📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের প্রথম উপহার

📄 জান্নাতের প্রথম উপহার


ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহ মুসলিমে হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট বসেছিলাম। এসময়ে একজন ইহুদী পণ্ডিত এসে বলল, السلامُ عَلَيْكَ يَا مُحَمَّدٍ হে মুহাম্মদ! আপনাকে সালাম। তখন আমি তাকে এমনভাবে ধাক্কা দিলাম, সে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। সে বলল, তুমি আমাকে কেন ধাক্কা দিলে? আমি বললাম, তুমি ইয়া রাসূলাল্লাহ না বলে ইয়া মুহাম্মদ বললে কেন? ইহুদী বলল, আমি তো তাকে সে নামেই ডাকছি, তার পরিবারের লোকেরা তার যে নাম রেখেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার পরিবারের লোকেরা আমার নাম মুহাম্মদই রেখেছে। ইহুদী বলল, আমি আপনার নিকট কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার জিজ্ঞাসিত বিষয় সম্পর্কে জানালে তোমার কি লাভ হবে? ইহুদী বলল, আমি মনোযোগ সহকারে শুনব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতের লাঠি দ্বারা মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বললেন, তুমি যা জিজ্ঞাসা করতে চাও জিজ্ঞাসা কর। ইহুদী বলল, যেদিন এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে রূপান্তর করা হবে, সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুলসিরাতের নিচে অন্ধকারে থাকবে। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, কারা সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হবে। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পর সর্বপ্রথম তাদের উপহার সামগ্রী কী হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশটুকু হবে জান্নাতের সর্বপ্রথম উপহার। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, এরপর তাদেরকে কি আহার প্রদান করা হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের জন্য জান্নাতের সে ষাঁড় যবাই করা হবে, যা জান্নাতের বিভিন্ন প্রান্ত চষে বেড়াত। ইহুদী পুনরায় প্রশ্ন করল, তাদের পানীয় কি হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা ছালছাবীল নামক প্রস্রবণ হতে পান করবে। ইহুদী বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।

অতপর সে বলল, আমি আপনাকে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে চাই, যা এ পৃথিবীর বুকে নবীগণ ও দু'একজন ছাড়া অন্য কেউ জানে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদি তোমার জিজ্ঞাসিত বিষয় সম্পর্কে তোমাকে বলি, তাহলে তোমার কি উপকার হবে? সে বলল, আমি আপনার কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনব। সে বলল, আমি আপনার নিকট সন্তান সম্পর্কে জানতে চাই। (সন্তান ছেলে বা মেয়ে কিভাবে হয়?) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুরুষের বীর্য সাদা বর্ণের আর স্ত্রীলোকের বীর্য হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। সুতরাং যখন স্বামী-স্ত্রী রতিক্রিয়ায় মিলিত হয়, তখন যদি স্বামীর বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তাহলে আল্লাহর হুকুমে ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে; আর যদি স্ত্রীর বীর্য স্বামীর বীর্যের উপর প্রাধান্য পায়, তাহলে আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান লাভ করে। ইহুদী বলল, আপনি সঠিক বলেছেন। অবশ্যই আপনি নবী। সে চলে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে আমাকে এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে, যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাকে অবহিত করার পূর্ব পর্যন্ত আমার কোন জ্ঞানই ছিল না।

সহীহ বুখারীতে২৭০ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মদীনায় আগমনের সংবাদ এমন সময় পেয়েছেন, যখন তিনি বাগান হতে ফল তুলছিলেন। তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গিয়ে বললেন, আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয় জিজ্ঞাসা করব, যা নবী ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। প্রথমটি হল, কিয়ামতের আলামত কি? দ্বিতীয়টি হল, জান্নাতীদেরকে সর্বপ্রথম কী খাবার দেওয়া হবে? তৃতীয়টি হল, সন্তান তার পিতা মাতার সদৃশ হয় কি করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে জিবরীল আ. এখন এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বললেন, জিবরীল এসে অবহিত করলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, জিবরীলই আমাকে জানিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, ফিরিশতাদের জিবরীলতো ইহুদীদের দুশমন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন শরীফের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ
যে কেউ জিবরীলের শত্রু এ জন্য যে, সে আল্লাহর নির্দেশে তোমার হৃদয়ে কুরআন পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ২৭১।

