📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৫. একে অপরকে দোষারোপ করা

📄 ৫. একে অপরকে দোষারোপ করা


একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে দোষারোপ করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কবীরা গুনাহের একটি। আগে নিজের খবর নাও! নিজের অবস্থানের ফিকির করো! অপপ্রচারের ফাঁদে পা দিয়ে অনেক সময় দেখা যায় যে, আমি এক লোককে দোষারোপ করে বলি যে, 'উনি এমন করেছেন কেন!' অথচ আমি নিজের বিষয় ভুলে যাই। হতে পারে আমি ঠিকমতো নামাজই পড়ি না, রোজা রাখি না, কুরআনও ঠিকমতো শুদ্ধ করে পড়তে পারি না। আমার ঘরের লোকদের পর্দার বুঝ নেই। পরিবারের লোকেরা ঠিকমতো পর্দাও করে না। সন্তান দ্বীনদার না, নেককার না-এ ব্যাপারে আমার কোনো খবর নেই, আফসোস নেই। আমি এটা ভাবিও না যে, আমার পরিবারের লোক বা আমার সন্তান নামাজ পড়ছে, নাকি পড়ছে না। গান-বাজনা নিয়ে মেতে আছে কি না। আমার মাথাব্যথার বিষয় হলো আরেকজনকে নিয়ে। আরেকজনকে দোষারোপ করতে আমি ব্যস্ত। অমুক এই কাজ করতে গেল কেন! আর এ ধরনের কবীরা গুনাহে জড়িয়ে আমি নিজেকে নিষ্পাপ মনে করছি। আমি মনে মনে ভাবছি-কী যেন এক মহান পুণ্যের কাজ করে ফেলেছি! বড়সড় একটা স্ট্যাটাস ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছি। নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করেছি।
এভাবেই আমরা আরও একটি কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি।
আর এর সূচনা হয়েছিল অপপ্রচারের দরুন, কারণ বর্তমানে অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্মুক্ত দোষারোপ করা শুরু হয়। অপরদিকে আমি নিজের, নিজের পরিবারের, নিজের সন্তানের হালত ভুলে যাই। নিজের আমলের খোঁজখবর ভুলিয়ে দিয়ে শয়তান আমাদেরকে এমন একজনের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছে, যার জীবনে নামাজ কাযা নেই। জীবনে হয়তো দুই-একটা ভুল করে ফেলেছে! কিন্তু আজীবন তাওবা করে করে বুক ভাসিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার দরবারে তার গুনাহকে মাফ করিয়ে নিয়েছে। অথচ আমার জীবনে সকাল-সন্ধ্যা গুনাহে ভরা। আর আমি কিনা তাকে দোষারোপ করছি! এজন্য পবিত্র কুরআন আমাকে সতর্ক করে বলছে,
وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ
'তোমরা একজন আরেকজনকে দোষারোপ করবে না।' [৩৪]
অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন: আমার নির্দেশ মানতে হবে তোমাদেরকে। দোষারোপ করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা যে কাজ করতে নিষেধ করেছেন, সে কাজ করলে কত বড় কবীরা গুনাহ হবে, চিন্তা করুন! কত স্পষ্ট শব্দ! অথচ আমরা অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে বলে ফেলি, 'আরে, উনার মতো মানুষ বুঝি এই কাজ করতে পারে!' অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে একটার পর একটা দোষ তার ওপর চাপাতেই থাকি। আর আমল শেষ হতে থাকে, বরবাদ হতে থাকে। নিজের গুনাহের ওপর পর্দা পড়তে থাকে। নেককারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কারণে নিয়মিত কবীরা গুনাহে জড়িত হতে থাকি। গুনাহের পাল্লা ভারী হতে থাকে।

