📄 ৮. গীবতে লিপ্ত হওয়া
যখন কারও সাথে আমার সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন তার কোনো ত্রুটি আমার কাছে ত্রুটি মনে হয় না। কিন্তু শত্রুতা পয়দা হলে সব ভুলে যাই। শয়তান আমাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। তখন তার যত গোপন বিষয় আমার জানা আছে, তা আমি গীবত হিসেবে প্রচার করতে থাকি। এখন তো তার প্রতি আমার শত্রুতা! একসময় তার বয়ান আমার কাছে ভালো লেগেছে, তার আত্মত্যাগ দেখে আমার কাছে ভালো লেগেছে। এখন অপপ্রচারের কারণে আমার দিলে তার প্রতি কেমন একটা বাজে ধারণা হয়েছে। আমি এখন তার বদনাম করতে শুরু করেছি।
এজন্যই পবিত্র কুরআন আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছে,
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গীবত কোরো না।[৩৯]
ا يُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
'তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।' [৪০]
এক অপপ্রচারকে ঢাল বানিয়ে শয়তান আট নম্বর যে কবীরা গুনাহে আমাকে লিপ্ত করল-তা হলো, গীবতের সূত্রপাত। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল বলে সম্পর্কের দাবিতে তাকে নিয়ে আমি কিছুই বলিনি। আর এখন সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে বলে তাকে নিয়ে আমি গীবত করতে শুরু করেছি। এখন তার গীবত আমার শুনতেও ভালো লাগে, করতেও ভালো লাগে। এখন আমার কাজই হয়ে গিয়েছে তার গীবত করা।
টিকাঃ
[৩৯] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।
[৪০] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।
📄 ৯. দোষত্রুটি তালাশ করা
নয় নম্বর কবীরা গুনাহ হলো, অপপ্রচারের কারণে তার নতুন নতুন ত্রুটি তালাশ করতে আমার ভালো লাগে। অথবা কেউ তার ত্রুটি তালাশ করে বের করলে, সাথে সাথে আমি তা লুফে নিই। কারণ, একসময় তাকে আমি অনেক ভালো মনে করতাম। এখন অপপ্রচারের ফলে তার একটা দোষ শোনার পর থেকে, তার আর কতগুলো ব্যক্তিগত ও গোপনীয় গুনাহ আছে-তা তালাশে ব্যস্ত হয়ে গেছি। প্রচার করার পেছনে লেগে গেছি। পবিত্র কুরআন কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছে,
وَلَا تَجَسَّسُوا
'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।'[৪১]
অর্থাৎ, খবরদার! মানুষ গোপন কোনো গুনাহ যদি করে, তুমি যদি তাকে সংশোধন করতে না পারো, তবে শুধু তার বদনামের জন্য ওগুলো তালাশ কোরো না।
আমরা সবাই জানি, গোপনীয় দোষত্রুটি তালাশ করা একটা কবীরা গুনাহ। অথচ এই আমরাই সে ব্যক্তি জীবনের কোন দিন কী করেছে, না করেছে-তা খুঁজে খুঁজে করে বের করছি। অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে তা নিজে শুনছি, অন্যকেও শোনাচ্ছি। তাহলে নয় নম্বরে আমি যে কবীরা গুনাহে লিপ্ত হচ্ছি-তা হলো, তার নতুন নতুন দোষত্রুটি তালাশে লিপ্ত হয়ে পড়ছি।
এজন্যই আল্লাহ আমাকে বাঁচাতে গিয়ে বলছেন, 'তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।' অর্থাৎ, খবরদার! বান্দা ব্যক্তিপর্যায়ে আমার সাথে যে অপরাধ করেছে, তা তুমি তালাশ করে বের কোরো না।
অথচ কারও নামে অপপ্রচার হলে তার একের পর এক ত্রুটি বের হতেই থাকে। আপনারাই বলুন, তার কি একটি ত্রুটি বের হয়, নাকি একটির সাথে আরও হাজার হাজার ত্রুটি বের হয়ে আসে?!
