📄 বান্দার জানের হক নষ্টকারীর তাওবা
জানের হক মানে কী? একটু চিন্তা করি। ধরুন, একজন মানুষকে শারীরিকভাবে আমি ক্ষতি করেছি। এই ক্ষতি চূড়ান্ত পর্যায়ে হলে, তাকে হত্যা করেছি অথবা হত্যার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি। এটাকে কতল বলে। এখন এটা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে হতে পারে, দলগত আক্রোশের কারণেও হতে পারে। অথবা দুনিয়াবি ফায়দার জন্য হতে পারে। হয়তো অন্যজন আমাকে ঘুষ দিয়েছে, টাকা দিয়েছে এবং বলেছে- 'তুমি ওকে মেরে দাও, তোমাকে এত টাকা দেবো।' তো অন্যায়ভাবে আমি একজনকে মেরে ফেলেছি। এগুলো হলো চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্ষতি।
আর দ্বিতীয় পর্যায় হলো। আমি একজনকে অন্যায়ভাবে একটা আঘাত করেছি। আল্লাহ তাআলা কসম করে বলেছেন যে,
'আমি যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার একজনের ওপর আরেকজনের হকগুলো পুরোপুরি আদায় না করব, ততক্ষণ কাউকে জান্নাতও দেবো না, জাহান্নামও দেবো না।[৮৮]
অর্থাৎ, কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে থাপ্পড়ও দেয়, আল্লাহ বিচার-দিবসে তার প্রতিশোধ নেবেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, 'ও আল্লাহর রাসূল, আমাদের কাছে তো কিয়ামতের দিন কিছুই থাকবে না! কাপড় থাকবে না পরনে, পায়ে জুতা থাকবে না। উসকো-খুসকো অবস্থায় আমরা কিয়ামতের দিন উঠব। আমাদের কাছ থেকে নেওয়ার তো কিছু নেই। তাহলে আল্লাহ কী নেবেন? ওকে কী দেবেন?'
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদেরকে বললেন-
অর্থাৎ, 'তুমি যদি ভালো কাজ করে থাকো, তো যাকে থাপ্পড় দিয়েছো, তোমার কামাই করা সওয়াব থেকে তাকে দেওয়া হবে। এভাবে যারই তুমি ক্ষতি করেছো বা ক্ষতি করতে সাহায্য করেছো, তোমার পুণ্য এক এক করে তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হবে। কিয়ামতের দিন তারা বলবে যে, “হে আল্লাহ! ও আমাকে একটা থাপ্পড় দিয়েছে।” আল্লাহ বলবেন, "আয়, তোকে বদলা দিয়ে দিই।” তখন হক নষ্টকারীর নামাজ-রোজা থেকে আল্লাহ তাআলা তাকে সওয়াব দিতে থাকবেন।
মানে হলো, এখন আর ওই বেচারার কাছে কিছু নেই। সওয়াবের কোনো অংশই তার ভেতরে নেই। তখন মজলুমের যে অন্যায় আছে, ওই অন্যায়গুলো জালিমের মাথার ওপর দিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।[৮৯]
শরীয়ত যদি থাকত, তাহলে শরীয়ত তার কাছ থেকে দুনিয়াতে কিসাস নিত। কিসাস মানে হলো হত্যাকারীকে সবার সামনে ডেকে এনে হত্যা করা হতো। এটি তার জন্য তাওবা। যাকে এভাবে শরীয়তের আলোকে বিচার করা হয়েছে সবার সামনে, তার ব্যাপারে আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দেবেন। অর্থাৎ যে আগে অন্যায়ভাবে কাউকে মেরেছে, শরীয়ত কর্তৃক তাকেও কিসাস বা হত্যা করা হলে, আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাকে মাফ করবেন। তবুও আরেক জায়গায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আমি নিশ্চিতভাবে এই কথা বলতে পারি না, খুনির সম্পূর্ণ পাপ মাফ হয়ে গিয়েছে। আমি জানি না।[৯০]
হত্যার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।' কারণ সে অন্যায়ভাবে খুন করেছে। যে অন্যায়ভাবে মানুষকে খুন করে, তাকে দুনিয়াবি সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটা এজন্য যে, এতে অন্যরা আর সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সাহস পাবে না। এই সুযোগই পাবে না। কারণ ওর ভেতরে ভয় কাজ করবে। শরীয়তে কিসাস কোনো বদ্ধ জায়গার ভেতরে হয় না। শরীয়তে কিসাস হয় মাঠ অথবা খোলা জায়গায়, সবাইকে জানান দিয়ে।
এখন যেমন মাইকে ঘোষণা করে- 'অমুক দিন টিকা দেওয়া হবে, আগামী দিন বিদ্যুৎ থাকবে না, গ্যাস থাকবে না।' কিসাসের ব্যাপারে শরীয়তের নির্ধারিত নিয়ম হলো, সারা মহল্লায় ঘোষণা দিতে হবে-'আগামী দিন অমুকের কিসাস কার্যকর হবে।' সমাজে বসবাসরত পুরুষদেরকে সেখানে থাকতে হবে। হদ ও কিসাস প্রয়োগের সময় কিছু মানুষ ওখানে হাজির থাকা শরীয়তে ফরজ। আর কেউ যদি না যায়, তাহলে পুরো এলাকা ফরজ তরক করার গুনাহে আক্রান্ত হবে। কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
'ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত করো। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তবে আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।' [৯১]
অর্থাৎ আল্লাহ যে সাজা দিচ্ছেন, মুমিনদের একটি দল যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যে, এটা কার্যকর হচ্ছে। কারণ, যারা তা দেখবে, ওইটা তাদের মনে ভয় সৃষ্টি করবে। আল্লাহ বলেছেন,
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
'আর হে বিবেকসম্পন্নগণ, কিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন; আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে।[৯২]
অর্থাৎ, শরীয়তের এই কিসাস তোমরা জারি করো। আল্লাহ তাআলা এই কিসাসের মাঝে তোমাদের জীবনকে লুকিয়ে রেখেছেন। হত্যাকারীকে যদি বাঁচিয়ে রাখো, তবে এমন হাজার হাজার মানুষ অন্যায়ভাবে নিহত হতে থাকবে। কিন্তু এই খুনিকে তোমরা যদি সবার সামনে হত্যা করো, তাহলে তোমাদের অনেকের জীবন একেবারে নিরাপদের সাথে থাকবে। ইতমিনানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে।
কিন্তু আমাদের সমাজে শরীয়তের এ বিধান নেই। খুনির বিচার হতে হতে যুগ পেরিয়ে যায়। নিহত ব্যক্তির পরিবার দৌড়াদৌড়ি করতে করতে নিঃস্ব হয়ে যায়। তবুও ফয়সালা আসে না। রায় আসতে আসতে জীবন-যৌবন সব চলে যায়।
যা-ই হোক, এক নাম্বারে মানুষের হক হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে, শরীয়ত অনুযায়ী হত্যাকারীর ওপর কিসাস জারি করা হবে。
