📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 পূর্ণিমার চাঁদ সদৃশ্যা হাস্যেজ্জ্বল অবয়বে মহান আল্লাহর দর্শন

📄 পূর্ণিমার চাঁদ সদৃশ্যা হাস্যেজ্জ্বল অবয়বে মহান আল্লাহর দর্শন


এ অধ্যায়টি একিতাবে আলোচিত সকল অধ্যায় অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। যা অত্যন্তমর্যাদাকর। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের জন্য চক্ষুর শীতলতা। বিদআতী ও ভ্রষ্টদের জন্য কঠোরতম। জান্নাত প্রত্যাশীদের এটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য। জান্নাত প্রত্যাশাকারীদের এটাই প্রত্যাশা করা উচিত। অগ্রগামীদের এরই প্রতি অগ্রগামী হওয়া উচিত। আমলকারীদের এ উদ্দেশ্যেই আমল করা চাই। জান্নাতীরা এ নিআমত লাভ করার পর জান্নাতের অন্য সকল নিআমতের কথা ভুলেই যাবে। এ নিআমত হতে বঞ্চিত হওয়াই জাহান্নামীদের জন্য সর্বাপেক্ষা কঠিন শাস্তি। এ ব্যাপারে সকল আম্বিয়ায়ে কিরাম, সকল সাহাবা, সকল তাবেঈ ও পরবর্তী যুগে যুগে আগত সকলেই ঐক্যমত পোষণ করেছেন।

ধিকৃত বিদআতীরা, অধঃপতিত জাহমিয়া ফিরকার সদস্যরা, নিরাশ্বরবাদী নাস্তিকেরা, সমস্ত ধর্ম হতে বিচ্ছিন্ন বাতেনী ফিরকার লোকেরা, শয়তানের অনুসারী শিআরা, যারা নির্বোধ জাহান্নামীরাও আল্লাহ তা'আলার সিফাত অস্বীকারকারী ফিরআউন, ফিরকা বাতেনিয়া, ফিরকা শয়তানের রশিকে শক্তভাবে ধারনকারী, আল্লাহর রজ্জু ছিন্নকারী, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামকে গালমন্দকারী, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সাথে বিবাদকারী, আল্লাহ ও রাসূলের দীনের শত্রুদের সাথে আপোষকারী, এসকল ভণ্ড কূপমণ্ডকেরা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের বিষয়টিকে অস্বীকার করে। তারা আল্লাহ তা'আলা থেকে আড়ালেই থাকবে এবং তাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে। এরাই হল পথভ্রষ্ট, অভিশপ্ত শিআ সম্প্রদায়, এরাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুসারীদের শত্রু।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব এর প্রথম দলীল
আল্লাহ সে ব্যক্তির ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সকল মাখলুক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং সেরা জ্ঞানী। পৃথিবীবাসীর মধ্যে একমাত্র সেই সৌভাগ্যবানই আল্লাহর গোপন রহস্য সম্পর্কে অবগত সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি স্বীয় প্রভুর নিকট এ আরযি পেশ করেছেন, قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব। فَال لَنْ تَرَانِي وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي তিনি বললেন 'তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের দিকে লক্ষ্য কর, তা স্ব-স্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখবে। فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا وَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا যখন তাঁর প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল। رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ এআয়াতাংশটি কয়েকভাবে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের সম্ভাব্যতা প্রমাণ করে।

প্রথম যুক্তি : আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথনকারী সম্মানিত রাসূল হতে এমন বিষয়ের আবেদন কল্পনাও করা যায় না, যা সম্ভব ও সঠিক নয়; বরং তা নিতান্তই ভুল ও অসম্ভব। কিন্তু ইউনানীর দর্শনবেত্তা ও স্বমেধার অনুগামীদের ভ্রান্ত যুক্তি মতে আল্লাহকে পানাহার ও নিদ্রার অনুরোধ করা যেমন অসম্ভব ও ভুল, তেমনি তাঁকে দেখার অনুরোধ জ্ঞাপনও ভুল।

বিস্ময় লাগে, কিভাবে সাবী (নক্ষত্রপূজক) অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক মুশরিক অভিশপ্ত জাহমিয়ারা ও খোদাদ্রোহীদের অনুসারী জুটেছে। এরা কি মূসা আ. এর চেয়েও আল্লাহ তা'আলার মারিফাত অধিক লাভ করেছিল? কোন বস্তু আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করা সমীচীন নয় বা কোনটি সমীচীন, এ ব্যাপারে কি তারা মূসা আ. অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত ছিল? তারা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা সম্পর্কে মূসা আ. অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত? (না বিষয়টি এমন নয়; বরং মূসা আ.-ই আল্লাহ তা'আলার অধিক মারিফাত হাসিল করেছিলেন। তিনিই অধিক জ্ঞাত, কোন বস্তু হতে আল্লাহ তা'আলাকে পবিত্র বিশ্বাস করতে হবে আর কোন বস্তুর আরযি তাঁর নিকট পেশ করা। সম্ভব। আর কোন বস্তুর আরযি পেশ করা সম্ভব নয়। এর দ্বারাই এটা প্রতীয়মান হয়, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ অসম্ভব নয়; বরং সম্ভব। কিন্তু দুনিয়াতে আমাদের শারীরিক সত্তা রূহানী সত্তার উপর বিজয়ী বলেই প্রভুর দর্শন সম্ভব হয় না। নয়তো বিষয়টি সম্ভব বলেই পরকালে যখন আমাদের পবিত্র রূহানী সত্তার প্রাধান্য হবে, তখন আমরা আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব। ইনশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় যুক্তি : আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ.-এর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেননি। যদি তা অসম্ভবই হত, তাহলে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতেন। হযরত মূসা আ.-এর এ আবেদন হযরত ইবরাহীম আ.-এর এ আবেদনের মতই। যখন তিনি আবেদন করেছিলেন, رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর, আমাকে দেখাও।

হযরত ঈসা আ. এর আকাশ থেকে খাবার অবতরণের আবেদনও অনুরুপ। যদি তাদের এ আবেদন সঠিক না হত, তবে আল্লাহ তা'আলা তাদের আবেদন তেমনিভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন, যেমনিভাবে হযরত নূহ আ.-এর স্বীয় পুত্রকে প্লাবন হতে রক্ষার আবেদন আল্লাহ তা'আলা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা সে প্রসঙ্গে বলেছেন فَلَا تَسْأَلْنِ مَالَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও।

قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُنْ مِنَ الْخَاسِرِينَ সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে যাতে আপনাকে অনুরোধ না করি, এজন্য আমি আপনার আশ্রয় চাচ্ছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমাকে দয়া না করেন ,তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।

তৃতীয় যুক্তি : হযরত মূসা আ.-এর আবেদনের জবাবে আল্লাহ তা'আলা বললেন, لَنْ تَرَانِي অর্থাৎ তুমি কখনো আমায় দেখতে পাবে না, আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি لَنْ تَرَانِي। এমনিভাবে এও বলেননি, আমার দর্শন সম্ভব নয়, উভয় উত্তরের মধ্যকার পার্থক্য একটু চিন্তা করলেই বুঝে আসবে।

لَنْ تَرَانِي দ্বারা বুঝা যায়, দর্শন তো সম্ভব কিন্তু এ পার্থিব জগতে আমার দর্শন লাভের শক্তি তোমার নেই। আর لَنْ تَرَانِي দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যেহেতু আমার দর্শন কাজটিই কোনো মতেই হতে পারে না। সুতরাং তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। لَنْ تَرَانِي দ্বারা জবাব প্রদান দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, দর্শনকার্য মূলত সম্ভব।)

সুতরাং এর দ্বারা এটাই বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলা দর্শন তো দিতে পারেন, কিন্তু হযরত মূসা আ.-এর এ পার্থিব জগতে তা বরদাশত করার শক্তি নেই।

চতুর্থ যুক্তি : হযরত মূসা আ.-এর আবেদনের পেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَكِنْ انْظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, তা স্ব-স্থানে স্থির থাকলে তুমি আমাকে দেখবে। এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা'আলা এ কথাই বুঝিয়েছেন, পাহাড় অত্যন্ত মযবুত ও দৃঢ় হওয়া সত্ত্বেও স্ব-স্থানে স্থির থাকতে পারেনি, তবে দুর্বল মানব কিভাবে স্থির থাকতে সক্ষম হবে?

পঞ্চম যুক্তি : আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই পর্বতকে স্ব-স্থানে স্থির রাখতে সক্ষম, এটি কোন অসম্ভব বিষয় নয়, বরং সম্ভব বিষয়। আর আল্লাহ তা'আলা সম্ভাব্য বিষয়ের সাথেই তাঁর দর্শনকে শর্তযুক্ত করেছেন। সুতরাং যদি দর্শন মূলত সম্ভব না হত, তবে তাকে সম্ভাব্য বিষয়ের সাথে শর্তযুক্ত করতেন না। যদি দর্শন মূলেই সম্ভব না হত, তবে তা ঐ উক্তির মতো হত, যেদিন পর্বত স্ব-স্থানে স্থির থাকবে, সে দিন আমি পানাহার করব, ঘুমাব। কেননা উভয়টি সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রে সমান।

ষষ্ঠ যুক্তি : আল্লাহ তা'আলার বাণী فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল।

এটিই আল্লাহ তা'আলার দর্শনের সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ। কেননা পর্বত, যা একটি জড় বস্তু, ছাওয়াব-আযাব কোনটিই তার সাথে আবর্তিত হয় না, তাহলে তাতে যখন আল্লাহ তা'আলার দর্শনের জ্যোতি প্রকাশ পেতে পারে, তবে নবী-রাসূল ও ওলিগণকে কেন আল্লাহ তা'আলা দর্শন দিবেন না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, পার্থিব জগতে পর্বত অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুদৃঢ় হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু স্ব-স্থানে স্থির থাকতে পারেনি, তবে দুর্বল মানুষ কি করে স্থির থাকবে? (কিন্তু আখিরাতে দর্শনে কোন সমস্যা হবে না)।

সপ্তম যুক্তি : আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই হযরত মূসা আ.-এর সাথে কথোপকথন করেছেন, তাকে সম্বোধন করেছেন, তাঁর সাথে গোপন কথা বলেছেন। সুতরাং যে সত্তার সাথে কোন মাধ্যম ব্যতীতই কথোপকথন করা সম্ভব, তার দর্শন তো আরো ভালোভাবে সম্ভব। তাই আল্লাহ তা'আলার দর্শনের সম্ভাব্যতাকে অস্বীকার করার দ্বারা তার সাথে কথোপকথনের সম্ভাব্যতাকে অস্বীকার করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। সুতরাং তাদের মত হওয়া দরকার যে, আল্লাহ তা'আলাকে যেমনিভাবে কেউ দেখতে পাবে না, তেমনি কেউ তাঁর সাথে কথোপকথনও করতে পারবে না।

এজন্যই তো হযরত মূসা আ. যখন তাঁর সাথে আল্লাহ তা'আলার কথোপকথনকে শুনতে পেলেন, তখন তাঁর দর্শন লাভের আরযি পেশ করলেন, তিনি তাকে সম্ভবই মনে করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলেননি, এটা অসম্ভব; বরং বলেছেন, তুমি তা বরদাশত করতে পারবে না, যেমনিভাবে পর্বত প্রভুর নূরের জ্যোতিতে স্ব-স্থানে স্থির থাকতে পারেনি।

মোদ্দাকথা, আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ لَن تَرَانِيْ এটা ভবিষ্যতের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বুঝায়। এ শব্দটি চিরকালীন নিষেধাজ্ঞা বুঝায় না। এর সদা أبدا। (কখনোই) শব্দ যুক্ত করলেও তা চিরকালীন নিষেধাজ্ঞা বুঝায় না। এখানে তাও করা হয়নি। কুরআনুল কারীমের অন্যত্র আল্লাহ জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলেছেন وَلَن يَتَمَنُوهُ أَبَدًا তারা কিছুতেই আল্লাহর কাছে কিছু চাইতে পারবে না। অথচ অন্য আয়াতে আছে, তারা জাহান্নামে তার প্রহরীকে ডেকে বলবে, وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ হে মালিক! তোমার প্রতিপালক যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন (অর্থাৎ তারা মৃত্যু কামনা করবে) তাহলে وَلَن يَتَمَنُّوْهُ أَبَدًا এর মধ্যে أبدا অর্থাৎ সর্বদায়ের শর্ত থাকা সত্ত্বেও যেহেতু চিরকালীন নিষেধ বুঝায়নি তবে لن ترانی এর মধ্যে أبدا অর্থাৎ চিরকালীন শর্ত না থেকেও কিভাবে সর্বদায়ের নিষিদ্ধতা বুঝাতে পারে? যেহেতু সর্বদায়ের নিষিদ্ধতা এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় না, তাহলে কোন এক সময় উক্ত কাজ অর্থাৎ দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন হওয়া সম্ভব। এটাই হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মত।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব এর দ্বিতীয় দলীল
وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ مُلَاقُوهُ এবং আল্লাহকে ভয় কর আর জেনে রাখ, তোমরা আল্লাহর সম্মুখীন হতে যাচ্ছ।

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, تَحْيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের প্রতি অভিবাদন হবে “সালাম।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّه সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُلَاقُو الله যাদের প্রত্যয় ছিল আল্লাহর সহিত তাদের সাক্ষাত ঘটবে, তারা বলল।

আরবী ভাষাবিদগণ এক্ষেত্রে একমত, نَاء শব্দটি যদি এমন কোন প্রাণীর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, যা অন্ধ নয় ও সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা হতে মুক্ত। তখন نَاء দ্বারা উদ্দেশ্য হল পরিদর্শন তথা স্ব-চক্ষে দেখা।

এমতের উপর এ বলে প্রশ্ন করা ঠিক হবে না, এরূপ نَاء শব্দটি তো মুনাফিকদের প্রতি করা হয়েছে। তাহলে কি তারা আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে? যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَأَعْقَبَهُمْ نَفَاقًا في قُلُوبِهِمْ إِلى يَوْمٍ يَلْقَوْنَهُ পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে কপটতা স্থির করলেন, আল্লাহর সহিত তাদের সাক্ষাৎ দিবস পর্যন্ত।

(এ ক্ষেত্রে বুঝা যায়, মুনাফিকরাও আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সাক্ষাত করবে, তাহলে এর দ্বারা কি দীদার তথা আল্লাহ তা'আলার দর্শন উদ্দেশ্য?) এর দ্বারা প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না এ জন্য যে, সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, কিয়ামত দিবসে মুনাফিকরা এমনকি কাফিররাও আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে।

আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ প্রসঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হতে তিনটি মতামত রয়েছে।

প্রথম মত: শুধু মাত্র মু'মিনরাই আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে।
দ্বিতীয় মত: হাশরের ময়দানে মু'মিন কাফির সকলেই আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে, তখন কাফেরদের সামনে আবরণ ফেলে দেওয়া হবে। এরপর তারা আল্লাহ তা'আলাকে আর দেখতে পাবে না।
তৃতীয় মত: শুধু কাফিররা আল্লাহকে দেখতে পাবে না। মুমিন ও মুনাফিক আল্লাহকে দেখতে পাবে।

এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন يَا أَيُّهَا الإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَى رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ (হে মানুষ! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট পৌছা পর্যন্ত কঠোর সাধনা করে থাক, পরে তুমি তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে।

এ আয়াতে فَمُلَاقِيه এর মধ্যকার যমীরের مرجع তথা প্রত্যাবর্তন স্থলের ব্যাপারে দু'টি সম্ভাবনা রয়েছে। এক: তার مرجع তথা প্রত্যাবর্তনস্থল হল আমল। অর্থাৎ হে মানুষ! তুমি তোমার আমলনামা পেয়ে যাবে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষ ঐ কিতাব দেখতে পাবে, যাতে তাদের আমল লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দুই: যমীরের مرجع তথা প্রত্যাবর্তন-স্থল হল, আল্লাহ তা'আলা। তখন তার অর্থ হল, হে মানুষ! তোমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাত করবে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুত সাক্ষাৎ।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব; এর তৃতীয় দলীল
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ আল্লাহ শান্তির আবাসের (জান্নাত) দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন। لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرٌ وَلَاذِلَّةٌ أولئك أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ যারা মঙ্গলকর কাজ করে, তাদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরো অধিক। কালিমা ও হীনতা তাদের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন করবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।

এআয়াতে الْحُسْنَى দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত, আর زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার দীদার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম রা. তার এ ব্যাখ্যাই করেছেন। যেমন ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহ মুসলিমে স্ব-সনদে হযরত সুহাইব রা. হতে বর্ণনা করেন, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ وَلَا يَرْهَقُ وُjُوهَهُمْ قَتَرٌ وَلَاذِلَّةٌ أولئك أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ বললেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের পর এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীরা! তোমাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি পতিশ্রুতি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তা পূর্ণ করতে চান। তখন জান্নাতীরা বলবে, কি সে প্রতিশ্রুতি?

তিনি কি আমাদের নেকীর পাল্লা ভারী করে দেননি? তিনি কি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করেননি? তিনি কি আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাননি? আল্লাহ তা'আলা তখন স্বীয় বড়ত্বের পর্দা সরিয়ে তাদের সামনে দৃশ্যমান হলে জান্নাতীরা আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে। এটা তাদের নিকট তাদেরকে প্রদত্ত সকল নিআমত অপেক্ষা পসন্দনীয় হবে। আর আল্লাহ তা'আলার বাণীতে زيادة দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।

হাসান বিন আরাফাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, للذين أحسنوا العمل في الدنيا الحسنى وهى الجنة অর্থাৎ যে সকল লোক দুনিয়াতে নেক আমল করবে, তাদের জন্য রয়েছে زيادة والزيادة هى النظر إلى وجه الله تعالى الحسنى (যিয়াদাহ) হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার বা দর্শন লাভ।

মুহাম্মদ ইবনে জারীর রহ.স্ব-সনদে হযরত কা'ব ইবনে আজরাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম للذين أحسنوا الحسنى وزيادة এর ব্যাখ্যায় বলেন, زيادة (যিয়াদাহ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ।

ইবনে জারীর রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে للذين أحسنوا وزيادة الحسنى এর মধ্যস্থিত زيادة (যিয়াদাহ)-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, الحسنى দ্বারা উদ্দেশ্য হল জান্নাত। আর زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহর দীদার।

আসাদুস্ সুন্নাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন একজন ঘোষক পাঠাবেন, যে ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীরা! আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে হুসনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হুসনা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত। তিনি তোমাদেরকে زيادة (যিয়াদাহ) এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ। সকল জান্নাতীই তার এ ঘোষণা শুনতে পাবে।

ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে এক ঘোষককে ঘোষণা করার নির্দেশ প্রদান করবেন। সে ঘোষণা করবে। তার ঘোষণা অগ্র-পশ্চাতের সকলেই শুনতে পাবে। সে বলতে থাকবে, হে জান্নাতীরা! আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে (حسنی) হুসনা) ও (زيادة) যিয়াদাহ)-এর প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। হুসনা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত আর যিয়াদাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ।

ইবনে জারীর রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ বকর রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি للذين أحسنوا الحسنى وزيادة এর ব্যাখ্যায় বলেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ।

হযরত জারীর রহ. এর এ সনদেই হযরত হুযায়ফা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা।

আলী ইবনে ঈসা রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মুসা আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা এক ঘোষণাকারীকে প্রেরণ করবেন, সে ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীরা! তোমাদেরকে তোমাদের প্রভু যে সকল বিষয়ের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন, তোমরা কি সে বস্তু লাভ করেছ? জান্নাতীরা তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান ও অন্যান্য নিআমতের প্রতি তাকিয়ে বলবে, হ্যাঁ, আমরা সব কিছুই লাভ করেছি। ফিরিশতা তখন বলবেন, للذين أحسنوا الحسنى وزيادة | এখানে زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে আবূ তামীমা রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. কে বصرার জামে মসজিদে লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতে শূনেছি, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন একজন ফিরিশতা জান্নাতীদের নিকট প্রেরণ করবেন, সে বলবে, হে জান্নাতীরা! তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুত সব বস্তুই অর্জন করেছ? তারা তখন তাদের পোশাক, অলংকার, নহরসমূহ ও পূতঃপবিত্র স্ত্রীদের দেখে বলবে, হ্যাঁ, সব কিছুই লাভ করেছি। ফিরিশতা পুনরায় অনুরূপ প্রশ্ন করবে। জান্নাতীরাও পূনরায় অনুরূপ জবাব দিবে। এভাবে তিনবার প্রশ্নোত্তর করার পর ফিরিশতা বলবে, তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুত কোন কিছু থেকে যায়নি তো? তারা উত্তরে বলবে, না, কোন কিছুই থেকে যায়নি।

ফিরিশতা তখন বলবে, একটি বস্তু অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তা হল আল্লাহ اللذين أحسنوا الحسنى وزيادة -হাসনী দ্বারা উদ্দেশ্য হল জান্নাত। আর زيادة (যিয়াদাহ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা।

আসবাত ইবনে নাসরের তাফসীরে সনদসহ হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, এ আয়াতে لحسنى (হুসনা) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত। আর زيادة (যিয়াদাহ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা আর قتر (কতারুন) দ্বারা উদ্দেশ্য কৃষ্ণতা তথা মলিনতা।

আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লা রহ. আমির ইবনে সা'দ রহ. ঈসমাঈল ইবনে আব্দুর রহমান আস সুদ্দী রহ., যাহ্হাক ইবনে মুযাহিম রহ. আব্দুর রহমান ইবনে ছাবিত রহ. আবূ ইসহাক আস সায়ী রহ. কাতাদাহ রহ. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. হাসান বসরী রহ. ইকরিমাহ রহ. মাওলা ইবনে আব্বাস রা. মুজাহিদ ইবনে জাবির রহ. বলেন, الحسنى (আল হুসনা) দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাত আর زيادة (যিয়াদাহ) দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা।

একাধিক পূর্বসূরী হতে বর্ণিত আছে, তারা বলেছেন لايرهق وجوههم قتر ولاذلة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভের পর কখনো তারা মলিনতা ও হীনতা এ অবস্থার সম্মুখীন হবে না।

এ ব্যাপারে সহীহ হাদীস বর্ণিত রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু زيادة কে الحسنى এর উপর عطف করেছেন, তাহলে বুঝা যায় এ দু'টি স্ব-তন্ত্র দু'টি বস্তু। যারা زيادة এর ব্যাখ্যা করেছেন ক্ষমা ও সন্তুষ্টি দ্বারা, তাদের সাথে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীস ও তাফসীরের সাথে কোন বিরোধ নেই। কেননা, আল্লাহ তা'আলার দীদারের জন্য ক্ষমা ও সন্তুষ্টি পূর্বশর্ত। কারণ, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করেছেন ও যাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে। অন্যরা তা হতে বঞ্চিত থাকবে।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব; এর চতুর্থ দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ অবশ্যই সেই দিন তারা তাদের প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে”।

উক্ত আয়াত দ্বারা এভাবে দলীল পেশ করা যায়, আল্লাহ তা'আলা তাঁর দর্শন থেকে বঞ্চিত হওয়াকে কাফিরদের শাস্তি বলে সর্বাপেক্ষা কঠোর ও কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। তাহলে মু'মিনরাও যদি দর্শন লাভ করতে না পারে ও কথোপকথন করতে না পারে, তবে উভয় দলের (মু'মিন ও কাফির) মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়? এ আয়াত দ্বারা ইমাম শাফেঈ রহ. সহ অন্য ইমামগণও দলীল পেশ করেছেন।

ইমাম তাবারানী রহ. ইমাম মুযানী রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি এর ব্যাখ্যায় বলতে শুনেছি, এ আয়াত এ কথার দলীল, আল্লাহ তা'আলার নেক বান্দাগণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে।

ইমাম হাকিম রহ. আসাম্ম রবী ইবনে সুলাইমান রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি ইমাম শাফেঈ রহ. এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর নিকট মিসরের সাঈদ শহর থেকে একটি ইস্তেফতা (প্রশ্ন) এল। প্রশ্নটি ছিল, আপনি আল্লাহর বাণী كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ব্যাপারে কী বলেন? তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হলে যেহেতু আড়ালে থাকবেন, তাহলে বুঝা যায়, সন্তুষ্ট থাকলে তাঁর বন্ধুদের সামনে দৃশ্যমান হবেন এবং তাদেরকে দর্শন দিবেন।

রবী বলেন, আমি বললাম, হে আবূ আবদুল্লাহ! আপনি কি এ মতই পোষণ করেছেন? তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, আমি এ মতই পোষণ করেছি। এ কারণেই আমি আল্লাহর ইবাদত করি।

যদি ইমাম শাফেঈ রহ. এর আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে বিশ্বাস না থাকত, তবে সে তাঁর ইবাদতই করত না। ইমাম তাবারানী রহ. শরহে সুন্নাহতে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

আবূ যুরআহ রাযী রহ. স্ব-সনদে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল হাকাম হতে বর্ণনা করেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মু'মিন-কাফির সকলেই কি কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে?

ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, ইমাম শাফেঈ রহ. কে আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন, إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَۙ বললেন, পক্ষান্তরে মু'মিনরা আল্লাহ তা'আলা হতে আড়লে থাকবে না।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব এর পঞ্চম দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, لَهُم مَّا يَشَاؤُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ এখানে তারা যা কামনা করবে তা-ই পাবে আর আমার নিকট রয়েছে তারও অধিক।

ইমাম তাবারানী রহ. বলেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আলী রা. ও হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, 'মাযীদ' দ্বারা উদ্দেশ্য হল, إِلَى النَّظَرُ وَجْهِ الله আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা। তাবেঈদের মধ্যে যায়দ ইবনে ওয়াহাব রহ. প্রমুখও এ ব্যাখ্যাই করেছেন।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব এর ষষ্ঠ দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ তিনি দৃষ্টির অধিগম্য নন, কিন্তু দৃষ্টিশক্তি তার অধিগত।

উক্ত আয়াত দ্বারা অত্যন্ত চমৎকারভাবে দলীল পেশ যায়। এ আয়াতকেই দর্শন লাভ না হওয়ার দলীল মনে করা হয়ে থাকে, কিন্তু গ্রন্থকার একে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুন্দরভাবে দর্শন লাভের সম্ভাব্যতার দলীল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, বাতিলপন্থীরা যে আয়াত ও সহীহ হাদীসকে ভ্রান্ত মতবাদের দলীল হিসাবে গ্রহণ করে থাকে, তারই মাঝে তাদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনের দলীলও নিহিত থাকে। উল্লিখিত আয়াতটি এ শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত।

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ না হওয়া হতে দীদার লাভ হওয়ার দলীল অধিক সুস্পষ্ট। কেননা, যেহেতু এটা আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশংসার স্থলে ব্যবহার করেছেন। (এর পূর্বে ও পরে উভয় স্থানেই আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা বিবৃত হয়েছে) আর এ কথা সর্বজন বিদিত, প্রশংসা এমন বস্তু দ্বারাই করা হয়, যার অস্তিত্ব রয়েছে, যার অস্তিত্ব নেই এমন বস্তু বা বিষয় দ্বারা প্রশংসা করা হয় না। কেননা, তাতে কোন পূর্ণতা নেই। সুতরাং তা দ্বারা প্রশংসা করা যায় না।

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় প্রশংসা এমন অনস্তিত্বশীল বস্তু দ্বারা করেছেন, যার অস্তিত্ব অন্য অস্তিত্বশীল বস্তুর অধীনে রয়ে গেছে। (অর্থাৎ মূল বিষয়টা অনস্তিত্বশীল আর এ অস্তিত্বশীল বস্তুর অধীনেই অনস্তিত্বশীল বস্তুটা পাওয়া যায়।)

যেমন আল্লাহ তা'আলা তার প্রশংসায় উল্লেখ করেছেন, তাকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। এর দ্বারা মূল উদ্দেশ্য হল, তাঁর চিরস্থায়িত্বের গুণ বর্ণনা করা। স্থায়িত্বের মধ্যে তখনই পূর্ণতা সাধিত হবে যখন তন্দ্রা ও নিদ্রা তাকে স্পর্শ না করবে। কেননা, এ দুটো বিষয় অপূর্ণতার পরিচায়ক।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, তার কখনো মৃত্যু আসবে না। এতেই নিহিত রয়েছে জীবনে পূর্ণাঙ্গতা। সুতরাং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল পূর্ণ জীবন প্রমাণসিদ্ধ করা।

এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাঁকে কখনো ক্লান্তি ও অবসাদ স্পর্শ করে না। এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে, তিনি পূর্ণ শক্তির অধিকারী।

এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাঁর কোন অংশীদার নেই, তাঁর স্ত্রী নেই, পুত্র নেই, কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে তার প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে।

এমনিভাবে তিনি বলেন, তিনি পানাহার করেন না। এর মধ্যে তাঁর অমুখাপেক্ষিতার পূর্ণতা নিহিত রয়েছে।

এমনিভাবে তিনি বলেন, তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ কোন সুপারিশ করতে পারবে না। এর মধ্যে তাঁর একত্ববাদ ও মাখলুক থেকে তাঁর অমুখাপেক্ষিতার পূর্ণতা নিহিত রয়েছে।

এমনিভাবে তিনি বলেছেন, তিনি কখনো যুলুম করেন না। এরই মধ্যে তাঁর জ্ঞানের পূর্ণতা ও ইনসাফের পূর্ণতা রয়েছে।

এমনিভাবে তাঁর অমুখাপেক্ষিতা, ভুলে না যাওয়া ও কোন বস্তু তাঁর অজ্ঞাত না থাকার মধ্যে জ্ঞানের পূর্ণতা ও সকল বস্তু তাঁর আয়ত্বে থাকার বিষয়টি নিহিত রয়েছে।

এমনিভাবে তাঁর অনুরূপ কোন কিছু না থাকার বিষয়টি তার সত্তার ও সিফাতের পূর্ণতাকে বুঝায়।

আল্লাহ তা'আলা এমন কোন না বিধায়ক বিষয় দ্বারা নিজের প্রশংসা করেননি, যার দ্বারা কোন হ্যাঁ-সূচক বিষয় সাব্যস্ত হয় না। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার বাণী لا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ কে বিশ্লেষন করলে বুঝা যায়, যদি একথা বলা হয়, আল্লাহ তা'আলাকে কখনো কেউ দেখবে না। তাহলে বলব, এটা কোন প্রশংসাই নয়। এতে কোন পূর্ণতাই নেই। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দর্শন তো সম্ভব, কিন্তু যাথাযোগ্যভাবে কারো পক্ষে তা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী وَمَا يَعْرُبُ عَنْ رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَابٍ مبين আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অণু পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচরে নয়।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبِ আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।

কেননা, পূর্ণ ক্ষমতা ও শক্তি একমাত্র তাঁরই। এমনিভাবে তাঁর বাণী وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তিনি ইনসাফগার এবং لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তিনি চিরস্থায়ী-চিরঞ্জীব। এমনিভাবে لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তিনি মহীয়ান, গরীয়ান, মহান ও কোন দৃষ্টিশক্তি তাকে বেষ্টন করতে পারবে না। কেননা, আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে إدراك। অর্থাৎ বেষ্টন করে নেওয়া, যা رؤیت অর্থাৎ দেখা হতে অতিরিক্ত বিষয়। যেমন মূসা আ.-এর বাণী ইসরাঈল ফিরআউন উভয় সম্প্রদায় যখন মখোমুখি হয়, তখন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ অতঃপর যখন দুই দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা বলল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। قَالَ মুসা আ. বললেন, কখনই নয়।

(উক্ত আয়াতে رؤية ادراك উভয়টিই ব্যবহৃত হয়েছে) সুতরাং হযরত মূসা আ. رؤية তথা তাদের পরস্পরকে দেখার বিষয়টি মানা করেননি, বরং ادراك )ইদরাক) অর্থাৎ বেষ্টিত হয়ে পড়ার ও ধরা পড়ার বিষয়টি মানা করেছেন। তারা انا لمدركون দ্বারা انا لمريتون অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে দেখে ফেলেছি, এটা উদ্দেশ্য নেয়নি। সুতরাং হযরত মূসা আ. ১৮ দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন ফিরআউন তোমাদেরকে বেষ্টন করে নিতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলাও তাই বলেছেন, لا تخاف دركا অর্থাৎ বেষ্টিত হয়ে যাওয়ার ভয় করো না। সুতরাং ادراك 3 رؤية উভয়টি একত্রেও পাওয়া যেতে পারে এবং ভিন্নও পাওয়া যেতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ তো সম্ভব; কিন্তু দৃষ্টিশক্তি দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করে নেওয়া সম্ভব নয়। সাহাবায়ে কিরাম ও আইম্মায়ে কিরামও এ আয়াতের এ ব্যাখ্যাই করেছেন।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. لَا تُدْرِكُهُ الأبصار এর অর্থ করেছেন, তাকে দৃষ্টিশক্তি বেষ্টন করে নিতে পারবে না।

কাতাদাহ রহ. বলেন, তিনি হলেন মহান। দৃষ্টিশক্তি তাঁকে বেষ্টন করে নিতে পারবে না।

আতিয়্যাহ রহ. বলেন, জান্নাতীরা আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকাবে কিন্তু তাদের দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ তা'আলাকে বেষ্টন করতে পারবে না। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা'আলা সকল জান্নাতীকে বেষ্টন করে নিবেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী الأبصار وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبصار لَا تُدْرِكُهُ দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।

