📄 জান্নাতের সুগন্ধি ও সৌরভ
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন যিম্মিকে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যাবে। ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে২৭৩ স্ব-সনদে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম তাবারানীর বর্ণনা ও ইমাম বুখারীর বর্ণনায় শুধু এতটুকু পার্থক্য, ইমাম বুখারী রহ. জানাদাহ নামক এক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি এবং তাঁর বর্ণনায় একশত বছরের জায়গায় চল্লিশ বছরের কথা উল্লেখ আছে।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খবরদার! যে ব্যক্তি এমন কোন চুক্তিকারীকে হত্যা করল, যার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মাদারী রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহর যিম্মাদারীকে ভঙ্গ করল। এমন ব্যক্তি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ সত্তর বছরের দূরত্ব হতেই পাওয়া যায়।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এ ব্যাপারে হযরত আবূ বকরাহ রা. হতে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসটি সহীহ ও হাসান পর্যায়ের।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, উক্ত হাদীসের সনদ আমার মতে ইমাম বুখারীর বর্ণনা শর্ত মোতাবেক।
আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম তাবারানী রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, সেটি মারফু। তাতে রয়েছে, যে ব্যক্তি কোন চুক্তিকারীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ একশত বছরের দূরত্ব হতে তার ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ বাকরাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, জান্নাতের খুশু একশত বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। এই শব্দে উভয় বর্ণনার মাঝে কোনোভাবে বৈপরিত্য পাওয়া যায় না।
ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. স্ব-স্ব সহীহ গ্রন্থে২৭৪ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার চাচা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এ বিষয়টি তাঁর নিকট অত্যন্ত কষ্টকর মনে হত যে, কাফিরদের সাথে রাসূলুল্লাহর প্রথম যুদ্ধে আমি শরীক হতে পারি নাই। আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে এরপর কখনো রাসূলুল্লাহর সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সুযোগ দান করেন, তবে আমি দেখিয়ে দেব যে, আমি কি করতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওহুদের ময়দানে হযরত মু'য়ায বিন জাবাল রা. তাকে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, আহ! জান্নাতের সুবাতাস কতই না চমৎকার! যা আমি ওহুদের পাদদেশে পাচ্ছি।
হযরত আনাস রা. বলেন, তিনি শত্রুদের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।
হযরত আনাস রা. বলেন, তাঁর শরীরে আশিটিরও অধিক তীর ধনুকের আঘাত ছিল। তাঁর বোন অর্থাৎ রবী বিনতে নাযারের ফুফী তার ভাইকে শুধু আঙ্গুলের মাথা দ্বারাই চিনতে পেরেছেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে২৭৫।
হযরত আনাস রা. বলেন, সাহাবায়ে কেরামের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, উক্ত আয়াত তার ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
উল্লেখ্য, জান্নাতের সুগন্ধি দু'প্রকার। এক প্রকার সুগন্ধি এমন দুনিয়াতেও যার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কখনো কখনো আত্মা তা অনুভব করতে পারে, যদিও বান্দার অনুভবে তা ধরা দেয় না।
অপর সুগন্ধি হল, যা কেবল দেহের নাসিকা রন্ধ্র দিয়ে ফুলের ঘ্রান অনুভব করার মত করে অনুভব করা যায়। এ প্রকার সুগন্ধি সকল জান্নাতীই লাভ করবে। নিকট ও দূর সকল স্থান থেকেই তা অনুভূত হবে।
দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসূলগণের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা করেন, তাঁকেই এ সুগন্ধির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
হযরত আনাস বিন নযর যে খোশবু অনুভব করেছেন, হতে পারে তা এ জাতীয় সুগন্ধি অথবা প্রথম প্রকারের সুগন্ধিও হতে পারে। والله اعلم ।
আবূ নাঈম রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যায়।
তাবারানী রহ. হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। আল্লাহর শপথ, মাতা-পিতার অবাধ্য ব্যক্তি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি এ সুঘ্রাণ পাবে না।
আবূ দাউদ তায়ালেসী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি পিতা ব্যতীত অন্যের দিকে নিজ বংশধারা যুক্ত করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার খোশবু পাঁচশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।
আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবীতে তাঁর বান্দাদেরকে জান্নাতের নিদর্শনাবলী হতে কিছু প্রত্যক্ষ করান। তন্মধ্যে রয়েছে জান্নাতের খোশবু, মনোপূত স্বাদ, সুন্দর ও মনোরম দৃশ্যাবলী, উত্তম ফল-ফলাদি, বিভিন্ন প্রকার নিআমত, আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও চোখের শীতলতা।