সুতরাং শুন তোমার প্রশ্নের উত্তর, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন তো হল অগ্নিগোলকের আবির্ভাব ঘটবে, যা পূর্ব হতে পশ্চিম সকল প্রান্তের মানুষদেরকে একত্রিত করবে আর জান্নাতীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশটুকু। সন্তান পিতা-মাতার সদৃশ হওয়ার কারণ হল, সহবাসের সময় যদি স্বামীর বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তাহলে সন্তান তার পিতৃকুলের সদৃশ হয়, যদি স্ত্রীর বীর্য স্বামীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তবে সন্তান তার মাতৃকুলের সদৃশ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কোন মা'বুদ নেই, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল।

হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই ইহুদী এক অপবাদপ্রবণ জাতি। যদি আমার ব্যাপারে তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করার পূর্বে আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তারা জানতে পারে, তবে তারা আমার ব্যাপারে অপবাদ দিবে। সুতরাং আমার ব্যাপারে আপনিই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। যখন ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তোমাদের মাঝে কেমন ব্যক্তি? তারা বলল, সে তো আমাদের অত্যন্ত পসন্দনীয় ব্যক্তি ও পসন্দনীয় ব্যক্তির পুত্র। সে তো আমাদের নেতা এবং নেতার পুত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? তারা বলল, আল্লাহ তাআলা তাকে এর থেকে রক্ষা করুক। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বেরিয়ে এসে বললেন, أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أنك رسول الله
ইহুদীরা তাঁর মুখ থেকে এ কালিমা শুনে বলতে শুরু করল, সে তো আমাদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ব্যক্তি ও নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছেলে। তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের ব্যাপারে অনেক নিকৃষ্টতম ভাষা ব্যবহার করল। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এ বিষয়টিরই ভয় ছিল। সহীহায়নে'২৭২ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটি পাতলা রুটির ন্যায় হবে। প্রভু পরাক্রমশালী তা এমনিভাবে উলটপালট করবেন যেমনিভাবে তোমরা সফরে রুটি উলটপালট কর। তখন ইহুদীদের এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবুল কাসেম! তোমার প্রতি আল্লাহ তাআলা বরকত অবতীর্ণ করুক। আমি কি আপনাকে কিয়ামত দিবসে জান্নাতীদের আপ্যায়ন সম্পর্কে বলব না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেন নয়? অবশ্যই বলবেন। সে বলল, সেদিন যমীন একটি রুটির ন্যায় হবে, সে ঠিক সেভাবেই বলল, যেভাবে তার আসার পূর্বে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বলেছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন, তাতে মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গেল। অতপর সে বলল, আমি আপনাকে জান্নাতের তরকারী সম্পর্কে বললব না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই বলবে। বলল, তা হল উদম এবং নূন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কি? সে বলল, ষাঁড় এবং এমন মাছ, যার কলিজার অতিরিক্ত অংশ সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদেরকে বলবেন, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। সকল অতিথির জন্য প্রাণী যবাহ করা হয়। আজ আমি তোমাদের জন্য যবাহ করব। এরপর ষাঁড় ও মাছ আনা হবে। আল্লাহ তাআলা সেগুলো যবাহ করে টুকরা টুকরা করে জান্নাতীর আপ্যায়ন করবেন।

টিকাঃ
২৬৯ খ. ১, পৃ. ১৪৬
২৭০. খ. ২ পৃ. ৬৪৩
২৭১. সুরা বাকারা, আয়াত: ৯৭
২৭২ বুখারী, খ ২ পৃ. ৯৬৫, মুসলিম খ. ২, পৃ. ৩৭১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের সুগন্ধি ও সৌরভ

📄 জান্নাতের সুগন্ধি ও সৌরভ


ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন যিম্মিকে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যাবে। ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে২৭৩ স্ব-সনদে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম তাবারানীর বর্ণনা ও ইমাম বুখারীর বর্ণনায় শুধু এতটুকু পার্থক্য, ইমাম বুখারী রহ. জানাদাহ নামক এক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি এবং তাঁর বর্ণনায় একশত বছরের জায়গায় চল্লিশ বছরের কথা উল্লেখ আছে।

ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খবরদার! যে ব্যক্তি এমন কোন চুক্তিকারীকে হত্যা করল, যার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মাদারী রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহর যিম্মাদারীকে ভঙ্গ করল। এমন ব্যক্তি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ সত্তর বছরের দূরত্ব হতেই পাওয়া যায়।

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এ ব্যাপারে হযরত আবূ বকরাহ রা. হতে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসটি সহীহ ও হাসান পর্যায়ের।

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, উক্ত হাদীসের সনদ আমার মতে ইমাম বুখারীর বর্ণনা শর্ত মোতাবেক।

আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম তাবারানী রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, সেটি মারফু। তাতে রয়েছে, যে ব্যক্তি কোন চুক্তিকারীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ একশত বছরের দূরত্ব হতে তার ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ বাকরাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, জান্নাতের খুশু একশত বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। এই শব্দে উভয় বর্ণনার মাঝে কোনোভাবে বৈপরিত্য পাওয়া যায় না।

ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. স্ব-স্ব সহীহ গ্রন্থে২৭৪ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার চাচা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এ বিষয়টি তাঁর নিকট অত্যন্ত কষ্টকর মনে হত যে, কাফিরদের সাথে রাসূলুল্লাহর প্রথম যুদ্ধে আমি শরীক হতে পারি নাই। আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে এরপর কখনো রাসূলুল্লাহর সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সুযোগ দান করেন, তবে আমি দেখিয়ে দেব যে, আমি কি করতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওহুদের ময়দানে হযরত মু'য়ায বিন জাবাল রা. তাকে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, আহ! জান্নাতের সুবাতাস কতই না চমৎকার! যা আমি ওহুদের পাদদেশে পাচ্ছি।

হযরত আনাস রা. বলেন, তিনি শত্রুদের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।

হযরত আনাস রা. বলেন, তাঁর শরীরে আশিটিরও অধিক তীর ধনুকের আঘাত ছিল। তাঁর বোন অর্থাৎ রবী বিনতে নাযারের ফুফী তার ভাইকে শুধু আঙ্গুলের মাথা দ্বারাই চিনতে পেরেছেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে২৭৫।

হযরত আনাস রা. বলেন, সাহাবায়ে কেরামের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, উক্ত আয়াত তার ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।

উল্লেখ্য, জান্নাতের সুগন্ধি দু'প্রকার। এক প্রকার সুগন্ধি এমন দুনিয়াতেও যার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কখনো কখনো আত্মা তা অনুভব করতে পারে, যদিও বান্দার অনুভবে তা ধরা দেয় না।

অপর সুগন্ধি হল, যা কেবল দেহের নাসিকা রন্ধ্র দিয়ে ফুলের ঘ্রান অনুভব করার মত করে অনুভব করা যায়। এ প্রকার সুগন্ধি সকল জান্নাতীই লাভ করবে। নিকট ও দূর সকল স্থান থেকেই তা অনুভূত হবে।

দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসূলগণের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা করেন, তাঁকেই এ সুগন্ধির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।

হযরত আনাস বিন নযর যে খোশবু অনুভব করেছেন, হতে পারে তা এ জাতীয় সুগন্ধি অথবা প্রথম প্রকারের সুগন্ধিও হতে পারে। والله اعلم ।

আবূ নাঈম রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যায়।

তাবারানী রহ. হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। আল্লাহর শপথ, মাতা-পিতার অবাধ্য ব্যক্তি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি এ সুঘ্রাণ পাবে না।

আবূ দাউদ তায়ালেসী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি পিতা ব্যতীত অন্যের দিকে নিজ বংশধারা যুক্ত করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার খোশবু পাঁচশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।

আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবীতে তাঁর বান্দাদেরকে জান্নাতের নিদর্শনাবলী হতে কিছু প্রত্যক্ষ করান। তন্মধ্যে রয়েছে জান্নাতের খোশবু, মনোপূত স্বাদ, সুন্দর ও মনোরম দৃশ্যাবলী, উত্তম ফল-ফলাদি, বিভিন্ন প্রকার নিআমত, আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও চোখের শীতলতা।

আবু নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার অধিবাসীদের জন্য সজীবতা ও সমৃদ্ধি রয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার সৌন্দর্য ও সজীবতা বৃদ্ধি করে দাও। সাহরীর সময় মানুষ যে শীতলতা অনুভব করে তা তারই অংশ। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আগুন ও তার কষ্ট এবং চিন্তা ও পেরেশানীকে আখিরাতের কষ্ট ও পেরেশানীর কথা স্মরণকারী হিসাবে তৈরী করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গরম-ঠাণ্ডা জাহান্নামের শ্বাস নেওয়ার কারণে হয়ে থাকে। সুতরাং আল্লাহ স্বীয় বান্দাকে জান্নাতের শ্বাসসহ সেখানকার স্মারক বস্তুসমূহ পৃথিবীতেই প্রত্যক্ষ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

والله المستعان

টিকাঃ
২৭৩. খ. ২ পৃ. ৪৪৬
২৭৪. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৩৯৩, মুসলিম, খ. ২ প. ১৩৯
২৭৫. সূরা আহযাব, আয়াত: ২৩

