📄 গুনাহ ছাড়তে হবে আল্লাহর ভয়ে
একজন মানুষ গুনাহ ছাড়বে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে। শারীরিক অক্ষমতার জন্য নয়। এমন নয় যে, এখন আর গুনাহ করতে পারে না বলে গুনাহ ছেড়ে দিয়েছে। অথবা মানুষের ভয়ে গুনাহ ছেড়ে দিয়েছে। অথবা স্বাস্থ্য নষ্ট হয় বলে গুনাহ ছেড়েছে। এসব কারণে গুনাহ ছেড়ে দেওয়াটা তাওবা না। গুনাহ একমাত্র আল্লাহর ভয়ে ছাড়তে হবে। আমি গুনাহ করতে পারি না, তাই ছেড়ে দিয়েছি—এটা গুনাহের তাওবা না। অথবা শারীরিক, আর্থিক ক্ষতি হবে বলে কিংবা মানুষ কী বলবে—এজন্য গুনাহ ছেড়ে দেওয়াকে তাওবা বলে না।
আমার গুনাহ ছাড়াটা কখন তাওবা হবে?
এককথায় উত্তর হলো: যখন আমার গুনাহ ছাড়াটা নবি-রাসূলদের গুণাবলি মোতাবেক হবে, তখন সেটা তাওবা হবে।
নবি-রাসূল ও নেককারদের সাথে আমার তাওবা কিভাবে মিলবে?
আমাকে জানতে হবে, আদম আলাইহিস সালাম যেভাবে তাওবা করেছেন এবং অন্যান্য নবিরা যেভাবে তাওবা করেছেন, সেভাবে আমাদের জীবনে তাওবার বাস্তবায়ন আছে কি না। এসব বিষয় ভেবে দেখা অনেক জরুরি। কারণ নামাজ যেমন ফরজ, একজন মুমিনের জন্য গুনাহ থেকে তাওবা করাও তেমন ফরজ। নামাজের নির্দেশ আল্লাহ তাআলা যেভাবে দিয়েছেন, ঠিক সেভাবে তাওবারও নির্দেশ দিয়েছেন।
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। [৮৫]
অতএব, নামাজ যেমন ফরজ, তাওবা করাও তেমনই ফরজ। তাই তাওবা নামাজের চেয়ে ছোট ইবাদত না, নামাজের মতোই বড় ইবাদত।
তাওবা একটি ইবাদত। আর ইবাদত মনোমতো করা যায় না। ঠিক যেমন নামাজ একটি ইবাদত এবং এটি মনমতো আদায় করা যায় না; বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাতলে দেওয়া পদ্ধতিতে আদায় করতে হয়। ঠিক তাওবাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাতলানো পদ্ধতিতে হতে হবে। এটাই নিয়ম যে, আমি যদি কোনো ইবাদত করতে চাই, ওটাকে আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকামতো করতে হবে। আমি যদি নামাজ আদায় করতে চাই, তবে আমার মনমতো পড়লে হবে না। নামাজ পড়তে হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা মোতাবেক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা মোতাবেক আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করি, তাহলে এই নামাজে ফায়দা হবে। নবিজির তরিকা বাদ দিয়ে আমি যদি সারা দিনও নামাজ পড়ি, তবুও কোনো লাভ নেই।
তাওবা একটি ফরজ ইবাদত। কিন্তু আমি যদি তাওবার বিষয়ে নিজ থেকে কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করি এবং তাওবার শর্তাবলির দিকে খেয়াল না রাখি, তবে সেটা তাওবা হবে না। যেভাবে নামাজের শর্ত-শারায়েত লক্ষ না করে নামাজ পড়লে নামাজ হবে না।
ওজু ছাড়া নামাজ পড়লে নামাজ হবে না। কিরাআত ছাড়া নামাজ পড়লে নামাজ হবে না। কারণ, এগুলো নামাজের শর্ত। ঠিক তেমনই তাওবারও কিছু শর্ত আছে। নামাজের শর্তের মতো তাওবার শর্তের দিকেও লক্ষ রাখা জরুরি। এগুলো ইয়াদ করতে হবে, মুখস্থ করতে হবে, দিলের ভেতর বসাতে হবে। এবং এটাকে পুরোপুরি ফিকির করে যত্ন-সহ আদায় করতে হবে।
তাওবা-সহ যেকোনো ইবাদতের প্রথম শর্ত হলো, ইবাদতটা আল্লাহর জন্য হওয়া জরুরি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না।
মনে করুন, অমুক ব্যক্তির তাবলিগে যাওয়ার পর এক লোকের দ্বীনদার মেয়েকে বিয়ে করার খুব শখ জেগেছে। কিন্তু সে ব্যক্তি নামাজের অতটা পাবন্দি না। এখন হবু শ্বশুরের সাথে নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তো, ওপরে ওপরে দেখাচ্ছে যে, সে পুরোপুরি নামাজি। এমনিতে নামাজের খবর নেই; কিন্তু এখন জামাআতের সাথে প্রথম কাতারে হবু শ্বশুরের সাথে দাঁড়িয়েছে। এই যে নামাজ, সে আসলে তা পড়ছে, শ্বশুর যেন মেয়েটা দিতে রাজি হয়, সেজন্য। নামাজের ভেতর এই জাতীয় আচরণ কেউ যদি করে, তার নামাজ কি হবে? বরং এটা বিশাল বড় কবীরা গুনাহ হবে। শরীয়তের পরিভাষায় একে রিয়া তথা শিরকে আসগরও বলে। অর্থাৎ এটা এক ধরনের শিরক। যে কাজ আল্লাহর জন্য করা দরকার, সে কাজ আরেকজনের জন্য করছে। ঠিক তাওবাও একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। অন্যকোনো কারণে তাওবা করলে, সেটা তাওবা না।
একটা উদাহরণ দিই। এক লোকের গুনাহ করার সামর্থ্য নেই। আগে সামর্থ্য ছিল, এখন নেই। এখন রোগী, অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। এখন আর সে গুনাহ করে না। একজন যুবক যতগুলো গুনাহ করতে পারে, একজন বয়স্ক মানুষ অতগুলো গুনাহ করতে পারে না। তো দেখা যায়, একজন মানুষ আগে যে গুনাহগুলো করত, বুড়ো বয়সে ওই গুনাহগুলো ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ছাড়ার মৌলিক কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি না, মৌলিক কারণ হলো সামর্থ্যের অভাব। শক্তি নেই দেহে। এই বুড়ো লোকটি যদি মনে করে যে, আগে এই গুনাহ করতাম, এখন এই গুনাহ ছেড়ে দিয়েছি-এটাই তাওবা। না, এটা তাওবা না। কারণ সে এখানে অক্ষম। মনে করুন, একজন মানুষ আগে নাচত। এখন বুড়ো হওয়ার কারণে তাকে কেউ অনুষ্ঠানে নেয় না। এজন্য সে নাচে না। এটা কিন্তু তাওবা না। কারণ, আল্লাহর জন্য সে নাচ ছাড়েনি। ছেড়েছে বয়স হওয়ার কারণে। কেউ তাকে নাচে নেয় না-এই কারণে। ভালো করে বুঝতে হবে, এখন সে গুনাহ ছেড়েছে মজবুর হয়ে, বাধ্য হয়ে ছেড়েছে। আল্লাহর জন্য ছাড়েনি।
তাহলে আল্লাহর জন্য পাপ থেকে বিরত থাকা, আর সামর্থ্য না থাকায় গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস না। এমন অনেক গুনাহ আছে-যা টাকা ছাড়া হয় না। যেমন ধরুন, পার্টির কথা। একসময় আপনি বাসায় গানবাজনার ইন্তেজাম করতেন। কিছু একটা হলেই পার্টি দিতেন। কারণ, তখন অনেক অর্থকড়ি ছিল। কিন্তু এখন কমে গিয়েছে। তাই এখন আর পার্টির আয়োজন করেন না। এটা কিন্তু তাওবার কারণে না। আপনার টাকা শেষ হয়ে গিয়েছে, করার মতো সামর্থ্য বা ক্ষমতা নেই, এজন্য। এই যে ক্ষমতা নেই-এর নাম তাওবা না। এটা কোনো সওয়াবের কাজ না।