সুতরাং মু'মিনরা তো আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে, কিন্তু তাদের দৃষ্টিশক্তি তাঁকে বেষ্টন করে নিতে সক্ষম হবে না। তবে তিনি সব কিছুই বেষ্টন করে নিবেন। এমনিভাবে তিনি মাখলুকের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকে তার কথা শ্রবণ করাতে পারেন, কিন্তু মাখলুক তাঁর কথা আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে না। এমনিভাবে তিনি মাখলুককে তাদের সকল জ্ঞানসহ জানেন, কিন্তু মাখলুক তাঁর ইলম সম্পর্কে জানে না। আল্লাহ তা'আলার সিফাত না থাকার পক্ষে দলীল প্রদানকারীদের لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئٌ দ্বারা দলীল পেশ করাও তদ্রূপ। অর্থাৎ এটাই আল্লাহ তা'আলার সিফাতের পূর্ণতা ও সৌন্দর্যকে অধিকারে নির্দেশক দলীল। তাঁর সিফাতের পূর্ণতা, আধিক্য, ব্যাপ্তি ও মহানতার ফলে তাঁর কোন তুলনা হয় না।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ তিনিই ছয় দিবসে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। (তাঁর শান মোতাবেক) يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয়। وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও যা কিছু উত্থিত হয়। وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তা দেখেন”।

উল্লিখিত আয়াত এ কথার প্রমাণ বহন করে, আল্লাহ তা'আলা মাখলুক হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সব কিছুকেই তাঁর সত্তার বাইরে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি তাঁর ইলম ও কুদরত, শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমে সকল মাখলুককে বেষ্টন করে রেখেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার বাণী أَيْنَمَا كُنتُمْ এর অর্থ তাই।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব এর সপ্তম দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إلى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ সেদিন কিছু কিছু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

যদি উক্ত আয়াতকে তার বাহ্যিক অর্থে রাখা হয় ও তাতে কোন পরিবর্তন না করা হয় ও তার বক্তাকে মিথ্যা হতে মুক্ত রাখা হয়, তাহলে আয়াতটিকে একথার সুস্পষ্ট ঘোষণাকারী রূপে পাবে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলাকে অবশ্যই চর্মচক্ষে দেখা যাবে। কিন্তু যদি তা অস্বীকার করা হয় (অর্থাৎ আয়াতকে তার বাহ্যিকতার উপর না রাখা হয়) এবং তাকে বিকৃত করা হয়, যাকে বিকৃতকারীরা তা'বীল বলে থাকে, তাহলে কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, মীযান, হিসাবের আয়াতগুলোকে বিকৃত করা এ আয়াতগুলোকে বিকৃত করা অপেক্ষা অধিকতর সহজ। এমনিভাবে দুনিয়াতে যত বাতিল ফিরকা রয়েছে, তারা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রমাণ করার জন্য আয়াতের কোন না কোন ব্যাখ্যা বের করবেই। এটাই দীন- দুনিয়ায় বিশৃংখলা সৃষ্টি করে থাকে।

আয়াতে রয়েছে, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إلى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ সেদিন কিছু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

এখানে দু'টি বিষয়, এক: نظر শব্দটিকে বিযুক্ত করা হয়েছে وجوه এর দিকে, যা দৃষ্টি নিক্ষেপের স্থল। কেননা, চক্ষ চেহারাতেই রয়েছে।

দুই. نظر শব্দটিকে رب এর দিকে إلى অব্যয়ের মাধ্যমে ধাবিত করা হয়েছে। সুতরাং এর দ্বারা বুঝা যায়, চর্মচক্ষু দ্বারাই আল্লাহ তা'আলাকে দেখা যাবে। ইয়াযীদ ইবনে হারূন রহ. মুবারক রহ. এর সূত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, 'চোখ তাকালো চোখের প্রভুর দিকে। তখন তাঁর আলোয় চোখ উজ্জ্বল হয়ে গেল।' সুতরাং হে সুন্নী মুসলমানগণ! তোমরা উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম রা., তাবেঈন ও আইম্মা কিরামের প্রদত্ত তাফসীর ভাল করে শুনে নাও।

ইবনে মারদাওয়ায়হ রহ. স্বীয় তাফসীরে স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ এর বাখ্যায় বলেন, ناضرة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মুখমণ্ডলকে সজীব রাখা হবে। إلى رَبِّهَا نَاظرة প্রসঙ্গে বলেন, তারা তাদের প্রভুর প্রতি তাকিয়ে থাকবে।

ইকরিমাহ রা. وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضرة প্রসঙ্গে বলেন, নিআমত লাভের কারণে তাদের চেহারা অত্যন্ত সজীব হবে। إلى رَبِّهَا نَاظَرَةٌ প্রসঙ্গে বলেন, তারা তাদের প্রভুর দর্শন লাভ করবে। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতেও অনুরূপ ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর সকল মুফাস্সিরেরও মতামত এটাই।

আল্লাহকে দেখা সম্ভব-এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম রা. হতে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে যে সকল বর্ণনা রয়েছে, তার মধ্যে মুতাওয়াতির বর্ণনাও রয়েছে, যা নিম্নে উল্লিখিত সাহাবায়ে কিরাম হতে বর্ণিত রয়েছে।

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাজালী রা. হযরত সুহাইব ইবনে সিয়ান আর-রূমী রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হযরত আদী ইবনে হাতেম তাঈ রা. হযরত আনাস বিন মালিক রা. হযরত বুরইদাহ ইবনে আল হুসাইব আল আসলামী রা. হযরত আবূ রাযীন আল উকায়লী রা. হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী রা. হযরত আবূ উমামাহ আল বাহিলী রা. হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত রা. হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়শা রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হযরত আম্মার ইবনে রুওয়ায়বাহ রা. হযরত সালমান ফারসী রা. হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. হযরত কা'ব ইবনে আজরাহ রা. হযরত ফুযালা ইবনে উবাইদ রা.। উল্লিখিত সাহাবীগণ হতে সিহাহ, মাসানীদ, সুনান জাতীয় হাদীসের কিতাবে হাদীসগুলো বর্ণিত রয়েছে। যা উম্মতে মুসলিমার কাছে অত্যন্ত গ্রহণীয় ও সমাদৃত। এর দ্বারা বুঝা যায়, এ সকল বর্ণনার কোন প্রকার বিকৃত ব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ নেই। সুতরাং যে এর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, সে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না; বরং সে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলার দর্শন হতে বঞ্চিতদের কাতারে থাকবে। নিম্নে সে হাদীসগুলো পেশ করা হচ্ছে।

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর বর্ণনা
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর বর্ণনাটি ইমাম আহমদ রহ. এভাবে উল্লেখ করেন, হযরত আবূ বকর রা. বলেন, একদিন ফজরের নামায শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসেছিলেন। যখন চাশতের নামাযের সময় হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন। এরপর স্ব-স্থানে বসে পড়লেন। এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর, আসর, মাগরিব-এর নামায আদায় করলেন। এ সকল নামাযের অর্ন্তবর্তী সময়ে তিনি কোন কথা বলেননি। অতঃপর তিনি এশার নামায আদায় করে আপন ঘরে তাশরীফ নেওয়ার জন্য উঠলেন। তখন লোকসকল হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. কে বললেন, আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন, কেননা, তিনি আজ এমন অবস্থা প্রকাশ করলেন, যা ইতোপূর্বে কখনো করেননি। বর্ণনাকারী বলেন, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, দুনিয়া ও আখিরাতের যা কিছু ঘটার সব কিছু আমার সামনে পেশ করা হয়েছে। প্রথমে পূর্ববর্তী সকল লোকদেরকে একটি ময়দানে জড় করা হবে। তখন সকল লোক নিরাশ হয়ে হযরত আদম আ.-এর নিকট যাবে। এমতাবস্থায় তাদের গণ্ডদেশ বেয়ে এমনভাবে ঘাম ঝরতে থাকবে, যেন তা মুখের লাগাম। লোক সকল তাঁর নিকট গিয়ে বলবে, হে আদম! আপনি সকল মানুষের পিতা। আপনাকে আল্লাহ তা'আলা নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং আপনি স্বীয় প্রভুর সামনে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। (যেন তাড়াতাড়ি হিসাব করেন) আদম আ. বলবেন, তোমাদের যে অবস্থা, আমারও তেমনি অবস্থা। তোমরা তোমাদের দ্বিতীয় পিতার নিকট যাও, যিনি আদি পিতার পর কিয়ামত পর্যন্ত সকল আগত মানুষের পিতা অর্থাৎ নূহ আ. إِنَّ اللَّهَ اصْطَفي , آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে, নূহকে, ইবরাহীম-এর বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরপর তারা নূহ আ.-এর নিকট গিয়ে বলবে, আপনি আমাদের জন্য স্বীয় প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন, আল্লাহ তা'আলা তো আপনাকে মনোনীত করেছেন ও আপনার ঐ দু'আ কবুল করেছেন, যাতে আপনি আরযি করেছিলেন, رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না।

হযরত নূহ আ. তখন বলবেন, তোমাদের এ সমস্যার মাধান আমার নিকট নেই, তোমরা হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট যাও, কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বন্ধু হিসাবে মনোনীত করেছেন। তখন তারা হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট গেলে তিনি বলবেন, আমি এর যোগ্য নই। তোমরা হযরত মূসা আ.-এর নিকট যাও। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তার সাথে কথোপকথন করেছেন। তখন তারা হযরত মূসা আ.-এর নিকট গিয়ে আবেদন করলে তিনি বলবেন, ليس ذالك عندي এর সমাধান আমার কাছে নয়। (অর্থাৎ আমি এর যোগ্য নই) বরং তোমরা হযরত ঈসা আ.-এর নিকট যাও। কেননা, তিনি জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে, কুষ্ট রোগীকে সুস্থ করে তুলতে ও আল্লাহ তা'আলার হুকুমে মৃতকে জীবিত করতে পারতেন। (আল্লাহ তা'আলা তাঁকে এ মু'জিযা প্রদান করেছেন) লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে আবেদন করলে তিনি বলবেন, আমি এর যোগ্য নই; বরং তোমরা মানব সর্দার হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট যাও। তিনিই আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তারা আমার নিকট আসবে। জিবরীল আ. তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট গেলে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বলবেন, তাঁকে (হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে) সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান কর আর তাকে জান্নাতের সু-সংবাদ দাও। জিবরীল আ. এ সংবাদ নিয়ে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সপ্তাহ পরিমাণ সময় সিজদায় পড়ে থাকবেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা তুলুন, আপনি যা আবেদন করার করুন, আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথা তুলবেন ও স্বীয় প্রভুর প্রতি যখন দেখবেন, তখন তিনি পুনরায় এক সপ্তাহ সিজদায় পড়ে থাকবেন।

আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, আপনার মাথা তুলুন। আপনি যা আবেদন করার করুন, তা মনযূর করা হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর আমি সিজদায় লুটে পড়তে চাইলে হযরত জিবরীল আ. আমার বাহু ধরে রাখবেন।

আল্লাহ তা'আলা তখন তাঁকে এমন এক দু'আ শিখিয়ে দেবেন, যা কাউকে কখনো শেখাননি। (অর্থাৎ তাঁকে এমন দু'আ শিখাবেন যা ইতোপূর্বে কাউকে কখনো শেখাননি। অথবা এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, দু'আ কবুলের ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করে দিবেন, যা ইতোপূর্বে কারো জন্য করা হয়নি) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলবেন, হে পরওয়ারদিগার! আপনি আমাকে মানবজাতির সরদার করে সৃষ্টি করেছেন, এটা কোন অহংকার নয় (বরং নিআমতের বহি:প্রকাশ) এবং এমন ব্যক্তি করে সৃষ্টি করেছেন, কিয়ামতের দিন যার কবর সর্বপ্রথম ফেটে যাবে ও সর্বপ্রথম কবর থেকে উঠে আসবে। এটা কোন গৌরবের নয়। তখন আমার নিকট হাউযে কাউসার হাযির করা হবে। যা সান'আ ও ঈলার মধ্যবর্তী পরিমাণ এলাকা জুড়ে থাকবে। এরপর বলা হবে, চরম সত্যবাদীদেরকে সুপারিশ করার জন্য ডাক। তখন তারা সুপারিশ করবে। অতঃপর বলা হবে, নবীগণকে ডাক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর নবীগণ ক্রমান্বয়ে আসতে থাকবেন। কোনো নবীর সাথে উম্মতের একটি দল থাকবে। কোন কোন নবীর সাথে পাঁচ ছয়জন করে লোক উম্মতরূপে থাকবে। কোন কোন নবী এমনও হবেন, যাঁদের সাথে কোন লোকই থাকবে না। এরপর বলা হবে, শহীদদেরকে ডাক, যাতে তারা যাদের ব্যাপারে সুপারিশ করার করে নেয়। শহীদদের সুপারিশের পালা শেষ হলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি হলাম, আরহামুর-রাহিমীন। সুতরাং আমার যে বান্দাই আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করেনি, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, দোযখীদের মধ্যে দেখ, এমন কোন ব্যক্তি আছে কি? যে কখনো কোন নেক আমল করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তিনি দোযখে এক ব্যক্তিকে পেয়ে বলবেন, তুমি কি জীবনে কখনো কোন নেক আমল করেছ? সে বলবে, না, আমি কখনো কোন নেক আমল করিনি। তবে হ্যাঁ, ক্রয়-বিক্রয়ে আমি ছাড় দিয়েছি। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার এ বান্দাকেও ছাড় দেও, কেননা, সে আমার বান্দাদেরকে ছাড় দিয়েছে। অতঃপর তিনি পুনরায় এক ব্যক্তিকে দোযখ থেকে বের করে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি কোন নেক আমল করেছ? সে বলবে, না, আমার কোন নেক আমল নেই। তবে হ্যাঁ, আমি আমার সন্তানদেরকে ওসিয়ত করে গিয়েছি। যখন আমি মৃত্যুবরণ করব, তখন আমাকে ভস্ম করে আমার শরীরের অণুগুলোকে পিষে সুরমার ন্যায় করে ফেলবে। অতঃপর সেগুলোকে সমুদ্রে ছড়িয়ে দিবে, যেন এগুলো আল্লাহ তা'আলার দরবারে হাযির না হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, কেন এরূপ করেছিলে? সে বলবে, আপনার ভয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, বিশাল রাজত্বের প্রতি তাকাও, তোমার জন্য এটা ও এর চেয়ে আরো অতিরিক্ত দশগুণ রয়েছে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমার সাথে কি বিদ্রূপ করছেন? অথচ আপনি রাজাধিরাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যে চাশতের সময় হেসেছিলাম, এ কথাগুলোই আমার হাসির কারণ ছিল।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর হাদীস
সহীহায়নে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. ও হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীস বর্ণিত রয়েছে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত হাদীস হল, সাহাবীরা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের প্রভুকে দেখতে পাব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পূর্ণিমা রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন কষ্ট হয়? তারা বলল, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেঘের আড়াল না থাকাবস্থায় তোমাদের সূর্য দেখতে কি কোন কষ্ট হয়? তারা উত্তর করল, 'না'। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ঠিক তেমনি দেখতে পাবে। কিয়ামতের দিন মানুষ সমবেত হলে তিনি বলবেন, দুনিয়াতে যে ব্যক্তি যার ইবাদত করেছে, এখন সে তার পিছনে সমবেত হও। তখন সূর্যপূজারীরা সূর্যের পেছনে সমবেত হবে। চন্দ্রপূজারীরা চন্দ্রের পেছনে। শয়তানের পূজারীরা শয়তানের পিছনে সমবেত হবে। এ উম্মত শুধু অবশিষ্ট থাকবে, তাদের সাথে মুনাফিকরাও থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা এমনভাবে দৃশ্যমান হবেন যে, তারা তাঁকে চিনবে না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমিই হলাম তোমাদের প্রভু। তখন তারা বলবে, আমরা তোমার থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আমাদের নিকট আমাদের প্রভু আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই অবস্থান করব, তিনি এলে আমরা তাকে চিনব। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে সে অবস্থায়ই দৃশ্যমান হবেন, যেভাবে তারা তাঁকে চিনতে পারে। তখন বলবেন, আমি তোমাদের প্রভু। তখন তারা বলবে, আপনিই আমাদের প্রভু। তখন তারা তাঁর পেছনে পেছনে যাবে। অতঃপর জাহান্নামের উপর পুল তৈরী করা হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি এবং আমার উম্মতই সর্বপ্রথম সে পুল অতিক্রম করব। সেদিন নবীগণ ব্যতীত কেউ কোন কথা বলতে পারবে না, নবীগণ বলতে থাকবেন اللهم سلّم سلم হে আল্লাহ! হিফাযত করুন, হিফাযত করুন।

জাহান্নামে কণ্টকাকীর্ণ সা'দান গুল্মের ন্যায় বক্র লৌহদণ্ড থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামকে জিজ্ঞসা করলেন, সা'দান কি তোমরা চিন? তারা বলল, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সা'দানের কাঁটার ন্যায় হবে। তবে কত বড় হবে তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। প্রত্যেকেই স্বীয় আমল অনুযায়ী লাভ করবে। সুতরাং কেউ তো স্বীয় আমলের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে আর কেউ স্বীয় আমলের দ্বারা পার পেয়ে যাবে এবং মুক্তিলাভ করবে।

আল্লাহ তা'আলা যখন বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন এবং স্বীয় রহমতগুণে কাউকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবার ইচ্ছা করবেন, তখন তিনি সে সকল লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ফিরিস্তাদেরকে নির্দেশ দিবেন, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি এবং لا إله إلا الله পাঠ করেছে। ফিরিশতারা তাদের সিজদার স্থান দেখে চিনতে পারবে, কেননা সিজদার স্থান ব্যতীত জাহান্নামের সেই আগুন সকল স্থান ধ্বংস করে দিবে। আল্লাহ তা'আলা সিজদার স্থান আগুনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন, ফলে তা সিজদার স্থানকে ধ্বংস করতে পারবে না। তাদেরকে জাহান্নাম হতে এমতাবস্থায় বের করা হবে, আগুন তাদের চর্ম ভস্মীভূত করে তাদের দেহ চর্বিশূন্য করে ফেলেছে। তখন তাদের শরীরে আবে হায়াত তথা সঞ্জীবনী পানীয় ঢেলে দেয়া হবে। তারা তখন তেমনিভাবে সজীব হয়ে উঠবে, যেমনিভাবে বানের পলিতে বীজ সজীব হয়ে উঠে।

আল্লাহ তা'আলা বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন। তখন এক ব্যক্তি এমন থাকবে, যে জাহান্নামে থাকবে না কিন্তু তার চেহারা জাহান্নামের দিকে ফেরানো থাকবে। জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে এ ব্যক্তিই হবে সর্বশেষ ব্যক্তি। সে বলবে, হে প্রভু আমার! আমার চেহারাকে জাহান্নামের দিক থেকে অন্যদিকে ফিরিয়ে দিন। কেননা, তার গন্ধও আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তার তাপ আমাকে জ্বালিয়ে ফেলছে। সে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দু'আ করতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি যদি তোমার এ প্রার্থনা মনযূর করি, হয়ত তুমি অন্য কিছু চেয়ে বসবে। সে বলবে, না, আমি তা ব্যতীত আর কিছুই প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সময় পরিমাণ সে আল্লাহর সাথে এ প্রতিজ্ঞা করতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তার চেহারাকে আগুনের দিক হতে অন্যদিকে ফিরিয়ে দাও। এরপর সে যখন জান্নাত ও তার নিআমত দেখবে, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চুপ থাকার পর বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, কেন? তুমি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করনি, আমার প্রদত্ত বিষয় হতে অতিরিক্ত কিছু তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করবে না? হায় আফসোস! মানুষ কতই না অঙ্গীকার ভঙ্গকারী। তখন সে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করতে থাকবে। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, আমি তোমাকে তোমার প্রার্থিত বস্তু দান করলেও হয়ত তুমি এর চেয়ে অতিরিক্ত বস্তু প্রার্থনা করবে। সে তখন বলবে, আপনার ইয্যত ও বুযুর্গীর কসম, এর চেয়ে অধিক আর কিছুই প্রার্থনা করব না। সে আল্লাহ তা'আলার সাথে এই অঙ্গীকার করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতের দ্বারে পৌঁছিয়ে দেবেন। সে যখন জান্নাতের দ্বারে পৌঁছে ঝলমলে, চাকচিক্যময় জান্নাত ও তন্মধ্যকার আনন্দদায়ক উপভোগ্য সব কিছু দেখবে, তখন আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চুপ থাকার পর বলবে, হে প্রভু আমার! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, কেন? তুমি কি আমার সাথে অঙ্গীকার করনি, আমার প্রদত্ত বিষয় হতে অতিরিক্ত কিছু প্রার্থনা করবে না। হে মানব! আফসোস তোমার জন্য, তুমি কতই না অঙ্গীকার ভঙ্গকারী। তখন সে বলবে, হে প্রভু আমার! আমি কি তোমার মাখলুকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুর্ভাগা থেকে যাব? সুতরাং সে এমনিভাবে ক্রমান্বয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করতে থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা হেসে উঠে বলবেন, জান্নাতে প্রবেশ কর। জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তোমার আকাংখা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত কর। তখন সে তার আকাংখা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে থাকবে আর আল্লাহ তা'আলা তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন, এই এই প্রত্যাশা ও আকাংখা তুমি ব্যক্ত কর, সে তা শুনে শুনে চেয়ে যাবে। এক পর্যায়ে তার আকাংখার সমাপ্তি ঘটবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবে, তুমি সবই পাবে এবং এর সমপরিমাণ আরো পাবে। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, তুমি তাও পাবে এবং তা হতে আরো দশগুণ বেশি পাবে।

হযরত আতা রা. বলেন, হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণনা একই ধরনের। শুধু পার্থক্য এতটুকু, হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণনায় রয়েছে 'তোমার জন্য তা ও আরো দশগুন রয়েছে'। আর হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর বর্ণনায় রয়েছে, 'তোমার জন্য তা ও এর সমপরিমাণ'।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, আমার স্মরণ হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী এটাই لَكَ ذَلكَ وَمَثْلُهُ مَعَهُ তুমি তাও পাবে এবং এর সমপরিমাণও পাবে। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ শব্দই মুখস্থ করেছি ذالك لك وعشرة أمثاله তা পাবে ও এর চেয়ে দশ গুণ বেশী পাবে। (উভয় বর্ণনা স্ব-স্ব-স্থানে বিশুদ্ধ। কেননা, হতে পারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো বলেছেন, لَكَ ذَلِكَ وَمَثْلُهُ مَعَهُ আর কখনো বলেছেন, ذالك لك وعشرة أمثاله হাদীসে এরূপ বহু জায়গায় রয়েছে। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, এ ব্যক্তিই সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী।

সহীহায়নে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে এ বর্ণনাও রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে কিছু লোক জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের প্রভুর দেখা পাব? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আকাশ পরিষ্কার থাকাবস্থায় দ্বি-প্রহরে তোমাদের সূর্য দেখতে কোন কষ্ট হয়? তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! না, কোন প্রকার সমস্যা হয় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভে সমস্যা হবে কেন? (কিন্তু চন্দ্র-সূর্যের সামনে মেঘের আড়াল থাকলে যেমনিভাবে তোমরা সেগুলোকে দেখতে পাওনা, তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন কাফির মুশরিকদের সামনে তাদের কুফর ও শিরকের মেঘ আড়াল হয়ে থাকবে। ফলে তারা আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করতে পারবে না।)

কিয়ামতের দিন এক ঘোষক ঘোষণা করবে, প্রত্যেক দল দুনিয়াতে যার উপাসনা করতে তার পেছনে পেছনে চল। তখন দুনিয়াতে যারা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত মূর্তি ও অন্যান্য বস্তুর উপাসনা ও আরাধনা করত, তাদের মধ্যে জাহান্নামে নিপতিত হওয়া ব্যতীত কেউই আর অবশিষ্ট থাকবে না। শুধু মাত্র যারা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করত, উপাসনা ও আরাধনা করত, তারাই অবশিষ্ট থাকবে। তাদের মধ্যে নেককার ও বদকার আল্লাহর ইবাদতকারী ও আহলে কিতাবও থাকবে। অতঃপর ইহুদীদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র আ.-এর ইবাদত করতাম। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যাবাদী। কেননা আল্লাহ তা'আলার কোন স্ত্রী নেই, পুত্রও নেই। তোমরা এখন কি প্রত্যাশা কর? তারা বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমরা তৃষ্ণার্ত, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হবে, তোমরা কেন প্রবেশ করছ না? অতঃপর তাদের সবাইকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে। যেন তা বালির মাঠ, যার একাংশ অপর অংশকে গ্রাস করছে। অতঃপর তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। এরপর খৃস্টানদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা কার ইবাদত করতে? তারা জাবাব দিবে, আমরা আল্লাহর পুত্র ঈসা মসীহের ইবাদত করতাম। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা'আলার কোন স্ত্রী নেই, পুত্রও নেই। এখন তোমরা কি প্রত্যাশা কর? তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! আমরা তৃষ্ণার্ত, আমাদেরকে পান করান। তখন তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হবে, তোমরা কেন প্রবেশ করছ না? অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে। যেন তা বালির মাঠ, যার একাংশ অপর অংশকে গ্রাস করছে." অতঃপর তাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। এভাবে যখন আল্লাহ তা'আলার ইবাদতকারীরা ব্যতীত আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। তাদের মধ্যে নেককারও থাকবে, গুনাহগারও থাকবে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে এমন আকৃতিতে আসবেন যা তাদের কাছে অস্পষ্ট মনে হবে।

তিনি এসে বলবেন, সবাইতো যার যার উপাস্যের পেছনে পেছনে চলে গেছে, কিন্তু তোমরা কিসের অপেক্ষা করছ? তারা বলবে, হে প্রভু আমাদের! আমরা পার্থিব জগতে তাদের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তাদের থেকে পৃথক ছিলাম, তাদের সাথী হইনি। (তাহলে এখানে কি করে তাদের সাথী হব) তখন তিনি বলবেন, আমি তোমাদের প্রভু, তারা তখন বলবে, আমরা তোমার থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি, আমরা তো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করিনি। এ কথাগুলো তারা দু'তিন বার বলবে, এমনকি তাদের মধ্যে কেউ ফিরে যাওয়ার উপক্রম হবে। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমাদের কাছে কি কোন নিদর্শন আছে? তারা বলবে, হ্যাঁ, এরূপ নিদর্শন রয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পায়ের গোছা হতে পর্দা সরিয়ে তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিবেন। যাঁরা দুনিয়াতে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সিজদা করেছে, তাদের তখন সিজদা করার অনুমতি মিলে যাবে।

আর যারা লোক দেখানোর বা লোক সমাজে খ্যাতি লাভের জন্য দুনিয়াতে সিজদা করেছে, তাদের পিঠ তখন কাঠের ন্যায় হবে। (অর্থাৎ পিঠ সিজদার জন্য ঝুঁকতে সক্ষম হবে না) সে সিজদা করতে চাইলে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের পূর্বের অবস্থায় তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন, তখন তারা শির উঠাবে। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, আমি তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, আপনিই আমাদের প্রভু। তখন জাহান্নামের উপর তাদের জন্য একটি পুল তৈরী করা হবে ও তাদের জন্য সুপারিশের অনুমতি প্রদান করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল, সে পুল কি ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হল পদস্খলন ও পতিত হওয়ার স্থান, যার উপর বড়শী, আঁকড়া ও নজদের সা'দান গুল্মের কণ্ঠকের ন্যায় বক্র লৌহদণ্ড রয়েছে। সে পুল দিয়ে কেউ তো চোখ বুঝে পার হয়ে যাবে, কেউ বিদ্যুৎগতিতে পার হয়ে যাবে। কেউ বাতাসের বেগে পার হয়ে যাবে, কেউ পাখীর ন্যায় পার হয়ে যাবে। আর কেউ উন্নত জাতের অশ্ব ও উষ্ট্রীর ন্যায় পার হয়ে যাবে। সুতরাং কেউ কেউ তো সহীহ সালামতে পার হয়ে যাবে, কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ধীরে ধীরে পার হয়ে যাবে আর কিছু লোক জাহান্নামে নিপতিত হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে সত্তার শপথ, যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, মু'মিনরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবার পর তারা আল্লাহর নিকট তাদের জাহান্নামে নিপতিত ভাইদের ব্যাপারে এত কঠোর হবে, যতটা কঠোর তোমরাও হওনা আমার সামনে নিজের হক আদায়ের ব্যাপারে। তারা পুনঃপুন: কঠোর আরযি পেশ করবে আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করার জন্য। তারা বলবে, হে প্রভু আমাদের! তারা তো আমাদের সাথে নামায পড়েছে, রোযা রেখেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাদের ব্যাপারে জান; তাদেরকে বের করে নাও। তাদের জন্য আগুন হারাম করে দেওয়া হবে। (অর্থাৎ আগুন তাদেরকে কোন কষ্ট দিবে না; বরং তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে) তখন তারা অনেক লোককে বের করে নিয়ে আসবে। তাদের মধ্যে কারো পায়ের গোছা পর্যন্ত, কারো হাটু পর্যন্ত আগুন ভস্ম করে দেওয়া অবস্থায় হবে। তখন তারা বলবে, হে প্রভু! যাদেরকে বের করার জন্য আপনি আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তাদের কেউ আর অবশিষ্ট নেই।

আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা পুনরায় জাহান্নামে যাও, যার অন্তরে এক দিনার পরিমাণ ঈমানও পাওয়া যায়, তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তারা তখন অনেক লোককে বের করে নিয়ে আসবে এবং বলবে, হে প্রভু! যাদেরকে বের করে আনার জন্য আপনি নির্দেশ প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে আর কেউ অবশিষ্ট আছে কিনা? তা আমাদের জানা নেই।

আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে বলবেন, তোমরা পুন:রায় জাহান্নামে যাও এবং যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নام হতে বের করে নিয়ে আস। তারা তখন অনেক লোককে বের করে নিয়ে এসে বলবে, হে প্রভু! যাদেরকে বের করে আনার জন্য আপনি আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তাদের মধ্যে আর কেউ অবশিষ্ট আছে কিনা, তা আমাদের জানা নেই। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় বলবেন, যাও জাহান্নামে গিয়ে যার অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের করে নিয়ে আস, তারা তখন অনেক লোককে বের করে নিয়ে এসে বলবে, হে প্রভু! আমাদের জানা নেই। তাদের মধ্যে এমন কেউ অবশিষ্ট আছে কিনা? যাদের অর্ধ দীনার ঈমান রয়েছে। তখন আল্লাহ চতুর্থবারে বলবেন, যাও! যার মাঝে সামান্যতম ভাল আমল আছে তাকে বের করে নিয়ে আস। তখন তারা অনেককে বের করে এনে বলবে, হে প্রভু! আমাদের জানা নেই, এমন লোক জাহান্নামে বাকী আছে কি না, যার সামান্যতম ভাল আমল রয়েছে।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এ হাদীস বর্ণনা করার সময় বলতেন, যদি তোমরা আমাকে এতে সত্যায়ন না কর। (অর্থাৎ তোমাদের কোন প্রশ্ন থাকে) তবে এ আয়াত পাঠ করতে পার, إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفُهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا আল্লাহ তা'আলা অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না; বরং কোন সৎকর্ম থাকলে তাকে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তাঁর পক্ষ হতে দেবেন মহান প্রতিদান'।

আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, ফিরিশতাগণ, নবীগণ ও সাধারণ মু'মিনগণের সুপারিশ সম্পন্ন হয়েছে। শুধু আরহামুর রাহিমীন বাকী আছেন। তিনি তখন মুষ্টি ভরে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসবেন (যাদের অন্তরে ঈমান ছিল) যারা কখনো কোন নেক আমল করেনি, তারা আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। তখন তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখস্থ নহরে হায়াতে (সঞ্জীবনী নদী) ফেলা হবে। সেখান থেকে তারা এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে, যেমনিভাবে বানের পলিতে বীজ অঙ্কুরিত হয়। তোমরা কি পাথর বা বৃক্ষের প্রতি দেখনি, তার যে অংশ রোদে থাকে তার কিছুটা হলদে ও কিছুটা সবুজাভ হয় আর তার যে অংশ ছায়ায় থাকে, তার পুরোটাই ফ্যাকাশে হয়। সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মনে হয় যেন আপনি মরু প্রান্তরে পশু চরিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা সে নহর থেকে এরূপে বের হবে, যেন মুক্তার মালা। তাদের গ্রীবায় মোহর আঁটা থাকবে, যার দ্বারা অন্যান্য জান্নাতীরা তাদেরকে চিনতে পারবে যে, এরা হল ঐ সকল লোক, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তার বিশেষ অনুগ্রহে কোন আমল ব্যতিতই জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। তারা কোন নেক আমল করেনি বা কোন নেক আমল পূর্বে প্রেরণ করেনি। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে বলবেন, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর, এতে তোমরা যা কিছু দেখতে পাচ্ছো সবই তোমাদের। তারা তখন বলে উঠবে, হে প্রভু! আপনি আমাদেরকে ঐ পরিমাণ নিআমত দান করেছেন, যে পরিমাণ পার্থিব জগতে কাউকে দান করেননি। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে বলবেন, আমার নিকট তোমাদের জন্য তা অপেক্ষাও উত্তম বস্তু রয়েছে। তারা তখন বলবে, হে প্রভু! আমাদের এর চেয়েও উত্তম বস্তু কি হতে পারে? আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তা হল আমার সন্তুষ্টি। সুতরাং আমি তোমাদের প্রতি আর কখনো অসন্তুষ্ট হব না।

হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাযালী রা. এর হাদীস
হযরত জারীর রা.-এর হাদীস সহীহায়নে ইসমাঈল ইবনে আবূ খালিদ কায়স ইবনে আবূ হাযিম হতে, তিনি হযরত জারীর রা. হতে এ সনদে বর্ণিত রয়েছে।

হযরত জারীর রা. বলেন, আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি চৌদ্দ তারিখের চাঁদের প্রতি তাঁকিয়ে বললেন, অবশ্যই তোমরা তোমাদের প্রভুকে ঠিক তেমনি দেখতে পাবে, যেমনিভাবে এই চাঁদকে দেখতে পাচ্ছ। তাঁকে দেখতে তোমাদের কোন প্রকার সমস্যা অনুভূত হবে না। যদি তোমরা সূর্যোদয়ের পূর্বের নামায ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামায অর্থাৎ ফজর ও আসর আদায় থেকে পরাস্ত না হতে সক্ষম হও, তাহলে তাই করে যাও। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا হে নবী! আপনি সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ তথা পবিত্রতা বর্ণনা করুন।

এ বর্ণনাটি নিন্মোক্ত মুহাদ্দিসীনে কিরাম বর্ণনা করেছেন।

ইসমাঈল ইবনে আবূ খালিদ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস আল আওদী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাততান রহ., আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ আল মুহারিবী রহ. জারীর ইবনে আবদুল হামীদ রহ. উবাইদ ইবনে হামীদ রহ. হাশিম ইবনে বাশীর রহ. আলী ইবনে আসিম রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহ. মারওয়ান ইবনে মুআবিয়া রহ. আবূ উসামা আবদুল্লাহ নুমায়র রহ. মুহাম্মদ ইবনে উবায়দ রহ এবং তার ভাই ই'য়ালা ইবনে উবায়দ রহ. ওয়াকী ইবনে জাররাহ রহ. মুহাম্মদ ইবনে ফুযায়ল আত তাফাবী রহ. ইয়াযিদ ইবনে হারূন রহ. ইসমাঈল ইবনে আবী খালিদ আম্বাসাহ ইবনে সাঈদ রহ. হাসান ইবনে সালিহ রহ. ওরাকা ইবনে আমর রহ. আম্মার ইবনে যুরাইক রহ. আবুল আগার সাঈদ ইবনে আবদুল্লাহ রহ.

