📄 জান্নাতীরা আপন নিবাস দেখেই চিনে ফেলবেন
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনও তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না। তিনি তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন। তিনি তাদেরকে দাখিল করেন জান্নাতে, যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়ে ছিলেন।২৫৩
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহ. বলেন, জান্নাতীগণ স্ব-স্ব ভবন ও নিবাস এমনভাবে চিনে নিবে, তাতে কোন প্রকার ভুল-ত্রুটি হবে না। যেন সে আজন্ম সেখানেই বসবাস করেছে, এমনকি তারা কারো নিকট পথ-নির্দেশনাও চাবে না।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জুম'আর নামায আদায় করে ফিরে গিয়ে মানুষ যেমনিভাবে স্ব-গৃহ চিনে নেয়, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করে স্ব-স্ব নিবাস তদপেক্ষা ভালভাবে চিনে নিবে।
মুহাম্মদ ইবনে কা'ব বলেন, তোমরা জুম'আর নামায পড়ে ফিরে এসে যেমনিভাবে আপন গৃহ চিনে নাও জান্নাতীগণও ঠিক তেমনিভাবে স্ব-স্ব নিবাস চিনে নিবে। অধিকাংশ মুফাস্সিরের উক্তিও তাই। এসকল মতের সমষ্টি তা-ই, যা আবূ উবায়দা রহ. বলেছেন, عَرَّفَهَا لَهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতীগণ তাদের নিবাসকে কারো নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীতই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিনে নিবে।
হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা জান্নাতে আগে আগে হাঁটতে থাকবে আর লোকেরা তার পেছনে পেছনে চলতে থাকবেন। ফিরিশতা তার ভবনে প্রবেশ করে তাকে সকল বস্তুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। মু'মিন ব্যক্তি নিজ নিবাসে প্রবেশ করে স্ত্রীর নিকট পৌঁছলে ফিরিশতা ফিরে আসবেন।
সালামাহ ইবনে কুহায়ল রহ. বলেন, عرفها لهم এর অর্থ طرفها هم অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন পথ তৈরী করে রেখেছেন যে পথ ধরে তারা স্ব- স্ব- নিবাসে পৌছতে পারবে।
হাসান বসরী রহ. বলেন, পৃথিবীতে তো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতের বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ বর্ণনা করে শুনিয়েছেন। যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা সেই বর্ণনার আলোকে জান্নাত চিনে ফেলবে। এ মতানুযায়ী عَرَّفَهَا لَهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে তাদের নিকট জান্নাতের যে গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, তাদেরকে সে জান্নাতেই দাখিল করাবেন। عَرَّفَهَا لَهُمْ এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে উল্লিখিত মতামতগুলো সেক্ষেত্রে, যখন عرف শব্দটির শব্দমূল تعریف অর্থাৎ পরিচয় জ্ঞাপন হবে। কতক ভাষাবিদের মতে তার শব্দমূল হল عرف। উত্তম ও উন্নত সুগন্ধি, তখন বাক্যটির অর্থ হল طيها همঅর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য জান্নাতকে সুগন্ধিময় করে সৃষ্টি করেছেন। এর থেকেই উৎকলিত طعام معرف অর্থাৎ সুগন্ধিময় খাবার। এটি যুজাজ রহ.-এর উক্তি।
কেউ বলেন, عرف শব্দটির অর্থ হল অনুগামী অর্থাৎ জান্নাতের সুগন্ধি ও স্বাদসমূহ জান্নাতীদের অনুগামী-অধীনস্থ হবে। তবে প্রথম উক্তিটি অধিক গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআলা সকলকেই স্ব-স্ব মনযিল ও গৃহ চিনিয়ে দিবেন, যেন অন্যদিকে অতিক্রম না করে।
