📄 সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ
এ রাসূলগণ, তাদের মধ্যে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছে, যার সাথে আল্লাহ তাআলা কথা বলেছেন, আর কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। মারয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করেছি।
হযরত মুজাহিদ রহ. অন্যরা উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, مَّن كُلِّمَ اللهُ দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন, হযরত মূসা আ. আর رفع بعضهم درجات দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।
মি'রাজের ঘটনা বিবৃত হাদীসে রয়েছে (এটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনে কিরাম একমত) যখন মি'রাজ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মূসা আ.-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন হযরত মূসা আ. বললেন, হে প্রভু আমার! আমারতো ধারণা ছিল, আপনি অন্য কাউকে আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবেন না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন স্থানে পৌঁছলেন যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কারো ধারণা নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সে স্থান সম্পর্কে জানেন। এমনকি তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌছে গেলেন।
সহীহ মুসলিমে২৬৫ হযরত আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যখন মুয়াযিযন আযান দেয়, তখন তোমরাও তার সাথে আযানের বাক্যাবলী পুনরাবৃত্তি কর এবং আমার প্রতি দুরূদ পড়। যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরূদ পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন আর তোমরা আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা কর। ওসীলা হল, জান্নাতের এমন একটি স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজনই লাভ করবে, আমি আশাবাদী, আমিই হব সে ব্যক্তি। যে আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যাবে।
সহীহ মুসলিমে২৬৬ হযরত মুগীরাহ ইবনে শোবা রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মূসা আ. আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, জান্নাতে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের ব্যক্তি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সকল জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশের পর এক ব্যক্তি আসবে (যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে) তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! কিভাবে আমি জান্নাতে প্রবেশ করব? জান্নাতীগণতো নিবাস ও নেয়ার বস্তুগুলো নিয়ে নিয়েছে। তখন তাকে বলা হবে, তুমি কি চাও যে, তোমাকে সে পরিমাণ সম্পদ ও প্রাচুর্য প্রদান করা হোক, যে পরিমাণ সম্পদ ও প্রাচুর্য দুনিয়ার কোন বাদশাহকে প্রদান করা হয়। সে বলবে, আমি এতেই সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমাকে এ পরিমাণ ও এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি প্রদান করা হল। সে বলবে, প্রভু! আমি এতে সন্তুষ্ট।
মূসা আ. পুনরায় প্রশ্ন করলেন, জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরের ব্যক্তি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সে হল ঐ ব্যক্তি, যার জন্য আমি নিজ কুদরতী হাতে সম্মানের বৃক্ষ রোপণ করেছি। তাতে এমন নিশানা লাগিয়ে দিয়েছি, যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি। এমনকি কোন মানব হৃদয়ে যার চিন্তাও উদয় হয়নি।
ইমাম তিরমিযী স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের হল সে ব্যক্তি, যার উদ্যান, সেবক, স্ত্রী, মসনদ ও খাট এ পরিমাণ জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকবে, যাকে এক সহস্র বছরেও অতিক্রম করা যাবে না। আর জান্নাতীদের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী সে ব্যক্তি, যে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তাআলার দীদার লাভে সৌভাগ্যবান হবে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضَرَةٌ إلى ربها ناظرة সেদিন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে ২৬৭।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি কেউ মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আর কেউ কেউ ইবনে উমর-এর পর মাওকূফ রেখেছেন। আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম তাবারানী তাঁর মু'জামে সনদ সহ উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাতে সর্বনিম্নস্তরের জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাত লাভ করার পর তার নিআমতসমূহ দু'সহস্র বছর পর্যন্ত দেখেও শেষ করতে পারবে না। সে যেমনিভাবে নিকটবর্তী বস্তু দেখবে, তেমনিভাবে অতি দূরের বস্তুও দেখবে। তার স্ত্রীদেরকে, সেবকদেরকেও দেখবে এবং তার জন্য তৈরী খাটসমূহও দেখবে।
