📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের রকমারি ফল ও তার সুঘ্রাণ

📄 জান্নাতের রকমারি ফল ও তার সুঘ্রাণ


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرى من تَحْتِهَا الأنهار كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقاً قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قَبْلُ وَأْتُوا بِهِ مُتَشَابِهَا وَلَهُمْ فِيهَا أزواج مُطَهَّرَةٌ
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে শুভ সংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত হয়। আর যখনই তাদেরকে ফলমূল খেতে দেয়া হবে, তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে পূর্বে জীবিকারূপে যা দেয়া হত, এটা তো তাই। তাদেরকে অনুরূপ ফলই দেয়া হবে এবং সেখানে তাদের জন্য রয়েছে, শুদ্ধাচারিণী রমণীকুল২৯২। জান্নাতীগণ বলবে, আমাদেরকে দুনিয়ার অনুরূপ ফলই দেয়া হয়েছে, তারা শুধু তার আকৃতি-প্রকৃতি দেখে বলবে। অন্যথায় সে ফলের স্বাদ ও দুনিয়ার ফলের স্বাদের মধ্যে অনেক ব্যবধান রয়েছে। الذى رُزقًا দ্বারা হয়ত উদ্দেশ্য হল, আমাদেরকে ইতোপূর্বে দুনিয়াতে যেমনিভাবে দান করা হয়েছে এখানেও তেমনিভাবে দান করা হচ্ছে। অথবা তাদের উদ্দেশ্য হল, জান্নাতে আমাদেরকে ইতোপূর্বে যে ফল দান করা হয়েছে। এখানেও অনুরূপ সে ফল দান করা হচ্ছে। মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, এতে দু'টি মতামত রয়েছে। বিশিষ্ট মুফাসসির হযরত সুদী রহ.-এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস রা., হযরত ইবনে মাসউদ রা. সহ অন্য সাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে বর্ণিত আছে قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আমাদেরকে ইতোপূর্বে দুনিয়াতেও এর কাছাকাছি গঠনের ফল দান করা হত, আর وَأُتُوا به مُتَشَابِهاً দ্বারা উদ্দেশ্য হল সে ফলের আকৃতি প্রকৃতি তাদের পরিচিত ফলের অনুরূপই হবে।

অন্য মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, জান্নাতে প্রথমে তাদেরকে যে ফল দান করা হবে, তার অনুরূপ আকৃতি প্রকৃতির ফলই তাদেরকে পরবর্তীতে দান করা হবে। তা দেখে জান্নাতীগণ বলবে, এর অনুরূপ ফলই তো আমাদেরকে ইতোপূর্বে দান করা হয়েছে, অথচ এগুলোর স্বাদ একেবারেই ভিন্ন।

যাঁরা বলেন, সে ফল জান্নাতেরই পূর্ব প্রদত্ত ফলের অনুরূপ হবে, তাঁরা স্বীয় মতের সমর্থনে কয়েকটি দলীল পেশ করেন।

প্রথম দলীল, জান্নাতের ফলই একটির সাথে অপরটির সামঞ্জস্যতা অধিকতর হবে, যার ফলে জান্নাতীগণ বলবে, هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قبل

দ্বিতীয় দলীল, জান্নাতের ফল যখন একটি ছেঁড়া হবে তদস্থলে অন্য একটি ফল হয়ে যাবে। এ দলীল ইবনে জারীর রহ. উল্লেখ করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে হযরত আবূ উবায়দার হাদীসও উল্লেখ করেছেন, জান্নাতের ফল যখন একটি তোলা হবে তখন অন্য একটি ফল তার স্থান পূর্ণ করে দিবে।

তৃতীয় দলীল, وَأْتُوا بِهِ مُتَشَابِها قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ এর জন্য কারণ স্বরূপ। কেননা, তারা এ উক্তি এ জন্যই করবে, যেহেতু তাদেরকে একই আকৃতি-প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে, তাই জান্নাতের ফলের ব্যাপারেই হবে তাদের উক্তি هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ

চতুর্থ দলীল, এ কথা তো অত্যন্ত সুস্পষ্ট, জান্নাতের হরেক রকম ফল তাদেরকে দুনিয়াতে রিযিক স্বরূপ দান করা হয়নি। তাদের অধিকাংশই তো দুনিয়ার সকল প্রকার ফল সম্পর্কে জানে না এবং সকল প্রকার ফল তারা দেখেওনি।

ইবনে জারীর রহ. সহ অন্যরা প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তাঁরা নিজ মতের সমর্থনে কয়েকটি দলীল পেশ করেছেন।

ইবনে জারীর রহ. বলেন, এমত পোষণকারীদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দলীল হল, আল্লাহ তাআলার বাণী كُلِّمًا رُزقُواْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যখনি প্রথমবার তাদেরকে ফল দেয়া হবে তারা বলবে, আমাদেরকে ইতোপূর্বেও অনুরূপ ফল দেয়া হয়েছিল। অথচ ইতোপূর্বে জান্নাতে তাদেরকে কোন ফল দেয়া হয়নি। এর দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, তাদের উক্তি দুনিয়ার ফলের ব্যাপারেই হবে। অর্থাৎ তারা বলবে, আমাদেরকে দুনিয়াতে যেরূপ ফল দান করা হত এখানেও সেরূপ ফলই দান করা হয়েছে। অন্যথায় তাদের এ উক্তিকে মিথ্যায় পর্যবসিত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। কেননা, তাদেরকে কোন ফল দানের পূর্বেই তারা বলছে, আমাদেরকে ইতোপূর্বেও অনুরূপ ফল প্রদান করা হয়েছে। অথচ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মিথ্যা হতে পূত-পবিত্র রেখেছেন।

আমি (ইবনে কায়্যিম) বলব, যারা বলেন, জান্নাতের ফলের সাথে তুলনা করেই তারা এ উক্তি করবে, এ ফলতো সে ফলের মতই যে ফল ইতোপূর্বে আমাদেরকে দান করা হয়েছে। তারা প্রথমবারের প্রদত্ত ফলকে তাদের এ উক্তি হতে বাদ দেন। অর্থাৎ প্রথমবার ফলপ্রাপ্ত হওয়ার পর তারা এ উক্তি করবে। পূর্বাপর আলোচনা ও যুক্তির দাবিও তাই। অন্যথায় নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়।

প্রথমত: জান্নাতের অনুরূপ অনেক ফলতো দুনিয়াতে নেই, তাহলে কিভাবে তারা এ উক্তি করতে পারে?

দ্বিতীয়ত: অনেক জান্নাতীকে দুনিয়াতে দুনিয়ার সকল ফল দ্বারা রিযিক দান করা হয়নি।

তৃতীয়ত: সব সময়ই একথা বলবে না, আমাদেরকে দুনিয়াতে অনুরূপ ফল দান করা হয়েছে; বরং তাদের এ উক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হল জান্নাতের এক প্রকারের ফল অন্য প্রকার ফলের সাথে সামঞ্জস্যশীল। সুতরাং এ মত গ্রহণ করার দ্বারা আল্লাহর বাণীর বিরোধিতা হয় না এবং জান্নাতীদের প্রতি মিথ্যার সম্পৃক্ততাও আবশ্যক হয় না।

আল্লাহ তাআলার বাণী وَأُتُوا به مُتَشَابِها এর ব্যাখ্যায় হযরত হাসান রহ. বলেন, জান্নাতের সকল ফলই উন্নতমানের হবে, নিম্নমানের কোন ফল হবে না।

কাতাদাহ রহ. বলেন, জান্নাতের সকল ফলই উন্নতমানের হবে, কোন ফল নিম্নমানের হবে না, যেমন দুনিয়ার কিছু ফল হয় উন্নতমানের আবার কিছু ফল হয় নিম্নমানের।

ইবনে জুরাইজ রহ. সহ অন্যরাও অনুরূপই মতপোষন করেছেন।

হযরত ইবনে মাসউদ রা., হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম বলেন, مُتَشَابِهًا দ্বারা উদ্দেশ্য হল, রং ও আকৃতি এক রকম হবে; কিন্তু স্বাদ ভিন্ন প্রকৃতির হবে।

মুজাহিদ রহ. বলেন, রং এক ধরনের হবে, কিন্তু স্বাদ ভিন্ন প্রকৃতির হবে।

ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর রহ. বলেন, জন্নাতের ঘাস হবে যাফরানের। তার টিলা হবে কস্তুরি। জান্নাতীদের নিকট কিশোররা ফল-ফলাদি নিয়ে এলে তারা খাবে। কিশোররা পুনরায় ফল নিয়ে এলে তারা বলবে, এ তো সেই ফলই, যা ইতোপূর্বে আমাদের নিকট নিয়ে এসেছিলে। তখন তাদের খাদেম বলবে, এগুলো খেয়ে দেখ। যদিও এগুলোর আকৃতি পূর্বোক্ত ফলের ন্যায়, কিন্তু স্বাদ ভিন্ন। আল্লাহ তাআলার বাণী كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِّزْقً দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।

অন্যরা বলেন, যদিও দুনিয়ার ফলের সাথে জান্নাতের ফলকে জান্নাতীগণ তুলনা করবে, কিন্তু জান্নাতের ফল হবে দুনিয়ার ফল অপেক্ষা উত্তম, সুস্বাদু ও উন্নতমানের।

আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, জান্নাতীগণ জান্নাতের ফল দেখে দুনিয়ার ফলের ন্যায় সেগুলোর নামকরণ করতে থাকবে। যেমন বলবে, এটা আপেল, এটা আনার ইত্যাদি। অথচ সেগুলোর স্বাদ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইবনে জারীর রহ. এ মতটিই পসন্দ করেছেন।

جَنَّاتِ عَدْنٍ مُفَتَّحَةً لَهُمُ الْأَبْوَابُ مُتَّكِينَ فِيهَا يَدْعُونَ فِيهَا بِفَاكِهَةِ كَثِيرَةٍ وَشَرَابٍ চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে তারা আসীন হবে হেলান দিয়ে, সেখানে তারা বহুবিধ ফলমূল ও পানীয় চাইবে।২৯৩

ا يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فاكهة أمنين তারা প্রশান্তচিত্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে।

এর দ্বারা বুঝা যায়, সেখানকার ফলমূল কখনো শেষ হবে না এবং তা ভক্ষণকারীর জন্য কখনো ক্ষতিকর হবে না।

