📄 জান্নাতের নদী, প্রস্রবণ ও প্রবাহধারা
কুরআন কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একাধিক স্থানে বারংবার ইরশাদ করেছেন, جَنّٰتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ এমন উদ্যানরাজি রয়েছে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত রয়েছে, কোথাও এসেছে تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْاَنْهٰرُ এই আয়াতাংশসমূহ দ্বারা কতগুলো বিষয় প্রতীয়মান হয় :
প্রথমত: সেখানে বাস্তবেই নদীর অস্তিত্ব রয়েছে।
দ্বিতীয়ত: সে নদীগুলো স্থির নয় বরং প্রবহমান।
তৃতীয়ত: সেই নদীগুলো তাদের প্রাসাদ ও উদ্যানের পাদদেশ দিয়ে প্রবহমান থাকবে।
কোন কোন মুফাস্সির মনে করেন, সে নদী জান্নাতী ব্যক্তির অনুগামী হয়ে প্রবাহিত হবে। সে ব্যক্তি যে দিকেই ইচ্ছা করবে, সে দিকেই প্রবাহিত হবে। যখন জান্নাতী ব্যক্তি জানবে, সে নহর কোন পরিখা ব্যতীতই প্রবাহিত হবে, তখন সে আকাংখা করবে, নদী তার ইচ্ছা মোতাবেক প্রবাহিত হোক। তা প্রাসাদ ও উদ্যানের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে। যেমন দুনিয়ার নদী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ قَرْن مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَالَمْ نُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَجَعَلْنَا الْأَنْهَارِ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمْ
তারা কি দেখে না,আমি তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করেছি, তাদেরকে দুনিয়ায় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেমনটি তোমাদেরকেও করিনি। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম আর তাদের পাদদেশে নদী প্রবাহিত করেছিলাম৩০২।
এটিই হল দুনিয়ার নদীসমূহের চিরাচরিত নিয়ম।
وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي আর এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত৩০৩।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দু'প্রস্রবণ৩০৪।
ইবনে আবী শাইবাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, نَضَّاخَتَانِ بِالْمَاءِ وَالْفَوَاكِهِ উভয় প্রস্রবণ হতে পানি ও ফল উথলে উঠবে।
ইবনুল ইয়ামান রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন نَضَّاخَتَانِ بِالْمِسْكِ وَالْعَنْبَرِ উভয় প্রস্রবণ হতে কস্তুরি ও মিশক আম্বর উথলে উঠবে। জান্নাতীর ঘর পর্যন্ত সে ঝর্ণা বইবে। যেমন দুনিয়াবাসীর ঘরের উপর বৃষ্টি পড়ে।
আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস রহ. স্ব-সনদে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, এ প্রস্রবণ দু'টি জান্নাতের সকল প্রস্রবণ অপেক্ষা উত্তম ও বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارٌ مِنْ مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِنْ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِنْ خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ
মুত্তাকীদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত: তাতে আছে নির্মল পানির নহর। আছে দুধের নহর। যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়। আছে পানকারীদের জন্য সুরার নহর। আছে পরিশোধিত দুধের নহর। আর সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা।৩০৫
আল্লাহ তাআলা এ চার প্রকার নহরের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এগুলো কখনো নষ্ট হবে না, অথচ পার্থিব জগতে তো এগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
পানি নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, দীর্ঘ সময় স্থির থাকার ফলে তা দুর্গন্ধযুক্ত হবে না, তার রং ও স্বাদের মাঝে কোন প্রকার বিকৃতি ঘটবে না। দুধের স্বাদ নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা টক হয়ে যাওয়া ও জমে যাওয়া। আর সুমিষ্ট পানীয় নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা পানকারীদের পসন্দসই না হওয়া ও বিরূপ স্বাদের হওয়া। আর মধু নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা পরিষ্কার না হওয়া। এটা আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি অনন্য নিদর্শন, পার্থিব জগতে সাধারণত যে সকল বস্তুর নহর প্রবাহিত হয় না, জান্নাতে সে সব বস্তুরই নহর প্রবাহিত হবে। সুতরাং সে নহরগুলোর পরিখা ব্যতীতই প্রবাহিত হওয়া এবং কোন প্রকার বিকৃতি হতে নিরাপদ থাকার কথা আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন। যেমনিভাবে সেখানকার মদ জাতীয় পানীয় হতে সে সকল খারাপ বিষয়গুলো বিদূরীত করার কথা ঘোষণা করেছেন, যে সকল খারাপ বিষয়গুলো পার্থিব জগতের মদ্য পানে সংঘটিত হয়। যেমন মাথা ঘূর্ণন করা, মাথা ব্যথা, সুরা পান করে অনর্থক ও অশ্লীল বাক্যালাপ করা, মাতাল হওয়া, স্বাদ উপভোগ না করা। সুতরাং এ পার্থিব জগতের সুরায় পাঁচটি অনিষ্টতা রয়েছে। বিবেক বিকৃত তথা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়া, অধিকহারে অশ্লীল অপলাপ করতে থাকা, সুরা পানকারীর মাঝে তা পান করার পর সেই স্বাদের মজাদার অনুভূতি বিদ্যমান না থাকা। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর মদ শুধু মাত্র অপলাপ করা, মাতাল হওয়া, সম্পদ ব্যয় করা, মাথা ঘূর্ণন করা ও অপসন্দনীয় একটু স্বাদ আস্বাদন করা বৈ কিছুই নয়। এটা অপবিত্র ও শয়তানের শয়তানী কর্ম। যা শুধু মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। আল্লাহর স্মরণ হতে বিস্মৃত করে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের প্রতি প্ররোচনা যোগায়। যার ফলে শরাব পানকারীর হারাম-হালাল, বৈধ-অবৈধের মাঝে তারতম্য জ্ঞান লোপ পায়। নীতি-নৈতিকতার যবনিকাপাত ঘটে এবং এমন কাজ করে যার ফলে তাকে লজ্জিত ও অপদস্থ হতে হয়।
তাকে সভ্য ও সুশীল শ্রেণী হতে অসভ্য নিম্নশ্রেণী ও উন্মাদশ্রেণীতে শামিল করে। শরাব পানকারীরা মাতাল অবস্থায় স্বীয় গোপন রহস্য প্রকাশ করে দেয়, যা তার ক্ষতি ও ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। হত্যা, বিশৃংখলা, অশ্লীলতা ও বেহায়া কার্যকলাপ তার জন্য সহজ হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে শরাব পানকারী ব্যক্তি শয়তানের সাথে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করল। কত কত লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছে এ শরাব, কত ধনাঢ্য ব্যক্তিকে নিঃস্বে পরিণত করেছে, কত সম্মানিত ব্যক্তিকে অপমান ও অপদস্থতার শৃংখলে আবদ্ধ করেছে। কত প্রাচুর্য ছিনিয়ে নিয়েছে ও শান্তি চাপিয়ে দিয়েছে। এ মদ কত ব্যক্তির বন্ধুত্বকে শত্রুতায় পরিণত করেছে। কত স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছিন্নতার আড় সৃষ্টি করেছে। শরাবের কু-প্রতিক্রিয়া কত ব্যক্তির অন্তরকে উদাসীন করেছে ও বিবেক-বুদ্ধিকে নিষ্কৃত করেছে এবং কতবার এ শরাবের কারণে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হতে হয়েছে ও কত অশ্রু ঝরিয়েছে। কতবার শরাব তার পানকারীর জন্য মঙ্গল ও কল্যাণের দ্বার রুদ্ধ করেছে। অনিষ্টতার দ্বার উন্মোচিত করেছে। শরাব ব্যক্তিকে কতবার বিপদাপদে নিপতিত করেছে ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। বস্তুত: মদই হল সকল প্রকার গুনাহ ও মন্দ কাজের সূত্র ও উৎস। এটাই সম্পদ ও প্রাচুর্য ধ্বংসকারী। যদি উল্লিখিত অনিষ্টসমূহ হতে কোন একটিও দুনিয়ার মদে নাও থাকে, তবু এ পার্থিব জগতের শরাব ও জান্নাতের শরাব কখনো একপেটে একত্রিত হতে পারে না। (অর্থাৎ সে ব্যক্তি জান্নাতের সুরা হতে বঞ্চিত থাকবে)। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
من شرب الخمر في الدنيا لم يشربها في الآخرة
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করে, সে বেহেশতী শরাব হতে বঞ্চিত হবে। মদের অপকারিতা তো বর্ণনাতীত; কিন্তু জান্নাতের মদে কোন অপকারীতা নেই।
প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহ তাআলা জান্নাতের নহরের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেছেন, তা প্রবহমান হবে। কখনো তার পানি বিনষ্ট হবে না; কিন্তু এটাতো অত্যন্ত সুস্পষ্ট বিষয়, প্রবহমান পানি কখনো বিনষ্ট হয় না, তবে প্রবহমান বলার পরও কেন বলা হচ্ছে, তা বিনষ্ট হবে না।
উত্তর: উক্ত প্রশ্নের উত্তর হল, প্রবহমাণ পানি যদিও বিনষ্ট হয় না; কিন্তু তা হতে কিছু পানি তুলে দীর্ঘ সময় রেখে দিলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু জান্নাতের নহরের পানি সুদীর্ঘকাল এভাবে রেখে দিলেও বিনষ্ট হবে না।
চিন্তা করে দেখুন, সেখানে মানুষের কাছে প্রিয়তম চার প্রকার পানীয়ের নহরের সমন্বয় ঘটবে। পানির নহর থাকবে, তাদের পান করা ও পবিত্রতা অর্জনের জন্যে। দুধের নহর থাকবে, তাদের আহারের বস্তু হিসাবে। সুরার নহর থাকবে, আমোদ-প্রমোদ, উৎফুল্লতা ও প্রফুল্লতার জন্য। অমৃতের নহর থাকবে, তাদের আরোগ্য ও উপকার লাভের জন্য।
জান্নাতের নহরের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য
জান্নাতের নহরগুলো উপর হতে উৎসারিত হয়ে নিম্নাঞ্চলে প্রবাহিত হবে।
ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে৩০৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان في الجنة مأة درجة জান্নাতে একশত স্তর রয়েছে। সেগুলো আল্লাহ তাআলা তাঁর রাস্তায় জিহাদকারীদের জন্য তৈরী করেছেন। بين كل درجتين كما بين السماء والأرض প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্বসম-দূরত্ব রয়েছে। সুতরাং যখন তোমরা তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা কর। فإذا سألتم الله فاسئلوه الفردوس ফإنه وسط الجنة وأعلى الجنة কেননা, তা মধ্যবর্তী ও উঁচু স্তরের জান্নাত। وفوقه عرش الرحمن তার উপরে রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ। ومنه تفجر أنهار الجنة তা হতেই জান্নাতের নহর প্রবাহিত হয়।
ইমাম তিরমিযী রহ. হযরত মু'আয বিন জাবাল রা. ও হযরত আবূ উবাদাহ ইবনুস-সামিত রা. হতে অনুরূপ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। হযরত উবাদাহ ইবনুস-সামিত রা.-এর বর্ণিত হাদীসের শব্দাবলী এরূপ الجنة مأة درجة ما بين كل درجتين مسيرة مأة عام জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে একশত বছরের দূরত্ব। ومنها الأنهار الأربعة তা হতেই চারটি নহর প্রবাহিত হয়। والعرش فوقها তার উপরেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।
فان سألتم الله فاسئلوه الفردوس الأعلى যখন তোমরা আল্লাহ তাআলা নিকট জান্নাত প্রার্থনা করবে, তখন উচ্চস্তরের ফিরদাউস প্রার্থনা কর।
মু'জামে তাবারানীতে হযরত সামুরাহ রা. হতে হযরত হাসান বসরী রহ.-এর বর্ণনা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الفردوس ربوة الجنة وأعلاها وأوسطها ফিরদাউস হলো জান্নাতসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, উচ্চতম ও মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত জান্নাতের নাম। منها تفجر الأنهار সেখান থেকেই জান্নাতের প্রস্রবণগুলো উৎসারিত হবে।
সহীহ বুখারীতে৩০৭ হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, رفعت إلى سدرة المنتهى في আমাকে (মি'রাজ রাতে) সপ্তম আকাশে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে نبقها مثل قلال هجر তার কূল ছিল হিজর গোত্রের মটকার ন্যায় বৃহৎ আকারের। ورقهامثل الاذان তার পাতা হাতির কানের ন্যায়। يخرج من ساقها نهران ظاهران ونهاران باطنان তার কাণ্ড হতে দুটি প্রকাশ্য প্রস্রবণ ও দু'টি অপ্রকাশ্য ঝর্ণা রয়েছে। فقلت يا جبريل ما هذا আমি জিবরীল আ. কে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। قال اما النهران الباطنان ففي الجنة وأما النهران الظاهران فا النيل والفرات অপ্রকাশ্য দুটি হলো জান্নাতে আর প্রকাশ্য দু'টি হল নীল ও ফুরাত নদদ্বয়।
সহীহ বুখারীতে৩০৮ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, بينا انا اسير في الجنة (মি'রাজ রাতে) আমি জান্নাতে বিচরণ করছিলাম। ذا انا بنهر حافتاه قباب اللؤلؤ المجوف। তখন আমি এমন এক নহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যার উভয় পার্শ্বে ফাঁপা মুক্তমালার গম্বুজ রয়েছে। فقلت ماهذا يا جبريل তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরীল এটা কি? قال هذا الكوثر الذي اعطاك ربك জিবরীল আ. বললেন, এটিই হল সে কাওসার, যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন।
قال فضرب الملك بيده فاذاطينه مسك اذفر রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর জিবরীল আ. সে নহরে হাত দিলেন, তখন তার মাটি হতে কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে লাগল।
৩০৯ সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الكوثر نهر في الجنة কাউছার হল জান্নাতের একটি নহর। وعدنيه ربي عز وجل আমার প্রভু আমাকে তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, دخلت الجنة فاذا بنهر يجري আমি জান্নাতে প্রবেশ করে এমন প্রবহমান এক নহরের নিকট দিয়ে অতিক্রম করেছি حافتاه خيام اللؤلؤ যার উভয় প্রান্তে মুক্তার তাবু রয়েছে। فضربت بيدي إلى ما يجرى فيه من الماء আমি তার প্রবহমান পানিতে হাত দিলাম فاذا انا بمسك اذفرا আমি তার সুগন্ধি বিচ্ছুরিত মাটি লক্ষ্য করলাম। (অর্থাৎ তার মাটি হতে কস্তুরির সুগন্ধ বিচ্ছুরিত হচ্ছে( فقلتُ : لمن هذا يا جبریل আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরীল! এটি কার? قال هذا الكوثر الذي أعطاك الله عز وجل তিনি বললেন, এটাই সে হাউযে কাউসার, যা আল্লাহ তাআলা আপনাকে দান করেছেন। ইমাম তিরমিযী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الكوثر نهر في الجنة কাউসার হল জান্নাতের একটি নহর। حافتاه من ذهب ومجراه على الدر والياقوت তার উভয় প্রান্তে স্বর্ণের, তা প্রবাহিত হয় পদ্মরাগ মনি ও মুক্তার উপর। تربتُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمَسْكِ তার মাটি মিল্ক অপেক্ষা অধিক সুগন্ধিময় وماءه احلى من العسل তার পানি মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি। وابيض من الثلج এবং শিলা অপেক্ষা অধিক শুভ্র।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি হাসান ও সহীহ স্তরের।
