📄 চিরস্থায়ী জান্নাত
এটি এমন একটি বিষয়, যে সম্পর্কে একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জানানো ব্যতীত জানা কোনো মতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَأَمَّا الَّذِينَ سُعِدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضِ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ عَطَاء غَيْرَ مَجْذُوذٍ
পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান, তারা থাকবে জান্নাতে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। যতদিন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে, যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরূপ ইচ্ছা করেন, এটা এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার৪০৬।
إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ এর মধ্যে যে استثناء তথা বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে সালাফ তথা পূর্ববর্তী আলিমদের মতবিরোধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে হযরত মা'মার রহ. যাহ্হাক রহ. হতে বর্ণনা করেন। এর দ্বারা সে সকল লোক উদ্দেশ্য, যারা প্রথমে জাহান্নামে ছিল, পরবর্তীতে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন خالدون في الجنة الا هم مدة مكتهم في النار তারা জান্নাতে অমর হবে, পূর্বে তাদের জাহান্নামে সাময়িক অবস্থানের মুহূর্তগুলো ব্যতিরেকে। গ্রন্থকার বলেন, এতে দু'টি সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি হল وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا দ্বারা সকল নেককার উদ্দেশ্য নয়; বরং নির্দিষ্ট শ্রেণীর নেককারগণ উদ্দেশ্য, তারা হল সে সব নেককার, যাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। অপর সম্ভাবনা হল এই وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا দ্বারা সকল নেককার লোক উদ্দেশ্য। استثناء দ্বারা বিশেষ শ্রেণীর লোকদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। (তখন এর অর্থ দাড়ায়, যে সকল মু'মিনকে সাজা ভোগ করার জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তারা ব্যতীত সকল নেককার লোকই জান্নাতে চিরস্থায়ী থাকবে।)
উল্লিখিত উভয় সম্ভাবনার চেয়ে مَا شَاءَ رَبُّكَ ! এর মধ্যে বিদ্যমান আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা দ্বারা সকলকেই উদ্দেশ্য নেওয়া উত্তম। কেননা, সকল মু'মিনই যতক্ষণ পর্যন্ত হাশরের মাঠে ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে ছিল না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্য দলের কথা হল এখানে استثناء তথা বাদ তো দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা এরূপ করবেন না। আল্লাহ তা'আলার এ বাণীটি এ কাজটির ন্যায় غير ذالك الا ان أرى والله لأضربنك অর্থাৎ কাউকে মারার একান্ত ইচ্ছা করে কেউ বলে, আমি অবশ্যই তোমাকে মারব। হ্যাঁ, যদি এর বিপরীত বিষয়টা এতদপেক্ষা উত্তম হয়। (সুতরাং এর অর্থ দাড়ায়, তারা সর্বদা জান্নাতেই থাকবে। হ্যাঁ, তোমার প্রভু যদি বিপরীত ইচ্ছা করেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের চিরস্থায়ী জান্নাত ব্যতীত অন্য কিছু ইচ্ছা করবেন না। কারণ, তাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতে রাখাই তাঁর একান্ত ইচ্ছা।)
তৃতীয় দলের মত হল : আরবরা যখন কোন বস্তুকে তার সমজাতীয় অনেক গুলো হতে استثناء তথা বাদ দেয়, তখন الا ও واو এর অর্থ سوی অর্থাৎ ব্যতীত। সে হিসাবে এর অর্থ হবে, سوى ماشاء ربك তোমার প্রভু যা ইচ্ছা করেন, এটা ব্যতীত। অর্থাৎ আসমান-যমীনের স্থায়ীত্বের সময়কাল অপেক্ষা অধিক। (এখানে যমীন ও আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আখিরাতের আসমান যমীন। যেমন আল্লাহর বাণী يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ অর্থাৎ যেদিন আসমান ও যমীনকে অন্য আসমান ও যমীন দ্বারা পরিবর্তিত করা হবে আর জান্নাতের আসমান ও যমীন হবে চিরস্থায়ী। সুতরাং মু'মিনগণও জান্নাতে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে।)
এমতটি হচ্ছে দুই নাহুবিদ সিবওয়াইহ ও ফাররার রহ.। তারা বলেন, এ আয়াতে ১। শব্দটি سوی এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, এর উপমা হল, যেমন কেউ বলল ليعليك الف الا الالفين الذين قبلها অর্থাৎ পূর্বের দু'ই হাজার ব্যতীত তোমার নিকট আমি এক হাজার পাব। ইবনে জারীর রহ. বলেন, পূর্বের দু'টি ব্যাখ্যা হতে এটিই আমার নিকট অধিক পসন্দনীয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এমন এক সত্তা, যিনি কখনো প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।
চতুর্থ দল মনে করে, ১। এখানে তার মূল অর্থ استثناء অর্থাৎ বাদ দেয়ার জন্য ব্যবহার হয়েছে। প্রয়োজন তো ছিল, জান্নাতী লোকদের পার্থিব জীবনের সমাপ্তির সাথে সাথেই তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো। কিন্তু তাদের মৃত্যু হতে পুনরুত্থান পর্যন্ত যেহেতু তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়নি, তাই আল্লাহ তা'আলা সে সময়টাকে জান্নাতের চিরস্থায়ী জীবন হতে বাদ দিয়েছেন বলেই এ আয়াতে ১। ব্যবহার করেছেন।
পঞ্চম দল মনে করে, জান্নাতীদের জান্নাতে সর্বদা থাকার ফায়সালা তো হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত করলে করতে পারেন। সুতরাং তিনি জানালেন, জান্নাতী জান্নাতে চিরস্থায়ী হলেও সবই তাঁর ইচ্ছাধীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন, وَلَئِن شننا لَتَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ অর্থাৎ যদি আমি ইচ্ছা করি, তবে আপনার নিকট প্রেরিত প্রত্যাদেশ বাণী ফিরিয়ে নিতে পারি।
ওয়াহী আল্লাহ তা'আলা ফিরিয়ে না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন। তিনি এতে সক্ষম, অক্ষম নন। তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী فَإِن يَشَا اللَّهُ يَحْتِمْ عَلَى قَلْبَكَ আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে আপনার অন্তরে মোহর এঁটে দিতে পারেন। (নবৃওয়াত প্রদানের পর মোহর না আঁটার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন) তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী قُلْ لُوْ شَاء اللَّهُ مَا تَلُوتُهُ عَلَيْكُمْহ নবী! আপনি বলে দিন, যদি আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করেন, তবে আমি তোমাদের নিকট কুরআন কারীম তিলাওয়াত করব না। এরূপ আরো উদাহরণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, সকল কিছুই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। যা ইচ্ছা করেন না, তা হয় না।
ষষ্ঠ দলের মত হল : مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ দ্বারা এ পৃথিবীর যমীন ও আসমানের সময়সীমা উদ্দেশ্য। সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে, তারা আসমান যমীনের সময় সীমা পর্যন্ত জান্নাতে থাকবে। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এ সময় হতে অধিক সময় রাখার ইচ্ছা করেন।
সপ্তম দলের মত হল : مَا شَاءَ رَبُّكَ এর মধ্যে শব্দটি من এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَانكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاء এর মধ্যে ما শব্দটি من এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ তোমরা মাহরাম মহিলা ব্যতীত অন্য কোন নারীকে ভালো লাগলে বিবাহ করতে পার। সুতরাং এ অবস্থায় অর্থ হবে, رَبُّكَ مَا شَاءَ الا। অর্থাৎ নেককার লোক চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতে থাকবে। হ্যাঁ, নেককারদের মধ্যে যাকে তার গুনাহের কারণে তোমার প্রভু জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন সে ছাড়া।
অষ্টম দলের মত হল : مَا دَامَت السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ দ্বারা জান্নাতের আসমান-যমীন উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তা'আলার বাণী, رَبُّكَ مَا شَاءَ الا। এর মধ্যে শব্দটি যদি من অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এর দ্বারা সে সকল লোক উদ্দেশ্য, যারা প্রথমে জাহান্নামে ছিল অতঃপর জাহান্নام থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। আর ৩ দ্বারা যদি সময় উদ্দেশ্য হয়, তবে এর দ্বারা আলমে বরযখ তথা মৃত্যুর পর পুনরুত্থান উদ্দেশ্য।
নবম দলের মত হল : এর দ্বারা তাদের দুনিয়ায় অতিবাহিত সময় উদ্দেশ্য।
উল্লিখিত মতামতগুলো উদ্দেশ্যের দিক থেকে অত্যন্ত কাছাকাছি এবং এগুলোতে সমন্বয় সাধনও সম্ভব। এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জান্নাতীরা সর্বদা জান্নাতে অবস্থান করবে, তবে সে পরিমাণ সময়, যে পরিমাণ সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের জান্নাতে অবস্থান করানো ইচ্ছা করেননি। সে সময়ের মধ্যে তাদের দুনিয়ায় অবস্থানের সময়, বরযখে থাকার সময়, হাশরের ময়দানে থাকার সময়, পুলসিরাতে থাকার সময় ও কারো কারো জাহান্নামে থাকার সময়ও অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে এ সকল সম্ভাবনাও রয়েছে, তবে আল্লাহ তা'আলার বাণী عَطَاء غَيْرَ مَجْذُودَ হল إِنَّ هَذَا لَرِزْقُنَا مَالَهُ مِن نَّفَادٍ। নিশ্চয়ই এটা আমার পক্ষ হতে অবতারিত রিক, যা কখনো নিঃশেষ হবে না। তেমনিভাবে আল্লাহর বাণী أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا তার ফল ও ছায়া স্থায়ী। এমনিভাবে আল্লাহর বাণী, وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা জান্নাত হতে বহিষ্কৃত হবে না। কুরআন কারীমে অনেক স্থানে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতীদের স্থায়ীত্বকে সর্বদা বিশেষণ দ্বারা দৃঢ় করেছেন। (অর্থাৎ خَالِدِينَ فِيهَا এর সাথে أَبَدًا শব্দটিকে তাকিদ হিসাবে উল্লেখ করেছেন) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন, তারা প্রথমবারের মৃত্যু (দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে আড়ালকারী মৃত্যু) ব্যতীত সেখানে তারা চিরস্থায়ী থাকবে। কিন্তু এ মৃত্যু যেহেতু তাদের চিরস্থায়ী জীবনের সূচনার পূর্বের। সুতরাং বুঝা যায়, তাদের জান্নাতী জীবনে মৃত্যু আসবে না; বরং তাদের জান্নাতী জীবন হবে চিরস্থায়ী।
পূর্বোল্লিখিত হাদীসে রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা প্রাচুর্য ও আভিজাত্যে থাকবে। কখনো সে দুরবস্থার সম্মুখীন হবে না। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। কখনো মৃত্যু মুখে পতিত হবে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জান্নাতে এক ঘোষক ঘোষণা করতে থাকবে, হে জান্নাতীগণ! তোমরা সর্বদা সুস্থ সবলে থাকবে, কখনো রুগ্ন ও পীড়িত হবে না। তোমরা সর্বদা তরুণ থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। চিরস্থায়ী হবে, কখনো মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে না।
সহীহায়নে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يجاء بالموت في صورة كبش املح فيوقف بين الجنة والنار একটি কালো-ধলো বর্ণ মিশ্রিত দুম্বার আকৃতিতে মৃত্যুকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জান্নাত ও জাহান্নাম-এর মধ্যবর্তী স্থলে যবাহ করা হবে ও অতঃপর আহ্বান করা হবে, হে জান্নাতবাসীরা! তখন তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তাকাবে। يقال يا أهل النار فيطلعون فرحين এরপর আহ্বান করা হবে, হে জাহান্নামীরা! তখন তারা আনন্দ চিত্তে তাকাবে, (এটা এ জন্য, তারা মনে করবে, হয়ত এর মাধ্যমে নরক থেকে আমাদেরকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে)? فيقال هل تعرفون هذا؟ তখন বলা হবে, তোমরা কি জান, এটা কি? فيقولون نعم هذا الموت তারা উত্তর দিবে, হ্যাঁ, এটা হল মৃত্যু। فيذبح بين الجنة والنار অতঃপর তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থলে যবাহ করা হবে। ثم يقال : يا أهل الجنة خلود فلا موت এরপর বলা হবে, হে জান্নাতবাসীরা! এখানে স্থায়ী জীবন, কখনো মৃত্যু আসবে না। ثم يقال : يا أهل النار خلود فلا موت এরপর বলা হবে, হে জাহান্নামীরা! এখানে স্থায়ী জীবন, কখনো মৃত্যু আসবে না। (তখন জান্নাতীদের আনন্দের কোন সীমা থাকবে না। আর জাহান্নামীদেরও দুঃখের কোন সীমা থাকবে না)
উম্মতে মুহাম্মদীর পরবর্তী প্রজন্মের উলামায়ে কিরামের মাঝে এ বিষয়ে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। তাদের থেকে তিন ধরনের অভিমত লক্ষ্য করা যায়।
প্রথম মত: জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল।
দ্বিতীয় মত: উভয়টিই স্থায়ী ও অবিনশ্বর। কখনো ধ্বংস হবে না।
তৃতীয় মত: জান্নাত স্থায়ী, কখনো ধ্বংস হবে না আর জাহান্নام অস্থায়ী, তা কোন এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে।
নিম্নে এ মতামতগুলোর পক্ষের-বিপক্ষের দিকগুলো উল্লেখ করব ও প্রত্যেক মতের দলীল উল্লেখ করে কুরআন-সুন্নাহের সাথে সাংঘর্ষিক মতকে খণ্ডন করব।
প্রথম মতটি অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টি অস্থায়ী হওয়ার মতটি হল মু'আত্তালাহদের ইমাম জাহম ইবনে সাফওয়ানের। তার পূর্বে সাহাবা, তাবেঈন, আইম্মায়ে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্যে কেউ এ মত পোষণ করেননি। এটা তার এমন একটি আকীদা, যার কারণে আইম্মায়ে ইসলাম তার ও তার অনুসারীদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা আওয়ায তুলেছেন।
যেমন ইমাম আহমদ রহ. এর পুত্র আবদুল্লাহ রহ. কিতাবুস্-সুন্নাহতে খারিজাহ ইবনে মুস'আব রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, জাহমিয়ারা কুরআন শরীফের তিনটি আয়াতকে অস্বীকার করেছে, তন্মধ্যে একটি হল আল্লাহ তা'আলার বাণী دائم وظلها كلها জান্নাতের ফল ও ছায়া হবে স্থায়ী। অথচ সে বলে তা অস্থায়ী।
দ্বিতীয়টি হল إِنَّ هَذَا لَرِزْقْنَا مَا لَهُ مِن تَفَادِ এটা আমার পক্ষ হতে রিযিক, যা কখনো নিঃশেষ হবে না।
তৃতীয়টি হল مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ اللَّهِ بَاقِ হে মানব সকল! তোমাদের নিকট যা রয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আমার নিকট যা রয়েছে, তা ধ্বংস হবে না; বরং তা হবে স্থায়ী।
এ মত পোষণকারীরা তাদের ভ্রান্ত ও ভুল কিয়াসের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, যা কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেননা, কুরআন-হাদীস ও সহীহ আকল দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলার বাণী ও কর্ম হল অসীম। যা অন্য কোন কর্মের কারণে নিঃশেষ হয়ে যায় না। পূর্বোক্ত কাজের কারণে বাধাগ্রস্তও হয় না। (মানুষ এক সময়ে একাধিক কাজ করতে পারে না, এক কাজ সমাপ্ত করে অন্য কাজ করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার কাজ এমন নয়; বরং তিনি সকল কাজই তাঁর শান মোতাবেক আদি হতে অন্ত পর্যন্ত করে যাচ্ছেন। আমরা তার পন্থা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানি না।)
আল্লাহ তা'আলার বাণী ও কর্ম অসীম হওয়ার দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, قُلْ لَوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِكَلِمَاتِ رَبِّي لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّي وَلَوْجِئْنَا بِمِثْلِهِ مَدَدً বল, আমার প্রতিপালকের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, আমি এটার সাহায্যার্থে অনুরূপ আরো সমুদ্র আনলেও।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন,
وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةِ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِنْ بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় আর সমুদ্র হয় কালি ও তার সাথে আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়, তবু আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় হওয়ার দরুন তাঁর বাণী কখনো নিঃশেষ হবে না। উভয়টিই তাঁর সিফাতে যাতিয়া তথা সত্তা সংশ্লিষ্ট গুণের অন্তর্ভূক্ত।
