📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ২. শত্রুতা সৃষ্টি করা

📄 ২. শত্রুতা সৃষ্টি করা


অপপ্রচারের ফলে দ্বিতীয় যে মারাত্মক গুনাহের মাঝে শয়তান আমাদেরকে লিপ্ত করে, সেটি হলো পরস্পরের মাঝে শত্রুতার বীজ বপন করা। কারণ, সম্পর্ক নষ্ট হবার পর যা হয়, তা হলো পারস্পরিক শত্রুতায় লিপ্ত হওয়া। ইতিপূর্বে যাকে সে সবচেয়ে ভালো জানত, অপপ্রচারের কারণে এখন তাকেই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। বন্ধুত্বের পরিবর্তে তার সাথে শত্রুতা করে। এটা কত ভয়ংকর কথা যে, যেখানে এক মুসলিম আরেক মুসলিমকে ইসলামকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ভালোবাসবে, বন্ধু বানাবে; সেখানে কিনা মুসলিমরা অপপ্রচারের কারণে বিভ্রান্ত হয়ে একজন আরেকজনের সাথে শত্রুতা করছে। অথচ মুসলিমদের শত্রুতা প্রকৃতপক্ষে কার সাথে হওয়া উচিত? কাফিরদের সাথে, নাকি মুসলিমদের সাথে? অবশ্যই কাফিরদের সাথে। এ কথা কে না জানে।
এবার পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের যে গুণাবলির আলোচনা করা হয়েছে-তা দেখে নিই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাদের যেই মৌলিক পরিচয় পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন তা হলো :
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا
'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সাথে আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেরা পরস্পর দয়াপরবশ। তোমরা যখনই দেখবে, তখন তাদেরকে রুকু ও সিজদা এবং আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি কামনায় তৎপর পাবে।[২৯]
এখানে আল্লাহ তাআলা 'যারা নবিজির সাথে ঈমান এনেছে'-এমন কথা বলেননি। বরং বলেছেন, 'যারা তাঁর সঙ্গী।' এটিই সর্বোচ্চ পরিচয়। তাঁদের গুণাবলি একত্রে বর্ণনা করা হয়েছে-তাঁরা কাফিরদের ব্যাপারে কঠোর, আর পরস্পর নিজেদের ব্যাপারে আন্তরিক। তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের মৌলিক পরিচয় হলো, তাঁরা সবচেয়ে বেশি কঠোর কাফিরদের ব্যাপারে; আর সবচেয়ে বেশি আন্তরিক নিজেদের ব্যাপারে। এখন, একজন মুমিন হয়ে আমি যদি আরেক মুমিনের সাথে শত্রুতা করি অপপ্রচারের ভিত্তিতে, তাহলে আমার পরিচয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাদের সাথে মিলবে না।
মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা-এগুলো আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন। এর একটি কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ
'হে ঈমানদারগণ! এ মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক তিরসমূহ-এ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানি কার্যকলাপ। এগুলো থেকে দূরে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে। [৩০]
মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য, জুয়া-এসব হারাম হবার কারণ কী? এগুলো শত্রুতা পয়দা করে। তাহলে শত্রুতা এত ভয়ংকর যে, নেশা এবং জুয়ার ভেতর এটি একটি বড় প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, ঈমানদারদের মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা, নেশা ও জুয়ার চাইতেও ভয়ংকর। কিন্তু অপপ্রচারের কারণে যে আমার বন্ধু ছিল, তাকেও আমি শত্রু বানিয়ে ফেলি।
এভাবেই শয়তান অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রথমে আমাদের মধ্যকার ঈমানি ভ্রাতৃত্বে আঘাত হেনে নষ্ট করেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের পারস্পরিক যে সম্পর্ক ছিল, তার পরিবর্তে শত্রুতা পয়দা করে দিয়েছে।

টিকাঃ
[২৯] সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯।
[৩০] সূরা মায়িদা, ৫: ৯০-৯১।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৩. হিংসার বীজ বপন করা