আবু নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার অধিবাসীদের জন্য সজীবতা ও সমৃদ্ধি রয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার সৌন্দর্য ও সজীবতা বৃদ্ধি করে দাও। সাহরীর সময় মানুষ যে শীতলতা অনুভব করে তা তারই অংশ। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আগুন ও তার কষ্ট এবং চিন্তা ও পেরেশানীকে আখিরাতের কষ্ট ও পেরেশানীর কথা স্মরণকারী হিসাবে তৈরী করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গরম-ঠাণ্ডা জাহান্নামের শ্বাস নেওয়ার কারণে হয়ে থাকে। সুতরাং আল্লাহ স্বীয় বান্দাকে জান্নাতের শ্বাসসহ সেখানকার স্মারক বস্তুসমূহ পৃথিবীতেই প্রত্যক্ষ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
والله المستعان
টিকাঃ
২৭৩. খ. ২ পৃ. ৪৪৬
২৭৪. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৩৯৩, মুসলিম, খ. ২ প. ১৩৯
২৭৫. সূরা আহযাব, আয়াত: ২৩
📄 জান্নাতে চিরশান্তির ঘোষণা
ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে২৭৬ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. ও হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এক ঘোষক ঘোষণা করবে, তোমরা অবশ্যই সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে, কখনো তোমাদেরকে কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানী স্পর্শ করবে না। ঘোষণাটি আল্লাহর সেই বাণীর মর্মার্থ وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ 0 জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে২৭৭।
উসমান ইবনে আবি শাইবা হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , RIIcon as وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ . এর ব্যাখ্যায় বলেন, তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে, তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে। কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানীর ছোঁয়াও তোমাদের লাগবে না।
সহীহ মুসলিমে হযরত সুহাইব রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহর নিকট তোমাদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তারা বলবে, কি সেই প্রতিশ্রুতি? তিনি তো আমাদের নেকের পাল্লা ভারী করে দিয়েছেন। আমাদের চেহারা শুভ্র ও ঔজ্জ্বল্যময় করেছেন। আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। (এ সকল নিআমত যেহেতু পেয়ে গেছি, তবে এমন আর কি প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট রয়েছে?) তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বড়ত্বের পর্দা উঠিয়ে নিবেন। আর জান্নাতীগণ আল্লাহ তাআলার দীদার লাভ করবে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যে সকল নিআমিত প্রদান করেছেন তার থেকে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হবে আল্লাহর দীদার।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে আবূ তামীম হুযাইমী হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. কে বলতে শুনেছি। যখন তিনি বসরার মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে জান্নাতীদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। সে বলবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দান করেছিলেন তা কি পূর্ণ করেছেন? তখন তারা অলংকারাদি, পোশাকাদী, প্রবহমান নদী, শুদ্ধাচারিণী রমণীকুল দেখতে পেয়ে বলবে, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই পূর্ণ করেছেন। তিনবার তারা এ কথা বলবেন। তখন তারা আশপাশে তাকিয়ে তা খুঁজবে; কিন্তু না পাওয়ার কোনো কিছুই চোখে পড়বে না। তখন ফিরিশতাগণ বলবেন, একটি বিষয় বাকী রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَة যারা মঙ্গলকর কার্য করে, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং আরো অধিক২৭৮।
জেনে রাখ, সেই মঙ্গল হচ্ছে জান্নাত আর অতিরিক্তটি হচ্ছে আল্লাহর দীদার।
সহীহায়নে২৭৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীগণকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতীগণ! জান্নাতীগণ জবাবে বলবে, لبيك وسعديك হে আমাদের প্রভু! আমরা উপস্থিত, আপনার নির্দেশ পালনার্থে আমরা উপস্থিত। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে সে সব বস্তু দান করছেন যা আপনার মাখলুকের অন্য কাউকে দান করেননি, তবু কেন আমরা সন্তুষ্ট হব না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করব? জান্নাতীগণ বলবে, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! এর চেয়ে উত্তম নিআমত আর কি হতে পারে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাদের জন্য আমার সন্তুষ্টিকে আবশ্যকীয় করে নিয়েছি, আমি কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না।
সহীহায়নে২৮০ হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে, তখন একজন ঘোষক তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যু কখনো তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। প্রত্যেকে যে যেখানে অবস্থান করছে, সেখানেই সর্বদা অবস্থান করবে। যদিও এ ঘোষণা জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থলে হবে, কিন্তু সকল জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী এ ঘোষণা শুনবে। জান্নাতীগণ যেদিন আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করবে, সেদিন তারা আরো একটি ঘোষণা শুনতে পাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। ফিরিশতা তাদের মাঝে আল্লাহ তাআলার দীদার লাভের ঘোষণা দিলে তারা ঠিক তেমনিভাবে দৌড়ে আসবে, যেমনিভাবে মুয়াযযিন জুমু'আর আযান দেওয়ার পর মানুষ জুমু'আর নামাযের জন্য দৌড়ে আসে।
টিকাঃ
২৭৬. খ. ২. পৃ. ৩৮০
২৭৭. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪৩
২৭৮. সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৬