আবূ নাঈম রহ. হযরত ইবনে উমর রা.-এর হাদীসটি ছুওয়াইর হতে ইসরাঈল-এর সনদে বর্ণনা করেছেন। ছুওয়াইর বলেন, ইবনে উমর এ হাদীসটি মারফুই বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আহমদ রহ.২৬৮ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের জান্নাতীর তিনশত সেবক থাকবে। তাকে সকাল-সন্ধ্যা তিনশত বাটিতে করে খাবার প্রদান করা হবে। প্রত্যেক বাটির খাবারের রং ও স্বাদ থাকবে ভিন্ন ভিন্ন। সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি বাটির খাবারেই স্বাদ আস্বাদন করবে। আমার জানামতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে বাটিগুলো হবে স্বর্ণের। তাকে তিনশত পাত্রে পানীয় দেওয়া হবে। প্রত্যেক পাত্রের পানীয়ের রং ও স্বাদ ভিন্ন ভিন্ন হবে। সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পাত্রের পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করবে। তাকে দুনিয়ার স্ত্রী ব্যতীত আরো ৭২জন হুর স্ত্রী দেয়া হবে। প্রত্যেক হূরের বসার জন্য মাইল খানেক জায়গার প্রয়োজন পড়বে।
আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম নাসাঈ উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী সাকিন ইবনে আবদুল আযীযকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। আর এ হাদীসের অন্য বর্ণনাকারী শাহর ইবনে হাওশাব তো প্রসিদ্ধ দুর্বল রাবীদের অন্তর্ভুক্ত। এ হাদীসটি মুনকার, সহীহ হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ। কেননা, ষাট গজ বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গীর বসার জন্য মাইল খানেক জায়গার প্রয়োজন কোনো মতেই হতে পারে না।
আর সহীহায়নে যে বর্ণিত রয়েছে, জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী কাফেলার প্রত্যেক সদস্যের জন্য দু'জন করে হুর থাকবে। তাহলে এটা কি করে হয়, সর্বনিম্ন জান্নাত লাভকারী ব্যক্তি ৭২জন স্ত্রী লাভ করবে। অথচ জান্নাতে তো দুনিয়ার মহিলা অনেক কম হবে, তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তি একদল স্ত্রী লাভ করবে। তাছাড়া স্বর্ণের জান্নাত দু'টি রৌপ্যের জান্নাত দু'টি অপেক্ষা উন্নতমানের ও উচ্চ মর্যদাশীল হবে। তাহলে এটা কি করে হয়, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তিই স্বর্ণের জান্নাত লাভ করবে।
দুলাবী রহ. বলেন, শাহর ইবনে হাওশাব তার বর্ণিত হাদীস অন্যদের মত বর্ণনা করেননি।
ইবনে আওন রহ. বলেন, লোকজন শাহর ইবনে হাওশাবের হাদীস বর্জন করেছে। ইমাম নাসাঈ ও ইবনে আদী রহ. বলেন, শাহর ইবনে হাওশাব নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী নয়।
আবূ হাতিম রহ. বলেন, তার বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না। শো'বা রহ. ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ রহ. তাকে বর্জন করেছেন। অথচ তাঁরা উভয়ে হাদীস সহীহ ও যইফ হওয়া সম্পর্কে অধিক অবগত। যদিও কেউ কেউ শাহর ইবনে হাওশাবকে নির্ভরযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু শাহর ইবনে হাওশাব এমন স্তরের বর্ণনাকারী, যেই স্তরের বর্ণনাকারীরা যদি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত কিছু বর্ণনা করে, তাহলে তা পরিত্যাজ্য হয়। والله اعلم
টিকাঃ
২৬৫ খ. ১, পৃ. ১৬৬
২৬৬ খ. ১. পৃ. ১০৬
২৬৭. সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২২-২৩
২৬৮. মুসনাদে আহমদ খ. ২. পৃ. ৩১৭
📄 জান্নাতের প্রথম উপহার
ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহ মুসলিমে হযরত সাওবান রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট বসেছিলাম। এসময়ে একজন ইহুদী পণ্ডিত এসে বলল, السلامُ عَلَيْكَ يَا مُحَمَّدٍ হে মুহাম্মদ! আপনাকে সালাম। তখন আমি তাকে এমনভাবে ধাক্কা দিলাম, সে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। সে বলল, তুমি আমাকে কেন ধাক্কা দিলে? আমি বললাম, তুমি ইয়া রাসূলাল্লাহ না বলে ইয়া মুহাম্মদ বললে কেন? ইহুদী বলল, আমি তো তাকে সে নামেই ডাকছি, তার পরিবারের লোকেরা তার যে নাম রেখেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার পরিবারের লোকেরা আমার নাম মুহাম্মদই রেখেছে। ইহুদী বলল, আমি আপনার নিকট কিছু বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার জিজ্ঞাসিত বিষয় সম্পর্কে জানালে তোমার কি লাভ হবে? ইহুদী বলল, আমি মনোযোগ সহকারে শুনব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতের লাঠি দ্বারা মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বললেন, তুমি যা জিজ্ঞাসা করতে চাও জিজ্ঞাসা কর। ইহুদী বলল, যেদিন এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে রূপান্তর করা হবে, সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুলসিরাতের নিচে অন্ধকারে থাকবে। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, কারা সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দরিদ্র মুহাজিরগণ সর্বপ্রথম পুলসিরাত পার হবে। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পর সর্বপ্রথম তাদের উপহার সামগ্রী কী হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশটুকু হবে জান্নাতের সর্বপ্রথম উপহার। ইহুদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, এরপর তাদেরকে কি আহার প্রদান করা হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের জন্য জান্নাতের সে ষাঁড় যবাই করা হবে, যা জান্নাতের বিভিন্ন প্রান্ত চষে বেড়াত। ইহুদী পুনরায় প্রশ্ন করল, তাদের পানীয় কি হবে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা ছালছাবীল নামক প্রস্রবণ হতে পান করবে। ইহুদী বলল, আপনি সত্যই বলেছেন।
অতপর সে বলল, আমি আপনাকে এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে চাই, যা এ পৃথিবীর বুকে নবীগণ ও দু'একজন ছাড়া অন্য কেউ জানে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদি তোমার জিজ্ঞাসিত বিষয় সম্পর্কে তোমাকে বলি, তাহলে তোমার কি উপকার হবে? সে বলল, আমি আপনার কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনব। সে বলল, আমি আপনার নিকট সন্তান সম্পর্কে জানতে চাই। (সন্তান ছেলে বা মেয়ে কিভাবে হয়?) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুরুষের বীর্য সাদা বর্ণের আর স্ত্রীলোকের বীর্য হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। সুতরাং যখন স্বামী-স্ত্রী রতিক্রিয়ায় মিলিত হয়, তখন যদি স্বামীর বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তাহলে আল্লাহর হুকুমে ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে; আর যদি স্ত্রীর বীর্য স্বামীর বীর্যের উপর প্রাধান্য পায়, তাহলে আল্লাহর হুকুমে কন্যা সন্তান লাভ করে। ইহুদী বলল, আপনি সঠিক বলেছেন। অবশ্যই আপনি নবী। সে চলে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে আমাকে এমন সব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে, যে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাকে অবহিত করার পূর্ব পর্যন্ত আমার কোন জ্ঞানই ছিল না।
সহীহ বুখারীতে২৭০ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মদীনায় আগমনের সংবাদ এমন সময় পেয়েছেন, যখন তিনি বাগান হতে ফল তুলছিলেন। তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট গিয়ে বললেন, আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয় জিজ্ঞাসা করব, যা নবী ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। প্রথমটি হল, কিয়ামতের আলামত কি? দ্বিতীয়টি হল, জান্নাতীদেরকে সর্বপ্রথম কী খাবার দেওয়া হবে? তৃতীয়টি হল, সন্তান তার পিতা মাতার সদৃশ হয় কি করে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে জিবরীল আ. এখন এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত করে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বললেন, জিবরীল এসে অবহিত করলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, জিবরীলই আমাকে জানিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, ফিরিশতাদের জিবরীলতো ইহুদীদের দুশমন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন শরীফের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ ۖ قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ
যে কেউ জিবরীলের শত্রু এ জন্য যে, সে আল্লাহর নির্দেশে তোমার হৃদয়ে কুরআন পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ২৭১।
সুতরাং শুন তোমার প্রশ্নের উত্তর, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন তো হল অগ্নিগোলকের আবির্ভাব ঘটবে, যা পূর্ব হতে পশ্চিম সকল প্রান্তের মানুষদেরকে একত্রিত করবে আর জান্নাতীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশটুকু। সন্তান পিতা-মাতার সদৃশ হওয়ার কারণ হল, সহবাসের সময় যদি স্বামীর বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তাহলে সন্তান তার পিতৃকুলের সদৃশ হয়, যদি স্ত্রীর বীর্য স্বামীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে, তবে সন্তান তার মাতৃকুলের সদৃশ হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কোন মা'বুদ নেই, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল।
হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই ইহুদী এক অপবাদপ্রবণ জাতি। যদি আমার ব্যাপারে তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করার পূর্বে আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তারা জানতে পারে, তবে তারা আমার ব্যাপারে অপবাদ দিবে। সুতরাং আমার ব্যাপারে আপনিই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন। যখন ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এল, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তোমাদের মাঝে কেমন ব্যক্তি? তারা বলল, সে তো আমাদের অত্যন্ত পসন্দনীয় ব্যক্তি ও পসন্দনীয় ব্যক্তির পুত্র। সে তো আমাদের নেতা এবং নেতার পুত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি? তারা বলল, আল্লাহ তাআলা তাকে এর থেকে রক্ষা করুক। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বেরিয়ে এসে বললেন, أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أنك رسول الله
ইহুদীরা তাঁর মুখ থেকে এ কালিমা শুনে বলতে শুরু করল, সে তো আমাদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট ব্যক্তি ও নিকৃষ্ট ব্যক্তির ছেলে। তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালামের ব্যাপারে অনেক নিকৃষ্টতম ভাষা ব্যবহার করল। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এ বিষয়টিরই ভয় ছিল। সহীহায়নে'২৭২ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটি পাতলা রুটির ন্যায় হবে। প্রভু পরাক্রমশালী তা এমনিভাবে উলটপালট করবেন যেমনিভাবে তোমরা সফরে রুটি উলটপালট কর। তখন ইহুদীদের এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আবুল কাসেম! তোমার প্রতি আল্লাহ তাআলা বরকত অবতীর্ণ করুক। আমি কি আপনাকে কিয়ামত দিবসে জান্নাতীদের আপ্যায়ন সম্পর্কে বলব না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেন নয়? অবশ্যই বলবেন। সে বলল, সেদিন যমীন একটি রুটির ন্যায় হবে, সে ঠিক সেভাবেই বলল, যেভাবে তার আসার পূর্বে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে বলেছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন, তাতে মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গেল। অতপর সে বলল, আমি আপনাকে জান্নাতের তরকারী সম্পর্কে বললব না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই বলবে। বলল, তা হল উদম এবং নূন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা কি? সে বলল, ষাঁড় এবং এমন মাছ, যার কলিজার অতিরিক্ত অংশ সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদেরকে বলবেন, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। সকল অতিথির জন্য প্রাণী যবাহ করা হয়। আজ আমি তোমাদের জন্য যবাহ করব। এরপর ষাঁড় ও মাছ আনা হবে। আল্লাহ তাআলা সেগুলো যবাহ করে টুকরা টুকরা করে জান্নাতীর আপ্যায়ন করবেন।
টিকাঃ
২৬৯ খ. ১, পৃ. ১৪৬
২৭০. খ. ২ পৃ. ৬৪৩
২৭১. সুরা বাকারা, আয়াত: ৯৭
২৭২ বুখারী, খ ২ পৃ. ৯৬৫, মুসলিম খ. ২, পৃ. ৩৭১
📄 জান্নাতের সুগন্ধি ও সৌরভ
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন যিম্মিকে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যাবে। ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে২৭৩ স্ব-সনদে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম তাবারানীর বর্ণনা ও ইমাম বুখারীর বর্ণনায় শুধু এতটুকু পার্থক্য, ইমাম বুখারী রহ. জানাদাহ নামক এক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি এবং তাঁর বর্ণনায় একশত বছরের জায়গায় চল্লিশ বছরের কথা উল্লেখ আছে।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খবরদার! যে ব্যক্তি এমন কোন চুক্তিকারীকে হত্যা করল, যার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের যিম্মাদারী রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহর যিম্মাদারীকে ভঙ্গ করল। এমন ব্যক্তি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার সুঘ্রাণ সত্তর বছরের দূরত্ব হতেই পাওয়া যায়।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এ ব্যাপারে হযরত আবূ বকরাহ রা. হতে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীসটি সহীহ ও হাসান পর্যায়ের।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, উক্ত হাদীসের সনদ আমার মতে ইমাম বুখারীর বর্ণনা শর্ত মোতাবেক।
আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম তাবারানী রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, সেটি মারফু। তাতে রয়েছে, যে ব্যক্তি কোন চুক্তিকারীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ একশত বছরের দূরত্ব হতে তার ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ বাকরাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, জান্নাতের খুশু একশত বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। এই শব্দে উভয় বর্ণনার মাঝে কোনোভাবে বৈপরিত্য পাওয়া যায় না।
ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. স্ব-স্ব সহীহ গ্রন্থে২৭৪ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার চাচা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এ বিষয়টি তাঁর নিকট অত্যন্ত কষ্টকর মনে হত যে, কাফিরদের সাথে রাসূলুল্লাহর প্রথম যুদ্ধে আমি শরীক হতে পারি নাই। আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে এরপর কখনো রাসূলুল্লাহর সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সুযোগ দান করেন, তবে আমি দেখিয়ে দেব যে, আমি কি করতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওহুদের ময়দানে হযরত মু'য়ায বিন জাবাল রা. তাকে আসতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, আহ! জান্নাতের সুবাতাস কতই না চমৎকার! যা আমি ওহুদের পাদদেশে পাচ্ছি।
হযরত আনাস রা. বলেন, তিনি শত্রুদের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।
হযরত আনাস রা. বলেন, তাঁর শরীরে আশিটিরও অধিক তীর ধনুকের আঘাত ছিল। তাঁর বোন অর্থাৎ রবী বিনতে নাযারের ফুফী তার ভাইকে শুধু আঙ্গুলের মাথা দ্বারাই চিনতে পেরেছেন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয় رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ মু'মিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে২৭৫।
হযরত আনাস রা. বলেন, সাহাবায়ে কেরামের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, উক্ত আয়াত তার ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
উল্লেখ্য, জান্নাতের সুগন্ধি দু'প্রকার। এক প্রকার সুগন্ধি এমন দুনিয়াতেও যার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কখনো কখনো আত্মা তা অনুভব করতে পারে, যদিও বান্দার অনুভবে তা ধরা দেয় না।
অপর সুগন্ধি হল, যা কেবল দেহের নাসিকা রন্ধ্র দিয়ে ফুলের ঘ্রান অনুভব করার মত করে অনুভব করা যায়। এ প্রকার সুগন্ধি সকল জান্নাতীই লাভ করবে। নিকট ও দূর সকল স্থান থেকেই তা অনুভূত হবে।
দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ও রাসূলগণের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা করেন, তাঁকেই এ সুগন্ধির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
হযরত আনাস বিন নযর যে খোশবু অনুভব করেছেন, হতে পারে তা এ জাতীয় সুগন্ধি অথবা প্রথম প্রকারের সুগন্ধিও হতে পারে। والله اعلم ।
আবূ নাঈম রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব হতেও পাওয়া যায়।
তাবারানী রহ. হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সুগন্ধি একশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। আল্লাহর শপথ, মাতা-পিতার অবাধ্য ব্যক্তি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি এ সুঘ্রাণ পাবে না।
আবূ দাউদ তায়ালেসী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি পিতা ব্যতীত অন্যের দিকে নিজ বংশধারা যুক্ত করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ তার খোশবু পাঁচশত বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।
আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবীতে তাঁর বান্দাদেরকে জান্নাতের নিদর্শনাবলী হতে কিছু প্রত্যক্ষ করান। তন্মধ্যে রয়েছে জান্নাতের খোশবু, মনোপূত স্বাদ, সুন্দর ও মনোরম দৃশ্যাবলী, উত্তম ফল-ফলাদি, বিভিন্ন প্রকার নিআমত, আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও চোখের শীতলতা।
আবু নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার অধিবাসীদের জন্য সজীবতা ও সমৃদ্ধি রয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার সৌন্দর্য ও সজীবতা বৃদ্ধি করে দাও। সাহরীর সময় মানুষ যে শীতলতা অনুভব করে তা তারই অংশ। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আগুন ও তার কষ্ট এবং চিন্তা ও পেরেশানীকে আখিরাতের কষ্ট ও পেরেশানীর কথা স্মরণকারী হিসাবে তৈরী করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গরম-ঠাণ্ডা জাহান্নামের শ্বাস নেওয়ার কারণে হয়ে থাকে। সুতরাং আল্লাহ স্বীয় বান্দাকে জান্নাতের শ্বাসসহ সেখানকার স্মারক বস্তুসমূহ পৃথিবীতেই প্রত্যক্ষ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
والله المستعان
টিকাঃ
২৭৩. খ. ২ পৃ. ৪৪৬
২৭৪. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৩৯৩, মুসলিম, খ. ২ প. ১৩৯
২৭৫. সূরা আহযাব, আয়াত: ২৩
📄 জান্নাতে চিরশান্তির ঘোষণা
ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে২৭৬ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. ও হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এক ঘোষক ঘোষণা করবে, তোমরা অবশ্যই সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে, কখনো তোমাদেরকে কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানী স্পর্শ করবে না। ঘোষণাটি আল্লাহর সেই বাণীর মর্মার্থ وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ 0 জান্নাতীদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে২৭৭।