টিকাঃ
[৩৪] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৬. মন্দ নামে ডাকা

📄 ৬. মন্দ নামে ডাকা


একজন আলিম বা একজন নেককারের বিরুদ্ধে সামান্য অপপ্রচারের কারণে আমরা বলে উঠি—'ধুর, ওই শয়তানের কথা আর বলিস না!' আমি শুধু 'শয়তানের কথা' শব্দটা উল্লেখ করলাম। আরও কত মন্দ কথা আমরা বলি— তা আমরাই ভালো বলতে পারব; যেমন বাটপার-সহ আরও অনেক কথা। বিশ্বাস না হলে আপনাদের কমেন্ট বক্স চেক করে দেখুন। দেখবেন, কত ধরনের গালাগালি যে আমরা করতে পারি-তা আমরা নিজেরাও জানি না। অথচ পবিত্র কুরআন কত আগে আমাদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। এমন না যে, কোনো কথা আমি বানিয়ে বলছি। আমি শুধু কুরআনের অনুবাদ করছি।
যে ব্যক্তি একসময় আমার কাছে আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ ছিল, যাকে আমি মান্য করতাম, শুধু একটি অপপ্রচারের কারণে আমি তাকে বলছি-বাটপার, চরিত্রহীন! নিজের হালত পুরোপুরি ভুলে যাই। আর আমার থেকে যে আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয়, আমার চেয়ে যার আমল-আখলাক সুন্দর, আমি তাকে অবলীলায় খারাপ লকব দিয়ে ফেলি। আল্লাহ তাআলার নিষেধাজ্ঞার কোনো পরোয়া করি না।
আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
'তোমরা একজন আরেকজনকে মন্দ নামে ডেকো না।' [৩৫]
অর্থাৎ, এই মন্দ নামে ডাকার অধিকার নেই তোমাদের। যদি ডাকো, তবে তা হবে কবীরা গুনাহ।
এরপর আল্লাহ তাআলা যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা কত কঠিন!
بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيْمَانِ
'ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয়, সেই) মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট!'[৩৬]
মানুষ ঈমানদার হবার পর যদি কাউকে দোষারোপ করে, কাউকে মন্দ নামে ডাকে, তাহলে তার ঈমানদার নাম পরিবর্তন হয়ে ফাসিকে পরিবর্তিত হয়। এর চাইতে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। এরপর আল্লাহ বলছেন,
وَمَنْ لَّمْ يَتُبُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
'আর যারা এ অবস্থান ত্যাগ করবে না, সে আল্লাহর কাছে প্রকৃত অপরাধী, প্রকৃত অত্যাচারী।[৩৭]
এক অপপ্রচারের ফলে আমরা-
আমাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করেছি;
শত্রুতার জন্ম দিয়েছি;
অন্তরে হিংসার বীজ বপন করেছি;
আমাদের জবান থেকে ব্যক্তির তিরস্কার ছড়িয়ে দিয়েছি;
ব্যক্তিকে দোষারোপ করতে শুরু করেছি এবং
ব্যক্তিকে মন্দ নামে ডাকতে শুরু করেছি।
আর আল্লাহ আমাকে বলছেন-তুমি অমুককে মন্দ নামে ডাকছো! আমিও তোমাকে ঈমানদারের পরিবর্তে মন্দ নাম যোগ করে দিলাম।

টিকাঃ
[৩৫] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৬] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৭. খারাপ ধারণা পোষণ করা

