📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ১৩. মানুষ যে নামে তাকে চেনে

📄 ১৩. মানুষ যে নামে তাকে চেনে


বর্তমানে ক্লাস টু থেকে নিয়ে সবাই এটাকে 'প্রেম' বা 'ভালোবাসা' নামে চেনে।
কিন্তু আমি আসলে কী নাম দেবো এই বিষয়ের, তা খুঁজে পাচ্ছি না। তবুও একটা নাম মোটামুটি আমার মনে ধরেছে। সেটা হলো 'অবৈধ সম্পর্ক'। অন্য অনেক নাম আমি খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে খুঁজেছি। আসলে কী নাম হতে পারে এ অপকর্মের। সবশেষে আপাতত এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, তাকে 'অবৈধ সম্পর্ক' বলেই অভিহিত করি।
অবশ্য মানুষের মাঝে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। কেউ এর নাম 'ভালোবাসা' দিয়েছে। আবার অনেকে 'প্রেম'। অনেকে আবার এটাকে ইংরেজিতে 'অ্যাফেয়ার' নামেও ডাকে। অথচ এ অপকর্মের সাথে 'ভালোবাসা'-এর মতো পবিত্র একটা বিষয়ের কী সম্পর্ক থাকতে পারে-তা আমার জানা নেই। কারণ মানুষের মাঝে সম্পর্কের দাম আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক। সেই সম্পর্ক যদি এমন হয়-যা মানুষকে তার খালিক থেকে সরিয়ে দেয়, তাহলে সেটাকে 'ভালোবাসা' বা অন্য কোনো সম্পর্কের নাম কিভাবে দেওয়া যায়! এটাকে তো অবৈধ সম্পর্ক বলতেও আমার ভালো লাগে না। এটা আবার সম্পর্ক হয় কী করে! এটা তো আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক নষ্ট করে। কিন্তু তারপরও যেহেতু সমাজের মানুষকে আমার এই কথা বোঝাতে হবে, এজন্য আমি এটার একটা নাম বাধ্য হয়েই দিয়েছি 'অবৈধ সম্পর্ক'। যাক, নাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দরকার নেই। এর সাথে আমরা সবাই পরিচিত। আমাদের এমন কোনো এলাকা নেই, এমন কোনো অঞ্চল নেই, এমন কোনো জেলা নেই, এমন কোনো জায়গা নেই-যেখানে এই সম্পর্কের ব্যাপারে মানুষ জানে না, ধারণা রাখে না।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ১৪. অবৈধ সম্পর্কের মানে

📄 ১৪. অবৈধ সম্পর্কের মানে


অবৈধ সম্পর্ক তো আপনারা সকলেই বোঝেন। ছেলে-মেয়ে একে অপরের সাথে বিবাহ-বহির্ভূত যে সম্পর্কে জড়ায়, এটাকে বলে অবৈধ সম্পর্ক। শুরুতে আমরা বলেছি, এটা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিস্তৃত এবং ভয়াবহ ফিতনার একটি। এবার আসুন, আমরা বিষয়টাকে একটু তলিয়ে দেখি। আপনার কাজ হলো, আমার কথাগুলো নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা।
আমি আমার সামান্য তালাশে, এই ভয়াবহ ফিতনার ভেতর যে অপরাধ লুকিয়ে রয়েছে-তা দেখার চেষ্টা করেছি। আমি একটা সংক্ষিপ্ত গুনাহের তালিকা করেছি। সেখানে সর্বমোট ৫৪টা গুনাহ বা অপরাধের লিস্ট পেয়েছি। আপনি শুনে হতবাক হয়ে যেতে পারেন! 'কী বলে হুজুর এসব!' কিন্তু আলোচনার শেষে আপনি নিজেই বলবেন, 'হুজুর তো কম বলেছে; আমি এরচেয়ে আরও বেশি বলতে পারতাম।' আরও বড় আশ্চর্যের বিষয় হলো, এগুলো আমি কুরআন-হাদীসের সাথে মিলিয়ে খুঁজে পেয়েছি। আলোচনা শেষে আপনি দেখবেন, চিন্তা করবেন। আরও বহু গুনাহ আপনি নিজেই খুঁজে পাবেন।
এরপর যে বিষয়টা আমাদেরকে দেখতে হবে, সেটা হলো-এর সাথে ঈমানের সংঘর্ষ আরও কত ভয়াবহ। কিন্তু স্বাভাবিক গুনাহের লিস্টে কয়টার কথা বললাম? ৫৪টা গুনাহ।
যখন এই অবৈধ সম্পর্কের মাঝে কতগুলো গুনাহ রয়েছে-তার খোঁজ করছিলাম, তখন এই ভেবে পেরেশান হয়ে পড়েছি যে, আমাদের কী অবস্থা হবে! আমাদের ইবাদত তো ইবলিসের সমপরিমাণও নয়। ইবলিস আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের কত হাজার বছর ইবাদত করেছে, নির্দিষ্টভাবে আমার জানা নেই। তবে এতটুকু বলা যায় যে, সে অনেক লম্বা সময় আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। কিন্তু ইবলিস আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের মাত্র একটা হুকুম মানেনি। আল্লাহ তাআলার বহু বিধান সে লঙ্ঘন করেছে, বিষয়টি এমন না। আল্লাহর শুধুমাত্র একটা হুকুমকে সে মানেনি। তাও আবার যৌক্তিক (!) কারণ দেখিয়ে বলেছে-'আমি তো সেরা। আমি মানতে পারছি না।' অথচ এক অবৈধ সম্পর্কের জেরে আমাদের সমাজে কত মানুষ প্রায় ৫৪টি গুনাহে জড়াচ্ছে। তাহলে শয়তান আর এদের মাঝে কতটুকু ব্যবধান, যদি এরা তাওবা না করে?
এজন্য দিলের ভেতরে এ অনুভূতি আনা প্রয়োজন যে, আমরা কত ভয়াবহ ফিতনার মাঝে জড়িয়ে আছি। আমরা এই অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে, আমাদেরকে অবশ্যই ইবলিসের সাথে উঠতে হবে। আর আমরা যাতে ইবলিসের কাতারে না দাঁড়াই, নিজেদের গুনাহের ব্যাপারে যেন সতর্ক হই, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করেছেন। পবিত্র কুরআনও প্রায় একই ভাষায় আমাদেরকে সতর্ক করেছে। ইরশাদ হচ্ছে,
قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
'তোমরা সেই জাহান্নাম থেকে নিজেরা বাঁচো এবং তোমাদের পরিবারকে বাঁচাও, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।'[৪৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اَتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
'জাহান্নام থেকে নিজেকে বাঁচাও; একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও।[৪۵]
জাহান্নাম থেকে কাকে বাঁচাও? নিজেকে বাঁচাও।
অথচ আমি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে বা নাটক-সিনেমা দেখে নিজের সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছি। প্রশ্ন করতে পারেন, 'কিভাবে?'