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতে চিরশান্তির ঘোষণা

📄 জান্নাতে চিরশান্তির ঘোষণা


ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে২৭৬ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. ও হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এক ঘোষক ঘোষণা করবে, তোমরা অবশ্যই সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে, কখনো তোমাদেরকে কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানী স্পর্শ করবে না। ঘোষণাটি আল্লাহর সেই বাণীর মর্মার্থ وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ 0 জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে২৭৭।

উসমান ইবনে আবি শাইবা হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , RIIcon as وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ . এর ব্যাখ্যায় বলেন, তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে, তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে। কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানীর ছোঁয়াও তোমাদের লাগবে না।

সহীহ মুসলিমে হযরত সুহাইব রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহর নিকট তোমাদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তারা বলবে, কি সেই প্রতিশ্রুতি? তিনি তো আমাদের নেকের পাল্লা ভারী করে দিয়েছেন। আমাদের চেহারা শুভ্র ও ঔজ্জ্বল্যময় করেছেন। আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। (এ সকল নিআমত যেহেতু পেয়ে গেছি, তবে এমন আর কি প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট রয়েছে?) তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বড়ত্বের পর্দা উঠিয়ে নিবেন। আর জান্নাতীগণ আল্লাহ তাআলার দীদার লাভ করবে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যে সকল নিআমিত প্রদান করেছেন তার থেকে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হবে আল্লাহর দীদার।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে আবূ তামীম হুযাইমী হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. কে বলতে শুনেছি। যখন তিনি বসরার মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে জান্নাতীদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। সে বলবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দান করেছিলেন তা কি পূর্ণ করেছেন? তখন তারা অলংকারাদি, পোশাকাদী, প্রবহমান নদী, শুদ্ধাচারিণী রমণীকুল দেখতে পেয়ে বলবে, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই পূর্ণ করেছেন। তিনবার তারা এ কথা বলবেন। তখন তারা আশপাশে তাকিয়ে তা খুঁজবে; কিন্তু না পাওয়ার কোনো কিছুই চোখে পড়বে না। তখন ফিরিশতাগণ বলবেন, একটি বিষয় বাকী রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَة যারা মঙ্গলকর কার্য করে, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং আরো অধিক২৭৮।

জেনে রাখ, সেই মঙ্গল হচ্ছে জান্নাত আর অতিরিক্তটি হচ্ছে আল্লাহর দীদার।

সহীহায়নে২৭৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীগণকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতীগণ! জান্নাতীগণ জবাবে বলবে, لبيك وسعديك হে আমাদের প্রভু! আমরা উপস্থিত, আপনার নির্দেশ পালনার্থে আমরা উপস্থিত। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে সে সব বস্তু দান করছেন যা আপনার মাখলুকের অন্য কাউকে দান করেননি, তবু কেন আমরা সন্তুষ্ট হব না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করব? জান্নাতীগণ বলবে, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! এর চেয়ে উত্তম নিআমত আর কি হতে পারে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাদের জন্য আমার সন্তুষ্টিকে আবশ্যকীয় করে নিয়েছি, আমি কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না।

সহীহায়নে২৮০ হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে, তখন একজন ঘোষক তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যু কখনো তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। প্রত্যেকে যে যেখানে অবস্থান করছে, সেখানেই সর্বদা অবস্থান করবে। যদিও এ ঘোষণা জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থলে হবে, কিন্তু সকল জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী এ ঘোষণা শুনবে। জান্নাতীগণ যেদিন আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করবে, সেদিন তারা আরো একটি ঘোষণা শুনতে পাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। ফিরিশতা তাদের মাঝে আল্লাহ তাআলার দীদার লাভের ঘোষণা দিলে তারা ঠিক তেমনিভাবে দৌড়ে আসবে, যেমনিভাবে মুয়াযযিন জুমু'আর আযান দেওয়ার পর মানুষ জুমু'আর নামাযের জন্য দৌড়ে আসে।

টিকাঃ
২৭৬. খ. ২. পৃ. ৩৮০
২৭৭. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪৩
২৭৮. সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৬
২৭৯. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৬৯, মুসলিম. খ. ২ পৃ. ৩৭৮
২৮০. বুখারী, খ. ২ প. ১১২১, মুসলিম, খঃ ২. পৃ. ৩৮২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের মনোরম গাছগাছালি ও ছায়ঘেরা উদ্যান