আবূ নাঈম আল ফযল রহ. স্ব-সনদে হযরত মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, إِنَّ أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ! আয়াতে কারীমার মাঝে كوثر দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অফুরন্ত কল্যাণ।
হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, কাউসার হল, জান্নাতের একটি নহর।
হযরত আইশা সিদ্দীকা রা. বলেন, কাউসার হল, জান্নাতের এমন একটি নহর, যার প্রবাহিত হওয়ার আওয়ায কানে আঙ্গুল প্রবেশকারী ব্যক্তিও শুনতে পাবে। বস্তুত: তার নিগূঢ় তত্ত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। অর্থাৎ কানে আঙ্গুল চেপে ধরলে যেই শব্দ শুনা যায়, জান্নাতের বর্ণনার শব্দপ্রায় তাই অনুরূপ হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।
জামে'তিরমিযীতে৩১০: 'হযরত হাকীম ইবনে মু'আবিয়া রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি স্বীয় পিতা হযরত মু'আবিয়া রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إن في الجنة بحر الماء জান্নাতে একটি পানির নহর রয়েছে। وبحر العسل আরেকটি মধুর নহর রয়েছে। وبحر اللبن আরেকটি দুধের নহর রয়েছে। ثم تشقق الأنهار এই নহরগুলো হতে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বের হয়েছে।
ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْقِيَهُ اللهُ عَزَّ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وَجَلَّ مِنَ الْخَمْرِ فِي الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهُ فِي الدُّنْيَا যে ব্যক্তি আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার সুরা পানের আশাবাদী ও আগ্রহী, সে যেন দুনিয়াতে তা বর্জন ا وَمَنْ سَرَّهُ أَنْ يَكْسِيَهُ اللهُ الْحَرِيرَ فِي الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهُ فِي الدُّنْيَا করে। যে ব্যক্তি আগ্রহী ও আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা তাকে আখিরাতে রেশমের পোশাক পরিধান করাবেন, সে যেন দুনিয়াতে তা বর্জন করে। জান্নাতের নহর কস্তুরির টিলা অথবা কস্তুরির পর্বতের তলদেশ হতে উৎসারিত হয়।
জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তিকে যে অলংকার পরিধান করানো হবে, যদি পৃথিবীর সকল অলংকারকে তার সাথে তুলনা করা হয়, তবে সে জান্নাতী ব্যক্তির অলংকারই শ্রেষ্ঠ ও উত্তম বলে প্রমাণিত হবে।
আ'মাশ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, জান্নাতের নহরসমূহ কস্তুরির পর্বতের তলদেশ হতে উৎসারিত হবে।
ইবনে মারদাবি রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়স রা.-এর এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, في هذه الأنهار تشخب من جنة عدن في جوبة এই নহরগুলো জান্নাতে আদনের গহবর থেকে প্রবাহিত হয়। ثم تصدع بعد أنهارا এরপর বিভিন্ন নদ হতে উজানের দিকে উঠে যায়।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়, তোমাদের ধারণা জান্নাতের নহরগুলো যমীনের গহবর দিয়ে প্রবাহিত হয়, অথচ বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহর শপথ! তা যমীনের উপরিভাগ দিয়েই প্রবাহিত হয়, তার একপ্রান্ত হল মুক্তমালার অন্য প্রান্ত হল পদ্মরাগ মণির, আর তার মাটি খাঁটি কস্তুরির। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম الاذفر কি? জবাবে তিনি বলেছেন, الاذفر হল এমন বস্তু যাতে অন্য কোন বস্তুর মিশ্রণ থাকবে না বরং তা সম্পূর্ন খাঁটি ও নির্ভেজাল হবে।
ইবনে মারদাবি স্ব-সনদে স্বীয় তাফসীরে হযরত আনাস রা. হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন। আবূ খাইসামা রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, إنا أعطيناك الكوثر! আয়াতটি পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কাউসার দান করা হয়েছে। যমীন বিদীর্ণ করা ব্যতীতই তা প্রবাহিত হয়। তার উভয় প্রান্তে মুক্তার গম্বুজ রয়েছে। তখন আমি আমার উভয় হাত সেই ঝর্ণার তলদেশের মাটিতে রাখলাম। মনে হল, তা যেন খাঁটি কস্তুরি। তার কংকর হবে মুক্তার।
সুফিয়ান সাওরী রহ. স্ব-সনদে হযরত মাসরুক রহ. হতে আল্লাহর বাণী, وماء مسكوب এর তাফসীর করেন। তা এমন নহর, যা গহবর ব্যতীতই প্রবাহিত হয়। তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী وَنَخْلِ طَلْعُهَا هَضِيمٌ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, এমন খেজুর রয়েছে সেখানে, যার শস্য অত্যন্ত কোমল। তিনি বলেন, তার মূল এবং শাখা একই ধরনের হবে।
সহীহ মুসলিমে৩১১ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাইহান, যাইহান, নীল ও ফুরাত এ চারটির সবগুলোই বেহেশতের নদী।
উসমান ইবনে সাঈদ দারেমী স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, اَنْزَلَ اللهُ مِنَ الْجَنَّةِ خَمْسَةَ اَنْهَار আল্লাহ তাআলা জান্নাতের পাঁচটি নদী দুনিয়াতে প্রবাহিত করেছেন। سیحون وهو نهر الهند সাইহুন যা ভারতবর্ষে অবস্থিত। وجيحون وهو نهر بلخ (আমু দরিয়া) জাইহুন যা বলখে অবস্থিত, دجلة والفرات وهما نهر العراق والنيل وهو نهر مصر নীল নদ; যা মিসরে অবস্থিত। এ সবগুলোই আল্লাহ তায়লা জান্নাতের একটি প্রস্রবণ হতে প্রবাহিত করেছেন, সেটি সর্ব নিম্নস্তরের জান্নাতের প্রসবণ। জিবরীল আ.-এর পাখা দ্বারা সেগুলোকে বের করা হয়। অতঃপর সেগুলোকে পর্বতের মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। এরপর সেগুলোকে পৃথিবীতে প্রবাহিত করা হয়েছে। মানুষের জীবিকার্জনের বিভিন্ন মাধ্যম এই নদগুলোতে রয়েছে। আল্লাহ তাআলার বাণী وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَر এবং আমি আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেছি পরিমিতভাবে দ্বারা উদ্দেশ্য হল فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّا عَلَى ذَهَابِ بِهِ لَقَادِرُونَ অর্থাৎ আমি তা মাটিতে সংরক্ষিত করি; আমি তাকে অপসারিত করতেও সক্ষম৩১২।
সুতরাং (কিয়ামত নিকটবর্তী সময়ে) যখন ইয়া'যূজ মা'যূজ-এর আবির্ভাব ঘটবে, তখন আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরীল আ. কে পাঠিয়ে পৃথিবী হতে কুরআন ও তার যাবতীয় সহযোগী ইলম, বায়তুল্লাহ হতে হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম, হযরত মূসা আ.-এর সিন্দুক ও তার মধ্যাবস্থিত বস্তু উঠিয়ে নিবেন। তখন সে পাঁচটি নহরও উঠিয়ে নিবেন। আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর উদ্দেশ্য এটাই, إِنَّا عَلَى ذَهَابِ بِه لَقَادِرُونَ অর্থাৎ আমি তাকে অপসারিত করতেও সক্ষম। এসকল বস্তু উঠিয়ে নেওয়ার দ্বারা পৃথিবীবাসী সেগুলোর নানাবিধ মঙ্গল হতে বঞ্চিত হবে।
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, জান্নাতে বায়দাখ নামক একটি নহর রয়েছে, তার উপর পদ্মরাগ মণির গম্বুজ রয়েছে, তার নিচে সুন্দরী, রূপবতী ও কমনীয়া বালিকারা থাকবে। জান্নাতীগণ বলবে, আমাদেরকে বায়দাখের দিকে নিয়ে যাও। তখন তারা সে রমণীদের চেহারা অত্যন্ত গভীরভাবে দেখতে থাকবে। কোন জান্নাতীর যে কোন কিশোরীকে পসন্দ হবে, সে তার বাহু স্পর্শ করলে কিশোরী তার পেছনে পেছনে হাটতে থাকবে।
জান্নাতের নদ-নদী
জান্নাতে নদ-নদী বিদ্যমান হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীসমূহ দ্বারাই প্রতীয়মান হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও প্রস্রবণসমূহে৩১৩।
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِنْ كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا সৎকর্মশীলেরা পান করবে এমন পানীয়, যার মিশ্রণ হবে কাফুর। عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا এমন একটি প্রস্রবণ, যা হতে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এই প্রস্রবণকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করবে৩১৪।
আল্লাহ তাআলার বাণী يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ এর ব্যখ্যায় উলামায়ে কিরামের মতভেদ রয়েছে। কুফাবাসীগণ বলেন, এ এর মধ্যে من باء এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। সে হিসাবে অর্থ হল يَشْرَبُ مِنْهَا জান্নাতীগণ সে নহর হতে পানি পান করবে।
অন্যরা বলেন, يشرب ها এর মধ্যে يروى এর অর্থ অন্তর্ভুক্ত। সে হিসাবে অর্থ হল, তারা এ পরিমাণ পানি পান করবে, যাতে তারা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন, ১৬ টি এখানে ظرف তথা স্থান বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। عينا দ্বারা উদ্দেশ্য প্রস্রবণ নয়; বরং তা একটি স্থানের নাম। (গ্রন্থকার يشرب শব্দটিতে یروی এর অর্থ নিহিত থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন) তিনি বলেন, কুরআন কারীমে এর উদাহরণ রয়েছে, وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِالْحَادِ بِظُلْمِ نُدَقُهُ مِنْ عَذاب أليم যে ইচ্ছা করে সীমালংঘন করে পাপ কার্যের দ্বারা, তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।
وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلًا সেখানে তাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে যান্জাবীল মিশ্রিত পানীয়। عَيْنَا فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلًا জান্নাতের এমন প্রস্রবণ হতে, যার নাম সালসাবীল৩১৫।
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাঁর নৈকট্য লাভকারীগণ খাঁটি পানীয় পান করবে। কেননা, নৈকট্যশীল বান্দাগণ তাঁদের যাবতীয় আমল একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই করেছে। এজন্য তাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা খাঁটি পানীয় পান করাবেন। কিন্তু অন্য নেককারদের আমলে যেহেতু অন্য উদ্দেশ্যের কিছুটা হলেও মিশ্রণ ছিল। (অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকলে কমছে কম জান্নাত লাভের উদ্দেশ্য তো ছিল) সুতরাং তাদের পানীয় মিশ্রণযুক্ত হবে।
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ নিশ্চয়ই পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে অবলোকন করবে। • تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعيم তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দের সজীবতা দেখতে পাবে। يُسْقَوْنَ مِنْ رَحيق مختوم ختامه مسك وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ . وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمِ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ ) তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানি হতে পান করানো হবে। তার মোহর মিশকের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। তার মিশ্রণ হবে তাস্স্নীমের। এটা একটি প্রস্রবণ, যা হতে সান্নিধ্যপ্রাপ্তরা পান করবে৩১৬।
আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাদের পানীয় দু'টি বস্তুর মিশ্রণযুক্ত হবে। সূরার প্রথমাংশে উল্লেখ করেছেন, তাদের পানীয় কাফুর মিশ্রিত হবে, আর শেষাংশে উল্লেখ করেছেন, তা (যানজাবীল) আদা মিশ্রিত হবে। কাফুর হল ঠান্ডা ও সুগন্ধিময় আর আদা হল উষ্ণ ও সুগন্ধিময়। সুতরাং উভয়টার মিশ্রণে তাতে সমতা বজায় থাকবে। সেগুলোর স্বাদ অধিক হবে আলাদা করে পান করা অপেক্ষা।
সূরার শুরুতে কাফুরের উল্লেখ আর শেষাংশে আদার উল্লেখ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হিকমত নির্দেশ করে। কেননা, পানীয়ের মধ্যে যখন প্রথমে কাফুর মিশ্রিত করা হবে, তখন তাতে শীতলতা সৃষ্টি হয়, অতঃপর যখন তাতে আদা মিশ্রণ করা হয়, তখন তাতে সমতা ফিরে আসে। বাহ্যিকতার দাবী হল, পূর্বের পেয়ালার পানীয় অপেক্ষা পরবর্তী পেয়ালার পানীয় ভিন্ন হবে। অবশ্যই উভয়টা ভিন্ন স্বাদের হবে। এক পেয়ালার পানীয়তে কাফুর মিশ্রিত থাকবে আর অন্য পেয়ালার পানীয়তে আদা মিশ্রিত থাকবে।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাদের পানীয়ের মধ্যে যে কাফুর মিশ্রণ করা হবে, তার শীতলতা হল তাদেরকে নির্দেশিত বিষয় অর্থাৎ ভীতি, ত্যাগ, ধৈর্যসহ তাদের সকল দায়িত্ব সম্পাদনের কারণে তাদের মধ্যে যে দাহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, তার বিপরীতে। যদিও তাদের নির্দেশিত বিষয় অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। তাছাড়া তারাও মান্নতের মাধ্যমে অনেক বিষয় আবশ্যকীয় করে থাকে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا ٥ আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরষ্কার স্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র৩১৭।
কেননা, ধৈর্যে কঠোরতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মত বিষয় নিহিত রয়েছে। যার দাবী হল, নিয়ন্ত্রণ ও কঠোরতার বিপরীত বিষয় অর্থাৎ প্রশস্ত জান্নাত ও রেশমী বস্ত্র তাদের লাভ করা।
আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের মাঝে উৎফুল্লতা, সজীবতা ও উজ্জ্বলতার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। চেহারার সজীবতার দরুন তাদের বাহ্যিক সুন্দর হবে আর অন্তরের প্রফুল্লতার দরুন অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। যেমনি দুনিয়াতে ইসলামের বিধানাবলীর সঠিক বাস্তবায়ন ব্যক্তির নিজের বাহ্যিক দিক সৌন্দর্যমন্ডিত ও সুশোভিত করে তোলে আর ঈমানের মূলধারা অভ্যন্তরকে সুশোভিত করে তোলে। এ সূরার শেষাংশের আল্লাহ তাআলার এ বাণীর মর্মার্থ এরূপই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَالَيْهُمْ ثِيَابُ سُنْدُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقَ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِنْ فِضَّةٍ তাদের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্থূল রেশম, তারা অলংকৃত হবে রৌপ্য নির্মিত কংকণে৩১৮। এহচ্ছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চিত্র। আল্লাহ তাআলা অতঃপর ইরশাদ করেন وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا আর তাদের প্রতিপালক তাদের কে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়৩১৯।
