📄 ৩. হিংসার বীজ বপন করা
কারও ব্যাপারে অপপ্রচার করা হলে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে শয়তান আমাদের অন্তরে হিংসার বীজ বপন করে। হিংসা এমন এক বিষয়-যার কারণে শয়তান মৌলিকভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْخَطَبَ أَوْ قَالَ الْعُشْبَ
'হিংসা থেকে আত্মরক্ষা করবে। কারণ হিংসা এমনভাবে নেককর্ম ধ্বংস করে ফেলে, যেমনভাবে আগুন কাঠ বা লাকড়িকে পুড়িয়ে ফেলে।[৩১]
শয়তান যে ধ্বংস হয়েছে, তার বড় একটি কারণ হচ্ছে হিংসা। তদ্রূপ, নেককারদের বিরুদ্ধে শয়তান যখন অপপ্রচার করে, তখন এ অপপ্রচারের মাধ্যমে একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে বিভ্রান্ত করে ফেলে। এর ফলে তাদের মাঝে আর ভালোবাসা বাকি থাকে না; বরং তা হিংসায় রূপান্তরিত হয়।
টিকাঃ
[৩১] আবু দাউদ: ৪৯০৩।
📄 ৪. একজন আরেকজনকে তিরস্কার করা
অপপ্রচারের মাধ্যমে ব্যক্তিকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা শুরু হয়। কথায় কথায় তাকে নিয়ে তিরস্কার করা হয়। অভিযুক্তকে নিয়ে যা মনে আসে, তা-ই বলা হয়। ভালো করে বুঝুন, এই এক অপপ্রচার দিয়ে শুরু হয় কত বড় বড় কবীরা গুনাহ। এ তো গেল সাধারণ মুসলিমের বিরুদ্ধে যখন অপপ্রচার হয়, তখনকার কথা। কিন্তু যখন আমাদের মাঝে নেতৃস্থানীয়-উলামায়ে কেরام, দ্বীনদার-এদের ব্যাপারে অপপ্রচার হয়, তখন তো পুরো মাঠ সরগরম। ব্যস, তিরস্কার আর তিরস্কার! মনে হয় যেন তিরস্কারের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
এবার পবিত্র কুরআনের ভাষায় আমরা দেখব যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কিভাবে তিরস্কারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
এখানে বলে রাখা ভালো, আল্লাহ তাআলা কুরআনে খুব কম জায়গায় নারী-পুরুষকে আলাদাভাবে সম্বোধন করেছেন। পবিত্র কুরআনে সম্বোধন করা হয় সাধারণত পুরুষদেরকে। পুরুষদের অধীনে নারীদেরকেও শামিল করা হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা তিরস্কারের ব্যাপারে এভাবে সম্বোধন করছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
'হে ঈমানদারগণ! পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদেরকে তিরস্কার না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম।[৩২]
তিরস্কারের কারণে তিরস্কারকারীর অবস্থান নিচে নামিয়ে দেওয়া হবে। আর যার তিরস্কার করা হচ্ছে, তাকে ওপরে উঠিয়ে দেওয়া হবে।
এই অপপ্রচারের কারণে আমরা বড়দের ব্যাপারেও মন খুলে তিরস্কার করতে শুরু করি। তাতে আমাদের মর্যাদা হ্রাস পায়। হতে পারে আমরা যার তিরস্কার করছি, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে আমাদের চাইতে বেশি। কিন্তু আমরা হয়তো তা জানি না।
তারপর এখানে নারীদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলছেন,
وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
'আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদেরকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। [৩৩]
তিরস্কার করার সাথে সাথেই, শত ইবাদত-বন্দেগি থাকার পরেও, যার তিরস্কার করা হয়েছে, তার চাইতে তিরস্কারকারী নিচে নেমে যাবে। অর্থাৎ অপপ্রচারের দ্বারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা আল্লাহর কাছে তাদের অবস্থান হারায়। এভাবেই অপপ্রচারের কারণে তিরস্কারের যাত্রা শুরু হয়।
টিকাঃ
[৩২] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৩] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১।
📄 ৫. একে অপরকে দোষারোপ করা
একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে দোষারোপ করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কবীরা গুনাহের একটি। আগে নিজের খবর নাও! নিজের অবস্থানের ফিকির করো! অপপ্রচারের ফাঁদে পা দিয়ে অনেক সময় দেখা যায় যে, আমি এক লোককে দোষারোপ করে বলি যে, 'উনি এমন করেছেন কেন!' অথচ আমি নিজের বিষয় ভুলে যাই। হতে পারে আমি ঠিকমতো নামাজই পড়ি না, রোজা রাখি না, কুরআনও ঠিকমতো শুদ্ধ করে পড়তে পারি না। আমার ঘরের লোকদের পর্দার বুঝ নেই। পরিবারের লোকেরা ঠিকমতো পর্দাও করে না। সন্তান দ্বীনদার না, নেককার না-এ ব্যাপারে আমার কোনো খবর নেই, আফসোস নেই। আমি এটা ভাবিও না যে, আমার পরিবারের লোক বা আমার সন্তান নামাজ পড়ছে, নাকি পড়ছে না। গান-বাজনা নিয়ে মেতে আছে কি না। আমার মাথাব্যথার বিষয় হলো আরেকজনকে নিয়ে। আরেকজনকে দোষারোপ করতে আমি ব্যস্ত। অমুক এই কাজ করতে গেল কেন! আর এ ধরনের কবীরা গুনাহে জড়িয়ে আমি নিজেকে নিষ্পাপ মনে করছি। আমি মনে মনে ভাবছি-কী যেন এক মহান পুণ্যের কাজ করে ফেলেছি! বড়সড় একটা স্ট্যাটাস ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছি। নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করেছি।
