📄 দ্বিতীয় স্তরের আলোচনা
এখন আসি পর্দার দ্বিতীয় স্তরে। শুধুমাত্র মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে নারীর জন্য বাহিরে যাওয়ার অনুমতি শরীয়তে আছে, তবে বিভিন্ন শর্ত- সাপেক্ষে। মৌলিক প্রয়োজন মূলত দুইটি: ১. দ্বীনি প্রয়োজন, ২. দুনিয়াবি প্রয়োজন। সংক্ষেপে বললে একটি হলো-যদি ঘরে দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে, তবে যেখানে পরিপূর্ণ শরীয়তের তরিকা মোতাবেক সঠিক পদ্ধতিতে দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা আছে, সেখানে গিয়ে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা। দ্বিতীয়টি হলো হাওয়ায়েজ বা জরুরত পূরণ করা।
যেসব নারীরা ঘরের বাহিরে কাজ করতে যায়, তাদের ব্যাপারে আমরা আলোচনা করব। তবে এর আগে আলোচনা করব, কখন সে ঘরের বাহিরে উপার্জনের জন্য শর্ত-সহ যেতে পারবে।
তখনই একজন মুসলিম রমণী ঘরের বাহিরে কাজ করতে যেতে পারবে, যখন তাকে ভরণপোষণ দেওয়ার মতো তার বাবা, স্বামী অথবা অন্য কোনো অভিভাবকই নেই। পিত্রালয়ের পরে একজন নারীর ভরণ-পোষণের জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হলো তার বিবাহ। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পরেও এটাই ভরণ-পোষণের সর্বোত্তম ব্যবস্থা। কারণ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, একটা মেয়ে বিধবা হওয়ার পর অথবা তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার পিত্রালয় আর তার কাছে আগের মতো আপন থাকে না। আপনি বলতে পারেন, 'কেন?'
এর সহজ উত্তর হলো, বাবা ও ভাইদের আচার-আচরণে তখন আর আন্তরিকতা অনুভূত হয় না। যে ঘরে এক সময় মেয়েকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হতো, সে ঘরে মেয়ে আর আগের মতো ইজ্জত পায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে বোঝা মনে করা হয়। আবার কখনো কাজের মেয়ের মতো আচরণ করা হয়। এখন সমাজের ঈমানদার পুরুষদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে বিবাহ করার জন্য এগিয়ে আসা। আমি-আপনি বা আমার-আপনার ছেলেরা যদি বিবাহের সময় সেই বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে বিবাহ না করি, তবে এই নারীদের ভরণপোষণের সুব্যবস্থা কিভাবে হবে?
যে নারীর স্বামী নেই, সে নারীই একমাত্র বুঝে, সে কতটা অসহায়। যেসব সন্তানের বাবা মারা যায়, সেসব সন্তানেরাই শুধু টের পায় তাদের নিজেদের অসহায়ত্ব।
আবার বর্তমানে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাও নেই। এখন যদি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকত, তাহলে অসহায় নারীদের ভরণপোষণের কোনো পেরেশানি থাকত না। কারণ তখন তাদের চলার মতো কোনো অবস্থা না থাকলে খলিফাতুল মুসলিমীনের জিম্মাদারি হয়ে যেত এমন নারীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে। কিন্তু আফসোস ও পরিতাপের বিষয়, এখন তো খলিফাতুল মুসলিমীন নেই। আর, খলিফাতুল মুসলিমীন না থাকলে অসহায়, বিধবা ও এতিম নারীদের লালন-পালনের জিম্মাদার প্রত্যেক মুসলিমের ওপর। যাতে কোনো অসহায় নারী ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যুবরণ না করে।