ইবনে আবী হাতিম স্বীয় তাফসীরে সুলায়মান ইবনে আমির রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রবী ইবনে আনাস রহ.কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলার ইলমের মোকাবেলায় সমস্ত মাখলুকের ইলমের তুলনা সমুদ্রের তুলনায় একটি বিন্দুর ন্যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَوْ أَنْمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةِ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ
তিনি আরো বলেন, قُلْ لَوْ كَانَ الْبَحْرُ مَدَادًا। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এটাই বললেন, হে নবী! আপনি বলে দিন, যদি আল্লাহর বাণী লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র কালিতে রূপান্তরিত হয় এবং বৃক্ষরাজি কলমে পরিণত হয় (এবং সকল মানুষ লিখতে শুরু করে) তবে কলম ক্ষয় হয়ে যাবে, সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার বাণী অবশিষ্ট থাকবে, নিঃশেষ হবে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলার বাণীকে আয়ত্ব করতে কেউ সক্ষম হবে না। কেউ তাঁর শানের যথোপযোগী প্রশংসা করতে সক্ষম নয়; বরং তিনি তাঁর যেভাবে প্রশংসা করেছেন, তিনি ঠিক তেমনি। তিনি তাঁর যেভাবে সিফাত বর্ণনা করেছেন, তিনি সে সিফাতের সাথে গুণান্বিত; বরং তিনি তাঁর থেকেও উর্ধ্বে। (কেননা, তিনি মাখলুককে তাঁর সমস্ত সিফাত সম্পর্কে জানাননি। তাই তিনি তাঁর যে সিফাতের বর্ণনা দিয়েছেন, তা অপেক্ষাও তাঁর সত্তা অনেক উর্ধ্বে।) পার্থিব জগতের পূর্বাপর সকল নিআমত আখিরাতের মোকাবেলায় ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে সমগ্র পৃথিবীর তুলনায় একটি তিল। (এটাও تو শুধু মানুষকে বুঝানোর জন্য উপমা স্বরূপ, অন্যথায় আখিরাতের নিআমতের সাথে দুনিয়ার নিআমতের কোন তুলনাই হয় না।)
জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার বর্ণনা
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের দু'টি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। এ ব্যাপারে তাবেঈদের থেকেও মতনৈক্য স্বতঃসিদ্ধ।
গ্রন্থকার বলেন, এ বিষয়ে সাতটি অভিমত রয়েছে।
প্রথম অভিমত: তাতে যে-ই প্রবেশ করবে, সে আর কখনো বের হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাতে প্রবেশ স্থায়ীভাবেই হবে। এটা মু'তাযিলা ও খারিজীদের মত।
দ্বিতীয় অভিমত: জাহান্নামীরা একটা সময় পর্যন্ত তাতে শান্তি পেতে থাকবে। তখন তাদের স্বভাবই আগুনের স্বভাব হয়ে যাবে। ফলে তারা তাতে এক প্রকার স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ করবে। এটা হল ইবনে আরাবী আত্ তায়ী-এর মত। তিনি স্বীয় গ্রন্থ ফুসূসে উল্লেখ করেন, প্রতিশ্রুতি পালন প্রশংসনীয় বিষয়, ধমকি বাস্তবায়ন নয়। আর আল্লাহর সত্তার মহত্ত্ব এমন প্রশংসার দাবীদার, যা তার সত্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই আল্লাহর সত্তার প্রশংসা হবে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের উপর; দণ্ড প্রয়োগের উপর নয়। বরং দণ্ড মার্জনার উপর প্রশংসা হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ مُخْلِفَ وَعْدِهِ رُسُلَهُ তুমি কখনো মনে করো না, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।
আল্লাহ তা'আলা مُخْلِفَ وَعْدِهِ বলেছেন, তিনি مُخلف وَغده বলেননি। সুতরাং বুঝা যায়, তিনি বলেছেন, ونتجاوز عن سيئاتهم অর্থাৎ আমি তাদের পাপরাশি মার্জনা করে দিব। পাপকার্যের ব্যাপারে ধমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি তা বললেন। তিনি হযরত ইসমাঈল আ.-এর প্রশংসায় বলেছেন, তিনি হলেন, অঙ্গীকার বাস্তবায়নকারী।
গ্রন্থকার বলেন, এঅভিমত পোষণকারীরা একদিকে আর মু'তাযিলারা অন্যদিকে। তারা বলে, আল্লাহ তা'আলার জন্য তাঁর প্রদত্ত ধমকির বিপরীত করা বৈধ নয়; বরং তিনি যে ধমকি প্রদান করেছেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য ওয়াজিব বা আবশ্যক। সুতরাং মু'তাযিলাদের মতে যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সে কখনো নাজাত পাবে না। আর ইবনে আরাবী আত্ তাঈর মতে কেউ চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। এ উভয় দলের মতই সে নীতির সাথে সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক, যা আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে জানিয়েছেন।
তৃতীয় অভিমত: কারো কারো অভিমত হল, জাহান্নামীদের কিছু দিন সাজা দেওয়ার পর তা হতে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর তাদের স্থলে অন্যদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ইহুদীরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এ মত ব্যক্ত করলে তিনি তাদের মতকে মিথ্যায় পর্যবসিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ মতকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে বলেন,
وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَةً قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِنْدَ الله عَهْدًا فَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ عَهْدَهُ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
আমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা কি আল্লাহ তা'আলা হতে অঙ্গীকার নিয়েছ? যে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না; কিংবা আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? بَلَى مَنْ كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ به خَطِيئَتُهُ فَأولئكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ .
যাদের পাপরাশি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে, তারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।
আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো বলেন,
قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ )
যারা বলে থাকে, দিন কতক ব্যতীত আগুন আমাদেরকে স্পর্শই করবে না। তাদের নিজেদের দ্বীন সম্বন্ধে তাদের মিথ্যা উদ্ভাবন তাদেরকে প্রবঞ্চিত করেছে।
সুতরাং এ মত হল খোদার দুশমন ইয়াহুদীদের। তারাই এ মত পোষণকারীদের গুরু। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমায়ে সাহাবাহ ও আইম্মায়ে ইসলামের মতানুসারে এটা ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট মত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَمَا هُمْ بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ তারা কখনো আগুন হতে বের হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَمَا هُمْ مِنْهَا بِخَارِجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمَّ أُعِيدُوا فِيهَا যখনই তারা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জাহান্নাম হতে বের হতে চাবে, তখনই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাতে। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا أُعِيدُوا فِيهَا যখনই তারা বের হতে চাবে, ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাতে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَايُخَفِّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا তাদের (জাহান্নামীদের) মৃত্যু আদেশ দেওয়া হবে না, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি লাঘব করাও হবে না।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمُ الْخِيَاطِ এবং তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সূচের ছিদ্র পথে উষ্ট্রী প্রবেশ করে।
এ আয়াতের ভাষ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট, কাফিররা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
চতুর্থ অভিমত : কেউ কেউ বলে, জাহান্নামীদের জাহান্নাম হতে বের করে আনা হবে, কিন্তু জাহান্নام আপন অবস্থায় বাকী থাকবে। সেখানে সাজার জন্য আর কেউ থাকবে না। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এ মতটি নকল করেছেন। কিন্তু এ মতটি কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত।
পঞ্চম অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নাম ধ্বংস হয়ে যাবে, কেননা, তা নব সৃষ্টি, যা পূর্বে ছিল না। আর যার নব সৃষ্টি হওয়া প্রমাণিত, তা স্থায়ী হওয়া অসম্ভব। এটা হল জাহম ইবনে সাফওয়ান ও তার অনুসারীদের মত। এ ব্যাপারে তার মত হল, জান্নাত ও জাহান্নামে কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যাবে।
ষষ্ঠ অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নামীরা কোন এক সময় জড় বস্তুতে পরিণত হবে। তাদের জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারা কোন দুঃখ-কষ্ট অনুভব করবে না। মু'তাযিলাদের ইমাম আবূ হুযাইল আল আল্লাফ এ মত পোষণ করেন।
সপ্তম অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নামের সৃষ্টিকর্তা নিজেই তাকে ধ্বংস করে দিবেন। কেননা তিনি তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরী করেছেন। সে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তিনি তা ধ্বংস করে দিবেন। এমতটি হযরত উমর, হযরত ইবনে মাসউদ, হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ সাঈদ রা. প্রমুখ হতে বর্ণিত।
আবদ ইবনে হুমাইদ রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, হযরত উমর রা. বলতেন, জাহান্নামীরা যদি সমগ্র বালুকারাশির সমপরিমাণও জাহান্নামে থাকে, তবুও একটা সময় আসবে, যখন তারা জাহান্নام থেকে মুক্তি পাবে
হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল রহ. স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, হযরত উমর রা. বলেছেন, যদি জাহান্নামীরা সমগ্র বালুকারাশি পরিমাণ সময়ও জাহান্নামে অবস্থান করে, তবু একটা সময় আসবে, যখন তারা জাহান্নام হতে নিষ্কৃতি পাবে। এ মত পোষণকারীরা বলেন, আলী ইবনে আবী তালহা আল ওয়ালেবী রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তা'আলার বাণী: النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ (জাহান্নাম হল তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে সর্বদা থাকবে, তবে আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান।) এর তাফসীরে উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের ব্যাপারে আল্লাহর উপর কারো ফয়সালা করা উচিত নয়। কাউকে জান্নাতী এবং জাহান্নামী ফয়সালা দেওয়াও উচিত নয়। তারা বলে, আয়াতে خالدين فيها أبدا এ ধমকি শুধুমাত্র আহলে কিবলার (অর্থাৎ ঈমানদার কিন্তু গুনাহের কারনে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে) সাথে খাস নয়; কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
يَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِنَ الإِنسِ وَقَالَ أَوْلَيَاؤُهُمْ مِنَ الإِنسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَلْتَ لَنَا قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ
সেদিন তিনি সকলকে একত্রিত করবেন এবং বলবেন, হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা তো অনেক মানুষকে তোমাদের অনুগামী করেছিলে এবং মানব সমাজের মধ্যে তাদের বন্ধুগণ বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের মধ্যে কতক অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছে এবং তুমি আমাদের জন্য সে সময় নির্ধারিত করেছিলে, এখন আমরা তাতে উপনীত হয়েছি, সেদিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জাহান্নামই তোমাদের বাসস্থান, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে, যদি না আল্লাহ অন্য রকম ইচ্ছা করেন। তোমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত। وَكَذَلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ এভাবে আমি তাদের কৃতকর্মের জন্য যালিমদের এক দলকে অন্য দলের বন্ধু করে থাকি। ৪৯।
মানবদের মাঝে জিনদের বন্ধু কাফিররাও হবে। কেননা, গুনাহগার মুসলমানদের তুলনায় কাফিররাই জিনদের বন্ধু হওয়ার বেশি উপযোগী। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ যারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাদের অভিভাবক বানিয়েছি। ৫০। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ শয়তানদের ঈমানদারদের উপর কোন কর্তৃত্ব নেই, কেননা তারা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ . وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ निश्चय তার অভিভাবকত্ব হল, তার উপর যারা তার সাথে বন্ধুত্ব রাখে আর তারা হল মুশরিকরা।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ যারা তাকওয়ার অধিকারী হয়, তাদেরকে শয়তান যখন কু-মন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়। وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الْغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ তাদের সঙ্গী- সাথীরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ যারা তোমাদের শত্রু?
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبُ . الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ তারা শয়তানেরই দল। সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ নিশ্চয় শয়তানেরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়, যদি তোমরা তাদের কথা মত চল, তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে।
জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার দলীল
যারা বলে, জাহান্নাম অবশ্যই চিরস্থায়ী হবে, তাদের ছয়টি দলীল রয়েছে।
প্রথম দলীল: সকলে ঐকমত্য। উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কিরামের অভিমত হল, জাহান্নামের চিরন্তনত্ব ও চিরস্থায়িত্বের উপর সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈগণ বিনা মতানৈক্যে একমত। এবিষয়ের মতভেদগুলো পরবর্তীতে সৃষ্ট। তাও বিদআতী মহল হতেই উদ্ভূত
দ্বিতীয় দলীল: কুরআনুল কারীম দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, عَذَابٌ مُقِيمٌ অর্থাৎ স্থায়ী শাস্তি।
তাদের থেকে সে আযাব কখনো লাঘব করা হবে না। যেমন কুরআনের ভাষ্য, لا يُفْتَرُ عَنْهُمْ তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না। তাদের শাস্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। যেমন কুরআনের ভাষ্য, فَلَن تَزِيدَكُمْ إِلَّا عَذَابًا আমি তো তোমাদের শুধু শাস্তিই বৃদ্ধি করব।
তারা সেখানে স্থায়ী থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, خالدين فيها أَبَدً তারা সেখানে সর্বদা থাকবে। وَمَا هُم بخارجينَ مِنَ النَّارِ তারা কখনো আগুন হতে বের হতে পারবে না। وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃত হবে না। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَهُمَا عَلَى الْكَافِرِينَ আল্লাহ তা'আলাতো এ দু'টিকে হারাম করেছেন কাফিরদের জন্য।
আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمٌ الْخِيَاط তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সুঁচের ছিদ্র পথে উষ্ট্রী প্রবেশ করে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, لا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلا يُخفِّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابهَا তাদের মৃত্যুর আদেশ দেওয়া হবে না, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এ সকল আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে বুঝা যায়, জাহান্নাম চিরস্থায়ী।
তৃতীয় দলীল: হাদীসে মাশহুর দ্বারা বুঝা যায়, যাদের অন্তরে শস্য পরিমাণও ঈমান রয়েছে, তারাও জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি পাবে, কিন্তু কাফিররা নিষ্কৃতি পাবে না। শাফাআত সংক্রান্ত সকল হাদীস দ্বারা পাপী মু'মিনদের জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার বিষয়টি বুঝে আসে। তা তাদের সাথেই খাস। সুতরাং যদি কাফিররাও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পায়, তবে ঈমানদার ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য থাকে কি? আর ঈমানদারের বিশেষত্ব-ই বা রইল কোথায়?
