📄 সাবধান হই, সতর্ক হই
ওপরে আমরা যে গুনাহের লিস্ট আপনাকে দিলাম, সে কথাগুলো আবারও ভাবনা আকারে আপনার কাছে তুলে ধরছি, যাতে আপনার দিলেও ভাবনাগুলো তৈরি হয়। আমি-আপনি সংশোধিত হতে পারি। আমাদের সন্তানদেরকে সংশোধন করতে পারি।
মানুষের চরিত্র নষ্ট করা অনেক বড় গুনাহ। অবৈধ সম্পর্কে জড়ালে মানুষের চরিত্র নষ্ট হয়। এই গুনাহের আরেকটা বড় সমস্যা হলো একাকী মিলিত হওয়া। একজনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক হলে, তারা চায় আলাদা একাকী মিলিত হতে। আলাদা কথা বলতে চায়। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ
'কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্ত গোপনে অবস্থান না করে।[৫৩]
এটা অনেক বড় গুনাহ। মায়ের পেটের আপন বোনের সাথেও একাকী দীর্ঘ সময় কাটানো সতর্কতা পরিপন্থি কাজ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা সুযোগ পেলেই আলাদা মিলিত হওয়ার চেষ্টা করে। এই গুনাহের আরেকটা ফল হলো, যখন কারও সাথে সম্পর্কে জড়িত হয়, সে যদি তাকে কোনো অন্যায় কাজে ডাকে, তবে তাকে যেতে হবে। না চাইলেও যেতে হবে। গানের অনুষ্ঠানে, কোথাও ঘুরতে, কোথাও সফরে, কোথাও পিকনিকের নামে যেতে হবে নিজের ইচ্ছার বাইরে। তার সাথে সম্পর্কের কারণে সে আপনাকে গুনাহের বিভিন্ন মজলিসে নিয়ে যাবে।
একজন মানুষ কি বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে আপন হতে পারে? হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে? কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের এত বেশি আপন হয় যে, দুনিয়াতে এরচেয়ে বেশি কোনো আপনজন নেই। স্বামী-স্ত্রীও এত বেশি আপন হয় না, এরা যত বেশি আপন হয়। এরা একজন আরেকজনের জন্য সবকিছু জায়েজ মনে করে। এই যে একজন আরেকজনকে সবকিছু মনে করছে এবং স্বামী-স্ত্রীর থেকেও আপন হয়ে যাচ্ছে, এখানে শরীয়ত নির্ধারিত সম্পর্ককে যে উপেক্ষা করা হচ্ছে, সেটা কি বুঝতে পারছেন?
চিন্তা করুন, বাস্তবতার সাথে মেলান। কতগুলো গুনাহ তারা একসাথে জড়ো করে ফেলছে!
অনেকে হয়তো গান শোনায় হালকা আসক্ত থাকে, কিন্তু এই সম্পর্কে এসে নতুন করে গান শোনার স্পিড বেড়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে পূর্বে শোনা গানের ধরন বদলে গিয়ে নতুন ধরনের গান শোনা শুরু হয়। এই সম্পর্কের শুরুতে গানের ধরন এক রকম থাকে; আবার যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ছ্যাঁকা খাওয়া গান শোনে, বিরহের গান শোনে। গান শোনা কত ভয়ানক অন্যায়! গান দিলের ভেতরের ঈমানকে সরিয়ে নিফাককে প্রতিষ্ঠিত করে। আর সেই অবৈধ সম্পর্কের কারণে গানের প্রতি আসক্তি আরও বেড়ে যায়। অবলীলায় কবীরা গুনাহ হতে থাকে।
অনেকেই এই সম্পর্কের কারণে নেশা করে। কেউ কেউ আবার সম্পর্কে ব্যর্থ হয়ে নেশায় আসক্ত হয়। এগুলো স্বাভাবিক চিত্র সমাজের।
এই এক অবৈধ সম্পর্কের কারণে আমি গানে জড়াচ্ছি, নেশায় জড়াচ্ছি। এরপরে সবচেয়ে বড় যে দুর্ঘটনা, ওই দুর্ঘটনাও ঘটে। আত্মহত্যা নামক বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে এই দুর্ঘটনা ঘটেনি। আছে কি কোনো এলাকা? আমার জানা নেই। তাহলে এই সম্পর্কের কারণে আত্মহত্যার মতো বড় অপরাধ ঘটছে। বাস্তবতা আপনি মিলিয়ে দেখুন। আমি শুধু লিস্টগুলো আপনাদেরকে দিচ্ছি।
সম্পর্ক যেহেতু অবৈধ, এখানে টাকা ব্যয় করা কি অবৈধ না? বাবা-মা যে টাকা দেয়, একটা বৈধ খাতে তা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সেটা ব্যয় হয় অবৈধ খাতে। এই মালের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আলাদা করে সওয়াল করবেন। আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার জন্য দেহ-মন-সব ত্যাগ করে দিলাম, তার পেছনে আমি যে টাকা-পয়সা খরচ করছি, আল্লাহ এই টাকার হিসাব নেবেন না? এই যে অনর্থক কাজে টাকা ব্যয় করছি, এটা কি ছোট অন্যায়, নাকি অনেক বড়?