📄 জান্নাতের মনোরম গাছগাছালি ও ছায়ঘেরা উদ্যান


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ فِي سِدْرٍ مَحْضُودٍ وَطَلْحٍ مَنْضُودٍ وَظِلٍّ مَمْدُودٍ وَمَاءٍ مَسْكُوبٍ وَفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ لَا مَقْطُوعَةٍ وَلَا مَمْنُوعَة
আর ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান ডানদিকের দল! তারা থাকবে এমন উদ্যানে, সেখানে থাকবে কণ্টকহীন কুল বৃক্ষ, কাঁদি ভরা কদলি বৃক্ষ, সম্প্রসারিত ছায়া, সদা প্রবহমান পানি, প্রচুর ফলমূল। যা শেষ হবে না, নিষিদ্ধও হবে না।২৮১

আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, ذَوَاتًا أَفْنَان উভয় বহু শাখা পল্লব বিশিষ্ট বৃক্ষপূর্ণ। أَفْنَان এটি فن-এর বহুবচন, যার অর্থ শাখা।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, فيهما فاكِهَةٌ وَنَحْلٌ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল, খেজুর ও আনার২৮২।

مخضود বলা হয়, যাকে কণ্টকমুক্ত করা হয়েছে। এটি হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত মুজাহিদ রহ. সহ অন্যদের মত। তাঁদের মতের সমর্থনে তারা দু'টি প্রমাণ পেশ করেন।

প্রথমটি, خضد শব্দটির আভিধানিক অর্থ কাঁটা। যখন কণ্টকমুক্ত করা হয়, তখন আরবগণ বলেন, خضدت الشجرة আর خضاد বলা হয়, কাঁটাহীন নরম গাছ।

দ্বিতীয়টি, ইবনে আবী দাউদ স্ব-সনদে হযরত উতবাহ ইবনে আব্দুস-সালামী হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসেছিলাম। এ সময়ে এক বেদুঈন এসে বলল, ইয়া রাসুলল্লাহ! আমি শুনেছি, আপনি জান্নাতের এমন একটি বৃক্ষের আলোচনা করছেন, যা কাঁটামুক্ত থাকবে, অথচ আমার জানা মতে এটিই সর্বাপেক্ষা অধিক কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকটি কাঁটাকে ফলে রূপান্তরিত করবেন। জান্নাতে সত্তর প্রকারের সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের খাবার থাকবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে সুলাইমান ইবনে আমেরের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বললেন, সাহাবায়ে কিরামগণ বলতেন, গ্রাম্য ও তাদের নিঃসংকোচ প্রশ্ন দ্বারা আমাদের অনেক ফায়দা হয়েছে। ঠিক তেমনি একদিন এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একটি কষ্টদায়ক গাছের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমার তো মনে হয়, জান্নাতে এ ধরনের কোন গাছ থাকবে না, যা জান্নাতীদের কষ্টের কারণ হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি কোন গাছ? সে বলল, কুল গাছ। তার কাঁটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, فى سدر مخضود আল্লাহ তাআলা সে কাঁটাগুলো কেটে প্রত্যেক কাঁটার স্থলে ফল লাগিয়ে দেবেন।

মুফাস্স্সিরীনের এক জামাআত বলেন, المنضود দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ফল দ্বারা পরিপূর্ণ বোঝা; কিন্তু তাদের এ মতটি অনেকের কাছে তেমন পসন্দনীয় নয়। তাই তাদের প্রতি প্রশ্ন উত্থাপনকারীগণ বলেন, خضد শব্দটির অভিধানে বোঝা অর্থে ব্যবহার নেই। বাস্তবে তাদের এ আপত্তি সঠিক নয়। কেননা, مخضود অর্থ ফলে পরিপূর্ণ, এটি এর সঠিক অর্থ। এ মত পোষণকারীরা বলেন, আল্লাহ যখন কাঁটাগুলোকে মিটিয়ে দিবেন, তখন তদস্থলে ফল দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন। পূর্বোক্ত হাদীস দু'টি এর সমর্থক।

জান্নাতের কলা কেমন হবে
অধিকাংশ মুফাস্সির বলেন, তলহ দ্বারা উদ্দেশ্য কলা গাছ। হযরত আলী রা. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর মতও তাই।

অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, তলহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল বড় লম্বা গাছ, যা বালুকাময় প্রান্তরে হয়ে থাকে, অধিক কাঁটাযুক্ত হয়ে থাকে। তা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সুগন্ধিময় ও প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট হয়।

ইবনে কুতাইবা রা. বলেন, তলহ বলা হয় ঐ গাছকে, যা ভারে নেতিয়ে পড়ে।

হযরত মাসরূক রহ. বলেন, জান্নাতের গাছের পাতাগুলো উপর হতে নিচ পর্যন্ত ভাঁজ করা থাকবে এবং কোন পরিখা ব্যতীতই তার নদী বয়ে চলবে।

