📘 জান্নাতি জীবন > 📄 হুজুররাও ভুল করতে পারে

📄 হুজুররাও ভুল করতে পারে


এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই বিশ্বাস রাখা জরুরি? তার কারণ হলো, সম্মানিত আলিম-উলামা হলেন নবিদের উত্তরাধিকারী। অনেকে আলিম-উলামাদের দ্বারা কোনো গুনাহ হতে দেখলে সহজে মেনে নিতে পারে না, এ মন্তব্য করে বসে, 'উনার মতো আলিম এমন কাজ করতে পারেন!' এভাবে মনের ভেতর বহু আজেবাজে চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। এক পর্যায়ে ওই আলিমের কাজের ছুতো দিয়ে দ্বীনকেই ছেড়ে দেয়। এ ধরনের আজেবাজে কিছু একটা ভেবে দ্বীনকে ছেড়ে দেওয়া মারাত্মক ঈমান-বিরোধী বিষয়।
আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলদেরকে মাসুম বানিয়েছেন, নিষ্পাপ বানিয়েছেন-এটা মানা আমাদের ঈমানের অংশ। নবি-রাসূল ছাড়া আর অন্য কারও ব্যাপারে নিষ্পাপ হওয়ার ধারণা করা শরীয়তে জায়েজ নেই। সুতরাং, কেউ গুনাহ করলে সেটাকে অস্বাভাবিক মনে করার কিছু নেই। যে গুনাহ করে, সেও আমার মতোই মানুষ। এই যুগের উলামায়ে কেরام যেমন মানুষ, আমরা সাধারণরাও তেমনই মানুষ। আমরা যেমন কোনো ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে না, তেমনইভাবে উলামায়ে কেরামও কোনো ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে না। বিষয়টি শুধু এই যুগ না; বরং সব যুগের জন্যই স্বীকৃত। একমাত্র নবি-রাসূলগণই নিষ্পাপ এবং সকল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, কিন্তু আমরা নই। আমাদের দ্বারা যেসব ভুল হয়; নেককার বান্দা-সহ সম্মানিত আলিম-উলামাদের থেকেও সেসব ভুল হতে পারে।
আমাদের সমস্যা হলো, নিজে নামাজ না পড়লে কোনো কিছু মনে করি না। কিন্তু ইমাম সাহেব যদি নামাজে একটু হেলা করে, তবে সেটা নিয়ে পেরেশান হয়ে যাই। ওই ইমাম সাহেবের চাকরিই থাকে না। অথচ, ইমাম সাহেবের ওপর নামাজ যেমন ফরজ, আমাদের জন্যও তেমনই ফরজ। ইমাম সাহেব সর্বোচ্চ শুদ্ধ করে কিরাআত পড়লেও যেন আমাদের হয় না। ইমাম সাহেব হাফিয কি না-সেটার খবর নিই। তিলাওয়াতের সুর সুন্দর কি না, যাচাই করি। কিন্তু এইদিকে আমি যে পবিত্র কুরআনের দুইটা অক্ষরও শুদ্ধ করে উচ্চারণ করতে পারি না, সেই ব্যাপারটাকে কোনো গুরুত্বই দিই না। অথচ, নামাজে শুদ্ধ কিরাআত পড়া ইমাম সাহেবের জন্য যেমন ফরজ, মুসল্লির জন্যও ফরজ। পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানা যেমন ইমাম সাহেবের জন্য ফরজ, তেমনই আমাদের জন্যও ফরজ।
যা-ই হোক, নবি-রাসূল ছাড়া সবারই বড় বড় গলদ হতে পারে এবং গুনাহ করতে পারে। এটা মানা জরুরি। না মানলে তার পরিণতি হিসেবে শয়তান আমাদের দোষগুলো আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে, আর অন্যের দোষ খোঁজার ভেতরে আমাদেরকে ব্যস্ত করে দেবে। আল্লাহ মাফ করুন!
গুনাহ কিংবা ভুলের ক্ষেত্রে কেউ অনুসরণযোগ্য না। কিন্তু তাই বলে উক্ত গুনাহকারী ব্যক্তির জীবনের সহিহ সব বিষয়গুলো, সঠিক বক্তব্যগুলো একেবারে বরবাদ হয়ে যাবে-এমন ভাবাটাও ভালো না। ধরুন, কোনো ইমাম সাহেবের সাথে আপনার ভালো সম্পর্ক। আপনি খেয়াল করে দেখলেন যে, ইমাম সাহেব টিভি দেখে বা খেলা দেখে বা স্মার্টফোনে নাটক-সিনেমা দেখে। এখন আপনি যদি সারা এলাকা সরগরম করে প্রচার করে বলেন যে, 'আরে! ওই ইমাম সাহেব তো বয়ানে সেদিন একটা কথা বলে দিলেন যে, টিভি দেখা নাজায়েজ; অথচ উনি তো দেখি নিজেই টিভি দেখেন।' এখন পরবর্তীকালে আপনি আপনার সাথি-সহ অন্যদেরকে টিভি দেখার বৈধতার দলিল দিচ্ছেন-সেই ইমাম সাহেবের টিভি দেখার ওপর ভিত্তি করে। ইমাম সাহেব খেলা দেখে; এখন আপনিও খেলা দেখছেন আর ভাবছেন যে, 'আরে! হুজুরই তো খেলা দেখে; সুতরাং আমার জন্য খেলা দেখাটা কোনো অন্যায় নয় এবং আমার সাথে সাথে অন্যদের খেলা দেখাটাও কোনো অন্যায় না।'
এখানে সমস্যাটা কোন জায়গায় হয়েছে? আমরা মূলত সেই ব্যাপারটি ভুলে গিয়েছি যে, হুজুররাও ভুল করতে পারে। এও ভুলে গিয়েছি যে, 'ভুলের ক্ষেত্রে হুজুরকে মানা যায় না'। কিন্তু হুজুরের ওই বক্তব্য সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী যে, টিভি দেখা নাজায়েজ। কারণ, টিভিতে বেপর্দা নারীরা আসে; সুন্দরী নারী-সহ অসুন্দর নারীরাও সুন্দরীর বেশ ধরে টিভিতে আসে মানুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার জন্য। এজন্য টিভি দেখা নিষেধ। কুরআন-হাদীসের দলিল দিয়ে হুজুর সে কথাই প্রমাণ করেছেন। এখন হুজুর যদি সেটা না মানেন, ভুল করেন-তার অর্থ কি এই যে, কুরআন-হাদীসও ভুল হয়ে যাবে? শয়তান আমাদেরকে কুরআন-হাদীসের দলিলগুলো ভুলিয়ে দিয়ে, আমাদের সামনে 'হুজুর'কে মানদণ্ড হিসেবে স্থাপন করে দিয়েছে। যার কারণে হুজুরের বউ বেপর্দা চললে আমরাও মনে করি যে, 'আমাদের বউ পর্দা না করলে সমস্যা কোথায়!' আমরা এইসব সমস্যায় জড়িয়ে যাওয়ার ওই একটাই কারণ-আমরা ভুলে গিয়েছি যে, হুজুররাও ভুল করতে পারেন; যেভাবে আমরা ভুল করতে পারি।
এখানে মনে রাখতে হবে, ভুলের ক্ষেত্রে আমরা কাউকে মানব না। কারও ভুল কাজকে আমরা দলিল বানাতে পারি না। যদিও শয়তান এগুলোকে আমাদের সামনে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে। যেমন, একজন ডাক্তার আর রোগীর মধ্যে ব্যবধান হলো, ডাক্তার চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে দীর্ঘ একটা সময় পড়াশোনা করেছে। আর এজন্যই যখন আমাদের কারও কোনো রোগ হয়, তখন আমরা ডাক্তারের কাছে যাই-যাতে সমাধান পাওয়া যায়। হঠাৎ ওই ডাক্তার কোনো ভুল করল, তার মানে কি এই যে, ওই ডাক্তারের পুরো জীবনের অর্জিত চিকিৎসাবিদ্যা সব বাতিল? কোনো ডাক্তার ভুল করে না? যত বড় ডাক্তারই হোক না কেন, ভুল করে না এমন ডাক্তার কি আছে? জীবনের অনেকটা সময় নিয়ে কোনো ডাক্তার শরীরের সামান্য একটা অংশ (ধরুন, চোখ) নিয়ে পড়ালেখা করেছে; কিন্তু অপারেশন করতে গিয়ে এমন ডাক্তারের ভুল হয় না? এখন কি ওই ডাক্তার তার ভুলের কারণে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে? নাকি ডাক্তার তার পদেই বহাল আছে? শুধুমাত্র ভুল যেটা হয়েছে-সেটাকে ভুল হিসেবে ডাক্তারও মানে এবং অন্যরাও মানে। আর সেই জায়গায় একজন আলিমের বিষয়টা তো এমনই। একজন আলিম তাঁর জীবনের দীর্ঘ একটা সময় ইলম অর্জনের পেছনে ব্যয় করেছে এবং সে অনুযায়ী তাঁর জীবনটা সাজাতে গিয়ে কোনো একটা ভুল করে ফেলেছে, তখন আমাদের ভেতর কেন এমন বিস্ময় আসে যে, 'এই আলিম এমন ভুল করতে পারল!' অবশ্যই ভুল করতে পারে। একজন ডাক্তারের যেমন ভুল হয়, সেখানে সমগ্র দ্বীন তো ডাক্তারি পড়াশোনার অনেক বড় ও বিস্তৃত বিষয়-যা হলো সম্পূর্ণ জীবনের সমাধান, কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত কিছুর সমাধান। তো আলিমের ভুল হওয়াটা কি সেখানে অবাস্তব কিংবা অসম্ভব কোনো বিষয় হতে পারে? কিন্তু, শয়তান আমাদের অন্তরে প্রোথিত করে দিয়েছে যে, আলিমরা ভুল করতে পারেনই না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
সুতরাং, মূল কথা এই যে, নবি-রাসূলগণ নিষ্পাপ। তাঁরা ভুল করতে পারেন না, তাঁরা গুনাহ করেন না। নবি-রাসূল ছাড়া আর বাকি সবাই অন্যায় করতে পারে। তবে ভুলের ক্ষেত্রে কেউ অনুসরণযোগ্য নয়-এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। তাদের অন্যায় করার কারণে আমরা সেগুলোকে কখনো দলিল হিসেবে পেশ করব না। একইসাথে তাদের কোনো ভুল বা গুনাহের দরুন তাদের পুরো জিন্দেগিকে একদম বরবাদ বলে মনে করব না, প্রশ্নবিদ্ধ করব না।

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 আমাদের প্রান্তিকতা

📄 আমাদের প্রান্তিকতা


এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। আমাদের মাঝে দুই ধরনের প্রান্তিকতা রয়েছে।
. এক. আলিমদেরকে নবিদের মতো নিষ্পাপ মনে করা।
• দুই. সামান্য ভুল দেখলেই তাঁদের পুরো জীবনের কীর্তিকে অবমূল্যায়ন করা।
আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, 'এতে সমস্যা কোথায়?' আমরা এর উত্তরে বলব, একজন ঈমানদারের মূল সমস্যা এখানেই। এ ধারণাকে পুঁজি করে শয়তান সাধারণ মানুষকে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেয়। প্রথমে আলিম-উলামাদের থেকে সরায়, এরপরে ধীরে ধীরে দ্বীন থেকেই সরিয়ে ফেলে।
এবার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
কোনো মানুষ একাকী বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ, পরিবার-সমাজ ইত্যাদি সবকিছু ছেড়ে সম্পূর্ণ একক অবস্থান গ্রহণ করা একজন মানুষের জন্য খুব কঠিন। এজন্য শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, মুসলিমরা কোনো নেতৃত্বের অধীনে চলবে; অর্থাৎ জামাআতবদ্ধভাবে মুসলিমরা চলবে। কারণ, জামাআতবদ্ধভাবে চললেই মুসলিমদের জন্য দ্বীন-ঈমান নিয়ে বাঁচা সহজ; অন্যথায় দ্বীন-ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকা কষ্টকর। দ্বীন-ঈমানের সাথে জুড়ে থাকার জন্যই মুসলিমদেরকে কোনো নেতৃত্বের অধীনে থাকা অনেক জরুরি। আর, মুসলিমরা মূলত দুই নেতৃত্বের অধীনে ইসলামের সাথে লেগে থাকে।
• এক. মুসলিমদেরকে পরিচালনার জন্য যদি আল্লাহর প্রতিনিধি তথা খলিফাতুল মুসলিমীন থাকে—যাদের অধীনে মুসলিমদের সমস্ত শাসনভার ন্যস্ত থাকে, তখন এই সকল আয়িম্মা বা নেতৃস্থানীয় লোকের মাধ্যমেই মুসলিমরা ইসলাম, ঈমান, জান-মাল-সহ সবকিছুর নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি মজবুতির সাথে টিকে থাকে।
• দুই. যদি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং নেতৃত্ব না থাকে বা নেতৃস্থানীয় লোকেরা ইসলামের নেতৃত্ব না দেয় বা ইসলাম ও মুসলিমদের হালত তাদের সামনে না থাকে, তখন মুসলিমদের দ্বীন-ঈমান সাধারণত টিকে থাকে আলিম-উলামাদের সাথে জুড়ে থাকার মাধ্যমে।
আর যদি এই দুই নেতৃত্ব একসাথে মিলে ইসলামকে এগিয়ে নেয় অর্থাৎ যদি উলামায়ে কেরাম থাকে এবং খলিফাতুল মুসলিমীনও থাকে—যারা দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবে, ইসলামি রাজত্ব কায়েম করবে, তখন ইসলাম ও মুসলিমদের গায়ে আঘাত দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। ইসলাম ও মুসলিমরা তখন সবার ওপরে থাকে। ইসলামের ওপরে তখন আর কোনো কিছু থাকে না। এটি হলো ইসলামের বিজয়ী অবস্থান। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন দ্বীনকে এই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য, যেখানে যাদের হাতে ক্ষমতা থাকবে, তাঁরা দ্বীন-ইসলাম ও মুসলিমদেরকে নিয়ে একসাথে চলবে; এবং উলামায়ে কেরাম যারা, তাঁরাও দ্বীন-ইসলাম নিয়ে চলবে। এই দুই অবস্থান যদি সমাজ আর রাষ্ট্রের ভেতরে থাকে, তখন এটা হলো ইসলামের প্রকৃত অবস্থা এবং ইসলামের সর্বোচ্চ দাবি।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা সাজদায় গুরুত্বপূর্ণ এক আয়াতে 'মানুষ দ্বীন-ঈমান নিয়ে কিভাবে চলবে'—সেটার অবস্থান উদাহরণ দিয়ে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। মূসা আলাইহিস সালাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পরে সাধারণ মানুষজন দ্বীন-ঈমান নিয়ে কিভাবে চলেছিল, আল্লাহ তাআলা সেটা বর্ণনা করেছেন।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ ؟
'আর আমি [মুসার পরে] তাদের (বনী-ইসরাঈলিদের) মধ্যে কিছু লোককে ইমাম হিসেবে নির্ধারণ করে দিই [এটা আল্লাহ তাআলার রীতি, আল্লাহই ইমাম নির্ধারণ করে দেন]-যারা আমার নির্দেশ অনুসারে দ্বীন-ঈমান নিয়ে চলবে এবং মানুষকে পথ প্রদর্শন করবে [অর্থাৎ মানুষ যাদের কথা মোতাবেক দ্বীন ঈমান নিয়ে চলবে] এবং তারা আমার আয়াতসমূহে গভীর বিশ্বাস রাখবে।[১২]
এখন, দ্বীন-ঈমানের পথে মানুষকে চালাতে দুটি যোগ্যতা বা শর্ত লাগবে।
• ১) সবর করতে হবে অর্থাৎ আয়িম্মাদেরকে দ্বীন-ইসলামের ব্যাপারে মজবুত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে এবং তার ওপর দৃঢ় থাকতে হবে। মানুষ ফিতরাতগতভাবেই আল্লাহর প্রতি অনুরাগী, দ্বীনের প্রতি অনুরাগী। অর্থাৎ দ্বীনকে মানুষ ভালোবাসে এবং আল্লাহকে সর্বাবস্থায় পেতে চায়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কথা বলে, তার পক্ষে মানুষের সমর্থন থাকবে-যার ফলে বিপরীত পক্ষ বা ক্ষমতার মালিক ওইসব লোকদের দ্বারা নিজেদের অস্তিত্বের আশঙ্কাবোধ করবে। অর্থাৎ, সমাজে যেসব আলিমদের জনপ্রিয়তা বেশি এবং মানুষের অন্তরে যাদের জন্য মহব্বত-ভালোবাসা প্রকট, সেসব আলিমরা যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর শ্রেণীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তখন রাষ্ট্র ওইসব আলিমদেরকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। তাই তাঁদেরকে সব বিপদ-বাধা উপেক্ষা করে, ধৈর্য বা সবর অবলম্বনের মাধ্যমে দ্বীনের ওপর অটল থাকতে হয়।
• ২) দুনিয়ার কোনো চাওয়া-পাওয়া আয়িম্মাদের মাঝে একদমই থাকতে পারবে না এবং তাঁদের সমস্ত আস্থা-বিশ্বাস আল্লাহর সকল নিদর্শন ও আল্লাহর পবিত্র বাণীর ওপরে থাকবে।
অতএব উল্লিখিত আয়াত থেকে বোঝা যায়, যাদের মাঝে এ দুই যোগ্যতা আছে, সাধারণ মুসলিম তাঁদেরকে মেনে চলবে; যদিও ক্ষমতা তাঁদের হাতে না থাকে বা মুসলিমরা ইসলামি নেতৃত্বশূন্য হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকে বিষয়টি মিলিয়ে নিই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দুটো অংশ-মাক্কি ও মাদানি। মাক্কি জীবনে ক্ষমতা ছিল মুশরিকদের হাতে; কিন্তু মুসলিমরা যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা জুড়ে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে।

টিকাঃ
[১২] সূরা সাজদাহ, ৩২: ২৪

📘 জান্নাতি জীবন > 📄 জুড়ে থাকার অর্থ

📄 জুড়ে থাকার অর্থ


দ্বীনের সাথে জুড়ে থাকার মানে হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী হওয়া। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপস্থিতিতে দ্বীনি রাহবারদের সাথে জুড়ে থাকা। মক্কাতে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের ডাকে, ঈমানের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবত প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে দারুল আরকামে মিলিত হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুঁজলে ওখানে পাওয়া যেত। এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। সাহাবাগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছায়ার মতো থাকতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রঙে নিজেকে সাজাতেন। সেজন্যই তো একবার এক আরব লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক মজমায় উপস্থিত হয়ে সবাইকে একই বেশভূষায় দেখে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন-'আইয়্যুকুম মুহাম্মাদ' (আপনাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে?)। [১৩] এটাকেই বলে জুড়ে থাকা। বছরে একদিন কোনো আলিমের বয়ান শুনলাম কিংবা মাসে একবার কোনো আলিমের মজলিসে গেলাম-এর মানে জুড়ে থাকা নয়, ওয়াল্লাহি! ইসলামের সাথে যেভাবে জুড়ে থাকতে হয়, তা শুধু ওয়াজ- বয়ান শুনে হয় না, দুয়েকটা মজলিসে গেলেই হয় না; বরং সবকিছু দিয়ে, প্রয়োজনে সবকিছু ত্যাগ করে বাস্তবে আমলের ময়দানে থাকতে হয়।
একটি উদাহরণ। মাঠ পর্যায়ের নেতা যারা থাকে, তাদের ডাকে যেসব কর্মীরা তেমন একটা সাড়া দেয় না, নেতাদের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকে না, তাদেরকে সেই নেতা কি কখনো কর্মী হিসেবে মেনে নেয়? মানে না। এই বিষয়টি দুনিয়ার ক্ষেত্রে ঠিকই বুঝি, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে একদমই বুঝি না। বাৎসরিক একটা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করার পর এমন কাউকে ডাকলাম-যার কণ্ঠ সুন্দর; কিন্তু ইলম আছে কি নেই, তা দেখলাম না। আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বললাম, 'আমি দ্বীনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী।' ইমাম সাহেবের পেছনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম আর মাঝেমধ্যে সালাম-মুসাফাহা করলাম- এগুলোর মানে জুড়ে থাকা নয়।
আলিমদের সাথে জুড়ে থাকার অর্থ হলো: নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কাজ, কথা, মুআমালাত, মুআশারাত, নিজের প্রত্যেকটি সকাল-সন্ধ্যা, উঠাবসা- সহ সকল মুহূর্ত শরীয়ত অনুযায়ী হচ্ছে কি না-তা বোঝার জন্য একজন আলিমের সাথে সম্পর্ক করা এবং তাঁর পরামর্শে চলা। কারণ যেখানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা নেই, সেখানে দ্বীন নিয়ে অন্ততপক্ষে টিকে থাকার মাধ্যম হলো উলামায়ে কেরাম। আর টিকে থাকার রূপ কী, তাও পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত, কোনো জীবনাদর্শ অন্তরের ভেতর পুরোপুরি প্রবেশ করানোর জন্য, ওই জীবনাদর্শ লালনকারী কারও সঙ্গে জুড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসায়ী কারও সাথে থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসার প্রতি এক ধরনের অনুরাগ আসে। খেলাধুলা বা গেইমসে আসক্ত কোনো ব্যক্তির সাথে থাকলে ধীরে ধীরে অন্তরে খেলার প্রতি আসক্তি পয়দা হয়। যার নারীর প্রতি আসক্তি বেশি-এমন ব্যক্তির সাথে কেউ থাকলে তারও নারীর প্রতি আসক্তি অবশ্যই তৈরি হবে। তেমনই কোনো হক্কানী-রব্বানী আলিমের সঙ্গ অবলম্বন করলে দ্বীনিয়াত, ঈমানিয়াত অন্তরে প্রবেশ করবে, দ্বীনের ওপর চলার জন্য ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হবে। এবং আলিম-উলামা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনকে যতটুকু সাজায়, কমপক্ষে ততটুকু সেও সাজাবে; আলিম-উলামাদের মতো কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন চালানোর চেষ্টা অন্তরে জাগবে।
যা-ই হোক, মাক্কি যুগে মুসলিমদের হাতে ক্ষমতা ছিল না। মুসলিমরা সেসময় সর্বাবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জুড়ে থাকত। আর মাদানি যুগে ইসলামি খিলাফতও ছিল এবং তার সাথে মুসলিমদের দ্বীন-ঈমানের জিম্মাদারির দায়িত্ব ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর; এই দুটো একত্রে মিলে ইসলামের পূর্ণতা এসেছে। আর ইসলাম যখন পরিপূর্ণ হলো, তখন অবস্থা এমন যে, নেতৃত্ব ইসলামের হাতে; জ্ঞান-বিজ্ঞানের নামে যত শিক্ষা আছে-সবকিছু তখন ওহীর শিক্ষার অনুগামী। এটাই ইসলামের বিজয়ী অবস্থা। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দুটি পাঠ। কিন্তু তিনি নিষ্পাপ; আর ইসলামের এই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তথা আলিমদেরকে নিষ্পাপ মনে করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ তাঁরা নবি-রাসূল নন। তাঁরা ভুল করতে পারেন, গুনাহ করতে পারেন। নিশ্চয়ই ভুলের ক্ষেত্রে কেউ অনুসরণীয় নয়; তবে তাই বলে কিছু ভুলের জন্য তাঁদের জীবনের সঠিক সব বিষয়গুলো একদম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করাটাও সমীচীন নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন, আমিন।
এতক্ষণ আলোচনার ফলাফল হলো, বর্তমানে আমরা দ্বীন নিয়ে টিকে থাকতে হলে আলিমদের সঙ্গ ছাড়া সম্ভব না। তবে আলিমগণ ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন; তাই তাঁদেরকে নবিদের মতো নিষ্পাপ মনে করার সুযোগ নেই। ভুল তাঁরা করতেই পারেন। আমরা ভুলের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করব না।
খবরদার, এমন যেন না হয় যে, দুয়েকটি ভুল পেলেই তাঁদের সঙ্গ ত্যাগ করে ফেলি। তাহলে কিন্তু আমরা শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হব। তাই সামনে আলোচনা করা হবে, শয়তান কোন কৌশলে আমাদেরকে আলিমদের থেকে দূরে সরিয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বীন থেকেই সরিয়ে ফেলে।

টিকাঃ
[১৩] বুখারি, ৬৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00