২৭৯. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৬৯, মুসলিম. খ. ২ পৃ. ৩৭৮
২৮০. বুখারী, খ. ২ প. ১১২১, মুসলিম, খঃ ২. পৃ. ৩৮২
📄 জান্নাতের মনোরম গাছগাছালি ও ছায়ঘেরা উদ্যান
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ فِي سِدْرٍ مَحْضُودٍ وَطَلْحٍ مَنْضُودٍ وَظِلٍّ مَمْدُودٍ وَمَاءٍ مَسْكُوبٍ وَفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ لَا مَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَة
আর ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডানদিকের দল! তারা থাকবে এমন উদ্যানে, সেখানে থাকবে কণ্টকহীন কুল বৃক্ষ, কাঁদি ভরা কদলি বৃক্ষ, সম্প্রসারিত ছায়া, সদা প্রবহমান পানি, প্রচুর ফলমূল। যা শেষ হবে না, নিষিদ্ধও হবে না।২৮১
আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, ذَوَاتًا أَفْنَان উভয় বহু শাখা পল্লব বিশিষ্ট বৃক্ষপূর্ণ। أَفْنَان এটি فن-এর বহুবচন, যার অর্থ শাখা।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, فيهما فاكِهَةٌ وَنَحْلٌ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল, খেজুর ও আনার২৮২।
مخضود বলা হয়, যাকে কণ্টকমুক্ত করা হয়েছে। এটি হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত মুজাহিদ রহ. সহ অন্যদের মত। তাঁদের মতের সমর্থনে তারা দু'টি প্রমাণ পেশ করেন।
প্রথমটি, خضد শব্দটির আভিধানিক অর্থ কাঁটা। যখন কণ্টকমুক্ত করা হয়, তখন আরবগণ বলেন, خضدت الشجرة আর خضاد বলা হয়, কাঁটাহীন নরম গাছ।
দ্বিতীয়টি, ইবনে আবী দাউদ স্ব-সনদে হযরত উতবাহ ইবনে আব্দুস-সালামী হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসেছিলাম। এ সময়ে এক বেদুঈন এসে বলল, ইয়া রাসুলল্লাহ! আমি শুনেছি, আপনি জান্নাতের এমন একটি বৃক্ষের আলোচনা করছেন, যা কাঁটামুক্ত থাকবে, অথচ আমার জানা মতে এটিই সর্বাপেক্ষা অধিক কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকটি কাঁটাকে ফলে রূপান্তরিত করবেন। জান্নাতে সত্তর প্রকারের সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের খাবার থাকবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে সুলাইমান ইবনে আমেরের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বললেন, সাহাবায়ে কিরামগণ বলতেন, গ্রাম্য ও তাদের নিঃসংকোচ প্রশ্ন দ্বারা আমাদের অনেক ফায়দা হয়েছে। ঠিক তেমনি একদিন এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একটি কষ্টদায়ক গাছের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমার তো মনে হয়, জান্নাতে এ ধরনের কোন গাছ থাকবে না, যা জান্নাতীদের কষ্টের কারণ হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি কোন গাছ? সে বলল, কুল গাছ। তার কাঁটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, فى سدر مخضود আল্লাহ তাআলা সে কাঁটাগুলো কেটে প্রত্যেক কাঁটার স্থলে ফল লাগিয়ে দেবেন।
মুফাস্স্সিরীনের এক জামাআত বলেন, المنضود দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ফল দ্বারা পরিপূর্ণ বোঝা; কিন্তু তাদের এ মতটি অনেকের কাছে তেমন পসন্দনীয় নয়। তাই তাদের প্রতি প্রশ্ন উত্থাপনকারীগণ বলেন, خضد শব্দটির অভিধানে বোঝা অর্থে ব্যবহার নেই। বাস্তবে তাদের এ আপত্তি সঠিক নয়। কেননা, مخضود অর্থ ফলে পরিপূর্ণ, এটি এর সঠিক অর্থ। এ মত পোষণকারীরা বলেন, আল্লাহ যখন কাঁটাগুলোকে মিটিয়ে দিবেন, তখন তদস্থলে ফল দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন। পূর্বোক্ত হাদীস দু'টি এর সমর্থক।
জান্নাতের কলা কেমন হবে
অধিকাংশ মুফাস্সির বলেন, তলহ দ্বারা উদ্দেশ্য কলা গাছ। হযরত আলী রা. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর মতও তাই।
অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, তলহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল বড় লম্বা গাছ, যা বালুকাময় প্রান্তরে হয়ে থাকে, অধিক কাঁটাযুক্ত হয়ে থাকে। তা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সুগন্ধিময় ও প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট হয়।
ইবনে কুতাইবা রা. বলেন, তলহ বলা হয় ঐ গাছকে, যা ভারে নেতিয়ে পড়ে।
হযরত মাসরূক রহ. বলেন, জান্নাতের গাছের পাতাগুলো উপর হতে নিচ পর্যন্ত ভাঁজ করা থাকবে এবং কোন পরিখা ব্যতীতই তার নদী বয়ে চলবে।
লাইস রহ. বলেন, তলহ হল সে গাছ, যাকে উম্মে গায়লান বলা হয়, যাতে কোন ধরনের বক্র কাঁটা নেই বরং সবগুলো সোজা সোজা কাঁটা থাকবে। এ গাছের কাঠ অত্যন্ত শক্ত হয় ও তার আঠা অত্যন্ত উত্তম মানের হয়ে যাবে।
আবূ ইসহাক রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য, উম্মে গাইলান নামক গাছ, যা অত্যন্ত উজ্জ্বল্যময় এবং যার সুগন্ধি অত্যন্ত চমৎকার। তবে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, জান্নাতের বিভিন্ন ফলমূলের নাম যদিও দুনিয়ার ফলমূলের নামের মতই; কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে বেহেশতের ফলের সাথে পৃথিবীর ফলের কোন তুলনাই হয় না। যারা তলহ দ্বারা কলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন তারা সারিবদ্ধ ফলের উপমা বুঝাতে কলার কথা বলেছেন। নয়তো তলহ বলা হয় মরুময় প্রান্তরের বড় লম্বা গাছকে। والله اعلم
সহীহায়নে২৮৩ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও যে গাছের ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। যেমনটি কুরআন কারীমে রয়েছে وظلٌ مَّمْدُود প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট।