অতএব, যদি কোনো অসহায় নারীর বিয়ে না হয়, তাহলে ওই সমাজের সবাই মিলে তার ভরণ-পোষণের যথাযথ ব্যবস্থা করবে। আপনারা কখনোই এ জিম্মাদারিকে নামাজ আদায় করার চেয়ে ছোট ফরজ মনে করবেন না। বরং এটি হাক্কুল ইবাদ। হাক্কুল ইবাদ তথা বান্দার হকের হিসাব-নিকাশ নামাজের হিসাব-নিকাশের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক হবে। এটাই শরীয়ত। আর, এই শরীয়তের অনুপস্থিতি তথা খলিফাতুল মুসলিমীনের অনুপস্থিতির কারণেই আজকে আমাদের এসব মা-বোনেরা অবহেলিত, নিষ্পেষিত। শরীয়ত এ ব্যবস্থাই রাখেনি যে, একজন নারী না খেয়ে মারা যাবে কিংবা নারীকে অর্থ উপার্জনের জন্য ঘর ছেড়ে বাইরে বের হতে হবে। এখন যদি এমন হয় যে, কোনো নারীর অভিভাবকও নেই, সমাজও দেখাশোনা করে না, খলিফাতুল মুসলিমীনও নেই যে, সে নারীর দায়িত্ব নেবে। কিংবা ঘরে থেকে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজেও আঞ্জাম দিতে সে জানে না-এমন নারীকে একান্ত বাধ্য হয়ে শারঈ পর্দার সাথে যদি কোথাও কাজ করতে যেতে হয়, তবে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত কিছু শর্ত সাপেক্ষে যাওয়ার অনুমতি শরীয়ত দিয়েছে।
প্রথম শর্ত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, আপনার কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের জিলবাবের কিছু অংশ নিজেদের (মাথার ওপর থেকে শুরু করে পুরো শরীরের) ওপর নামিয়ে দেয়। এ পন্থায় তাদেরকে চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা কিংবা কষ্ট দেওয়া হবে না। আর, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[৬৪]
লক্ষ করুন, আল্লাহ তাআলা পর্দার বিধান শুরু করছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি ও কন্যাদেরকে দিয়ে।
এখন আমরা দেখি যে, সাহাবায়ে কেরام উক্ত আয়াতকে কিভাবে উপলব্ধি করেছেন। সাহাবাদের (রিদওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন) মধ্যে পবিত্র কুরআন সবচেয়ে বেশি যারা বুঝতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন রঈসুল মুফাসসিরীন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস। তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
أمر الله نساء المؤمنين إذا خرجن من بيوتهن في حاجة أن يغطين وجوههن . من فوق رءوسهن بالجلابيب ويبدين عينا واحدة
'নারীরা যদি একান্ত জরুরতে ঘরের বাইরে যায়, তবে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন একটা বাড়তি বড় চাদর ব্যবহার করে-যা দিয়ে তারা তাদের মাথার ওপর থেকে শুরু করে চেহারা-সহ সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেবে। আর যদি এভাবে চলাচল করতে বেশি কষ্ট হয়, তবে শুধু এক চোখ বের করবে।[৬৫]
হাসান বসরি, আতা-সহ অনেক তাবেঈগণ উক্ত বিষয়টি একদম হাতে-কলমে শিখিয়ে গিয়েছেন।
উম্মু সালামা থেকে সহিহ বর্ণনায় এসেছে,
خرج نساء الأنصار كأن على رؤوسهن الغربان من الأكسية
'যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো, তখন থেকে আনসারি নারীগণ তাদের মাথায় এমন চাদর জড়িয়ে বের হতেন, (চাদর কালো বর্ণের হওয়ায়) মনে হতো তাতে যেন কাক বসে আছে। [৬৬]
সুতরাং, সারসংক্ষেপ দাঁড়ায় এই যে, নারীরা যদি একান্ত জরুরতে বাইরে বের হয়, তবে-
* নিজেকে সম্পূর্ণ কালো কাপড়ে আবৃত করে জিলবাবের কিছু অংশ মাথা থেকে শুরু করে মুখ-সহ নিজের সম্মুখ ভাগে টেনে দেবে।
* বাইরে চলার সময় অত্যন্ত ধীরে-সুস্থে চলবে।