লাইস রহ. বলেন, তলহ হল সে গাছ, যাকে উম্মে গায়লান বলা হয়, যাতে কোন ধরনের বক্র কাঁটা নেই বরং সবগুলো সোজা সোজা কাঁটা থাকবে। এ গাছের কাঠ অত্যন্ত শক্ত হয় ও তার আঠা অত্যন্ত উত্তম মানের হয়ে যাবে।

আবূ ইসহাক রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য, উম্মে গাইলান নামক গাছ, যা অত্যন্ত উজ্জ্বল্যময় এবং যার সুগন্ধি অত্যন্ত চমৎকার। তবে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, জান্নাতের বিভিন্ন ফলমূলের নাম যদিও দুনিয়ার ফলমূলের নামের মতই; কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে বেহেশতের ফলের সাথে পৃথিবীর ফলের কোন তুলনাই হয় না। যারা তলহ দ্বারা কলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন তারা সারিবদ্ধ ফলের উপমা বুঝাতে কলার কথা বলেছেন। নয়তো তলহ বলা হয় মরুময় প্রান্তরের বড় লম্বা গাছকে। والله اعلم

সহীহায়নে২৮৩ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও যে গাছের ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। যেমনটি কুরআন কারীমে রয়েছে وظلٌ مَّمْدُود প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট।

সহীহায়নে২৮৪ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না।

আবূ হাযিম রহ. নো'মান বিন আবী আইয়াশের মাধ্যমে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যে গাছের ছায়া কোন পাতলা কোমর বিশিষ্ট অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না।

ইমাম আহমদ রহ.২৮৫ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সত্তর বছর অথবা বলেছেন, একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। তা হল জান্নাতুল খুলদের গাছ।

ওকী' রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন, وَظَلٌ مَّمْدُود 'প্রলম্বিত ছায়া বিশিষ্ট গাছ রয়েছে'।

হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসটি হযরত কা'ব রা. শুনে বলেন, তিনি সঠিকই বলেছেন। সে সত্তার শপথ! যিনি হযরত মূসা আ.-এর প্রতি তাওরাত এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যদি কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহী সে বৃক্ষের শিকড়ের চার পাশে একশত বছর পর্যন্ত ঘুরে, তবু তার কাণ্ড পর্যন্ত পৌছতে পারবে না। এমন কি সে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। আল্লাহ তায়লা স্বীয় কুদরতী হাতে সেটি লাগিয়েছেন। জান্নাতের সকল প্রান্তে তার শেকড় বিস্তৃত আর তার শেকড় হতেই জান্নাতের প্রত্যেক প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়।

ইবনে আবিদ-দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, ظل ممدود হল জান্নাতের একটি গাছ। তার কাণ্ড এত মোটা যে, দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছর তার পাশে ঘুরেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। জান্নাতীগণ তাদের প্রাসাদ থেকে বের হয়ে সে গাছের ছায়ায় বসে গল্প করবে।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জান্নাতে কোন জান্নাতী দুনিয়ার কোন আনন্দ-ফুর্তির কথা স্মরণ করে তার আগ্রহ প্রকাশ করবে। তখন আল্লাহ তাআলা একটি সমীরণ বইয়ে দিবেন, যার ফলে দুনিয়ার সে আনন্দময় বিনোদন গুলো সে গাছ থেকে প্রকাশ পাবে।

জামে তিরমিযীতে২৮৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের প্রত্যেক গাছের কাণ্ড হবে স্বর্ণের। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি হাসান পর্যায়ের।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন বস্তু তৈরী করেছি, যা কোন চোখ দেখেনি, কোনো কর্ন শ্রবণ করেনি, এমনকি কোনো মানব-হৃদয়ে যার কোন চিন্তাও উদয় হয়নি। এ ক্ষেত্র যদি তোমরা চাও, তাহলে উক্ত আয়াত পড়তে পার, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّة أعين جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ . আল্লাহ তা'আলা বলেন, কেউ জানে না, তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্মরূপ২৮৭।

তিনি আরো বলেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া দ্রুতগামী অশ্বারোহী একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহ তাআলার বাণী وَظَلٌ مَّمْدُود )সম্প্রসারিত ছায়া বিশিষ্ট গাছ রয়েছে( স্বরণ করতে পার।

তিনি বলেন, জান্নাতে একটি তৃণ রাখার স্থানও দুনিয়া ও তন্মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা হতে উত্তম। এ ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহ তাআলার বানী, فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ স্মরণ করতে পার, যাকে জাহান্নام হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে, সে-ই সফলকাম।২৮৮

