📄 আমাদের প্রান্তিকতা
এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। আমাদের মাঝে দুই ধরনের প্রান্তিকতা রয়েছে।
. এক. আলিমদেরকে নবিদের মতো নিষ্পাপ মনে করা।
• দুই. সামান্য ভুল দেখলেই তাঁদের পুরো জীবনের কীর্তিকে অবমূল্যায়ন করা।
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, 'এতে সমস্যা কোথায়?' আমরা এর উত্তরে বলব, একজন ঈমানদারের মূল সমস্যা এখানেই। এ ধারণাকে পুঁজি করে শয়তান সাধারণ মানুষকে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়। প্রথমে আলিম-উলামাদের থেকে সরায়, এরপরে ধীরে ধীরে দ্বীন থেকেই সরিয়ে ফেলে।
এবার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
কোনো মানুষ একাকী বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ, পরিবার-সমাজ ইত্যাদি সবকিছু ছেড়ে সম্পূর্ণ একক অবস্থান গ্রহণ করা একজন মানুষের জন্য খুব কঠিন। এজন্য শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, মুসলিমরা কোনো নেতৃত্বের অধীনে চলবে; অর্থাৎ জামাআতবদ্ধভাবে মুসলিমরা চলবে। কারণ, জামাআতবদ্ধভাবে চললেই মুসলিমদের জন্য দ্বীন-ঈমান নিয়ে বাঁচা সহজ; অন্যথায় দ্বীন-ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকা কষ্টকর। দ্বীন-ঈমানের সাথে জুড়ে থাকার জন্যই মুসলিমদেরকে কোনো নেতৃত্বের অধীনে থাকা অনেক জরুরি। আর, মুসলিমরা মূলত দুই নেতৃত্বের অধীনে ইসলামের সাথে লেগে থাকে।
• এক. মুসলিমদেরকে পরিচালনার জন্য যদি আল্লাহর প্রতিনিধি তথা খলিফাতুল মুসলিমীন থাকে—যাদের অধীনে মুসলিমদের সমস্ত শাসনভার ন্যস্ত থাকে, তখন এই সকল আয়িম্মা বা নেতৃস্থানীয় লোকের মাধ্যমেই মুসলিমরা ইসলাম, ঈমান, জান-মাল-সহ সবকিছুর নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি মজবুতির সাথে টিকে থাকে।
• দুই. যদি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং নেতৃত্ব না থাকে বা নেতৃস্থানীয় লোকেরা ইসলামের নেতৃত্ব না দেয় বা ইসলাম ও মুসলিমদের হালত তাদের সামনে না থাকে, তখন মুসলিমদের দ্বীন-ঈমান সাধারণত টিকে থাকে আলিম-উলামাদের সাথে জুড়ে থাকার মাধ্যমে।
আর যদি এই দুই নেতৃত্ব একসাথে মিলে ইসলামকে এগিয়ে নেয় অর্থাৎ যদি উলামায়ে কেরাম থাকে এবং খলিফাতুল মুসলিমীনও থাকে—যারা দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবে, ইসলামি রাজত্ব কায়েম করবে, তখন ইসলাম ও মুসলিমদের গায়ে আঘাত দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। ইসলাম ও মুসলিমরা তখন সবার ওপরে থাকে। ইসলামের ওপরে তখন আর কোনো কিছু থাকে না। এটি হলো ইসলামের বিজয়ী অবস্থান। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন দ্বীনকে এই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য, যেখানে যাদের হাতে ক্ষমতা থাকবে, তাঁরা দ্বীন-ইসলাম ও মুসলিমদেরকে নিয়ে একসাথে চলবে; এবং উলামায়ে কেরাম যারা, তাঁরাও দ্বীন-ইসলাম নিয়ে চলবে। এই দুই অবস্থান যদি সমাজ আর রাষ্ট্রের ভেতরে থাকে, তখন এটা হলো ইসলামের প্রকৃত অবস্থা এবং ইসলামের সর্বোচ্চ দাবি।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা সাজদায় গুরুত্বপূর্ণ এক আয়াতে 'মানুষ দ্বীন-ঈমান নিয়ে কিভাবে চলবে'—সেটার অবস্থান উদাহরণ দিয়ে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। মূসা আলাইহিস সালাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পরে সাধারণ মানুষজন দ্বীন-ঈমান নিয়ে কিভাবে চলেছিল, আল্লাহ তাআলা সেটা বর্ণনা করেছেন।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ ؟
'আর আমি [মুসার পরে] তাদের (বনী-ইসরাঈলিদের) মধ্যে কিছু লোককে ইমাম হিসেবে নির্ধারণ করে দিই [এটা আল্লাহ তাআলার রীতি, আল্লাহই ইমাম নির্ধারণ করে দেন]-যারা আমার নির্দেশ অনুসারে দ্বীন-ঈমান নিয়ে চলবে এবং মানুষকে পথ প্রদর্শন করবে [অর্থাৎ মানুষ যাদের কথা মোতাবেক দ্বীন ঈমান নিয়ে চলবে] এবং তারা আমার আয়াতসমূহে গভীর বিশ্বাস রাখবে।[১২]
