📄 বর্তমান জমানার হালচাল
বর্তমান সমাজে নামাজি পাওয়া যায় বটে। কিন্তু তারা টিভিও দেখে, বেপর্দাও হয়, আবার বিভিন্ন হারামেও লিপ্ত থাকে। সারা বছর রোজা রাখে, সারা দিন ইবাদতে কাটায়, অথচ তার অবৈধ সম্পর্কও থাকে। এমন বান্দা আল্লাহ চাননি। শরীয়ত মানহিয়্যাত (অর্থাৎ নিষিদ্ধ জিনিসকে বর্জন করা)-কে সবার আগে স্থান দিয়েছে। হারামকে বর্জন করা শরীয়তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন বড় বড় নামাজি পাওয়া যায়, অথচ সে টিভি দেখে, টাচস্ক্রিন মোবাইলের ফিতনায় সে আক্রান্ত, বিভিন্নভাবে নারীর ফিতনায় সে আক্রান্ত। শরীয়ত কিন্তু এটা চায়নি। শরীয়ত চেয়েছে-আগে হারামকে ছাড়তে হবে, হারাম জিনিস বর্জন করতে হবে। একজন মানুষ যতই ইবাদত করুক, সে যদি গুনাহ থেকে না বাঁচে, হারাম বর্জন না করে, অবৈধ জিনিস থেকে দূরে না থাকে, সে কখনো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারবে না। অবৈধ জিনিসগুলোতে যুক্ত থেকে, হারাম রুটিরুজি খেয়ে একজন মানুষ যতই ইবাদত করুক, তার ইবাদত কবুল হবে না। কারণ এই গুনাহগুলো তার শরীরে নাপাকের মতো লেপ্টে রয়েছে। সেজন্য শরীয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হারাম বর্জন করা। আমরা এখন হারামের মৌলিক কাজগুলো ব্যাখ্যা করব। যাতে আমাদের বুঝতে সুবিধা হয় যে, হারামের সাথে বেপর্দার কতটা সম্পর্ক রয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'অচিরেই আমার উম্মতে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা অত্যাধুনিক বাহনে আরোহন করে মসজিদে যাবে, কিন্তু তাদের স্ত্রীরা হবে অর্ধউলঙ্গ, তাদের মাথাগুলো হবে বৃদ্ধ উটের কুঁজের ন্যায়। তোমরা এই মহিলাদেরকে অভিশাপ দাও কেননা তারা অভিশপ্ত। তোমাদের পরে যদি আর কোন জাতি আসতো, তাহলে নারীরা তাদের খেদমত করতো। যেমন তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের নারীরা খেদমত করেছে।[৭৬]'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এদেরকে তোমরা লানত করো। তারা লানতের উপযুক্ত।'[৭৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, 'আমার পরে এমন এক জাতি আসবে, যাদের খিদমত করবে নারীরা। যেমন বনী ইসরাইলের নারীরা আযনবিদের খিদমত করে ধ্বংস হয়েছে, এরাও ঠিক এভাবেই ধ্বংস হবে।[৭৮]
আজকাল বিমান, হাসপাতাল-সব জায়গায় নারীরা পাবলিকের খিদমত করছে; অথচ তারা তাদের স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করাকে লজ্জার বিষয় মনে করে। গাইরে মাহরাম পুরুষের খিদমতে এসব নারীরা নিজেদেরকে বিলীন করে দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিনজন লোককে আল্লাহ তাআলা কোনো সওয়াল ছাড়াই বিনা হিসাবে জাহান্নামে পাঠাবেন। একদল লোক হচ্ছে, মুসলিমদের জামাআত আছে, খলিফা আছে, কিন্তু যারা এ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। এসব মানুষকে আল্লাহ বিনা হিসাবে জাহান্নামে পাঠাবেন। আরেকদল হলো দাস-দাসী ছিল, কিন্তু মালিকের নিকট হতে পলায়ন করেছে। তৃতীয় দল হলো, ওই নারী—যে তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে সাজসজ্জা করে ঘরের বাইরে যায় অন্য পুরুষদেরকে দেখানোর জন্য। এসব নারীদেরকে বিনা হিসাবে জাহান্নামে প্রেরণ করা হবে।
অপর একটি হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءُ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلاَتٌ مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا .
‘দুই প্রকার জাহান্নামবাসী, আমি যাদেরকে (এ পর্যন্ত) দেখিনি। এক প্রকার মানুষ, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, তা দ্বারা তারা লোকজনকে মারবে এবং এক দল স্ত্রী লোক, যারা কাপড় পরিহিতা উলঙ্গ, যারা অন্যদের আকর্ষণ করে ও নিজেও আকৃষ্ট হয়। তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। ওরা জান্নাতে যেতে পারবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না। অথচ এত এত দূর হতে তার সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।[৭৯]
এবার আমরা মৌলিক আলোচনায় আসি। আমরা প্রথমেই জেনেছিলাম যে, পুরো বনী আদমকে জান্নাত থেকে বের করার প্রথম পদ্ধতি হিসেবে ইবলিস বেছে নিয়েছিল বেপর্দাকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন—আমার উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি আমি আশঙ্কা করি যে, তারা দ্বীন ও ঈমান থেকে সরে গিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে নারীর কারণে। বেহায়া-বেপর্দা নারীর কারণে। সেই নারী—যারা বেপর্দায় চলবে, আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করবে। তাদের কারণে পুরুষরা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। এই নারীরা পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে—এসব নারীরা জান্নাতে তো যাবেই না, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না; যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ হাজার হাজার বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।
আমরা বর্তমানে যারা যত গুনাহে লিপ্ত, এই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার মৌলিক কারণ কি শিরক-কুফর? নাকি এরচেয়ে বড় কারণ হলো নারী? এই বিষয়টা সামনে আসা দরকার। আল্লাহ তাআলা যাদেরকে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে অনেকগুলো অঙ্গ প্রদান করেছেন। এককথায় দেহ ও মন প্রদান করেছেন। পুরুষের এই দেহ ও মন যিনায় লিপ্ত হবে। কিভাবে হবে, তাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে বর্ণনা করেছেন।
'আদম সন্তানের জন্য তাকদীরে যিনার অংশ যতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছে, সে ততটুকু অবশ্যই পাবে। দুই চোখের যিনা তাকানো, কানের যিনা যৌন-উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের যিনা আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের যিনা (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশ্যে) স্পর্শ করা, আর পায়ের যিনা ব্যভিচারের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া এবং মনের যিনা হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা। অতঃপর গুপ্তাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।[৮০]
প্রত্যেক পুরুষ তার দেহ-মনকে হারিয়ে ফেলেছে-অন্য নারীদের দিকে অসংযত দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে। টাচস্ক্রিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভিডিও দেখার মাধ্যমে তার চোখ নাপাক হয়ে যাচ্ছে। নাটক, সিনেমা, থিয়েটার, টেলিফিল্ম, খবর-সহ সবকিছুতে আঁটসাঁট পোশাক পরা নারী অথবা পোশাকহীন নারীরা থাকে। যার ফলে একজন পুরুষ চাইলেও তার নজর হেফাজত করতে পারবে না। এই উম্মতের প্রত্যেক সদস্যকে এই বেহায়া নারীরা পথভ্রষ্ট করছে। এই উম্মতের চোখ, জবান, হাত, পা, দিল নিঃশেষ হচ্ছে এই যিনার কারণে। আর একবার যার দিলে যিনা প্রবেশ করেছে, সেই দিলে ঈমান আসবে কোত্থেকে! যে উম্মতের জবান যিনায় লিপ্ত, কিভাবে সেই জবান দিয়ে সে আল্লাহকে ডাকবে? তার নামাজে মনোযোগ নেই, যিকির করতে ভালো লাগে না, দ্বীনের কাজ তার জন্য কষ্টকর হয়। এই কষ্টকর হওয়ার মৌলিক কারণ হলো-শয়তান নারীর পোশাককে পুরুষের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
