📄 প্রথম স্তরের আলোচনা
আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যখন আয়াতগুলো নাযিল হলো, তখন সাহাবায়ে কেরাম-সহ সকলেই বুঝে গিয়েছেন যে, এখন আর কেউই ঘরের বাইরে বের হতে পারবে না। তখনকার সাথে এ যুগের পার্থক্য শুধু এতটুকুই, তখন আরব-সহ সবখানেই বাথরুম ছিল ঘর থেকে দূরে, বাইরে। আর এখন গ্রামে, শহরে-সব জায়গায় নিজেদের ঘরেই এটাচড বাথরুম, হাতেগোনা কিছু জায়গা ছাড়া। আম্মাজান খাদীজা-এর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে বিবাহ করেছিলেন, তিনি ছিলেন হযরত সাওদা। আম্মাজান আয়িশা বর্ণনা করেন,
خَرَجَتْ سَوْدَةُ بَعْدَمَا ضُرِبَ عَلَيْهَا الْحِجَابُ لِتَقْضِيَ حَاجَتَهَا، فَرَآهَا عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ، فَقَالَ: يَا سَوْدَةُ ، وَاللهِ مَا تَخْفَيْنَ عَلَيْنَا، فَانْظُرِي كَيْفَ تَخْرُجِينَ، قَالَتْ: فَانْكَفَأَتْ رَاجِعَةً وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِي، وَإِنَّهُ لَيَتَعَشَّى وَفِي يَدِهِ عَرْقُ، فَدَخَلَتْ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي خَرَجْتُ، فَقَالَ لِي عُمَرُ: كَذَا وَكَذَا، قَالَتْ: فَأُوحِيَ إِلَيْهِ، ثُمَّ رُفِعَ عَنْهُ وَإِنَّ الْعَرْقَ فِي يَدِهِ مَا وَضَعَهُ، فَقَالَ: إِنَّهُ قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ
হযরত সাওদা নিজের জরুরত পূরণ করতে রাতে বের হলেন। নিজেকে সর্বোচ্চ আড়াল করেই বের হলেন। পথিমধ্যে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব -এর সাথে দেখা হয়ে গেল। আম্মাজান সাওদা এর শারীরিক গড়ন, উচ্চতা ছিল সবার থেকে অন্যরকম; যার কারণে উমর তাঁকে দেখেই চিনতে পেরেছিলেন যে, 'আরে! ইনি তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিলেন ঘরে থাকতে, তো উনি বাইরে কেন?'
আসলে সাহাবাগণ (রিদওয়ানুল্লাহু তাআলা আলাইহিম আজমাঈন) যেভাবে পবিত্র কুরআন বুঝতেন, আমরা সেভাবে বুঝি না; যেভাবে পবিত্র কুরআনকে মানতেন, আমরা সেভাবে মানি না, মানতে পারি না; কিন্তু মানা জরুরি।
যা-ই হোক, হাদীসের ভাষায়- فرآها عمر অর্থাৎ, উমর দেখে ফেললেন (সাওদা-কে)। فعرفها অর্থাৎ দেখেই তাকে চিনে ফেললেন। এরপর উমর বললেন, 'আমি আপনাকে চিনেছি যে আপনি সাওদা, আপনি নিজেকে লুকাতে পারবেন না। পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে নারীদের ঘরে থাকার জন্য, তো আপনি বাইরে বের হয়েছেন কেন?' সাওদা তৎক্ষণাৎ ঘরে ফিরে গেলেন। হাদীসের ভাষায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন হাড্ডি চিবুচ্ছিলেন। সাওদা বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি তো বের হলাম, কিন্তু উমর দেখে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি কেন বের হয়েছি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন খামোশ ছিলেন, হাড্ডি চিবুচ্ছিলেন আর ওই অবস্থায় আল্লাহ তাআলার ওহি নাযিল হলো। সুবহানাল্লাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাওদা-কে বললেন,
إِنَّهُ قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ওহি নাযিল করেছেন এবং মৌলিক প্রয়োজনে তোমাদেরকে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। [৬০]
সুতরাং, পর্দার প্রথম স্তর ও মৌলিক বিধান হলো, নারীদেরকে সর্বদা ঘরের ভেতর অবস্থান করতে হবে। এরপরে আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র মৌলিক প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে। সুতরাং, কেউ যদি মনে করে যে, সে নিজে যেভাবে ইচ্ছা চলতে পারে এবং নিজের মতো করে তার বিবি-কন্যাকে চালানোর অধিকার তার আছে, তাহলে এ কথা একদম স্পষ্ট যে, সে পর্দার বিধান বুঝেনি। শরীয়ত কী-তা বুঝেনি।