সহীহায়নে২৮৪ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না।
আবূ হাযিম রহ. নো'মান বিন আবী আইয়াশের মাধ্যমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যে গাছের ছায়া কোন পাতলা কোমর বিশিষ্ট অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না।
ইমাম আহমদ রহ.২৮৫ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সত্তর বছর অথবা বলেছেন, একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। তা হল জান্নাতুল খুলদের গাছ।
ওকী' রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন, وَظَلٌ مَّمْدُود 'প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট গাছ রয়েছে'।
হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসটি হযরত কা'ব রা. শুনে বলেন, তিনি সঠিকই বলেছেন। সে সত্তার শপথ! যিনি হযরত মূসা আ.-এর প্রতি তাওরাত এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যদি কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সে বৃক্ষের শিকড়ের চার পাশে একশত বছর পর্যন্ত ঘুরে, তবু তার কাণ্ড পর্যন্ত পৌছতে পারবে না। এমন কি সে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। আল্লাহ তায়লা স্বীয় কুদরতী হাতে সেটি লাগিয়েছেন। জান্নাতের সকল প্রান্তে তার শেকড় বিস্তৃত আর তার শেকড় হতেই জান্নাতের প্রত্যেক প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়।
ইবনে আবিদ-দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, ظل ممدود হল জান্নাতের একটি গাছ। তার কাণ্ড এত মোটা যে, দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছর তার পাশে ঘুরেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। জান্নাতীগণ তাদের প্রাসাদ থেকে বের হয়ে সে গাছের ছায়ায় বসে গল্প করবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতে কোন জান্নাতী দুনিয়ার কোন আনন্দ-ফুর্তির কথা স্মরণ করে তার আগ্রহ প্রকাশ করবে। তখন আল্লাহ তাআলা একটি সমীরণ বইয়ে দিবেন, যার ফলে দুনিয়ার সে আনন্দময় বিনোদন গুলো সে গাছ থেকে প্রকাশ পাবে।
জামে তিরমিযীতে২৮৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের প্রত্যেক গাছের কাণ্ড হবে স্বর্ণের। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি হাসান পর্যায়ের।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন বস্তু তৈরী করেছি, যা কোন চোখ দেখেনি, কোনো কর্ন শ্রবণ করেনি, এমনকি কোনো মানব-হৃদয়ে যার কোন চিন্তাও উদয় হয়নি। এ ক্ষেত্র যদি তোমরা চাও, তাহলে উক্ত আয়াত পড়তে পার, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّة أعين جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ . আল্লাহ তা'আলা বলেন, কেউ জানে না, তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্মরূপ২৮৭।
তিনি আরো বলেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহ তাআলার বাণী وَظَلٌ مَّمْدُود )সম্প্রসারিত ছায়া বিশিষ্ট গাছ রয়েছে( স্বরণ করতে পার।
তিনি বলেন, জান্নাতে একটি তৃণ রাখার স্থানও দুনিয়া ও তন্মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা হতে উত্তম। এ ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহ তাআলার বানী, فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ স্মরণ করতে পার, যাকে জাহান্নام হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে, সে-ই সফলকাম।২৮৮
সহীহ বুখারীতে২৮৯ হযরত আনাস রা. হতে বর্নিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া দ্রুতগামী আরোহী ব্যক্তি একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তোমরা এ আয়াত পড়তে পার وَظَلُّ مَّمْدُود وَمَاء مَسْكُوْبِ সেখানে সম্প্রসারিত ছায়া থাকবে ও সদা প্রবহমান পানিও থাকবে।২৯০
ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی (তৃবা) কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তৃবা হল, জান্নাতের একটি গাছ, যার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে একশত বছরের দূরত্ব। জান্নাতীগণের পোশাক হবে সে গাছের মূকুল দ্বারা।
হারমালা রহ. কিছু অতিরিক্ততার সাথে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی (তৃবা) কি সে ব্যক্তি লাভ করবে, যে আপনার দর্শন লাভে ধন্য হয়েছে ও আপনার প্রতি ঈমান এনেছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যে আমাকে দেখেছে ও আমার প্রতি ঈমান এনেছে তার জন্যতো বটে। সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির জন্যও তৃবা, যে আমাকে না দেখেও ঈমান এনেছে। তখন এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی কী? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, طوبی (তৃবা) হল জান্নাতের একটি গাছ, যার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তের দূরত্ব একশত মাইল। জান্নাতীদের পোশাক সে গাছের ফুলের বৃতি দ্বারা তৈরী করা হবে।
আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, উক্ত হাদীসের প্রথমাংশ মুসনাদেও রয়েছে। طوبى لمن راني وآمن بي وطوبى لمن امن بي ولم يرني سبع مرات সুসংবাদ সে ব্যক্তির, যে আমাকে দেখেছে ও আমার প্রতি ঈমান এনেছে, যে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান এনেছে কিন্তু আমাকে দেখেনি। এভাবে সাতবার সুসংবাদ।
ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতের খেজুর গাছের কাণ্ড হবে মূল্যবান সবুজ পাথরের। তার শিকড় হবে লাল স্বর্ণের, তার পত্রপল্লব হবে জান্নাতীদের পোশাক। তাদের সকল প্রকার বস্ত্রই তা দ্বারা হবে। তার ফল হবে মটকা এবং বালতির ন্যায় বড়। দুগ্ধ অপেক্ষা অধিক সাদা। মধু অপেক্ষা অধিক মিষ্ট। মাখন অপেক্ষা অধিক নরম হবে। তাতে কোন আঁটি থাকবে না।
