📄 জান্নাতীদের তাঁবুর আসন, বালিশ ও মশারি
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, حُورٌ مَّقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ জান্নাতে তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিত হূর রয়েছে।৩৫১
সহীহায়নে৩৫২ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ان للمؤمن في الجنة لخيمة من لؤلؤة واحدة مجوفة নিশ্চয় জান্নাতে মু'মিনদের জন্য প্রস্ফুটিত মুক্তার তাঁবু থাকবে। طولها ستون ميلا فيها أهلون يطوف عليهم তার দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। المؤمن তাতে তার স্ত্রীগণ থাকবে, যাদের দ্বারা সে নিজ জৈবিক কামনা পূরণ করবে। فلا يرى بعضهم بعضا (একই তাঁবুতে হওয়া সত্ত্বেও মু'মিন ব্যক্তি এক স্ত্রীর সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করার বিষয়ে তাঁবুর বিশালতার কারণে অন্যান্য স্ত্রী দেখবে না) তারা একে অপরকে দেখবে না।
সহীহায়নের এক বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাতে ফাঁপা মুক্তা দ্বারা একটি তাঁবু নির্মিত হবে। في كل زاوية منها ستون ميلا তার দৈর্ঘ হবে ষাট মাইল। أهل ما يرون الآخرين তার প্রত্যেক কোণে জান্নাতী ব্যক্তির স্ত্রীগণ থাকবে; কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাবে না। يطوف عليهم المؤمن মু'মিন ব্যক্তি তাদের নিকট ঘুরে বেড়াবে। (অর্থাৎ সে ব্যক্তি তার কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য কখনো একজনের নিকট যাবে, কখনো অন্যজনের নিকট যাবে।)
সুনানে তিরমিযীতে হযরত আবূ মূসা রা.-এর সূত্রে वर्णित হাদীস এও রয়েছে, الخِيمَة دُرَّةٌ طُولُهَا فِي السَّمَاءِ سَنُونَ مِيلا মুক্তা নির্মিত একটি তাঁবু থাকবে। যার দৈর্ঘ ষাট মাইল। তার প্রত্যেক কোণে স্ত্রীগণ থাকবে; কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাবে না।
বুখারীর এক বর্ণনায় রয়েছে مِيلا ثَلاَثُونَ طُولُهَا তার দৈর্ঘ্য হল ত্রিশ মাইল। সে তাঁবুটি প্রাসাদ আর অট্টালিকায় থাকবে না; বরং উদ্যানের মাঝে নদীর তীরে অবস্থিত থাকবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে বর্ণনা করেন, আবূ সুলাইমান রহ. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা 'ডাগর চোখের হুরদের'কে নির্দিষ্টাঙ্গিকে সৃষ্টি করবেন। যখন তাদের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হবে, তখন ফিরিশতাগণ তাদের উপর তাঁবু টাঙ্গিয়ে দিবেন। কেউ কেউ বলেন, সে সকল হূর যেহেতু কুমারী হবে, তাই তারা পর্দাবৃত থাকবে। কেননা, কুমারীদের অভ্যাস হল, তারা স্বামীর সংসর্গে আসার পূর্ব পর্যন্ত অন্যদের তুলনায় বেশি পর্দাবৃত থাকে। আল্লাহ তাআলাও হুরদেরকে সৃষ্টি করে তাদেরকে তাঁবুর মধ্যে পর্দাবৃত করে রাখবেন, তাদের হকদারকে জান্নাতে তাদের সাথে একত্রিত করার পূর্ব পর্যন্ত।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, প্রত্যেক মু'মিনের জন্য অনেক গুণ ও বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত স্ত্রী থাকবে। সে স্ত্রী তাঁবুর ভেতর অবস্থান করবে। প্রত্যেক তাঁবুর চারটি করে দরযা থাকবে, এর প্রত্যেক দরযা দ্বারাই মু'মিন ব্যক্তি প্রত্যহ প্রবেশ করবে। প্রত্যেক দরযাতেই তার জন্য এমন হাদিয়া, উপঢৌকন, তোহফা ও সম্মানজনক উপহার থাকবে, যা সে ইতোপূর্বে কখনো লাভ করেনি। সে স্ত্রী বাহ্যিক ও কৃত্রিম সাজ-সজ্জা করবে না। (কেননা খোদাপ্রদত্ত্ব রূপ লাবণ্যই তার সৌন্দর্যের জন্য যথেষ্ট) এবং রাগে ও ক্ষোভে কখনো সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলবে না। (কেননা, সে কখনো স্বামীর প্রতি রাগ করবে না) ও তার মুখ হতে কখনো দুর্গন্ধ বের হবে না, কখনো কোন বিষয়ে সে বিরক্তির প্রকাশ ঘটাবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি حور مقصوات في الخيام এর মধ্যস্থিত الخيام এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন, তাঁবুটি হবে ফাঁপা মুক্তা মালায় সৃজিত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ দারদা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একই মুক্তা দ্বারা নির্মিত তাঁবু থাকবে। তাঁবুর সত্তরটি দরযা থাকবে, প্রত্যেক দরযা একক মুক্তা দিয়ে নির্মিত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, একটি ফাঁপা মুক্তা দ্বারা নির্মিত তাঁবু থাকবে, যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থাকবে এক ফরসখ করে (প্রায় তিন মাইল) তার চার হাজার স্বর্ণ নির্মিত দরযা থাকবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি حور مقصورات في الخيام এর ব্যাপারে বলেছেন, সে সকল হুর মুক্তা নির্মিত তাঁবুতে থাকবে। প্রত্যেক তাঁবু একটি মাত্র মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে حور مقصورات في الخيام এর ব্যাখ্যায় বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, উক্ত তাঁবু ফাঁপা মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে। যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হবে এক ফরসখ করে। এতে স্বর্ণ নির্মিত এক হাজার দরযা থাকবে। প্রত্যেক দরযায় এমন পর্দা থাকবে যা পঞ্চাশ ফরসখ (প্রায় ১৫০ মাইল) পুরু হবে। ফিরিশতাগণ প্রত্যেক দরযা দিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে হাদিয়া-তোহফা নিয়ে মু'মিন ব্যক্তির নিকটে যাবেন। আল্লাহ তাআলার বাণী হলো وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَاب ফিরিশতাগণ তাদের নিকট উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরযা দিয়ে।৩৫৩
জান্নাতীদের আসন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى سُرُرٍ مَصْفُوفَةٍ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ তারা বসবে শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে; আমি তাদের মিলন ঘটাব আয়াতলোচনা হুরের সঙ্গে৩৫৪।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ثُلَّةٌ مِنَ الْأَوَّلِينَ وَقَلِيلٌ مِنَ الْآخِرِينَ বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে; এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। عَلَى سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ مُتَّكِيْنَ عَلَيْهَا مُتَقَابِلِينَ স্বর্ণ খচিত আসনে বসবে, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে৩৫৫।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, فِيهَا سُرُرٌ مَّرْفُوعة সেখানে উন্নত মর্যাদাসম্পন্ন শয্যা রয়েছে৩৫৬।
উক্ত আয়াতাবলী দ্বারা বুঝা যায়, আসনগুলো মুখোমুখি সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত থাকবে। একজন অপর জনের পেছনে ও থাকবে না এবং দূরেও থাকবে না। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টিও অবহিত করলেন, موضونة (মাওযুনা) হবে। وضن অর্থ হল, বিন্যস্ত আকারে তৈরীকৃত বস্তু। যেমন আরবগণ বলে থাকেন, وضن فلان الحجر অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি পাথরকে উপরে নিচে সু-বিন্যস্ত করছে। একটি ইঁটকে অপরটির উপর সুবিন্যস্ত করে রাখাকে موضونة বলে।
লাইস রহ. বলেন, পালঙ্ক ও সে জাতীয় বস্তুকে وضن বলে।
আবু উবায়দা রহ. ফাররা, মুবাররাদ ও ইবনে কুতাইবা রহ. প্রমুখ মুফাসসিরীন বলেন, موضوعة বলা হয়, এমন ভাঁজ ভাঁজ করে তৈরীকৃত বস্তুকে, যার ধাগাগুলো একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে রয়েছে। যেমন বর্মের শিকল একটি অপরটিতে প্রবিষ্ট থাকে। এ কারণে যেই ফিতার সুতাগুলো একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট সে ফিতাকে وضين বলা হয়।
তারা তাদের মতের সমর্থনে আ'শা কবির এ কবিতাটি উল্লেখ করেন, ومن نسج داؤد موضونة تساق مع الحي غيرا فعيرا হযরত দাউদ আ. এর নির্মাণ পদ্ধতিতে নির্মিত বর্ম যার বৃত্ত একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট, সেগুলোকে কাফেলায় কাফেলায় গোত্রের সাথে বয়ে নিয়ে যায়।
তারা বলেন, উক্ত আয়াতে موضونة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা স্বর্ণের ধাগা দ্বারা নির্মিত হবে এবং তার উপর পদ্মরাগমণি ও পোখরাজ ছড়ানো থাকবে।
হুশায়ম রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে এ ব্যপারে বর্ণনা করেন যে, مُوضُونَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مُرَمَّوْلَةٌ بِالذَّهَبِ অর্থাৎ স্বর্ণের সুক্ষ্ম তার দ্বারা নির্মিত।
মুজাহিদ রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مُوَصَّلَةٌ بِالذَّهَبِ অর্থাৎ স্বর্ণ সংযোজিত।
হযরত আলী ইবনে আবী তালহা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, مُوضُونَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مَصْفُوفَةٌ সারিবদ্ধভাবে বিছানো।
আতা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, স্বর্ণের আসন থাকবে। যার মধ্যে পদ্মরাগমণি, পোখরাজ ও মুক্তার প্রলেপ থাকবে। আর সেটি এত বিশাল আকৃতির হবে যে, তা ঈলা (একটি জায়গার নাম) হতে মক্কা পর্যন্ত পূর্ণ স্থানটিকে বেষ্টন করে নিবে।
কালবী রহ. বলেন, আসনটি একশত হাত উঁচু হবে। তখন মু'মিন ব্যক্তি তাতে উপবেশনের ইচ্ছা পোষণ করবে তখন তা নিচের দিকে ঝুঁকে যাবে। উপবেশনের পর পূণরায় স্ব-স্থানে উঠে যাবে।
জান্নাতের পালঙ্ক
أرائك শদ্ধটি أريكة এর বহুবচন। আল্লাহ তাআলার বাণী, مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِك এর ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নববধূর সজ্জিত কক্ষে স্থাপিত পালঙ্ককে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়। এরূপ কক্ষে না থাকলে তা আরীকাহ বলা হয় না। এমনিভাবে যদি নববধূর জন্য কক্ষ সজ্জিত হয়; কিন্তু তাতে পালঙ্ক না থাকে বা পালঙ্ক থাকে; কিন্তু কক্ষ সজ্জিত না হয়, তবে তাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হবে না; বরং উভয় বস্তু অর্থাৎ সজ্জিত কক্ষ ও পালঙ্ক উভয়টার সমন্বয় ঘটলেই কেবল তাকে আরীকাহ বলা হবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, কনের আসনের জন্য সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়।
লাইস রহ. বলেন, সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة বলা হয়।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, কনের আসনের জন্য সজ্জিত কক্ষে বিছানো বিছানাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়।
গ্রন্থকার বলেন, তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটলেই তাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হবে।
প্রথমত: সেটি পালঙ্ক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত: তাতে সজ্জিত ঝুলানো পর্দা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত: পালঙ্কের উপর বিছানোর জন্য বিছানা থাকতে হবে।