নবি-রাসূলগণ ব্যতীত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র অন্তর যাদের ছিল, তারা হলে সম্মানিত সাহাবাগণ (রিদওয়ানুল্লাহু তাআলা আলাইহিম আজমাঈন)। আর উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ যেমন আমাদের মা, তেমনই সাহাবিদেরও মা। তারপরেও আল্লাহ তাআলা তাঁদের দিয়ে পর্দার বিধান আলোচনার সূচনা করেছেন। হাদীসে এর কারণ উল্লেখ আছে, এখানে বিস্তারিত আলাপে না গিয়ে শুধুমাত্র কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
ইবনু মাসউদ-এর সূত্রে ইমাম তিরমিজি বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
‘নারীরা হচ্ছে সংরক্ষিত বস্তু। সে বাইরে বের হলে শয়তান তার দিকে উঁকি দেয়। [৬১]
অর্থাৎ, নারীরা সংরক্ষিত। আর সংরক্ষণ করার মতো কোনো জিনিস কি মানুষ যেখানে-সেখানে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, নাকি সংরক্ষিত স্থানে রাখে? অবশ্যই জায়গামতো রেখে দেয়। এই নারীরা যখন ঘর থেকে বের হয়ে যায়, তখন শয়তান উঁকি দেয়। উঁকি দেওয়ার অর্থ হলো-শয়তান এই নারীদের মাধ্যমে পুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে এবং নারীদেরকেও পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। তো, শয়তানের পথভ্রষ্ট করার এই ব্যাপারটি শুরু হয় তখন, যখন নারী তার আপন ঘর ছেড়ে বাইরে যায়। ঘরের ভেতর যেহেতু কোনো সমস্যা নেই-এজন্য শয়তান সব সময় চায় নারীদেরকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসতে। অর্থাৎ, নারী ঘরের ভেতর থাকলে সংরক্ষিত থাকবে, বাইরে আসলে আর সংরক্ষিত থাকবে না; বরং শয়তানের ধোঁকায় পতিত হবে।
ইমাম মুসলিম অন্য বর্ণনায় এনেছেন,
إِنَّ الْمَرْأَةَ تُقْبِلُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ، وَتُدْبِرُ فِي صُورَةِ شَيْطَانٍ، فَإِذَا أَبْصَرَ أَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلْيَأْتِ أَهْلَهُ، فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ
‘স্ত্রীলোক সামনে আসে শয়তানের বেশে এবং ফিরে যায় শয়তানের বেশে। অতএব তোমাদের কেউ কোন স্ত্রীলোক দেখতে পেলে সে যেন তার স্ত্রীর নিকট আসে। কারণ তা তার মনের ভেতর যা (কামনা) রয়েছে, তা দূর করে দেয়। [৬২]
অর্থাৎ পুরুষদের সামনে নারীরা যখন আসা-যাওয়া করে, তখন নারীদের অবয়ব পুরুষদের অন্তরে কুমন্ত্রণা জাগায়। শয়তান নারীদের মাধ্যমে যেভাবেই হোক পুরুষদের অন্তরে কুমন্ত্রণা জাগায়। যা-ই হোক, হাদীসের শেষ অংশের বর্ণনামতে, অগত্যা কোনো নারী যদি বের হয় আর পুরুষদের সেদিকে নজর পড়ে যায়, তখন অন্তরে যে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হয়-সেটা দূর করার পদ্ধতি হিসেবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
فَلْيَأْتِ أَهْلَهُ
'সে যেন নিজের স্ত্রীর কাছে চলে আসে।'
অর্থাৎ, সে যেন ঘরে তার বিবির কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আসে। কারণ নিজের বিবির কাছে থাকলে, যে কুভাব অন্তরে জন্মেছিল-তা কেটে যাবে।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল বলেন, 'একবার উম্মু হুমাইদ উনার অন্তরের সব আবেগ দিয়ে চেয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করতে। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, মূলত তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববিতে নামাজের শিক্ষা দিতেন, দ্বীন-ঈমানের শিক্ষা দিতেন; যার কারণে মনের এই আকুতি পেশ করেছিলেন উম্মু হুমাইদ । হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী-
أَنَّهَا جَاءَتِ إِلَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أُحِبُّ الصَّلَاةَ مَعَكَ، قَالَ: " قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي ، وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي حُجْرَتِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي دَارِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِي "، قَالَ: فَأَمَرَتْ فَبُنِيَ لَهَا مَسْجِدُ فِي أَقْصَى شَيْءٍ مِنْ بَيْتِهَا وَأَظْلَمِهِ، فَكَانَتْ تُصَلِّي فِيهِ حَتَّى لَقِيَتِ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ
'একদা উম্মু হুমাইদ নবি কারীম সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সাথে মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করতে ভালোবাসি।” রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "আমি জানি, তুমি আমার সাথে নামাজ আদায় করতে ভালোবাসো। কিন্তু তোমার জন্যে ক্ষুদ্র কুঠুরিতে নামাজ পড়া, বাড়িতে (প্রশস্ত ঘরের মধ্যে) নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। আর বাড়িতে নামাজ পড়া, বাড়ির উঠানে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। নিজ বাড়ির উঠানে/বারান্দায় নামাজ পড়া মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। আর মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়া আমার মসজিদে (মসজিদে নববিতে) নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।”[৬৩]
আগেকার দিনে মুসলিম বাসা-বাড়িতে আমরা দেখতাম যে, নামাজের জন্য আলাদা গোপন কুঠুরি/কামরা নির্দিষ্ট করা থাকত, সেখানে একটি চৌকি থাকত—যার ওপরে জায়নামাজ বিছানো থাকত। এরপরে সাধারণ কামরা, এরপর বারান্দা ইত্যাদি। নারীদের জন্য আলাদা গোপন কুঠুরি থাকা কাম্য এবং শরীয়তের প্রথম ও প্রধান নির্দেশ এটাই যে, স্ত্রী তার স্বামীর কাছে আবদার করে নামাজের জন্য আলাদা কামরা নির্ধারিত করে নেবে। বাবা যখন মেয়েকে বিবাহ দিতে যাবে, তখন মেয়ের হবু স্বামীকে জিজ্ঞেস করবে যে, তার ঘরে মেয়ের নামাজের জন্য আলাদা কুঠুরি আছে কি না। কিন্তু, এখনকার বাসা-বাড়িতে মহিলাদের আলাদা কোনো নামাজের কামরা নেই। আর কয়জন বাবা মেয়ে বিয়ের সময় সে ব্যাপারে খোঁজ নেয়—তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
যা-ই হোক, ভেবে দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখনো দুনিয়াতে আছেন, কুরআন ও হাদীসের বিধান নাযিল হচ্ছে, দ্বীন-শরীয়ত নাযিল হচ্ছে আর সাহাবাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহবতে ধন্য। দ্বীনের জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত না তাঁরা। এমন একটা সময়ে এত পূতপবিত্র অন্তরের আকুতিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন আবেগকে সংবরণ করার জন্য। অর্থাৎ, নারীদের নামাজের আসল জায়গা হলো নিজ ঘরের গোপন কুঠুরি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পেছনে নামাজ পড়া থেকে নিজ ঘরের গোপন কুঠুরিতে নারীদের নামাজ পড়া উত্তম—এটাই হাদীসের মূলভাব।
উম্মু হুমাইদ -এর হাদীসের শেষাংশ একটু খেয়াল করি, 'এরপর উম্মু হুমাইদ আদেশ দিলেন। ফলে তার জন্যে নিজ ঘরের ভেতরে একদম কোণায় অন্ধকারতম স্থানে একটি নামাজের জায়গা বানিয়ে দেওয়া হলো। তিনি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সেই ক্ষুদ্র অন্ধকার কুঠুরিতে নামাজ আদায় করেছেন।'
সুবহানাল্লাহ! সব আবেগ-আকুতি ভুলে তিনি এভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিধানকে মান্য করেছেন।
ইসলামের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে নামাজ। বিশুদ্ধ বর্ণনামতে, মসজিদে নববিতে নামাজ পড়লে এক রাকআত নামাজের বিনিময়ে কমপক্ষে এক হাজার রাকআত নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। তার ওপর নামাজের ইমামতিতে আছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। স্বাভাবিকভাবেই তখন সেখানে নামাজ আদায়ের আগ্রহ থাকবে। তারপরেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যেন নামাজ গোপন কুঠুরিতে আদায় করা হয় এবং সেটাই উত্তম। মসজিদে নববিতে নামাজ পড়ার চেয়ে, একজন নারীর জন্য পর্দার গুরুত্ব অনেক ওপরে। এবং মসজিদে নববিতে নামাজের ক্ষেত্রে যে ফাযায়েল বর্ণিত আছে-তার চেয়েও অধিক ফাযায়েলের সুসংবাদ তাদেরকে দেওয়া হয়েছে, যারা নিজের অন্ধকার কুঠুরিতে নামাজ আদায় করবে। সুবহানাল্লাহ!