ইমাম আহমদ রহ.২৯১ হযরত উতবা ইবনে আব্দুস সুলামী বর্ণনা করেন। এক গ্রাম্য লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে এসে হাউযে কাউসারের ব্যাপারে প্রশ্ন করল। সে জান্নাতের কথা উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করল, সেখানে কি ফলফলাদি থাকবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, সেখানে তুবা নামক একটি গাছ রয়েছে। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করলেন, যেগুলো আমার স্মৃতিতে নেই।
অতঃপর গ্রাম্য ব্যক্তি প্রশ্ন করল, সেই গাছটি আমাদের এলাকার কোন গাছের মত হবে? জবাবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পৃথিবীতে তার মত কোন গাছই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি কখনো সিরিয়া গিয়েছ? সে বলল, না, আমি কখনো সিরিয়া গমন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সিরিয়ায় জাওযাহ নামে তার মত একটি গাছ রয়েছে, যা এক কাণ্ড বিশিষ্ট হয়। সে কাণ্ড হতেই ডাল-পালা বিস্তৃত হয়। গ্রাম্য লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল, সে গাছের কাণ্ডটি কেমন মোটা? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের শক্তিশালী ও সামর্থবান জোয়ান উট বৃদ্ধ হয়ে তার হাঁসুলির হাড় খসে পড়া পর্যন্ত চলতে থাকলেও তার প্রকাণ্ডটিকে বেষ্টন করতে পারবে না।
গ্রাম্য লোকটি পুনপ্রশ্ন করল, জান্নাতে কি আঙ্গুর হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, তার থোকা কত বড় হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন যাত্রা বিরতি না করে কাক যদি একমাস স্বাভাবিক গতিতে ধারাবাহিকভাবে উড়তে থাকে, তবে তার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। গ্রাম্য লোকটি প্রশ্ন করল, তার শস্য কত বড় হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার পিতা কি কখনো বড় খাসি যবাহ করেছে? সে বলল, জি, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে খাসির চামড়া তুলে তোমার পিতা কি কখনো তোমার মাকে মশক বানানোর জন্য দিয়েছে? সে বলল, হ্যাঁ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার একটি শস্য এমনি হবে। গ্রাম্য লোকটি বলল, তবে তো তার একটি মাত্র শস্যই আমাকে ও আমার পরিবারস্থদেরকে পরিতৃপ্ত করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তোমার গোটা পরিবারকে পরিতৃপ্ত করবে।
হযরত আবূ ইয়ালা মূসিলী রহ. স্ব-সনদে আসমা বিনতে আবূ বকর রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সিদরাতুল-মুনতাহার আলোচনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, দ্রুতগামী আরোহী একশত বছরেও তার ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না অথবা বলেছেন, তার ছায়ায় একশত আরোহী বিশ্রাম করতে পারবে। তাতে স্বর্ণের প্রজাপতি থাকবে, তার ফল মটকার ন্যায় বড় হবে।
ইমাম তিরমিযী রহ.ও উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একশত বছরে ছায়া অতিক্রম করা বা একশত আরোহীর বিশ্রাম এ দু'টির ব্যাপারে যে সংশয় পেশ করা হয়েছে। তা এ সনদের ইয়াহইয়া নামক একজন বর্ণনাকারীর সংশয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক স্ব-সনদে হযরত মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতের যমীন হবে রৌপ্যের। মাটি হবে কস্তুরির। গাছের কাণ্ড হবে স্বর্ণ-রৗপ্যের। ডালপালা হবে মূল্যবান পাথর ও ইয়াকূতের। তা পাতা ও ফলে নত থাকবে। তার গাছ থেকে দাঁড়িয়ে বসে বা শুয়ে যে কোনভাবেই ফল খেতে কোন প্রকার কষ্ট হবে না। কেননা, তার ফলগুলো ঝুলে থাকবে।
আবূ মু'আবিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। আমরা সাফাহ নামক স্থানে অবতীর্ণ হলাম। সেখানে গাছের নিচে একটি লোক ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তার উপর সূর্যের তাপ পড়ার উপক্রম হল। তাই আমি গোলামকে বললাম, এই চামড়ার মাদুরটি নিয়ে যাও, তাকে এ দ্বারা ছায়া দাও। তিনি বলেন, গোলাম গিয়ে সে ব্যক্তিকে মাদুরের ছায়া দিয়ে রাখল। যখন সে ব্যক্তি জাগ্রত হল, তখন দেখি, আরে এ যে হযরত সালমান ফারসী রাঃ। হযরত জারীর রাঃ বলেন, আমি গিয়ে তাঁকে সালাম করলে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার জন্য বিনম্রতা অবলম্বন কর। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে কিয়ামতের দিন সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। হে জারীর! তুমি কি জান? কিয়ামতের দিন কোন জিনিস অন্ধকার হবে?
জারীর বলেন, না। আমি সে সম্পর্কে জানি না। তিনি বললেন, মানুষ একে অন্যের প্রতি যুলুম করে, তা কিয়ামত দিবসে অন্ধকার হবে। এরপর হযরত সালমান রাঃ অত্যন্ত ক্ষীণ একটি খড়ি নিলেন। সেটি এত ক্ষীণ ছিল যে, তাঁর আঙ্গুলদ্বয়ে আমি তা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনি আমাকে বললেন, এমন ক্ষীণ ছোট এত সাধারণ একটি খড়ি তুমি জান্নাতে খুঁজে পাবে না। (জারীর রহঃ বলেন) আমি বললাম, হে আবূ আবদুল্লাহ! জান্নাতের খর্জুর বীথি ও অন্যান্য গাছ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, সেগুলোর প্রকাণ্ড হবে মুক্তার মালার ও স্বর্ণের, তাতে ফল থাকবে।
টিকাঃ
২৮১. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ২৭-৩৩
২৮২. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৮
২৮৩. বুখারী, খ. ২, পৃ.৭২৪, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৮