সহীহ বুখারীতে২৫৪ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একদল মু'মিন যখন জাহান্নام থেকে মুক্তি পাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও দোযখের মধ্যবর্তী একটি সেতুতে বাধা দেয়া হবে। সেখানে তারা পরস্পরে দুনিয়াতে যে বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন করেছে তার প্রতিশোধ নিবে। এরপর যখন সকল প্রকার বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন থেকে মুক্ত হবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। সেই সত্তার শপথ! যার কুদরতী হাতে আমার জীবন, তারা তখন জান্নাতে আপন নিবাসকে এত দ্রুত ও সহজে তেমনি করে চিনবে যতটা সহজে পৃথিবীতে আপন গৃহকেও চেনা সম্ভব হয় না।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যিনি আমাকে সত্য নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই সত্তার শপথ! তোমরা পৃথিবীতে তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিকেও ততটা চিন না যতটা জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশের পর স্বীয় স্ত্রী ও নিবাসকে চিনবে।
টিকাঃ
২৫৩. সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৪-৬
২৫৪. খ. ২, পৃ. ৯৭০
📄 জান্নাতে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আড়ম্বরপূর্ণ প্রবেশানুষ্ঠান
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত, তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।২৫৫
يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلى الرَّحْمَنِ وَفَدًا যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীদেরকে সম্মানিত মেহমান রূপে সমবেত করব।২৫৬
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلى الرَّحْمَنِ وَفَدًا আয়াতটি প্রসঙ্গে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন। হযরত আলী রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! وَفْدًا (ওফদ) তো আরোহী অবস্থাকেই বলে। (কিন্তু এখানে আরোহী অবস্থা কিভাবে হবে) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সত্তার শপথ! যার কুদরতী হাতে আমার জীবন, যখন তারা (জান্নাতীরা) কবর দেশ থেকে উত্থিত হবে, তখন তারা তাদের সামনে ডানা বিশিষ্ট শ্বেত-শুভ্র উষ্ট্রী দেখতে পাবে, যার হাওদা হবে স্বর্ণের। পায়ের ক্ষুরের ধারাগুলো পর্যন্ত ঔজ্জল্যমান ও স্বচ্ছ হবে। সে উষ্ট্রীগুলোর পদচিহ্নগুলোর ঔজ্জ্বল্য দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত দেখা যাবে। যখন জান্নাতের দরযায় পৌঁছবে, তখন ফটকের পাতার উপর লাল ইয়াকুতের শৃঙ্খল থাকবে, যার চতুর্পার্শ্বে সোনালী কাঠ রয়েছে। জান্নাতের দ্বার সংলগ্ন একটি বৃক্ষ থাকবে। যার শেকড় হতে দুটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে। যখন একটি হতে পানি পান করবে, তখন তার চেহারার প্রশান্তি ও সজীবতা প্রতিভাত হবে। আর অন্যটি হতে যখন ওযু করবে তখন তাদের কেশগুচ্ছ এতটাই ঝরঝরে হয়ে যাবে যে, আর কখনই এলোমেলো হবে না।
অতঃপর তারা শৃঙ্খল দ্বারা দরযায় আঘাত করলে সে আঘাতের শব্দ হুরদের কর্ণকুহরে ধ্বনিত হলে, তারা বুঝে ফেলবে যে তাদের স্বামীরা এসে গেছে। তখন তারা জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ককে দ্বার উন্মোচন করতে বললে দরযা খুলে দেওয়া হবে। যদি সে ব্যক্তি আল্লাহর পরিচয় পূর্বে না পেত, তবে তত্ত্বাবধায়ক ব্যক্তির চেহারায় দীপ্তি ও ঔজ্জ্বল্য দেখে সিজদায় লুটে পড়ত। তখন সে বলবে, আমি তোমারই তত্ত্বাবধায়ক, তোমার তত্ত্বাবধানের জন্য আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তখন সে তার পেছনে পেছনে চলতে চলতে এক পর্যায়ে স্বীয় স্ত্রীর নিকট পৌঁছে যাবে।
সেই জান্নাতী স্ত্রী নি:শব্দ পদে তাঁবুর ভেতর থেকে বাইরে বের হবে এবং তাকে বুকে জড়িয়ে প্রণয় বিজড়িত কণ্ঠে বলবে, তুমিই আমার ভালবাসা আর আমি তোমার ভালবাসা। আমি সর্বদা সন্তুষ্ট থাকবো, কখনো অসন্তুষ্ট হব না। আমি সর্বদা হৃষ্টচিত্ত ও প্রফুল্ল থাকব, কখনো অস্থির ও পেরেশান হব না। এখানে আমি চিরদিন থাকব, কখনো অন্য কোথাও যাব না।