অনেকে এই ভয়ে নেশা করে না যে, তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। সিগারেটের প্যাকেটে বিভিন্ন সতর্কীকরণ ছবি দেওয়া থাকে। জর্দার প্যাকেটেও দেওয়া থাকে। এখানে ছবি দেওয়ার ভেতরেই তো সমস্যা আছে। ছবি কীজন্য দিয়েছে-এটা পরের বিষয়। এই ছবি দেওয়ার পর কি কেউ সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে নাকি? আমি শুনিনি কখনো। কিন্তু এই সিগারেটে ক্ষতি আছে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি, শারীরিক ক্ষতি। এখন কেউ যদি শারীরিক সমস্যাকে সামনে রেখে সিগারেট ছেড়ে দেয়, অথবা কোনো নেশা জাতীয় দ্রব্যকে স্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা ভেবে ছেড়ে দেয়, তবে এটা কোনো তাওবা না। এটা কোনো সওয়াবের কাজ না। কারণ এটা সে তার জাহান্নামকে সামনে রেখে করেনি। সে এটা করেছে তার স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখার জন্য, ঠিক রাখার জন্য। কিংবা বাবা-মা বলেছে, 'এটা খেয়ো না, এটা মস্ত বড় সমস্যা, এটা খেলে ক্যান্সার হবে'-এই জন্য সে নেশা থেকে দূরে থাকে। আল্লাহর ভয়ে সে গুনাহ ছাড়েনি, গুনাহ ছেড়েছে শারীরিক ক্ষতির ভয়ে। আল্লাহর কসম! যদি এই ভয়ে কেউ তাওবা করে-এটা তাওবা হবে না। ভালো করে বুঝুন। তাওবার বিষয়টি বোঝা খুবই দরকার।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكُوةَ وَ ذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ )
'আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদাত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে, নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত দেয়; আর এটিই হলো সঠিক দ্বীন।[৮৬]
ইবাদাত শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে হতে হবে। আর তাওবাও একটি ইবাদাত। তাওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য করতে হবে। অন্য কোনো স্বার্থকে সামনে রাখলে হবে না। কিছু মানুষের কাছে গুনাহের উপকরণ থাকে না, টাকা-পয়সা থাকে না-এজন্য গুনাহ করে না। কিন্তু দিল থেকে ভাবছে, 'আমার বাবার অর্থকড়ি থাকলে, অথবা আমি টাকা-পয়সা বেশি কামাই করলে অমুকের মতো জাঁকজমকভাবে বিয়েটা পূর্ণ করব।'
যে এখন নাজায়েজ মজমাস্তি করছে, আর যে করছে না-তাদের দুজনের দিলের হালত একরকম। দুজনেই বরাবর। একজন গুনাহ করে, গান-বাজনা করে যে স্তরে পৌঁছেছে, অন্যজন গুনাহ না করেও শুধু গুনাহের স্বপ্ন দেখার কারণে সে স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। দুজনেই জাহান্নামের একই স্তরে থাকবে। তাহলে আমাকে ভেবে দেখতে হবে যে, আমি যে গুনাহ ছাড়ছি, এটা কী কারণে ছাড়ছি? যদি আমার অক্ষমতার কারণে ছাড়ি, তাহলে এটা তাওবা না।
তাওবা করতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। এর বাইরে অন্য কারও জন্য, অন্যকিছুর জন্য আমি যদি তাওবা করি, তাহলে এটা তাওবা না। সর্বোচ্চ এটা হতে পারে, আমি কাজটা ছেড়েছি। কিন্তু এই গুনাহ আমার জিম্মায় রয়ে গিয়েছে। কারণ তাওবা একটা ইবাদত। ইবাদতের ক্ষেত্রে অনেক বৈধ জিনিসকেই আনা যায় না। নিজের স্বার্থের অনুকূলে অনেক বৈধ বিষয়েরই নিয়ত করা যায় না। বুখারি-সহ অনেক কিতাবের প্রথম হাদীস হচ্ছে,
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ
'প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে, সেই উদ্দেশ্যই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য। [৮৭]
হিজরত একটা ফরজ বিষয় ছিল। মক্কা বিজয়ের আগে মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ফরজ ছিল। তো, উম্মু কায়িস নামের এক মহিলা হিজরত করেছে। তার সাথে জাহিলি যুগে আরেকজনের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্ক হওয়ার পরে এটাকে সে বৈধ রূপ দিতে চেয়েছে। এখন উম্মু কায়িস হিজরত করে চলে গিয়েছিল মদীনায়। যে লোক উম্মু কায়িসকে ভালোবাসত, সে মক্কা থেকেই উম্মু কায়িসকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তো উম্মু কায়িস এ কথা বলেছে, 'যদি তুমি হিজরত করে মদীনায় চলে আসতে পারো, তাহলে তোমার সাথে আমার বিয়ে হতে পারে। নচেৎ হবে না।'
তো, একথা বলার পর সেই লোক হিজরত করে চলে এসেছে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে। তো এই ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিরস্কার করেছেন। চিন্তা করে দেখুন-বিয়ে অবৈধ জিনিস না, বৈধ জিনিস। কিন্তু যেহেতু সে কেবল বিয়ের স্বার্থেই হিজরত করে এসেছে, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তিরস্কার করেছেন। 'তোমার এ হিজরতে কোনো সওয়াব হবে না। কারণ তুমি হিজরত করেছো বিয়ের জন্য।'
ভালো করে বুঝুন। বর্তমানে অনেক সময় দেখা যায়, মুসলিমদের কেউ অমুসলিম কাউকে বিয়ে করেছে। কিভাবে করেছে? প্রেম ছিল দুজনার মধ্যে। ছেলে মুসলিম, মেয়ে অমুসলিম। বিয়ের স্বার্থে ওই মেয়েকেও মুসলিম হতে হবে। এজন্য সে মুসলিম হয়েছে। এমন ঘটনা বহু আছে। আমরা শুনে পুরো খুশি হয়ে যাই। যাক, অমুক মেয়ে মুসলিম হয়ে গিয়েছে। আরে, ওর ইসলাম গ্রহণ করা কি আল্লাহর জন্য, নাকি একটা মডেলকে পাওয়ার জন্য? ও কি আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছে? নাকি যাকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করতে চাইলে মুসলিম হতে হবে-এজন্য মুসলিম হয়েছে? এই যে মুসলিম হওয়া, ইসলামের কাছে এর কোনো ভ্যালু নেই। ইসলামে ওটাই গ্রহণযোগ্য-যেটা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। তাই বিয়ের জন্য, মডেলকে পাওয়ার জন্য, চাকরি পাওয়ার জন্য কেউ মুসলিম হলে শরীয়তে ওটা ধর্তব্য না।
অনেকে কারও সাথে সম্পর্ক রক্ষার জন্য পর্দা শুরু করে দিয়েছে। কারণ, প্রেমিক বলেছে, 'তুমি যদি আমার সাথে সম্পর্ক করতে চাও, বিয়ে করতে চাও, তোমাকে পর্দা করতে হবে। কারণ, আমার বাড়িতে সবাই পর্দা করে।'
ও বলেছে, 'হ্যাঁ, পর্দা করব। তবুও তোমাকে চাই।'
এটা কি বোরকা চাওয়া হয়েছে, নাকি ওকে চাওয়া হয়েছে? শরীয়তের বিধান চাওয়া হয়েছে, নাকি প্রেমিককে চাওয়া হয়েছে?