কিসাস কায়েম হলে খুনির হয়তো পরকালে মাফ পাওয়ার সুযোগ আছে। তবে আরেকটা সুযোগ আছে। নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদের কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে নেওয়া। মাফ চাওয়ার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি কিন্তু শুধু ক্ষমা না। নিহতের পরিবার যদি মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে বদলা চায়, তাহলে তাদেরকে অন্ততপক্ষে দামি একশ উটের মূল্য দিয়ে দিতে হবে। একশ উটের দাম কত? ধরেন একটা উটের দাম এক লাখ টাকা, তাহলে কত হয়? এক কোটি টাকা।
এক কোটি টাকা দিয়েও মাফ চাইতে পারেন তাদের কাছে। এর পরেও আল্লাহ জানেন, আপনার মাফ হবে কি না। আঙুলের ডগা পরিমাণ জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য এই এক কোটি টাকা কিছুই না।
এখন কথা হচ্ছে, একশ উট কে দেবে? লম্বা আলোচনা, একশ উট দেবে হত্যাকারীর আত্মীয়-স্বজন। কাছের আত্মীয়, দূরের আত্মীয়-সবাই মিলে দেবে। পঞ্চাশটা উটও যদি ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেন, এই ফয়সালা শরীয়ত মেনে নেবে না। নিহতের পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পুরো একশটি দিয়ে মাফ চেয়ে নিতে হবে। তারা যাকে হারিয়েছে, তাকে হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে আপনার। চেষ্টা করতে হবে। তবে তারা যদি রক্তমূল্য ছাড়াই ক্ষমা করে দেয়, তবে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ওরা মাফ না করলে, বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। হয় মৃত্যুদণ্ড, নয়তো রক্তমূল্য।
এখন, আপনি যাকে মেরেছেন, তার পরিবারের কাছে মাফও চাননি, তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতেও চেষ্টা করেননি, কিন্তু মসজিদে এসে তাওবা করেছেন; আপনার এই তাওবা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য না। অনেকে আছে উমরায় যায়। হজে গিয়ে বাইতুল্লাহের গিলাফ ধরে বলে-'হে আল্লাহ! অমুককে মেরে ফেলেছি, মাফ করে দিয়ো। যা অন্যায় করেছি, ব্যক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সব মাফ করে দিয়ো।' বিভিন্নজন অন্যায় করে গিয়ে উমরা করে আসে। উমরায় কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মানুষ তো! মনে অন্যায়ের অনুভূতি জাগেই। যদি তার আকল বিলুপ্তি না ঘটে, তাহলে কিছু না কিছু খারাপ তো লাগবেই। এর কারণে মসজিদে নববিতে গিয়ে কান্না শুরু করে দেয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারকে গিয়ে সালাম পাঠ করে, ওখানে গিয়ে কাঁদে। কিন্তু শরীয়তে এটা মানুষের হক নষ্ট করার তাওবা না। কারণ, এভাবে যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তো সামনে আরেকজনকে খুন করে আরও একটি উমরায় যাওয়ার রাস্তা বের করবে সে। আবার মসজিদে নববিতে এসে কান্নাকাটি করবে। আবার কিছু সময় পরে যাকে মারতে মন চায় মারবে। এভাবে সে সকল মানুষের জীবন বিপন্ন করবে। কিন্তু শরীয়ত এটার কোনো রাস্তাই রাখেনি। হয় হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, কতল করা হবে, না হয় হত্যাকারী ক্ষমা চাইবে নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে। একশ উট পরিমাণ জরিমানা দেবে। দেওয়ার পর যদি ওরা মাফ করে, তবুও তাওবা করতে থাকতে হবে, যেন আল্লাহও মাফ করে দেন। যেন কিয়ামতের দিন বিচারের মুখোমুখি না করেন।
আপনার কাছে হয়তো বিষয়টা সহজ মনে হয়। কিন্তু যার আত্মীয়-স্বজন মারা গেছে, যে সন্তান তার বাবাকে হারিয়েছে ছোট বয়সে-সে-ই বুঝে, ক্ষত কত গভীর।
এখন আমাদের সমাজটা এই পর্যায়ে গিয়েছে যে, আমাদের একজন মা-বোন যদি বিধবা হয়, তাহলে বাবা-মার কাছেও সে বোঝা হয়ে যায়। স্বামী হারানোর কারণে তার আর কেউ থাকে না। সন্তান পালন করা তো দূরের কথা, নিজে আগে যেভাবে শাহেনশাহ হালতে চলত, এখন গরিবের বেশেও সে চলতে পারে না। ঘরে ভাইয়ের বউয়ের কাছে কাজের বুয়ার মতো থাকতে হয়। এই ক্ষতি আপনি বুঝবেন কোত্থেকে! আপনার তো কোনো ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি ওই বাচ্চার হয়েছে। ক্ষতি ওই বিধবা নারীর হয়েছে。
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'বিধবা ও মিসকিনদের অভাব দূর করার চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর তুল্য।[৯৩]
অর্থাৎ, বিধবা নারীকে দেখাশোনা করলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সওয়াব পাবেন। কিন্তু বিধবা নারীরা আজ বাবার কাছে বোঝা হয়ে গেছে, ভাইয়ের কাছে বোঝা হয়ে গেছে, সমাজের কাছে বোঝা হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার কেউই মূল্যায়ন করেনি, একবার ভাবেওনি।
একজনকে আপনি দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়ে মসজিদে এসে তাওবা করবেন! এতেই সব মাফ হয়ে যাবে? আপনি তো এভাবে আরেক বার আরেকজনকে মেরে এসে তাওবা করবেন। এভাবে আর কত সন্তানকে এতিম করবেন, আর কত নারীকে বিধবা করবেন? আপনি একটু ফিকির করেন! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।
আমি যদি কাউকে আঘাত করি, সাথে সাথে বলতে হবে, 'আমি তোমাকে মানুষের সামনে থাপ্পড় দিয়েছি, আজকে তুমি আমাকে থাপ্পড় দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নাও। যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে আমার নেকি তোমাকে দিয়ে না দেন। অথবা তোমার গুনাহগুলা যেন আমাকে না দিয়ে দেন। আজকে তুমি আমাকে সবার সামনে আঘাত করে প্রতিশোধ নিয়ে নাও।'
যদি কেউ কাউকে প্রকাশ্যে থাপ্পড় দেয়, কেউ কাউকে মারে, তো সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে যে, 'তুমি আমার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারো। তোমাকে অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে। না নিলে কিয়ামতের দিন আমাকে পাকড়াও করা হবে।' যদি সে মাফ করে দেয়, আলহামদুলিল্লাহ। তবে এরপর আল্লাহর কাছেও মাফ চাইতে হবে।
- 'আমি নেতা, আমি বড় মাপের লোক, আমি আরেকজনের হাতে প্রকাশ্যে আঘাত কিভাবে খাব? আমার একটা প্রেসটিজ আছে না! একটা বাহাদুরি আছে না!'
