📄 ৭. খারাপ ধারণা পোষণ করা
মানুষের ব্যাপারে যখন অপপ্রচার হয়, তখন অনেক খারাপ ধারণা দিলে পয়দা হয়। আপনার অনেক আপন কেউ, যেমন আপনার বাবা, তার নামেও যদি কোনো কথা শোনেন তবে দেখবেন যে, দিলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হয়ে যাবে। এটা আমাদের সমাজের একেবারে স্বাভাবিক চিত্র যে, বিবিরা স্বামীর দোষ সন্তানের কাছে বর্ণনা করে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। বিবিদের অন্য কোনো কারণ লাগবেই না জাহান্নামে যাবার জন্য। এটিই যথেষ্ট!
বসে বসে সন্তানকে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলে ক্ষেপিয়ে তোলে; 'তোমার বাবা এইটা করেনি, সেটা করেনি, এই সমস্যা করেছে-সে সমস্যা করেছে'-এই ধরনের হাজারও কথা বলতে থাকে। মনে হয় যেন বাবার কোনো অবদানই নেই! জীবনটা যিনি দিয়ে দিলেন, নিজে ঠিকমতো জামা-স্যান্ডেলও পরেননি; এ সবকিছুর পরেও বিবি তার সন্তানকে শেখাচ্ছে যে, 'তোমার বাবা কিছুই করেনি।' এখন, সন্তান কিন্তু দেখছে বাবার অবদান। তারপরেও যখন সে এসব অপপ্রচার শোনে, বাবার প্রতি কেমন যেন একটা বদ ধারণা পয়দা হয়ে যায়! বাবার ক্ষেত্রেই যদি এমনটি হয়, তাহলে অন্যান্য নেককারদের প্রতি বদ ধারণা পয়দা হবে-এটা তো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তাহলে, কারও ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হবার পর সেই ধারণা প্রকাশ করতে থাকা কবীরা গুনাহ।
আর একজনের মনে আরেকজনের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হলে শয়তান সেই ধারণার স্বপক্ষে হাজার হাজার দলিল সামনে নিয়ে আসে।
যখন বিবির ব্যাপারে খারাপ ধারণা হয় যে, 'বিবির কারও সাথে সম্পর্ক আছে কি না', তখন এমন খারাপ ধারণা পয়দা হওয়ার পরে শয়তান এর স্বপক্ষে হাজারও দলিল সামনে এনে দেয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে, 'সত্যিই তো, আমি ওইদিন তার মোবাইলে ওয়েটিং দেখলাম।' এই যে অপপ্রচারের কারণে খারাপ ধারণা পয়দা হয়, এজন্যই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খারাপ ধারণা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।'[৩৮]
অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন: হে ঈমানদারগণ, তোমরা যে বেশি বেশি অনুমান করো, এ থেকে বিরত থাকো। তা না হলে তোমাদের ঈমান টিকবে না। কারণ তোমরা যে ধারণা করছো, এর অনেক ধারণা এমন আছে-যা আল্লাহর কাছে গুনাহ, অপরাধ।
তাহলে অপপ্রচারের কারণে সাত নম্বর যে কবীরা গুনাহে আমরা জড়াই তা হলো, ব্যক্তি সম্পর্কে নানান খারাপ ধারণা আমার মধ্যে আসে। বেচারা নিজের জীবন আল্লাহর জন্য দিয়ে দিচ্ছে, আর আমি তাকে মনে করি 'মৌলবাদী', 'কট্টরপন্থি'। ও মরলেই যেন আমরা বাঁচি।
টিকাঃ
[৩৮] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২।
📄 ৮. গীবতে লিপ্ত হওয়া
যখন কারও সাথে আমার সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন তার কোনো ত্রুটি আমার কাছে ত্রুটি মনে হয় না। কিন্তু শত্রুতা পয়দা হলে সব ভুলে যাই। শয়তান আমাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। তখন তার যত গোপন বিষয় আমার জানা আছে, তা আমি গীবত হিসেবে প্রচার করতে থাকি। এখন তো তার প্রতি আমার শত্রুতা! একসময় তার বয়ান আমার কাছে ভালো লেগেছে, তার আত্মত্যাগ দেখে আমার কাছে ভালো লেগেছে। এখন অপপ্রচারের কারণে আমার দিলে তার প্রতি কেমন একটা বাজে ধারণা হয়েছে। আমি এখন তার বদনাম করতে শুরু করেছি।
এজন্যই পবিত্র কুরআন আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছে,
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গীবত কোরো না।[৩৯]