২৮৪. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৭০ মুসলিম, খ. ২, প. ৩৭৮
২৮৫. মুসনাদে আহমদ খ. ২. পৃ. ৪৫৫
২৮৬. খ. ২. পৃ. ৭৮
২৮৭. সূরা সাজদা, আয়াত: ১৭
২৮৮. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫
২৮৯. খ. ২, পৃ. ৪২১
২৯০. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৩০-৩১
২৯১. মুসনাদে আহমদ, খ. ৪ পৃ. ১৮৩
📄 জান্নাতের রকমারি ফল ও তার সুঘ্রাণ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرى من تَحْتِهَا الأنهار كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقاً قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قَبْلُ وَأْتُوا بِهِ مُتَشَابِهَا وَلَهُمْ فِيهَا أزواج مُطَهَّرَةٌ
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে শুভ সংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত হয়। আর যখনই তাদেরকে ফলমূল খেতে দেয়া হবে, তখনই তারা বলবে, আমাদেরকে পূর্বে জীবিকারূপে যা দেয়া হত, এটা তো তাই। তাদেরকে অনুরূপ ফলই দেয়া হবে এবং সেখানে তাদের জন্য রয়েছে, শুদ্ধাচারিণী রমণীকুল২৯২। জান্নাতীগণ বলবে, আমাদেরকে দুনিয়ার অনুরূপ ফলই দেয়া হয়েছে, তারা শুধু তার আকৃতি-প্রকৃতি দেখে বলবে। অন্যথায় সে ফলের স্বাদ ও দুনিয়ার ফলের স্বাদের মধ্যে অনেক ব্যবধান রয়েছে। الذى رُزقًا দ্বারা হয়ত উদ্দেশ্য হল, আমাদেরকে ইতোপূর্বে দুনিয়াতে যেমনিভাবে দান করা হয়েছে এখানেও তেমনিভাবে দান করা হচ্ছে। অথবা তাদের উদ্দেশ্য হল, জান্নাতে আমাদেরকে ইতোপূর্বে যে ফল দান করা হয়েছে। এখানেও অনুরূপ সে ফল দান করা হচ্ছে। মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, এতে দু'টি মতামত রয়েছে। বিশিষ্ট মুফাসসির হযরত সুদী রহ.-এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস রা., হযরত ইবনে মাসউদ রা. সহ অন্য সাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে বর্ণিত আছে قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আমাদেরকে ইতোপূর্বে দুনিয়াতেও এর কাছাকাছি গঠনের ফল দান করা হত, আর وَأُتُوا به مُتَشَابِهاً দ্বারা উদ্দেশ্য হল সে ফলের আকৃতি প্রকৃতি তাদের পরিচিত ফলের অনুরূপই হবে।
অন্য মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, জান্নাতে প্রথমে তাদেরকে যে ফল দান করা হবে, তার অনুরূপ আকৃতি প্রকৃতির ফলই তাদেরকে পরবর্তীতে দান করা হবে। তা দেখে জান্নাতীগণ বলবে, এর অনুরূপ ফলই তো আমাদেরকে ইতোপূর্বে দান করা হয়েছে, অথচ এগুলোর স্বাদ একেবারেই ভিন্ন।
যাঁরা বলেন, সে ফল জান্নাতেরই পূর্ব প্রদত্ত ফলের অনুরূপ হবে, তাঁরা স্বীয় মতের সমর্থনে কয়েকটি দলীল পেশ করেন।
প্রথম দলীল, জান্নাতের ফলই একটির সাথে অপরটির সামঞ্জস্যতা অধিকতর হবে, যার ফলে জান্নাতীগণ বলবে, هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قبل
দ্বিতীয় দলীল, জান্নাতের ফল যখন একটি ছেঁড়া হবে তদস্থলে অন্য একটি ফল হয়ে যাবে। এ দলীল ইবনে জারীর রহ. উল্লেখ করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে হযরত আবূ উবায়দার হাদীসও উল্লেখ করেছেন, জান্নাতের ফল যখন একটি তোলা হবে তখন অন্য একটি ফল তার স্থান পূর্ণ করে দিবে।
তৃতীয় দলীল, وَأْتُوا بِهِ مُتَشَابِها قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ এর জন্য কারণ স্বরূপ। কেননা, তারা এ উক্তি এ জন্যই করবে, যেহেতু তাদেরকে একই আকৃতি-প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে, তাই জান্নাতের ফলের ব্যাপারেই হবে তাদের উক্তি هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ
চতুর্থ দলীল, এ কথা তো অত্যন্ত সুস্পষ্ট, জান্নাতের হরেক রকম ফল তাদেরকে দুনিয়াতে রিযিক স্বরূপ দান করা হয়নি। তাদের অধিকাংশই তো দুনিয়ার সকল প্রকার ফল সম্পর্কে জানে না এবং সকল প্রকার ফল তারা দেখেওনি।
ইবনে জারীর রহ. সহ অন্যরা প্রথম মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তাঁরা নিজ মতের সমর্থনে কয়েকটি দলীল পেশ করেছেন।
ইবনে জারীর রহ. বলেন, এমত পোষণকারীদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দলীল হল, আল্লাহ তাআলার বাণী كُلِّمًا رُزقُواْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যখনি প্রথমবার তাদেরকে ফল দেয়া হবে তারা বলবে, আমাদেরকে ইতোপূর্বেও অনুরূপ ফল দেয়া হয়েছিল। অথচ ইতোপূর্বে জান্নাতে তাদেরকে কোন ফল দেয়া হয়নি। এর দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয়, তাদের উক্তি দুনিয়ার ফলের ব্যাপারেই হবে। অর্থাৎ তারা বলবে, আমাদেরকে দুনিয়াতে যেরূপ ফল দান করা হত এখানেও সেরূপ ফলই দান করা হয়েছে। অন্যথায় তাদের এ উক্তিকে মিথ্যায় পর্যবসিত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। কেননা, তাদেরকে কোন ফল দানের পূর্বেই তারা বলছে, আমাদেরকে ইতোপূর্বেও অনুরূপ ফল প্রদান করা হয়েছে। অথচ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মিথ্যা হতে পূত-পবিত্র রেখেছেন।
আমি (ইবনে কায়্যিম) বলব, যারা বলেন, জান্নাতের ফলের সাথে তুলনা করেই তারা এ উক্তি করবে, এ ফলতো সে ফলের মতই যে ফল ইতোপূর্বে আমাদেরকে দান করা হয়েছে। তারা প্রথমবারের প্রদত্ত ফলকে তাদের এ উক্তি হতে বাদ দেন। অর্থাৎ প্রথমবার ফলপ্রাপ্ত হওয়ার পর তারা এ উক্তি করবে। পূর্বাপর আলোচনা ও যুক্তির দাবিও তাই। অন্যথায় নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়।
প্রথমত: জান্নাতের অনুরূপ অনেক ফলতো দুনিয়াতে নেই, তাহলে কিভাবে তারা এ উক্তি করতে পারে?