আমরা বলব : আসুন, একটু চিন্তা করে দেখি।
'আমি' বলার দ্বারা আমার দেহ ও মনকে বোঝায়। আর দেহের ভেতর উল্লেখযোগ্য অঙ্গ আছে মোট ছয়টি : চোখ, কান, জবান, হাত, পা, লজ্জাস্থান। আর অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি অঙ্গ-সহ মানুষের দিল গুনাহের মাঝে জড়িয়ে যায়। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই গুনাহগুলোকে যিনার মতো ভয়াবহ গুনাহের নামে অভিহিত করেছেন। নিম্নে হাদীসের ভাষ্য লক্ষ করুন:
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ حَظَّه مِنْ الزِّنَا أَدْرَكَ ذلِكَ لَا مَحَالَةَ فَزِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ وَزِنَا النِّسَانِ الْمَنْطِقُ وَالنَّفْسُ تَمَنّى وَتَشْتَهِي وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ وَيُكَذِّبُه مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "মহান আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের জন্য তার ব্যভিচারের অংশ লিখে রেখেছেন, সে তা নিশ্চয়ই করবে। চোখের ব্যভিচার হলো দেখা, জিহ্বার ব্যভিচার কথা বলা (যৌন-উদ্দীপ্ত কথা বলা)। আর মন চায় ও আকাঙ্ক্ষা করে এবং গুপ্তাঙ্গ তাকে সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।” [৪৬]
সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় আছে,
كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُه مِنَ الزِّنَا مُدْرِكُ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ الْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ وَالْأُذْنَانِ زِنَاهُمَا الْاِسْتِمَاعُ وَاللَّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ وَالرَّجُلُ زِنَاهَا الْخُطَا وَالْقَلْبُ يَهْوى وَيَتَمَنَّى وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُه
'আদম সন্তানের জন্য তাকদীরে যিনার অংশ যতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছে, সে ততটুকু অবশ্যই পাবে। দুই চোখের যিনা তাকানো, কানের যিনা যৌন-উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের যিনা আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের যিনা (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশ্যে) স্পর্শ করা, আর পায়ের যিনা ব্যভিচারের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া এবং মনের যিনা হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা। অতঃপর গুপ্তাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।[৪৭]
আপনি যদি হাদীসের বিষয়টি একটু গভীরভাবে লক্ষ করেন, তাহলে দেখবেন, অবৈধ সম্পর্কের কারণে বা নাটক-সিনেমা দেখার কারণে আমি-আপনি প্রতিনিয়ত চোখের যিনায় জড়াচ্ছি, কানের যিনায় জড়াচ্ছি, মুখের যিনায় জড়াচ্ছি, হাত-পায়ের যিনায় জড়াচ্ছি, সবশেষে লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে পারছি না। এভাবে প্রতিনিয়ত আমার গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি অঙ্গের মাধ্যমে আমি ছয় ধরনের যিনায় জড়িয়ে যাচ্ছি।
সাত নম্বর হলো, আমার মন-মস্তিস্কও এই গুনাহের মাঝে জড়িয়ে যাচ্ছে। এগুলো আমার কথা না। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-আদম সন্তান এই চোখ দ্বারা যিনা করবে। পরনারীর দিকে তাকিয়ে এই চোখ দ্বারা যিনা করবে।
শব্দটা কী? যিনা।
এরপর আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন-পরনারীর সাথে পুরুষের কথা বলা মুখের যিনা। পরনারী আরেক পুরুষের সাথে বসে কথা বলবে, এটা মুখের যিনা।
কে বলছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
তিনি আরও বলছেন-হাতের যিনা স্পর্শ করা। পায়ের যিনা হলো কোনো পরনারীর দিকে অথবা পরপুরুষের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-আর মানুষের দিল, এই দিল এই যিনার স্বপ্নকে লালন করে। পরনারীর স্বপ্নকে লালন করে গুনাহে আক্রান্ত হয়।
তার মানে হলো, অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের মৌলিক ছয়টি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যিনায় জড়িয়ে যায়। যেই প্রধান অঙ্গগুলো দিয়ে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে, সেই অঙ্গগুলো যিনার সাথে জড়িয়ে যায়। আর নফসও নিজেকে এই যিনার সাথে জড়িয়ে নেয়। নফসও পরনারী বা পরপুরুষের কথা দিলের ভেতর এনে কলবকে যিনা দ্বারা আক্রান্ত করে।
তাহলে সহজ হিসাব হলো, যদি আমি আর আপনি একবারও এই যিনার কাজগুলো করি, তাহলে একসাথে সাতটা গুনাহে জড়িয়ে যাচ্ছি।
মৌলিক অঙ্গের ছয়টি, আর দিলকে সঙ্গে নিলে হয় সাতটি।
এবার বলুন-কোনো ছেলে-মেয়ে যখন অবৈধ সম্পর্কে জড়ায়, তারা কি একবারই পরস্পরের দিকে তাকাতে চায়? একটা কথাই বলতে চায়? একটা কথাই শুনতে চায়? একবারই তার কাছে যেতে চায়? না, কখনোই না; বরং তার চোখ সব সময় তাকে দেখতে চায়, তার জবান তার সাথে সদা কথা বলতে চায়, তার কান সর্বদা তার কথা শুনতে চায়। অর্থাৎ উল্লিখিত সাতটা গুনাহ ধারাবাহিকভাবে তার জীবনে আসতে থাকে। শুধু একবার আসে না। সারাদিন যে কতবার আসে, আল্লাহই তা ভালো জানেন! যে গুনাহ বারবার করা হয়, তার সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমরা যদি সর্বনিম্ন সংখ্যা ধরি, তাহলে সাতের সাথে আরও সাত যোগ হয়ে ১৪টি হবে। কারণ, একটা হলো গুনাহ। আরেকটা হলো গুনাহ জারি রাখা। এটা আরও বড় গুনাহ। একবার খারাপ নজরে তাকালেই যিনার গুনাহ হয়। বারবার যখন এই গুনাহ চোখের মাধ্যমে জারি থাকে, সেটা তো আরও বড় গুনাহে রূপ নেবে। যেমন, একবার চুরি করা একটা গুনাহ। আর যদি ধারাবাহিকভাবে চুরি করে, তবে সেটা তো আরও বড় অপরাধ। গুনাহের ব্যাপারে আল্লাহ রব্বুল ইযযাত ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তিনি এও বলেছেন যে, 'গুনাহের কথা জানার পরে, কেউ যদি বারবার এই গুনাহ করে, ওই গুনাহ আমি মাফ করি না।'[৪৮]
