📄 অপবাদ ও অপপ্রচারের পরিচয়
বিষয়টি ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি। অপবাদ এবং অপপ্রচার-দুইটি ভিন্ন বিষয়।
অপবাদ হলো, কেউ কারোর বিরুদ্ধে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলা। আর তার অপবাদমূলক কথা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া মানুষের কাছে প্রচার করতে থাকা হলো অপপ্রচার। অর্থাৎ, অপবাদ হয়তো এক-দুই জন দেয়; কিন্তু সেই অপবাদমূলক কথা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া যখন অন্যরা একে-অপরকে বয়ান করতে থাকে, সেটা হলো অপপ্রচার।
📄 অপবাদ ও অপপ্রচারের হুকুম
কেউ কারও নামে অপবাদ দিলে বা অপপ্রচার করলে, সেটা যদি ব্যক্তিগত কারণে হয়, তবে তা কবীরা গুনাহ। আর যদি এমন হয় যে, কোনো ব্যক্তি ইসলামের কথা বলে, শরীয়তের কথা বলে, আর তার নামে কেউ যদি অপবাদ দেয় বা অপপ্রচার করে শুধুমাত্র ইসলামের কারণে এবং ইসলামের বিধি-বিধান আলোচনা করার কারণে, তবে আল্লাহ রব্বুল ইযযাতের দরবারে এটি সুস্পষ্ট নিফাক এবং সে মুনাফিকদের কাতারে চলে যায়।
এখন, আপনি বলতে পারেন, 'হযরত, যা রটে, তার কিছু না কিছু তো ঘটে-এ সূত্র ধরে আমরা কারও বিষয়ে কিছু বললে এত বড় গুনাহ কেন হবে?'
এর উত্তরে আমরা বলব: সমাজে বহুল প্রচলিত একটা কথা-'যা রটে, তার কিছু না কিছু তো ঘটে', এটা একটা ধোঁকা। মূলত যা রটে, তার কতটুকু অংশ আসলেই ঘটে-তা আমাদের দেশের বিরোধীদল ভালো করেই জানে। বিরোধীদলের লোকের ওপর যে পরিমাণ মামলা লাগে, সে পরিমাণ মামলা কি সরকারি দলের লোকের ওপর লাগে? বাস্তবতা বুঝুন। দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশি অপবাদ দেওয়া হয়েছিল সম্মানিত নবি-রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) নামে। এখন কি বলতে পারবেন যে, 'যা রটে, তা কিছু না কিছু তো ঘটেই'? সুতরাং, এমন কথা অবশ্যই সত্য না। আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে কাফিরদের তো অপবাদ আছেই; বরং উনার পবিত্র চরিত্রে কালিমা লেপন করতে কিছু নামধারী মুসলিম তথা মুনাফিকরাও সর্বদা তৎপর ছিল। ইতিহাস বিচার করলে এর লিস্টও পাওয়া যাবে লম্বা। নারীঘটিত ব্যাপার নিয়ে নবিজিকে কালিমা লেপন করতে চেয়েছিল। তাতে ব্যর্থ হয়ে মুনাফিকরা পরবর্তীকালে আয়িশা-এর নামে জঘন্যতম অপবাদ, অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছিল। অথচ আয়িশা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তমা বিবি, আমাদের মা। উম্মাহাতুল মুমিনীনদের মধ্যে যিনি ছিলেন ইলমের দিক দিয়ে সবচেয়ে সেরা এবং এই উম্মতে মুহাম্মাদীর ওপর নারী হিসেবে সর্বোচ্চ ইহসান যার-তিনি হলেন হযরত আয়িশা। সাহাবায়ে কেরام পবিত্র কুরআনের আয়াতের তাফসির যদি না বুঝতেন, তবে তাঁরা আয়িশা-এর কাছে যেতেন; কোনো হাদীস বুঝতে সমস্যা হলে তাঁরা আয়িশা-এর দ্বারস্থ হতেন। মুনাফিকরা সেই আয়িশা-কেই টার্গেট বানিয়েছিল, আর আয়িশা-কে টার্গেট বানানোর সহজ-সরল অর্থ হলো, সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়ানো।
বিষয়টি বোঝার জন্য বলছি। কেউ যখন কোনো ছেলের সমালোচনা করে, তখন কি সে শুধু ওই ছেলের সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়, নাকি সেইসাথে ছেলেটির বাবারও সমালোচনা করে? বরং তখন এভাবে বলে ফেলে, 'আরে, ওর বাবাই তো উলটাপালটা, ছেলে আর কেমনই বা হবে...'। আরও কত কিছু যে বলে। কিন্তু, এর বিপরীতও তো হতে পারে। আর কারও বিবির ক্ষেত্রে তো মানুষ আরও বেশি বলে।
মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতম অংশ হলো বিবি, পরিবার। এই দুর্বল জায়গাতেই মানুষ আঘাত করে বেশি। আর এই আঘাতটাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর হযরত আয়িশা-এর নামে অপবাদের মাধ্যমে করা হয়েছিল।
মুনাফিকরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে অপবাদ দিয়েছে; তাহলে আলিমদের ব্যাপারে অপবাদ দেওয়া কি কোনো ব্যাপার!
📄 অপবাদের ঘটনা
ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম রহিমাহুমাল্লাহ হাদীসে এই ঘটনা যেভাবে এনেছেন, সেটা একটু লক্ষ করি। এই ঘটনায় শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনটাকে সাজানোর জন্য এবং জীবনটাকে পবিত্র করার জন্য এই ঘটনা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন-যাতে আমাদের জীবনে এই ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে।
স্বয়ং হযরত আয়িশা হতে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ অভ্যাস ছিল-যখন জিহাদের ময়দানে বের হতেন, তখন বিবিদের মধ্য থেকে একজনকে সাথে নিয়ে বের হতেন। এখন যেহেতু বিবি নেওয়া যেত একজন, কিন্তু উনার ছিল একাধিক বিবি এবং সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জিহাদের ময়দানে যেতে চাইতেন। এজন্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লটারি করতেন। লটারিতে যাঁর নাম উঠত, তাঁকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদের ময়দানে যেতেন।
বনু মুস্তালিক যুদ্ধের সময় লটারিতে আয়িশা-এর নাম উঠল। উনাকে সাথে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাত্রা শুরু করবেন-তা ভেবে তিনি খুব খুশি ছিলেন। ততদিনে পর্দার বিধান নাযিল হয়ে গিয়েছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো বিবিকে যদি সাথে নিতেন, তাহলে উটের হাওদায় (উটের ওপর বসার আসনে) পর্দার ব্যবস্থা করতেন। তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবি যখন হাওদায় বসতেন, তখন বাকিরা হাওদাটিকে উটের পিঠে তুলে দিতেন।
তখন আয়িশা ছিলেন দৈহিক গড়নে হালকা-পাতলা। অর্থাৎ, আরবের ৪-৫ জন লোক মিলে যদি হাওদা ওঠায়, তবে আয়িশা -এর হাওদার ভেতরে থাকা কিংবা না থাকা একই কথা। তো যা-ই হোক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদ শেষ করার পরে আবার মদীনার দিকে রওনা করেছেন। পথে এক জায়গায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থামলেন বিশ্রামের জন্য; কিন্তু হঠাৎই শেষ রাতে তিনি মদীনার দিকে রওনা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন এবং বললেন, যার যা জরুরত (প্রয়োজন) আছে-তা যেন সমাপ্ত করা হয়। এটি সফরের আদব যে, সফর শুরু করার আগে যাবতীয় জরুরত মিটিয়ে নেওয়া। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার দিকে পুনরায় যাত্রা শুরু করার আগে সবাইকে জরুরত পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তো, আম্মাজান আয়িশা একটু দূরে গিয়ে নিজের জরুরত পূরণ করে আবার আগের জায়গায় সময়মতো চলেও আসলেন। তখন তিনি তাঁর গলায় হাত দিয়ে দেখেন যে, তাঁর গলার হারটা নেই। বোঝা যায়, যেখানে তিনি গিয়েছিলেন, সেখানেই হারিয়ে গিয়েছে হারটা। তাই হারের তালাশে আবার সেই জায়গায় আম্মাজান আয়িশা যান। আর এইদিকে কাফেলার সবাই চলে এসেছে এবং আয়িশা -এর হাওদা উত্তোলনকারীরাও হাওদাটিকে উটের ওপর উঠিয়ে দিয়েছে। শেষ রাত, তাই পরিবেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। হাওদা ছিল পর্দা দিয়ে ঢাকা এবং আয়িশা ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের। ফলে আয়িশা ভেতরে আছেন নাকি না-তা বোঝা যায় না। সুতরাং, আয়িশা-কে না নিয়েই কাফেলা মদীনার দিকে রওয়ানা শুরু করে দিয়েছে। একটু পর আয়িশা ফিরে এসে দেখেন যে, কাফেলা নেই এবং আশেপাশেও কেউ নেই। তো আমাদের বুদ্ধিমতী মা আয়িশা মনস্থির করলেন যে, একটা চাদর জড়িয়ে সে স্থানে বসেই অপেক্ষা করবেন, যেখানে কাফেলা বিশ্রামের জন্য থেমেছিল। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আয়িশা -কে খুঁজবেন, তখন আয়িশা -কে না পেয়ে নিশ্চয়ই আগের জায়গাতেই আসবেন। আর এইদিকে আয়িশা -ও যদি কাফেলার খোঁজে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেন, তাহলে দুই পক্ষকেই পেরেশানির স্বীকার হতে হবে। এসব ভেবে আয়িশা আগের জায়গাতেই নীরবে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। যেহেতু শেষ রাত, তাই অপেক্ষা করতে করতে একসময় আয়িশা ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ নিয়ম ছিল-তিনি সফর রওয়ানা করার সময় একজন লোক ঠিক করে রেখে যেতেন, যাতে কারও মাল-সামানা ভুলে ফেলে গিয়ে থাকলে বা কোনো ব্যক্তি পথ হারিয়ে ফেললে-সেসব নিয়ে যেতে পারেন। যা-ই হোক, এই সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কাজের জন্য হযরত সাফওয়ান ইবনু মুয়াত্তিল -কে রেখে যান। আর হযরত সাফওয়ান কাফেলা রওয়ানা করার পর এসে দেখেন যে, সেখানে আয়িশা শুয়ে আছেন। যেহেতু পর্দা নাযিল হওয়ার আগে একদম ছোট থেকেই হযরত সাফওয়ান আম্মাজান আয়িশা -কে চিনতেন, তাই তিনি আম্মাজান আয়িশা -কে ওই অবস্থায় সেখানে দেখে বলে উঠলেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। তারপর সাফওয়ান আম্মাজানকে নিজের উটের পিঠে বসালেন এবং নিজে উটের রশি টানতে টানতে শেষমেশ কাফেলার সাথে দুপুর নাগাদ মিলিত হলেন। তো, মাঝখানে এই যে আম্মাজান আয়িশা -এর হার হারিয়ে যাওয়া এবং কাফেলা থেকে পেছনে পড়ে যাওয়া-ছোট্ট এই দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে আঘাত দেওয়ার জন্য এবং মুসলিমদের মধ্যকার ঐক্য বিনষ্ট করার লক্ষ্যে, আম্মাজান আয়িশা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সফর তদারকির জন্য নির্ধারিত সাহাবি হযরত সাফওয়ান -এর নামে বিশাল বড় এক অপবাদের ঘটনা ছড়িয়ে দিয়েছে। মুনাফিকরা তিলকে তাল বানিয়ে বানোয়াট ঘটনাটি প্রচার করতে থাকে এবং মদীনাতেও মুনাফিকদের এই আলোচনা চলতে থাকে।
একসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানেও খবরটি পৌঁছায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন এমনিতেই আত্মমর্যাদাশীল। তার ওপর উনার প্রিয়তমা বিবিকে নিয়ে এমন কথা শুনে উনি মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়লেন। যা-ই হোক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা-এর ঘরে যান, সালাম দেন, কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন; কিন্তু আয়িশা বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আগের মতো আন্তরিক না। সফর থেকে ফিরে আসার পরে কী এমন হলো-ইত্যাদি ভেবে ভেবে আয়িশা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আয়িশা কিন্তু তখনো জানেন না যে, কী মিথ্যা ঘটনা ও অপবাদ উনার নামে সব জায়গায় ছড়ানো হয়েছে। তো, এক রাতে আয়িশা জরুরত পূরণ করার উদ্দেশ্যে বের হন এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে উম্মু মিসতাকে