📘 জান্নাতি জীবন 📄 প্রথম পয়েন্ট

📄 প্রথম পয়েন্ট


আমরা শুরু করব পবিত্র কুরআনের জান্নাতের ঘটনা থেকে, যখন ইবলিস আদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে ধোঁকা দিয়ে জান্নাত থেকে বের করে দেয়।
আদম ও হাওয়া আলাইহিমুস সালামকে ইবলিস জান্নাত থেকে বের করতে চেয়েছে। এমনকি সবশেষে জান্নাত থেকে বের করে ছেড়েছে। আমাদের কাছে এটা প্রসিদ্ধ ঘটনা। আল্লাহ তাআলা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এই ঘটনার কথা বলেছেন। পবিত্র কুরআনের রীতি হলো, যদি কোনো ঘটনা বারবার বয়ান করা হয়, তবে উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন তার জীবনে এই কথা সব সময় স্মরণ রাখে। মানুষ যেন ভুলে না যায়। এই ঘটনাগুলো জান্নাতের হলেও এগুলোর সাথে আমাদের জীবনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বারবার একই ঘটনা উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি যে, ইবলিসের উদ্দেশ্য ছিল আদম এবং হাওয়া আলাইহিমুস সালামকে নিষিদ্ধ গাছের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং ওই গাছের কোনো একটা অংশ ভক্ষণ করানো। কিন্তু কুরআন এটাকে মৌলিক উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করেনি। ইবলিসের এই গাছের কাছে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল; কিন্তু এটা মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সর্বোচ্চ বললে বলা যায়, এটা উদ্দেশ্যের অংশবিশেষ। মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল নারী-পুরুষকে একে অপরের সামনে নগ্নভাবে পেশ করা। আমরা যদি কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি দেখি এবং কুরআনের মূলপাঠ সামনে রাখি, তাহলে আমরা সহজেই কুরআন থেকে এ কথা স্পষ্ট আকারে পেয়ে যাব যে, শয়তানের আসল উদ্দেশ্য ছিল নারী-পুরুষ একে অপরের সামনে তাদের সতরকে খুলে দেওয়া। এবার আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে যা বলেছেন—তা একটু দেখে নিই :
فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا
'তারপর তাদের লজ্জাস্থান—যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল—তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিলো।[৭৩]
তরজমাটা একটু দেখলেই আপনি বুঝবেন যে, শয়তানের উদ্দেশ্য কী ছিল। তার উদ্দেশ্য শুধুই কি গাছের কাছে নিয়ে যাওয়া ছিল? না; বরং শয়তান আদম ও হাওয়া আলাইহিমুস সালামকে কুমন্ত্রণা দিয়ে ওই গাছের কাছে নিয়ে গিয়েছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কারণ শয়তান জানত, ওই গাছের কাছে গেলে তাদের গায়ের কাপড় থাকবে না। তাই শয়তানের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো : নারী-পুরুষের যে আবরণ বা পোশাক, তা খুলে ফেলা। আর শয়তান বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলার সাথে ওয়াদা করেছে— পুরো বনী আদমকে আমি তোমার কাছ থেকে সরিয়ে নেবো。
তাই আমরা বুঝলাম, আদমকে জান্নাত থেকে বের করা শয়তানের মৌলিক উদ্দেশ্যের একটা অংশ মাত্র। কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো বনী আদমকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরানো, আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত করা। আর এটা করতে হলে, নারী-পুরুষের যে পর্দা-পুশিদা—তা আরেকজনের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। নারী-পুরুষ যে সতর ঢেকে রেখেছে—তা আরেকজনের সামনে প্রকাশ করে দিতে হবে। এ আকর্ষণে পুরো বনী আদমকে আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব। এটাই ছিল শয়তানের লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই বর্তমানে সে পুরো বনী আদমকে আল্লাহর কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কারণ জান্নাত থেকে তো বের করা হয়েছে শুধু আদম ও হাওয়া আলাইহিমুস সালামকে। আর পরবর্তী বনী আদমকে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে, জান্নাতের কাছ থেকে দূরে সরানোর সবচেয়ে বড় কার্যকরী পদ্ধতি এটাই।

টিকাঃ
[৭৩] সূরা আল-আরাফ, ৭ : ২০।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 দ্বিতীয় পয়েন্ট

