📘 জান্নাতি জীবন > 📄 অপপ্রচার

📄 অপপ্রচার


এর দলিল হিসেবে বুখারি শরীফের একটি ঘটনা পেশ করছি। ঘটনাটি বলার উদ্দেশ্য হলো একটা বিষয় বোঝানো। সেটা হলো-যাদেরকে মানুষ বুজুর্গ, নেককার, আল্লাহওয়ালা মনে করে এবং ভালোবাসে, যখন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচার হয়, তখন যতটা ভালোবাসত, ঠিক ততটা ঘৃণা করা শুরু করে। তাঁদের থেকে বিপরীত দিকে ছোটা শুরু করে। এ কথা ভুলে যায়, তাঁরাও আমাদের মতো মানুষ। ভুল তো আমাদেরও হয়।
আমাদের স্ত্রীরা গুনাহ করলে আমরা কি তাদেরকে সাথে সাথে তালাক দিয়ে দিই? না, দিই না। তদ্রূপ, স্বামী গুনাহে জড়িয়ে পড়লে স্ত্রী কি সাথে সাথে স্বামীকে ত্যাগ করে? ছেলে গুনাহ করলে বা অবাধ্য হলে কি বাবা সাথে সাথে ছেলেকে ছেড়ে দেয়? নাকি বাবা গুনাহ করলে ছেলে সাথে সাথে বাবাকে ত্যাগ করে? কিন্তু কেউ যদি দ্বীনের কারণে কাউকে ভালোবাসে, আর যদি তার নামে উলটাপালটা কিছু শোনে, তখন ভালো করে তাহকিক না করেই, ঠিক যতটা ভালোবেসেছিল, ততটা উলটো দিকে ফিরে যায়। এটা আমাদের এক দুর্বলতা। চরম দুর্বলতা।
অথচ এই সামান্য কারণে সে কখনো বাবা, মা, ভাই, বোন, দল, নেতা- কাউকে ছাড়ে না। কিন্তু যাদের মাধ্যমে সে জান্নাতে যাবে, যাদের সাথে সে জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাঁদের ব্যাপারে কিছু শোনার পরপরই তাঁদেরকে ছেড়ে দেয়। উলটো পথে যাওয়া শুরু করে।
বুখারি আমাদেরকে ঘটনাটা শোনাচ্ছেন, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে।
وَقَالَ اللَّيْثُ حَدَّثَنِي جَعْفَرُ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ هُرْمُزَ، قَالَ قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ - رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " نَادَتِ امْرَأَةُ ابْنَهَا، وَهُوَ فِي صَوْمَعَةٍ قَالَتْ يَا جُرَيْجُ. قَالَ اللَّهُمَّ أُمِّي وَصَلَاتِي، قَالَتْ يَا جُرَيْحُ. قَالَ اللَّهُمَّ أُمِّي وَصَلاتِي. قَالَتْ يَا جُرَيْجُ قَالَ اللَّهُمَّ أُمِّي وَصَلَاتِي قَالَتِ اللَّهُمَّ لَا يَمُوتُ جُرَيْجٌ حَتَّى يَنْظُرَ فِي وَجْهِ الْمَيَامِيسِ، وَكَانَتْ تَأْوِي إِلَى صَوْمَعَتِهِ رَاعِيَةٌ تَرْعَى الْغَنَمَ فَوَلَدَتْ فَقِيلَ لَهَا مِمَّنْ هَذَا الْوَلَدُ قَالَتْ مِنْ جُرَيْجٍ نَزَلَ مِنْ صَوْمَعَتِهِ. قَالَ جُرَيْجُ أَيْنَ هَذِهِ الَّتِي تَزْعُمُ أَنَّ وَلَدَهَا لِي قَالَ يَا بَابُوسُ مَنْ أَبُوكَ قَالَ رَاعِي الْغَنَمِ ".
'আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "এক মহিলা তার ছেলেকে ডাকল। তখন তার ছেলে গির্জায় ছিল। বলল, 'হে জুরাইজ!' ছেলে মনে মনে বলল, 'হে আল্লাহ! (একদিকে) আমার মা (এর ডাক), আর (অন্যদিকে) আমার নামাজ!' মা আবার ডাকলেন, 'হে জুরাইজ!' ছেলে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার মা, আর আমার নামাজ!' মা আবার ডাকলেন, 'হে জুরাইজ!' ছেলে বলল, 'হে আল্লাহ! আমার মা ও আমার নামাজ।' মা বললেন, 'হে আল্লাহ! পতিতাদের সামনে দেখা না যাওয়া পর্যন্ত যেন জুরাইজের মৃত্যু না হয়।' এক রাখালনী-যে বকরি চরাত, সে জুরাইজের গির্জায় আসা-যাওয়া করত। সে একটি সন্তান প্রসব করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'এ সন্তান কার ঔরসজাত?' সে জবাব দিলো, 'জুরাইজের ঔরসের।' জুরাইজ তার গির্জা হতে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় সে মেয়েটি, যে বলে যে, তার সন্তানটি আমার?' (সন্তান- সহ মেয়েটিকে উপস্থিত করা হলে) জুরাইজ বলেন, 'হে বাবুস! তোমার পিতা কে?' সে বলল, 'বকরির অমুক রাখাল।'”””[১৫]
ওপরে হাদীসটি কিতাব থেকে সরাসরি তুলে দিলাম। এখন হাদীসটি নিজের ভাষায় সহজ করে বিস্তারিত বলব।
কুরআন-হাদীস আমাদেরকে বিভিন্ন গল্প-কাহিনি শোনায়। উদ্দেশ্য হলো, গল্পে গল্পে যাতে আমরা আমাদের জীবন গড়ি। এই গল্পগুলো ভালো লাগার জন্য বা চিত্তবিনোদনের জন্য না।
ওই যুগে একটা নিয়ম ছিল। কেউ যদি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে চাইত, তাহলে ঘরবাড়ি সব ছেড়ে একটা নির্দিষ্ট ঘরে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতো। এই বিখ্যাত বুজুর্গ জুরাইজও আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ঘরবাড়ি সব ছেড়ে আলাদা এক ঘরে আল্লাহর ইবাদত করতেন। জুরাইজ তাঁর প্রয়োজন ব্যতীত বাকি সময় অর্থাৎ খাওয়া-দাওয়া, ইসতিনজা ব্যতীত বাকি সময় নামাজে কাটাতেন। একদিন জুরাইজের মা খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তাঁর কাছে আসল। জুরাইজ তখন নামাজে। তিনি মায়ের ডাক শুনে নামাজে মনে মনে বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! মা নাকি নামাজ? মা নাকি নামাজ?'
অর্থাৎ মনে মনে আল্লাহকে একথা বলছিলেন-হে আল্লাহ! আমার মা আমাকে ডাকছে। আমি কি নামাজ চালিয়ে যাব, নাকি মায়ের ডাকে সাড়া দেবো? এভাবে চিন্তা করতে করতে তিনি নামাজ চালিয়ে গেলেন। মা তখন জুরাইজের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে চলে গেল।
পরের দিন আবার মা জুরাইজের কাছে আসল। তিনি প্রয়োজন ব্যতীত বাকি সময় যেহেতু নামাজে কাটাতেন, তাই তখনও তিনি নামাজ পড়ছিলেন। মা জুরাইজকে ডাকতে লাগল, 'ইয়া জুরাইজ! ইয়া জুরাইজ!'
তখন তিনি মনে মনে আল্লাহকে একথা বলছিলেন-হে আল্লাহ! আমার মা আমাকে ডাকছে। এখন আমি কী করব? নামাজ চালিয়ে যাব, নাকি মায়ের ডাকে সাড়া দেবো? এভাবে চিন্তা করতে করতে তিনি নামাজ চালিয়ে গেলেন। তারপর মা কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সেই দিনও ফিরে গেলেন।
তৃতীয় দিন মা আবার আসলেন। এসে জুরাইজকে ডাকতে লাগলেন, 'ইয়া জুরাইজ! ইয়া জুরাইজ!'
তখনো তিনি আগের মতো মনে মনে আল্লাহকে একথা বলতে লাগলেন-হে আল্লাহ! আমার মা আমাকে ডাকছে। এখন আমি কী করব? নামাজ চালিয়ে যাব, নাকি মায়ের ডাকে সাড়া দেবো?