অতঃপর সে তার বাসভবনে প্রবেশ করবে। এই ভবনের ফ্লোর থেকে ছাদের দূরত্ব এক লক্ষ গজ। মুক্তার মালা ও ইয়াকুত পাথর দ্বারা তা নির্মিত। সেগুলোর মাঝে কিছু পাথর থাকবে হলুদ। পাথরগুলো একটির সাথে অপরটির কোন সামঞ্জস্য নেই। অতঃপর সে সজ্জিত খাটের নিকট পৌঁছবে। সে খাটে সত্তরটি বিছানা থাকবে। সে বিছানার উপর সত্তর জন স্ত্রী শোভা পাবে। প্রত্যেক স্ত্রীর পরনে সত্তর জোড়া কাপড় থাকা সত্ত্বেও পায়ের গোছার হারের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। পূর্ণ এক রাত পরিমাণ সময় সে স্ত্রীদের সাথে কাম-প্রবৃত্তি পূর্ণ করবে। জান্নাতবাসীদের প্রাসাদের তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে | أنهار مِنْ مَاءٍ غَيْرِ أَسِن وَأنهار مِنْ عَسَلٍ مُصَفي
একটি নদী থাকবে নির্মল পানির, তাতে বিন্দুমাত্র ময়লা থাকবে না। কিছু আছে পরিশোধিত মধুর নদী, যা মৌমাছির পেট থেকে নির্গত নয় | وأنهار من خمر لَذَّةُ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارِ مِنْ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُه আরো থাকবে অতুলনীয় স্বাদ বিশিষ্ট সুরার নদী। আরো থাকবে কয়েকটি দুগ্ধ নদ, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, যা গাভীর পেট হতে নির্গত নয়।২৫৭
যখন জান্নাতী ব্যক্তির আহারের ইচ্ছা জাগবে, তখন তার সামনে সাদা পাখী এসে উপস্থিত হবে। পাখীর গা থেকে পালক তুলে তা ভুনা হয়ে পরিবেশিত হবে। জান্নাতী তার পাঁজর হতে খেতে আরম্ভ করবে। সে যেই স্বাদে খেতে চাবে তেমন স্বাদই পাবে। অতঃপর সে পাখী পুনরায় উড়ে চলে যাবে। এছাড়াও জান্নাতে ফল ঝুলতে থাকবে। যখন জান্নাতী ফল খাওয়ার ইচ্ছা করবে, তখন গাছের ডালটি এমনিতেই তার প্রতি ঝুঁকে পড়বে আর সে হেলান দিয়ে তার ফল খেতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانِ দুই উদ্যানের ফল নিকটবর্তী হবে এবং ফলগুলো ঝুলতে থাকবে। তার সামনে মুক্তার ন্যায় ঔজ্জ্বল্যমান সেবক থাকবে।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত নো'মান ইবনে সা'দ হতে يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا এ আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করে বলেন, আল্লাহর কসম! তারা পদব্রজে গমনকারীদের ন্যায় পদব্রজে একত্রিত হবে না বরং এমন উষ্ট্রীতে আরোহণ করে তারা একত্রিত হবে যা কখনো কোন মানব চক্ষু অবলোকন করেনি। সে উষ্ট্রীর পিঠে স্বর্ণের হাওদা থাকবে এবং তার বলগা হবে পোখরাজ পাথরের। জান্নাতী তাতে আরোহন করে জান্নাতের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছবে।
আলী ইবনে জা'দ তার জা'দিয়াতে স্ব-সনদে হযরত আলী রা. হতে বর্ণনা করেন, যে সকল লোক তাদের স্বীয় প্রভুকে ভয় করে, তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা জান্নাতের দরযায় পৌঁছলে একটি বৃক্ষ পাবে, যে বৃক্ষের মূল থেকে দুটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়েছে। তখন একটি প্রস্রবণের দিকে এমনভাবে ছুটবে, যেন তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে প্রস্রবণ হতে তারা পানি পান করলে তাদের পেটে কোন ময়লা ও অপবিত্রতা থাকবে না। অতঃপর তারা অন্য প্রস্রবণের দিকে ছুটে। সেখান থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে। তখন তাদের চেহারায় প্রশান্তি ও সজীবতার ছাপ দেখা যাবে। এরপর আর কখনো তাদের চেহারায় কোন পরিবর্তন হবে না। কখনো ধূলিমলিন হবে না। তাদের কেশগুচ্ছে কখনো বিক্ষিপ্ততার স্পর্শ লাগবে না; বরং এমন হবে, যেন তাতে তিল লাগানো হয়েছে। অতঃপর সে জান্নাতের প্রহরীদের নিকট পৌছে তাদের সালাম করলে প্রহরী তাকে বলবে, তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, তুমি পবিত্র। চিরদিনের জন্য তুমি এ জান্নাতে প্রবেশ কর।