فاكهة كثيرة لا مَقْطُوعَة وَلَا مَمْنُوعَة সেখানে প্রচুর ফলমূল থাকবে, যা শেষ হবে না ও নিষিদ্ধ হবে না।

তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এমন নয় যে, কখনও সেখানে অবস্থান করবে আবার কখনও সেখান থেকে অনুপস্থিত থাকবে। তারা সেখানে যা চাবে, তা থেকে তাদেরকে কখনো নিষেধ করা হবে না।

فَهُوَ فِي عِيشَة رَاضِيَة فِي جَنَّة عالية قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন; সুউচ্চ জান্নাতে, যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে২৯৫।

قطوف শব্দটি قطف এর বহুবচন, অর্থ: চয়নকৃত। যবর দ্বারা পড়লে, অর্থ: ফল চয়ন করা, অর্থাৎ জান্নাতের ফল অবনমিত নাগালে থাকবে। যে তা তুলতে চাবে তার কোন কষ্ট হবে না; বরং যেভাবে চাবে সেভাবেই তা লাভ করতে পারবে।

হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বলেন, তারা নিদ্রাবস্থায়ও তা লাভ করতে পারবে।

وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظَلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلًا আর তার ছায়া তাদের উপর থাকবে, তার ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আওতাধীন থাকবে২৯৬।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতীগণ যখনই তার ফল নিতে চাইবে, তখনি ফল অর্ধনমিত হয়ে পড়বে। যার ফলে ইচ্ছা মত তা নিতে পারবে।

কেউ কেউ বলে, জান্নাতীগণ যেভাবে চাবে, তার ফল সেভাবেই তাদের জন্য অবনমিত হবে। সুতরাং তারা তা শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, সর্বাবস্থায় নিতে পারবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলার বাণী قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য, তার ফল লাভ করা তাদের জন্য খুবই সহজ হবে। খেজুর ফল তোলা যখন সহজ হয়ে পড়ে আরবরা তখন বলে, ذُلِّلَ النَّخْلُ সুতরাং বুঝা যায়, তাদের জন্য তার ফল লাভ করা একেবারে সহজ হবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فِيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক প্রকার ফল দু'দু'প্রকার২৯৭।

সে দু'উদ্যানে আরো দু'টি উদ্যান রয়েছে, فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلٌ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল খেজুর ও আনার২৯৮।

এ আয়াতে বিশেষভাবে খেজুর ও আনারের উল্লেখ সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কারণেই হয়েছে। যেমনটি সূরা নাবাতেও রয়েছে। (সূরা নাবাতে শুধু আঙ্গুরের উল্লেখ রয়েছে, খেজুরের উল্লেখ নেই। তবে এর দ্বারা সূরা মু'মিনুনের আয়াত فَأَنشَأْنَا لَكُم بِهِ جَنَّاتٍ مِّن نَّخِيلٍ وَأَعْنَابِ এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার অর্থ 'অতঃপর আমি তা দ্বারা তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করি'। অন্য সকল ফলের মধ্যে বিশেষ করে এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, অত্যন্ত উন্নত বৈশিষ্ট্য ও সুমিষ্ট হওয়ার কারণে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা২৯৯।

তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত ছাওবান রহ. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে যখন জান্নাতী ব্যক্তি এক জায়গা হতে একটি ফল ছিড়বে তখন অন্য একটি ফল তার স্থান পূরণ করবে।

ইমাম আহমদ রহ.-এর পুত্র আবদুল্লাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন হযরত আদম আ. কে জান্নাত হতে পৃথিবীতে নামিয়ে দেন, তখন তাকে সকল প্রকার শিল্প-কারিগরী শিখিয়েছিলেন। তাঁকে জান্নাতের ফল পাথেয় স্বরূপ সাথে দিয়েছেন। তোমার দুনিয়ার এফলগুলো জান্নাতেরই ফল হতে সৃষ্ট। তবে হ্যাঁ, এতটুকু বিষয়, সেগুলো নষ্ট হয়ে যেত; কিন্তু জান্নাতের ফল কখনো নষ্ট হবে না'। পূর্বে আলোচিত হয়েছে, সিদরাতুল মুনতাহার ফল মটকার ন্যায় বড় আকারের হবে।

সহীহ মুসলিমে৩০০ হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে জান্নাত পেশ করা হল এবং তা আমার এত নিকটে নিয়ে আসা হল, যদি আমি তার ফল নিতে চাইতাম, তাহলে তা হতে নিতে পারতাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আমি জান্নাতের ফল নিতে চাইলাম, কিন্তু আমার হাত তা হতে ছোট ছিল। যার ফলে আমি তা হতে ফল নিতে পারিনি।

আবূ খাইছামাহ রা. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, আমরা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পেছনে যোহরের নামায আদায় করছিলাম। তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সামনে অগ্রসর হতে দেখে আমরাও সামনে অগ্রসর হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বস্তু ধরার জন্য সামনে হাত বাড়ালেন, আবার পেছনে সরে গেলেন। নামায শেষে হযরত উকবা ইবনে কা'ব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আপনাকে নামাযে এমন কাজ করতে দেখেছি, যা ইতোপূর্বে করতে দেখিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আজ আমার সামনে জান্নাত পেশ করা হয়েছে, আমি তার ফলমূল দেখলাম। তোমাদের জন্য তার আঙ্গুর থোকা নিতে চাইলাম; কিন্তু আমার মাঝে ও তার মাঝে একটি বস্তু আড়াল হয়ে দাঁড়াল। আমি যদি তা তোমাদের জন্য নিতাম, তাহলে যমীন হতে আসমান পর্যন্ত সকল মাখলুক তা ভক্ষণ করলেও তা হতে হ্রাস পেত না।

ইবনুল মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতের ফল মটকা ও বালতির ন্যায় বিশাল হবে, দুধ অপেক্ষা সাদা, অমৃতাপেক্ষা সুমিষ্ট, পনীর হতেও কোমল হবে। তাতে কোন বিচি থাকবে না।

সাঈদ ইবনুল মনসূর রহ. স্ব-সনদে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জান্নাতীগণ তার ফল দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থায় খেতে পারবে।

ইমাম বায্যায রহ. স্ব-সনদে উসামা বিন যায়েদ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি জান্নাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে? জান্নাতে কোন প্রকার বিধি-নিষেধ থাকবে না। কা'বার প্রভুর শপথ! তা তো দ্বীপ্তিময় আলোকরশ্মি। তার ফুল দোল খেতে থাকে। তাতে রয়েছে সুদৃঢ় অট্টালিকা, প্রবহমান নদী, পাকা ফল, সুন্দরী-রূপবতী সূডোল স্ত্রী, জোড়া জোড়া পোশাকের সমাহার, স্থায়ী নিবাস, শান্তির নিকেতন, ফলমূল, সবুজ শ্যামলিমা, কারুকার্য খচিত চাদর, সুরম্য সুউচ্চ প্রাসাদে নানাবিধ নিআমত। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ইন্‌শাআল্লাহ' বল। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইন্‌শাআল্লাহ।

ইমাম বায্যায রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি শুধু হযরত উসামা বিন যায়দ রা. হতে বর্ণিত এবং এক সনদেই বর্ণিত রয়েছে।

হযরত লাকীত ইবনে সাবুরাহ রা. হতে ইমাম আহমদ রহ.-এর ছেলে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাতীরা কোথায় উদিত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নির্মল অমৃত মধুসাগরের পাদদেশে এবং শরাবের নদীতে। যাতে মাথা ব্যথা সহ কোনো লজ্জা ও অনুতাপ থাকবে না। তাতে এমন দুধের নদী থাকবে, যার স্বাদ কখনো বিনষ্ট হবে না। এমন পরিচ্ছন্ন পানির নহর থাকবে, যা কখনও দুর্গন্ধ হবে না।

টিকাঃ
২৯২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫
২৯৩. সূরা সাদ, আয়াত ৫০-৫১
২৯৪. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৩২-৩৩
২৯৫. সূরা হাক্কা, আয়াত ২১-২৩
২৯৬. সূরা দাহর, আয়াত: ১৪
২৯৭. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৫২
২৯৮. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৮
২৯৯. সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫
৩০০. খ. ১, পৃ. ২৯৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের চাষাবাদ ও ফসল

📄 জান্নাতের চাষাবাদ ও ফসল


وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الأَنفُسُ وَتَلَذُّ الأعين ‘সেখানে রয়েছে এমন সবকিছু; যা অন্তর চায়, যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়’৩০১।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে হাদীস বর্ণিত আছে। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলছিলেন, ইতোমধ্যে তখন তাঁর দরবারে এক গ্রাম্য লোক এল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতীদের কেউ কেউ আল্লাহ তাআলার নিকট চাষাবাদের অনুমতি চাবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি এখন তোমার মনের মত পরিবেশে শান্তিতে দিনাদিপাত করছ না? উত্তরে সে ব্যক্তি বলবে, জী হ্যাঁ, তবে একটু চাষাবাদ করতে মন চাচ্ছে। তখন সে দ্রুতই উঠে বীজ বপন করবে। সঙ্গে সঙ্গে অঙ্কুর উদগত হবে এবং বড় হতে থাকবে। মুহূর্তেই তা পেকে কাটার যোগ্য হয়ে যাবে। তার শীষ হবে পাহাড়ের ন্যায়। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদম সন্তান! এটা নিয়ে নাও, কোন বস্তুই তোমাদেরকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে না। গ্রাম্য লোকটি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মনে হয়, সে ব্যক্তি কোরাইশী বা আনসারী হবে। কেননা, তারাই তো কৃষিজীবী, আমরা তো কৃষক নই। তার কথা শুনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠলেন।

উক্ত হাদীসটি ইমাম বুখারী রহ. كتاب التوحيد في كلام الرب مع أهل الجنة অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায়, জান্নাতে চাষাবাদ হবে।

বীজ হবে সেখানকারই। আর জান্নাতের উর্বর যমীন অবশ্যই গাছগাছালি ও শস্যে ফুলে সমৃদ্ধ হওয়ার উত্তম ক্ষেত্রই বটে।

যদি প্রশ্ন হয়, জান্নাতে কোন প্রকার কষ্টের বিষয় থাকবে না, চাষাবাদের কোন প্রয়োজন পড়বে না, তবে সে ব্যক্তি কিভাবে যমীন চাষাবাদের অনুমতি চাবে? তার উত্তরে বলা যায়, সম্ভবত সে ব্যক্তি নিজ হাতে চাষাবাদের জন্য এ অনুমতি চাবে তাঁর আত্মিক সুখের জন্য। অন্যথায় তার তো এর কোন প্রয়োজন-ই নেই।

আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, এ হাদীস ছাড়া অন্য কোন হাদীসে চাষাবাদের কথা উল্লেখ নেই।

ইব্রাহীম ইবনুল হাকাম তাঁর পিতার সূত্রে হযরত ইকরিমাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, হঠাৎ এক জান্নাতী ব্যক্তির মনে এ আকাংখা জাগবে, যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে জান্নাতে চাষাবাদের অনুমতি প্রদান করতেন, তাহলে আমি চাষাবাদ করতাম। তাঁর মনের এ আকাংখা তাঁর কাছ থেকে প্রকাশ পাওয়ার পূর্বেই একদল ফিরিশতা দুয়ারে এসে নিবেদন করবেন, 'তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমার প্রভু তোমাকে জানাচ্ছেন, হে বান্দা! তুমি তোমার মনে মনে কিছু চেয়েছ। আমি তা জেনে গেছি।' তখন ফিরিশতারা বলবেন, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বীজ দিয়ে পাঠিয়েছেন। সে বলবে, বীজ দাও। ঐ বীজ হতে এমন গাছ উৎপন্ন হবে, যার শীষ হবে পাহাড়ের ন্যায়।

আল্লাহ আরশের উপর হতে বলবেন, নাও, খেয়ে নাও। মানবপ্রবৃত্তি কিছুতেই পরিতৃপ্ত হয় না।

টিকাঃ
৩০১. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের নদী, প্রস্রবণ ও প্রবাহধারা

📄 জান্নাতের নদী, প্রস্রবণ ও প্রবাহধারা


কুরআন কারীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একাধিক স্থানে বারংবার ইরশাদ করেছেন, جَنّٰتٌ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ এমন উদ্যানরাজি রয়েছে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত রয়েছে, কোথাও এসেছে تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْاَنْهٰرُ এই আয়াতাংশসমূহ দ্বারা কতগুলো বিষয় প্রতীয়মান হয় :

প্রথমত: সেখানে বাস্তবেই নদীর অস্তিত্ব রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: সে নদীগুলো স্থির নয় বরং প্রবহমান।

তৃতীয়ত: সেই নদীগুলো তাদের প্রাসাদ ও উদ্যানের পাদদেশ দিয়ে প্রবহমান থাকবে।

কোন কোন মুফাস্সির মনে করেন, সে নদী জান্নাতী ব্যক্তির অনুগামী হয়ে প্রবাহিত হবে। সে ব্যক্তি যে দিকেই ইচ্ছা করবে, সে দিকেই প্রবাহিত হবে। যখন জান্নাতী ব্যক্তি জানবে, সে নহর কোন পরিখা ব্যতীতই প্রবাহিত হবে, তখন সে আকাংখা করবে, নদী তার ইচ্ছা মোতাবেক প্রবাহিত হোক। তা প্রাসাদ ও উদ্যানের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে। যেমন দুনিয়ার নদী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ قَرْن مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَالَمْ نُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَجَعَلْنَا الْأَنْهَارِ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمْ
তারা কি দেখে না,আমি তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করেছি, তাদেরকে দুনিয়ায় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেমনটি তোমাদেরকেও করিনি। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম আর তাদের পাদদেশে নদী প্রবাহিত করেছিলাম৩০২।

এটিই হল দুনিয়ার নদীসমূহের চিরাচরিত নিয়ম।

وَهَذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِي আর এই নদীগুলো আমার পাদদেশে প্রবাহিত৩০৩।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ উভয় উদ্যানে আছে উচ্ছলিত দু'প্রস্রবণ৩০৪।

ইবনে আবী শাইবাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, نَضَّاخَتَانِ بِالْمَاءِ وَالْفَوَاكِهِ উভয় প্রস্রবণ হতে পানি ও ফল উথলে উঠবে।

ইবনুল ইয়ামান রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন نَضَّاخَتَانِ بِالْمِسْكِ وَالْعَنْبَرِ উভয় প্রস্রবণ হতে কস্তুরি ও মিশক আম্বর উথলে উঠবে। জান্নাতীর ঘর পর্যন্ত সে ঝর্ণা বইবে। যেমন দুনিয়াবাসীর ঘরের উপর বৃষ্টি পড়ে।

আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস রহ. স্ব-সনদে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, এ প্রস্রবণ দু'টি জান্নাতের সকল প্রস্রবণ অপেক্ষা উত্তম ও বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارٌ مِنْ مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِنْ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِنْ خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ
মুত্তাকীদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত: তাতে আছে নির্মল পানির নহর। আছে দুধের নহর। যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়। আছে পানকারীদের জন্য সুরার নহর। আছে পরিশোধিত দুধের নহর। আর সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা।৩০৫

আল্লাহ তাআলা এ চার প্রকার নহরের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এগুলো কখনো নষ্ট হবে না, অথচ পার্থিব জগতে তো এগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

পানি নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, দীর্ঘ সময় স্থির থাকার ফলে তা দুর্গন্ধযুক্ত হবে না, তার রং ও স্বাদের মাঝে কোন প্রকার বিকৃতি ঘটবে না। দুধের স্বাদ নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা টক হয়ে যাওয়া ও জমে যাওয়া। আর সুমিষ্ট পানীয় নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা পানকারীদের পসন্দসই না হওয়া ও বিরূপ স্বাদের হওয়া। আর মধু নষ্ট হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তা পরিষ্কার না হওয়া। এটা আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি অনন্য নিদর্শন, পার্থিব জগতে সাধারণত যে সকল বস্তুর নহর প্রবাহিত হয় না, জান্নাতে সে সব বস্তুরই নহর প্রবাহিত হবে। সুতরাং সে নহরগুলোর পরিখা ব্যতীতই প্রবাহিত হওয়া এবং কোন প্রকার বিকৃতি হতে নিরাপদ থাকার কথা আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন। যেমনিভাবে সেখানকার মদ জাতীয় পানীয় হতে সে সকল খারাপ বিষয়গুলো বিদূরীত করার কথা ঘোষণা করেছেন, যে সকল খারাপ বিষয়গুলো পার্থিব জগতের মদ্য পানে সংঘটিত হয়। যেমন মাথা ঘূর্ণন করা, মাথা ব্যথা, সুরা পান করে অনর্থক ও অশ্লীল বাক্যালাপ করা, মাতাল হওয়া, স্বাদ উপভোগ না করা। সুতরাং এ পার্থিব জগতের সুরায় পাঁচটি অনিষ্টতা রয়েছে। বিবেক বিকৃত তথা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়া, অধিকহারে অশ্লীল অপলাপ করতে থাকা, সুরা পানকারীর মাঝে তা পান করার পর সেই স্বাদের মজাদার অনুভূতি বিদ্যমান না থাকা। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর মদ শুধু মাত্র অপলাপ করা, মাতাল হওয়া, সম্পদ ব্যয় করা, মাথা ঘূর্ণন করা ও অপসন্দনীয় একটু স্বাদ আস্বাদন করা বৈ কিছুই নয়। এটা অপবিত্র ও শয়তানের শয়তানী কর্ম। যা শুধু মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। আল্লাহর স্মরণ হতে বিস্মৃত করে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও ব্যভিচারের প্রতি প্ররোচনা যোগায়। যার ফলে শরাব পানকারীর হারাম-হালাল, বৈধ-অবৈধের মাঝে তারতম্য জ্ঞান লোপ পায়। নীতি-নৈতিকতার যবনিকাপাত ঘটে এবং এমন কাজ করে যার ফলে তাকে লজ্জিত ও অপদস্থ হতে হয়।

তাকে সভ্য ও সুশীল শ্রেণী হতে অসভ্য নিম্নশ্রেণী ও উন্মাদশ্রেণীতে শামিল করে। শরাব পানকারীরা মাতাল অবস্থায় স্বীয় গোপন রহস্য প্রকাশ করে দেয়, যা তার ক্ষতি ও ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। হত্যা, বিশৃংখলা, অশ্লীলতা ও বেহায়া কার্যকলাপ তার জন্য সহজ হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে শরাব পানকারী ব্যক্তি শয়তানের সাথে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করল। কত কত লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছে এ শরাব, কত ধনাঢ্য ব্যক্তিকে নিঃস্বে পরিণত করেছে, কত সম্মানিত ব্যক্তিকে অপমান ও অপদস্থতার শৃংখলে আবদ্ধ করেছে। কত প্রাচুর্য ছিনিয়ে নিয়েছে ও শান্তি চাপিয়ে দিয়েছে। এ মদ কত ব্যক্তির বন্ধুত্বকে শত্রুতায় পরিণত করেছে। কত স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছিন্নতার আড় সৃষ্টি করেছে। শরাবের কু-প্রতিক্রিয়া কত ব্যক্তির অন্তরকে উদাসীন করেছে ও বিবেক-বুদ্ধিকে নিষ্কৃত করেছে এবং কতবার এ শরাবের কারণে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হতে হয়েছে ও কত অশ্রু ঝরিয়েছে। কতবার শরাব তার পানকারীর জন্য মঙ্গল ও কল্যাণের দ্বার রুদ্ধ করেছে। অনিষ্টতার দ্বার উন্মোচিত করেছে। শরাব ব্যক্তিকে কতবার বিপদাপদে নিপতিত করেছে ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। বস্তুত: মদই হল সকল প্রকার গুনাহ ও মন্দ কাজের সূত্র ও উৎস। এটাই সম্পদ ও প্রাচুর্য ধ্বংসকারী। যদি উল্লিখিত অনিষ্টসমূহ হতে কোন একটিও দুনিয়ার মদে নাও থাকে, তবু এ পার্থিব জগতের শরাব ও জান্নাতের শরাব কখনো একপেটে একত্রিত হতে পারে না। (অর্থাৎ সে ব্যক্তি জান্নাতের সুরা হতে বঞ্চিত থাকবে)। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
من شرب الخمر في الدنيا لم يشربها في الآخرة
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করে, সে বেহেশতী শরাব হতে বঞ্চিত হবে। মদের অপকারিতা তো বর্ণনাতীত; কিন্তু জান্নাতের মদে কোন অপকারীতা নেই।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহ তাআলা জান্নাতের নহরের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেছেন, তা প্রবহমান হবে। কখনো তার পানি বিনষ্ট হবে না; কিন্তু এটাতো অত্যন্ত সুস্পষ্ট বিষয়, প্রবহমান পানি কখনো বিনষ্ট হয় না, তবে প্রবহমান বলার পরও কেন বলা হচ্ছে, তা বিনষ্ট হবে না।