তাহলে ভালোবাসার নামে প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের জীবনে গুনাহের যে চ্যাপ্টার শুরু হলো, এটা একটি মাত্র গুনাহ না। বরং এর সূচনা হয় সাতটি গুনাহের দ্বারা। এরপর সাত থেকে চৌদ্দটি গুনাহে রূপান্তরিত হয়। এভাবে কত হাজার গুনাহের সাথে যে বান্দা জড়িয়ে যায়, ওই হিসাবটা কখনোই আমি করতে পারব না। আমার জন্য করা সম্ভবও না। কেবল আল্লাহই তার হিসাব জানেন। এমনকি যে ব্যক্তি এই পাপে লিপ্ত, সেও জানবে না, কতবার সে যিনার গুনাহ করছে।
নিম্নে বাকি গুনাহগুলোর ব্যাপারে উল্লেখ করা হলো:
১৫. ব্যক্তির চরিত্র নষ্ট হয়। অবৈধ সম্পর্কের দরুন ছেলে-মেয়ে-উভয়ের চরিত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। অথচ চরিত্র শরীয়তে মহা মূল্যবান সম্পদ।
১৬. ছেলে-মেয়ে একাকী মিলিত হয়। যতই সম্পর্ক বাড়তে থাকে, ততই তাদের মাঝে একাকী মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন কারণ তৈরি করে একজন আরেকজনের সাথে একান্তে মিলিত হয়। এ ব্যাপারে হাদীসে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ حَدَّثَنَا عَمْرُو عَنْ أَبِي مَعْبَدٍ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ امْرَأَتِي خَرَجَتْ حَاجَّةً وَاكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا قَالَ ارْجِعْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ
ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "মাহরামের বিনা উপস্থিতিতে কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে না।” এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্ত্রী হজ করার জন্য বেরিয়ে গেছে এবং অমুক অমুক জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য আমার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।” নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ সম্পন্ন করো।” [৪৯]
পূর্ণ হাদীসটি যদি আপনি গভীরভাবে লক্ষ করেন, তাহলে দেখবেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সাহাবির বিবিকে একাকী হজে যেতে অনুমতি দেননি; বরং সেই সাহাবিকে জিহাদের লিস্ট থেকে নাম কাটিয়ে তার বিবির সাথে হজে যেতে বলেছেন। এবার বলুন, অপরিচিত ছেলে-মেয়ে একসাথে বসাটা, বিশেষ করে একাকী বساটা, একাকী থাকাটা শরীয়তে কত বড় অন্যায়।
এমনকি, শরীয়তে যারা মাহরাম, তাদের সাথে একাকী থাকতেও সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
১৭. শরীয়তে নিষিদ্ধ কাজ, যেমন: গান-বাজনার আসরে বা পার্কে বান্ধবীর ডাকে সাড়া দিয়ে যেতে হয়। আপনি চিন্তা করে দেখুন যে, এটা আল্লাহ তাআলার কত বড় হুকুমের লঙ্ঘন।
১৮. আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাদ দিয়ে, অবৈধ সম্পর্কের জেরে তারা একে অপরকে সর্বোচ্চ আপন মনে করে। নিজেদের পিতা-মাতার চেয়ে তারা পরস্পরকে আপন মনে করে।
১৯. ব্যক্তি বিভিন্ন গানে আসক্ত হয়ে যায়। আগে গান শুনত না-এমন অনেকে গান শুনতে শুরু করে। কেউ কেউ প্রেমের গানে মজে। আবার, সম্পর্ক না টিকলে বিরহের গানে আসক্ত হয়।
২০. ব্যক্তি নেশায় আসক্ত হয়ে যায়। এর আবার ধরন ভিন্ন হয়। কখনো নারীকে নিয়ে একসাথে নেশা করে। কখনো নারীকে না পেলে নেশাকে সঙ্গী করে নেয়।
২১. আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। অথচ আত্মহত্যা শরীয়তের অনেক বড় গর্হিত কাজ ও বড় বড় অপরাধের একটি।
২২. অর্থ অবৈধ কাজে ব্যয় হয়। সম্পর্ক হওয়ার পর থেকেই এ অবৈধ পথে অর্থ ব্যয় হতে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা অবৈধ খাতে অর্থ ব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। বিভিন্ন ঘোরাফেরার নামে, গিফট আদান-প্রদানের নামে, বাহিরে খাবার খাওয়ার নামে এই অবৈধ পথে টাকা ব্যয় হতেই থাকে।
২৩. মেধা অবৈধ কাজে ব্যয় হয়। আল্লাহ তাআলার দেওয়া অনেক বড় নিয়ামত হলো মেধা। এই মেধা কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকে অর্জন করতে হয়। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের ফলে পূর্ণ মেধা খরচ হয়, কিভাবে তার অবৈধ সঙ্গীর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে-তার পেছনে।
২৪. ব্যাপকভাবে সময়ের অপচয় হতে থাকে। অথচ সময়টা মানুষের জীবনের একটা অংশ। এই অংশগুলোকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহ তাআলার হুকুমকে মান্য করে, নিজেকে আল্লাহ তাআলার কাছে সফল করতে হয়। কিন্তু এক অবৈধ সম্পর্কের কারণে জীবনের দামি সময়গুলো অবৈধ কাজে নষ্ট হতে থাকে। কখনো ফোনালাপে, কখনো চ্যাটিংয়ে। এভাবে জীবনের বহু রাত-দিন শেষ হতে থাকে।
২৫. যৌবন অবৈধ কাজে শেষ হয়। মানুষের জীবনের আসল সময় হলো যৌবনকাল। এই যৌবনকালকে কাজে লাগিয়ে মানুষ আল্লাহ তাআলার কাছে এত প্রিয় হতে পারে যে, আরশের নিচে যারা ছায়া পাবেন, নিজেকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে। আর যদি যৌবনকে নষ্ট করে, তাহলে অবশ্যই হাশরের ময়দানে সূর্যের তাপে প্রচণ্ড রোদের মাঝে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
অথচ এক অবৈধ সম্পর্কের কারণে সে তার যৌবনকে নষ্ট করে আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার এক বড় সুযোগকে হাতছাড়া করে।
