📄 জান্নাতের তৈজসপত্র
يُطَافُ عَلَيْهِم بصَحَافَ مِّن ذَهَب وَأَكْوَاب আল্লাহ তাআলার বাণী স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে পদক্ষিণ করা হবে। এর ব্যাখ্যায় কালবী রহ. বলেন, صحف অর্থ হল قصع অর্থাৎ পেয়ালা।
লাইস রহ. বলেন, صحفة রাজকীয় বিশাল গামলাকে বলা হয়, যেমন আ'শা কবির কবিতায় রয়েছে,
والضامرات تحت الرجال • والمكاكيك والصحاف من الفضة
রৌপ্য নির্মিত বিশাল গامলা ও পানপাত্র রয়েছে। সেখানে পুরুষের জন্য রয়েছে সরু কোমর বিশিষ্ট দ্রুতগামী বাহন। أكواب হল كوب এর বহুবচন। ফাররা নাহভী বলেন, হাতলবিহীন গোল মুখ বিশিষ্ট পেয়ালাকে کوب বলা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আদীর এ কবিতা আবৃত্তি করেন, يسعى عليه العبد بالكوب متكنا تصفق أبوابه- তারা রুদ্ধ দ্বার কক্ষে থাকবে। সেখানে দ্রুত পায়ে পান পাত্র হাতে ক্রীতদাস ছুটে যাবে।
আবূ উবাইদ রহ. বলেন, হাতলবিহীন গোলাকৃতি পাত্রকে کوب বলা হয়। মুকাতিল রহ. ও আবূ ইসহাক ওহ.-অনুরূপ মত পেশ করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নালীবিহীন পাত্রকে کوب বলা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيقَ وَكَأْسٍ مِنْ مَعِينٍ Ο তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চিরকিশোরেরা, পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে।৩৩৫
নালী ও হাতল বিশিষ্ট পাত্রকে اباریق বলা হয়। আর নালী ও হাতলবিহীন পাত্রকে أكواب বলা হয়।
ابریق এটি افعیل এর ওযনে بریق হতে উৎকলিত। ابریق বলা হয় সে পাত্রকে যা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করলে উজ্জ্বল ও ঝকঝকে হয়।
জান্নাতে সে পাত্র (ابریق ইবরীক) হবে রূপার তৈরী। তা কাঁচের ন্যায় ঝকঝকে হবে, তার ভিতরের বস্তু বাহির হতেও দেখা যাবে। আরবগণ তরবারিকেও ইবরীক বলে থাকে; কেননা, তরবারীও অত্যন্ত ঝকঝকে হয়।
ইবনে আহমারের কবিতায় এ ব্যবহারই পরিলক্ষিত হয়। কবিতাটি হল, تعلقت إبريقا وعلقت جفنه • ليهلك حياذا زهاء وخامل
আমি তরবারি ঝুলিয়ে রেখেছি ও তার খাঁপ বেঁধে রেখেছি, যেন প্রত্যেক অহংকারী ও অকৃতজ্ঞকে হত্যা করতে পারি।
নাওয়াদিরুল লিহয়ানিতে রয়েছে إمرئة إبريق বিদ্যুতের মত উজ্জ্বল মহিলাকে বলা হয়।
يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِأَنيَة مِنْ فِضَّة وَأَكْوَاب كَانَتْ قَوَارِيرَ قَوَارِيرَ مِنْ فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا . তাদের কে পরিবেশন করা হবে রৌপ্য পাত্রে এবং স্ফটিকের মত স্বচ্ছ পানপাত্রে। রজত শুভ্র স্ফটিক পাত্রে, পরিবেশনকারীরা যথাযথ পরিমাণে তা পরিমিত করবে।৩৩৬
قواریر অর্থ হল কাঁচ, কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে সকল পাত্রের মৌল উপাদান হিসাবে রৌপ্যের কথা উল্লেখ করলেন। তাহলে বুঝা যায়, তা রৌপ্য দ্বারা নির্মিত হবে, তবে কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ হবে। সে সব বস্তু সুন্দর ও শোভনীয় হবে।
মুজাহিদ রহ. কাতাদাহ রহ. মুকাতিল রহ. কালবী ও কা'বী রহ. সহ সকল মুফাসসির বলেন, জান্নাতের কাঁচ হবে রৌপ্যের। সুতরাং সে পাত্রে রৌপ্য ও কাঁচ উভয়টার স্বচ্ছতার সমাবেশ ঘটবে।
ইবনে কুতাইবা রহ. বলেন, জান্নাতের নদী, খাট, বিছানা, পানপাত্র ও অন্যান্য সকল বস্তুই দুনিয়ার মানুষের তৈরী বস্তু হতে ভিন্নতর হবে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতে যে সকল বস্তু রয়েছে, দুনিয়াতে সে সকল বস্তুর সাথে নামের সাদৃশ ব্যতীত অন্য কিছুই নেই। (অর্থাৎ জান্নাতের বস্তু ও দুনিয়ার বস্তুর মধ্যে একমাত্র নামের সাদৃশ্যই রয়েছে। এ ছাড়া স্বাদ, আকৃতি-প্রকৃতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন।)
দুনিয়ার পানপাত্র কখনো রৌপ্য দ্বারা নির্মিত করা হয়, কখনো কাঁচ দ্বারা তৈরী করা হয়; কিন্তু জান্নাতের পানপাত্র শুভ্রতার ক্ষেত্রে হবে রৌপ্যের ন্যায় আর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে হবে কাঁচের ন্যায়। এখানে কাঁচকে রূপার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ ধরনের হবে যেন তা রৌপ্য নির্মিত।
আল্লাহ তাআলার এ বাণীর ন্যায় كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল অর্থাৎ জান্নাতের নারীরা রং ও রূপে পদ্মরাগের মত আর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে প্রবালের ন্যায়।
কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলতে পারে, কাঁচ ও রূপা ভিন্ন ভিন্ন দু'টি ধাতু হওয়া সত্ত্বেও একই বস্তু রূপা ও কাঁচ কিভাবে হতে পারে? আমাদের পূর্বের আলোচনার আলোকে এ প্রশ্ন থাকতে পারে না। (অর্থাৎ দুনিয়াতে যদিও এগুলো দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধাতু; কিন্তু জান্নাতে এরূপ নয়।)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا ١٠ تَقْدِير অর্থ হল, কোন বস্তু নির্ধারিত পরিমাণে তৈরী করা। সুতরাং সে সকল পাত্র একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে তৈরী করা হবে, যা অপেক্ষাকৃত বড়ও হবে না, ছোটও হবে না। পানকারীদের পানে তা স্বাদ বৃদ্ধি করবে। কেননা, যদি পানীয় তৃষ্ণা অপেক্ষা কম হয়ে থাকে, তবে স্বাদানুভূতি পূর্ণ হয় না আর যদি পানীয় তৃষ্ণা অপেক্ষা অধিক হয়, তৃষ্ণা নিবারণের পরও যদি বাকী থাকে তবে তা বিরক্তিকর। মুফাস্সিরীনে কিরামের এক জামাত এ মতামত পেশ করেন।
ইমাম ফাররা রহ. বলেন, প্রত্যেক পানকারীর তৃষ্ণার পরিমাপে পানপাত্র তৈরী করা হবে। তার পানীয় পানকারীর তৃষ্ণা অপেক্ষা কমও থাকবে না, বেশিও থাকবে না; বরং পরিমাণ মত থাকবে।
আবু উবায়দ রহ. বলেন, পানীয় পরিবেশনকারী পানকারীর তৃষ্ণা পরিমাণ পানীয়ই পাত্রে ঢালবে। এ অবস্থায় যমীর তথা সর্বনাম ফেরেশতা বা খাদেমদের দিকে ফিরবে। যারা জান্নাতীদের খিদমতে নিয়োজিত থাকবে। তারা সে পরিমাণই পানীয় পানপাত্রে ঢালবে যে পরিমাণে পানকারী পরিতৃপ্ত হয়। এর চেয়ে কমও ঢালবে না, বেশিও ঢালবে না।
মুফাসসিরগণের এক জামাত বলেন, يسقون এর মধ্যাবস্থিত যমীর তথা সর্বনামটি পানকারীদের দিকে ফিরবে। অর্থাৎ পানকারীদের অন্তরে একটা পরিমাণ নির্ধারিত থাকবে। সে পরিমাণই তাদেরকে প্রদান করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে জমহুরে মুফাসসিরীনের মতটি অধিক নির্ভরযোগ্য ও পসন্দনীয়। والله اعلم
کاس এর ব্যাপারে হযরত আবূ উবাইদ রহ. বলেন, كأس হল পানীয়তে পূর্ণ পানপাত্র। আবূ ইসহাক রহ. অনুরূপ মত পেশ করেছেন। কোন কোন মুফাসসির كأس এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, كأس হল সুরা।
হযরত আতা রহ. হযরত কালবী ও মুকাতিল রহ. প্রমুখের মতও এটিই। এমনকি যাহ্হাক রহ. বলেন, কুরআনের মধ্যে যে স্থানেই كأس শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেখানেই 'সূরা' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য, ইঙ্গিত সব কিছু বিবেচনা করেই তাঁরা এ অর্থ বর্ণনা করেছেন। কেননা, এখানে শুধু পাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং পানীয়সহ পানপাত্র উদ্দেশ্য।
সহীহায়নে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, جنتان من ذهب آنيتهما وما فيهما উভয় জান্নাত হবে স্বর্ণের এবং তার পাত্র ও তার মধ্যাবস্থিত সকল কিছুই হবে স্বর্ণের।৩৩৭ জান্নাতে আদনের অধিবাসী ও তাঁদের প্রভুর মাঝে শুধু মাত্র আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের আড় ব্যতীত অন্য কোনো কিছু থাকবে না।
সহীহায়নে৩৩৮ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أول زمرة يدخلون الجنة على صورة القمر ليلة البدر সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মুখমণ্ডল হবে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। والذين يلونهم على أشد كوكب دري في السماء তাদের পরে যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তাদের মুখমণ্ডল আকাশের তারকারাজি হতেও অধিক উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। لايبولون ولا يتغوطون ولا يمتخطون ولا يتقلون সেখানে তারা প্রস্রাব-পায়খানা করবে না, শ্লেষ্মা ফেলবে না, থুথু ফেলবে না। امشاطهم الذهب তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের। ورشحهم المسك তাদের ঘাম হবে কস্তুরির ন্যায় সুরভিত। ومجامرهم الالوة তাদের ধোঁয়া হবে আগরবাতির খড়ি হতে وازواجهم الحور العين তাদের স্ত্রী হবে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা রমণীকুল। اخلاقهم على خلق رجل وأحد তাদের স্বভাব-চরিত্র একই ব্যক্তির ন্যায় হবে। যেন ভিন্ন ব্যক্তি নয় বরং على صورة ابيه آدم ستون ذراعا في السماء সেখানে তারা সকলে তাদের আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর আকৃতির হবে। সকলের উচ্চতা হবে ষাট হাত।
সহীহায়নে৩৩৯ হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا تشربوا في آنية الذهب والفضة ولا تأكلوا في صحافهما তোমরা স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে ও পেয়ালায় পানি পান করো না। فإن لهم في الدنيا ولكم في الآخرة কেননা, দুনিয়াতে তা হল কাফিরদের জন্য আর তোমাদের জন্য হল আখিরাতে।
আবূ ইয়ালা মূসিলী রহ. তাঁর মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্ন দেখাকে ভাল মনে করতেন, তাই কখনো কেউ স্বপ্ন দেখলে তাঁর নিকট সে সম্পর্কে জানতে চাইত। যদি সে নিজে সে ব্যাপারে না জানত। যদি তিনি স্বপ্নের প্রেক্ষিতে তার প্রশংসা করতেন, তবে সে তার স্বপ্নের ব্যাপারে আনন্দিত হতো। একবার এক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি মদীনায় এলে আমাকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়া হল। অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করানো হল। এরপর কম্পনের ফলে কোন কিছু পতনের শব্দ শুনলাম, যাতে জান্নাতের দরজা খুলে গেল। তখন আমি অমুক অমুক ব্যক্তিকে দেখেছি। এভাবে সে ১২ জনের নাম বলল। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের জন্য একটি সৈন্য দল পাঠিয়েছিলেন। সে মহিলা তার স্বপ্ন বর্ণনায় বলল, অতঃপর তাদেরকে আনা হল, তাদের পোশাক ধুলিমলিন ছিল এবং তাদের শিরা হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন বলা হল, তাদেরকে বাইদাখ অথবা বাইদাজ নহরে নিয়ে যাও এবং সেখানে ডুব দিতে বল। সে নহরে ডুব দেওয়ার পর তাদেরকে আনা হল, তখন তাদের দেখা গেল, তাদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাতের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। এরপর তাদের নিকট স্বর্ণের রেকাবী আনা হল, যাতে উন্নতমানের খেজুর ছিল। তারা তা হতে খেজুর খেল। সে রেকাবী তাদের সামনেই ছিল। তারা যে ফল ইচ্ছা তা হতে সে ফলই খেতে লাগল। আমি তাদের সাথে খেলাম। ইত্যবসরে সেই সৈন্য দলের আগমনের সু-সংবাদদাতা এসে বলতে লাগল, অমুক অমুক শহীদ হয়ে গেছে, সে ঐ মহিলার স্বপ্নে দেখা ১২ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে ডেকে পুনরায় তার স্বপ্নের বিবরণ দিতে বললেন। মহিলা সেই বার ব্যক্তির নামই উল্লেখ করল, সংবাদদাতা এসে যে বার ব্যক্তির শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছিল।