নাসর ইবনে তুরায়ফ রহ. আম্মার ইবনে মুহাম্মদ রহ. হাসান ইবনে আইয়াশ রহ. ইয়াযিদ ইবনে আতা রহ. ঈসা ইবনে ইউনুস, শু'বা ইবনুল হাজ্জাজ রহ. আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. আবূ হামযাহ আস সুকারী রহ. হুসাইন ওয়াকিদ রহ. মু'তামার ইবনে সুলাইমান রহ. জা'ফর ইবনে যিয়াদ রহ. খুদাশ ইবনে মুহাজির রহ. হুরাইম ইবনে সুফিয়ান রহ. মুনদিল ইবনে আলী রহ. তার ভাই হিববান ইবনে আলী, আমর ইবনে মারছাদ রহ.

আবদুল গাফ্ফার ইবনে কাসিম রহ. মুহাম্মদ ইবনে বাশীর আল জারীরী রহ. মালিক ইবনে মিগওয়াল রহ. ইসাম ইবনে নু'মান রহ. আলী ইবনে কাসিম আল কিন্দী রহ. উবাইদ ইবনুল আসওয়াদ আল হামদানী রহ. আবদুল জাব্বার ইবনুল আব্বাস রহ. মুআল্লাহ ইবনে হিলাল রহ. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া রহ. সুববাহ ইবনে মুহরিব রহ. মুহাম্মদ ইবনে ঈসা রহ.

সাইদ ইবনে হাযিম রহ. আবান ইবনে আরকাম রহ. আমর ইবনে নু'মান রহ. মাসউদ ইবনে সা'দ আল জু'ফী রহ. উস্যামা ইবনে আলী রহ. হাসান ইবনে হাবীব রহ. সিনান ইবনে হারুন আল বারযামী রহ. মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ আল ওয়াসিতী রহ. আমর ইবনে হিশাম রহ. মুহাম্মদ ইবনে মারওয়ান রহ. ইয়ালা ইবনুল হারিস আল মুহারেবী রহ. শুয়াইব ইবনে রাশেদ রহ. হাসান ইবনে দীনার রহ. সাল্যাম ইবনে আবী মুতী রহ. দাউদ ইবনে যাবারকান রহ. হাম্মাদ ইবনে আবী হানীফা রহ. ইয়াকূব ইবনে হাবীব রহ. হুককাম ইবনে সালাম রহ. আবু মুকাতিল ইবনে হাফস রহ. মুসাইয়াব ইবনে শুয়াইব রহ. আবূ হানীফা আন নুমান ইবনে ছাবিত রহ.

আমর ইবনে শামর আল জু'ফী রহ. আমর ইবনে আবদুল গাফফার আল-ফাকহামী রহ. সায়ফ ইবনে হারুন আল বারজামী রহ. আবদ ইবনে হাবীব রহ. মালিক ইবনে সুআয়র রহ. ইয়াযীদ ইবনে আ'তা রহ. খালিদ ইবনে ইয়াযিদ আল আসরী রহ. উবায়দুল্লাহ ইবনে মূসা রহ. খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ আত তাহহান রহ. আবূ কুদাইনাহ ইয়াহইয়া ইবনে মুহলিব রহ.

মুরজী ইবনে রাজা রহ. রুকা ইবনে মাসকালাহ রহ. মা'মার ইবনে সুলাইমান রহ আমর ইবনে জারীর রহ. ইয়াহইয়া ইবনে হাশিম আস সিমসার রহ. ইবরাহীম ইবনে তুহমান রহ. খারিজাহ ইবনে মাসআব রহ. আবদুল্লাহ ইবনে উসমান রহ. আব্দুল্লাহ ইবনে ফররুখ রহ. যায়দ ইবনে আবী আনীসাহ রহ.। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা যেমনিভাবে স্ব-চক্ষে চাঁদ দেখে থাক ঠিক তেমনিভাবে চর্মচক্ষে তোমাদের প্রভুকে দেখতে পাবে। জাহমীয়াহ, ফিরআউনিয়া, রাফেযী, কারামেতী, বাতেনী ও অভিশপ্ত সাবীয়াহ প্রমুখ ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীরা আল্লাহর দর্শন লাভকে অস্বীকার করে থাকে। এরা ঐ সকল কুফুরী শক্তির সাথে গলা মিলিয়েছে যারা আল্লাহর অস্তিত্ব পর্যন্ত বিশ্বাস করে না। এদের কেউ কেউ আবার আল্লাহর ক্ষেত্রে মানব দেহের মত অঙ্গ ধারণের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষন করে থাকে। যারা সুন্নাত ও আহলে সুন্নাত বিশ্বাসী তারা তাদের অনুসরণ করে থাকবে। কিন্তু আল্লাহ রাসূলে বিশ্বাসী দ্বীনের নুসরতকারীরা চিরকাল তাদের প্রতিবাদ করে যাবে। وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

হযরত সুহাইব রা. এর হাদীস
সহীহ মুসলিমে হযরত সুহাইব রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশের পর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা কি অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা কর, আমি তোমাদেরকে তা বৃদ্ধি করে দেব। তারা বলবে, আপনি কি আমাদের মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় করেননি? আপনি কি আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাননি? আপনি কি আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেননি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর ও তাদের মধ্যকার আড়াল তুলে দিবেন। আল্লাহ তা'আলার দর্শন অপেক্ষা অধিক প্রিয় ও পসন্দনীয় বস্তু তাদেরকে দেওয়া হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন لِّلَّذِيۡنَ أَحْسَنُواْ الْحُسْنَى وَزَيَادَةٌ যারা মঙ্গলকর কার্য করে, তাদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরো অধিক।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর হাদীস
ইমাম তাবারানী রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীস স্ব- সনদে উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা নির্ধারিত একদিনে (কিয়ামতের দিন) পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদেরকে একত্রিত করবেন। তাদের আবস্থা এমন হবে, তারা উপরের দিকে তাকিয়ে চল্লিশ বছর যাবৎ বিচার কার্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা মেঘের ছায়ায় আরশ হতে কুরসীতে অবতরণ করবেন। (তার শান মোতাবেক) অতঃপর একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, হে লোক সকল! যেই প্রভু তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, রিযিক দান করেছেন, তাঁর ইবাদাত করার জন্য ও তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি যদি এই সিদ্ধান্ত দেন, দুনিয়ায় যে যার সাথে বন্ধুত্ব রেখেছে ও যে যার ইবাদত করেছে, সে যেন তার সাথী হয়, তাহলে কি তোমরা সন্তুষ্ট হবে না। এ কি তাঁর ন্যায় বিচার হবে না? তখন তারা সমস্বরে বলবে, হ্যাঁ, আর প্রত্যেকেই তার পৃথিবীর বন্ধুদের পেছনে পেছনে ছুটবে। তাদের কেউ সূর্যের নিকট, কেউ চন্দ্রের নিকট, কেউ পাথর নির্মিত মূর্তির নিকট, কেউ প্রতিমার নিকট চলে যাবে। যাকে তারা দুনিয়াতে পূজা-অর্চনা করত। যারা হযরত ঈসা আ.-এর ইবাদত করত, তাদের জন্য শয়তান হযরত ঈসা আ.-এর মূর্তি তৈরী করবে। তখন তারা তাদের পেছনে পেছনে যাবে। শুধু মাত্র উম্মতে মুহাম্মদী অবশিষ্ট থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের নিকট এসে বলবেন, তোমাদের কি হল, অন্যদের মত তোমরাও যাচ্ছ না কেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা বলবে, আমাদের উপাস্য রয়েছে, যাঁকে আমরা এখনো দেখতে পাইনি। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা কি তাঁকে দেখলে চিনতে পারবে? তারা বলবে, অবশ্যই! তাঁর ও আমাদের মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে (যা তিনি স্বয়ং স্বীয় কালামে পাকে ঘোষণা করেছেন) আমরা সে নিদর্শন দেখেই তাঁকে চিনতে পারব। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, কি সে নিদর্শন? তারা বলবে, তিনি স্বীয় পায়ের গোছা উন্মুক্ত করে দিবেন।

তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পায়ের গোছা হতে তাঁর বড়ত্বের আড়াল সরিয়ে নিবেন। তারা তাঁর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে, কিন্তু কিছু লোক সিজদা করতে সক্ষম হবে না, বরং তাদের পিঠ ষাঁড়ের শিং-এর ন্যায় শক্ত হবে, যার ফলে তারা সিজদা করতে চাইলেও করতে পারবে না। কেননা, যখন তারা সুস্থ ছিল, তখন তাদেরকে সিজদার প্রতি আহ্বান করা হত (কিন্তু তখন তারা সিজদা করত না অথবা লোক দেখানোর জন্য সিজদা করেছে) সিজদারতদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমাদের শির তোল। তারা তখন শির উঠাবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে প্রত্যেকের আমল মোতাবেক নূর প্রদান করবেন। তাদের কাউকে পর্বতসম নূর প্রদান করা হবে। যা তার সামনে চলতে থাকবে। কেউ কেউ এর চেয়ে কম নূর পাবে। আবার কেউ এ পরিমাণ নূর লাভ করবে, মনে হবে যেন তার ডান পার্শ্বে খর্জুর বৃক্ষ। কেউ এর চেয়ে কম নূর লাভ করবে। তাদের সর্বশেষ ব্যক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ পরিমাণ নূর প্রদান করা হবে, যা কখনো আলোকিত হবে আবার কখনো নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। তা আলোকিত হলে সে ব্যক্তি চলতে থাকবে, আর নিভে গেলে সেও থেমে যাবে, আল্লাহ তা'আলা তার সামনে থাকবেন। এমনি চলতে চলতে সে অগ্নিতে গিয়ে পড়বে, ফলে পিচ্ছিল পথে পদস্খলনের কারণে তার দেহে তরবারির আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতের ন্যায় দাগ পড়ে যাবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, এ জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম কর। তখন তারা প্রত্যেকেই স্বীয় জ্যোতি অনুযায়ী অতিক্রম করবে। তাদের মধ্য হতে কেউ চোখ বুজে অতিক্রম করবে। আবার কেউ বিদ্যুৎগতিতে, কেউ মেঘের ন্যায়, কেউ ভেঙ্গে পড়া নক্ষত্রের ন্যায়, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী অশ্বের গতিতে, কেউ পদব্রজে ভ্রমণকারীর ন্যায় তা অতিক্রম করবে। যে ব্যক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ পরিমাণ নূর প্রদান করা হয়েছিল, সে হাত-পা টেনে টেনে এমনভাবে পার হতে থাকবে, একহাত টানছে তো অন্য হাত ঝুলে আছে, এক পা টানছে তো অন্য পা ঝুলে পড়েছে। তার দু'পার্শ্বের অঙ্গের এক পার্শ্ব আগুন স্পর্শ করছে। সে এভাবেই চলতে থাকবে আর এক সময় জাহান্নাম অতিক্রম করে যাবে। অতিক্রম করার পর সেখানে দাঁড়িয়ে বলবে: الحمد لله لقد اعطاني ما لم يعط أحدا إذ نجاني منها بعد اذ رأيتها প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি আমাকে এমন বস্তু দান করেছেন, যা অন্য কাউকে দান করেননি। কেননা, তিনি আমাকে জাহান্নামে দেখে ফেলার পর সেখান থেকে মুক্তি দিয়েছেন। (অর্থাৎ আমি তো নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম, সেখানে পতিত হব, কিন্তু তিনি আমাকে রক্ষা করেছেন।)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর তাকে জান্নাতের সামনের একটি নদীতে নেওয়া হবে। সেখানে সে গোসল করবে, তখন তার উপর এমন সুগন্ধি ও এমন আভা ছড়িয়ে পড়বে, যা কেবল মাত্র জান্নাতীরাই লাভ করবে। তখন সে জান্নাতের দরযা দ্বারা জান্নাতীদেরকে দেখে বলবে, হে প্রভু! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, তোমাকে তো আমি জাহান্নام হতে রক্ষা করেছি, এরপরও কি আমার নিকট জান্নাত প্রার্থনা কর? (অর্থাৎ জাহান্নাম থেকে বাঁচানো কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়?) সে তখন বলবে, হে প্রভু আমার! যদি আপনি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ না-ই করাবেন, তবে আমার ও জান্নাতের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দিন, যেন আমি তার সামান্যতম শব্দও শুনতে না পাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে স্বপ্নের চেয়েও সুন্দরতম একটি রাজকীয় প্রাসাদ দেখানো হবে। অথবা সে দেখবে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে তা দান করুন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি এটা তোমাকে দান করলে হয়ত তুমি আরো কিছু প্রার্থনা করবে। সে বলবে, আপনার ইয্যতের শপথ! আমি আর কিছুই প্রার্থনা করব না, এর চেয়ে উত্তম গন্তব্য আর কি হতে পারে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাকে তা প্রদান করবেন, সে তাতে প্রবেশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাকে আরেকটি স্থান দেখানো হবে এবং তার কল্পনা জাগবে যে, সে যেন তাতে অবস্থান করছে। তখন সে প্রার্থনা করবে, হে প্রভু! আমাকে এটিও দান করুন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমাকে এটা দান করলে হয়ত তুমি আরো প্রত্যাশা করবে। সে বলবে, আপনার ইয্যতের শপথ! আমি তা ব্যতীত আর কিছুই চাব না। এর থেকে উত্তম স্থান আর কি হতে পারে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাকে সেটিও দান করবেন আর সে তাতে প্রবেশ করবে। সে আর প্রার্থনা করবে না, আল্লাহ তা'আলা বলবেন, কি হল তোমার, তুমি তো আর প্রার্থনা করছ না। সে বলবে, হে প্রভু! আমি আপনার কাছে এ পরিমাণ প্রার্থনা করেছি, এর চেয়ে অধিক প্রার্থনা করতে আমার লজ্জাবোধ হয়। আমি আপনার নামের শপথ করেছি (কিন্তু তা পূর্ণ করতে পারিনি) তাই অধিক কিছু চাইতে আমার লজ্জাবোধ হয়। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি কি আশা কর না, পৃথিবীর জন্মলগ্ন হতে ধ্বংসলগ্ন পর্যন্ত যা কিছু ছিল পৃথিবীতে, তা ও তার চেয়ে দশগুণ বেশি তোমাকে আমি দান করি? সে তখন বলবে, আপনি কি আমার সাথে উপহাস করছেন? অথচ আপনি তো মহান প্রভু। তার কথা শুনে আল্লাহ তা'আলা হেসে উঠবেন।

উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এ হাদীসটি বর্ণনা করার সময় এ জায়গায় এসে হেসে উঠতেন। তখন এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাস করলেন, হে আবূ আব্দুর রহমান! আমি এ হাদীসটি আপনার কাছ থেকে কয়েকবার শুনেছি, কিন্তু যখনি আপনি এ স্থানে উপনীত হন, তখনি হেসে উঠেন। এর কারণ কি? বলেন, আমিও এ হাদীসটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কয়েকবার শুনেছি, প্রত্যেক বারেই তিনি এমন হেসেছেন যে, তার মাঢ়ীর দাঁত মুবারক পর্যন্ত দেখা গেছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না; বরং আমি যা চাই, তা-ই করতে সক্ষম। সুতরাং প্রার্থনা কর। সে বলবে, আমাকে অন্যান্য জান্নাতীদের সাথী করে দিন। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, যাও, তুমি অন্যান্য জান্নাতীদের নিকট চলে যাও। তখন সে কাঁধ-হেলিয়ে দুলিয়ে চলতে চলতে তাদের নিকটবর্তী হবে। তখন মুক্তার একটি প্রাসাদ তার সামনে আনা হলে সে সিজদায় লুটে পড়বে। তাকে বলা হবে, তোমার কি হল, মাথা তোল। সে বলবে, আমি আমার প্রভুর দর্শন লাভ করেছি অথবা বলবে, আমার প্রভু আমাকে দর্শন দিয়েছেন। তাকে বলা হবে, এটি তোমার প্রাসাদসমূহ হতে একটি প্রাসাদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে তখন এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করানো হবে (তার উজ্জ্বল্যতা ও বিভা দেখে সে সিজদায় লুটে পড়তে চাইলে তাকে বলা হবে, কি হল তোমার? সে বলবে, আমি ভেবেছি, এ হল কোন ফিরিশতা। সে তখন তাকে বলবে, আমি হলাম তোমার আসবাবপত্রের পাহারাদারদের একজন, তোমার সেবকদের একজন সেবক। আমার অধীনে এক হাজার সেবক রয়েছে। যারা তোমার সেবা ও আরাম আয়েশে নিয়োজিত। তারা সকলেই আমার ন্যায়। তখন সে তার সামনে সামনে হেটে তার প্রাসাদে গিয়ে তার জন্য তা খুলে দিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার প্রাসাদ হবে ফাঁপা মুক্তা দ্বারা তৈরীকৃত।

তার ছাদ, দরযা, তালা, চাবি সবই হবে মুক্তার তৈরী। তার বাইরের দিক হবে সবুজ মুক্তার। আর ভেতরের দিক হবে লাল মুক্তার। প্রত্যেক মুক্তার রং বৈচিত্রময় হবে। প্রত্যেকটির মধ্যে খাট, স্ত্রী ও সেবক থাকবে। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের হরে-ঈনও এমন হবে যে, সে সত্তর জোড়া পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও তার পায়ের গোছার মজ্জা দেখা যাবে। সে হৃরের বক্ষ ঐ ব্যক্তির জন্য আর ঐ ব্যক্তির বক্ষ সে হৃরের জন্য আরশির ন্যায় হবে। (অর্থাৎ সে ব্যক্তি হৃরের বক্ষে নিজের প্রতিকৃতি দেখতে পাবে আর সে হূর ঐ ব্যক্তির বক্ষে তার প্রতিকৃতি দেখতে পাবে, যেমনি মানুষ আয়নায় দেখে থাকে) সে ব্যক্তি ঐ হূর হতে সামান্যতম বিমূখ ভাব প্রকাশ করলে তার প্রতি সে হৃরের পূর্বের তুলনায় সত্তর গুণ মুহাব্বত বৃদ্ধি পাবে। সে তাকে বলবে, আল্লাহর কসম! তোমার প্রতি আমার মুহাব্বত সত্তর গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেও তখন বলবে, আল্লাহর কসম! তোমার প্রতিও আমার মুহাব্বত সত্তর গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন সে ব্যক্তিকে বলা হবে, ঝুঁকে দেখ। সে ঝুঁকে দেখলে তাকে বলা হবে, শত বর্ষের দূরত্ব পরিমাণ অঞ্চল তোমার রাজত্বে।

হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, হযরত উমর রা. হযরত কা'ব রা. কে বলেছেন, ইবনে উম্মে আবদ (হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.) জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তি সম্পর্কে যে হাদীস আমাকে বর্ণনা করেছে, তা কি তুমি শুননি? তাহলে জান্নাতের শীর্ষস্থান লাভকারীর অবস্থা কি হবে? হযরত কা'ব রা. বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! তাতে এমন বস্তু রয়েছে যা কোন চক্ষু কখনো অবলোকন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি। আল্লাহ তা'আলা একটি ঘর তৈরী করেছেন, তার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতীদের স্ত্রী, ফলমূল, পানীয় ও তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক সব কিছু তৈরী করে তাকে ঢেকে রেখেছেন, যা জিবরীল আ. বা অন্য কোন ফিরিশতা বা অন্য কোন মাখলুক কেউই দেখেনি। এরপর হযরত কা'ব রা. এ আয়াত فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنِ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ কেউ জানে না, তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ।

আল্লাহ তা'আলা তা ছাড়াও আরো দু'টি জান্নাত তৈরী করেছেন। আর সেগুলোকে তাঁর ইচ্ছানুরূপ সু-সজ্জিত করেছেন। তা তিনি তাঁর মাখলুকের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকে দেখাবেন। যার আমলনামা ইল্লিয়‍্যীনে থাকবে, সে ঐ জান্নাত লাভ করবে, যা কেউ কখনো দেখেনি।

ইল্লিয়্যীনে আমলনামা লাভকারীদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি বের হয়ে তার রাজত্ব পরিদর্শন করবে। তখন জান্নাতের প্রত্যেকটি তাঁবুতে তার চেহারার জ্যোতি ও দ্যুতি ছড়িয়ে পড়বে। (অর্থাৎ তার সুগন্ধিও সমগ্র তাঁবুতে বিচ্ছুরিত হবে) সে সুগন্ধিতে তাঁবুতে অবস্থানকারীরা বিমোহিত হয়ে বলবে, এ সুগন্ধি সম্পর্কে আর কি বা বলব। এ ব্যক্তি তো ইল্লিয়্যীনের অধিবাসী, সে তার রাজত্বে ভ্রমন করছে।

হযরত কা'ব রা.-এর এ সকল কথা শুনে তখন হযরত উমর রা. বললেন, হে কা'ব! তোমার প্রতি বিস্ময় লাগে, তোমাদের একথা শুনে সকলের মনতো লাগামহীন ও যথেচ্ছারি হয়ে যাবে। তাকে সংযত কর। (অর্থাৎ একথা গুলোর কারণে লোকেরা জাহান্নামের কথা ভুলে গিয়ে আমল করা ছেড়ে দেবে। কাজেই তাদের মনের লাগাম টেনে ধরার জন্য জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তির কথাও বলো।)

তখন হযরত কা'ব রা. বললেন, সে সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, জাহান্নামের আগুন যখন উত্তেজিত হয়ে উঠবে তখন তার গর্জন শুনে আল্লাহ তা'আলার সকল নৈকট্যশীল ফিরিশতা ও নবীগণ পর্যন্ত হাঁটু কেঁপে পড়ে যাবে। এমনকি আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম আ.ও বলবেন, رَبِّبْ نفسي نفسي অর্থাৎ হে প্রভু! আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে রক্ষা করুন। (তার ভয়াবহতা এরূপ হবে) তোমার আমল নামার সাথে যদি সত্তর নবীর আমল নামাও থাকে, তবু তখন তুমি মনে করবে, তুমি নাজাত পাবে না।

হযরত আলী রা. এর হাদীস
হযরত আলী রা.-এর হাদীস ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান রহ. স্ব-সনদে এভাবে উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يزور أهل الجنة الرب تبارك وتعالى في كل جمعة وذكر ما يعطون আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতীদেরকে প্রদত্ত নিআমত সমূহের উল্লেখ করেছেন, قال : ثم يقول الله تبارك وتعالى : اكشفوا حجابا، فيكشف حجاب ثم حجاب আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আড়াল সরিয়ে দাও। তখন এক একটি করে আড়াল সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় সত্তার তাজাল্লী দিবেন। তাদের অবস্থা তখন এমন হবে, যেন তারা ইতোপূর্বে কোন নিআমতই দেখেনি। আল্লাহ তা'আলার বাণী ولدينا مزيد দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।

হযরত আবূ মূসা রা. এর হাদীস
সহীহায়নে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, جنتان من فضة آنيتها وما فيها দু'টি জান্নাত এমন রয়েছে, তৈজসপত্রসহ সব কিছুই রৌপ্য নির্মিত وجنتان من ذهب آنيتها وما فيها দু'টি জান্নাত এমন রয়েছে, যার وما بين القوم وبين أن ينظروا إلى ربهم تبارك وتعالى الا رداء الكبرياء على وجهه في جنة عدن আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভকারীদের মধ্যেও আল্লাহ তা'আলার মধ্যে তাঁর বড়ত্বের আড়াল ব্যতীত অন্য কোন আড়াল থাকবে না।

ইমাম আহমদ রহ. স্ব সনদে হযরত আবূ মূসা রা.-এর বর্ণনা এভাবে উল্লখ করছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সকল উম্মতকে সমতল এক প্রান্তরে একত্রিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা যখন প্রত্যেক উম্মতকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করতে চাইবেন, তখন প্রত্যেক দলের জন্য দুনিয়াতে তাদের উপাস্যের প্রতিকৃতি তৈরী করে দেয়া হবে। প্রত্যেক দলই তখন তাদের সে উপাস্যের অনুসরণ করবে। এমতাবস্থায়ই সে উপাস্যরা তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দেবে। এরপর আমরা একটি উচু স্থানে অবস্থান কালে প্রভু মহান এসে বলবেন, তোমরা কারা? আমরা বলব, আমরা মুসলমান। তিনি তখন বলবেন, তোমরা কিসের অপেক্ষা করছ? আমরা তখন বলব, আমরা আমাদের প্রভুর প্রতীক্ষা করছি। তিনি তখন বলবেন, দেখলে কি তোমরা তাঁকে চিনতে পারবে? আমরা বলব, হ্যাঁ, তিনি এমন সত্তা; যার কোন উপমা ও তুলনা নেই, আল্লাহ তা'আলা তখন হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে বলবেন, হে মুসলমানগণ! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। তোমাদের প্রত্যেকের পরিবর্তে আমি একজন করে ইহুদী অথবা খৃস্টানদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছি।

হাম্মাদ ইবনে সালামাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর হাদীস এভাবে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يتجلى لنا ربنا تبارك وتعالى ضاحكا يوم القيامة কিয়ামত দিবসে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় আমাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন।
দারাকুতনীতে আবান ইবনে আবী আয়াশ হযরত আবূ তামীমাহ আল হুজাইমী রহ. এর সূত্রে আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يبعث الله يوم القيامة مناديا بصوت يسمعه أولهم وآخرهم আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে একজন ঘোষক পাঠাবেন, সে এমন উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবে, জান্নাতের অগ্র-পশ্চাতের সকল লোক তার ঘোষণা শুনতে পাবে। ঘোষক বলবে, ان الله عز وجلّ وعدكم الحسنى وزيادة আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মঙ্গল ও অতিরিক্ত নিআমত প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। فالحسنى الجنة، والزيادة النظر إلى وجه الله عز وجل সুতরাং হুসনা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, জান্নাত আর যিয়াদাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ।

হযরত আদী ইবনে হাতিম রা. বর্ণিত হাদীস
হযরত আদী ইবনে হাতিম রা.-এর হাদীস সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে দারিদ্র্যের অভিযোগ করল। অন্য এক ব্যক্তি এসে রাহাজানির অভিযোগ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, হে আদী! তুমি কি হীরা নামক স্থান দেখেছ? তিনি বলেন, আমি উত্তর দিলাম, আমি তা দেখিনি কিন্তু তা সম্পর্কে শুনেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাকে যদি আল্লাহ তা'আলা দীর্ঘায়ু দান করেন, তাহলে তুমি দেখবে, হীরা হতে মহিলারা একাকী সফর করে কা'বা তাওয়াফ করবে; কিন্তু পথে তারা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। (অর্থাৎ তখন এমন অভূতপূর্ব নিরাপত্তা থাকবে) হযরত আদী রা. বলেন, আমি তখন মনে মনে ভাবলাম, তাঈ গোত্রের ডাকাত, যারা শহরকে অতিস্ট করে রেখেছে, তারা তখন কোথায় যাবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ যদি তোমাকে দীর্ঘায়ু দান করেন, তবে তুমি দেখবে, অবশ্যই তোমরা কিসরার ধনভাণ্ডার বিজয় করবে।

হযরত আদী রা. বলেন, আমি বিস্ময় ভরে প্রশ্ন করলাম, কিসরা ইবনে হুরমুষের ধনভাণ্ডার? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুযের ধনভাণ্ডারই। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাকে দীর্ঘায়ু দান করেন, তাহলে তুমি দেখবে, এক ব্যক্তি মুঠিভরা স্বর্ণ-রুপা নিয়ে দান করার জন্য ঘুরে বেড়াবে কিন্তু তা গ্রহণ করার মত কাউকে পাবে না। (কেননা, তখন সবাই ধনাঢ্য থাকবে, কেউ সদকা গ্রহণ করার যোগ্য থাকবে না) তোমরা সকলে অবশ্যই কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাত করবে, তোমাদের ও তাঁর মাঝে কোন আড়াল থাকবে না। তোমাদের মাঝে ও তাঁর মাঝে কথোপকথনের জন্য কোন দোভাষীর প্রয়োজন পড়বে না। তখন, তনি বলবেন, আমি কি তোমাদের নিকট নবী প্রেরণ করিনি? যিনি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়ে দিয়েছেন। লোকেরা বলবে, হ্যাঁ, হে পরওয়ারদিগার! আপনি পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি কি তোমাদের সম্পদ দান করিনি? তোমাদের প্রতি কি অনুগ্রহ করিনি? লোকেরা বলবে, হ্যাঁ, করেছেন হে প্রভু! তখন সম্বোধিত ব্যক্তি তার ডানদিকে তাকালে জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছুই দেখবে না, এমনিভাবে বাম দিকে তাকালে জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছুই দেখবে না।

হযরত আদী রা. বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, اتقوا النار ولو بشق تمرة، فمن لم يجد شق تمرة فبكلمة طيبة খেজুরের একটি টুকরার বিনিময়ে হলেও জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা কর। (অর্থাৎ খেজুরের একটি টুকরা দান করার সামর্থ থাকলে তা দান করার মাধ্যমে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা কর) যে একটি খেজুরের টুকরা প্রদানেও সক্ষম নয়, সে যেন উত্তম কথার মাধ্যমে জাহান্নাম হতে বাঁচার চেষ্টা করে। (অর্থাৎ মানুষের সাথে উত্তম বাক্য বিনিময় করবে অথবা আল্লাহর যিকির, দুরূদ ও উত্তম কালিমার মাধ্যমে জাহান্নام হতে বাঁচার চেষ্টা করবে।) হযরত আদী রা. বলেন, আমি অনেক মহিলাকে দেখেছি, সে হীরা হতে একাকী সফর করে এসে কা'বা তাওয়াফ করেছে। পথিমধ্যে তার আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কারো ভয় হয়নি। আমি কিসরাকে পরাজিতকারী মুজাহিদ বাহিনীর একজন ছিলাম। আর যদি তোমরা কিছু দিন হায়াত পাও, তাহলে নবীজির তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন স্বচক্ষে দেখতে পাবে। অর্থাৎ সকলে এত ধনী হয়ে যাবে যে, যাকাত গ্রহণের লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

হযরত আনাস বিন মালিক রা.-কর্তৃক বর্ণিত হাদীস
হযরত আনাস বিন মালিক রা.-এর হাদীস সহীহায়নে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। (দীর্ঘকাল হাশরের উত্তপ্ত ময়দানে থাকার কারণে) তারা অস্থির ও পেরেশান থাকবে। কোন কোন বর্ণনাকারী উল্লেখ করেন, فيلهمون لذالك তারা সে কারণে বিপদগ্রস্ত থাকবে। তারা তখন বলতে থাকবে, হায়! যদি কেউ আমাদের জন্য আমাদের প্রভুর কাছে সুপারিশ করত, তাহলে হয়ত আমরা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতাম। তাই তারা হযরত আদম আ.-এর নিকট এসে বলবে, আপনি (আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান) সকল মানুষের পিতা আদম। আপনাকে আল্লাহ তা'আলা নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন ও আপনার মাঝে তাঁর পক্ষ হতে আত্ম দান করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে ফিরিশতারা আপনাকে সিজদা করেছে। সুতরাং আপনি আপনার প্রভুর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন, যেন আমরা এ অবস্থা হতে মুক্তি পাই। তিনি তখন বলবেন, لَسْتُ هناكم তোমাদের এ দাবী পূরণ করার আমার সুযোগ নেই।