আবার, এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে বহুদিক থেকে ঈমানের বিরোধ ও সংঘর্ষ রয়েছে। তাই, এখান থেকে ঈমানের সাথে সম্পর্কিত কিছু গুনাহের কথা উল্লেখ করব-যা অবৈধ সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট হয়।
২৬. লজ্জা ঈমানের অংশ। অবৈধ সম্পর্কের কারণে তা পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
২৭. ব্যক্তি সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকে; তার অবৈধ সঙ্গীর ভাবনায় বিভোর থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْمَى
'যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।'[৫০]
২৮. গুনাহের প্রতি ঘৃণা দিল থেকে মুছে যায়। একের পর এক গুনাহ করতে করতে একসময় গুনাহের প্রতি স্বভাবজাত ঘৃণা দিল থেকে উঠে যায়। আর, যার দিল থেকে গুনাহের প্রতি ঘৃণা উঠে যায়, তার ঈমান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
وَعَنْ أَبِي أُمَامَةَ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَا الْإِيمَانُ؟ قَالَ : إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ. قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا الْإِثْمُ؟ قَالَ : إِذَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ شَيْءٌ فَدَعْهُ. رَوَاهُ أَحْمَدُ
আবু উমামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'জনৈক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! ঈমান কী?” তিনি বললেন, "যখন তোমাকে নেককাজ আনন্দ দেবে এবং খারাপ কাজ পীড়া দেবে, তখন তুমি মুমিন।” আবার সে লোকটি জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! খারাপ কাজ কী?” উত্তরে তিনি বললেন, "যখন কোনো কাজ করতে গিয়ে তোমার মনে দ্বিধা ও সন্দেহের উদ্রেক ঘটে (তবে মনে করবে এটা গুনাহের কাজ), তখন তা ছেড়ে দেবে।””[৫১]
২৯. গুনাহ পরিণত হয় সর্বোচ্চ মজার বস্তুতে।
যে অপকর্মের প্রতি ঘৃণা থাকাটা ছিল ঈমানের আলামত; অথচ আজ সেই অবৈধ সম্পর্কের কারণে হওয়া গুনাহ পৃথিবীর সবচেয়ে মজার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। একটু চিন্তা করুন, এটা কত বড় অপরাধ! কত বড় অন্যায়!
৩০. গুনাহ গর্বের বস্তুতে পরিণত হয়। যা ছিল বড় ঘৃণার, বড় অপমানকর, আজ তা রূপান্তরিত হয়েছে বড় গর্বের বিষয়ে। কত বড় অধঃপতন হলে এমন হতে পারে!
৩১. গুনাহের কাজ প্রকাশ্যে করা শুরু হয়।
গুনাহের কাজ করা যেভাবে আল্লাহ তাআলার দরবারে অভিশপ্ত হওয়ার কারণ, তদ্রূপ তা প্রকাশ্যে করা আরও অধিক অভিশপ্ত হওয়ার মাধ্যম। আর এ অবৈধ সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসবেই।
৩২. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা হয়। যারা এ সম্পর্কে জড়ায়, তারা গুনাহকে গুনাহই মনে করে না।
অনেকে আবার এটাকে সর্বোচ্চ পবিত্র ও বৈধ বিষয় মনে করে। তখন তো তা সরাসরি ঈমান না থাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৩৩. পর্দাকে উপেক্ষা করা হয়, যবনিকা টানা হয়। এমনি যতই সে পর্দা করুক না কেন, এ ধরনের সম্পর্ক হওয়ার পরে সব ধরনের পর্দাকে সে ভুলে যায়। বরং একজন আরেকজনের কাছে স্বামী-স্ত্রীর চেয়ে বেশি আপন হয়। আপনি চিন্তা করুন, এর চেয়ে বড় অপরাধ হতে পারে!
এবার এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে জড়িত কিছু পারিবারিক অপরাধের কথা তুলে ধরব।
৩৪. ভ্রূণ নষ্ট করা হয়; কখনো সন্তান পর্যন্ত নষ্ট করা হয়। পত্র-পত্রিকা দেখলে এরকম হাজারও ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে। এখন তো এ ধরনের ঘটনাও অস্বাভাবিক নয় যে, ডাস্টবিনে বা বাথরুমে মানব সন্তান ফেলে রাখা হয়।
৩৫. আয়োজন করে গুনাহের সাক্ষী তৈরি করা হয়। এ ধরনের সম্পর্কে জড়িত লোকেরা সাধারণত বন্ধুবান্ধব-সহ অনেককে গুনাহের কথা বলে বেড়ান। আর কোনো গুনাহের সাক্ষী রাখা হলে, সেই গুনাহের ওপর এক ধরনের সীলমোহর পড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা চান না, বান্দা কাউকে তার গুনাহের সাক্ষী রাখুক; বরং তিনি চান, বান্দা তাঁর কাছে ক্ষমা চাক।
৩৬. পিতা-মাতার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়, পিতা-মাতার অবাধ্যতার পথ সুগম হয়। পিতা-মাতার অবাধ্যতা শরীয়তের সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহের একটি। অবৈধ সম্পর্কের ফলে প্রায়শই এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে।
৩৭. মাতা-পিতা বা পরিবারের যারা একে সমর্থন দেয়, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরফ থেকে অভিশপ্ত দাইয়্যুস বা নিশ্চিত জাহান্নামি উপাধি লাভ করে।
عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسَرٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ أَبَدًا الدَّيُوْتُ وَالرَّجْلَةُ مِنَ النِّسَاءِ وَمُدْمِنُ الْخَمْرِ
আম্মার ইবনু ইয়াসার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তিন শ্রেণীর মানুষ কখনো জান্নাতে যাবে না: (১) যে ব্যক্তি তার পরিবারে বেহায়াপনার সুযোগ দেয়। (২) পুরুষের বেশধারী নারী। (৩) নিয়মিত নেশাজাতীয় দ্রব্য পানকারী। [৫২]
৩৮. অনেক বাবা-মা এ অপরাধ মানতে না পারলে সন্তানকে হারাতে হয়। আর যে পিতা-মাতা এ অবৈধ সম্পর্ক বছর বছর ধরে মেনে নেয়, তারা বছর বছর ধরে আল্লাহকে হারায়।
৩৯. ইসলামি পারিবারিক জীবন নষ্ট হয়-যার ওপর মানবতার ভিত্তি। এ অবৈধ সম্পর্কের কারণে ইসলামি পারিবারিক জীবন হুমকির মুখে পড়ে। ইসলাম মায়ের গর্ভ ও বাবার ঔরশ পবিত্র চায়। কিন্তু এ সম্পর্কের কারণে সব নাপাক হয়ে যায়। সন্তান নাপাক পাত্র হয়ে আসে। এমন সন্তান কী করে দ্বীনের ধারক-বাহক হবে!