এখন, দ্বীন-ঈমানের পথে মানুষকে চালাতে দুটি যোগ্যতা বা শর্ত লাগবে।
• ১) সবর করতে হবে অর্থাৎ আয়িম্মাদেরকে দ্বীন-ইসলামের ব্যাপারে মজবুত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে এবং তার ওপর দৃঢ় থাকতে হবে। মানুষ ফিতরাতগতভাবেই আল্লাহর প্রতি অনুরাগী, দ্বীনের প্রতি অনুরাগী। অর্থাৎ দ্বীনকে মানুষ ভালোবাসে এবং আল্লাহকে সর্বাবস্থায় পেতে চায়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কথা বলে, তার পক্ষে মানুষের সমর্থন থাকবে-যার ফলে বিপরীত পক্ষ বা ক্ষমতার মালিক ওইসব লোকদের দ্বারা নিজেদের অস্তিত্বের আশঙ্কাবোধ করবে। অর্থাৎ, সমাজে যেসব আলিমদের জনপ্রিয়তা বেশি এবং মানুষের অন্তরে যাদের জন্য মহব্বত-ভালোবাসা প্রকট, সেসব আলিমরা যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর শ্রেণীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখন রাষ্ট্র ওইসব আলিমদেরকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। তাই তাঁদেরকে সব বিপদ-বাধা উপেক্ষা করে, ধৈর্য বা সবর অবলম্বনের মাধ্যমে দ্বীনের ওপর অটল থাকতে হয়।
• ২) দুনিয়ার কোনো চাওয়া-পাওয়া আয়িম্মাদের মাঝে একদমই থাকতে পারবে না এবং তাঁদের সমস্ত আস্থা-বিশ্বাস আল্লাহর সকল নিদর্শন ও আল্লাহর পবিত্র বাণীর ওপরে থাকবে।
অতএব উল্লিখিত আয়াত থেকে বোঝা যায়, যাদের মাঝে এ দুই যোগ্যতা আছে, সাধারণ মুসলিম তাঁদেরকে মেনে চলবে; যদিও ক্ষমতা তাঁদের হাতে না থাকে বা মুসলিমরা ইসলামি নেতৃত্বশূন্য হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকে বিষয়টি মিলিয়ে নিই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দুটো অংশ-মাক্কি ও মাদানি। মাক্কি জীবনে ক্ষমতা ছিল মুশরিকদের হাতে; কিন্তু মুসলিমরা যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা জুড়ে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে।
টিকাঃ
[১২] সূরা সাজদাহ, ৩২: ২৪
📄 জুড়ে থাকার অর্থ
দ্বীনের সাথে জুড়ে থাকার মানে হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী হওয়া। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপস্থিতিতে দ্বীনি রাহবারদের সাথে জুড়ে থাকা। মক্কাতে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের ডাকে, ঈমানের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে দারুল আরকামে মিলিত হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুঁজলে ওখানে পাওয়া যেত। এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। সাহাবাগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছায়ার মতো থাকতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রঙে নিজেকে সাজাতেন। সেজন্যই তো একবার এক আরব লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক মজমায় উপস্থিত হয়ে সবাইকে একই বেশভূষায় দেখে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন-'আইয়্যুকুম মুহাম্মাদ' (আপনাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?)। [১৩] এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। বছরে একদিন কোনো আলিমের বয়ান শুনলাম কিংবা মাসে একবার কোনো আলিমের মজলিসে গেলাম-এর মানে জুড়ে থাকা নয়, ওয়াল্লাহি! ইসলামের সাথে যেভাবে জুড়ে থাকতে হয়, তা শুধু ওয়াজ- বয়ান শুনে হয় না, দুয়েকটা মজলিসে গেলেই হয় না; বরং সবকিছু দিয়ে, প্রয়োজনে সবকিছু ত্যাগ করে বাস্তবে আমলের ময়দানে থাকতে হয়।
একটি উদাহরণ। মাঠ পর্যায়ের নেতা যারা থাকে, তাদের ডাকে যেসব কর্মীরা তেমন একটা সাড়া দেয় না, নেতাদের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকে না, তাদেরকে সেই নেতা কি কখনো কর্মী হিসেবে মেনে নেয়? মানে না। এই বিষয়টি দুনিয়ার ক্ষেত্রে ঠিকই বুঝি, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে একদমই বুঝি না। বাৎসরিক একটা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করার পর এমন কাউকে ডাকলাম-যার কণ্ঠ সুন্দর; কিন্তু ইলম আছে কি নেই, তা দেখলাম না। আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বললাম, 'আমি দ্বীনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী।' ইমাম সাহেবের পেছনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম আর মাঝেমধ্যে সালাম-মুসাফাহা করলাম- এগুলোর মানে জুড়ে থাকা নয়।
আলিমদের সাথে জুড়ে থাকার অর্থ হলো: নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কাজ, কথা, মুআমালাত, মুআশারাত, নিজের প্রত্যেকটি সকাল-সন্ধ্যা, উঠাবসা- সহ সকল মুহূর্ত শরীয়ত অনুযায়ী হচ্ছে কি না-তা বোঝার জন্য একজন আলিমের সাথে সম্পর্ক করা এবং তাঁর পরামর্শে চলা। কারণ যেখানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা নেই, সেখানে দ্বীন নিয়ে অন্ততপক্ষে টিকে থাকার মাধ্যম হলো উলামায়ে কেরাম। আর টিকে থাকার রূপ কী, তাও পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত, কোনো জীবনাদর্শ অন্তরের ভেতর পুরোপুরি প্রবেশ করানোর জন্য, ওই জীবনাদর্শ লালনকারী কারও সঙ্গে জুড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসায়ী কারও সাথে থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসার প্রতি এক ধরনের অনুরাগ আসে। খেলাধুলা বা গেইমসে আসক্ত কোনো ব্যক্তির সাথে থাকলে ধীরে ধীরে অন্তরে খেলার প্রতি আসক্তি পয়দা হয়। যার নারীর প্রতি আসক্তি বেশি-এমন ব্যক্তির সাথে কেউ থাকলে তারও নারীর প্রতি আসক্তি অবশ্যই তৈরি হবে। তেমনই কোনো হক্কানী-রব্বানী আলিমের সঙ্গ অবলম্বন করলে দ্বীনিয়াত, ঈমানিয়াত অন্তরে প্রবেশ করবে, দ্বীনের ওপর চলার জন্য ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হবে। এবং আলিম-উলামা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনকে যতটুকু সাজায়, কমপক্ষে ততটুকু সেও সাজাবে; আলিম-উলামাদের মতো কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন চালানোর চেষ্টা অন্তরে জাগবে।
যা-ই হোক, মাক্কি যুগে মুসলিমদের হাতে ক্ষমতা ছিল না। মুসলিমরা সেসময় সর্বাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জুড়ে থাকত। আর মাদানি যুগে ইসলামি খিলাফতও ছিল এবং তার সাথে মুসলিমদের দ্বীন-ঈমানের জিম্মাদারির দায়িত্ব ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর; এই দুটো একত্রে মিলে ইসলামের পূর্ণতা এসেছে। আর ইসলাম যখন পরিপূর্ণ হলো, তখন অবস্থা এমন যে, নেতৃত্ব ইসলামের হাতে; জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে যত শিক্ষা আছে-সবকিছু তখন ওহীর শিক্ষার অনুগামী। এটাই ইসলামের বিজয়ী অবস্থা। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দুটি পাঠ। কিন্তু তিনি নিষ্পাপ; আর ইসলামের এই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তথা আলিমদেরকে নিষ্পাপ মনে করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ তাঁরা নবি-রাসূল নন। তাঁরা ভুল করতে পারেন, গুনাহ করতে পারেন। নিশ্চয়ই ভুলের ক্ষেত্রে কেউ অনুসরণীয় নয়; তবে তাই বলে কিছু ভুলের জন্য তাঁদের জীবনের সঠিক সব বিষয়গুলো একদম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করাটাও সমীচীন নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন, আমিন।
এতক্ষণ আলোচনার ফলাফল হলো, বর্তমানে আমরা দ্বীন নিয়ে টিকে থাকতে হলে আলিমদের সঙ্গ ছাড়া সম্ভব না। তবে আলিমগণ ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন; তাই তাঁদেরকে নবিদের মতো নিষ্পাপ মনে করার সুযোগ নেই। ভুল তাঁরা করতেই পারেন। আমরা ভুলের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করব না।
খবরদার, এমন যেন না হয় যে, দুয়েকটি ভুল পেলেই তাঁদের সঙ্গ ত্যাগ করে ফেলি। তাহলে কিন্তু আমরা শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হব। তাই সামনে আলোচনা করা হবে, শয়তান কোন কৌশলে আমাদেরকে আলিমদের থেকে দূরে সরিয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বীন থেকেই সরিয়ে ফেলে।
টিকাঃ
[১৩] বুখারি, ৬৩