এটা হল অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের চিত্র।
মানব পিতা হযরত আদম আ. কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর মর্মার্থ এটাই। إِنْ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى তোমার জন্য এটাই রইল, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না, নগ্নও হবে না, وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى এবং সেখানে পিপাসার্ত হবে না এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না৩২০।
আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, সেখানে ক্ষুধার কারণে অভ্যন্তরীন কষ্ট হবে না এবং নগ্নতার দ্বারাও বাহ্যিক কষ্ট হবে না। তৃষ্ণার কারণে অভ্যন্ত রীণ কাতরতার সৃষ্টি হবে না এবং রৌদ্রের কারণে বাহ্যিক কাতরতা সৃষ্টি হবে না। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর প্রদত্ত নিআমতর কথা এক এক করে স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে লজ্জা নিবারনের জন্য পোশাক দান করেছেন। এটা তাদের বাহ্যিক দিককে সুশোভিত করে। এটা ব্যতীতও অন্য একটি পোশাক রয়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে। তা হল, তাকওয়া তথা খোদাভীতি।
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, উপরোক্ত পোশাক দু'টি হল, তাকওয়া তথা খোদাভীতির পোশাক। আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর মর্মার্থ এরই মত। তিনি ইরশাদ করেন,
إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بزينة الكواكب وحفظا مِنْ كُلِّ شَيْطَانِ مارد আমি নিম্নতম আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে৩২১।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা আকাশের বাহ্যিক দিককে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছেন আর অভ্যন্তরীণ দিককে বিদ্রোহী শয়তান থেকে রক্ষা করার দ্বারা সুশোভিত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা হজ সম্পাদনের ইচ্ছা পোষণকারীদের ব্যাপারে যা বলেছেন, তাও এরই ন্যায়। কেননা, তিনি হজব্রত পালনে ইচ্ছা পোষনকারীদেরকে কা'বা পর্যন্ত ভ্রমণের পাথেয় নিতে যেমনিভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনিভাবে পরপারের ভ্রমণের পাথেয় সঞ্চয়েরও নির্দেশ দিয়েছেন। আর তা হল তাকওয়া তথা খোদাভীতি।
আযীযে মিসর-এর স্ত্রী হযরত ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারে যা বলেছেন, তাও এর-ই ন্যায়। সে বলেছে, فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَنِي فيه সে বলল, এ-ই সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। তখন সে অন্য সব মহিলাকে হযরত ইউসুফ আ.-এর বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখিয়ে তাদেরকে বলল, وَلَقَدْ رَاوَدَّتْهُ عَنْ نَفْسَه فَاسْتَعْصَم আমি তো তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছি, কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে।৩২২ এর দ্বারা সে হযরত ইউসুফ আ. এর আত্মিক সৌন্দর্যের কথা সকল মহিলার সামনে তুলে ধরেছে। কুরআন কারীমে এ জাতীয় বিষয় অনেক রয়েছে।
টিকাঃ
৩০২. সূরা আনআম, আয়াত ৬
৩০৩. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৫১
৩০৪. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৬
৩০৫. সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫
৩০৬. খ. ১ পৃ. ৩৯১
৩০৭. খ. ১, পৃ. ৫৪৯
৩০৮. খ. ২, পৃ: ৯৭৪
৩০৯. খ. ১, পৃ. ১৭২
৩১০. খ. ২ প. ৮৪
৩১১. খ. ২ প. ৩৮০
৩১২. সুরা মু'মিন, আয়াত: ১৮
৩১৩. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৫
৩১৪. সূরা দাহর, আয়াত: ৫, ৬
৩১৫. সূরা দাহ্, আয়াত: ১৭-১৮
৩১৬. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ২২-২৮
৩১৭. সূরা দাহর, আয়াত ১২
৩১৮. সূরা দাহর, আয়াত ২১
৩১৯. সূরা দাহর, আয়াত ২১
৩২০. সূরা তা-হা, আয়াত: ১১৭-১৮
৩২১. সূরা সাফফাত, আয়াত: ৬-৭
৩২২. সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩২
📄 জান্নাতীদের খাবার ও পানীয় এবং পরিপাক পদ্ধতি
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي ظِلَالٍ وَعُيُونٍ وَفَوَاكِهَ مِمَّا يَشْتَهُونَ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণবহুল স্থানে। তাদের বাঞ্ছিত ফলমূলের প্রাচুর্যের মধ্যে। তোমাদের কর্মের পুরস্কার স্বরূপ তোমরা তৃপ্তিসহ পানাহার কর৩২৩।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ ، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابَيَة . فَهُوَ فِي عيشة راضية فِي جَنَّةِ عَالِيَة • قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ، كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَة
তখন যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, নেও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ আমি জানতাম, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে, সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে। তাদেরকে বলা হবে, পানাহার কর তৃপ্তিসহকারে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে, তার বিনিময় স্বরূপ৩২৪।
وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ এ হল জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ। لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْهَا تَأْكُلُونَ সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা হতে তোমরা আহার করবে৩২৫।
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার উপমা এরূপ: তার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তার ফলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী৩২৬।
وَأَمْدَدْنَا هُمْ بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمِ مِمَّا يَشْتَهُونَ আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, আমি তাদেরকে দিব ফলমূল এবং গোস্ত, যা তারা পসন্দ করে। يَتَنَازَعُونَ فِيهَا كَأْسًا لَّا لَغْوٌ فِيهَا وَلَا تَأْثِيمٍ সেখানে তারা পরস্পরের মধ্যে আদান প্রদান করতে থাকবে পান পাত্র, যা হতে পান করলে কেউ অসার কথা বলবে না, পাপ কর্মেও লিপ্ত হবে না। (অথচ দুনিয়ার মদে উভয় প্রকার মন্দতা বিদ্যমান)
يُسْقَونَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় হতে পান করানো হবে। خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ তার মোহর মিশকের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক৩২৭।
সহীহ মুসলিমে৩২৮ হযরত জাবির রা. হতে আবুয-যুবাইর বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يَأْكُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ وَيَشْرَبُونَ জান্নাতীগণ পানাহার করবে। لَا يَبُولُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَمْتَخِطُونَ সেখানে প্রস্রাব-পায়খানা ফেলতে হবে না এবং প্রস্রাব-পায়খানা করতে হবে না। (পার্থিব জগতের খাবার পরিপাক তন্ত্র ঘুরে এসে তরল বস্তুতে পরিণত হয় তখন প্রস্রাব ও পায়খানার প্রয়োজন পড়ে) طَعَامُهُمْ ذَلِكَ جُشَاءٌ كَرِيحِ الْمِسْكِ তাদের খাবার হযমকারী বস্তু হবে কস্তুরির মত, সুগন্ধিময় ঢেকুর। يلهمون التسبيح والتكبيركما تلهمون النفس তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস যেমনিভাবে অব্যাহত রাখা হয়, তেমনিভাবে তাদের মাঝে তাসবীহ ও তাকবীর অব্যাহত রাখা হবে।
এমনিভাবে মুসলিম শরীফে৩২৯ হযরত জাবির রা. হতে হযরত তালহা ইবনে নাফে'র বর্ণনা রয়েছে। فمابال الطعام : قال সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, জান্নাতীগণতো পানাহার করবে, তাহলে তাদের খাদ্য পানীয় কিসে রূপান্তরিত হবে?
قال : جشاء ورشح كرشح المسك জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধিময় ঘাম ও ঢেকুর। (ঢেকুর ও ঘাম দ্বারাই সে খাদ্য হযম হয়ে যাবে( يلهمون التسبيح والحمد হামদ ও তাসবীহ তাদের অন্ত রে ঢেলে দেওয়া হবে।
মুসনাদ ও সুনানে নাসায়ীতে বুখারীর বর্ণনা ধারার শর্ত মোতাবেক হাদীস বর্ণিত রয়েছে। সেখানে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী-খৃস্টান) এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, يا ابا القاسم تزعم أن أهل الجنة يأكلون ويشربون হে আবুল কাসিম! আপনি কি মনে করেন, জান্নাতীগণ পানাহার করবে? قال : نعم والذي نفس محمد بيده أن أحدهم ليعطى قوة مأة رجل من الأكل والشرب والجماع والشهوة নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হ্যাঁ, সে সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক জান্নাতীদেরকে পানাহার, সহবাস ও কাম প্রবৃত্তিতে একশত ব্যক্তির শক্তি প্রদান করা হবে।
قال : فان الذي يأكل ويشرب تكون له الحاجة সে বলল, যে পানাহার করবে, অবশ্যই তার মানবীয় প্রয়োজন দেখা দেবে। وليس في الجنة اذى অথচ জান্নাতে তো কোন প্রকার ময়লা নেই। (তাহলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে কোথায় যাবে?)
قال : تكون حاجة أحدهم رشحا يفيض من جلودهم كرشح المسك فيضمر بطنه রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের চামড়া হতে কস্তুরির ন্যায় সুরভিত ঘাম নির্গমনের দ্বারা তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটে যাবে এবং পেটও খালি হয়ে যাবে।
ইমাম হাকিম রহ. তাঁর সহীহ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এক ইহুদী ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল, হে আবুল কাসিম! আপনি কি মনে করেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে পানাহার করবে? সে ইহুদী তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বলল, সে (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যদি বলে, হ্যাঁ, তবে আমি তাকে নিরুত্তর করার জন্য আরো প্রশ্ন করতে থাকব। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আমি এটাই মনে করি। ঐ সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, অবশ্যই প্রত্যেক জান্নাতী ব্যক্তিকে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও কাম প্রবৃত্তিতে একশত ব্যক্তির সমপরিমাণ শক্তি প্রদান করা হবে। ইহুদী পুনরায় প্রশ্ন করল, যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, তার অবশ্যই প্রাকৃতিক প্রয়োজন বোধ হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের চামড়া হতে নির্গত কস্তুরির ন্যায় সুরভিত ঘামের দ্বারাই তাদের সে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটে যাবে। এর দ্বারা তাদের পেটও খালী হয়ে যাবে।
হাসান ইবনে আরাফাহ স্ব-সনদে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, إنك لتنظر إلى الطير في الجنة فتشتهيه فيخر بين يديك مشويا তুমি যখনি তা খাওয়ার ইচ্ছা করবে, তখনি তা ভুনা অবস্থায় তোমার সামনে এসে উপস্থিত হবে।
ইতোপূর্বে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের রা. ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে জান্নাতের সর্বপ্রথম খাদ্য ও পানির উল্লেখ রয়েছে। (অর্থাৎ জান্নাতীদেরকে জান্নাতে সর্বাগ্রে কোন ধরনের খাবার ও পানীয় প্রদান করা হবে।)
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,৩৩০ কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটি রুটির আকৃতি হবে আর আল্লাহ তাআলা তাকে তাঁর এক হাত হতে অন্য হাতে নিবেন। সেই রুটি দ্বারা জান্নাতীদেরকে আপ্যায়ন করা হবে।
ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত হুযাইফা রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان في الجنة طيرا أمثال البخاتی জান্নাতে বুখতী উটের (এক প্রজাতির উট) ন্যায় বৃহদাকারের পাখী থাকবে। فقال : ابوبكر انها لناعمة يارسول الله তখন হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাতো অবশ্যই হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় তৃপ্ত হবে? قال : أنعم منها من يأكلها )কেননা, তা জান্নাতের পাখী( রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভক্ষণকারী তা অপেক্ষা অধিক নিআমত ধন্য হবে। وأنت ممن يأكلها يا أبا بكر হে আবূ বকর! তুমিও তার ভক্ষণকারীদের একজন হবে।
ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত কাতাদাহ রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَلَحْمِ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাতীগণ যেমনিভাবে আরাম-আয়েশে থাকবে, জান্নাতের পাখিগুলোও তেমনি আরাম-আয়েশে থাকবে বলে আমি মনে করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভক্ষণকারীরা তা অপেক্ষাও অধিক আরাম-আয়েশে থাকবে। সে পাখীর ঘাড় উষ্ট্রীর ঘাড়ের ন্যায় বৃহদাকারের হবে। হে আবূ বকর! আমি আল্লাহর দরবারে আশাবাদী, তুমিও তা ভক্ষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
একই সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে হযরত কাতাদাহ রহ. يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَاب এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জান্নাতীদের নিকট সত্তর প্রকারের স্বর্ণের পানপাত্র নিয়ে প্রদক্ষিণ করা হবে। প্রত্যেক পাত্রের খাদ্য ও আহারের রং ও প্রকৃতি অন্যটি অপেক্ষা ভিন্নতর হবে।
দারাওয়ারদী স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, তাতে হাউযে কাউসারের ব্যাপারে উল্লেখ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেটি একটি নদী, যা আমার প্রভু আমাকে দান করেছেন। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা অধিক শুভ্র এবং অমৃত অপেক্ষা অধিক মিষ্ট হবে। فيه طيور أعناقها كأعناق الجزر সেখানে উটের ঘাড়ের ন্যায় বৃহৎ ঘাড় বিশিষ্ট পাখী রয়েছে। فقال عمر بن الخطاب : انها يا رسول الله الناعمة !
