📄 সবচেয়ে প্রিয় আমল
এবার মূল আলোচনায় ফিরে যাই। আল্লাহর কাছে দামি সময় শুধু যৌবনকাল। আগেই বলেছি, আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার সবচেয়ে বড় আমল নিয়ে কথা বলব, ইনশাআল্লাহ। এরপর আমরা আমাদের জীবনকে এই অনুযায়ী সাজাব।
মানুষ সাধারণত ধারণা করে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো নামাজ। কারও ধারণা হলো রোজা। কারও ধারণা হজ। আবার, কারও ধারণা যাকাত। এমন অনেক ধারণা আছে। কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো 'গুনাহমুক্ত জীবন গড়া'। সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো গুনাহমুক্ত জীবন। এই কথাটা আমরা আলোচনা থেকে বোঝার চেষ্টা করব এবং সিদ্ধান্ত নেব যে, আমি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হব কি হব না! তো, আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য প্রথমে আমার জীবনকে গুনাহমুক্ত করতে হবে।
আমি যে দাবি করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার আমল হলো 'গুনাহমুক্ত জীবন গড়া', এই দাবিটার বাস্তবতা প্রথমে আমাদেরকে বুঝতে হবে। বর্তমান সমাজের ভেতরে অনেক বড় বড় নামাজি পাওয়া যায়। রোজাদার লোকের অভাব নেই। যাকাত দেয়-এমন লোকও কম নেই। কিন্তু গুনাহমুক্ত জীবন কার আছে-এমন দুই-একজন লোক দাঁড় করিয়ে দিতে বললে যে ফলাফল দেখা যাবে, তা বড় পেরেশানির বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
বলুন তো, আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের মধ্যে সবচাইতে বেশি প্রিয় কে? নবি-রাসূলগণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তো, আল্লাহর কাছে নবি-রাসূলগণ কীসের মাধ্যমে প্রিয় হলেন-সেটা বোঝা দরকার। আচ্ছা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাইতে প্রিয় কোনো ব্যক্তি আছে আল্লাহর কাছে?
না।
তিনি যখন নবুওয়ত পান, তখন তাঁর বয়স হলো চল্লিশ। এরপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা যখন নামাজের বিধান দান করেন, তখন তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশ। কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। নামাজ ফরজ হয়েছে তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়সে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াতে ছিলেন তেষট্টি বছর। তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে নামাজ পড়েছেন সবোর্চ্চ তেরো বছর। ধরুন, আমাদের ভেতরে কেউ পনেরো বছর বয়সে বালেগ হলো, আর সে হায়াত পেল ষাট বছর। তো, সে যদি পনেরো বছর বয়স থেকে নামাজ পড়া শুরু করে, তাহলে নামাজ পড়বে মোট পঁয়তাল্লিশ বছর। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়েছেন তেরো বছর। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, তেরো আর পঁয়তাল্লিশে পার্থক্য অনেক।
দ্বিতীয় কথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ফরজ নামাজ ছয় ওয়াক্ত না পাঁচ ওয়াক্ত? পাঁচ ওয়াক্ত। আর আমার ওপর কয় ওয়াক্ত? ঠিক একই পরিমাণ। তাহলে যে লোক পঁয়তাল্লিশ বছর নামাজ পড়েছে, যদি তার পঠিত ফরজ নামাজের সংখ্যা আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফরজ নামাজের সংখ্যা তুলনা করি, তাহলে গাণিতিকভাবে কারটা বেশি হবে? যে লোক পঁয়তাল্লিশ বছর নামাজ পড়েছে, তার ফরজ নামাজের সংখ্যাই বেশি হবে। তাহলে যদি নামাজের সংখ্যার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার মাসআলা হয়, তাহলে তো সংখ্যা আপনার বেশি-যদি আপনি পঁয়তাল্লিশ বছর নামাজ পড়েন। কেউ যদি ৬০ বছর ধরে নামাজ পড়ে, তারটা তো আরও বেশি। অবশ্যই তার ফরজ নামাজের রাকআত সংখ্যা, ফরজ রুকুর সংখ্যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাইতে বেশি হবে। এখন যদি নামাজের সংখ্যার দ্বারা কেউ প্রিয় হয়, তাহলে আপনি যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে বেশি নামাজ পড়েছেন, সেহেতু আপনিই তো অধিক প্রিয় হওয়ার কথা। তাই না?