৪০. বৈধ সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। যতই অবৈধ সম্পর্ক ব্যাপক হবে, ততই বৈধ সম্পর্কের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারাবে। দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হবে।
৪১. অনেকের সংসার ভাঙে-এ অবৈধ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। কত সংসার নষ্ট হলো। কত শিশুসন্তান অসহায় হলো। কত মহিলা স্বামী হারাল। এর পরিসংখ্যান তৈরি করাও দুষ্কর হবে।
৪২. অনেক ক্ষেত্রে জীবিকার উপযুক্ত একমাত্র ছেলে হারিয়ে পিতা-মাতাকে ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়। আর বর্তমানে মানুষের সন্তান এমনিতেই কম হয়।
এবার কিছু সামাজিক গুনাহের কথা আলোচনা করব— যেগুলো এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে জড়িত।
৪৩. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ অবৈধ সম্পর্ক যত ব্যাপক হয়, তত বেশি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শুরু হয়। এমনই করে পুরো সমাজ-ব্যবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়। তখন শরীয়তের সবচেয়ে বড় অপরাধ স্বাভাবিক হয়ে যায়। বর্তমানে এ কথা কাউকে বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই।
৪৪. নারী-পুরুষের মাঝে চলনে-বলনে যে পার্থক্য শরীয়ত দিয়েছে, সে পার্থক্য ঘুচে যায়—যা হাজারও অনিষ্টের কারণ।
৪৫. রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে নারীদের সরব উপস্থিতি পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। ফ্রি-মিক্সিং বাড়ছে।
৪৬. নারী তার পোশাক ও চুলের ধরন পরিবর্তন করে—যা শরীয়তে অভিশপ্ত হওয়ার বড় একটি কারণ।
৪৭. স্বেচ্ছায় গর্ভের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়—যার ফলে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র উম্মত নাপাক পাত্রে বড় হয়। এক কথায় নসল বা বংশ নষ্ট হয়।
৪৮. সমাজে অবৈধ সন্তান জন্ম নেয়।
৪৯. স্বেচ্ছায় না হলে, জোরপূর্বক ধর্ষণ ও ইভটিজিংয়ের রাস্তা উন্মুক্ত হয়।
৫০. সমাজ থেকে গুনাহের প্রতি ঘৃণা দূর হয়ে গুনাহে সমাজ দূষিত হয়। মুসলিমদের মাঝে আর ইউরোপ-আমেরিকার লোকদের মাঝে চালচলনে কোনো ব্যবধান আর থাকে না। ইসলামি চালচলন নিঃশেষ হয়ে যায়।
৫১. বড় বড় মারামারি ও হানাহানির ঘটনা ঘটতে থাকে।
৫২. সমাজে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ দেশের খবর যাদের আছে, তারা জানে, প্রতিদিন যেসব খুনের ঘটনা ঘটে, এর একটা বড় কারণ এ অবৈধ সম্পর্ক।
৫৩. পরকীয়া বিস্তার লাভ করে।

টিকাঃ
[৪৪] সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ৬।
[৪৫] মুসলিম, ২২২১।
[৪৬] বুখারি, ৬২৪৩; মুসলিম, ২৬৫৭; আবু দাউদ, ২১৫২; আহমাদ, ৭৭১৯।
[৪৭] মুসলিম, ২৬৫৭।
[৪৮] এটি মূলত সূরা আলে ইমরানের ১৩৫ নং আয়াতের মর্মানুবাদ। আয়াতটিতে মুত্তাকী বা আল্লাহভীরুদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে তারা গুনাহর ওপর অবিচল থাকে না।
[৪৯] বুখারি, ৪৮৫৩।
[৫০] সূরা ত্ব-হা, ২০: ১২৪।
[৫১] মুসনাদু আহমাদ, ২১৬৬২; সহিহুত তারগীব, ১৭৩৯; সহিহ হাদীস।
[৫২] তারগীব, ৩৩৮১; সহিহ হাদীস।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 সাবধান হই, সতর্ক হই

📄 সাবধান হই, সতর্ক হই


ওপরে আমরা যে গুনাহের লিস্ট আপনাকে দিলাম, সে কথাগুলো আবারও ভাবনা আকারে আপনার কাছে তুলে ধরছি, যাতে আপনার দিলেও ভাবনাগুলো তৈরি হয়। আমি-আপনি সংশোধিত হতে পারি। আমাদের সন্তানদেরকে সংশোধন করতে পারি।
মানুষের চরিত্র নষ্ট করা অনেক বড় গুনাহ। অবৈধ সম্পর্কে জড়ালে মানুষের চরিত্র নষ্ট হয়। এই গুনাহের আরেকটা বড় সমস্যা হলো একাকী মিলিত হওয়া। একজনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক হলে, তারা চায় আলাদা একাকী মিলিত হতে। আলাদা কথা বলতে চায়। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ
'কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্ত গোপনে অবস্থান না করে।[৫৩]
এটা অনেক বড় গুনাহ। মায়ের পেটের আপন বোনের সাথেও একাকী দীর্ঘ সময় কাটানো সতর্কতা পরিপন্থি কাজ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা সুযোগ পেলেই আলাদা মিলিত হওয়ার চেষ্টা করে। এই গুনাহের আরেকটা ফল হলো, যখন কারও সাথে সম্পর্কে জড়িত হয়, সে যদি তাকে কোনো অন্যায় কাজে ডাকে, তবে তাকে যেতে হবে। না চাইলেও যেতে হবে। গানের অনুষ্ঠানে, কোথাও ঘুরতে, কোথাও সফরে, কোথাও পিকনিকের নামে যেতে হবে নিজের ইচ্ছার বাইরে। তার সাথে সম্পর্কের কারণে সে আপনাকে গুনাহের বিভিন্ন মজলিসে নিয়ে যাবে।
একজন মানুষ কি বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে আপন হতে পারে? হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে? কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের এত বেশি আপন হয় যে, দুনিয়াতে এরচেয়ে বেশি কোনো আপনজন নেই। স্বামী-স্ত্রীও এত বেশি আপন হয় না, এরা যত বেশি আপন হয়। এরা একজন আরেকজনের জন্য সবকিছু জায়েজ মনে করে। এই যে একজন আরেকজনকে সবকিছু মনে করছে এবং স্বামী-স্ত্রীর থেকেও আপন হয়ে যাচ্ছে, এখানে শরীয়ত নির্ধারিত সম্পর্ককে যে উপেক্ষা করা হচ্ছে, সেটা কি বুঝতে পারছেন?
