📄 জুড়ে থাকার অর্থ
দ্বীনের সাথে জুড়ে থাকার মানে হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী হওয়া। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপস্থিতিতে দ্বীনি রাহবারদের সাথে জুড়ে থাকা। মক্কাতে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের ডাকে, ঈমানের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে দারুল আরকামে মিলিত হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুঁজলে ওখানে পাওয়া যেত। এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। সাহাবাগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছায়ার মতো থাকতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রঙে নিজেকে সাজাতেন। সেজন্যই তো একবার এক আরব লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক মজমায় উপস্থিত হয়ে সবাইকে একই বেশভূষায় দেখে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন-'আইয়্যুকুম মুহাম্মাদ' (আপনাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?)। [১৩] এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। বছরে একদিন কোনো আলিমের বয়ান শুনলাম কিংবা মাসে একবার কোনো আলিমের মজলিসে গেলাম-এর মানে জুড়ে থাকা নয়, ওয়াল্লাহি! ইসলামের সাথে যেভাবে জুড়ে থাকতে হয়, তা শুধু ওয়াজ- বয়ান শুনে হয় না, দুয়েকটা মজলিসে গেলেই হয় না; বরং সবকিছু দিয়ে, প্রয়োজনে সবকিছু ত্যাগ করে বাস্তবে আমলের ময়দানে থাকতে হয়।
একটি উদাহরণ। মাঠ পর্যায়ের নেতা যারা থাকে, তাদের ডাকে যেসব কর্মীরা তেমন একটা সাড়া দেয় না, নেতাদের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকে না, তাদেরকে সেই নেতা কি কখনো কর্মী হিসেবে মেনে নেয়? মানে না। এই বিষয়টি দুনিয়ার ক্ষেত্রে ঠিকই বুঝি, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে একদমই বুঝি না। বাৎসরিক একটা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করার পর এমন কাউকে ডাকলাম-যার কণ্ঠ সুন্দর; কিন্তু ইলম আছে কি নেই, তা দেখলাম না। আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বললাম, 'আমি দ্বীনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী।' ইমাম সাহেবের পেছনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম আর মাঝেমধ্যে সালাম-মুসাফাহা করলাম- এগুলোর মানে জুড়ে থাকা নয়।
আলিমদের সাথে জুড়ে থাকার অর্থ হলো: নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কাজ, কথা, মুআমালাত, মুআশারাত, নিজের প্রত্যেকটি সকাল-সন্ধ্যা, উঠাবসা- সহ সকল মুহূর্ত শরীয়ত অনুযায়ী হচ্ছে কি না-তা বোঝার জন্য একজন আলিমের সাথে সম্পর্ক করা এবং তাঁর পরামর্শে চলা। কারণ যেখানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা নেই, সেখানে দ্বীন নিয়ে অন্ততপক্ষে টিকে থাকার মাধ্যম হলো উলামায়ে কেরাম। আর টিকে থাকার রূপ কী, তাও পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত, কোনো জীবনাদর্শ অন্তরের ভেতর পুরোপুরি প্রবেশ করানোর জন্য, ওই জীবনাদর্শ লালনকারী কারও সঙ্গে জুড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসায়ী কারও সাথে থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসার প্রতি এক ধরনের অনুরাগ আসে। খেলাধুলা বা গেইমসে আসক্ত কোনো ব্যক্তির সাথে থাকলে ধীরে ধীরে অন্তরে খেলার প্রতি আসক্তি পয়দা হয়। যার নারীর প্রতি আসক্তি বেশি-এমন ব্যক্তির সাথে কেউ থাকলে তারও নারীর প্রতি আসক্তি অবশ্যই তৈরি হবে। তেমনই কোনো হক্কানী-রব্বানী আলিমের সঙ্গ অবলম্বন করলে দ্বীনিয়াত, ঈমানিয়াত অন্তরে প্রবেশ করবে, দ্বীনের ওপর চলার জন্য ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হবে। এবং আলিম-উলামা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনকে যতটুকু সাজায়, কমপক্ষে ততটুকু সেও সাজাবে; আলিম-উলামাদের মতো কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন চালানোর চেষ্টা অন্তরে জাগবে।
যা-ই হোক, মাক্কি যুগে মুসলিমদের হাতে ক্ষমতা ছিল না। মুসলিমরা সেসময় সর্বাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জুড়ে থাকত। আর মাদানি যুগে ইসলামি খিলাফতও ছিল এবং তার সাথে মুসলিমদের দ্বীন-ঈমানের জিম্মাদারির দায়িত্ব ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর; এই দুটো একত্রে মিলে ইসলামের পূর্ণতা এসেছে। আর ইসলাম যখন পরিপূর্ণ হলো, তখন অবস্থা এমন যে, নেতৃত্ব ইসলামের হাতে; জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে যত শিক্ষা আছে-সবকিছু তখন ওহীর শিক্ষার অনুগামী। এটাই ইসলামের বিজয়ী অবস্থা। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দুটি পাঠ। কিন্তু তিনি নিষ্পাপ; আর ইসলামের এই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তথা আলিমদেরকে নিষ্পাপ মনে করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ তাঁরা নবি-রাসূল নন। তাঁরা ভুল করতে পারেন, গুনাহ করতে পারেন। নিশ্চয়ই ভুলের ক্ষেত্রে কেউ অনুসরণীয় নয়; তবে তাই বলে কিছু ভুলের জন্য তাঁদের জীবনের সঠিক সব বিষয়গুলো একদম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করাটাও সমীচীন নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন, আমিন।
এতক্ষণ আলোচনার ফলাফল হলো, বর্তমানে আমরা দ্বীন নিয়ে টিকে থাকতে হলে আলিমদের সঙ্গ ছাড়া সম্ভব না। তবে আলিমগণ ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন; তাই তাঁদেরকে নবিদের মতো নিষ্পাপ মনে করার সুযোগ নেই। ভুল তাঁরা করতেই পারেন। আমরা ভুলের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করব না।
খবরদার, এমন যেন না হয় যে, দুয়েকটি ভুল পেলেই তাঁদের সঙ্গ ত্যাগ করে ফেলি। তাহলে কিন্তু আমরা শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হব। তাই সামনে আলোচনা করা হবে, শয়তান কোন কৌশলে আমাদেরকে আলিমদের থেকে দূরে সরিয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বীন থেকেই সরিয়ে ফেলে।
টিকাঃ
[১৩] বুখারি, ৬৩