📄 দ্বিতীয় পয়েন্ট


নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সাবধান করেছেন,
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِي النَّاسِ فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
'আমার (ইন্তেকালের) পরে আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য নারী অপেক্ষা অধিক ফিতনার শঙ্কা আর কিছুতেই রেখে যাইনি।'[৭৪]
অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সব থেকে বেশি আশঙ্কা করি নারীর ফিতনা, বেপর্দা নারীর ফিতনা, বেহায়া নারীর ফিতনা। এটা উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় ফিতনা। দুনিয়াতে শিরক, কুফর, দাজ্জালী ফিতনা-সহ যত প্রকার ফিতনা আছে-সকল ফিতনা থেকে ক্ষতিকর হচ্ছে বেপর্দা নারীদের ফিতনা।
যাদের ঈমানের ব্যাপারে সামান্য ভয় আছে, তারা জানে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা কতটা সত্য। বর্তমানে একজন ঈমানদার যুবক সব ধরনের ফিতনা থেকে বাঁচতে পারলেও বেপর্দা নারীর ফিতনা থেকে সে না ঘরের মাঝে নিরাপদ, না বাহিরে নিরাপদ, না প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ। তার পুরো জীবন জুড়ে নারীর ফিতনা। নারীর ফিতনা চতুর্দিক থেকে তাকে বেষ্টন করে নিয়ে নিতে চাচ্ছে।

টিকাঃ
[৭৪] মুসলিম: ২৭৪১।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 তৃতীয় পয়েন্ট

📄 তৃতীয় পয়েন্ট


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم : اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ وَأَحْسِنْ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا وَلَا تُكْثِرُ الضَّحِكَ فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় আবিদ (ইবাদতকারী) হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন- তাতেই পরিতুষ্ট থাকো, তবে তুমিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী হবে। প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ করো, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুমিন বিবেচিত হবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ করো-যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করো, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম গণ্য হবে। আর খুব বেশি হাসবে না; কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে।' [৭৫]
আপনি যদি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হতে চান, তাহলে আপনার কাজ হলো: আপনি অবৈধ কাজ ছেড়ে দিন। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার বান্দা হলো, যে হারাম ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে ঘোষণা দিলেন যে, সবচেয়ে বড় আবিদ হলো-যে ব্যক্তি হারামকে ত্যাগ করে। এর অর্থ হলো, এটা সবচেয়ে বড় ইবাদত। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত-এসবও ইবাদত। কিন্তু এরচেয়েও বড় ইবাদত হচ্ছে হারামকে ছেড়ে দেওয়া। সবচেয়ে বড় আবিদ হতে হলে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত আদায়ের পাশাপাশি হারাম ছেড়ে দেওয়া, হারাম থেকে দূরে থাকা ও হারামকে ভয় করা উচিত। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় হওয়ার যে স্তর রাখা হয়েছে-তা হলো, হারাম বর্জন করা।
তাহলে আমরা তিনটি পয়েন্ট পেলাম।
* প্রথমটা হচ্ছে ইবলিস জান্নাত থেকে বনী আদমকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনার মাঝে এ পরিকল্পনাও ছিল যে, পুরো বনী আদমকে জান্নাতে যেতে না দেওয়া। সেজন্য সে অবলম্বন হিসেবে নিয়েছে নারী-পুরুষ একে অপরের সামনে সতর মুক্ত থাকবে, পোশাক মুক্ত থাকবে।
* দ্বিতীয়টা হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নারীদের ফিতনা থেকে সাবধান করেছেন। নারীদের ফিতনাকে সবচেয়ে বড় ফিতনা বলেছেন।
* তৃতীয় পয়েন্ট হচ্ছে, আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় হতে হলে সকল প্রকার হারাম বর্জন করতে হবে。

টিকাঃ
[৭৫] মুসনাদে আহমাদ: ৮০৯৫; তিরিমিজি: ২৩০৫; সহিহুল জামে ৪৫৮০, ৭৮৩৩; সহিহ হাদীস।