ا يُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
'তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।' [৪০]
এক অপপ্রচারকে ঢাল বানিয়ে শয়তান আট নম্বর যে কবীরা গুনাহে আমাকে লিপ্ত করল-তা হলো, গীবতের সূত্রপাত। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল বলে সম্পর্কের দাবিতে তাকে নিয়ে আমি কিছুই বলিনি। আর এখন সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে বলে তাকে নিয়ে আমি গীবত করতে শুরু করেছি। এখন তার গীবত আমার শুনতেও ভালো লাগে, করতেও ভালো লাগে। এখন আমার কাজই হয়ে গিয়েছে তার গীবত করা।
টিকাঃ
[৩৯] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।
[৪০] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।
📄 ৯. দোষত্রুটি তালাশ করা
নয় নম্বর কবীরা গুনাহ হলো, অপপ্রচারের কারণে তার নতুন নতুন ত্রুটি তালাশ করতে আমার ভালো লাগে। অথবা কেউ তার ত্রুটি তালাশ করে বের করলে, সাথে সাথে আমি তা লুফে নিই। কারণ, একসময় তাকে আমি অনেক ভালো মনে করতাম। এখন অপপ্রচারের ফলে তার একটা দোষ শোনার পর থেকে, তার আর কতগুলো ব্যক্তিগত ও গোপনীয় গুনাহ আছে-তা তালাশে ব্যস্ত হয়ে গেছি। প্রচার করার পেছনে লেগে গেছি। পবিত্র কুরআন কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছে,
وَلَا تَجَسَّسُوا
'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।'[৪১]
অর্থাৎ, খবরদার! মানুষ গোপন কোনো গুনাহ যদি করে, তুমি যদি তাকে সংশোধন করতে না পারো, তবে শুধু তার বদনামের জন্য ওগুলো তালাশ কোরো না।
আমরা সবাই জানি, গোপনীয় দোষত্রুটি তালাশ করা একটা কবীরা গুনাহ। অথচ এই আমরাই সে ব্যক্তি জীবনের কোন দিন কী করেছে, না করেছে-তা খুঁজে খুঁজে করে বের করছি। অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে তা নিজে শুনছি, অন্যকেও শোনাচ্ছি। তাহলে নয় নম্বরে আমি যে কবীরা গুনাহে লিপ্ত হচ্ছি-তা হলো, তার নতুন নতুন দোষত্রুটি তালাশে লিপ্ত হয়ে পড়ছি।
এজন্যই আল্লাহ আমাকে বাঁচাতে গিয়ে বলছেন, 'তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।' অর্থাৎ, খবরদার! বান্দা ব্যক্তিপর্যায়ে আমার সাথে যে অপরাধ করেছে, তা তুমি তালাশ করে বের কোরো না।
অথচ কারও নামে অপপ্রচার হলে তার একের পর এক ত্রুটি বের হতেই থাকে। আপনারাই বলুন, তার কি একটি ত্রুটি বের হয়, নাকি একটির সাথে আরও হাজার হাজার ত্রুটি বের হয়ে আসে?!
এজন্যই পবিত্র কুরআন আমাকে এমন কোনো সুযোগ দেয়নি। ধারণা করার সুযোগ দেয়নি, বদনাম বলার সুযোগ দেয়নি, তিরস্কার করার সুযোগ দেয়নি, তিরস্কার শোনার সুযোগ দেয়নি, তার নামে কোনো গোপনীয় দোষ তালাশ করারও সুযোগ দেয়নি। এভাবে আমাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার যত পথ ও পন্থা আছে-সব বাতলে দিয়েছে।
টিকাঃ
[৪১] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২।
📄 ১০. হেয় প্রতিপন্ন করা
অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে মানুষ তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে শুরু করে। ছোট করে, নীচু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ
'একজন মানুষ খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে (তার কথা- কাজের মাধ্যমে) অপর ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করবে।' [৪২]
হেয় করাই তার খারাপ মানুষ হবার জন্য যথেষ্ট।
অপপ্রচারের কারণে অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, দুনিয়ার সবচেয়ে কট্টর, কাফির, মুনাফিক, নাস্তিকরাও এতটা হেয়-বস্তু হয় না, যতটা একজন নেককার বান্দা আমাদের কাছে হেয় বা অপমানের বস্তুতে রূপান্তরিত হয়।
টিকাঃ
[৪২] মুসলিম,: ২৫৬৪