সাথে নেন- যিনি আয়িশা -এর খিদমত করতেন। পথিমধ্যে উম্মু মিসতা গায়ের চাদর পায়ে লাগার কারণে পড়ে যান এবং পড়ে গিয়েই নিজের ছেলের নামে বদদুআ করে বললেন, 'মিসতার ধ্বংস হোক।' আয়িশা এমন শুনে অবাক হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন যে, মিসতা একজন বদরি সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁর নামে বদদুআ করা হচ্ছে। প্রশ্ন শুনে উম্মু মিসতা আশ্চর্য হলেন, সারা মদীনার অলি-গলিতে যে ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে-তা আয়িশা জানেন না দেখে।
উম্মু মিসতা তখন ঘটনাটি আয়িশা-এর কাছে খুলে বললেন এবং জানালেন যে, মিসতাকে বদদুআ করার কারণ হলো, উক্ত অপপ্রচার যারা করছে, এর মধ্যে মিসতাও একজন। সব শুনে আয়িশা অস্থির হয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি তাঁর বাবা হযরত আবু বকর-এর বাড়ি যাবেন এবং ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছে-তা আরও ভালো করে জানার চেষ্টা করবেন। তো, তিনি তাঁর বাবার বাড়ি গেলেন আর ঘটনা জানলেন। এরপর থেকে তিনি দিন- রাত চোখের পাতা এক করতে পারতেন না, শুধু কাঁদতেন। আয়িশা-এর মা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন-তোমার মতো এতদিকে গুণী একজন রমণীর শত্রু থাকবেই, এজন্য শত্রুতা চলছে; তুমি সবর করো।
হঠাৎ একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা-এর বাড়িতে আসলেন, আয়িশা-এর খুব কাছাকাছি বসলেন এবং চলমান অপপ্রচারমূলক ঘটনাটি মিথ্যা জানার পরেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়িশা -এর কাছ থেকে উত্তর শোনার জন্য ঘটনাটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। ব্যাপারটি আয়িশা-এর আত্মমর্যাদায় লাগে, তাই তিনি তাঁর বাবা হযরত আবু বকর-কে কিছু বলতে বললেন। কিন্তু আবু বকর না-সূচক জবাব দিলেন। এরপর বাধ্য হয়ে আয়িশা তাঁর মাকে আরজ করলেন, যাতে আয়িশা -এর পক্ষে কিছু বলা হয়। কিন্তু মাও কিছু বললেন না। আয়িশা তখন অল্পবয়স্কা একজন তরুণী, পবিত্র কুরআনের সামান্য কিছু অংশ তখন উনার ইয়াদ ছিল। তো তিনি পবিত্র কুরআন থেকে কী বলবেন-সেটা মনে মনে খুঁজছিলেন এবং শেষে বললেন যে, 'আমার অবস্থা নবি ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর মতো।' ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে হারিয়েছেন। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর কাছে যখন তাঁর ছেলেরাই মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে এনে জানাল যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে, তখন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর আক্ষেপ করা ছাড়া বলার আর কিছু ছিল না। থাকলেও কাকেই বা বলবে? নিজের ছেলেরাই তো মিথ্যা বলছে। এজন্যই আয়িশা বললেন যে, তাঁর অবস্থা এখন নবি ইয়াকুব (আ)-এর মতো; সবরে জামীল ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কথাটি ব্যক্ত করে আম্মাজান আয়িশা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অভিমান করে অন্যদিকে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য উঠতে যাবেন, আর তখনই পবিত্র কুরআনের 'সূরা নূর' এর দীর্ঘ কিছু আয়াত নাযিল হলো প্রায় দুই পৃষ্ঠাব্যাপী। আয়াত নাযিল হওয়ার পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে হেসে আয়িশা -কে জানালেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতার ঘোষণা দিয়েছেন।' (সুবহানাল্লাহ!)