সিহাহতে (একটি অভিধান গ্রন্থ) রয়েছে, এমন সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة বলা হয়, যা কোন ঘরে বা খিলানযুক্ত ছাদে বিছানো থাকে, কিন্তু যদি কক্ষ সজ্জিত এবং তাতে পালঙ্ক না থাকে তবে তাকে حجله হাজলাহ বলা হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোহরে নবুয়্যাত সম্পর্কিত হাদীসে রয়েছে, كان مثل زر الحجلة অর্থাৎ তা ছিল নববধূর জন্য তৈরীকৃত মশারির বোতামের ন্যায়। মশারির বোতাম দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মশারির কোণে জমা অংশটুকু।
টিকাঃ
৩৫১. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭২
৩৫২. বুখারী, খ. ২, পৃ.৭২৪, মুসলিম খ. ২, পৃ. ৩৮৯
৩৫৩. সূরা রা'দ, আয়াত: ২৩
৩৫৪. সরা তর, আয়াত: ২০
৩৫৫. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৩-১৬
৩৫৬. সূরা গাশিয়াহ, আয়াত: ১৩
📄 জান্নাতীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে যারা
يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ بِأَكْوَابِ وَأَبَارِيقَ • وكأس من معين তাদের সেবায় ঘুরাফেরা করবে চির কিশোরেরা; পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে৩৫৭।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنْثُورًا যখন তুমি তাদেরকে দেখবে, তখন মনে করবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা৩৫৮।
আবূ উবায়দা রহ. ও ফাররা রহ. বলেন, مُخَلَّدُونَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা বৃদ্ধ হবে না ও তাদের অবস্থার পরিবর্তনও ঘটবে না; বরং তারা চির কিশোর থাকবে। (প্রথম দর্শনে তাদেরকে যেরূপ সুদর্শন মনে হয়েছে পরবর্তীতে ঠিক তেমনি থাকবে)।
যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু তার চুল সাদা-কালো মিশ্রিত নয় (বরং এখন পর্যন্ত কলোই রয়েছে) তাকে আরবগণ خُلْدٌ (মুখাল্লাদ) বলে থাকে। যেমনিভাবে বার্ধক্যের ছাপ পড়ার পূর্ব পর্যন্ত বয়সপ্রাপ্তকে তারা خُلْدٌ বলে।
কেউ বলেন, خُلْدٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল مُقَرَّطُونَ ومُسَوِّرُونَ অর্থাৎ তাদের কালো অলংকার থাকবে এবং হাতে কাঁকন থাকবে। ইবনে আরাবী রহ. এ অর্থটিকে पसন্দ করেছেন। তিনি বলেন, مُخَلَّدُونَ শব্দটি خَلْدَة থেকে উৎকলিত, যার অর্থ হল কানের দুল। সুতরাং مخلدون দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কানে দুল পরিহিত ব্যক্তি।
আমর রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। কানে দুল পরিহিত মহিলাকে مخلدة বলা হয়। আর কোন কোন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তির যদি চুল সাদা না হয়, তাকে বলা হয়।
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়র রহ. বলেন, مخلد দ্বারা উদ্দেশ্য হল مقرطون (অর্থাৎ কানে দুল পরিহিত) এ মত পোষণকারীগণ তাদের মতের সমর্থনে দুটি দলীল পেশ করেছেন। প্রথম দলীল হল, প্রত্যেক ব্যক্তিই জান্নাতে চিরস্থায়ী হবে। সুতরাং এ কিশোরদের এমন কোন নিদর্শন থাকা উচিৎ যার দ্বারা তাদেরকে চেনা যাবে। সুতরাং তাদের কানে দুল পরিয়ে দেওয়া হবে যাতে বুঝা যায়, তারা জান্নাতীদের খেদমতে নিয়োজিত কিশোরদল। দ্বিতীয় দলীল হল কবির নিম্নোক্ত পংক্তিমালা
اعجاز من رواكد الكثبان و مخلدات باللجين. كأنما
সে সকল মহিলা খাঁটি রৌপ্যের অলংকার পরিহিতা এবং এমন স্বাস্থ্যবতী; যেন তাদের নিতম্ব বালুর ঢিবি।
প্রথম পক্ষের ভাষাবিদগণ, যাদের মতে مخلد দ্বারা উদ্দেশ্য অবিনশ্বরত্ব, তাদের দলীল হল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, যে কিশোররা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। এ ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্যকার হযরত ইবনে আব্বাস রা.- এর উক্তিই যথেষ্ট।
মুজাহিদ রহ., কালবী রহ. ও মুকাতিল রহ. এ মতটিই গ্রহণ করেছেন। তারাও বলেছেন, সে সকল কিশোর কখনো বার্ধক্যে উপনিত হবে না এবং কখনো তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।
কেউ কেউ উভয় মতের সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, সে সকল কিশোর বৃদ্ধও হবে না এবং তাদের কানে দুলও থাকবে।
যারা বলেছেন, خلد অর্থ مقرطون তাদের উদ্দেশ্য হল, তারা অবশ্যই কিশোর হবে।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে لؤلؤمنشورا তথা বিক্ষিপ্ত মুক্তামালার সাথে তুলনা করেছেন, শুভ্রতা ও আকৃতিগত সৌন্দর্য বোঝাতে। তাদেরকে বিক্ষিপ্ত বলা দ্বারা দুটি লাভ রয়েছে। প্রথমত: এর দ্বারা এ কথা বুঝা যায়, তারা সর্বদা জান্নাতীদের খেদমতে এবং তাদের প্রয়োজন মিটানোর কাজে লিপ্ত থাকবে। কখনো তারা খেদমত ছেড়ে অবসর কাটাতে একত্রে বসে থাকবে না।
দ্বিতীয়ত: বিক্ষিপ্ত মুক্তামালা বিশেষত: স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর বিক্ষিপ্ত মুক্তামালা একত্রিত মুক্তামালা হতে অধিক সৌন্দর্যময় ও শোভাময় হয়।
সেবক কিশোরগণ
এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের মতানৈক্য রয়েছে। সে সকল কিশোর দুনিয়ার কিশোররাই হবে নাকি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে সৃষ্টি করবেন?
হযরত আলী রা. ও হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, তারা হল মুসলমানদের সে সকল সন্তান যারা এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কোন নেক আমলও ছিল না এবং কোন পাপও ছিল না। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিশোরে পরিণত করবেন এবং জান্নাতীদের খাদেম হিসাবে নিয়োজিত করবেন। কেননা, জান্নাতে তো প্রজননধারা থাকবে না।
হাকেম রহ. স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করে বলেন, তারা হবে এমন কিশোর, যাদের কোন পুণ্যও নেই, পাপও নেই। যেহেতু তাদের কোন পাপ নেই, তাই তারা কোন শাস্তিরও সম্মুখীন হবে না। ফলে তাদের এখানেই রাখা হবে।
কেউ কেউ বলেন, তারা হল মুশরিকদের সে সকল সন্তান, যারা অপ্রাপ্ত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতের খাদেম হিসাবে নিয়োগ করবেন।
তারা তাদের সমর্থনে হযরত ইয়াকুব ইবনে আব্দুর রহমান রহ. বর্ণিত হাদীস দলীল হিসাবে পেশ করেন। তিনি স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আল্লাহর নিকট মানুষের অপ্রাপ্ত বয়সে মৃত্যুবরণকারী সন্তানদের আযাব না দেওয়ার নিবেদন পেশ করেছি। আল্লাহ তাআলা আমার এ নিবেদন মনযূর করেছেন। সে সকল সন্তান জান্নাতের খাদেম হিসাবে নিয়োজিত হবে।
দারা কুতনী রহ. বলেন, আবদুল আযীয মাজেশূন রহ.ও স্ব-সনদে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফুযায়ল ইবনে সুলাইমান রহ. ও স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন। তবে উভয় বর্ণনার সনদ দুর্বল। কেননা, প্রথম বর্ণনার সনদে ইয়াযীদ রুক্কাশী নামক বর্ণনাকারী অনির্ভরযোগ্য। আর দ্বিতীয় বর্ণনার সনদে ফুযায়ল ইবনে সুলায়মান বিতর্কিত এবং আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
প্রথমোক্ত মত পোষণকারীরা অর্থাৎ যাঁরা বলেন, এরা দুনিয়ার কিশোর নয়। তারাও এ কথা মনে করেন না যে, তারা জান্নাতবাসীদের ঔরসে সৃষ্ট বংশধারা। বরং তারা বলেন, আল্লাহ তাআলা যেভাবে জান্নাতে ডাগর চোখের হূর সৃষ্টি করেছেন, তেমনি এসব কিশোরদেরকে সৃষ্টি করবেন।
তারা বলেন, দুনিয়াতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শিশুরাতো কিয়ামত দিবসে ৩৩ বছরের যুবক হবে। তাঁদের মতের সমর্থনে তারা হযরত ইবনে ওয়াহাব রহ.-এর হাদীস পেশ করেছেন। যা তিনি স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من مات من أهل الجنة من صغير أو كبير يردون بني ثلاثين سنة في الجنة لا يزيدون عليها أبدا যে জান্নাতী পৃথিবীতে মৃত্যুবরণ করেছেন, চাই ছোট হোক, চাই বড় হোক, তাদেরকে তেত্রিশ বছরের পূর্ণ যুবক করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর তাদের বয়স কখনো এর চেয়ে বৃদ্ধি পাবে না, বরং সর্বদা তাদের বয়স এমনই থাকবে। وكذالك أهل النار জাহান্নামীদের অবস্থাও তাই হবে। ইমাম তিরমিযী রহ.ও উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
সর্বোপযোগী মত হল, সে কিশোরদেরকে হূরেঈনদের মত জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে। তাদের কাজ হবে জান্নাতীদের সেবা করা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَّكْنُونٌ তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে কিশোররা, সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ৩৫৯।
এ কিশোর-কিশোরীরা জান্নাতীদের ঔরসে সৃষ্ট সন্তান হবে না। কেননা জান্নাতীদের সন্তান জান্নাতের সেবাদাস হবে এটা কখনোই একজন জান্নাতীর সম্মান ও মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং তাদের সন্তান তাদের-ই মত সেবা গ্রহণকারী হবে। এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক।
ইতোপূর্বে হযরত আনাস রা. এর হাদীস উল্লেখ হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, انا أول الناس خروجا اذا بعثوا আমিই সর্বপ্রথম কবর দেশ থেকে উত্থিত হব। وفيه يطوف على الف خادم كانهم لؤلؤ مکنون সেখানে আমার জন্য নিয়োজিত থাকবে সুরক্ষিত মুক্তার ন্যায় হাজারো খাদেম। مکنون বলা হয়, এমন গোপন ও সুরক্ষিত বস্তুকে যা কখনো মানুষের হাতের ছোঁয়া পায়নি।
يطوف عليهم غلمان لهم ويطوف عليهم قولدان বাক্যটি ও এর মধ্যে চিন্তা- গবেষণার দ্বারা এবং এর সাথে হযরত আবূ সাঈদ রা. এর হাদীসকে সংযুক্ত করলে বুঝা যায়, সে কিশোরদেরকে জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে। والله اعلم
টিকাঃ
৩৫৭. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৭-১৮
৩৫৮. সূরা দাহর, আয়াত: ১৯
৩৫৯. সূরা তৃর, আয়াত: ২৪
📄 অনিন্দ্য সুন্দরী ও গুণবতী জান্নাতী স্ত্রী
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِزْقًا ۙ قَالُوا هَٰذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ ۖ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا ۖ وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ ۖ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। যখনই তাদেরকে ফলমূল খেতে দেওয়া হবে, তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে পূর্বে জীবিকা রূপে যা দেওয়া হত এতো তাই; তাদেরকে অনুরূপ ফলই দেওয়া হবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী রয়েছে, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।৩৬০