না, কোনো নেতৃত্ব থাকবে না কিয়ামতের দিন। আল্লাহ তাআলা বলছেন,
يَوْمَ هُم بَارِزُونَ لَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
'মানুষ যেদিন (কবর থেকে) বের হয়ে আসবে, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। (সেদিন ঘোষণা দেওয়া হবে,) "আজ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কার?” (উত্তর আসবে) “এক ও একক মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর।” [৯৪]
আল্লাহ ঘোষণা দেবেন-আজকে রাজত্ব কার? আজকে রাজত্ব একমাত্র আমার। আজকে কারও কোনো কথা চলবে না। প্রত্যেকে যা যা করেছে, আজকে ওই সব বদলা মিটিয়ে দেওয়া হবে।
খুনি নেতাকে সবার সামনে ধরে আনা হবে। সে যদি পুণ্য করে থাকে, তবে ওই পুণ্য আল্লাহ তাআলা তার কাছ থেকে নিয়ে নিহত ব্যক্তিকে দিয়ে দেবেন। অথবা নিহত ব্যক্তির যত গুনাহ আছে, সব ওই নেতার মাথায় দিয়ে সর্বোচ্চ ভয়ংকর জাহান্নামে আল্লাহ তাকে পাঠাবেন।
এজন্য অন্যায়ভাবে আমি যদি কাউকে আঘাত করে থাকি, তবে দুনিয়াতেই তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে।
একটু ভাবার বিষয়, আমার স্তর আল্লাহর কাছে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধারেকাছেও না। একদিন সাইয়িদুল কাওনাইন, সাইয়িদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালিন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের সবাইকে সারি ধরে দাঁড় করিয়েছেন। দাঁড় করিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন-'শোনো, আমি যদি কারও জানের ক্ষতি করে থাকি, মালের ক্ষতি করে থাকি, ইজ্জত নষ্ট করে থাকি, কিয়ামতের দিন আমাকে ধোরো না। আজ আমার থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নাও। আমি নিজেকে তোমাদের সামনে পেশ করছি। '[৯৫]
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যিনি সবার সেরা, যার কারণে আমরা সেরা, যার কারণে কুরআন-কিতাব সব আমরা পেলাম এবং আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার স্বপ্নও আমরা তাঁর কারণেই দেখতে পারি। ওই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ওপর এত এত ইহসান করার পরেও সাহাবাদের সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বলেছেন, 'আমি যদি কারও জানের, মালের, ইজ্জতের কোনো ক্ষতি করে থাকি, আজকে আমার থেকে বদলা নিয়ে নাও। কিয়ামতের দিন আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বোলো না যে, "আমার সাথে মন্দ আচরণ করা হয়েছে, দুনিয়া থেকে আমি বদলা নিতে পারিনি।""
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড় করানোর পর এক সাহাবি তখন কথা বলতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটা বদলা নেওয়ার আছে।'
আমাদেরকে শেখানোর জন্য এটা একটা অনুশীলন। আমরা তো দুনিয়ার ইজ্জত, দুনিয়ার সম্পদ-এসবকে আসল বানিয়েছি। ওয়াল্লাহি! এগুলোর কোনোটাই আসল না। এগুলো কোনোটাই থাকবে না। আপনার-আমার শেষ পরিণতি দেখার জন্য বৃদ্ধ লোকগুলোকে দেখেন। এদেরও একদিন আমার মতো, আপনার মতো স্বাস্থ্য ভালো ছিল। এরাও ঠিকমতো দুনিয়ায় চলাফেরা করেছে। আজকে তাদের অবস্থা দেখুন, নিজের সন্তানের কাছেও তারা আজ বোঝা। দয়া করে আমার আর আপনার শেষ পরিণতি চিন্তা করুন।
তো, ওই সাহাবা দাঁড়িয়ে বলেছেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বদলা বাকি আছে।' কী সেই বদলা? সে বলে, 'আপনি একবার জিহাদের ময়দানে কাতার সোজা করতে গিয়ে ধনুক দিয়ে আমাকে খোঁচা দিয়েছেন। আমি একটু এগিয়েছিলাম, তাই আমাকে খোঁচা দিয়েছিলেন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন নিজের পিঠকে পেশ করেছেন, 'নাও, তুমি আমার থেকে বদলা নিয়ে নাও।' সাহাবি সুযোগ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো পিঠ চুমো দিয়ে ভরে দিয়েছেন। তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম, কবে আপনি বলবেন যে আমার থেকে প্রতিশোধ নাও। আমি তো চেয়েছিলাম, আমার ঠোঁট আপনার বদন মুবারকের সাথে একটু লাগুক। এজন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।'
এখন বলুন, আপনি আর আমি কোথায়? আমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাইতেও বেশি সম্মানিত?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল এটা না যে, কোনো একটা বিশেষ সময় এল আর তিনি বললেন— 'ভাই, আমি জীবনে যা যা করেছি মাফ করে দিয়েন। আরেকবার সেবা করার সুযোগ দিয়েন।'
কীসের সেবা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো সংকোচ ছাড়াই বলেছেন, 'বদলা নাও।' সাথেসাথে স্বাভাবিক গতিতে নিজের চাদর খুলে দিয়েছেন। আর এই সাহাবিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চুমোয় ভরে দিয়েছেন।
কই গেল এখন সেই আদর্শ? কোথায় সেই আদর্শ! আমি নেতা হওয়ার, আমি অর্থকড়ির মালিক হওয়ার জন্য কত মানুষের হক নষ্ট করেছি। কত মানুষের জানের কষ্ট দিয়েছি। একদিনও তো তার কাছে মাফ চাইতে যাইনি! আজ যদি আমি না যাই, আল্লাহর কসম! এর বদলা বাকি থাকবে। দুনিয়াতে এর বদলা আদায় না হলেও কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জালিমদের থেকে মজলুমের হক আদায় করে দেবেন। প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বেন।
আপনি যাকে মন চায়, তাকে মারার পরিকল্পনা করেছেন। মেরেছেন। কত নারীকে যে বিধবা করেছেন! এরপর গিয়ে হজ আর উমরা করে, মসজিদে সিজদা দিয়ে, কিছু টাকা দান-সাদাকা করে মনে করেছেন যে, মাফ হয়ে গেছে? না। এটা বান্দার হক। আগে বান্দার কাছে যান। তার কাছে মাফ চান। বলুন, 'আমার কাছ থেকে প্রতিশোধ নাও।' এরপর আল্লাহর দরবারে সিজদা করুন— 'ওগো আল্লাহ! আপনার হুকুম মানিনি। আপনি মানুষকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। আমি কষ্ট দিয়েছি। আমি আপনার কাছে মাফ চাই।' তাহলে মাফের আশা আছে, অন্যথায় না।
বিষয়টা বোঝা জরুরি। আমি মনে করেছি, দুনিয়াতে আমি আমার মতো চলব, আমার মতো করে ইবাদত করব!
হতেই পারে না। নিম্নের হাদীসখানি লক্ষ করুন:
একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟
'তোমরা কি বলতে পারো, গরিব কে?'
গরিব বলতে তো আমরা জানি-যার অর্থকড়ি, সম্পদ ইত্যাদি কিছুই নেই। তা-ই না? সেই জন্য সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যার অর্থকড়ি ও ধন-সম্পদ নেই, সে-ই তো গরিব।' তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
'আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত গরিব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায়, সেই ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।'[৯৬]
ভালো করে বুঝে নিন।
দুনিয়ায় কেউ কাউকে গালি দিলে কিয়ামতের ময়দানে গালিদাতাকে আটকানো হবে। আজ মুসলিম ভুলেই গিয়েছে যে, গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ। গালি দেওয়া তো আজকাল আমাদের একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। একটা রিকশা আরেকটার সাথে ধাক্কা খেয়েছে, তো একসাথে পঞ্চাশটা গালি দিয়ে জিতে গিয়েছে। ও তো আসলে জাহান্নাম পেয়ে জিতে গিয়েছে!
গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ। আর এখন তো এমন গালি দেওয়া হয়, যা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছিলই না। আগে গালি ছিল-'তুই একটা গর্দভ', 'এই গাধা, তোর ধ্বংস হোক।' তখন লোকেরা গাদা-গর্দভ বলত। আর এখন যা বলে, সেগুলো তো জবান দিয়ে কোনো মুমিন উচ্চারণও করতে পারবে না। ভুলে মুখে আনলেও মুখ তিনশ বছর ধৌত করা লাগবে।
রিকশা একটার সাথে আরেকটা ধাক্কা খেয়েছে, কারও সাথে কারও রাগ উঠেছে-ব্যস, তাহলেই জবান চালাচ্ছে। যা মন চায়, তা-ই বলছে।
বেশ, তুমি বলতে থাকো। কিয়ামতের দিন যত নেকি নিয়েই আসো না কেন, যাকে গালি দিয়েছিলে সে হয়তো দাঁড়িয়ে বলবে : ‘হে আল্লাহ! অমুক লোক আমাকে গালি দিয়েছে, তমুকে আমার গীবত করেছে। এই লোক আমার অগোচরে কথা বলেছে। ওর যত নেকি আছে, হিসাব করে করে একেকটা গালির বদলে ওর একেকটা নামাজ আমাকে দিয়ে দিন।’
আরও লোক এসে দাঁড়িয়ে যাবে—যাদেরকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, অন্যায়ভাবে মারা হয়েছিল; যাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল।
এভাবে পুরো পাহাড় পরিমাণ সব নেকি বিলিয়ে দেওয়ার পরেও আরও লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকবে। আরও পাওনাদার দাঁড়িয়ে থাকবে। গীবতের অপরাধের কারণে সারা দুনিয়া পরিমাণ নেকিও কোনো কাজে আসবে না। অথচ আমি আমার জবানকে হেফাজত করি না! যদি তার নেক কাজ থাকে, তবে পাওনাদারদেরকে নেক কাজ দিয়ে দেওয়া হবে। যদি নেক কাজ শেষ হয়ে যায়, পাওনাদারদের থেকে গুনাহ একেকটা করে নিয়ে তার মাথার ওপর চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।’
রাসূলুল্লাহ -এর ভাষায়, এই ব্যক্তিই হলো প্রকৃত গরিব।
ভালো করে বুঝুন, দিল থেকে বুঝুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে একবারে বুঝিয়েছেন। আমাদের ধারণা হলো, নেকির কাজ হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, দান-সাদাকা—এগুলো। তা-ই না? কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নেকির কাজ শুধু নামাজ-রোজা না। শুধু এগুলো দিয়ে কেউ জান্নাতে যাবে—এ কথা কুরআন-হাদীসে নেই। একদল লোক নামাজ নিয়ে আসবে। কোনোদিন তারা নামাজ কাযা করেনি। রোজা, হজ, যাকাত—সবই ঠিক আছে। কিন্তু তার জবান ঠিক নেই, মানুষের হক তারা নষ্ট করেছে। শুধুই যে নামাজ-রোজা ইসলামের সৌন্দর্য—তা কিন্তু না। শুধু এগুলো দিয়েই কেউ কি জান্নাতে যাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, না।
নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত—এগুলোকেই কি আপনি জান্নাতে যাওয়ার কারণ মনে করেন?
মানুষের হক না আদায় করার কারণে কিয়ামতের দিন অনেকেই জাহান্নামে যাবে, যদিও আল্লাহর হক তারা আদায় করেছে। কাজেই শুধু আল্লাহর হক না, পাশাপাশি মানুষের হকও আদায় করতে হবে। কাউকে চড় দিয়েছি, কাউকে হত্যা করেছি, কাউকে হত্যার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি, কাউকে গালি দিয়েছি, কারও গীবত করেছি, তো আমি সেদিন বরবাদ হয়ে যাব। এই নামাজ, রোজা, যাকাত, সাদাকা আমাকে জান্নাতে নিতে পারবে না。
সুতরাং আসুন, আমাদের মেধা ও বুঝ ঠিক করে নিই। মানুষের হক নষ্ট করার কারণে কিয়ামতের দিন আমরা সবচেয়ে বেশি অসহায় থাকব। দ্বীন শুধু নামাজ, রোজা, দান-সাদাকার নাম না। মানুষের হক, স্ত্রীর হক, পিতা-মাতার হক, প্রতিবেশীর হক-এগুলোও দ্বীন। এসব হকের কোনোটি আদায় না করলে জান্নাতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না।
কাউকে যদি গালি দিই, গীবত করি, পরনিন্দা করি অথবা কারও বিরুদ্ধে কোনো কিছু করে থাকি, আর সে যদি জীবিত থাকে, তাহলে আমার এখনো সুযোগ আছে। তার কাছে মাফ চাইতে হবে। বলতে হবে, 'ভাই! আমাকে মাফ করে দিন।'
টিকাঃ
[৮৮] মুসনাদে আহমাদ: ১৬০৮৫; হাসান
[৮৯] বুখারি: ২৪৪৯, ৬৫৩৪
[৯০] সিলসিলা সহীহাহ: ৬৮৯
[৯১] সূরা আন-নূর, ২৪: ২।
[৯২] সূরা আল-বাকারা, ২: ১৭৯।
[৯৩] বুখারি, ৫৫৮২।
[৯৪] সূরা আল-গাফির, ৪০: ১৬।
[৯৫] আল ইসাবাহ ফী মারিফাতিস সাহাবাহ, ১০/৭১
[৯৬] মুসলিম, ৬৩৪৩।
📄 বান্দার মালের হক নষ্টকারীর তাওবা
এবার আমাকে তালিকা তৈরি করতে হবে, আমি কার কত মাল নষ্ট করেছি। এরপর আমার জায়গা-জমিন-সব দিয়ে হলেও আমি তার জরিমানা দিয়ে দেবো। এখন আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মালের হকের ব্যাপারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাল সাধারণত আপনজনরাই বেশি নষ্ট করে। বাবা তার মেয়ের হক নষ্ট করে। গ্রামে এটা একেবারে স্বাভাবিক। শহরেও স্বাভাবিক কি না, সেটা জানি না। আপনারা ভালো বলতে পারবেন।
মেয়ের হক নষ্ট করে বাবা। মেয়েকে কোনোরকম একটা বুঝ দিয়ে সম্পত্তি সব ছেলেদেরকে দিয়ে যায়। শরীয়তে সে তো বাবা হওয়ারই যোগ্য না। কখনোই না। সন্তানাদির ব্যাপারে আমি কাউকে প্রাধান্য দিচ্ছি না। কোন সন্তান লালন-পালন করলে আপনি জান্নাতে যাবেন, এটা আগে বুঝুন। হাদীসে স্পষ্ট আছে, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা শুনিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যার তিন জন মেয়ে আছে, সে ওই মেয়েদেরকে দ্বীন শিখিয়েছে এবং দ্বীনি শিষ্টাচারের ওপর বড় করেছে, বড় করার পর দ্বীনদার পুরুষের কাছে ওই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে-সেই লোকটা জান্নাতি।'
এরপর আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেছেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! দুটো মেয়ে হলে?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'দুটো হলেও যদি এভাবে পালন করে, দ্বীন শিক্ষা দেয় এবং দ্বীনদার পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত সে যদি ইখলাসের সাথে করে, তবুও সে জান্নাতি।' আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যার একটা মেয়ে আছে?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'একজন হলেও জান্নাতে যাবে।[৯৭]