চতুর্থ দলীল: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ মত অনুযায়ী-ই দীক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং অন্য কোন বর্ণনা ব্যতীতই আমরা শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দীক্ষা দ্বারা বুঝতে পারি, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হবে, তাঁর দীক্ষা দ্বারা জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার বিষয়টি বুঝে আসে।
পঞ্চম দলীল: সালফে সালেহীনের ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর আকীদায় এ কথাও বর্ণনা করা হয়েছে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই সৃজিত এবং সেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না; বরং সেগুলো চিরস্থায়ী। এগুলোর অস্থায়িত্বের আকীদা বিদ'আতীদের আকীদা।
ষষ্ঠ দলীল: যুক্তির নিরিখেও বুঝা যায়, কাফিররা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। মূলত: এ বিষয়টি নির্ভর করে অন্য একটি মূলনীতির উপর, তা হল, পূণ্যাত্মাকে পুণ্যের প্রতিদান করা ও পাপাত্মাকে পাপের প্রায়শ্চিত্য ভোগ করার বিষয়টি কুরআন-হাদীস ব্যতীত শুধুমাত্র যুক্তির আলোকে বুঝা সম্ভব, নাকি কুরআন হাদীস ব্যতীত বুঝা সম্ভব নয়? এ ব্যপারে দু'টি মত রয়েছে। একটি হল, কুরআন হাদীস হতে শ্রুত দলীলের সাথে সমন্বয় করে যুক্তির নিরিখেও এটা বুঝা সম্ভব। কুরআন কারীমের কয়েক স্থানে এরূপ বিবৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা সে সকল লোকের ধারণাকে খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, নেককার ও বদকারদের জীবন ও মৃত্যু সমপর্যায়ের। আল্লাহ তা'আলা তাদের ধারনাকে খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুককে অনর্থক সৃষ্টি করেছেন। তারা স্বীয় প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না। তাদের ধারনাকেও আল্লাহ তা'আলা খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, তাদেরকে এমনিতেই রেখে দেওয়া হবে অথবা কোন সাওয়াবও দেওয়া হবে না, আযাবও দেওয়া হবে না। অথচ এমন ধারণা তাঁর প্রজ্ঞা ও পূর্ণতাকে ত্রুটিযুক্ত করার নামান্তর। সুতরাং তাঁর প্রতি এ ধারণা পোষণ করার কোন অবকাশ নেই। তারা কখনো কখনো এ কথা স্বীকার করে, মানবাত্মা অবশিষ্ট থাকবে আর মানবাত্মার আকীদা-বিশ্বাস ও সিফাত এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কখনো সেগুলো তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। সে সকল আত্মা এ ভুল আকীদা ও বিশ্বাস রাখার দরুন তারা যে শাস্তির সম্মুখীন হবে, সে জন্য তারা লজ্জিত হবে। কিন্তু এ ভুল আকীদা পোষণ করা বা ভুল সিফাত ধারণ করার কারনে তারা লজ্জিত হবে না; বরং আযাব তুলে নিলে তারা পুনরায় পূর্বের আকীদাই পোষণ করবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَتَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَالَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
তুমি যদি দেখতে, তাদেরকে যখন আগুনের পার্শ্বে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা বলবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত, তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না, আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। بَلْ بَدَا لَهُمْ مَا كَانُوا يُخْفُونَ مِنْ قَبْلُ وَلَوْرُدُّوا لَعَادُوا لِمَا / 2017 acha wa نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ . না, তারা পূর্বে যা গোপন করত, তা এখন তাদের নিকট প্রকাশ পেয়েছে। আর তারা প্রত্যাবর্তিত হলেও যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, পুনরায় তারা তাই করত এবং নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।
সুতরাং তারা শাস্তি ভোগ করার পরও তাদের শাস্তির কারণ ও তাদের শাস্তির সম্মুখীনকারী বিষয় তাদের হতে বিদূরিত করা হবে না; বরং তাদের নষ্টামি ও কুফরী তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। ফলে তাদেরকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠালেও তারা পূর্বের ন্যায় কুফরীই করবে। এর দ্বারা বুঝা যায়, যুক্তিরও দাবী হল, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকবে, যেমনিভাবে কুরআন- হাদীস হতে শ্রুত দলীল দ্বারা বুঝা যায়।
দ্বিতীয় পক্ষ, যারা জাহান্নামের অস্থায়িত্ব ও এক সময় ধ্বংস হওয়ার প্রবক্তা তারা উক্ত প্রমাণাদির উত্তরে বলে, এই প্রমাণগুলো আলোচনার মাধ্যমে অসার হয়ে যাবে।
প্রথম দলীলের জবাব: তারা বলে, তোমরা যে ইজমার কথা বর্ণনা করছ, মূলত: তার কোন হাদীস নেই। এ মাস'আলাতে মতবিরোধ সম্পর্কে অবহিত না হওয়াকেই তোমরা ইজমা বলে ধারণা করেছ, অথচ এ মাস'আলাতে পূর্বাপর সব যুগেই মতবিরোধ চলেই আসছে। এমনি এ মাস'আলাতে ইজমার দাবীদারকে দশজন বা তার চেয়েও কম সংখ্যক সাহাবী হতে তাদের দাবীর সপক্ষে বর্ণনা উপস্থাপন করতে বলা হলে তারা সক্ষম হবে না, অথচ আমরা আমাদের মতের পক্ষে সাহাবায় কিরাম হতে একাধিক সুস্পষ্ট বর্ণনা উপস্থাপন করেছি।
দ্বিতীয় দলীলের জবাব: দ্বিতীয় দলীলের জবাবে তারা বলে, তোমরা বলেছ, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার ও ধ্বংস না হওয়ার ব্যাপারে কুরআন কারীমের ভাষ্য রয়েছে। কিন্তু কুরআন কারীমের এমন দলীল কোথায় আছে? হ্যাঁ, কুরআন কারীমে রয়েছে, কাফিররা জাহান্নামে সর্বদা থাকবে। তাদেরকে তা হতে কখনো নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না। তাদের শাস্তি কখনো লাঘব করা হবে না। তারা সেখানে মৃত্যুবরণ করবে না। তারা সর্বদা আযাবে থাকবে। আর জাহান্নামের আযাব তাদের জন্য আবশ্যকীয়। এ সকল বিষয়ে সাহাবা ও তাবেঈদের মাঝে কোন মতবিরোধ নেই। এটা আমাদের বিরোধিত বিষয়ও নয়। আমাদের বিরোধিত বিষয় হল, জাহান্নام চিরস্থায়ী না কি ধ্বংসশীল! কিন্তু উল্লিখিত বিষয়গুলি দ্বারা বুঝা যায় না, জাহান্নাম চিরস্থায়ী। বরং এর দ্বারা বুঝা যায়, জাহান্নাম যতদিন থাকবে, ততদিন তারা শাস্তি ভোগ করবে এবং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না ইত্যাদি। অর্থাৎ জাহান্নাম বিদ্যমান থাকাবস্থায় তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না, যেমনিভাবে পাপী মু'মিনদেরকে জাহান্নাম বিদ্যমান থাকাবস্থায়ই নিষ্কৃতি দেওয়া হবে। এদের উপমা হল, সেই দুই বন্দীর ন্যায়, যাদের একজনকে জেলখানা বিদ্যমান থাকাবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আর অপরজনকে জেলখানা ধ্বংস হওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় দলীলের জবাব: আপনারা হাদীসে মাশহুর দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, কবীরাহ গুনাহতে লিপ্ত মুমিন ব্যক্তি জাহান্নام হতে মুক্তি পাবে কিন্তু মুশরিকরা নিষ্কৃতি পাবে না। এটা সঠিক ও এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর দ্বারাও কেবল মাত্র তা-ই বুঝা যায়, যা আমরা ইতোপূর্বে বলেছি অর্থাৎ পাপী ঈমানদাররা জাহান্নام বিদ্যমান থাকাবস্থায়ও তা হতে নিষ্কৃতি পাবে। কিন্তু মুশরিকরা জাহান্নাম যতদিন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন সেখানে অবস্থান করবে।
চতুর্থ দলীলের জবাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দীক্ষা দ্বারা বুঝা যায়, কাফিররা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কথার উপর দলীল পেশ করা, জাহান্নام চিরস্থায়ী, এটা সঠিক নয়।
পঞ্চম দলীলের জবাব: জান্নাত ও জাহান্নام সৃষ্টি করা হয়ে গেছে এবং এগুলো কখনো ধ্বংস হবে না। এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা। এতে কোন সন্দেহ নেই আর উভয়টা ধ্বংস হওয়ার আকীদা নিশ্চয়ই বিদ'আতীদের, জাহমিয়াদের ও মু'তাযিলাদের আকীদা। সাহাবা, তাবেঈন ও আইম্মায়ে ইসলাম কেউ এরূপ মত পোষণ করেননি। কিন্তু শুধু জাহান্নام ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে আমরা কতিপয় সাহাবা ও তাবেঈদের মত উল্লেখ করেছি। সুতরাং সাহাবা ও তাবেঈদের মত উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তা বিদ'আতীদের আকীদা কিভাবে বলা যেতে পারে? জান্নাতের স্থায়িত্ব ও জাহান্নামের অস্থায়িত্ব; এভাবে দু'ভাগ করে অভিমত কোনো বিদআতী মহল থেকে শুনা যায়নি।
যুক্তিঋদ্ধ দলীলের জবাব: আপনারা জাহান্নামীদের চিরস্থায়ী হওয়ার উপর যুক্তির আলোকে যে দলীল পেশ করেছেন, তার উত্তর হল, এটি যুক্তির ঊর্ধ্বে র বিষয়ে যুক্তি প্রয়োগের জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি এমন একটি মাসআলা; যা যুক্তি দিয়ে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না এ বিষয়ে মহান রাসূল হতে সুস্পষ্ট ঘোষাণা বা বিবৃতি না আসে। তবে হ্যাঁ, এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, সেটি হল, ছাওয়াব ও আযাবের যোগ্য হওয়ার বিষয়টি কুরআন হাদীসে শ্রুত দলীলের সাথে সাথে যুক্তি দ্বারাও বুঝা সম্ভব কিনা? এ ব্যাপারে চার ইমাম ও তাদের অনুসারীগণ এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের থেকে দু'টি মত পাওয়া যায়। তবে বিশুদ্ধতম বিষয় হল, যুক্তির নিরিখে সমষ্টিগতভাবে বুঝা যায়, কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং ছাওয়াব ও আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু এর দ্বারা বিস্তারিত কিছুই জানা যায় না; বরং তা একমাত্র কুরআন হাদীসে বর্ণিত দলীল দ্বারাই জানা সম্ভব।
সুতরাং কুরআন-হাদীসের দলীল দ্বারা জানা যায়, নেককার লোকদের ছাওয়াব তথা প্রতিদান স্থায়ী হবে আর পাপী ঈমানদের শাস্তি স্থায়ী হবে না; বরং এক সময় তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু মুশরিকদের ব্যাপারে স্থায়ী হওয়া বা সমাপ্তি ঘটা এই বিষয়টি হচ্ছে বিতর্কের প্রতিপাদ্য। কাজেই কুরআন হাদীসের ভাষ্য যে দলের পক্ষে যাবে, সে দলই সঠিক ও বিজয়ী রূপে সৌভাগ্যবান হবে।
টিকাঃ
৪০৬. সূরা হুদ, আয়াত ১০৮
৪০৯. বুখারী-খ. ২ পৃ. ৬৯১ মুসলিম, খ. ২ পৃ. ৩৮২
৪৩৮. সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৯
৪৩৯. সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭
৪৪১. সূরা বাকারা, আয়াত: ৮০-৮১
৪৪২. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৪
৪৪২. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৪
৪৪৩. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৬৭
৪৪৪. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৪৪৫. সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২২
৪৪৬. সূরা সাজদাহ, আয়াত: ২০
৪৪৭. সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬
৪৪৮. সূরা আরাফ, আয়াত: ৪০
৪৪৯. সূরা আনআম, আয়াত: ১২৮-১২৯
৪৫০. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২৭
৪৫১. সূরা আরাফ: আয়াত: ২০১-২০২
৪৫২. সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫০
৪৫৩. সূরা নিসা, আয়াত: ৭৬
৪৫৪. সূরা. মুজাদালাহ, আয়াত ১৯
৪৫৫. সূরা আন'আম, আয়াত: ১২১
৪৫৯. সূরা আনআম, আয়াত: ২৭-২৮
📄 সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে
সহীহায়নে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সে ব্যক্তি সম্পর্কে জানি, যে সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাবে ও সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। সে ব্যক্তি নিতম্ব হেঁচড়িয়ে হেঁচড়িয়ে জাহান্নام থেকে বের হবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, যাও, বেহেশতে প্রবেশ কর। সে তখন জান্নাতের নিকট এসে মনে করবে, জান্নাত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সে ফিরে গিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো জান্নাত পরিপূর্ণ পেলাম। (অর্থাৎ আমার জন্য সেখানে স্থান কোথায়?) আল্লাহ তা'আলা তাকে পূনরায় বলবেন, যাও, গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। সে জান্নাতের নিকট গেলে তার মনে এ ধারণাই জাগবে। ফলে সে পুনরায় ফিরে গিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো তা পরিপূর্ণ পেলাম। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় তাকে বলবেন, যাও, গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমার জন্য দুনিয়া ও তদপেক্ষা দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। অথবা তিনি বলেছেন, তোমার জন্য পৃথিবীর দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমার সাথে কি উপহাস করছেন? অথচ আপনি হলেন, অধিপতি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি এ দৃশ্য বর্ণনা কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ হাসতে দেখেছি, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী।
সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ যার রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সে ব্যক্তি সম্পর্কে জানি, যে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে ও সর্বশেষ জাহান্নام হতে নিষ্কৃতি পাবে। সে হবে ঐ ব্যক্তি, যাকে কিয়ামত দিবসে আনা হবে এবং বলা হবে, তার ছোট ছোট গুনাহগুলো সামনে উপস্থিত কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো তুলে নাও। তখন তার ছোট ছোট গুনাগুলো উপস্থিত করা হবে। তাকে বলা হবে, তোমার কি স্মরণ আছে, তুমি অমুক দিন অমুক কাজ করেছ? সে বলবে, হ্যাঁ। তার অস্বীকারের কোন ক্ষমতা থাকবে না; বরং সে এ জন্য ভীত থাকবে, তার বড় গুনাহগুলো তার সামনে উপস্থিত করা হবে কিনা। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমার প্রত্যেক পাপের বিনিময়ে রয়েছে নেকী। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমার তো আরো আমল রয়েছে, যা আমি এখানে দেখছি না। (অর্থাৎ সে বলবে, আমার তো আরো গুনাহ রয়েছে) হযরত আবূ যারর রা. বলেন, এ কথা বর্ণনা কালে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ পরিমাণ হাসতে দেখেছি, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি সে, যে ঐ শিশুর ন্যায় হবে, যাকে তার পিতা প্রহার করার কারণে পলায়ন করেছে, সে পুলসিরাতের উপর দিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে উপস্থিত হবে আর সে তার আমলের কারণে পলায়ন করার শক্তি হারিয়ে ফেলবে। সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমাকে যদি আমি জাহান্নام থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেই, তাহলে কি তুমি তোমার সকল গুনাহ-এর স্বীকারোক্তি করবে? সে বলবে, হে প্রভু! তোমার বড়ত্ব ও ইযযতের শপথ! যদি আপনি আমাকে জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান, তবে আমি আপনার সামনে আমি আমার সকল প্রকার গুনাহ ও ত্রুটির স্বীকারোক্তি করব। অতঃপর সে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে ও মনে মনে বলতে থাকবে, যদি আমি আমার গুনাহ ও ত্রুটির স্বীকারোক্তি দেই, তাহলে তিনি আমাকে পুনরায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি আমার সামনে তোমার গুনাহের স্বীকারোক্তি দাও, আমি তোমার সে গুনাহ ক্ষমা করে দিব। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার বড়ত্ব ও বুযুর্গির শপথ! আমি কখনো কোন গুনাহ করিনি, কখনো কোন অন্যায় করিনি। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তোমার বিরুদ্ধে আমার নিকট সাক্ষী রয়েছে। সে ডানে-বামে তাকিয়ে কাউকে না দেখে বলবে, আমাকে সাক্ষী দেখান। আল্লাহ তা'আলা তখন তার ত্বককে বাক শক্তি দান করবেন, যা তার ছোট ছোট গুনাহগুলো প্রকাশ করবে। এ অবস্থা দেখে সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনার সত্ত্বার শপথ! আমার তো এর চেয়ে বড় বড় পাপ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমার থেকে অধিক অবগত। সুতরাং আমার সামনে তুমি সেগুলো স্বীকার করে নাও, আমি তোমার সে গুনাহগুলো ক্ষমা করে তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেব। তখন তার গুনাহের স্বীকারোক্তি দিলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিবেন। এ ঘটনা বর্ণনা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পরিমাণ হাসলেন, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঐ ব্যক্তিই হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী। তাহলে সর্বোচ্চ স্তরের অবস্থা কিরূপ হবে?
সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী ঐ ব্যক্তি, যে পুলসিরাতের উপর দিয়ে চলতে থাকবে আর একটু পরপর মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। কখনো অগ্নি তার নিকট এসে পড়বে। সে যখন পুল অতিক্রম করে চলে যাবে, তখন সে তার দিকে তাকিয়ে বলবে, বরকতপূর্ণ সে সত্তা, যিনি আমাকে নাজাত দিয়েছেন। তিনি আমাকে এমন বস্তু দান করেছেন, যা পূর্বাপর কাউকে দান করেননি। তার সামনে তখন একটি বৃক্ষ উপস্থাপিত হলে সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিন, যাতে আমি তার ছায়ায় বসতে পারি ও তা হতে পানি পান করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, আমি তা দিলে তুমি এটা ব্যতীত অন্য কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে অঙ্গীকার করে বলবে, 'না' আমি এর অধিক আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার এ আবেদন পূর্ণ করবেন। কেননা তিনি জানেন, সে আর ধৈর্য রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন। সে ঐ বৃক্ষের ছায়ায় বসবে এবং তার হতে পান করবে। অতঃপর তার সামনে আরো সুন্দর একটি বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে তার নিকটবর্তী করে দিন, যেন তার ছায়ায় বসতে পারি এবং তার রস হতে পান করতে পারি। আমি আপনার নিকট আর কিছুই প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, কেন? তুমি তো আমার সাথে অঙ্গীকার করেছ, আমার নিকট এর চেয়ে অধিক আর কিছুই প্রার্থনা করবে না। তিনি আরো বলবেন, আমি তোমাকে এটা দিলে তুমি তো আমার নিকট অন্য কিছু প্রার্থনা করবে। সে পুনরায় অঙ্গীকার করবে, আমি এর চেয়ে আপনার নিকট আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার ওয়াদা ভঙ্গের ওযর কবুল করে নিবেন। কেননা তিনি জানেন, সে এ ব্যাপারে ধৈর্য রাখতে পারছে না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন। সে তার ছায়া গ্রহণ করবে ও তার রস পান করবে। অতঃপর তার সামনে বেহেশতের দরযার নিকটবর্তী একটি বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে, যা পূর্বোক্ত বৃক্ষ দু'টি অপেক্ষা উত্তম ও মনোরম। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষটির নিকটবর্তী করে দিন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আমি আপনার নিকট এটা ব্যতীত আর কিছুই প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, কেন? তুমি না আমার সাথে অঙ্গীকার করেছিলে, আর কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে না। সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এটা দান করুন, এরপর আর কিছু আপনার নিকট প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার অঙ্গীকার ভঙ্গের ওযর গ্রহণ করবেন, কেননা, তিনি জানেন, সে এ ব্যাপারে ধৈর্য রাখতে সক্ষম না। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন।
সে ব্যক্তি বৃক্ষের নিকটবর্তী হলে জান্নাতীদের আওয়ায শুনে বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, হে বান্দা! আমার পক্ষ হতে কি পেলে তুমি তৃপ্ত হবে? তোমাকে দুনিয়ার চেয়ে দশগুণ বড় জান্নাত দান করলে তুমি কি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হবে? সে বলবে, হে প্রভু! আপনি কি আমার সাথে উপহাস করেছেন? অথচ আপনি হলেন রাব্বুল আলামীন। এ পর্যন্ত বর্ণনা করে হযরত ইবনে মাসউদ হেসে উঠে বললেন, তোমরা আমাকে হাসার কারণ কেন জিজ্ঞেস করছ না? শ্রোতাগণ তখন জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন হাসছেন? তিনি বললেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এ স্থানে হেসেছেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে কেন হাসলেন? তিনি বললেন, ঐ লোকটির এ কথা বলার কারণে আল্লাহও হেসে উঠবেন। আল্লাহর হাসির কারণে আমারও হাসি পেয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না; বরং আমি যা চাই, তা-ই করতে সক্ষম।
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বাপেক্ষা কম আযাবে নিপতিত জাহান্নামী হল সে ব্যক্তি, যাকে অগ্নিজুতা পরিধান করানো হবে। সে জুতার তাপে তার মস্তিষ্ক স্ফুটিত হতে থাকবে আর সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তি হল সে, যাকে আল্লাহ তা'আলা দোযখের দিক থেকে ফিরিয়ে জান্নাত অভিমুখী করে দিবেন ও ছায়াযুক্ত বৃক্ষ তার সামনে উপস্থাপন করা হবে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে উক্ত বৃক্ষের নিচে অবস্থান দিন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি যদি তোমাকে তার ছায়াতে অবস্থান দেই, তবে তুমি আরো প্রার্থনা করতে থাকবে। সে বলবে, আপনার ইয্যত ও বুযুর্গীর শপথ! আমি আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিচে অবস্থান করে দিবেন। তখন তার সামনে ছায়াদার একটি ফল বিশিষ্ট বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে, সে তা দেখে বলবে, হে প্রভু! আমাকে উক্ত বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিন, যাতে আমি তার ছায়া ও ফল লাভ করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমাকে তা প্রদান করলে হয়ত আরো কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ, আমি আপনার নিকট এর চেয়ে অধিক আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। অতঃপর তার সামনে ছায়াদার ফল বিশিষ্ট ও পানি বিশিষ্ট অপর একটি বৃক্ষ উপস্থিত করা হবে। সে তা দেখে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষটির নিকট পৌঁছিয়ে দিন, যাতে আমি তার ছায়ায় অবস্থান করতে পারি, ফল খেতে পারি ও পানি পান করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমাকে এটা দান করলে তুমি অন্য কিছু হয়ত আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ! এটা ব্যতীত অন্য কিছু আর প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে তখন সে বৃক্ষের নিকট পৌছিয়ে দেবেন। তার সামনে তখন জান্নাত দৃশ্যমান হলে সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে জান্নাতের দরযায় নিয়ে যান, যাতে আমি জান্নাতের অলিন্দে অবস্থান করতে পারি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, تحت نجاف الجنة انظر إلى أهلها অর্থাৎ যাতে আমি জান্নাতের অলিন্দের নিচে অবস্থান করতে পারি ও তার অধিবাসীদের দেখতে পাই। আল্লাহ তা'আলা তাকে সেখানে পৌছে দেবেন, সে তখন জান্নাতীদেরকে ও জান্নাতস্থ সব কিছু দেখতে পেয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবেন। তখন সে বলবে, এটা আমার। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি তোমার আকাংখা ব্যক্ত কর। সে তার আকাংখা তখন ব্যক্ত করতে থাকবে আর আল্লাহ তা'আলা তাকে আরো আশা আকাংখার কথা স্বরণ করিয়ে দেবেন, এটাও প্রার্থনা কর। সে তার আকাংখা ব্যক্ত করা সমাপ্ত করলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি এগুলো সহ আরো দশগুণ বেশি পাবে। তখন সে আপন বাসভবনে প্রবেশ করলে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট দু'জন হুর এসে বলবে, الحمد لله الذي احياك لنا واحيانا لك সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য; যিনি আমাদের জন্য তোমাকে এবং তোমার জন্য আমাদেরকে জীবন দান করেছেন। সে তখন বলবে, ما اعطي مثل ما اعطيت আমাকে যে পরিমাণ দান করা হয়েছে, অন্য কাউকে সে পরিমাণ দান করা হয়নি।
সহীহ মুসলিমে হযরত মুগীরাহ ইবনে শু'বা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হযরত মূসা আ. স্বীয় প্রভুর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, সর্ব নিম্নস্তরের জান্নাতী ব্যক্তি কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, সকল জান্নাতী জান্নাতে প্রবেশ করার পর এক ব্যক্তি আসবে। তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে, হে প্রভু! কিভাবে জান্নাতে প্রবেশ করব। সকলেই তো স্বীয় অবস্থান গ্রহণ করে ফেলেছে। যা কিছু নেওয়ার সব নিয়েছে। তাকে তখন বলা হবে, দুনিয়ার কোন বাদশাহকে যে পরিমাণ প্রাচুর্য দান করা হয়েছে, তোমাকে সে পরিমাণ দান করলে তুমি সন্তুষ্ট তো? সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি এতেই সন্তুষ্ট। তাকে তখন বলা হবে, তোমার জন্য এটা ও এর সমপরিমাণ। এটা ও এর সমপরিমাণ। এটা ও এর সমপরিমাণ। এভাবে পঞ্চমবার বলার পর সে বলবে, হে প্রভু আমার! আমি এতেই সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, তোমার জন্য এটা ও এর দশগুণ রয়েছে। তোমার মন যা চায়, তোমার চক্ষু যার দ্বারা শীতল হয়, সবই তোমার জন্য রয়েছে। সে তখন বলবে, হে প্রভু আমার! আমি সন্তুষ্ট। (এ হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতেী) হযরত মূসা আ. পুনরায় প্রশ্ন করলেন, সর্বোচ্চ মর্যাদার জান্নাতী কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, সর্বোচ্চ মর্যাদার জান্নাতী হল সে, যার জন্য আমি নিজ হাতে সম্মানের বৃক্ষ রোপন করেছি ও তাতে মোহর এঁটে দিয়েছি। যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, কোন কর্ন শ্রবন করেনি এবং কোন মানব হৃদয়ে যারে কোন কল্পনা কখনো উঁকি দেয়নি। আল্লাহ তা'আলার বাণী فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةَ أَعْيُنِ এর ভাবার্থও তাই, কেউ জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃত কর্মের পুরস্কার স্বরূপ।
টিকাঃ
৪৮০. বুখারী: খ:২ পৃ: ৯৭২, মুসলিম: খ: ১ পৃ: ১০৫
৪৬১. খ: ১ পৃ: ১০৬
৪৬২. খ: ১ পৃ: ১০৫
৪৬৩ খ. ১, পৃ. ১০৬
📄 কতিপয় টুকরো বিষয়
জান্নাতীদের ভাষা
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ.স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করলে তাদের শারীরিক কাঠামো আদম আ.- এর অবয়বের ন্যায় ফিরিশতাদের ষাট হাত বরাবর হবে। সৌন্দর্য হবে হযরত ইউসুফ আ.-এর ন্যায়। বয়স হবে হযরত ঈসা আ.-এর ন্যায় ৩৩ বছর। তাদের ভাষা হবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ন্যায়। (অর্থাৎ আরবী ভাষা) তারা হবে শ্মশ্রু বিহীন, লোমবিহীন এবং কাজল কালো আঁখি বিশিষ্ট। দাউদ ইবনে হুসাইন রহ. ইকরিমাহ রা. এর সূত্রে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন لسان أهل الجنة عربي জান্নাতীদের ভাষা হবে আরবী। আকীল রহ. যুহরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতীদের ভাষা হবে আরবী।
জান্নাত ও জাহান্নামের পরস্পরে বড়ত্ব প্রকাশ
সহীহায়নে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নام পরস্পরে বড়ত্ব প্রকাশ করবে। জাহান্নাম গৌরব করে বলতে থাকবে, আমার মধ্যে বড় বড় অহংকারী ও পরাক্রমশালীরা প্রবেশ রবে। আর জান্নাত বলবে, আমার মধ্যে দুর্বল আর নিঃস্ব ব্যক্তিরা প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা'আলা তখন জাহান্নামকে লক্ষ্য করে বলবেন, তুমি হলে আমার শান্তি। আমি যাকে ইচ্ছা তোমার দ্বারা শান্তি দেব। আর জান্নাতকে লক্ষ করে বলবেন, তুমি আমার রহমত। আমি যাকে ইচ্ছা তাকে তোমার মাধ্যমে রহম করব। তোমাদের উভয়কেই আমি পরিপূর্ণ করব।
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাত ও জাহান্নام উভয়ে একে অপরের উপর বড়ত্ব প্রকাশ করবে, তখন জাহান্নام বলতে থাকবে, অহংকারী ও বড় বড় পরাক্রমশালীদের মাধ্যমেই আমাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জান্নাত বলবে, আমার মধ্যে শুধু দরিদ্র, নিঃস্ব, দুর্বল ও নিম্ন শ্রেণীর লোকদেরই প্রবেশ করানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তখন জান্নাতকে বলবেন, তুমি হলে আমার রহমত, আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকে আমি তোমার দ্বারা দয়া করব। আর জাহান্নامকে বলবেন, তুমি হলে আমার আযাব। তোমার মাধ্যমে আমি যাকে ইচ্ছা সাজা দিব। তোমাদের প্রত্যেককেই আমি পরিপূর্ণ করে দিব। জাহান্নাম পরিপূর্ণ না হলে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কদম তাতে রাখবেন। তখন সে বলবে, যথেষ্ট, আর নয়। তার একাংশ অপর অংশে প্রবিষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুকের কারো প্রতি যুলুম করবেন না। আর জান্নাতের জন্য আল্লাহ তা'আলা আরো মানুষ সৃষ্টি করবেন।
একমাত্র জান্নাতেরই শূন্যস্থান পূরণে নব সৃষ্টির উন্মেষ
সহীহায়নে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামে একাধারে জাহান্নامীদের নিক্ষেপ করা হবে, সে তখন বলতে থাকবে, هَلْ مِنْ مَزِيْدٍ আরো আছে কি? আল্লাহ তা'আলা এক পর্যায়ে তার উপর আপন কদম রাখবেন, যার ফলে তার একাংশ অপর অংশের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে যাবে আর তা বলতে থাকবে, আপনার ইয্যত ও দয়ার শপথ! যথেষ্ট, আর নয়। তদ্রূপ জান্নাতে তেমনি স্থান অবশিষ্ট থেকে যাবে। আল্লাহ তা'আলা নতুন মানব সৃষ্টি করে সে স্থানে তাদেরকে প্রবেশ করাবেন।
মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে এরূপ রয়েছে, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা মোতাবেক জান্নাতের স্থান অবশিষ্ট থেকে যাবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য নব মানব সৃষ্টি করে তাদেরকে সেখানে অবস্থান করাবেন।
মুসলিম শরীফের অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার পরিমাপ মত কিছু স্থান শূন্য থেকে যাবে।
সহীহ বুখারীতে হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসে এভাবে বর্ণিত রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে ইচ্ছা, জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করবেন ও তাদেরকে সেখানে নিক্ষেপ করবেন। আর জাহান্নام বলতে থাকবে, هَلْ من مزید আরো অধিক আছে কি? উক্ত বর্ণনায় কোন বর্ণনাকারী হতে ভুলক্রমে শব্দ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যাকে সহীহ হাদীস ও কুরআনের আয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন, তিনি জাহান্নامকে ইবলীস ও তার অনুসারীদের দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন। لاملئن جهنم منك ومن تبعك منهم اجمعين (আমি তোমার ও তোমার অনুগামীদের দ্বারা জাহান্নامকে পরিপূর্ণ করে দিব) তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা শুধু মাত্র তাদেরকেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত রাসূলদের অবাধ্যতার কারণে তাদের জাহান্নামী হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ قَالُوا بَلَى قَدْ جَاءَنَا نَذِيرٌ فَكَذَّبْنَا وَقُلْنَا مَا نَزَّلَ اللَّهُ مِنْ شَيْ তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের নিকট কি সতর্ককারী আসেনি? তারা বলবে, অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী এসেছিল। আমরা তাদেরকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছিলাম আর বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেননি।
আল্লাহ কাউকে বিনা অপরাধে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করে তার উপর যুলুম করতে পারেন না।
জান্নাতীরা নিদ্রা যাবে না
ইবনে মারদাওয়ায়হ রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, النوم اخو الموت অর্থাৎ নিদ্রা মৃত্যু তুল্য وأهل الجنة لا ينامون আর জান্নাতীরা নিদ্রা যাবে না।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হয়েছে, জান্নাতীরা কি নিদ্রা যাবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিদ্রা হল মৃত্যু তুল্য। সুতরাং জান্নাতীরা নিদ্রা যাবে না।
নিম্নস্তর থেকে জান্নাতীর ঊর্ধ্ব স্তরে আরোহণ
ইমাম আহমদ রহ.' স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেনঅ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان الله ليرفع الدرجة للعبد الصالح في الجنة নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে তাঁর নেককার বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকবেন। فيقول يارب انى لي هذه সে বলবে, হে প্রভু! কিসের বিনিময়ে আমার এ প্রাপ্তি? باستغفار ولدك لك আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ইস্তিগফারের বিনিময়ে তুমি এটা লাভ করেছ।
মু'মিনদের সন্তানদেরকে তাদের সমপর্যায়ের মর্যাদা প্রদান করা হবে, যদিও তারা সে পরিমাণ আমল না করে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانِ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে। وَمَا أَكْتَنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ এবং তাদের কর্ম ফল আমি কিছু মাত্র হ্রাস করব না, *كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।