তখন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে সকল পাখীতো হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় তৃপ্ত থাকবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ভক্ষণকারী তদাপেক্ষা আরো অধিক নিআমত ধন্য হবে।
ইবরাহীম ইবনে সাঈদ অনুরূপ হাদীস উল্লেখ করেছেন। তবে তাতে হযরত উমর রা.-এর স্থলে হযরত আবূ বকর রা.-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
উসমান ইবনে সাঈদ দারেমী রহ. স্ব সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَكَأْس من معين এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, সে সব পানপাত্রে এমন সুরা থাকবে, যা পান করার দ্বারা মাথা ঘুরাবে না এবং সংজ্ঞাও হারাবে না। وَكَأْسًا دَهَاقًا এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে সকল পানপাত্র পরিপূর্ণ থাকবে مِن رَّحِيقٍ مَّحْتُومٍ এর ব্যাখ্যায় বলেন, তাতে কস্তুরির মোহর সমৃদ্ধ থাকবে।
হযরত আলকামাহ রহ. হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। ختامه مسكদ্বারা উদ্দেশ্য হল, তার পানীয়তে কস্তুরির মিশণ থাকবে। তার দ্বারা উদ্দেশ্য মোহর নয়।
গ্রন্থকার বলেন, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জ্ঞাত। তবে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে পানীয়তে কস্তুরির মিশণ থাকবে। আর ختام শব্দটি خاتمه থেকে উৎকলিত, ختم থেকে নয়।
যায়দ ইবনে মুআবিয়া রহ. বলেন, আমি হযরত আনাস রা. কে ختامه مسك এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমি তখন ختامه مسك পাঠ করেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, ختامه مسك পড়।
আলকামাহ রহ. বলেন, ختامه অর্থ হল خلطه অর্থাৎ মিশণ। তোমরা কি লক্ষ্য কর না, তোমাদের স্ত্রীরা বলে থাকে ك للطيب ان خلطه من مسك لكذا সুগন্ধিতে এভাবে কস্তুরির সংমিশণ রয়েছে।
হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর হযরত মাসরুক রহ. থেকে الرحيق المختوم এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন যে, الرحيق দ্বারা উদ্দেশ্য হল পানীয়, المختوم দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তার শেষাংশে কস্তুরির স্বাদযুক্ত হওয়া।
একই সনদে হযরত আবদুল্লাহ হতে মাসরুক রহ. বর্ননা করেন, তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী ومزاجه من تسنیم এর ব্যাখ্যায় বলেন, নৈকট্যশীল ব্যক্তিগণতো অন্য কোন মিশ্রণ ব্যতীত খাঁটি পানীয় পান করবে, কিন্তু অন্যরা অন্য বস্তু মিশ্রিত পানীয় পান করবে।
এমনিভাবে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, নৈকট্যশীল বান্দাগণ অন্য কোন মিশ্রণ ব্যতীত খাঁটি পানীয় পান করবে কিন্তু অন্যরা অন্য বস্তু মিশ্রিত পানীয় পান করবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, ختامه مسك এর মধ্যে ختام শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মাটি অর্থাৎ তার মাটি কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধিময় হবে। তবে এ তাফসীর ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কেননা, অন্য অর্থে আয়াতের শব্দ এর চেয়েও অধিক সুস্পষ্ট। হতে পারে এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য হল, পানীয় পান করার পর পানপাত্রে যে ফেনা থাকবে, তা কস্তুরির ন্যায় হবে।
ইমাম হাকিম রহ. হযরত আবূ দারদা রা.-এর হাদীস স্ব-সনদে আদম হতে বর্ণনা করেন, তাতে রয়েছে তিনি ختامه مسك এর ব্যাখ্যায় বলেন, তার পানীয় রৌপ্যের ন্যায় সাদা হবে, সর্বশেষ জান্নাতী ব্যক্তি পান না করা পর্যন্ত তা টইটম্বুর থাকবে। দুনিয়ার কোন ব্যক্তি যদি তাতে হাত প্রবেশ করিয়ে বের করত, যমীনের সব প্রাণীর কাছে তার সুঘ্রাণ পৌছে যেত।
উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী আদম রহ. বলেন, হযরত আতা রহ. হতে আবূ শাইবা আমাকে বর্ণনা করেন, তাসনীম হল সুর মিশ্রিত পানীয় বিশিষ্ট প্রস্রবণ।
ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَكَأْسًا دَهَاقًا এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে সকল পান পাত্র পরিপূর্ণ থাকবে।
ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, আমি অনেকবার আব্বাস নাহভীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমাকে পাত্র ভরে পান করাও। এ কথা বুঝানোর জন্য তিনি যেহেতু এ واهق শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাহলে বুঝা যায় دهاق অর্থ হল পরিপূর্ণ হওয়া। তিনি যেহেতু ভাষাবিদ, তার সে কথা দলীল হতে পারে।
إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُوا (নিশ্চয় সৎকর্মশীলেরা পান করবে পানীয় মিশ্রণ কাফুর) এর আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।
কতক আরবী ভাষাবিদ বলেন, سلسبیل এটি فعل )কর্ম( فعل )কর্তা( مفعول )কর্মপদের) সমন্বিত একটি বাক্য। মূলত বাক্যটি ছিল سل سيلا اليها সে নহর পর্যন্ত পৌছার রাস্তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর। তবে এটি বিশুদ্ধ মত নয়; বরং বিশুদ্ধ মত হল, এটি একটি একক শব্দ। এটি একটি বর্ণনার নাম।
আবুল আলিয়াহ রহ. বলেন, জান্নাতীদের পথে ও গৃহে সামনা সামনি দু'টি নদী প্রবাহিত হবে। সে নদী এমন সুন্দর হবে, যেন শুধু তাই প্রবহমান একমাত্র নদী। তার শোভা ও সৌন্দর্যের কারণেই তাকে سلسبیل বলা হয়।
অন্যরা বলেন, সালসাবীল অর্থ হল অত্যন্ত সুস্বাদু।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, সে নদী সুন্দর ও শোভনীয় হওয়ার দরুন তার এ গুণ ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে তাকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে।
ইবনে আম্বারী রহ. বলেন, সালসাবীল কোন ঝর্ণার নাম নয়; বরং ঝর্ণার পানির নাম হল, সালসাবীল। তাঁর এ মতের সমর্থনে তিনি দু'টি দলীল পেশ করেছেন।
প্রথম দলীল, সালসাবীল শব্দটি হল منصرف যদি এটি কোন ঝর্ণার নাম হত, তাহলে তা غیر منصرف হত। কেননা غیر منصرف হওয়ার জন্য যে দু'টি কারণ বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন, এতে দু'টিই রয়েছে, تأنيث তথা স্ত্রী লিঙ্গ হওয়া ও নাম হওয়া।
দ্বিতীয় দলীল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. তার অর্থ করেছেন, 'যা অতি সহজে গলধঃকরণ করা যায়' আর গলা দিয়ে পানি অবনমিত হয়, ঝর্ণা নয়।
উক্ত বর্ণিত দলীল দু'টি এর দলীল হতে পারে না। কেননা, এ শব্দটিকে منصرف পড়া হয় শুধু তার পূর্বাপরের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার্থে। ইবনে আব্বাস রা. যে অর্থ বর্ণনা করেছেন সে হিসাবে তার তরলতা ও সহজ পানীয় বলেই তার এ নামকরণ করা হয়েছে।
উক্ত আয়াত ও হাদীসের আলোকে বুঝা যায়, জান্নাতীদের জন্য রুটি, গোস্ত, ফলমূল, মিষ্টি দ্রব্যাদিসহ বিভিন্ন পানীয় অর্থাৎ দুধ, পানি ও শরাব থাকবে। দুনিয়াতে যে সকল বিষয় পাওয়া যায়, জান্নাতে সেগুলোর শুধু নামের মিল থাকবে। (উদাহরণত দুনিয়াতে রুটি আছে এবং জান্নাতেও রুটি থাকবে, তবে তার স্বাদ এবং প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। তবে উভয়টাকেই রুটি বলা হয়ে থাকে।)
একই নামের বস্তু দুনিয়াতে এবং আখিরাতে হওয়া সত্ত্বেও স্থানের ভিন্নতার কারণে উভয়ের মাঝে স্বাদ ও প্রকৃতি-আকৃতি, গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের বিরাট ব্যবধান থাকবে।
প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, গোস্ত কোথায় ভুনা করা হবে। জান্নাতেতো আগুন থাকবে না।
জবাব: কেউ কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা কুন্ (হয়ে যাও) বলার দ্বারা তা ভুনা হয়ে যাবে।
কেউ কেউ বলেন, সে গোশ্তগুলো জান্নাতের বাইরে ভুনা করে জান্নাতীদের জন্য পেশ করা হবে।
তবে সঠিক বিষয় হল, আগুন ব্যতীতই আল্লাহ তাআলা তা ভুনার উপকরণ সৃষ্টি করবেন। যেমনিভাবে সেখানকার ফলমূল ও খাদ্যের উপকরণ দুনিয়ার ফলমূল ও খাদ্যের উপকরণ থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। এও হতে পারে, সেখানে এমন আগুন থাকবে, যা কোন বস্তুকে ধ্বংস করবে না।
সহীহ হাদীসে৩৩১ উল্লেখ রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীদের অঙ্গার আগরবাতি হতে উজ্জ্বল হবে। জান্নাতীরা সে আগরবাতির কাষ্ঠ জালিয়ে ধোঁয়া দিবে, যাতে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়বে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, জান্নাতে ছায়া হবে। তাহলে ছায়ার জন্য সে বস্তুর প্রয়োজন, যার উপর ছায়া পড়বে।
هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِنُونَ তারা এবং তাদের স্ত্রীরা সুশীতল ছায়ায় সু-সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে৩৩২।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي ظِلَالٍ وَعُيُونِ মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণবহুল স্থলে৩৩৩।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا এবং তাদেরকে চির স্নিগ্ধ ছায়ায় প্রবিষ্ট করব৩৩৪।
খাবার পানীয় ও সুগন্ধিময় ধোঁয়া থাকা এমন উপকরণের দাবী করে, যার দ্বারা সেগুলো পূর্ণ হতে পারে। (আগুন ছাড়া ধোঁয়া হতে পারে না। সুতরাং জান্নাতে আগুন বিদ্যমান থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হল।)
কারণ, সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ তাআলা। তিনিই হলেন সকলের প্রভু। তিনি ব্যতীত কোন মা'বুদ তথা উপাস্য নেই। তাই আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের খাবার হযমের জন্য ঢেকুর ও ঘামকে কারণ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যেমনভাবে খাবার হযম করার জন্য আল্লাহ তাআলা একটি কারন নির্ধারন করেছেন, তেমনিভাবে খাবার রান্না করারও একটি উপকরণ নির্ধারন করতে পারেন। হতে পারে আল্লাহ তাআলা তাদের পেটে এমন উষ্ণতা সৃষ্টি করবেন, যার দ্বারা খাবার রান্না হয়ে যাবে। এমনিভাবে সেখানকার ফলমূল রান্নার জন্যও তিনি উষ্ণতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
গাছ-পাতাকে ছায়ার উপকরণ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভু একই সত্তা। তিনিই সকল কারন, আদি কারণ ও উপকরণের সৃষ্টিকর্তা। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল সৃষ্টিকৃত বস্তু তারই নির্দেশে হয়ে থাকে। উপকরণ ও কর্ম হল, তাঁর হিকমতের প্রকাশস্থল। যদিও উপকরণ ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্যই বান্দা আশ্চর্যবোধ করে যে, কোন কোন বস্তু তার নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যতীত অন্য উপকরণ দ্বারাও সংগঠিত হয়ে থাকে। এ আশ্চর্য বোধ কখনো কখনো বান্দাকে অস্বীকৃতিতে উদ্বুদ্ধ করে; কিন্তু তা একমাত্র অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণেই সৃষ্টি হয়।
কেননা, কোন কাজের নির্ধারিত উপকরণ ব্যতীত অন্য উপকরণের দ্বারা তার অস্তিত্ব প্রদানে আল্লাহ তাআলার কুদরত অপারগ নয়। (যেমন বৃক্ষরাজির সজীবতা লাভের নির্ধারিত উপকরণ হল, পানি দ্বারা সেচ দেওয়া। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আগুন দ্বারাও তাকে সজীব করতে পারেন। কেননা, আল্লাহ তাআলার জন্য তো কর্মের নির্ধারিত উপকরণে কর্ম সম্পাদনের বাধ্য বাধকতা নেই।)
তিনি এ জগতে যেমনিভাবে কারণ, আদি কারণ ও উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, তেমনিভাবে পরজগতেও এমন সৃষ্টি করতে পারেন। এ জগতে এসব সৃষ্টি করতে যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা অক্ষম নন, তেমনিভাবে পরজগতেও তিনি এসব সৃষ্টি করতে অক্ষম নন। কেননা, দুনিয়াতে এসব বস্তু সৃষ্টি করার চেয়ে আখিরাতে সৃষ্টি করা অধিকতর সহজসাধ্য। কেননা, দুনিয়ার এ শক্ত মাটি ও পানি হতে ফল সৃষ্টি করা জান্নাতের মাটি, পানি ও আবহাওয়া হতে সৃষ্টি করা অপেক্ষা কঠিনতর ও আশ্চর্যের বিষয়।
হতে পারে, পর্বতমালার প্রস্তরের তীক্ষ্ণ বালি হতে স্বর্ণ-রৌপ্য সৃষ্টি করা অন্য উপকরণের সাহায্যে সৃষ্টি করা অপেক্ষা অধিক আশ্চার্যজনক।
মোট কথা হল, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তাঁর যে সকল নিদর্শনাবলী সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করার জন্য নির্দেশ দান করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে চিন্তা ও গবেষণা করুন। আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে তাঁর কুদরতের পূর্ণাঙ্গতা, তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা, তাঁর ইচ্ছার নি:শর্ততা, তাঁর স্বাধীনতা, হিকমত ও রাজত্বের উপর প্রমাণ ও নিদর্শন বানিয়েছেন। তাঁর প্রভুত্ব ও একত্ববাদের জন্য দলীল নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং দুনিয়ার বস্তু আখিরাতের বস্তুসমূহের সাথে তুলনা করলে এ ফলাফল পাবে, সেগুলো অপেক্ষা দুনিয়াবী বস্তুই আল্লাহ তাআলার কুদরতকে অধিক সুস্পষ্টভাবে বুঝায় ও তার সাক্ষ্য বহন করে। উভয়টাকে একই প্রদীপালয়ে পাবে। আর প্রভুও একজন। সৃষ্টিকর্তাও একজন। সব বস্তুর মালিকও একজন। যারা এ বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে না। তাদের জন্য চূড়ান্ত ধ্বংস অপেক্ষমাণ।