ছেলেকে নেককার বানালে অনেক বড় সওয়াব। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতি হওয়ার ব্যাপারে সরাসরি সুসংবাদ দিয়েছেন মেয়েদের বেলায়। মেয়েদেরকে দ্বীন শেখালে, দ্বীনদার বরের সাথে বিয়ে দিলে, সেই পিতা জান্নাতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলে দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেও মেয়েদের পিতা। তাঁর চার মেয়ে ছিল। তাঁর ছেলেদের মধ্যে একজনও বেঁচে থাকেনি।
আর আমরা? যে কন্যার বাবা জান্নাতে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেত, ওই বাবা মেয়ের হক নষ্ট করে জাহান্নামে যাচ্ছে। মেয়েকে উলটাপালটা বুঝ দিচ্ছে। ভাই তাকে ঠকাচ্ছে। সম্পদ নিতে আসলে ওর সাথে আর কোনো কথা বলে না ভাই। জীবনের জন্য সব সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। অথচ ভাইয়ের বলার দরকার ছিল, 'বোন আমার! তোর সম্পদ তুই নিতে না চাস, কিন্তু আমরা দিতে চাই। দয়া করে তোর সম্পদটা নিয়ে যা।'
এভাবে আজ স্বামী তার স্ত্রীর হক নষ্ট করছে। মোহর দিচ্ছে না। মোহর যে দেওয়া উচিত, এই অনুভূতিও দিল থেকে সরে গিয়েছে। কিন্তু বিয়ের সময় মানুষকে দেখিয়ে মোহরটা নির্ধারণ করেছে। যেটা পারবে না, ওটা নির্ধারণ করেছে। পাঁচ লাখ দেবো, দশ লাখ দেবো। কেন ভাই? এত নির্ধারণ করছো কেন? কে বলেছে এটা নির্ধারণ করতে? মোহর না দিয়ে তো স্ত্রীর কাছে যাওয়াই জায়েজ নেই-যদি স্ত্রী অনুমতি না দেয়। কিন্তু মারা যাওয়ার আগেও ওই মোহর আর দেওয়া হয়ে ওঠে না। মারা যাওয়ার সময় সন্তানদেরকে ওসিয়তও করে না যে, 'আমার মোহরটা দিয়ে দিস তোর মাকে।' আপনিও বুড়ো হয়ে মারা যাচ্ছেন, আরেকজনও বুড়ি হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ওই টাকা দিয়ে কী করবে? এখন তো খেতেও পারে না ঠিকমতো, পরতেও পারে না। যখন শখ ছিল, ওই সময় শখ পূরণ করতে পারেনি। আর এখন আপনি বুড়ো অবস্থায় দিচ্ছেন তার মোহর? ওগুলোতে আবার ছেলে-মেয়েরা ভাগ বসিয়েছে। নাতি-নাতনিও ভাগ বসিয়েছে। আশ্চর্য কথা! শরীয়ত আপনার স্ত্রীকে যেটা দিয়েছে, আপনি তার কাছে যাওয়ার আগে ওটা পরিশোধ করে দেবেন।
এভাবেই, আজকাল আপনজনরা মালের ব্যাপারে আত্মীয়কে ঠকাচ্ছে। ভাই ভাইকে ঠকাচ্ছে, আর স্বামী স্ত্রীকে ঠকাচ্ছে, মেয়েদেরকে ঠকাচ্ছে তাদের পিতা। এই হক না দেওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা শুরু হয়েছে। এখন বোন বলছে, 'মাফ করে দিয়েছি।' স্ত্রী বলছে, 'আমিও মাফ করে দিয়েছি।' না, এটা মাফ হয় না শরীয়তে। ভালো করে বুঝে নিন, এই মাফ মাফ নয়।
তাহলে মাফ কাকে বলে? আপনি আপনার বোনকে পুরো জমি বুঝিয়ে দিলেন অথবা জমির প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দিলেন। আপনার স্ত্রীকে মোহরানা পুরোপুরি খামে দিয়ে দিলেন। অথবা তার একাউন্টে জমা করে দিলেন। জমা করে দেওয়ার পরে, মালিকানায় আসার পরে যদি তারা বলে-এগুলো আপনি নিয়ে যান, আমার আর লাগবে না; তাহলে হক আদায় হবে। এটাই মাসআলা। এর আগ পর্যন্ত মাফ নয়। স্ত্রী এখন আপনার অধীনে আছে, সে তো বলবেই নিয়ে যান। তার হস্তগত হওয়ার পর সে যদি ফিরিয়ে দেয়, তবে বুঝবেন মাফ হয়েছে।
ধরুন, আপনি আপনার বোনকে ওয়ারিশ পরিমাণ সম্পদ লিখে দিয়েছেন বা সম্পদ পরিমাণ টাকা দিয়ে দিয়েছেন। টাকা হাতে যাওয়ার পর সে যদি ফিরিয়ে দেয়, তবেই কেবল মাফ। কিন্তু কয়জনে টাকা ফেরত দেয় আল্লাহই ভালো জানেন! টাকা যাওয়ার আগে সব দিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু টাকা হাতে গেলে দিয়ে দেওয়া যায় না। তাহলে টাকা না দিয়েই আপনি কিভাবে বুঝলেন যে, সে মাফ করে দিয়েছে? তাকে তো তার মালিকানা বুঝিয়েই দেননি। অথচ বলছেন-'মাফ করে দিয়েছে।' আপনি এই মাফ নিয়ে বসে থাকুন। এই মাফ মাফ নয়।
আমি আমার বোনের হক নষ্ট করছি, আমার স্ত্রীর হক নষ্ট করছি, আমার মেয়ের হক নষ্ট করছি। আমি তো ভাই/স্বামী/পিতা হওয়ার যোগ্যতাই রাখি না। মালের কথা উঠলেই লোকে বলে- 'ওরা তো মাফ করে দিয়েছে।' অথবা 'তাওবা করে নিয়েছি।'
অনেকেই চাঁদাবাজির টাকা লুটেপুটে খায়। অথচ রাস্তাঘাটে কত গাড়ির থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠিয়েছে জীবনে, জানেও না। তাহলে সে কিভাবে মাফ পাবে? কয়জনের থেকে মাফ চাইবে? কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, জানেই তো না সে। এখানে শুধু টাকা নেয়নি, জোর খাটিয়ে নিয়েছে, ক্ষমতা খাটিয়ে নিয়েছে। ও যে কত টাকা দিয়ে ওর পেট পুরেছে, তা তো জানে না। কিয়ামত পর্যন্ত এটা মাফের কোনো সুযোগ নেই। ওর বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন কত নালিশ যে দাঁড়াবে, ও নিজেই জানে না। মালের হকের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। আল্লাহ কসম! এই ব্যাপারে কোনো সাহাবা, কোনো তাবিয়ি মাফের কথা বলেনি। অন্য কারও মাল আত্মসাৎ করে মসজিদে দান করে মাফ পাওয়ার সুযোগ নেই। না, সবার আগে পাওনাদার ব্যক্তির কাছে গিয়ে বলতে হবে- 'হে ভাই! আমি জোর খাটিয়ে, অন্যায়ভাবে তোমার থেকে টাকা নিয়েছি। আমাকে মাফ করো।'
টাকা ফিরিয়ে দিয়ে এরপর আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলে লাভ আছে। এর বাইরে হজ করলেও মাফ নেই। মাল পাওনাদারের কাছে ফেরত না দিলে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার বিরুদ্ধে অনেক ফরিয়াদি থাকবে। তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে অনেকেই।
মাল বোঝার বিষয়। বাড়ি বানাতে গেলে আসে এলাকার ছেলেরা। তারা বলে, 'ভাই! একটু মিষ্টি খাব।' ও নাকি মিষ্টি খাবে! তুমি তো মল খাচ্ছ, মিষ্টি না! এরচেয়ে বড় গুনাহ হতে পারে না। এটা এত বড় অন্যায়, এত বড় গুনাহ যে, তার ব্যাপারে হাদীসে ধমকি আছে। তার ঈমানই থাকতে পারে না এই অবস্থায়। আর সে নাকি মিষ্টি খেতে এসেছে!
