📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের ধুলি মাটি কস্তুর ও উদ্ভিদ কেমন হবে?

📄 জান্নাতের ধুলি মাটি কস্তুর ও উদ্ভিদ কেমন হবে?


ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার দর্শনে আমার হৃদয় বিগলিত হয়, পার্থিবতা বিমুখী হয়ে পরকালের চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়ি। কিন্তু যখন আপনার দর্শন হতে দূরে থাকি তখন পার্থিব জগত প্রিয় হয়ে পড়ে। স্ত্রী-পরিজন ও সন্তান-সন্ততিতে ডুবে যাই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমরা সর্বাবস্থায় আমার সম্মুখের আবস্থায় থাকতে, তাহলে ফিরিশতাগণ তোমাদের সাথে মোসাফাহ করত, সাক্ষাতের জন্য তোমাদের ঘর পর্যন্ত যেত। যদি তোমরা পাপ না কর তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্থলে এমন জাতি সৃষ্টি করবেন, যারা পাপ করবে, আবার আল্লাহর নিকট মাফ চাবে। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, আমি বললাম, আমাকে জান্নাতের অট্টালিকা ও প্রাসাদ সম্পর্কে বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতের অট্টালিকার একটি ইট স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার কাদা হবে কস্তুরির ও পাথরকণা হবে মুক্তার এবং মৃত্তিকা হবে যাফ্রানের। যে ব্যক্তিই তাতে প্রবেশ করবে সে বিভিন্ন প্রকার নিআমত লাভ করবে। কেউ কোন প্রয়োজন অনুভব করবে না। তাতে চিরস্থায়ী থাকবে। কেউ মৃত্যুবরন করবে না। তাতে পোশাকাদী পুরাতন হবে না। যৌবনের অবসান ঘটবে না। তিনি আরো বলেন, তিন ব্যক্তির দু'আ প্রত্যাখ্যাত হয় না। ন্যায়-পরায়ণ বাদশাহ, রোযাদার ব্যক্তি ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত এবং মাযলুম তথা নির্যাতিত ব্যক্তি। তিনি বলেন, মাযলুমের দু'আ মেঘমালার উপরে উঠানো হয় এবং তার জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব যদিও বিলম্বে হয়।

আবূ বকর ইবনে মারদুইয়া স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জান্নাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সারা জীবন জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। নিআমত লাভ করতে থাকবে, কোন প্রয়োজন অনুভব করবে না। পোশাকাদী পুরাতন হবে না, যৌবনের অবসান ঘটবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পুনরায় তার অট্টালিকা এবং প্রাসাদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তার একটি ইট হবে স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার কাদা হবে সুগন্ধি বিচ্ছুরণকারী কস্তুরির ন্যায়, পাথরকণা হবে মুক্তার এবং মৃত্তিকা হবে যাফরানের।

ইয়যিদ ইবনে যুরাই রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের একটি ইট হবে স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার মৃত্তিকা হবে যাফরানের আর কাদা হবে কস্তুরির।

সহীহায়নে২৪১ হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ যারর রা. হাদীস বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করে মুক্তার গম্বুজ দেখতে পেলাম, তার মৃত্তিকা কস্তরির। এটি মি'রাজ সংক্রান্ত হাদীসটির অংশ বিশেষ।

ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় গ্রন্থ মুসলিমে২৪২ স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে সায়্যাদকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন, তা শুভ্র ময়দার ন্যায় অকৃত্রিম মুক্তা হবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে এ কথাটি সঠিক বলেছে। আবূ বকর ইবনে আবূ শাইবাহ রহ. স্ব-সনদে আবূ নুসরা হতে বর্ণনা করেন, ইবনে সায়্যাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তা হবে শুভ্র ময়দার ন্যায় কস্তুরি।

হযরত সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ রহ. হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলে, হে মুহাম্মদ! আজ আপনার সাথী পরাজিত হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিসে পরাজিত হয়েছে? উত্তরে সে বলল, এক ইয়াহুদী তাকে প্রশ্ন করল, জাহান্নামের প্রহরী সংখ্যা কত? আপনার সাথী উত্তরে বলল, আমি আমাদের নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত বলতে পারব না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, সে জাতি কি পরাজিত হতে পারে? যারা অজানা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বলে, আমাদের নবীর নিকট জেনে বলব। কিন্তু ইহুদীরাতো আল্লাহর দুশমন, তারা স্বীয় নবীর নিকট আল্লাহর দর্শনের দাবী জানিয়েছে। আল্লাহর দুশমনদেরকে আমার নিকট নিয়ে আস! আমি তাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করব, তা হল ময়দার ন্যায় শুভ্র। অতঃপর ইহুদীরা এসে জিজ্ঞাসা করল, হে মুহাম্মদ! জাহান্নামের প্রহরীর সংখ্যা কত? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'বার উভয় হাতের অঙ্গুলি প্রসারিত করে ইঙ্গিত করলেন। তবে দ্বিতীয় বার একটি অঙ্গুলী বন্ধ রাখলেন অর্থাৎ বুঝালেন, জাহান্নামের প্রহরী সংখ্যা উনিশজন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, জান্নাতের মাটি কেমন হবে? তারা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল। এরপর বলল, তা হবে রুটির ন্যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রুটি হল শুভ্র ময়দা দ্বারা তৈরী।