কায়েস রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সন্তানদেরকে তাদের মর্যাদা ও স্তরে উন্নীত করবেন। যদিও তাদের সন্তানরা তাদের তুলনায় নিম্নস্তরের হয়। তাদের সাথে তাদের সন্তানের মিলন ঘটাবেন। যেন উপরের স্তরের মু'মিনগণ তাদের নিম্নস্তরের সন্তানদের মাধ্যমে তাদের চক্ষু শীতল করতে পারে। এরপর হযরত ইবনে আব্বাস রা. এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بإيمان أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ . ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছু হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।
ইবনে মারদাওয়ায়হ স্বীয় তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশের পর স্বীয় মাতা-পিতা, 'স্ত্রী-পরিজন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাকে বলা হবে, তারা তোমার সমপর্যায়ের জান্নাত লাভ করতে সক্ষম হয়নি। তখন সে বলবে, আমি আমার জন্য ও তাদের জন্য আমল করেছি। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস রা. উক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। ذُرِّيَّتُهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান নাকি প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান? এ ব্যাপারে মুফাস্সিরীনে কিরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি মত রয়েছে।
প্রথম মত: একদল মুফাস্সির বলেন, আয়াতের অর্থ হল, ঐ সকল লোক, যারা নিজেরা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও তাদের অনুগামী হয়েছে। সাথে সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের সমপরিমাণ ঈমানসহ পরকালে এসেছে। তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি তাদেরকে তাদের পিতাদের সমপর্যায়ে উন্নীত করব। যারা وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ এর মধ্যে ذُرِّيَّة ক্রিয়ার কর্তা )فعل-এর فاعل( সাব্যস্ত করেছেন, তাদের কিরাত এ মতকে সমর্থন করে।
তারা বলেন, ذُرِّيَّة শব্দটি শুধু মাত্র অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ক্ষেত্রেও শব্দটি প্রযোজ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَمِن ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ এবং তার বংশধর হল দাউদ এবং সুলাইমান।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, ذُرِّيَّة منْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ হেতাদের বংশধর! যাদেরকে নূহের সাথে আরোহণ করিয়েছিলাম। আল্লাহ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِّن بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর, তবে কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের কারণে তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এটি অত্যন্ত জ্ঞানী লোকদের মত।
তারা বলেন, ইবনে আব্বাস রা.-এর মারফু বর্ণনা দ্বারা এ মতের শক্তিশালী সমর্থন পাওয়া যায়। যে হাদীসে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা মু'মিন বান্দাদের সন্তানদেরকে তাদের সমপর্যায়ে উন্নীত করবেন। যাতে তারা তাদের মাধ্যমে নিজেদের চক্ষুকে শীতল করতে পারেন। উক্ত বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, তারা জান্নাতে যাবে নিজেদের নেক আমলের কারণেই। কিন্তু তাদের মর্যাদা তাদের পিতাদের সমপর্যায়ের হবে না। তবে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের পিতাদের সমপর্যায়ে উন্নীত করবেন। যদিও তাদের আমল এর চেয়ে কম হয়। তারা এও বলেন, ঈমান হল তিন বিষয়ের সমন্বয়ের নাম। এক, মুখের স্বীকৃতি, দু'ই, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা মুখে স্বীকৃত বিষয়ের বাস্তবায়ন, তিন, নিয়্যাত।
এ সমন্বিতকাজ প্রাপ্ত বয়স্কদের মাধ্যমেই হতে পারে। সে হিসাবে আয়াতের অর্থ হবে, আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সন্তানদেরকে তাদের সাথে একত্রিত করবেন, যদি তারাও তাদের পিতাদের ন্যায় ঈমান আনয়ন করে থাকে, কেননা, বাস্তব অনুগামী তো এটাই। ঈমানের সাথে আমলও তাদের পিতাদের ন্যায় হবে, যদিও তাদের ঈমান তাদের পিতাদের ঈমান অপেক্ষা দুর্বল হয়। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পুরুষদের সাথে একত্রিত করবেন, যেন তারা তাদের মাধ্যমে নিজেদের চক্ষু শীতল করতে পারে ও তাদের নিআমতের পূর্ণতা লাভ হয়। এটা তেমনি, যেমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র পত্নীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথেই থাকবেন, যদিও তারা নিজেদের আমল দ্বারা এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম নন। (কেননা, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমল পরিমাণ কারো আমল হতে পারে না।)
দ্বিতীয় অভিমত: অন্য এক দল মুফসসির বলেন, এ আয়াতে ذُرِّيَّة দ্বারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান উদ্দেশ্য। সুতরাং এ হিসাবে আয়াতের অর্থ হল, যারা ঈমান এনেছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের অনুগামী করে দিয়েছি। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের পিতাদের সাথে একত্রিত করে দেব আর এ কথা বিদিত, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরকেই কেবল ধর্মের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুগামী মনে করা হয়। দুনিয়াবী হুকুমের ক্ষেত্রেও তারা তাদের পিতা-মাতার অনুগামী, যেমন তাদের উপর জানাযার নামায পড়া হয়, তাদেরকে মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা হয় ইত্যাদি।
উলামায়ে কিরাম বলেন, উক্ত অভিমতটি নিম্নের যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায়। যুক্তিাট হল, পাপ-পুণ্যের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। সুতরাং তাকে কারো অনুগামী বলা যায় না। তারা দুনিয়াবী হুকুমের ক্ষেত্রেও পিতা-মাতার অনুগামী নয়, ছাওয়াব-শাস্তির ক্ষেত্রেও পিতা-মাতার অনুগত নয়। কেননা, তারা তো স্বতন্ত্র। (তারা স্বাধীন, অনুগত নয়) আর যদি ذرية দ্বারা প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান উদ্দেশ্য নেওয়া হয়, তাহলে তো সাহাবাদের সন্তান সাহাবীদের স্তরের হওয়া আবশ্যক হয়ে যাবে। তাবেঈদের সন্তানও তাবেঈদের সমস্তরের হয়ে যাবে। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। যার ফলে পরবর্তী প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের সমস্তরের হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে।
উলামায় কিরাম বলেন, এ মতের পক্ষে দ্বিতীয় যুক্তি হল, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পুরুষদের অনুগামী করেছেন স্তরের দিক থেকে, যেমনিভাবে অনুগামী করেছেন ঈমানের ক্ষেত্রে। সুতরাং তারা যদি প্রাপ্ত বয়স্ক হত, তবে তো তারা ঈমানের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুগামী হত না; বরং তারা স্বাধীন হত।
উলামায়ে কিরাম বলেন, এ মতের পক্ষে তৃতীয় যুক্তি হল আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে বিভিন্ন স্তর সৃষ্টি করেছেন। সে লোকদের আমল মোতাবেক, যারা ঈমানের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আর যারা তাদের অনুগামী। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা অনুগতদেরকে অনুসৃতদের মর্যাদায় উন্নীত করবেন, যদিও অনুগতদের আমল তাদের আমলের ন্যায় না হয়। এমনিভাবে হুরে ঈন ও জান্নাতীদের খাদিমদেরকেও সে পর্যায়ে উন্নীত করবেন, যদিও তাদের কোন আমল নেই। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মুকাল্লিফদের অবস্থা এমন নয়; বরং তারা সে পর্যায়ভূক্ত হবে, যে পরিমাণ তাদের আমল রয়েছে। (অর্থাৎ তাদের আমল যেমন হবে, তারা সে স্তর লাভ করবে।)
তৃতীয় অভিমت: অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, যাদের মধ্যে ওয়াহেদী রহ. রয়েছেন, উক্ত আয়াতে ذُرِّيَّة দ্বারা প্রাপ্ত বয়স্ক অপ্রাপ্ত বয়স্ক উভয় শ্রেণীর সন্তানদেরকে বুঝানো হয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্ততি ঈমানের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুগামী আর অপ্রাপ্ত বয়স্করা তাদের পিতার ঈমানের কারণে তাদের অনুগামী।
তারা বলেন, ذُرِّيَّة শব্দটি প্রাপ্ত বয়স্ক-অপ্রাপ্ত বয়স্ক, এক-একাধিক, পিতা-পুত্র সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَآيَةً لَهُمْ أَنَّا حَمَلْنَا ذُرِّيَّتَهُمْ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ আমি তাদের বংশধরদের এক বোঝাই নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম।
এআয়াতে ذُرِّيَّة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, পিতৃপুরুষ। আর ঈমান এটি যেমনিভাবে স্বেচ্ছায় অর্জনকৃত ঈমানের উপর প্রযোজ্য, তেমনিভাবে অনুগামী ঈমানের উপরও প্রযোজ্য। (অর্থাৎ অনুসৃত ব্যক্তি মু'মিন হওয়ার ফলে অনুগত ব্যক্তিকেও মু'মিন গণ্য করা, যেমন মু'মিনের ঈমানের ফলে তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানকে মু'মিন বলে গণ্য করা হয়, এটা ঈমানে তাবঈ।
আর ঈমানে কাসাবী হল, অনুসৃত ব্যক্তি ঈমান আনার ফলে অনুগত ব্যক্তিও নিজে স্বেচ্ছায় ঈমান গ্রহণ করা।) প্রকৃতিগতভাবে মু'মিন হওয়া, যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَة একজন মু'মিন দাস মুক্ত করা।
এখানে হত্যার কাফফারার ক্ষেত্রে যদি কেউ এমন অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন গোলাম আযাদ করে, যার পিতা-মাতার মধ্যে কোন একজন মুসলমান, তাহলে কাফ্ফ্ফারা আদায় হয়ে যাবে। (কেননা, তার মধ্যে ঈমানে তাবঈ পাওয়া গেছে) এ মত পোষণকারীরা বলেন, সালাফে সালেহীনদের উক্তিও এ মতকে সমর্থন করে। যেমন হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সন্তান-সন্ততিদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে তাদের পিতাদের স্তরে উন্নীত করবেন। যদিও তার আমল তার পিতা অপেক্ষা কম হয়। যেন সে তাদের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তার চক্ষু শীতল করতে পারে। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ . ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছু হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।
এ আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে উঁচু স্তর লাভ করেছে আর তার সন্তানও জান্নাত লাভ করেছে, আল্লাহ তা'আলা তার সে সন্তানের মর্যাদা উন্নীত করে তার সমপর্যায়ে করে দিবেন। যদিও সে তার আমলের মাধ্যমে এ স্তরে পৌছতে সক্ষম না হত। যেন সে তার মাধ্যমে তার নিজ চক্ষু শীতল করতে পারে। (অর্থাৎ সে স্বীয় আমল দ্বারা এ স্তর লাভ করতে সক্ষম হয় না, তবু তাকে এ স্তরে উন্নীত করা হয়েছে।)
আবূ মিজলায রহ. বলেন, পৃথিবীতে যেমনিভাবে তারা একত্রে থাকতে পসন্দ করত, জান্নাতেও আল্লাহ তা'আলা তেমনিভাবে তাদেরকে একত্রিত করে দিবেন।
শা'বী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতার আমলের কারণে সন্তান-সন্ততিদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কালবী রহ. বলেন, যদি পিতা উঁচুস্তর লাভ করেন আর সন্তান নিম্নস্তর লাভ করে, আল্লাহ তা'আলা সন্তানদেরকে পিতা-মাতার স্তরে উন্নীত করাবেন। আর যদি সন্তান উঁচু স্তরের জান্নাত লাভ করে, পিতা-মাতা নিম্ন স্তরের জান্নাত লাভ করে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতাকে সন্তানের স্তরে উন্নীত করাবেন।
ইবরাহীম রহ. বলেন, সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতার পরিমাণ প্রতিদান প্রদান করা হবে, কিন্তু পিতা-মাতার পরিমাণ হতে মোটেও হ্রাস করা হবে না।
গ্রন্থকার বলেন, এখানে ذُرِّيَّة শব্দটি দ্বারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান উদ্দেশ্য নেয়াই সুস্পষ্ট ও উত্তম। তাহলে পশ্চাতগামীরা অগ্রগামীদের সমপর্যায়ে হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে না। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান উদ্দেশ্য নিলে এটা আবশ্যক হয় না। কেননা, প্রত্যেক ব্যক্তির অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান তারই স্তরের হবে। والله اعلم |
জান্নাত বলবে কথা
পূর্বে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী উল্লিখিত হয়েছে। যাতে রয়েছে احتجت الجنة والنار জান্নাত-জাহান্নাম একে অপরের উপর বড়ত্ব দাবী করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, জান্নাত বলবে, يارب قد اطردت أنهاري হে প্রভু! আমার নহরগুলো পূর্ণ মাত্রায় প্রবহমান, ثماري وطابت আমার ফলগুলো পেকে গেছে। فعجل علي بأهلي সুতরাং আমার অধিবাসীদেরকে আমার মাঝে দ্রুত প্রেরণ করুন।
ইসমাইল ইবনে আবী খালিদ রহ. সাঈদ আত-তাঈ রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি জেনেছি, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করে তাকে সুসজ্জিত হওয়ার নির্দেশ দান করলে তা সুসজ্জিত হয়ে গেল। এরপর তিনি তাকে বললেন, কথা বল, তখন সে বলে উঠল, সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যার প্রতি আপনি সন্তুষ্ট।
কাতাদাহ রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে সৃষ্টি করে কথা বলার নির্দেশ দান করলে সে বলে উঠল, খোদাভীরুদের জন্য সুসংবাদ।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা 'আদন' জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। তখন তাতে এমন সব বস্তু সৃষ্টি করেছেন, যা কোন চক্ষু কখনো অবলোকন করেনি, কোন কর্ন কখনো শ্রবন করেনি, কোন মানব হৃদয়ে যার কোন চিন্তা কখনো উঁকি দেয়নি। অতঃপর তিনি তাকে কথা বলতে বললে, তা বলে উঠলো, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُون নিশ্চয়ই মু'মিনরা সফলকাম।
জান্নাতের বর্ধনশীল রূপ লাবণ্য
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা যখনি জান্নাতের প্রতি দৃষ্টি দিবেন, তখনি বলবেন, তোমার সৌন্দর্যে দ্বিগুণ বৃদ্ধি করো। তখন তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তার অধিবাসীরা তাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
হুরে-ঈন স্বীয় স্বামীদের প্রতি সদা আসক্ত থাকবে
হযরত মুআয বিন জাবাল রা. হতে বর্ণিত হাদীসটি পূর্বে বিধৃত হয়েছে। যেখানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী হুরদের এই মন্তব্য নকল করেছেন, জান্নাতের হুররা মুমিনের দুনিয়াবী স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলে, তাকে কষ্ট দিও না। আশঙ্কা হয়, সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।
হযরত ইকরিমাহ রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার জন্য জান্নাতের হুর নির্ধারিত রয়েছে, তার জন্য সে হুর দু'আ করতে থাকে اللهم أعنه على دينك হে আল্লাহ! তাকে আপনার দ্বীনের উপর চলার ক্ষেত্রে সাহায্য করুন। واقبل بقلبه على طاعتك তার অন্তরকে আপনার আনুগত্যমুখী করে দিন।
ইবনে আবিদ-দুনিয়া রহ. আবূ সুলায়মান আদ-দারেমী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, ইরাকে অত্যন্ত ইবাদাতগুযার এক তরুণ ছিল। সে একদিন তার সাথীদের সাথে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা করল। পথিমধ্যে তার সাথীরা যখন বিশ্রামের জন্য তাঁবু ফেলত, তখন সে নামাযে লিপ্ত হয়ে যেত। যখন তার সাথীরা খাবারে লিপ্ত হত, তখন সে রোযা থাকত। তার সাথীরা কিছু বললে, সে ধৈর্য ধারণ করত। অতঃপর যখন সে তাদের থেকে বিদায় নিতে চাইল, তখন তার সাথীরা তাকে জিজ্ঞেস করল, হে ভাই! আমরা তোমাকে যে আমলগুলো করতে দেখলাম, এর প্রতি তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? সে বলল, আমি জান্নাতের প্রাসাদসমূহ হতে একটি প্রাসাদ দেখেছি, তার একটি ইট স্বর্ণের, অপর ইট রৌপ্যের। যখন তার নির্মাণ সম্পন্ন হল, তখন দেখা গেল, তার একটি গম্বুজ পদ্মরাগ মণির তৈরী, অপরটি পোখরাজের তৈরী। উভয়টিতে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূর রয়েছে। সে বলছিল, আমাকে পেতে চাইলে আল্লাহ তা'আলাকে পাওয়ার চেষ্টা কর। আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য আল্লাহকে পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সে যুবক তার সাথীদেরকে বলল, সুতরাং আমি তাকে পাওয়ার জন্যই এ আমল করছি। আবূ সুলায়মান রহ. বলেন, এ যুবক একজন হূরকে পাওয়ার জন্য এ পরিমাণ পরিশ্রম করছে। সুতরাং যে ব্যক্তি এর চেয়ে অধিক প্রাপ্তির আশা রাখে, তার কতটুকু পরিশ্রম করা উচিত!
জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে মৃত্যুকে যবাহ
وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةِ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ তাদেরকে সতর্ক করে দাও, পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে, যখন সকল সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। এখন তারা গাফিল এবং বিশ্বাস করে না।
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মৃত্যুকে শুভ্র-কৃষ্ণ ডোরাকাটা দুম্বার আকৃতিতে উপস্থিত করা হবে ও তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থলে দাঁড় করিয়ে বলা হবে, হে জান্নাতবাসী! তোমরা কি এটা চিন? তারা ঘাড় উঠিয়ে দেখে বলবে, হ্যাঁ, এটা হল মৃত্যু। অতঃপর বলা হবে, হে দোযখবাসী! তোমরা কি এটা চিন? তারা তখন ঘাড় উঠিয়ে দেখে বলবে, হ্যাঁ, এটা হল মৃত্যু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর তাকে যবাহ করার নির্দেশ প্রদান করা হবে এবং জান্নাতীদেরকে বলা হবে, হে জান্নাতীরা! তোমরা এখানে চিরস্থায়ী। মৃত্যু কখনো তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। জাহান্নামীদেরকে বলা হবে, হে জাহান্নামীরা! তোমরা এখানে চিরস্থায়ী। মৃত্যু আর কখনো তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম وَأَنْذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ এ আয়াতটি পাঠ করেন। এ বর্ণনা বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে।
সহীহায়নে হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা 'জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর তাদের মাঝে এক ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীরা! এখন আর তোমাদেরকে মৃত্যু স্পর্শ করবে না। হে জাহান্নামীরা! এখন আর তোমাদেরকে মৃত্যু স্পর্শ করবে না। যে যেখানে আছ, সে সেখানে সর্বদা অবস্থান করবে।
হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে এবং দোযখীরা দোযখে প্রবেশের পর মৃত্যুকে এনে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থলে দাঁড় করানো হবে। (তাকে যবাহ করা হবে) অতঃপর এক ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীরা! এখন আর মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। হে জাহান্নামীরা! এখন আর মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তখন জান্নাতীদের আনন্দে বৃদ্ধি ঘটবে আর জাহান্নামীদের পেরেশানীতে বৃদ্ধি ঘটবে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে এবং দোযখীরা দোযখে প্রবেশের পর মৃত্যুকে বেঁধে আনা হবে ও তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি দেয়ালে রাখা হবে। অতঃপর বলা হবে, হে জান্নাতীরা! তখন তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঁকি মেরে দেখবে। অতঃপর বলা হবে, হে দোযখীরা! তখন তারা শাফাআত লাভের আশায় উৎসাহ ভরে তাকাবে। এরপর জান্নাতী ও জাহান্নামী উভয়কে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা কি এটা চিন?
উভয়ের অধিবাসীরা উত্তর দিবে, হ্যাঁ, আমরা এটা চিনি, এ তো সে মৃত্যু, যাকে আমাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর তাকে সে দেয়ালের উপর শুইয়ে যবাহ করা হবে এবং বলা হবে, হে জান্নাতীরা! তোমরা চিরস্থায়ী, মৃত্যুবরণ করবে না, হে জাহান্নামীরা! তোমরা চিরস্থায়ী, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। ইমাম তিরমিযী ও নাসাঈ রহ.ও এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
মৃত্যুকে দুম্বার আকৃতিতে হাযির করা, তাকে শোয়ানো, যবাহ করা এবং জান্নাতবাসী ও জাহান্নামীদের প্রত্যক্ষ করা সবই বাস্তবে ঘটবে। এগুলো কোন কাল্পনিক বিষয় নয়। এ ব্যাপারে অনেকে মহা ভ্রান্তিতে পতিত। তারা বলে, মৃত্যু হল একটি নিজস্ব সত্তাহীন বস্তু, যার কোন অবয়ব নেই। তাহলে তাকে কিভাবে যবাহ করা হবে? তাদের এ কথাটি সঠিক নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে দুম্বার আকৃতিতে সৃষ্টি করবেন।
যেমনিভাবে তিনি আমলসমূহকে সৃষ্টি করবেন, যার মাধ্যমে তিনি প্রতিদান এবং শান্তি দিবেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান ও সর্ববিষয়ে সক্ষম। সুতরাং তাদের এ ধরনের চিন্তাধারা তাদের জ্ঞানের স্বল্পতারই পরিচায়ক। কেননা, আল্লাহ তা'আলা অশরীরী বস্তুকেও অবয়ব দান করতে সক্ষম। তেমনিভাবে অবয়ব বিশিষ্ট বস্তুকে অবয়বহীন বস্তুতে রূপান্তর করতে সক্ষম। যেমন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, غمامتان كانهما القيامة يوم تجى البقرة وآل عمران কিয়ামত দিবসে সূরা বাকারা, ও সূরা আল ইমরান মেঘমালার আকৃতিতে উপস্থিত হবে। সুতরাং এগুলো অবয়বহীন অশরীরী বস্তু, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে মেঘের আকৃতি দান করবেন।
এমনিভাবে অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ان ما تذكرون من جلال الله من تسبيحه وتحميده وتهليله يتعاطفن তোমরা আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের কারণে তাঁর যে প্রশংসা কর, পবিত্রতা বর্ণনা কর ও তাঁর একত্ববাদ বর্ণনা কর, সেগুলো আরশের حول العرش لهن دوي كدوي النحل يذكرن بصاحبهن সেগুলোর গুনগুন আওয়ায হবে, যার মাধ্যমে তা তার পাঠকারীর স্বরণ করতে থাকবে। কবরের শাস্তি ও পুরস্কার সম্পর্কিত হাদীসে এ কথাও আছে, প্রত্যেকের আমলনামা তার আকৃতিতে উপস্থিত হবে। তখন সে প্রথম ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করবে, কে তুমি? সে বলবে আমি তোমার নেক আমল। দ্বিতীয় ব্যক্তিও তার প্রশ্নের উত্তরে বলবে, আমি তোমার বদ আমল। এটি কোনো চিত্রকল্প নয়। বরং বাস্তব ঘটনা। কেননা, আল্লাহ তা'আলা ব্যক্তির নেক আমলকে উত্তম রূপে সৃষ্টি করবেন আর বদকারের আমলকে খারাপ আকৃতিতে সৃষ্টি করবেন। এমনিভাবে কিয়ামত দিবসে ঈমানদারদের মাঝে যে নূর বিতরণ করা হবে তা হবে তাদের ঈমানের নূর। আল্লাহ তাআলা তাদের ঈমান হতে এমন নূর তৈরী করবেন, যা ঐ ব্যক্তির আগে দৌড়াতে থাকবে। এ ব্যাপারে যদি কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি নাও থাকত, তবু যুক্তি ও কিয়াসের মাধ্যমে তা বুঝা সম্ভব ছিল। সুতরাং যখন এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি বিদ্যমান, তাহলে বিষয়টিকে আকলী ও নকলী উভয় প্রকার দলীল দ্বারা প্রমাণিত বলা যেতে পারে।
হযরত সাঈদ রহ. হযরত কাতাদাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, আমার নিকট এ হাদীস পৌছেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মু'মিন ব্যক্তি যখন কবর থেকে উঠবে, তখন তার যাবতীয় নেক আমলকে উত্তম রূপ প্রদান করা হবে। সে ব্যক্তি তখন প্রশ্ন করবে, তুমি কে? আল্লাহর শপথ! আমার তো ধারণা, তুমি উত্তম ব্যক্তি। উত্তরে তা বলবে, আমি তোমার নেক আমল। তা তার জন্য নূর হবে এবং সে ব্যক্তিকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে আর কাফির যখন কবর থেকে উঠবে, তার আমলকে খারাপ আকৃতি প্রদান করা হবে। সে তখন বলবে, তুমি কে? তোমাকে অত্যন্ত খারাপ মানুষ মনে হচ্ছে। বলবে, আমি হলাম তোমার আমল। তাকে নিয়ে তা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। মুজাহিদ রহ. ও অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইবনে যুরায়জ রহ. বলেন, নেককার ব্যক্তির আমলকে উত্তম, পবিত্র, সুগন্ধিময় আকৃতি দান করা হবে। তা তার সম্পাদনকারীর মনস্তুষ্টিকল্পে তাকে সর্বপ্রকার কল্যাণ ও মঙ্গলের সুসংবাদ দিবে। সে ব্যক্তি বলবে, কে তুমি? তা বলবে, আমি হলাম তোমার আমল। অতঃপর তাকে তার জন্য জ্যোতি হয়ে যাবে। তা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবে। আল্লাহ তা'আলার বাণী : يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ তাদের প্রতিপালক তাদের ঈমান হেতু তাদের পথ নির্দেশ করবেন। এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। আর কাফিরের আমলকে খারাপ ও দুর্গন্ধময় আকৃতি দান করা হবে। তা সে ব্যক্তিকে জড়িয়ে থাকবে, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা পর্যন্ত।
ইবনুল মুবারক রহ. মুবারক ইবনে ফুযালা রহ.-এর সূত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী أَفَمَا نَحْنُ بِمَيِّيْتِينَ إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُعَذِّبِينَ প্রসঙ্গে বলেন, যে নিআমতের পর মৃত্যু রয়েছে সে মৃত্যু সে নিআমতের যবনিকা টেনে দেবে। সে নিআমত সম্পর্কে তারা অবহিত হয়ে সে প্রসঙ্গে বলবে, আমরা কি প্রথমবারের মৃত্যু ব্যতীত মৃত্যুবরণ করব? আমরা কি আযাবে নিপতিত হব? তাদেরকে তখন বলা হবে, না, তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না আর তোমাদের কোন শাস্তি প্রদান করা হবে না।
ইয়াযীদ আর-রুক্কাশী রহ. বলেন, জান্নাতীদের মৃত্যু-চিন্তা থাকবে না। তাদের জীবন হবে স্বাচ্ছন্দ্যময়। তারা সকল প্রকার ব্যাধিমুক্ত থাকবে। ধন্য তারা, যারা আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী প্রতিবেশী হবে। এ কথা বলে ইয়াযীদ আর-রুক্কাশী এ পরিমাণ ক্রন্দন করলেন, অশ্রুবারিতে তার শ্মশ্রু ভিজে গেল।
যিক্র জান্নাতে একমাত্র ইবাদত
যিকর ব্যতীত জান্নাতে কোনো প্রকার ইবাদত থাকবে না। একমাত্র যিক্রই সর্বদা চলতে থাকবে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে পানাহার করবে, কিন্তু শ্লেষ্মা ও মল-মূত্র ত্যাগ করবে না। তাদের খাবার হযম হবে এমন ঢেকুর ও ঘামের মাধ্যমে, যা কস্তুরীর ন্যায় সুগন্ধিময়। সেখানে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে তাসবীহ ও তাহমীদ চলতে থাকবে।
জান্নাতীদের পৃথিবীর ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ তারা একে অপরের সামনা-সামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي فَرِین তাদের কেউ বলবে, আমার ছিল এক সঙ্গী। এ প্রসঙ্গে আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَ لُونَ তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করবে, قَالُوا إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلَنَا مُشْفِقِينَ বলতে থাকবে, আমরা পূর্বে পরিবার-পরিজনের মধ্যে শংকিত অবস্থায় ছিলাম। فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে মারফু হাদীস বর্ণনা করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের পর পরস্পর সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করবে। তখন একেক জনের সিংহাসন অন্যজনের প্রতি ধাবিত হবে এ ভাবে সকলে একত্রিত হয়ে যাবে। প্রত্যেকে হেলান দিয়ে বসে পড়বে। তখন তাদের একজন তার সাথীকে লক্ষ্য করে বলবে, তোমার কি মনে পড়ে, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কখন ক্ষমা করে দিয়েছেন? সে বলবে, হ্যাঁ অমুক দিন অমুক জায়গায়, সে দিন আমরা আল্লাহর নিকট দু'আ করছিলাম আর তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
তাদের এ পারস্পরিক কথোপকথনের মাঝে দুনিয়ার কঠিন জ্ঞানগর্ভ মাসআলা থেকে শুরু করে কুরআন-হাদীসের নানা গভীর জ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনাও উঠে আসবে। দুনিয়াতেই যখন পানাহার এবং স্ত্রী-সম্ভোগের চেয়ে কোনো ইলমী আলাপচারিতা খুব বেশি তৃপ্তিদায়ক ও প্রশান্তিকর অনুভূতি দিয়ে যায়, তখন নিশ্চয়ই আখিরাতে তার আলোচনা আরো অধিক তৃপ্তিদায়ক হবে। এটা আলিমদের সাথে বিশেষিত হবে। সকল জান্নাতী অপেক্ষা তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকবে। এটি এমন এক তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি যা একমাত্র আহলে ইলমই অনুভব করে থাকেন। আর এ অনুভূতিই তাদেরকে অন্যদের হতে আলাদা করে দিয়ে থাকে। আর আল্লাহই উত্তম সহায়ক।
টিকাঃ
৪৬৫. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৭১৯. মুসলিম. খ. ২, পৃ. ৩৮৬
৪৬৬. সূরা মুল্ক, আয়াত ৮-৯
৪৬৭. মুসনাদে আহমদ খ. ২, পৃ. ৫০৯
৪৬৮. সূরা তূর, আয়াত: ২১
৪৬৯ সূরা তুর আয়াত: ২১
৪৭০. সূরা আনআম, আয়াত : ৮৪
৪৭১. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩
৪৭২. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৭৩
৪৭০. সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ৪১
৪৭৪. সূরা নিসা, আয়াত: ৯২
৪৭৫. সূরা মারয়াম, আয়াত: ৩৯
৪৭৬. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৬৯১
৪৭৭. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৯৬৯, মুসলিম, পৃ. ৩৮২
৪৭৮. মুসলিম খ. ১, পৃ. ২৭০
৪৭৯. মুসনাদে আহমদ, খ. ৪ প. ২২৮
৪৮০. সূরা ইউনুস, আয়াত : ৯
৪৮১. খ. ২ পৃ. ৩৭৯
৪৮২. সূরা সাফ্ফাত, আয়াত: ৫০-৫১
৪৮০. সূরা তুর, আয়াত: ২৫
📄 জান্নাতের সুসংবাদ লাভের যোগ্য যারা
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنْ لَهُمْ aj malaia ja a 9 PII PII, OMAR SO جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْفَارِ সংবাদ দাও, তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হয়।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهُ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ • يَحْزَنُونَ জেনে রাখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই, তারা কোন দুঃখিতও হবে না। • الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ যারা ঈমান ও তাকওয়া لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخرة لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ الله | PC 1977 ,A GAN ACCE HAI ART O TRAITO ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ . আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই, এটাই মহা সাফল্য।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبَّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ . বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফিরিশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হইও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার জন্য আনন্দিত হও।
فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أولئك الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأولئك هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ আমার বান্দাদেরকে, যারা মনোযোগ সহকারে কথা শুনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে। তাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই বোধশক্তিসম্পন্ন।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا في سبيل الله بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللهِ وَأُولئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ আনে, হিজরত করে, সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা আল্লাহর নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। আর তারাই সফলকাম। يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِنْهُ وَرِضْوَانِ وَجَنَّاتٍ لَهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُقِيمٌ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ তাদের প্রতিপালক তাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, যেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-শান্তি। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট আছে মহা পুরস্কার।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ في رَوْضَاتِ الْجَنَّاتِ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ আনে ও সৎকর্ম করে, তারা থাকবে জান্নাতের মনোরম স্থানে। তারা যা কিছুই চাবে, তাদের প্রতিপালকের নিকট তাই পাবে। এটাই তো মহা অনুগ্রহ। ذلك الذي يُبَشِّرُ اللَّهُ عِبَادَهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَات আল্লাহ দেন তাঁর বান্দাদেরকে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, إِنَّمَا تُنْذِرُ مَنِ اتَّبَعَ الذِّكْرَ وَخَشِيَ الرَّحْمَنَ بالْغَيْبِ فَبَشِّرْهُ بِمَغْفِرَةٍ وَأَجْرِ كَرِيمِ তুমি কেবল তাকেই সতর্ক করতে পার, যে উপদেশ মেনে চলে এবং না দেখে দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে। অতএব তাকে তুমি মহা পুরস্কার ও ক্ষমার সংবাদ দাও।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ إِنَّآ أَرْسَلْنَٰكَ شَٰهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا • হে নবী! আমি তো তোমাকে বানিয়েছি সাক্ষী এবং সুসংবাদ দাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে।
وداعيا إلى الله بإذنه وسراجا منيرا অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী হিসেবে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ بِأَنَّ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ فَضْلًا كَبِيرًا তাদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে মহা অনুগ্রহ।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত। তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তারা রিযকপ্রাপ্ত।
فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَاهُمْ يَحْزَنُونَ
আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তারা আনন্দিত আর তাদের পেছনে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি, তাদের জন্য আনন্দ প্রকাশ করে, এই জন্য, তাদের কোন ভয় নেই, আর তারা দুঃখিতও হবে না।
يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে, আল্লাহ মু'মিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاهِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بَيْعَكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ .
নিশ্চয়ই আল্লাহ মু'মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত ইঞ্জিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কে আছে? তোমরা যে সওদা করেছ, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং এটাই তো মহা সাফল্য।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ 0 ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ 0 যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। أولئك عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأولئك هُمُ الْمُهْتَدُونَ 10 এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয় আর এরাই সৎপথে পরিচালিত।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ 0 এবং তিনি দান করেন তোমাদের ব্যক্তিগত আরো একটি অনুগ্রহ। আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়, মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দাও।
জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন, أعدت للْمُتَّقِينَ জান্নাত মুত্তাকী তথা খোদাভীরুদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
أُعدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِالله وَرُسُله আল্লাহ ত'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, সে সকল লোকের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনরা। الذين هم فى صلاتهم خاشعون যারা বিনয়ী-নম্র নিজেদের নামাযে। والذين هم عن اللغو معرضون যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে। والذين هم للزكاة فعلون যারা যাকাত দানে সক্রিয়। والذين هم لفروجهم حافظون যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। إلا على أزواجهم أو ما ملكت أيمانهم فإنهم غير ملومين নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত। এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। فمن ابتغى وراء ذلك فأولئك هم العادون এবং কেউ তাদেরকে ব্যতীত অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমা লঙ্ঘনকারী। والذين هم لأماناتهم وعهدهم راعون এবং যারা নিজেদের আমানত এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। والذين هم على صلواتهم يحافظون এবং যারা নিজেদের সালাতে যত্নবান থাকে। أولئك هم الوارثون তারাই হবে উত্তরাধিকারী। الذين يرثون الفردوس هم فيها خالدون যারা অধিকারী হবে ফিরদাউসের, তারা তাতে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
অবশ্যই আত্মসমর্পণকারী পুরুষ এবং আত্মসমর্পণকারী নারী, মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সাওম পালনকারী পুরুষ ও সাওম পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ এবং অধিক স্মরণকারী নারী, তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলা রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ তারা তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী, সিজদাকারী, সৎকর্মের নির্দেশদাতা, অসৎকার্যে নিষেধকারী ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী। মু'মিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي نُورِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَنْ كَانَ تَقِيًّا এই সে জান্নাত, যার অধিকারী করব আমার বান্দাদের মধ্যে মুত্তাকীদেরকে।
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةِ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ক্ষমার দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। الَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ এবং যারা কোন অশ্লীল কার্য করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ্ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? তারা যা করে ফেলে, জেনেশুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না। أُولَٰئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হয়, সেখানে তারা স্থায়ী হবে আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম হয়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ হে মু'মিনরা! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সংবাদ দিব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে মর্মন্তুদ শাস্তি হতে? تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে! يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ আল্লাহ্ তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত আর স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটাই মহা সাফল্য। وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا ۖ نَصْرٌ مِّنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ ۖ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ আরো একটি অনুগ্রহ, আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়, মু'মিনদেরকে সুসংবাদ দাও।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ আর যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দু'টি উদ্যান।
আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْس عن الْهَوَى পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى তবে জান্নাতই হবে তার আবাস।
এ বিষয়ে অনেক আয়াত কুরআনে কারীমে রয়েছে, যার ভিত্তি হল তিনটি বিষয়ের উপর। এক, ঈমান, দুই. তাকওয়া, তিন, সুন্নাত মত চলে নিজের যাবতীয় আমলকে এক মাত্র আল্লাহর জন্যই করা। যারা এ তিনটি বিষয়ের পাবন্দী করবে, তারাই কেবল এ সুসংবাদের উপযুক্ত। এছাড়া অন্য কেউ এ সুসংবাদের উপযুক্ত নয়। কেননা, কুরআন ও হাদীসে এ সংক্রান্ত যত সুসংবাদ রয়েছে, এ তিনটি বিষয়ের উপরই তার ভিত্তি। এ ক্ষেত্রে দু'টি মূলনীতি রয়েছে। এক. আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে নিষ্ঠা সৃষ্টি। দুই. মাখলুকের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আবার এ দু'টি বিষয়ও একটি বিষয়ের মাঝে নিহিত। তা হল, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পসন্দের আনুকূল্য রক্ষা করা। আর এটা একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জাহেরী ও বাতেনী তাবেদারীর মাধ্যমেই পাওয়া যায়।
যে কোনো আমল এ মূলনীতির বিশদ বিবরণ ক্ষেত্রে তার মধ্যে সত্তরের অধিক স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর হল لا إله إلا الله আল্লাহ তা'আলার একাত্ববাদের স্বীকৃতি। আর সর্বনিম্ন স্তর হল, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো। এ দু'য়ের মাঝেই রয়েছে বাকী সব স্তর, অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত সকল বিষয়ে তাঁকে সত্যায়ন করা এবং তাঁর নির্দেশিত সকল বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করা, চাই সেটা ওয়াজিব হোক বা মুস্তাহাব হোক। যেমন আল্লাহ তা'আলার নাম, সিফাত, কর্ম ইত্যাদির উপর কোন প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন ব্যতীত, কোন অবস্থার সাথে বিশেষিত করা ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে অবহিত করেছেন, হুবহু সেভাবে ঈমান আনা।
ইমাম শাফেঈ রহ. বলেন, সকল প্রশংসা সে সত্তার, যিনি ঐ গুণাবলীতে গুণান্বিত, যা তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেছেন এবং যা মানুষের বর্ণনা হতেও অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী আল্লাহুম (لك الحمد كالذي تقول وخيرا مما نقول) (অর্থঃ হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই জন্য সেরূপে, যেরূপে স্বয়ং আপনি বলেছেন এবং আমরা আপনার যেরূপ গুণগান করি, তা হতে উত্তম।) এর অনুকরণে এটা বলেছেন।
যেসব বিষয়ের উপর ঈমান আনা অত্যাবশ্যক
এ গ্রন্থের শুরুতে আমি এ ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সে সব মত ও আকীদা উল্লেখ করেছি, যাতে সকলের ঐকমত্য রয়েছে। সকল উলামা, হাদীসবেত্তাগণ, ফুকাহা, মুফাস্সির সকলেরই এতে সমমত রয়েছে। সুতরাং যে এর বিপরীত মত পোষণ করবে, সে বিদ'আতী।
গ্রন্থকার বলেন, যে সকল বুযুর্গানে দীন হতে ইলম অর্জন করেছি, তাদের সকলের মত হল, ঈমান মুখের স্বীকারোক্তি, অন্তরের বিশ্বাস ও সুন্নাত মোতাবেক তা কার্যক্ষেত্রে বস্তবায়ন করার নাম। ঈমান হ্রাস পায় ও বৃদ্ধি পায়। কারো কারো মতে মূল ঈমানই হ্রাস পায় ও বৃদ্ধি পায়। আর কারো মতে মূল ঈমানে হ্রাস ও বৃদ্ধি ঘটে না। কারণ, ঈমান হল অন্তরের বিশ্বাসের নাম। হ্যাঁ, ঈমানের পর্যায় ও বিস্তারিত ক্ষেত্রে তার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে পারে। যে এমত পোষণ করে, ঈমান শুধুমাত্র মুখের স্বীকৃতির নাম, আমলের কোন দখল নেই, সে মুরজিয়াদের অন্তর্ভূক্ত। এমনিভাবে যে মনে করে, ঈমান শুধুমাত্র মুখে স্বীকৃতির নাম আর আমল হল আহকামে শরঈ, সেও মুরজিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। আর যে মনে করে, ঈমানে বৃদ্ধি তো ঘটে, কিন্তু হ্রাস পায় না, সেও মুরজিয়াদের মতই মত পেশ করল। এমনিভাবে যে মনে করে, তার ঈমান হযরত জিবরীল আ. ও অন্য ফিরিশতাদের ঈমানের ন্যায়, সেও মুরজিয়াদের মতো মত পোষণ করল। এমনিভাবে যে মনে করে, মারিফাত অন্তরের বিষয় যদিও মুখে না থাকে, তবে সেও মুরজিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। ভাল-মন্দ, কম-বেশি বাহ্যিক-অভ্যন্তরীন, মিষ্ট- তিক্ত, পসন্দনীয়-অপসন্দনীয়, নেকী-বদী, আদি-অন্ত সব কিছুই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই।
বান্দার উপর তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। বান্দাদের উপর তাঁর লিপিবদ্ধ ভাগ্যলিপিই চূড়ান্তভাবে ঘটিতব্য। কারো পক্ষে আল্লাহর ইচ্ছা লংঘন করার ন্যূনতম সামর্থ নেই। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে তাই ঘটবে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রত্যেকের ভাগ্যে তাই ঘটবে যা তার জন্য লিপিবদ্ধ আছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্তই পূর্ণ ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত।
মন্দ কাজসমূহ যেমন: চুরি, ব্যভিচার, মদ্যপান, অন্যায়, হত্যা, হারাম মাল ভক্ষণ, শিরক, এ যাবতীয় গুনাহ তাঁরই ফায়সালা মোতাবেক হয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে কোন মানুষই আল্লাহ তা'আলার উপর কোন অভিযোগ আরোপ করতে পারে না; বরং মাখলুখের উপর তাঁর পূর্ণ দলীল প্রমাণ রয়েছে, يُسْأَلُونَ (২১) (আল্লাহর) কার্যবলী সম্পর্কে কোন কৈফিয়ত দিতে হয় না, কিন্তু তাদের (মাখলুকের) কার্যবলী সম্পর্কে কৈফিয়ত দিতে হয়।
আল্লাহ তা'আলা পূর্ব হতেই জানেন, মাখলুককে স্বাধীনতা দিলে সে এ কাজ করবে, সে হিসাবে তিনি তা লিখে রেখেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা ইবলীস ও তৎপরবর্তী কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল নাফরমানদের নাফরমানী সম্পর্কে অবগত। বান্দাদের ব্যাপারেও জানেন এবং সে জন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর অনাগত বান্দাদের ব্যাপারেও জানেন এবং সে জন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি তেমনি আমল করে থাকে, যে জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার তাকদীর লিখিত পথেই চলে। কেউ আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত ও কর্তৃত্ব বহির্ভূত হতে পারবে না। তিনি যা ইচ্ছা, তা-ই করেন।
যে ব্যক্তি এ আকীদা পোষণ করে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার জন্য কল্যাণ ও মঙ্গল চান, কিন্তু বান্দা নাফরমানী ও অহংকারী করে এর বিপরীত আমল করে থাকে। তাহলে এ আকীদা পোষণকারী আল্লাহর ইচ্ছা অপেক্ষা বান্দার ইচ্ছাকে অধিক কার্যকর মনে করল। আল্লাহ তা'আলার উপর এর চেয়ে বড় অপবাদ আর কি হতে পারে?
যে ব্যক্তি মনে করে, ব্যভিচার আল্লাহ তা'আলার তাকদীর অনুযায়ী হয় না, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, মহিলা ব্যভিচার দ্বারা গর্ভ ধারণ করল ও সন্তান জন্ম দিল, তাহলে কি এটা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়নি? এটা কি আল্লাহ তা'আলার জানা ছিল না, এ সন্তান এভাবেই সৃষ্টি হবে? যদি সে বলে, আল্লাহর জানা ছিল না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে অন্য সৃষ্টিকর্তাকে মেনে নিল, যা সরাসরি শিরক।
যে ব্যক্তি মনে করে, চুরি করা, মদ্যপান, হারাম মাল ভক্ষণ এটা আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা অনুযায়ী হয় না। তাহলে এ কথা বিশ্বাসকারী মনে কর, বান্দা আল্লাহর রিযিক ব্যতীত অন্য কারো রিযিক গ্রহণে সক্ষম। এটা সম্পূর্ণ অগ্নিপুঁজকদের আকীদা। এটা মোটেও ঠিক নয়; বরং সে নিজের রিযিকই ভক্ষণ করল। এটা ছিল তার তাকদীর।
যে ব্যক্তি মনে করে, হত্যা আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা অনুযায়ী হয় না, তাহলে সে যেন এটাই বিশ্বাস করল, নিহত ব্যক্তি তার মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুবরণ করেনি। এরচেয়ে স্পষ্টতর কুফরী আকীদা আর কি হতে পারে? বরং নিহত ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ফায়সালা মোতাবেক-ই মৃত্যু বরণ করেছে। এটাই মাখলুকের প্রতি তাঁর ইনসাফ আর এটাই তার ভাগ্যলিপি ছিল, যা তিনি মাখলুকের ব্যপারে পূর্ব থেকেই জানেন এবং এটাই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। সুতরাং সঠিক কথা হল, তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই করে থাকেন।
আমরা কোনো আহলে কেবলার ক্ষেত্রে তার গুনাহের কারনে তাকে জাহান্নামী বলি না। যদি না তার সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট হাদীস এসে থাকে। তদ্রূপ আমরা কাউকে তার জীবনের নেক আমলের কারনে তাকে জান্নাতী বলি না। হ্যাঁ, যদি কারো ব্যাপারে কোনো হাদীসে এ ধরণের সুসংবাদ থাকে, তবে তার কথা ভিন্ন।
এ ধরা পৃষ্ঠে যতক্ষণ পর্যন্ত দু'জন লোকও অবশিষ্ট থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত খলীফা কুরায়শদের থেকেই হবে। তাদের সাথে এ ব্যাপারে বিরোধ করা কারো জন্য উচিত নয়। আমাদের জন্য তাদের বিরোধিতা করা কোনভাবেই উচিত নয়। আমাদের জন্য তাদের খিলাফতের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। তাদের ব্যতীত অন্যদের খিলাফতের স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের জন্য কোনভাবেই উচিত নয়।
জিহাদ সৎ বা গুনাহগার তার নেতৃত্বে সর্বদা চলতে থাকবে। কোন যালিমের যুলুম, ইনসাফকারীর ইনসাফ তা বাতিল করতে পারবে না। জুমু'আ ও দু'ঈদের নামায বাদশাহর তত্ত্বাবধানেই সম্পাদিত হবে, যদিও সে ইনসাফগার এবং খোদাভীরু না হয়। (অর্থাৎ যেখানে মুসলিম শাসক রয়েছে, চাই সে নেককার হোক বা ফাসিক হোক, সে-ই জুমু'আ আর দু'ঈদের নামায পড়াবে, যদি সে তার যোগ্য হয়। যেখানে মুসলিম বাদশাহ না থাকে, সেখানে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি যাকে নির্ধারণ করবে, সে-ই জুমু'আ ও ঈদের নামায পড়াবে। যদি কেউ বলে, যেখানে মুসলিম শাসক নেই, সেখানে জুমু'আ ও ঈদের নামায ঠিক হবে না। তাহলে তার কথা পরিত্যাজ্য।)