আপনি কার জন্য পর্দা করছেন, ইসলাম গ্রহণ করেছেন কার জন্য?
এগুলো শরীয়তে অনেক আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে গিয়েছেন。
হাদীসে বর্ণিত ওই ব্যক্তি হিজরতের মতো বড় ইবাদত করেছে, ঘর-বাড়ি সব ছেড়ে এসেছে, কিন্তু এতটুকু স্বার্থ দিলের ভেতর লুকিয়েছে যে, সে বিয়ে করবে। তো ওই ব্যক্তির হিজরতই বরবাদ।
প্রত্যেকটা ইবাদত আল্লাহর জন্য হতে হবে। অতএব আমরা যে তাওবা করব, এটা কার জন্য হতে হবে? একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য।
আরও একটি উদাহরণ। আগে যুবক থাকতে অনেক উলটাপালটা করেছে, এখন বুড়ো হয়ে গিয়েছে। কেউ ডাকলে সে বলে, 'না রে! তোর মতো বয়স থাকতে কতকিছু করেছি আমরা! এখন কি আর ওই বয়স আছে?' তার মানে বুড়ো বয়সে ওই কাজগুলো ছেড়ে দিয়েছে, কারণ এখন 'ওই' বয়স নেই। আল্লাহর কসম! এই বুড়ো লোক এখনো গুনাহে জড়িয়ে আছে। তবে সে এখন করতে পারছে না, কারণ তার শক্তি নেই। তার মনের অবস্থা হলো, 'এখন কি আর এই কাজ করতে পারি? মানুষ কী বলবে? শক্তিতেও কুলোয় না।' আল্লাহর কসম! ওই বুড়ো লোক গুনাহ না করেও গুনাহের ভেতর শামিল আছে।
'আমি বুড়োকালে দাড়ি রেখেছি এজন্য যে, দাড়ি না রাখলে সবাই উলটাপালটা কথা বলে। এই বয়সে কি দাড়ি ফেলা যায়! এক পা কবরে, এখনো কি দাড়ি কামানো যায়?' মানে, এখন দাড়ি ফেলা বিরক্তির কাজ; আরেকজনকে ফেলে দিতে হয়। আগে নিজে নিজে ফেলতে পারত, এখন পারে না। তাই দাড়ি রেখে দিয়েছে। অথবা লোকে বলবে, 'কবরে এক পা দিয়ে ফেলেছো, এখনো দাড়ি রাখো না কেন?' ও চিন্তা করেছে-এখন যেহেতু সবাই তিরস্কার করে, এখন মনে হয় দাড়ির বয়স হয়েছে। এজন্য দাড়ি রাখা শুরু করেছে। আল্লাহর কসম! ওর দাড়ি রাখা সওয়াবের কাজ না। সে আল্লাহর জন্য দাড়ি রাখেনি।
এ ধরনের ভাবনা বড় অন্যায়। আমরা ভাগ করে নিয়েছি। যুবক বয়স-এটা দাড়ি রাখার বয়স না। দাড়ি রাখার বয়স কোনটা না, আল্লাহই ভালো জানেন। দাড়ি কি আল্লাহই দেন না? তাহলে কোন বয়সটা দাড়ি রাখার, আর কোন বয়সটা না রাখার, এটা আমাদের হাতে নেই। আল্লাহ এটার বিধান দিয়ে দিয়েছেন। লোকেরা আজকাল বলে, 'ওর কি দাড়ি রাখার বয়স হয়েছে নাকি? বাবা রাখেনি দাড়ি, তাহলে ওর দাড়ি রাখার বয়স হয়েছে? ওর মা করে না পর্দা, ওর কি পর্দা করার বয়স হয়েছে?'