চিন্তা করুন, বাস্তবতার সাথে মেলান। কতগুলো গুনাহ তারা একসাথে জড়ো করে ফেলছে!
অনেকে হয়তো গান শোনায় হালকা আসক্ত থাকে, কিন্তু এই সম্পর্কে এসে নতুন করে গান শোনার স্পিড বেড়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে পূর্বে শোনা গানের ধরন বদলে গিয়ে নতুন ধরনের গান শোনা শুরু হয়। এই সম্পর্কের শুরুতে গানের ধরন এক রকম থাকে; আবার যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ছ্যাঁকা খাওয়া গান শোনে, বিরহের গান শোনে। গান শোনা কত ভয়ানক অন্যায়! গান দিলের ভেতরের ঈমানকে সরিয়ে নিফাককে প্রতিষ্ঠিত করে। আর সেই অবৈধ সম্পর্কের কারণে গানের প্রতি আসক্তি আরও বেড়ে যায়। অবলীলায় কবীরা গুনাহ হতে থাকে।
অনেকেই এই সম্পর্কের কারণে নেশা করে। কেউ কেউ আবার সম্পর্কে ব্যর্থ হয়ে নেশায় আসক্ত হয়। এগুলো স্বাভাবিক চিত্র সমাজের।
এই এক অবৈধ সম্পর্কের কারণে আমি গানে জড়াচ্ছি, নেশায় জড়াচ্ছি। এরপরে সবচেয়ে বড় যে দুর্ঘটনা, ওই দুর্ঘটনাও ঘটে। আত্মহত্যা নামক বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে এই দুর্ঘটনা ঘটেনি। আছে কি কোনো এলাকা? আমার জানা নেই। তাহলে এই সম্পর্কের কারণে আত্মহত্যার মতো বড় অপরাধ ঘটছে। বাস্তবতা আপনি মিলিয়ে দেখুন। আমি শুধু লিস্টগুলো আপনাদেরকে দিচ্ছি।
সম্পর্ক যেহেতু অবৈধ, এখানে টাকা ব্যয় করা কি অবৈধ না? বাবা-মা যে টাকা দেয়, একটা বৈধ খাতে তা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সেটা ব্যয় হয় অবৈধ খাতে। এই মালের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আলাদা করে সওয়াল করবেন। আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার জন্য দেহ-মন-সব ত্যাগ করে দিলাম, তার পেছনে আমি যে টাকা-পয়সা খরচ করছি, আল্লাহ এই টাকার হিসাব নেবেন না? এই যে অনর্থক কাজে টাকা ব্যয় করছি, এটা কি ছোট অন্যায়, নাকি অনেক বড়?
মানুষকে মেধা দেওয়া হয়েছিল আল্লাহকে খোঁজার জন্য, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য। অথচ এই হারাম সম্পর্কের দ্বারা মেধার অপচয় ঘটে। ওটা তো সম্পর্কই না, যে সম্পর্কে মেধার অপচয় ঘটে।
মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো সময়। এ সময়ের ভেতরেই আমাকে জান্নাত অর্জন করতে হবে। এই হারাম সম্পর্কের কারণে কত রাত আর কত দিন আমি যে নষ্ট করেছি, সেটার কি হিসাব আছে?
মানুষের আরেকটা বড় সম্পদ হলো যৌবনকাল। এই সময়ে যে আল্লাহর ইবাদত করবে, সে নবিদের সাথে আরশের নিচে ছায়া পাবে। আর এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয় মানুষের যৌবন। কিয়ামতের দিন এই যৌবনকালের ব্যাপারে হিসাব দিতে না পারলে আল্লাহ তাআলা এক পা-ও এগুতে দেবেন না।
'তুমি তোমার যৌবনকে কোথায় নষ্ট করেছো?-এই হিসাব দিয়ে দাও।'
এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের যৌবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে যৌবন ছিল নবিদের সাথে হাশরের ময়দানে আল্লাহর সান্নিধ্যে আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার জন্য, এই সম্পর্কের কারণে সে যৌবন বিনষ্ট হচ্ছে।
এই সম্পর্ক ঈমানকে কতটা আঘাত করে, চিন্তা করুন। গুনাহের লিস্ট আপনারা করুন।
লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الْإِيمَانِ
'নিশ্চয়ই লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ।'[৫৪]
লজ্জা, ঈমানের একটা বিশেষ শাখা। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে লজ্জা নষ্ট হয়। শরীয়ত যেটাকে লজ্জা বলেছে, সেখানে লজ্জা করা ফরজ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা এখানে এসেই সবচেয়ে বেশি ফ্রি হয়ে যায়। এতে তাদের লজ্জা নষ্ট হয়, ঈমান নষ্ট হয়। এখানে ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণ বিদ্যমান থাকে।
আল্লাহ তাআলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন আল্লাহর যিকির করার জন্য। দিল দিয়েছেন আল্লাহকে সেখানে বসানোর জন্য। জবান, হাত, পা, চোখ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, তাঁর সামনে নত রাখার জন্য। আরেকটু চিন্তা করুন। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়ায়, তখন আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ, কান, জবান, হাত, পা, দিল-সব নিয়মিতভাবে গাফেল হয়ে যায়। শয়নে-স্বপনে-সব অবস্থায় সে আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের স্মরণ বাদ দিয়ে আরেক অবৈধ ব্যক্তির স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। মনে রাখবেন, এটা কিন্তু ঈমানের ওপর আঘাত।
একজন মুমিন গুনাহকে ঘৃণা করবে না—এটা হতেই পারে না। এটা সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ। গুনাহকে ঘৃণা না করলে ঈমান যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে আমরা যে কাজটা করি, এর দ্বারা যিনার প্রতি ঘৃণা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়। এটা ঈমান হারানোর একটা বড় কারণ। এই সম্পর্কের কারণে গুনাহ ঘৃণার বস্তু হওয়া তো দূরের কথা, আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। সর্বোচ্চ লেভেলের গুনাহ তার কাছে প্রিয় এবং মজার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। একজন মুমিনের জীবনে এটা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু অবৈধ সম্পর্কের কারণে এমনটা হয়। নামাজে মজা থাকে না, রোজায় মজা লাগে না; সব মজা লেগে থাকে যিনার মধ্যে। তাহলে যেটা সবচেয়ে ঘৃণার বস্তু ছিল, সেটা এখন সবচেয়ে মজার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মানুষ এটাকে নিয়ে রীতিমতো গল্প করে। এতগুলো গুনাহ সে গল্প করে বন্ধুবান্ধবের কাছে পেশ করে। এর দ্বারা গুনাহের প্রতি ঘৃণা উবে যায়। গুনাহ তখন সর্বোচ্চ মজার বস্তুতে পরিণত হয়। তখন আর ঈমানের দাম কোথায় রইল?