টিকাঃ
৩২৩. সূরা মুরসালাত, আয়াত: ৪১-৪৩
৩২৪. সূরা হাক্কা, আয়াত: ১৯-২০
৩২৫. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭২-৭৩
৩২৬. সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৫
৩২৭. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ২৫-২৬)
৩২৮. খ. ২ পৃ. ৩৭৯
৩২৯. খ. ২, পৃ. ৩৭৯
৩৩০. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৬৫
৩৩১. বুখারী, খ. পৃ. ৪৬০
৩৩৩. সূরা মুরসালাত, আয়াত: ৪১
৩৩৪. সূরা নিসা, আয়াত: ৫৭
📄 জান্নাতের তৈজসপত্র
يُطَافُ عَلَيْهِم بصَحَافَ مِّن ذَهَب وَأَكْوَاب আল্লাহ তাআলার বাণী স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে পদক্ষিণ করা হবে। এর ব্যাখ্যায় কালবী রহ. বলেন, صحف অর্থ হল قصع অর্থাৎ পেয়ালা।
লাইস রহ. বলেন, صحفة রাজকীয় বিশাল গামলাকে বলা হয়, যেমন আ'শা কবির কবিতায় রয়েছে,
والضامرات تحت الرجال • والمكاكيك والصحاف من الفضة
রৌপ্য নির্মিত বিশাল গامলা ও পানপাত্র রয়েছে। সেখানে পুরুষের জন্য রয়েছে সরু কোমর বিশিষ্ট দ্রুতগামী বাহন। أكواب হল كوب এর বহুবচন। ফাররা নাহভী বলেন, হাতলবিহীন গোল মুখ বিশিষ্ট পেয়ালাকে کوب বলা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আদীর এ কবিতা আবৃত্তি করেন, يسعى عليه العبد بالكوب متكنا تصفق أبوابه- তারা রুদ্ধ দ্বার কক্ষে থাকবে। সেখানে দ্রুত পায়ে পান পাত্র হাতে ক্রীতদাস ছুটে যাবে।
আবূ উবাইদ রহ. বলেন, হাতলবিহীন গোলাকৃতি পাত্রকে کوب বলা হয়। মুকাতিল রহ. ও আবূ ইসহাক ওহ.-অনুরূপ মত পেশ করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নালীবিহীন পাত্রকে کوب বলা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُخَلَّدُونَ بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيقَ وَكَأْسٍ مِنْ مَعِينٍ Ο তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চিরকিশোরেরা, পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে।৩৩৫
নালী ও হাতল বিশিষ্ট পাত্রকে اباریق বলা হয়। আর নালী ও হাতলবিহীন পাত্রকে أكواب বলা হয়।
ابریق এটি افعیل এর ওযনে بریق হতে উৎকলিত। ابریق বলা হয় সে পাত্রকে যা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করলে উজ্জ্বল ও ঝকঝকে হয়।
জান্নাতে সে পাত্র (ابریق ইবরীক) হবে রূপার তৈরী। তা কাঁচের ন্যায় ঝকঝকে হবে, তার ভিতরের বস্তু বাহির হতেও দেখা যাবে। আরবগণ তরবারিকেও ইবরীক বলে থাকে; কেননা, তরবারীও অত্যন্ত ঝকঝকে হয়।
ইবনে আহমারের কবিতায় এ ব্যবহারই পরিলক্ষিত হয়। কবিতাটি হল, تعلقت إبريقا وعلقت جفنه • ليهلك حياذا زهاء وخامل
আমি তরবারি ঝুলিয়ে রেখেছি ও তার খাঁপ বেঁধে রেখেছি, যেন প্রত্যেক অহংকারী ও অকৃতজ্ঞকে হত্যা করতে পারি।
নাওয়াদিরুল লিহয়ানিতে রয়েছে إمرئة إبريق বিদ্যুতের মত উজ্জ্বল মহিলাকে বলা হয়।
يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِأَنيَة مِنْ فِضَّة وَأَكْوَاب كَانَتْ قَوَارِيرَ قَوَارِيرَ مِنْ فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا . তাদের কে পরিবেশন করা হবে রৌপ্য পাত্রে এবং স্ফটিকের মত স্বচ্ছ পানপাত্রে। রজত শুভ্র স্ফটিক পাত্রে, পরিবেশনকারীরা যথাযথ পরিমাণে তা পরিমিত করবে।৩৩৬
قواریر অর্থ হল কাঁচ, কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে সকল পাত্রের মৌল উপাদান হিসাবে রৌপ্যের কথা উল্লেখ করলেন। তাহলে বুঝা যায়, তা রৌপ্য দ্বারা নির্মিত হবে, তবে কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ হবে। সে সব বস্তু সুন্দর ও শোভনীয় হবে।
মুজাহিদ রহ. কাতাদাহ রহ. মুকাতিল রহ. কালবী ও কা'বী রহ. সহ সকল মুফাসসির বলেন, জান্নাতের কাঁচ হবে রৌপ্যের। সুতরাং সে পাত্রে রৌপ্য ও কাঁচ উভয়টার স্বচ্ছতার সমাবেশ ঘটবে।
ইবনে কুতাইবা রহ. বলেন, জান্নাতের নদী, খাট, বিছানা, পানপাত্র ও অন্যান্য সকল বস্তুই দুনিয়ার মানুষের তৈরী বস্তু হতে ভিন্নতর হবে। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতে যে সকল বস্তু রয়েছে, দুনিয়াতে সে সকল বস্তুর সাথে নামের সাদৃশ ব্যতীত অন্য কিছুই নেই। (অর্থাৎ জান্নাতের বস্তু ও দুনিয়ার বস্তুর মধ্যে একমাত্র নামের সাদৃশ্যই রয়েছে। এ ছাড়া স্বাদ, আকৃতি-প্রকৃতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন।)
দুনিয়ার পানপাত্র কখনো রৌপ্য দ্বারা নির্মিত করা হয়, কখনো কাঁচ দ্বারা তৈরী করা হয়; কিন্তু জান্নাতের পানপাত্র শুভ্রতার ক্ষেত্রে হবে রৌপ্যের ন্যায় আর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে হবে কাঁচের ন্যায়। এখানে কাঁচকে রূপার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ ধরনের হবে যেন তা রৌপ্য নির্মিত।
আল্লাহ তাআলার এ বাণীর ন্যায় كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল অর্থাৎ জান্নাতের নারীরা রং ও রূপে পদ্মরাগের মত আর স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে প্রবালের ন্যায়।
কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলতে পারে, কাঁচ ও রূপা ভিন্ন ভিন্ন দু'টি ধাতু হওয়া সত্ত্বেও একই বস্তু রূপা ও কাঁচ কিভাবে হতে পারে? আমাদের পূর্বের আলোচনার আলোকে এ প্রশ্ন থাকতে পারে না। (অর্থাৎ দুনিয়াতে যদিও এগুলো দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধাতু; কিন্তু জান্নাতে এরূপ নয়।)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا ١٠ تَقْدِير অর্থ হল, কোন বস্তু নির্ধারিত পরিমাণে তৈরী করা। সুতরাং সে সকল পাত্র একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে তৈরী করা হবে, যা অপেক্ষাকৃত বড়ও হবে না, ছোটও হবে না। পানকারীদের পানে তা স্বাদ বৃদ্ধি করবে। কেননা, যদি পানীয় তৃষ্ণা অপেক্ষা কম হয়ে থাকে, তবে স্বাদানুভূতি পূর্ণ হয় না আর যদি পানীয় তৃষ্ণা অপেক্ষা অধিক হয়, তৃষ্ণা নিবারণের পরও যদি বাকী থাকে তবে তা বিরক্তিকর। মুফাস্সিরীনে কিরামের এক জামাত এ মতামত পেশ করেন।
ইমাম ফাররা রহ. বলেন, প্রত্যেক পানকারীর তৃষ্ণার পরিমাপে পানপাত্র তৈরী করা হবে। তার পানীয় পানকারীর তৃষ্ণা অপেক্ষা কমও থাকবে না, বেশিও থাকবে না; বরং পরিমাণ মত থাকবে।
আবু উবায়দ রহ. বলেন, পানীয় পরিবেশনকারী পানকারীর তৃষ্ণা পরিমাণ পানীয়ই পাত্রে ঢালবে। এ অবস্থায় যমীর তথা সর্বনাম ফেরেশতা বা খাদেমদের দিকে ফিরবে। যারা জান্নাতীদের খিদমতে নিয়োজিত থাকবে। তারা সে পরিমাণই পানীয় পানপাত্রে ঢালবে যে পরিমাণে পানকারী পরিতৃপ্ত হয়। এর চেয়ে কমও ঢালবে না, বেশিও ঢালবে না।
মুফাসসিরগণের এক জামাত বলেন, يسقون এর মধ্যাবস্থিত যমীর তথা সর্বনামটি পানকারীদের দিকে ফিরবে। অর্থাৎ পানকারীদের অন্তরে একটা পরিমাণ নির্ধারিত থাকবে। সে পরিমাণই তাদেরকে প্রদান করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে জমহুরে মুফাসসিরীনের মতটি অধিক নির্ভরযোগ্য ও পসন্দনীয়। والله اعلم
کاس এর ব্যাপারে হযরত আবূ উবাইদ রহ. বলেন, كأس হল পানীয়তে পূর্ণ পানপাত্র। আবূ ইসহাক রহ. অনুরূপ মত পেশ করেছেন। কোন কোন মুফাসসির كأس এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, كأس হল সুরা।
হযরত আতা রহ. হযরত কালবী ও মুকাতিল রহ. প্রমুখের মতও এটিই। এমনকি যাহ্হাক রহ. বলেন, কুরআনের মধ্যে যে স্থানেই كأس শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেখানেই 'সূরা' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য, ইঙ্গিত সব কিছু বিবেচনা করেই তাঁরা এ অর্থ বর্ণনা করেছেন। কেননা, এখানে শুধু পাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং পানীয়সহ পানপাত্র উদ্দেশ্য।
সহীহায়নে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, جنتان من ذهب آنيتهما وما فيهما উভয় জান্নাত হবে স্বর্ণের এবং তার পাত্র ও তার মধ্যাবস্থিত সকল কিছুই হবে স্বর্ণের।৩৩৭ জান্নাতে আদনের অধিবাসী ও তাঁদের প্রভুর মাঝে শুধু মাত্র আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের আড় ব্যতীত অন্য কোনো কিছু থাকবে না।
সহীহায়নে৩৩৮ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أول زمرة يدخلون الجنة على صورة القمر ليلة البدر সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মুখমণ্ডল হবে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। والذين يلونهم على أشد كوكب دري في السماء তাদের পরে যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন, তাদের মুখমণ্ডল আকাশের তারকারাজি হতেও অধিক উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। لايبولون ولا يتغوطون ولا يمتخطون ولا يتقلون সেখানে তারা প্রস্রাব-পায়খানা করবে না, শ্লেষ্মা ফেলবে না, থুথু ফেলবে না। امشاطهم الذهب তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের। ورشحهم المسك তাদের ঘাম হবে কস্তুরির ন্যায় সুরভিত। ومجامرهم الالوة তাদের ধোঁয়া হবে আগরবাতির খড়ি হতে وازواجهم الحور العين তাদের স্ত্রী হবে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্টা রমণীকুল। اخلاقهم على خلق رجل وأحد তাদের স্বভাব-চরিত্র একই ব্যক্তির ন্যায় হবে। যেন ভিন্ন ব্যক্তি নয় বরং على صورة ابيه آدم ستون ذراعا في السماء সেখানে তারা সকলে তাদের আদি পিতা হযরত আদম আ.-এর আকৃতির হবে। সকলের উচ্চতা হবে ষাট হাত।
সহীহায়নে৩৩৯ হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا تشربوا في آنية الذهب والفضة ولا تأكلوا في صحافهما তোমরা স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে ও পেয়ালায় পানি পান করো না। فإن لهم في الدنيا ولكم في الآخرة কেননা, দুনিয়াতে তা হল কাফিরদের জন্য আর তোমাদের জন্য হল আখিরাতে।
আবূ ইয়ালা মূসিলী রহ. তাঁর মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্ন দেখাকে ভাল মনে করতেন, তাই কখনো কেউ স্বপ্ন দেখলে তাঁর নিকট সে সম্পর্কে জানতে চাইত। যদি সে নিজে সে ব্যাপারে না জানত। যদি তিনি স্বপ্নের প্রেক্ষিতে তার প্রশংসা করতেন, তবে সে তার স্বপ্নের ব্যাপারে আনন্দিত হতো। একবার এক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি মদীনায় এলে আমাকে মদীনা থেকে বের করে দেওয়া হল। অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করানো হল। এরপর কম্পনের ফলে কোন কিছু পতনের শব্দ শুনলাম, যাতে জান্নাতের দরজা খুলে গেল। তখন আমি অমুক অমুক ব্যক্তিকে দেখেছি। এভাবে সে ১২ জনের নাম বলল। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের জন্য একটি সৈন্য দল পাঠিয়েছিলেন। সে মহিলা তার স্বপ্ন বর্ণনায় বলল, অতঃপর তাদেরকে আনা হল, তাদের পোশাক ধুলিমলিন ছিল এবং তাদের শিরা হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন বলা হল, তাদেরকে বাইদাখ অথবা বাইদাজ নহরে নিয়ে যাও এবং সেখানে ডুব দিতে বল। সে নহরে ডুব দেওয়ার পর তাদেরকে আনা হল, তখন তাদের দেখা গেল, তাদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাতের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়। এরপর তাদের নিকট স্বর্ণের রেকাবী আনা হল, যাতে উন্নতমানের খেজুর ছিল। তারা তা হতে খেজুর খেল। সে রেকাবী তাদের সামনেই ছিল। তারা যে ফল ইচ্ছা তা হতে সে ফলই খেতে লাগল। আমি তাদের সাথে খেলাম। ইত্যবসরে সেই সৈন্য দলের আগমনের সু-সংবাদদাতা এসে বলতে লাগল, অমুক অমুক শহীদ হয়ে গেছে, সে ঐ মহিলার স্বপ্নে দেখা ১২ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে ডেকে পুনরায় তার স্বপ্নের বিবরণ দিতে বললেন। মহিলা সেই বার ব্যক্তির নামই উল্লেখ করল, সংবাদদাতা এসে যে বার ব্যক্তির শাহাদাতের সংবাদ দিয়েছিল।
টিকাঃ
৩৩৫. সূর. ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ১৭-১৮
৩৩৬. সূরা দাহর, আয়াত: ১৫-১৬
৩৩৭. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৭২৪, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০০
৩০২. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৪৬০, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৯