আর, বর্তমানে নারীদেরকে অবাধে চলতে দেখা যায় সব জায়গায়। বিভিন্ন মাজার ও খানকাতেও আনাগোনা দেখা যায় তাদের। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। এ ছাড়া সমাজে নারীদের এই পর্দা নিয়ে কতরকম বিভ্রান্তি যে ছড়ানো হয়-যার প্রত্যেকটাই ঈমান ভঙ্গের কারণের অন্তর্ভুক্ত। এ নিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ পরবর্তীকালে আলোচনা করব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুযায়ী-নারী ততক্ষণ সময় পর্যন্ত আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার একান্ত গোপন কুঠুরিতে থাকবে। এতক্ষণ সংক্ষেপে বললাম পর্দার প্রথম স্তর, যার মূল দাবি হলো নারী তার ঘরে অবস্থান করবে।
টিকাঃ
[৬০] বুখারি, ৪৪৩২।
[৬১] তিরমিজি: ১১৭৩।
[৬২] মুসলিম, ৩২৭৭।
[৬৩] মুসনাদে আহমাদ, ২৭০৯০; সহিহ ইবনু খুযাইমা, ১৬৮৯। হাফিজ ইবনু হাজার (রহ.)-এর মতে, হাদীসটি হাসান। ফাতহুল বারি, ২/২৯০।
📄 দ্বিতীয় স্তরের আলোচনা
এখন আসি পর্দার দ্বিতীয় স্তরে। শুধুমাত্র মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে নারীর জন্য বাহিরে যাওয়ার অনুমতি শরীয়তে আছে, তবে বিভিন্ন শর্ত- সাপেক্ষে। মৌলিক প্রয়োজন মূলত দুইটি: ১. দ্বীনি প্রয়োজন, ২. দুনিয়াবি প্রয়োজন। সংক্ষেপে বললে একটি হলো-যদি ঘরে দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে, তবে যেখানে পরিপূর্ণ শরীয়তের তরিকা মোতাবেক সঠিক পদ্ধতিতে দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা আছে, সেখানে গিয়ে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা। দ্বিতীয়টি হলো হাওয়ায়েজ বা জরুরত পূরণ করা।
যেসব নারীরা ঘরের বাহিরে কাজ করতে যায়, তাদের ব্যাপারে আমরা আলোচনা করব। তবে এর আগে আলোচনা করব, কখন সে ঘরের বাহিরে উপার্জনের জন্য শর্ত-সহ যেতে পারবে।
তখনই একজন মুসলিম রমণী ঘরের বাহিরে কাজ করতে যেতে পারবে, যখন তাকে ভরণপোষণ দেওয়ার মতো তার বাবা, স্বামী অথবা অন্য কোনো অভিভাবকই নেই। পিত্রালয়ের পরে একজন নারীর ভরণ-পোষণের জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হলো তার বিবাহ। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পরেও এটাই ভরণ-পোষণের সর্বোত্তম ব্যবস্থা। কারণ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, একটা মেয়ে বিধবা হওয়ার পর অথবা তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার পিত্রালয় আর তার কাছে আগের মতো আপন থাকে না। আপনি বলতে পারেন, 'কেন?'
এর সহজ উত্তর হলো, বাবা ও ভাইদের আচার-আচরণে তখন আর আন্তরিকতা অনুভূত হয় না। যে ঘরে এক সময় মেয়েকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হতো, সে ঘরে মেয়ে আর আগের মতো ইজ্জত পায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে বোঝা মনে করা হয়। আবার কখনো কাজের মেয়ের মতো আচরণ করা হয়। এখন সমাজের ঈমানদার পুরুষদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে বিবাহ করার জন্য এগিয়ে আসা। আমি-আপনি বা আমার-আপনার ছেলেরা যদি বিবাহের সময় সেই বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে বিবাহ না করি, তবে এই নারীদের ভরণপোষণের সুব্যবস্থা কিভাবে হবে?