📘 জান্নাতি জীবন 📄 বর্তমান জমানার হালচাল

📄 বর্তমান জমানার হালচাল


বর্তমান সমাজে নামাজি পাওয়া যায় বটে। কিন্তু তারা টিভিও দেখে, বেপর্দাও হয়, আবার বিভিন্ন হারামেও লিপ্ত থাকে। সারা বছর রোজা রাখে, সারা দিন ইবাদতে কাটায়, অথচ তার অবৈধ সম্পর্কও থাকে। এমন বান্দা আল্লাহ চাননি। শরীয়ত মানহিয়্যাত (অর্থাৎ নিষিদ্ধ জিনিসকে বর্জন করা)-কে সবার আগে স্থান দিয়েছে। হারামকে বর্জন করা শরীয়তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন বড় বড় নামাজি পাওয়া যায়, অথচ সে টিভি দেখে, টাচস্ক্রিন মোবাইলের ফিতনায় সে আক্রান্ত, বিভিন্নভাবে নারীর ফিতনায় সে আক্রান্ত। শরীয়ত কিন্তু এটা চায়নি। শরীয়ত চেয়েছে-আগে হারামকে ছাড়তে হবে, হারাম জিনিস বর্জন করতে হবে। একজন মানুষ যতই ইবাদত করুক, সে যদি গুনাহ থেকে না বাঁচে, হারাম বর্জন না করে, অবৈধ জিনিস থেকে দূরে না থাকে, সে কখনো আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারবে না। অবৈধ জিনিসগুলোতে যুক্ত থেকে, হারাম রুটিরুজি খেয়ে একজন মানুষ যতই ইবাদত করুক, তার ইবাদত কবুল হবে না। কারণ এই গুনাহগুলো তার শরীরে নাপাকের মতো লেপ্টে রয়েছে। সেজন্য শরীয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হারাম বর্জন করা। আমরা এখন হারামের মৌলিক কাজগুলো ব্যাখ্যা করব। যাতে আমাদের বুঝতে সুবিধা হয় যে, হারামের সাথে বেপর্দার কতটা সম্পর্ক রয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'অচিরেই আমার উম্মতে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা অত্যাধুনিক বাহনে আরোহন করে মসজিদে যাবে, কিন্তু তাদের স্ত্রীরা হবে অর্ধউলঙ্গ, তাদের মাথাগুলো হবে বৃদ্ধ উটের কুঁজের ন্যায়। তোমরা এই মহিলাদেরকে অভিশাপ দাও কেননা তারা অভিশপ্ত। তোমাদের পরে যদি আর কোন জাতি আসতো, তাহলে নারীরা তাদের খেদমত করতো। যেমন তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের নারীরা খেদমত করেছে।[৭৬]'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'এদেরকে তোমরা লানত করো। তারা লানতের উপযুক্ত।'[৭৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, 'আমার পরে এমন এক জাতি আসবে, যাদের খিদমত করবে নারীরা। যেমন বনী ইসরাইলের নারীরা আযনবিদের খিদমত করে ধ্বংস হয়েছে, এরাও ঠিক এভাবেই ধ্বংস হবে।[৭৮]
আজকাল বিমান, হাসপাতাল-সব জায়গায় নারীরা পাবলিকের খিদমত করছে; অথচ তারা তাদের স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করাকে লজ্জার বিষয় মনে করে। গাইরে মাহরাম পুরুষের খিদমতে এসব নারীরা নিজেদেরকে বিলীন করে দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিনজন লোককে আল্লাহ তাআলা কোনো সওয়াল ছাড়াই বিনা হিসাবে জাহান্নামে পাঠাবেন। একদল লোক হচ্ছে, মুসলিমদের জামাআত আছে, খলিফা আছে, কিন্তু যারা এ সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। এসব মানুষকে আল্লাহ বিনা হিসাবে জাহান্নামে পাঠাবেন। আরেকদল হলো দাস-দাসী ছিল, কিন্তু মালিকের নিকট হতে পলায়ন করেছে। তৃতীয় দল হলো, ওই নারী—যে তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে সাজসজ্জা করে ঘরের বাইরে যায় অন্য পুরুষদেরকে দেখানোর জন্য। এসব নারীদেরকে বিনা হিসাবে জাহান্নামে প্রেরণ করা হবে।
অপর একটি হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءُ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلاَتٌ مَائِلَاتٌ رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا .
‘দুই প্রকার জাহান্নামবাসী, আমি যাদেরকে (এ পর্যন্ত) দেখিনি। এক প্রকার মানুষ, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, তা দ্বারা তারা লোকজনকে মারবে এবং এক দল স্ত্রী লোক, যারা কাপড় পরিহিতা উলঙ্গ, যারা অন্যদের আকর্ষণ করে ও নিজেও আকৃষ্ট হয়। তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। ওরা জান্নাতে যেতে পারবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না। অথচ এত এত দূর হতে তার সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।[৭৯]