যে সত্তা আমাদেরকে সুসংবাদ দিয়েছেন তাঁর বড়ত্ব, মহত্ত্ব, সত্যবাদিতার ব্যাপারে চিন্তা করে দেখুন। এমনি ভাবে সে সত্ত্বার ব্যাপারে চিন্তা করে দেখুন, যাঁকে আমাদের নিকট এ সুসংবাদ দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং সে বস্তুর সংবাদ দিয়েছেন তার পরিমাণের ব্যাপারেও চিন্তা করে দেখুন আল্লাহ তাআলা সামান্য বস্তুর বিনিময়েই আমাদের জন্য এ মহান নিআমত লাভের ব্যবস্থা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা শরীরের নিআমত হিসাবে উদ্যান ও তার মধ্যস্থিত ফলমূল ও নদীসমূহ ও আত্মার নিআমত হিসাবে পবিত্র স্ত্রী দান এবং এগুলো অফুরন্ত হওয়ার ঘোষণা প্রদানের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি ও চোখের শীতলতা লাভ ইত্যাদি যাবতীয় নিআমতের সমাবেশ ঘটিয়েছেন।
أزواج শব্দটি زوج এর বহুবচন। স্ত্রী-পুরুষ, উভয়ের জোড়া বোঝাতে زوج শব্দ ব্যবহৃত হয়। তবে পুরুষের স্ত্রী অর্থে অতি বিশুদ্ধ। কুরায়শদের ভাষাও এটি। যে অনুপাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী ي اسكن انت وزجك الجنةহে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর।
এ আয়াতে হযরত আদম আ.-এর স্ত্রীকে তাঁর زوج বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরবগণ زوجة (যাওজাহ) শব্দ খুব কমই ব্যবহার করে থাকে।
مطهرة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে সকল স্ত্রী, যারা ঋতুস্রাব, প্রসূতি পরবর্তী রক্তস্রাব, প্রস্রাব-পায়খানা, শ্লেষ্মা, থুথু ইত্যাদি সকল প্রকার ময়লা থেকে পবিত্র হবে এবং যাবতীয় মেয়েলী দোষ-ত্রুটিসমূহ থেকে মুক্ত হবে। এর দ্বারা বুঝা যায়, তাদের অন্তরাত্মা কু-স্বভাব ও দুশ্চরিত্র থেকে পবিত্র হবে। তাদের মুখ মন্দ ও অনর্থক কথা থেকে মুক্ত থাকবে। তারা কখনো আপন স্বামী ব্যতীত অন্য কোন পুরুষের দিকে তাকাবে না। তাদের পোশাক- আশাক ময়লা আবর্জনা থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে।
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বাণী, وَلَهُمْ فِيهَا أزواج مُّطَهَّرَةٌ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তারা ঋতুস্রাব, প্রসূতি পরবর্তী রক্তস্রাব, প্রস্রাব-পায়খানা, নাকের শ্লেষ্মা, থুথু ইত্যাদি থেকে পবিত্র থাকবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, তারা সর্ব প্রকার অপবিত্রতা থেকে পবিত্র থাকবে। তাদের ঋতুস্রাব হবে না এবং তাদের নাকে কোন শ্লেষ্মা সৃষ্টি হবে না।
মুজাহিদ রহ. বলেন, তারা প্রস্রাব-পায়খানা করবে না, তাদের বীর্য স্খলিত হবে না, মযীও বের হবে না, ঋতুস্রাবও হবে না, তারা থুথুও ফেলবে না, নাকের শ্লেষ্মাও বের হবে না এবং সন্তানও জন্ম দিবে না।
কাতাদাহ রহ. বলেন, তারা সকল প্রকার পাপকার্য ও অপবিত্রতা হতে মুক্ত থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে প্রস্রাব-পায়খানা ও সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে এবং সকল প্রকার গুনাহ হতে পবিত্র রেখেছেন।
আব্দুর রহমান ইবনে যায়দ বলেন, তারা পবিত্র থাকবে। তাদের ঋতুস্রাব হবে না। কিন্তু দুনিয়ার স্ত্রীলোক পবিত্র নয়। কেননা, তারা ঋতুবতী হয় ও সন্তান প্রসবের পর রক্তস্রাব হয়। যার ফলে তাদেরকে নামায ও রোযা ছেড়ে দিতে হয়। হযরত হাওয়া আ. কে উক্ত গুণেই সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু যখন তাঁর থেকে বিচ্যুতি সংঘটিত হল, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, তোমাকে আমি পবিত্রা করে সৃষ্টি করেছিলাম; কিন্তু এখন তোমাকে রক্তে জড়িত করব, যেমনিভাবে এ বৃক্ষ হতে রক্ত নিঃসৃত হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ ، فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ ، يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورِعِينٍ ، يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ أَمِنِينَ ، لَايَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَى وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ .
মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে। তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই ঘটবে; আমি তাদেরকে সঙ্গিনী দান করব আয়তলোচনা হুর। সেখানে তারা প্রশান্তচিত্তে বিভিন্ন ফলমূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর সেখানে তারা আর মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে না। আর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন।৩৬১
এ আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের সার্বিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে যে, তাদের অবস্থান-স্থল হবে অত্যন্ত সুদৃশ্য। তারা সেখানে সকল প্রকার চিন্তা ও পেরেশানী হতে মুক্ত থাকবে। সে স্থানে ফলমূল, নদী ও উত্তম পোশাকের দরুন এবং পরস্পর সামনা-সামনি থাকার ফলে সামাজিকতার স্বাদ পূর্ণমাত্রায় লাভ করবে। ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা নারীর ফলে জীবনের পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করবে। তারা বিভিন্ন প্রকার ফল ও প্রশান্তি চাইবে, তা কখনো নিঃশেষ হবে না। তা খাওয়ার ফলে তার কোন খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে না এবং কোন সমস্যায় ফেলবে না। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, তারা জান্নাতে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে না।
حور শব্দটি حوراء এর বহুবচন। حوراء বলা হয় সুন্দরী রূপবতী শুভ্র মুখাবয়ব বিশিষ্টা কাজল কালো আঁখি বিশিষ্টা রমণীকে।
যায়েদ ইবনে আসলাম রহ. বলেছেন, حوراء সে সকল স্ত্রী লোককে বলা হয়, যার মুখমণ্ডলের আলোক, ঔজ্জ্বল্য ও বিভার দরুন তাদের চেহারার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যাবে না। দৃষ্টি এতে স্তম্ভিত হয়ে পড়বে। عين দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সুন্দর আঁখি বিশিষ্টা।
মুজাহিদ রহ. বলেন حوراء সে সকল স্ত্রীলোককে বলা হয়, যাদের ত্বকের কোমলতা ও রূপ লাবণ্যের দরুন দৃষ্টি মুগ্ধ ও আবিষ্ট হয়ে পড়ে।
হাসান বসরী রহ. বলেন, حوراء সে সব স্ত্রীলোককে বলা হয়, যাদের চোখের সাদা অংশ পূর্ণরূপে সাদা এবং কালো অংশ পূর্ণরূপে কালো থাকে।
حور শব্দটির আভিধানিক বিশ্লেষণ
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আরবী ভাষায় শুভ্রতাকে হুর বলা হয়। কাতাদাহ রহ. ও অনুরূপ মত পোষণ করেছেন।
মুকাতিল রহ. বলেন, শুভ্র মুখমণ্ডলকে হুর বলা হয়।
মুজাহিদ রহ. বলেন, হুরে ঈন হল তারা, যাদেরকে দেখে দৃষ্টি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তাদের পোশাকের অভ্যন্তর হতে তাদের পায়ের গোড়ালির মজ্জা পরিলক্ষিত হয়। তাদের কোমল ত্বক ও রূপ-লাবণ্য এমন হবে, তাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপকারী তাদের হৃদয়ে আপন ছবি দেখতে পাবে, যেমনিভাবে আয়নায় দেখতে পায়।
বিশুদ্ধতম মত হল, এটি الحورفي العين হতে উৎকলিত الحورفي العين বলা হয়, চোখের সাদা অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ের সাদা এবং কালো অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ের কালো হওয়া। সুতরাং হূর সে স্ত্রীলোককে বলা হয়, যার মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত পূর্ণরূপে বিরাজমান।
আবূ ওমর রহ. বলেন, গাভী ও হরিণের চোখের ন্যায় সমগ্র চোখ কালো হলে সে সকল স্ত্রীলোককে হুর বলা হয়। মানুষের মধ্যে হুর বিদ্যমান নেই। বিশুদ্ধতম কথা হল, স্ত্রীলোকদেরকে হুর এ জন্য বলা হবে, যেহেতু তারা গাভী ও হরিণের চোখ সদৃশ নেত্র বিশিষ্ট হবে।
গ্রন্থকার বলেন, এ শব্দটির ব্যুৎপত্তির ক্ষেত্রে আবূ ওমর রহ. অন্যান্য ভাষাবিদদের পরিপন্থী মত ব্যক্ত করেছেন। কেননা, তিনি حور )হুর( শব্দটিকে 'কালো'র অর্থে ব্যবহার করেছেন। অথচ অন্যরা 'সাদা' অর্থে ব্যবহার করেছেন অথবা কালোর মধ্যে সাদা অর্থে ব্যবহার করেছেন। الحور في العين দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তাদের মধ্যে কালো ও শুভ্রতার যুগপৎ সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটবে। সাদা কালো উভয়টাতেই একের কারণে অন্যের মধ্যে শোভা বৃদ্ধি পাবে। (অর্থাৎ সাদাকে দেখে কালোর মধ্যে আর কালোকে দেখে সাদার মধ্যে শোভাও পরিদৃষ্ট হবে) আরবগণ عين حوراء তখন বলে থাকেন, যখন চোখের সাদা অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ের সাদা হয় এবং কালো অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ের কালো হয়। যখন কোনো নারী উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত চক্ষু বিশিষ্টা হয় এবং শরীরের বর্ণও সাদা হয়, তখন তাকে حوراء বলা হয়।
عين এটি হল عيناء এর বহুবচন। عين বলা হয়, ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা নারীকে। পুরুষের চক্ষু বড় বড় হলে তাকে رجل عين বলা হয়। আর মহিলাকে বলা হয় امرأة عيناء। তবে বিশুদ্ধতম মত হল এই, যে নারীর চোখ সুন্দর এবং সুদর্শন তাকেই عين )ঈন) বলা হয়।
মুকাতিল রহ. বলেন, সুন্দর চক্ষু বিশিষ্টা নারীকে عين বলা হয়। ডাগর ডাগর ও প্রশস্ত চক্ষুও নারীদের সৌন্দর্য ও রূপ বৃদ্ধি করে। ছোট চোখ হওয়া এক প্রকার ত্রুটি।
নারীদের চারটি অঙ্গের সংকীর্ণতা পসন্দনীয় মুখ, নাকের ছিদ্র, কানের ছিদ্র ও লজ্জা স্থান। আর চারটি অঙ্গের প্রশস্ততা পসন্দনীয়: মুখমণ্ডল, বক্ষস্থল, উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থল ও কপাল। আর চারটি অঙ্গের শুভ্রতা পসন্দনীয়: বর্ণ, মাথার সিঁথি, দন্ত এবং চোখের সাদা অংশ অত্যন্ত সাদা হওয়া। আর চারটি অঙ্গের কৃষ্ণতা পসন্দনীয়, চোখের কালো অংশ অত্যন্ত কালো হওয়া, চোখের ভ্রূ, চোখের পলক ও চুল। আর চারটি অঙ্গের দীর্ঘতা পসন্দনীয়: দেহের উচ্চতা, ঘাড়ের দীর্ঘতা, চুলের দীর্ঘতা এবং আঙ্গুলের দীর্ঘতা। আর চারটি অঙ্গের ন্যূনতা অর্থাৎ ছোট হওয়া পসন্দনীয়: এটা বাহ্যিকতার দিক থেকে নয়; বরং তাৎপর্যতার দিক থেকে। তা হল যবান, হাত, পা ও চোখ। চোখ ছোট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, প্রত্যেক বস্তুর প্রতি লালসার দৃষ্টি না দেওয়া; বরং তার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। পা ছোট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, নারী ঘর থেকে বাইরে খুব কম বের হওয়া। যবান ছোট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অধিক কথা না বলা। হাত ছোট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, স্বামীর অপসন্দনীয় বস্তু স্পর্শ না করা। তার অসম্মতিতে অর্থ ব্যয় না করা। আর তাদের চারটি অঙ্গের ক্ষীণতা পসন্দনীয়: কোমর, মাথার সিঁথি, ভ্রূ এবং নাসিকা।
وَزَوَّجَنَاهُم بِحُوْرِعِيْنِ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عين আমি তাদের সঙ্গিনী দান করব আয়তলোচনা হুর৩৬২।
আবূ উবায়দা রহ. বলেন, এর অর্থ হল, আমি তাদেরকে এমন সম জুটিতে রূপান্তরিত করব, যেমনিভাবে একটি পাদুকা অপরটির জোড়া হয়ে থাকে। ইউনুস রহ. বলেন, আমি জান্নাতীদেরকে তাদের হুরদের সাথে একীভূত ও ঘনিষ্ঠ করে দেব। زَوَّجْنَا দ্বারা বৈবাহিক বন্ধন উদ্দেশ্য নয়। দলীল হিসাবে তিনি বলেন, আরবগণ কোন মহিলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে, تزوجتها تزوجت بها বলে না।