সহীহ বুখারীতে২৮৯ হযরত আনাস রা. হতে বর্নিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়া দ্রুতগামী আরোহী ব্যক্তি একশত বছরেও অতিক্রম করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তোমরা এ আয়াত পড়তে পার وَظَلُّ مَّمْدُود وَمَاء مَسْكُوْبِ সেখানে সম্প্রসারিত ছায়া থাকবে ও সদা প্রবহমান পানিও থাকবে।২৯০

ইবনে ওয়াহাব স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی (তৃবা) কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তৃবা হল, জান্নাতের একটি গাছ, যার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে একশত বছরের দূরত্ব। জান্নাতীগণের পোশাক হবে সে গাছের মূকুল দ্বারা।

হারমালা রহ. কিছু অতিরিক্ততার সাথে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی (তৃবা) কি সে ব্যক্তি লাভ করবে, যে আপনার দর্শন লাভে ধন্য হয়েছে ও আপনার প্রতি ঈমান এনেছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যে আমাকে দেখেছে ও আমার প্রতি ঈমান এনেছে তার জন্যতো বটে। সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির জন্যও তৃবা, যে আমাকে না দেখেও ঈমান এনেছে। তখন এক ব্যক্তি আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! طوبی কী? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, طوبی (তৃবা) হল জান্নাতের একটি গাছ, যার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তের দূরত্ব একশত মাইল। জান্নাতীদের পোশাক সে গাছের ফুলের বৃতি দ্বারা তৈরী করা হবে।

আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, উক্ত হাদীসের প্রথমাংশ মুসনাদেও রয়েছে। طوبى لمن راني وآمن بي وطوبى لمن امن بي ولم يرني سبع مرات সুসংবাদ সে ব্যক্তির, যে আমাকে দেখেছে ও আমার প্রতি ঈমান এনেছে, যে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান এনেছে কিন্তু আমাকে দেখেনি। এভাবে সাতবার সুসংবাদ।

ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতের খেজুর গাছের কাণ্ড হবে মূল্যবান সবুজ পাথরের। তার শিকড় হবে লাল স্বর্ণের, তার পত্রপল্লব হবে জান্নাতীদের পোশাক। তাদের সকল প্রকার বস্ত্রই তা দ্বারা হবে। তার ফল হবে মটকা এবং বালতির ন্যায় বড়। দুগ্ধ অপেক্ষা অধিক সাদা। মধু অপেক্ষা অধিক মিষ্ট। মাখন অপেক্ষা অধিক নরম হবে। তাতে কোন আঁটি থাকবে না।

ইমাম আহমদ রহ.২৯১ হযরত উতবা ইবনে আব্দুস সুলামী বর্ণনা করেন। এক গ্রাম্য লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে এসে হাউযে কাউসারের ব্যাপারে প্রশ্ন করল। সে জান্নাতের কথা উল্লেখ করে জিজ্ঞাসা করল, সেখানে কি ফলফলাদি থাকবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, সেখানে তুবা নামক একটি গাছ রয়েছে। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করলেন, যেগুলো আমার স্মৃতিতে নেই।

অতঃপর গ্রাম্য ব্যক্তি প্রশ্ন করল, সেই গাছটি আমাদের এলাকার কোন গাছের মত হবে? জবাবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পৃথিবীতে তার মত কোন গাছই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি কখনো সিরিয়া গিয়েছ? সে বলল, না, আমি কখনো সিরিয়া গমন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সিরিয়ায় জাওযাহ নামে তার মত একটি গাছ রয়েছে, যা এক কাণ্ড বিশিষ্ট হয়। সে কাণ্ড হতেই ডাল-পালা বিস্তৃত হয়। গ্রাম্য লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল, সে গাছের কাণ্ডটি কেমন মোটা? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের শক্তিশালী ও সামর্থবান জোয়ান উট বৃদ্ধ হয়ে তার হাঁসুলির হাড় খসে পড়া পর্যন্ত চলতে থাকলেও তার প্রকাণ্ডটিকে বেষ্টন করতে পারবে না।