যে নারীর স্বামী নেই, সে নারীই একমাত্র বুঝে, সে কতটা অসহায়। যেসব সন্তানের বাবা মারা যায়, সেসব সন্তানেরাই শুধু টের পায় তাদের নিজেদের অসহায়ত্ব।
আবার বর্তমানে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাও নেই। এখন যদি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকত, তাহলে অসহায় নারীদের ভরণপোষণের কোনো পেরেশানি থাকত না। কারণ তখন তাদের চলার মতো কোনো অবস্থা না থাকলে খলিফাতুল মুসলিমীনের জিম্মাদারি হয়ে যেত এমন নারীদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে। কিন্তু আফসোস ও পরিতাপের বিষয়, এখন তো খলিফাতুল মুসলিমীন নেই। আর, খলিফাতুল মুসলিমীন না থাকলে অসহায়, বিধবা ও এতিম নারীদের লালন-পালনের জিম্মাদার প্রত্যেক মুসলিমের ওপর। যাতে কোনো অসহায় নারী ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যুবরণ না করে।
অতএব, যদি কোনো অসহায় নারীর বিয়ে না হয়, তাহলে ওই সমাজের সবাই মিলে তার ভরণ-পোষণের যথাযথ ব্যবস্থা করবে। আপনারা কখনোই এ জিম্মাদারিকে নামাজ আদায় করার চেয়ে ছোট ফরজ মনে করবেন না। বরং এটি হাক্কুল ইবাদ। হাক্কুল ইবাদ তথা বান্দার হকের হিসাব-নিকাশ নামাজের হিসাব-নিকাশের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক হবে। এটাই শরীয়ত। আর, এই শরীয়তের অনুপস্থিতি তথা খলিফাতুল মুসলিমীনের অনুপস্থিতির কারণেই আজকে আমাদের এসব মা-বোনেরা অবহেলিত, নিষ্পেষিত। শরীয়ত এ ব্যবস্থাই রাখেনি যে, একজন নারী না খেয়ে মারা যাবে কিংবা নারীকে অর্থ উপার্জনের জন্য ঘর ছেড়ে বাইরে বের হতে হবে। এখন যদি এমন হয় যে, কোনো নারীর অভিভাবকও নেই, সমাজও দেখাশোনা করে না, খলিফাতুল মুসলিমীনও নেই যে, সে নারীর দায়িত্ব নেবে। কিংবা ঘরে থেকে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজেও আঞ্জাম দিতে সে জানে না-এমন নারীকে একান্ত বাধ্য হয়ে শারঈ পর্দার সাথে যদি কোথাও কাজ করতে যেতে হয়, তবে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত কিছু শর্ত সাপেক্ষে যাওয়ার অনুমতি শরীয়ত দিয়েছে।
প্রথম শর্ত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, আপনার কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের জিলবাবের কিছু অংশ নিজেদের (মাথার ওপর থেকে শুরু করে পুরো শরীরের) ওপর নামিয়ে দেয়। এ পন্থায় তাদেরকে চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা কিংবা কষ্ট দেওয়া হবে না। আর, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[৬৪]
লক্ষ করুন, আল্লাহ তাআলা পর্দার বিধান শুরু করছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি ও কন্যাদেরকে দিয়ে।
এখন আমরা দেখি যে, সাহাবায়ে কেরام উক্ত আয়াতকে কিভাবে উপলব্ধি করেছেন। সাহাবাদের (রিদওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন) মধ্যে পবিত্র কুরআন সবচেয়ে বেশি যারা বুঝতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন রঈসুল মুফাসসিরীন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস। তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
أمر الله نساء المؤمنين إذا خرجن من بيوتهن في حاجة أن يغطين وجوههن . من فوق رءوسهن بالجلابيب ويبدين عينا واحدة
'নারীরা যদি একান্ত জরুরতে ঘরের বাইরে যায়, তবে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন একটা বাড়তি বড় চাদর ব্যবহার করে-যা দিয়ে তারা তাদের মাথার ওপর থেকে শুরু করে চেহারা-সহ সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেবে। আর যদি এভাবে চলাচল করতে বেশি কষ্ট হয়, তবে শুধু এক চোখ বের করবে।[৬৫]
হাসান বসরি, আতা-সহ অনেক তাবেঈগণ উক্ত বিষয়টি একদম হাতে-কলমে শিখিয়ে গিয়েছেন।