📄 ৭. খারাপ ধারণা পোষণ করা


মানুষের ব্যাপারে যখন অপপ্রচার হয়, তখন অনেক খারাপ ধারণা দিলে পয়দা হয়। আপনার অনেক আপন কেউ, যেমন আপনার বাবা, তার নামেও যদি কোনো কথা শোনেন তবে দেখবেন যে, দিলে তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হয়ে যাবে। এটা আমাদের সমাজের একেবারে স্বাভাবিক চিত্র যে, বিবিরা স্বামীর দোষ সন্তানের কাছে বর্ণনা করে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। বিবিদের অন্য কোনো কারণ লাগবেই না জাহান্নামে যাবার জন্য। এটিই যথেষ্ট!
বসে বসে সন্তানকে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলে ক্ষেপিয়ে তোলে; 'তোমার বাবা এইটা করেনি, সেটা করেনি, এই সমস্যা করেছে-সে সমস্যা করেছে'-এই ধরনের হাজারও কথা বলতে থাকে। মনে হয় যেন বাবার কোনো অবদানই নেই! জীবনটা যিনি দিয়ে দিলেন, নিজে ঠিকমতো জামা-স্যান্ডেলও পরেননি; এ সবকিছুর পরেও বিবি তার সন্তানকে শেখাচ্ছে যে, 'তোমার বাবা কিছুই করেনি।' এখন, সন্তান কিন্তু দেখছে বাবার অবদান। তারপরেও যখন সে এসব অপপ্রচার শোনে, বাবার প্রতি কেমন যেন একটা বদ ধারণা পয়দা হয়ে যায়! বাবার ক্ষেত্রেই যদি এমনটি হয়, তাহলে অন্যান্য নেককারদের প্রতি বদ ধারণা পয়দা হবে-এটা তো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তাহলে, কারও ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হবার পর সেই ধারণা প্রকাশ করতে থাকা কবীরা গুনাহ।
আর একজনের মনে আরেকজনের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পয়দা হলে শয়তান সেই ধারণার স্বপক্ষে হাজার হাজার দলিল সামনে নিয়ে আসে।
যখন বিবির ব্যাপারে খারাপ ধারণা হয় যে, 'বিবির কারও সাথে সম্পর্ক আছে কি না', তখন এমন খারাপ ধারণা পয়দা হওয়ার পরে শয়তান এর স্বপক্ষে হাজারও দলিল সামনে এনে দেয়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে, 'সত্যিই তো, আমি ওইদিন তার মোবাইলে ওয়েটিং দেখলাম।' এই যে অপপ্রচারের কারণে খারাপ ধারণা পয়দা হয়, এজন্যই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খারাপ ধারণা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।'[৩৮]
অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন: হে ঈমানদারগণ, তোমরা যে বেশি বেশি অনুমান করো, এ থেকে বিরত থাকো। তা না হলে তোমাদের ঈমান টিকবে না। কারণ তোমরা যে ধারণা করছো, এর অনেক ধারণা এমন আছে-যা আল্লাহর কাছে গুনাহ, অপরাধ।
তাহলে অপপ্রচারের কারণে সাত নম্বর যে কবীরা গুনাহে আমরা জড়াই তা হলো, ব্যক্তি সম্পর্কে নানান খারাপ ধারণা আমার মধ্যে আসে। বেচারা নিজের জীবন আল্লাহর জন্য দিয়ে দিচ্ছে, আর আমি তাকে মনে করি 'মৌলবাদী', 'কট্টরপন্থি'। ও মরলেই যেন আমরা বাঁচি।

টিকাঃ
[৩৮] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৮. গীবতে লিপ্ত হওয়া

📄 ৮. গীবতে লিপ্ত হওয়া


যখন কারও সাথে আমার সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন তার কোনো ত্রুটি আমার কাছে ত্রুটি মনে হয় না। কিন্তু শত্রুতা পয়দা হলে সব ভুলে যাই। শয়তান আমাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। তখন তার যত গোপন বিষয় আমার জানা আছে, তা আমি গীবত হিসেবে প্রচার করতে থাকি। এখন তো তার প্রতি আমার শত্রুতা! একসময় তার বয়ান আমার কাছে ভালো লেগেছে, তার আত্মত্যাগ দেখে আমার কাছে ভালো লেগেছে। এখন অপপ্রচারের কারণে আমার দিলে তার প্রতি কেমন একটা বাজে ধারণা হয়েছে। আমি এখন তার বদনাম করতে শুরু করেছি।
এজন্যই পবিত্র কুরআন আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছে,
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গীবত কোরো না।[৩৯]
ا يُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
'তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।' [৪০]
এক অপপ্রচারকে ঢাল বানিয়ে শয়তান আট নম্বর যে কবীরা গুনাহে আমাকে লিপ্ত করল-তা হলো, গীবতের সূত্রপাত। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল বলে সম্পর্কের দাবিতে তাকে নিয়ে আমি কিছুই বলিনি। আর এখন সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে বলে তাকে নিয়ে আমি গীবত করতে শুরু করেছি। এখন তার গীবত আমার শুনতেও ভালো লাগে, করতেও ভালো লাগে। এখন আমার কাজই হয়ে গিয়েছে তার গীবত করা।

টিকাঃ
[৩৯] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।
[৪০] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00