ইবনে নসর রহ. বলেন, আল্লাহর নিম্মোক্ত বাণীর মাঝে উক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায়। আয়াতটি فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَا كَهَا যায়েদ যখন যয়নবের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তোমার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করলাম৩৬৩।
এ সকল ক্ষেত্রে যদিও تزوجت بها ব্যবহার করা বিধিসম্মত, তবে زَوَّجْنَاكَهَا এর স্থলে زوجناك بها ব্যবহার করা হত।
ইবনে সালাম তামীম রহ. বলেন, تزوجت امرة এবং تزوجت بها উভয়টাই ব্যবহার করা যায়। কায়েস রহ. হতে এরূপ বর্ণিত রয়েছে। আযহারী বলেন, আরবগণ এরূপতো বলে থাকেন, تزوجته امرنة অর্থাৎ আমি অমুক মহিলার সাথে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছি। এমনিভাবে বলে থাকে تزوجت امرءة অর্থাৎ আমি তাকে (মহিলাকে) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছি। কিন্তু তারা কখনো বলে না تزوجت بامرأة। কাজেই আল্লাহ তাআলার বাণী وزوجناهم بخور عين দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে জান্নাতপ্রাপ্তদের মিলন ঘটাবেন।
ওয়াহিদী রহ. বলেন, এ ক্ষেত্রে আবূ উবায়দার অভিমতই অধিক উত্তম। কেননা, তিনি এটি تزویج থেকে গঠন করেছেন। تزویج অর্থ হল এক বস্তুকে অপর বস্তুর সাথে যুক্ত করে জোড়া তৈরী করে দেওয়া। এটি শুধু বৈবাহিক অর্থে ব্যবহৃত এমন নয়। এ জন্যই বলা যায় كان فردا فزوجته بامرئة সে নি:সঙ্গ ছিল, আমি তাকে সঙ্গিনীর সাথে যুক্ত করে দিয়েছি। যারা বলেন, এ ক্ষেত্রে بء ব্যবহার করা ঠিক নয়, তারা বলেন, এটা কেবল তখনই, যখন এটা বৈবাহিক বন্ধন অর্থে ব্যবহার হয়। গ্রন্থকার বলেন, بء শব্দটি উভয় অর্থেই ব্যবহার হতে পারে। কেননা تزویج শব্দটি বৈবাহিক বন্ধন অর্থেও ব্যবহার হয়। যেমন মুজাহিদ রহ. زوجناهم এর অর্থ انكحناهم করেছেন। بء যুক্ত ও সংযুক্ত করাকে বুঝায়। তাকে উহ্য রাখার চেয়ে উল্লেখ করাই উত্তম।
قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ সে সবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে পূর্বে কোন মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি। فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? كانهن الياقوت والمرجان তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল৩৬৪।
আল্লাহ তাআলা তিন স্থানে তাদের নত দৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন। এক. উক্ত আয়াতে। দুই. সূরা সাফ্ফাতে যেমন وَعِنْدَهُمْ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ عِينٌ তাদের সঙ্গে থাকবে আনতনয়না, আয়তলোচনা হুরীগণ।৩৬৫ তিন: সূরা সা’দে, যেমন وَعِنْدَهُمْ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ أَتْرَابٌ তাদের সঙ্গে থাকবে আনতনয়না সমবয়স্কাগণ৩৬৬।
সকল মুফাস্সির এ ব্যাপারে একমত, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে সকল স্ত্রী; যারা একমাত্র স্বীয় স্বামীর দিকেই আপন দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখবে। অন্য কারো দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না। এমনিভাবে তাদের স্বামীদের দৃষ্টিও একমাত্র তাদের দিকেই নিবদ্ধ থাকবে। কেননা, তাদের সৌন্দর্য ও রূপ-লাবণ্য অন্যদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ হতে বিরত রাখবে।
আদম রহ.স্ব-সনদে মুজাহিদ রহ. থেকে قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ -এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, সে সকল স্ত্রী যারা স্বীয় স্বামীর প্রতি আপন দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করে রাখবে এবং আপন স্বামী ব্যতীত অন্য কাউকে পছন্দ করবে না।
আদম রহ. স্ব-সনদে হাসান বসরী রহ. প্রদত্ত قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, সে সকল স্ত্রী আপন স্বামীর প্রতিই স্বীয় দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখবে। আল্লাহর শপথ, তারা অন্য কারো সামনে স্বীয় সাজসজ্জার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে না। আর কারো প্রতি উঁকি মেরেও দেখবে না।
মানসূর রহ. মুজাহিদ রহ. হতে এ ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন, সে স্ত্রী তার চক্ষু, অন্তর ও নিজেকে আপন স্বামীর মধ্যে সীমিত রাখবে। অন্য কারো প্রতি তার কোন আগ্রহ থাকবে না।
সাঈদ রহ. কাতাদাহ রহ. হতে এ ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন যে, সে স্ত্রী স্বীয় স্বামীর প্রতি আপন দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে। অন্য কারো প্রতি ফিরেও তাকাবে না।
أتراب এর ব্যাখ্যা
أتراب এটা ترب এর বহুবচন, অর্থ হল সমবয়সী।
আবূ উবায়দা রহ. ও আবূ ইসহাক রহ. বলেন, সে সকল স্ত্রী সমবয়সী হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও অন্য মুফাস্সিরগণ বলেন, তারা সকলে সমবয়সী হবে। তাদের সকলের বয়স তেত্রিশ বছর হবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, أتراب দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সমপর্যায়ের, অর্থাৎ তারা একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, 'স্ত্রী পূর্ণ যুবতী ও কমনীয়া হবে। সে সকল হূর সমবয়সী হবে। কুরআন কারীমে এর উল্লেখ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এ বিষয়টি স্পষ্টতর করা যে, তাদের মধ্যে কেউ বৃদ্ধ হবে না। যার দরুন তার সৌন্দর্য হ্রাস পেতে পারে। সে স্বল্প বয়সেরও হবে না, যার ফলে কাম-বাসনা চরিতার্থ করা অসম্ভব হতে পারে। কিন্তু পুরুষদের অবস্থা এর চেয়ে ভিন্নতর। কেননা, পুরুষদের মধ্যে কিশোররাও থাকবে যারা জান্নাতীদের খাদেম হবে।
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ -এর মধ্যে فِيهِنَّ এর ضمير (সর্বনাম) এর مرجع তথা প্রত্যাবর্তন-স্থল সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এর প্রত্যাবর্তন-স্থল হল, لجنتان। অর্থাৎ জান্নাতদ্বয় ও তার মধ্যস্থিত প্রাসাদ, অট্টালিকা, তাঁবু ইত্যাদি। অন্যরা বলেন, এর مرجع প্রত্যাবর্তন-স্থল হল, আল্লাহ তাআলার বাণী مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشِ -এর মধ্যস্থল فرش। তখন فيهِنَّ -এর মধ্যস্থ في অক্ষরটি على -এর অর্থে ব্যবহৃত হবে।
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌ এর ব্যাখ্যা
আল্লাহ তাআলার বাণী لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌ এর ব্যাখ্যায় আবূ উবায়দা রহ. বলেন لم يطمئهن অর্থ لم يمسهن অর্থাৎ তাদেরকে কেউ স্পর্শ করেনি। আরবদের পরিভাষায় রয়েছে, ماطمث هذا البعير حبل قط অর্থাৎ এ উষ্ট্রীকে রশি কখনো স্পর্শ করেনি।
ফাররা রহ. বলেন, طمث অর্থ হল افتضاض অর্থাৎ ঋতুবতী স্ত্রী লোক। এটা বাবে ضرب ও বাবে نصر হতে ব্যবহৃত হয়। ضرب হতে ব্যবহার হলে এর অর্থ হবে কোন বস্তু স্পর্শ করা, আর نصر হতে হলে এর অর্থ হবে ঋতুবতী হওয়া।
লাইস রহ. বলেন, ব্যক্তি যখন কোন নারীর সাথে সহবাস করে তার কুমারীত্বের অবসান ঘটায় তখন বলে طمئت الجارية। সে হিসাবে ঋতুবতী স্ত্রী লোককে طمث বলা হয়।
আবুল হায়ছাম রহ. বলেন, সহবাসের পর যখন রক্ত স্রাব শুরু হয়, তখন সে মহিলার ক্ষেত্রে বলা হয় طمئت ও تطمث ।
মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, لم يطمئهن অর্থ হল لم يطأهن অর্থাৎ তাদের সাথে কেউ সঙ্গম করেনি। কেউ কেউ বলেন, لم يطمئهن অর্থ لم يغش هن। আর কেউ বলেন, لم يجامعهن কিন্তু শব্দ ভিন্ন হলেও সবগুলোর অর্থ এক। তবে একটি বিষয়ে তারা মতভেদ করেছেন। কেউ কেউ বলেন, সে সকল হূরকে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের মাঝেই সৃষ্টি করবেন। অন্যরা বলেন, তারা পৃথিবীরই নারী, তবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নতুনভাবে কুমারীত্ব প্রদান করবেন।
শা'বী রহ. বলেন, তারা পৃথিবীরই নারী, তবে তাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করার পর কেউ স্পর্শ করেনি।
মুকাতিল রহ. বলেন, তাদেরকে কেউ স্পর্শ করেনি। কারণ তাদেরকে জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে।
আতা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, তারা হবে দুনিয়ার সে সকল নারী, যারা কুমারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।
গ্রন্থকার বলেন, কুরআন কারীমের বাহ্যিক অবস্থা থেকে এ কথাই বুঝা যায়, সে সকল নারী পার্থিব জগতের নারী হবে না, বরং তারা হবে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট জান্নাতী রমণীকুল। কিন্তু পার্থিব জগতে তো মানবীদের সাথে মানবেরা সঙ্গম করেছে। আর স্ত্রী জিনদের পুরুষ জিনরা সঙ্গম করেছে। আয়াতুল কুরসী দ্বারা এ কথাই বুঝা যায়। অত্র আয়াত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, মানব পুরুষরা যেমনিভাবে স্বীয় স্ত্রীদের সাথে সঙ্গম করে থাকে। তেমনিভাবে পুরুষ জিনরাও স্ত্রী জিনদের সাথে সঙ্গম করে থাকে। আয়াতে এ কথার প্রমাণ রয়েছে যে, সে সকল হুরকে জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে। আল্লাহ তাআলা যেমনিভাবে জান্নাতীদের জন্য ফলমূল, উদ্যান, নদী, পোশাক ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন। এমনিভাবে তাদের জন্য হুরদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। এর পরবর্তী আয়াতও একথাই বুঝায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فِي الْخِيَامِ حُورٌ مَقْصُورَاتٌ সেখানে তাঁবুর মধ্যে রক্ষিতা হুরী থাকবে।
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسُ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ ইতোপূর্বে তাদেরকে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, কিয়ামত প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, সেদিন জান্নাতে আয়তলোচনা রমণীকুল মারা যাবে না। কেননা, তাদেরকে চিরকালের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আয়াত দ্বারা তাই বুঝা যায়। জমহূর এমত পোষণ করেছেন, মু'মিন জিন জান্নাত লাভ করবে যেমনি ভাবে কাফের জিন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
ইমাম বুখারী রহ. এ জন্য স্বতন্ত্র অধ্যায় উল্লেখ করেছেন باب ثواب الجن وعقابهم । পূর্ববর্তীগণের মধ্যেও অনেকে এ মত পোষণ করেছেন।
যামরাহ ইবনে হাবীব রহ. কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জিনরা কি পূণ্য লাভ করবে? বলেলেন, হ্যাঁ। তিনি দলীল হিসাবে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করলেন। এরপর বলেন, আয়তলোচনা রমনীদেরকে মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা মানুষের জন্যই নির্ধারিত থাকবে। আর যাদেরকে জিনদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তারা জিনদের জন্যই নির্ধারিত থাকবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, সঙ্গমের সময় ব্যক্তি যদি আল্লাহর নাম না নেয়, তাহলে শয়তান তার পুরুষাঙ্গের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়।