তাঁর থেকে ঘটিত ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন, যার কারণে তখন আল্লাহর নিকট আরযি পেশ করতে লজ্জা বোধ করবেন। তিনি বলবেন, বরং তোমরা হযরত নূহ আ.-এর নিকট যাও। কেননা, তিনিই মুশরিকদের প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল। সবাই তখন হযরত নূহ আ. এর কাছে আসবে। তিনি তাদের আবেদনের উত্তরে বলবেন, لَسْتُ هُنَاكُمْ আমি এদাবী পুরণের সক্ষমতা রাখি না। তিনি তখন তাঁর থেকে সংগঠিত ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন, যার কারণে তিনি সুপারিশ করতে লজ্জাবোধ করবেন আর বলবেন; বরং তোমরা হযরত ইবরাহীম আ.-এর নিকট যাও। যিনি আল্লাহ তা'আলার বন্ধু। তারা তখন ইবরাহীম আ.-এর নিকট গেলে তিনি তখন বলবেন, لَسْتُ هُنَاكُمْ আমি তোমাদের আবেদন পূরণ করতে সক্ষম নই। তিনি তখন তাঁর থেকে প্রকাশ পাওয়া ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। যার কারণে তিনি আল্লাহর নিকট আরযি পেশ করতে লজ্জাবোধ করবেন। তিনি বলবেন, তোমরা বরং হযরত মূসা আ.-এর নিকট যাও। তিনি আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথন করেছেন ও তাওরাত কিতাব পেয়েছেন। তারা তখন হযরত মূসা আ.-এর নিকট গেলে তিনিও বলবেন, আমি এর যোগ্য নই। তিনি তাঁর থেকে প্রকাশ পাওয়া ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। যার কারণে তিনি প্রভুর নিকট আরযি পেশ করতে লজ্জাবোধ করবেন। আর বলবেন, তোমরা হযরত ঈসা আ.-এর নিকট যাও। কেননা, তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে রূহ ও কালিমা। (হযরত ঈসা আ.-এর জন্ম পিতা ব্যতীতই হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা হযরত মারয়াম আ.-এর নিকট ফিরিশতা পাঠিয়েছিলেন। যিনি তাঁর বুকে ফুঁ দিলেন। ফলে তিনি গর্ভ ধারণ করেন। এই আত্মা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে। এ জন্যই হযরত ঈসা আ. কে রূহুল্লাহ ও কালিমাতুল্লাহ বলা হয়।) তারা তখন হযরত ঈসা আ.-এর নিকট গেলে তিনি বলবেন, আমি তোমাদের এ আরযি পূরণ করতে পারব না; বরং তোমরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট যাও। যিনি আল্লাহ তা'আলার এমন বান্দা, যার পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।

হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর তারা আমার নিকট আসবে। তখন আমি তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশের অনুমতি প্রার্থনা করলে আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। আমি তখন আল্লাহ তা'আলাকে দেখে সিজদায় লুটে পড়ব। আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আমি সে অবস্থায়ই থাকব। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মদ! আপনি মাথা তুলুন। আপনি যা বলার বলুন। আপনার সব কথাই শুনা হবে। আপনি যা প্রার্থনা করার করুন। আপনাকে তা দেয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন। আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। তখন আমি মাথা তুলে আল্লাহ তা'আলার শেখানো বাক্যাবলী দ্বারা আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করব। এরপর আমি সুপারিশ করব। আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। আমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেব।

হযরত আনাস রা. বলেন, আমার মনে পড়ছে না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তৃতীয়বার না চতুর্থবার বলেছেন। অতঃপর আমি বলব, হে পরওয়ারদিগার! এখন তো জাহান্নামে শুধু তারাই রয়েছে, যাদের জন্য কুরআন প্রতিবন্ধক হয়েছে অর্থাৎ যাদের ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্য হল, তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে গমনকারী আমিই প্রথম ব্যক্তি। সর্বপ্রথম আমার কবরই বিদীর্ণ হবে, এটা কোন অহংকার নয়। আমিই সকল মানুষের সরদার। এটা কোন অহংকার নয়। আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব। এটা কোন অহংকার নয়। আমি জান্নাতের শিকল ধরলে আমাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। তখন আল্লাহ তা'আলা আমার সামনে থাকবেন। আমি তখন সিজদায় লুটে পড়ব।

দারাকুতনী রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ এর ব্যাখ্যায় বলেন, زِيَادَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

আবু সালিহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার নিকট হযরত জিবরীল আ. এমতাবস্থায় এলেন, যখন তাঁর হাতে উজ্জ্বল আয়নার মত কিছু ছিল। যাতে কালো বিন্দুর মত একটি দাগ ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! আপনার হাতে এটা কী? উত্তর দিলেন, এটা হল জুম'আ। আমি বললাম, জুম'আ কী? জিবরীল আ. বললেন, এতে আপনার অনেক কল্যাণ ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। আমি বললাম, তাতে আমাদের কি উপকারিতা রয়েছে? বললেন, এটা আপনার জন্য ও আপনার পরবর্তী উম্মতের জন্য ঈদ। আর ইয়াহুদী-খস্টানরা এ ব্যাপারে আপনার অনুসারী। আমি বললাম, তাতে আমাদের আর কি উপকারিতা রয়েছে? বললেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যাতে বান্দা তার কোন ভাগ্য নির্ধারিত বস্তু আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে তা দান করেন। আর যদি তার প্রার্থিত বিষয় তার ভাগ্যে নির্ধারিত না থাকে, তবে তাকে তার আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করেন। দুনিয়ার লাভ করা অপেক্ষা আখিরাতে লাভ করা কতইনা সৌভাগ্যের বিষয়। আমি বললাম, তাতে কালো দাগটি কিসের? বললেন, এটাই হল মুহূর্ত। এটাকে আমরা ইয়াওমুল মাযীদ বলি। জিজ্ঞেস করলাম, ইয়াওমুল মাযীদ কি? বললেন, আপনার প্রভু জানাতে শুভ কস্তুরীর টিলা তৈরী করেছেন। তিনি জুম'আর দিন ইল্লিয়্যিন থেকে অবতরণ করে কুরসীতে বসবেন। সে কুরসীর চতুর্পার্শ্বে নূরের কুরসী থাকবে, তাতে নবীগণ বসবেন। সেগুলোর চতুর্পার্শ্বে মুক্তা খচিত স্বর্ণের মিম্বর থাকবে, যাতে শহীদগণ ও সিদ্দীকগণ বসবেন। প্রাসাদবাসীরা প্রাসাদ থেকে বের হয়ে কস্তুরীর টিলায় বসে পড়বে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে বলবেন, আমি ঐ সত্তা, যে তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে। আমি তোমাদেরকে আমার নিআমত পুর্ণাঙ্গরূপে প্রদান করেছি। এটা আমার বড়ত্বের স্থান। সুতরাং তোমরা আমার নিকট যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। তখন তারা প্রার্থনা করতে করতে এক পর্যায়ে তাদের আকাংখা ও প্রত্যাশা ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা সে অবস্থায়ই তাদেরকে এমন নিআমত দান করবেন, যা কোন চক্ষু কখনো দেখেনি, কোন কান কখনো শুনেনি, কোন মানব হৃদয়ে যার কল্পনাও উঁকি দেয়নি।

এটা হবে তোমাদের জুম'আ শেষে ফিরে যাওয়া সমপরিমাণ সময়। তখন তিনি নিজ কুরসীতে অধিষ্ঠিত হবেন। সাথে সাথে নবীগণ ও সিদ্দীকগণও দাঁড়িয়ে যাবেন। আর প্রাসাদবাসীরা স্ব-স্ব প্রাসাদে ফিরে যাবেন। যে প্রাসাদ হবে শুভ্র মুক্তার মালা, সবুজ পোখরাজ ও লাল পদ্মরাগ মণি দ্বারা নির্মিত। তার দরযাও সে মুক্তার মালা দ্বারা তৈরীকৃত হবে। প্রবহমান নদী থাকবে। তাতে তার স্ত্রী ও সেবকরা থাকবে। থাকবে ঝুলন্ত ফল। সুতরাং তাদের জুমু'আর দিন অপেক্ষা অন্য কোন বস্তুর প্রতি অধিক আগ্রহ থাকবে না। কেননা, তারা সেদিন তাদের প্রভু মহানের দীদার লাভ করবে।

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন, যাতে রয়েছে, এরপর আল্লাহ তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। এমনকি তারা সে মহান সত্তাকে দেখতে পাবে। অতঃপর তিনি পূর্ণ হাদীস উল্লেখ করেন।

উক্ত রিওয়ায়েতটি আমর ইবনে আবী কায়স রা. হযরত আনাস রা. হতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে রয়েছে জুমু'আর দিন আল্লাহ তা'আলা নূরের মিম্বর বেষ্টিত কুরসীতে অবতরণ করবেন। তখন প্রাসাদবাসীরা এসে সে কস্তুরির টিলায় বসবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন, তারা তাঁকে দেখতে পাবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে বলবেন, আমি সে সত্তা, যে তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছে। আমি তোমাদেরকে আমার নিআমত পূর্ণাঙ্গরূপে দান করেছি। কিন্তু এটা হল আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের স্থান। সুতরাং যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। তারা তখন আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর সন্তুষ্টির প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার সন্তুষ্টিই তোমাদের জন্য এ স্থানকে নিরাপদ করে দিয়েছে। তোমরা তো আমার বড়ত্বের অবস্থানকেও জয় করে নিয়েছে। সুতরাং তোমরা যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। তখনো তারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিই প্রার্থনা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে স্বীয় সন্তুষ্টির সাক্ষী বানাবেন। এরপর তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে। এমনকি একপর্যায়ে তাদের সকল প্রত্যাশা ও আকাংখা ফুরিয়ে যাবে। তারপর তিনি হাদীসের বাকী অংশ বর্ণনা করেন। আলী ইবনে হারব রা. স্ব-সনদে বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরসীতে অধিষ্ঠিত হলে আম্বিয়ায়ে করাম, শহীদগণ ও সিদ্দীকগণও উঠে দাঁড়াবে। আর প্রাসাদবাসীরা স্ব-প্রাসাদে ফিরে যাবে।

হযরত কাতাদাহ রা. বলেন, আমি হযরত আনাস রা. কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশেই ছিলাম। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার নিকট হযরত জিবরীল আ. এমন অবস্থায় এলেন। তাঁর হাতে আরশির ন্যায় স্বচ্ছ কিছু ছিল। যার মাঝে একটি কালো বিন্দুর ন্যায় দাগ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! আপনার হাতে এটা কি? বললেন, এটা হল জুমু'আর দিন। আল্লাহ তা'আলা আপনার ও আপনার উম্মতের জন্য ঈদ হিসাবে পাঠিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, হে জিবরীল! এতে এ কালো দাগ কিসের? উত্তর দিলেন, এটা হল জুমু'আর দিনেরই একটি ক্ষণ। এ জুমু'আর দিনই হল দুনিয়ার দিবস সর্দার। তাকে আমরা জান্নাতে ইয়াওমুল মাযীদ বলে থাকি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! আপনারা এটাকে ইয়াওমুল মাযীদ কেন বলেন? বললেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে শুভ্র কস্তুরির একটি উপত্যকা তৈরী করেছেন, (জান্নাতে) জুমু'আর দিন আমাদের প্রভু সে উপত্যকায় কুরসীতে অবতরণ করবেন। তাতে মুক্তাখচিত স্বর্ণের মিম্বর বেষ্টন করা থাকবে আর সে মিম্বরগুলিকে নূরের কুরসী বেষ্টন করে থাকবে।

তখন প্রাসাদবাসীদের মাঝে এ ঘোষণা দেওয়া হলে তারা তাদের বাহনসহ কস্তুরির টিলায় ঢুকে পড়বে। তাদের পরনে থাকবে, স্বর্ণ-রৌপ্যের কঙ্কণ এবং সূক্ষ্ম পুরু রেশমের পোশাক। এভাবে চলতে চলতে তারা এসে উপত্যকায় উপনিত হবে এবং স্থিরচিত্তে সেখানে বসে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের উপর মুসিরাহ নামক এক প্রকার বাতাস বইয়ে দেবেন। সে বাতাস কস্তুরি বিন্দু উড়িয়ে এনে তাদের চেহারা ও পোশাকে ছড়িয়ে দেবে। সে দিন তারা হবে অপ্রয়োজনীয় পশম ও লোমমুক্ত। কাজল কালো চক্ষু বিশিষ্ট ৩৩ বছরের যুবক। তাদের আকৃতি হবে হযরত আদম আ.-এর আকৃতির মত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের ব্যবস্থাপক রিযওয়ানকে ডেকে বলবেন, হে রিযওয়ান! আমার ও আমার বান্দাদের এবং আমার দর্শনপ্রার্থীদের মধ্যকার আড়াল তুলে দাও। সুতরাং আড়াল তুলে দিলে আল্লাহ তা'আলার সৌন্দর্য দেখে তারা সিজদায় লুটে পড়তে চাইবে।

আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তখন বলবেন, তোমরা শির তোল, কেননা ইবাদতের স্থান তো ছিল দুনিয়া, এটা হল প্রতিদান স্থল। সুতরাং যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। আমিই তোমাদের সে প্রভু, যিনি তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছে। তারা বলবে, হে প্রভু! এমন কোন কল্যাণ কি রয়েছে, যা আপনি আমাদের দেননি? আপনি কি মৃত্যুযন্ত্রণার সময় আমাদের সাহায্য করেননি? আপনি কবরদেশে অন্ধকার ভয়াবহ অবস্থায় আমাদের উপর দয়া করেননি? শিঙ্গায় ফুৎকারের ভয়াবহতার সময় আপনি কি আমাদের নিরাপদ রাখেননি? আপনি কি আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেননি? আপনি কি আমাদের অপরাধগুলোকে আড়াল করে দেননি? আপনি কি জাহান্নামের পুল অতিক্রম কালে আমাদের পা দৃঢ় রাখেননি? আপনি কি আমাদেরকে আপনার নিকটতম প্রতিবেশী করেননি? আপনি কি আমাদেরকে আপনার মধুময় কথা শ্রবণ করাননি? আপনি কি আমাদের সামনে স্বীয় নূরসহ দৃশ্যমান হননি? মোটকথা, এমন কোন কল্যাণ ও মঙ্গল নেই, যা আপনি আমাদের প্রতি করেননি।

আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের স্বীয় কণ্ঠে ডেকে বলবেন, আমি তোমাদের সে প্রভু, যে তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছে। আমি তোমাদেরকে আমার নিআমত পূর্ণাঙ্গরূপে দান করেছি। সুতরাং তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর। তারা তখন বলবে, আমরা আপনার নিকট আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার সন্তুষ্টির ফলেই তো আমি তোমাদের যাবতীয় ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছি ও তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে আড়াল করে দিয়েছি। তোমাদের আমার নিকটতম প্রতিবেশী বানিয়েছি ও আমার কথা তোমাদের শ্রবণ করিয়েছি। আমার তাজাল্লীসহ তোমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছি। এটা আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের স্থান। সুতরাং আমার নিকট তোমরা যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। তারা তখন তাঁর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে এমনকি এক পর্যায়ে তাদের সকল প্রত্যাশা ও আকাংখা ফুরিয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের পুনরায় বলবেন, আমার কাছে প্রার্থনা কর।

তারা পুনরায় প্রার্থনা করতে থাকবে। এমনকি একপর্যায়ে তাদের সকল প্রত্যাশা পূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনরায় বলবেন, তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর। তারা বলবে, হে প্রভু মোদের! আমরা সন্তুষ্ট, আনন্দিত। আল্লাহ তা'আলা তখন স্বীয় রহমতগুণে এমন বস্তু প্রদান করবেন, যা কোন চক্ষু কখনো অবলোকন করেনি, কোন কর্ণ কখনো শ্রবণ করেনি এবং যার চিন্তা কখনো কোন মানব হৃদয়ে উঁকি দেয়নি। এটা হবে তোমাদের জুমু'আ শেষে প্রত্যাবর্তন কালে। হযরত আনাস রা. বলেন, আমি বললাম, আপনার উপর আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক, তাদের পৃথক হওয়ার সময় কতটুকু?

উত্তরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক জুমু'আ হতে অন্য জুমু'আ পরিমাণ সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার আরশ আনা হবে। তার সাথে ফিরিশতা, নবীগণও থাকবেন। তখন প্রাসাদবাসীদের মাঝে ঘোষণা করে দেওয়া হলে তারা নিজ নিজ প্রাসাদে ফিরে যাবে। সে প্রাসাদ হবে সবুজ পান্না দ্বারা নির্মিত।

জুমু'আর দিন অপেক্ষা তাদের নিকট প্রত্যাশিত ও কাংখিত অন্য কোন বস্তু থাকবে না। কেননা, সেদিন তারা আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করতে পারে ও তাঁর ফযল গুণে অতিরিক্ত নিআমত লাভ করতে পারে। হযরত আনাস রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ হাদীস এমন সময় শুনেছি, যখন অন্য কেউ ছিল না।

হযরত বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব বর্ণিত হাদীস
হযরত বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব রা.-এর হাদীস ইমামুল আইম্মাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মাহ রহ. স্ব-সনদে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই কিয়ামত দিবসে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে একাকী সাক্ষাৎ করবে। তার মাঝে ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে কোন আড়াল থাকবে না ও কোন দোভাষীর প্রয়োজন হবে না।

হযরত আবু রাযীন আল উকায়লী রা. বর্ণিত হাদীস
হযরত আবূ রাযীন আল উকাইলী রা.-এর হাদীস ইমাম আহমদ রহ. স্ব- সনদে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু রাযীন রা. বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা প্রত্যেকেই কি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দেখা পাব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের নিকট তাঁকে চিনার কি উপায় থাকবে? বললেন, তোমরা কি পূর্ণিমা রাতের চাঁদ দেখেছ? তিনি বললেন, আমি বললাম, জী, হ্যাঁ, আমরা তাও দেখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বস্তু হতে বড় ও মহান।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণিত হাদীস
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর হাদীস ইমাম আহমদ রহ. স্ব- সনদে আবুয-যুবায়র হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি হযরত জাবির রা.-এর নিকট শুনেছি, যখন তাকে জান্নাত ও দোযখে প্রবেশ হওয়ার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তখন তিনি বলেছেন, আমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা উঁচু হব। তখন প্রত্যেক উম্মতকে তাদের দুনিয়ার উপাস্য প্রতিমাসহ ডাকা হবে। অতঃপর আমাদের নিকট আমাদের প্রতিপালক এসে বলবেন, তোমরা কিসের প্রতীক্ষা করছ? তখন তারা বলবে, আমরা আমাদের প্রভুর অপেক্ষা করছি। তিনি বলবেন, আমিই তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, আমরা প্রত্যক্ষ করা ছাড়া এটা মানব না। আল্লাহ তা'আলা তখন হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। হযরত জাবির রা. বলেন, অতঃপর তারা তাঁর পেছনে চলতে থাকবে এবং তাদের প্রত্যেককেই চাই মু'মিন হোক বা মুনাফিক হোক একটি জ্যোতি প্রদান করা হবে। অতঃপর তারা তাঁর পেছনে জাহান্নামের পুল অতিক্রম করবে। তাতে বক্র লৌহদণ্ড রয়েছে।

লোহার কণ্টক রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পার হওয়া থেকে যাকে আটকাতে চাইবেন, তাকে কণ্টক ও লৌহদণ্ড ধরে ফেলবে। অতঃপর মুনাফিকদের জ্যোতি নিভিয়ে দেওয়া হবে আর মু'মিনগণ নাজাত পেয়ে যাবেন। মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রথম দলের চেহারা পূর্ণিমার চাদের ন্যায় উজ্জ্বল ও আভাময় হবে। এমন সত্তর হাজার সৌভাগ্যবান থাকবে, যাদের কোন হিসাব-নিকাশ নেয়া হবে না। তাদের পরবর্তী দলের লোকদের চেহারা হবে আকাশের দিপ্তমান নক্ষত্রের ন্যায়। এভাবে ক্রমান্বয়ে শ্রেণীবিন্যাস হবে।

এরপর সুপারিশের অনুমতি প্রদান করা হবে। তখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু অর্থাৎ কালিমা পাঠকারী, যার আমলনামায় বিন্দু পরিমাণ নেক আমলও নেই, তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। তাদেরকে জান্নাতের অলিন্দে আনা হবে। তখন জান্নাতীরা তাদের শরীরে পানি ছিটিয়ে দিলে তারা এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হবে, যেমন বানের মাঝে বীজ উৎপন্ন হয়। ইতোপূর্বে জাহান্নামে দগ্ধীভূত হওয়ার সকল চিহ্নই মুছে যাবে। তখন সে আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলে তাকে দুনিয়ার সমপরিমাণ ও তার চেয়ে দশগুণ বেশি দান করা হবে। উক্ত বর্ণনাটি ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

আব্দুর রাযযাক রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাদের (জান্নাতীদের) সামনে দৃশ্যমান হলে তারা তাঁকে দেখে সিজদায় লুটে পড়বে। তখন তিনি তাদেরকে বলবেন, তোমরা মাথা উঠাও। কেননা, এটা ইবাদতের স্থান নয়।

আবূ কুরাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সকল উম্মতকে একত্রিত করা হবে। অতঃপর হাদীসের বাকী অংশ বর্ণনা করেছেন। যাতে রয়েছে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা কি আল্লাহ তা'আলাকে দেখে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমরা চিনতে পারব। তিনি বলবেন, কিভাবে তোমরা তাকে চিনতে পারবে, তাকে তো তোমরা কখনো দেখইনি। উত্তরে তারা বলবে, আমরা জানি, তাঁর কোন উপমা বা তুলনা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের সামনে দৃশ্যমান হলে তারা সিজদায় লুটে পড়বে।

ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. তার সুনানে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা তাদের নিআমতে মশগুল থাকবে তখন তাদের সামনে একটি জ্যোতি উদ্ভাসিত হলে তারা মাথা উঠিয়ে দেখবে। তারা দেখতে পাবে, আল্লাহ তা'আলা উঁকি মেরে তাদের দেখছেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ তা'আলার বাণী سَلامٌ قَوْلاً من رَّبِّ رَّحِيمএর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এটাই।

হযরত জাবির রা. বলেন, তখন জান্নাতীরা আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকবে। আল্লাহও তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। এই দীদার লাভ হবে জান্নাতীদের জন্য মহা নিআমত। এমন নিআমতঋদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের দৃষ্টি অন্য কোনো নিআমতের দিকে যাবে না। যতক্ষণ না তাদের সামনে পর্দা ফেলা হয় তারা তাকিয়ে থাকবে। পর্দা ফেলার পরও দীদারের নূর ও বরকত তাদের মাঝে বিরাজ করবে। আর এ নূর নিয়ে তারা নিজ ঠিকানায় ফিরবে।

ইমাম বায়হাকী রহ. ইবাদানী রহ. এর সনদে বর্ণনা করেছেন, যাতে রয়েছে। হযরত জাবির রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীরা স্ব-স্ব-স্থানে অবস্থান করবে। তখনি একটি আলো উদ্ভাসিত হবে। তখন তারা মাথা তুলে দেখতে পাবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের উঁকি মেরে দেখছেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদের বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর। তারা বলবে, আমরা আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করছি।

আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার সন্তুষ্টির ফলেই তো তোমরা এ স্থানে উপনীত হতে পেরেছ। তোমরা আমার সম্মান ও বুযুর্গীর অবস্থা জয় করেছ। এখন চাওয়া ও প্রার্থনার সময়। সুতরাং তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর। তারা বলবে, আমরা আপনার নিকট যিয়াদাহ (অতিরিক্ত পুরস্কার অর্থাৎ আপনার দীদার) প্রার্থনা করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তাদেরকে সবুজ পদ্মরাগ মণির উন্নত অশ্ব প্রদান করা হবে। যার লাগাম হবে সবুজ পান্না ও লাল মুক্তাখচিত। তারা সে অশ্বে আরোহণ করবে। অশ্ব তাদের নিয়ে এত দ্রুত ছুটবে, মুহূর্তেই দৃষ্টিসীমা পেরিয়ে যাবে সেগুলোর পা।

আল্লাহ তা'আলা তখন বৃক্ষকে নির্দেশ দিলে তাদের নিকট ফল এসে যাবে। ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট রমণীরা তাদের নিকট এসে বলবে, আমরা নিআমতপ্রাপ্ত। আমরা কখনো দুরবস্থার সম্মুখীন হব না। মৃত্যু কখনো আমাদের স্পর্শ করবে না। আমরা সম্মানিত মু'মিনদের স্ত্রী। আল্লাহ তা'আলা শুভ্র সুগন্ধি বিচ্ছুরণকারী টিলাকে নির্দেশ প্রদান করলে তা তাদের উপর বাতাস প্রবাহিত করবে, যাকে মুছীরাহ বলা হয়। এভাবে চলতে চলতে তাদের অশ্ব তাদেরকে জান্নাতে আদনে নিয়ে হাযির হবে, যা হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দরতম জান্নাত।

তখন ফিরিশতারা বলবে, হে প্রভু! সম্মানিত ব্যক্তিরা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, স্বাগতম! সত্যবাদীদেরকে স্বাগতম! সাগ্রহে আনুগত্যকারীদেরকে স্বাগতম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর বড়ত্বের পর্দা সরিয়ে দিবেন। তারা তখন আল্লাহ তা'আলার নূর দেখবে এবং এর স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ করবে। তারা একে অপরের কথা পর্যন্ত ভুলে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে বলবেন, উপঢৌকন নিয়ে স্বীয় গন্তব্যে ফিরে যাও। তারা উপঢৌকন নিয়ে স্বীয় গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার সময় একে অপরকে দেখায় সম্বিত ফিরে পাবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, نُزُلاً مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمِ এর উদ্দেশ্য এটাই।

ইমাম দারাকুতনী রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা নবীগণ ব্যতীত অন্য লোকদের সামনে আম তাজাল্লী দিবেন আর হযরত আবূ বকরের সামনে খাস তাজাল্লী দিবেন।

হযরত আবু উমামাহ রা. বর্ণিত হাদীস
হযরত আবূ উমামাহ রা.-এর হাদীস ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি তাঁর ভাষণে দাজ্জাল সম্পর্কে অধিক আলোচনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সে সম্পর্কে বলতেন ও ভীতি প্রদর্শন করতেন। অতঃপর তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন আমাদের সামনে যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল, আল্লাহ তা'আলা যত নবী প্রেরণ করেছেন, তাদের সকলেই স্বীয় উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। নিশ্চয়ই আমি শেষ নবী আর তোমরা হলে শেষ উম্মত। দাজ্জাল অবশ্যই তোমাদের সময়ে আবির্ভূত হবে। যদি আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকাবস্থায় দাজ্জাল আবির্ভূত হয়, তবে আমি সকল মুসলমানের পক্ষে তার সাথে লড়াই করব। আর যদি আমার তিরোধানের পর দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে প্রত্যেক মুসলমান নিজেই নিজের আত্মরক্ষাকারী। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আল্লাহ তা'আলা আমার খলীফা। (অর্থাৎ যেমনিভাবে আমার উপস্থিতিতে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটলে আমি তোমাদের পক্ষে লড়াই করার কথা বলছি, আমার তিরোধানের পর দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটলে আল্লাহ তা'আলাই তোমাদেরকে হিফাযত করবেন।) সে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে একটি সুড়ঙ্গ পথ হতে আত্মপ্রকাশ করবে।

সে ডানে বামে সর্বত্র ফিতনা ফাসাদ ছড়িয়ে দেবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! অবশ্যই তোমাদেরকে ঈমানের উপর অটল থাকতে হবে। সে সর্বপ্রথম বলবে, আমি হলাম নবী। অথচ আমার পর কোন নবী আসবে না। এরপর সে বলবে, আমিই তোমাদের প্রভু, অথচ মৃত্যু পর্যন্ত কখনো তোমরা তোমাদের প্রভুকে কোনভাবেই দেখতে পাবে না। তার উভয় চোখের মাঝখানে লিখা থাকবে 'কাফির' যা প্রত্যেক মু'মিনই পড়তে সক্ষম হবে। সুতরাং তোমাদের কেউ তাকে পেলে সে যেন সূরা কাহফের প্রাথমিক আয়াতগুলো পড়তে পড়তে তার মুখের উপর থুথু মারে। দাজ্জাল মানুষ ধরে ধরে প্রথমে হত্যা করবে ও পরে পুনরুজ্জীবিত করবে। এভাবে সে মানব জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করবে। এর চেয়ে অধিক কোন কাজ সে করতে পারবে না। মানব ছাড়া অন্য কারো উপর তার কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। তার অন্যতম ফিতনা হল, তার সাথে একটি জান্নাত ও একটি আগুন থাকবে। আগুনটি মূলত জান্নাত আর জান্নাতটি মূলত জাহান্নাম। সুতরাং সে যাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে, সে চক্ষু বন্ধ রাখবে ও আল্লাহ তা'আলার নিকট ফরিয়াদ করবে।

আল্লাহ তায়ালা তার জন্য আগুনকে শান্তিদায়ক করে দিবেন। যেমন ইবরাহীম আ.-এর জন্য আগুনকে শীতল ও শান্তিদায়ক করে দিয়েছেন।

দাজ্জাল এ পৃথিবীতে চল্লিশ দিন থাকবে। এই চল্লিশ দিনের প্রথম দিন হবে বছরসম। পরের এক দিন হবে এক মাসসম। এর পরের দিন হবে এক সপ্তাহসম। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতই হবে। আর তার শেষ দিন হবে মরীচিকার ন্যায়। সকালে কোন ব্যক্তি শহরের এক প্রান্তে থাকলে অন্য প্রান্তে পৌঁছার পূর্বে সন্ধ্যা নেমে আসবে।

সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, আমরা সে দিনগুলোতে নামায কিভাবে পড়ব? অর্থাৎ যে দিনগুলি একবৎসর, একমাস ও একসপ্তাহ-এর নামায আদায় করব নাকি একদিনের নামায আদায় করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বড় দিনগুলির হিসাব করে সে পরিমাণ মত তোমরা নামায আদায় করবে। (বড় দিনে যতটুকু বিরতির পর নামাযের ওয়াক্ত হয়, ততটুকু সময় পর পর তোমরা নামায আদায় করবে।)

হযরত যায়দ বিন ছাবিত রা. বর্ণিত হাদীস
ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত যায়দ বিন ছাবিত রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি দু'আ শিখিয়েছেন আর তার পরিবারস্থদেরকে নিয়মিত তা পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি সকালে এ দু'আ পড়বে,

لبيك اللهم لبيك لبيك وسعديك والخير في يديك، ومنك وإليك، اللهم ما قلت من قول، أو حلفت من حلف أو نذرت من نذر فمشيئتك بين يديه، ما شئت كان، وما لم تشأ لم يكن، لا حول ولا قوة إلا بالله، إنك على كل شيء قدير، اللهم ما صليت من صلاة فعلى من صليت، وما لعنت من لعنة فعلى من لعنت، إنك وليي في الدنيا والآخرة، توفني مسلما وألحقني بالصالحين، اللهم إني أسألك الرضا بعد القضاء وبرد العيش بعد الموت، ولذة النظر إلى وجهك والشوق إلى لقائك من غير ضراء مضرة، ولا فتنة مضلة، وأعوذ بك أن أظلم أو أظلم أو أعتدي أو يعتدى علي أو أكتسب خطيئة أو ذنبا لا تغفره، اللهم فاطر السماوات والأرض عالم الغيب والشهادة ذا الجلال والإكرام، فإني أعهد إليك في هذه الحياة الدنيا، وأشهدك - وكفى بالله شهيدا - أني أشهد أن لا إله إلا أنت وحدك لا شريك لك، لك الملك ولك الحمد، وأنت على كل شيء قدير، وأشهد أن محمدا عبدك ورسولك، وأشهد أن وعدك حق، ولقاءك حق، والجنة حق والساعة آتية لا ريب فيها، وأنك تبعث من في القبور، وإنك إن تكلني إلى نفسي تكلني إلى ضعف، وعورة وذنب وخطيئة وإني لا أثق إلا برحمتك، فاغفر لي ذنوبي كلها، إنه لا يغفر الذنوب إلا أنت، وتب علي إنك أنت التواب الرحيم।

হে আল্লাহ! আমি হাযির, আমি হাযির, আমি হাযির, আনুগত্যের জন্য আমি পুনঃপুনঃ উপস্থিত। কল্যাণ ও মঙ্গল আপনারই কর্তৃত্বাধীন। আপনার পক্ষ হতেই কল্যাণ ও মঙ্গল। আপনার প্রতিই কল্যাণ আর মঙ্গল। হে আল্লাহ! আমি যাই বলি, যে মান্নতই করি, যে কসমই করি, তার সমুদয়ের উপর আপনার ইচ্ছা সর্বাগ্রে। আপনি যা চাবেন তা-ই হবে, যা চাবেন না, তা হবে না। সকল শক্তি ও সামর্থ একমাত্র আপনারই, আপনিই সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাশীল। হে আল্লাহ! আমি যে সকল রহমত কামনা করছি, সেই ঈপ্সিত রহমত আমারই উপর বর্ষণ করো। আর যে সব লোকের বিরুদ্ধে অভিশাপ দিয়েছি, সে অভিশাপ যেন তাদের উপর নিপতিত হয়।

আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত অভিভাবক। আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং নেককারদের সঙ্গী করে দিন। হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! মৃত্যুর পর শান্তির জীবন প্রার্থনা করছি। আপনার দর্শনের তৃপ্তি ও স্বাদ প্রার্থনা করছি। আপনার সাক্ষাতের আনন্দ প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! যেন কষ্টদায়ক মুসীবতের সম্মুখীন না হই, যেন বিভ্রান্তিকারী ফিতনার শিকার না হই। হে আল্লাহ! আমি যালেম ও মাযলুম হওয়া থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। সীমা লংঘনকারী হওয়া থেকে ও সীমালংঘনের শিকার হওয়া থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমল বিনষ্টকারী অপরাধ ও আপনার ক্ষমার অযোগ্য পাপ হতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আপনিই ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা। মাখলুকের নিকট দৃশ্য ও অদৃশ্য সবই আপনার জ্ঞাত। আপনিই মহান ও মহৎ সত্তা। সুতরাং এ পার্থিব জীবনে আপনার নিকট অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছি। আপনাকেই সাক্ষী রাখছি। আপনার সত্তাই সাক্ষীর জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই তথা উপাস্য নেই। আপনি একক। আপনার কোন শরীক নেই। রাজত্ব ও আধিপত্য একমাত্র আপনারই। সকল প্রশংসা আপনারই। আপনিই সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাশালী।

আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য। আপনার সাক্ষাৎ সত্য। জান্নাত সত্য এবং কিয়ামতের দিন নির্ঘাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক মৃতকে আপনি পুনরুজ্জীবিত করবেন। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি যদি আমাকে আমার নফসের অধীনস্থ করেন। তবে আমাকে ক্ষতিগ্রস্ততা, দোষ-ত্রুটি, পাপ ও অন্যায়েরই অধীনস্থ করলেন। আমি একমাত্র আপনার উপরই ভরসা করি। সুতরাং আপনি আমার পাপ মার্জনা করুন। আপনি ব্যতীত পাপ মার্জনাকারী তো আর কেউ নেই। আমার তওবা কবুল করুন। আপনি ব্যতীত তাওবা কবুলকারী ও রহমকারী আর কেউ নেই।

হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রা. বর্ণিত হাদীস
ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে আবূ মিজলায রহ. হতে হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রা.-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবূ মিজলায রহ. বলেন, একবার হযরত আম্মার বিন ইয়াসির আমাদের নামাযের ইমামতি করলেন। তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নামায পড়ালেন। যে জন্য মানুষ তাকে সু- নযরে দেখল না। তাই তিনি বললেন, আমি রুকু সিজদা পুরোপুরি আদায় করিনি? লোকজন বলল, তাতো অবশ্যই আদায় করেছেন। হযরত আম্মার রা. বললেন, তোমরা জেনে রাখ, আমি নামাযে সে দু'আ পড়েছি, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়ে থাকতেন, اللَّهُمَّ بِعِلْمِكَ الْغَيْبَ وَقُدْرَتِكَ عَلَى الْخَلْقِ أَحْيِنِي مَا عَلِمْتَ الْحَيَاةَ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي اذا كانت الوفاة خيرا لي وأسئلك خشيتك في الغيب والشهادة، وكلمة الحق في الغضب والرضاء، والقصد في الفقر والغنى، ولذة النظر إلى وجهك والشوق إلى لقائك، في غير ضراء مضرة ولا مضلة، اللهم زينا بزينة الإيمان، واجعلنا هداة مهتدين।

হে আল্লাহ! আপনি যেহেতু অদৃশ্যের খবর জানেন, আপনিই মাখলুকের উপর কর্তৃত্বশীল, সুতরাং যত দিন আমার জন্য জীবন কল্যাণকর হয়, ততদিন আমার জীবন দান করুন আর যখন আমার জন্য আমার মৃত্যু কল্যাণকর হয়, তখন আমার মৃত্যু দান করুন। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় আমি আপনার ভয়-ভীতি প্রার্থনা করি। আনন্দ ও ক্রোধ সর্বাবস্থায় কথা বলার যোগ্যতা প্রার্থনা করি। দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য সর্বাবস্থায় মধ্যম পন্থা প্রার্থনা করি। আপনার দর্শন লাভের তৃপ্তি ও স্বাদ প্রার্থনা করি এবং আপনার সাক্ষাতের আনন্দ প্রার্থনা করি। কোন কষ্টদায়ক মুসীবতের মাঝে নিপতিত হওয়া ব্যতীত, কোন বিভ্রান্তিকর ফিতনায় নিপতিত হওয়া ব্যতীত। হে আল্লাহ! আমাকে ঈমানের সাজে সজ্জিত কর। আমাকে হিদায়েতপ্রাপ্ত হিদায়েত প্রদর্শক বানাও।

উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা রা. বর্ণিত হাদীস
ইমাম হাকিম রহ. তার সহীহ গ্রন্থে হযরত আইশা রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাবির রা. কে বললেন, হে জাবির! আমি তোমাকে কি সু-সংবাদ দিব না? তিনি বললেন, কেন নয়? আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের সু-সংবাদ দিতে থাকুন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জান? আল্লাহ তা'আলা তোমার পিতাকে জীবিত করে তাঁর সামনে বসিয়ে বলবেন, হে আমার বান্দা! তুমি আমার নিকট যা কামনা করার কর। যা চাওয়ার চাও। আমি তোমাকে তা দান করব। তখন সে বলবে, হে প্রভু আমার! যেভাবে আপনার ইবাদত করা উচিত ছিল, সেভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি। তাই আমি চাই আমাকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ করুন। তাহলে আমি আপনার নবীর সাথে জিহাদ করে আপনার রাস্তায় আবার শহীদ হতে পারব।

আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, আমার পক্ষ হতে এ ফায়সালা হয়ে গেছে যে, তুমি দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করতে পারবে না।

ইমাম তিরমিযী রহ. হযরত জাবির রা. হতে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে, হযরত জাবিরের পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হিযাম রা. ওহুদের দিন শহীদ হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে জাবির! তোমার পিতার সাথে আল্লাহ তা'আলা কি আচরণ করেছেন, আমি কি তোমাকে তা বলব না? হযরত জাবির বললেন, অবশ্যই বলুন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা সকলের সাথেই তাঁর বড়ত্বের পর্দার আড়াল হতে কথা বলেন, কিন্তু তোমার পিতার সাথে সামনাসামনি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ও আমার বান্দা! আমার নিকট তোমার আকাংখা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত কর, আমি তা পূর্ণ করব। তিনি বলেছেন, হে প্রভু আমার! আমাকে পুনরায় জীবন দান করুন, যেন আমি পুনরায় আপনার রাস্তায় শহীদ হতে পারি।

আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার পক্ষ হতে পূর্বেই এ ফায়সালা হয়ে গেছে, (মৃত্যুর পর) দুনিয়াতে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করা যাবে না। তখন তিনি বললেন, হে প্রভু আমার! পরবর্তী লোকদেরকে এ সম্পর্কে জানিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন এ আয়াত নাযিল করেন, وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتَلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদীস
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর হাদীস ইমাম তিরমিযী রহ. স্ব-সনদে জামে তিরমিযীতে উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমর রা. বলেন, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী তার রাজত্বে দু'হাজার বছর দৃষ্টি ফিরাবে। তার দূরের স্থানও নিকটের স্থানের ন্যায় দেখতে পাবে। সে তাতে তার সিংহাসন, স্ত্রী ও খাদেমদের দেখতে পাবে আর সর্বোচ্চ স্তরের জান্নাতী হবে সে ব্যক্তি, যে প্রত্যহ দু'বার আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে।

সাঈদ ইবনে হাশীম রহ.স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমিই সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করব।

ইমাম দারাকুতনী রহ. হযরত ইবনে উমর রা. হতে আহমদ ইবনে সুলাইমানের সূত্রে বর্ণনা করেন। ইবনে উমর রা. বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তি সম্পর্কে 'বলব না? তারা বললেন, অবশ্যই বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অতঃপর তিনি হাদীসের বাকী অংশ উল্লেখ করেছেন। তাতে রয়েছে, জান্নাতীরা যখন জান্নাতের সমস্ত নিআমত উপভোগ করে ফেলবেন এবং মনে করবেন, এর বাইরে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো উপভোগ্য নিআমত নেই। তখন সহসা আল্লাহ তাআলা শুভাগমন করবেন এবং বলবেন, হে জান্নাতীরা! আমার তাসবীহ, তাহলীল ও বড়ত্ব বর্ণনা করতে থাক। যেভাবে তোমরা দুনিয়াতে বর্ণনা করতে। তখন তারা তাসবীহ তাহলীল পাঠ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে দাউদ! উঠ, আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব বর্ণনা কর। তখন তিনি উঠে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব বর্ণনা করতে থাকবেন।

হযরত উসমান ইবনে সাইদ দারেমী রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতের সকল নিআমত উপভোগ করে ফেলবেন এবং মনে করবেন, এর বাইরে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো উপভোগ্য নিআমত নেই। তখন সহসা আল্লাহ তাআলা শুভাগমন করবেন। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার পর তারা পূর্বের উপভোগকৃত সকল নিআমতের কথা ভুলে যাবে।

হযরত উমারাহ বিন রুয়ায়বা রা. বর্ণিত হাদীস
ইবনে বাত্তাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত উমারাহ ইবনে রুওয়াইবাহ রা.-এর হাদীস আল ইবানাহ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। হযরত উমারাহ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের যেমনিভাবে পূর্ণিমার চাঁদকে দেখতে কোন সমস্যা হয় না, ঠিক তেমনিভাবে তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে পরিষ্কার দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা যদি সূর্যোদয়ের পূর্বের নামায (ফজর) ও সূর্যাস্তের পূর্বের নামায (আসর) আদায় করতে অসমর্থ না হও, তাহলে অবিচ্ছিন্নভাবে তা আদায় করে যাও (অর্থাৎ এর ফলে আল্লাহর দীদার পাবে।)

হযরত সালমান ফারসী রা. বর্ণিত হাদীস
আবূ মুআবিয়া রহ. স্ব-সনদে সালমান ফারসী রা. হতে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত সালমান ফারসী রা. বলেছেন, (কিয়ামতের দিন শাফাআতের আবেদন করে সকল নবীর নিকট যাওয়ার পর) মানুষ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বলবে, হে আল্লাহর নবী! আপনার কারণেই আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করেছেন এবং আপনার মাধ্যমেই নবুওয়াতের ধারার সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, সুতরাং আপনি আমাদের জন্য প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, হ্যাঁ, আমিই তোমাদের বন্ধু। (অর্থাৎ আমিই তোমাদের এ কাজ করতে সক্ষম হব।)

তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদেরকে নিয়ে জান্নাতের দ্বারে উপস্থিত হবেন। তিনি দরযার কড়া নাড়লে বলা হবে কে? তখন উত্তর দেওয়া হবে, মুহাম্মদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতপর আমার জন্য জান্নাতের দরযা খুলে দেয়া হবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়িয়ে সিজদার অনুমতি প্রার্থনা করলে তাঁকে সিজদার অনুমতি দেয়া হবে।

হযরত হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান রা. বর্ণিত হাদীস
ইবনে বাত্তাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা.-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন। হযরত হুযায়ফা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার নিকট হযরত জিবরীল আ. এলেন। তাঁর হাতে সর্বাপেক্ষা স্বচ্ছ ও সুন্দর একটি আরশী ছিল, তাতে একটি কালো দাগ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! আপনার হাতে এটা কি? বললেন, এটি হল জুমু'আ। আমি বললাম, জুমু'আ কি? তিনি বললেন, জুমু'আ হল আপনার প্রভুর পক্ষ হতে মহত্ত্বপূর্ণ দিনগুলির একটি দিন। অচিরেই আমি আপনাকে সে দিনের গুরুত্ব ও ফযীলত এবং তার আখিরাতের নাম সম্পর্কে জানাব। দুনিয়াতে তার গুরুত্ব ও ফযীলত এই, মাখলুকের সকল বিষয়ের ফায়সালা এই দিনেই করা হয়। সে দিন এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যাতে কোন নর-নারী কল্যাণ প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা'আলা তাকে তা দান করেন। পরকালের তাৎপর্য, গুরুত্ব ও নামকরণের প্রেক্ষাপট হল জান্নাতী ও জাহান্নামী প্রত্যেকেই যখন আপন ঠিকানায় চলে যাবে।

আর তাদের উপর দিন-রাত ও মুহূর্তগুলো একে একে অতিবাহিত হয়ে যাবে। এই দিন-রাতের গণনা হবে আল্লাহর ইলম অনুযায়ী। নয়তো সেখানে দিনও নেই, রাতও নেই। সুতরাং তাঁর হিসাব মতে যখন জুম'আর দিন আসবে আর জান্নাতীরা দুনিয়ায় জুম'আর নামায আদায়ের জন্য বের হওয়ার মুহূর্তটি চলে আসবে, তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীরা! তোমরা অতিরিক্ত প্রতিদান প্রাপ্তির স্থল কস্তুরির টিলার দিকে যাও। যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও প্রশস্ততা সম্পর্কে এক আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ অবগত নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নবীগণের খাদেম কিশোররা নূরের মিম্বর এবং সাধারণ মু'মিনদের খাদেম ও কিশোররা পদ্মরাগ মণির সিংহাসন বের করে রাখলে সকলে স্ব-স্ব আসন গ্রহণ করবে। তখন আল্লাহ তা'আলা মুছীরাহ নামক একটি বায়ু প্রবাহিত করবেন, যা তাদের উপর শুভ্র কস্তুরি বিচ্ছুরণ করবে। সে বাতাস তাদের পোশাকের নিচ দিয়ে প্রবেশ করে চেহারা ও মাথার কেশ দিয়ে বের হবে। সে কস্তুরির সুঘ্রাণ বহন করে তোমরা যখন নিজ স্ত্রীদের কাছে ফিরবে তখন সে সুঘ্রাণ তাদেরকে মোহিত ও সম্পূর্ণরূপে আবিষ্ট করে ফেলবে। দুনিয়ার সকল সুঘ্রাণ একত্র করা হলেও তা ঐ কস্তুরির ঘ্রাণের কাছে হেরে যাবে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা আরশ বহনকারীদের নির্দেশ প্রদান করলে তা জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থলে রাখা হবে। তার ও জান্নাতীদের মধ্যে আড়াল হবে। তারা আল্লাহ তা'আলার থেকে সর্বপ্রথম যে কথা শুনবে, তা হল, তিনি বলবেন, হে আমার বান্দারা! তোমরা আমাকে না দেখেই আমার ইবাদত করেছ, আমার রাসূলগণকে সত্যায়ন করেছ ও আমার হুকুম-আহকামের অনুস্বরণ করেছ। সুতরাং আমার নিকট যা প্রার্থনা করার প্রার্থনা কর। কেননা, আজ হল ইয়াওমুল মাযীদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা সকলে তখন বলবে, আমরা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার জবাব দেবেন এভাবে, হে জান্নাতবাসীরা! আমি যদি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট না হতাম, তবে তোমাদেরকে আমার জান্নাতে স্থান দিতাম না। সুতরাং তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর। কেননা আজ হল ইয়াওমুল মাযীদ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা সকলেই প্রার্থনা করবে, তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! আমরা আপনার সত্তার দর্শন চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন তাঁর বড়ত্বের পর্দা তুলে তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। তখন তাঁর নূর তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। তাদের ব্যাপারে যদি পূর্বেই ভস্মীভূত না হওয়ার ফায়সালা না হত, তবে সে নূরের তাজাল্লীতে তারা ভস্মিভূত হয়ে যেত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তাদেরকে স্বীয় গন্তব্যে ফিরে যেতে বলা হলে তারা স্ব-স্ব গন্তব্যে ফিরে যাবে। ইতোমধ্যে তাদেরকে নূর আচ্ছাদিত করেছে, ফলে তারা তাদের স্ত্রীদেরকে এবং তাদের স্ত্রীরা তাদেরকে সঠিকভাবে চিনতে সক্ষম হবে না। তারা তাদের গন্তব্যে ফিরে গেলে সে নূর আরো বৃদ্ধি পাবে। এরপর এক পর্যায়ে তারা তাদের পূর্বাকৃতিতে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তাদের স্ত্রীরা তাদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের নিকট হতে প্রস্থান কালে তোমাদের চেহারা এক রকম ছিল আর প্রত্যাবর্তনের পর অন্য রকম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা বলবে, এর কারণ হল, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়েছেন। আমরা তাঁর দেখা পেয়েছি। এ কারণেই আমরা তোমাদের থেকে গোপন ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাদের প্রত্যেককে তাদের অর্জিত বস্তু হতে দ্বি-গুণ প্রদান করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালার বাণী, فلا تَعْلَمُ نَفْسٌ ما أخفي لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ) এটাই।

আব্দুর রহমান মাহদী রহ. স্ব-সনদে হযরত হুযায়ফাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, للذينَ أَحْسَنُواْ الْحُسْنَى وَزَيَادَةً এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার মহান সত্তার দর্শ লাভ করা।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত হাদীস
ইবনে খুযাইমাহ রহ. স্ব-সনদে আবূ নুযরাহ রহ. এর সূত্রে ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার ইবনে আব্বাস রা. আমাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাতে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যক নবীরই একটি বিশেষ দু'আ থাকে। প্রত্যেকেই সেই দু'আ দুনিয়ায় নগদ নিয়ে গেছে। কিন্তু আমি সে দু'আ কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য নির্ধারিত রেখেছি। সুতরাং আমি জান্নাতের দরযায় গিয়ে কড়া নাড়ব। তখন জিজ্ঞেস করা হবে, কে আপনি?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বলব, আমি মুহাম্মদ। এরপর আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট যাব। তিনি আরশ বা কুরসীর উপর থাকবেন। তখন তিনি স্বীয় বড়ত্বের পর্দা সরিয়ে আমার সামনে দৃশ্যমান হবেন। আমি তখন সিজদায় লুটে পড়ব।

আবূ বকর ইবনে আবূ দাউদ রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ প্রত্যেক শুক্রবারে কাফুরের টিলায় আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলার অধিক নিকটবর্তী সে দিন ঐ ব্যক্তি হবে, যে তাড়াতাড়ি জুমু'আর জন্য গিয়েছে ও সকাল থেকে জুমু'আর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল আমর ইবনুল আস রা. বর্ণিত হাদীস
সাগানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসকে রা. মদীনার গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকামের সাথে বলতে শুনেছি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইবাদতের জন্য বিভিন্ন ফিরিশতা সৃষ্টি করেছেন। কিছু ফিরিশতা রয়েছে, যাঁরা তাদের সৃষ্টিলগ্ন হতে কিয়ামত পর্যন্ত সারিবদ্ধ অবস্থায় দাড়িয়ে থাকবে। কিছু ফিরিশতা রয়েছে, যাঁরা তাঁদের সৃষ্টিলগ্ন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত রুকূ অবস্থায় বিনীত থাকবে। কিছু ফিরিশতা রয়েছে, যারা সিজদারত থাকবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। তাঁরা সে মহান সত্তাকে দেখে বলে উঠবে سُبْحَانَكَ مَا عَبَدْنَاكَ حَقَّ عِبَادَتِكَ আপনার সত্তা কতইনা পবিত্র। যেভাবে আপনার ইবাদত করা উচিত ছিল, আমরা সেভাবে আপনার জন্য ইবাদত করিনি।

হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. বর্ণিত হাদীস
দারাকুতনী রহ. হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা.-এর হাদীস স্ব-সনদে উল্লেখ করেছেন। হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী لِلَّذِينَ أَحْسَنُواْ الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ এর ব্যাপারে বলেছেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

মুহাম্মদ ইবনে হুমাইদ রহ. হযরত কা'ব ইবনে আজরাহ রা.-এর হাদীস স্ব-সনদে উল্লেখ করেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী, لِلَّذِينَ أَحْسَنُواْ الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ এর ব্যাখ্যায় বলেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

হযরত ফুযালাহ ইবনে উবাইদ রা. বর্ণিত হাদীস
উসমান ইবনে সাঈদ আল করাশী রহ. আবুদ-দারদা রা. এর সূত্রে হযরত ফুযালাহ ইবনে উবাইদ রা.-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হযরত ফুযালাহ রা. বলতেন, اللهم اني اسئلك الرضاء بعد القضاء، وبرد العيش بعد الموت، ولذة النظر إلى وجهك والشوق إلى لقائك في غير ضراء مضرة ولا فتنة مضلة।

হে আল্লাহ! আমি অপনার কাছে প্রার্থনা করছি, যেন আপনার সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট থাকি। যেন মৃত্যুর পর শান্তিময় জীবন লাভ করি। যেন কষ্টদায়ক বিপদ বা বিপর্যস্তকারী ফিতনার মুখোমুখি না হয়েই আপনার পূতপবিত্র চেহারা মুবারকের প্রীতিময় দর্শন লাভ করতে পারি।

হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত রা. বর্ণিত হাদীস
মুসনাদে আহমাদে সনদসহ হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত রা.-এর হাদীস বর্ণিত রয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের সামনে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিল।

আমার শংকা হয় তোমাদের ব্যপারে, হয়ত তোমরা সে সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারবে না। (তাই আমি তোমাদেরকে সে ব্যাপারে আরো সুস্পষ্ট বর্ণনা দিচ্ছি) তোমরা জেনে রাখ, দাজ্জাল হবে ক্ষুদ্রকায়ী। সে পায়ের পাতা ছড়িয়ে ছড়িয়ে চলবে। কোঁকড়া চুল বিশিষ্ট হবে। আভাহীন একচক্ষু বিশিষ্ট হবে। তার চোখ উত্থিত হবে, ভেতরে প্রবিষ্ট থাকবে না। সুতরাং তোমরা যদি দ্বিধান্বিত হও, তবে জেনে নাও, অবশ্যই তোমাদের প্রভু কানা নন। তোমরা মৃত্যুর পূর্বে তোমাদের প্রভুকে দেখতে পাবে না।

সাগানী রহ. স্ব-সনদে আব্বাস ইবনে মানসুর রহ. হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি হযরত আদী ইবনে আরতাতকে মাদায়েনে মিম্বরে বসে নসীহত করতে শুনেছি। তিনি ওয়ায শুরু করে নিজেও কাঁদলেন। আমাদেরকেও কাঁদালেন। এরপর তিনি বললেন, তোমরা সে ব্যক্তির ন্যায় হও; যে স্বীয় পুত্রকে এ নসীহত করে। হে বৎস! আমি তোমাকে নসীহত করছি, তুমি যে নামাযই পড়বে, তখন মনে করবে, এরপর মৃত্যু পর্যন্ত আমি আর কোন নামায পড়ার সুযোগ পাব না। আর যে বলে, হে বৎস! তুমি অগ্রসর হয়ে সে ব্যক্তিদ্বয়ের ন্যায় আমল করবে, যারা আগুনের উপর দাঁড়িয়ে জায়নামায খোঁজ করে। (অর্থাৎ যে আগুনের পরওয়া না করেই নামাযের চিন্তা করে, আমরাও তাঁর মত করব) এরপর আদী ইবনে আরতাত বললেন, এগুলো আমি অমুকের থেকে শুনেছি। তিনি যে নাম বললেন, আব্বাদ ইবনে মানসুর সে নাম ভুলে গেলেন। আদী ইবনে আরতাত বলেন, এ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আমার ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মাঝে সে ব্যক্তি ব্যতীত আর কোন মাধ্যম নেই। অতঃপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ফিরিশতাদের স্কন্ধ কাঁপতে থাকবে। তাদের চক্ষু হতে প্রবাহিত অশ্রুও আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ ভূ-মণ্ডল ও নভমণ্ডলের সৃষ্টিলগ্ন হতেই কিছু ফিরিশতা সিজদায় পড়ে আছেন, তারা কখনো শির তোলেননি আর কিয়ামত পর্যন্ত তুলবেনও না। কিছু ফিরিশতা সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে আছে, তারা কখনো এ সারি ভঙ্গ করবেন না। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন, তখন তারা তাঁকে দেখে বলবে, কতইনা পবিত্র অপনার সত্তা। যেভাবে আপনার ইবাদত করা উচিত ছিল, সেভাবে আপনার ইবাদত আমরা করতে পারিনি।

আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের উক্তি
হযরত আবূ বকর রা.-এর উক্তি
আবূ ইসহাক রহ. আমির ইবনে সা'د রহ. হতে বর্ণনা করেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ আয়াতটি পাঠ করলে শ্রবণকারীরা তাঁকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! زِيَادَةٌ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? উত্তরে তিনি বললেন, زِيَادَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

হযরত আলী রা.-এর উক্তি
আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাতিম রহ. স্ব-সনদে হযরত উমারাহ ইবনে আবদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি হযরত আলী রা. কে বলতে শুনেছি, জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ণতা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের মাধ্যমে সাধিত হবে।

হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা.-এর উক্তি
ওকী রহ. স্ব-সনদে হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, زِیاﺩَۃ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তাকে দেখা।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর উক্তি
আবূ আওয়ানাহ রহ. হিলাল রহ. এর সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আকীম রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. কে কুফার মসজিদে বলতে শুনেছি, তিনি আমাদের সাথে আলোচনার প্রাক্কালে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা কিয়ামতের দিন কোন প্রকার আড়াল ব্যতীতই তোমাদের প্রভুর দর্শন লাভ করবে, যেমনিভাবে তোমরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখে থাক। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তখন তোমাদেরকে তিনবার বলবেন, হে মানুষ! আমার ব্যাপারে কোন্ জিনিষ তোমাদেরকে প্রতারিত করেছে? তিনবার বলবেন, তোমরা রাসূলের আহ্বানে কী উত্তর দিয়েছ? যা শিখেছ, তার উপর কী আমল করেছ?

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর উক্তি
ইবনে আবী দাউদ রহ. স্ব-সনদে হযরত ইকরিমাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর নিকট জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রত্যেক জান্নাতী ব্যক্তিই কি আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করবে? উত্তরে তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, প্রত্যেক ব্যক্তিই আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করবে।

আসবাত ইবনে নাসর রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেছেন, زِيدَۃ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা।

হযরত মু'আয বিন জাবাল রা.-এর উক্তি
আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাতিম রহ. স্ব-সনদে হযরত মাইমুন ইবনে আবী হামযাহ রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি একদিন আবূ ওয়াইল রহ. এর নিকট বসা ছিলাম। তখন আমাদের নিকট আবু আফীফ নামক এক ব্যক্তি এলে শাকীক ইবনে সালামাহ রহ. তাকে বললেন, হে আবূ আফীফ! তুমি আমাদের নিকট হযরত মুআয বিন জাবালের হাদীস কি বর্ণনা করবে না? তিনি বললেন, কেন নয়? আমি তাঁকে (মুআয রা.) বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একটি সমতল ময়দানে একত্র করা হবে। তখন ঘোষণা করা হবে, খোদাভীরুগণ কোথায়? খোদাভীরুগণ তখন উঠে আল্লাহ তা'আলার এক পাশে একত্রিত হবেন। আল্লাহ তা'আলার মাঝে ও তাদের মাঝে তখন কোন আড়াল থাকবে না। আবূ আফীফ রহ. বলেন, আমি হযরত মুআয বিন জাবাল রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, মুত্তাকী কারা? উত্তরে বললেন, মুত্তাকী হল তারা, যারা শিরক ও মূর্তিপূজা হতে বিরত ছিল এবং একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত করত। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর উক্তি
ইবনে ওয়াহাব রহ. ইবনে লাহীআহ এর সূত্রে আবু নাসর রহ. হতে বর্ণনা করেন। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলতেন, তোমরা মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করার পূর্বে কখনো তোমাদের প্রভুকে দেখতে পাবে না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.এর উক্তি
হুসাইন আল জু'ফী রহ. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তি তার রাজত্বে দু'হাজার বছর পর্যন্ত দৃষ্টি ফিরাবে। তার দূরের স্থানকে নিকটের স্থানের মতই দেখতে পাবে। সর্বোচ্চ স্তরের জান্নাতী হল সে ব্যক্তি, যে প্রতিদিন দু'বার আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে।

হযরত ফুযালাহ ইবনে উবাইদ রা. এর উক্তি
আবুদ দারদা রা. বর্ণনা করেন, হযরত ফুযালাহ ইবনে উবাইদ রা. বলতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ভাগ্যলিপির পর আপনার সন্তুষ্টি কামনা করি আর মৃত্যুর পর সুখময় জীবন ও আপনার দীদারের তৃপ্তি ও স্বাদ কামনা করি।

হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. এর উক্তি
ওকী' রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেন, زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা। ইয়াযীদ ইবনে হারুন আবী সনদসহ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি লোকদের সামনে হাদীস বর্ণনা করছিলেন। তখন তারা তাঁর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকাল। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সেদিকে দৃষ্টি ফিরালে কেন? তারা উত্তর দিল, চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আবূ মূসা রা. বললেন, তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন তোমরা সামনাসামনি আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে!