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা বললে হয়তো বলতে পারেন, 'উনি নবি। তাঁর সাথে কি আমাদের উপমা চলতে পারে?' আচ্ছা ঠিক আছে, আল্লাহর নবির কথা বাদ দিলাম। উম্মতের ভেতরে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলেন আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি নবিজির উম্মত ছিলেন। ধরে নিন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে বয়সের পার্থক্য ছিল দুই বছর। তার মানে নামাজ যখন ফরজ হয়, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বয়স আটচল্লিশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেষট্টি বছরে মারা গেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও তেষট্টি বছর বয়সে মারা গেছেন। বয়স সমান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার দুই বছর পরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিদায় নিয়েছেন। তাহলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কত বছর ধরে নামাজ পড়েছেন? পনেরো বছর। সুতরাং, আমাদের মধ্যে যিনি পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে নামাজ পড়েছেন, এখনো পড়ছেন, তিনি তো সংখ্যার দিক থেকে আবু বকরের চেয়ে বেশি নামাজ পড়েছেন।
আমরা মনে করি যে, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত-এগুলোই কেবল বড় আমল। মনে করতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার সবচেয়ে বড় আমল হলো 'গুনাহমুক্ত জীবন গড়া'। আমি উদাহরণ দিয়ে বোঝালাম।
আপনি রোজার কথাই বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বোচ্চ এগারো বছর রোজা রেখেছেন। আমাদের ভেতরে যে লোক ৬৫ বছর বেঁচেছে, সে তো প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে রোজা রেখেছে। নবিজির চেয়ে সংখ্যায় তিনগুণেরও বেশি। চার ভাগের একভাগ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে একবার হজ করেছেন; আর আমরা অনেকেই আছি, যারা চল্লিশ বারও হজ করেছি। তো, চল্লিশ আর এক কি সংখ্যার দিক থেকে সমান? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পত্তি কখনোই জমা হয়নি। যাকাত দেওয়ার সুযোগই তিনি পাননি। আর আমরা তো অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা যাকাত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি।
এগুলো বোঝার জন্যে বলছি। উম্মতের ভেতরে আজ ভুল ধারণা পয়দা হয়েছে। তারা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার কোনো পরোয়া করছে না। আমি বলছি-এই কথা বুঝতে হবে এই মজলিস থেকে যে, আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার সবচেয়ে বড় আমল হলো গুনাহমুক্ত জীবন গড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেরো বছর নামাজ পড়েছেন, এগারো বছর রোজা রেখেছেন, জীবনে একবার হজ করেছেন, যাকাত তাঁর ওপর ফরজ হয়নি কখনো, এরপরেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। কারণ, তিনি