আবু দাউদের বর্ণনামতে, এক মায়ের ছেলে জিহাদ-ফি-সাবিলিল্লাহ-তে শহীদ হয়ে গিয়েছে। তো ছেলের খোঁজ নিতে মা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল-উনার ছেলে জান্নাতি, নাকি জাহান্নামি। মহিলা পুরোপুরি শারঈ পর্দার হক আদায় করে এসেছে দেখে একজন সাহাবি বিস্ময়ে বলেই বসলেন, 'এত পেরেশানির মুহূর্তেও আপনি কিভাবে পর্দা ঠিক রেখে আসলেন?' তখন মহিলা উত্তরে বললেন,
إِنْ أُرْزَأَ ابْنِي فَلَنْ أُرْزَأَ حَيَائِي
'আমি আমার ছেলে হারিয়েছি, কিন্তু লজ্জা তো হারাইনি।'
আমাদের নারীদেরকে এমনই হতে হবে। কারণ, মাতৃগর্ভ যদি নাপাক হয়, সেখান থেকে সাহাবাদের মতো নেককার সন্তান কখনো হবে না। যা-ই হোক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই মহিলাকে উত্তর দিলেন-
ابْنُكِ لَهُ أَجْرُ شَهِيدَيْنِ
'তোমার সন্তান দুজন শহীদের সমপরিমাণ বদলা পেয়েছে।'
এত বড় সুসংবাদ শুনেও মহিলা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্থিরচিত্তে জানতে চাইল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এত বড় মর্যাদার কারণ কী?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন,
لِأَنَّهُ قَتَلَهُ أَهْلُ الْكِتَابِ
'কারণ, আহলে কিতাব তোমার ছেলেকে শহীদ করেছে।[৬৭]
আহলে কিতাব শহীদ করলে দ্বিগুণ সওয়াব। কারণ, আহলে কিতাবগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য নবি হিসেবে জানে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে শেষনবি হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা বর্ণিত আছে। এ ছাড়া মিরাজের রাত্রিতে বাইতুল মাকদিসে সমস্ত নবি-রাসূলগণের নামাজের ইমামতি করেছেন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যার অর্থ এই যে, সমস্ত নবি-রাসূলগণ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
হজের বিধান অনুযায়ী নারীদের জন্য জরুরি হলো জিলবাবের সামনের অংশের কাপড় মুখের ওপর লাগানো যাবে না; নিষেধ। তো, বিদায় হজের সময়ে অনেক জায়গা থেকে অনেক মানুষ, লাখ লাখ সাহাবা এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে প্রথম হজ করতে। সে সময় আম্মাজান আয়িশা -ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হজের সফরে ছিলেন ইহরাম অবস্থায়। বিভিন্ন কাফেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, কাছে আসত; আর উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের প্রত্যেকেই তখন জিলবাবের অতিরিক্ত কাপড় মুখের ওপর নামিয়ে দিতেন। হজের সময় চেহারার ওপর কাপড় লাগানো যায় না; তাই তাঁরা চেহারার সামনে কাঠি ব্যবহার করে চেহারার ওপর নিকাব টেনে দিতেন। আর, কাফেলা দূরে চলে গেলে তাঁরা মুখের ওপরের কাপড় আবার সরিয়ে নিতেন। আলহামদুলিল্লাহ! বর্তমানেও কিছু মহীয়সী নেককার নারীগণ এ আমল করার জন্য মাথায় ক্যাপ পড়েন। ক্যাপের ওপর দিয়ে জিলবাবের কাপড় মুখের ওপর নামিয়ে দেন- যাতে করে নিজেদের মুখ পর্দায় আবৃত থাকে, আবার হজের নিষেধাজ্ঞাও পুরোপুরি বহাল থাকে। এভাবেই, খুব মহব্বতের সাথে আল্লাহ তাআলার বিধান মানতে হয়।
দ্বিতীয় শর্ত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আরও বলেন,
وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ
'আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। [৬৮]
আয়াতের ব্যাখ্যা তাফসির ইবনু কাসির ও তাফসিরে তাবারী-সহ বহু কিতাবে মুফাসসিরগণ সাহাবা ও তাবেঈদের থেকে উল্লেখ করেছেন।