তিনি নামাজ চালিয়ে গেলেন।
মায়েরা যদিও ছেলে-মেয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ, কিন্তু বদদুআর ক্ষেত্রে মায়েরা খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে। যে ছেলের জন্য মা তার জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে দেয়, সারাজীবন অনেক কষ্ট করে, সেই ছেলে যদি বিয়ের পর একটু এদিক-সেদিক করে, তাহলে আর রক্ষা নেই! অন্য কিছু না হোক, মায়ের জবান তো আছে! যা-ই হোক, এভাবে জুরাইজের মা যখন তৃতীয় দিন এসেও ছেলের কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেল না, তখন মা জুরাইজকে বদদুআ দিতে লাগল: 'হে আল্লাহ! জুরাইজ যেন কোনো পতিতার চেহারা না দেখে কখনো না মরে!'
পতিতার চেহারা সাধারণত খারাপ মানুষেরাই দেখে। যে জুরাইজ বাড়ি-ঘর সবকিছু ছেড়ে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য বের হয়ে গিয়েছে, তাঁর জন্য এটা কত মারাত্মক বদদুআ! এজন্য শরীয়ত মায়ের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। শরীয়ত নির্দেশ দিয়েছে, মায়ের সাথে ব্যবহার যাতে সবচেয়ে বেশি কোমল হয়। কেননা মায়েরা সাধারণত একটু কষ্ট পেলেই রাগের মাথায় এমন কিছু বলে ফেলে-যা সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত,
وَعَنهُ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قَالَ أُمُّكَ قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَأُمُّكَ قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ أُمُّكَ قَالَ : ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَأبُوكَ متفق عليه وَفِي رِوَايَةٍ : يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ ؟ قَالَأُمُّكَ ثُمَّ أُمُّكَ ثُمَّ أُمُّكَ ثُمَّ أَبَاكَ ثُمَّ أَدْنَاكَ أَدْنَاكَ
একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার কে?” তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার মা।” সে বলল, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার বাবা।”[১৬]
অন্য এক বর্ণনায় আছে, 'হে আল্লাহর রাসূল! সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার কে?' তিনি বললেন, 'তোমার মা, তারপর তোমার মা, তারপর তোমার মা, তারপর তোমার বাবা, তারপর যে তোমার সবচেয়ে নিকটবর্তী।[১৭]
যা-ই হোক, বাকি ঘটনা বলি। বনী ইসরাঈলের কাছে জুরাইজ অনেক প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর কথা সবার মুখে মুখে ছিল। সবাই তাঁর ইবাদতের খুব প্রশংসা করত।
এখন ওই যুগের এক খারাপ মহিলা সবার কাছে বলল—তোমরা যাকে এত ভালো বলছো, দেখো আমি তাকে কিভাবে কাবু করি!
তারপর সে জুরাইজের কাছে গেল। কিন্তু জুরাইজ তো নামাজে! তাঁর তো কারও দিকে তাকানোর সময়ই নেই। পরে ওই নারী যখন দেখল জুরাইজ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না, তার দিকে তাকাচ্ছেই না, তখন জুরাইজের সাথে এক রাখাল ছিল, সে ওই রাখালের সাথে অপকর্মে লিপ্ত হলো।
পরবর্তীকালে আস্তে আস্তে ওই নারীর পেটে বাচ্চা আসল। ওই নারীর ইচ্ছা ছিল যেভাবেই হোক জুরাইজের নামে অপবাদ দেবে।
যেহেতু ওই নারী অবিবাহিতা ছিল, তাই বাচ্চা হওয়ার পর মানুষেরা জিজ্ঞাসা করতে লাগল যে, সে বাচ্চা কোথায় পেল? তখন ওই মহিলা বলল—এই বাচ্চা জুরাইজের। আমি বলছিলাম যে, আমি জুরাইজকে ফিতনায় ফেলব। আর এই ফিতনার ফল এই বাচ্চা। এই বাচ্চা জুরাইজ থেকে হয়েছে।
ঠিক তখনই-যারা আগে জুরাইজকে খুব পছন্দ করত, তাঁকে দেখার জন্য সব সময় উদগ্রীব থাকত, তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল-তারাই জুরাইজের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে গেল। যাচাই-বাছাই করার কোনো গরজ করল না। জুরাইজের ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। কোনো কিছু চিন্তা না করেই, বিচার-বিশ্লেষণ না করেই সবাই একমত হয়ে গেল যে, 'জুরাইজের বিচার করতে হবে। তাকে এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমরা তো তাকে অনেক বড় বুজুর্গ মনে করতাম, অথচ সে এত বড় অকাজ করে বসল।' তারা একবারও চিন্তা করল না যে, জুরাইজ কি ঘটনা সত্যিই ঘটিয়েছে, না এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে?