আমি আল্লাহর জন্য করছি না, বুড়ো হয়েছি এজন্য পর্দা করছি। বুড়ো হলে নাকি পর্দা করে? নিজে মেয়ের সাথে এক রিকশায় যাচ্ছে। মেয়ের পোশাক কী! আর বুড়ো-বুড়ি পর্দা করে যাচ্ছে। এখন নাকি তাদের পর্দা করার বয়স হয়েছে! যখন দেহে আকর্ষণ বেশি থাকে, তখন ওই আকর্ষণে কারও নজর যেন না লাগে-এজন্য ছিল পর্দা। আর যখন আকর্ষণ শেষ, তখন গিয়ে পর্দাকে ঠিক করছি। হ্যাঁ, এর জন্যেও সওয়াব হবে; যদি আল্লাহর জন্যে পর্দা ঠিক করে নিতে পারি। তবে যৌবনে পর্দা করার জরুরত এর চেয়েও বেশি। তখন পর্দা করলে আরও বেশি নেকি হবে।
টিকাঃ
[৮৫] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
[৮৬] সূরা আল-বায়্যিনা, ৯৮: ৫।
[৮৭] বুখারি, ১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩।
📄 তাওবার হাকিকত
তাওবা মানে শুধু মসজিদে এসে ইসতিগফার করলাম, কান্নাকাটি করলাম, আর এরপর আগের মতোই অপরাধে জড়ালাম-এটাকে তাওবা বলে না। মানুষ কেন যেন এই বিষয়গুলো আন্তরিকতার সঙ্গে বুঝতে চায় না, চিন্তাও করে না। হ্যাঁ, কিছু নেক লোক রয়েছে, যাদেরকে বুঝিয়ে দিলে গুনাহ ছেড়ে তাওবার পথ ধরে। মানুষের সাথে অপরাধ করলেও আমাদের দেশে এমন সিস্টেম চালু আছে। কেউ অন্যায় করলে বলে, 'যা, ধরে নিয়ে যা মুরুব্বিদের কাছে, এ অন্যায় করেছে।' অন্যায়কারী পা ধরে মাফ চায়; মনে করে যে, মাফ হয়ে গেছে। এটা সুন্নতি তরিকা নয়।
কোনোদিন কোনো সাহাবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পায়ে ধরে মাফ চেয়েছে? এমন ঘটনা আমাদের জানা নেই। শরীয়তে মাফের তরিকা হলো-আগে যা অন্যায় করেছো, এই অন্যায় আগে ছাড়ো। বাবার সাথে যে অন্যায় আচরণ করেছো, যার জন্য তোমার বাবা কষ্ট পেয়েছেন-এই আচরণ ছেড়ে ভালো আচরণ করা তোমার জন্য জরুরি। অপরাধ করে হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে আবার আগের মতো অপরাধ করতে থাকব, এটা শরীয়ত আমাদেরকে শিক্ষা দেয়নি।
আপনাদের কি এটা ভালো লাগে যে, একবার মাফ চেয়ে আবার যা মনে চায় তা-ই করবে সন্তান? আপনারা সবাই উত্তর দেবেন-'না'। ঠিক শরীয়তও এটা পছন্দ করে না। সেজন্য মাফের প্রথম শর্ত হলো আপনি পিতা-মাতার সাথে যে অন্যায় করছেন-তা ছেড়ে দিন। এবং অন্যায়ের পরিবর্তে ভালো কাজ করুন। দেখবেন, আপনার প্রতি অটোমেটিক তাদের ধারণা আগের চাইতে ভালো হয়ে গিয়েছে।
আবার, বাবা-মা যে কষ্ট পেয়েছে-এজন্য জবান দিয়েও ক্ষমা চান। বলুন যে, ‘ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি আর ভবিষ্যতে এমন কাজ করব না।’ এটাই শরীয়তের নির্দেশ।
আপনারাই বলুন, সন্তান যদি বাবা-মায়ের সাথে অবাধ্যতা করার পর তাদের কাছে বারবার ক্ষমা চায়, আর নিজেকে বদলে ফেলে নিজের আচরণ সুন্দর করা শুরু করে—তখন বাবা-মা সন্তানের প্রতি কী রকম খুশি হয়! আর যদি এমন হয় যে, একটার পর একটা অন্যায় সে করতেই থাকে, আর মাঝখানে এসে বাবার পায়ে ধরে মাফ চায়, কিন্তু নিজেকে বদলায় না, নিজের আচরণ পরিবর্তন করে না; তখন এ সন্তানের প্রতি কি বাবা-মা খুশি হবে? বরং এই মাফ চাওয়া তাদেরকে আরও বিরক্ত করবে। একদিকে মাফ চাওয়া, অপরদিকে বারবার অপরাধ করা—এটা অপরাধের মাঝে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
তাই সঠিকভাবে তাওবা করতে হলে,
* জবানে সর্বদা ইসতিগফার জারি রাখতে হবে, নিজের অন্যায়কে আল্লাহর কাছে স্বীকার করতে হবে।
* ওই অন্যায়-অপরাধকে, গুনাহের কাজকে ছেড়ে দিতে হবে।
* ওই গুনাহের কাজের পরিবর্তে যেটা আপনার করণীয় ছিল, সেটা করতে হবে।
আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ওয়াজ শুনে কান্নাকাটি করি, নামাজ পড়ি। কিন্তু শরীয়তে তাওবার জন্য যেসব শর্ত আছে, সেগুলো খেয়াল করি না। তাই আমাদেরকে সবার আগে খেয়াল করতে হবে যে, তাওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য হবে। দ্বিতীয় যে দিকটি রয়েছে, সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর তা হলো, এ কথা ভাবতে হবে যে, আমার ওপর আল্লাহর কী কী হক ছিল, আর আমি কী কী হক নষ্ট করেছি। আমার ওপর বান্দার কী কী হক ছিল, আর আমি কী কী হক নষ্ট করেছি। এটার একটা তালিকা তৈরি করতে হবে।
তালিকাতে সর্বপ্রথম বান্দার সাথে যুক্ত যত অপরাধ আছে—সেগুলো আনব এবং তার থেকে তাওবার পদ্ধতি ও মুক্তির উপায় নিয়ে আলোচনা করব।
📄 বান্দার হক নষ্টকারীর তাওবা
দুনিয়াতে আমরা যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন অন্যায় থেকে তাওবা করে নিজেকে পবিত্র করার সুযোগ আছে। কবরে যাওয়ার পরে কারও আর এই সুযোগ নেই। কারণ মৃত্যুর পর দুনিয়াতে ফিরে আসার আর কোনো উপায় নেই। প্রত্যেক অপরাধী মরণের সময়, যখন তার সামনে মৃত্যুর ফেরেশতারা আসতে থাকবে, তখন আল্লাহর কাছে তাওবা করতে শুরু করবে। আল্লাহকে মানা শুরু করবে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত তারা আল্লাহর কাছে আবদার জানাবে যে—আরেকবার আপনি যদি আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠান, তাহলে আমরা আপনাকে পুরোপুরি মানব, আপনার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখব।
এজন্য হায়াত আমাদের জন্য অনেক বড় নিয়ামত। এখনো আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হায়াত দিয়েছেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই হায়াত যেন আমরা আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের পূর্ণ আনুগত্যে কাটাতে পারি!; আমরা যেন পেছনের গুনাহ থেকে পূর্ণ তাওবা করতে পারি। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন।
আমরা যদি সংক্ষেপে বান্দার হক নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, আল্লাহ তাআলা তিন ধরনের হককে বান্দার হক হিসেবে আমাদেরকে দিয়েছেন। এককথায়, বান্দার হক সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। এর বেশি যে নেই-তা নয়। আমরা সংক্ষেপে বোঝার জন্য বলছি। তা হলো—জানের হক, মালের হক ও ইজ্জতের হক। একটা কথা আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে, আমাদের এই আলোচনা শুধু পড়ার জন্য না। একে দিলের ভেতরে বসাতে হবে। কারণ আল্লাহর হক আমি আদায় করতে না পারলে আল্লাহকে বলব যে, 'আল্লাহ, আপনি মাফ করে দিন, আমি আমার মরণ পর্যন্ত চেষ্টা করেছি।' আল্লাহ তাআলা দয়া করলে আমাকে মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু বান্দার হকের বেলায় এখানে দুইটি বিষয় জড়িত। একটি আরেকটির ওপর নির্ভর করে।