দ্বিতীয়ত: অনেক জান্নাতীকে দুনিয়াতে দুনিয়ার সকল ফল দ্বারা রিযিক দান করা হয়নি।
তৃতীয়ত: সব সময়ই একথা বলবে না, আমাদেরকে দুনিয়াতে অনুরূপ ফল দান করা হয়েছে; বরং তাদের এ উক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হল জান্নাতের এক প্রকারের ফল অন্য প্রকার ফলের সাথে সামঞ্জস্যশীল। সুতরাং এ মত গ্রহণ করার দ্বারা আল্লাহর বাণীর বিরোধিতা হয় না এবং জান্নাতীদের প্রতি মিথ্যার সম্পৃক্ততাও আবশ্যক হয় না।
আল্লাহ তাআলার বাণী وَأُتُوا به مُتَشَابِها এর ব্যাখ্যায় হযরত হাসান রহ. বলেন, জান্নাতের সকল ফলই উন্নতমানের হবে, নিম্নমানের কোন ফল হবে না।
কাতাদাহ রহ. বলেন, জান্নাতের সকল ফলই উন্নতমানের হবে, কোন ফল নিম্নমানের হবে না, যেমন দুনিয়ার কিছু ফল হয় উন্নতমানের আবার কিছু ফল হয় নিম্নমানের।
ইবনে জুরাইজ রহ. সহ অন্যরাও অনুরূপই মতপোষন করেছেন।
হযরত ইবনে মাসউদ রা., হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম বলেন, مُتَشَابِهًا দ্বারা উদ্দেশ্য হল, রং ও আকৃতি এক রকম হবে; কিন্তু স্বাদ ভিন্ন প্রকৃতির হবে।
মুজাহিদ রহ. বলেন, রং এক ধরনের হবে, কিন্তু স্বাদ ভিন্ন প্রকৃতির হবে।
ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর রহ. বলেন, জন্নাতের ঘাস হবে যাফরানের। তার টিলা হবে কস্তুরি। জান্নাতীদের নিকট কিশোররা ফল-ফলাদি নিয়ে এলে তারা খাবে। কিশোররা পুনরায় ফল নিয়ে এলে তারা বলবে, এ তো সেই ফলই, যা ইতোপূর্বে আমাদের নিকট নিয়ে এসেছিলে। তখন তাদের খাদেম বলবে, এগুলো খেয়ে দেখ। যদিও এগুলোর আকৃতি পূর্বোক্ত ফলের ন্যায়, কিন্তু স্বাদ ভিন্ন। আল্লাহ তাআলার বাণী كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِّزْقً দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।
অন্যরা বলেন, যদিও দুনিয়ার ফলের সাথে জান্নাতের ফলকে জান্নাতীগণ তুলনা করবে, কিন্তু জান্নাতের ফল হবে দুনিয়ার ফল অপেক্ষা উত্তম, সুস্বাদু ও উন্নতমানের।
আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, জান্নাতীগণ জান্নাতের ফল দেখে দুনিয়ার ফলের ন্যায় সেগুলোর নামকরণ করতে থাকবে। যেমন বলবে, এটা আপেল, এটা আনার ইত্যাদি। অথচ সেগুলোর স্বাদ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইবনে জারীর রহ. এ মতটিই পসন্দ করেছেন।
جَنَّاتِ عَدْنٍ مُفَتَّحَةً لَهُمُ الْأَبْوَابُ مُتَّكِينَ فِيهَا يَدْعُونَ فِيهَا بِفَاكِهَةِ كَثِيرَةٍ وَشَرَابٍ চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে তারা আসীন হবে হেলান দিয়ে, সেখানে তারা বহুবিধ ফলমূল ও পানীয় চাইবে।২৯৩
ا يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فاكهة أمنين তারা প্রশান্তচিত্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে।
এর দ্বারা বুঝা যায়, সেখানকার ফলমূল কখনো শেষ হবে না এবং তা ভক্ষণকারীর জন্য কখনো ক্ষতিকর হবে না।
فاكهة كثيرة لا مَقْطُوعَة وَلَا مَمْنُوعَة সেখানে প্রচুর ফলমূল থাকবে, যা শেষ হবে না ও নিষিদ্ধ হবে না।
তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এমন নয় যে, কখনও সেখানে অবস্থান করবে আবার কখনও সেখান থেকে অনুপস্থিত থাকবে। তারা সেখানে যা চাবে, তা থেকে তাদেরকে কখনো নিষেধ করা হবে না।
فَهُوَ فِي عِيشَة رَاضِيَة فِي جَنَّة عالية قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন; সুউচ্চ জান্নাতে, যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে২৯৫।
قطوف শব্দটি قطف এর বহুবচন, অর্থ: চয়নকৃত। যবর দ্বারা পড়লে, অর্থ: ফল চয়ন করা, অর্থাৎ জান্নাতের ফল অবনমিত নাগালে থাকবে। যে তা তুলতে চাবে তার কোন কষ্ট হবে না; বরং যেভাবে চাবে সেভাবেই তা লাভ করতে পারবে।
হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বলেন, তারা নিদ্রাবস্থায়ও তা লাভ করতে পারবে।
وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظَلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوفُهَا تَدْلِيلًا আর তার ছায়া তাদের উপর থাকবে, তার ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আওতাধীন থাকবে২৯৬।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতীগণ যখনই তার ফল নিতে চাইবে, তখনি ফল অর্ধনমিত হয়ে পড়বে। যার ফলে ইচ্ছা মত তা নিতে পারবে।
কেউ কেউ বলে, জান্নাতীগণ যেভাবে চাবে, তার ফল সেভাবেই তাদের জন্য অবনমিত হবে। সুতরাং তারা তা শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, সর্বাবস্থায় নিতে পারবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলার বাণী قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ দ্বারা উদ্দেশ্য, তার ফল লাভ করা তাদের জন্য খুবই সহজ হবে। খেজুর ফল তোলা যখন সহজ হয়ে পড়ে আরবরা তখন বলে, ذُلِّلَ النَّخْلُ সুতরাং বুঝা যায়, তাদের জন্য তার ফল লাভ করা একেবারে সহজ হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فِيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক প্রকার ফল দু'দু'প্রকার২৯৭।
সে দু'উদ্যানে আরো দু'টি উদ্যান রয়েছে, فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلٌ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল খেজুর ও আনার২৯৮।