জান্নাতের এ তিনটি গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য এমন যে, এগুলোতে পারস্পরিক কোন দ্বন্দ্ব নেই। সালাফীদের একদল বলেন, তার মাটি হবে কস্তুরি ও যাফরানের সমন্বিত।

আবূ বকর ইবনে আবূ শাইবা রহ. স্ব-সনদে মুগীছ বিন সামী রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জান্নাতের মাটি হবে কস্তুরি ও যাফরানের সমন্বিত।

এর আরো দুটি অর্থের অবকাশ রয়েছে। একটি হল, মাটি হবে যাফরানের। তবে যখন তাকে পানি মিশ্রিত করে গদ তৈরী করা হবে, তখন তা কস্তুরিতে রূপান্তরিত হবে আর তুরাব (تراب) শব্দটি দ্বারা ভেজা মাটিকেই বুঝানো হয়েছে। হাদীসে ব্যবহৃত শব্দাবলীও এ অর্থই নির্দেশ করে। যেমন المسك ملاطها অর্থাৎ তার কাদা হবে কস্তুরির। হযরত আলা ইবনে যিয়াদ হতে বর্ণিত হাদীসও একথা নির্দেশ করে। যাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, ترابها الزعفران وطينها المسك 1 অর্থাৎ তার শুষ্ক মাটি হবে যাফরানের এবং ভেজা মাটি হবে কস্তুরির; সুতরাং জান্নাতের শুষ্ক মাটি এবং পানি সবই যেহেতু সুগন্ধিময়, তাই উভয়টার সম্মিলনে ভিন্ন এক প্রকার সুগন্ধিতে রূপান্তরিত হয়ে মিশকে পরিণত হবে। দ্বিতীয় অর্থ হল, রং-এর দৃষ্টিকোণ থেকে তো তা যাফরানের মত হবে তবে সুগন্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে তা কস্তুরির ন্যায় হবে। সৌন্দর্য ও শোভায় যাফরানের মত হওয়া আর সুগন্ধিতে কস্তুরির ন্যায় হওয়া অত্যন্ত চমৎকার বিষয়।

হযরত মুজাহিদ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহ. ও আবূ নুযাইহ রহ.-এর মাধ্যমে এ অর্থ বর্ণনা করেছেন। জান্নাতের যমীন হবে রৌপ্যের আর তার মাটি হবে করর অর্থাৎ তার রং হবে রৌপ্যের আর সুগন্ধি হবে কস্তুরির।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের জমীন হবে শুভ্র, তার মাটি হবে কপূর প্রস্তরের, তাকে কস্তুরি বালুর ঢিবির ন্যায় বেষ্টন করে আছে। তাতে প্রবহমান নহর রয়েছে। সেখানে উঁচু-নিচু সর্বস্তরের জান্নাতীগণ একত্রিত হয়ে পরস্পরে পরিচিত হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তাতে রহমতের সমীরণ বইয়ে দিলে কস্তুরির ন্যায় তার সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকবে। তখন জান্নাতীগণ স্বীয় স্ত্রীদের নিকট গিয়ে তাদের সৌন্দর্য ও রূপলাবণ্য বৃদ্ধি পেতে দেখে বলবে, আমি যখন তোমার নিকট থেকে গিয়েছিলাম, তখনো তোমাকে পসন্দ করতাম কিন্তু এখন তোমাকে আরো অধিক পসন্দ করি।

ইবনে আবী শাইবা স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জান্নাতের প্রাসাদ ও অট্টালিকাসমূহ কেমন হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, এক ইট স্বর্ণের ও অপর ইট রৌপ্যের হবে, তার কাদা হবে বিচ্ছুরিত কস্তুরির ন্যায় আর পাথরকনা হবে মুক্তা ও ইয়াকুত পাথরের এবং মাটি হবে যাফরানের।