হযরত আনাস বিন মালিক রা.-এর উক্তি
ইবনে আবী শাইবাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে আল্লাহ তা'আলার বাণী وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, মাযীদ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন মু'মিনদের সামনে আবির্ভূত হবেন।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর উক্তি
মারওয়ান ইবনে মুয়াবিয়াহ রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতবাসীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদেরকে চিরস্থায়ী সম্মান প্রদান করা হবে, তখন তাদের সামনে পদ্মরাগ মণির এমন অশ্ব পেশ করা হবে, যা মলমূত্র ত্যাগ করবে না, সেগুলোর পাখা থাকবে। জান্নাতীরা সেগুলোতে আরোহণ করে আল্লাহ তা'আলার নিকট আগমন করলে আল্লাহ তা'আলা যখন তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন, তখন তারা সিজদায় লুটে পড়বে। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, হে জান্নাতীরা! তোমরা শির তোল, আমি তোমাদের প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট যে, এরপর আর কখনো অসন্তুষ্ট হব না।

তাবারী রহ.-এর অভিমত
তাবারী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে ২৩ জন সাহাবীর বর্ণনা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেন, হযরত আলী রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হযরত আবূ সাঈদ রা. হযরত জারীর রা. হযরত সুহাইব রা. হযরত জাবির রা. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হযরত আনাস রা. হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রা. হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত রা. হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত রা. হযরত আদী ইবনে হাতিম রা. হযরত আবু রাযীন আল উকাইলী রা. হযরত কা'ব ইবনে আরজাহ রা. হযরত ফুযালাহ ইবনে উবাইদ রা. হযরত বুরাইদাহ ইবনে হুসাইব রা. প্রমূখ।

দারা কুতনী রহ. স্ব-সনদে মুফায্যল ইবনে গাস্সান রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনে মুঈনকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে আমার নিকট সতেরটি হাদীস রয়েছে।

ইমাম বায়হাকী রহ. বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের ব্যাপারে আমি হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত আবূ মূসা রা. সহ অন্যান্য সাহাবা থেকে একাধিক হাদীস বর্ণনা করেছি।

কিন্তু কোন সাহাবী এর বিপরীত মত পোষণ করেননি। যদি এ ব্যাপারে কোন দ্বি-মত থাকত, তবে অবশ্যই তা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছত। যেমন দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলাকে দেখার ব্যপারে মতবিরোধ রয়েছে। আখিরাতে আল্লাহ তা'আলাকে দেখার ব্যাপারে এত সংখ্যক বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোতে কোন দ্বি-মত পাওয়া যায়নি। সুতরাং বুঝা গেল, সকলে এ ব্যাপারে সমমত পোষণকারী।

কতিপয় তাবেঈর উক্তি
এ ব্যাপারে তাবেঈন, মর্যাদাশীল ব্যক্তিবর্গ, হাদীস, ফিক্‌হ, তাফসীর ও তাসাউফের ইমামগণ থেকে অনেক বর্ণনা রয়েছে। যার মধ্যে নিম্নে কিছু উল্লেখ করা হল।

হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব রহ.-এর উক্তি
ইমাম খালিক র. ইয়াহইয়া রহ.-এর সূত্রে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. হতে বর্ণনা করেন, زِيَادَةٌ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ و وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ) উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ।

হযরত হাসান বসরী রহ.-এর উক্তি
ইবনে হাতেম রহ. হযরত হাসান বসরী হতে বর্ণনা করেন, زیادۀ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার তথা দর্শন লাভ করা।

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লার রহ.-এর উক্তি
হাম্মাদ ইবনে যায়দ রহ. ছাবিত রহ.-এর সূত্রে আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লা হতে বর্ণনা করেন। زيَّدَةً দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা।

হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ.-এর উক্তি
হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রহ. তাঁর গভর্নরের নিকট যে পত্র লিখেছেন, তাতে রয়েছে 'আমি তোমাকে খোদাভীতি ও তাঁর আনুগত্যকে মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরার এবং তোমার প্রতি ন্যস্ত দায়িত্ব পূর্ণরূপে আঞ্জাম দেয়া সহ আল্লাহর কিতাব পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করার উপদেশ দিচ্ছি। কেননা, আল্লাহর ওলীগণ এই তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা পেয়েছেন এবং এর মাধ্যমে নবীগণের সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছন। এ কারণেই তাদের চেহারা সজীব হয়েছে। একারণেই তারা স্বীয় প্রভুর দর্শন লাভ করবে।

এ তাকওয়া তথা খোদাভীতির মাধ্যমে দুনিয়ার ফিতনা ও আখিরাতের ভয়াবহ মুসিবত হতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

হযরত হাসান বসরী রহ.-এর উক্তি
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, যদি ইবাদতকারীরা দুনিয়াতে জানত, আখিরাতে তারা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করতে পারবে না, তাহলে দুনিয়াতেই তাদের প্রাণবায়ু গলে গলে বের হয়ে যেত।

ইমাম আ'মাশ এবং সাইদ ইবনে যুবাইর রহ. এর উক্তি
আ'মাশ রহ. ও সাঈদ ইবনে যুবাইর রহ. বলেন, সর্বোচ্চ স্তরের জান্নাতী ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করবে।

হযরত কা'ব রহ.-এর উক্তি
হযরত কা'ব রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে দেখলেই বলেন, তুমি তোমার অধিবাসীদের জন্য উত্তম ও উন্নত হয়ে যাও। এ কথার সাথে সাথে তার সৌন্দর্যও দ্বি-গুণ বৃদ্ধি পায়। তার অধিবাসী তাতে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতেই থাকবে। দুনিয়াতে যে ক'দিন পর ঈদের দিন (জুম'আর দিন) উপস্থিত হয়, সে পরিমাণ সময়ের পর তারা জান্নাতের বাগ বগিচায় বের হবেন। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন। তারা তখন আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে। বায়ু তখন তাদের প্রতি কস্তুরি বিচ্ছুরণ করবে। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট যা-ই প্রার্থনা করবে, তা-ই তাদেরকে প্রদান করা হবে। অতঃপর তারা স্ব-স্ব গন্তব্যে ফিরে যাবে। পূর্বের তুলনায় তাদের রুপ-সৌন্দর্যের মধ্যে সত্তর গুণ বৃদ্ধি ঘটবে। তারা তাদের স্ত্রীদের নিকট গিয়ে দেখতে পাবে, তাদেরও রুপ সৌন্দর্যে এরূপ বৃদ্ধি ঘটেছে।

হিশাম ইবনে হাসসান রহ.-এর উক্তি
হিশাম ইবনে হাসসান রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতীদের সামনে দৃশ্যমান হলে তারা যখন তাঁকে দেখবে, তখন অন্য সকল নিআমতের কথা তারা ভুলে যাবে।

আবু ইসহাক সাবীঈ রহ.-এর উক্তি
আবূ ঈসহাক সাবীঈ রহ. বলেন, زِيَادَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা রহ.-এর উক্তি
হাম্মাদ বিন যায়দ রহ. ছাবিত রহ. এর সূত্রে আবদুর রহমান ইবনে আবী লাইলা রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী لِلَّذِينَ أَحْسَنُواْ الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ এ আয়াতটি তিলাওয়াত করে বললেন, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা যা প্রার্থনা করবে, তাই প্রদান করা হবে। আল্লাহ তা'আলা যখন তাদেরকে বলবেন, তোমাদের একটি হক বাকী রয়েছে, যা তোমাদেরকে প্রদান করা হয়নি। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদের সামনে আবির্ভূত হবেন। জান্নাতীদের নিকট তখন ইতোপূর্বে লাভ করা নিআমতগুলো এর তুলনায় কোন মূল্যই থাকবে না। সুতরাং এ আয়াতে الحسنى দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত আর زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা। আল্লাহ তা'আলার বাণী, وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তাদের চেহারায় কখনো মলিনতা দেখা দেবে না বা তার আলামত পরিস্ফুটিত হবে না। (বরং সর্বদা শুভ্র সুন্দর সজীব থাকবে।)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-এর উক্তি
আলী ইবনুল মাদীনী রহ. বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. কে আল্লাহ তা'আলার বাণী فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا (যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভের আশাবাদী, সে যেন কোন প্রকার লৌকিকতা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করে।

নাঈম ইবনে হাম্মাদ রহ. বললেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ যাকে আড়ালে রাখবেন, যাকে দর্শন দেবেন না, তাকেই আযাবে নিপতিত করবেন। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ۖ না, অবশ্যই সে দিন তারা তাদের প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে, ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُو الْجَحِيمِ ٥ অতঃপর তারাতো জাহান্নামে প্রবেশ করবে, ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُمْ بِهِ تُكَذِّبُونَ অতঃপর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা অস্বীকার করতে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, তাদেরকে বলা হবে, তোমরা আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে, সুতরাং আজ তোমরা তাঁর দীদার হতে বঞ্চিত থাকবে।

হযরত শরীক ইবনে অবদুল্লাহর রহ. উক্তি
আব্বাদ ইবনে আওয়াম রহ. বলেন, শরীক ইবনে আবদুল্লাহ রহ. পঞ্চাশ বছর যাবৎ আমার এখানে আসা-যাওয়া করতেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবু আবদুল্লাহ! আমাদের এখানে মু'তাযিলাদের একটি দল আছে, যারা শেষ রাতে আল্লাহর সর্বনিম্ন আকাশে অবতরণ সম্পর্কিত হাদীসসমুহকে অস্বীকার করে। এ ছাড়াও তারা জান্নাতীদের আল্লাহর দর্শন লাভের হাদীসসমূহকেও অস্বীকার করে বেড়ায়। তখন তিনি তার প্রমাণ স্বরূপ আমার নিকট দশটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, আমরা তো দীনের দীক্ষা তাবেঈদের থেকে গ্রহণ করেছি। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ থেকে নিয়েছেন। কিন্তু এরা (মু'তাযিলারা) তাদের দীনের দীক্ষা কাদের কাছ থেকে নিয়েছে?

হযরত আকাবাহ ইবনে কবীসাহ রহ. এর উক্তি
আকাবাহ ইবনে কাবীসাহ রহ. বলেন, আমি একদিন আবূ নাঈম রহ. এর নিকট গেলাম। তিনি তাঁর ঘরে উঁচু স্থান থেকে মাঝে বসে পড়লেন, যেন তিনি ক্রোধাবস্থায় ছিলেন। অতঃপর তিনি স্ব-সনদে হযরত শরীক ইবনে আবদুল্লাহ নাখঈ রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, মুহাজির সাহাবায়ে কিরাম রা. এর সন্তানগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, আখিরাতে আল্লাহ তা'আলা দেখা দিবেন। কিন্তু এক ইহুদীর ছেলে তা অস্বীকার করেছে।

চার ইমামসহ অন্যান্য ইমামদের উক্তি
হযরত মালিক বিন আনাস রহ.-এর উক্তি
আহমদ ইবনে সালিহ রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব রহ. হতে বর্ণনা করেন, হযরত আনাস রা. বলেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষ স্ব-চক্ষে আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে।
হারিছ ইবনে মিসকীন রহ. আশহাব রহ. হতে বর্ণনা করেন, ইমাম মালিক রহ. কে আল্লাহ তা'আলার বাণী ওُجُوهٌ يَوْمَند نَاضِرَةٌ ، إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাকিয়ে থাকবে, তারা কি প্রকৃত পক্ষেই আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে? বললেন, হ্যাঁ, বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, কেউ কেউ বলে, إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার পার্শ্বে অবস্থিত বস্তু দেখতে পাবে। হযরত মূসা আ. আল্লাহ তা'আলার নিকট আরযি পেশ করেছিলেন رَبِّ أَرِنِي أَنْظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَنْ تَرَانِي হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখা দাও, আমি তোমাকে দেখবো। আল্লাহ বললেন, তুমি আমাকে কখনোই দেখতে পাবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ তাদের প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে।

তাবারী রহ. সহ অন্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে বর্ণিত আছে, ইমাম মালিক রহ. কে বলা হল, এরা (মু'তাযিলা) দাবী করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর দর্শন লাভ সম্ভব হবে না। ইমাম মালিক রহ. বললেন, السيف السيف এদের অস্বীকারের একমাত্র প্রতিকার হল তরবারি।

ইবনুল মাজিশূন রহ.-এর উক্তি
আবূ হাতেম আর রাজী রহ. হতে বর্ণিত, আযীয ইবনে আবী সালামাহ আল মাজিশূন রহ. কে ঐ সকল বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যেগুলো জাহমিয়ারা অস্বীকার করে থাকে। তখন তিনি বললেন, শয়তান তাদেরকে ঢিল দিয়ে রেখেছে। এমনকি তারা আল্লাহ তা'আলার وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ কে পর্যন্ত অস্বীকার করে বসেছে। তাই তারা বলছে, কিয়ামতের দিন কেউ আল্লাহকে দেখবে না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে যে নিআমত ও সম্মাননা প্রদান করবেন তন্মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিআমত ও সম্মাননা হচ্ছে আল্লাহর দীদার লাভ করা। সুতরাং আসমান ও যমীনের প্রভুর শপথ! আল্লাহ তা'আলার দর্শন কিয়ামতের দিন তারাই লাভ করবে, যারা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত করেছে। এর মাধ্যমে তাদের চেহারা সজীব হবে। কিন্তু পাপিষ্ঠরা তাঁর দীদার লাভ করবে না। আল্লাহর বাণী, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ দ্বারা অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার দীদার অস্বীকারকারীদের উপর তাদের দাবী ফলে যায়। যারা মনে করে, আল্লাহকে দেখা যাবে না, তাঁর সাথে বাক্যলাপ করা যাবে না। তাঁর প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাবে না। তারা এই كُلًّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ এর প্রতিপাদ্য। তারাই সে দীদার হতে অন্তরিত দল।

ইমাম আওযাঈ রহ.-এর উক্তি
ইবনে আবী হাতিম রহ. তার থেকে বর্ণনা করেন, আমার বিশ্বাস, আল্লাহ তা'আলা ভণ্ড জাহম ও তার অনুসারীদেরকে (জাহমিয়্যা) তাঁর থেকে আড়ালে রাখবেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদানের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা হলো তাঁর দীদার। কিন্তু ভণ্ড জাহম ও তার অনুসারীরা সে নিআমতকেই অস্বীকার করেছে।

লাইস ইবনে সা'দ রহ. এর উক্তি
ইবনে আবী হাতিম রহ. স্ব-সনদে ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি ইমাম আওযাঈ রহ. সুফিয়ান ছাওরী রহ. মালিক বিন আনাস রহ. ও লাইস ইবনে সা'দ রহ. কে আল্লাহ তা'আলার দীদার সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, تمر بلا كيف পদ্ধতি জানা ব্যতীতই অতিক্রম কর। (অর্থাৎ অবশ্যই বিশ্বাস রাখবে, কিন্তু পদ্ধতি জানার পেছনে পড় না।)

সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাহ রহ.-এর উক্তি
তাবারী রহ. তাঁর থেকে বর্ণনা করেন। যে ব্যক্তি কুরআনকে আল্লাহ তা'আলার কালাম বলে মানে না এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভে বিশ্বাস করে না, সে অবশ্যই জাহমিয়্যাদের সাথে সম্পর্ক রাখে। জাহমিয়্যা হলো, যারা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভে অবিশ্বাসী।

জারীর ইবনে আবদুল হামীদ রহ.-এর উক্তি
ইবনে আবী হাতিম রহ. বর্ণনা করেন, তিনি زيادۀ এর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা। তখন এক ব্যক্তি এ কথা অস্বীকার করলে তিনি তাকে ধমক দিয়ে তাঁর মজলিস থেকে বের করে দেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-এর উক্তি
আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাতিম রহ. বর্ণনা করেন। জাহমিয়্যাদের অনুসারী এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. কে জিজ্ঞেস করল, সে জগতে আল্লাহ তা'আলাকে কিভাবে দেখা যাবে? উত্তরে তিনি বললেন, চোখ দ্বারা।

ইবনে আবিদ-দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে নাঈম ইবনে হাম্মাদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা যাকেই তাঁর থেকে আড়ালে রাখবেন, সে-ই আযাবে নিপতিত হবে। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ . হতে অন্তরিত থাকবে। ০ ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُو الْجَحِيمِ ٥ অতঃপর তারা তো অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ০ ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم بِهِ تُكَذِّبُونَ 0 অতঃপর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা অস্বীকার করতে।

ওকী' ইবনুল জাররাহ রহ.-এর উক্তি
ইবনে আবী হাতিম রহ. তাঁর থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে মু'মিনদেরকে দর্শন দিবেন। শুধু মু'মিনরাই আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে।

হযরত কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ.-এর উক্তি
ইবনে আবী হাতিম রহ. তাঁর থেকে বর্ণনা করেন, এ ব্যাপারে হাদীস ও আইম্মায়ে ইসলামের মত এটাই। আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভের উপর ঈমান রাখতে হবে। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত হাদীস সমূহের সত্যায়ন করতে হবে।

আবু উবায়দুল কাসিম ইবনে সালাম রহ.-এর উক্তি
ইবনে বাত্তাহ প্রমুখ উল্লেখ করেন, আবূ উবায়দ রহ. এর সামনে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীস উল্লেখ করলে তিনি বলেন, এ হাদীসগুলো আমাদের নিকট সত্য। সেগুলো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী সূত্রেই আমাদের নিকট পৌঁছেছে। কিন্তু আমার নিকট সেগুলোর ব্যাখ্যা চাওয়া হলে (অর্থাৎ তার পদ্ধতি ও পন্থা) আমি সেগুলোর ব্যাখ্যা করা ব্যতীত সেগুলোকে আপন অবস্থায় রেখেই সামনে অগ্রসর হতাম। (অর্থাৎ উক্ত হাদীসগুলো দ্বারা সে বিষয়টি তথা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ প্রমাণিত হয়, তার প্রতি বিশ্বাস রেখেই সামনে অগ্রসর হই। তার পদ্ধতি ও পন্থা উদঘাটনের পেছনে পড়ি না।)

আসওয়াদ ইবনে সালিম রহ.-এর উক্তি
মারওয়াযী রহ. বলেন, আবদুল ওয়াহাব আল ওয়াররাক রহ. আমার নিকট বর্ণনা করেন, তাকে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি স্ত্রী তালাকের শপথ করে বলব, সেগুলো সত্য।

হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ্-শাফেঈ রহ.-এর উক্তি
ইতোপূর্বে তাঁর থেকে রবী রহ. এর সূত্রে বর্ণনা উল্লিখিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আল্লাহ্ বাণী ۞ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ۞ এর ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেন। তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তাদেরকে আড়াল করে রাখবেন। তাহলে এর দ্বারা বুঝা যায়, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাদের সামনে দৃশ্যমান হবেন ও তাদেরকে দর্শন দিবেন। রবী রহ. বলেন, আমি বললাম, হে আবূ আবদুল্লাহ! আপনি কি এমতই পোষণ করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এ কারণেই তো আমি আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করি। যদি মুহাম্মদ ইবনে ইদরীসের আল্লাহ তা'আলাকে দেখার দৃঢ় বিশ্বাস না থাকতো, তবে তাঁর ইবাদতই করত না।

ইবনে বাত্তাহ স্ব-সনদে ইমাম শাফেঈ রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী ۞ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ۞ উল্লেখ করেন, এর দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, কিয়ামত দিবসে মানুষ আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে।

হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর উক্তি
ইসহাক ইবনে মানসুর রহ. বলেন, ইমাম আহমদ রহ. কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা কি জান্নাতীদেরকে দেখা দিবেন না? আপনি কি এসব হাদীসের অনুরূপ মত পোষণ করেন না? বললেন, হ্যাঁ, এ মতই সঠিক ও সত্য।

ফযল ইবনে যিয়াদ রহ. বলেন, আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম আহমদ রহ.) কে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যারা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করাকে অস্বীকার করে, তারা জাহমীয়‍্যাহ ফিরকার অন্তর্ভুক্ত। ফযল ইবনে যিয়াদ রহ. বলেন, আমি শুনেছি, ইমাম আহমদ রহ.-এর নিকট এক ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ পৌছল, সে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করাকে অস্বীকার করে। এ শুনে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং বললেন, যে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভকে অস্বীকার করে, সে কাফির। তার উপর আল্লাহর লা'নত ও গযব নাযিল হোক; চাই সে যে কেউ হোক না কেন? কেননা, আল্লাহ তায়ালা কি ইরশাদ করেননি? كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوبُونَ وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ

ইমাম আবূ দাউদ রহ. বলেন, আমি শুনেছি, ইমাম আহমদ রহ.কে যখন সে ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে বলে, আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ হবে না। তখন তিনি বললেন, যে এ কথা বলে, তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার লা'নত হোক, আল্লাহ তা'আলা তাকে অপমানিত করুক।

আবূ বকর মারওয়াযী রহ. বলেন, আবূ আবদুল্লাহকে ঐ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, যাতে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ. কে বলেছেন, যদি এ পাহাড় স্ব-স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। আর যদি স্থির না থাকে, তবে আমাকে দেখতে পাবে না। দুনিয়াতেও না, আখিরাতেও না। এ কথা শুনে তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। এমনকি ক্রোধের আলামত তার চেহারায় ফুটে উঠলো। তিনি বসা অবস্থায় ছিলেন এবং তার পাশে লোকজন ছিল। এরপর বসা থেকে উঠে পড়লেন আর বললেন, আল্লাহ তা'আলা তাকে অপমানিত করুক। এ হাদীস লিখাও ঠিক হবে না। বললেন, যে ব্যক্তি এ আকীদা পোষণ করে, সে জাহমী, কাফির। সে আল্লাহ তা'আলার বাণী وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ . إلَ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ، رَبِّهَا نَاظِرَةٌ . অস্বীকারকারী। আল্লাহ তা'আলা সে খবীছ-ভ্রষ্টকে অপমানিত করুন। আবূ তালিব রহ. বলেন, ইমাম আহমদ রহ. বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ তারা শুধুই এ কথার প্রতীক্ষায় রয়েছে, আল্লাহ ও ফিরিশতাগণ মেঘের ছায়ায় তাদের নিকট উপস্থিত হবেন।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَجَاء رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا এবং যখন তোমার প্রতিপালাক উপস্থিত হবেন এবং সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও।

সুতরাং যারা আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভকে অস্বীকার করে, তারা কাফির।

ইসহাক ইবনে ইবরাহীম ইবনে হানী রহ. বলেন, আমি আবূ আবদুল্লাহকে (ইমাম আহমদ) বলতে শুনেছি, আল্লাহর দীদার লাভ করাকে অস্বীকারকারী জাহমী। আর জাহমীরা কাফির।

আবূ ইউসুফ ইবনে মূসা বলেন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জান্নাতীরা কি আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে? তার সাথে কথা বলবে? আল্লাহ তা'আলাও কি তাদের সাথে কথা বলবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তারা আল্লাহকে দেখবে এবং আল্লাহ তা'আলাও তাদেরকে দেখবেন। তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলবেন। আল্লাহ তা'আলাও যখন ইচ্ছা করেন, যেভাবে ইচ্ছা করেন, তাদের সাথে কথা বলবেন। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ প্রসঙ্গে বুযুর্গানে দীন হতে যে মতবিরোধ-এর কথা উল্লেখ রয়েছে, তা হলো পার্থিব জগতে দর্শন লাভ প্রসঙ্গে, পরজগতে নয়।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, আমি আমার সকল শাইখকে দেখেছি, তারা আল্লাহর দর্শন লাভ সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোকে হুবহু সত্যায়ন করতেন। বিন্দুমাত্র অস্বীকার করতেন না। তারা হাদীসকে তার অবস্থায় রেখে হুবহু বর্ণনা করতেন। দর্শনের কোনো পন্থা বলতেন না, বা তার প্রতি সংশয় বোধ করতেন না। ইমাম আহমদ রহ. আরো বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولاً মানুষের এমন মর্যাদা নেই, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে কিংবা দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে।

আল্লাহ তা'আলা মূসা আ.-এর সাথে পর্দার অন্তরাল হতে কথা বলেছেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট আরযি পেশ করলেন, হে প্রভু আমার! আপনি আমাকে দেখা দিন, যেন আমি আপনাকে দেখতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না; বরং তুমি পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, তা স্ব-স্থানে স্থির থাকলে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, তিনি তাঁকে পরজগতে দেখতে পাবেন।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ তারা সে দিন প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে।

আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে (حجاب) হিজাব অর্থাৎ অন্তরিত হওয়া শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা শুধু দর্শনে বাধাপ্রাপ্ত হওয়াকে বুঝায়। সুতরাং আয়াতের মর্মার্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা, তাকেই দর্শন দিবেন। কিন্তু কাফিররা তাঁর দেখা পাবে না। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَة সেদিন কিছু চেহারা সজীব থাকবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

হাম্বল রহ. বলেন, আমি ইমাম আহমদ রহ. কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ সংক্রান্ত হাদীসগুলো বিশুদ্ধ। আল্লাহ তা'আলার বাণী لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ এর মধ্যে زيادة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা।

ইমাম আহমদ রহ. বলেন, আমরা বিশ্বাস রাখি, নিশ্চয়ই এ হাদীসগুলো সত্য। আমরা এও বিশ্বাস করি, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ হবে। আমরা কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব। এ ব্যাপারে আমাদের কোন সন্দেহ ও সংশয় নেই।

ইমাম আহমদ রহ. এ কথাও বলেছেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, কিয়ামতের দিন কেউ আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করবে না, সে কুফুরী করল ও কুরআনকে অস্বীকার করল। এরূপ ব্যক্তিকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবাহ করে, তবে তো ভাল আর তাওবা না করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। (কেননা, সে ধর্মদ্রোহী)

বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইমাম আহমদ রহ.কে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এ সব বর্ণনা সহীহ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যা সহীহ সনদে বর্ণিত হবে, আমরা তাকে সত্যায়ন করি। কেননা, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে যা সহীহ সনদে বর্ণিত হয়, আমরা তা যদি সত্যায়ন না করি, তবে আমরা পক্ষান্তরে আল্লাহর বাণীকেই প্রত্যাখ্যানকারী বলে পরিগণিত হব। কারণ আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন, فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে তোমরা বিরত থাক।

ইসহাক ইবনে রাহওয়া রহ.-এর উক্তি
হাকীম রহ. ও শাইখুল ইসলাম রহ. বর্ণনা করেন, খুরাসানের বাদশাহ আবদুল্লাহ তাহির ইসহাক ইবনে রাহওয়ায়কে আল্লাহ তা'আলার দর্শন সংক্রান্ত হাদীসসমূহ ও আল্লাহ তা'আলার প্রথম আকাশে অবতরণ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শরীআতের আহকাম তথা রোযা, নামায, তাহারাত ইত্যাদি সংক্রান্ত হাদীসগুলো যাদের থেকে বর্ণিত, এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোও তাদের থেকে বর্ণিত। সুতরাং সে সকল হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে যদি তারা আদিল-নিষ্ঠাবান তথা সত্যবাদী হন, তবে এগুলোর ব্যাপারেও তাঁরা অবশ্যই আদিল। অন্যথায় তো দীনের আহকামই বাতিল হয়ে যাবে। বাদশাহ তাকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে প্রশান্তি দান করুন। যেমনিভাবে তুমি আমাকে প্রশান্তি দান করেছ।

সকল মু'মিনের সর্বসম্মত মত
ইমামুল আইম্মাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমাহ রহ. স্বীয় গ্রন্থে লিখেন, মু'মিনদের এ ব্যাপারে কোন দ্বি-মত নেই, মু'মিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের সৃষ্টিকর্তাকে দেখবে। সুতরাং যে এ কথা অস্বীকার করল, সে মু'মিনদের নিকট ঈমানদার-ই থাকবে না।

ইমাম মুযানী রহ.-এর উক্তি
'ইমাম তাবারী রহ. আস্-সুন্নাহ নামক গ্রন্থে ইবরাহীম রহ. এর সূত্রে আবূ দাউদ আল মিসরী রহ. হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি নাঈম ইবনে হাম্মাদ রহ. এর নিকট বসা ছিলাম, তিনি তখন মুযানী রহ. কে জিজ্ঞেস করলেন, ما تقول في القران؟ কুরআন কারীমের ব্যাপারে আপনার মত কি? فقال : اقول أنه كلام الله উত্তর দিলেন, আমি বিশ্বাস করি, তা আল্লাহ তা'আলার বাণী। فقال : غير مخلوق؟ পুন: প্রশ্ন করলেন, তা কি মাখলুকের অন্তর্ভুক্ত নয়? فقال : غير مخلوق উত্তর করলেন, হ্যাঁ, তা মাখলুকের অন্তর্ভুক্ত নয় | وتقول : ان الله يرى يوم القيامة নাঈম রহ. পুন: প্রশ্ন করলেন, আপনি কি মনে করেন, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ হবে? قال : نعم উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আমি এ মত পোষণ করি। লোকজন চলে গেলে মুযানী রহ. উঠে নাঈম রহ. কে এসে বললেন, হে আবূ আব্দুল্লাহ! তুমি আমাকে মানুষের সামনে অপমান করেছ। তখন তিনি বললেন, মানুষ আপনার ব্যাপারে অনেক কথা বলে থাকে, তাই আমি জনসাধারণের সামনেই সে সব প্রশ্ন থেকে আপনাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চেয়েছি।

অভিধান বেত্তাদের সর্বসম্মত মত
আবূ আবদুল্লাহ ইবনে বাত্তাহ রহ. বলেন, আমি ভাষাবিদ আবূ ওমর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহিদকে বলতে শুনেছি, আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া সা'লাবী বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا তিনি মু'মিনদের প্রতি দয়ালু। تَحِيْتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সেদিন তাদের সাথে অভিবাধন হবে সালাম।

অভিধানবেত্তাদের সর্বসম্মত মত হলো, উক্ত আয়াতে لقاء দ্বারা উদ্দেশ্য হল চাক্ষুষ দেখা। আল্লাহ তা'আলার সাথে এভাবে প্রত্যক্ষ সাক্ষাত হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন বীরে মাউনার ঘটনায় হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, انا قد لقينا ربنا فرضي عنا وأرضانا আমরা আমাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন।

হযরত উবাদাহ রা. হযরত আইশা সিদ্দীকা রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত ইবনে মাসউদ রা. প্রমুখ হতে এ হাদীস বর্ণিত রয়েছে, من احب لقاء الله احب الله لقائه যে আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাতকে পসন্দ করে, আল্লাহ তা'আলা তার সাক্ষাতকে পসন্দ করেন।

হযরত আনাস রা. হতে এ হাদীস বর্ণিত রয়েছে ،انكم ستلقون بعدي أثرة فاصبروا حتى تلقوا الله ورسوله আমার পরে তোমরা স্বার্থপরতা ও স্বীয় মতকে প্রাধান্য দেওয়ার অভ্যাসটি দেখতে পাবে। তখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাক্ষাতের অপেক্ষা কর।

হযরত আবূ যারর রা. হতে এ হাদীস বর্ণিত রয়েছে لو لقيتنى بقراب الأرض خطايا ثم لقيتنى لا تشرك بي شيئا لقيتك بقرابها مغفرة বান্দাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমরা যদি আমার সাথে কোন অংশীদার সাব্যস্ত না করা অবস্থায় পৃথিবী পরিমাণ পাপ নিয়ে আমার নিকট হাজির হও, তবে আমি সে পরিমাণ মার্জনা ও ক্ষমা নিয়ে হাজির হব।

হযরত আবূ মূসা রা. হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে من لقي الله لا يشرك به شيئا دخل الجنة যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় তাঁর দরবারে হাজির হবে, সে জান্নাত লাভ করবে।

আল্লাহর দীদার অস্বীকারের ভয়াবহতা ও শাস্তি
আল্লাহ তা'আলার বাণী كلا إنهم عن ربهم يومئذ لمخجوبون পূর্বে আলোচিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা যার থেকে আড়ালে থাকবেন, তাকেই আযাব দিবেন। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন, • ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُو الْجَحِيم অতঃপর তারা তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে। • ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُم به تُكَذِّبُونَ অতঃপর বলা হবে, এটাই তা, যা তোমরা অস্বীকার করতে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, তাদের সে অস্বীকৃত বিষয় হল, আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভের বিষয়টি।

ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় সহীহ গ্রন্থে হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কিরাম রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করেছিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কিয়ামত দিবসে কি আমরা আমাদের প্রভুর দেখা পাব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দ্বি-প্রহরে যখন আকাশ পরিচ্ছন্ন থাকে, কোন মেঘ না থাকে, তখন তোমাদের সূর্য দেখতে কি কোন প্রতিবন্ধকতা থাকে, সূর্য দেখতে কি তোমাদের কোন সমস্যা হয়? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকাশে কোন মেঘ না থাকলে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন সমস্যা হয়? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে মুহাম্মদ-এর জীবন, স্বীয় প্রভু মহানকে দেখতেও তোমাদের কোন সমস্যা হবে না, চন্দ্র-সূর্য দেখার সমস্যাহীনতার ন্যায়। এরপর তিনি স্বীয় বান্দাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলবেন, আমি কি তোমাকে সম্মান প্রদর্শন করিনি? আমি কি তোমাকে মর্যাদাবান করিনি? আমি কি তোমাকে স্ত্রী-পরিজন দান করিনি? আমি কি অশ্ব ও উষ্ট্রী তোমার অনুগত করে দেইনি? তোমাকে কি আমি নেতৃত্ব-সরদারী লাভের জন্য অবমুক্ত রাখিনি? তখন বান্দা বলবে, হে প্রভু আমার! শপথ আপনার! আপনি সব কিছুই দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, তুমি কি আমার সাক্ষাতে বিশ্বাসী ছিলে? বান্দা বলবে, না প্রভু! আল্লাহ তা'আলা বলবেন, যেমনিভাবে তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, তেমনিভাবে আমিও তোমাকে ভুলে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা অপর এক বান্দার সাথে সাক্ষাৎ করে সেভাবেই প্রশ্নোত্তর করবেন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, যেমনিভাবে তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, তেমনিভাবে আমিও তোমাকে ভুলে গেলাম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তৃতীয় এক বান্দার সাথে সাক্ষাৎ করে এ প্রশ্নগুলোই করলে সে উত্তর দিবে, হে আমাদের প্রভু! আমি আপনার প্রতি, আপনার প্রেরিত রাসূল, আপনার অবতারিত কিতাবসমূহের প্রতি, আপনার প্রেরিত রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছি। নামায আদায় করেছি। রোযা রেখেছি। সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার হাম্দ ও সানা করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, এখানে, এ সময়ও অর্থাৎ এখানেও মিথ্যা বলছ? এরপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, এখন আমি তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষী পেশ করব। তখন তার মুখে মোহর এঁটে দেয়া হবে। তার উরুকে বলা হবে, তুমি বল। তখন তার উরু, গোশত, হাড় তার আমল সম্পর্কে বলতে থাকবে (অর্থাৎ সে কি কাজ করেছে) এটা এ জন্য করা হবে, যেন সে তার গুনাহের আধিক্য সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। এ ব্যক্তি হবে মুনাফিক, যার প্রতি আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট।

সুতরাং বুঝা গেল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'টি বিষয় উল্লেখ করেছেন, একটি হল فائكم سترون ربكم অচিরেই তোমরা তোমাদের প্রভুর দেখা পাবে। অপরটি হল, আল্লাহর সাক্ষাতে অবিশ্বাসীর ব্যপারে আল্লাহর বাণী, অবশ্যই আমি আজ তোমাকে তেমনি ভুলে গিয়েছি, যেমনিভাবে তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এর দ্বারা এ ফলাফল দাঁড়ায়, মু'মিনদের আল্লাহ তা'আলার لقاء তথা সাক্ষাৎ লাভ হবে। আর অভিধান বেত্তাগণ একমত, لقاء দ্বারা উদ্দেশ্য হল, চর্ম চক্ষু দ্বারা দেখা। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভকে অস্বীকারকারী ব্যক্তিই এ শাস্তির বেশি উপযোগী। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে ভুলে যাবেন অর্থাৎ তার প্রতি কোন রহম করবেন না।

আল্লাহর দর্শন লাভের প্রমাণাদির ব্যাপকতা
ঈমানদারগণ জান্নাতে স্ব-চক্ষে প্রভু মহানের দেখা পাবে। এই বিষয়টি কুরআন, হাদীস, ইজমায়ে সাহাবাহ, আইম্মায়ে ইসলাম, মুহাদ্দিসীনে কিরাম, মনোনীত ও নির্বাচিত ব্যক্তিগণ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নৈকট্য লাভকারীগণের ঐকমত্যের দ্বারা বুঝা যায়। কাজেই কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহ তা'আলাকে ঠিক তেমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমনি মেঘহীন পরিচ্ছন্ন পূর্ণিমার চন্দ্র দেখতে পায় এবং দ্বি-প্রহরের সূর্য দেখতে পায়।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল যে বিষয় সম্পর্কে অবহিত করেছেন, তা যদি বাস্তব হয় এবং তা অবশ্যই বাস্তবও, তাহলে তারা আল্লাহকে তাদের উপরে দেখতে পাবে। কেননা, তারা নিজের নীচে বা পেছনে বা সামনাসামনি কিংবা ডানে অথবা বামে দেখা সম্ভব নয় কোনো মতেই। যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবহিতকৃত বিষয় বাস্তব না হয়, যেমন সাবীঈরা, দার্শনিকরা, অগ্নিপূজকরা, অভিশপ্ত নাস্তিকেরা বলে থাকে, তাহলে কুরআন ও শরীআত সবই বাতিল হয়ে যায়। যাঁদের মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত এ হাদীসগুলো পৌঁছেছে, তাদের মাধ্যমেই আমাদের কাছে আমাদের দীন পৌঁছেছে। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কিছু হাদীসকে মান্য করা আর কিছু হাদীসকে অমান্য করা কোন ভাবেই জায়েয হবে না। কোন ব্যক্তির নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এ বাণীগুলো পৌঁছার পর তার অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝে সেগুলোকে অস্বীকার করা আবার উল্টো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়া, এ দু'টি বিষয় কখনো একত্রিত হতে পারে না।