৩৩৯. বুখারী, খ. ২ পৃ. ১৮৯
📄 জান্নাতীদের পোশাক পরিচ্ছদ ও আসবাবপত্র
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينِ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُون يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। (জান্নাতে কেউ কারো পশ্চাতে থাকবে না)৩৪০
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا أُولَئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكَ যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, আমিতো তার শ্রমফল নষ্ট করি না, যে উত্তমরূপে কার্য সম্পাদন করে। তাদেরই জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ কংকণে অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের সবুজ বস্ত্র ও সেখানে সমাসীন হবে সুসজ্জিত আসনে৩৪১।
একদল মুফাস্সির বলেন, সূক্ষ্ম রেশমী বস্ত্রকে سندس বলা হয় আর পুরু রেশমী বস্ত্রকে استبرق বলা হয়।
অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, استبرق দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মোটা বস্ত্র। সর্বাপেক্ষা সুন্দর রং হল সবুজ আর সর্বাপেক্ষা কোমল পোশাক হল রেশমী পোশাক। আল্লাহ তাআলা তাদের পোষাকে উভয় বিষয়ের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। যেন দেখতে সুন্দর হওয়ার ফলে তা দেখে আঁখি সুখানুভূতি লাভ করতে পারে আর তার কোমলতার ফলে শরীরও আরাম লাভ করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ আর তাদের পোশাক পরিচ্ছদ হবে রেশমের৩৪২।
উক্ত আয়াতে সুস্পষ্ট বর্ণিত আছে, জান্নাতীদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, مَنْ لَبِسَ الحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَةِ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী পোশাক পরিধান করবে, সে আখিরাতে তা পরিধান করতে পারবে না।
উক্ত হাদীসটি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ও হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত। উক্ত হাদীসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিস ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তবে তার উদ্দেশ্য নির্ধারণে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণের মধ্যে একদল মুফাস্সির বলেন, (দুনিয়াতে যারা রেশমী পোশাক পরিধান করেছে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করলেও) জান্নাতে তাদের পোশাক রেশমী বস্ত্রের হবে না; বরং অন্য কোন ধরনের হবে। তাঁরা বলেন, আল্লাহ তাআলার বাণী وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ যদিও ব্যাপকার্থে, কিন্তু তার মধ্য হতে কিছু সংখ্যককে বিশেষিত করা হয়েছে। (অর্থাৎ সাধারণত জান্নাতীদের পোশাক হবে রেশমী বস্ত্র; কিন্তু কিছু লোকের পোশাক রেশমী বস্ত্রের হবে না।)
জমহুরে উলামায়ে কিরাম বলেন, হাদীসে রেশমী বস্ত্র পরিধানের যে ধমকি রয়েছে, তার নযীর কুরআন ও হাদীসে রয়েছে, যা এ কথা বুঝায়, রেশমী পোশাক পরিধান করলে অবশ্যই তার উপর উক্ত হুকুম আরোপিত হবে। তবে হ্যাঁ, কোন প্রতিবন্ধকতার কারণে সে হুকুম আরোপিত নাও হতে পারে। যেমন কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী বস্ত্র পরিধান করল, কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তাওবা করল, তাহলে দুনিয়াতে রেশমী কাপড় তো সে পরিধান করল কিন্তু তাওবা করার ফলে শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। যেমনিভাবে কোন কোন নেক আমল রয়েছে, যা গুনাহকে মিটিয়ে দেয় এবং মুসলমানদের দু'আ ও যাকে আল্লাহ তাআলা সুপারিশের অনুমতি প্রদান করেছেন, তার সুপারিশের ফলে এবং মহান দয়ালু আল্লাহ তাআলা নিজেই কোন কোন পাপীদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। (যেমন হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে, নবীদেরকে, সৎকর্মশীলদেরকে ও সাধারণ মু'মিনদেরকে সুপারিশের অনুমতি প্রদান করবেন। তখন সকলেই স্ব-স্ব স্তরের জাহান্নামের মু'মিনদেরকে সুপারিশের মাধ্যমে জাহান্নام হতে বের করে আনবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, এখন আমার পালা, তখন আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হতে এমন লোকদেরকে বের করবেন, যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান রয়েছে।) তাওবা করার ফলে এ কাজ (রেশমী বস্ত্র পরিধান) করলেও তার উক্ত হুকুম (জান্নাতে রেশমী বস্ত্র পরিধান করতে না পারা) আরোপিত হবে না।
উক্ত হাদীসটি এ হাদীসেরই সমর্থক। যাতে রয়েছে من يشرب في الدنيا لم يشرب بها في الآخرة যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, আখেরাতে সুরা পান করতে পারবে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র৩৪৩।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُنْدُsٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَق তাদের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্থূল রেশম৩৪৪।
উক্ত আয়াতে عَلَهُمْ এর মধ্যে একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়, তা তাদের মূল পোশাক নয়, বরং তা হবে মূল পোশাকের উপরে শোভা বর্ধনকারী পোশাক।
মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, যে সকল কিশোর জান্নাতীদের জন্য খাবার সহ অন্যান্য বস্তু পরিবেশন করবে, তারাও সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমী বস্ত্র পরিধান করবে।
কেউ কেউ বলেন, যাদের নিকট কিশোররা খাবার এবং অন্যান্য বস্তু পরিবেশন করবে, তাদের পোশাক হবে রেশমী বস্ত্রের।
আয়াতে গবেষণা করলে বুঝা যায়, আল্লাহ তাআলা কিভাবে পোশাক ও অলংকার দ্বারা তাদের দু'ধরনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। যা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পবিত্র সুরার মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য প্রদান করা হয়েছে। তাদের কব্জিকে কঙ্কণ দ্বারা শোভিত করেছেন আর দেহকে রেশমী বস্ত্র দ্বারা সুশোভিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارِ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ
যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা এবং সেখানে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ হবে রেশমের৩৪৫।
এ আয়াত দ্বারা দু'টি বিষয় বুঝা যায়, তা হল, তাদের স্বর্ণের কঙ্কণ থাকবে এবং মুক্তারও ভিন্ন কঙ্কণ থাকবে। এও হতে পারে, এমন কঙ্কণ হবে, যা স্বর্ণ এবং মুক্তার যুগলে তৈরী।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা মানব সৃষ্টিলগ্ন হতেই জান্নাতীদের জন্য স্বর্ণের কঙ্কণ তৈরীর কাজে একজন ফিরিশতা নিয়োগ করেছেন, যে কিয়ামত পর্যন্ত এ কাজে লিপ্ত থাকবে। لوان قلبا من حلي أهل الجنة اخرج لذهب بضوء شعاع الشمس জান্নাতীদের জন্য তৈরীকৃত একটি মাত্র কঙ্কণ দুনিয়াতে আনা হত, তবে তার ঔজ্জ্বল্য সূর্যের কিরণকে নিষ্প্রভ করে দিত। ولا تسئلوا عن حلي أهل الجنة بعد هذا জান্নাতীদের অলংকার সম্পর্কে আর জানতে চেয়ো না।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, জান্নাতে মহিলাদের অলংকার অপেক্ষা পুরুষদের অলংকার অধিক সুন্দর হবে।
হযরত সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি জান্নাতীদের কেউ উঁকি মেরে দুনিয়া দেখত আর তাতে তার পরিহিত কঙ্কণের কিছু অংশ দুনিয়াতে প্রকাশ পেত, তবে তা সূর্যের কিরণকে নিষ্প্রভ করে দিত। যেমনিভাবে সূর্যোদয়ের কারণে নক্ষত্ররাজির আলো নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ উমামাহ রা. তাকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতীদের অলংকার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, مسورون بالذهب والفضة অর্থাৎ তাদের স্বর্ণ-রৌপ্যের কঙ্কণ পরিধান করানো হবে। مكللون بالدر عليهم أكاليل من در وياقوت متواصلة তাদের মাথায় ধারাবাহিকভাবে মুক্তা ও পদ্মরাগ মনি দ্বারা সুজ্জিত মুকুট থাকবে।
شباب جرد مرد مكحلون وعليهم تاج كتاج الملكوت তারা হবে পশমবিহীন কালো আঁখি বিশিষ্ট যুবক। (জান্নাতে পৌঁছার সাথে সাথে তাদেরকে যুবকে রূপান্তরিত করা হবে। তাদের শরীরে কোন লোম থাকবে না, তাদের চোখ এমন হবে, যেন এখনই কেবল সুরমা ব্যবহার করেছে)।
সহীহায়নে হযরত আবূ হাযিম রহ. হতে বর্ণিত আছে। এখানে ইমাম মুসলিম রহ.-এর শব্দ বর্ণনা করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, كنت خلف أبي هريرة وهو يتوضأ للصلوة আমি হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর পেছনে ছিলাম, যখন তিনি ওযু করছিলেন। كان يمد يده حتى يبلغ إبطه তিনি ওযুতে হাত ধুতে ধুতে তার বগল পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন। فقال : يا بنی فروخ أنتم ههنا তিনি বললেন, হে ফরুখের বংশধর! তুমি এখানে আছ?
لو علمت انكم ههنا ما توضأت هذا الوضوء যদি আমি জানতাম, তুমি এখানে আছ, তাহলে আমি এমন অযু করতাম না। سمعت خليلي صلى الله عليه وسلم আমি আমার প্রিয় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, تبلغ الحلية من المؤمن حيث يبلغ الوضوء মু'মিন ব্যক্তির যে পর্যন্ত ওযুর পানি লাগে, তাকে জান্নাতে সে পর্যন্ত অলংকার পরিধান করানো হবে। (তাই আমি এত অধিক পরিমাণ ধৌত করেছি।)
হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর আমলের আলোকেই কেউ কেউ বগল পর্যন্ত হাত ধৌত করাকে মুস্তাহাব বলে মত পোষণ করেছেন। তবে বিশুদ্ধতম মত হল, এটা মুস্তাহাব নয়। মদীনাবাসীদের মত তা-ই।
এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ রহ. হতে দু'টি মত রয়েছে। তবে হাদীস দ্বারা ধৌত করাকে দীর্ঘায়িত করা বুঝায় না। কেননা, অলংকার পরানো হবে কজিতে, বাহুতে নয়। فمن استطاع منكم ان يطيل غرته فليفعل )অর্থাৎ যে বগলের শুভ্রতা পর্যন্ত ধৌত করতে সক্ষম, সে যেন তা করে) এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী নয়, হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর উক্তি।
এ বাক্যটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর অন্তর্ভুক্ত নয়; কেননা, غرة হাতে হতে পারে না। (কেননা غرة অর্থ হল, মুখ মণ্ডলের উজ্জ্বল্যতা) বরং তা মুখমণ্ডলের মধ্যেই হতে পারে আর মুখমণ্ডল ধৌত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘায়িত হতে পারে না; কেননা, মুখমণ্ডলের উপর থেকেই মাথার শুরু ভাগ আর থুতনীর নীচ হতেই শুরু হয় ঘাড়। সুতরাং তাকে غرة বলা যায় না।)
সহীহ মুসলিমে৩৪৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من يدخل الجنة ينعم ولا يباس যে জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সর্বদা প্রাচুর্যের মধ্যে থাকবে, কখনো দুর্দশাগ্রস্ত এবং বিরক্ত হবে না। لا تبلی ثیابه তার পোশাক পুরাতন হবে না। ولا يفنى شبابতার তারুণ্য ও যৌবনের কখনো অবসান ঘটবে না। في الجنة مالا عين رأت ولا أذن سمعت ولا خطر على قلب بشر জান্নাতে এমন বস্তু রয়েছে, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ন শ্রবণ করেনি, এমনকি কোন মানব হৃদয়ে যার কোন চিন্তাও উদিত হয়নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী لا تبلى ثيابه দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য, বিশেষ এক ধরনের পোশাক, যেখানে কখনো পুরানত্ব আসবে না। অথবা উদ্দেশ্য হল নতুন পোশাকের ধারাবাহিকতা সব সময় বজায় থাকবে। এক পোশাক পুরাতন হওয়া মাত্রই নতুন পোশাক চলে আসবে। যেমনটি আমরা জান্নাতের ফলের ক্ষেত্রে দেখেছি। এক ফল আহরিত হওয়া মাত্রই তদস্থলে নতুন ফল গজিয়ে উঠবে।
হযরত ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণনা করেন, جاء أعربي جرمي জারাম এলাকার একজন গ্রাম্য লোক এসে বলল, فقال : يا رسول الله اخبرني عن الهجرة ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে হিজরত সম্পর্কে বলুন | أينما كنت أم لقوم خاص আপনি যেখানে থাকেন, সেখানে যাওয়াকে হিজরত বলে, নাকি কোন বিশেষ গোত্রে (যাদের মধ্যে আপনি অবস্থান গ্রহণ করেন) চলে যাওয়াকে হিজরত বলে। أم إلى أرض معلومة নাকি নির্দিষ্ট এলাকায় চলে যাওয়াকে হিজরত বলে। اذا مت انقطعت আপনার পৃথিবী হতে ইন্তিকালের পর কি তার সমাপ্তি ঘটবে? সে ব্যক্তি এরূপ তিনবার বলে বসে পড়ল । فسكت رسول الله صلى الله عليه وسلم يسيرا ثم রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সময় চুপ থেকে বললেন, কোথায় সে প্রশ্নকারী? قال : أين السائل বলা হল, সে এখানে। فقال ها هوذا يارسول الله !