টিকাঃ
৩৩৫. সূর. ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৭-১৮
৩৩৬. সূরা দাহর, আয়াত: ১৫-১৬
৩৩৭. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৭২৪, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০০
৩০২. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৪৬০, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৯
৩৩৯. বুখারী, খ. ২ পৃ. ১৮৯
📄 জান্নাতীদের পোশাক পরিচ্ছদ ও আসবাবপত্র
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينِ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُون يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। (জান্নাতে কেউ কারো পশ্চাতে থাকবে না)৩৪০
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا أُولَئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكَ যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, আমিতো তার শ্রমফল নষ্ট করি না, যে উত্তমরূপে কার্য সম্পাদন করে। তাদেরই জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ কংকণে অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের সবুজ বস্ত্র ও সেখানে সমাসীন হবে সুসজ্জিত আসনে৩৪১।
একদল মুফাস্সির বলেন, সূক্ষ্ম রেশমী বস্ত্রকে سندس বলা হয় আর পুরু রেশমী বস্ত্রকে استبرق বলা হয়।
অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, استبرق দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মোটা বস্ত্র। সর্বাপেক্ষা সুন্দর রং হল সবুজ আর সর্বাপেক্ষা কোমল পোশাক হল রেশমী পোশাক। আল্লাহ তাআলা তাদের পোষাকে উভয় বিষয়ের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। যেন দেখতে সুন্দর হওয়ার ফলে তা দেখে আঁখি সুখানুভূতি লাভ করতে পারে আর তার কোমলতার ফলে শরীরও আরাম লাভ করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ আর তাদের পোশাক পরিচ্ছদ হবে রেশমের৩৪২।
উক্ত আয়াতে সুস্পষ্ট বর্ণিত আছে, জান্নাতীদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, مَنْ لَبِسَ الحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَةِ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী পোশাক পরিধান করবে, সে আখিরাতে তা পরিধান করতে পারবে না।
উক্ত হাদীসটি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ও হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত। উক্ত হাদীসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিস ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তবে তার উদ্দেশ্য নির্ধারণে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণের মধ্যে একদল মুফাস্সির বলেন, (দুনিয়াতে যারা রেশমী পোশাক পরিধান করেছে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করলেও) জান্নাতে তাদের পোশাক রেশমী বস্ত্রের হবে না; বরং অন্য কোন ধরনের হবে। তাঁরা বলেন, আল্লাহ তাআলার বাণী وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ যদিও ব্যাপকার্থে, কিন্তু তার মধ্য হতে কিছু সংখ্যককে বিশেষিত করা হয়েছে। (অর্থাৎ সাধারণত জান্নাতীদের পোশাক হবে রেশমী বস্ত্র; কিন্তু কিছু লোকের পোশাক রেশমী বস্ত্রের হবে না।)
জমহুরে উলামায়ে কিরাম বলেন, হাদীসে রেশমী বস্ত্র পরিধানের যে ধমকি রয়েছে, তার নযীর কুরআন ও হাদীসে রয়েছে, যা এ কথা বুঝায়, রেশমী পোশাক পরিধান করলে অবশ্যই তার উপর উক্ত হুকুম আরোপিত হবে। তবে হ্যাঁ, কোন প্রতিবন্ধকতার কারণে সে হুকুম আরোপিত নাও হতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী বস্ত্র পরিধান করল, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তাওবা করল, তাহলে দুনিয়াতে রেশমী কাপড় তো সে পরিধান করল কিন্তু তাওবা করার ফলে শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। যেমনিভাবে কোন কোন নেক আমল রয়েছে, যা গুনাহকে মিটিয়ে দেয় এবং মুসলমানদের দু'আ ও যাকে আল্লাহ তাআলা সুপারিশের অনুমতি প্রদান করেছেন, তার সুপারিশের ফলে এবং মহান দয়ালু আল্লাহ তাআলা নিজেই কোন কোন পাপীদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। (যেমন হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে, নবীদেরকে, সৎকর্মশীলদেরকে ও সাধারণ মু'মিনদেরকে সুপারিশের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলেই স্ব-স্ব স্তরের জাহান্নামের মু'মিনদেরকে সুপারিশের মাধ্যমে জাহান্নام হতে বের করে আনবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, এখন আমার পালা, তখন আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হতে এমন লোকদেরকে বের করবেন, যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান রয়েছে।) তাওবা করার ফলে এ কাজ (রেশমী বস্ত্র পরিধান) করলেও তার উক্ত হুকুম (জান্নাতে রেশমী বস্ত্র পরিধান করতে না পারা) আরোপিত হবে না।
উক্ত হাদীসটি এ হাদীসেরই সমর্থক। যাতে রয়েছে من يشرب في الدنيا لم يشرب بها في الآخرة যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, আখেরাতে সুরা পান করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র৩৪৩।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُنْدُsٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَق তাদের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্থূল রেশম৩৪৪।
উক্ত আয়াতে عَلَهُمْ এর মধ্যে একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়, তা তাদের মূল পোশাক নয়, বরং তা হবে মূল পোশাকের উপরে শোভা বর্ধনকারী পোশাক।
মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, যে সকল কিশোর জান্নাতীদের জন্য খাবার সহ অন্যান্য বস্তু পরিবেশন করবে, তারাও সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমী বস্ত্র পরিধান করবে।
কেউ কেউ বলেন, যাদের নিকট কিশোররা খাবার এবং অন্যান্য বস্তু পরিবেশন করবে, তাদের পোশাক হবে রেশমী বস্ত্রের।
আয়াতে গবেষণা করলে বুঝা যায়, আল্লাহ তাআলা কিভাবে পোশাক ও অলংকার দ্বারা তাদের দু'ধরনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। যা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পবিত্র সুরার মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রদান করা হয়েছে। তাদের কব্জিকে কঙ্কণ দ্বারা শোভিত করেছেন আর দেহকে রেশমী বস্ত্র দ্বারা সুশোভিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارِ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ
যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা এবং সেখানে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ হবে রেশমের৩৪৫।
এ আয়াত দ্বারা দু'টি বিষয় বুঝা যায়, তা হল, তাদের স্বর্ণের কঙ্কণ থাকবে এবং মুক্তারও ভিন্ন কঙ্কণ থাকবে। এও হতে পারে, এমন কঙ্কণ হবে, যা স্বর্ণ এবং মুক্তার যুগলে তৈরী।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা মানব সৃষ্টিলগ্ন হতেই জান্নাতীদের জন্য স্বর্ণের কঙ্কণ তৈরীর কাজে একজন ফিরিশতা নিয়োগ করেছেন, যে কিয়ামত পর্যন্ত এ কাজে লিপ্ত থাকবে। لوان قلبا من حلي أهل الجنة اخرج لذهب بضوء شعاع الشمس জান্নাতীদের জন্য তৈরীকৃত একটি মাত্র কঙ্কণ দুনিয়াতে আনা হত, তবে তার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের কিরণকে নিষ্প্রভ করে দিত। ولا تسئلوا عن حلي أهل الجنة بعد هذا জান্নাতীদের অলংকার সম্পর্কে আর জানতে চেয়ো না।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, জান্নাতে মহিলাদের অলংকার অপেক্ষা পুরুষদের অলংকার অধিক সুন্দর হবে।
হযরত সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি জান্নাতীদের কেউ উঁকি মেরে দুনিয়া দেখত আর তাতে তার পরিহিত কঙ্কণের কিছু অংশ দুনিয়াতে প্রকাশ পেত, তবে তা সূর্যের কিরণকে নিষ্প্রভ করে দিত। যেমনিভাবে সূর্যোদয়ের কারণে নক্ষত্ররাজির আলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ উমামাহ রা. তাকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতীদের অলংকার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, مسورون بالذهب والفضة অর্থাৎ তাদের স্বর্ণ-রৌপ্যের কঙ্কণ পরিধান করানো হবে। مكللون بالدر عليهم أكاليل من در وياقوت متواصلة তাদের মাথায় ধারাবাহিকভাবে মুক্তা ও পদ্মরাগ মনি দ্বারা সুজ্জিত মুকুট থাকবে।
شباب جرد مرد مكحلون وعليهم تاج كتاج الملكوت তারা হবে পশমবিহীন কালো আঁখি বিশিষ্ট যুবক। (জান্নাতে পৌঁছার সাথে সাথে তাদেরকে যুবকে রূপান্তরিত করা হবে। তাদের শরীরে কোন লোম থাকবে না, তাদের চোখ এমন হবে, যেন এখনই কেবল সুরমা ব্যবহার করেছে)।
সহীহায়নে হযরত আবূ হাযিম রহ. হতে বর্ণিত আছে। এখানে ইমাম মুসলিম রহ.-এর শব্দ বর্ণনা করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, كنت خلف أبي هريرة وهو يتوضأ للصلوة আমি হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর পেছনে ছিলাম, যখন তিনি ওযু করছিলেন। كان يمد يده حتى يبلغ إبطه তিনি ওযুতে হাত ধুতে ধুতে তার বগল পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন। فقال : يا بنی فروخ أنتم ههنا তিনি বললেন, হে ফরুখের বংশধর! তুমি এখানে আছ?