জীবনে কোনোদিন গুনাহ করেননি। এবং শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো অন্য নবিরাও মাসুম ছিলেন। অন্যান্য নবিরাও তাঁদের জীবনকে গুনাহমুক্ত রেখেছেন। আমি আর আপনি ৪৫ বছর নামাজ পড়লেও, কয়দিন নিজের জীবনকে গুনাহমুক্ত রাখতে পেরেছি? ওই হিসাব কিন্তু নেওয়া হয়নি। এজন্য আমি ৪৫ হাজার দিনও যদি নামাজ পড়ি, ৪৫ হাজার বছরও যদি নামাজ পড়ি, তাহলেও আমার জীবন রাসূলের সাথে মিলবে না। আমি রাসূলের সাথে টেক্কা দেওয়া তো দূরের কথা, রাসূলের সাথে আমার জিন্দেগি মেলালে দেখা যাবে যে, গুনাহ করার কারণে হয়তো আল্লাহর কাছে আমার এক ওয়াক্ত নামাজও কবুল হয়নি। এভাবে সমাজ থেকে গুনাহমুক্ত থাকার ধারণা ছুটে গেছে। পুরো সমাজ এ কথা ভুলে গেছে যে, আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ হওয়ার এবং প্রিয় হওয়ার সবচেয়ে বড় আমল হলো গুনাহমুক্ত জীবন গড়া। এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন দেখলেই স্পষ্ট হয়। আমিও যদি আমার জীবনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো করতে চাই এবং তাঁর সাথে জান্নাতে যাওয়ার আশা রাখি, তাহলে আমার জীবনটাকেও গুনাহমুক্ত করতে হবে।
📄 প্রথম দলিল
এবার ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি দলিল পেশ করব। এরপর আমাদের জীবনের হিসাব নেব। আল্লাহ তাআলা কুরআনে একটি সূরা নাযিল করেছেন। সূরাটির নাম হলো সূরা ইউসুফ। এখন তো অনেকেই ইউসুফ-জুলেখা নামের ফিল্ম বের করেছে। আল্লাহ মাফ করুক। এতে ঈমানের খতরা আছে। নবির অবয়ব দেখতে গিয়ে দুনিয়ার বড় বড় লম্পটকে দেখছে মানুষ। নায়করা লম্পট না? তাদের চরিত্র ঠিক আছে? নায়িকার চরিত্র ঠিক আছে? ফিল্ম দেখার কারণে আপনার দিলে এখন নবির নাম শুনলে ওই লম্পটের চেহারা দিলে ভেসে আসে। আসে কি না? নবিরা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাসুম, আর এই নবির নামে সিনেমা দেখার কারণে দিলের ভেতরে দুনিয়ার লম্পটের ছবি আসছে। তো, ঈমান ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা আছে কি না? আমরা আমাদের অজান্তে নেক নিয়তে ইউসুফ-জুলেখা দেখে ঈমানকে অনেক বড় করছি, নাকি ছোট করছি? এখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর নাম শুনলেই একজন নায়কের কল্পনা দিলের ভেতর আসে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। এটা এমনি এমনি বললাম।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে সূরা নাযিল করেছেন। সূরার নাম ইউসুফ। আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বর্ণিত ইউসুফ আলাইহিস সালামের গল্পের ব্যাপারে একটা কথা বলেছেন। অন্য কারও গল্পের ব্যাপারে এই কথা বলেননি আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ
'আমি তোমার নিকট সুন্দরতম কাহিনি বর্ণনা করছি, এ কুরআন আমার ওহি হিসেবে তোমার কাছে প্রেরণ করার মাধ্যমে। যদিও তুমি এর পূর্বে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।[৪]
আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহব্বত করে বলছেন, 'আমি তোমার কাছে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প শোনাচ্ছি। সবচেয়ে সুন্দর গল্প শোনাচ্ছি।' আল্লাহ তাআলা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর বালেগ হওয়ার পরের ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
وَرَا وَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
'আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিলো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো, আর বলল, “এসো”। সে (ইউসুফ) বলল, "আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয়ই তিনি আমার রব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই জালিমগণ সফল হয় না।”[৫]
এই লম্বা-চওড়া ঘটনা আল্লাহ বয়ান করছেন যে, ইউসুফ বালেগ হয়েছেন। এই সুন্দর ঘটনা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শোনাচ্ছেন। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যাদের ঘরে ছিলেন, ওই ঘরের রমণী একদিন ইউসুফ আলাইহিস সালাম- কে নিজের কাছে ডাকছে। মনে রাখবেন, এই ঘটনা শোনাচ্ছেন আল্লাহ। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ঘটনাটা আল্লাহ শোনাচ্ছেন। ওখানে তখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে শুধু এই রমণীই আছে, আর কেউ নেই। এই সময় সে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে আকর্ষণ করার চেষ্টা করল।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম তখন সবেমাত্র বালেগ। তো, ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মধ্যে আকর্ষণ আছে, নাকি নেই? আছে। আর ওই রমণী এমন জায়গায় ডাকছে, যে জায়গা আল্লাহ ছাড়া আর তৃতীয় কেউ দেখছে না। এই সময় ইউসুফ আলাইহিস সালাম একটা শব্দ বলেছেন, "মাআযাল্লাহ”-হে আল্লাহ! আপনি আমাকে বাঁচান। আমি নিজে বাঁচার ক্ষমতা রাখি না, আমারও তো আকর্ষণ আছে। কিন্তু আমি আপনাকে ভয় করি, আমি এ অবস্থা থেকে বাঁচতে চাই। আল্লাহ বলেন যে-হে ইউসুফ! তোমার ঘটনা আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত কোনো যুবক যদি গুনাহের আহ্বান পাওয়ার পর আমার ভয়ে এইভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়, তাহলে সেটাও আমার কাছে সবচেয়ে সেরা গল্প হবে। আমি ইউসুফকে যেভাবে অমর করে রেখেছি, ওই যুবককেও আমি অমর করে রাখব।
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় গল্প রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোনাচ্ছেন। এজন্যে শোনাচ্ছেন, তিনি যেন তাঁর উম্মতকে শোনান। তিনি এই উম্মতের কাছে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মতো আদর্শ চান। গুনাহ করার সব সুযোগ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সামনে ছিল; কিন্তু আল্লাহর ভয়ে সব আকর্ষণকে বাদ দিয়ে ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলছেন, 'মাযাআল্লাহ-হে আল্লাহ! আপনি আমাকে বাঁচান।'
এই-যে আল্লাহ তাআলা তাঁর সেরা গল্প শুনিয়েছেন, এখানে কি ইউসুফ আলাইহিস সালামের এক হাজার বছর নামাজ পড়ার কথা আছে? দুই হাজার বছর? ইউসুফ আলাইহিস সালাম সারাদিন-সারারাত রোজা রাখতেন-এই গল্প শোনানো হয়েছে? কোটি কোটি টাকা যাকাত দিয়েছেন, এইটা শোনানো হয়েছে?
না। আল্লাহ তাঁর পূতপবিত্র চরিত্রের ঘটনা বয়ান করেছেন। এখন যার আকল আছে, সে নিজেকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর চরিত্রের ওপর উঠাবে। কার ওপর উঠাবে? ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর চরিত্রের ওপর। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর গুনাহের অফুরন্ত সুযোগ ছিল, কিন্তু আল্লাহর ভয়ে তিনি নিজেকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন। এই গল্প আল্লাহর কাছে 'আহসানুল কাসাস' হয়ে গেছে।