📄 ৩. হিংসার বীজ বপন করা


কারও ব্যাপারে অপপ্রচার করা হলে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে শয়তান আমাদের অন্তরে হিংসার বীজ বপন করে। হিংসা এমন এক বিষয়-যার কারণে শয়তান মৌলিকভাবে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْخَطَبَ أَوْ قَالَ الْعُشْبَ
'হিংসা থেকে আত্মরক্ষা করবে। কারণ হিংসা এমনভাবে নেককর্ম ধ্বংস করে ফেলে, যেমনভাবে আগুন কাঠ বা লাকড়িকে পুড়িয়ে ফেলে।[৩১]
শয়তান যে ধ্বংস হয়েছে, তার বড় একটি কারণ হচ্ছে হিংসা। তদ্রূপ, নেককারদের বিরুদ্ধে শয়তান যখন অপপ্রচার করে, তখন এ অপপ্রচারের মাধ্যমে একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে বিভ্রান্ত করে ফেলে। এর ফলে তাদের মাঝে আর ভালোবাসা বাকি থাকে না; বরং তা হিংসায় রূপান্তরিত হয়।

টিকাঃ
[৩১] আবু দাউদ: ৪৯০৩।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৪. একজন আরেকজনকে তিরস্কার করা

📄 ৪. একজন আরেকজনকে তিরস্কার করা


অপপ্রচারের মাধ্যমে ব্যক্তিকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা শুরু হয়। কথায় কথায় তাকে নিয়ে তিরস্কার করা হয়। অভিযুক্তকে নিয়ে যা মনে আসে, তা-ই বলা হয়। ভালো করে বুঝুন, এই এক অপপ্রচার দিয়ে শুরু হয় কত বড় বড় কবীরা গুনাহ। এ তো গেল সাধারণ মুসলিমের বিরুদ্ধে যখন অপপ্রচার হয়, তখনকার কথা। কিন্তু যখন আমাদের মাঝে নেতৃস্থানীয়-উলামায়ে কেরام, দ্বীনদার-এদের ব্যাপারে অপপ্রচার হয়, তখন তো পুরো মাঠ সরগরম। ব্যস, তিরস্কার আর তিরস্কার! মনে হয় যেন তিরস্কারের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
এবার পবিত্র কুরআনের ভাষায় আমরা দেখব যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কিভাবে তিরস্কারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
এখানে বলে রাখা ভালো, আল্লাহ তাআলা কুরআনে খুব কম জায়গায় নারী-পুরুষকে আলাদাভাবে সম্বোধন করেছেন। পবিত্র কুরআনে সম্বোধন করা হয় সাধারণত পুরুষদেরকে। পুরুষদের অধীনে নারীদেরকেও শামিল করা হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা তিরস্কারের ব্যাপারে এভাবে সম্বোধন করছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
'হে ঈমানদারগণ! পুরুষরা যেন অন্য পুরুষদেরকে তিরস্কার না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম।[৩২]
তিরস্কারের কারণে তিরস্কারকারীর অবস্থান নিচে নামিয়ে দেওয়া হবে। আর যার তিরস্কার করা হচ্ছে, তাকে ওপরে উঠিয়ে দেওয়া হবে।
এই অপপ্রচারের কারণে আমরা বড়দের ব্যাপারেও মন খুলে তিরস্কার করতে শুরু করি। তাতে আমাদের মর্যাদা হ্রাস পায়। হতে পারে আমরা যার তিরস্কার করছি, তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে আমাদের চাইতে বেশি। কিন্তু আমরা হয়তো তা জানি না।
তারপর এখানে নারীদেরকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলছেন,
وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
'আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদেরকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। [৩৩]
তিরস্কার করার সাথে সাথেই, শত ইবাদত-বন্দেগি থাকার পরেও, যার তিরস্কার করা হয়েছে, তার চাইতে তিরস্কারকারী নিচে নেমে যাবে। অর্থাৎ অপপ্রচারের দ্বারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা আল্লাহর কাছে তাদের অবস্থান হারায়। এভাবেই অপপ্রচারের কারণে তিরস্কারের যাত্রা শুরু হয়।