لو علمت انكم ههنا ما توضأت هذا الوضوء যদি আমি জানতাম, তুমি এখানে আছ, তাহলে আমি এমন অযু করতাম না। سمعت خليلي صلى الله عليه وسلم আমি আমার প্রিয় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, تبلغ الحلية من المؤمن حيث يبلغ الوضوء মু'মিন ব্যক্তির যে পর্যন্ত ওযুর পানি লাগে, তাকে জান্নাতে সে পর্যন্ত অলংকার পরিধান করানো হবে। (তাই আমি এত অধিক পরিমাণ ধৌত করেছি।)
হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর আমলের আলোকেই কেউ কেউ বগল পর্যন্ত হাত ধৌত করাকে মুস্তাহাব বলে মত পোষণ করেছেন। তবে বিশুদ্ধতম মত হল, এটা মুস্তাহাব নয়। মদীনাবাসীদের মত তা-ই।
এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ রহ. হতে দু'টি মত রয়েছে। তবে হাদীস দ্বারা ধৌত করাকে দীর্ঘায়িত করা বুঝায় না। কেননা, অলংকার পরানো হবে কজিতে, বাহুতে নয়। فمن استطاع منكم ان يطيل غرته فليفعل )অর্থাৎ যে বগলের শুভ্রতা পর্যন্ত ধৌত করতে সক্ষম, সে যেন তা করে) এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী নয়, হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর উক্তি।
এ বাক্যটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর অন্তর্ভুক্ত নয়; কেননা, غرة হাতে হতে পারে না। (কেননা غرة অর্থ হল, মুখ মণ্ডলের উজ্জ্বল্যতা) বরং তা মুখমণ্ডলের মধ্যেই হতে পারে আর মুখমণ্ডল ধৌত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত হতে পারে না; কেননা, মুখমণ্ডলের উপর থেকেই মাথার শুরু ভাগ আর থুতনীর নীচ হতেই শুরু হয় ঘাড়। সুতরাং তাকে غرة বলা যায় না।)
সহীহ মুসলিমে৩৪৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من يدخل الجنة ينعم ولا يباس যে জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সর্বদা প্রাচুর্যের মধ্যে থাকবে, কখনো দুর্দশাগ্রস্ত এবং বিরক্ত হবে না। لا تبلی ثیابه তার পোশাক পুরাতন হবে না। ولا يفنى شبابতার তারুণ্য ও যৌবনের কখনো অবসান ঘটবে না। في الجنة مالا عين رأت ولا أذن سمعت ولا خطر على قلب بشر জান্নাতে এমন বস্তু রয়েছে, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ন শ্রবণ করেনি, এমনকি কোন মানব হৃদয়ে যার কোন চিন্তাও উদিত হয়নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী لا تبلى ثيابه দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য, বিশেষ এক ধরনের পোশাক, যেখানে কখনো পুরানত্ব আসবে না। অথবা উদ্দেশ্য হল নতুন পোশাকের ধারাবাহিকতা সব সময় বজায় থাকবে। এক পোশাক পুরাতন হওয়া মাত্রই নতুন পোশাক চলে আসবে। যেমনটি আমরা জান্নাতের ফলের ক্ষেত্রে দেখেছি। এক ফল আহরিত হওয়া মাত্রই তদস্থলে নতুন ফল গজিয়ে উঠবে।
হযরত ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণনা করেন, جاء أعربي جرمي জারাম এলাকার একজন গ্রাম্য লোক এসে বলল, فقال : يا رسول الله اخبرني عن الهجرة ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে হিজরত সম্পর্কে বলুন | أينما كنت أم لقوم خاص আপনি যেখানে থাকেন, সেখানে যাওয়াকে হিজরত বলে, নাকি কোন বিশেষ গোত্রে (যাদের মধ্যে আপনি অবস্থান গ্রহণ করেন) চলে যাওয়াকে হিজরত বলে। أم إلى أرض معلومة নাকি নির্দিষ্ট এলাকায় চলে যাওয়াকে হিজরত বলে। اذا مت انقطعت আপনার পৃথিবী হতে ইন্তিকালের পর কি তার সমাপ্তি ঘটবে? সে ব্যক্তি এরূপ তিনবার বলে বসে পড়ল । فسكت رسول الله صلى الله عليه وسلم يسيرا ثم রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সময় চুপ থেকে বললেন, কোথায় সে প্রশ্নকারী? قال : أين السائل বলা হল, সে এখানে। فقال ها هوذا يارسول الله !
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, قال : الهجرة أن تهجر الفواحش ماظهر منها وما بطن হিজরত হল, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার অশ্লীলতা ত্যাগ করা وتؤتى الزكوة وتقيم الصلوة এবং নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করার নামই হল হিজরত। ثم أنت مهاجر وان مت بالحضرا উল্লিখিত কাজগুলো সম্পাদন করতে পারলে ঘরে মৃত্যুবরণ করলেও তুমি মুহাজির বলে গণ্য হবে।
فقال آخر يارسول الله اخبرني عن ثياب أهل الجنة : অতঃপর অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জান্নাতীদের পোশাক সম্পর্কে বলুন। اتخلق خلقا ام اتنسج نسجا তা কি এমনি এমনিই সৃষ্টি হবে নাকি তা বুনন করতে হবে? قال : ضحك بعض القوم বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে কেউ কেউ হেসে ফেলল। فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : تضحكون ممن جاهل يسئل عالما রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এক বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট এক অজ্ঞ ব্যক্তির প্রশ্ন শুনে হাসছ? فسكت النبي صلى الله عليه وسلم ساعة ثم قال : أين السائل عن ثياب أهل الجنة؟ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষণকাল চুপ থেকে বললেন, জান্নাতীদের পোশাক সম্পর্কে প্রশ্নকারী ব্যক্তি কোথায়? ها هو ذا يارسول الله জনৈক ব্যক্তি বলল, সে এখানেই, ইয়া রাসূলাল্লাহ! قال : لا، بل يشقق عنها ثمر الجنة রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, (তা বুনে বানানো হবে না) বরং তার জন্য জান্নাতের ফল পাড়া হবে। (সে ফল হতেই তা তৈরী হবে) ثلاث مرات রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার উক্ত বাণী উচ্চারণ করলেন।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে স্বীয় মু'জামে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أول زمرة يدخلون الجنة كأن وجوههم ضوء القمر ليلة البدر সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মুখমণ্ডল পুর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। والزمرة الثانية على لون أحسن كوكب دري في السماء দ্বিতীয় দলের সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য নক্ষত্ররাজি অপেক্ষা অধিক দীপ্তিময় হবে। لكل واحد منهم زوجتان من الحور العين তাদের প্রত্যেকের ভাগে ডাগর ডাগর আঁখি বিশিষ্ট হুর থাকবে। দু'জন করে স্ত্রী থাকবে। (এ হল সর্বনিম্ন সংখ্যা ( على كل زوجة سبعون حلة يرى مخ سوقها من وراء لحومها।প্রত্যেক স্ত্রীর সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। (خومهما و وراء لحومهما وحللهما তাদের রূপলাবণ্য ও কমনীয়তা এ পর্যায়ের থাকবে, সত্তর জোড়া পোশাকসহ গোশতের ভেতর হতেও তাদের পায়ের গোছার মজ্জা দেখা যাবে। كما يرى الشراب الأحمر في الزجاجة البيضاء যেমনিভাবে সাদা কাচের পাত্রে লাল সুরা দেখা যায়।
জান্নাতের এক বিঘত পরিমাণ জায়গা এই দুনিয়াসহ আরেক দুনিয়া লাভ করা হতেও অনেক উত্তম। তদ্রূপ জান্নাতের এক ধনুক সমান জায়গা দুই দুনিয়া লাভ করা হতেও উত্তম। জান্নাতী রমনীর একটি মাত্র ওড়না এরকম দুই দুনিয়ার মালিক হওয়া অপেক্ষা অনেক উত্তম। তার মধ্যকার সকল বস্তু তার সমান আরো কয়েক দুনিয়া লাভ করা হতেও উত্তম।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! نصيف কি? قال : الخمار তিনি বললেন, نصيف হল ওড়না।
ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতী ব্যক্তি একবার পার্শ্ব পরিবর্তনের পূর্বেই সত্তর বছর হেলান দিয়ে থাকবে। অতঃপর তার স্ত্রী এসে তার স্কন্ধে স্পর্শ করবে। তখন সে স্ত্রীর গণ্ডদেশে আপন মুখমণ্ডল আরশী হতেও পরিষ্কার দেখতে পাবে। তার শরীরে যে মুক্তা শোভা পাবে, তাতে সর্বনিন্ম মানেরটি এমন হবে যে, পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত তার আলোতে উদ্ভাসিত হবে। তখন সে রমণী তাকে সালাম করবে। সে উত্তর দিয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তুমি কে? রমণী বলবে, আমি তোমার অতিরিক্ত প্রাপ্য। ঐ রমণীর শরীরে সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। সে ব্যক্তি তখন ঐ রমনীর দিকে তাকাবে, যাতে সে রমনীর সত্তর জোড়া পোশাকের অভ্যন্তর হতেও তার পায়ের গোড়ালির মজ্জা দেখতে পাবে। সে মহিলার মাথায় মুকুট থাকবে। তার সর্বনিম্ন মানের মুক্তা এত উজ্জ্বল হবে যে, পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত তার আলোতে উদ্ভাসিত হবে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাকে তৃবার (স্বর্গোদ্যানের গাছ, যার ফল অত্যন্ত মধুর হবে) নিকট নিয়ে যাওয়া হবে। সেই তুবার ফুলের আবরণ প্রস্ফুটিত হবে। সে সেখান হতে লাল, সাদা, সবুজ, হলুদ, কালো, যে কোন রংয়ের ফুল নিবে। সে ফুল গুলো এন্যুমুন ফুলের মত হবে বা আরো কোমল ও আরো সুন্দর হবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত খালিদ আয-যামীল হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞাসা করেছি, ماحلل الجنة؟ জান্নাতীদের পোশাক কোন কাপড় দ্বারা তৈরী হবে? উত্তরে তিনি বলেন, فيها شجرة فيها ثمرة كانه الرمان জান্নাতে এমন একটি গাছ রয়েছে, যার ফল আনারের ন্যায়। আল্লাহ তাআলার প্রিয় বন্ধু (জান্নাতী ব্যক্তি) যখন পোশাক চাইবে, তখন সে গাছ তার ডাল নুইয়ে দেবে ও বিদীর্ণ হয়ে যাবে, তখন তা হতে বিভিন্ন রংয়ের সত্তর জোড়া পোশাক বেরিয়ে আসবে। অতঃপর গাছটি পূর্বের ন্যায় হয়ে যাবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তৃবা তার জন্য, যে আপনার দর্শন লাভ করেছেন ও আপনার প্রতি ঈমান এনেছে। فقال طوبى لمن راني وآمن بي নবীজী বললেন, তৃবা তার জন্য, যে আমাকে দেখেছে এবং আমার প্রতি ঈমান এনেছে। وطوبى ثم طوبى ثم طوبى لمن امن بي ولم يرنى তুবা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমাকে না দেখেও আমার প্রতি ঈমান এনেছে ! فقال له رجل : وما طوبى؟ তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, তুবা (طوبی) কি? قال : شجرة في الجنة مسيرة مأة عام বললেন, তুবা হল জান্নাতের একটি গাছ। যার ছায়া শত বছরের দূরত্ব পরিমাণ দীর্ঘ হবে। ثياب أهل الجنة تخرج من كمامها তার মুকুল হতে জান্নাতীদের পোশাক বের হবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, فيها شجرة دار المؤمن في الجنة لؤلؤة تنبت الحلل জান্নাতে একটি গাছ রয়েছে, যা হতে কাপড় উৎপন্ন হবে। فيأخذ الرجل باصبعيه واشار بالسبابة والا بهام মু'মিন ব্যক্তি তা থেকে দুই আঙ্গুল দিয়ে নিতে থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলীর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। (অর্থাৎ এ দু'আঙ্গুল দ্বারা নিবে( سبعين حلة متمنطقة باللؤلؤ والمرجان প্রবাল ও মুক্ত দানা সমৃদ্ধ সত্তর জোড়া পোশাক নিবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, لو ان ثوبا من ثياب أهل الجنة لبس اليوم في الدنيا لصعق من ينظر اليه যদি জান্নাতীদের পোশাক পরিধান করে কেউ দুনিয়াতে আগমন করে, তাহলে যে ব্যক্তি তাকে দেখবে, সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলবে, ও তার চোখের দৃষ্টি শক্তিলোপ পাবে। وما حملته أبصارهم
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে বাশীর ইবনে কা'ব সহ অন্য শাইখ হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতীরা যে স্ত্রী লাভ করবে, তাদের প্রত্যেকের শরীরে সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। সে স্ত্রী পৃথিবীর ফুল হতে অধিক কোমল ও কমনীয় হবে। তাদের গোশতের অভ্যন্তর হতে তাদের পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।
সহীহায়নে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার দুমাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একটি রেশমী জুব্বাহ উপহার দিল, লোকজন তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়াভিভূত হল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, مناديل سعد في الجنة أحسن من هذا হযরত সা'দ রা. জান্নাতে যে রুমাল লাভ করেছে, তা এর চেয়ে অধিক সুন্দর।
সহীহায়নে৩৪৭ হযরত বারা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একবার একটি রেশমী জুব্বাহ উপহার দেয়া হয়েছিল, লোকজন তার কোমলতা দেখে বিস্ময়াভিভূত হল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করেছ? সা'দ ইবনে মুআ'য জান্নাতে যে রুমাল লাভ করেছে, তা এর চেয়েও অধিক সুন্দর।
এখানে বিশেষভাবে হযরত সা'দ ইবনে মুআ'য রা.-এর কথা উল্লেখ করার বিষয়টি অস্পষ্ট নয়। কেননা, মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর যে মর্যাদা, আনসারদের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে মুআ'য রা.-এর ঠিক সেই মর্যাদা। যাঁর মৃত্যুতে আল্লাহ তাআলার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আল্লাহ তাআলার জন্য তিনি কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে মোটেও পরোয়া করতেন না। আল্লাহ তাআলা শাহাদাতের সুধা পান করিয়েই তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটালেন। তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টিকে স্ব-জাতি, স্বীয় গোত্র ও বন্ধু-বান্ধবদের সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দিতেন। তিনি (ইহুদীদের ব্যাপারে) ঠিক সেই ফায়সালাই দিয়েছেলেন; সপ্তাকাশের উপর আল্লাহ তাআলা যে ফায়সালা দিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর শরীর পরিষ্কার করার জন্য জান্নাতে বাদশাহদের রুমাল হতেও সুন্দর রুমাল পাওয়ার অধিক যোগ্য।
জান্নাতীদের শাহী মুকুট
জান্নাতীদের পোশাকের মধ্যে মুকুটও থাকবে।
ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রহ. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من قرأ القرآن فقام به آناء الليل والنهار ويحل حلاله ويحرم حرامه خلطه الله بلحمه ودمه যে কুরআন পড়ল এবং দিবা-রাতের উভয় প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করল (অর্থাৎ তেলাওয়াত ও নফল নামাযে তা তেলাওয়াতে লিপ্ত থাকল) এবং তার হালালকে হালাল মনে করল ও হারামকে হারাম মনে করল, আল্লাহ তাআলা তার রক্ত মাংসের সাথে তাকে (কুরআন) সংযুক্ত করে দিবেন। وجعله رفيق السفرة الكرام البردة তাকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান ফেরেশতাদের সঙ্গী বানিয়ে দিবেন। واذا كان يوم القيامة كان القرآن له حجيجا আর কিয়ামত দিবসে কুরআন তার পক্ষাবলম্বনকারী হবে। (অর্থাৎ তার পক্ষে সাফাইকারী ওকীল হবে)। فقال : يارب كل عامل يعمل في الدنيا يأخذ بعمله من الدنيا الا فلانا كان يقوم في (به) آناء الليل واطراف النهار কুরআন বলবে, হে পরওয়ারদেগার! প্রত্যেক আমলকারীই দুনিয়াতে তার নিজ আমলের বিনিময় গ্রহণ করেছে, কিন্তু অমুক ব্যক্তি (কুরআন তিলাওয়াতকারী) কোন বিনিময় গ্রহণ করেনি; বরং দিবা-রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকত, (অর্থাৎ তিলাওয়াত করত নফল নামাযে)। فيحل حلالي ويحوم حرامي সে আমার মধ্যে হালালকৃত বস্তুকে হালাল মনে করত আর আমার মধ্যে হারামকৃত বস্তুকে হারাম মনে করত। يقول يارب فا عطه কুরআন বলবে, হে প্রভু! তাঁকে দান করুন। فيتوجه الله تاج الملك ويكسوه من حلة الكرامة ثم يقول هل رضيت তখন আল্লাহ তাআলা তাকে শাহী মুকুট ও সম্মানিত ব্যক্তিদের বস্ত্র জোড়া পরাবেন এবং বলবেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট? فيقول يارب أرغب له في أفضل من هذا؟ কুরআন বলবে, হে আমার প্রভু! আমি তো তার জন্য এর চেয়ে উত্তম বস্তু পসন্দ করি। فيعطيه الله الملك بيمينه والخلد بشماله তখন আল্লাহ তাআলা তার ডান হাতে রাজত্ব ও বাম হাতে জান্নাতুল খুলদ প্রদান করবেন। ثم يقول : هل رضیت অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে কুরআন! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট? فيقول : نعم يارب কুরআন বলবে, হ্যাঁ, প্রভু! আমি এতে সন্তুষ্ট।
ইমাম বায়হাকী রহ. স্বীয় মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত বুরাইদা রা. হতে মারফু হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, تعلموا سورة البقرة، وتركها حسرة ولا تستطيعها البطلة فإن اخذها بركة,
তোমরা সূরা বাকারা শিক্ষা কর। কেননা, তা শিক্ষা করা বরকতপূর্ণ বিষয় আর শিক্ষা না করা দুঃখ ও লজ্জার বিষয়। কারণ বাতিল লোক তার ব্যাপারে সক্ষম নয়। (অর্থাৎ সঠিক ভাবে অর্জন করতে ও তার বরকত নষ্ট করতে সক্ষম নয়।) অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, সূরা বাকারা ও সূরা আল ইমরান শিক্ষা কর। কেননা, উভয়টি কিয়ামত দিবসে জ্যোতির্ময় হবে আর তার পাঠকারী ও আমলকারীদের উপর কিয়ামত দিবসে মেঘমালার ন্যায় ছায়া দিবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম غمامتان বলেছেন, অথবা غیایتان غمامة( অর্থ হল মেঘমালা আর غيية অর্থ হল প্রত্যেক ছায়া প্রদানকারী বস্তু( অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فرقان من طيرصواف সারিবদ্ধ পাখীর ডানাদ্বয়ের ছায়া প্রদান করবে।