হযরত আলী রা. বলেন, জান্নাতে প্রবেশ করার পর তার আশাপাশে বালক সেবকের দল তেমনিভাবে ঘুরঘুর করতে থাকবে, যেমনিভাবে কোন স্বজন অনেক দিন পর এলে শিশুরা তার পাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। তারা তাকে বলবে, আপনি সে সকল নিআমতের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যেগুলো আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। এরপর তাদের মধ্য হতে একজন সেবক তাকে নিয়ে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট অনিন্দ্য রূপসী কোনো এক স্ত্রীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলবে, অমুক এসে গেছে। দুনিয়াতে তার যে নাম ছিল, তাকে সে নামেই ডাকা হবে। সে বালক তাকে বলবে, তুমি কি তাকে দেখেছ? সে বলবে, হ্যাঁ, আমি তাকে দেখেছি। সে তো আমারই পেছনে পেছনে ছিল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়বে। এমনি অবস্থায় সে তার বাসভবনের নিকট এসে উপস্থিত হবে। অতঃপর বাসভবনে প্রবেশ করে দেখতে পাবে, তার ভিত্তি তৈরী হয়েছে মুক্তা পাথর দ্বারা। তার উপরে লাল, সবুজ, নীল, প্রত্যেক রংয়ের সুউচ্চ অট্টালিকা ও প্রাসাদ রয়েছে। ছাদের দিকে তাকালে দেখতে পাবে যেন বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় আলোকজ্জ্বল। যদি আল্লাহ তাআলা তা তার জন্য নির্ধারিত না করতেন, তবে তার আলো তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দিত। যখন সে মাথা ঝুঁকিয়ে উঁকি দেবে, তখন সে তার স্ত্রীদের ও সেখানে রাখা পান পাত্রসমূহ এবং সারি সারি করে বিছিয়ে রাখা গালিচা ও মখমলের বালিশ দেখতে পাবে। সেখানে হেলান দিয়ে বসে বলবে الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِيَ لَوْلَا أَنْ هَدَانَا اللَّهُ সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য, যিনি আমাদেরকে এ পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পথ না দেখালে আমরা কখনো এ পথ পেতাম না২৫৮।
তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, তোমরা সদা জীবিত থাকবে। কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সর্বদা এখানেই থাকবে, অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হবে না। সর্বদা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. স্ব-সনদে হযরত হুমাইদ ইবনে বিলাল রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, যখন কোন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে জান্নাতীদের আকৃতি প্রদান করা হবে। জান্নাতী পোশাক ও অলংকার পরিধান করানো হবে। সে ব্যক্তি তার স্ত্রী ও সেবকদের দেখতে পেয়ে এতটাই আনন্দে উদ্বেলিত হবে, যদি সেখানে মৃত্যু সম্ভব হত, তাহলে সে আনন্দের আতিশয্যে মৃত্যুবরণ করত। তাকে বলা হবে, তোমার এ আনন্দ সম্পর্কে তোমার অনুভূতি কি? তুমি কি জান, তোমার এ আনন্দ ক্ষণিকের নয়; বরং চিরস্থায়ী আনন্দ।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. আবূ আবদুর রহমান আল হাবালী রহ. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতী ব্যক্তি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তার সাথে এমন সত্তর হাজার সেবক সাক্ষাৎ করবে যারা হবে মুক্তার ন্যায়।
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. হযরত আবূ আব্দুর রহমান আল মুআফিরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতী ব্যক্তিদের জন্য দুসারি সেবক সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। যখন সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা তার পেছনে পেছনে চলতে থাকবে।
আবূ নাঈম রহ. আবূ সালামাহ রহ. এর সূত্রে যাহ্হাক রহ. হতে বর্ণনা করে বলেন, যখন জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তার আগে ফিরিশতা থাকবে, ফিরিশতা যখন তাকে তার গলিতে নিয়ে যাবে। তখন বলবে, তাকাও তো, কি দেখা যায়? সে বলবে, স্বর্ণ-রৌপ্যের অনেক প্রাসাদ ও অনেক সুহৃদ দেখতে পাচ্ছি। তখন ফিরিশতা বলবে, এ সবই তোমার। এমতাবস্থায় তারা পরিদৃষ্ট হবে এবং তারা তাকে অভ্যর্থনা জানাবে। সবদিক থেকে বলতে থাকবে, আমরা তোমারই জন্য। ফিরিশতা তাকে বলবে, হাঁটতে থাক এবং বলবে, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ? সে বলবে, শিবিরে অনেক সৈন্য দেখতে পাচ্ছি এবং অনেক সুহৃদ দেখতে পাচ্ছি। ফিরিশতা বলবে, এসবই তোমার। যখন সে তাদের সম্মুখে উপস্থিত হবে, তখন তারা তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবে, আমরা তোমারই জন্য।