উত্তর: উক্ত প্রশ্নের উত্তর হল, প্রবহমাণ পানি যদিও বিনষ্ট হয় না; কিন্তু তা হতে কিছু পানি তুলে দীর্ঘ সময় রেখে দিলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু জান্নাতের নহরের পানি সুদীর্ঘকাল এভাবে রেখে দিলেও বিনষ্ট হবে না।

চিন্তা করে দেখুন, সেখানে মানুষের কাছে প্রিয়তম চার প্রকার পানীয়ের নহরের সমন্বয় ঘটবে। পানির নহর থাকবে, তাদের পান করা ও পবিত্রতা অর্জনের জন্যে। দুধের নহর থাকবে, তাদের আহারের বস্তু হিসাবে। সুরার নহর থাকবে, আমোদ-প্রমোদ, উৎফুল্লতা ও প্রফুল্লতার জন্য। অমৃতের নহর থাকবে, তাদের আরোগ্য ও উপকার লাভের জন্য।

জান্নাতের নহরের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য
জান্নাতের নহরগুলো উপর হতে উৎসারিত হয়ে নিম্নাঞ্চলে প্রবাহিত হবে।

ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে৩০৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان في الجنة مأة درجة জান্নাতে একশত স্তর রয়েছে। সেগুলো আল্লাহ তাআলা তাঁর রাস্তায় জিহাদকারীদের জন্য তৈরী করেছেন। بين كل درجتين كما بين السماء والأرض প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্বসম-দূরত্ব রয়েছে। সুতরাং যখন তোমরা তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা কর। فإذا سألتم الله فاسئلوه الفردوس ফإنه وسط الجنة وأعلى الجنة কেননা, তা মধ্যবর্তী ও উঁচু স্তরের জান্নাত। وفوقه عرش الرحمن তার উপরে রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ। ومنه تفجر أنهار الجنة তা হতেই জান্নাতের নহর প্রবাহিত হয়।

ইমাম তিরমিযী রহ. হযরত মু'আয বিন জাবাল রা. ও হযরত আবূ উবাদাহ ইবনুস-সামিত রা. হতে অনুরূপ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। হযরত উবাদাহ ইবনুস-সামিত রা.-এর বর্ণিত হাদীসের শব্দাবলী এরূপ الجنة مأة درجة ما بين كل درجتين مسيرة مأة عام জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে একশত বছরের দূরত্ব। ومنها الأنهار الأربعة তা হতেই চারটি নহর প্রবাহিত হয়। والعرش فوقها তার উপরেই রয়েছে আল্লাহ তাআলার আরশ।

فان سألتم الله فاسئلوه الفردوس الأعلى যখন তোমরা আল্লাহ তাআলা নিকট জান্নাত প্রার্থনা করবে, তখন উচ্চস্তরের ফিরদাউস প্রার্থনা কর।

মু'জামে তাবারানীতে হযরত সামুরাহ রা. হতে হযরত হাসান বসরী রহ.-এর বর্ণনা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الفردوس ربوة الجنة وأعلاها وأوسطها ফিরদাউস হলো জান্নাতসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, উচ্চতম ও মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত জান্নাতের নাম। منها تفجر الأنهار সেখান থেকেই জান্নাতের প্রস্রবণগুলো উৎসারিত হবে।

সহীহ বুখারীতে৩০৭ হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, رفعت إلى سدرة المنتهى في আমাকে (মি'রাজ রাতে) সপ্তম আকাশে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে نبقها مثل قلال هجر তার কূল ছিল হিজর গোত্রের মটকার ন্যায় বৃহৎ আকারের। ورقهامثل الاذان তার পাতা হাতির কানের ন্যায়। يخرج من ساقها نهران ظاهران ونهاران باطنان তার কাণ্ড হতে দুটি প্রকাশ্য প্রস্রবণ ও দু'টি অপ্রকাশ্য ঝর্ণা রয়েছে। فقلت يا جبريل ما هذا আমি জিবরীল আ. কে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। قال اما النهران الباطنان ففي الجنة وأما النهران الظاهران فا النيل والفرات অপ্রকাশ্য দুটি হলো জান্নাতে আর প্রকাশ্য দু'টি হল নীল ও ফুরাত নদদ্বয়।

সহীহ বুখারীতে৩০৮ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, بينا انا اسير في الجنة (মি'রাজ রাতে) আমি জান্নাতে বিচরণ করছিলাম। ذا انا بنهر حافتاه قباب اللؤلؤ المجوف। তখন আমি এমন এক নহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যার উভয় পার্শ্বে ফাঁপা মুক্তমালার গম্বুজ রয়েছে। فقلت ماهذا يا جبريل তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরীল এটা কি? قال هذا الكوثر الذي اعطاك ربك জিবরীল আ. বললেন, এটিই হল সে কাওসার, যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন।

قال فضرب الملك بيده فاذاطينه مسك اذفر রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর জিবরীল আ. সে নহরে হাত দিলেন, তখন তার মাটি হতে কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে লাগল।

৩০৯ সহীহ মুসলিমে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الكوثر نهر في الجنة কাউছার হল জান্নাতের একটি নহর। وعدنيه ربي عز وجل আমার প্রভু আমাকে তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, دخلت الجنة فاذا بنهر يجري আমি জান্নাতে প্রবেশ করে এমন প্রবহমান এক নহরের নিকট দিয়ে অতিক্রম করেছি حافتاه خيام اللؤلؤ যার উভয় প্রান্তে মুক্তার তাবু রয়েছে। فضربت بيدي إلى ما يجرى فيه من الماء আমি তার প্রবহমান পানিতে হাত দিলাম فاذا انا بمسك اذفرا আমি তার সুগন্ধি বিচ্ছুরিত মাটি লক্ষ্য করলাম। (অর্থাৎ তার মাটি হতে কস্তুরির সুগন্ধ বিচ্ছুরিত হচ্ছে( فقلتُ : لمن هذا يا جبریل আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরীল! এটি কার? قال هذا الكوثر الذي أعطاك الله عز وجل তিনি বললেন, এটাই সে হাউযে কাউসার, যা আল্লাহ তাআলা আপনাকে দান করেছেন। ইমাম তিরমিযী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الكوثر نهر في الجنة কাউসার হল জান্নাতের একটি নহর। حافتاه من ذهب ومجراه على الدر والياقوت তার উভয় প্রান্তে স্বর্ণের, তা প্রবাহিত হয় পদ্মরাগ মনি ও মুক্তার উপর। تربتُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمَسْكِ তার মাটি মিল্ক অপেক্ষা অধিক সুগন্ধিময় وماءه احلى من العسل তার পানি মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি। وابيض من الثلج এবং শিলা অপেক্ষা অধিক শুভ্র।

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি হাসান ও সহীহ স্তরের।

আবূ নাঈম আল ফযল রহ. স্ব-সনদে হযরত মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, إِنَّ أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ! আয়াতে কারীমার মাঝে كوثر দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অফুরন্ত কল্যাণ।

হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, কাউসার হল, জান্নাতের একটি নহর।

হযরত আইশা সিদ্দীকা রা. বলেন, কাউসার হল, জান্নাতের এমন একটি নহর, যার প্রবাহিত হওয়ার আওয়ায কানে আঙ্গুল প্রবেশকারী ব্যক্তিও শুনতে পাবে। বস্তুত: তার নিগূঢ় তত্ত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। অর্থাৎ কানে আঙ্গুল চেপে ধরলে যেই শব্দ শুনা যায়, জান্নাতের বর্ণনার শব্দপ্রায় তাই অনুরূপ হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

জামে'তিরমিযীতে৩১০: 'হযরত হাকীম ইবনে মু'আবিয়া রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি স্বীয় পিতা হযরত মু'আবিয়া রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إن في الجنة بحر الماء জান্নাতে একটি পানির নহর রয়েছে। وبحر العسل আরেকটি মধুর নহর রয়েছে। وبحر اللبن আরেকটি দুধের নহর রয়েছে। ثم تشقق الأنهار এই নহরগুলো হতে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বের হয়েছে।

ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْقِيَهُ اللهُ عَزَّ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وَجَلَّ مِنَ الْخَمْرِ فِي الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهُ فِي الدُّنْيَا যে ব্যক্তি আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার সুরা পানের আশাবাদী ও আগ্রহী, সে যেন দুনিয়াতে তা বর্জন ا وَمَنْ سَرَّهُ أَنْ يَكْسِيَهُ اللهُ الْحَرِيرَ فِي الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهُ فِي الدُّنْيَا করে। যে ব্যক্তি আগ্রহী ও আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা তাকে আখিরাতে রেশমের পোশাক পরিধান করাবেন, সে যেন দুনিয়াতে তা বর্জন করে। জান্নাতের নহর কস্তুরির টিলা অথবা কস্তুরির পর্বতের তলদেশ হতে উৎসারিত হয়।

জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তিকে যে অলংকার পরিধান করানো হবে, যদি পৃথিবীর সকল অলংকারকে তার সাথে তুলনা করা হয়, তবে সে জান্নাতী ব্যক্তির অলংকারই শ্রেষ্ঠ ও উত্তম বলে প্রমাণিত হবে।

আ'মাশ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, জান্নাতের নহরসমূহ কস্তুরির পর্বতের তলদেশ হতে উৎসারিত হবে।

ইবনে মারদাবি রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়স রা.-এর এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, في هذه الأنهار تشخب من جنة عدن في جوبة এই নহরগুলো জান্নাতে আদনের গহবর থেকে প্রবাহিত হয়। ثم تصدع بعد أنهارا এরপর বিভিন্ন নদ হতে উজানের দিকে উঠে যায়।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়, তোমাদের ধারণা জান্নাতের নহরগুলো যমীনের গহবর দিয়ে প্রবাহিত হয়, অথচ বিষয়টি এমন নয়। আল্লাহর শপথ! তা যমীনের উপরিভাগ দিয়েই প্রবাহিত হয়, তার একপ্রান্ত হল মুক্তমালার অন্য প্রান্ত হল পদ্মরাগ মণির, আর তার মাটি খাঁটি কস্তুরির। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম الاذفر কি? জবাবে তিনি বলেছেন, الاذفر হল এমন বস্তু যাতে অন্য কোন বস্তুর মিশ্রণ থাকবে না বরং তা সম্পূর্ন খাঁটি ও নির্ভেজাল হবে।