মানুষকে মেধা দেওয়া হয়েছিল আল্লাহকে খোঁজার জন্য, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। অথচ এই হারাম সম্পর্কের দ্বারা মেধার অপচয় ঘটে। ওটা তো সম্পর্কই না, যে সম্পর্কে মেধার অপচয় ঘটে।
মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো সময়। এ সময়ের ভেতরেই আমাকে জান্নাত অর্জন করতে হবে। এই হারাম সম্পর্কের কারণে কত রাত আর কত দিন আমি যে নষ্ট করেছি, সেটার কি হিসাব আছে?
মানুষের আরেকটা বড় সম্পদ হলো যৌবনকাল। এই সময়ে যে আল্লাহর ইবাদত করবে, সে নবিদের সাথে আরশের নিচে ছায়া পাবে। আর এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয় মানুষের যৌবন। কিয়ামতের দিন এই যৌবনকালের ব্যাপারে হিসাব দিতে না পারলে আল্লাহ তাআলা এক পা-ও এগুতে দেবেন না।
'তুমি তোমার যৌবনকে কোথায় নষ্ট করেছো?-এই হিসাব দিয়ে দাও।'
এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের যৌবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে যৌবন ছিল নবিদের সাথে হাশরের ময়দানে আল্লাহর সান্নিধ্যে আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার জন্য, এই সম্পর্কের কারণে সে যৌবন বিনষ্ট হচ্ছে।
এই সম্পর্ক ঈমানকে কতটা আঘাত করে, চিন্তা করুন। গুনাহের লিস্ট আপনারা করুন।
লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الْإِيمَانِ
'নিশ্চয়ই লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ।'[৫৪]
লজ্জা, ঈমানের একটা বিশেষ শাখা। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে লজ্জা নষ্ট হয়। শরীয়ত যেটাকে লজ্জা বলেছে, সেখানে লজ্জা করা ফরজ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা এখানে এসেই সবচেয়ে বেশি ফ্রি হয়ে যায়। এতে তাদের লজ্জা নষ্ট হয়, ঈমান নষ্ট হয়। এখানে ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণ বিদ্যমান থাকে।
আল্লাহ তাআলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন আল্লাহর যিকির করার জন্য। দিল দিয়েছেন আল্লাহকে সেখানে বসানোর জন্য। জবান, হাত, পা, চোখ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, তাঁর সামনে নত রাখার জন্য। আরেকটু চিন্তা করুন। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়ায়, তখন আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ, কান, জবান, হাত, পা, দিল-সব নিয়মিতভাবে গাফেল হয়ে যায়। শয়নে-স্বপনে-সব অবস্থায় সে আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের স্মরণ বাদ দিয়ে আরেক অবৈধ ব্যক্তির স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। মনে রাখবেন, এটা কিন্তু ঈমানের ওপর আঘাত।
একজন মুমিন গুনাহকে ঘৃণা করবে না—এটা হতেই পারে না। এটা সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ। গুনাহকে ঘৃণা না করলে ঈমান যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে আমরা যে কাজটা করি, এর দ্বারা যিনার প্রতি ঘৃণা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। এটা ঈমান হারানোর একটা বড় কারণ। এই সম্পর্কের কারণে গুনাহ ঘৃণার বস্তু হওয়া তো দূরের কথা, আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। সর্বোচ্চ লেভেলের গুনাহ তার কাছে প্রিয় এবং মজার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। একজন মুমিনের জীবনে এটা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু অবৈধ সম্পর্কের কারণে এমনটা হয়। নামাজে মজা থাকে না, রোজায় মজা লাগে না; সব মজা লেগে থাকে যিনার মধ্যে। তাহলে যেটা সবচেয়ে ঘৃণার বস্তু ছিল, সেটা এখন সবচেয়ে মজার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মানুষ এটাকে নিয়ে রীতিমতো গল্প করে। এতগুলো গুনাহ সে গল্প করে বন্ধুবান্ধবের কাছে পেশ করে। এর দ্বারা গুনাহের প্রতি ঘৃণা উবে যায়। গুনাহ তখন সর্বোচ্চ মজার বস্তুতে পরিণত হয়। তখন আর ঈমানের দাম কোথায় রইল?