সহীহায়নে২৫৯ হযরত সাহল ইবনে সা'দ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই আমার উম্মতের সত্তর হাজার অথবা বলেছেন, ষাট হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পরস্পরে মিলে মিলে একে অপরে হাত ধরাধরি করে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের সর্বশেষ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত প্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ঔজ্জ্বল্যময় হবে তাদের অবস্থা।
টিকাঃ
২৫৫. সূরা যুমার, আয়াত: ৭৩
২৫৬- সূরা মারয়াম, আয়াত, ৮৫
২৫৭. সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫
২৫৮. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪৩
২৫৯ বুখারী, খ. ২, পৃ. ৯৬৯, মুসলিম খ. ১ পৃ. ১১৬
📄 জান্নাতীদের দৈহিক সৌন্দর্য ও চরিত্র মাধুরিমা
২৬০ ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ. কে নিজ পসন্দনীয় আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দৈর্ঘ্য হল ষাট হাত। তাঁকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন, ফিরিশতাদের ঐ দলকে সালাম কর এবং তারা কি উত্তর দেয় তা শুন। তারা যে জবাব দেবে তাই হবে তোমার ও তোমার সন্তানদের সালাম ও জবাব।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হযরত আদম আ. গিয়ে বললেন, আসসালামু আলাইকুম (السلام عليكم) জবাবে তারা বললেন ওয়া রাহমাতুল্লাহ (ورحمة الله) অর্থাৎ তারা শুধু রাহমাতুল্লাহ (رحمة الله) শব্দটি বৃদ্ধি করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তিই জান্নাতে পবেশ করবে, সে-ই হযরত আদম আ. এর আকৃতিতে প্রবেশ করবে। হযরত আদম আ. ছিলেন ষাট হাত লম্বা; কিন্তু মানুষের অবয়ব খাটো হতে হতে বর্তমান আকৃতিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
২৬১ ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে লোমবিহীন (অবাঞ্ছিত লোম থেকে মুক্ত হয়ে) কুঞ্চিত কেশ বিশিষ্ট, কাজল কালো আঁখি বিশিষ্ট ও ৩৩ বছরের যুবক হবে। হযরত আদম আ.-এর ন্যায় ষাট হাত দৈর্ঘ এবং ষাট হাত প্রস্ত বিশিষ্ট হবে। কেউ কেউ বলেন, হাম্মাদ একাই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
জামে'তিরমিযীতে২৬২ শাহর ইবনে হাওশাবের মাধ্যমে আব্দুর রহমান ইবনে গানাম রহ. হযরত মু'আয রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে মাথা ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশে লোমবিহীন, কাজল কালো চোখ বিশিষ্ট ৩৩ বছরের যুবক হবে।
আবূ বকর ইবনে দাউদ স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ হযরত আদম আ.-এর আকৃতিতে হবে। তাদের বয়স ৩৩ বছরের কাছাকাছি হবে। মাথা ব্যতীত শরীরের অন্যান্য অংশে লোমবিহীন কাজল কালো চোখ বিশিষ্ট হবে। তাদেরকে জান্নাতের একটি বৃক্ষের নিকট পৌঁছে দেয়া হবে। তা থেকে তারা পোশাক পরিধান করবে, তাদের পোশাক কখনো পুরাতন হবে না, কখনো তাদের যৌবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে না।
ইমাম তিরমিযী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাত লাভকারী পৃথিবীতে ছোট থেকে মারা যাক কিংবা বড় হয়ে মারা যাক, তাকে জান্নাতে ২৩ বছরের যুবকে পরিণত করা হবে, সে চিরকাল এ বয়সেই থাকবে। জাহান্নামীদের অবস্থাও এমনি হবে।
উক্ত হাদীসের সাথে পূর্বোক্ত বর্ণনাগুলোর কোন বিরোধ নেই। (যদিও পূর্বোক্ত হাদীসে রয়েছে যে, ৩৩ বছরের যুবকে পরিণত করা হবে আর উক্ত হাদীসে রয়েছে ২৩ বছরের যুবকে পরিণত করা হবে, সুতরাং উভয়টার মাঝে বাহ্যত বিরোধ পরিলক্ষিত হয়) কারণ, আরবগণের অভ্যাস হল তারা দশকের পর কোন একক বৃদ্ধি পেলে কখনো তা উল্লেখ করে, কখনো তা উল্লেখ করে না। যারা একক উল্লেখ করেছেন, তারা ৩৩ বছর উল্লেখ করেছেন আর যারা একক উল্লেখ করেননি, তারা ২৩ বছর উল্লেখ করেছেন। এটি আরবদের ভাষায় প্রসিদ্ধ একটি রীতি।