গ্রাম্য লোকটি পুনপ্রশ্ন করল, জান্নাতে কি আঙ্গুর হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, তার থোকা কত বড় হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন যাত্রা বিরতি না করে কাক যদি একমাস স্বাভাবিক গতিতে ধারাবাহিকভাবে উড়তে থাকে, তবে তার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। গ্রাম্য লোকটি প্রশ্ন করল, তার শস্য কত বড় হবে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার পিতা কি কখনো বড় খাসি যবাহ করেছে? সে বলল, জি, হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে খাসির চামড়া তুলে তোমার পিতা কি কখনো তোমার মাকে মশক বানানোর জন্য দিয়েছে? সে বলল, হ্যাঁ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার একটি শস্য এমনি হবে। গ্রাম্য লোকটি বলল, তবে তো তার একটি মাত্র শস্যই আমাকে ও আমার পরিবারস্থদেরকে পরিতৃপ্ত করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তোমার গোটা পরিবারকে পরিতৃপ্ত করবে।

হযরত আবূ ইয়ালা মূসিলী রহ. স্ব-সনদে আসমা বিনতে আবূ বকর রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সিদরাতুল-মুনতাহার আলোচনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, দ্রুতগামী আরোহী একশত বছরেও তার ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না অথবা বলেছেন, তার ছায়ায় একশত আরোহী বিশ্রাম করতে পারবে। তাতে স্বর্ণের প্রজাপতি থাকবে, তার ফল মটকার ন্যায় বড় হবে।

ইমাম তিরমিযী রহ.ও উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একশত বছরে ছায়া অতিক্রম করা বা একশত আরোহীর বিশ্রাম এ দু'টির ব্যাপারে যে সংশয় পেশ করা হয়েছে। তা এ সনদের ইয়াহইয়া নামক একজন বর্ণনাকারীর সংশয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক স্ব-সনদে হযরত মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন। জান্নাতের যমীন হবে রৌপ্যের। মাটি হবে কস্তুরির। গাছের কাণ্ড হবে স্বর্ণ-রৗপ্যের। ডালপালা হবে মূল্যবান পাথর ও ইয়াকূতের। তা পাতা ও ফলে নত থাকবে। তার গাছ থেকে দাঁড়িয়ে বসে বা শুয়ে যে কোনভাবেই ফল খেতে কোন প্রকার কষ্ট হবে না। কেননা, তার ফলগুলো ঝুলে থাকবে।

আবূ মু'আবিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। আমরা সাফাহ নামক স্থানে অবতীর্ণ হলাম। সেখানে গাছের নিচে একটি লোক ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু তার উপর সূর্যের তাপ পড়ার উপক্রম হল। তাই আমি গোলামকে বললাম, এই চামড়ার মাদুরটি নিয়ে যাও, তাকে এ দ্বারা ছায়া দাও। তিনি বলেন, গোলাম গিয়ে সে ব্যক্তিকে মাদুরের ছায়া দিয়ে রাখল। যখন সে ব্যক্তি জাগ্রত হল, তখন দেখি, আরে এ যে হযরত সালমান ফারসী রাঃ। হযরত জারীর রাঃ বলেন, আমি গিয়ে তাঁকে সালাম করলে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার জন্য বিনম্রতা অবলম্বন কর। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে কিয়ামতের দিন সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। হে জারীর! তুমি কি জান? কিয়ামতের দিন কোন জিনিস অন্ধকার হবে?

জারীর বলেন, না। আমি সে সম্পর্কে জানি না। তিনি বললেন, মানুষ একে অন্যের প্রতি যুলুম করে, তা কিয়ামত দিবসে অন্ধকার হবে। এরপর হযরত সালমান রাঃ অত্যন্ত ক্ষীণ একটি খড়ি নিলেন। সেটি এত ক্ষীণ ছিল যে, তাঁর আঙ্গুলদ্বয়ে আমি তা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনি আমাকে বললেন, এমন ক্ষীণ ছোট এত সাধারণ একটি খড়ি তুমি জান্নাতে খুঁজে পাবে না। (জারীর রহঃ বলেন) আমি বললাম, হে আবূ আবদুল্লাহ! জান্নাতের খর্জুর বীথি ও অন্যান্য গাছ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, সেগুলোর প্রকাণ্ড হবে মুক্তার মালার ও স্বর্ণের, তাতে ফল থাকবে।

টিকাঃ
২৮১. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ২৭-৩৩
২৮২. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৬৮
২৮৩. বুখারী, খ. ২, পৃ.৭২৪, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৮
২৮৪. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৭০ মুসলিম, খ. ২, প. ৩৭৮
২৮৫. মুসনাদে আহমদ খ. ২. পৃ. ৪৫৫
২৮৬. খ. ২. পৃ. ৭৮
২৮৭. সূরা সাজদা, আয়াত: ১৭
২৮৮. সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫
২৮৯. খ. ২, পৃ. ৪২১
২৯০. সূরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৩০-৩১
২৯১. মুসনাদে আহমদ, খ. ৪ পৃ. ১৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00