قبلهم এর মধ্যে (ضمیر (সর্বনাম) দু'কারণে বহুবচন আনা হয়েছে।
প্রথমত: متكنين হল, বহুবচন। সুতরাং সেদিকে লক্ষ্য করে (ضمیر সর্বনাম) ও বহুবচন আনা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত : كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ -এর মধ্যে من হল, বহুবচনের সর্বনাম। সুতরাং এর বিপরীতে 3 বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। (অর্থাৎ সে সকল মহিলা পদ্মরাগমণি ও প্রবালের ন্যায় হবে এবং তাদের স্বামীর পূর্বে কেউ স্পর্শ করবে না।
হাসান বসরী রহ. সহ অধিকাংশ মুফাস্সিরগণ বলেন, পদ্মরাগমণির স্বচ্ছতা ও প্রবালের শুভ্রতা উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। তাদের বর্ণের উজ্জ্বলতার দিক থেকে পদ্মরাগমণির সাথে এবং শুভ্রতার দিক থেকে প্রবালের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বারাও তাই বুঝা যায়, জান্নাতের স্ত্রীরা সত্তর জোড়া রেশমী পোশাক পরা সত্ত্বেও তাদের গোড়ালির মজ্জা দেখা যাবে।
كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়। কেননা, ইয়াকুতের মধ্যে যদি সূতা রাখা হয় আর ওটাকে পরিষ্কার করা হয়, তবে তার সূতা দেখা যায়। তদ্রূপ তাদের গোড়ালির মজ্জা দেখা যাবে।
অপরূপা হুর
আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসায় ইরশাদ করেন, حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিতা হুর রয়েছে৩৬৭।
المَقْصُورَات অর্থ হল المحبوسات অর্থাৎ সুরক্ষিতা। আবূ উবায়দা রহ. বলেন, তারা তাঁবুতে পর্দায় থাকবে।
তদ্রূপ মুকাতিল রহ. বলেন, তার এক অর্থ এই, তারা তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিতা থাকবে। তাদেরকে তাদের স্বামীরা ব্যতীত অন্য কেউ দেখবে না। এ শব্দের আরো একটি অর্থ রয়েছে। তা হল, তারা নিজ স্বামীদের জন্য সুরক্ষিতা থাকবে, তারা স্বামী ছাড়া অন্য কারো প্রত্যাশা করবে না এবং স্বামী ব্যতীত অন্য কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না।
গ্রন্থকার বলেন, قاصرات الطرف দ্বারাও এটাই উদ্দেশ্য। তবে ব্যবধান এতটুকু, এতে সুস্পষ্ট বর্ণিত রয়েছে, তারা নিজের দৃষ্টি অবনত রাখবে। আর مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ -এর মধ্যে রয়েছে, তারা তাঁবুতে সুরক্ষিতা থাকবে।
তাদের মতানুযায়ী في الخيام শব্দটি হল حور عين-এর সিফাত বা গুণজ্ঞাপক শব্দ। সে হিসাবে তারা এর ব্যখ্যা করেন এ ভাবে যে, সে সকল হূর তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিতা থাকবে। তারা সেখান থেকে বের হয়ে উদ্যানে ও প্রাসাদে যাবে না।
প্রথমোক্ত মত পোষণকারীরা তাদের এ মতের উত্তরে বলেন, তারা পর্দায় সুরক্ষিতা থাকবে। এর দ্বারা এ কথা জরুরী নয়, তারা পর্দা থেকে বের হয়ে উদ্যান ও প্রাসাদে যাবে না। যেমন বাদশাহ ও অভিজাত শ্রেণীর মেয়েরা সুরক্ষিত মহলে অবস্থান করে; কিন্তু উদ্যানে পায়চারি ও ভ্রমণ করতে তাদেরকে বাধা প্রদান করা হয় না। সুতরাং 'তারা সুরক্ষিত মহলে অবস্থান করে'। এ কথা বলার দ্বারা এটা আবশ্যক হয়ে পড়ে না, ঘরে আবদ্ধ থাকে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, তারা তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় একমাত্র নিজ স্বামীর জন্য আসন নির্ধারিত করে রাখবে। তারা মুক্তামালার তাঁবুতে অবস্থান করবে। তাদের প্রথম গুণ পূর্বে আলোচিত হয়েছে। তা হল, তারা অবনত দৃষ্টিসম্পন্না হবে।
তাদের দ্বিতীয় গুণ হল, مَقْصُورَاتٌ অর্থাৎ তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিতা থাকবে। সুতরাং উভয়টাই তাদের স্বতন্ত্র দুটি গুণ। قاصرات الطرف দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তাদের দৃষ্টি নিজ স্বামী ছাড়া অন্য কারো প্রতি নিবদ্ধ হবে না। আর مَقْصُورَاتٌ فِي الْخَيَامِ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা স্বামী ব্যতীত অন্য কারো সামনে নিজ রূপ ও সাজসজ্জার প্রকাশ করবে না এবং স্বামী ছাড়া অন্য কোন দিকে যাওয়ার জন্য তাদের পা উত্থিত হবে না।
فيهِنَّ خَيْرَاتٌ এর ব্যাখ্যা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فيهِنَّ خَيْرات حسان সে উদ্যানসমূহে রয়েছে সুশীলা সুন্দরীরা৩৬৮।
خيرات এটা خيرة বহুবচন। خيرة মূলত: ছিল خيرة (তাশদীদ যুক্ত) حسان এটা حسنةএর বহুবচন। অর্থাৎ সে সকল নারী উত্তম গুণাবলী, উন্নত স্বভাব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এবং সুশীলা ও কমনীয়া হবে।
ওকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানই উত্তম গুণাবলী, উন্নত চরিত্র ও সুশীলা এবং কমনীয়া নারী লাভ করবে। তাদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন তাঁবু থাকবে। প্রত্যেক তাঁবুর চারটি দরযা থাকবে। প্রত্যহ প্রত্যেক দরযা দিয়ে ফিরিশতাগণ এমন সব উপহার ও সম্মাননা নিয়ে প্রবেশ করবে যা সে ইতোপূর্বে কখনো লাভ করেনি। সে সকল রমণীরা কখনো অস্থিরতা ও চিন্তাক্লিষ্ট হবে না। (যেন তাদেরকে দেখে স্বামীরা চিন্তাক্লিষ্ট এবং অস্থির না হয়ে পড়ে) তাদের শরীর কখনো দুর্গন্ধযুক্ত হবে না এবং তাদের মুখ হতেও দুর্গন্ধ বের হবে না। তারা স্বামী ছাড়া অন্য কারো দিকে তাকাবে না।
انا انشئنا هن انشاء এর ব্যাখ্যা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءُ فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا عُرُبًا أَتْرَابًا لِأَصْحَابِ الْيَمِينِ
তাদেরকে (অর্থাৎ হুরদেরকে) আমি সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে, তাদেরকে করেছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা। ডান দিকের লোকদের জন্য অর্থাৎ যাদের আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে৩৬৯
এ আয়াতে هن সর্বনামটির প্রত্যাবর্তন স্থল হল হুর। পূর্বে তাদের উল্লেখ না করেও সর্বনামের প্রত্যাবর্তনস্থল তা নির্ধারণ করা হয়েছে এ হিসাবে, পূর্বোল্লিখিত فرش দ্বারা তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা, সে সকল فرش তাদের প্রাসাদেই থাকবে।
মুফসিরগণের কেউ কেউ বলেন, فرش مرفوعة এর মধ্যে فرش দ্বারা উদ্দেশ্য হল স্ত্রীরা। فرش দ্বারা ইঙ্গিতার্থে স্ত্রীলোক উদ্দেশ্য। কিন্তু مرفوعة এর বিপরীত অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে। সুতরাং সঠিক বিষয় হল, فرشদ্বারা বিছানাই উদ্দেশ্য। তবে এটা মহিলাকেও বুঝায়। কেননা, বিছানা অধিকাংশ সময় মহিলাদের প্রাসাদেই শোভা পায়।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত কাতাদাহ ও সাঈদ ইবনে জুবায়র রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলা সে মহিলাদের নতুন করে সৃষ্টি করবেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এর দ্বারা মানব জাতির নারী উদ্দেশ্য।
হযরত কালবী ও হযরত মুকাতিল রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, দুনিয়ার প্রৌঢ়া ও বৃদ্ধা নারী। যাদেরকে পৃথিবীতে একবার সৃষ্টি করার পর তারা এ বয়সে মৃত্যুবরণ করবে। তাদেরকে জান্নাতে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা নব যৌবন দান করবেন।
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত মারফু হাদীসও এ ব্যাখ্যার সমর্থন রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তারা হবে তোমাদের মধ্যকার দুর্বল ও ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন স্ত্রীলোক।
উক্ত হাদীসটি ছাওরী রহ. স্ব-সনদে হযরত ইয়াযীদ রুক্কাশী হতে বর্ণনা করেছেন।
ইয়াহইয়া হামানী রহ.স্ব-সনদে হযরত আয়েশা রা. হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তাও এর সমর্থন করে। তিনি বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে এলেন। তখন তার ঘরে একজন বৃদ্ধা মহিলা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, এই মহিলা কে? হযরত আয়শা রা. বললেন, তিনি হলেন আমার খালা। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এই কথা শুনে বৃদ্ধা যারপর নাই চিন্তিত হল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءً নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করব।
সকল মানুষকেই নতুনভাবে সৃষ্টি করে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। কিয়ামতের দিনে উলঙ্গ দেহে, খালি পায়ে তাদেরকে খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম আ. কে পোশাক পরানো হবে। এরপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنَّشَاءًর্ড। আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।
আদম ইবনে আবূ ইয়াস রহ. স্ব-সনদে হযরত সালামাহ ইবনে ইয়াযীদ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنَّشَاءُ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা বিবাহিত-অবিবাহিত সকলকেই নতুনভাবে সৃষ্টি করবেন।
আদম রহ. স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, (এ বর্ণনাটি শামায়েলে তিরমিযীতেও উল্লেখ করা হয়েছে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا يدخل الجنة العجز অর্থাৎ বৃদ্ধারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। فیکت عجوز সে বৃদ্ধা তখন কেঁদে ফেলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, اخبروها انها يومئذ ليست بعجوز তাকে বলে দাও, সেদিন সে বৃদ্ধা থাকবে না। انها يومئذ لشبابة সেদিন সে যুবতীতে রূপান্তরিত হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنَّشَاءُর্ড অর্থাৎ আমি তাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করব।
ইবনে আবী শাইবা রহ. স্ব-সনদে হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক আনসারী বৃদ্ধা এসে আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, যেন আল্লাহ আমাকে জান্নাত দান করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এ কথা বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলেন এবং নামায আদায় করে পুনরায় হযরত আয়শা রা. এর ঘরে তাশরীফ নিলেন। হযরত আয়শা রা. বললেন, আপনার কথায় বৃদ্ধা অনেক দুঃখ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটাই তো বাস্তব কথা। কেননা, আল্লাহ তাআলা যদি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর ইচ্ছা করেন, তবে তাকে কুমারীতে রূপান্তরিত করবেন।
মুকাতিল রহ. আরেকটি মত বর্ণনা করেছেন। তা হল, إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاء বলে হুরদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাদেরকে আল্লাহ জান্নাতে তার প্রিয় বন্ধুদের জন্য একদম নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। এসমস্ত হুরদের জন্মপর্ব অতিক্রম করতে হবে। এটি হযরত যুজাজ রহ. এর মত। বাস্তব হল এমতটি ঠিক নয়। ঠিক হল তাই যা আমরা পূর্বে বলেছি, দুনিয়ার রমণীগণ। এই মতের পেছনে একাধিক যুক্তি রয়েছে। যদিও তার যুক্তি হল, এক: আল্লাহ তাআলা সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারীদের ব্যাপারে বলেছেন, يَطُوفُ عَلَيْهِمْ كامثال اللُّؤْلُوِ الْمَكْنُونِ كَ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ পর্যন্ত তাদের আলোচনা করেছেন। অতঃপর তাদের খাট, প্লেট, পানীয়, ফলমূল, আহার ও হুরদের আলোচনা করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় ধাপে জান্নাতে প্রবেশকারী ডান হাতে আমলনামা লাভকারীদের আলোচনায় তাদের খাদ্য, পানীয়, বিছানা ও স্ত্রী সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। এত সুস্পষ্ট বুঝা যায়, প্রথম শ্রেণীর লোকদের স্ত্রীদের ন্যায় এদেরকেও জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে।
দুই: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاء তাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে৩৭০।
এ আয়াতে সৃষ্টি দ্বারা প্রথম বারের সৃষ্টিই উদ্দেশ্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা যেখানে পুন:সৃষ্টি উদ্দেশ্য নিয়েছেন সেখানে إِنْشَاء কে কোন বিশেষণের সাথে বিশেষিত করে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী وَأَنْ عَلَيْهِ النَّشْأَةَ الْأُخْرَى আর এই যে, পুনরুত্থান ঘটানোর দায়িত্ব তারই৩৭১।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ النَّشْأَةَ الأولى তোমরা তো অবগত হয়েছ, প্রথম সৃষ্টি সম্বন্ধে৩৭২।
তিন: আল্লাহ এভাবে সম্বোধন করেছেন, وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا ثَلَاثَةٌ তোমরা হবে তিন শ্রেণী।
এ সম্বোধন নারী পুরুষ সকলকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে। ফলে নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীকেই পুন: সৃষ্টি করা হবে। তবে إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءُ এর মধ্যে মহিলাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। (এর দ্বারা وَكُنْتُمْ أَزْوَاجًا এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নারীরা উদ্দেশ্য নয়; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল সে সকল নারী যাদেরকে জান্নাতেই সৃষ্টি করবেন)। টাক্রিয়াকে ক্রিয়ামূল দ্বারা দৃঢ় করার বিষয়টিতে চিন্তা করলেও এটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
উপরোল্লিখিত হাদীসে শুধুমাত্র পূর্বের বৃদ্ধাদেরকেই বুঝানো হয়নি, বরং হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, যুবতীতে রূপান্তরিত বৃদ্ধাগণ ও জান্নাতী ডাগর চোখের হুরগণ অভিন্ন রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্যের অধিকারী হবেন। ফলে হুরে ঈনকে তাদের থেকে আলাদা করে ভাবার কোন অবকাশ নেই। বরং হূরে ঈন থেকে তারা এসব বৈশিষ্ট্যের অধিক যোগ্য। সুতরাং إِنْشَاءُ দ্বারা উভয় শ্রেণীর নারীই (দুনিয়ার নারী ও হুরে ঈন) উদ্দেশ্য। والله اعلم
عربا এর ব্যখ্যা
আল্লাহর বাণী, عربا এটি عروب এর বহুবচন। তার অর্থ হল সোহাগিনী অর্থাৎ সে সকল স্ত্রী স্বামীদেরকে অত্যন্ত সোহাগ করবে।
ইবনুল আরাবী বলেন عروب হল সেই সকল স্ত্রীলোক যারা স্বীয় স্বামীর অনুগত ও অত্যন্ত প্রিয় হয়।
আবূ উবায়দা রহ. বলেন, কমনীয় ও স্বামী অনুগত স্ত্রীদেরকে عروب বলা হয়। গ্রন্থকার বলেন, عزوب দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে স্ত্রীলোক, যে সহবাসের সময় স্বামীর সামনে উত্তম ভঙ্গিতে শয়ন করে এবং তার সাথে নম্রতা প্রদর্শন করে।
মুবাররাদ রহ. বলেন, একমাত্র আপন স্বামীর প্রতিই আসক্ত স্ত্রী লোককে عروب বলা হয়। তিনি প্রমাণ স্বরূপ লাবীদের পংক্তি উল্লেখ করেছেন, وفي الحدوج عروب غير فاحشة ريا الروادف يغشي دونها البصر. মহিলাদের আরোহী দলে এমন স্বামীভক্ত মহিলাও রয়েছে, যারা অপকর্মকারিণী নন। অনিন্দ্য সুন্দরী। যাদের দিকে তাকালে দৃষ্টিশক্তি মুগ্ধ, চমৎকৃত ও স্তম্ভিত হয়ে যায়।
মুফাস্সিরীনে কিরাম আরব এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, আরব বলা হয় সে নারীকে, যে হবে আসক্ত, অনুরক্ত, সোহাগিনী, আদরিনী, চিত্তমুগ্ধকারিণী, মিষ্টভাষী, সাজ-সজ্জাকারিণী এবং যার চোখের সাদা অংশে লাল রেখা থাকবে এবং যে অত্যন্ত মনমোহিনী ও কামিনী ও অত্যন্ত কামোদ্দীপ্ত হবে। ইমাম বুখারী রহ. তার সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেছেন আরব হল সে সকল নারী, যারা আপন স্বামীকে অত্যন্ত ভালবাসবে।
গ্রন্থকার বলেন, আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে রূপ-শোভা ও কান্তি এবং স্বামীদের সাথে অত্যন্ত সুন্দর প্রকৃতিতে মেলামেশার এবং স্বামীদেরকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করার মত রূপের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। নারীদের এটিই চূড়ান্ত প্রত্যাশিত বিষয় এবং এরই মাধ্যমে পুরুষ তাদের দ্বারা পূর্ণ সুখানুভূতি ও দাম্পত্যের সত্যিকার স্বাদ লাভ করতে পারে।
আল্লাহ তাআলার বাণী لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلا جَان দ্বারা তাদের সাথে পূর্ণ মজা ও তৃপ্তি লাভের বিষয়টি অবহিত করাই উদ্দেশ্য। কেননা সে নারীর সাথে সঙ্গম করেই পুরুষ অধিক তৃপ্তি লাভ করে যার সাথে ইতোপূর্বে কেউ সঙ্গম করেনি। তাই অধিক তৃপ্তি লাভের ক্ষেত্রে অন্য নারী অপেক্ষা তাদের প্রাধান্য রয়েছে। উক্ত আয়াতের ভাবার্থও তাই বুঝায়।
জান্নাতী রমণীদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য
إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا حَدَائِقَ وَأَعْنَابًا وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا মুত্তাকীদের জন্য তো আছে সাফল্য, উদ্যান, দ্রাক্ষা, সমবয়স্কা উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী৩৭৩।
كواعب হল کاعب এর বহুবচন, کعب অর্থ হল, স্ফীত বক্ষবিশিষ্টা তরুণী। হযরত কাতাদাহ ও মুজাহিদ রহ. প্রমুখ মুফাস্সিরীন এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন।
কালবী রহ. বলেন, গোলাকৃতির স্ফীতবক্ষ বিশিষ্টা তরুণীকে كاعب বলা হয়। كاعب শব্দটির প্রকৃত অর্থ হল গোলাকৃতি। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে সকল স্ত্রীলোকের স্তন আনারের ন্যায় উদভিন্ন থাকবে, নিচের দিকে ঝুলন্ত থাকবে না। এরূপ নারীদেরকে نواهد ও كواعب বলা হয়।
জান্নাতী রমণীদের অবগুণ্ঠন
ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক সকাল ও এক বিকাল আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা দুনিয়া ও তার মধ্যকার সকল বস্তু হতে উত্তম। তোমাদের ধনুক পরিমাণ অথবা বলেছেন চাবুক পরিমাণ স্থান জান্নাতে লাভ করা দুনিয়া ও তার মধ্যকার সকল বস্তু থেকেও উত্তম। যদি কোন জান্নাতী নারী পৃথিবীর প্রতি ঝুঁকে দেখত, তবে সমগ্র পৃথিবী সুগন্ধিতে সুরভিত হয়ে যেত এবং সমগ্র পৃথিবী আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে যেত। তার মাথায় ব্যবহৃত অবগুণ্ঠন দুনিয়া ও তার সকল বস্তু থেকে উত্তম।
সহীহায়নে৩৭৪ হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর সূত্রে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন। সর্বপ্রথম যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় দীপ্তিময় হবে। তাদের পরবর্তীতে যারা প্রবেশ করবে তারা হবে আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের মত। তাদের প্রত্যেকের দু'জন করে স্ত্রী থাকবে, যাদের গোশত ভেদ করে পায়ের গোছার মজ্জা দেখা যাবে। জান্নাতে কেউ স্ত্রীবিহীন থাকবে না।
ইমাম আহমদ রহ.স্ব-সনদে৩৭৫ হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক জান্নাতীর ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা স্ত্রী থাকবে। প্রত্যেকের পরণে সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। পোশাক ভেদ করে তাদের পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত উম্মে সালামাহ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে হরে-ঈন সম্পর্কে বলুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হুর শব্দের অর্থ হল সাদা, শুভ্রতা। عين ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা, অর্থাৎ পাখীর পালকের ন্যায় আকর্ষণীয় সাদা কালো চক্ষু বিশিষ্টা। উম্মে সালামাহ রা. বললেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে আল্লাহর বাণী كَأَنَّهُمْ لُؤْلُوٌ مَّكْنُونَ সম্পর্কে বলুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের স্বচ্ছতা হবে শঙ্খের খোলসে অবস্থিত মুক্তার মত, যাকে কেউ স্পর্শ করেনি।
উম্মে সালামাহ রা. বলেন, আমি বললাম আমাকে আল্লাহর বাণী, فيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ সম্পর্কে বলুন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, خَيْرَات দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা (জান্নাতী স্ত্রীগণ) উন্নত ও অনুপম চরিত্র মাধুরীর অধিকারিণী হবে। আর ৩ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা সুদর্শনা ও কমনীয়া হবেন। উম্মে সালামাহ রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে كَأَنَّهُنَّ بَيْضٌ مَّكْنُونএর ব্যাখ্যা বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ডিমের খোসা সংশ্লিষ্ট আবরণের ন্যায় হবে তাদের সূক্ষ্মতা। উম্মে সালামাহ রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে আল্লাহর বাণীعُرُبًا أَتْرَابً সম্পর্কে বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে সকল মহিলা দুনিয়া থেকে দুর্বলাবস্থায় ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন অবস্থায় ও বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে কুমারী আকারে পুনসৃষ্টি করবেন। 'عُرُبًا' শব্দের অর্থ হল, অধিক আসক্ত অনুরক্ত ও সোহাগিনী। আর أَتْرَابًا অর্থ হল সমবয়স্কা। উম্মে সালামাহ রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দুনিয়ার নারীরা উত্তম নাকি হরে-ঈন উত্তম? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হরে-ঈন অপেক্ষা দুনিয়ার নারীরা উত্তম। যেমনিভাবে আবরণী বস্ত্র অপেক্ষা আবরণীর মধ্যকার বস্ত্রগুলো উত্তম।
উম্মে সালামাহ রা. বললেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর কারণ কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের নামায, রোযা ও আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের চেহারাকে নূরের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত করবেন। তাদের শরীরের বর্ণ হবে শুভ্র, রেশমী পোশাক হবে সবুজ, অলংকার হবে হলদে, সুগন্ধিময় ধোঁয়া নির্গত হবে (কাঠের পরিবর্তে) মুক্তা হতে এবং তাদের কাঁকন হবে স্বর্ণের।