এবার আমরা মৌলিক আলোচনায় আসি। আমরা প্রথমেই জেনেছিলাম যে, পুরো বনী আদমকে জান্নাত থেকে বের করার প্রথম পদ্ধতি হিসেবে ইবলিস বেছে নিয়েছিল বেপর্দাকে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন—আমার উম্মতের জন্য সবচেয়ে বেশি আমি আশঙ্কা করি যে, তারা দ্বীন ও ঈমান থেকে সরে গিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে নারীর কারণে। বেহায়া-বেপর্দা নারীর কারণে। সেই নারী—যারা বেপর্দায় চলবে, আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করবে। তাদের কারণে পুরুষরা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে। এই নারীরা পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে—এসব নারীরা জান্নাতে তো যাবেই না, জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না; যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ হাজার হাজার বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।
আমরা বর্তমানে যারা যত গুনাহে লিপ্ত, এই গুনাহে লিপ্ত হওয়ার মৌলিক কারণ কি শিরক-কুফর? নাকি এরচেয়ে বড় কারণ হলো নারী? এই বিষয়টা সামনে আসা দরকার। আল্লাহ তাআলা যাদেরকে পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে অনেকগুলো অঙ্গ প্রদান করেছেন। এককথায় দেহ ও মন প্রদান করেছেন। পুরুষের এই দেহ ও মন যিনায় লিপ্ত হবে। কিভাবে হবে, তাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে বর্ণনা করেছেন।
'আদম সন্তানের জন্য তাকদীরে যিনার অংশ যতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছে, সে ততটুকু অবশ্যই পাবে। দুই চোখের যিনা তাকানো, কানের যিনা যৌন-উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের যিনা আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের যিনা (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশ্যে) স্পর্শ করা, আর পায়ের যিনা ব্যভিচারের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া এবং মনের যিনা হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা। অতঃপর গুপ্তাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।[৮০]
প্রত্যেক পুরুষ তার দেহ-মনকে হারিয়ে ফেলেছে-অন্য নারীদের দিকে অসংযত দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে। টাচস্ক্রিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে অশ্লীল ভিডিও দেখার মাধ্যমে তার চোখ নাপাক হয়ে যাচ্ছে। নাটক, সিনেমা, থিয়েটার, টেলিফিল্ম, খবর-সহ সবকিছুতে আঁটসাঁট পোশাক পরা নারী অথবা পোশাকহীন নারীরা থাকে। যার ফলে একজন পুরুষ চাইলেও তার নজর হেফাজত করতে পারবে না। এই উম্মতের প্রত্যেক সদস্যকে এই বেহায়া নারীরা পথভ্রষ্ট করছে। এই উম্মতের চোখ, জবান, হাত, পা, দিল নিঃশেষ হচ্ছে এই যিনার কারণে। আর একবার যার দিলে যিনা প্রবেশ করেছে, সেই দিলে ঈমান আসবে কোত্থেকে! যে উম্মতের জবান যিনায় লিপ্ত, কিভাবে সেই জবান দিয়ে সে আল্লাহকে ডাকবে? তার নামাজে মনোযোগ নেই, যিকির করতে ভালো লাগে না, দ্বীনের কাজ তার জন্য কষ্টকর হয়। এই কষ্টকর হওয়ার মৌলিক কারণ হলো-শয়তান নারীর পোশাককে পুরুষের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