সকল প্রশংসাই সে সত্তার, যিনি আমাদের সে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। যদি তিনি দিশা না দিতেন, তবে আমরা সু-পথপ্রাপ্ত হতাম না। আমাদের রাসূল সত্য নিয়েই আগমন করেছেন। আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভে এর ক্ষেত্রে দু'টি বিভ্রান্ত গোষ্ঠি রয়েছে। এক গোষ্ঠী তো হল, যারা মনে করে দুনিয়াতেও আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা সম্ভব এবং তার সাথে দুনিয়াতেই কথোপকথন করা সম্ভব। অপর গোষ্ঠী হল, যারা এ মত পোষণ করে, আখিরাতেও আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সম্ভব নয় এবং আখিরাতেও তাঁর সাথে কথোপথন সম্ভব নয়। সুতরাং উভয় গোষ্ঠীই এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার বাণী, তাঁর রাসূলসহ সাহাবায়ে কিরাম ও আইম্মায়ে কিরামের সর্বসম্মত মতকে অস্বীকারকারী। হকের পথে অটল থাকা ও ভ্রান্তি হতে রক্ষা পাওয়ার তাওফীক দানকারী একমাত্র আল্লাহই।

টিকাঃ
৩৯৮. সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২২-২৫
৩৯৯. সুরা, বাকারা, আয়াত: ২৬০
৪০০. সূরা, হুদ, আয়াত: ৪৫-৪৭
৪০১. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭৭
৪০২. সূরা তাওবা, আয়াত: ২২০
৪০৩. সুরা আহযাব, আয়াত: ৪৪
৪০৪. সূরা কাহফ, আয়াত: ১১০
৪০৫. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪৯
৪০৬. সূরা বাকারা, আয়াত: ৭৭
৪০৭. সূরা ইনশিকাক, আয়াত : ৬
৪০৮. সূরা ইউনুস, আয়াত : ২৫
৪০৯. সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৬
৪১০. খ. ১ পৃ. ১০০
৪১১. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৫
৪১২. সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৫
৪১৩. সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩
৪১৪. সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬১
৪১৫. সূরা কাফ, আয়াত: ৩৮
৪১৬. সূরা শু'আরা, আয়াত: ৬১-৬২
৪১৭. সূরা হাদীদ, আয়াত: ৪
৪৮. সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২২-২৩
৪১৯. মুসনাদে আহমদ, খ. ১ পৃ. ৪
৪২০. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ৩৩
৪২১. সুরা নূহ, আয়াত: ২৬
৪২২. বুখারী, খ. ২, পৃ. ১১০৬, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০০
৪২৩. বুখারী, খ. ২ পৃ. ১১০, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০৬
৪২৪. বুখারী, খ. ২ পৃ. ১১০৫
৪২৫. খ. ১ পৃ. ১০০
৪৩১. খ. ৫ পৃ. ৩২৪
৪৩২. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৫-১৭
৪০৩. সূরা শূরা, আয়াত: ৫১
৪৩৪. সূরা হাশর, আয়াত: ৭
৫০৫. সূরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬
৫০৬. সূরা মুজাদালাহ, আয়াত: ৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 মহান প্রভুর অভিবাদন ও কথোপকথন

📄 মহান প্রভুর অভিবাদন ও কথোপকথন


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا أولئك لا خَلَاقَ لَهُمْ فِي الآخرة وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
যারা আল্লাহ তা'আলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেনও না, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
যারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে অবতারিত সুস্পষ্ট দলীল ও হিদায়েতকে গোপন করে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَة আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে তাদের সাথে কথা বলবেন না।
সুতরাং যদি তিনি মু'মিন বান্দাদের সাথেও কথা না বলেন, তবে তো মু'মিন ও দুশমন সকলেই সমান হয়ে যাবে এবং তাঁর দুশমনদের সাথে কথা না বলার বিষয়টি উল্লেখ করা একেবারেই নিরর্থক হয়ে পড়বে। নিরশ্বরবাদী ও বান্দাকে পুতুল বিশ্বাসকারী ফিরকাহ বলে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে কথা বলা তাদের সাথে পানাহার করার মতই। তারা এটাকে এমন সব জিনিসের সাথে তুলনা করে, যা হতে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র। আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি জান্নাতীদেরকে সালাম করবেন। এর দ্বারা বাস্তবার্থেই সালাম উদ্দেশ্য। যেমন তাঁর বাণী سَلَامٌ قَوْلًاً مِن رَّبِّ رَّحِيمِ এ আয়াতের তাফসীরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, তা পূর্বোল্লিখিত হযরত জাবির রা. কর্তৃক বর্ণিত আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীসে রয়েছে। তাতে আছে, আল্লাহ তা'আলা উপর থেকে উঁকি দিয়ে জান্নাতীদেরকে বলবেন, سَلَامٌ عَلَيْكُمْ তোমাদের প্রতি সালাম। এরপর তিনি তাদের সরাসরি দেখা দিবেন।
উক্ত হাদীসে আল্লাহ তাআলার দীদার লাভ, তাঁর সাথে কথোপকথন ও তিনি উপরে থাকার বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়। কিন্তু মু'আত্তালাহরা এ তিনটি বিষয়কেই অস্বীকার করে। এ মত পোষণকারীদেরকে তারা কাফির বলে।
জান্নাতের বাজার সংক্রান্ত হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত পূর্বোল্লিখিত হাদীসে রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে অনুষ্ঠিত মজলিস সমূহে এমন কোন ব্যক্তি থাকবে না, যার সাথে আল্লাহ তা'আলা সরাসরি কথা বলবেন না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে অমুক ব্যক্তি! তোমার কি সে দিনের কথা স্মরণ আছে, যেদিন তুমি এমন এমন কাজ করেছিলে?
হযরত আদী রা.-এর এ হাদীসও পূর্বে আলোচিত হয়েছে। যাতে আছে, তোমাদের প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে কথোপকথন করবেন। আল্লাহ তাআলার দীদার লাভ সংক্রান্ত হযরত আবূ হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস পূর্বে আলোচিত হয়েছে। যাতে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, আমি কি তোমাকে ইয্যত দান করিনি? আমি কি তোমাকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করিনি?
হযরত বুরাইদাহ রা.-এর বর্ণিত হাদীসও পূর্বে আলোচিত হয়েছে, যাতে রয়েছে, তোমাদের প্রত্যেকেই আল্লাহ তা'আলার সাথে পৃথক পৃথক কথা বলবে। যেখানে কোন আড়াল থাকবে না এবং কোন ভাষ্যকারেরও প্রয়োজন পড়বে না।
মোটকথা, আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ সংক্রান্ত হাদীসে চিন্তা করলে অধিকাংশ হাদীসে আল্লাহ তা'আলার সাথে কথা বলার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়ে যাবে। ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে باب كلام الرب تبارك وتعالى مع أهل الجنة (অর্থাৎ জান্নাতীদের সাথে আল্লাহ তা'আলার কথোপকথন বিষয়ক অধ্যায়) নামে শিরোনামে অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করেছেন। এরপর জান্নাতীদের সর্বাপেক্ষা উত্তম নিআমত হল, আল্লাহ তা'আলার দীদার লাভ করা ও তাঁর সাথে কথোপকথন করা। সুতরাং এটা অস্বীকার করা মানে জান্নাতের প্রাণকেই অস্বীকার করা। জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম নিআমতকেই অস্বীকার করা। যা ব্যতীত জান্নাতীরা কোন কিছুতেই স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ করবে না। আর আল্লাহই সর্বোত্তম সহায়তাকারী।

টিকাঃ
৪০৫. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 চিরস্থায়ী জান্নাত

📄 চিরস্থায়ী জান্নাত


এটি এমন একটি বিষয়, যে সম্পর্কে একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জানানো ব্যতীত জানা কোনো মতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَأَمَّا الَّذِينَ سُعِدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضِ إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ عَطَاء غَيْرَ مَجْذُوذٍ
পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান, তারা থাকবে জান্নাতে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। যতদিন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে, যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরূপ ইচ্ছা করেন, এটা এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার৪০৬।
إِلَّا مَا شَاءَ رَبُّكَ এর মধ্যে যে استثناء তথা বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে সালাফ তথা পূর্ববর্তী আলিমদের মতবিরোধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে হযরত মা'মার রহ. যাহ্হাক রহ. হতে বর্ণনা করেন। এর দ্বারা সে সকল লোক উদ্দেশ্য, যারা প্রথমে জাহান্নামে ছিল, পরবর্তীতে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন خالدون في الجنة الا هم مدة مكتهم في النار তারা জান্নাতে অমর হবে, পূর্বে তাদের জাহান্নামে সাময়িক অবস্থানের মুহূর্তগুলো ব্যতিরেকে। গ্রন্থকার বলেন, এতে দু'টি সম্ভাবনা রয়েছে।
একটি হল وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا দ্বারা সকল নেককার উদ্দেশ্য নয়; বরং নির্দিষ্ট শ্রেণীর নেককারগণ উদ্দেশ্য, তারা হল সে সব নেককার, যাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। অপর সম্ভাবনা হল এই وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا দ্বারা সকল নেককার লোক উদ্দেশ্য। استثناء দ্বারা বিশেষ শ্রেণীর লোকদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। (তখন এর অর্থ দাড়ায়, যে সকল মু'মিনকে সাজা ভোগ করার জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তারা ব্যতীত সকল নেককার লোকই জান্নাতে চিরস্থায়ী থাকবে।)
উল্লিখিত উভয় সম্ভাবনার চেয়ে مَا شَاءَ رَبُّكَ ! এর মধ্যে বিদ্যমান আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা দ্বারা সকলকেই উদ্দেশ্য নেওয়া উত্তম। কেননা, সকল মু'মিনই যতক্ষণ পর্যন্ত হাশরের মাঠে ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে ছিল না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্য দলের কথা হল এখানে استثناء তথা বাদ তো দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা এরূপ করবেন না। আল্লাহ তা'আলার এ বাণীটি এ কাজটির ন্যায় غير ذالك الا ان أرى والله لأضربنك অর্থাৎ কাউকে মারার একান্ত ইচ্ছা করে কেউ বলে, আমি অবশ্যই তোমাকে মারব। হ্যাঁ, যদি এর বিপরীত বিষয়টা এতদপেক্ষা উত্তম হয়। (সুতরাং এর অর্থ দাড়ায়, তারা সর্বদা জান্নাতেই থাকবে। হ্যাঁ, তোমার প্রভু যদি বিপরীত ইচ্ছা করেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের চিরস্থায়ী জান্নাত ব্যতীত অন্য কিছু ইচ্ছা করবেন না। কারণ, তাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতে রাখাই তাঁর একান্ত ইচ্ছা।)
তৃতীয় দলের মত হল : আরবরা যখন কোন বস্তুকে তার সমজাতীয় অনেক গুলো হতে استثناء তথা বাদ দেয়, তখন الا ও واو এর অর্থ سوی অর্থাৎ ব্যতীত। সে হিসাবে এর অর্থ হবে, سوى ماشاء ربك তোমার প্রভু যা ইচ্ছা করেন, এটা ব্যতীত। অর্থাৎ আসমান-যমীনের স্থায়ীত্বের সময়কাল অপেক্ষা অধিক। (এখানে যমীন ও আসমান দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আখিরাতের আসমান যমীন। যেমন আল্লাহর বাণী يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ অর্থাৎ যেদিন আসমান ও যমীনকে অন্য আসমান ও যমীন দ্বারা পরিবর্তিত করা হবে আর জান্নাতের আসমান ও যমীন হবে চিরস্থায়ী। সুতরাং মু'মিনগণও জান্নাতে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে।)
এমতটি হচ্ছে দুই নাহুবিদ সিবওয়াইহ ও ফাররার রহ.। তারা বলেন, এ আয়াতে ১। শব্দটি سوی এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, এর উপমা হল, যেমন কেউ বলল ليعليك الف الا الالفين الذين قبلها অর্থাৎ পূর্বের দু'ই হাজার ব্যতীত তোমার নিকট আমি এক হাজার পাব। ইবনে জারীর রহ. বলেন, পূর্বের দু'টি ব্যাখ্যা হতে এটিই আমার নিকট অধিক পসন্দনীয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এমন এক সত্তা, যিনি কখনো প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।
চতুর্থ দল মনে করে, ১। এখানে তার মূল অর্থ استثناء অর্থাৎ বাদ দেয়ার জন্য ব্যবহার হয়েছে। প্রয়োজন তো ছিল, জান্নাতী লোকদের পার্থিব জীবনের সমাপ্তির সাথে সাথেই তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো। কিন্তু তাদের মৃত্যু হতে পুনরুত্থান পর্যন্ত যেহেতু তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়নি, তাই আল্লাহ তা'আলা সে সময়টাকে জান্নাতের চিরস্থায়ী জীবন হতে বাদ দিয়েছেন বলেই এ আয়াতে ১। ব্যবহার করেছেন।
পঞ্চম দল মনে করে, জান্নাতীদের জান্নাতে সর্বদা থাকার ফায়সালা তো হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত করলে করতে পারেন। সুতরাং তিনি জানালেন, জান্নাতী জান্নাতে চিরস্থায়ী হলেও সবই তাঁর ইচ্ছাধীন। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন, وَلَئِن شننا لَتَذْهَبَنَّ بِالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ অর্থাৎ যদি আমি ইচ্ছা করি, তবে আপনার নিকট প্রেরিত প্রত্যাদেশ বাণী ফিরিয়ে নিতে পারি।
ওয়াহী আল্লাহ তা'আলা ফিরিয়ে না নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন। তিনি এতে সক্ষম, অক্ষম নন। তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী فَإِن يَشَا اللَّهُ يَحْتِمْ عَلَى قَلْبَكَ আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে আপনার অন্তরে মোহর এঁটে দিতে পারেন। (নবৃওয়াত প্রদানের পর মোহর না আঁটার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন) তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী قُلْ لُوْ شَاء اللَّهُ مَا تَلُوتُهُ عَلَيْكُمْহ নবী! আপনি বলে দিন, যদি আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করেন, তবে আমি তোমাদের নিকট কুরআন কারীম তিলাওয়াত করব না। এরূপ আরো উদাহরণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, সকল কিছুই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। যা ইচ্ছা করেন না, তা হয় না।
ষষ্ঠ দলের মত হল : مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ দ্বারা এ পৃথিবীর যমীন ও আসমানের সময়সীমা উদ্দেশ্য। সুতরাং আয়াতের অর্থ হবে, তারা আসমান যমীনের সময় সীমা পর্যন্ত জান্নাতে থাকবে। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এ সময় হতে অধিক সময় রাখার ইচ্ছা করেন।
সপ্তম দলের মত হল : مَا شَاءَ رَبُّكَ এর মধ্যে শব্দটি من এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَانكِحُواْ مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاء এর মধ্যে ما শব্দটি من এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ তোমরা মাহরাম মহিলা ব্যতীত অন্য কোন নারীকে ভালো লাগলে বিবাহ করতে পার। সুতরাং এ অবস্থায় অর্থ হবে, رَبُّكَ مَا شَاءَ الا। অর্থাৎ নেককার লোক চিরস্থায়ীভাবে জান্নাতে থাকবে। হ্যাঁ, নেককারদের মধ্যে যাকে তার গুনাহের কারণে তোমার প্রভু জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন সে ছাড়া।
অষ্টম দলের মত হল : مَا دَامَت السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ দ্বারা জান্নাতের আসমান-যমীন উদ্দেশ্য। আর আল্লাহ তা'আলার বাণী, رَبُّكَ مَا شَاءَ الا। এর মধ্যে শব্দটি যদি من অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এর দ্বারা সে সকল লোক উদ্দেশ্য, যারা প্রথমে জাহান্নামে ছিল অতঃপর জাহান্নام থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। আর ৩ দ্বারা যদি সময় উদ্দেশ্য হয়, তবে এর দ্বারা আলমে বরযখ তথা মৃত্যুর পর পুনরুত্থান উদ্দেশ্য।
নবম দলের মত হল : এর দ্বারা তাদের দুনিয়ায় অতিবাহিত সময় উদ্দেশ্য।
উল্লিখিত মতামতগুলো উদ্দেশ্যের দিক থেকে অত্যন্ত কাছাকাছি এবং এগুলোতে সমন্বয় সাধনও সম্ভব। এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জান্নাতীরা সর্বদা জান্নাতে অবস্থান করবে, তবে সে পরিমাণ সময়, যে পরিমাণ সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের জান্নাতে অবস্থান করানো ইচ্ছা করেননি। সে সময়ের মধ্যে তাদের দুনিয়ায় অবস্থানের সময়, বরযখে থাকার সময়, হাশরের ময়দানে থাকার সময়, পুলসিরাতে থাকার সময় ও কারো কারো জাহান্নামে থাকার সময়ও অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে এ সকল সম্ভাবনাও রয়েছে, তবে আল্লাহ তা'আলার বাণী عَطَاء غَيْرَ مَجْذُودَ হল إِنَّ هَذَا لَرِزْقُنَا مَالَهُ مِن نَّفَادٍ। নিশ্চয়ই এটা আমার পক্ষ হতে অবতারিত রিক, যা কখনো নিঃশেষ হবে না। তেমনিভাবে আল্লাহর বাণী أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا তার ফল ও ছায়া স্থায়ী। এমনিভাবে আল্লাহর বাণী, وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা জান্নাত হতে বহিষ্কৃত হবে না। কুরআন কারীমে অনেক স্থানে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতীদের স্থায়ীত্বকে সর্বদা বিশেষণ দ্বারা দৃঢ় করেছেন। (অর্থাৎ خَالِدِينَ فِيهَا এর সাথে أَبَدًا শব্দটিকে তাকিদ হিসাবে উল্লেখ করেছেন) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন, তারা প্রথমবারের মৃত্যু (দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে আড়ালকারী মৃত্যু) ব্যতীত সেখানে তারা চিরস্থায়ী থাকবে। কিন্তু এ মৃত্যু যেহেতু তাদের চিরস্থায়ী জীবনের সূচনার পূর্বের। সুতরাং বুঝা যায়, তাদের জান্নাতী জীবনে মৃত্যু আসবে না; বরং তাদের জান্নাতী জীবন হবে চিরস্থায়ী।
পূর্বোল্লিখিত হাদীসে রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তারা প্রাচুর্য ও আভিজাত্যে থাকবে। কখনো সে দুরবস্থার সম্মুখীন হবে না। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। কখনো মৃত্যু মুখে পতিত হবে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, জান্নাতে এক ঘোষক ঘোষণা করতে থাকবে, হে জান্নাতীগণ! তোমরা সর্বদা সুস্থ সবলে থাকবে, কখনো রুগ্ন ও পীড়িত হবে না। তোমরা সর্বদা তরুণ থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। চিরস্থায়ী হবে, কখনো মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে না।
সহীহায়নে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يجاء بالموت في صورة كبش املح فيوقف بين الجنة والنار একটি কালো-ধলো বর্ণ মিশ্রিত দুম্বার আকৃতিতে মৃত্যুকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জান্নাত ও জাহান্নাম-এর মধ্যবর্তী স্থলে যবাহ করা হবে ও অতঃপর আহ্বান করা হবে, হে জান্নাতবাসীরা! তখন তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তাকাবে। يقال يا أهل النار فيطلعون فرحين এরপর আহ্বান করা হবে, হে জাহান্নামীরা! তখন তারা আনন্দ চিত্তে তাকাবে, (এটা এ জন্য, তারা মনে করবে, হয়ত এর মাধ্যমে নরক থেকে আমাদেরকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে)? فيقال هل تعرفون هذا؟ তখন বলা হবে, তোমরা কি জান, এটা কি? فيقولون نعم هذا الموت তারা উত্তর দিবে, হ্যাঁ, এটা হল মৃত্যু। فيذبح بين الجنة والنار অতঃপর তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থলে যবাহ করা হবে। ثم يقال : يا أهل الجنة خلود فلا موت এরপর বলা হবে, হে জান্নাতবাসীরা! এখানে স্থায়ী জীবন, কখনো মৃত্যু আসবে না। ثم يقال : يا أهل النار خلود فلا موت এরপর বলা হবে, হে জাহান্নামীরা! এখানে স্থায়ী জীবন, কখনো মৃত্যু আসবে না। (তখন জান্নাতীদের আনন্দের কোন সীমা থাকবে না। আর জাহান্নামীদেরও দুঃখের কোন সীমা থাকবে না)
উম্মতে মুহাম্মদীর পরবর্তী প্রজন্মের উলামায়ে কিরামের মাঝে এ বিষয়ে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। তাদের থেকে তিন ধরনের অভিমত লক্ষ্য করা যায়।

প্রথম মত: জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই অস্থায়ী ও ধ্বংসশীল।
দ্বিতীয় মত: উভয়টিই স্থায়ী ও অবিনশ্বর। কখনো ধ্বংস হবে না।
তৃতীয় মত: জান্নাত স্থায়ী, কখনো ধ্বংস হবে না আর জাহান্নام অস্থায়ী, তা কোন এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে।

নিম্নে এ মতামতগুলোর পক্ষের-বিপক্ষের দিকগুলো উল্লেখ করব ও প্রত্যেক মতের দলীল উল্লেখ করে কুরআন-সুন্নাহের সাথে সাংঘর্ষিক মতকে খণ্ডন করব।

প্রথম মতটি অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টি অস্থায়ী হওয়ার মতটি হল মু'আত্তালাহদের ইমাম জাহম ইবনে সাফওয়ানের। তার পূর্বে সাহাবা, তাবেঈন, আইম্মায়ে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্যে কেউ এ মত পোষণ করেননি। এটা তার এমন একটি আকীদা, যার কারণে আইম্মায়ে ইসলাম তার ও তার অনুসারীদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাঁরা আওয়ায তুলেছেন।

যেমন ইমাম আহমদ রহ. এর পুত্র আবদুল্লাহ রহ. কিতাবুস্-সুন্নাহতে খারিজাহ ইবনে মুস'আব রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, জাহমিয়ারা কুরআন শরীফের তিনটি আয়াতকে অস্বীকার করেছে, তন্মধ্যে একটি হল আল্লাহ তা'আলার বাণী دائم وظلها كلها জান্নাতের ফল ও ছায়া হবে স্থায়ী। অথচ সে বলে তা অস্থায়ী।

দ্বিতীয়টি হল إِنَّ هَذَا لَرِزْقْنَا مَا لَهُ مِن تَفَادِ এটা আমার পক্ষ হতে রিযিক, যা কখনো নিঃশেষ হবে না।

তৃতীয়টি হল مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ اللَّهِ بَاقِ হে মানব সকল! তোমাদের নিকট যা রয়েছে, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আমার নিকট যা রয়েছে, তা ধ্বংস হবে না; বরং তা হবে স্থায়ী।

এ মত পোষণকারীরা তাদের ভ্রান্ত ও ভুল কিয়াসের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, যা কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেননা, কুরআন-হাদীস ও সহীহ আকল দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলার বাণী ও কর্ম হল অসীম। যা অন্য কোন কর্মের কারণে নিঃশেষ হয়ে যায় না। পূর্বোক্ত কাজের কারণে বাধাগ্রস্তও হয় না। (মানুষ এক সময়ে একাধিক কাজ করতে পারে না, এক কাজ সমাপ্ত করে অন্য কাজ করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার কাজ এমন নয়; বরং তিনি সকল কাজই তাঁর শান মোতাবেক আদি হতে অন্ত পর্যন্ত করে যাচ্ছেন। আমরা তার পন্থা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানি না।)

আল্লাহ তা'আলার বাণী ও কর্ম অসীম হওয়ার দলীল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, قُلْ لَوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِكَلِمَاتِ رَبِّي لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّي وَلَوْجِئْنَا بِمِثْلِهِ مَدَدً বল, আমার প্রতিপালকের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, আমি এটার সাহায্যার্থে অনুরূপ আরো সমুদ্র আনলেও।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন,
وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةِ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِنْ بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় আর সমুদ্র হয় কালি ও তার সাথে আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়, তবু আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিলেন, তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় হওয়ার দরুন তাঁর বাণী কখনো নিঃশেষ হবে না। উভয়টিই তাঁর সিফাতে যাতিয়া তথা সত্তা সংশ্লিষ্ট গুণের অন্তর্ভূক্ত।

ইবনে আবী হাতিম স্বীয় তাফসীরে সুলায়মান ইবনে আমির রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রবী ইবনে আনাস রহ.কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলার ইলমের মোকাবেলায় সমস্ত মাখলুকের ইলমের তুলনা সমুদ্রের তুলনায় একটি বিন্দুর ন্যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَوْ أَنْمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةِ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ

তিনি আরো বলেন, قُلْ لَوْ كَانَ الْبَحْرُ مَدَادًا। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এটাই বললেন, হে নবী! আপনি বলে দিন, যদি আল্লাহর বাণী লিপিবদ্ধ করার জন্য সমুদ্র কালিতে রূপান্তরিত হয় এবং বৃক্ষরাজি কলমে পরিণত হয় (এবং সকল মানুষ লিখতে শুরু করে) তবে কলম ক্ষয় হয়ে যাবে, সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার বাণী অবশিষ্ট থাকবে, নিঃশেষ হবে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলার বাণীকে আয়ত্ব করতে কেউ সক্ষম হবে না। কেউ তাঁর শানের যথোপযোগী প্রশংসা করতে সক্ষম নয়; বরং তিনি তাঁর যেভাবে প্রশংসা করেছেন, তিনি ঠিক তেমনি। তিনি তাঁর যেভাবে সিফাত বর্ণনা করেছেন, তিনি সে সিফাতের সাথে গুণান্বিত; বরং তিনি তাঁর থেকেও উর্ধ্বে। (কেননা, তিনি মাখলুককে তাঁর সমস্ত সিফাত সম্পর্কে জানাননি। তাই তিনি তাঁর যে সিফাতের বর্ণনা দিয়েছেন, তা অপেক্ষাও তাঁর সত্তা অনেক উর্ধ্বে।) পার্থিব জগতের পূর্বাপর সকল নিআমত আখিরাতের মোকাবেলায় ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে সমগ্র পৃথিবীর তুলনায় একটি তিল। (এটাও تو শুধু মানুষকে বুঝানোর জন্য উপমা স্বরূপ, অন্যথায় আখিরাতের নিআমতের সাথে দুনিয়ার নিআমতের কোন তুলনাই হয় না।)

জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার বর্ণনা
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের দু'টি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। এ ব্যাপারে তাবেঈদের থেকেও মতনৈক্য স্বতঃসিদ্ধ।

গ্রন্থকার বলেন, এ বিষয়ে সাতটি অভিমত রয়েছে।

প্রথম অভিমত: তাতে যে-ই প্রবেশ করবে, সে আর কখনো বের হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাতে প্রবেশ স্থায়ীভাবেই হবে। এটা মু'তাযিলা ও খারিজীদের মত।

দ্বিতীয় অভিমত: জাহান্নামীরা একটা সময় পর্যন্ত তাতে শান্তি পেতে থাকবে। তখন তাদের স্বভাবই আগুনের স্বভাব হয়ে যাবে। ফলে তারা তাতে এক প্রকার স্বাদ ও তৃপ্তি লাভ করবে। এটা হল ইবনে আরাবী আত্ তায়ী-এর মত। তিনি স্বীয় গ্রন্থ ফুসূসে উল্লেখ করেন, প্রতিশ্রুতি পালন প্রশংসনীয় বিষয়, ধমকি বাস্তবায়ন নয়। আর আল্লাহর সত্তার মহত্ত্ব এমন প্রশংসার দাবীদার, যা তার সত্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই আল্লাহর সত্তার প্রশংসা হবে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের উপর; দণ্ড প্রয়োগের উপর নয়। বরং দণ্ড মার্জনার উপর প্রশংসা হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ مُخْلِفَ وَعْدِهِ رُسُلَهُ তুমি কখনো মনে করো না, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।

আল্লাহ তা'আলা مُخْلِفَ وَعْدِهِ বলেছেন, তিনি مُخلف وَغده বলেননি। সুতরাং বুঝা যায়, তিনি বলেছেন, ونتجاوز عن سيئاتهم অর্থাৎ আমি তাদের পাপরাশি মার্জনা করে দিব। পাপকার্যের ব্যাপারে ধমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি তা বললেন। তিনি হযরত ইসমাঈল আ.-এর প্রশংসায় বলেছেন, তিনি হলেন, অঙ্গীকার বাস্তবায়নকারী।

গ্রন্থকার বলেন, এঅভিমত পোষণকারীরা একদিকে আর মু'তাযিলারা অন্যদিকে। তারা বলে, আল্লাহ তা'আলার জন্য তাঁর প্রদত্ত ধমকির বিপরীত করা বৈধ নয়; বরং তিনি যে ধমকি প্রদান করেছেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন করা তাঁর জন্য ওয়াজিব বা আবশ্যক। সুতরাং মু'তাযিলাদের মতে যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সে কখনো নাজাত পাবে না। আর ইবনে আরাবী আত্ তাঈর মতে কেউ চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। এ উভয় দলের মতই সে নীতির সাথে সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক, যা আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে জানিয়েছেন।

তৃতীয় অভিমত: কারো কারো অভিমত হল, জাহান্নামীদের কিছু দিন সাজা দেওয়ার পর তা হতে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর তাদের স্থলে অন্যদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ইহুদীরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এ মত ব্যক্ত করলে তিনি তাদের মতকে মিথ্যায় পর্যবসিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ মতকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে বলেন,
وَقَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَةً قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِنْدَ الله عَهْدًا فَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ عَهْدَهُ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
আমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা কি আল্লাহ তা'আলা হতে অঙ্গীকার নিয়েছ? যে আল্লাহ তা'আলা তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না; কিংবা আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? بَلَى مَنْ كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ به خَطِيئَتُهُ فَأولئكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ .
যাদের পাপরাশি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে, তারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।

আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো বলেন,
قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ )
যারা বলে থাকে, দিন কতক ব্যতীত আগুন আমাদেরকে স্পর্শই করবে না। তাদের নিজেদের দ্বীন সম্বন্ধে তাদের মিথ্যা উদ্ভাবন তাদেরকে প্রবঞ্চিত করেছে।

সুতরাং এ মত হল খোদার দুশমন ইয়াহুদীদের। তারাই এ মত পোষণকারীদের গুরু। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমায়ে সাহাবাহ ও আইম্মায়ে ইসলামের মতানুসারে এটা ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট মত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَمَا هُمْ بِخَارِجِينَ مِنَ النَّارِ তারা কখনো আগুন হতে বের হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَمَا هُمْ مِنْهَا بِخَارِجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمَّ أُعِيدُوا فِيهَا যখনই তারা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জাহান্নাম হতে বের হতে চাবে, তখনই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাতে। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا أُعِيدُوا فِيهَا যখনই তারা বের হতে চাবে, ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাতে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَايُخَفِّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا তাদের (জাহান্নামীদের) মৃত্যু আদেশ দেওয়া হবে না, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি লাঘব করাও হবে না।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمُ الْخِيَاطِ এবং তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সূচের ছিদ্র পথে উষ্ট্রী প্রবেশ করে।

এ আয়াতের ভাষ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট, কাফিররা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

চতুর্থ অভিমত : কেউ কেউ বলে, জাহান্নামীদের জাহান্নাম হতে বের করে আনা হবে, কিন্তু জাহান্নام আপন অবস্থায় বাকী থাকবে। সেখানে সাজার জন্য আর কেউ থাকবে না। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এ মতটি নকল করেছেন। কিন্তু এ মতটি কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত।

পঞ্চম অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নাম ধ্বংস হয়ে যাবে, কেননা, তা নব সৃষ্টি, যা পূর্বে ছিল না। আর যার নব সৃষ্টি হওয়া প্রমাণিত, তা স্থায়ী হওয়া অসম্ভব। এটা হল জাহম ইবনে সাফওয়ান ও তার অনুসারীদের মত। এ ব্যাপারে তার মত হল, জান্নাত ও জাহান্নামে কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যাবে।

ষষ্ঠ অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নামীরা কোন এক সময় জড় বস্তুতে পরিণত হবে। তাদের জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারা কোন দুঃখ-কষ্ট অনুভব করবে না। মু'তাযিলাদের ইমাম আবূ হুযাইল আল আল্লাফ এ মত পোষণ করেন।

সপ্তম অভিমত: কেউ কেউ মনে করে, জাহান্নামের সৃষ্টিকর্তা নিজেই তাকে ধ্বংস করে দিবেন। কেননা তিনি তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তৈরী করেছেন। সে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তিনি তা ধ্বংস করে দিবেন। এমতটি হযরত উমর, হযরত ইবনে মাসউদ, হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত আবূ সাঈদ রা. প্রমুখ হতে বর্ণিত।

আবদ ইবনে হুমাইদ রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, হযরত উমর রা. বলতেন, জাহান্নামীরা যদি সমগ্র বালুকারাশির সমপরিমাণও জাহান্নামে থাকে, তবুও একটা সময় আসবে, যখন তারা জাহান্নام থেকে মুক্তি পাবে

হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল রহ. স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, হযরত উমর রা. বলেছেন, যদি জাহান্নামীরা সমগ্র বালুকারাশি পরিমাণ সময়ও জাহান্নামে অবস্থান করে, তবু একটা সময় আসবে, যখন তারা জাহান্নام হতে নিষ্কৃতি পাবে। এ মত পোষণকারীরা বলেন, আলী ইবনে আবী তালহা আল ওয়ালেবী রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তা'আলার বাণী: النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ (জাহান্নাম হল তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে সর্বদা থাকবে, তবে আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা করেন। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রভু জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান।) এর তাফসীরে উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা'আলার মাখলুকের ব্যাপারে আল্লাহর উপর কারো ফয়সালা করা উচিত নয়। কাউকে জান্নাতী এবং জাহান্নামী ফয়সালা দেওয়াও উচিত নয়। তারা বলে, আয়াতে خالدين فيها أبدا এ ধমকি শুধুমাত্র আহলে কিবলার (অর্থাৎ ঈমানদার কিন্তু গুনাহের কারনে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে) সাথে খাস নয়; কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
يَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِنَ الإِنسِ وَقَالَ أَوْلَيَاؤُهُمْ مِنَ الإِنسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَلْتَ لَنَا قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ
সেদিন তিনি সকলকে একত্রিত করবেন এবং বলবেন, হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা তো অনেক মানুষকে তোমাদের অনুগামী করেছিলে এবং মানব সমাজের মধ্যে তাদের বন্ধুগণ বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের মধ্যে কতক অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছে এবং তুমি আমাদের জন্য সে সময় নির্ধারিত করেছিলে, এখন আমরা তাতে উপনীত হয়েছি, সেদিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জাহান্নামই তোমাদের বাসস্থান, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে, যদি না আল্লাহ অন্য রকম ইচ্ছা করেন। তোমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত। وَكَذَلِكَ نُوَلِّي بَعْضَ الظَّالِمِينَ بَعْضًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ এভাবে আমি তাদের কৃতকর্মের জন্য যালিমদের এক দলকে অন্য দলের বন্ধু করে থাকি। ৪৯।

মানবদের মাঝে জিনদের বন্ধু কাফিররাও হবে। কেননা, গুনাহগার মুসলমানদের তুলনায় কাফিররাই জিনদের বন্ধু হওয়ার বেশি উপযোগী। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ যারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাদের অভিভাবক বানিয়েছি। ৫০। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ শয়তানদের ঈমানদারদের উপর কোন কর্তৃত্ব নেই, কেননা তারা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ . وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ निश्चय তার অভিভাবকত্ব হল, তার উপর যারা তার সাথে বন্ধুত্ব রাখে আর তারা হল মুশরিকরা।

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ যারা তাকওয়ার অধিকারী হয়, তাদেরকে শয়তান যখন কু-মন্ত্রণা দেয়, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ তাদের চক্ষু খুলে যায়। وَإِخْوَانُهُمْ يَمُدُّونَهُمْ فِي الْغَيِّ ثُمَّ لَا يُقْصِرُونَ তাদের সঙ্গী- সাথীরা তাদেরকে ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোন ত্রুটি করে না।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে ও তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ যারা তোমাদের শত্রু?