টিকাঃ
[৩২] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১১।
[৩৩] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 ৫. একে অপরকে দোষারোপ করা

📄 ৫. একে অপরকে দোষারোপ করা


একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে দোষারোপ করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কবীরা গুনাহের একটি। আগে নিজের খবর নাও! নিজের অবস্থানের ফিকির করো! অপপ্রচারের ফাঁদে পা দিয়ে অনেক সময় দেখা যায় যে, আমি এক লোককে দোষারোপ করে বলি যে, 'উনি এমন করেছেন কেন!' অথচ আমি নিজের বিষয় ভুলে যাই। হতে পারে আমি ঠিকমতো নামাজই পড়ি না, রোজা রাখি না, কুরআনও ঠিকমতো শুদ্ধ করে পড়তে পারি না। আমার ঘরের লোকদের পর্দার বুঝ নেই। পরিবারের লোকেরা ঠিকমতো পর্দাও করে না। সন্তান দ্বীনদার না, নেককার না-এ ব্যাপারে আমার কোনো খবর নেই, আফসোস নেই। আমি এটা ভাবিও না যে, আমার পরিবারের লোক বা আমার সন্তান নামাজ পড়ছে, নাকি পড়ছে না। গান-বাজনা নিয়ে মেতে আছে কি না। আমার মাথাব্যথার বিষয় হলো আরেকজনকে নিয়ে। আরেকজনকে দোষারোপ করতে আমি ব্যস্ত। অমুক এই কাজ করতে গেল কেন! আর এ ধরনের কবীরা গুনাহে জড়িয়ে আমি নিজেকে নিষ্পাপ মনে করছি। আমি মনে মনে ভাবছি-কী যেন এক মহান পুণ্যের কাজ করে ফেলেছি! বড়সড় একটা স্ট্যাটাস ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছি। নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করেছি।
এভাবেই আমরা আরও একটি কবীরা গুনাহে জড়িয়ে পড়ি।
আর এর সূচনা হয়েছিল অপপ্রচারের দরুন, কারণ বর্তমানে অপপ্রচারের মাধ্যমে উন্মুক্ত দোষারোপ করা শুরু হয়। অপরদিকে আমি নিজের, নিজের পরিবারের, নিজের সন্তানের হালত ভুলে যাই। নিজের আমলের খোঁজখবর ভুলিয়ে দিয়ে শয়তান আমাদেরকে এমন একজনের পেছনে লাগিয়ে দিয়েছে, যার জীবনে নামাজ কাযা নেই। জীবনে হয়তো দুই-একটা ভুল করে ফেলেছে! কিন্তু আজীবন তাওবা করে করে বুক ভাসিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার দরবারে তার গুনাহকে মাফ করিয়ে নিয়েছে। অথচ আমার জীবনে সকাল-সন্ধ্যা গুনাহে ভরা। আর আমি কিনা তাকে দোষারোপ করছি! এজন্য পবিত্র কুরআন আমাকে সতর্ক করে বলছে,
وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ
'তোমরা একজন আরেকজনকে দোষারোপ করবে না।' [৩৪]
অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন: আমার নির্দেশ মানতে হবে তোমাদেরকে। দোষারোপ করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা যে কাজ করতে নিষেধ করেছেন, সে কাজ করলে কত বড় কবীরা গুনাহ হবে, চিন্তা করুন! কত স্পষ্ট শব্দ! অথচ আমরা অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে বলে ফেলি, 'আরে, উনার মতো মানুষ বুঝি এই কাজ করতে পারে!' অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে একটার পর একটা দোষ তার ওপর চাপাতেই থাকি। আর আমল শেষ হতে থাকে, বরবাদ হতে থাকে। নিজের গুনাহের ওপর পর্দা পড়তে থাকে। নেককারদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কারণে নিয়মিত কবীরা গুনাহে জড়িত হতে থাকি। গুনাহের পাল্লা ভারী হতে থাকে।

টিকাঃ
[৩৪] সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00