ইবনে মারদাবি স্ব-সনদে স্বীয় তাফসীরে হযরত আনাস রা. হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন। আবূ খাইসামা রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, إنا أعطيناك الكوثر! আয়াতটি পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কাউসার দান করা হয়েছে। যমীন বিদীর্ণ করা ব্যতীতই তা প্রবাহিত হয়। তার উভয় প্রান্তে মুক্তার গম্বুজ রয়েছে। তখন আমি আমার উভয় হাত সেই ঝর্ণার তলদেশের মাটিতে রাখলাম। মনে হল, তা যেন খাঁটি কস্তুরি। তার কংকর হবে মুক্তার।

সুফিয়ান সাওরী রহ. স্ব-সনদে হযরত মাসরুক রহ. হতে আল্লাহর বাণী, وماء مسكوب এর তাফসীর করেন। তা এমন নহর, যা গহবর ব্যতীতই প্রবাহিত হয়। তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী وَنَخْلِ طَلْعُهَا هَضِيمٌ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, এমন খেজুর রয়েছে সেখানে, যার শস্য অত্যন্ত কোমল। তিনি বলেন, তার মূল এবং শাখা একই ধরনের হবে।

সহীহ মুসলিমে৩১১ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাইহান, যাইহান, নীল ও ফুরাত এ চারটির সবগুলোই বেহেশতের নদী।

উসমান ইবনে সাঈদ দারেমী স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, اَنْزَلَ اللهُ مِنَ الْجَنَّةِ خَمْسَةَ اَنْهَار আল্লাহ তাআলা জান্নাতের পাঁচটি নদী দুনিয়াতে প্রবাহিত করেছেন। سیحون وهو نهر الهند সাইহুন যা ভারতবর্ষে অবস্থিত। وجيحون وهو نهر بلخ (আমু দরিয়া) জাইহুন যা বলখে অবস্থিত, دجلة والفرات وهما نهر العراق والنيل وهو نهر مصر নীল নদ; যা মিসরে অবস্থিত। এ সবগুলোই আল্লাহ তায়লা জান্নাতের একটি প্রস্রবণ হতে প্রবাহিত করেছেন, সেটি সর্ব নিম্নস্তরের জান্নাতের প্রসবণ। জিবরীল আ.-এর পাখা দ্বারা সেগুলোকে বের করা হয়। অতঃপর সেগুলোকে পর্বতের মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। এরপর সেগুলোকে পৃথিবীতে প্রবাহিত করা হয়েছে। মানুষের জীবিকার্জনের বিভিন্ন মাধ্যম এই নদগুলোতে রয়েছে। আল্লাহ তাআলার বাণী وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَر এবং আমি আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেছি পরিমিতভাবে দ্বারা উদ্দেশ্য হল فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّا عَلَى ذَهَابِ بِهِ لَقَادِرُونَ অর্থাৎ আমি তা মাটিতে সংরক্ষিত করি; আমি তাকে অপসারিত করতেও সক্ষম৩১২।

সুতরাং (কিয়ামত নিকটবর্তী সময়ে) যখন ইয়া'যূজ মা'যূজ-এর আবির্ভাব ঘটবে, তখন আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরীল আ. কে পাঠিয়ে পৃথিবী হতে কুরআন ও তার যাবতীয় সহযোগী ইলম, বায়তুল্লাহ হতে হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম, হযরত মূসা আ.-এর সিন্দুক ও তার মধ্যাবস্থিত বস্তু উঠিয়ে নিবেন। তখন সে পাঁচটি নহরও উঠিয়ে নিবেন। আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর উদ্দেশ্য এটাই, إِنَّا عَلَى ذَهَابِ بِه لَقَادِرُونَ অর্থাৎ আমি তাকে অপসারিত করতেও সক্ষম। এসকল বস্তু উঠিয়ে নেওয়ার দ্বারা পৃথিবীবাসী সেগুলোর নানাবিধ মঙ্গল হতে বঞ্চিত হবে।

আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, জান্নাতে বায়দাখ নামক একটি নহর রয়েছে, তার উপর পদ্মরাগ মণির গম্বুজ রয়েছে, তার নিচে সুন্দরী, রূপবতী ও কমনীয়া বালিকারা থাকবে। জান্নাতীগণ বলবে, আমাদেরকে বায়দাখের দিকে নিয়ে যাও। তখন তারা সে রমণীদের চেহারা অত্যন্ত গভীরভাবে দেখতে থাকবে। কোন জান্নাতীর যে কোন কিশোরীকে পসন্দ হবে, সে তার বাহু স্পর্শ করলে কিশোরী তার পেছনে পেছনে হাটতে থাকবে।

জান্নাতের নদ-নদী
জান্নাতে নদ-নদী বিদ্যমান হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীসমূহ দ্বারাই প্রতীয়মান হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও প্রস্রবণসমূহে৩১৩।

আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِنْ كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا সৎকর্মশীলেরা পান করবে এমন পানীয়, যার মিশ্রণ হবে কাফুর। عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا এমন একটি প্রস্রবণ, যা হতে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এই প্রস্রবণকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করবে৩১৪।

আল্লাহ তাআলার বাণী يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ এর ব্যখ্যায় উলামায়ে কিরামের মতভেদ রয়েছে। কুফাবাসীগণ বলেন, এ এর মধ্যে من باء এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। সে হিসাবে অর্থ হল يَشْرَبُ مِنْهَا জান্নাতীগণ সে নহর হতে পানি পান করবে।

অন্যরা বলেন, يشرب ها এর মধ্যে يروى এর অর্থ অন্তর্ভুক্ত। সে হিসাবে অর্থ হল, তারা এ পরিমাণ পানি পান করবে, যাতে তারা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলেন, ১৬ টি এখানে ظرف তথা স্থান বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। عينا দ্বারা উদ্দেশ্য প্রস্রবণ নয়; বরং তা একটি স্থানের নাম। (গ্রন্থকার يشرب শব্দটিতে یروی এর অর্থ নিহিত থাকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন) তিনি বলেন, কুরআন কারীমে এর উদাহরণ রয়েছে, وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِالْحَادِ بِظُلْمِ نُدَقُهُ مِنْ عَذاب أليم যে ইচ্ছা করে সীমালংঘন করে পাপ কার্যের দ্বারা, তাকে আমি আস্বাদন করাব মর্মন্তুদ শাস্তি।

وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنْجَبِيلًا সেখানে তাদেরকে পান করতে দেওয়া হবে যান্জাবীল মিশ্রিত পানীয়। عَيْنَا فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلًا জান্নাতের এমন প্রস্রবণ হতে, যার নাম সালসাবীল৩১৫।

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাঁর নৈকট্য লাভকারীগণ খাঁটি পানীয় পান করবে। কেননা, নৈকট্যশীল বান্দাগণ তাঁদের যাবতীয় আমল একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই করেছে। এজন্য তাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা খাঁটি পানীয় পান করাবেন। কিন্তু অন্য নেককারদের আমলে যেহেতু অন্য উদ্দেশ্যের কিছুটা হলেও মিশ্রণ ছিল। (অন্য কোন উদ্দেশ্য না থাকলে কমছে কম জান্নাত লাভের উদ্দেশ্য তো ছিল) সুতরাং তাদের পানীয় মিশ্রণযুক্ত হবে।

إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ নিশ্চয়ই পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে অবলোকন করবে। • تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعيم তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দের সজীবতা দেখতে পাবে। يُسْقَوْنَ مِنْ رَحيق مختوم ختامه مسك وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ . وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمِ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ ) তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানি হতে পান করানো হবে। তার মোহর মিশকের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। তার মিশ্রণ হবে তাস্স্নীমের। এটা একটি প্রস্রবণ, যা হতে সান্নিধ্যপ্রাপ্তরা পান করবে৩১৬।

আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাদের পানীয় দু'টি বস্তুর মিশ্রণযুক্ত হবে। সূরার প্রথমাংশে উল্লেখ করেছেন, তাদের পানীয় কাফুর মিশ্রিত হবে, আর শেষাংশে উল্লেখ করেছেন, তা (যানজাবীল) আদা মিশ্রিত হবে। কাফুর হল ঠান্ডা ও সুগন্ধিময় আর আদা হল উষ্ণ ও সুগন্ধিময়। সুতরাং উভয়টার মিশ্রণে তাতে সমতা বজায় থাকবে। সেগুলোর স্বাদ অধিক হবে আলাদা করে পান করা অপেক্ষা।

সূরার শুরুতে কাফুরের উল্লেখ আর শেষাংশে আদার উল্লেখ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হিকমত নির্দেশ করে। কেননা, পানীয়ের মধ্যে যখন প্রথমে কাফুর মিশ্রিত করা হবে, তখন তাতে শীতলতা সৃষ্টি হয়, অতঃপর যখন তাতে আদা মিশ্রণ করা হয়, তখন তাতে সমতা ফিরে আসে। বাহ্যিকতার দাবী হল, পূর্বের পেয়ালার পানীয় অপেক্ষা পরবর্তী পেয়ালার পানীয় ভিন্ন হবে। অবশ্যই উভয়টা ভিন্ন স্বাদের হবে। এক পেয়ালার পানীয়তে কাফুর মিশ্রিত থাকবে আর অন্য পেয়ালার পানীয়তে আদা মিশ্রিত থাকবে।

এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, তাদের পানীয়ের মধ্যে যে কাফুর মিশ্রণ করা হবে, তার শীতলতা হল তাদেরকে নির্দেশিত বিষয় অর্থাৎ ভীতি, ত্যাগ, ধৈর্যসহ তাদের সকল দায়িত্ব সম্পাদনের কারণে তাদের মধ্যে যে দাহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, তার বিপরীতে। যদিও তাদের নির্দেশিত বিষয় অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। তাছাড়া তারাও মান্নতের মাধ্যমে অনেক বিষয় আবশ্যকীয় করে থাকে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا ٥ আর তাদের ধৈর্যশীলতার পুরষ্কার স্বরূপ তাদেরকে দিবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্র৩১৭।

