📘 জান্নাতি জীবন > 📄 পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়

📄 পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়


যদি কোনো পিতা-মাতা এটাকে বৈধতা দেয়, তবে সেও আল্লাহর নাফরমান হবে। আরও বড় গুনাহ যেটা হয়-সেটা হলো, হাদীসের ভাষায় ওই পিতা-মাতা দাইয়্যুসে রূপান্তরিত হয়। যারা এগুলো সমর্থন করে, তারা দাইয়্যুস। দাইয়্যুসের জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়েছে। জাহান্নামকে ওয়াজিব করা হয়েছে। পিতা-মাতা হোক, অথবা বন্ধুবান্ধব, এই কাজ সমর্থন করার কারণে নিজের ওপর থেকে ওরা জান্নাতকে হারাম করে নেয়।
ইসলামি পারিবারিক জীবন হলো মানুষের বৈশিষ্ট্য। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যে বৈধ সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হয়। অবৈধ সম্পর্কে সে যে মজা পেয়েছে, সেই মজার কারণে সমাজের ভেতর বৈধ সম্পর্কের ঘাটতি দেখা দেয়। ধরুন কোনো স্বামী মারা গিয়েছে, সে জন্য কি তার স্ত্রী কখনো আত্মহত্যা করে? আমি তো এটা সমাজে দেখি না। ঘটেছে নাকি কোথাও? কিন্তু একজন প্রেমিক মারা গেলে সেজন্য প্রেমিকা মরে গিয়েছে, এমন ঘটনা কি কম? তাহলে বৈধ সম্পর্কের প্রতি যে আকর্ষণ, সেই আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেকের সংসার পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায়। আবার অনেকের সন্তান ইয়াতিম হয়। এগুলো কি ছোট গুনাহ মনে হয়? কখনোই না। আর অনেক সময় দেখা যায়, পিতা-মাতার একটাই সন্তান। পিতা-মাতা বুড়ো হয়ে গিয়েছে এই সন্তানকে পালন করতে করতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এখন সে-ই। কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। এখন তার পিতা-মাতাকে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। এই দৃশ্য তো একেবারে অহরহ। সামাজিকভাবে আজ কত বড় বড় গুনাহ ঘটছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শরীয়তে কত বড় অন্যায়। চলনে-বলনে নারী-পুরুষের যে পার্থক্য শরীয়ত করে দিয়েছে, অবাধ মেলামেশার কারণে এই পার্থক্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে কিয়ামতের দিন গর্ব করবেন।
إِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কিয়ামতের দিন তোমাদের নিয়ে আমি গর্ব করব।'[৫৫]
আমরা কি নবিজির এই তামান্নার প্রতি খেয়াল রেখেছি? নাকি উল্টো পথে হাঁটছি?
সন্তান মায়ের পেটে যে গর্ভের ভেতর থাকে, এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে তা নষ্ট হয়। ওই অপবিত্র পাত্র থেকে পবিত্র সন্তানের আশা করা যায় না। নাপাক গর্ভ থেকে হাসান বসরির জন্ম হবে না, দুষ্টের জন্ম হবে। শয়তানের জন্ম হবে। কোনো নেককার জন্ম হতে পারে না। ওটার পাত্রই তো নষ্ট! আবার, অবৈধ সম্পর্কের ছড়াছড়ির কারণে 'সন্তান বৈধ না অবৈধ'-এই প্রশ্নই তো পেরেশানির। দেখুন, সমাজের ভেতরে যত ইভটিজিং আর যত ধরনের অন্যায় কাজ-সব এই খারাপ সম্পর্কের জের ধরেই সৃষ্টি হয়। পুরো সমাজের মানুষ এটা দেখতে দেখতে অধিকাংশের ভেতরে এর প্রতি ঘৃণাও চলে যায়। ঈমানি সমাজের যে বৈশিষ্ট্য, সে বৈশিষ্ট্যই নষ্ট হয়ে যায়, খতম হয়ে যায়।
পরকীয়ার ঘটনা আপনি পড়ুন। এই পরকীয়ার জেরে যত দুর্ঘটনা দুনিয়াতে ঘটছে-সূত্রে দেখা গিয়েছে, বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এর একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। বাবা-মা বিয়ে দেয়নি, এ কারণে আজকে তাদের পরকীয়ার সম্পর্ক হয়েছে। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে কত মারামারি-হানাহানি হয়, হত্যা-দুর্ঘটনা হয়, আল্লাহ জানেন!
পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহ শুধুমাত্র এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে যুক্ত। আর আমরা এটা থেকে নিজেদেরকে করতে পারছি না মুক্ত। একটু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। ইবলিস আজীবন নেক কাজ করার পরেও একটা গুনাহের কারণে অভিশপ্ত হয়েছে। মাত্র একবার সে আল্লাহর হুকুম মানেনি। আল্লাহ বলেছেন-তুমি মানুষকে সিজদা দাও। এই একটা কথা সে মানেনি। এর জন্য সে পুরোপুরি আল্লাহর জান্নাত থেকে, আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আর আমি-আপনি অবৈধ সম্পর্কের নামে পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহের সাথে লিপ্ত আছি। কখনো কি ভেবেছি? আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, জবান দিয়েছেন, হাত দিয়েছেন, পা দিয়েছেন, আমাকে দিল দিয়েছেন। এরপর দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