উসমান ইবনে আবি শাইবা হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম , RIIcon as وَنُودُوا أَنْ تِلْكُمُ الْجَنَّةُ أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ . এর ব্যাখ্যায় বলেন, তোমাদেরকে জানিয়ে দেয়া হবে, তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমরা সর্বদা নিআমতে নিমজ্জিত থাকবে। কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানীর ছোঁয়াও তোমাদের লাগবে না।
সহীহ মুসলিমে হযরত সুহাইব রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহর নিকট তোমাদের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তারা বলবে, কি সেই প্রতিশ্রুতি? তিনি তো আমাদের নেকের পাল্লা ভারী করে দিয়েছেন। আমাদের চেহারা শুভ্র ও ঔজ্জ্বল্যময় করেছেন। আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। (এ সকল নিআমত যেহেতু পেয়ে গেছি, তবে এমন আর কি প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট রয়েছে?) তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বড়ত্বের পর্দা উঠিয়ে নিবেন। আর জান্নাতীগণ আল্লাহ তাআলার দীদার লাভ করবে। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যে সকল নিআমিত প্রদান করেছেন তার থেকে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হবে আল্লাহর দীদার।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে আবূ তামীম হুযাইমী হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. কে বলতে শুনেছি। যখন তিনি বসরার মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসে জান্নাতীদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। সে বলবে, হে জান্নাতীগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দান করেছিলেন তা কি পূর্ণ করেছেন? তখন তারা অলংকারাদি, পোশাকাদী, প্রবহমান নদী, শুদ্ধাচারিণী রমণীকুল দেখতে পেয়ে বলবে, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই পূর্ণ করেছেন। তিনবার তারা এ কথা বলবেন। তখন তারা আশপাশে তাকিয়ে তা খুঁজবে; কিন্তু না পাওয়ার কোনো কিছুই চোখে পড়বে না। তখন ফিরিশতাগণ বলবেন, একটি বিষয় বাকী রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَة যারা মঙ্গলকর কার্য করে, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং আরো অধিক২৭৮।
জেনে রাখ, সেই মঙ্গল হচ্ছে জান্নাত আর অতিরিক্তটি হচ্ছে আল্লাহর দীদার।
সহীহায়নে২৭৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতীগণকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতীগণ! জান্নাতীগণ জবাবে বলবে, لبيك وسعديك হে আমাদের প্রভু! আমরা উপস্থিত, আপনার নির্দেশ পালনার্থে আমরা উপস্থিত। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে সে সব বস্তু দান করছেন যা আপনার মাখলুকের অন্য কাউকে দান করেননি, তবু কেন আমরা সন্তুষ্ট হব না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম বস্তু দান করব? জান্নাতীগণ বলবে, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! এর চেয়ে উত্তম নিআমত আর কি হতে পারে? আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমাদের জন্য আমার সন্তুষ্টিকে আবশ্যকীয় করে নিয়েছি, আমি কখনো তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হব না।
সহীহায়নে২৮০ হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর জাহান্নামীদের জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে, তখন একজন ঘোষক তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! কখনো মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যু কখনো তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। প্রত্যেকে যে যেখানে অবস্থান করছে, সেখানেই সর্বদা অবস্থান করবে। যদিও এ ঘোষণা জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থলে হবে, কিন্তু সকল জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী এ ঘোষণা শুনবে। জান্নাতীগণ যেদিন আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভ করবে, সেদিন তারা আরো একটি ঘোষণা শুনতে পাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের নিকট একজন ফিরিশতা পাঠাবেন। ফিরিশতা তাদের মাঝে আল্লাহ তাআলার দীদার লাভের ঘোষণা দিলে তারা ঠিক তেমনিভাবে দৌড়ে আসবে, যেমনিভাবে মুয়াযযিন জুমু'আর আযান দেওয়ার পর মানুষ জুমু'আর নামাযের জন্য দৌড়ে আসে।
টিকাঃ
২৭৬. খ. ২. পৃ. ৩৮০
২৭৭. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪৩
২৭৮. সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৬
২৭৯. বুখারী, খ. ২ পৃ. ৯৬৯, মুসলিম. খ. ২ পৃ. ৩৭৮
২৮০. বুখারী, খ. ২ প. ১১২১, মুসলিম, খঃ ২. পৃ. ৩৮২