কেননা, ধৈর্যে কঠোরতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মত বিষয় নিহিত রয়েছে। যার দাবী হল, নিয়ন্ত্রণ ও কঠোরতার বিপরীত বিষয় অর্থাৎ প্রশস্ত জান্নাত ও রেশমী বস্ত্র তাদের লাভ করা।

আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের মাঝে উৎফুল্লতা, সজীবতা ও উজ্জ্বলতার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। চেহারার সজীবতার দরুন তাদের বাহ্যিক সুন্দর হবে আর অন্তরের প্রফুল্লতার দরুন অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। যেমনি দুনিয়াতে ইসলামের বিধানাবলীর সঠিক বাস্তবায়ন ব্যক্তির নিজের বাহ্যিক দিক সৌন্দর্যমন্ডিত ও সুশোভিত করে তোলে আর ঈমানের মূলধারা অভ্যন্তরকে সুশোভিত করে তোলে। এ সূরার শেষাংশের আল্লাহ তাআলার এ বাণীর মর্মার্থ এরূপই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, عَالَيْهُمْ ثِيَابُ سُنْدُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقَ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِنْ فِضَّةٍ তাদের আবরণ হবে সূক্ষ্ম সবুজ রেশম ও স্থূল রেশম, তারা অলংকৃত হবে রৌপ্য নির্মিত কংকণে৩১৮। এহচ্ছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের চিত্র। আল্লাহ তাআলা অতঃপর ইরশাদ করেন وَسَقَاهُمْ رَبُّهُمْ شَرَابًا طَهُورًا আর তাদের প্রতিপালক তাদের কে পান করাবেন বিশুদ্ধ পানীয়৩১৯।

এটা হল অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের চিত্র।

মানব পিতা হযরত আদম আ. কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর মর্মার্থ এটাই। إِنْ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى তোমার জন্য এটাই রইল, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না, নগ্নও হবে না, وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى এবং সেখানে পিপাসার্ত হবে না এবং রৌদ্র-ক্লিষ্টও হবে না৩২০।

আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিলেন, সেখানে ক্ষুধার কারণে অভ্যন্তরীন কষ্ট হবে না এবং নগ্নতার দ্বারাও বাহ্যিক কষ্ট হবে না। তৃষ্ণার কারণে অভ্যন্ত রীণ কাতরতার সৃষ্টি হবে না এবং রৌদ্রের কারণে বাহ্যিক কাতরতা সৃষ্টি হবে না। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর প্রদত্ত নিআমতর কথা এক এক করে স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে লজ্জা নিবারনের জন্য পোশাক দান করেছেন। এটা তাদের বাহ্যিক দিককে সুশোভিত করে। এটা ব্যতীতও অন্য একটি পোশাক রয়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে। তা হল, তাকওয়া তথা খোদাভীতি।

আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, উপরোক্ত পোশাক দু'টি হল, তাকওয়া তথা খোদাভীতির পোশাক। আল্লাহ তাআলার উক্ত বাণীর মর্মার্থ এরই মত। তিনি ইরশাদ করেন,
إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بزينة الكواكب وحفظا مِنْ كُلِّ شَيْطَانِ مارد আমি নিম্নতম আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে৩২১।

সুতরাং আল্লাহ তাআলা আকাশের বাহ্যিক দিককে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছেন আর অভ্যন্তরীণ দিককে বিদ্রোহী শয়তান থেকে রক্ষা করার দ্বারা সুশোভিত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা হজ সম্পাদনের ইচ্ছা পোষণকারীদের ব্যাপারে যা বলেছেন, তাও এরই ন্যায়। কেননা, তিনি হজব্রত পালনে ইচ্ছা পোষনকারীদেরকে কা'বা পর্যন্ত ভ্রমণের পাথেয় নিতে যেমনিভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনিভাবে পরপারের ভ্রমণের পাথেয় সঞ্চয়েরও নির্দেশ দিয়েছেন। আর তা হল তাকওয়া তথা খোদাভীতি।

আযীযে মিসর-এর স্ত্রী হযরত ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারে যা বলেছেন, তাও এর-ই ন্যায়। সে বলেছে, فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَنِي فيه সে বলল, এ-ই সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। তখন সে অন্য সব মহিলাকে হযরত ইউসুফ আ.-এর বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখিয়ে তাদেরকে বলল, وَلَقَدْ رَاوَدَّتْهُ عَنْ نَفْسَه فَاسْتَعْصَم আমি তো তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছি, কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে।৩২২ এর দ্বারা সে হযরত ইউসুফ আ. এর আত্মিক সৌন্দর্যের কথা সকল মহিলার সামনে তুলে ধরেছে। কুরআন কারীমে এ জাতীয় বিষয় অনেক রয়েছে।

টিকাঃ
৩০২. সূরা আনআম, আয়াত ৬
৩০৩. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৫১
৩০৪. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৬
৩০৫. সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫
৩০৬. খ. ১ পৃ. ৩৯১
৩০৭. খ. ১, পৃ. ৫৪৯
৩০৮. খ. ২, পৃ: ৯৭৪
৩০৯. খ. ১, পৃ. ১৭২
৩১০. খ. ২ প. ৮৪
৩১১. খ. ২ প. ৩৮০
৩১২. সুরা মু'মিন, আয়াত: ১৮
৩১৩. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৫
৩১৪. সূরা দাহর, আয়াত: ৫, ৬
৩১৫. সূরা দাহ্, আয়াত: ১৭-১৮
৩১৬. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ২২-২৮
৩১৭. সূরা দাহর, আয়াত ১২
৩১৮. সূরা দাহর, আয়াত ২১
৩১৯. সূরা দাহর, আয়াত ২১
৩২০. সূরা তা-হা, আয়াত: ১১৭-১৮
৩২১. সূরা সাফফাত, আয়াত: ৬-৭
৩২২. সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতীদের খাবার ও পানীয় এবং পরিপাক পদ্ধতি

📄 জান্নাতীদের খাবার ও পানীয় এবং পরিপাক পদ্ধতি


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي ظِلَالٍ وَعُيُونٍ وَفَوَاكِهَ مِمَّا يَشْتَهُونَ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণবহুল স্থানে। তাদের বাঞ্ছিত ফলমূলের প্রাচুর্যের মধ্যে। তোমাদের কর্মের পুরস্কার স্বরূপ তোমরা তৃপ্তিসহ পানাহার কর৩২৩।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهُ ، إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابَيَة . فَهُوَ فِي عيشة راضية فِي جَنَّةِ عَالِيَة • قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ، كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَة
তখন যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, নেও, আমার আমলনামা পড়ে দেখ আমি জানতাম, আমাকে আমার হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে, সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন। সুউচ্চ জান্নাতে যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে। তাদেরকে বলা হবে, পানাহার কর তৃপ্তিসহকারে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে, তার বিনিময় স্বরূপ৩২৪।

وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ এ হল জান্নাত, তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের ফল স্বরূপ। لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْهَا تَأْكُلُونَ সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা হতে তোমরা আহার করবে৩২৫।

مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ أُكُلُهَا دَائِمٌ وَظِلُّهَا মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার উপমা এরূপ: তার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তার ফলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী৩২৬।

وَأَمْدَدْنَا هُمْ بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمِ مِمَّا يَشْتَهُونَ আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, আমি তাদেরকে দিব ফলমূল এবং গোস্ত, যা তারা পসন্দ করে। يَتَنَازَعُونَ فِيهَا كَأْسًا لَّا لَغْوٌ فِيهَا وَلَا تَأْثِيمٍ সেখানে তারা পরস্পরের মধ্যে আদান প্রদান করতে থাকবে পান পাত্র, যা হতে পান করলে কেউ অসার কথা বলবে না, পাপ কর্মেও লিপ্ত হবে না। (অথচ দুনিয়ার মদে উভয় প্রকার মন্দতা বিদ্যমান)

يُسْقَونَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় হতে পান করানো হবে। خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ তার মোহর মিশকের, এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক৩২৭।

সহীহ মুসলিমে৩২৮ হযরত জাবির রা. হতে আবুয-যুবাইর বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يَأْكُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ وَيَشْرَبُونَ জান্নাতীগণ পানাহার করবে। لَا يَبُولُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَمْتَخِطُونَ সেখানে প্রস্রাব-পায়খানা ফেলতে হবে না এবং প্রস্রাব-পায়খানা করতে হবে না। (পার্থিব জগতের খাবার পরিপাক তন্ত্র ঘুরে এসে তরল বস্তুতে পরিণত হয় তখন প্রস্রাব ও পায়খানার প্রয়োজন পড়ে) طَعَامُهُمْ ذَلِكَ جُشَاءٌ كَرِيحِ الْمِسْكِ তাদের খাবার হযমকারী বস্তু হবে কস্তুরির মত, সুগন্ধিময় ঢেকুর। يلهمون التسبيح والتكبيركما تلهمون النفس তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস যেমনিভাবে অব্যাহত রাখা হয়, তেমনিভাবে তাদের মাঝে তাসবীহ ও তাকবীর অব্যাহত রাখা হবে।

এমনিভাবে মুসলিম শরীফে৩২৯ হযরত জাবির রা. হতে হযরত তালহা ইবনে নাফে'র বর্ণনা রয়েছে। فمابال الطعام : قال সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, জান্নাতীগণতো পানাহার করবে, তাহলে তাদের খাদ্য পানীয় কিসে রূপান্তরিত হবে?

قال : جشاء ورشح كرشح المسك জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধিময় ঘাম ও ঢেকুর। (ঢেকুর ও ঘাম দ্বারাই সে খাদ্য হযম হয়ে যাবে( يلهمون التسبيح والحمد হামদ ও তাসবীহ তাদের অন্ত রে ঢেলে দেওয়া হবে।

মুসনাদ ও সুনানে নাসায়ীতে বুখারীর বর্ণনা ধারার শর্ত মোতাবেক হাদীস বর্ণিত রয়েছে। সেখানে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী-খৃস্টান) এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, يا ابا القاسم تزعم أن أهل الجنة يأكلون ويشربون হে আবুল কাসিম! আপনি কি মনে করেন, জান্নাতীগণ পানাহার করবে? قال : نعم والذي نفس محمد بيده أن أحدهم ليعطى قوة مأة رجل من الأكل والشرب والجماع والشهوة নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হ্যাঁ, সে সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক জান্নাতীদেরকে পানাহার, সহবাস ও কাম প্রবৃত্তিতে একশত ব্যক্তির শক্তি প্রদান করা হবে।

قال : فان الذي يأكل ويشرب تكون له الحاجة সে বলল, যে পানাহার করবে, অবশ্যই তার মানবীয় প্রয়োজন দেখা দেবে। وليس في الجنة اذى অথচ জান্নাতে তো কোন প্রকার ময়লা নেই। (তাহলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে কোথায় যাবে?)