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, قال : الهجرة أن تهجر الفواحش ماظهر منها وما بطن হিজরত হল, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার অশ্লীলতা ত্যাগ করা وتؤتى الزكوة وتقيم الصلوة এবং নামায কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করার নামই হল হিজরত। ثم أنت مهاجر وان مت بالحضرا উল্লিখিত কাজগুলো সম্পাদন করতে পারলে ঘরে মৃত্যুবরণ করলেও তুমি মুহাজির বলে গণ্য হবে।
فقال آخر يارسول الله اخبرني عن ثياب أهل الجنة : অতঃপর অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জান্নাতীদের পোশাক সম্পর্কে বলুন। اتخلق خلقا ام اتنسج نسجا তা কি এমনি এমনিই সৃষ্টি হবে নাকি তা বুনন করতে হবে? قال : ضحك بعض القوم বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে কেউ কেউ হেসে ফেলল। فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : تضحكون ممن جاهل يسئل عالما রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এক বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট এক অজ্ঞ ব্যক্তির প্রশ্ন শুনে হাসছ? فسكت النبي صلى الله عليه وسلم ساعة ثم قال : أين السائل عن ثياب أهل الجنة؟ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষণকাল চুপ থেকে বললেন, জান্নাতীদের পোশাক সম্পর্কে প্রশ্নকারী ব্যক্তি কোথায়? ها هو ذا يارسول الله জনৈক ব্যক্তি বলল, সে এখানেই, ইয়া রাসূলাল্লাহ! قال : لا، بل يشقق عنها ثمر الجنة রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, (তা বুনে বানানো হবে না) বরং তার জন্য জান্নাতের ফল পাড়া হবে। (সে ফল হতেই তা তৈরী হবে) ثلاث مرات রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার উক্ত বাণী উচ্চারণ করলেন।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে স্বীয় মু'জামে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أول زمرة يدخلون الجنة كأن وجوههم ضوء القمر ليلة البدر সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মুখমণ্ডল পুর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। والزمرة الثانية على لون أحسن كوكب دري في السماء দ্বিতীয় দলের সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য নক্ষত্ররাজি অপেক্ষা অধিক দীপ্তিময় হবে। لكل واحد منهم زوجتان من الحور العين তাদের প্রত্যেকের ভাগে ডাগর ডাগর আঁখি বিশিষ্ট হুর থাকবে। দু'জন করে স্ত্রী থাকবে। (এ হল সর্বনিম্ন সংখ্যা ( على كل زوجة سبعون حلة يرى مخ سوقها من وراء لحومها।প্রত্যেক স্ত্রীর সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। (خومهما و وراء لحومهما وحللهما তাদের রূপলাবণ্য ও কমনীয়তা এ পর্যায়ের থাকবে, সত্তর জোড়া পোশাকসহ গোশতের ভেতর হতেও তাদের পায়ের গোছার মজ্জা দেখা যাবে। كما يرى الشراب الأحمر في الزجاجة البيضاء যেমনিভাবে সাদা কাচের পাত্রে লাল সুরা দেখা যায়।
জান্নাতের এক বিঘত পরিমাণ জায়গা এই দুনিয়াসহ আরেক দুনিয়া লাভ করা হতেও অনেক উত্তম। তদ্রূপ জান্নাতের এক ধনুক সমান জায়গা দুই দুনিয়া লাভ করা হতেও উত্তম। জান্নাতী রমনীর একটি মাত্র ওড়না এরকম দুই দুনিয়ার মালিক হওয়া অপেক্ষা অনেক উত্তম। তার মধ্যকার সকল বস্তু তার সমান আরো কয়েক দুনিয়া লাভ করা হতেও উত্তম।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! نصيف কি? قال : الخمار তিনি বললেন, نصيف হল ওড়না।
ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতী ব্যক্তি একবার পার্শ্ব পরিবর্তনের পূর্বেই সত্তর বছর হেলান দিয়ে থাকবে। অতঃপর তার স্ত্রী এসে তার স্কন্ধে স্পর্শ করবে। তখন সে স্ত্রীর গণ্ডদেশে আপন মুখমণ্ডল আরশী হতেও পরিষ্কার দেখতে পাবে। তার শরীরে যে মুক্তা শোভা পাবে, তাতে সর্বনিন্ম মানেরটি এমন হবে যে, পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত তার আলোতে উদ্ভাসিত হবে। তখন সে রমণী তাকে সালাম করবে। সে উত্তর দিয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তুমি কে? রমণী বলবে, আমি তোমার অতিরিক্ত প্রাপ্য। ঐ রমণীর শরীরে সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। সে ব্যক্তি তখন ঐ রমনীর দিকে তাকাবে, যাতে সে রমনীর সত্তর জোড়া পোশাকের অভ্যন্তর হতেও তার পায়ের গোড়ালির মজ্জা দেখতে পাবে। সে মহিলার মাথায় মুকুট থাকবে। তার সর্বনিম্ন মানের মুক্তা এত উজ্জ্বল হবে যে, পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত তার আলোতে উদ্ভাসিত হবে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাকে তৃবার (স্বর্গোদ্যানের গাছ, যার ফল অত্যন্ত মধুর হবে) নিকট নিয়ে যাওয়া হবে। সেই তুবার ফুলের আবরণ প্রস্ফুটিত হবে। সে সেখান হতে লাল, সাদা, সবুজ, হলুদ, কালো, যে কোন রংয়ের ফুল নিবে। সে ফুল গুলো এন্যুমুন ফুলের মত হবে বা আরো কোমল ও আরো সুন্দর হবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত খালিদ আয-যামীল হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞাসা করেছি, ماحلل الجنة؟ জান্নাতীদের পোশাক কোন কাপড় দ্বারা তৈরী হবে? উত্তরে তিনি বলেন, فيها شجرة فيها ثمرة كانه الرمان জান্নাতে এমন একটি গাছ রয়েছে, যার ফল আনারের ন্যায়। আল্লাহ তাআলার প্রিয় বন্ধু (জান্নাতী ব্যক্তি) যখন পোশাক চাইবে, তখন সে গাছ তার ডাল নুইয়ে দেবে ও বিদীর্ণ হয়ে যাবে, তখন তা হতে বিভিন্ন রংয়ের সত্তর জোড়া পোশাক বেরিয়ে আসবে। অতঃপর গাছটি পূর্বের ন্যায় হয়ে যাবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তৃবা তার জন্য, যে আপনার দর্শন লাভ করেছেন ও আপনার প্রতি ঈমান এনেছে। فقال طوبى لمن راني وآمن بي নবীজী বললেন, তৃবা তার জন্য, যে আমাকে দেখেছে এবং আমার প্রতি ঈমান এনেছে। وطوبى ثم طوبى ثم طوبى لمن امن بي ولم يرنى তুবা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমাকে না দেখেও আমার প্রতি ঈমান এনেছে ! فقال له رجل : وما طوبى؟ তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, তুবা (طوبی) কি? قال : شجرة في الجنة مسيرة مأة عام বললেন, তুবা হল জান্নাতের একটি গাছ। যার ছায়া শত বছরের দূরত্ব পরিমাণ দীর্ঘ হবে। ثياب أهل الجنة تخرج من كمامها তার মুকুল হতে জান্নাতীদের পোশাক বের হবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, فيها شجرة دار المؤمن في الجنة لؤلؤة تنبت الحلل জান্নাতে একটি গাছ রয়েছে, যা হতে কাপড় উৎপন্ন হবে। فيأخذ الرجل باصبعيه واشار بالسبابة والا بهام মু'মিন ব্যক্তি তা থেকে দুই আঙ্গুল দিয়ে নিতে থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলীর প্রতি ইঙ্গিত করলেন। (অর্থাৎ এ দু'আঙ্গুল দ্বারা নিবে( سبعين حلة متمنطقة باللؤلؤ والمرجان প্রবাল ও মুক্ত দানা সমৃদ্ধ সত্তর জোড়া পোশাক নিবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, لو ان ثوبا من ثياب أهل الجنة لبس اليوم في الدنيا لصعق من ينظر اليه যদি জান্নাতীদের পোশাক পরিধান করে কেউ দুনিয়াতে আগমন করে, তাহলে যে ব্যক্তি তাকে দেখবে, সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলবে, ও তার চোখের দৃষ্টি শক্তিলোপ পাবে। وما حملته أبصارهم
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে বাশীর ইবনে কা'ব সহ অন্য শাইখ হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতীরা যে স্ত্রী লাভ করবে, তাদের প্রত্যেকের শরীরে সত্তর জোড়া পোশাক থাকবে। সে স্ত্রী পৃথিবীর ফুল হতে অধিক কোমল ও কমনীয় হবে। তাদের গোশতের অভ্যন্তর হতে তাদের পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।
সহীহায়নে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার দুমাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একটি রেশমী জুব্বাহ উপহার দিল, লোকজন তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়াভিভূত হল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, مناديل سعد في الجنة أحسن من هذا হযরত সা'দ রা. জান্নাতে যে রুমাল লাভ করেছে, তা এর চেয়ে অধিক সুন্দর।
সহীহায়নে৩৪৭ হযরত বারা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একবার একটি রেশমী জুব্বাহ উপহার দেয়া হয়েছিল, লোকজন তার কোমলতা দেখে বিস্ময়াভিভূত হল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এতে বিস্ময়বোধ করেছ? সা'দ ইবনে মুআ'য জান্নাতে যে রুমাল লাভ করেছে, তা এর চেয়েও অধিক সুন্দর।
এখানে বিশেষভাবে হযরত সা'দ ইবনে মুআ'য রা.-এর কথা উল্লেখ করার বিষয়টি অস্পষ্ট নয়। কেননা, মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর যে মর্যাদা, আনসারদের মধ্যে হযরত সা'দ ইবনে মুআ'য রা.-এর ঠিক সেই মর্যাদা। যাঁর মৃত্যুতে আল্লাহ তাআলার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আল্লাহ তাআলার জন্য তিনি কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে মোটেও পরোয়া করতেন না। আল্লাহ তাআলা শাহাদাতের সুধা পান করিয়েই তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটালেন। তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টিকে স্ব-জাতি, স্বীয় গোত্র ও বন্ধু-বান্ধবদের সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দিতেন। তিনি (ইহুদীদের ব্যাপারে) ঠিক সেই ফায়সালাই দিয়েছেলেন; সপ্তাকাশের উপর আল্লাহ তাআলা যে ফায়সালা দিয়েছিলেন। সুতরাং তাঁর শরীর পরিষ্কার করার জন্য জান্নাতে বাদশাহদের রুমাল হতেও সুন্দর রুমাল পাওয়ার অধিক যোগ্য।
জান্নাতীদের শাহী মুকুট
জান্নাতীদের পোশাকের মধ্যে মুকুটও থাকবে।
ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রহ. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من قرأ القرآن فقام به آناء الليل والنهار ويحل حلاله ويحرم حرامه خلطه الله بلحمه ودمه যে কুরআন পড়ল এবং দিবা-রাতের উভয় প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করল (অর্থাৎ তেলাওয়াত ও নফল নামাযে তা তেলাওয়াতে লিপ্ত থাকল) এবং তার হালালকে হালাল মনে করল ও হারামকে হারাম মনে করল, আল্লাহ তাআলা তার রক্ত মাংসের সাথে তাকে (কুরআন) সংযুক্ত করে দিবেন। وجعله رفيق السفرة الكرام البردة তাকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান ফেরেশতাদের সঙ্গী বানিয়ে দিবেন। واذا كان يوم القيامة كان القرآن له حجيجا আর কিয়ামত দিবসে কুরআন তার পক্ষাবলম্বনকারী হবে। (অর্থাৎ তার পক্ষে সাফাইকারী ওকীল হবে)। فقال : يارب كل عامل يعمل في الدنيا يأخذ بعمله من الدنيا الا فلانا كان يقوم في (به) آناء الليل واطراف النهار কুরআন বলবে, হে পরওয়ারদেগার! প্রত্যেক আমলকারীই দুনিয়াতে তার নিজ আমলের বিনিময় গ্রহণ করেছে, কিন্তু অমুক ব্যক্তি (কুরআন তিলাওয়াতকারী) কোন বিনিময় গ্রহণ করেনি; বরং দিবা-রাত্রি দাঁড়িয়ে থাকত, (অর্থাৎ তিলাওয়াত করত নফল নামাযে)। فيحل حلالي ويحوم حرامي সে আমার মধ্যে হালালকৃত বস্তুকে হালাল মনে করত আর আমার মধ্যে হারামকৃত বস্তুকে হারাম মনে করত। يقول يارب فا عطه কুরআন বলবে, হে প্রভু! তাঁকে দান করুন। فيتوجه الله تاج الملك ويكسوه من حلة الكرامة ثم يقول هل رضيت তখন আল্লাহ তাআলা তাকে শাহী মুকুট ও সম্মানিত ব্যক্তিদের বস্ত্র জোড়া পরাবেন এবং বলবেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট? فيقول يارب أرغب له في أفضل من هذا؟ কুরআন বলবে, হে আমার প্রভু! আমি তো তার জন্য এর চেয়ে উত্তম বস্তু পসন্দ করি। فيعطيه الله الملك بيمينه والخلد بشماله তখন আল্লাহ তাআলা তার ডান হাতে রাজত্ব ও বাম হাতে জান্নাতুল খুলদ প্রদান করবেন। ثم يقول : هل رضیت অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে কুরআন! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট? فيقول : نعم يارب কুরআন বলবে, হ্যাঁ, প্রভু! আমি এতে সন্তুষ্ট।
ইমাম বায়হাকী রহ. স্বীয় মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত বুরাইদা রা. হতে মারফু হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, تعلموا سورة البقرة، وتركها حسرة ولا تستطيعها البطلة فإن اخذها بركة,
তোমরা সূরা বাকারা শিক্ষা কর। কেননা, তা শিক্ষা করা বরকতপূর্ণ বিষয় আর শিক্ষা না করা দুঃখ ও লজ্জার বিষয়। কারণ বাতিল লোক তার ব্যাপারে সক্ষম নয়। (অর্থাৎ সঠিক ভাবে অর্জন করতে ও তার বরকত নষ্ট করতে সক্ষম নয়।) অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, সূরা বাকারা ও সূরা আল ইমরান শিক্ষা কর। কেননা, উভয়টি কিয়ামত দিবসে জ্যোতির্ময় হবে আর তার পাঠকারী ও আমলকারীদের উপর কিয়ামত দিবসে মেঘমালার ন্যায় ছায়া দিবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম غمامتان বলেছেন, অথবা غیایتان غمامة( অর্থ হল মেঘমালা আর غيية অর্থ হল প্রত্যেক ছায়া প্রদানকারী বস্তু( অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فرقان من طيرصواف সারিবদ্ধ পাখীর ডানাদ্বয়ের ছায়া প্রদান করবে।
কুরআন তার তিলাওয়াতকারীর সাথে কিয়ামত দিবসে তার কবর বিদীর্ণ হওয়ার স্থানে শীর্ণ ও কৃশকায় ব্যক্তির ন্যায় সাক্ষাত করবে। তাকে বলবে, তুমি কি আমাকে চিন? সে ব্যক্তি বলবে, আমি তোমাকে চিনি না। তখন কুরআন বলবে, আমি তো সেই, যে তোমাকে উত্তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত রেখেছে এবং রাতে তোমাকে জাগ্রত রেখেছে। সকল ব্যবসায়ী আপনার ব্যবসায় মুনাফার আশা পোষণ করে, তুমিও আজ প্রত্যেক ব্যবসায়ীর ন্যায় আশা কর। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ডান হাতে রাজত্ব আর বাম হাতে জান্নাতুল খুলদ প্রদান করবেন। তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিধান করাবেন ও তার পিতা-মাতাকে এমন পোশাক পরিধান করাবেন, সমগ্র পৃথিবী সম্মিলিতভাবেও তার মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম হবে না। তখন কুরআনের হাফিযের পিতা-মাতা জিজ্ঞাসা করবে, আমাদেরকে এগুলো কেন পরানো হল? তখন তাদেরকে জবাব দেয়া হবে, তোমাদের সন্তানকে কুরআন শিখানোর কারণে তোমাদেরকে এগুলো পরানো হলো।
আল্লাহ তাআলা তখন কুরআনের হাফিয ব্যক্তিকে বলবেন, পড়তে থাক আর জান্নাতের উচু হতে উঁচু মর্যাদা লাভ করতে থাক, তখন সে হদর বা তারতীল যেভাবে দুনিয়াতে পড়ত, সেভাবে পড়তে থাকবে।
পূর্বোক্ত হাদীসে البطة শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তার অর্থ হল জাদুকর, আর غياية হল প্রত্যেক ঐ বস্তু, যা মানুষের উপর ছায়া প্রদান করে।
আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَب মু'মিনগণ স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ কংকণে অলংকৃত করা হবে। ان عليهم التيجان وان أدنى لؤلؤة منها لتضيئ ما بين المشرق والمغرب তিনি বলেন, জান্নাতীদের মাথায় এমন মুকুট থাকবে, যার নিম্ন মানের মুক্তাই পূর্ব পশ্চিম দিগন্তকে আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলবে।
জান্নাতীদের শয্যা
متكنينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তর বিশিষ্ট ফরাশে৩৪৮।
আল্লাহ তাআলা তাদের বিছানার বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেছেন, তাদের বিছানা হবে পুরু আস্তর বিশিষ্ট রেশমের। এর দ্বারা দুটি বিষয় প্রতীয়মান হয়, বিছানার উপরের কাপড় অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের ও সৌন্দর্যময় হবে। কেননা, নীচের কাপড় তো অভ্যন্তরে থাকে আর উপরের কাপড় সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধি করে।
সুফিয়ান সাওরী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ হতে بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقِ এর তাফসীর বর্ণনা করেন, তোমাদেরকে তার অভ্যন্তর সম্পর্কে জানানো হয়েছে, তা কি পরিমাণ সুন্দর হবে?
