📘 জান্নাতি জীবন 📄 মিউজিক ও বেপর্দা নারী

📄 মিউজিক ও বেপর্দা নারী


গানের শব্দগুচ্ছ নিয়ে ভেবে দেখুন, যেমন: 'তোমাকে ছাড়া আমি বুঝি না কোনো কিছু আর', 'তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়'- এইসব গানের মধ্যেই আজকের যুবকরা মত্ত হয়ে আছে। এইসব গানের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে গেছে। পুরো নাটক জুড়ে উপস্থাপন করা হয় একটা নারীর জন্য যুবক তার জীবনকে শেষ করে দেয়। সিনেমাতেও একই কাহিনী, টেলিফিল্মেও একই কাহিনী। এই নারীর সুড়সুড়ি দিয়ে যুবকের জীবনটাকে শয়তান শেষ করে দেয়। কিন্তু হে যুবক, তোমার জীবন তো ছিল আল্লাহর জন্য। তোমার জীবন তো ছিল মুসলিমের জন্য, উম্মতের জন্য। উম্মতের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য।
ঘুরেফিরে কথা একটাই দাঁড়ায় যে, বর্তমান যুগের এইসব হারাম গানবাজনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে বেহায়া নারী। এই সমাজের যুবকরা গান নামক যে ব্যাধিতে আক্রান্ত, এর মূলে রয়েছে নারী। প্রত্যেকটা যুবক তার জীবনের চরিত্রকে হারিয়ে ফেলেছে, তার যৌবনকে হারিয়ে ফেলেছে এই নারী ফিতনার কারণে।
ডিবিসির একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের যৌবন অরক্ষিত। তাহলে বোঝা গেল, শরীয়তে সর্বোচ্চ গুনাহ 'যিনা'য় লিপ্ত হচ্ছে এমন ছেলেমেয়েরা, যারা আমাদের পরিভাষায় এখনো কিশোর-কিশোরী। এই যে যিনার মতো এত বড় গুনাহ ছড়াচ্ছে, এটা হয়েছে কেবলমাত্র বেপর্দার কারণে। আজকাল পুরুষ, বুড়ো, জোয়ান, বাচ্চা-প্রত্যেকটা মানুষ আল্লাহর বাইরে গিয়ে নারীর পেছনে মত্ত হয়ে গেছে, স্মার্টফোনে আসক্ত হয়েছে। সংস্কৃতির নামে স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার চোখ, অন্তর, চরিত্র বলতে কিছুই নেই। যেটা আগে মুশরিকরাও কল্পনা করত না, সেই যিনা আজকে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে। এর পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী বেপর্দা।
ইসলামের বড় শত্রু আবু সুফিয়ানের বিবি হিন্দার গল্প একটু ভাবলে আমরা দেখব, ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল হিন্দা নামক এক নারী। সে ছিল আবু সুফিয়ান ইবনুল হারবের স্ত্রী। মক্কা বিজয়ের সময় এই নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। রাদিয়াল্লাহু আনহা। এমন ভয়ংকর নারী ছিল সে। বদর যুদ্ধে মুশরিকদেরকে পিছু হটতে দেয়নি, সবাইকে একসাথে জমা করে রেখেছিল। উহুদের যুদ্ধে ইসলামের সবচেয়ে বড় বীর, সাইয়্যেদুশ শুহাদা হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত, পা, নাক-সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলেছিল এই নারী। কলিজা কেটে চর্বণ করেছে। কী পরিমাণ ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ! ওই নারী যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণ করতে গেল, তখন নবিজি বললেন, 'তোমাকে এই শর্ত দিতে হবে যে, তুমি যিনা করতে পারবে না।' সেই নারী আশ্চর্য হয়ে গেল! বলল, 'কোনো স্বাধীন নারী তো যিনার কথা কল্পনাই করতে পারে না, আর আপনি এই শর্ত আমাকে দিচ্ছেন!'[৮২]
যেই নারী ইসলামের একজন বীরের কলিজা পর্যন্ত চিবিয়েছে, সে-ই বলছে, যিনার কথা সে কখনো কল্পনাও করতে পারে না। আর এখন যারা মুসলিম দাবিদার, যারা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করে, তার জীবন কতটুকু পূতপবিত্র, তার সন্তান, তার পরিবারের জীবন কতটুকু পূতপবিত্র-তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একজন মুশরিক নারীও যা কল্পনা করতে পারেনি-তাতে এখন মুসলিম নারী-পুরুষ অবাধে লিপ্ত। আজ তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
আরেকটা দিক নিয়ে ভাবুন, আজ সমাজে যত গুনাহ আছে, তার মূলে আছে মিউজিক। এই মিউজিকের উদ্ভব ঘটেছে বেপর্দা নারীর কারণে। যিনার এত প্রসারণ ঘটেছে কেন? উত্তর একটাই, সেটা হলো বেপর্দা নারী। সহশিক্ষা হোক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোক, যা-ই হোক, সবকিছুতে পুরুষের ঈমান হরণে প্রধান ভূমিকা রাখছে বেপর্দা নারী। এই বেহায়া-নির্লজ্জ নারীদের কারণে যুবক-বয়োবৃদ্ধ কারোর জীবনই রক্ষিত নেই। হুমায়ূন আহমেদের মতো দ্বীনহীন ব্যক্তির বিখ্যাত উক্তি আছে যে, এক নাতি জিজ্ঞেস করছে, তার দাদা কোথায়? তাকে উত্তর দেওয়া হলো, 'গার্লস স্কুল ছুটি দিয়েছে তো, তাই তোমার দাদা সেখানে বসে রয়েছে।' এই কথার মধ্যে কী বোঝা যায়? এটাই বোঝা যায় যে, এই উম্মতের মধ্যে যাকে আপনি বৃদ্ধ মনে করছেন, সেই বৃদ্ধের মাঝে শাহাওয়াত আছে। সে চোখের যিনা জারি রাখতে পারে, যদিও তার অন্যান্য কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।
এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخٌ زَانٍ، وَمَلِكُ كَذَّابٌ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرُ
'তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, তাদেরকে (গুনাহ থেকে) পবিত্র করবেন না।' রাবী আবূ মুআবিয়া এর বর্ণনায় আছে, নবিজি বলেছেন, 'তাদের প্রতি তাকাবেনও না। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (এরা হলো) যিনাকারী বৃদ্ধ, মিথ্যাবাদী বাদশাহ ও অহংকারী দরিদ্র ব্যক্তি।[৮৩]
আমার জীবনে এ বিষয়ের একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি যখন মালিবাগ পড়তাম, তখন আমার এক মামা ছিল আলিম। তো আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন বৃদ্ধ মানুষের পর্দার ব্যাপারে শরীয়ত এত শক্ত অবস্থানে কেন? তিনি উত্তর দিলেন, 'তুমি গ্রামে গিয়ে চায়ের দোকানগুলোতে একটু সময় দাঁড়াবে। দেখবে, সেখানে কারা কতক্ষণ বসে থাকে। তার একটা চার্ট বানাবে। কথামতো আমি একটা চার্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। পার্সেন্টিজ করে দেখতে পেলাম, অধিকাংশ বৃদ্ধরাই চায়ের দোকানে বসে থাকে। দোকানে একটা টিভি চলতে থাকে, আর সেখানে হরেকরকম আড্ডা-কথাবার্তায় মশগুল থাকে সবাই। একজন বৃদ্ধের যৌনশক্তি যদিও বয়সের সাথে রহিত হয়ে যায়, কিন্তু তার চোখের খাহেশ রহিত হয় না। সে ওই চোখের মাধ্যমে যিনায় লিপ্ত হয়। এজন্য পর্দা সবার করা দরকার। পর্দা না থাকার কারণে এই উম্মতের যুবকরা যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, ঠিক একইভাবে বৃদ্ধরাও ধ্বংস হচ্ছে।
দুই টাকার পণ্য থেকে শুরু করে গাড়ি-বাড়ি, সংস্কৃতি, শিক্ষা-সবকিছুতে শয়তান বেপর্দা নারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কাপড় কিনতে গেলেও আজকাল অর্ধউলঙ্গ নারীর ছবি সামনে আসবে। আপনি দেখতে না চাইলেও আসবে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-সহ যেকোনো জায়গায় গেলে আপনার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবখানেই শয়তান বেহায়া নারীর ফিতনা পুরুষের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছে। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-এই সব বেপর্দা নারী জান্নাতে যাবে না, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না; যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ হাজার হাজার বছরের দুরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে。
মুসল্লি, নামাজি কিংবা আল্লাহওয়ালা মানুষও আজকাল রাস্তায় গেলে ঈমান ঠিক রাখতে পারে না। বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ছাত্র তাউস (রহিমাহুল্লাহ) ও তাঁর বাবা একসাথে বসে মুযাকারা করছিল। তাউস রাদিয়াল্লাহু আনহু বিখ্যাত একজন তাবিয়ি। তিনি বলেন, 'আমি সবকিছু থেকে নিরাপদ বোধ করলেও, কোনো নারী আমার সামনে পড়ে গেলে তার থেকে নজর হেফাজত করব-এই ব্যাপারে নিরাপদ বোধ করি না।'
তাহলে বর্তমানে আপনার পীর সাহেব নিশ্চিত হবে কিভাবে? বেপর্দা নারী যদি বাইরে বের হয়, তাহলে পুরুষ ফিতনায় লিপ্ত হবে-এটা খুবই স্বাভাবিক।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মেয়ের জামাই, শ্রেষ্ঠ তাবিয়ি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর বয়স যখন ৮৪ বছর, তখন তিনি পেরেশান হয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি নারীর ফিতনাকে। আমি ভয় পাই, এটা আমার ঈমানকে নষ্ট করেই ফেলে কি না!'
নারীর ফিতনার কারণগুলো এবং ফিতনার স্থানগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশ বছর আগেই আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা এর আগেও তা বর্ণনা করেছি। শুধুমাত্র সন্তানকে প্রতিপালন করলেই বাবা হওয়া যায় না। সন্তান জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। আল্লাহর কসম, যে বাবা তার মেয়েকে পর্দা করাতে পারে না, সে বাবা হওয়ার উপযুক্ত না। যে মা তার সন্তানকে শরীয়ত শেখাতে পারেনি, সে মা হওয়ার উপযুক্ত না।