কুরআন তার তিলাওয়াতকারীর সাথে কিয়ামত দিবসে তার কবর বিদীর্ণ হওয়ার স্থানে শীর্ণ ও কৃশকায় ব্যক্তির ন্যায় সাক্ষাত করবে। তাকে বলবে, তুমি কি আমাকে চিন? সে ব্যক্তি বলবে, আমি তোমাকে চিনি না। তখন কুরআন বলবে, আমি তো সেই, যে তোমাকে উত্তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত রেখেছে এবং রাতে তোমাকে জাগ্রত রেখেছে। সকল ব্যবসায়ী আপনার ব্যবসায় মুনাফার আশা পোষণ করে, তুমিও আজ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর ন্যায় আশা কর। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ডান হাতে রাজত্ব আর বাম হাতে জান্নাতুল খুলদ প্রদান করবেন। তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিধান করাবেন ও তার পিতা-মাতাকে এমন পোশাক পরিধান করাবেন, সমগ্র পৃথিবী সম্মিলিতভাবেও তার মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম হবে না। তখন কুরআনের হাফিযের পিতা-মাতা জিজ্ঞাসা করবে, আমাদেরকে এগুলো কেন পরানো হল? তখন তাদেরকে জবাব দেয়া হবে, তোমাদের সন্তানকে কুরআন শিখানোর কারণে তোমাদেরকে এগুলো পরানো হলো।
আল্লাহ তাআলা তখন কুরআনের হাফিয ব্যক্তিকে বলবেন, পড়তে থাক আর জান্নাতের উচু হতে উঁচু মর্যাদা লাভ করতে থাক, তখন সে হদর বা তারতীল যেভাবে দুনিয়াতে পড়ত, সেভাবে পড়তে থাকবে।
পূর্বোক্ত হাদীসে البطة শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তার অর্থ হল জাদুকর, আর غياية হল প্রত্যেক ঐ বস্তু, যা মানুষের উপর ছায়া প্রদান করে।
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَب মু'মিনগণ স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ কংকণে অলংকৃত করা হবে। ان عليهم التيجان وان أدنى لؤلؤة منها لتضيئ ما بين المشرق والمغرب তিনি বলেন, জান্নাতীদের মাথায় এমন মুকুট থাকবে, যার নিম্ন মানের মুক্তাই পূর্ব পশ্চিম দিগন্তকে আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলবে।
জান্নাতীদের শয্যা
متكنينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তর বিশিষ্ট ফরাশে৩৪৮।
আল্লাহ তাআলা তাদের বিছানার বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেছেন, তাদের বিছানা হবে পুরু আস্তর বিশিষ্ট রেশমের। এর দ্বারা দুটি বিষয় প্রতীয়মান হয়, বিছানার উপরের কাপড় অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের ও সৌন্দর্যময় হবে। কেননা, নীচের কাপড় তো অভ্যন্তরে থাকে আর উপরের কাপড় সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধি করে।
সুফিয়ান সাওরী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ হতে بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقِ এর তাফসীর বর্ণনা করেন, তোমাদেরকে তার অভ্যন্তর সম্পর্কে জানানো হয়েছে, তা কি পরিমাণ সুন্দর হবে?
দ্বিতীয় বিষয় হল তাদের সেই শয্যা বেশ পুরু হবে। উপর ও নিচের কাপড়দ্বয়ের মাঝে ফোলা ও ফাঁপা বস্তু থাকবে। এ ব্যাপারে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো দ্বারা বুঝা যায়, তাদের স্থান সুউচ্চ হবে। যেমন ইমাম তিরমিযী রহ.৩৪৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম وَفُرُشٍ مَرْفُوْعَةِ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবী সমান দূরত্ব বিশিষ্ট হবে। উভয়ের মাঝে পাঁচশত বৎসরের দূরত্ব রয়েছে। (অর্থাৎ তার নিচের অংশের তুলনায় উপরের অংশের মাঝে এ পরিমাণ দূরত্ব হবে, অতি তেজোদীপ্ত আরোহী তা পাঁচশত বৎসরে অতিক্রম করতে পারবে।)
কেউ কেউ বলেন, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের উঁচু মর্যাদা লাভ করা। আর বিছানাও তেমনিভাবে হবে, যে ব্যক্তি যে স্তরের হবে, সে ঐ অনুপাতে লাভ করবে। এ হাদীস রিশদীন ইবনে সা'দ নামক বর্ণনাকারীর সূত্রে বর্ণিত। তার সম্বন্ধে হাদীস বিশারদদের মন্তব্য হল। ইমাম দারা কুতনী রহ. বলেন, ليس بالقوي সে শক্তিশালী নয়। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, উক্ত বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন প্রকার যাচাই বাছাই করে না। তবে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে তার হাদীস গ্রহণ করতে কোন সমস্যা নেই।
ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন রহ. বলেন, ليس بشیئ সে গ্রহণ যোগ্য নয়। আবূ যুর'আহ রহ. বলেন, সে দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী। জাওযানী রহ. বলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই, রিশদীন ইবনে সা'द দুর্বল বর্ণনাকারী, তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল। তিনি একাকী বর্ণনা করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বাণী وَفُرْشِ مَرْفُوْعَة সম্পর্কে বলেছেন, দুই বিছানার মধ্যে আকাশ পৃথিবী সম দূরত্ব হবে। যদি এ হাদীসটি মাহফুয (ইলমে হাদীসের একটি পরিভাষা, শাব্দিক অর্থ সংরক্ষিত) হয়, তবে এটি একটি সুন্দর বিষয়। والله اعلم
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, وَفُرُش مَرْفُوْعَة এর ক্ষেত্রে প্রত্যেক দুই বিছানার মধ্যে চল্লিশ বছরের দূরত্ব হবে।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে وَفُرْشِ مَرْفُوْعَة সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যদি বিছানাকে উপর হতে নিক্ষেপ করা হয়, তবে তা মাটিতে পৌঁছতে একশত বৎসর লাগবে।
এ হাদীসটি মারফু হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি আছে, কেননা, ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূউমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি وَفُرْشِ مَرْفوعة এর ব্যাপারে বলেছেন, যদি তার উপরের অংশ পড়ে যায়, তবে তা চল্লিশ বছরেও নিচের অংশে পৌঁছুবে না।
জান্নাতীদের আসন
জান্নাতীদের পাটি ও গদির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مُتَّكِثِينَ عَلَى رَقْرَفِ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার উপরে।৩৫০
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, فِيهَاسُرُرٌ مَرْفُوعَةٌ وَأَكْوَابٌ مَوْضُوعَةٌ وَتَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَة সেখানে থাকবে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন শয্যা। প্রস্তুত থাকবে পানপাত্র, সারি সারি উপাধান ও বিছানো গালিচা।
হাশীম আবুল বাশারের সূত্রে হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. হতে বর্ণনা করেন। রফরফ (رفرف) জান্নাতের উদ্যানকে আর আবকরী (عبقري) উন্নত মানের গালিচাকে বলা হয়।
ইসমাঈল ইবনে উলাইয়াহ রহ. আবূ রাজা রহ.-এর সূত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী مُتَّكِثِينَ عَلَى رَقْرَفَ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٌّ حِسَانٍ সম্পর্কে বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল পাটি। তিনি বলেন, মদীনাবাসীগণও বলেন, এর দ্বারা পাটি উদ্দেশ্য।
ঘারিক এর ব্যাপারে ওয়াহিদী বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বালিশ তথা উপাধান। এর একবচন হল غرفة নূনে পেশ। ইমাম ফাররা নূনে যের পড়েছেন। এর সমর্থনে তিনি আবূ উবাইদের এ কবিতাটি পাঠ করেন, اذا ما بساط اللهو مد وقربت للذاته إنماطه و نمارقه
যখন খেলনার পাটি বিছানো হল, তার জন্য হাওদার মধ্যকার পশমী চাদর ও উপাধান নিকটবর্তী করা হল।
কালবী রহ. বলেন, وسائد مصفوفة و نمارق مصفوفة সামনা-সামনি সারি সারি উপাধান। মুকাতিল রহ. বলেন, ঐ বালিশগুলো সারি সারি পাটিতে সজ্জিত থাকবে।
ভাষাবিদগণ এক্ষেত্রে একমত, زرابي অর্থ পাটি। এর এক বচন হল زربية আর مبثوثة অর্থ منشورة مبسوطة বিছানো, ছড়ানো।
রফরফ (رفرف) দ্বারা উদ্দেশ্য
আয়াতে রফরফ শব্দটির ব্যাপারে লাইস রহ. বলেন, এটা সবুজ এক ধরনের বিছানার চাদর। তার একবচন হল رفرفة। আবূ উবাইদাহ রহ. বলেন, রফরফ পাটিকেই বলা হয়। এর সমর্থনে তিনি ইবনে মুকবিলের এ কবিতাটি পাঠ করেছেন,
♦ سواقط من اصناف ريط ورفرف وانالترالون تغشي نعالنا
'আমরা তো হলাম নির্বোধ চাষী, আমাদের জুতা তো বিভিন্ন প্রকার উন্নত চাদর ও পাটি মাড়ায়'।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, কেউ কেউ বলেন, এখানে রফরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের উদ্যানসমূহ। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বিছানার চাদর। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল অতিরিক্ত কাপড়, যেগুলো বিছানা হেফাযতের জন্য ব্যবহার করা হয়। মুবারক রহ. বলেন, বাদশা বা অভিজাত ব্যক্তিবর্গ যে অতিরিক্ত কাপড় ব্যবহার করে, তাকে রফরফ বলে। ওয়াহিদী বলেন, এ ব্যাখ্যাই অধিক উপযোগী। কেননা আরবগণ তাবুর মধ্যে ব্যবহৃত বস্ত্রখণ্ডকে রফরফ বলে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত সংক্রান্ত হাদীসে এ শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, فرفع الرفرف فرأينا وجهه كانه ورقة রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখমণ্ডল হতে রফরফ (যে কাপড় দ্বারা তাঁর মুখ ঢাকা হয়েছিল) উঠানো হলে আমরা তাঁর মুখমণ্ডল দেখতে পেলাম, যেন তা একটি রৌপ্যখণ্ড।