ওই লোকটার একটা বাড়ি করতে জীবন চলে যাচ্ছে, আর তুমি এসে উলটো চাঁদাবাজি করছো। দশ লাখ টাকা দিতে হবে, পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে...। কিয়ামতের দিন এগুলো সব আগুন হবে, আগুন পেটে নিয়ে উঠবে তোমরা। এজন্য ঘরে বসে তাওবা করলে কাজ হবে না। হকদারের কাছে হক পৌঁছে দিয়ে, তার কাছে গিয়ে মাফ চাইতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই কেবল রেহাই আছে। না হলে কোনো মাফ নেই। এটাই মাসআলা। এই ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন, 'যে তার ভাইয়ের হক নষ্ট করেছে, সে তার থেকে পুরোপুরি মাফ চেয়ে নিতে হবে। এর আগে মাফ নয়।' নচেৎ হজ, উমরা, নামাজ-কোনো কিছু কাজে আসবে না।[৯৮]
ভাই আমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলিনি। এটা আঘাতের মাসআলা না। বাস্তব বিষয়। আপনি মুসলিম দাবি করে কিভাবে আরেকজনের হক নষ্ট করেন? আপনি তো জানেন-এর বদলায় কিয়ামতের দিন পেট ভরে আগুন নিয়ে আসবেন। এটা কুরআনের আয়াত।
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتْلَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
'নিশ্চয় যারা ইয়াতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে। আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।'[৯৯]
যে ব্যক্তি আরেক জনের মাল অন্যায়ভাবে খায়, সে আসলে আগুন খেলো। কুরআনের স্পষ্ট শব্দ। অথচ তার কোনো পেরেশানি নেই। রাস্তা-ঘাটে, অলিতেগলিতে আজ এগুলো চলছে। এটার বিনিময়ে হজ, উমরা করলে কোনো লাভ হবে না। এটার তাওবা হলো, যার কাছে যত টাকা খেয়েছে দিয়ে আসতে হবে। এরপর জোরপূর্বক খাওয়ার কারণে মাফ চাইতে হবে তার কাছে। যদি মাফ হয়, তখন আল্লাহর কাছে মাফ চান। আল্লাহ আমাদের বোঝার, আমল করার তাওফীক দান করুন。
টিকাঃ
[৯৭] মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৪৭; সহীহ
[৯৮] মুসলিম ১৩৭, নাসায়ী ৫৪১৯, আবু দাউদ ২৩২৪।
[৯৯] সূরা নিসা, ৪: ১০
📄 মুমিনের ইজ্জত নষ্টকারীর তাওবা
মানুষকে অপমান করা বলতে কী বোঝায়, আমরা সকলেই তা জানি। অপমান সরাসরি হতে পারে, পেছনেও হতে পারে। গালি দেওয়া, বাবা-মা তুলে কথা বলা, টিটকারি করা, তিরস্কার করা, উপহাস করা-এই সবগুলোই হচ্ছে মানুষের ইজ্জতের ওপর আঘাত। এই আঘাত মানুষকে সামনাসামনিও দেওয়া যায়, আবার পেছনে পেছনেও দেওয়া যায়। পেছনে যে বদনাম করা হয়, ওটাকে গীবত বলে।
ধরুন, কারও ভেতর কোনো বদগুণ লুকিয়ে আছে, কিন্তু অন্য মানুষ সেটা জানে না। আপনি তা জানিয়ে দিলেন। এটাকে গীবত বলে। আবার ধরুন, একজন সিগারেট খায় সবার সামনে। তাকে সিগারেটখোর বললে গীবত হবে fix না। কারণ, সে এই অন্যায়টা দেখিয়ে দেখিয়ে করে। কেউ যদি প্রকাশ্য নেশা করে আর সবাই তা জানে, তবে তার কথা বলাটা অন্যায় না। ভালো করে বুঝুন, এটা গীবত না। কিন্তু একজনের কোনো গোপন কথা বা আচরণ যদি থাকে-যা লোকে জানে না, তবে সেটা জানিয়ে দিলে গীবত হবে।
গীবত নিয়ে আলোচনা আমার মাকসাদ না। কিন্তু মানুষের সম্মানহানি করা, তিরস্কার করা, খোঁটা দেওয়া, গালি দেওয়া-এগুলো স্পষ্ট কবীরা গুনাহ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বুখারি শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقُ
'মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি। [১০০]
এটা শরীয়ত-বিরোধী কাজ। ফাসিকি কাজ। আপনি কারও গীবত করেছেন, কাউকে গালি দিয়েছেন, কাউকে সামনাসামনি অপমান করেছেন, বেইজ্জতি করেছেন-তাহলে আপনার জন্য ধ্বংস। আল্লাহ তাআলা একটি সূরার শুরুতেই বলেছেন,
وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لِّمَرَةِ
'দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য, যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী। [১০১]
মুসলিমের ইজ্জত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পৃথিবীর সবথেকে দামি দিনে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মাঠে, পৃথিবীর এক দামি কাজ-হজের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, তার একটা কথা হলো, অন্যায়ভাবে কারও রক্তপাত করা, কারও মাল নষ্ট করা এবং কারও ইজ্জতে আঘাত দেওয়া তোমাদের জন্য হারাম। আজকে যেভাবে হারাম, কিয়ামত পর্যন্ত সেভাবে হারাম। আরাফার দিনে যেভাবে হারাম, অন্যদিনেও সেভাবে হারাম। এই শহরে যেভাবে হারাম, সব জায়গায় তোমাদের জন্য অন্যায় রক্তপাত করা হারাম। [১০২]
সবচেয়ে দামি জায়গায়, সবচেয়ে দামি সময়ে, সবচেয়ে দামি নবি এই ঘোষণা দিয়েছেন।