আয়িশা -এর একদম সর্বোচ্চ ইয়াক্বীন ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করবেনই। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সরাসরি পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল করে কিয়ামত পর্যন্ত সেটা সংরক্ষণ করে রাখবেন-এমন উপযুক্ত আয়িশা নিজেকে ভাবতেন না। যা-ই হোক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখনও সেখানে বসা ছিলেন। আয়িশা -এর বাবা-মা তখন আয়িশা -কে নির্দেশ দিলেন, 'যাও, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।' আয়িশা এখানেও অভিমান করে বললেন, 'আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কৃতজ্ঞতা আমি এখন জ্ঞাপন করব না।'[১৯]
উক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, সাহাবাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে সরানোর জন্য অপবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে আলিমদের কাছ থেকেও সাধারণ মানুষকে সরানোর জন্য অপবাদ ও অপপ্রচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই এ ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। শয়তান ও শয়তানরূপী মানুষ এই হাতিয়ার ব্যবহার করে আমাদেরকে যেন আলিমদের থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। তাহলে কিন্তু একটা সময় আমরা দ্বীন থেকে দূরে সরে যাব। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাজত করুন।
উক্ত ঘটনার মাঝে অপবাদ এবং অপপ্রচার—উভয়টি পাওয়া যাচ্ছে।
টিকাঃ
[১৯] বুখারি, ৩৮৩৫।
📄 গোনাহ কোনটা, নিফাক কোনটা
এবার আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। যেটা মূল কথা ছিল, অপবাদ আর অপপ্রচার এক জিনিস না। মানুষ সাধারণত অপপ্রচারেরই স্বীকার হয় বেশি। যেকোনো ঘটনার সঠিক অবস্থান না জেনে কোনো মুমিন দুনিয়াবি কারণে কিংবা ব্যক্তিগত কারণে অন্য কোনো মুমিনের নামে অপবাদ, অপপ্রচার করতে পারে না; করলে সেটা হবে কবীরা গুনাহ। আর অপবাদ-অপপ্রচার যদি হয় ইসলামের কারণে, দ্বীনের কারণে, দ্বীনি কোনো কথা ভালো না লাগার কারণে, তাহলে তা সুস্পষ্ট নিফাক। নিফাক যার ভেতর থাকে, সে আল্লাহর কাছে মুনাফিক। সুতরাং, 'যা রটে, তার কিছু না কিছু তো ঘটে'— কথাটি কিছু ক্ষেত্রে সত্য হলেও মূলগতভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিহ না। তাই এই কথার ওপর নির্ভর করে যেকোনো ঘটনা কানে এলেই তা রটানোর সুযোগ কারও নেই। কারণ, তখন রটনাকারীর অবস্থান হবে পবিত্র কুরআনের বিপরীত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُم بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِي مِنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে কোরো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে—যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহা আযাব।[২০]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বলছেন: যারা এই জঘন্য মিথ্যা ঘটনা রটিয়েছে—এদের পরিচয় হলো এরা 'উসবাতুম মিনকুম'; এরা তোমাদেরই একজন, তোমাদেরই পরিচয় বহন করে, তোমাদের মধ্য হতেই একটি দল। এদের পরিচয় কাফির না, এদের পরিচয় মুশরিক না; বরং এরা মুসলিম আর এরাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে আঘাত হানার জন্য, মুসলিমদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে সরিয়ে ঐক্যে ফাটল তৈরি করার জন্য এবং মুসলিমদের মধ্যকার ভালোবাসা খতম করার জন্য ঘটনাটি রটিয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন: তোমাদের নামে অপবাদ রটানো হলে তোমরা এটাকে খারাপ দৃষ্টিতে নিও না। 'বালহুওয়া খাইরুল লাকুম'-বরং এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর।