দ্বিতীয় বিষয় হল তাদের সেই শয্যা বেশ পুরু হবে। উপর ও নিচের কাপড়দ্বয়ের মাঝে ফোলা ও ফাঁপা বস্তু থাকবে। এ ব্যাপারে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো দ্বারা বুঝা যায়, তাদের স্থান সুউচ্চ হবে। যেমন ইমাম তিরমিযী রহ.৩৪৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম وَفُرُشٍ مَرْفُوْعَةِ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, তার উচ্চতা আকাশ ও পৃথিবী সমান দূরত্ব বিশিষ্ট হবে। উভয়ের মাঝে পাঁচশত বৎসরের দূরত্ব রয়েছে। (অর্থাৎ তার নিচের অংশের তুলনায় উপরের অংশের মাঝে এ পরিমাণ দূরত্ব হবে, অতি তেজোদীপ্ত আরোহী তা পাঁচশত বৎসরে অতিক্রম করতে পারবে।)
কেউ কেউ বলেন, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের উঁচু মর্যাদা লাভ করা। আর বিছানাও তেমনিভাবে হবে, যে ব্যক্তি যে স্তরের হবে, সে ঐ অনুপাতে লাভ করবে। এ হাদীস রিশদীন ইবনে সা'দ নামক বর্ণনাকারীর সূত্রে বর্ণিত। তার সম্বন্ধে হাদীস বিশারদদের মন্তব্য হল। ইমাম দারা কুতনী রহ. বলেন, ليس بالقوي সে শক্তিশালী নয়। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, উক্ত বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন প্রকার যাচাই বাছাই করে না। তবে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে তার হাদীস গ্রহণ করতে কোন সমস্যা নেই।
ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন রহ. বলেন, ليس بشیئ সে গ্রহণ যোগ্য নয়। আবূ যুর'আহ রহ. বলেন, সে দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী। জাওযানী রহ. বলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই, রিশদীন ইবনে সা'द দুর্বল বর্ণনাকারী, তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল। তিনি একাকী বর্ণনা করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার বাণী وَفُرْشِ مَرْفُوْعَة সম্পর্কে বলেছেন, দুই বিছানার মধ্যে আকাশ পৃথিবী সম দূরত্ব হবে। যদি এ হাদীসটি মাহফুয (ইলমে হাদীসের একটি পরিভাষা, শাব্দিক অর্থ সংরক্ষিত) হয়, তবে এটি একটি সুন্দর বিষয়। والله اعلم
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, وَفُرُش مَرْفُوْعَة এর ক্ষেত্রে প্রত্যেক দুই বিছানার মধ্যে চল্লিশ বছরের দূরত্ব হবে।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ উমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে وَفُرْشِ مَرْفُوْعَة সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যদি বিছানাকে উপর হতে নিক্ষেপ করা হয়, তবে তা মাটিতে পৌঁছতে একশত বৎসর লাগবে।
এ হাদীসটি মারফু হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি আছে, কেননা, ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূউমামাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি وَفُرْشِ مَرْفوعة এর ব্যাপারে বলেছেন, যদি তার উপরের অংশ পড়ে যায়, তবে তা চল্লিশ বছরেও নিচের অংশে পৌঁছুবে না।
জান্নাতীদের আসন
জান্নাতীদের পাটি ও গদির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مُتَّكِثِينَ عَلَى رَقْرَفِ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার উপরে।৩৫০
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, فِيهَاسُرُرٌ مَرْفُوعَةٌ وَأَكْوَابٌ مَوْضُوعَةٌ وَتَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَة সেখানে থাকবে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন শয্যা। প্রস্তুত থাকবে পানপাত্র, সারি সারি উপাধান ও বিছানো গালিচা।
হাশীম আবুল বাশারের সূত্রে হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রা. হতে বর্ণনা করেন। রফরফ (رفرف) জান্নাতের উদ্যানকে আর আবকরী (عبقري) উন্নত মানের গালিচাকে বলা হয়।
ইসমাঈল ইবনে উলাইয়াহ রহ. আবূ রাজা রহ.-এর সূত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী مُتَّكِثِينَ عَلَى رَقْرَفَ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٌّ حِسَانٍ সম্পর্কে বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল পাটি। তিনি বলেন, মদীনাবাসীগণও বলেন, এর দ্বারা পাটি উদ্দেশ্য।
ঘারিক এর ব্যাপারে ওয়াহিদী বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বালিশ তথা উপাধান। এর একবচন হল غرفة নূনে পেশ। ইমাম ফাররা নূনে যের পড়েছেন। এর সমর্থনে তিনি আবূ উবাইদের এ কবিতাটি পাঠ করেন, اذا ما بساط اللهو مد وقربت للذاته إنماطه و نمارقه
যখন খেলনার পাটি বিছানো হল, তার জন্য হাওদার মধ্যকার পশমী চাদর ও উপাধান নিকটবর্তী করা হল।
কালবী রহ. বলেন, وسائد مصفوفة و نمارق مصفوفة সামনা-সামনি সারি সারি উপাধান। মুকাতিল রহ. বলেন, ঐ বালিশগুলো সারি সারি পাটিতে সজ্জিত থাকবে।
ভাষাবিদগণ এক্ষেত্রে একমত, زرابي অর্থ পাটি। এর এক বচন হল زربية আর مبثوثة অর্থ منشورة مبسوطة বিছানো, ছড়ানো।
রফরফ (رفرف) দ্বারা উদ্দেশ্য
আয়াতে রফরফ শব্দটির ব্যাপারে লাইস রহ. বলেন, এটা সবুজ এক ধরনের বিছানার চাদর। তার একবচন হল رفرفة। আবূ উবাইদাহ রহ. বলেন, রফরফ পাটিকেই বলা হয়। এর সমর্থনে তিনি ইবনে মুকবিলের এ কবিতাটি পাঠ করেছেন,
♦ سواقط من اصناف ريط ورفرف وانالترالون تغشي نعالنا
'আমরা তো হলাম নির্বোধ চাষী, আমাদের জুতা তো বিভিন্ন প্রকার উন্নত চাদর ও পাটি মাড়ায়'।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, কেউ কেউ বলেন, এখানে রফরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের উদ্যানসমূহ। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বিছানার চাদর। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ সকল অতিরিক্ত কাপড়, যেগুলো বিছানা হেফাযতের জন্য ব্যবহার করা হয়। মুবারক রহ. বলেন, বাদশা বা অভিজাত ব্যক্তিবর্গ যে অতিরিক্ত কাপড় ব্যবহার করে, তাকে রফরফ বলে। ওয়াহিদী বলেন, এ ব্যাখ্যাই অধিক উপযোগী। কেননা আরবগণ তাবুর মধ্যে ব্যবহৃত বস্ত্রখণ্ডকে রফরফ বলে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত সংক্রান্ত হাদীসে এ শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, فرفع الرفرف فرأينا وجهه كانه ورقة রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুখমণ্ডল হতে রফরফ (যে কাপড় দ্বারা তাঁর মুখ ঢাকা হয়েছিল) উঠানো হলে আমরা তাঁর মুখমণ্ডল দেখতে পেলাম, যেন তা একটি রৌপ্যখণ্ড।
ইবনে আরাবী বলেন, এখানে রফরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিছানার প্রান্ত। এটি ঐ নিম্নের বস্তুর মত, যা পাটি হিফাযতের জন্য পাটির নিচে বিছানো হয়। তাকেই রফরফ বলা হয়।
গ্রন্থকার বলেন, রফরফ শব্দটির মূল অর্থ হল, কিনারা বা প্রান্ত। এ হিসাবে বলা হয়, الرفرف في الحائط দেয়ালের প্রান্ত। এ হিসাবে তাঁবুর প্রান্তের কাপড়কেও রফরফ বলা হয়। তাঁবুর প্রান্তকে, বর্শার প্রান্তকে রফরফ বলা হয়ে থাকে। এর একবচন হল, رفرف الطير। এর থেকেই رفرفة الطير। এটা তখন বলা হয়, যখন পাখি কোন বস্তুর উপর পতিত হওয়ার সময় তার আশ পাশে পাখা জাপটায়।
সবুজ বিছানার চাদরকেও রফরফ বলা হয়ে থাকে। এর একবচন হল, رفرفة-চাদরের ঐ অতিরিক্ত অংশ যাকে পুনরায় বিছানো হয় বা ঝুলিয়ে রাখা হয়, তাকে রফরফ বলা হয়ে থাকে।
হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি আল্লাহর বাণী رأى رفرفا أخضر سد 21 6 7 لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى . آلافق অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ রাতে সবুজ অনেক ডানা দোলায়িত হতে দেখেছেন। যার ফলে প্রান্ত আচ্ছাদিত হয়ে গেছে। (অর্থাৎ তা এত বৃহদাকারের ছিল, যার ফলে প্রান্ত ঢেকে গেছে।)
عبقري দ্বারা উদ্দেশ্য
আয়াতে রয়েছে عبقري حسان এর ব্যাপারে আবূ উবাইদাহ রা. বলেছেন, যে বস্তু বিছানো হয়, তাকে عبقري বলা হয়। তিনি বলেন, আরবগণ সে যমীনকে عبقري বলেন, যাতে উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। লাইস বলেন, আবকারী সে তেপান্তর স্থানকে বলা হয়, যে স্থানে অধিক হারে জিন থাকে।
তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা হল, আবকারের প্রতি সম্বন্ধযুক্তকে عبقري বলা হয়। عبقري বলা হয়, যেখানে জিনরা বসবাস করে। অতঃপর প্রত্যেক উঁচু স্থানের প্রতি সম্বন্ধযুক্ত বস্তুর জন্য عبقري শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
আবুল হাসান আল ওয়াহেদী বলেন, عبقري এর ব্যাপারে এটিই বিশুদ্ধমত। কেননা, আরবগণ কোন বস্তুর ব্যাপারে অতিশয়োক্তি করতে গিয়ে তাকে জিন বা এ জাতীয় বস্তুর প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করে থাকে। এটা এ জন্য যে, তারা মনে করে জ্বিনের মধ্যে অনেক আজব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। জিন সকল কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম। সেহেতু কোন বস্তু সম্বন্ধে অতিশয়োক্তি করার জন্য সে দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে।
পাটি ও কাপড় ব্যতীতও অনেক বস্তু এমন রয়েছে, সেগুলোকে عبقري বলা হয়। যেমন হযরত উমর রা. এর প্রশংসায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবকারী শব্দ ব্যবহার করেছেন।
হযরত সালামাহ রা. হযরত ফাররা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মানুষের মধ্যে আবকারী (عبقري) হল, তাদের সর্দার। আর প্রাণীদের মধ্যে গৌরবযোগ্য প্রাণীকেও عبقري বলা হয়। সুতরাং আবকার যদি শুধু সুসজ্জিত বুনন বিশিষ্ট বিছানার সাথেই বিশেষিত থাকত, তাহলে এই বুনন ছাড়া অন্য কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ ও ব্যবহার থাকত না। অথচ তা ঘটেছে। কাজেই এই আয়াতে যখন বিছনার বিশেষণ রূপে তার ব্যবহার ঘটেছে, তখন তার অর্থ হবে প্রত্যেক ঐ বিছানা; যার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য চুড়ান্ত রকমের নকশী ও কারুকার্য খচিত হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, عبقري দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিছানা ও পাটি। কাতাদাহ রহ. বলেন, উন্নতমানের গালিচাকে عبقري বলা হয়। মুজাহিদ রহ. বলেন, পুরু রেশমকে عبقري বলা হয়।
ভেবে দেখা উচিত আল্লাহ তাআলা বিছানার প্রশংসা কিভাবে করেছেন। তিনি বলেছেন, তা উঁচু হবে। زرابي অর্থাৎ বালিশ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, সেগুলো ছড়ানো থাকবে। غرق এর ব্যাপারে বলেন, সেগুলো সারিবদ্ধভাবে বিছানো থাকবে। এর দ্বারা বুঝা যায়, বিছানাগুলো উঁচু ও নরম হবে। আর বালিশ ছড়িয়ে থাকার দ্বারা তার আধিক্য বুঝানো উদ্দেশ্য এবং প্রত্যেক জায়গায় হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তা শুধু মজলিসের প্রধান ব্যক্তির জন্য নয়; বরং প্রত্যেক ব্যক্তিই তা লাভ করতে পারবে। আর উপাধানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বৈশিষ্ট্য এদিকে ইঙ্গিত করে, সে গুলোতে সর্বদা হেলান দেয়া সম্ভব হওয়ায়র মত করে গঠন করা হয়েছে। এমন নয়, তা দেবে যাবে বা চুপসে যাবে ও মাঝে মধ্যে ব্যবহার অনুপোযগী হয়ে যাবে। আল্লাহই প্রকৃতার্থ সম্পর্কে সর্বধিক অবহিত।
টিকাঃ
৩৪০. সূরা দুখান, আয়াত: ৫১-৫৩
৩৪১. সূরা কাহফ, আয়াত: ৩০-৩১
৩৪২. সূরা হজ্জ, আয়াত: আয়াত ২৩
৩৪৩. সূরা দাহর, আয়াত: ১২
৩৪৪. সূরা দাহর, আয়াত: ২১
৩৪৫. সূরা হজ্জ, আয়াত: ২৩
৩৪৬. খ. ২ পৃ. ৩৮০
৩৪৭. বুখারী খ. ১ পৃ. ৪৬০, মুসলিম খ. ২, পৃ. ২৯৫
৩৪৮. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৫৪
৩৪৯. খ. ২, পৃ. ১৬৫
৩৫০. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৭৬