বড় নামাজি, কিন্তু গুনাহ থেকে মুক্ত না; বড় রোজাদার, কিন্তু গুনাহে জড়িত; বড় দানবীর, কিন্তু গুনাহযুক্ত জীবন তার; এই জীবনের দাম আল্লাহর কাছে বেশি? না। যে ব্যক্তি হালাল-হারাম বেছে চলে-হোক তার আমল অল্প-তার দাম আল্লাহর কাছে বেশি। যে ব্যক্তি গুনাহমুক্ত জীবন গড়েছে, তার আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
সমাজ থেকে এটা হারিয়ে গেছে যে, গুনাহমুক্ত জীবন গড়তে হবে। ঈমান আনার পরে গুনাহ করার যে আর সুযোগ নেই-এই কথা সমাজের মানুষ ভুলেই গেছে। সবাই বলছে নামাজ পড়ো, রোজা রাখো, হজ করো, যাকাত দাও। কিন্তু আসল কথা হলো ঈমান আনার পরে সর্বপ্রথম তোমার জিম্মাদারি ছিল, তুমি এই ওয়াদা করো যে, 'আমি আল্লাহর হুকুমের বাইরে চলব না। আমার জীবনকে নবিদের জীবনের মতো বানাব।' নবিরা তো গুনাহমুক্ত জীবন গড়ে মাসুম হয়েছে। তুমি যদি গুনাহ করেও ফেলো, তবে তাওবা করে নিজেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দা বানিয়ে আল্লাহর কাছে চলে যাও।
তাহলে, আমার জীবন যদি নবির সাথে মেলাতে চাই, তাহলে কোন পয়েন্টে সবচেয়ে বেশি মেলাতে হবে? গুনাহমুক্ত জীবন। যদি আমার জীবন আবু বকরের জীবনের মতো করতে চাই, তাহলে কোন পয়েন্টে তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করতে হবে? গুনাহমুক্ত জীবন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে যে সুন্দর গল্পটা শুনিয়েছেন, ওই গল্পের ভেতর আল্লাহ কী উপস্থাপন করেছেন? গুনাহের সুযোগ ছিল, কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজেকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রেখেছেন।
টিকাঃ
[৪] সূরা ইউসুফ, ১২: ৩।
[৫] সূরা ইউসুফ, ১২: ২৩।
📄 দ্বিতীয় দলিল
এই ব্যাপারে আরেকটা দলিল দেবো। আরও অনেক দলিল আছে, শুধু বোঝার জন্য আরেকটা দিচ্ছি। কিয়ামতের ময়দানে সবাই যখন জমা হবে, তো কারও নাক দিয়ে মগজ টপকিয়ে টপকিয়ে পড়তে থাকবে। কেউ হাটু পরিমাণ ঘামের মধ্যে চলতে থাকবে, দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ কোমর পরিমাণ, কেউ গলা পরিমাণ। কেউ হাবুডুবু খেতে থাকবে। ওই সময় আল্লাহ রব্বুল ইযযাত সাত শ্রেণীর লোককে আরশের নিচে জায়গা দেবেন।
আল্লাহ তাআলা নবিদেরকে আরশের নিচে ছায়া দেবেন। নবিদের সাথে আরও সাত শ্রেণীর লোককে আরশের নিচে ছায়া দেবেন। এরা কারা?
এর মধ্যে আল্লাহ প্রথম জনের নাম বয়ান করছেন 'ইমামুন আদিলুন'।
একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে শোনাচ্ছেন, সবার আগে যে ছায়া পাবে, সে হলো ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ।[৬] অনেক বড় নামাজি বাদশাহর কথা বলা হয়নি। বেশি বেশি নফল রোজা রাখে, এমন বাদশাহ না। কারও ওপর জুলুম করেনি, অন্যায় করেনি, পাপ করেনি—এমন বাদশাহকে আল্লাহ আরশের নিচে ছায়া দেবেন। কারণ সে গুনাহমুক্ত জীবন গড়েছে। বাদশাহ হয়েও গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার কারণে আল্লাহ আরশের নিচে ছায়া দেবেন। সুবহানআল্লাহ! আরেকজন হলো, নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে যে যুবক। এই যুবককে দেখতে সুন্দরী, আকর্ষণ আছে এবং সম্ভ্রান্ত- এমন নারী কাছে পাবার জন্যে ডেকেছে। নিভৃতে নিজের কাছে ডেকেছে। ওই যুবক তখন আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সে ডাক প্রত্যাখ্যান করেছে। সে যুবক থাকবে আরশের ছায়ার নিচে। কারণ, সে গুনাহমুক্ত জীবন গঠন করেছিল। সম্ভ্রান্ত, রূপবতী নারী ডাকার পরেও সে বলছে, 'আমি তো আল্লাহকে ভয় করি।' এই যুবক নিজেকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে। তাহলে আমি-আপনি যদি এই ধারণা করে বসে থাকি নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতও করব, আবার গুনাহও করব—তবে এই জীবন নবির সাথে মিলবে না। আর নবির জীবনের সাথে আপনার জীবন না মেলার কারণে আপনি আল্লাহর আরশের ছায়ায় জায়গা পাবেন না। আপনার জীবন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সাথে মিলেনি; আপনার জীবন, যারা আরশের নিচে ছায়া পাবে—তাদের সাথে মিলেনি। কেননা আপনি ভুল ধারণা নিয়ে বসে ছিলেন।