টিকাঃ
[৮২] ওয়াকিদি, মাগাযী ২/৮৭১; তাবারি ৩/৬১-৬৩। বর্ণনাটি যঈফ।
[৮৩] মুসলিম, ১৯৭।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 আদর্শ মা

📄 আদর্শ মা


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেছেন, 'তুমি যে বিয়ে করেছো, এই নারীর কী কী গুণ রয়েছে?'
তিনি উত্তর দিলেন, 'চারটা গুণ আছে তার মধ্যে। প্রথম হলো, সে আমার অধীনস্থ বোনদেরকে আদব শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয়ত, তাদেরকে দ্বীন ইসলাম শিক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, তাদেরকে পরিপাটি হওয়ার শিক্ষা দেয়-কিভাবে গোছগাছ হয়ে জীবনযাপন করা যায় তা শেখায়। চতুর্থত, তাদের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রাখে, শরীয়তের বাইরে চলার কোনো সুযোগ দেয় না। একজন মা যেভাবে তার মেয়ের ওপর কর্তৃত্ব রাখে, ঠিক তেমনই সে আমার ছোট বোনদের ওপর পুরোপুরি কর্তৃত্ব রাখে। [৮৪]
এই গুণগুলোই হলো মা হওয়ার জন্য উপযুক্ত। মা তো সে-ই হওয়ার উপযুক্ত, যে তার সন্তানকে শরীয়ত শিক্ষা দিতে পারে। পর্দা-পুশিদা শিক্ষা দিতে পারে। বাবা তো সে-ই, যে তার মেয়েদেরকে পর্দার বিধানের ওপর বড় করে তোলে। পর্দার ব্যাপারে যে তার পরিবারের লোকদেরকে একচুল পরিমাণও ছাড়া দেয় না।
আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।
আমরা উল্লেখযোগ্য গুনাহের দিকগুলো আলোচনা করলাম। আমরা আশাবাদী, একজন মানুষ যদি তার জবানকে সংরক্ষণ করে, নারীর ফিতনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে, পর্দাকে তার স্তর-সহ মেনে চলে, তাহলে সে অনেকটাই বেঁচে যাবে। তারপরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা গুনাহের পাহাড় বহন করে চলছি। দিন দিন গুণাহের পরিমাণ বাড়ছেই। তাই আমাদের সত্যিকারের সফলতা পেতে হলে, জান্নাতের বিষয়টি আরও নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই তাওবার বিষয়ে আমাদেরকে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। এজন্য আমরা তাওবার খুঁটিনাটি দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। এ জন্য পরবর্তী পর্ব থেকে শুরু হবে তাওবার পাঠ। একমাত্র তাওবা-ই দিতে পারে আমাদের সকল গুনাহ থেকে মুক্তির আশ্বাস। পারে আমাদের জীবনকে নবিদের জীবনের সাথে মেলাতে।

টিকাঃ
[৮৪] বুখারি: ১৯০১; মুসলিম: ৭১৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px