এই গুনাহের কারণে শরীয়তের একটা বড় বিধান—পর্দাও ঢিলেঢালা হয়ে যায়। পর্দা দিল থেকে উঠে যায়। অবৈধ কাজে জড়ানোর কারণে কত ভ্রূণ যে নষ্ট করা হয়, আল্লাহই জানেন। কখনো কখনো তো সন্তানও নষ্ট করা হয়। এটা কি ছোট অন্যায়, নাকি বড় অন্যায়? কখনো নবজাতককে ডাস্টবিনে পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় বাথরুমে। কখনো এই অবৈধ নবজাতককে হাসপাতালে রেখেই দৌড় দেয়। একজন মানব সন্তানের দুনিয়াতে বাঁচার অধিকার ছিল, কিন্তু ওই সন্তান এখন ডাস্টবিনে পড়ে আছে। বলুন তো, একটা মাসুম বাচ্চার অপরাধ কোথায়?
আজকাল আবার এই গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা হয়। পরিবারের লোক সাক্ষী, বন্ধুবান্ধব সাক্ষী। গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা যে কত বড় অন্যায়! গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কবীরা গুনাহ। অথচ অবৈধ সম্পর্ক লালনকারীরা গুনাহের ব্যাপারে সাক্ষী রাখে সবাইকে।
পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। পিতা-মাতার হাজারও বৈধ স্বপ্ন থাকে এই সন্তানের জন্য। আর সে সন্তান সব স্বপ্ন নষ্ট করে ফেলে। পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা কি শরীয়তসিদ্ধ কাজ? শরীয়তে কি এই কাজের অনুমতি আছে? তো এই কাজের মাধ্যমে পিতা-মাতার অবাধ্যতার রাস্তা কি সুগম হয় না?

টিকাঃ
[৫৩] তিরমিজি, ১১৭১।
[৫৪] বুখারি, ৫৬৮৮।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়

📄 পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়


যদি কোনো পিতা-মাতা এটাকে বৈধতা দেয়, তবে সেও আল্লাহর নাফরমান হবে। আরও বড় গুনাহ যেটা হয়-সেটা হলো, হাদীসের ভাষায় ওই পিতা-মাতা দাইয়্যুসে রূপান্তরিত হয়। যারা এগুলো সমর্থন করে, তারা দাইয়্যুস। দাইয়্যুসের জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়েছে। জাহান্নামকে ওয়াজিব করা হয়েছে। পিতা-মাতা হোক, অথবা বন্ধুবান্ধব, এই কাজ সমর্থন করার কারণে নিজের ওপর থেকে ওরা জান্নাতকে হারাম করে নেয়।
ইসলামি পারিবারিক জীবন হলো মানুষের বৈশিষ্ট্য। অথচ এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে মানুষের পারিবারিক জীবন ধ্বংস হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যে বৈধ সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হয়। অবৈধ সম্পর্কে সে যে মজা পেয়েছে, সেই মজার কারণে সমাজের ভেতর বৈধ সম্পর্কের ঘাটতি দেখা দেয়। ধরুন কোনো স্বামী মারা গিয়েছে, সে জন্য কি তার স্ত্রী কখনো আত্মহত্যা করে? আমি তো এটা সমাজে দেখি না। ঘটেছে নাকি কোথাও? কিন্তু একজন প্রেমিক মারা গেলে সেজন্য প্রেমিকা মরে গিয়েছে, এমন ঘটনা কি কম? তাহলে বৈধ সম্পর্কের প্রতি যে আকর্ষণ, সেই আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেকের সংসার পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায়। আবার অনেকের সন্তান ইয়াতিম হয়। এগুলো কি ছোট গুনাহ মনে হয়? কখনোই না। আর অনেক সময় দেখা যায়, পিতা-মাতার একটাই সন্তান। পিতা-মাতা বুড়ো হয়ে গিয়েছে এই সন্তানকে পালন করতে করতে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এখন সে-ই। কিন্তু এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। এখন তার পিতা-মাতাকে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। এই দৃশ্য তো একেবারে অহরহ। সামাজিকভাবে আজ কত বড় বড় গুনাহ ঘটছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা শরীয়তে কত বড় অন্যায়। চলনে-বলনে নারী-পুরুষের যে পার্থক্য শরীয়ত করে দিয়েছে, অবাধ মেলামেশার কারণে এই পার্থক্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিয়ে কিয়ামতের দিন গর্ব করবেন।
إِنِّي مُكَاثِرُ بِكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'কিয়ামতের দিন তোমাদের নিয়ে আমি গর্ব করব।'[৫৫]
আমরা কি নবিজির এই তামান্নার প্রতি খেয়াল রেখেছি? নাকি উল্টো পথে হাঁটছি?
সন্তান মায়ের পেটে যে গর্ভের ভেতর থাকে, এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে তা নষ্ট হয়। ওই অপবিত্র পাত্র থেকে পবিত্র সন্তানের আশা করা যায় না। নাপাক গর্ভ থেকে হাসান বসরির জন্ম হবে না, দুষ্টের জন্ম হবে। শয়তানের জন্ম হবে। কোনো নেককার জন্ম হতে পারে না। ওটার পাত্রই তো নষ্ট! আবার, অবৈধ সম্পর্কের ছড়াছড়ির কারণে 'সন্তান বৈধ না অবৈধ'-এই প্রশ্নই তো পেরেশানির। দেখুন, সমাজের ভেতরে যত ইভটিজিং আর যত ধরনের অন্যায় কাজ-সব এই খারাপ সম্পর্কের জের ধরেই সৃষ্টি হয়। পুরো সমাজের মানুষ এটা দেখতে দেখতে অধিকাংশের ভেতরে এর প্রতি ঘৃণাও চলে যায়। ঈমানি সমাজের যে বৈশিষ্ট্য, সে বৈশিষ্ট্যই নষ্ট হয়ে যায়, খতম হয়ে যায়।
পরকীয়ার ঘটনা আপনি পড়ুন। এই পরকীয়ার জেরে যত দুর্ঘটনা দুনিয়াতে ঘটছে-সূত্রে দেখা গিয়েছে, বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এর একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। বাবা-মা বিয়ে দেয়নি, এ কারণে আজকে তাদের পরকীয়ার সম্পর্ক হয়েছে। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণে কত মারামারি-হানাহানি হয়, হত্যা-দুর্ঘটনা হয়, আল্লাহ জানেন!
পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহ শুধুমাত্র এই অবৈধ সম্পর্কের সাথে যুক্ত। আর আমরা এটা থেকে নিজেদেরকে করতে পারছি না মুক্ত। একটু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। ইবলিস আজীবন নেক কাজ করার পরেও একটা গুনাহের কারণে অভিশপ্ত হয়েছে। মাত্র একবার সে আল্লাহর হুকুম মানেনি। আল্লাহ বলেছেন-তুমি মানুষকে সিজদা দাও। এই একটা কথা সে মানেনি। এর জন্য সে পুরোপুরি আল্লাহর জান্নাত থেকে, আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আর আমি-আপনি অবৈধ সম্পর্কের নামে পঞ্চাশোর্ধ বড় বড় গুনাহের সাথে লিপ্ত আছি। কখনো কি ভেবেছি? আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, জবান দিয়েছেন, হাত দিয়েছেন, পা দিয়েছেন, আমাকে দিল দিয়েছেন। এরপর দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
তিনি বলে দিয়েছেন-হে বান্দা! আমার দ্বীন-বিরোধী যত দিক আছে, যত ভালোবাসার পাত্র আছে, ওখান থেকে তোমার চোখকে হেফাজত করো, কানকে হেফাজত করো, জবানকে হেফাজত করো, দিলকে হেফাজত করো। তোমার কানে যেন আমার কথা বাজে; তোমার চোখ যেন আমার আয়াত, আমার কুরআন দেখে; তোমার দিলে যেন আমার যিকির প্রতিধ্বনিত হয়। তোমার হাত-পা যেন আমার কাজ করে।
আজকে এই অবৈধ সম্পর্কের নামে আমি আমার চোখকে নাপাক করেছি, আমি আমার কানকে নাপাক করেছি, জবানকে নাপাক করেছি, হাতকে নাপাক করেছি, পাকে নাপাক করেছি, দিলকে নাপাক করেছি। আল্লাহকে কোথায় আমি জায়গা দিলাম? আমার অর্থ নষ্ট করছি, মেধা নষ্ট করছি, সময় নষ্ট করছি, যৌবন নষ্ট করছি, ব্যক্তিগত জীবন নষ্ট করছি, পারিবারিক জীবন নষ্ট করছি, সমাজকে নষ্ট করছি, ঈমানকে নষ্ট করছি। এরপরও আমি আমাকে নিয়ে ভালো স্বপ্ন দেখি!
এ যুগে ঈমান বাঁচানো এত সহজ না। এই যুগে আমার মেয়ে, আমার সন্তান এই গুনাহে জড়িয়ে গিয়েছে। সে হয়তো মনের অজান্তেই পুরো জীবন থেকে আল্লাহকে বিদায় দিয়েছে। কখনোই সে ভাবেনি। ওই না ভাবতে না ভাবতে কবরে চলে যেতে হয়েছে। ওই সময় ফেরেশতা ঠিকই হিসাব নেবে। ফেরেশতাদের হিসাব অবশ্যই আমাদের চেয়ে বেশি।
অবৈধ সম্পর্কের নামে আমরা যেসব গুনাহে জড়িয়ে রয়েছি, সেগুলো আপনার সামনে পেশ করলাম। আমি কোনো অবাস্তব কথা বলিনি। আপনিই চিন্তা করুন। কিন্তু আফসোস! আল্লাহকে ভোলার কারণে আপনার অন্তরে সে অনুভূতিই নেই। এই চোখ, এই জবান, এই কান কেন আল্লাহ দিয়েছেন, ওটাও আপনি জানেন। কিন্তু আপনি এগুলো দ্বীনের প্রতি ব্যবহার করছেন না। করছেন অবৈধ সম্পর্কের প্রতি, অবৈধ ভালোবাসার প্রতি। এই অবৈধ ভালোবাসা যদি মন্দিরের নামে আসত, তাহলে মুমিনরা কিছু না কিছু হলেও বাঁচত। কিন্তু মুমিনের কাছে এটা এসেছে দুনিয়ায় সবচেয়ে মধুর নামে, 'ভালোবাসা'-র নামে। ভালোবাসার নাম করে আল্লাহ রব্বুল ইযযতের সাথে ভালোবাসা, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক-পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে আমরা যে কত ধরনের ফিতনার ভেতর নিমজ্জিত, কতভাবে যে ঈমানকে বিসর্জন দিচ্ছি, কতভাবে যে আল্লাহকে ভুলে থাকছি—এর ব্যাপারে কখনো ফিকির করি না। আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। অন্ততপক্ষে এই মজলিস থেকে তাওবা করুন। যুবক-যুবতী হোক, পিতা-মাতা হোক, আমরা এ ধরনের কোনো গুনাহকে সমর্থন করব না। আমরা সর্বোচ্চ খেয়াল রাখব। আমরা আমাদের ঈমানকে বাঁচিয়ে চলব। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমিন।
এভাবে যদি একজন মুমিন নিজের জীবন গুনাহমুক্ত করতে পারে, নিজের জবানকে অপবাদ-অপপ্রচার থেকে সংযত করতে পারে, আলিম-উলামা ও নেককারদের সাথে জুড়ে থাকতে পারে; এরপর যদি সতর্কতার সাথে নারীদের থেকে দূরে থাকতে পারে, নিজের দেহ-মনকে নারীদের থেকে পবিত্র রাখতে পারে, তাহলে তার জীবন অসংখ্য অগণিত গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাবে। আর বর্তমানে যারা দ্বীন-ঈমান নিয়ে বাঁচতে চায়, তারাও এ ধরনের গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে না। তাই যে এই গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক ও সংযত হতে পারবে, সে জান্নাতের পথে অনেক দূরে এগিয়ে যাবে।
আর যেহেতু এই গুনাহ ঈমান-আমলের অনেক বেশি ক্ষতি করে, তাই সংগত কারণে আগামী পর্বে আমরা পর্দার বিধানের সাথে ঈমানের যোগসূত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করব। এর পরবর্তী পর্বে পর্দার স্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে পূর্ণভাবে পর্দার বিষয়টি আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আমরা আমাদের জীবনকে অসংখ্য-অগণিত গুনাহ থেকে মুক্ত করতে পারি, আর জান্নাতে যাওয়ার পথকে আরও মসৃণ ও সুগম করতে পারি।

টিকাঃ
[৫৫] মুসনাদুশ শামিয়‍্যীন: ৭২৩; ভিন্ন শব্দে সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০; আলবানী 'ইরওয়াউল গালিল' গ্রন্থে (১৭৮৪) হাদীসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00