সাদকা, উশর, খিরাজ, মালে ফাই ও গনীমতের মাল বাদশাহর নিকট একত্রিত করা হবে, চাই সে ন্যায়পরায়ণ হোক বা যালিম হোক। আল্লাহ যাকে রাজত্ব দান করেন বাদশাহ নিযুক্ত হয়, তার আনুগত্য ওয়াজিব। তার আনুগত্য প্রত্যাহার করা উচিত নয়। যদি সে শরীআতের খিলাফ কোন হুকুম না দেয়। আর যদি সে শরীআতের খিলাফ কোন হুকুম দেয়, তবে সেক্ষেত্রে তার আনুগত্য জায়েয নেই, কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق অর্থাৎ নাফরমানীর ক্ষেত্রে বান্দার অনুগত্য করা যাবে না। তার বায়আত ভঙ্গ করা যাবে না। যদি কেউ তা করে, তাহলে সে বিদআতী, বিরুদ্ধবাদী ও জামাতচ্যুত প্রতিপন্ন হবে।
আর ফেতনা থেকে বেঁচে থাকা শাশ্বত সুন্নাত ও অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। যদি তুমি ফেতনার সম্মুখীন হও, তাহলে নিজেকে দীনের কাছে সমর্পণ করে দিবে। নিজ হাত বা কথার মাধ্যমে ফেতনার সহযোগিতা করা যাবে না। নিজের যবান, হাত ও রসনাকে সংযত রাখতে হবে।
দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে, এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। সে দাজ্জাল সকল মিথ্যাবাদী অপেক্ষা জঘন্য ও সেরা মিথ্যাবাদী। কবরের আযাব সত্য। কবরে বান্দাকে তার দীন, রব ও জান্নাত-দোযখের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। মুনকার-নাকীর (কবরে প্রশ্নকারী ফিরিশতা) সত্য। এরা উভয়েই কবরে মহা পরীক্ষা। আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট সে সময়ের দৃঢ়তা প্রার্থনা করি। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাউযে কাওছার সত্য। এটা হল সে হাউয, যাতে উম্মতে মুহাম্মদী আসবে আর সেখানে পাত্র থাকবে, যার দ্বারা তারা তার পানি পান করবে। পুলসিরাত সত্য। যা জাহান্নামের উপর স্থাপিত। মানুষ তা অতিক্রম করবে। জান্নাত তার পরে অবস্থিত। মীযান সত্য। যার দ্বারা নেক আমল ও বদ আমল আল্লাহ তা'আলা তার ইচ্ছা অনুযায়ী মাপবেন। শিংগায় ফুৎকার দেওয়া সত্য। ইসরাফিল আ. তাতে ফুৎকার দিবেন। তখন সকল সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি তাতে ফুৎকার দিলে পুনরায় জীবিত হবে এবং হিসাব-নিকাশের জন্য। মোকাদ্দমার ফায়সালার জন্য, প্রতিদান ও শাস্তির জন্য, জান্নাত-জাহান্নামের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট উপস্থিত হবে।
লাওহে মাহফুয সত্য। যা হতে পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী বান্দার আমল তাদের প্রতি স্থানান্তরিত হয়। কলম সত্য। যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। কুরআন কারীমে তার আলোচনা করেছেন।
কিয়ামত দিবসের শাফাআত সত্য। কিয়ামতের দিন একদল অন্যদলের জন্য সুপারিশ করবে। তখন তারা জাহান্নামে গিয়ে কিছু লোককে বের করে নিয়ে আসবে। তারা জাহান্নামে প্রবেশের পর আল্লাহর নির্ধারিত সময় পরিমাণ সেখানে অবস্থানের পর তাদেরকে বের করে নিয়ে আসা হবে। আর কিছু লোক সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে, তারা হল মুশরিক, আল্লাহকে অবিশ্বাসী কাফির। মৃত্যুকে কিয়ামত দিবসে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থলে এনে যবাহ করা হবে।
জান্নাত ও তন্মধ্যকার সকল বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জাহান্নাম ও তন্মধ্যকার সকল বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত ও জাহান্নام উভয়টা সৃষ্টি করেছেন ও সেগুলোর জন্য মাখলুকও সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো ও সেগুলোতে অবস্থিত বস্তুসমূহ ধ্বংসশীল নয়। সুতরাং যদি কোন বিদ'আতী ব্যক্তি সেগুলো ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর বাণী كُلُّ شَيْء هَالِكَ إِلَّا وَجْهَهُ সকল বস্তুই ধ্বংস হবে, একমাত্র তোমার প্রভু ব্যতীত) দ্বারা দলীল পেশ করে, তবে তাকে বলা হবে, এদ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে সকল বস্তু ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ হয়েছে, কেবলমাত্র সেগুলোই ধ্বংস হবে। আর জান্নাত ও জাহান্নام আল্লাহ তা'আলা স্থায়িত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন, ধ্বংস হওয়ার জন্য নয়। তাছাড়া সেগুলো হল আখিরাতের বস্তু, পার্থিব জগতের নয়। জান্নাতের হুররাও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় মৃত্যুবরণ করবে না। তারা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে স্থায়িত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন, ধ্বংসের জন্য নয়। তাদের ভাগ্যলিপিতে মৃত্যু লিপিবদ্ধ করা হয়নি। সুতরাং যে এর বিপরীত মত পোষণ করবে, সে বিদ'আতী এবং সত্যপথ বিচ্যুত।
আল্লাহ তা'আলা সাত আকাশ ও সাত যমীন স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। সর্বাপেক্ষা উপরের যমীন ও সর্বাপেক্ষা নিচের আকাশের মধ্যে পাঁচশত বছরের দূরত্ব রয়েছে। আর প্রত্যেক আকাশ হতে অপর আকাশের মধ্যে পাঁচশত বছরের দূরত্ব রয়েছে। সপ্তম আকাশের উপর পানি। পানির উপর আল্লাহ তা'আলার আরশ। আর আল্লাহ তা'আলা আরশে অধিষ্ঠিত। কুরসী হল তাঁর পায়ের স্থলে। আকাশে, যমীনে ও তার মধ্যবর্তী স্থলে, সমুদ্রের তলদেশে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। প্রতিটি বৃক্ষ, তরুলতা, বীজ উৎপন্ন হওয়ার স্থল, পতিত পাতা, সকল বাণীর সংখ্যা, বালুকারাশি, মাটি-কংকর, বৃহৎ পাহাড়-পর্বত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র সকল বিষয়ই তাঁর নখদর্পণে। বান্দার আমল, তার ফলাফল, তাদের কথা-বার্তা, শ্বাস-প্রশ্বাস সব কিছুই তিনি জানেন। কোন বস্তুই তাঁর নিকট গোপন নয়। তিনি সপ্তম আকাশের উপর আরশে অধিষ্ঠিত। (তাঁর শান মোতাবেক) তাঁর সামনে অগ্নি, জ্যোতি ও অন্ধকার সহ তার জ্ঞাত অনেক বস্তুরাশি দিয়ে আড়াল সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। সুতরাং যদি কোন বিদ'আতী ব্যক্তি এ আকীদার বিপরীত আকীদার উপর আল্লাহ তা'আলার এ বাণীর দ্বারা দলীল পেশ করে, যাতে রয়েছে وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।
مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে তিনি চতুর্থজন হিসাবে তিনি উপস্থিত থাকেন না, পাঁচ ব্যক্তির মাঝেও হয় না, যাতে তিনি ষষ্ঠ ব্যক্তি হিসাবে উপস্থিত থাকেন না। তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক, তিনিতো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানে থাকুক না কেন।
এ জাতীয় মুতাশাবিহ আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করে, তাহলে তাদের জবাবে বলা হবে, এটা হল আল্লাহ তা'আলার ইলম হিসাবে, অর্থাৎ তিনি সপ্ত আকাশে আরশের উপর অধিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও সব কিছুই জানেন। মাখলুকের সকল কিছুই তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। কোন স্থানই তাঁর ইলম বহির্ভূত নয়।
তিনি নিরাকার, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা। তিনি দানশীল, কৃপণ নন। তিনি সহনশীল, তাড়াহুড়াকারী নন। তিনি সংরক্ষক, তাঁর কখনো বিস্মৃতি ঘটে না। তিনি সকলের কাছেই, কখনো উদাসীন নন। তিনি কথা বলেন ও দেখেন, হাসেন, সন্তুষ্ট হন, কোন বস্তু পসন্দ করেন আবার কোন বস্তু অপসন্দ করেন। তিনি ক্রোধান্বিত হন, দয়া করেন, তাঁর সদৃশ কেউ নেই। তিনি প্রতি রাতের শেষাংশে সর্বনিম্নের আকাশে অবতরণ করেন। বান্দার অন্তর আল্লাহ তা'আলার দু'আংগুলের মাঝে। তিনি তাকে যেভাবে ইচ্ছা পরিবর্তন করেন।
তিনি হযরত আদম আ. কে তাঁর আকৃতিতে (তাঁর সর্বাপেক্ষা পসন্দনীয় আকৃতিতে) সৃষ্টি করেছেন। কিয়ামত দিবসে আসমান-যমীন তাঁর মুষ্টিতে থাকবে। তিনি তাঁর পা জাহান্নামে রাখলে তা সংকুচিত হয়ে যাবে, তিনি তাঁর পবিত্র হাত দ্বারা জাহান্নام থেকে কিছু লোককে বের করে আনবেন। জান্নাতীরা তাঁর দর্শন লাভ করবে। তিনি তাদেরকে সম্মাননা প্রদান করবেন ও তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। বান্দাকে তাঁর সামনে কিয়ামত দিবসে উপস্থিত করানো হবে। তখন তিনি স্বয়ং তাদের হিসাব নিবেন। তাঁর কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম। এটা তাঁরই কথা। কুরআন মাখলুক নয়। যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক মনে করবে, সে জাহমিয়্যাহ ফিরকার অনুসারী হয়ে কাফির প্রতিপন্ন হবে। যে কুরআনকে আল্লাহর বাণী স্বীকার করবে, কিন্তু মাখলুক না হওয়ার স্বীকারোক্তি দেবে না, সে আগেরজন থেকেও জঘন্য। যে বলবে, কুরআন তো আল্লাহর বাণী। কিন্তু আমাদের উচ্চারিত শব্দ ও তিলাওয়াত মাখলুক, সেও জাহমী হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ.-এর সাথে কথোপকথন করেছেন, নিজ হাতে তাকে তাওরাত কিতাব দান করেছেন। (কুরআন কারীমে এটার উল্লেখ রয়েছে) আদি হতে অন্ত পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা বক্তা।
স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। স্বপ্ন সত্য। সুতরাং কেউ স্বপ্ন দেখলে সে যেন সন্দেহাতীতভাবে কোন প্রকার রদবদল ব্যতীত সত্যাসত্য কোন আলিমের নিকট বর্ণনা করে। আলিম কোন রদবদল ছাড়াই তার ব্যাখ্যা করলে তা সত্য স্বপ্ন। আর নবীগণের স্বপ্নতো ওহী। সুতরাং কোন জাহেল, যে স্বপ্ন সম্পর্কে বিদ্রূপ করে ও স্বপ্নকে কিছুই মনে করে না। আর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان رؤيا المؤمن كلام মু'মিন ব্যক্তির স্বপ্ন হল বান্দার সথে রবের কথাবার্তা। তিনি এও বলেছেন, ان رؤيا من الله স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে থাকে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সাহাবা কিরামের আলোচনা উত্তমভাবে করতে হবে। তাদের পরস্পরে যে লড়াই ও বিরোধ হয়েছে, সেগুলোর আলোচনা হতে বিরত থাকতে হবে। সুতরাং যে সাহাবা কিরামকে বা তন্মধ্য হতে কাউকে মন্দ বলল, অথবা তাদের শানে গোস্তাখী করল বা তাদের প্রতি বিদ্রূপ করল বা কোন দোষ-ত্রুটি প্রকাশে সচেষ্ট হল, সে বিদ'আতী, রাফেযী ও ভ্রষ্ট। আল্লাহ তা'আলা তার কোন দান-সাদকা গ্রহণ করবেন না। বরং সাহাবায়ে কিরামকে মহব্বত করা সুন্নাত। তাদের জন্য দুআ করা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তাদের অনুসরণ নৈকট্য লাভের মাধ্যম। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পরে উম্মতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. অতঃপর হযরত উমর রা. অতঃপর হযরত উছমান রা. অতঃপর হযরত আলী রা.। কেউ কেউ এ স্তর বর্ণনার ক্ষেত্রে হযরত উসমান পর্যন্ত এসে বিরত রয়েছেন। (অর্থাৎ শুধু তিন জনের নাম ধারাক্রমে উল্লেখ করেছে। কিন্তু সঠিক কথা, হযরত উছমানের পরই হল হযরত আলী রা.-এর মর্যাদা) তারা হলেন, খোলাফায়ে রাশেদীন। তাঁরা হিদায়েত প্রাপ্ত। এ চার জনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সাহাবা অন্য সকল মানুষ (নবীগণ ব্যতীত) অপেক্ষা উত্তম। কারো জন্যই তাদের মন্দ উল্লেখ করা ও আলোচনা করা জাইয নেই। তাদের প্রতি বিদ্রূপ করাও কারো জন্য জায়েয নয়। যে ব্যক্তি এমন করবে, তাকে শাস্তি প্রদান করা তখনকার মুসলিম শাসকের উপর অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। বাদশাহর জন্য এ ধরনের ব্যক্তিকে ক্ষমা করাও জায়েয নয়; বরং তাকে শাস্তি প্রদান করা ও তাওবা করানো শাসকের জন্য অত্যাবশ্যক। যদি সে তাওবা করে, তাহলে তার তাওবা গ্রহণ করা হবে আর যদি তাওবা না করে, তাহলে তাকে পুনরায় শান্তি প্রদান করা, তাকে কারাগারের অন্ধ কুঠরীতে বন্দী করে রাখতে হবে। যতক্ষণ না সে মরে যায় বা তাওবা না করে। আমাদের উচিত, আরবদের অধিকার, মর্যাদা, উত্তমতা ও ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী হওয়ার বিষয়টির স্বীকৃতি প্রদান করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসের কারণে তাদেরকে মহব্বত করা উচিৎ। কেননা তাদের মুহাব্বত করা ঈমানের পরিচায়ক আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ করা নিফাকের পরিচায়ক।
যে হালাল পন্থায় ব্যবসা উপার্জনকে হারাম মনে করে, সে মূর্খ এবং অবশ্যই ভ্রান্ত; বরং যে সকল উপার্জনের মাধ্যম হালাল, সেগুলোকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং ব্যক্তির জন্য উচিত, স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য আল্লাহর ফযল তথা জীবিকা অন্বেষণ করা। সুতরাং কেউ যদি জীবিকা উপার্জনকে নাজায়েয মনে করে তা পরিহার করে, তবে সে সত্যপথ বিচ্যুত হয়ে পড়ল। আল্লাহর কিতাব, নবী হতে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হাদীস, নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের হতে এমন সব তথ্য ও তত্ত্ব, যা পরস্পরে সমর্থক এবং যার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম রা., তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের অনুসারীয় দীনদার, চরম সত্যবাদী বিদআত পরিপন্থী মহান ইমামদের কাছে পৌছে যায়। উক্ত বিষয়াবলীর সমন্বিত নামই হল দীন।
এতক্ষণ যা বর্ণনা করলাম, এটাই হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের চিরন্তন আকীদা ও বিশ্বাস। এ আকীদা আমরা তাদের কাছ থেকে শিখেছি, যাদের কাছ থেকে আমরা ইলম পেয়েছি, কুরআন-হাদীস পেয়েছি। যারা সবার কাছেই সমাদৃত ইমাম। যারা চির অনুসরণীয় ও চির বরণীয়। যাদের সত্তার উপর মিথ্যা, বিদআত, সংমিশ্রণ ও কপটতার সামান্যতম আঁচড়ও পড়েনি। তারা উক্ত আকীদাগুলো তাদের পূর্বসূরীদের কাছ থেকে জেনে আমাদের জানিয়েছেন। এ আকীদাগুলো আমরা ইমাম হরব রহ. রচিত المسائل المشهورة গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করলাম। তিনি হলেন ইমাম আহমদ, হযরত ইসহাক, হযরত সাঈদ বিন মানসূর ও আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রের শিষ্য ও তাদের সমস্তরের আলিম।
টিকাঃ
৪৮৪. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫
৪৮৫. সূরা ইউনুস, আয়াত : ৬২-৬৪
৪৮৬. সূরা হামীম, আয়াত: ৩০
৪৮৭. সূরা যুমার, আয়াত: ১৭-১৮
৪৮৮. সূরা তাওবা, আয়াত: ২০-২২
৪৮৯. সূরা শুরা আয়াত ১১-১৩
৪৯০. সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ১১
৪৯১. সূরা আহযাব, আয়াত: ৪৫-৪৭
৪৯২. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭১
৪৯৩. সূরা তাওবা আয়াত: ১১১
৪৯৪. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫-১৫৭
৪৯৫. সুরা সাফ, আয়াত: ১৩
৪৯৬. সূরা হাদীদ, আয়াত: ২১
৪৯৭. সূরা মু'মিনূন, আয়াত: ১-১১
৪৯৮. সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৫
৪৯৯. সূরা তাওবা, আয়াত: ১১২
৫০০. সূরা মারয়াম, আয়াত: ৬৩
৫০১. সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১৩৩-৩৬
৫০২. সূরা সাফফ, আয়াত: ১০-১৩
৫০৩. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৪৬
৫০৪. সূরা নাযি'আত, আয়াত: ৪০
৫০৫. সূরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬
৫০৬. সূরা মুজাদালাহ, আয়াত: ৭