শয়তান সব সময় এই সুযোগই নেয়। দ্বীনি ক্ষেত্রে যাকে আমরা আদর্শ বা নেতা মনে করি, যাদেরকে দ্বীনের কারণে ভালোবাসি, তাদের ব্যাপারে কিছু শোনামাত্রই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। ঘটনার আগপিছ খেয়াল করি না। অথচ আমরা নিজেরাই কত হাজার গুনাহে জর্জরিত! আমাদের ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা কত অপরাধ করে! কিন্তু তাদের বেলায় সাথে সাথে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। সাথে সাথে তাদেরকে ছুড়ে ফেলি না। সম্পর্ক ছিন্ন করি না।
কিন্তু দ্বীনের জন্য যাদের সাথে সম্পর্ক, তাঁদের ব্যাপারে কিছু শোনামাত্রই আমরা কোনো রকম বিচার বিশ্লেষণ না করেই অযাচিত মন্তব্য করে বসি। তাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলি।
যদি মেনে নিই, তাঁরা সত্যিই সেই অপরাধ করেছে, তারপরও কি তাঁদের সঙ্গ ত্যাগ করার অনুমতি আছে? তাঁরা শুধু গুনাহই করে? তাঁরা তো তাওবাও করে। আচ্ছা, আলিমদের ছাড়া আমার অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে কি আমি এ আচরণ করি? আলিমদের মতো তাদেরকেও ছেড়ে দিই? অপরাধের কারণে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যে আচরণ করি, তাঁদের সাথেও তো সেরকম আচরণই করার কথা ছিল। নিজেদের ব্যাপারে, নিজেদের অন্যান্য আত্মীয়দের ব্যাপারে যে ছাড় আমি দিই, তাঁদের ব্যাপারেও কি সেরকম ছাড় দেওয়া উচিত ছিল না?
যা-ই হোক, পরবর্তীকালে জুরাইজের ইবাদতগাহে সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে গেল। বেচারা তখন নামাজ পড়ছিল। তাঁকে টেনেহিঁচড়ে তাঁর ঘর থেকে বের করল। ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলো। নষ্ট করে দিলো।
জুরাইজ তো অবাক। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তারপর তাঁর সাথে কোনো কথা না বলেই, কোনো কথা না শুনেই সবাই ইচ্ছামতো তাঁকে মেরে অজ্ঞান করে দিলো। হুশ আসার পর সে সবাইকে তাঁকে মারার, তাঁর ইবাদতগাহ ভেঙে ফেলার কারণ জিজ্ঞাসা করল।
জনগণ তখন ওই নারীকে সন্তান-সহ তাঁর সামনে নিয়ে আসল। বলল—এই যে তোমার পাপের ফসল!
জুরাইজ তখন বুঝতে পারল ঘটনা। সে দুই রাকআত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইল। নামাজ পড়ার পর সে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দুআ করল। এরপর বাচ্চার কাছে গিয়ে তার পেটে টোকা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার বাবা কে?'