তিনি বলে দিয়েছেন-হে বান্দা! আমার দ্বীন-বিরোধী যত দিক আছে, যত ভালোবাসার পাত্র আছে, ওখান থেকে তোমার চোখকে হেফাজত করো, কানকে হেফাজত করো, জবানকে হেফাজত করো, দিলকে হেফাজত করো। তোমার কানে যেন আমার কথা বাজে; তোমার চোখ যেন আমার আয়াত, আমার কুরআন দেখে; তোমার দিলে যেন আমার যিকির প্রতিধ্বনিত হয়। তোমার হাত-পা যেন আমার কাজ করে।
আজকে এই অবৈধ সম্পর্কের নামে আমি আমার চোখকে নাপাক করেছি, আমি আমার কানকে নাপাক করেছি, জবানকে নাপাক করেছি, হাতকে নাপাক করেছি, পাকে নাপাক করেছি, দিলকে নাপাক করেছি। আল্লাহকে কোথায় আমি জায়গা দিলাম? আমার অর্থ নষ্ট করছি, মেধা নষ্ট করছি, সময় নষ্ট করছি, যৌবন নষ্ট করছি, ব্যক্তিগত জীবন নষ্ট করছি, পারিবারিক জীবন নষ্ট করছি, সমাজকে নষ্ট করছি, ঈমানকে নষ্ট করছি। এরপরও আমি আমাকে নিয়ে ভালো স্বপ্ন দেখি!
এ যুগে ঈমান বাঁচানো এত সহজ না। এই যুগে আমার মেয়ে, আমার সন্তান এই গুনাহে জড়িয়ে গিয়েছে। সে হয়তো মনের অজান্তেই পুরো জীবন থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছে। কখনোই সে ভাবেনি। ওই না ভাবতে না ভাবতে কবরে চলে যেতে হয়েছে। ওই সময় ফেরেশতা ঠিকই হিসাব নেবে। ফেরেশতাদের হিসাব অবশ্যই আমাদের চেয়ে বেশি।
অবৈধ সম্পর্কের নামে আমরা যেসব গুনাহে জড়িয়ে রয়েছি, সেগুলো আপনার সামনে পেশ করলাম। আমি কোনো অবাস্তব কথা বলিনি। আপনিই চিন্তা করুন। কিন্তু আফসোস! আল্লাহকে ভোলার কারণে আপনার অন্তরে সে অনুভূতিই নেই। এই চোখ, এই জবান, এই কান কেন আল্লাহ দিয়েছেন, ওটাও আপনি জানেন। কিন্তু আপনি এগুলো দ্বীনের প্রতি ব্যবহার করছেন না। করছেন অবৈধ সম্পর্কের প্রতি, অবৈধ ভালোবাসার প্রতি। এই অবৈধ ভালোবাসা যদি মন্দিরের নামে আসত, তাহলে মুমিনরা কিছু না কিছু হলেও বাঁচত। কিন্তু মুমিনের কাছে এটা এসেছে দুনিয়ায় সবচেয়ে মধুর নামে, 'ভালোবাসা'-র নামে। ভালোবাসার নাম করে আল্লাহ রব্বুল ইযযতের সাথে ভালোবাসা, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক-পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে আমরা যে কত ধরনের ফিতনার ভেতর নিমজ্জিত, কতভাবে যে ঈমানকে বিসর্জন দিচ্ছি, কতভাবে যে আল্লাহকে ভুলে থাকছি—এর ব্যাপারে কখনো ফিকির করি না। আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। অন্ততপক্ষে এই মজলিস থেকে তাওবা করুন। যুবক-যুবতী হোক, পিতা-মাতা হোক, আমরা এ ধরনের কোনো গুনাহকে সমর্থন করব না। আমরা সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব। আমরা আমাদের ঈমানকে বাঁচিয়ে চলব। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমিন।
এভাবে যদি একজন মুমিন নিজের জীবন গুনাহমুক্ত করতে পারে, নিজের জবানকে অপবাদ-অপপ্রচার থেকে সংযত করতে পারে, আলিম-উলামা ও নেককারদের সাথে জুড়ে থাকতে পারে; এরপর যদি সতর্কতার সাথে নারীদের থেকে দূরে থাকতে পারে, নিজের দেহ-মনকে নারীদের থেকে পবিত্র রাখতে পারে, তাহলে তার জীবন অসংখ্য অগণিত গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাবে। আর বর্তমানে যারা দ্বীন-ঈমান নিয়ে বাঁচতে চায়, তারাও এ ধরনের গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে না। তাই যে এই গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক ও সংযত হতে পারবে, সে জান্নাতের পথে অনেক দূরে এগিয়ে যাবে।
আর যেহেতু এই গুনাহ ঈমান-আমলের অনেক বেশি ক্ষতি করে, তাই সংগত কারণে আগামী পর্বে আমরা পর্দার বিধানের সাথে ঈমানের যোগসূত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করব। এর পরবর্তী পর্বে পর্দার স্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে পূর্ণভাবে পর্দার বিষয়টি আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আমরা আমাদের জীবনকে অসংখ্য-অগণিত গুনাহ থেকে মুক্ত করতে পারি, আর জান্নাতে যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ ও সুগম করতে পারি।

টিকাঃ
[৫৫] মুসনাদুশ শামিয়‍্যীন: ৭২৩; ভিন্ন শব্দে সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০; আলবানী 'ইরওয়াউল গালিল' গ্রন্থে (১৭৮৪) হাদীসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00