কিভাবে কল্যাণকর? মূলত আল্লাহ তো সবকিছুই স্পষ্টরূপে জানেন; সুতরাং দ্বীন-ইসলামের কারণে কোনো মুমিনের নামে যে অপবাদ, অপচর্চা চলছে, তার কারণে আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। সারা জীবন অনেক ভালো আমল করেও যে মর্যাদা আল্লাহর কাছে পাওয়া যায় না, অপবাদ-অপপ্রচারকারীদের কারণে সেই মর্যাদা পাওয়া যাবে। অপবাদ-অপপ্রচারকারীর জীবনের নেক আমল সব ওই মুমিনের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। আর যদি তাদের কোনো নেক আমল না থাকে, তবে ওই মুমিনের গুনাহগুলো সেইসব পাপিষ্ঠদের ঘাড়ে সওয়ার করা হবে। তাহলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে অপবাদ-অপপ্রচার সহ্য করা কষ্টকর; কিন্তু আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন: 'লা তাহসাবু শাররাল্লাকুম'-এটাকে তোমরা কষ্টকর মনে কোরো না, পরিণামের বিচারে এটা অনেক কল্যাণকর।
যেমন আয়িশা-এর সেই এক মাস অতিবাহিত করা বাহ্যিকভাবে কষ্টকর ছিল; কিন্তু এরপর আয়িশা-এর পবিত্রতা ঘোষণা করেছে পবিত্র কুরআন। আয়িশা-এর সবরের কারণে স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল ইযযাত-এর পক্ষ থেকে আয়িশা-এর পবিত্রতার এই যে সত্যায়ন ও ঘোষণা, নিশ্চয়ই এ প্রাপ্তি অনেক বড়, দামি ও শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এ ঘটনা থেকেই তো শিক্ষা নেওয়া যায়।
এজন্য কোনো মুমিনের নামে যদি অপবাদ রটানো হয়, সে সবর করবে; তবে নিয়ত ঠিক রেখে। 'যার যা ইচ্ছা বলতে থাকুক, আমার কী'-এমন নিয়ত না করে বরং এই নিয়ত থাকতে হবে যে, 'অপবাদ রটানোর পরিণামে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য অবশ্যই ভালো ও সুখকর কিছু আছে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলছেন-অপবাদ রটানোতে যারা যারা যতটুকু অংশ নিয়েছে, আল্লাহ ওই পরিমাণ গুনাহগার হিসেবে তাদের নাম লিখেছেন এবং তারা গুনাহের ওই অংশ পেয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ যে অপবাদ দিয়েছে, যারা অপপ্রচার করেছে, তারা সবাই গুনাহগার। এবং এরই সাথে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো মুমিনের কানে যদি অন্য কোনো মুমিনের অপবাদ আসে, আর তখন যদি সে চুপ থাকে, তবে সেও অপবাদ-অপপ্রচারের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকার কারণে গুনাহগার। আবার, কোনো মুমিনের নামে অপবাদ- অপপ্রচারমূলক কথা শুনে যদি যাচাই-বাছাই ছাড়া অন্তরে কুধারণা পোষণ করা হয়, তবে সেও গুনাহগার। অর্থাৎ এরা সবাই গুনাহের ভাগীদার। আর আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, যে বা যারা অপবাদ-অপপ্রচারের নেতৃত্বে থাকে, তার বা তাদের জন্য ভয়ংকর সাজা অবধারিত।
আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। পবিত্র কুরআনের আয়াত থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
[২০] সূরা আন-নূর, ২৪: ১১।