প্রথমত, আমি যার হক নষ্ট করেছি, তার কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বান্দার হক নষ্ট করা যেহেতু আল্লাহর হুকুমের বাইরে ছিল, এজন্য আল্লাহর কাছেও তাওবা করতে হবে।
আল্লাহর হক যদি যথাযথভাবে আমি নাও আদায় করতে পারি, তাহলে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করলে চলবে। আশা করা যায়, আল্লাহ মাফ করে দেবেন। কিন্তু বান্দার হকের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো আগে বান্দার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে— 'হে আল্লাহ! আপনি আমার ওপর বান্দার যে হক আরোপিত করেছেন, আমি তা মানতে পারিনি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।'
এজন্য বললাম যে, বান্দার হকের বিষয়গুলো আমাদের দিলে বসানো দরকার। বান্দার কী কী হক? জানের, মালের ও ইজ্জতের।
📄 বান্দার জানের হক নষ্টকারীর তাওবা
জানের হক মানে কী? একটু চিন্তা করি। ধরুন, একজন মানুষকে শারীরিকভাবে আমি ক্ষতি করেছি। এই ক্ষতি চূড়ান্ত পর্যায়ে হলে, তাকে হত্যা করেছি অথবা হত্যার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি। এটাকে কতল বলে। এখন এটা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে হতে পারে, দলগত আক্রোশের কারণেও হতে পারে। অথবা দুনিয়াবি ফায়দার জন্য হতে পারে। হয়তো অন্যজন আমাকে ঘুষ দিয়েছে, টাকা দিয়েছে এবং বলেছে- 'তুমি ওকে মেরে দাও, তোমাকে এত টাকা দেবো।' তো অন্যায়ভাবে আমি একজনকে মেরে ফেলেছি। এগুলো হলো চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্ষতি।
আর দ্বিতীয় পর্যায় হলো। আমি একজনকে অন্যায়ভাবে একটা আঘাত করেছি। আল্লাহ তাআলা কসম করে বলেছেন যে,
'আমি যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার একজনের ওপর আরেকজনের হকগুলো পুরোপুরি আদায় না করব, ততক্ষণ কাউকে জান্নাতও দেবো না, জাহান্নামও দেবো না।[৮৮]
অর্থাৎ, কেউ যদি কাউকে অন্যায়ভাবে থাপ্পড়ও দেয়, আল্লাহ বিচার-দিবসে তার প্রতিশোধ নেবেন। তখন সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, 'ও আল্লাহর রাসূল, আমাদের কাছে তো কিয়ামতের দিন কিছুই থাকবে না! কাপড় থাকবে না পরনে, পায়ে জুতা থাকবে না। উসকো-খুসকো অবস্থায় আমরা কিয়ামতের দিন উঠব। আমাদের কাছ থেকে নেওয়ার তো কিছু নেই। তাহলে আল্লাহ কী নেবেন? ওকে কী দেবেন?'
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদেরকে বললেন-
অর্থাৎ, 'তুমি যদি ভালো কাজ করে থাকো, তো যাকে থাপ্পড় দিয়েছো, তোমার কামাই করা সওয়াব থেকে তাকে দেওয়া হবে। এভাবে যারই তুমি ক্ষতি করেছো বা ক্ষতি করতে সাহায্য করেছো, তোমার পুণ্য এক এক করে তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হবে। কিয়ামতের দিন তারা বলবে যে, “হে আল্লাহ! ও আমাকে একটা থাপ্পড় দিয়েছে।” আল্লাহ বলবেন, "আয়, তোকে বদলা দিয়ে দিই।” তখন হক নষ্টকারীর নামাজ-রোজা থেকে আল্লাহ তাআলা তাকে সওয়াব দিতে থাকবেন।
মানে হলো, এখন আর ওই বেচারার কাছে কিছু নেই। সওয়াবের কোনো অংশই তার ভেতরে নেই। তখন মজলুমের যে অন্যায় আছে, ওই অন্যায়গুলো জালিমের মাথার ওপর দিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে।[৮৯]
শরীয়ত যদি থাকত, তাহলে শরীয়ত তার কাছ থেকে দুনিয়াতে কিসাস নিত। কিসাস মানে হলো হত্যাকারীকে সবার সামনে ডেকে এনে হত্যা করা হতো। এটি তার জন্য তাওবা। যাকে এভাবে শরীয়তের আলোকে বিচার করা হয়েছে সবার সামনে, তার ব্যাপারে আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দেবেন। অর্থাৎ যে আগে অন্যায়ভাবে কাউকে মেরেছে, শরীয়ত কর্তৃক তাকেও কিসাস বা হত্যা করা হলে, আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাকে মাফ করবেন। তবুও আরেক জায়গায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
'আমি নিশ্চিতভাবে এই কথা বলতে পারি না, খুনির সম্পূর্ণ পাপ মাফ হয়ে গিয়েছে। আমি জানি না।[৯০]
হত্যার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।' কারণ সে অন্যায়ভাবে খুন করেছে। যে অন্যায়ভাবে মানুষকে খুন করে, তাকে দুনিয়াবি সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটা এজন্য যে, এতে অন্যরা আর সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সাহস পাবে না। এই সুযোগই পাবে না। কারণ ওর ভেতরে ভয় কাজ করবে। শরীয়তে কিসাস কোনো বদ্ধ জায়গার ভেতরে হয় না। শরীয়তে কিসাস হয় মাঠ অথবা খোলা জায়গায়, সবাইকে জানান দিয়ে।
এখন যেমন মাইকে ঘোষণা করে- 'অমুক দিন টিকা দেওয়া হবে, আগামী দিন বিদ্যুৎ থাকবে না, গ্যাস থাকবে না।' কিসাসের ব্যাপারে শরীয়তের নির্ধারিত নিয়ম হলো, সারা মহল্লায় ঘোষণা দিতে হবে-'আগামী দিন অমুকের কিসাস কার্যকর হবে।' সমাজে বসবাসরত পুরুষদেরকে সেখানে থাকতে হবে। হদ ও কিসাস প্রয়োগের সময় কিছু মানুষ ওখানে হাজির থাকা শরীয়তে ফরজ। আর কেউ যদি না যায়, তাহলে পুরো এলাকা ফরজ তরক করার গুনাহে আক্রান্ত হবে। কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
'ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত করো। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাকো, তবে আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।' [৯১]
অর্থাৎ আল্লাহ যে সাজা দিচ্ছেন, মুমিনদের একটি দল যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যে, এটা কার্যকর হচ্ছে। কারণ, যারা তা দেখবে, ওইটা তাদের মনে ভয় সৃষ্টি করবে। আল্লাহ বলেছেন,
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
'আর হে বিবেকসম্পন্নগণ, কিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন; আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে।[৯২]
অর্থাৎ, শরীয়তের এই কিসাস তোমরা জারি করো। আল্লাহ তাআলা এই কিসাসের মাঝে তোমাদের জীবনকে লুকিয়ে রেখেছেন। হত্যাকারীকে যদি বাঁচিয়ে রাখো, তবে এমন হাজার হাজার মানুষ অন্যায়ভাবে নিহত হতে থাকবে। কিন্তু এই খুনিকে তোমরা যদি সবার সামনে হত্যা করো, তাহলে তোমাদের অনেকের জীবন একেবারে নিরাপদের সাথে থাকবে। ইতমিনানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে।
কিন্তু আমাদের সমাজে শরীয়তের এ বিধান নেই। খুনির বিচার হতে হতে যুগ পেরিয়ে যায়। নিহত ব্যক্তির পরিবার দৌড়াদৌড়ি করতে করতে নিঃস্ব হয়ে যায়। তবুও ফয়সালা আসে না। রায় আসতে আসতে জীবন-যৌবন সব চলে যায়।