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبُ . الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ তারা শয়তানেরই দল। সাবধান! শয়তানের দল অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত।

وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ নিশ্চয় শয়তানেরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়, যদি তোমরা তাদের কথা মত চল, তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হবে।

জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার দলীল
যারা বলে, জাহান্নাম অবশ্যই চিরস্থায়ী হবে, তাদের ছয়টি দলীল রয়েছে।

প্রথম দলীল: সকলে ঐকমত্য। উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কিরামের অভিমত হল, জাহান্নামের চিরন্তনত্ব ও চিরস্থায়িত্বের উপর সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈগণ বিনা মতানৈক্যে একমত। এবিষয়ের মতভেদগুলো পরবর্তীতে সৃষ্ট। তাও বিদআতী মহল হতেই উদ্ভূত

দ্বিতীয় দলীল: কুরআনুল কারীম দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, عَذَابٌ مُقِيمٌ অর্থাৎ স্থায়ী শাস্তি।

তাদের থেকে সে আযাব কখনো লাঘব করা হবে না। যেমন কুরআনের ভাষ্য, لا يُفْتَرُ عَنْهُمْ তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না। তাদের শাস্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। যেমন কুরআনের ভাষ্য, فَلَن تَزِيدَكُمْ إِلَّا عَذَابًا আমি তো তোমাদের শুধু শাস্তিই বৃদ্ধি করব।

তারা সেখানে স্থায়ী থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, خالدين فيها أَبَدً তারা সেখানে সর্বদা থাকবে। وَمَا هُم بخارجينَ مِنَ النَّارِ তারা কখনো আগুন হতে বের হতে পারবে না। وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃত হবে না। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَهُمَا عَلَى الْكَافِرِينَ আল্লাহ তা'আলাতো এ দু'টিকে হারাম করেছেন কাফিরদের জন্য।

আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمٌ الْخِيَاط তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সুঁচের ছিদ্র পথে উষ্ট্রী প্রবেশ করে।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, لا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلا يُخفِّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابهَا তাদের মৃত্যুর আদেশ দেওয়া হবে না, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এ সকল আয়াত দ্বারা অকাট্যভাবে বুঝা যায়, জাহান্নাম চিরস্থায়ী।

তৃতীয় দলীল: হাদীসে মাশহুর দ্বারা বুঝা যায়, যাদের অন্তরে শস্য পরিমাণও ঈমান রয়েছে, তারাও জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি পাবে, কিন্তু কাফিররা নিষ্কৃতি পাবে না। শাফাআত সংক্রান্ত সকল হাদীস দ্বারা পাপী মু'মিনদের জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি পাওয়ার বিষয়টি বুঝে আসে। তা তাদের সাথেই খাস। সুতরাং যদি কাফিররাও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পায়, তবে ঈমানদার ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য থাকে কি? আর ঈমানদারের বিশেষত্ব-ই বা রইল কোথায়?

চতুর্থ দলীল: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ মত অনুযায়ী-ই দীক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং অন্য কোন বর্ণনা ব্যতীতই আমরা শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দীক্ষা দ্বারা বুঝতে পারি, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হবে, তাঁর দীক্ষা দ্বারা জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার বিষয়টি বুঝে আসে।

পঞ্চম দলীল: সালফে সালেহীনের ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর আকীদায় এ কথাও বর্ণনা করা হয়েছে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টিই সৃজিত এবং সেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না; বরং সেগুলো চিরস্থায়ী। এগুলোর অস্থায়িত্বের আকীদা বিদ'আতীদের আকীদা।

ষষ্ঠ দলীল: যুক্তির নিরিখেও বুঝা যায়, কাফিররা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। মূলত: এ বিষয়টি নির্ভর করে অন্য একটি মূলনীতির উপর, তা হল, পূণ্যাত্মাকে পুণ্যের প্রতিদান করা ও পাপাত্মাকে পাপের প্রায়শ্চিত্য ভোগ করার বিষয়টি কুরআন-হাদীস ব্যতীত শুধুমাত্র যুক্তির আলোকে বুঝা সম্ভব, নাকি কুরআন হাদীস ব্যতীত বুঝা সম্ভব নয়? এ ব্যপারে দু'টি মত রয়েছে। একটি হল, কুরআন হাদীস হতে শ্রুত দলীলের সাথে সমন্বয় করে যুক্তির নিরিখেও এটা বুঝা সম্ভব। কুরআন কারীমের কয়েক স্থানে এরূপ বিবৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা সে সকল লোকের ধারণাকে খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, নেককার ও বদকারদের জীবন ও মৃত্যু সমপর্যায়ের। আল্লাহ তা'আলা তাদের ধারনাকে খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুককে অনর্থক সৃষ্টি করেছেন। তারা স্বীয় প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না। তাদের ধারনাকেও আল্লাহ তা'আলা খণ্ডন করেছেন, যারা মনে করে, তাদেরকে এমনিতেই রেখে দেওয়া হবে অথবা কোন সাওয়াবও দেওয়া হবে না, আযাবও দেওয়া হবে না। অথচ এমন ধারণা তাঁর প্রজ্ঞা ও পূর্ণতাকে ত্রুটিযুক্ত করার নামান্তর। সুতরাং তাঁর প্রতি এ ধারণা পোষণ করার কোন অবকাশ নেই। তারা কখনো কখনো এ কথা স্বীকার করে, মানবাত্মা অবশিষ্ট থাকবে আর মানবাত্মার আকীদা-বিশ্বাস ও সিফাত এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কখনো সেগুলো তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। সে সকল আত্মা এ ভুল আকীদা ও বিশ্বাস রাখার দরুন তারা যে শাস্তির সম্মুখীন হবে, সে জন্য তারা লজ্জিত হবে। কিন্তু এ ভুল আকীদা পোষণ করা বা ভুল সিফাত ধারণ করার কারনে তারা লজ্জিত হবে না; বরং আযাব তুলে নিলে তারা পুনরায় পূর্বের আকীদাই পোষণ করবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَتَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَالَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
তুমি যদি দেখতে, তাদেরকে যখন আগুনের পার্শ্বে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা বলবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত, তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না, আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। بَلْ بَدَا لَهُمْ مَا كَانُوا يُخْفُونَ مِنْ قَبْلُ وَلَوْرُدُّوا لَعَادُوا لِمَا / 2017 acha wa نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ . না, তারা পূর্বে যা গোপন করত, তা এখন তাদের নিকট প্রকাশ পেয়েছে। আর তারা প্রত্যাবর্তিত হলেও যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, পুনরায় তারা তাই করত এবং নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী।

সুতরাং তারা শাস্তি ভোগ করার পরও তাদের শাস্তির কারণ ও তাদের শাস্তির সম্মুখীনকারী বিষয় তাদের হতে বিদূরিত করা হবে না; বরং তাদের নষ্টামি ও কুফরী তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। ফলে তাদেরকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠালেও তারা পূর্বের ন্যায় কুফরীই করবে। এর দ্বারা বুঝা যায়, যুক্তিরও দাবী হল, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী থাকবে, যেমনিভাবে কুরআন- হাদীস হতে শ্রুত দলীল দ্বারা বুঝা যায়।

দ্বিতীয় পক্ষ, যারা জাহান্নামের অস্থায়িত্ব ও এক সময় ধ্বংস হওয়ার প্রবক্তা তারা উক্ত প্রমাণাদির উত্তরে বলে, এই প্রমাণগুলো আলোচনার মাধ্যমে অসার হয়ে যাবে।

প্রথম দলীলের জবাব: তারা বলে, তোমরা যে ইজমার কথা বর্ণনা করছ, মূলত: তার কোন হাদীস নেই। এ মাস'আলাতে মতবিরোধ সম্পর্কে অবহিত না হওয়াকেই তোমরা ইজমা বলে ধারণা করেছ, অথচ এ মাস'আলাতে পূর্বাপর সব যুগেই মতবিরোধ চলেই আসছে। এমনি এ মাস'আলাতে ইজমার দাবীদারকে দশজন বা তার চেয়েও কম সংখ্যক সাহাবী হতে তাদের দাবীর সপক্ষে বর্ণনা উপস্থাপন করতে বলা হলে তারা সক্ষম হবে না, অথচ আমরা আমাদের মতের পক্ষে সাহাবায় কিরাম হতে একাধিক সুস্পষ্ট বর্ণনা উপস্থাপন করেছি।

দ্বিতীয় দলীলের জবাব: দ্বিতীয় দলীলের জবাবে তারা বলে, তোমরা বলেছ, জাহান্নাম চিরস্থায়ী হওয়ার ও ধ্বংস না হওয়ার ব্যাপারে কুরআন কারীমের ভাষ্য রয়েছে। কিন্তু কুরআন কারীমের এমন দলীল কোথায় আছে? হ্যাঁ, কুরআন কারীমে রয়েছে, কাফিররা জাহান্নামে সর্বদা থাকবে। তাদেরকে তা হতে কখনো নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না। তাদের শাস্তি কখনো লাঘব করা হবে না। তারা সেখানে মৃত্যুবরণ করবে না। তারা সর্বদা আযাবে থাকবে। আর জাহান্নামের আযাব তাদের জন্য আবশ্যকীয়। এ সকল বিষয়ে সাহাবা ও তাবেঈদের মাঝে কোন মতবিরোধ নেই। এটা আমাদের বিরোধিত বিষয়ও নয়। আমাদের বিরোধিত বিষয় হল, জাহান্নام চিরস্থায়ী না কি ধ্বংসশীল! কিন্তু উল্লিখিত বিষয়গুলি দ্বারা বুঝা যায় না, জাহান্নাম চিরস্থায়ী। বরং এর দ্বারা বুঝা যায়, জাহান্নাম যতদিন থাকবে, ততদিন তারা শাস্তি ভোগ করবে এবং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না ইত্যাদি। অর্থাৎ জাহান্নাম বিদ্যমান থাকাবস্থায় তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হবে না, যেমনিভাবে পাপী মু'মিনদেরকে জাহান্নাম বিদ্যমান থাকাবস্থায়ই নিষ্কৃতি দেওয়া হবে। এদের উপমা হল, সেই দুই বন্দীর ন্যায়, যাদের একজনকে জেলখানা বিদ্যমান থাকাবস্থায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আর অপরজনকে জেলখানা ধ্বংস হওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় দলীলের জবাব: আপনারা হাদীসে মাশহুর দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, কবীরাহ গুনাহতে লিপ্ত মুমিন ব্যক্তি জাহান্নام হতে মুক্তি পাবে কিন্তু মুশরিকরা নিষ্কৃতি পাবে না। এটা সঠিক ও এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর দ্বারাও কেবল মাত্র তা-ই বুঝা যায়, যা আমরা ইতোপূর্বে বলেছি অর্থাৎ পাপী ঈমানদাররা জাহান্নام বিদ্যমান থাকাবস্থায়ও তা হতে নিষ্কৃতি পাবে। কিন্তু মুশরিকরা জাহান্নাম যতদিন বিদ্যমান থাকবে, ততদিন সেখানে অবস্থান করবে।

চতুর্থ দলীলের জবাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দীক্ষা দ্বারা বুঝা যায়, কাফিররা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কথার উপর দলীল পেশ করা, জাহান্নام চিরস্থায়ী, এটা সঠিক নয়।

পঞ্চম দলীলের জবাব: জান্নাত ও জাহান্নام সৃষ্টি করা হয়ে গেছে এবং এগুলো কখনো ধ্বংস হবে না। এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা। এতে কোন সন্দেহ নেই আর উভয়টা ধ্বংস হওয়ার আকীদা নিশ্চয়ই বিদ'আতীদের, জাহমিয়াদের ও মু'তাযিলাদের আকীদা। সাহাবা, তাবেঈন ও আইম্মায়ে ইসলাম কেউ এরূপ মত পোষণ করেননি। কিন্তু শুধু জাহান্নام ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে আমরা কতিপয় সাহাবা ও তাবেঈদের মত উল্লেখ করেছি। সুতরাং সাহাবা ও তাবেঈদের মত উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তা বিদ'আতীদের আকীদা কিভাবে বলা যেতে পারে? জান্নাতের স্থায়িত্ব ও জাহান্নামের অস্থায়িত্ব; এভাবে দু'ভাগ করে অভিমত কোনো বিদআতী মহল থেকে শুনা যায়নি।

যুক্তিঋদ্ধ দলীলের জবাব: আপনারা জাহান্নামীদের চিরস্থায়ী হওয়ার উপর যুক্তির আলোকে যে দলীল পেশ করেছেন, তার উত্তর হল, এটি যুক্তির ঊর্ধ্বে র বিষয়ে যুক্তি প্রয়োগের জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি এমন একটি মাসআলা; যা যুক্তি দিয়ে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না এ বিষয়ে মহান রাসূল হতে সুস্পষ্ট ঘোষাণা বা বিবৃতি না আসে। তবে হ্যাঁ, এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, সেটি হল, ছাওয়াব ও আযাবের যোগ্য হওয়ার বিষয়টি কুরআন হাদীসে শ্রুত দলীলের সাথে সাথে যুক্তি দ্বারাও বুঝা সম্ভব কিনা? এ ব্যাপারে চার ইমাম ও তাদের অনুসারীগণ এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের থেকে দু'টি মত পাওয়া যায়। তবে বিশুদ্ধতম বিষয় হল, যুক্তির নিরিখে সমষ্টিগতভাবে বুঝা যায়, কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং ছাওয়াব ও আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু এর দ্বারা বিস্তারিত কিছুই জানা যায় না; বরং তা একমাত্র কুরআন হাদীসে বর্ণিত দলীল দ্বারাই জানা সম্ভব।

সুতরাং কুরআন-হাদীসের দলীল দ্বারা জানা যায়, নেককার লোকদের ছাওয়াব তথা প্রতিদান স্থায়ী হবে আর পাপী ঈমানদের শাস্তি স্থায়ী হবে না; বরং এক সময় তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু মুশরিকদের ব্যাপারে স্থায়ী হওয়া বা সমাপ্তি ঘটা এই বিষয়টি হচ্ছে বিতর্কের প্রতিপাদ্য। কাজেই কুরআন হাদীসের ভাষ্য যে দলের পক্ষে যাবে, সে দলই সঠিক ও বিজয়ী রূপে সৌভাগ্যবান হবে।

টিকাঃ
৪০৬. সূরা হুদ, আয়াত ১০৮
৪০৯. বুখারী-খ. ২ পৃ. ৬৯১ মুসলিম, খ. ২ পৃ. ৩৮২
৪৩৮. সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৯
৪৩৯. সূরা লুকমান, আয়াত: ২৭
৪৪১. সূরা বাকারা, আয়াত: ৮০-৮১
৪৪২. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৪
৪৪২. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ২৪
৪৪৩. সূরা বাকারা, আয়াত: ১৬৭
৪৪৪. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৪৪৫. সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২২
৪৪৬. সূরা সাজদাহ, আয়াত: ২০
৪৪৭. সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৬
৪৪৮. সূরা আরাফ, আয়াত: ৪০
৪৪৯. সূরা আনআম, আয়াত: ১২৮-১২৯
৪৫০. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২৭
৪৫১. সূরা আরাফ: আয়াত: ২০১-২০২
৪৫২. সূরা কাহাফ, আয়াত: ৫০
৪৫৩. সূরা নিসা, আয়াত: ৭৬
৪৫৪. সূরা. মুজাদালাহ, আয়াত ১৯
৪৫৫. সূরা আন'আম, আয়াত: ১২১
৪৫৯. সূরা আনআম, আয়াত: ২৭-২৮

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে

📄 সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে


সহীহায়নে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সে ব্যক্তি সম্পর্কে জানি, যে সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাবে ও সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে। সে ব্যক্তি নিতম্ব হেঁচড়িয়ে হেঁচড়িয়ে জাহান্নام থেকে বের হবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, যাও, বেহেশতে প্রবেশ কর। সে তখন জান্নাতের নিকট এসে মনে করবে, জান্নাত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সে ফিরে গিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো জান্নাত পরিপূর্ণ পেলাম। (অর্থাৎ আমার জন্য সেখানে স্থান কোথায়?) আল্লাহ তা'আলা তাকে পূনরায় বলবেন, যাও, গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। সে জান্নাতের নিকট গেলে তার মনে এ ধারণাই জাগবে। ফলে সে পুনরায় ফিরে গিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো তা পরিপূর্ণ পেলাম। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় তাকে বলবেন, যাও, গিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমার জন্য দুনিয়া ও তদপেক্ষা দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। অথবা তিনি বলেছেন, তোমার জন্য পৃথিবীর দশগুণ বড় জান্নাত রয়েছে। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমার সাথে কি উপহাস করছেন? অথচ আপনি হলেন, অধিপতি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, আমি এ দৃশ্য বর্ণনা কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ হাসতে দেখেছি, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী।

সহীহ মুসলিমে হযরত আবূ যার রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সে ব্যক্তি সম্পর্কে জানি, যে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে ও সর্বশেষ জাহান্নام হতে নিষ্কৃতি পাবে। সে হবে ঐ ব্যক্তি, যাকে কিয়ামত দিবসে আনা হবে এবং বলা হবে, তার ছোট ছোট গুনাহগুলো সামনে উপস্থিত কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো তুলে নাও। তখন তার ছোট ছোট গুনাগুলো উপস্থিত করা হবে। তাকে বলা হবে, তোমার কি স্মরণ আছে, তুমি অমুক দিন অমুক কাজ করেছ? সে বলবে, হ্যাঁ। তার অস্বীকারের কোন ক্ষমতা থাকবে না; বরং সে এ জন্য ভীত থাকবে, তার বড় গুনাহগুলো তার সামনে উপস্থিত করা হবে কিনা। অতঃপর তাকে বলা হবে, তোমার প্রত্যেক পাপের বিনিময়ে রয়েছে নেকী। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমার তো আরো আমল রয়েছে, যা আমি এখানে দেখছি না। (অর্থাৎ সে বলবে, আমার তো আরো গুনাহ রয়েছে) হযরত আবূ যারর রা. বলেন, এ কথা বর্ণনা কালে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ পরিমাণ হাসতে দেখেছি, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।

তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি সে, যে ঐ শিশুর ন্যায় হবে, যাকে তার পিতা প্রহার করার কারণে পলায়ন করেছে, সে পুলসিরাতের উপর দিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে উপস্থিত হবে আর সে তার আমলের কারণে পলায়ন করার শক্তি হারিয়ে ফেলবে। সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমাকে যদি আমি জাহান্নام থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেই, তাহলে কি তুমি তোমার সকল গুনাহ-এর স্বীকারোক্তি করবে? সে বলবে, হে প্রভু! তোমার বড়ত্ব ও ইযযতের শপথ! যদি আপনি আমাকে জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করান, তবে আমি আপনার সামনে আমি আমার সকল প্রকার গুনাহ ও ত্রুটির স্বীকারোক্তি করব। অতঃপর সে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে ও মনে মনে বলতে থাকবে, যদি আমি আমার গুনাহ ও ত্রুটির স্বীকারোক্তি দেই, তাহলে তিনি আমাকে পুনরায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি আমার সামনে তোমার গুনাহের স্বীকারোক্তি দাও, আমি তোমার সে গুনাহ ক্ষমা করে দিব। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার বড়ত্ব ও বুযুর্গির শপথ! আমি কখনো কোন গুনাহ করিনি, কখনো কোন অন্যায় করিনি। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তোমার বিরুদ্ধে আমার নিকট সাক্ষী রয়েছে। সে ডানে-বামে তাকিয়ে কাউকে না দেখে বলবে, আমাকে সাক্ষী দেখান। আল্লাহ তা'আলা তখন তার ত্বককে বাক শক্তি দান করবেন, যা তার ছোট ছোট গুনাহগুলো প্রকাশ করবে। এ অবস্থা দেখে সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনার সত্ত্বার শপথ! আমার তো এর চেয়ে বড় বড় পাপ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, সেগুলো সম্পর্কে আমি তোমার থেকে অধিক অবগত। সুতরাং আমার সামনে তুমি সেগুলো স্বীকার করে নাও, আমি তোমার সে গুনাহগুলো ক্ষমা করে তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেব। তখন তার গুনাহের স্বীকারোক্তি দিলে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিবেন। এ ঘটনা বর্ণনা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পরিমাণ হাসলেন, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঐ ব্যক্তিই হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী। তাহলে সর্বোচ্চ স্তরের অবস্থা কিরূপ হবে?

সহীহ মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে সর্বশেষ প্রবেশকারী ঐ ব্যক্তি, যে পুলসিরাতের উপর দিয়ে চলতে থাকবে আর একটু পরপর মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। কখনো অগ্নি তার নিকট এসে পড়বে। সে যখন পুল অতিক্রম করে চলে যাবে, তখন সে তার দিকে তাকিয়ে বলবে, বরকতপূর্ণ সে সত্তা, যিনি আমাকে নাজাত দিয়েছেন। তিনি আমাকে এমন বস্তু দান করেছেন, যা পূর্বাপর কাউকে দান করেননি। তার সামনে তখন একটি বৃক্ষ উপস্থাপিত হলে সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিন, যাতে আমি তার ছায়ায় বসতে পারি ও তা হতে পানি পান করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, আমি তা দিলে তুমি এটা ব্যতীত অন্য কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে অঙ্গীকার করে বলবে, 'না' আমি এর অধিক আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার এ আবেদন পূর্ণ করবেন। কেননা তিনি জানেন, সে আর ধৈর্য রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন। সে ঐ বৃক্ষের ছায়ায় বসবে এবং তার হতে পান করবে। অতঃপর তার সামনে আরো সুন্দর একটি বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে তার নিকটবর্তী করে দিন, যেন তার ছায়ায় বসতে পারি এবং তার রস হতে পান করতে পারি। আমি আপনার নিকট আর কিছুই প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, কেন? তুমি তো আমার সাথে অঙ্গীকার করেছ, আমার নিকট এর চেয়ে অধিক আর কিছুই প্রার্থনা করবে না। তিনি আরো বলবেন, আমি তোমাকে এটা দিলে তুমি তো আমার নিকট অন্য কিছু প্রার্থনা করবে। সে পুনরায় অঙ্গীকার করবে, আমি এর চেয়ে আপনার নিকট আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার ওয়াদা ভঙ্গের ওযর কবুল করে নিবেন। কেননা তিনি জানেন, সে এ ব্যাপারে ধৈর্য রাখতে পারছে না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন। সে তার ছায়া গ্রহণ করবে ও তার রস পান করবে। অতঃপর তার সামনে বেহেশতের দরযার নিকটবর্তী একটি বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে, যা পূর্বোক্ত বৃক্ষ দু'টি অপেক্ষা উত্তম ও মনোরম। সে তখন বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষটির নিকটবর্তী করে দিন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি এবং তার রস পান করতে পারি। আমি আপনার নিকট এটা ব্যতীত আর কিছুই প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, কেন? তুমি না আমার সাথে অঙ্গীকার করেছিলে, আর কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে না। সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এটা দান করুন, এরপর আর কিছু আপনার নিকট প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তার অঙ্গীকার ভঙ্গের ওযর গ্রহণ করবেন, কেননা, তিনি জানেন, সে এ ব্যাপারে ধৈর্য রাখতে সক্ষম না। তাই আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিবেন।

সে ব্যক্তি বৃক্ষের নিকটবর্তী হলে জান্নাতীদের আওয়ায শুনে বলবে, হে আল্লাহ! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, হে বান্দা! আমার পক্ষ হতে কি পেলে তুমি তৃপ্ত হবে? তোমাকে দুনিয়ার চেয়ে দশগুণ বড় জান্নাত দান করলে তুমি কি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত হবে? সে বলবে, হে প্রভু! আপনি কি আমার সাথে উপহাস করেছেন? অথচ আপনি হলেন রাব্বুল আলামীন। এ পর্যন্ত বর্ণনা করে হযরত ইবনে মাসউদ হেসে উঠে বললেন, তোমরা আমাকে হাসার কারণ কেন জিজ্ঞেস করছ না? শ্রোতাগণ তখন জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন হাসছেন? তিনি বললেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এ স্থানে হেসেছেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে কেন হাসলেন? তিনি বললেন, ঐ লোকটির এ কথা বলার কারণে আল্লাহও হেসে উঠবেন। আল্লাহর হাসির কারণে আমারও হাসি পেয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না; বরং আমি যা চাই, তা-ই করতে সক্ষম।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বাপেক্ষা কম আযাবে নিপতিত জাহান্নামী হল সে ব্যক্তি, যাকে অগ্নিজুতা পরিধান করানো হবে। সে জুতার তাপে তার মস্তিষ্ক স্ফুটিত হতে থাকবে আর সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তি হল সে, যাকে আল্লাহ তা'আলা দোযখের দিক থেকে ফিরিয়ে জান্নাত অভিমুখী করে দিবেন ও ছায়াযুক্ত বৃক্ষ তার সামনে উপস্থাপন করা হবে। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে উক্ত বৃক্ষের নিচে অবস্থান দিন, যেন আমি তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি যদি তোমাকে তার ছায়াতে অবস্থান দেই, তবে তুমি আরো প্রার্থনা করতে থাকবে। সে বলবে, আপনার ইয্যত ও বুযুর্গীর শপথ! আমি আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষের নিচে অবস্থান করে দিবেন। তখন তার সামনে ছায়াদার একটি ফল বিশিষ্ট বৃক্ষ উপস্থাপন করা হবে, সে তা দেখে বলবে, হে প্রভু! আমাকে উক্ত বৃক্ষের নিকটবর্তী করে দিন, যাতে আমি তার ছায়া ও ফল লাভ করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমাকে তা প্রদান করলে হয়ত আরো কিছু আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ, আমি আপনার নিকট এর চেয়ে অধিক আর কিছু প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে সে বৃক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। অতঃপর তার সামনে ছায়াদার ফল বিশিষ্ট ও পানি বিশিষ্ট অপর একটি বৃক্ষ উপস্থিত করা হবে। সে তা দেখে বলবে, হে প্রভু! আমাকে এ বৃক্ষটির নিকট পৌঁছিয়ে দিন, যাতে আমি তার ছায়ায় অবস্থান করতে পারি, ফল খেতে পারি ও পানি পান করতে পারি। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি তোমাকে এটা দান করলে তুমি অন্য কিছু হয়ত আমার নিকট প্রার্থনা করবে। সে বলবে, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ! এটা ব্যতীত অন্য কিছু আর প্রার্থনা করব না। আল্লাহ তা'আলা তাকে তখন সে বৃক্ষের নিকট পৌছিয়ে দেবেন। তার সামনে তখন জান্নাত দৃশ্যমান হলে সে বলবে, হে প্রভু! আমাকে জান্নাতের দরযায় নিয়ে যান, যাতে আমি জান্নাতের অলিন্দে অবস্থান করতে পারি। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, تحت نجاف الجنة انظر إلى أهلها অর্থাৎ যাতে আমি জান্নাতের অলিন্দের নিচে অবস্থান করতে পারি ও তার অধিবাসীদের দেখতে পাই। আল্লাহ তা'আলা তাকে সেখানে পৌছে দেবেন, সে তখন জান্নাতীদেরকে ও জান্নাতস্থ সব কিছু দেখতে পেয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবেন। তখন সে বলবে, এটা আমার। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি তোমার আকাংখা ব্যক্ত কর। সে তার আকাংখা তখন ব্যক্ত করতে থাকবে আর আল্লাহ তা'আলা তাকে আরো আশা আকাংখার কথা স্বরণ করিয়ে দেবেন, এটাও প্রার্থনা কর। সে তার আকাংখা ব্যক্ত করা সমাপ্ত করলে আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তুমি এগুলো সহ আরো দশগুণ বেশি পাবে। তখন সে আপন বাসভবনে প্রবেশ করলে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট দু'জন হুর এসে বলবে, الحمد لله الذي احياك لنا واحيانا لك সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য; যিনি আমাদের জন্য তোমাকে এবং তোমার জন্য আমাদেরকে জীবন দান করেছেন। সে তখন বলবে, ما اعطي مثل ما اعطيت আমাকে যে পরিমাণ দান করা হয়েছে, অন্য কাউকে সে পরিমাণ দান করা হয়নি।

সহীহ মুসলিমে হযরত মুগীরাহ ইবনে শু'বা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হযরত মূসা আ. স্বীয় প্রভুর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, সর্ব নিম্নস্তরের জান্নাতী ব্যক্তি কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, সকল জান্নাতী জান্নাতে প্রবেশ করার পর এক ব্যক্তি আসবে। তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে, হে প্রভু! কিভাবে জান্নাতে প্রবেশ করব। সকলেই তো স্বীয় অবস্থান গ্রহণ করে ফেলেছে। যা কিছু নেওয়ার সব নিয়েছে। তাকে তখন বলা হবে, দুনিয়ার কোন বাদশাহকে যে পরিমাণ প্রাচুর্য দান করা হয়েছে, তোমাকে সে পরিমাণ দান করলে তুমি সন্তুষ্ট তো? সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি এতেই সন্তুষ্ট। তাকে তখন বলা হবে, তোমার জন্য এটা ও এর সমপরিমাণ। এটা ও এর সমপরিমাণ। এটা ও এর সমপরিমাণ। এভাবে পঞ্চমবার বলার পর সে বলবে, হে প্রভু আমার! আমি এতেই সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে বলবেন, তোমার জন্য এটা ও এর দশগুণ রয়েছে। তোমার মন যা চায়, তোমার চক্ষু যার দ্বারা শীতল হয়, সবই তোমার জন্য রয়েছে। সে তখন বলবে, হে প্রভু আমার! আমি সন্তুষ্ট। (এ হল সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতেী) হযরত মূসা আ. পুনরায় প্রশ্ন করলেন, সর্বোচ্চ মর্যাদার জান্নাতী কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, সর্বোচ্চ মর্যাদার জান্নাতী হল সে, যার জন্য আমি নিজ হাতে সম্মানের বৃক্ষ রোপন করেছি ও তাতে মোহর এঁটে দিয়েছি। যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, কোন কর্ন শ্রবন করেনি এবং কোন মানব হৃদয়ে যারে কোন কল্পনা কখনো উঁকি দেয়নি। আল্লাহ তা'আলার বাণী فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةَ أَعْيُنِ এর ভাবার্থও তাই, কেউ জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃত কর্মের পুরস্কার স্বরূপ।

টিকাঃ
৪৮০. বুখারী: খ:২ পৃ: ৯৭২, মুসলিম: খ: ১ পৃ: ১০৫
৪৬১. খ: ১ পৃ: ১০৬
৪৬২. খ: ১ পৃ: ১০৫
৪৬৩ খ. ১, পৃ. ১০৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00