ইবনে আরাবী বলেন, এখানে রফরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিছানার প্রান্ত। এটি ঐ নিম্নের বস্তুর মত, যা পাটি হিফাযতের জন্য পাটির নিচে বিছানো হয়। তাকেই রফরফ বলা হয়।
গ্রন্থকার বলেন, রফরফ শব্দটির মূল অর্থ হল, কিনারা বা প্রান্ত। এ হিসাবে বলা হয়, الرفرف في الحائط দেয়ালের প্রান্ত। এ হিসাবে তাঁবুর প্রান্তের কাপড়কেও রফরফ বলা হয়। তাঁবুর প্রান্তকে, বর্শার প্রান্তকে রফরফ বলা হয়ে থাকে। এর একবচন হল, رفرف الطير। এর থেকেই رفرفة الطير। এটা তখন বলা হয়, যখন পাখি কোন বস্তুর উপর পতিত হওয়ার সময় তার আশ পাশে পাখা জাপটায়।
সবুজ বিছানার চাদরকেও রফরফ বলা হয়ে থাকে। এর একবচন হল, رفرفة-চাদরের ঐ অতিরিক্ত অংশ যাকে পুনরায় বিছানো হয় বা ঝুলিয়ে রাখা হয়, তাকে রফরফ বলা হয়ে থাকে।
হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি আল্লাহর বাণী رأى رفرفا أخضر سد 21 6 7 لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى . آلافق অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ রাতে সবুজ অনেক ডানা দোলায়িত হতে দেখেছেন। যার ফলে প্রান্ত আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। (অর্থাৎ তা এত বৃহদাকারের ছিল, যার ফলে প্রান্ত ঢেকে গেছে।)
عبقري দ্বারা উদ্দেশ্য
আয়াতে রয়েছে عبقري حسان এর ব্যাপারে আবূ উবাইদাহ রা. বলেছেন, যে বস্তু বিছানো হয়, তাকে عبقري বলা হয়। তিনি বলেন, আরবগণ সে যমীনকে عبقري বলেন, যাতে উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। লাইস বলেন, আবকারী সে তেপান্তর স্থানকে বলা হয়, যে স্থানে অধিক হারে জিন থাকে।
তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা হল, আবকারের প্রতি সম্বন্ধযুক্তকে عبقري বলা হয়। عبقري বলা হয়, যেখানে জিনরা বসবাস করে। অতঃপর প্রত্যেক উঁচু স্থানের প্রতি সম্বন্ধযুক্ত বস্তুর জন্য عبقري শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
আবুল হাসান আল ওয়াহেদী বলেন, عبقري এর ব্যাপারে এটিই বিশুদ্ধমত। কেননা, আরবগণ কোন বস্তুর ব্যাপারে অতিশয়োক্তি করতে গিয়ে তাকে জিন বা এ জাতীয় বস্তুর প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করে থাকে। এটা এ জন্য যে, তারা মনে করে জ্বিনের মধ্যে অনেক আজব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। জিন সকল কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম। সেহেতু কোন বস্তু সম্বন্ধে অতিশয়োক্তি করার জন্য সে দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে।
পাটি ও কাপড় ব্যতীতও অনেক বস্তু এমন রয়েছে, সেগুলোকে عبقري বলা হয়। যেমন হযরত উমর রা. এর প্রশংসায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবকারী শব্দ ব্যবহার করেছেন।
হযরত সালামাহ রা. হযরত ফাররা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মানুষের মধ্যে আবকারী (عبقري) হল, তাদের সর্দার। আর প্রাণীদের মধ্যে গৌরবযোগ্য প্রাণীকেও عبقري বলা হয়। সুতরাং আবকার যদি শুধু সুসজ্জিত বুনন বিশিষ্ট বিছানার সাথেই বিশেষিত থাকত, তাহলে এই বুনন ছাড়া অন্য কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ ও ব্যবহার থাকত না। অথচ তা ঘটেছে। কাজেই এই আয়াতে যখন বিছনার বিশেষণ রূপে তার ব্যবহার ঘটেছে, তখন তার অর্থ হবে প্রত্যেক ঐ বিছানা; যার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য চুড়ান্ত রকমের নকশী ও কারুকার্য খচিত হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, عبقري দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিছানা ও পাটি। কাতাদাহ রহ. বলেন, উন্নতমানের গালিচাকে عبقري বলা হয়। মুজাহিদ রহ. বলেন, পুরু রেশমকে عبقري বলা হয়।
ভেবে দেখা উচিত আল্লাহ তাআলা বিছানার প্রশংসা কিভাবে করেছেন। তিনি বলেছেন, তা উঁচু হবে। زرابي অর্থাৎ বালিশ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, সেগুলো ছড়ানো থাকবে। غرق এর ব্যাপারে বলেন, সেগুলো সারিবদ্ধভাবে বিছানো থাকবে। এর দ্বারা বুঝা যায়, বিছানাগুলো উঁচু ও নরম হবে। আর বালিশ ছড়িয়ে থাকার দ্বারা তার আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য এবং প্রত্যেক জায়গায় হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তা শুধু মজলিসের প্রধান ব্যক্তির জন্য নয়; বরং প্রত্যেক ব্যক্তিই তা লাভ করতে পারবে। আর উপাধানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বৈশিষ্ট্য এদিকে ইঙ্গিত করে, সে গুলোতে সর্বদা হেলান দেয়া সম্ভব হওয়ায়র মত করে গঠন করা হয়েছে। এমন নয়, তা দেবে যাবে বা চুপসে যাবে ও মাঝে মধ্যে ব্যবহার অনুপোযগী হয়ে যাবে। আল্লাহই প্রকৃতার্থ সম্পর্কে সর্বধিক অবহিত।
টিকাঃ
৩৪০. সূরা দুখান, আয়াত: ৫১-৫৩
৩৪১. সূরা কাহফ, আয়াত: ৩০-৩১
৩৪২. সূরা হজ্জ, আয়াত: আয়াত ২৩
৩৪৩. সূরা দাহর, আয়াত: ১২
৩৪৪. সূরা দাহর, আয়াত: ২১
৩৪৫. সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৩
৩৪৬. খ. ২ পৃ. ৩৮০
৩৪৭. বুখারী খ. ১ পৃ. ৪৬০, মুসলিম খ. ২, পৃ. ২৯৫
৩৪৮. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৫৪
৩৪৯. খ. ২, পৃ. ১৬৫
৩৫০. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭৬
📄 জান্নাতীদের তাঁবুর আসন, বালিশ ও মশারি
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, حُورٌ مَّقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ জান্নাতে তাঁবুর মধ্যে সুরক্ষিত হূর রয়েছে।৩৫১
সহীহায়নে৩৫২ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ان للمؤمن في الجنة لخيمة من لؤلؤة واحدة مجوفة নিশ্চয় জান্নাতে মু'মিনদের জন্য প্রস্ফুটিত মুক্তার তাঁবু থাকবে। طولها ستون ميلا فيها أهلون يطوف عليهم তার দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। المؤمن তাতে তার স্ত্রীগণ থাকবে, যাদের দ্বারা সে নিজ জৈবিক কামনা পূরণ করবে। فلا يرى بعضهم بعضا (একই তাঁবুতে হওয়া সত্ত্বেও মু'মিন ব্যক্তি এক স্ত্রীর সাথে কাম-বাসনা চরিতার্থ করার বিষয়ে তাঁবুর বিশালতার কারণে অন্যান্য স্ত্রী দেখবে না) তারা একে অপরকে দেখবে না।
সহীহায়নের এক বর্ণনায় রয়েছে, জান্নাতে ফাঁপা মুক্তা দ্বারা একটি তাঁবু নির্মিত হবে। في كل زاوية منها ستون ميلا তার দৈর্ঘ হবে ষাট মাইল। أهل ما يرون الآخرين তার প্রত্যেক কোণে জান্নাতী ব্যক্তির স্ত্রীগণ থাকবে; কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাবে না। يطوف عليهم المؤمن মু'মিন ব্যক্তি তাদের নিকট ঘুরে বেড়াবে। (অর্থাৎ সে ব্যক্তি তার কাম-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য কখনো একজনের নিকট যাবে, কখনো অন্যজনের নিকট যাবে।)
সুনানে তিরমিযীতে হযরত আবূ মূসা রা.-এর সূত্রে वर्णित হাদীস এও রয়েছে, الخِيمَة دُرَّةٌ طُولُهَا فِي السَّمَاءِ سَنُونَ مِيلا মুক্তা নির্মিত একটি তাঁবু থাকবে। যার দৈর্ঘ ষাট মাইল। তার প্রত্যেক কোণে স্ত্রীগণ থাকবে; কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পাবে না।