সদ্য ভূমিষ্ট বাচ্চা। কথা বলতে পারার কথা না। কিন্তু বাচ্চা বলে উঠল, 'অমুক রাখাল আমার পিতা।'
তখন সবাই প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারল। সবাই মিলে জুরাইজের কাছে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। তাঁর ইবাদতগাহ যেটা ভেঙে ফেলছিল, সেটা আবার নতুন করে বানিয়ে দিলো।
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই ঘটনাটি শুধু ঘটনা হিসেবে শোনানো উদ্দেশ্য না। যে লোক আল্লাহর ইবাদতের জন্য ঘর-বাড়ি সব কিছু ছেড়ে দিলো, যাকে সবাই খুব ভালোবাসতো, সবাই যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল, তাঁর ব্যাপারে যখন উলটাপালটা কিছু শুনল, তখন কোনো কিছু ভালো করে না জেনে না বুঝেই বিপরীত দিকে ছোটা শুরু করল। যদিও সেইসব কথা তারা পতিতার মুখ থেকেই শুনেছে! তবুও তারা জুরাইজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল!
এখানে রাসূলুল্লাহর এই ঘটনা বলার দ্বারা এটাই বোঝানো উদ্দেশ্য যে, আমাদের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা ঘটবে। আর এখন অহরহ এই ঘটনাই ঘটছে। আমরা দ্বীনের ক্ষেত্রে যাদের অনুসরণ করি, ভালোবাসি, দ্বীনের ক্ষেত্রে যাদের নেতা হিসেবে মনে করি, তাদের ব্যাপারে কিছু শোনামাত্রই ঘটনার আগপিছ চিন্তা না করেই, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাই! তাদের ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করে বসি। তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলি। তাদের ব্যাপারে আমরা উলটো প্রতিক্রিয়া দেখাই। যদিও দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ ব্যক্তি আমাদের কাছে তাদের ব্যাপারে কিছু বলে, তবুও আমরা কোনো রকম বিচার-বিশ্লেষণ না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই!

টিকাঃ
[১৫] সহিহ বুখারি, হাদীস নং: ১২০৬।
[১৬] বুখারি, ৫৯৭১; মুসলিম, ৬৬৬৪।
[১৭] মুসলিম, ৬৬৬৫।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 তাঁদেরকেও ছাড় দেবো

📄 তাঁদেরকেও ছাড় দেবো


আমাদেরকে এ ব্যাপারে নিজেদের ইসলাহ করতে হবে। আমাদের দিলে ভালো করে বসাতে হবে যে, আলিম-উলামারা নিষ্পাপ না। আমরা যেমন গুনাহ করি, তারাও তেমনই গুনাহ করতে পারে। গুনাহ করার পর আমরা নিজেরা নিজেদের সাথে যেরকম আচরণ করি, তাদের সাথেও আমরা সেই একই আচরণ করব। আমাদের বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন তাদেরকে যেমন ভালোবাসি, আলিম-উলামাদেরকেও তেমনই ভালোবাসব। আমার সন্তান-স্ত্রী কোনো ভুল করলে, গুনাহ করলে, আমরা যে আচরণ করি, ছাড় দিই, সুযোগ দিই, তাঁদের সাথেও সেই একই আচরণ করব। তাঁদেরকেও ছাড় দেবো। সুযোগ দেবো।
নয়তো শয়তান আমাদের দুর্বলতাকে, আমাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে, আলিম-উলামাদের থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে দেবে। আর এভাবে আস্তে আস্তে দ্বীন-ঈমান থেকেও আমাদেরকে সরিয়ে দেবে।
আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফীক দান করুন।
অতএব, উক্ত ঘটনা থেকে আমরা এটা বুঝলাম, শয়তান আমাদেরকে আলিমদের নামে বদনাম রটিয়ে আলিমদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়; এরপর ধীরে ধীরে দ্বীন থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। তাই আমি যদি আমার দ্বীন-ঈমান বাঁচাতে চাই, তাহলে অবশ্যই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
এখন একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, আলিম-উলামাদের নামে যে সমস্ত দোষত্রুটি ছড়ায় বা মিডিয়াতে প্রকাশ পায়, কেউ যদি তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তার কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? সামনের আলোচনাতে আমরা এ বিষয়টি ক্লিয়ার করব। এক কথায় বললে, এতে আমাদের ঈমান ধ্বংস হওয়ার পুরোপুরি আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিস্তারিত আলোচনা বোঝা জরুরি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00