আরবের জাহিলি যুগের মুশরিক নারীরা নুপুর ব্যবহার করত। তারা এমন নুপুর বানাত, যাতে কোনো রকম আওয়াজই হয় না। কারণ, নুপুরের আওয়াজে পুরুষরা আকর্ষিত হতে পারে। আর অন্য পুরুষেরা আকর্ষিত হবে—ব্যাপারটা মক্কার মুশরিকর স্বামীরাও সহ্য করতে পারত না। তো মুশরিক নারীরা শব্দবিহীন নুপুর ঠিকই পড়ত; কিন্তু চলার সময় তাদের পা দিয়ে ভূমিতে সজোরে আঘাত করত নিজেকে প্রকাশ করার জন্য। এজন্যই আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন—যাতে মুমিন নারীগণ একান্ত মৌলিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে, জাহিলি যুগের নারীদের মতো ভূমিতে সজোরে আঘাত করে না চলে; নারীর যে সৌন্দর্য—সেটা যেন প্রকাশিত না করা হয়।
ইবনু কাসির -এর মতে, নারীদের যেসব আওয়াজ বা চলনভঙ্গি দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হতে পারে, সেসবের কোনো কিছু করা যাবে না। পর্দার জন্য এমন কোনো বোরকাও পড়া যাবে না—যার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। যেমন, যে ধরনের চুড়ি পড়লে আওয়াজ হয়, সে ধরনের চুড়ি পড়ে বাইরে বের হওয়া নারীদের নিষেধ। যেসব জুতা পড়ে হাঁটলে শব্দ হয়, সেসব জুতা পড়ে বাইরে বের হওয়া যাবে না। কারণ, নারীদের দ্বারা শয়তান পুরুষকে ফিতনাগ্রস্ত করে—যার ফলে পুরুষদের অন্তর নাপাক হয়।
তৃতীয় শর্ত
এরপর যে শর্ত—তা হলো, কোনো ধরনের সুগন্ধি (আতর, পারফিউম, বডি স্প্রে ইত্যাদি) ব্যবহার করে নারীরা বাইরে যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিজি থেকে সহিহ রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كُلُّ عَيْنٍ زَانِيَةٌ، وَالمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا
‘প্রতিটি চোখের (নারী কিংবা পুরুষ) ক্ষমতা আছে যিনা করার। যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো পুরুষদের মজলিসের পাশ দিয়ে যায়, সে ব্যভিচারিণী।[৬৯]
কারণ, কোনো নারী যখন সুগন্ধি ব্যবহার করে, তার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। তা ছাড়া, পুরুষের আকর্ষণ তো মেয়েদের নামের ভেতরেও আছে। মেয়েদের নাম শুনলেও পুরুষের মনের অনুভূতি একটু অন্যরকম হয়ে যায়।
চতুর্থ শর্ত
জরুরতে বাইরে বের হওয়ার সর্বশেষ যে শর্ত-তা হলো, বাইরে চলার সময় নিজেকে আড়াল করে একপাশে চলবে। এটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ যে, কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষের পাশ দিয়ে বা মাঝখান দিয়ে চলবে না; একদম এক পাশে চলবে।
সুনানে আবু দাউদ এ, মাইমুনা থেকে বর্ণিত হাদীসে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই নির্দেশ শোনার পর তখনকার সময়ের নারীগণ এমনভাবে রাস্তার এক পাশে চলতেন যে, তাদের কাপড়ের সাথে রাস্তার দেয়াল ঘষা লাগত। এরপর, তিরিমিজির বর্ণনায় হাদীসের নির্দেশ হলো-কোনো পরনারীর সাথে কোনো পরপুরুষ আলাদা বসবে না। [৭০]
তাহলে, ওপরোক্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় যে, মুমিন নারীগণ সর্বদা তার নিজের অবস্থান ঘরের ভেতর রাখবে-এটাই আল্লাহর হুকুম ও পর্দার সর্বপ্রথম স্তর। তবে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একান্তই অপারগ হলে, শরীয়তে নারীদের জন্য বাইরে বের হওয়ার অনুমতি আছে কিছু শর্ত-শারায়েত সাপেক্ষে। শর্তগুলো হলো:
* নিজেকে পরিপূর্ণ পর্দায় আবৃত করে বের হতে হবে, শারঈ পর্দার হক আদায় করে বের হতে হবে।
* এমনভাবে হাঁটবে না বা চলবে না-যার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। ধীরে-সুস্থে চলবে।