বুখারীর এক বর্ণনায় রয়েছে مِيلا ثَلاَثُونَ طُولُهَا তার দৈর্ঘ্য হল ত্রিশ মাইল। সে তাঁবুটি প্রাসাদ আর অট্টালিকায় থাকবে না; বরং উদ্যানের মাঝে নদীর তীরে অবস্থিত থাকবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে বর্ণনা করেন, আবূ সুলাইমান রহ. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা 'ডাগর চোখের হুরদের'কে নির্দিষ্টাঙ্গিকে সৃষ্টি করবেন। যখন তাদের সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হবে, তখন ফিরিশতাগণ তাদের উপর তাঁবু টাঙ্গিয়ে দিবেন। কেউ কেউ বলেন, সে সকল হূর যেহেতু কুমারী হবে, তাই তারা পর্দাবৃত থাকবে। কেননা, কুমারীদের অভ্যাস হল, তারা স্বামীর সংসর্গে আসার পূর্ব পর্যন্ত অন্যদের তুলনায় বেশি পর্দাবৃত থাকে। আল্লাহ তাআলাও হুরদেরকে সৃষ্টি করে তাদেরকে তাঁবুর মধ্যে পর্দাবৃত করে রাখবেন, তাদের হকদারকে জান্নাতে তাদের সাথে একত্রিত করার পূর্ব পর্যন্ত।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, প্রত্যেক মু'মিনের জন্য অনেক গুণ ও বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত স্ত্রী থাকবে। সে স্ত্রী তাঁবুর ভেতর অবস্থান করবে। প্রত্যেক তাঁবুর চারটি করে দরযা থাকবে, এর প্রত্যেক দরযা দ্বারাই মু'মিন ব্যক্তি প্রত্যহ প্রবেশ করবে। প্রত্যেক দরযাতেই তার জন্য এমন হাদিয়া, উপঢৌকন, তোহফা ও সম্মানজনক উপহার থাকবে, যা সে ইতোপূর্বে কখনো লাভ করেনি। সে স্ত্রী বাহ্যিক ও কৃত্রিম সাজ-সজ্জা করবে না। (কেননা খোদাপ্রদত্ত্ব রূপ লাবণ্যই তার সৌন্দর্যের জন্য যথেষ্ট) এবং রাগে ও ক্ষোভে কখনো সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলবে না। (কেননা, সে কখনো স্বামীর প্রতি রাগ করবে না) ও তার মুখ হতে কখনো দুর্গন্ধ বের হবে না, কখনো কোন বিষয়ে সে বিরক্তির প্রকাশ ঘটাবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি حور مقصوات في الخيام এর মধ্যস্থিত الخيام এর তাফসীর করতে গিয়ে বলেন, তাঁবুটি হবে ফাঁপা মুক্তা মালায় সৃজিত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ দারদা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একই মুক্তা দ্বারা নির্মিত তাঁবু থাকবে। তাঁবুর সত্তরটি দরযা থাকবে, প্রত্যেক দরযা একক মুক্তা দিয়ে নির্মিত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, একটি ফাঁপা মুক্তা দ্বারা নির্মিত তাঁবু থাকবে, যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ থাকবে এক ফরসখ করে (প্রায় তিন মাইল) তার চার হাজার স্বর্ণ নির্মিত দরযা থাকবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি حور مقصورات في الخيام এর ব্যাপারে বলেছেন, সে সকল হুর মুক্তা নির্মিত তাঁবুতে থাকবে। প্রত্যেক তাঁবু একটি মাত্র মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে حور مقصورات في الخيام এর ব্যাখ্যায় বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, উক্ত তাঁবু ফাঁপা মুক্তা দ্বারা নির্মিত হবে। যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হবে এক ফরসখ করে। এতে স্বর্ণ নির্মিত এক হাজার দরযা থাকবে। প্রত্যেক দরযায় এমন পর্দা থাকবে যা পঞ্চাশ ফরসখ (প্রায় ১৫০ মাইল) পুরু হবে। ফিরিশতাগণ প্রত্যেক দরযা দিয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে হাদিয়া-তোহফা নিয়ে মু'মিন ব্যক্তির নিকটে যাবেন। আল্লাহ তাআলার বাণী হলো وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَاب ফিরিশতাগণ তাদের নিকট উপস্থিত হবে প্রত্যেক দরযা দিয়ে।৩৫৩
জান্নাতীদের আসন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى سُرُرٍ مَصْفُوفَةٍ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ তারা বসবে শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে; আমি তাদের মিলন ঘটাব আয়াতলোচনা হুরের সঙ্গে৩৫৪।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ثُلَّةٌ مِنَ الْأَوَّلِينَ وَقَلِيلٌ مِنَ الْآخِرِينَ বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে; এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। عَلَى سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ مُتَّكِيْنَ عَلَيْهَا مُتَقَابِلِينَ স্বর্ণ খচিত আসনে বসবে, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে৩৫৫।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, فِيهَا سُرُرٌ مَّرْفُوعة সেখানে উন্নত মর্যাদাসম্পন্ন শয্যা রয়েছে৩৫৬।
উক্ত আয়াতাবলী দ্বারা বুঝা যায়, আসনগুলো মুখোমুখি সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত থাকবে। একজন অপর জনের পেছনে ও থাকবে না এবং দূরেও থাকবে না। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টিও অবহিত করলেন, موضونة (মাওযুনা) হবে। وضن অর্থ হল, বিন্যস্ত আকারে তৈরীকৃত বস্তু। যেমন আরবগণ বলে থাকেন, وضن فلان الحجر অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি পাথরকে উপরে নিচে সু-বিন্যস্ত করছে। একটি ইঁটকে অপরটির উপর সুবিন্যস্ত করে রাখাকে موضونة বলে।
লাইস রহ. বলেন, পালঙ্ক ও সে জাতীয় বস্তুকে وضن বলে।
আবু উবায়দা রহ. ফাররা, মুবাররাদ ও ইবনে কুতাইবা রহ. প্রমুখ মুফাসসিরীন বলেন, موضوعة বলা হয়, এমন ভাঁজ ভাঁজ করে তৈরীকৃত বস্তুকে, যার ধাগাগুলো একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে রয়েছে। যেমন বর্মের শিকল একটি অপরটিতে প্রবিষ্ট থাকে। এ কারণে যেই ফিতার সুতাগুলো একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট সে ফিতাকে وضين বলা হয়।
তারা তাদের মতের সমর্থনে আ'শা কবির এ কবিতাটি উল্লেখ করেন, ومن نسج داؤد موضونة تساق مع الحي غيرا فعيرا হযরত দাউদ আ. এর নির্মাণ পদ্ধতিতে নির্মিত বর্ম যার বৃত্ত একটি অপরটির মধ্যে প্রবিষ্ট, সেগুলোকে কাফেলায় কাফেলায় গোত্রের সাথে বয়ে নিয়ে যায়।
তারা বলেন, উক্ত আয়াতে موضونة দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা স্বর্ণের ধাগা দ্বারা নির্মিত হবে এবং তার উপর পদ্মরাগমণি ও পোখরাজ ছড়ানো থাকবে।
হুশায়ম রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে এ ব্যপারে বর্ণনা করেন যে, مُوضُونَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مُرَمَّوْلَةٌ بِالذَّهَبِ অর্থাৎ স্বর্ণের সুক্ষ্ম তার দ্বারা নির্মিত।
মুজাহিদ রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مُوَصَّلَةٌ بِالذَّهَبِ অর্থাৎ স্বর্ণ সংযোজিত।
হযরত আলী ইবনে আবী তালহা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, مُوضُونَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مَصْفُوفَةٌ সারিবদ্ধভাবে বিছানো।
আতা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, স্বর্ণের আসন থাকবে। যার মধ্যে পদ্মরাগমণি, পোখরাজ ও মুক্তার প্রলেপ থাকবে। আর সেটি এত বিশাল আকৃতির হবে যে, তা ঈলা (একটি জায়গার নাম) হতে মক্কা পর্যন্ত পূর্ণ স্থানটিকে বেষ্টন করে নিবে।
কালবী রহ. বলেন, আসনটি একশত হাত উঁচু হবে। তখন মু'মিন ব্যক্তি তাতে উপবেশনের ইচ্ছা পোষণ করবে তখন তা নিচের দিকে ঝুঁকে যাবে। উপবেশনের পর পূণরায় স্ব-স্থানে উঠে যাবে।
জান্নাতের পালঙ্ক
أرائك শদ্ধটি أريكة এর বহুবচন। আল্লাহ তাআলার বাণী, مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِك এর ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নববধূর সজ্জিত কক্ষে স্থাপিত পালঙ্ককে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়। এরূপ কক্ষে না থাকলে তা আরীকাহ বলা হয় না। এমনিভাবে যদি নববধূর জন্য কক্ষ সজ্জিত হয়; কিন্তু তাতে পালঙ্ক না থাকে বা পালঙ্ক থাকে; কিন্তু কক্ষ সজ্জিত না হয়, তবে তাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হবে না; বরং উভয় বস্তু অর্থাৎ সজ্জিত কক্ষ ও পালঙ্ক উভয়টার সমন্বয় ঘটলেই কেবল তাকে আরীকাহ বলা হবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, কনের আসনের জন্য সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়।
লাইস রহ. বলেন, সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة বলা হয়।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, কনের আসনের জন্য সজ্জিত কক্ষে বিছানো বিছানাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হয়।
গ্রন্থকার বলেন, তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটলেই তাকে أريكة (আরীকাহ) বলা হবে।
প্রথমত: সেটি পালঙ্ক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত: তাতে সজ্জিত ঝুলানো পর্দা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত: পালঙ্কের উপর বিছানোর জন্য বিছানা থাকতে হবে।
সিহাহতে (একটি অভিধান গ্রন্থ) রয়েছে, এমন সজ্জিত পালঙ্ককে أريكة বলা হয়, যা কোন ঘরে বা খিলানযুক্ত ছাদে বিছানো থাকে, কিন্তু যদি কক্ষ সজ্জিত এবং তাতে পালঙ্ক না থাকে তবে তাকে حجله হাজলাহ বলা হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোহরে নবুয়্যাত সম্পর্কিত হাদীসে রয়েছে, كان مثل زر الحجلة অর্থাৎ তা ছিল নববধূর জন্য তৈরীকৃত মশারির বোতামের ন্যায়। মশারির বোতাম দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মশারির কোণে জমা অংশটুকু।
টিকাঃ
৩৫১. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭২
৩৫২. বুখারী, খ. ২, পৃ.৭২৪, মুসলিম খ. ২, পৃ. ৩৮৯
৩৫৩. সূরা রা'দ, আয়াত: ২৩
৩৫৪. সরা তর, আয়াত: ২০
৩৫৫. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৩-১৬
৩৫৬. সূরা গাশিয়াহ, আয়াত: ১৩
📄 জান্নাতীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে যারা
يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ بِأَكْوَابِ وَأَبَارِيقَ • وكأس من معين তাদের সেবায় ঘুরাফেরা করবে চির কিশোরেরা; পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে৩৫৭।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنْثُورًا যখন তুমি তাদেরকে দেখবে, তখন মনে করবে তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা৩৫৮।
আবূ উবায়দা রহ. ও ফাররা রহ. বলেন, مُخَلَّدُونَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তারা বৃদ্ধ হবে না ও তাদের অবস্থার পরিবর্তনও ঘটবে না; বরং তারা চির কিশোর থাকবে। (প্রথম দর্শনে তাদেরকে যেরূপ সুদর্শন মনে হয়েছে পরবর্তীতে ঠিক তেমনি থাকবে)।
যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু তার চুল সাদা-কালো মিশ্রিত নয় (বরং এখন পর্যন্ত কলোই রয়েছে) তাকে আরবগণ خُلْدٌ (মুখাল্লাদ) বলে থাকে। যেমনিভাবে বার্ধক্যের ছাপ পড়ার পূর্ব পর্যন্ত বয়সপ্রাপ্তকে তারা خُلْدٌ বলে।
কেউ বলেন, خُلْدٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হল مُقَرَّطُونَ ومُسَوِّرُونَ অর্থাৎ তাদের কালো অলংকার থাকবে এবং হাতে কাঁকন থাকবে। ইবনে আরাবী রহ. এ অর্থটিকে पसন্দ করেছেন। তিনি বলেন, مُخَلَّدُونَ শব্দটি خَلْدَة থেকে উৎকলিত, যার অর্থ হল কানের দুল। সুতরাং مخلدون দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কানে দুল পরিহিত ব্যক্তি।
আমর রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। কানে দুল পরিহিত মহিলাকে مخلدة বলা হয়। আর কোন কোন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তির যদি চুল সাদা না হয়, তাকে বলা হয়।
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়র রহ. বলেন, مخلد দ্বারা উদ্দেশ্য হল مقرطون (অর্থাৎ কানে দুল পরিহিত) এ মত পোষণকারীগণ তাদের মতের সমর্থনে দুটি দলীল পেশ করেছেন। প্রথম দলীল হল, প্রত্যেক ব্যক্তিই জান্নাতে চিরস্থায়ী হবে। সুতরাং এ কিশোরদের এমন কোন নিদর্শন থাকা উচিৎ যার দ্বারা তাদেরকে চেনা যাবে। সুতরাং তাদের কানে দুল পরিয়ে দেওয়া হবে যাতে বুঝা যায়, তারা জান্নাতীদের খেদমতে নিয়োজিত কিশোরদল। দ্বিতীয় দলীল হল কবির নিম্নোক্ত পংক্তিমালা
اعجاز من رواكد الكثبان و مخلدات باللجين. كأنما
সে সকল মহিলা খাঁটি রৌপ্যের অলংকার পরিহিতা এবং এমন স্বাস্থ্যবতী; যেন তাদের নিতম্ব বালুর ঢিবি।
প্রথম পক্ষের ভাষাবিদগণ, যাদের মতে مخلد দ্বারা উদ্দেশ্য অবিনশ্বরত্ব, তাদের দলীল হল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, যে কিশোররা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। এ ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্যকার হযরত ইবনে আব্বাস রা.- এর উক্তিই যথেষ্ট।
মুজাহিদ রহ., কালবী রহ. ও মুকাতিল রহ. এ মতটিই গ্রহণ করেছেন। তারাও বলেছেন, সে সকল কিশোর কখনো বার্ধক্যে উপনিত হবে না এবং কখনো তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।
কেউ কেউ উভয় মতের সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, সে সকল কিশোর বৃদ্ধও হবে না এবং তাদের কানে দুলও থাকবে।
যারা বলেছেন, خلد অর্থ مقرطون তাদের উদ্দেশ্য হল, তারা অবশ্যই কিশোর হবে।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে لؤلؤمنشورا তথা বিক্ষিপ্ত মুক্তামালার সাথে তুলনা করেছেন, শুভ্রতা ও আকৃতিগত সৌন্দর্য বোঝাতে। তাদেরকে বিক্ষিপ্ত বলা দ্বারা দুটি লাভ রয়েছে। প্রথমত: এর দ্বারা এ কথা বুঝা যায়, তারা সর্বদা জান্নাতীদের খেদমতে এবং তাদের প্রয়োজন মিটানোর কাজে লিপ্ত থাকবে। কখনো তারা খেদমত ছেড়ে অবসর কাটাতে একত্রে বসে থাকবে না।
দ্বিতীয়ত: বিক্ষিপ্ত মুক্তামালা বিশেষত: স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর বিক্ষিপ্ত মুক্তামালা একত্রিত মুক্তামালা হতে অধিক সৌন্দর্যময় ও শোভাময় হয়।
সেবক কিশোরগণ
এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের মতানৈক্য রয়েছে। সে সকল কিশোর দুনিয়ার কিশোররাই হবে নাকি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে সৃষ্টি করবেন?
হযরত আলী রা. ও হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, তারা হল মুসলমানদের সে সকল সন্তান যারা এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কোন নেক আমলও ছিল না এবং কোন পাপও ছিল না। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিশোরে পরিণত করবেন এবং জান্নাতীদের খাদেম হিসাবে নিয়োজিত করবেন। কেননা, জান্নাতে তো প্রজননধারা থাকবে না।
হাকেম রহ. স্ব-সনদে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করে বলেন, তারা হবে এমন কিশোর, যাদের কোন পুণ্যও নেই, পাপও নেই। যেহেতু তাদের কোন পাপ নেই, তাই তারা কোন শাস্তিরও সম্মুখীন হবে না। ফলে তাদের এখানেই রাখা হবে।
কেউ কেউ বলেন, তারা হল মুশরিকদের সে সকল সন্তান, যারা অপ্রাপ্ত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতের খাদেম হিসাবে নিয়োগ করবেন।
তারা তাদের সমর্থনে হযরত ইয়াকুব ইবনে আব্দুর রহমান রহ. বর্ণিত হাদীস দলীল হিসাবে পেশ করেন। তিনি স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আল্লাহর নিকট মানুষের অপ্রাপ্ত বয়সে মৃত্যুবরণকারী সন্তানদের আযাব না দেওয়ার নিবেদন পেশ করেছি। আল্লাহ তাআলা আমার এ নিবেদন মনযূর করেছেন। সে সকল সন্তান জান্নাতের খাদেম হিসাবে নিয়োজিত হবে।
দারা কুতনী রহ. বলেন, আবদুল আযীয মাজেশূন রহ.ও স্ব-সনদে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফুযায়ল ইবনে সুলাইমান রহ. ও স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন। তবে উভয় বর্ণনার সনদ দুর্বল। কেননা, প্রথম বর্ণনার সনদে ইয়াযীদ রুক্কাশী নামক বর্ণনাকারী অনির্ভরযোগ্য। আর দ্বিতীয় বর্ণনার সনদে ফুযায়ল ইবনে সুলায়মান বিতর্কিত এবং আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
প্রথমোক্ত মত পোষণকারীরা অর্থাৎ যাঁরা বলেন, এরা দুনিয়ার কিশোর নয়। তারাও এ কথা মনে করেন না যে, তারা জান্নাতবাসীদের ঔরসে সৃষ্ট বংশধারা। বরং তারা বলেন, আল্লাহ তাআলা যেভাবে জান্নাতে ডাগর চোখের হূর সৃষ্টি করেছেন, তেমনি এসব কিশোরদেরকে সৃষ্টি করবেন।
তারা বলেন, দুনিয়াতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী শিশুরাতো কিয়ামত দিবসে ৩৩ বছরের যুবক হবে। তাঁদের মতের সমর্থনে তারা হযরত ইবনে ওয়াহাব রহ.-এর হাদীস পেশ করেছেন। যা তিনি স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من مات من أهل الجنة من صغير أو كبير يردون بني ثلاثين سنة في الجنة لا يزيدون عليها أبدا যে জান্নাতী পৃথিবীতে মৃত্যুবরণ করেছেন, চাই ছোট হোক, চাই বড় হোক, তাদেরকে তেত্রিশ বছরের পূর্ণ যুবক করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর তাদের বয়স কখনো এর চেয়ে বৃদ্ধি পাবে না, বরং সর্বদা তাদের বয়স এমনই থাকবে। وكذالك أهل النار জাহান্নামীদের অবস্থাও তাই হবে। ইমাম তিরমিযী রহ.ও উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
সর্বোপযোগী মত হল, সে কিশোরদেরকে হূরেঈনদের মত জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে। তাদের কাজ হবে জান্নাতীদের সেবা করা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَّكْنُونٌ তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে কিশোররা, সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ৩৫৯।
এ কিশোর-কিশোরীরা জান্নাতীদের ঔরসে সৃষ্ট সন্তান হবে না। কেননা জান্নাতীদের সন্তান জান্নাতের সেবাদাস হবে এটা কখনোই একজন জান্নাতীর সম্মান ও মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং তাদের সন্তান তাদের-ই মত সেবা গ্রহণকারী হবে। এটাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক।
ইতোপূর্বে হযরত আনাস রা. এর হাদীস উল্লেখ হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, انا أول الناس خروجا اذا بعثوا আমিই সর্বপ্রথম কবর দেশ থেকে উত্থিত হব। وفيه يطوف على الف خادم كانهم لؤلؤ مکنون সেখানে আমার জন্য নিয়োজিত থাকবে সুরক্ষিত মুক্তার ন্যায় হাজারো খাদেম। مکنون বলা হয়, এমন গোপন ও সুরক্ষিত বস্তুকে যা কখনো মানুষের হাতের ছোঁয়া পায়নি।
يطوف عليهم غلمان لهم ويطوف عليهم قولدان বাক্যটি ও এর মধ্যে চিন্তা- গবেষণার দ্বারা এবং এর সাথে হযরত আবূ সাঈদ রা. এর হাদীসকে সংযুক্ত করলে বুঝা যায়, সে কিশোরদেরকে জান্নাতেই সৃষ্টি করা হবে। والله اعلم
টিকাঃ
৩৫৭. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৭-১৮
৩৫৮. সূরা দাহর, আয়াত: ১৯
৩৫৯. সূরা তৃর, আয়াত: ২৪