قال : تكون حاجة أحدهم رشحا يفيض من جلودهم كرشح المسك فيضمر بطنه রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের চামড়া হতে কস্তুরির ন্যায় সুরভিত ঘাম নির্গমনের দ্বারা তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটে যাবে এবং পেটও খালি হয়ে যাবে।

ইমাম হাকিম রহ. তাঁর সহীহ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এক ইহুদী ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল, হে আবুল কাসিম! আপনি কি মনে করেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে পানাহার করবে? সে ইহুদী তার সাঙ্গোপাঙ্গদের বলল, সে (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যদি বলে, হ্যাঁ, তবে আমি তাকে নিরুত্তর করার জন্য আরো প্রশ্ন করতে থাকব। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আমি এটাই মনে করি। ঐ সত্তার শপথ! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, অবশ্যই প্রত্যেক জান্নাতী ব্যক্তিকে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও কাম প্রবৃত্তিতে একশত ব্যক্তির সমপরিমাণ শক্তি প্রদান করা হবে। ইহুদী পুনরায় প্রশ্ন করল, যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে, তার অবশ্যই প্রাকৃতিক প্রয়োজন বোধ হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের চামড়া হতে নির্গত কস্তুরির ন্যায় সুরভিত ঘামের দ্বারাই তাদের সে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটে যাবে। এর দ্বারা তাদের পেটও খালী হয়ে যাবে।

হাসান ইবনে আরাফাহ স্ব-সনদে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, إنك لتنظر إلى الطير في الجنة فتشتهيه فيخر بين يديك مشويا তুমি যখনি তা খাওয়ার ইচ্ছা করবে, তখনি তা ভুনা অবস্থায় তোমার সামনে এসে উপস্থিত হবে।

ইতোপূর্বে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের রা. ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্বলিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে জান্নাতের সর্বপ্রথম খাদ্য ও পানির উল্লেখ রয়েছে। (অর্থাৎ জান্নাতীদেরকে জান্নাতে সর্বাগ্রে কোন ধরনের খাবার ও পানীয় প্রদান করা হবে।)

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,৩৩০ কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটি রুটির আকৃতি হবে আর আল্লাহ তাআলা তাকে তাঁর এক হাত হতে অন্য হাতে নিবেন। সেই রুটি দ্বারা জান্নাতীদেরকে আপ্যায়ন করা হবে।

ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত হুযাইফা রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان في الجنة طيرا أمثال البخاتی জান্নাতে বুখতী উটের (এক প্রজাতির উট) ন্যায় বৃহদাকারের পাখী থাকবে। فقال : ابوبكر انها لناعمة يارسول الله তখন হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাতো অবশ্যই হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় তৃপ্ত হবে? قال : أنعم منها من يأكلها )কেননা, তা জান্নাতের পাখী( রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভক্ষণকারী তা অপেক্ষা অধিক নিআমত ধন্য হবে। وأنت ممن يأكلها يا أبا بكر হে আবূ বকর! তুমিও তার ভক্ষণকারীদের একজন হবে।

ইমাম হাকিম রহ. স্ব-সনদে হযরত কাতাদাহ রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَلَحْمِ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাতীগণ যেমনিভাবে আরাম-আয়েশে থাকবে, জান্নাতের পাখিগুলোও তেমনি আরাম-আয়েশে থাকবে বলে আমি মনে করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভক্ষণকারীরা তা অপেক্ষাও অধিক আরাম-আয়েশে থাকবে। সে পাখীর ঘাড় উষ্ট্রীর ঘাড়ের ন্যায় বৃহদাকারের হবে। হে আবূ বকর! আমি আল্লাহর দরবারে আশাবাদী, তুমিও তা ভক্ষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

একই সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে হযরত কাতাদাহ রহ. يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَاب এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জান্নাতীদের নিকট সত্তর প্রকারের স্বর্ণের পানপাত্র নিয়ে প্রদক্ষিণ করা হবে। প্রত্যেক পাত্রের খাদ্য ও আহারের রং ও প্রকৃতি অন্যটি অপেক্ষা ভিন্নতর হবে।

দারাওয়ারদী স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, তাতে হাউযে কাউসারের ব্যাপারে উল্লেখ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেটি একটি নদী, যা আমার প্রভু আমাকে দান করেছেন। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা অধিক শুভ্র এবং অমৃত অপেক্ষা অধিক মিষ্ট হবে। فيه طيور أعناقها كأعناق الجزر সেখানে উটের ঘাড়ের ন্যায় বৃহৎ ঘাড় বিশিষ্ট পাখী রয়েছে। فقال عمر بن الخطاب : انها يا رسول الله الناعمة !
তখন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে সকল পাখীতো হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় তৃপ্ত থাকবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ভক্ষণকারী তদাপেক্ষা আরো অধিক নিআমত ধন্য হবে।

ইবরাহীম ইবনে সাঈদ অনুরূপ হাদীস উল্লেখ করেছেন। তবে তাতে হযরত উমর রা.-এর স্থলে হযরত আবূ বকর রা.-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।

উসমান ইবনে সাঈদ দারেমী রহ. স্ব সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَكَأْس من معين এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, সে সব পানপাত্রে এমন সুরা থাকবে, যা পান করার দ্বারা মাথা ঘুরাবে না এবং সংজ্ঞাও হারাবে না। وَكَأْسًا دَهَاقًا এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে সকল পানপাত্র পরিপূর্ণ থাকবে مِن رَّحِيقٍ مَّحْتُومٍ এর ব্যাখ্যায় বলেন, তাতে কস্তুরির মোহর সমৃদ্ধ থাকবে।

হযরত আলকামাহ রহ. হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন। ختامه مسكদ্বারা উদ্দেশ্য হল, তার পানীয়তে কস্তুরির মিশণ থাকবে। তার দ্বারা উদ্দেশ্য মোহর নয়।

গ্রন্থকার বলেন, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জ্ঞাত। তবে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, সে পানীয়তে কস্তুরির মিশণ থাকবে। আর ختام শব্দটি خاتمه থেকে উৎকলিত, ختم থেকে নয়।

যায়দ ইবনে মুআবিয়া রহ. বলেন, আমি হযরত আনাস রা. কে ختامه مسك এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমি তখন ختامه مسك পাঠ করেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, ختامه مسك পড়।

আলকামাহ রহ. বলেন, ختامه অর্থ হল خلطه অর্থাৎ মিশণ। তোমরা কি লক্ষ্য কর না, তোমাদের স্ত্রীরা বলে থাকে ك للطيب ان خلطه من مسك لكذا সুগন্ধিতে এভাবে কস্তুরির সংমিশণ রয়েছে।

হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর হযরত মাসরুক রহ. থেকে الرحيق المختوم এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন যে, الرحيق দ্বারা উদ্দেশ্য হল পানীয়, المختوم দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তার শেষাংশে কস্তুরির স্বাদযুক্ত হওয়া।

একই সনদে হযরত আবদুল্লাহ হতে মাসরুক রহ. বর্ননা করেন, তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী ومزاجه من تسنیم এর ব্যাখ্যায় বলেন, নৈকট্যশীল ব্যক্তিগণতো অন্য কোন মিশ্রণ ব্যতীত খাঁটি পানীয় পান করবে, কিন্তু অন্যরা অন্য বস্তু মিশ্রিত পানীয় পান করবে।

এমনিভাবে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, নৈকট্যশীল বান্দাগণ অন্য কোন মিশ্রণ ব্যতীত খাঁটি পানীয় পান করবে কিন্তু অন্যরা অন্য বস্তু মিশ্রিত পানীয় পান করবে।

মুজাহিদ রহ. বলেন, ختامه مسك এর মধ্যে ختام শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মাটি অর্থাৎ তার মাটি কস্তুরির ন্যায় সুগন্ধিময় হবে। তবে এ তাফসীর ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কেননা, অন্য অর্থে আয়াতের শব্দ এর চেয়েও অধিক সুস্পষ্ট। হতে পারে এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য হল, পানীয় পান করার পর পানপাত্রে যে ফেনা থাকবে, তা কস্তুরির ন্যায় হবে।

ইমাম হাকিম রহ. হযরত আবূ দারদা রা.-এর হাদীস স্ব-সনদে আদম হতে বর্ণনা করেন, তাতে রয়েছে তিনি ختامه مسك এর ব্যাখ্যায় বলেন, তার পানীয় রৌপ্যের ন্যায় সাদা হবে, সর্বশেষ জান্নাতী ব্যক্তি পান না করা পর্যন্ত তা টইটম্বুর থাকবে। দুনিয়ার কোন ব্যক্তি যদি তাতে হাত প্রবেশ করিয়ে বের করত, যমীনের সব প্রাণীর কাছে তার সুঘ্রাণ পৌছে যেত।

উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী আদম রহ. বলেন, হযরত আতা রহ. হতে আবূ শাইবা আমাকে বর্ণনা করেন, তাসনীম হল সুর মিশ্রিত পানীয় বিশিষ্ট প্রস্রবণ।

ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে আল্লাহ তাআলার বাণী وَكَأْسًا دَهَاقًا এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে সকল পান পাত্র পরিপূর্ণ থাকবে।

ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, আমি অনেকবার আব্বাস নাহভীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমাকে পাত্র ভরে পান করাও। এ কথা বুঝানোর জন্য তিনি যেহেতু এ واهق শব্দ ব্যবহার করেছেন, তাহলে বুঝা যায় دهاق অর্থ হল পরিপূর্ণ হওয়া। তিনি যেহেতু ভাষাবিদ, তার সে কথা দলীল হতে পারে।

إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُوا (নিশ্চয় সৎকর্মশীলেরা পান করবে পানীয় মিশ্রণ কাফুর) এর আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।

কতক আরবী ভাষাবিদ বলেন, سلسبیل এটি فعل )কর্ম( فعل )কর্তা( مفعول )কর্মপদের) সমন্বিত একটি বাক্য। মূলত বাক্যটি ছিল سل سيلا اليها সে নহর পর্যন্ত পৌছার রাস্তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর। তবে এটি বিশুদ্ধ মত নয়; বরং বিশুদ্ধ মত হল, এটি একটি একক শব্দ। এটি একটি বর্ণনার নাম।