এ আয়াতে বিশেষভাবে খেজুর ও আনারের উল্লেখ সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার কারণেই হয়েছে। যেমনটি সূরা নাবাতেও রয়েছে। (সূরা নাবাতে শুধু আঙ্গুরের উল্লেখ রয়েছে, খেজুরের উল্লেখ নেই। তবে এর দ্বারা সূরা মু'মিনুনের আয়াত فَأَنشَأْنَا لَكُم بِهِ جَنَّاتٍ مِّن نَّخِيلٍ وَأَعْنَابِ এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার অর্থ 'অতঃপর আমি তা দ্বারা তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান সৃষ্টি করি'। অন্য সকল ফলের মধ্যে বিশেষ করে এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, অত্যন্ত উন্নত বৈশিষ্ট্য ও সুমিষ্ট হওয়ার কারণে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা২৯৯।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত ছাওবান রহ. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে যখন জান্নাতী ব্যক্তি এক জায়গা হতে একটি ফল ছিড়বে তখন অন্য একটি ফল তার স্থান পূরণ করবে।
ইমাম আহমদ রহ.-এর পুত্র আবদুল্লাহ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মূসা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা যখন হযরত আদম আ. কে জান্নাত হতে পৃথিবীতে নামিয়ে দেন, তখন তাকে সকল প্রকার শিল্প-কারিগরী শিখিয়েছিলেন। তাঁকে জান্নাতের ফল পাথেয় স্বরূপ সাথে দিয়েছেন। তোমার দুনিয়ার এফলগুলো জান্নাতেরই ফল হতে সৃষ্ট। তবে হ্যাঁ, এতটুকু বিষয়, সেগুলো নষ্ট হয়ে যেত; কিন্তু জান্নাতের ফল কখনো নষ্ট হবে না'। পূর্বে আলোচিত হয়েছে, সিদরাতুল মুনতাহার ফল মটকার ন্যায় বড় আকারের হবে।
সহীহ মুসলিমে৩০০ হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে জান্নাত পেশ করা হল এবং তা আমার এত নিকটে নিয়ে আসা হল, যদি আমি তার ফল নিতে চাইতাম, তাহলে তা হতে নিতে পারতাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আমি জান্নাতের ফল নিতে চাইলাম, কিন্তু আমার হাত তা হতে ছোট ছিল। যার ফলে আমি তা হতে ফল নিতে পারিনি।
আবূ খাইছামাহ রা. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, আমরা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পেছনে যোহরের নামায আদায় করছিলাম। তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সামনে অগ্রসর হতে দেখে আমরাও সামনে অগ্রসর হলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বস্তু ধরার জন্য সামনে হাত বাড়ালেন, আবার পেছনে সরে গেলেন। নামায শেষে হযরত উকবা ইবনে কা'ব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আপনাকে নামাযে এমন কাজ করতে দেখেছি, যা ইতোপূর্বে করতে দেখিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আজ আমার সামনে জান্নাত পেশ করা হয়েছে, আমি তার ফলমূল দেখলাম। তোমাদের জন্য তার আঙ্গুর থোকা নিতে চাইলাম; কিন্তু আমার মাঝে ও তার মাঝে একটি বস্তু আড়াল হয়ে দাঁড়াল। আমি যদি তা তোমাদের জন্য নিতাম, তাহলে যমীন হতে আসমান পর্যন্ত সকল মাখলুক তা ভক্ষণ করলেও তা হতে হ্রাস পেত না।
ইবনুল মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতের ফল মটকা ও বালতির ন্যায় বিশাল হবে, দুধ অপেক্ষা সাদা, অমৃতাপেক্ষা সুমিষ্ট, পনীর হতেও কোমল হবে। তাতে কোন বিচি থাকবে না।
সাঈদ ইবনুল মনসূর রহ. স্ব-সনদে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জান্নাতীগণ তার ফল দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থায় খেতে পারবে।
ইমাম বায্যায রহ. স্ব-সনদে উসামা বিন যায়েদ রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি জান্নাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে? জান্নাতে কোন প্রকার বিধি-নিষেধ থাকবে না। কা'বার প্রভুর শপথ! তা তো দ্বীপ্তিময় আলোকরশ্মি। তার ফুল দোল খেতে থাকে। তাতে রয়েছে সুদৃঢ় অট্টালিকা, প্রবহমান নদী, পাকা ফল, সুন্দরী-রূপবতী সূডোল স্ত্রী, জোড়া জোড়া পোশাকের সমাহার, স্থায়ী নিবাস, শান্তির নিকেতন, ফলমূল, সবুজ শ্যামলিমা, কারুকার্য খচিত চাদর, সুরম্য সুউচ্চ প্রাসাদে নানাবিধ নিআমত। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ইন্শাআল্লাহ' বল। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইন্শাআল্লাহ।
ইমাম বায্যায রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি শুধু হযরত উসামা বিন যায়দ রা. হতে বর্ণিত এবং এক সনদেই বর্ণিত রয়েছে।
হযরত লাকীত ইবনে সাবুরাহ রা. হতে ইমাম আহমদ রহ.-এর ছেলে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাতীরা কোথায় উদিত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নির্মল অমৃত মধুসাগরের পাদদেশে এবং শরাবের নদীতে। যাতে মাথা ব্যথা সহ কোনো লজ্জা ও অনুতাপ থাকবে না। তাতে এমন দুধের নদী থাকবে, যার স্বাদ কখনো বিনষ্ট হবে না। এমন পরিচ্ছন্ন পানির নহর থাকবে, যা কখনও দুর্গন্ধ হবে না।
টিকাঃ
২৯২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৫
২৯৩. সূরা সাদ, আয়াত ৫০-৫১
২৯৪. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৩২-৩৩
২৯৫. সূরা হাক্কা, আয়াত ২১-২৩
২৯৬. সূরা দাহর, আয়াত: ১৪
২৯৭. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৫২
২৯৮. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৮
২৯৯. সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫
৩০০. খ. ১, পৃ. ২৯৭