এখন তো একজন মুসলিমকে অপমান করা, বাবা হয়ে ছেলেকে অপমান করা, ছেলে হয়ে বাবাকে অপমান করা, স্বামী হয়ে স্ত্রীকে অপমান করা, স্ত্রী হয়ে স্বামীকে অপমান করা-এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে। সুযোগ পেলেই ঘটছে। এখন পারিবারিক অবস্থা দুভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা হয়ে গিয়েছে শ্বশুরালয়, আরেকটা বাবা-মায়ের ঘর। আলাদা দুটো। একটা ছেলে পক্ষ, একটা মেয়ে পক্ষ। অথচ এই দুই পক্ষ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে, একজন আরেক জনের সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য। আর এখন দুপক্ষ হয়েছে, একজন আরেকজনের বদনাম গাওয়ার জন্য; ভুল ধরার জন্য। কে কোনটা ভুল করেছে-তা খোঁজাই যেন মাকসাদ হয়ে গেছে। তাহলে আত্মীয়তার বন্ধনে লাভ হলো কী? এর আগে তো আমরা এত বড় গুনাহের বাজার সাজাইনি। এখন তো গুনাহের বাজার সাজিয়ে বসেছি। কী খাওয়াল-না খাওয়াল, কতটা যত্ন করল, কতটা করল না-এটা নিয়ে বিশাল আলোচনার ফিরিস্তি। প্রত্যেকটা ঘর একেকটা জাহান্নামের কুণ্ডলী হয়ে গিয়েছে।
আমি ছেলেপক্ষ হয়ে মেয়েপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলি! আমি কি একবারও ভাবি না, আমারও মেয়ে আছে! আমি আজ বাবা হয়ে সন্তানের ইজ্জত রাখছি না। আমার রাগ উঠে গেছে, ব্যস। আমার সন্তানকে যা মন চায় তা-ই বলছি। সন্তানের গীবত করছি। সন্তানও বাবা-মায়ের গীবত করছে। এই যে গীবতের চর্চা চলছে-এভাবে আমরা একজন আরেকজনের ইজ্জতকে নষ্ট করছি। কিয়ামতের দিন বাবা-সন্তান একজন আরেকজনকে জান্নাতে নেবে তো দূরের কথা, একজন আরেকজনকে যেন জাহান্নামে নেওয়ার জন্য পাড়াপাড়ি করতে থাকবে।
এজন্য অবস্থার সংশোধন করা দরকার। পেছনে যা হওয়ার হয়েছে। সামনে আমরা আর গালি দেবো না, গীবত করব না, কাউকে আঘাত করব না, কাউকে কষ্ট দেবো না অন্যায়ভাবে। এই কথার প্রতিজ্ঞা করা দরকার। প্রতিজ্ঞা করার পরে আমার কাজ হলো একথা বলা যে, 'ভাই! আমি আপনাকে অমুক দিনে গালি দিয়েছি। আমি আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। আপনার নামে গীবত করেছি। আপনি যদি মাফ না করেন, আল্লাহ আমাকে মাফ করবে না।' অনেক সময় হয়তো মনে থাকে না যে, রাগবশত আমি কী বলেছি। তবুও যদি আমার আবছা আবছা মনে পড়ে যে, 'হ্যাঁ, আমি ঝামেলা করেছি, গীবত করেছি, তার নামে বদনাম গেয়েছি'-তাহলে তার কাছে এ কথা বলা জরুরি। তাকে বলতে হবে, 'ভাই! আমার তো সব মনে নেই। আমি তোমার গীবত করেছি, আমাকে মাফ করে দিয়ো।'
তাহলে প্রথম কাজ হলো, জীবনে কখনো তার গীবত করব না-এটা তাকে শুনিয়ে দেওয়া。
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া。
তৃতীয় কাজ হলো, বদনামের পরিবর্তে তার ভালো গুণগুলো উপস্থান করা। তার সুনাম করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে দুআ শিখিয়েছেন,
اللَّهُمَّ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ سَبَبْتُهُ، أَوْ لَعَنْتُهُ، أَوْ جَلَدْتُهُ، فَاجْعَلْهَا لَهُ زَكَاةً وَرَحْمَةً
'হে আল্লাহ! আমি যাকে কষ্ট দিয়েছি, বা যে মুসলিমকে গালি দিয়েছি (নবিজি গালি দেননি, আমাদেরকে শেখানোর জন্য বলেছেন), যে কষ্টই দিয়েছি, এটা তার জন্য সওয়াবের কারণ বানিয়ে দিন। মুক্তির কারণ বানিয়ে দিন। তাকে মাফ করে দিন। [১০৩]
আমাদেরকেও এমনটা বলতে হবে-'হে আল্লাহ! আমি তো আগে বুঝিনি, গীবত করলে কিয়ামতের দিন আপনি ধরবেন। মানুষকে অপমান করলে ধরবেন। হে আল্লাহ! যার যার গীবত আমি করেছি, যাকে বকা দিয়েছি, যাকে অপমান করেছি, তাদের সবার পক্ষ হয়ে আপনার কাছে তাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি এটাকে তাদের সওয়াবের কারণ বানিয়ে দিন।'
এরপর যার বিরুদ্ধে গীবত করেছি, তার সুনাম করতে হবে। এমন না যে, প্রতিটি মানুষেরই সুনাম-সুখ্যাতি রয়েছে। তবে তার কোনো না কোনো ভালো দিক অবশ্যই আছে। আমরা তার সেই ভালো দিকটার আলোচনা করব। এটা তার কানে অবশ্যই পৌঁছাবে। গীবত যেভাবে পৌঁছায়, সুনামও ওভাবেই যাবে। লোকে বলবে, 'আজ তো সে তোমার সুনাম করেছে।' ওর দিলটা তখন ভরে যাবে। দুআ করবে অন্তর থেকে। এভাবেই ভালোবাসা এবং মহব্বত তৈরি হবে।
গীবত, পরনিন্দা, পরচর্চা, অপমান-এগুলো সম্পর্ক ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছেলের মুখে নিন্দা শুনে বাবা অনেকসময় মন খারাপ করে বলতে থাকে—'হায় হায়! এই সন্তান জন্ম দেওয়াই আমার জন্য অন্যায় হয়েছে।' আর এই সন্তানই যখন বাবার প্রশংসা করে, বাবার বুকটা ভরে যায়। মায়ের মনটা খুশিতে নেচে ওঠে। ঠিক তেমনই দ্বীনি ভাইয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। আমরা যখন ভাইয়ের অগোচরে তার প্রসংশা করব, তার দিলটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। এভাবে একটি ভালোবাসার সমাজ গড়ে উঠবে। সমাজ গীবতমুক্ত হবে। সমাজ না গড়তে পারলে অন্তত পরিবারকে তো ঠিক করুন। প্রতিজ্ঞা করুন যে, আমাদের পরিবারের উপমা হবে কুরআন-হাদীস যেমন চেয়েছে, ঠিক তেমন।
আফসোস! এমন পরিবার তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। আজ একটা দ্বীনি পরিবার নেই, সমাজ নেই, রাষ্ট্র নেই।
তাহলে ইসলাম আছে কোথায়?