যা-ই হোক, এক নাম্বারে মানুষের হক হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে, শরীয়ত অনুযায়ী হত্যাকারীর ওপর কিসাস জারি করা হবে。
কিসাস কায়েম হলে খুনির হয়তো পরকালে মাফ পাওয়ার সুযোগ আছে। তবে আরেকটা সুযোগ আছে। নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদের কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে নেওয়া। মাফ চাওয়ার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি কিন্তু শুধু ক্ষমা না। নিহতের পরিবার যদি মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে বদলা চায়, তাহলে তাদেরকে অন্ততপক্ষে দামি একশ উটের মূল্য দিয়ে দিতে হবে। একশ উটের দাম কত? ধরেন একটা উটের দাম এক লাখ টাকা, তাহলে কত হয়? এক কোটি টাকা।
এক কোটি টাকা দিয়েও মাফ চাইতে পারেন তাদের কাছে। এর পরেও আল্লাহ জানেন, আপনার মাফ হবে কি না। আঙুলের ডগা পরিমাণ জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য এই এক কোটি টাকা কিছুই না।
এখন কথা হচ্ছে, একশ উট কে দেবে? লম্বা আলোচনা, একশ উট দেবে হত্যাকারীর আত্মীয়-স্বজন। কাছের আত্মীয়, দূরের আত্মীয়-সবাই মিলে দেবে। পঞ্চাশটা উটও যদি ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেন, এই ফয়সালা শরীয়ত মেনে নেবে না। নিহতের পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পুরো একশটি দিয়ে মাফ চেয়ে নিতে হবে। তারা যাকে হারিয়েছে, তাকে হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে আপনার। চেষ্টা করতে হবে। তবে তারা যদি রক্তমূল্য ছাড়াই ক্ষমা করে দেয়, তবে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ওরা মাফ না করলে, বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। হয় মৃত্যুদণ্ড, নয়তো রক্তমূল্য।
এখন, আপনি যাকে মেরেছেন, তার পরিবারের কাছে মাফও চাননি, তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতেও চেষ্টা করেননি, কিন্তু মসজিদে এসে তাওবা করেছেন; আপনার এই তাওবা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য না। অনেকে আছে উমরায় যায়। হজে গিয়ে বাইতুল্লাহের গিলাফ ধরে বলে-'হে আল্লাহ! অমুককে মেরে ফেলেছি, মাফ করে দিয়ো। যা অন্যায় করেছি, ব্যক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সব মাফ করে দিয়ো।' বিভিন্নজন অন্যায় করে গিয়ে উমরা করে আসে। উমরায় কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। মানুষ তো! মনে অন্যায়ের অনুভূতি জাগেই। যদি তার আকল বিলুপ্তি না ঘটে, তাহলে কিছু না কিছু খারাপ তো লাগবেই। এর কারণে মসজিদে নববিতে গিয়ে কান্না শুরু করে দেয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারকে গিয়ে সালাম পাঠ করে, ওখানে গিয়ে কাঁদে। কিন্তু শরীয়তে এটা মানুষের হক নষ্ট করার তাওবা না। কারণ, এভাবে যদি তাওবার সুযোগ থাকে, তো সামনে আরেকজনকে খুন করে আরও একটি উমরায় যাওয়ার রাস্তা বের করবে সে। আবার মসজিদে নববিতে এসে কান্নাকাটি করবে। আবার কিছু সময় পরে যাকে মারতে মন চায় মারবে। এভাবে সে সকল মানুষের জীবন বিপন্ন করবে। কিন্তু শরীয়ত এটার কোনো রাস্তাই রাখেনি। হয় হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, কতল করা হবে, না হয় হত্যাকারী ক্ষমা চাইবে নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে। একশ উট পরিমাণ জরিমানা দেবে। দেওয়ার পর যদি ওরা মাফ করে, তবুও তাওবা করতে থাকতে হবে, যেন আল্লাহও মাফ করে দেন। যেন কিয়ামতের দিন বিচারের মুখোমুখি না করেন।
আপনার কাছে হয়তো বিষয়টা সহজ মনে হয়। কিন্তু যার আত্মীয়-স্বজন মারা গেছে, যে সন্তান তার বাবাকে হারিয়েছে ছোট বয়সে-সে-ই বুঝে, ক্ষত কত গভীর।
এখন আমাদের সমাজটা এই পর্যায়ে গিয়েছে যে, আমাদের একজন মা-বোন যদি বিধবা হয়, তাহলে বাবা-মার কাছেও সে বোঝা হয়ে যায়। স্বামী হারানোর কারণে তার আর কেউ থাকে না। সন্তান পালন করা তো দূরের কথা, নিজে আগে যেভাবে শাহেনশাহ হালতে চলত, এখন গরিবের বেশেও সে চলতে পারে না। ঘরে ভাইয়ের বউয়ের কাছে কাজের বুয়ার মতো থাকতে হয়। এই ক্ষতি আপনি বুঝবেন কোত্থেকে! আপনার তো কোনো ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি ওই বাচ্চার হয়েছে। ক্ষতি ওই বিধবা নারীর হয়েছে。
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
السَّاعِي عَلَى الْأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ، كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'বিধবা ও মিসকিনদের অভাব দূর করার চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর তুল্য।[৯৩]
অর্থাৎ, বিধবা নারীকে দেখাশোনা করলে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সওয়াব পাবেন। কিন্তু বিধবা নারীরা আজ বাবার কাছে বোঝা হয়ে গেছে, ভাইয়ের কাছে বোঝা হয়ে গেছে, সমাজের কাছে বোঝা হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার কেউই মূল্যায়ন করেনি, একবার ভাবেওনি।
একজনকে আপনি দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়ে মসজিদে এসে তাওবা করবেন! এতেই সব মাফ হয়ে যাবে? আপনি তো এভাবে আরেক বার আরেকজনকে মেরে এসে তাওবা করবেন। এভাবে আর কত সন্তানকে এতিম করবেন, আর কত নারীকে বিধবা করবেন? আপনি একটু ফিকির করেন! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।
আমি যদি কাউকে আঘাত করি, সাথে সাথে বলতে হবে, 'আমি তোমাকে মানুষের সামনে থাপ্পড় দিয়েছি, আজকে তুমি আমাকে থাপ্পড় দিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নাও। যাতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমার সামনে দাঁড় করিয়ে আমার নেকি তোমাকে দিয়ে না দেন। অথবা তোমার গুনাহগুলা যেন আমাকে না দিয়ে দেন। আজকে তুমি আমাকে সবার সামনে আঘাত করে প্রতিশোধ নিয়ে নাও।'
যদি কেউ কাউকে প্রকাশ্যে থাপ্পড় দেয়, কেউ কাউকে মারে, তো সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে যে, 'তুমি আমার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারো। তোমাকে অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে। না নিলে কিয়ামতের দিন আমাকে পাকড়াও করা হবে।' যদি সে মাফ করে দেয়, আলহামদুলিল্লাহ। তবে এরপর আল্লাহর কাছেও মাফ চাইতে হবে।
- 'আমি নেতা, আমি বড় মাপের লোক, আমি আরেকজনের হাতে প্রকাশ্যে আঘাত কিভাবে খাব? আমার একটা প্রেসটিজ আছে না! একটা বাহাদুরি আছে না!'