আবুল আলিয়াহ রহ. বলেন, জান্নাতীদের পথে ও গৃহে সামনা সামনি দু'টি নদী প্রবাহিত হবে। সে নদী এমন সুন্দর হবে, যেন শুধু তাই প্রবহমান একমাত্র নদী। তার শোভা ও সৌন্দর্যের কারণেই তাকে سلسبیل বলা হয়।

অন্যরা বলেন, সালসাবীল অর্থ হল অত্যন্ত সুস্বাদু।

আবূ ইসহাক রহ. বলেন, সে নদী সুন্দর ও শোভনীয় হওয়ার দরুন তার এ গুণ ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে তাকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

ইবনে আম্বারী রহ. বলেন, সালসাবীল কোন ঝর্ণার নাম নয়; বরং ঝর্ণার পানির নাম হল, সালসাবীল। তাঁর এ মতের সমর্থনে তিনি দু'টি দলীল পেশ করেছেন।

প্রথম দলীল, সালসাবীল শব্দটি হল منصرف যদি এটি কোন ঝর্ণার নাম হত, তাহলে তা غیر منصرف হত। কেননা غیر منصرف হওয়ার জন্য যে দু'টি কারণ বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন, এতে দু'টিই রয়েছে, تأنيث তথা স্ত্রী লিঙ্গ হওয়া ও নাম হওয়া।

দ্বিতীয় দলীল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. তার অর্থ করেছেন, 'যা অতি সহজে গলধঃকরণ করা যায়' আর গলা দিয়ে পানি অবনমিত হয়, ঝর্ণা নয়।

উক্ত বর্ণিত দলীল দু'টি এর দলীল হতে পারে না। কেননা, এ শব্দটিকে منصرف পড়া হয় শুধু তার পূর্বাপরের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার্থে। ইবনে আব্বাস রা. যে অর্থ বর্ণনা করেছেন সে হিসাবে তার তরলতা ও সহজ পানীয় বলেই তার এ নামকরণ করা হয়েছে।

উক্ত আয়াত ও হাদীসের আলোকে বুঝা যায়, জান্নাতীদের জন্য রুটি, গোস্ত, ফলমূল, মিষ্টি দ্রব্যাদিসহ বিভিন্ন পানীয় অর্থাৎ দুধ, পানি ও শরাব থাকবে। দুনিয়াতে যে সকল বিষয় পাওয়া যায়, জান্নাতে সেগুলোর শুধু নামের মিল থাকবে। (উদাহরণত দুনিয়াতে রুটি আছে এবং জান্নাতেও রুটি থাকবে, তবে তার স্বাদ এবং প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। তবে উভয়টাকেই রুটি বলা হয়ে থাকে।)

একই নামের বস্তু দুনিয়াতে এবং আখিরাতে হওয়া সত্ত্বেও স্থানের ভিন্নতার কারণে উভয়ের মাঝে স্বাদ ও প্রকৃতি-আকৃতি, গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের বিরাট ব্যবধান থাকবে।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, গোস্ত কোথায় ভুনা করা হবে। জান্নাতেতো আগুন থাকবে না।

জবাব: কেউ কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা কুন্‌ (হয়ে যাও) বলার দ্বারা তা ভুনা হয়ে যাবে।

কেউ কেউ বলেন, সে গোশ্তগুলো জান্নাতের বাইরে ভুনা করে জান্নাতীদের জন্য পেশ করা হবে।

তবে সঠিক বিষয় হল, আগুন ব্যতীতই আল্লাহ তাআলা তা ভুনার উপকরণ সৃষ্টি করবেন। যেমনিভাবে সেখানকার ফলমূল ও খাদ্যের উপকরণ দুনিয়ার ফলমূল ও খাদ্যের উপকরণ থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। এও হতে পারে, সেখানে এমন আগুন থাকবে, যা কোন বস্তুকে ধ্বংস করবে না।

সহীহ হাদীসে৩৩১ উল্লেখ রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীদের অঙ্গার আগরবাতি হতে উজ্জ্বল হবে। জান্নাতীরা সে আগরবাতির কাষ্ঠ জালিয়ে ধোঁয়া দিবে, যাতে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়বে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, জান্নাতে ছায়া হবে। তাহলে ছায়ার জন্য সে বস্তুর প্রয়োজন, যার উপর ছায়া পড়বে।

هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِنُونَ তারা এবং তাদের স্ত্রীরা সুশীতল ছায়ায় সু-সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে৩৩২।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي ظِلَالٍ وَعُيُونِ মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণবহুল স্থলে৩৩৩।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا এবং তাদেরকে চির স্নিগ্ধ ছায়ায় প্রবিষ্ট করব৩৩৪।

খাবার পানীয় ও সুগন্ধিময় ধোঁয়া থাকা এমন উপকরণের দাবী করে, যার দ্বারা সেগুলো পূর্ণ হতে পারে। (আগুন ছাড়া ধোঁয়া হতে পারে না। সুতরাং জান্নাতে আগুন বিদ্যমান থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হল।)

কারণ, সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ তাআলা। তিনিই হলেন সকলের প্রভু। তিনি ব্যতীত কোন মা'বুদ তথা উপাস্য নেই। তাই আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের খাবার হযমের জন্য ঢেকুর ও ঘামকে কারণ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যেমনভাবে খাবার হযম করার জন্য আল্লাহ তাআলা একটি কারন নির্ধারন করেছেন, তেমনিভাবে খাবার রান্না করারও একটি উপকরণ নির্ধারন করতে পারেন। হতে পারে আল্লাহ তাআলা তাদের পেটে এমন উষ্ণতা সৃষ্টি করবেন, যার দ্বারা খাবার রান্না হয়ে যাবে। এমনিভাবে সেখানকার ফলমূল রান্নার জন্যও তিনি উষ্ণতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

গাছ-পাতাকে ছায়ার উপকরণ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভু একই সত্তা। তিনিই সকল কারন, আদি কারণ ও উপকরণের সৃষ্টিকর্তা। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল সৃষ্টিকৃত বস্তু তারই নির্দেশে হয়ে থাকে। উপকরণ ও কর্ম হল, তাঁর হিকমতের প্রকাশস্থল। যদিও উপকরণ ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্যই বান্দা আশ্চর্যবোধ করে যে, কোন কোন বস্তু তার নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যতীত অন্য উপকরণ দ্বারাও সংগঠিত হয়ে থাকে। এ আশ্চর্য বোধ কখনো কখনো বান্দাকে অস্বীকৃতিতে উদ্বুদ্ধ করে; কিন্তু তা একমাত্র অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণেই সৃষ্টি হয়।

কেননা, কোন কাজের নির্ধারিত উপকরণ ব্যতীত অন্য উপকরণের দ্বারা তার অস্তিত্ব প্রদানে আল্লাহ তাআলার কুদরত অপারগ নয়। (যেমন বৃক্ষরাজির সজীবতা লাভের নির্ধারিত উপকরণ হল, পানি দ্বারা সেচ দেওয়া। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আগুন দ্বারাও তাকে সজীব করতে পারেন। কেননা, আল্লাহ তাআলার জন্য তো কর্মের নির্ধারিত উপকরণে কর্ম সম্পাদনের বাধ্য বাধকতা নেই।)

তিনি এ জগতে যেমনিভাবে কারণ, আদি কারণ ও উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, তেমনিভাবে পরজগতেও এমন সৃষ্টি করতে পারেন। এ জগতে এসব সৃষ্টি করতে যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা অক্ষম নন, তেমনিভাবে পরজগতেও তিনি এসব সৃষ্টি করতে অক্ষম নন। কেননা, দুনিয়াতে এসব বস্তু সৃষ্টি করার চেয়ে আখিরাতে সৃষ্টি করা অধিকতর সহজসাধ্য। কেননা, দুনিয়ার এ শক্ত মাটি ও পানি হতে ফল সৃষ্টি করা জান্নাতের মাটি, পানি ও আবহাওয়া হতে সৃষ্টি করা অপেক্ষা কঠিনতর ও আশ্চর্যের বিষয়।

হতে পারে, পর্বতমালার প্রস্তরের তীক্ষ্ণ বালি হতে স্বর্ণ-রৌপ্য সৃষ্টি করা অন্য উপকরণের সাহায্যে সৃষ্টি করা অপেক্ষা অধিক আশ্চার্যজনক।

মোট কথা হল, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তাঁর যে সকল নিদর্শনাবলী সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করার জন্য নির্দেশ দান করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে চিন্তা ও গবেষণা করুন। আল্লাহ তাআলা সেগুলোকে তাঁর কুদরতের পূর্ণাঙ্গতা, তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা, তাঁর ইচ্ছার নি:শর্ততা, তাঁর স্বাধীনতা, হিকমত ও রাজত্বের উপর প্রমাণ ও নিদর্শন বানিয়েছেন। তাঁর প্রভুত্ব ও একত্ববাদের জন্য দলীল নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং দুনিয়ার বস্তু আখিরাতের বস্তুসমূহের সাথে তুলনা করলে এ ফলাফল পাবে, সেগুলো অপেক্ষা দুনিয়াবী বস্তুই আল্লাহ তাআলার কুদরতকে অধিক সুস্পষ্টভাবে বুঝায় ও তার সাক্ষ্য বহন করে। উভয়টাকে একই প্রদীপালয়ে পাবে। আর প্রভুও একজন। সৃষ্টিকর্তাও একজন। সব বস্তুর মালিকও একজন। যারা এ বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে না। তাদের জন্য চূড়ান্ত ধ্বংস অপেক্ষমাণ।

টিকাঃ
৩২৩. সূরা মুরসালাত, আয়াত: ৪১-৪৩
৩২৪. সূরা হাক্কা, আয়াত: ১৯-২০
৩২৫. সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭২-৭৩
৩২৬. সূরা রা'দ, আয়াত: ৩৫
৩২৭. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ২৫-২৬)
৩২৮. খ. ২ পৃ. ৩৭৯
৩২৯. খ. ২, পৃ. ৩৭৯
৩৩০. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৬৫
৩৩১. বুখারী, খ. পৃ. ৪৬০
৩৩৩. সূরা মুরসালাত, আয়াত: ৪১
৩৩৪. সূরা নিসা, আয়াত: ৫৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00