আর তারা বলতে থাকবে نحن الخالدات فلا نموت আমরা চিরস্থায়ী; আমরা মৃত্যুবরণ করব না। ونحن الناعمات فلا نبأس أبدا আমরা ঐশ্বর্যশালী; সুতরাং কখনো আমরা দুরবস্থা ও দুঃখ-দুর্দশার শিকার হব না। ونحن المقيمات فلا نلظعن أبدا আমরা সদা অবস্থানকারিণী; কখনো আমরা স্থানান্তরিত হব না। ونحن الراضات فلا نسخط أبدا আমরা সর্বদা সন্তুষ্ট থাকব, কখনো আমরা রাগান্বিত বিমর্ষ ও অসন্তুষ্ট হব না . طوبى لمن كان لنا وكنا له সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যার জন্য আমরা হব আর যে হবে আমাদের জন্য।
হযরত উম্মে সালামাহ রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দুনিয়ায় অনেক মহিলা দু-তিন স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু মৃত্যুর পর যদি সে মহিলা এবং তার সকল স্বামী জান্নাতী হয়, তবে সে মহিলা কার হবে? কে হবে তার স্বামী? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উম্মে সালামাহ! সে মহিলাকে এখতিয়ার দেওয়া হবে, সে তার স্বামীদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্র ও স্বভাবের অধিকারীকে বেছে নেবে। আর বলবে, হে পরওয়ারদিগার! দুনিয়াতে সে-ই আমার সাথে উত্তম আচরণ করেছে সুতরাং এখানেও তাকে আমার স্বামী বানিয়ে দিন। হে উম্মে সালামাহ! উত্তম স্বভাব চরিত্র পার্থিব ও পরজগতের সকল কল্যাণ কুড়িয়ে নেয়।
উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে সুলায়মান ইবনে আবী কারীম নামক একজন বর্ণনাকারী এক স্তরে একাই বর্ণনা করেছেন। আবূ হাতীম রহ. তাকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে আদী বলেন, তার অধিকাংশ হাদীসই প্রত্যাখ্যাত। গ্রন্থকার বলেন, পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের কেউ তার কোন সমালোচনা করেননি।
আবূ ইয়ালা মূসেলী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মাঝে ছিলেন। তখন দীর্ঘ এক আলোচনায় বলেন, হে পরওয়ারদিগার! আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুতরাং জান্নাতীদের ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, অবশ্যই তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হল এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সত্তার শপথ! যিনি আমাকে সত্য নবী হিসাবে প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই তোমরা দুনিয়াতে যে ভাবে আপন গৃহ ও স্ত্রী-পরিজনকে চিনে থাক, জান্নাতীগণ আপন বাসস্থান ও স্ত্রীদেরকে এর চেয়েও ভাল করে চিনবে। তারা প্রত্যেকে এমন বাহাত্তর জন স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র তাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে দু'জন হবে আদম সন্তান। তাদের জন্য জান্নাতে সৃষ্ট স্ত্রীদের তুলনায় এ দু'জনের প্রাধান্য থাকবে। দুনিয়াতে তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার কারণেই এ শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবে। সে ব্যক্তি এ দু'স্ত্রীদের মধ্যে একজনের নিকট প্রবেশ করবে পদ্মরাগ মণির প্রাসাদে।
সেখানে সে বসবে মুক্তা খচিত স্বর্ণের খাটে। সে স্ত্রী পাতলা ও পুরু সত্তর জোড়া পোশাক পরা থাকবে। সে ঐ রমণীর বুকে হাত রাখবে। এরপর তার হাত থেকে বুক পর্যন্ত অংশের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকবে। উপরে এত জোড়া পোশাক, ত্বক ও গোশত থাকা সত্ত্বেও তা ভেদ করে তার দৃষ্টি দেহের গভীরে চলে যাবে। পায়ের গোছার মজ্জা ঠিক তেমনি দেখা যাবে, যেমনিভাবে তোমরা ফাঁপা মুক্তার উপর খচিত ঝুরি দেখতে পাও। সে মহিলার হৃদয় এ ব্যক্তির জন্য, এ ব্যক্তির হৃদয় সে মহিলার জন্য আয়নার মত হবে। সে মহিলার উপস্থিতিতে এ ব্যক্তি কোন ক্লান্তি বা বিরক্তি অনুভব করবে না। এমনিভাবে এ ব্যক্তির উপস্থিতে সে মহিলা কোন প্রকার ক্লান্তি বা বিরক্তি অনুভব করবে না। সে যখনই ঐ নারীর নিকট যাবে, তখনই তাকে কুমারী পাবে। পুরুষের যৌনাঙ্গ যেমন নিস্তেজ হবে না, তদ্রূপ ঐ রমণীর যৌনাঙ্গও ব্যথা অনুভব করবে না। সে এ অবস্থায় থাকতেই তার কানে এ ধ্বনি ধ্বনিত হতে থাকবে, আমরা জানি, তুমি ক্লান্ত হওনি, সেও ক্লান্ত হয়নি। তবে এখানে বীর্য স্খলিত হবে না এবং মৃত্যু আসবে না। তখন তার অন্য স্ত্রীরা একে একে আসতে থাকবে।
তাদের কেউ তার নিকট আসলেই বলবে, আল্লাহর শপথ! জান্নাতে তোমার থেকে সুন্দর আর সুদর্শন আর কিছু নেই এবং জান্নাতে অবস্থিত কোন বস্তুই আমার নিকট তোমার থেকে অধিক প্রিয় নয়।
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أدنى أهل الجنة له ثمانون ألف خادم সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তির আশি হাজার সেবক থাকবে। وإثنتان وسبعون زوجة বাহাত্তর জন স্ত্রী থাকবে। وينصب له قبة من لؤلؤ وزبرجد وياقوت كما بين الجابية وصنعاء, তার জন্য সানআ (স্থানের নাম) ও জাবিয়াহর (স্থানের নাম) মধ্যবর্তী দূরত্বসম মুক্তা, পোখরাজ, পদ্মরাগমণির এত বৃহৎ তাঁবু স্থাপন করা হবে।
ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী كانهن الياقوت والمرجان এর ব্যাখ্যায় বলেন, জান্নাতী তার স্ত্রীর গণ্ডদেশে তাকালে তাতে নিজ মুখমণ্ডল আয়নার চেয়েও পরিষ্কার দেখতে পাবে। তার মুখমণ্ডলে আরশী অপেক্ষা অধিক পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। আর তার সর্বনিম্ন স্তরের মুক্তা এমন হবে যে, তার আলোয় পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সে সত্তর জোড়া পোশাক পরা থাকবে তথাপিও তার পায়ের গোছার মজ্জা দেখা যাবে।
ফিরয়াবী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবু উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে তার বাহাত্তর জন স্ত্রী থাকবে। দু'জন হবে হুরে-ঈন আর সত্তর জন হবে পার্থিব জগতের। প্রত্যেক স্ত্রীর যৌনি অত্যন্ত কামোদ্দীপ্ত হবে এবং সে ব্যক্তির পুরুষাঙ্গ নিস্তেজহীন অবিরাম শক্তিধর হবে।
আবূ নাঈম রহ.স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, للمؤمن في الجنة ثلاث وسبعون زوجة প্রত্যেক মু'মিন ব্যক্তির জান্নাতে তিয়াত্তর জন স্ত্রী থাকবে। قلنا یا رسول الله أو له قوة على ذالك আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে কি এত স্ত্রীকে সামলাতে পারবে? قال : انه ليعطى قوة مأة رجل রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে একশত পুরুষের শক্তি প্রদান করা হবে।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, هل نصل إلى نسائنا في الجنة كما نفضي اليها في الدنيا আমরা কি জান্নাতে সহবাস করতে পারব? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ان الرجل ليصل في اليوم إلى مأة عذراء নিশ্চয়ই একজন জান্নাতী পুরুষ দিনে একশত কুমারীর সাথে সঙ্গম করতে সক্ষম হবে।
আবুশ শায়খ রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, نفضي إلى نسائنا في الجنة كما نفضي اليها في الدنيا আমরা যেভাবে আমাদের স্ত্রীদের সাথে সঙ্গম করতাম জান্নাতেও কি সে রূপ আমাদের স্ত্রীদের সাথে সঙ্গম করতে সক্ষম হবো? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, والذي نفس محمد بيده إن الرجل ليفضي في الغداة الواحدة إلى مأة عذراء সে সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, একজন জান্নাতী পুরুষ এক দিনেই একশত কুমারীর সাথে সঙ্গম করতে সক্ষম হবে।
জান্নাতী নারী সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধন
সহীহ হাদীসে শুধু রয়েছে, প্রত্যেকের দু'জন করে পত্নী থাকবে। সহীহ বর্ণনায় এর চেয়ে অতিরিক্ত কিছু নেই। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সকলে স্ব-স্ব মর্যাদা মোতাবেক কম বা বেশি সেবক পাবে। অথবা সঙ্গম করতে পারবে, এটাকেই কেউ কেউ ভাবার্থে বর্ণনা করেছেন, এত সংখ্যক স্ত্রী লাভ করবে। ইমাম তিরমিযী রহ. জামে তিরমিযীতে৩৭৬ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন يعطى المؤمن في الجنة قوة كذا كذا في الجماع। মু'মিন ব্যক্তি জান্নাতে এত সংখ্যক মহিলার সাথে সঙ্গম করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হল, يا رسول الله اويطيق ذالك ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা কি পারবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, يعطى قوة مأة তাকে একশত পুরুষের সমান শক্তি দেয়া হবে। উক্ত হাদীসটি সহীহ।
সুতরাং যে বর্ণনায় রয়েছে, একশত কুমারীর সাথে সঙ্গম করবে। হতে পারে এটি ভাবার্থ। অথবা জান্নাতীদের মর্যাদা কম-বেশির কারণে তাদের স্ত্রীর সংখ্যায়ও কম-বেশি হবে।
জান্নাতে মু'মিনণের দু'স্ত্রী থেকে অধিক স্ত্রী লাভ করার বিষয়টি সন্দেহাতীত। কেননা সহীহায়নে৩৭৭ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়স রহ. তাঁর পিতা-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان للعبد المؤمن في الجنة لخيمة من لؤلؤ مجوفة, জান্নাতে মু'মিন ব্যক্তির ফাপা একই মুক্তা দ্বারা নির্মিত তাঁবু থাকবে। طولها ستون میلا যার দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। للعبد المؤمن فيها أهلون সে স্থানে মু'মিন ব্যক্তির সেখানে অনেক স্ত্রী থাকবে। فىطوف عليهم لا يرى بعضهم بعضا সে ব্যক্তি তাদের নিকট গমন করে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন এমনভাবে পূরণ করবে; কিন্তু বিশাল তাঁবুর ভেতরে প্রত্যেকের অবস্থান করার কারণে একে অপরকে দেখতে পাবে না।
টিকাঃ
৩৬০. সূরা বাকারা, আয়াত ২৫
৩৬১. সূরা দুখান, আয়াত: ৫১-৫৬
৩৬২. সুরা দুখান, আয়াত: ৫৪
৩৬৩. সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭
৩৬৪. সুরা আর রাহমান, অয়াত ৫৬-৫৮
৩৬৫. সূরা সাফ্ফাত, আয়াত: ৪৮
৩৬৬. সাদ, আয়াত: ৫২
৩৬৭. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭২
৩৬৮. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭০
৩৬৯. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৩৫-৩৮
৩৭০. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৩৫
৩৭১. সূরা নাজম, আয়াত: ৪৭
৩৭২. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৬২
৩৭৩. সূরা নাবা, আয়াত: ৩১-৩৩
৩৭৪- বুখারী খ. ১, পৃ. ৪৬০, মুসলিম খ. ২, প. ৩৭৯
৩৭৫. মুসনাদে আহমদ খ. ২. প. ৩৪৫
৩৭৬. খ. ২, পৃ. ৮১
৩৭৭. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৭২৪
📄 জান্নাতী হুর এক অনুপম সৃষ্টি
হুরে-ঈনের সৃষ্টির উপাদান প্রসঙ্গে ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন الحور العين خلقن من زعفران হুরে ঈনকে যাফরান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হুরে ঈন জাফরানের সৃষ্টি।