না, কোনো নেতৃত্ব থাকবে না কিয়ামতের দিন। আল্লাহ তাআলা বলছেন,
يَوْمَ هُم بَارِزُونَ لَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
'মানুষ যেদিন (কবর থেকে) বের হয়ে আসবে, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। (সেদিন ঘোষণা দেওয়া হবে,) "আজ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কার?” (উত্তর আসবে) “এক ও একক মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর।” [৯৪]
আল্লাহ ঘোষণা দেবেন-আজকে রাজত্ব কার? আজকে রাজত্ব একমাত্র আমার। আজকে কারও কোনো কথা চলবে না। প্রত্যেকে যা যা করেছে, আজকে ওই সব বদলা মিটিয়ে দেওয়া হবে।
খুনি নেতাকে সবার সামনে ধরে আনা হবে। সে যদি পুণ্য করে থাকে, তবে ওই পুণ্য আল্লাহ তাআলা তার কাছ থেকে নিয়ে নিহত ব্যক্তিকে দিয়ে দেবেন। অথবা নিহত ব্যক্তির যত গুনাহ আছে, সব ওই নেতার মাথায় দিয়ে সর্বোচ্চ ভয়ংকর জাহান্নামে আল্লাহ তাকে পাঠাবেন।
এজন্য অন্যায়ভাবে আমি যদি কাউকে আঘাত করে থাকি, তবে দুনিয়াতেই তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে।
একটু ভাবার বিষয়, আমার স্তর আল্লাহর কাছে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধারেকাছেও না। একদিন সাইয়িদুল কাওনাইন, সাইয়িদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালিন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের সবাইকে সারি ধরে দাঁড় করিয়েছেন। দাঁড় করিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন-'শোনো, আমি যদি কারও জানের ক্ষতি করে থাকি, মালের ক্ষতি করে থাকি, ইজ্জত নষ্ট করে থাকি, কিয়ামতের দিন আমাকে ধোরো না। আজ আমার থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নাও। আমি নিজেকে তোমাদের সামনে পেশ করছি। '[৯৫]
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যিনি সবার সেরা, যার কারণে আমরা সেরা, যার কারণে কুরআন-কিতাব সব আমরা পেলাম এবং আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার স্বপ্নও আমরা তাঁর কারণেই দেখতে পারি। ওই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের ওপর এত এত ইহসান করার পরেও সাহাবাদের সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বলেছেন, 'আমি যদি কারও জানের, মালের, ইজ্জতের কোনো ক্ষতি করে থাকি, আজকে আমার থেকে বদলা নিয়ে নাও। কিয়ামতের দিন আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বোলো না যে, "আমার সাথে মন্দ আচরণ করা হয়েছে, দুনিয়া থেকে আমি বদলা নিতে পারিনি।""
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড় করানোর পর এক সাহাবি তখন কথা বলতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটা বদলা নেওয়ার আছে।'
আমাদেরকে শেখানোর জন্য এটা একটা অনুশীলন। আমরা তো দুনিয়ার ইজ্জত, দুনিয়ার সম্পদ-এসবকে আসল বানিয়েছি। ওয়াল্লাহি! এগুলোর কোনোটাই আসল না। এগুলো কোনোটাই থাকবে না। আপনার-আমার শেষ পরিণতি দেখার জন্য বৃদ্ধ লোকগুলোকে দেখেন। এদেরও একদিন আমার মতো, আপনার মতো স্বাস্থ্য ভালো ছিল। এরাও ঠিকমতো দুনিয়ায় চলাফেরা করেছে। আজকে তাদের অবস্থা দেখুন, নিজের সন্তানের কাছেও তারা আজ বোঝা। দয়া করে আমার আর আপনার শেষ পরিণতি চিন্তা করুন।
তো, ওই সাহাবা দাঁড়িয়ে বলেছেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বদলা বাকি আছে।' কী সেই বদলা? সে বলে, 'আপনি একবার জিহাদের ময়দানে কাতার সোজা করতে গিয়ে ধনুক দিয়ে আমাকে খোঁচা দিয়েছেন। আমি একটু এগিয়েছিলাম, তাই আমাকে খোঁচা দিয়েছিলেন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন নিজের পিঠকে পেশ করেছেন, 'নাও, তুমি আমার থেকে বদলা নিয়ে নাও।' সাহাবি সুযোগ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো পিঠ চুমো দিয়ে ভরে দিয়েছেন। তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম, কবে আপনি বলবেন যে আমার থেকে প্রতিশোধ নাও। আমি তো চেয়েছিলাম, আমার ঠোঁট আপনার বদন মুবারকের সাথে একটু লাগুক। এজন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।'
এখন বলুন, আপনি আর আমি কোথায়? আমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাইতেও বেশি সম্মানিত?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল এটা না যে, কোনো একটা বিশেষ সময় এল আর তিনি বললেন— 'ভাই, আমি জীবনে যা যা করেছি মাফ করে দিয়েন। আরেকবার সেবা করার সুযোগ দিয়েন।'
কীসের সেবা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো সংকোচ ছাড়াই বলেছেন, 'বদলা নাও।' সাথেসাথে স্বাভাবিক গতিতে নিজের চাদর খুলে দিয়েছেন। আর এই সাহাবিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চুমোয় ভরে দিয়েছেন।
কই গেল এখন সেই আদর্শ? কোথায় সেই আদর্শ! আমি নেতা হওয়ার, আমি অর্থকড়ির মালিক হওয়ার জন্য কত মানুষের হক নষ্ট করেছি। কত মানুষের জানের কষ্ট দিয়েছি। একদিনও তো তার কাছে মাফ চাইতে যাইনি! আজ যদি আমি না যাই, আল্লাহর কসম! এর বদলা বাকি থাকবে। দুনিয়াতে এর বদলা আদায় না হলেও কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা জালিমদের থেকে মজলুমের হক আদায় করে দেবেন। প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বেন।
আপনি যাকে মন চায়, তাকে মারার পরিকল্পনা করেছেন। মেরেছেন। কত নারীকে যে বিধবা করেছেন! এরপর গিয়ে হজ আর উমরা করে, মসজিদে সিজদা দিয়ে, কিছু টাকা দান-সাদাকা করে মনে করেছেন যে, মাফ হয়ে গেছে? না। এটা বান্দার হক। আগে বান্দার কাছে যান। তার কাছে মাফ চান। বলুন, 'আমার কাছ থেকে প্রতিশোধ নাও।' এরপর আল্লাহর দরবারে সিজদা করুন— 'ওগো আল্লাহ! আপনার হুকুম মানিনি। আপনি মানুষকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। আমি কষ্ট দিয়েছি। আমি আপনার কাছে মাফ চাই।' তাহলে মাফের আশা আছে, অন্যথায় না।
বিষয়টা বোঝা জরুরি। আমি মনে করেছি, দুনিয়াতে আমি আমার মতো চলব, আমার মতো করে ইবাদত করব!