একটু ভালোভাবে চিন্তা করুন। আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছে কার্টুন দেখে। এসব কার্টুনের ভেতরে নারীদেরকে প্রদর্শন করা হচ্ছে। আর কার্টুনে পোশাকের যে অবস্থা-তাও হাদীসের ভাষ্যের সাথে মিল রয়েছে। কার্টুনে হয়তো আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা নারী, নয়তো উলঙ্গ নারী। এটা শয়তানের পরিকল্পনা। শয়তান এই পরিকল্পনা করে রেখেছে আমাদের জন্মেরও আগে থেকেই। শয়তান নারী-পুরুষের এই পর্দাকে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে আমাদের চোখ, কান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাপাকীর দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আপনি যেকোনো জায়গায় যাবেন, দেখবেন যে, তাও নাপাক করে দেওয়া হয়েছে এই পর্দাকে সরিয়ে ফেলে। মুসলিমদের সংস্কৃতি বলতে কিছু বাকি রাখেনি। মুসলিমদের বিবাহগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। মুসলিমদের পরিবারগুলো শেষ করে দিয়েছে। মুসলিম মেয়েরা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের জীবন বরবাদ করে দেওয়া হয়েছে। আর সবার বরবাদ হওয়ার পেছনে একটি মৌলিক কারণ হলো বেপর্দা 'নারী'। নিউজের মাধ্যমে এই নারীরা সামনে আসছে, নয়তো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আসছে। যেখানেই যান না কেন, আপনার চোখ নাপাক করতে হবে, জবান নাপাক করতে হবে। সব নাপাকের পেছনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারণ বলে দিয়েছেন, এইসব আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা নারী। রাসূল বলেছেন,
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلَّهِ، يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ
'সাত ধরনের মানুষকে আল্লাহ তাআলা সেদিন (কিয়ামতের দিন) তাঁর ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবে না।[৮১]
অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন সাত প্রকার ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিচে ছায়া দেবেন। তার মধ্যে ওই মুসলিম যুবকও থাকবে—যে তার জীবনকে আল্লাহর হুকুমের অনুগামী করেছে। আল্লাহ তাকে আরশের নিচে ছায়া দান করবেন।
একটা ছেলে যখন বালেগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে পৌঁছায়, তখন শয়তান তাকে খারাপ স্বপ্ন দেখায়। সে বান্ধবীর খোঁজ করে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করে নিচ্ছে স্মার্ট ফোন। আর মোবাইল নিয়ে যাচ্ছেতাই নাটক-সিনেমায় মশগুল হয়ে যাচ্ছে। যে ছেলে তার জীবনকে উৎসর্গ করত আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে, সে শয়তানের ফাঁদে পড়ে নারীর প্রেমে পাগল হয়ে যায়। ফেসবুক, নারী, বান্ধবী, খেলাধুলা—এসবে সে মজে যায়। অথচ তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব অন্যায়ের মূলোৎপাটন করা। প্রয়োজনে এসব অন্যায়কে মূলোৎপাটন করতে গিয়ে তার জীবনকে উৎসর্গ করা। কিন্তু শয়তান তা ভুলিয়ে দিয়েছে। সে জানেও না, শয়তান তার জীবনকে কোথায় নিয়ে গেছে। এই উম্মতের জীবন থেকে দ্বীন শেষ হয়ে গেছে। যে উম্মতের যুবকদের কাছে মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষিত থাকার কথা, ওই উম্মতের শিক্ষিত নামধারী যুবকরাই সবচেয়ে বেশি নারীদের ইজ্জত হরণ করছে। কারণ এদের জীবনটা শুরুই হয়েছে সুড়সুড়িমূলক নাটক-সিনেমার মধ্য দিয়ে। আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে যুবকেরা এখন নারীর ফিতনায় জড়িয়ে গেছে। আপনিই বলুন, এই যুবকের কাছ থেকে কী করে সমাজ ভালো কিছু আশা করতে পারে? উলটো সমাজ তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে যত ধরনের গুনাহ আছে, এর অধিকাংশই বেপর্দার সাথে সংশ্লিষ্ট। বেপর্দা একজন মানুষের ভেতরে নিফাকের বীজ বপন করে, ঈমানকে সরিয়ে দেয়, আল্লাহর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একজন মানুষের অন্তরের সবচেয়ে বড় তামান্না হলো, সে তার জীবন-মরণ-সবকিছু আল্লাহর জন্য সঁপে দেবে। কিন্তু এই ফিতনায় থাকা যুবক প্রতিনিয়ত পরনারীর মাধ্যমে জ্ঞান শিখছে, বেপর্দায় থাকা নারীর সাথে চলাফেরা করছে। তার চাওয়া-পাওয়া সব নারীকে ঘিরে।

টিকাঃ
[৭৬] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৭] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৮] ইবনে হাজম: ৫৭৫৩; হাসান
[৭৯] মুসলিম, ৬৯৩০।
[৮০] মুসলিম, ২৬৫৭।
[৮১] বুখারি: ৬৬০; মুসলিম: ১০৩১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px