একটু ভালোভাবে চিন্তা করুন। আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছে কার্টুন দেখে। এসব কার্টুনের ভেতরে নারীদেরকে প্রদর্শন করা হচ্ছে। আর কার্টুনে পোশাকের যে অবস্থা-তাও হাদীসের ভাষ্যের সাথে মিল রয়েছে। কার্টুনে হয়তো আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা নারী, নয়তো উলঙ্গ নারী। এটা শয়তানের পরিকল্পনা। শয়তান এই পরিকল্পনা করে রেখেছে আমাদের জন্মেরও আগে থেকেই। শয়তান নারী-পুরুষের এই পর্দাকে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে আমাদের চোখ, কান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাপাকীর দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আপনি যেকোনো জায়গায় যাবেন, দেখবেন যে, তাও নাপাক করে দেওয়া হয়েছে এই পর্দাকে সরিয়ে ফেলে। মুসলিমদের সংস্কৃতি বলতে কিছু বাকি রাখেনি। মুসলিমদের বিবাহগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। মুসলিমদের পরিবারগুলো শেষ করে দিয়েছে। মুসলিম মেয়েরা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের জীবন বরবাদ করে দেওয়া হয়েছে। আর সবার বরবাদ হওয়ার পেছনে একটি মৌলিক কারণ হলো বেপর্দা 'নারী'। নিউজের মাধ্যমে এই নারীরা সামনে আসছে, নয়তো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আসছে। যেখানেই যান না কেন, আপনার চোখ নাপাক করতে হবে, জবান নাপাক করতে হবে। সব নাপাকের পেছনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারণ বলে দিয়েছেন, এইসব আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা নারী। রাসূল বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ
'সাত ধরনের মানুষকে আল্লাহ তাআলা সেদিন (কিয়ামতের দিন) তাঁর ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবে না।[৮১]
অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন সাত প্রকার ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিচে ছায়া দেবেন। তার মধ্যে ওই মুসলিম যুবকও থাকবে—যে তার জীবনকে আল্লাহর হুকুমের অনুগামী করেছে। আল্লাহ তাকে আরশের নিচে ছায়া দান করবেন।
একটা ছেলে যখন বালেগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে পৌঁছায়, তখন শয়তান তাকে খারাপ স্বপ্ন দেখায়। সে বান্ধবীর খোঁজ করে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করে নিচ্ছে স্মার্ট ফোন। আর মোবাইল নিয়ে যাচ্ছেতাই নাটক-সিনেমায় মশগুল হয়ে যাচ্ছে। যে ছেলে তার জীবনকে উৎসর্গ করত আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে, সে শয়তানের ফাঁদে পড়ে নারীর প্রেমে পাগল হয়ে যায়। ফেসবুক, নারী, বান্ধবী, খেলাধুলা—এসবে সে মজে যায়। অথচ তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব অন্যায়ের মূলোৎপাটন করা। প্রয়োজনে এসব অন্যায়কে মূলোৎপাটন করতে গিয়ে তার জীবনকে উৎসর্গ করা। কিন্তু শয়তান তা ভুলিয়ে দিয়েছে। সে জানেও না, শয়তান তার জীবনকে কোথায় নিয়ে গেছে। এই উম্মতের জীবন থেকে দ্বীন শেষ হয়ে গেছে। যে উম্মতের যুবকদের কাছে মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষিত থাকার কথা, ওই উম্মতের শিক্ষিত নামধারী যুবকরাই সবচেয়ে বেশি নারীদের ইজ্জত হরণ করছে। কারণ এদের জীবনটা শুরুই হয়েছে সুড়সুড়িমূলক নাটক-সিনেমার মধ্য দিয়ে। আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে যুবকেরা এখন নারীর ফিতনায় জড়িয়ে গেছে। আপনিই বলুন, এই যুবকের কাছ থেকে কী করে সমাজ ভালো কিছু আশা করতে পারে? উলটো সমাজ তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে যত ধরনের গুনাহ আছে, এর অধিকাংশই বেপর্দার সাথে সংশ্লিষ্ট। বেপর্দা একজন মানুষের ভেতরে নিফাকের বীজ বপন করে, ঈমানকে সরিয়ে দেয়, আল্লাহর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একজন মানুষের অন্তরের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, সে তার জীবন-মরণ-সবকিছু আল্লাহর জন্য সঁপে দেবে। কিন্তু এই ফিতনায় থাকা যুবক প্রতিনিয়ত পরনারীর মাধ্যমে জ্ঞান শিখছে, বেপর্দায় থাকা নারীর সাথে চলাফেরা করছে। তার চাওয়া-পাওয়া সব নারীকে ঘিরে।
টিকাঃ
[৭৬] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৭] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৮] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৯] মুসলিম, ৬৯৩০।