আবূ সালামাহ ইবনে আব্দুর রহমান বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন স্ত্রী থাকবে যাদেরকে আদম-হাওয়া জন্ম দেননি, বরং তাদেরকে যাফরান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস রা. হযরত আনাস রা., হযরত আবূ সালামাহ রা. হযরত মুজাহিদ রহ. হতেও বর্ণিত আছে। মোটকথা, তারা মাতা-পিতার মিলন দ্বারা জন্মলাভ করবে না, বরং তাদেরকে জান্নাতে সৃষ্টি করা হবে।
আবু নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে মারফু সনদে বর্ণনা করেন, لو أن حوراء بصقت في سبعة ابحر لعذبت البحار من عذوبة فمها যদি কোন হুর যদি সাত সমুদ্রেও থুথু নিক্ষেপ করে, তবে তার মুখের মধুরতায় সমগ্র সমুদ্রের পানি মিষ্ট হয়ে যাবে। وخلق الحور العين من الزعفران হুরে-ঈনকে যাফরান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মাটির তৈরী মানুষ যখন সেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ের সুন্দর ও সুদর্শন হবে, সেখানে যাফরানের তৈরী হুরের সৌন্দর্য কি চিন্তা করা যায়? ا فالله المستعان
আবূ নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يسطع نور في الجنة فاذا هو من ثغر ضحكت في وجه زوجها জান্নাতে হঠাৎ আলোকরশ্মি উদ্ভাসিত হলে জান্নাতীগণ মাথা উঠিয়ে দেখবে, তখন তারা জানতে পারবে, এ হচ্ছে সে হূরের দাঁতের আলোকরশ্মি, যে আপন স্বামীর সাথে হাসছে।
বাকিয়্যাহ ইবনে ওলীদ স্ব-সনদে কাসীর ইবনে মুররাহ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জান্নাতীদের আমলের বিনিময়ে অতিরিক্ত নিআমতের মধ্যে এ-ও রয়েছে, মেঘমালা জান্নাতীদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে এবং জান্নাতীদের লক্ষ্য করে বলবে, তোমরা কে কোন বস্তুর বৃষ্টি চাও? তখন তারা যে বস্তুর বৃষ্টির প্রত্যাশা করবে সে বস্তুর বৃষ্টিই বর্ষিত হবে। কাসীর ইবনে মুররাহ বলেন, আল্লাহ যদি আমাকে সেখানে স্থান দেন, তবে আমি মেঘমালাকে সুদর্শনা, সুসজ্জিতা, কমনীয়া কুমারী বর্ষণ করতে বলব।
অন্য হাদীসে হূরে-ঈনের সৃষ্টি উপাদান এবং গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তা হল ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতে বাইদাখ নামক একটি নদী রয়েছে। তার উপরে পদ্মরাগ মণির গুম্বুজ রয়েছে এবং তার তলদেশের মৃত্তিকা হতে হূর সৃষ্টি করা হয়। জান্নাতীগণ বলবে, আমাদেরকে বাইদাখ নদীর কাছে নিয়ে চল। তখন তারা সেখানে এসে সে সকল কুমারীর প্রতি অত্যন্ত গভীর দৃষ্টি দিবে। তাদের কারো সে কুমারীদের কাউকে পসন্দ হলে তার হাতের কব্জি স্পর্শ করলেই তার পেছনে পেছনে চলে আসবে।
লাইস ইবনে সা'দ রহ. ইয়াযীদ ইবনে আবূ হাবীবের মাধ্যমে ওলীদ ইবনে আবাদাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (মি'রাজ রাতে) হযরত জিবরীলকে বলেছেন, يا جيريل قف بي على الحور العين فاوقفه عليهن হে জিবরীল! আমাকে হূরে-ঈনের কাছে নিয়ে যান। জিবারঈল আ. তাঁকে তাদের কাছে নিয়ে গেলেন। فقال من انتن؟ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, তোমরা কারা? : فقلن نحن جواری قوم كرام حلوا فلم يظعنوا তারা বলল, আমরা এমন সম্মানিত সম্প্রদায়ের স্ত্রী, যারা এখানে আসবে; কিন্তু এখান থেকে কখনো প্রস্থান করবে না। وشبوا فلم يهرموا ونقوا فلم يدرنوا তারা চির যুবক থাকবে কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না এবং তারা সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে কখনো ময়লা হবে না।
ইবনুল মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আয়্যাশ রা. হতে বর্ণনা করেন। আমরা একবার হযরত কা'ব রা. এর সাথে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেন, যদি আকাশের নিচে কোন হৃরের হাত প্রসারিত করা হত, তবে সূর্যের আলোর ন্যায় পৃথিবী আলোকিত হয়ে যেত। এরপর বললেন, আমি তো শুধুমাত্র তাদের হাতের কথা বললাম, তাহলে তাদের চেহারা, চেহারার শুভ্রতা ও সৌন্দর্যের কারণে কেমন আলোকিত হতে পারে?
মুসনাদে আহমদে৩৭৮ হযরত মুয়ায বিন জাবাল রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لا تؤذى امرئة زوجها في الدنيا الا قالت زوجته من الحور العين لا تؤذيه قاتلك الله যখনই কোন স্ত্রী তার স্বামীকে কোন কষ্ট দেয়, তখন হরে-ঈনদের মধ্য হতে তার স্ত্রী চিৎকার করে বলতে থাকে আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুক, তুমি তাকে কষ্ট দিও না। فانما هو عندك دخيل يوشك ان يفارقك الينا কেননা, সে তো তোমার নিকট অতিথি। অচিরেই সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।
ইকরিমাহ রহ. এর মুরসাল হাদীসে রয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,ان الحور العين لاكثر عددا منکن হে রমণীকুল! জান্নাতী হুরগণ তোমাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি হবে। يدعون لأزواجهن তারা স্বীয় স্বামীদের জন্য দু'আ করতে থাকে। يقلن : اللهم أعنه على دينك দু'আয় তারা বলে থাকে, হে আল্লাহ! তাকে দীনের পথে চলার জন্য সাহায্য করুন। وأقبل بقلبه على طاعتك এবং তার অন্তরকে আপনার আনুগত্যমুখী করে দিন। وبلغه بعزتك يا أرحم الراحمين ইয়া আরহামার রাহিমীন! তাকে আপনার সম্মানিত স্থানে সমাসীন করে দিন।
ইমাম আওযাঈ রহ. হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, জান্নাতে লু'বা নাম্নী কিছু হূর রয়েছে যাদের সৌন্দর্যতা ও কমনীয়তা দেখে জান্নাতের অন্য সকল হূর বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়বে। তারা তার কাঁধে হাত রেখে বলবে, হে লু'বা! তোমার সৌভাগ্য তোমার অনুসন্ধানকারী যদি তোমার ব্যাপারে জানত হত, তবে সে আরো বেশি প্রচেষ্টা চালাত। তাঁর দু'চোখে লিখা থাকবে, যে ব্যক্তি আমার ন্যায় হূর প্রাপ্তির আশা করে সে যেন আমার প্রভুর সন্তুষ্টিকর কাজ করে।
আতা আস-সুলামী রহ. মালিক ইবনে দীনার রহ. কে বললেন, হে আবূ ইয়াহইয়া! আমাকে উৎসাহ দিন, (অর্থাৎ এমন কোন কথা বলুন, যাতে আমার নেক কাজ ও জান্নাত লাভের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি হয়)। তখন তিনি বললেন, হে আতা! জান্নাতে এমন এক হূর রয়েছে, যার রূপ-সৌন্দর্য নিয়ে জান্নাতবাসী গৌরব করে। যদি জান্নাতীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার এমন ফায়সালা না হত যে, তারা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না, তবে তার সৌন্দর্যের ঔজ্জ্বল্য সহ্য করতে না পেরে অন্যরা মৃত্যুমুখে পতিত হত। মালিক ইবনে দীনারের এ কথায় আতা সর্বদা জান্নাত লাভের চিন্তা মগ্ন থাকতেন।
আহমদ ইবনে আবুল হাওয়ারী বলেন। আমাকে জা'ফর ইবনে মুহাম্মদ বলেছেন, জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি অপর এক জ্ঞানী ব্যক্তির সাক্ষাত লাভ করলে সে তাকে বলল, তুমি কি হুরে-ঈন লাভের আকাংখা কর? সে বলল, না। তখন প্রত্যুত্তরে সে বলল, তার আকাংখা কর। কেননা, তাদের চেহারার জ্যোতি আল্লাহ তাআলার নূর থেকে। এটা শুনে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। তখন তাকে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দেওয়া হল। এরপর এক মাস যাবত আমি তার অসুস্থতার খোঁজ নিতে যেতাম।
রবীআহ ইবনে কুলছুম রহ. বলেন, একবার হযরত হাসান বসরী রহ. আমাদের দিকে তাকালেন। সেখানে আমরা ক'জন যুবক ছিলাম। তখন তিনি বললেন, হে যুবক সম্প্রদায়! তোমরা কি হুরে ঈনের আকাংখা কর না?
ইবনে আবুল হাওয়ারী আমাকে বলেন, হাযরামী রহ. আমার নিকট বর্ণনা করেন, আমি এবং আবূ হামযা ছাদে শুয়ে ছিলাম, তখন আমি তার দিকে দেখতে লাগলাম। তাকে আমি দেখলাম, সে সারা রাত আপন শয্যায় পার্শ্ব পরিবর্তন করছিল। বললাম, হে আবূ হামযা! তুমি তো সারা রাত ঘুমাওনি। সে বলল, আমি যখন শুয়েছি তখন আমার দৃষ্টিতে হূরের ছবি আসতে লাগল এমনকি আমি তার ত্বকও অনুভব করলাম এবং সেও আমার ত্বক স্পর্শ করল। আমি আবূ সুলাইমানের নিকট এ কথা বর্ণনা করলে তিনি বললেন, সে হূরে-ঈনের আসক্ত।
ইবনে আবুল হাওয়ারী রহ. বলেন, আমি আবূ সুলাইমানকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বিশেষ প্রকৃতিতে হূরে ঈনকে সৃষ্টি করেন, তাঁর সৃজনকার্য সম্পন্ন হলে ফিরিশতাগণ তাঁকে তাঁবু টানিয়ে দেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত যায়দ আর রুক্কাশী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি এ হাদীস জানতে পারলাম, জান্নাতে একটি জ্যোতি প্রলম্বিত হবে, তখন বলাবলি করা হবে, এটা কি? তখন কোন একজন বলবে, হূর তার স্বামীর সাথে হাসছে (এটা তাঁর দাতের আলো)। এ কথা শ্রবণ করে উক্ত মজলিসের এক কোণের এক ব্যক্তি চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে বলতে শুনেছি যে, যদি কোন হুর আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে নিজ হাত প্রসারিত করত, তবে তার সৌন্দর্যে সকল মানুষ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলত। যদি সে তার উড়নী প্রকাশ করত, তবে সূর্য তাঁর আভার সামনে ঠিক তেমনি মনে হত যেমনিভাবে সূর্যের কিরণের সামনে চেরাগ হয়। যদি সে তাঁর চেহারা প্রকাশ করত, তবে ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সব কিছুই আলোকিত হয়ে যেত।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে সুফিয়ান ছাওরী রহ. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, জান্নাতে একটি জ্যোতি প্রলম্বিত হবে। জান্নাতের সর্বস্থানে সে জ্যোতির আলোকরেখা ছড়িয়ে পড়বে। তখন জান্নাতীগণ অনুসন্ধান করে জানতে পারবে, একজন হূর আপন স্বামীর সাথে হাসছিল। যার ফলে এ আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে।
খতীবে বাগদাদী রহ. তার তারীখে বাগদাদে স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فى الجنة سطع نور فرفعوا أبصارهم তখন জান্নাতে একটি নূর প্রলম্বিত হবে, তখন জান্নাতীগণ দৃষ্টি তুলে তাকাবে। فاذا هو ثغر حوراء ضحكت في وجه زوجها তখন তারা দেখতে পাবে, একজন হূর নিজ স্বামীর সামনে হাসছে।
তারই দাতের আলোয় সমগ্র জান্নাত উদ্ভাসিত হয়েগেছে।
ইবনুল মুবারক রহ. আওযাঈ রহ. এর মাধ্যমে ইয়াহইয়া ইবনে আবু কাসীর থেকে বর্ণনা করেন, হূর জান্নাতের দ্বারে স্বীয় স্বামীদের সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং বলবে, বহুকাল অতিবাহিত হয়ে গেল আমরা এতকাল তোমার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। আমরা সর্বদাই তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকব, কখনো অসন্তুষ্ট হব না এবং সর্বদা এখানে অবস্থান করব, কখনো অন্য কোথায়ও যাব না এবং আমরা চিরকাল থাকব, কখনো মৃত্যুবরণ করব না। তোমরা যত প্রকার স্বর শুনেছ তাদের স্বর তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা মিষ্ট হবে। সে বলবে, তুমি আমার প্রিয় আর আমি তোমার প্রেয়সী। তোমার সামনে আমার কোন ত্রুটি হবে না এবং তোমার অগোচরে কোন সীমালংঘন হবে না।
টিকাঃ
৩৭৮. খ. ৫, পৃ. ২৪২