এজন্যই পবিত্র কুরআন আমাকে এমন কোনো সুযোগ দেয়নি। ধারণা করার সুযোগ দেয়নি, বদনাম বলার সুযোগ দেয়নি, তিরস্কার করার সুযোগ দেয়নি, তিরস্কার শোনার সুযোগ দেয়নি, তার নামে কোনো গোপনীয় দোষ তালাশ করারও সুযোগ দেয়নি। এভাবে আমাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার যত পথ ও পন্থা আছে-সব বাতলে দিয়েছে।
টিকাঃ
[৪১] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২।
📄 ১০. হেয় প্রতিপন্ন করা
অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে মানুষ তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে শুরু করে। ছোট করে, নীচু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ
'একজন মানুষ খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে (তার কথা- কাজের মাধ্যমে) অপর ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করবে।' [৪২]
হেয় করাই তার খারাপ মানুষ হবার জন্য যথেষ্ট।
অপপ্রচারের কারণে অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, দুনিয়ার সবচেয়ে কট্টর, কাফির, মুনাফিক, নাস্তিকরাও এতটা হেয়-বস্তু হয় না, যতটা একজন নেককার বান্দা আমাদের কাছে হেয় বা অপমানের বস্তুতে রূপান্তরিত হয়।
টিকাঃ
[৪২] মুসলিম,: ২৫৬৪
📄 ১১. বৈশ্বিক অপরাধ
একটা সময় ছিল, মানুষ এক-দুইজন অথবা পরিবারের মাঝে মানুষের বদনাম ছড়াত। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া এবং মিডিয়ার কারণে এ ধরনের বড় বড় গুনাহ এখন আর এক-দুইজনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটাকে মিডিয়ার বরকত বলব, নাকি আজাব বলব, আপনারা জানেন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে গুনাহ দ্বারা নাপাক করে দিয়েছে এই মিডিয়া। সাংবাদিকতার বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মুসলিমদের দোষত্রুটি খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে।
এভাবে পুরো বিশ্ব এক কাতারে গীবত-পরনিন্দায় লিপ্ত হচ্ছে, তিরস্কারে লিপ্ত হচ্ছে। একজন আরেকজনকে হেয় প্রতিপন্ন করছে, একজন আরেকজনকে দোষারোপ করছে। নানাভাবে আঘাত করছে। বিভিন্ন নামে তাকে ডাকছে। সুতরাং আপনি চিন্তা করুন! একটা হলো দুই-তিনজনের ভেতরে গুনাহ করা। আরেকটা হলো সারা বিশ্বকে একই গুনাহের ভেতর জমা করা। একই তালে সারা বিশ্বকে গীবতের ভেতর জড়ানো।
পুরো দুনিয়া ধ্বংস হবে এরকম গুনাহের কারণে, যেই গুনাহে সারা দুনিয়াবাসী লিপ্ত! এখন মিডিয়ার কারণে আমাদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি হয়ে গেছে যে, আমাদের ওপর কিয়ামত হতে পারে। এখন গীবত আর পরিবারের ভেতর নয়, একটা অঞ্চলের ভেতর নয়; গীবত এখন দেশের সীমানা পার হয়ে বিশ্বের সীমানায় প্রবেশ করেছে। আমিও তাদের একজন হয়ে গীবত করছি, সম্পর্ক নষ্ট করছি, বিদ্বেষ ছড়াচ্ছি, মন্দ নামে ডাকছি, তিরস্কার করছি। এইভাবে সারা বিশ্ব এক কাতারে এসে এতগুলো বড় বড় গুনাহের ভেতর জড়াচ্ছে। আমিও নিজেকে এর একজন সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছি।
তাহলে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক। মূল আলোচনা হলো, আলিম ও নেককার শাসকদের অধীনে থাকলে সত্যিকার অর্থে আমাদের জন্য দ্বীন-ঈমান নিয়ে টিকে থাকা সহজ। যদি আমরা উলামাদের অধীন হয়ে বেঁচে থাকি, তাহলে আমাদের ঈমান বাঁচবে। কিন্তু তখন অপপ্রচারের বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক না হলে, শয়তান অপপ্রচারের ফাঁদে ফেলে আমাদেরকে তাঁদের থেকে সরিয়ে নেবে। একটা সময় আমরা দ্বীন থেকেই সরে যাব। অথচ সেটা অনুভবও করতে পারব না। অতএব আমরা বুঝতে পারলাম যে, অপপ্রচারের মাধ্যমে আলিম-উলামাদের থেকে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। আমাদেরকে ঈমানি খতরার ভেতর ফেলে দেওয়া হয়।
এবার বলুন : এই অপপ্রচারের দ্বারা কতগুলো কবীরা গুনাহের সূত্রপাত ঘটিয়েছে শয়তান? এগারোটি। আমরা এখানে তা আলোচনা করলাম।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বলবেন,
وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
'অপরাধীরা আজকে আলাদা হয়ে যাও।[৪৩]
একটা অপরাধ করলেই যদি মুমিনদের থেকে সেদিন আলাদা হয়ে যেতে হয়, তাহলে এগারোটা অপরাধ নিয়মিত করলে আমার কী দশা হবে?
ভাবুন তো, সারা বিশ্বের আনাচে-কানাচে যারা অপরাধ করেছে, আমি লাইক-কমেন্ট-শেয়ার করে তাদের সাথে সহমত পোষণ করেছি! তাহলে কিয়ামতের দিন আমার ঠিকানা কোন কাতারে হবে? কোন কাতারে আমাকে দাঁড়াতে হবে? আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন। আমিন।
সম্ভবত আমাদের মনে আছে, আমাদের এই বইয়ের নাম হলো জান্নাতি জীবন; আর বইটির উদ্দেশ্য হলো এমন জীবন গড়া-যা আমাকে পৌঁছে দেবে জান্নাতে। সে লক্ষ্যে আমরা প্রথমে গুনাহমুক্ত জীবন গড়া ও এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এরপরে দ্বীন-ঈমানের সাথে জুড়ে থাকার জন্য উলামাদের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছি। এরপরে আলোচনা করেছি, ঈমান-আমল নষ্ট হওয়ার বড় একটা দিক নিয়ে।
এবার আমরা আলোচনা করব এমন একটা অপরাধের ব্যাপারে-যার মাঝে আমরা কোনো না কোনোভাবে জড়িত হয়েই যাই; কিন্তু ভেবেও দেখি না, এই এক অপরাধের মাঝে আরও কত অপরাধ লুকিয়ে রয়েছে! এভাবে জান্নাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে ফেলি।
না, আমরা জান্নাত থেকে নিজেদেরকে দূরে সরাতে পারি না। জান্নাত আমাদের চাই। জান্নাত হারাতে হয়-এমন কোনো অপরাধে আমরা কোনোভাবেই জড়াব না। এই থাকবে আমাদের প্রতিজ্ঞা। আর এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে সামনের আলোচনা আমাদেরকে মনোযোগের সাথে শুনতে হবে।
টিকাঃ
[৪৩] সূরা ইয়াসিন, ৩৬: ৫৯।