* এমন পোশাক কিংবা অলংকার পরিধান করবে না-যার দ্বারা নারীদের সৌন্দর্য প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
* কোনো ধরনের সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করে বের হওয়া যাবে না।
* নিজেকে আড়াল করে, পুরুষদের থেকে দূরে, রাস্তার একপাশে চলবে।
* কোথাও বসলে বা অবস্থান করলে খেয়াল রাখতে হবে, যেন গাইরে মাহরাম কোনো পুরুষ আলাদা বা একাকী তার সাথে না বসে।
টিকাঃ
[৬৪] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৯।
[৬৫] তাফসীরুত তবারি, ২০/৩২৪।
[৬৬] আবু দাউদ: ৪১০১।
[৬৭] আবু দাউদ: ২৪৮৮
[৬৮] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
[৬৯] সহীহুল জামে, হা/৪৫৪০; শাইখ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহিহ বলেছেন।
[৭০] তিরমিজি, ১১৭১।
📄 তৃতীয় স্তরের আলোচনা
এখন কোনো নারী ঘর থেকে সব শর্ত পালন করে বের হওয়ার পরেও চলার পথে অবশ্যই তাকে নজর হেফাজত করে চলতে হবে। যেভাবে প্রত্যেক পুরুষকে নজর হেফাজত করে চলতে হয়—এমনকি বোরকাওয়ালি থেকেও নজর হেফাজত করে চলতে হয়। এরপরে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো লক্ষ করুন।
১. قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
'মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।[৭১]
২. وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'এবং মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে; যা আপনা-আপনিই প্রকাশ পায়, তা ছাড়া। এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয় এবং নিজেদের ভূষণ যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনেয়, আপন নারীগণ, যারা নিজ মালিকানাধীন, যৌনকামনা নেই এমন পুরুষ খিদমতগার এবং নারীদের গোপনীয় অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া আর কারও সামনে প্রকাশ না করে। মুসলিম নারীদের উচিত ভূমিতে এভাবে পদক্ষেপ না করা, যাতে তাদের গুপ্তসাজ জানা হয়ে যায়। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো।[৭২]
অতএব, আমরা বুঝতে পারলাম যে, পর্দা কোনো বোরকার নাম নয়; বরং পর্দা একটি জীবনব্যবস্থার নাম। এটি শরীয়তের এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ বিধান-যা মান্য করা নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্তব্য। এই ফারায়েজের সাথে আমাদের মা-বোনদের সব ধরনের ইজ্জত লুক্কায়িত। সেইসাথে পুরুষদের জন্য সকল ফিতনা থেকে মাহফুয থাকাও এর ওপর নির্ভর করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। আল্লাহর শান অনুযায়ী পর্দার আজমত রক্ষা করে চলার তাওফীক দান করুন। আমিন।
ইতিপূর্বে আমরা পর্দার যে আলোচনা করেছি-সেটা যদি কোনো মুসলিম পুরুষ অথবা রমণী পূর্ণভাবে আদায় করে, তাহলে সে জান্নাতের কত কাছাকাছি চলে যাবে। সেটা প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও রমণী সহজে উপলব্ধি করতে পারবে। এক কথায়, পর্দা বাঁচলে ঈমান-আমল বেঁচে যাবে। তাই পরবর্তী পর্বে আমরা আরেকটু বিস্তারিতভাবে পর্দার সাথে ঈমানের গভীর যোগসূত্র আর বেপর্দার সাথে নাফরমানির সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করব। পাশাপাশি পর্দার বিধান লঙ্ঘন করার তথা বেপর্দা হওয়ার গুনাহগুলোকে ফুটিয়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[৭১] সূরা আন নূর, ২৪: ৩১।
[৭২] সূরা আন নূর, ২৪: ৩১।