টিকাঃ
[১০০] বুখারি: ৪৬।
[১০১] সূরা হুমাযাহ, ১০৪: ১।
[১০২] তিরমিযি: ২১৫৯
[১০৩] মুসলিম, ৬৩৭৯
📄 গীবতের তাওবা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارُ وَلَا دِرْهَمُ
'কেউ যদি কোনো ভাইয়ের ইজ্জত নষ্ট করে থাকে, তাহলে আজকেই যেন এর সুরাহা করে, তার কাছে মাফ চেয়ে নেয়। যেদিন কোনো কিছু কাজে আসবে না, ওই দিন (অর্থাৎ কিয়ামত) আসার আগে।[১০৪]
তার মানে আমি যদি কারও গীবত করি, কারও ক্ষতি করতে চেষ্টা করি তার অজান্তে, তাহলে আগে তার কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে নিতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আশা করি, সবাই বুঝতে পারছেন আমার কথা।
আমরা দিন-রাত কত গীবত করেছি। কত মানুষের বিরুদ্ধে কত কথা বলেছি। নিজেই হয়তো জানি না। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সন্তান এখন মায়ের বিরুদ্ধে গীবত করে, মা সন্তানের বিরুদ্ধে গীবত করে। অথচ একই ঘরে থাকে তারা। ছেলের বউয়ের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে, ছেলের ব্যাপারে গীবত চলতে থাকে। পরনিন্দা-পরচর্চা চলতে থাকে। কিয়ামতের দিন এই সন্তান দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! মা আমার গীবত করেছে।' আবার মা দাঁড়িয়ে বলবে, 'হে আল্লাহ! আমার ছেলে আমার নামে গীবত করেছে।'
এভাবে পারিবারিক জীবন আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মায়ের কত ইহসান সন্তানের ওপর। সন্তান মায়ের কাছে কতই-না প্রিয়। কিন্তু একজন আরেকজনের নামে গীবত করে একে অপরকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক নামাজ-রোজা-এগুলো কিয়ামতের দিন কাজে আসবে না। যার নামে গীবত করেছি, সে আমার কাছ থেকে সব নিয়ে নেবে।
বুখারির রিওয়ায়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যতদিন বেঁচে আছো, তাড়াতাড়ি শুধরে নাও।'[১০৫]
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, হে মানবমন্ডলী! তোমরা মরার পূর্বেই আল্লাহ নিকট তওবা করো এবং কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ার পূর্বেই সৎ কাজের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। তাঁর অধিক যিক্সের মাধ্যেমে তোমাদের রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে অধিক পরিমাণে দান-খয়রাত করো, এজন্য তোমাদের রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হবে, সাহায্য করা হবে এবং তোমাদের অবস্থার সংশোধন করা হবে। তোমরা জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমার এই স্থানে আমার এই দিনে, আমার এই মাসে এবং আমার এই বছরে তোমাদের উপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত জুমুআহ্ সালাত ফার্দ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি আমার জীবদ্দশায় বা আমার ইনতিকালের পরে, ন্যায়পরায়ণ অথবা যালেম শাসক থাকা সত্ত্বেও জুমুআহ্ সালাত তুচ্ছ মনে করে বা অস্বীকার করে তা বর্জন করবে, আল্লাহ তার বিক্ষিপ্ত বিষয়কে একত্রে গুছিয়ে দিবেন না এবং তার কাজে বরকত দান করবেন না। সাবধান! তা সালাত, যাকাত, হাজ্জ, সওম এবং অন্য কোন নেক আমার গ্রহণ করা হবে না যতক্ষণ না সে তওবা করে। যে ব্যক্তি তওবা করে আল্লাহর তাআলা তার তওবা কবুল করেন। সাবধান! নবী পুরুষের, বেদুইন মুহাজিরের এবং পাপাচারী মু'মিন ব্যক্তির ইমামতি করবে না। তবে স্বৈরাচারী শাসক তাকে বাধ্য করলে এবং তার তরবারি ও চাবুকের ভয় থাকলে স্বতন্ত্র কথা। [১০৬]
শুধু শুধরালেই হবে না। মাসআলা হলো, আজকের পর থেকে ওই লোকের বিরুদ্ধে আর কোনো গীবত করা যাবে না। যাদের কাছে গীবত করা হয়েছিল, তাদের কাছে ওই লোকের ব্যাপারে সুনাম করতে হবে। বলতে হবে—‘ভাই! লোকটা অনেক ভালো। আসলে আমিই বুঝতে পারিনি।' এটা জরুরি।
মায়ের নামে বদনাম করলে তার কাছে যেয়ে বলতে হবে, 'আম্মু! আমি ভুল করেছি। বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা।' এভাবে যেয়ে তার ভালো গুণের কথা বলতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে-'হে আল্লাহ! আপনি গীবত করতে নিষেধ করেছিলেন। নিষেধ করার পরেও আমি গুনাহের কাজ করেছি। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন।'
এখানে তাহলে কয়টা কাজ হলো? ১. ক্ষমা চাওয়া ২. তাওবা করা
১. ক্ষমা চাওয়া
কাউকে গালি দিলে, গীবত করলে, তার কাছে প্রথমে মাফ চান। মাফ চাইলে কি আপনার ইজ্জত কমে যাবে? বাবা-মাও যদি সন্তানের গীবত করে, তবে তাদেরকেও মাফ চাইতে হবে সন্তানের কাছে।
এখন বলতে পারেন, 'বাবা-মা আবার মাফ চাইবে কেন? এটা কেমন কথা?' তারা যে আল্লাহর কথা লঙ্ঘন করেছে, তাহলে মাফ চাইবে না?
তবে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাফের ধরন নিয়ে আমরা প্রায়শই ভুল বুঝে থাকি। এদেশে মাফ মানে হলো পা ধরা। কোথা থেকে আসল এই বাজে রীতি? হাদীসে এটা নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কেউ পা ধরে মাফ চেয়েছে। এটা তো ফালতু একটা কাজ। কোথা থেকে এসেছে কে জানে! অথচ মাফ চাওয়া মানে হচ্ছে— 'এই অন্যায় আমি আর করব না। আমি ভুল করেছি, আর এই ভুল রিপিট করব না।' এরপর বাকি জিন্দেগিতে এটা প্রমাণ করে দেওয়া যে—'আমি ভালো হয়ে গিয়েছি।'
এটাকে মাফ বলে। মাফ চাওয়া মানে জবান দিয়ে বলা যে, 'আমি ভুল করেছি।' সন্তানের কাছে বললে সন্তান শিখবে। বুঝবে যে, অন্যায় হলে ভুল স্বীকার করতে হয়। এতে করে বাবা-মা সন্তানের কাছে বড় হবে, ছোট হবে না।
২. তাওবা করা
মাফ চাওয়ার পর, তার সুনাম করার পর, আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। এটা হলো তাওবার সুরত।
হাদীসটা যেন আমরা মাথায় রাখি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطْرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
'আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত গরিব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায়, সেই ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [১০৭]
টিকাঃ
[১০৪] বুখারি: ২৪৪৯
[১০৫] রিয়াদুস সলেহিন, হাদিস নং ৯৪
[১০৬] সুনানে ইবনে মাজাহ, ১০৮১; যঈফ। তাখরীজ আলবানী: ইরওয়াহ ৫৯১।
[১০৭] মুসলিম, ৬৩৪৩।