এই গুনাহের কারণে শরীয়তের একটা বড় বিধান—পর্দাও ঢিলেঢালা হয়ে যায়। পর্দা দিল থেকে উঠে যায়। অবৈধ কাজে জড়ানোর কারণে কত ভ্রূণ যে নষ্ট করা হয়, আল্লাহই জানেন। কখনো কখনো তো সন্তানও নষ্ট করা হয়। এটা কি ছোট অন্যায়, নাকি বড় অন্যায়? কখনো নবজাতককে ডাস্টবিনে পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় বাথরুমে। কখনো এই অবৈধ নবজাতককে হাসপাতালে রেখেই দৌড় দেয়। একজন মানব সন্তানের দুনিয়াতে বাঁচার অধিকার ছিল, কিন্তু ওই সন্তান এখন ডাস্টবিনে পড়ে আছে। বলুন তো, একটা মাসুম বাচ্চার অপরাধ কোথায়?
আজকাল আবার এই গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা হয়। পরিবারের লোক সাক্ষী, বন্ধুবান্ধব সাক্ষী। গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা যে কত বড় অন্যায়! গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কবীরা গুনাহ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখে সবাইকে।
পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। পিতা-মাতার হাজারও বৈধ স্বপ্ন থাকে এই সন্তানের জন্য। আর সে সন্তান সব স্বপ্ন নষ্ট করে ফেলে। পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা কি শরীয়তসিদ্ধ কাজ? শরীয়তে কি এই কাজের অনুমতি আছে? তো এই কাজের মাধ্যমে পিতা-মাতার অবাধ্যতার রাস্তা কি সুগম হয় না?
টিকাঃ
[৫৩] তিরমিজি, ১১৭১।
[৫৪] বুখারি, ৫৬৮৮।
📄 পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়
যদি কোনো পিতা-মাতা এটাকে বৈধতা দেয়, তবে সেও আল্লাহর নাফরমান হবে। আরও বড় গুনাহ যেটা হয়-সেটা হলো, হাদীসের ভাষায় ওই পিতা-মাতা দাইয়্যুসে রূপান্তরিত হয়। যারা এগুলো সমর্থন করে, তারা দাইয়্যুস। দাইয়্যুসের জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়েছে। জাহান্নামকে ওয়াজিব করা হয়েছে। পিতা-মাতা হোক, অথবা বন্ধুবান্ধব, এই কাজ সমর্থন করার কারণে নিজের ওপর থেকে ওরা জান্নাতকে হারাম করে নেয়।
ইসলামি পারিবারিক জীবন হলো মানুষের বৈশিষ্ট্য। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যে বৈধ সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হয়। অবৈধ সম্পর্কে সে যে মজা পেয়েছে, সেই মজার কারণে সমাজের ভেতর বৈধ সম্পর্কের ঘাটতি দেখা দেয়। ধরুন কোনো স্বামী মারা গিয়েছে, সে জন্য কি তার স্ত্রী কখনো আত্মহত্যা করে? আমি তো এটা সমাজে দেখি না। ঘটেছে নাকি কোথাও? কিন্তু একজন প্রেমিক মারা গেলে সেজন্য প্রেমিকা মরে গিয়েছে, এমন ঘটনা কি কম? তাহলে বৈধ সম্পর্কের প্রতি যে আকর্ষণ, সেই আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেকের সংসার পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায়। আবার অনেকের সন্তান ইয়াতিম হয়। এগুলো কি ছোট গুনাহ মনে হয়? কখনোই না। আর অনেক সময় দেখা যায়, পিতা-মাতার একটাই সন্তান। পিতা-মাতা বুড়ো হয়ে গিয়েছে এই সন্তানকে পালন করতে করতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এখন সে-ই। কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। এখন তার পিতা-মাতাকে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। এই দৃশ্য তো একেবারে অহরহ। সামাজিকভাবে আজ কত বড় বড় গুনাহ ঘটছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শরীয়তে কত বড় অন্যায়। চলনে-বলনে নারী-পুরুষের যে পার্থক্য শরীয়ত করে দিয়েছে, অবাধ মেলামেশার কারণে এই পার্থক্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে কিয়ামতের দিন গর্ব করবেন।
إِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কিয়ামতের দিন তোমাদের নিয়ে আমি গর্ব করব।'[৫৫]
আমরা কি নবিজির এই তামান্নার প্রতি খেয়াল রেখেছি? নাকি উল্টো পথে হাঁটছি?