ইবনে আবিদ দুনিয়া রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে হযরত আদম আ.-এর আকৃতি সমান অর্থাৎ ষাট হাত লম্বাকৃতির হবে। সৌন্দর্যের দিক থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর ন্যায় হবে। আর হযরত ঈসা আ. এর ন্যায় বয়স হবে ৩৩ বছর। (হযরত ঈসা আ. কে এ বয়সে আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছে।) বাক্যালাপে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায় সুমিষ্ট ভাষী হবে। শরীর হবে লোমহীন, চোখ হবে কাজল কালো।
ইবনে ওয়াহাব রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে হযরত আদম আ.-এর আকৃতির অর্থাৎ ষাট হাত লম্বা হবে। জান্নাতে তাদের জন্য সে হিসাবেই খাট তৈরী করা হয়েছে। পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, যারা জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবে তাদের আকৃতি হবে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায়। আর যারা তাদের নিকটবর্তী থাকবে তারা আকাশের জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল নক্ষত্র অপেক্ষাও আলোকোজ্জ্বল থাকবে। আর তাদের স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلْ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করব; তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে।২৬৩
সুতরাং আল্লাহ তাআলা জানালেন, তাদের পরস্পরে হৃদ্যতা থাকবে ও তারা পরস্পরে সামনা সামনি থাকবে।
সহীহায়নে২৬৪ বর্ণিত আছে, জান্নাতীদের অন্তর একাত্নর ন্যায় হবে (অর্থাৎ তাদের সকলের চাহিদা এক ধরনের হবে, কারো প্রতি কারো কোন প্রকার বিদ্বেষ থাকবে না) তারা তাদের পিতা আদম আ.-এর আকৃতিতে ষাট হাত লম্বা হবে। উক্ত বর্ণনায় خُلُق শব্দটির خاء এর মাঝে যবর হলে অর্থ হবে, বাহ্যিক আকৃতি আর خُلُق এর মাঝে যের হলে অর্থ হবে, চরিত্র। অর্থাৎ তারা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও বয়সের ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের হবে। যদিও সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হবে। তাদের স্বভাব চরিত্র ও অন্তরের ব্যাপারে বুখারীতে যে বর্ণনা এসেছে তাতে রয়েছে, জান্নাতীদের পরস্পরে কোন প্রকার বিরোধ থাকবে না। কারো প্রতি কারো কোন হিংসা বিদ্বেষ থাকবে না। তাদের অন্তর হবে একাত্মার ন্যায়, সকাল-সন্ধা তারা আল্লাহ তাআলার তাসবীহ পাঠ করবে। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা জান্নাতী মহিলাদের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন, তারা সমবয়সী হবে। কেউ বৃদ্ধা থাকবে না বরং সকলেই যুবতী থাকবে।
অবয়বের এ পরিমাণ দৈর্ঘ প্রস্থ ও একই পরিমাণ বয়স হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ হিকমত রয়েছে যা কারো কাছে অস্পষ্ট নয়। কেননা আত্মিক প্রশান্তি স্বাদ উপভোগের ক্ষেত্রে এ বয়স ও আকৃতিই সর্বাপেক্ষা অধিক উপযোগী ও পরিপূরক। এ দু'য়ের (বয়স ও অবয়ব) সমন্বয়ের ফলে এমন শক্তিশালী হবে, একদিনে একশত কুমারী রমণীর সাথে রতি ক্রিয়ায় মিলিত হতে পারবে।
দৈর্ঘ ও প্রস্থের ক্ষেত্রে এটিই অধিক উপযো। কেননা, এর চেয়ে কম বা বেশি হলে সমতা বিনষ্ট হবে। কেননা যদি দৈর্ঘ এ পরিমাণ হত কিন্তু প্রস্থ কম হত, তবে তাও অনুপযোগী ও কুশ্রী হত। সুতরাং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এটি সর্বাপেক্ষা উপযোগী।
টিকাঃ
২৬০. মুসনাদে আহমাদ খ.২ পৃ. ৩১৫
২৬১. মুসনাদে আহমদে খ. ২ পৃ. ২৯৫
২৬২. খ. ২, পৃ. ৮১
২৬৩ সূরা হিজর, আয়াত: ৪৭
২৬৪ বুখারী খ. ১ পৃ ৪২০, মুসলিম, খ. ২ প. ৩৭৯
📄 সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ
এ রাসূলগণ, তাদের মধ্যে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছে, যার সাথে আল্লাহ তাআলা কথা বলেছেন, আর কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। মারয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করেছি।