উম্মু সালামা থেকে সহিহ বর্ণনায় এসেছে,
خرج نساء الأنصار كأن على رؤوسهن الغربان من الأكسية
'যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো, তখন থেকে আনসারি নারীগণ তাদের মাথায় এমন চাদর জড়িয়ে বের হতেন, (চাদর কালো বর্ণের হওয়ায়) মনে হতো তাতে যেন কাক বসে আছে। [৬৬]
সুতরাং, সারসংক্ষেপ দাঁড়ায় এই যে, নারীরা যদি একান্ত জরুরতে বাইরে বের হয়, তবে-
* নিজেকে সম্পূর্ণ কালো কাপড়ে আবৃত করে জিলবাবের কিছু অংশ মাথা থেকে শুরু করে মুখ-সহ নিজের সম্মুখ ভাগে টেনে দেবে।
* বাইরে চলার সময় অত্যন্ত ধীরে-সুস্থে চলবে।
আবু দাউদের বর্ণনামতে, এক মায়ের ছেলে জিহাদ-ফি-সাবিলিল্লাহ-তে শহীদ হয়ে গিয়েছে। তো ছেলের খোঁজ নিতে মা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল-উনার ছেলে জান্নাতি, নাকি জাহান্নামি। মহিলা পুরোপুরি শারঈ পর্দার হক আদায় করে এসেছে দেখে একজন সাহাবি বিস্ময়ে বলেই বসলেন, 'এত পেরেশানির মুহূর্তেও আপনি কিভাবে পর্দা ঠিক রেখে আসলেন?' তখন মহিলা উত্তরে বললেন,
إِنْ أُرْزَأَ ابْنِي فَلَنْ أُرْزَأَ حَيَائِي
'আমি আমার ছেলে হারিয়েছি, কিন্তু লজ্জা তো হারাইনি।'
আমাদের নারীদেরকে এমনই হতে হবে। কারণ, মাতৃগর্ভ যদি নাপাক হয়, সেখান থেকে সাহাবাদের মতো নেককার সন্তান কখনো হবে না। যা-ই হোক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই মহিলাকে উত্তর দিলেন-
ابْنُكِ لَهُ أَجْرُ شَهِيدَيْنِ
'তোমার সন্তান দুজন শহীদের সমপরিমাণ বদলা পেয়েছে।'
এত বড় সুসংবাদ শুনেও মহিলা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্থিরচিত্তে জানতে চাইল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এত বড় মর্যাদার কারণ কী?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন,
لِأَنَّهُ قَتَلَهُ أَهْلُ الْكِتَابِ
'কারণ, আহলে কিতাব তোমার ছেলেকে শহীদ করেছে।[৬৭]
আহলে কিতাব শহীদ করলে দ্বিগুণ সওয়াব। কারণ, আহলে কিতাবগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য নবি হিসেবে জানে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে শেষনবি হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা বর্ণিত আছে। এ ছাড়া মিরাজের রাত্রিতে বাইতুল মাকদিসে সমস্ত নবি-রাসূলগণের নামাজের ইমামতি করেছেন নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যার অর্থ এই যে, সমস্ত নবি-রাসূলগণ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
হজের বিধান অনুযায়ী নারীদের জন্য জরুরি হলো জিলবাবের সামনের অংশের কাপড় মুখের ওপর লাগানো যাবে না; নিষেধ। তো, বিদায় হজের সময়ে অনেক জায়গা থেকে অনেক মানুষ, লাখ লাখ সাহাবা এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে প্রথম হজ করতে। সে সময় আম্মাজান আয়িশা -ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হজের সফরে ছিলেন ইহরাম অবস্থায়। বিভিন্ন কাফেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, কাছে আসত; আর উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের প্রত্যেকেই তখন জিলবাবের অতিরিক্ত কাপড় মুখের ওপর নামিয়ে দিতেন। হজের সময় চেহারার ওপর কাপড় লাগানো যায় না; তাই তাঁরা চেহারার সামনে কাঠি ব্যবহার করে চেহারার ওপর নিকাব টেনে দিতেন। আর, কাফেলা দূরে চলে গেলে তাঁরা মুখের ওপরের কাপড় আবার সরিয়ে নিতেন। আলহামদুলিল্লাহ! বর্তমানেও কিছু মহীয়সী নেককার নারীগণ এ আমল করার জন্য মাথায় ক্যাপ পড়েন। ক্যাপের ওপর দিয়ে জিলবাবের কাপড় মুখের ওপর নামিয়ে দেন- যাতে করে নিজেদের মুখ পর্দায় আবৃত থাকে, আবার হজের নিষেধাজ্ঞাও পুরোপুরি বহাল থাকে। এভাবেই, খুব মহব্বতের সাথে আল্লাহ তাআলার বিধান মানতে হয়।