হতেই পারে না। নিম্নের হাদীসখানি লক্ষ করুন:
একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟
'তোমরা কি বলতে পারো, গরিব কে?'
গরিব বলতে তো আমরা জানি-যার অর্থকড়ি, সম্পদ ইত্যাদি কিছুই নেই। তা-ই না? সেই জন্য সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যার অর্থকড়ি ও ধন-সম্পদ নেই, সে-ই তো গরিব।' তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
'আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই প্রকৃত গরিব, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক আমল থেকে দেওয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেওয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক আমল থেকে পূরণ করা না যায়, সেই ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।'[৯৬]
ভালো করে বুঝে নিন।
দুনিয়ায় কেউ কাউকে গালি দিলে কিয়ামতের ময়দানে গালিদাতাকে আটকানো হবে। আজ মুসলিম ভুলেই গিয়েছে যে, গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ। গালি দেওয়া তো আজকাল আমাদের একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। একটা রিকশা আরেকটার সাথে ধাক্কা খেয়েছে, তো একসাথে পঞ্চাশটা গালি দিয়ে জিতে গিয়েছে। ও তো আসলে জাহান্নাম পেয়ে জিতে গিয়েছে!
গালি দেওয়া কবীরা গুনাহ। আর এখন তো এমন গালি দেওয়া হয়, যা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছিলই না। আগে গালি ছিল-'তুই একটা গর্দভ', 'এই গাধা, তোর ধ্বংস হোক।' তখন লোকেরা গাদা-গর্দভ বলত। আর এখন যা বলে, সেগুলো তো জবান দিয়ে কোনো মুমিন উচ্চারণও করতে পারবে না। ভুলে মুখে আনলেও মুখ তিনশ বছর ধৌত করা লাগবে।
রিকশা একটার সাথে আরেকটা ধাক্কা খেয়েছে, কারও সাথে কারও রাগ উঠেছে-ব্যস, তাহলেই জবান চালাচ্ছে। যা মন চায়, তা-ই বলছে।
বেশ, তুমি বলতে থাকো। কিয়ামতের দিন যত নেকি নিয়েই আসো না কেন, যাকে গালি দিয়েছিলে সে হয়তো দাঁড়িয়ে বলবে : ‘হে আল্লাহ! অমুক লোক আমাকে গালি দিয়েছে, তমুকে আমার গীবত করেছে। এই লোক আমার অগোচরে কথা বলেছে। ওর যত নেকি আছে, হিসাব করে করে একেকটা গালির বদলে ওর একেকটা নামাজ আমাকে দিয়ে দিন।’
আরও লোক এসে দাঁড়িয়ে যাবে—যাদেরকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, অন্যায়ভাবে মারা হয়েছিল; যাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল।
এভাবে পুরো পাহাড় পরিমাণ সব নেকি বিলিয়ে দেওয়ার পরেও আরও লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকবে। আরও পাওনাদার দাঁড়িয়ে থাকবে। গীবতের অপরাধের কারণে সারা দুনিয়া পরিমাণ নেকিও কোনো কাজে আসবে না। অথচ আমি আমার জবানকে হেফাজত করি না! যদি তার নেক কাজ থাকে, তবে পাওনাদারদেরকে নেক কাজ দিয়ে দেওয়া হবে। যদি নেক কাজ শেষ হয়ে যায়, পাওনাদারদের থেকে গুনাহ একেকটা করে নিয়ে তার মাথার ওপর চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।’
রাসূলুল্লাহ -এর ভাষায়, এই ব্যক্তিই হলো প্রকৃত গরিব।
ভালো করে বুঝুন, দিল থেকে বুঝুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে একবারে বুঝিয়েছেন। আমাদের ধারণা হলো, নেকির কাজ হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, দান-সাদাকা—এগুলো। তা-ই না? কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নেকির কাজ শুধু নামাজ-রোজা না। শুধু এগুলো দিয়ে কেউ জান্নাতে যাবে—এ কথা কুরআন-হাদীসে নেই। একদল লোক নামাজ নিয়ে আসবে। কোনোদিন তারা নামাজ কাযা করেনি। রোজা, হজ, যাকাত—সবই ঠিক আছে। কিন্তু তার জবান ঠিক নেই, মানুষের হক তারা নষ্ট করেছে। শুধুই যে নামাজ-রোজা ইসলামের সৌন্দর্য—তা কিন্তু না। শুধু এগুলো দিয়েই কেউ কি জান্নাতে যাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, না।
নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত—এগুলোকেই কি আপনি জান্নাতে যাওয়ার কারণ মনে করেন?
মানুষের হক না আদায় করার কারণে কিয়ামতের দিন অনেকেই জাহান্নামে যাবে, যদিও আল্লাহর হক তারা আদায় করেছে। কাজেই শুধু আল্লাহর হক না, পাশাপাশি মানুষের হকও আদায় করতে হবে। কাউকে চড় দিয়েছি, কাউকে হত্যা করেছি, কাউকে হত্যার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছি, কাউকে গালি দিয়েছি, কারও গীবত করেছি, তো আমি সেদিন বরবাদ হয়ে যাব। এই নামাজ, রোজা, যাকাত, সাদাকা আমাকে জান্নাতে নিতে পারবে না。
সুতরাং আসুন, আমাদের মেধা ও বুঝ ঠিক করে নিই। মানুষের হক নষ্ট করার কারণে কিয়ামতের দিন আমরা সবচেয়ে বেশি অসহায় থাকব। দ্বীন শুধু নামাজ, রোজা, দান-সাদাকার নাম না। মানুষের হক, স্ত্রীর হক, পিতা-মাতার হক, প্রতিবেশীর হক-এগুলোও দ্বীন। এসব হকের কোনোটি আদায় না করলে জান্নাতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না।
কাউকে যদি গালি দিই, গীবত করি, পরনিন্দা করি অথবা কারও বিরুদ্ধে কোনো কিছু করে থাকি, আর সে যদি জীবিত থাকে, তাহলে আমার এখনো সুযোগ আছে। তার কাছে মাফ চাইতে হবে। বলতে হবে, 'ভাই! আমাকে মাফ করে দিন।'
টিকাঃ
[৮৮] মুসনাদে আহমাদ: ১৬০৮৫; হাসান
[৮৯] বুখারি: ২৪৪৯, ৬৫৩৪
[৯০] সিলসিলা সহীহাহ: ৬৮৯
[৯১] সূরা আন-নূর, ২৪: ২।
[৯২] সূরা আল-বাকারা, ২: ১৭৯।
[৯৩] বুখারি, ৫৫৮২।
[৯৪] সূরা আল-গাফির, ৪০: ১৬।
[৯৫] আল ইসাবাহ ফী মারিফাতিস সাহাবাহ, ১০/৭১
[৯৬] মুসলিম, ৬৩৪৩।