সন্তান মায়ের পেটে যে গর্ভের ভেতর থাকে, এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে তা নষ্ট হয়। ওই অপবিত্র পাত্র থেকে পবিত্র সন্তানের আশা করা যায় না। নাপাক গর্ভ থেকে হাসান বসরির জন্ম হবে না, দুষ্টের জন্ম হবে। শয়তানের জন্ম হবে। কোনো নেককার জন্ম হতে পারে না। ওটার পাত্রই তো নষ্ট! আবার, অবৈধ সম্পর্কের ছড়াছড়ির কারণে 'সন্তান বৈধ না অবৈধ'-এই প্রশ্নই তো পেরেশানির। দেখুন, সমাজের ভেতরে যত ইভটিজিং আর যত ধরনের অন্যায় কাজ-সব এই খারাপ সম্পর্কের জের ধরেই সৃষ্টি হয়। পুরো সমাজের মানুষ এটা দেখতে দেখতে অধিকাংশের ভেতরে এর প্রতি ঘৃণাও চলে যায়। ঈমানি সমাজের যে বৈশিষ্ট্য, সে বৈশিষ্ট্যই নষ্ট হয়ে যায়, খতম হয়ে যায়।
পরকীয়ার ঘটনা আপনি পড়ুন। এই পরকীয়ার জেরে যত দুর্ঘটনা দুনিয়াতে ঘটছে-সূত্রে দেখা গিয়েছে, বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এর একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। বাবা-মা বিয়ে দেয়নি, এ কারণে আজকে তাদের পরকীয়ার সম্পর্ক হয়েছে। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে কত মারামারি-হানাহানি হয়, হত্যা-দুর্ঘটনা হয়, আল্লাহ জানেন!
পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহ শুধুমাত্র এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে যুক্ত। আর আমরা এটা থেকে নিজেদেরকে করতে পারছি না মুক্ত। একটু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। ইবলিস আজীবন নেক কাজ করার পরেও একটা গুনাহের কারণে অভিশপ্ত হয়েছে। মাত্র একবার সে আল্লাহর হুকুম মানেনি। আল্লাহ বলেছেন-তুমি মানুষকে সিজদা দাও। এই একটা কথা সে মানেনি। এর জন্য সে পুরোপুরি আল্লাহর জান্নাত থেকে, আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আর আমি-আপনি অবৈধ সম্পর্কের নামে পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহের সাথে লিপ্ত আছি। কখনো কি ভেবেছি? আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, জবান দিয়েছেন, হাত দিয়েছেন, পা দিয়েছেন, আমাকে দিল দিয়েছেন। এরপর দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
তিনি বলে দিয়েছেন-হে বান্দা! আমার দ্বীন-বিরোধী যত দিক আছে, যত ভালোবাসার পাত্র আছে, ওখান থেকে তোমার চোখকে হেফাজত করো, কানকে হেফাজত করো, জবানকে হেফাজত করো, দিলকে হেফাজত করো। তোমার কানে যেন আমার কথা বাজে; তোমার চোখ যেন আমার আয়াত, আমার কুরআন দেখে; তোমার দিলে যেন আমার যিকির প্রতিধ্বনিত হয়। তোমার হাত-পা যেন আমার কাজ করে।
আজকে এই অবৈধ সম্পর্কের নামে আমি আমার চোখকে নাপাক করেছি, আমি আমার কানকে নাপাক করেছি, জবানকে নাপাক করেছি, হাতকে নাপাক করেছি, পাকে নাপাক করেছি, দিলকে নাপাক করেছি। আল্লাহকে কোথায় আমি জায়গা দিলাম? আমার অর্থ নষ্ট করছি, মেধা নষ্ট করছি, সময় নষ্ট করছি, যৌবন নষ্ট করছি, ব্যক্তিগত জীবন নষ্ট করছি, পারিবারিক জীবন নষ্ট করছি, সমাজকে নষ্ট করছি, ঈমানকে নষ্ট করছি। এরপরও আমি আমাকে নিয়ে ভালো স্বপ্ন দেখি!