[৮০] মুসলিম, ২৬৫৭।
[৮১] বুখারি: ৬৬০; মুসলিম: ১০৩১।
📄 মিউজিক ও বেপর্দা নারী
গানের শব্দগুচ্ছ নিয়ে ভেবে দেখুন, যেমন: 'তোমাকে ছাড়া আমি বুঝি না কোনো কিছু আর', 'তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়'- এইসব গানের মধ্যেই আজকের যুবকরা মত্ত হয়ে আছে। এইসব গানের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে গেছে। পুরো নাটক জুড়ে উপস্থাপন করা হয় একটা নারীর জন্য যুবক তার জীবনকে শেষ করে দেয়। সিনেমাতেও একই কাহিনী, টেলিফিল্মেও একই কাহিনী। এই নারীর সুড়সুড়ি দিয়ে যুবকের জীবনটাকে শয়তান শেষ করে দেয়। কিন্তু হে যুবক, তোমার জীবন তো ছিল আল্লাহর জন্য। তোমার জীবন তো ছিল মুসলিমের জন্য, উম্মতের জন্য। উম্মতের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য।
ঘুরেফিরে কথা একটাই দাঁড়ায় যে, বর্তমান যুগের এইসব হারাম গানবাজনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে বেহায়া নারী। এই সমাজের যুবকরা গান নামক যে ব্যাধিতে আক্রান্ত, এর মূলে রয়েছে নারী। প্রত্যেকটা যুবক তার জীবনের চরিত্রকে হারিয়ে ফেলেছে, তার যৌবনকে হারিয়ে ফেলেছে এই নারী ফিতনার কারণে।
ডিবিসির একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের যৌবন অরক্ষিত। তাহলে বোঝা গেল, শরীয়তে সর্বোচ্চ গুনাহ 'যিনা'য় লিপ্ত হচ্ছে এমন ছেলেমেয়েরা, যারা আমাদের পরিভাষায় এখনো কিশোর-কিশোরী। এই যে যিনার মতো এত বড় গুনাহ ছড়াচ্ছে, এটা হয়েছে কেবলমাত্র বেপর্দার কারণে। আজকাল পুরুষ, বুড়ো, জোয়ান, বাচ্চা-প্রত্যেকটা মানুষ আল্লাহর বাইরে গিয়ে নারীর পেছনে মত্ত হয়ে গেছে, স্মার্টফোনে আসক্ত হয়েছে। সংস্কৃতির নামে স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার চোখ, অন্তর, চরিত্র বলতে কিছুই নেই। যেটা আগে মুশরিকরাও কল্পনা করত না, সেই যিনা আজকে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে। এর পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী বেপর্দা।
ইসলামের বড় শত্রু আবু সুফিয়ানের বিবি হিন্দার গল্প একটু ভাবলে আমরা দেখব, ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল হিন্দা নামক এক নারী। সে ছিল আবু সুফিয়ান ইবনুল হারবের স্ত্রী। মক্কা বিজয়ের সময় এই নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। রাদিয়াল্লাহু আনহা। এমন ভয়ংকর নারী ছিল সে। বদর যুদ্ধে মুশরিকদেরকে পিছু হটতে দেয়নি, সবাইকে একসাথে জমা করে রেখেছিল। উহুদের যুদ্ধে ইসলামের সবচেয়ে বড় বীর, সাইয়্যেদুশ শুহাদা হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত, পা, নাক-সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেলেছিল এই নারী। কলিজা কেটে চর্বণ করেছে। কী পরিমাণ ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ! ওই নারী যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণ করতে গেল, তখন নবিজি বললেন, 'তোমাকে এই শর্ত দিতে হবে যে, তুমি যিনা করতে পারবে না।' সেই নারী আশ্চর্য হয়ে গেল! বলল, 'কোনো স্বাধীন নারী তো যিনার কথা কল্পনাই করতে পারে না, আর আপনি এই শর্ত আমাকে দিচ্ছেন!'[৮২]
যেই নারী ইসলামের একজন বীরের কলিজা পর্যন্ত চিবিয়েছে, সে-ই বলছে, যিনার কথা সে কখনো কল্পনাও করতে পারে না। আর এখন যারা মুসলিম দাবিদার, যারা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করে, তার জীবন কতটুকু পূতপবিত্র, তার সন্তান, তার পরিবারের জীবন কতটুকু পূতপবিত্র-তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একজন মুশরিক নারীও যা কল্পনা করতে পারেনি-তাতে এখন মুসলিম নারী-পুরুষ অবাধে লিপ্ত। আজ তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
আরেকটা দিক নিয়ে ভাবুন, আজ সমাজে যত গুনাহ আছে, তার মূলে আছে মিউজিক। এই মিউজিকের উদ্ভব ঘটেছে বেপর্দা নারীর কারণে। যিনার এত প্রসারণ ঘটেছে কেন? উত্তর একটাই, সেটা হলো বেপর্দা নারী। সহশিক্ষা হোক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোক, যা-ই হোক, সবকিছুতে পুরুষের ঈমান হরণে প্রধান ভূমিকা রাখছে বেপর্দা নারী। এই বেহায়া-নির্লজ্জ নারীদের কারণে যুবক-বয়োবৃদ্ধ কারোর জীবনই রক্ষিত নেই। হুমায়ূন আহমেদের মতো দ্বীনহীন ব্যক্তির বিখ্যাত উক্তি আছে যে, এক নাতি জিজ্ঞেস করছে, তার দাদা কোথায়? তাকে উত্তর দেওয়া হলো, 'গার্লস স্কুল ছুটি দিয়েছে তো, তাই তোমার দাদা সেখানে বসে রয়েছে।' এই কথার মধ্যে কী বোঝা যায়? এটাই বোঝা যায় যে, এই উম্মতের মধ্যে যাকে আপনি বৃদ্ধ মনে করছেন, সেই বৃদ্ধের মাঝে শাহাওয়াত আছে। সে চোখের যিনা জারি রাখতে পারে, যদিও তার অন্যান্য কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।
এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ: شَيْخٌ زَانٍ، وَمَلِكُ كَذَّابٌ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرُ
'তিন ব্যক্তির সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না, তাদেরকে (গুনাহ থেকে) পবিত্র করবেন না।' রাবী আবূ মুআবিয়া এর বর্ণনায় আছে, নবিজি বলেছেন, 'তাদের প্রতি তাকাবেনও না। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (এরা হলো) যিনাকারী বৃদ্ধ, মিথ্যাবাদী বাদশাহ ও অহংকারী দরিদ্র ব্যক্তি।[৮৩]
আমার জীবনে এ বিষয়ের একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি যখন মালিবাগ পড়তাম, তখন আমার এক মামা ছিল আলিম। তো আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন বৃদ্ধ মানুষের পর্দার ব্যাপারে শরীয়ত এত শক্ত অবস্থানে কেন? তিনি উত্তর দিলেন, 'তুমি গ্রামে গিয়ে চায়ের দোকানগুলোতে একটু সময় দাঁড়াবে। দেখবে, সেখানে কারা কতক্ষণ বসে থাকে। তার একটা চার্ট বানাবে। কথামতো আমি একটা চার্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। পার্সেন্টিজ করে দেখতে পেলাম, অধিকাংশ বৃদ্ধরাই চায়ের দোকানে বসে থাকে। দোকানে একটা টিভি চলতে থাকে, আর সেখানে হরেকরকম আড্ডা-কথাবার্তায় মশগুল থাকে সবাই। একজন বৃদ্ধের যৌনশক্তি যদিও বয়সের সাথে রহিত হয়ে যায়, কিন্তু তার চোখের খাহেশ রহিত হয় না। সে ওই চোখের মাধ্যমে যিনায় লিপ্ত হয়। এজন্য পর্দা সবার করা দরকার। পর্দা না থাকার কারণে এই উম্মতের যুবকরা যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে, ঠিক একইভাবে বৃদ্ধরাও ধ্বংস হচ্ছে।
দুই টাকার পণ্য থেকে শুরু করে গাড়ি-বাড়ি, সংস্কৃতি, শিক্ষা-সবকিছুতে শয়তান বেপর্দা নারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কাপড় কিনতে গেলেও আজকাল অর্ধউলঙ্গ নারীর ছবি সামনে আসবে। আপনি দেখতে না চাইলেও আসবে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-সহ যেকোনো জায়গায় গেলে আপনার ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবখানেই শয়তান বেহায়া নারীর ফিতনা পুরুষের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছে। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-এই সব বেপর্দা নারী জান্নাতে যাবে না, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না; যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ হাজার হাজার বছরের দুরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে。
মুসল্লি, নামাজি কিংবা আল্লাহওয়ালা মানুষও আজকাল রাস্তায় গেলে ঈমান ঠিক রাখতে পারে না। বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ছাত্র তাউস (রহিমাহুল্লাহ) ও তাঁর বাবা একসাথে বসে মুযাকারা করছিল। তাউস রাদিয়াল্লাহু আনহু বিখ্যাত একজন তাবিয়ি। তিনি বলেন, 'আমি সবকিছু থেকে নিরাপদ বোধ করলেও, কোনো নারী আমার সামনে পড়ে গেলে তার থেকে নজর হেফাজত করব-এই ব্যাপারে নিরাপদ বোধ করি না।'
তাহলে বর্তমানে আপনার পীর সাহেব নিশ্চিত হবে কিভাবে? বেপর্দা নারী যদি বাইরে বের হয়, তাহলে পুরুষ ফিতনায় লিপ্ত হবে-এটা খুবই স্বাভাবিক।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মেয়ের জামাই, শ্রেষ্ঠ তাবিয়ি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর বয়স যখন ৮৪ বছর, তখন তিনি পেরেশান হয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, 'আমি সবচেয়ে বেশি ভয় করি নারীর ফিতনাকে। আমি ভয় পাই, এটা আমার ঈমানকে নষ্ট করেই ফেলে কি না!'
নারীর ফিতনার কারণগুলো এবং ফিতনার স্থানগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশ বছর আগেই আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা এর আগেও তা বর্ণনা করেছি। শুধুমাত্র সন্তানকে প্রতিপালন করলেই বাবা হওয়া যায় না। সন্তান জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। আল্লাহর কসম, যে বাবা তার মেয়েকে পর্দা করাতে পারে না, সে বাবা হওয়ার উপযুক্ত না। যে মা তার সন্তানকে শরীয়ত শেখাতে পারেনি, সে মা হওয়ার উপযুক্ত না।
টিকাঃ
[৮২] ওয়াকিদি, মাগাযী ২/৮৭১; তাবারি ৩/৬১-৬৩। বর্ণনাটি যঈফ।
[৮৩] মুসলিম, ১৯৭।
📄 আদর্শ মা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেছেন, 'তুমি যে বিয়ে করেছো, এই নারীর কী কী গুণ রয়েছে?'
তিনি উত্তর দিলেন, 'চারটা গুণ আছে তার মধ্যে। প্রথম হলো, সে আমার অধীনস্থ বোনদেরকে আদব শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয়ত, তাদেরকে দ্বীন ইসলাম শিক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, তাদেরকে পরিপাটি হওয়ার শিক্ষা দেয়-কিভাবে গোছগাছ হয়ে জীবনযাপন করা যায় তা শেখায়। চতুর্থত, তাদের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রাখে, শরীয়তের বাইরে চলার কোনো সুযোগ দেয় না। একজন মা যেভাবে তার মেয়ের ওপর কর্তৃত্ব রাখে, ঠিক তেমনই সে আমার ছোট বোনদের ওপর পুরোপুরি কর্তৃত্ব রাখে। [৮৪]
এই গুণগুলোই হলো মা হওয়ার জন্য উপযুক্ত। মা তো সে-ই হওয়ার উপযুক্ত, যে তার সন্তানকে শরীয়ত শিক্ষা দিতে পারে। পর্দা-পুশিদা শিক্ষা দিতে পারে। বাবা তো সে-ই, যে তার মেয়েদেরকে পর্দার বিধানের ওপর বড় করে তোলে। পর্দার ব্যাপারে যে তার পরিবারের লোকদেরকে একচুল পরিমাণও ছাড়া দেয় না।
আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।
আমরা উল্লেখযোগ্য গুনাহের দিকগুলো আলোচনা করলাম। আমরা আশাবাদী, একজন মানুষ যদি তার জবানকে সংরক্ষণ করে, নারীর ফিতনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে, পর্দাকে তার স্তর-সহ মেনে চলে, তাহলে সে অনেকটাই বেঁচে যাবে। তারপরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা গুনাহের পাহাড় বহন করে চলছি। দিন দিন গুণাহের পরিমাণ বাড়ছেই। তাই আমাদের সত্যিকারের সফলতা পেতে হলে, জান্নাতের বিষয়টি আরও নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই তাওবার বিষয়ে আমাদেরকে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। এজন্য আমরা তাওবার খুঁটিনাটি দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। এ জন্য পরবর্তী পর্ব থেকে শুরু হবে তাওবার পাঠ। একমাত্র তাওবা-ই দিতে পারে আমাদের সকল গুনাহ থেকে মুক্তির আশ্বাস। পারে আমাদের জীবনকে নবিদের জীবনের সাথে মেলাতে।
টিকাঃ
[৮৪] বুখারি: ১৯০১; মুসলিম: ৭১৫