দ্বিতীয় শর্ত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আরও বলেন,
وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ
'আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। [৬৮]
আয়াতের ব্যাখ্যা তাফসির ইবনু কাসির ও তাফসিরে তাবারী-সহ বহু কিতাবে মুফাসসিরগণ সাহাবা ও তাবেঈদের থেকে উল্লেখ করেছেন।
আরবের জাহিলি যুগের মুশরিক নারীরা নুপুর ব্যবহার করত। তারা এমন নুপুর বানাত, যাতে কোনো রকম আওয়াজই হয় না। কারণ, নুপুরের আওয়াজে পুরুষরা আকর্ষিত হতে পারে। আর অন্য পুরুষেরা আকর্ষিত হবে—ব্যাপারটা মক্কার মুশরিকর স্বামীরাও সহ্য করতে পারত না। তো মুশরিক নারীরা শব্দবিহীন নুপুর ঠিকই পড়ত; কিন্তু চলার সময় তাদের পা দিয়ে ভূমিতে সজোরে আঘাত করত নিজেকে প্রকাশ করার জন্য। এজন্যই আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন—যাতে মুমিন নারীগণ একান্ত মৌলিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে, জাহিলি যুগের নারীদের মতো ভূমিতে সজোরে আঘাত করে না চলে; নারীর যে সৌন্দর্য—সেটা যেন প্রকাশিত না করা হয়।
ইবনু কাসির -এর মতে, নারীদের যেসব আওয়াজ বা চলনভঙ্গি দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হতে পারে, সেসবের কোনো কিছু করা যাবে না। পর্দার জন্য এমন কোনো বোরকাও পড়া যাবে না—যার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। যেমন, যে ধরনের চুড়ি পড়লে আওয়াজ হয়, সে ধরনের চুড়ি পড়ে বাইরে বের হওয়া নারীদের নিষেধ। যেসব জুতা পড়ে হাঁটলে শব্দ হয়, সেসব জুতা পড়ে বাইরে বের হওয়া যাবে না। কারণ, নারীদের দ্বারা শয়তান পুরুষকে ফিতনাগ্রস্ত করে—যার ফলে পুরুষদের অন্তর নাপাক হয়।
তৃতীয় শর্ত
এরপর যে শর্ত—তা হলো, কোনো ধরনের সুগন্ধি (আতর, পারফিউম, বডি স্প্রে ইত্যাদি) ব্যবহার করে নারীরা বাইরে যেতে পারবে না। ইমাম তিরমিজি থেকে সহিহ রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كُلُّ عَيْنٍ زَانِيَةٌ، وَالمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا
‘প্রতিটি চোখের (নারী কিংবা পুরুষ) ক্ষমতা আছে যিনা করার। যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো পুরুষদের মজলিসের পাশ দিয়ে যায়, সে ব্যভিচারিণী।[৬৯]
কারণ, কোনো নারী যখন সুগন্ধি ব্যবহার করে, তার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। তা ছাড়া, পুরুষের আকর্ষণ তো মেয়েদের নামের ভেতরেও আছে। মেয়েদের নাম শুনলেও পুরুষের মনের অনুভূতি একটু অন্যরকম হয়ে যায়।
চতুর্থ শর্ত
জরুরতে বাইরে বের হওয়ার সর্বশেষ যে শর্ত-তা হলো, বাইরে চলার সময় নিজেকে আড়াল করে একপাশে চলবে। এটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ যে, কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষের পাশ দিয়ে বা মাঝখান দিয়ে চলবে না; একদম এক পাশে চলবে।
সুনানে আবু দাউদ এ, মাইমুনা থেকে বর্ণিত হাদীসে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই নির্দেশ শোনার পর তখনকার সময়ের নারীগণ এমনভাবে রাস্তার এক পাশে চলতেন যে, তাদের কাপড়ের সাথে রাস্তার দেয়াল ঘষা লাগত। এরপর, তিরিমিজির বর্ণনায় হাদীসের নির্দেশ হলো-কোনো পরনারীর সাথে কোনো পরপুরুষ আলাদা বসবে না। [৭০]
তাহলে, ওপরোক্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় যে, মুমিন নারীগণ সর্বদা তার নিজের অবস্থান ঘরের ভেতর রাখবে-এটাই আল্লাহর হুকুম ও পর্দার সর্বপ্রথম স্তর। তবে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একান্তই অপারগ হলে, শরীয়তে নারীদের জন্য বাইরে বের হওয়ার অনুমতি আছে কিছু শর্ত-শারায়েত সাপেক্ষে। শর্তগুলো হলো:
* নিজেকে পরিপূর্ণ পর্দায় আবৃত করে বের হতে হবে, শারঈ পর্দার হক আদায় করে বের হতে হবে।
* এমনভাবে হাঁটবে না বা চলবে না-যার দ্বারা পুরুষেরা আকর্ষিত হয়। ধীরে-সুস্থে চলবে।
* এমন পোশাক কিংবা অলংকার পরিধান করবে না-যার দ্বারা নারীদের সৌন্দর্য প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
* কোনো ধরনের সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করে বের হওয়া যাবে না।
* নিজেকে আড়াল করে, পুরুষদের থেকে দূরে, রাস্তার একপাশে চলবে।
* কোথাও বসলে বা অবস্থান করলে খেয়াল রাখতে হবে, যেন গাইরে মাহরাম কোনো পুরুষ আলাদা বা একাকী তার সাথে না বসে।
টিকাঃ
[৬৪] সূরা আহযাব, ৩৩: ৫৯।
[৬৫] তাফসীরুত তবারি, ২০/৩২৪।
[৬৬] আবু দাউদ: ৪১০১।
[৬৭] আবু দাউদ: ২৪৮৮
[৬৮] সূরা আন-নূর, ২৪: ৩১।
[৬৯] সহীহুল জামে, হা/৪৫৪০; শাইখ আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহিহ বলেছেন।
[৭০] তিরমিজি, ১১৭১।
📄 তৃতীয় স্তরের আলোচনা
এখন কোনো নারী ঘর থেকে সব শর্ত পালন করে বের হওয়ার পরেও চলার পথে অবশ্যই তাকে নজর হেফাজত করে চলতে হবে। যেভাবে প্রত্যেক পুরুষকে নজর হেফাজত করে চলতে হয়—এমনকি বোরকাওয়ালি থেকেও নজর হেফাজত করে চলতে হয়। এরপরে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো লক্ষ করুন।
১. قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
'মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।[৭১]
২. وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ ۖ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ ۚ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'এবং মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে; যা আপনা-আপনিই প্রকাশ পায়, তা ছাড়া। এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয় এবং নিজেদের ভূষণ যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনেয়, আপন নারীগণ, যারা নিজ মালিকানাধীন, যৌনকামনা নেই এমন পুরুষ খিদমতগার এবং নারীদের গোপনীয় অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া আর কারও সামনে প্রকাশ না করে। মুসলিম নারীদের উচিত ভূমিতে এভাবে পদক্ষেপ না করা, যাতে তাদের গুপ্তসাজ জানা হয়ে যায়। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো।[৭২]
অতএব, আমরা বুঝতে পারলাম যে, পর্দা কোনো বোরকার নাম নয়; বরং পর্দা একটি জীবনব্যবস্থার নাম। এটি শরীয়তের এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ বিধান-যা মান্য করা নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্তব্য। এই ফারায়েজের সাথে আমাদের মা-বোনদের সব ধরনের ইজ্জত লুক্কায়িত। সেইসাথে পুরুষদের জন্য সকল ফিতনা থেকে মাহফুয থাকাও এর ওপর নির্ভর করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। আল্লাহর শান অনুযায়ী পর্দার আজমত রক্ষা করে চলার তাওফীক দান করুন। আমিন।
ইতিপূর্বে আমরা পর্দার যে আলোচনা করেছি-সেটা যদি কোনো মুসলিম পুরুষ অথবা রমণী পূর্ণভাবে আদায় করে, তাহলে সে জান্নাতের কত কাছাকাছি চলে যাবে। সেটা প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও রমণী সহজে উপলব্ধি করতে পারবে। এক কথায়, পর্দা বাঁচলে ঈমান-আমল বেঁচে যাবে। তাই পরবর্তী পর্বে আমরা আরেকটু বিস্তারিতভাবে পর্দার সাথে ঈমানের গভীর যোগসূত্র আর বেপর্দার সাথে নাফরমানির সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করব। পাশাপাশি পর্দার বিধান লঙ্ঘন করার তথা বেপর্দা হওয়ার গুনাহগুলোকে ফুটিয়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[৭১] সূরা আন নূর, ২৪: ৩১।
[৭২] সূরা আন নূর, ২৪: ৩১।