এভাবেই আমরা আরও একটি কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি।
আর এর সূচনা হয়েছিল অপপ্রচারের দরুন, কারণ বর্তমানে অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্মুক্ত দোষারোপ করা শুরু হয়। অপরদিকে আমি নিজের, নিজের পরিবারের, নিজের সন্তানের হালত ভুলে যাই। নিজের আমলের খোঁজখবর ভুলিয়ে দিয়ে শয়তান আমাদেরকে এমন একজনের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছে, যার জীবনে নামাজ কাযা নেই। জীবনে হয়তো দুই-একটা ভুল করে ফেলেছে! কিন্তু আজীবন তাওবা করে করে বুক ভাসিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার দরবারে তার গুনাহকে মাফ করিয়ে নিয়েছে। অথচ আমার জীবনে সকাল-সন্ধ্যা গুনাহে ভরা। আর আমি কিনা তাকে দোষারোপ করছি! এজন্য পবিত্র কুরআন আমাকে সতর্ক করে বলছে,
وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ
'তোমরা একজন আরেকজনকে দোষারোপ করবে না।' [৩৪]
অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন: আমার নির্দেশ মানতে হবে তোমাদেরকে। দোষারোপ করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা যে কাজ করতে নিষেধ করেছেন, সে কাজ করলে কত বড় কবীরা গুনাহ হবে, চিন্তা করুন! কত স্পষ্ট শব্দ! অথচ আমরা অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে বলে ফেলি, 'আরে, উনার মতো মানুষ বুঝি এই কাজ করতে পারে!' অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে একটার পর একটা দোষ তার ওপর চাপাতেই থাকি। আর আমল শেষ হতে থাকে, বরবাদ হতে থাকে। নিজের গুনাহের ওপর পর্দা পড়তে থাকে। নেককারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কারণে নিয়মিত কবীরা গুনাহে জড়িত হতে থাকি। গুনাহের পাল্লা ভারী হতে থাকে।
টিকাঃ
[৩৪] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১।
📄 ৬. মন্দ নামে ডাকা
একজন আলিম বা একজন নেককারের বিরুদ্ধে সামান্য অপপ্রচারের কারণে আমরা বলে উঠি—'ধুর, ওই শয়তানের কথা আর বলিস না!' আমি শুধু 'শয়তানের কথা' শব্দটা উল্লেখ করলাম। আরও কত মন্দ কথা আমরা বলি— তা আমরাই ভালো বলতে পারব; যেমন বাটপার-সহ আরও অনেক কথা। বিশ্বাস না হলে আপনাদের কমেন্ট বক্স চেক করে দেখুন। দেখবেন, কত ধরনের গালাগালি যে আমরা করতে পারি-তা আমরা নিজেরাও জানি না। অথচ পবিত্র কুরআন কত আগে আমাদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে। এমন না যে, কোনো কথা আমি বানিয়ে বলছি। আমি শুধু কুরআনের অনুবাদ করছি।
যে ব্যক্তি একসময় আমার কাছে আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ ছিল, যাকে আমি মান্য করতাম, শুধু একটি অপপ্রচারের কারণে আমি তাকে বলছি-বাটপার, চরিত্রহীন! নিজের হালত পুরোপুরি ভুলে যাই। আর আমার থেকে যে আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয়, আমার চেয়ে যার আমল-আখলাক সুন্দর, আমি তাকে অবলীলায় খারাপ লকব দিয়ে ফেলি। আল্লাহ তাআলার নিষেধাজ্ঞার কোনো পরোয়া করি না।
আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
'তোমরা একজন আরেকজনকে মন্দ নামে ডেকো না।' [৩৫]
অর্থাৎ, এই মন্দ নামে ডাকার অধিকার নেই তোমাদের। যদি ডাকো, তবে তা হবে কবীরা গুনাহ।
এরপর আল্লাহ তাআলা যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা কত কঠিন!
بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيْمَانِ
'ঈমান গ্রহণের পর (ঈমানের আগে কৃত অপরাধকে যা মনে করিয়ে দেয়, সেই) মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট!'[৩৬]
মানুষ ঈমানদার হবার পর যদি কাউকে দোষারোপ করে, কাউকে মন্দ নামে ডাকে, তাহলে তার ঈমানদার নাম পরিবর্তন হয়ে ফাসিকে পরিবর্তিত হয়। এর চাইতে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। এরপর আল্লাহ বলছেন,
وَمَنْ لَّمْ يَتُبُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ
'আর যারা এ অবস্থান ত্যাগ করবে না, সে আল্লাহর কাছে প্রকৃত অপরাধী, প্রকৃত অত্যাচারী।[৩৭]
এক অপপ্রচারের ফলে আমরা-
আমাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করেছি;
শত্রুতার জন্ম দিয়েছি;
অন্তরে হিংসার বীজ বপন করেছি;
আমাদের জবান থেকে ব্যক্তির তিরস্কার ছড়িয়ে দিয়েছি;
ব্যক্তিকে দোষারোপ করতে শুরু করেছি এবং
ব্যক্তিকে মন্দ নামে ডাকতে শুরু করেছি।
আর আল্লাহ আমাকে বলছেন-তুমি অমুককে মন্দ নামে ডাকছো! আমিও তোমাকে ঈমানদারের পরিবর্তে মন্দ নাম যোগ করে দিলাম।
টিকাঃ
[৩৫] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৬] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।