হযরত মুজাহিদ রহ. অন্যরা উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, مَّن كُلِّمَ اللهُ দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন, হযরত মূসা আ. আর رفع بعضهم درجات দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।
মি'রাজের ঘটনা বিবৃত হাদীসে রয়েছে (এটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনে কিরাম একমত) যখন মি'রাজ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মূসা আ.-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন হযরত মূসা আ. বললেন, হে প্রভু আমার! আমারতো ধারণা ছিল, আপনি অন্য কাউকে আমার উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবেন না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন স্থানে পৌঁছলেন যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কারো ধারণা নেই। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সে স্থান সম্পর্কে জানেন। এমনকি তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌছে গেলেন।
সহীহ মুসলিমে২৬৫ হযরত আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যখন মুয়াযিযন আযান দেয়, তখন তোমরাও তার সাথে আযানের বাক্যাবলী পুনরাবৃত্তি কর এবং আমার প্রতি দুরূদ পড়। যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরূদ পড়বে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন আর তোমরা আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা কর। ওসীলা হল, জান্নাতের এমন একটি স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজনই লাভ করবে, আমি আশাবাদী, আমিই হব সে ব্যক্তি। যে আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যাবে।
সহীহ মুসলিমে২৬৬ হযরত মুগীরাহ ইবনে শোবা রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মূসা আ. আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, জান্নাতে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের ব্যক্তি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সকল জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশের পর এক ব্যক্তি আসবে (যাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে) তাকে বলা হবে, জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! কিভাবে আমি জান্নাতে প্রবেশ করব? জান্নাতীগণতো নিবাস ও নেয়ার বস্তুগুলো নিয়ে নিয়েছে। তখন তাকে বলা হবে, তুমি কি চাও যে, তোমাকে সে পরিমাণ সম্পদ ও প্রাচুর্য প্রদান করা হোক, যে পরিমাণ সম্পদ ও প্রাচুর্য দুনিয়ার কোন বাদশাহকে প্রদান করা হয়। সে বলবে, আমি এতেই সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমাকে এ পরিমাণ ও এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি প্রদান করা হল। সে বলবে, প্রভু! আমি এতে সন্তুষ্ট।
মূসা আ. পুনরায় প্রশ্ন করলেন, জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরের ব্যক্তি কে? আল্লাহ তাআলা বললেন, সে হল ঐ ব্যক্তি, যার জন্য আমি নিজ কুদরতী হাতে সম্মানের বৃক্ষ রোপণ করেছি। তাতে এমন নিশানা লাগিয়ে দিয়েছি, যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি। এমনকি কোন মানব হৃদয়ে যার চিন্তাও উদয় হয়নি।
ইমাম তিরমিযী স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের হল সে ব্যক্তি, যার উদ্যান, সেবক, স্ত্রী, মসনদ ও খাট এ পরিমাণ জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকবে, যাকে এক সহস্র বছরেও অতিক্রম করা যাবে না। আর জান্নাতীদের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী সে ব্যক্তি, যে সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তাআলার দীদার লাভে সৌভাগ্যবান হবে। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضَرَةٌ إلى ربها ناظرة সেদিন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে ২৬৭।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি কেউ মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আর কেউ কেউ ইবনে উমর-এর পর মাওকূফ রেখেছেন। আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম তাবারানী তাঁর মু'জামে সনদ সহ উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাতে সর্বনিম্নস্তরের জান্নাতী ব্যক্তি জান্নাত লাভ করার পর তার নিআমতসমূহ দু'সহস্র বছর পর্যন্ত দেখেও শেষ করতে পারবে না। সে যেমনিভাবে নিকটবর্তী বস্তু দেখবে, তেমনিভাবে অতি দূরের বস্তুও দেখবে। তার স্ত্রীদেরকে, সেবকদেরকেও দেখবে এবং তার জন্য তৈরী খাটসমূহও দেখবে।