এ যুগে ঈমান বাঁচানো এত সহজ না। এই যুগে আমার মেয়ে, আমার সন্তান এই গুনাহে জড়িয়ে গিয়েছে। সে হয়তো মনের অজান্তেই পুরো জীবন থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছে। কখনোই সে ভাবেনি। ওই না ভাবতে না ভাবতে কবরে চলে যেতে হয়েছে। ওই সময় ফেরেশতা ঠিকই হিসাব নেবে। ফেরেশতাদের হিসাব অবশ্যই আমাদের চেয়ে বেশি।
অবৈধ সম্পর্কের নামে আমরা যেসব গুনাহে জড়িয়ে রয়েছি, সেগুলো আপনার সামনে পেশ করলাম। আমি কোনো অবাস্তব কথা বলিনি। আপনিই চিন্তা করুন। কিন্তু আফসোস! আল্লাহকে ভোলার কারণে আপনার অন্তরে সে অনুভূতিই নেই। এই চোখ, এই জবান, এই কান কেন আল্লাহ দিয়েছেন, ওটাও আপনি জানেন। কিন্তু আপনি এগুলো দ্বীনের প্রতি ব্যবহার করছেন না। করছেন অবৈধ সম্পর্কের প্রতি, অবৈধ ভালোবাসার প্রতি। এই অবৈধ ভালোবাসা যদি মন্দিরের নামে আসত, তাহলে মুমিনরা কিছু না কিছু হলেও বাঁচত। কিন্তু মুমিনের কাছে এটা এসেছে দুনিয়ায় সবচেয়ে মধুর নামে, 'ভালোবাসা'-র নামে। ভালোবাসার নাম করে আল্লাহ রব্বুল ইযযতের সাথে ভালোবাসা, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক-পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে আমরা যে কত ধরনের ফিতনার ভেতর নিমজ্জিত, কতভাবে যে ঈমানকে বিসর্জন দিচ্ছি, কতভাবে যে আল্লাহকে ভুলে থাকছি—এর ব্যাপারে কখনো ফিকির করি না। আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। অন্ততপক্ষে এই মজলিস থেকে তাওবা করুন। যুবক-যুবতী হোক, পিতা-মাতা হোক, আমরা এ ধরনের কোনো গুনাহকে সমর্থন করব না। আমরা সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব। আমরা আমাদের ঈমানকে বাঁচিয়ে চলব। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমিন।
এভাবে যদি একজন মুমিন নিজের জীবন গুনাহমুক্ত করতে পারে, নিজের জবানকে অপবাদ-অপপ্রচার থেকে সংযত করতে পারে, আলিম-উলামা ও নেককারদের সাথে জুড়ে থাকতে পারে; এরপর যদি সতর্কতার সাথে নারীদের থেকে দূরে থাকতে পারে, নিজের দেহ-মনকে নারীদের থেকে পবিত্র রাখতে পারে, তাহলে তার জীবন অসংখ্য অগণিত গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাবে। আর বর্তমানে যারা দ্বীন-ঈমান নিয়ে বাঁচতে চায়, তারাও এ ধরনের গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে না। তাই যে এই গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক ও সংযত হতে পারবে, সে জান্নাতের পথে অনেক দূরে এগিয়ে যাবে।
আর যেহেতু এই গুনাহ ঈমান-আমলের অনেক বেশি ক্ষতি করে, তাই সংগত কারণে আগামী পর্বে আমরা পর্দার বিধানের সাথে ঈমানের যোগসূত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করব। এর পরবর্তী পর্বে পর্দার স্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে পূর্ণভাবে পর্দার বিষয়টি আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আমরা আমাদের জীবনকে অসংখ্য-অগণিত গুনাহ থেকে মুক্ত করতে পারি, আর জান্নাতে যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ ও সুগম করতে পারি।
টিকাঃ
[৫৫] মুসনাদুশ শামিয়্যীন: ৭২৩; ভিন্ন শব্দে সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০; আলবানী 'ইরওয়াউল গালিল' গ্রন্থে (১৭৮৪) হাদীসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন।