📘 জান্নাতি জীবন > 📄 কী পরিমাণ গুনাহ ছাড়তে হবে

📄 কী পরিমাণ গুনাহ ছাড়তে হবে


এখন প্রশ্ন হলো, কী পরিমাণ গুনাহ থেকে মুক্ত জীবন গড়লে আমি মোটামুটি জান্নাতে যেতে পারব?
আমরা তো অনেকে অনেক গুনাহ থেকে মুক্ত। কেউ যিনা করেনি, কেউ মদ খায়নি, কেউ গালি দেয়নি, কেউ গাঁজা খায়নি, কেউ চাঁদাবাজি করেনি, অনেকে আবার টিভিও দেখেনি। অনেকে অনেক গুনাহ থেকেই মুক্ত আছে। তাহলে কয়টা গুনাহ থেকে মুক্ত হলে আমি আল্লাহর কাছে জান্নাতের আশা করতে পারি? আর কয়টা গুনাহ যুক্ত হলে কোনো সমস্যা নেই? এটা জানার বিষয়। প্রথম আমি বুঝেছি যে, আমার জীবন গুনাহমুক্ত হওয়া দরকার। এখন বুঝতে হবে, আমায় কয়টি গুনাহ ছাড়তে হবে?
কুরআন-হাদীস আমাদেরকে এই কথা বলে যে, একটা কবীরা গুনাহ করার পর কেউ যদি তাওবা ছাড়া দুনিয়া থেকে চলে যায়, বা তার তাওবা যদি কবুল না হয়, তবে তাকে জাহান্নামে যাওয়া লাগতে পারে। কয়টা কবীরা গুনাহ? একটা। একটা কবীরা গুনাহও যদি করে আর সেটা থেকে সে যদি তাওবা না করে মারা যায়, তবে সে জান্নাত পাবে না। গুনাহ আর জান্নাত একসাথে জমা হতে পারে না।
আমরা যখনই রাস্তায় বেড়িয়েছি, তখনই যত নাজায়েজ জায়গা আছে, তাকাচ্ছি। ঘরে গিয়ে টিভি দেখছি, স্মার্টফোন দেখছি, এভাবে কানকে গান শুনে নাপাক করছি, দিল নাপাক করছি, সব নাপাক করে দিচ্ছি। তাহলে এখন কয়টা গুনাহ থেকে মুক্ত হতে হবে আমাদেরকে?
বোঝার জন্য একটা ঘটনা বলি। ইবলিস কত হাজার বছর ইবাদত করেছে? এক-দুই বছর? নাকি হাজার হাজার বছর? হাজার হাজার বছর ইবাদত করেছে। ইবলিস আল্লাহর কয়টা হুকুম মানেনি? মাত্র একটা হুকুম মানেনি। আল্লাহ বলেছেন, 'আদমকে সিজদা করো।' সব ফেরেশতারা সিজদা করেছেন। কিন্তু ইবলিস করেনি। ইবলিসকে যদি বলা হতো—'আল্লাহকে সিজদা করো', তাহলে সে করত না? অবশ্যই করত। সে আদমকে সিজদা করেনি। কারণ, তার কাছ এটা পছন্দ হয়নি। সে ভাবছিল—আমি তো হাজার হাজার বছর আল্লাহর ইবাদত করেছি, এত এত বছর জান্নাতে থেকেছি, আল্লাহ আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে, আর এই আদমকে মাটি থেকে বানিয়েছেন। আগুনের স্বভাব ওপরের দিকে ওঠা। মাটির স্বভাব নিচের দিকে যাওয়া। আমি তাকে সিজদা করব কেন?
তখন আল্লাহ বললেন—তুই জান্নাত থেকে বের হয়ে যা।
এখন বলুন তো, কয়টা গুনাহ করেছিল ইবলিস? মাত্র একটা। সে হাজার হাজার বছর পর্যন্ত ইবাদত করেছে। অথচ একটা গুনাহের কারণে আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন, অভিশপ্ত করেছেন। এখন হিসাব মিলিয়ে দেখুন। জিন্দেগিতে একটাও গুনাহ নেই—এমন কতজন আছেন? আজকে বনী আদম হাজারও গুনাহ করছে, যেমন মন চায় জীবন গড়ছে, যেমনভাবে মন চায় তার জীবনকে সাজাচ্ছে, যেখান থেকে মন চায় খাচ্ছে, যেখানে মন চায় ব্যয় করছে। হাজার হাজার দিন ধরে গান নিয়ে ব্যস্ত, টিভি নিয়ে ব্যস্ত, সব ধরনের অবৈধ কাজ নিয়ে ব্যস্ত, নেশা নিয়ে ব্যস্ত, চাঁদা নিতে ব্যস্ত। আল্লাহর কোনো খবর তার নেই, আল্লাহর কথা সে মনে রাখে না। একটা গুনাহের অপরাধে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বের করে দিয়েছেন। সে বনী আদমকে সিজদা করেনি। আর এই বনী আদম হাজার হাজার বার গুনাহ করছে। বনী আদমের জিন্দেগি শয়তানের চাইতেও বড় বড় গুনাহে ভরে যাচ্ছে। তাহলে গুনাহমুক্ত যে জীবন গড়তে হবে, সেখানে কি দুয়েকটা গুনাহ বাদ দিলেই যথেষ্ট হয়ে যাবে? নাকি সব গুনাহ বাদ দিতে হবে?
সব গুনাহ।
দুই-একটা গুনাহ করার অনুমতি আছে নাকি?
না, একটা গুনাহ করারও অনুমতি নেই।
এবার অন্য আরেকটি বিষয় ভাবুন। আল্লাহ তাআলা প্রথমে আদম আলাইহিস সালাম আর হাওয়া আলাইহিস সালামকে জান্নাতে রেখেছিলেন। ইবলিস তাঁদেরকে প্ররোচনা দিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাইয়েছে। কারণ, ওর ইচ্ছা ছিল যে, আদম-হাওয়াকে জান্নাত থেকে বের করবে। সে তাঁদেরকে গিয়ে বলল— অবশ্যই আমি সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী। আমার কথা না মানলে পস্তাতে হবে। কিন্তু যদি আমার কথা মানো, তবে আজীবন জান্নাতে থাকতে পারবে, আল্লাহর কাছে থাকতে পারবে। বিশ্বাস করো, আমি তোমাদের ভালো চাই।
অমনি আদম ও হাওয়া দিলে দিলে ভেবেছেন—যাক, একটু খেয়ে দেখি। এতে যদি সারাজীবন আল্লাহর কাছাকাছি থাকা যায়, তবে তো বেশ ভালোই হবে।
আদমের নিয়ত খুবই ভালো ছিল। আল্লাহর কাছে জান্নাতে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। নিয়ত ভালো ছিল; কিন্তু যার ওয়াজ দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, সেই ওয়ায়েজ ভালো লোক ছিল না। এজন্যই ঝামেলা হয়ে গেছে।
আদম আলাইহিস সালাম একটা ভুল করেছেন, ভুল বুঝেছেন। তিনি আল্লাহর কাছাকাছি থাকার জন্যে অল্প একটু ফল খেয়েছেন। এইক্ষেত্রে তিনি কয়টা হুকুম মানেননি? মাত্র একটা। এক ভুলেই জান্নাত থেকে দুনিয়ায় আসতে হয়েছে। আদম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে এসেছেন, দুনিয়ায় এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলেছেন,
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি, যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন আর দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।[১০]
আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে, কাঁদতে কাঁদতে দুনিয়ার জমিন ভিজিয়ে ফেলেছেন আদম আলাইহিস সালাম। তিনি শুধু বলছিলেন—হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি। আমি বুঝিনি যে, আমাকে এইভাবে জান্নাত ছাড়তে হবে। আমি নিজের অপরাধকে স্বীকার করছি। যদি আপনি মাফ না করেন, তাহলে আমার জীবনও ইবলিসের মতো বরবাদ হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন, আমাকে আবার জান্নাত দিন। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَتَلَقَّى آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'অতঃপর আদম তার রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, অতি দয়ালু।[১১]
অর্থাৎ, আল্লাহ বলছেন—ও আমার বান্দারা, আদমের মতো অনিচ্ছাকৃত ভুল করার পরে, আমার কাছে আদমের মতো তাওবা করো। তাহলে আদমকে আমি যেভাবে জান্নাতের ওয়াদা করেছি, তোমাদেরকেও জান্নাতের ওয়াদা করব। কিন্তু গুনাহ নিয়ে তুমি আমার কাছে আসতে পারবে না। গুনাহমুক্ত জীবন নিয়ে যদি তুমি আমার কাছে আসতে চাও, তাহলে আদম যেভাবে দুআ করেছিল, সেভাবে আমাকে ডাকো। আমি আদমকে কাছে ডেকে নিয়েছি, অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছি। তোমাকেও দেবো। তবে গুনাহ বাকি রাখতে পারবে না। কারণ, জান্নাত আর গুনাহ কোনোদিন একসাথে জমা হতে পারে না। তাই আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে তাঁর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য জান্নাত থেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
পূতপবিত্র জীবন যারা গড়ছে, যাদের জীবনে একটাও কবীরা গুনাহ নেই, তারাই শুধু জান্নাতে আসতে পারবে; এ ছাড়া আর কেউ পারবে না। ও যুবক, তুমি কি এই ধোঁকায় বসে আছো যে, তুমি প্রেম করবে, টিভি-সিনেমা দেখবে, স্মার্টফোনে অশ্লীল কাজ করবে, হোলির অনুষ্ঠানে যোগ দেবে, বিবাহে গান-বাজনা চালাবে, আবার নিজেকে জান্নাতিও দাবি করবে? রবের কসম! এই দাবি অবাস্তব। শয়তান একটি মাত্র গুনাহের কারণে জান্নাত ছেড়েছে। আর তুমি হাজারও গুনাহ নিয়ে জান্নাতের স্বপ্ন দেখছো? এটা তো অনেক বড় ধোঁকা। এর চেয়ে বড় ধোঁকা আছে আর?
জান্নাতে যাবে কারা?
যারা কবীরা গুনাহকে ছেড়েছে। হ্যাঁ, সগীরা গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন, কিন্তু কবীরা গুনাহ না ছাড়লে, দুনিয়া থেকে মাফ করিয়ে না-নিলে, জান্নাত দেবেন না। আগে জাহান্নame জ্বলেপুড়ে গুনাহ মাফ হবে, এরপর জান্নাত।
ওয়াজ আমরা অনেক শুনি। কিন্তু ওয়াজ শোনার পরে গুনাহ তো ছাড়ি না। ঘরে বিবি পর্দা করে না, সন্তান দ্বীনি শিক্ষা জানে না, নামাজ জানে না, রোজা জানে না; আর আমি নিজেকে জান্নাতি দাবি করছি! আমার জানাযা এই অবস্থায় হচ্ছে যে, আমার বিবি পর্দা জানে না, আমার মেয়ে পর্দা জানে না। আজীবন আমি টিভি দেখেছি, আমাকে কবর দেওয়ার পরে আমার পরিবার এখন টিভি দেখবে! আর আমি জান্নাতের আশা নিয়ে বসে আছি! আর হুজুর ডেকে দুআ করাচ্ছি, 'অমুক ভাইকে জান্নাতে পাঠিয়ে দাও।' অথচ এই হুজুরেরও জান্নাত নিশ্চিত কি না, জানা নেই। সে আবার কিভাবে আপনাকে জান্নাত দেবে, বলুন?
তাই কোনো গুনাহ বাকি থাকুক—এটা মুমিন কল্পনা করতে পারে না। একটা কবীরা গুনাহও যদি হয়ে থাকে, তবে তাওবা করতে হবে। এই মজলিস থেকেই তাওবা করতে হবে। সে তার মায়ের হক নষ্ট করেছে, বোনের হক নষ্ট করছে, স্বামীর হক নষ্ট করছে, স্ত্রীর হক নষ্ট করছে—সবাইকে তাওবা করতে হবে। যে ব্যক্তি সন্তানকে দ্বীন শেখায়নি, ঘরে টিভির ব্যবস্থা করেছে, সন্তানের হাতে টাচস্ক্রীন মোবাইল তুলে দিয়েছে, সন্তান মোবাইলে আজেবাজে জিনিস দেখছে, সন্তানের জীবন পুরো বরবাদ হয়ে গেছে, তার ছেলে অন্য মেয়ের সাথে ফ্রি মিক্সিং করে, তার মেয়ে অন্য ছেলের সাথে ফ্রি মিক্সিং করে, অথচ বাবা হয়ে সে কোনো আপত্তি করে না; আবার সে আশা করছে জান্নাতে ঢুকে যাবে!
ইবলিসকে মাত্র একটা গুনাহের কারণে জান্নাত ছাড়তে হয়েছে, আর আমি প্রত্যেক দিন হাজার হাজার গুনাহ করে কিভাবে জান্নাতের আশা করি? আল্লাহ আপনি আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন।
তাহলে, আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার, নবিওয়ালা জিন্দেগি পাওয়ার সবচেয়ে বড় আমল কী?
গুনাহমুক্ত জীবন। শুধু নামাজ না। নামাজের সাথে গুনাহমুক্ত জীবন। শুধু রোজা না, রোজার সাথে গুনাহমুক্ত জীবন। নামাজের আসল উদ্দেশ্য গুনাহ থেকে বাঁচা, রোজার আসল উদ্দেশ্য গুনাহ থেকে বাঁচা, যাকাতের আসল উদ্দেশ্য গুনাহ থেকে বাঁচা, হজের আসল উদ্দেশ্য গুনাহ থেকে বাঁচা। আর আজকাল লোকেরা নামাজও পড়ে, আবার গুনাহও করে। নামাজ পড়ে, আবার পূজায়ও অংশগ্রহণ করে। নামাজ পড়ে, আবার সিনেমাও দেখে। নামাজও পড়ে, আবার গান-বাজনাও শুনে। নামাজও পড়ে, আবার বেপর্দায়ও চলে। বলেন তো, আমার এই নামাজ আল্লাহর কাছে কবুলযোগ্য নামাজ? আমার এই রোজা আল্লাহর কাছে কবুলযোগ্য রোজা? আমার এই যাকাত আল্লাহর কাছে মাকবুল? আমার এই হজ আল্লাহর কাছে মাকবুল?
সুতরাং, ওয়াদা করুন: 'হে আল্লাহ, আমরা একটা গুনাহ নিয়েও কবরে যেতে চাই না। আজ থেকে আমরা গুনাহমুক্ত জীবন গড়ব। ও আল্লাহ, আপনি আমাদেরকে গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন। আমাদেরকে বেপর্দা থেকে বাঁচান। আমাদের চোখ ও কানকে হেফাজত করুন। আমাদের দিলকে হেফাজত করুন। আমাদের হারাম খাবার থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সন্তানদেরকে দ্বীনের ফরজ পরিমাণ জ্ঞান শেখার তাওফীক দান করুন। ও আল্লাহ, আমাদের বিবিদেরকে যেন পর্দায় রাখতে পারি, সেই তাওফীক দান করুন। আমাদের মেয়েদেরকে যেন সাচ্চা নামাজি হিসেবে গড়তে পারি, সেই তাওফীক দান করুন। আমাদের জীবনকে নবিদের সাথে মিলিয়ে দিন। ইবলিসের সাথে মেলাবেন না। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।' আমিন।

টিকাঃ
[১০] সূরা আল-আরাফ, ৭: ২৩।
[১১] সূরা আল-বাকারা, ২: ৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00