টিকাঃ
[৬] মিশকাতুল মাসাবীহ, ৭০১।
📄 ইবাদতের উদ্দেশ্য
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নামাজের পরিচয় দিচ্ছেন,
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
'তোমার প্রতি যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত করো এবং নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন—যা তোমরা করো।'[৭]
দেখুন, নামাজের ভেতর আল্লাহ শেখাচ্ছেন যে, গুনাহমুক্ত জীবন গড়ো। আল্লাহ বলছেন—আমার কাছে ওটা নামাজই না, যে নামাজের নামাজিরা গুনাহ ছাড়তে পারেনি। যে নামাজ তোমাকে গুনাহ থেকে ফেরায় না, ওই নামাজ নামাজই না।
তাহলে নামাজের উদ্দেশ্য কিন্তু গুনাহমুক্ত জীবন গড়া। নামাজ আর রোজা মানে হলো আল্লাহর এমন ভয় দিলে পয়দা করা, যে ভয়ে আপনি নিভৃতে গুনাহ থেকে বাঁচবেন। এজন্যই রোজাকে ফরজ করা হয়েছে। এবার বুঝেছেন, কেন রোজা ফরজ হলো?
বলুন তো, নামাজ কেন ফরজ? গুনাহ করার জন্য, নাকি গুনাহকে ছাড়ার জন্য? রোজা কেন ফরজ? আল্লাহ নিজে বলছেন-তোমার দিলে এমন ভয় পয়দা করো, যে ভয় দ্বারা তুমি গুনাহের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে ফিরিয়ে রাখবে। এই জন্য আমি রোজাকে ফরজ করেছি।
তাহলে আমরা যে রোজা রাখি, এ রোজার উদ্দেশ্য ঠিক করেছি কি? আমার রোজা যদি আমাকে গুনাহ থেকে না ফিরায়, তাহলে আমার রোজার কী অবস্থা? যাকাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছেন,
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلُوتَكَ سَكَن لَّهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
'তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর তাদের জন্য দুআ করো, নিশ্চয়ই তোমার দুআ তাদের জন্য প্রশান্তিকর। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।[৮]
আল্লাহ বলছেন-তুমি যাকাত দাও। যাকাত দিয়ে তাদেরকে পবিত্র করো। তাদের জীবনকে গুনাহ থেকে পবিত্র করো। তাদের মালকে পবিত্র করো। তাহলে যাকাতের উদ্দেশ্য কি গুনাহমুক্ত জীবন গড়া, নাকি গুনাহযুক্ত জীবন? এখন আসি হজের কথায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُتْ، وَلَمْ يَفْسُقُ، رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
'যে ব্যক্তি রাফাছ ও ফিসক থেকে বিরত থেকে আল্লাহর উদ্দেশে হজ করল, সে এমন নবজাতক শিশু-যাকে তার মা এ মুহূর্তেই প্রসব করেছে, তার ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরবে।[৯]
তাহলে হজের মাকসাদ কি গুনাহমুক্ত জীবন গড়া, নাকি গুনাহযুক্ত জীবন?
আমি যে নামাজ পড়ছি, এই নামাজ যদি গুনাহমুক্ত জীবন না গড়তে পারে, যাকাত দ্বারা যদি আমার জীবন গুনাহ থেকে পবিত্র না হয়, হজ দ্বারা যদি আমি নিষ্পাপ না হই, তবে আমার নামাজ, হজ, যাকাত—কোনোটাই আল্লাহর কাছে মাকবুল না। তাহলে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার আমল কী? গুনাহমুক্ত জীবন গড়া।
টিকাঃ
[৭] সূরা আল-আনকাবুত, ২৯: ৪৫।
[৮] সূরা আত-তাওবা, ৯: ১০৩।
[৯] বুখারি, ১৫২১; মুসলিম, ১৮২০।