আবূ নাঈম রহ. হযরত ইবনে উমর রা.-এর হাদীসটি ছুওয়াইর হতে ইসরাঈল-এর সনদে বর্ণনা করেছেন। ছুওয়াইর বলেন, ইবনে উমর এ হাদীসটি মারফুই বর্ণনা করেছেন।
ইমাম আহমদ রহ.২৬৮ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের জান্নাতীর তিনশত সেবক থাকবে। তাকে সকাল-সন্ধ্যা তিনশত বাটিতে করে খাবার প্রদান করা হবে। প্রত্যেক বাটির খাবারের রং ও স্বাদ থাকবে ভিন্ন ভিন্ন। সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি বাটির খাবারেই স্বাদ আস্বাদন করবে। আমার জানামতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে বাটিগুলো হবে স্বর্ণের। তাকে তিনশত পাত্রে পানীয় দেওয়া হবে। প্রত্যেক পাত্রের পানীয়ের রং ও স্বাদ ভিন্ন ভিন্ন হবে। সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক পাত্রের পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করবে। তাকে দুনিয়ার স্ত্রী ব্যতীত আরো ৭২জন হুর স্ত্রী দেয়া হবে। প্রত্যেক হূরের বসার জন্য মাইল খানেক জায়গার প্রয়োজন পড়বে।
আমি (ইবনুল কায়্যিম) বলব, ইমাম নাসাঈ উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী সাকিন ইবনে আবদুল আযীযকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। আর এ হাদীসের অন্য বর্ণনাকারী শাহর ইবনে হাওশাব তো প্রসিদ্ধ দুর্বল রাবীদের অন্তর্ভুক্ত। এ হাদীসটি মুনকার, সহীহ হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ। কেননা, ষাট গজ বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গীর বসার জন্য মাইল খানেক জায়গার প্রয়োজন কোনো মতেই হতে পারে না।
আর সহীহায়নে যে বর্ণিত রয়েছে, জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী কাফেলার প্রত্যেক সদস্যের জন্য দু'জন করে হুর থাকবে। তাহলে এটা কি করে হয়, সর্বনিম্ন জান্নাত লাভকারী ব্যক্তি ৭২জন স্ত্রী লাভ করবে। অথচ জান্নাতে তো দুনিয়ার মহিলা অনেক কম হবে, তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তি একদল স্ত্রী লাভ করবে। তাছাড়া স্বর্ণের জান্নাত দু'টি রৌপ্যের জান্নাত দু'টি অপেক্ষা উন্নতমানের ও উচ্চ মর্যদাশীল হবে। তাহলে এটা কি করে হয়, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতী ব্যক্তিই স্বর্ণের জান্নাত লাভ করবে।
দুলাবী রহ. বলেন, শাহর ইবনে হাওশাব তার বর্ণিত হাদীস অন্যদের মত বর্ণনা করেননি।
ইবনে আওন রহ. বলেন, লোকজন শাহর ইবনে হাওশাবের হাদীস বর্জন করেছে। ইমাম নাসাঈ ও ইবনে আদী রহ. বলেন, শাহর ইবনে হাওশাব নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী নয়।
আবূ হাতিম রহ. বলেন, তার বর্ণিত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না। শো'বা রহ. ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ রহ. তাকে বর্জন করেছেন। অথচ তাঁরা উভয়ে হাদীস সহীহ ও যইফ হওয়া সম্পর্কে অধিক অবগত। যদিও কেউ কেউ শাহর ইবনে হাওশাবকে নির্ভরযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু শাহর ইবনে হাওশাব এমন স্তরের বর্ণনাকারী, যেই স্তরের বর্ণনাকারীরা যদি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত কিছু বর্ণনা করে, তাহলে তা পরিত্যাজ্য হয়। والله اعلم
টিকাঃ
২৬৫ খ. ১, পৃ. ১৬৬
২৬৬ খ. ১. পৃ. ১০৬
২৬৭. সূরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২২-২৩
২৬৮. মুসনাদে আহমদ খ. ২. পৃ. ৩১৭