আবূ শাইখ স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আদনকে স্বীয় কুদরতী হাতে তৈরী করেছেন। তার একটি ইট হবে স্বর্ণের অপর ইট রৌপ্যের। তার অট্টালিকা তৈরীর মসলা বিচ্ছুরিত কস্তরি দ্বারা তৈরী করা হবে এবং তার মাটি হবে যাফরানের আর পাথরকণা হবে মুক্তার। আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে কথা বলতে বললে, তা বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ নিশ্চয় সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ। তখন ফিরিশতাগণ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বলবেন, তুমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, তুমিই হবে অধিপতিদের নিবাস।

আবূশ-শাইখ স্ব সনদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে রাতে আমাকে ঊর্ধ্বলোকে আরোহন করানো হল সে রাতে আমি জিবরীলকে বললাম, তারাতো অবশ্যই আমার নিকট জান্নাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। তখন জিবরীল বললেন, আপনি তাদেরকে বলবেন, জান্নাত হল, শ্বেতশুভ্র মুক্তরাজি দ্বারা তৈরী। আর তার যমীন হবে স্বর্ণের।

যদি এ হাদীসটি মারফু হয়, তবে সোনালী যমীন বিশিষ্ট জান্নাত বলতে জিবরীল আ. সর্বোত্তম জান্নাত দু'টির কথাই বুঝিয়েছেন ।

টিকাঃ
২৪১. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৫১, মুসলিম, খ. ১, পৃ, ৯৩
২৪২. খ. ২ প. ১৯৮

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতে আলোকসজ্জা

📄 জান্নাতে আলোকসজ্জা


আহমদ ইবনে মানসূর রামাদী রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে শ্বেতশুভ্র করে তৈরী করেছেন। আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাপেক্ষা পসন্দনীয় ও প্রিয় পোশাক হল সাদা পোশাক। সুতরাং তোমরা জীবিতাবস্থায়ও তা পরিধান কর এবং মৃতদেরকেও তা দ্বারা কাফন দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরীর রাখালদের একত্রিত করার নির্দেশ প্রদান করলে তাদেরকে একত্রিত করা হল। তাদের উদ্দেশ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের যাদের শুধু কালো বকরী আছে তোমরা সেগুলোর সঙ্গে সাদা বকরী যোগ করে নাও। এরপর জনৈক মহিলা এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কালো বকরী খরীদ করেছি; কিন্তু আমার মনে হয় সেগুলোতে বৃদ্ধি হবে না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেগুলোর সাথে সাদা বকরীও যোগ করে নাও।

আবূ নাঈম স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস হতে মারফু হাদীস বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে শ্বেতশুভ্র করে সৃষ্টি করেছেন। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সকল রং অপেক্ষা সাদা রংই অধিক প্রিয়। সুতরাং তোমরা জীবিতরাও সাদা পোশাক পরিধান কর এবং মৃতদেরকেও সাদা কাপড়ে কাফন দাও। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সাদা পোশাক পরিধান কর, কেননা আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে শ্বেতশুভ্র করে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমরা জীবিতরাও সাদা পোশাক পরিধান কর এবং মৃতদেরকে ও সাদা পোশাকে কাফন দাও।

ইমাম বুখারী রহ. এর সনদে যামীল ইবনে সিমাক হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার পিতা সিমাক বর্ণনা করে বলেছেন, হযরত ইবনে আব্বাস রা. যখন জীবনের শেষ লগ্নে অন্ধ হয়ে যান, তখন আমি মদীনায় তাঁর সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে প্রশ্ন করলাম, হে ইবনে আব্বাস! জান্নাতের যমীন কিরূপ হবে? তিনি বললেন, কোমল শুভ্র রৌপ্যের ন্যায় হবে যেন তা আয়না। আমি পুনরায় বললাম, তার উজ্জ্বলতা কিরূপ হবে? তিনি বললেন, তুমি কি সূর্যদয়ের পূর্ব মুহূর্তটি দেখনি? সে কি মন মুগ্ধকর স্নিগ্ধ আলোময় দিগন্ত! জান্নাত তেমনি হবে। তবে সেখানে সূর্যের প্রখরতা থাকবে না আবার সূর্যহীনতার হিমশীতলতাও থাকবে না।

মুসনাদে আহমাদে২৪৩ হযরত লকীত ইবনে আমির রা. হতে দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সূর্য ও চন্দ্র দুটোকেই বিলীন করে দেওয়া হবে। জান্নাতে কোনটিকেই দেখা যাবে না। হযরত লাকীত রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তবে আমরা কিভাবে দেখব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই মুহূর্তে তোমার দৃষ্টি দিয়ে যেভাবে দেখছ, তেমনি দেখবে। মেঘহীন আকাশে উজ্জ্বল সৌন্দর্যের সূর্য উদয়ের পূর্ব মুহূর্তে স্নিগ্ধ আলোময় দিগন্তের ন্যায় জান্নাত সদা আলোময় থাকবে।

২৪৪ ইবনে মাযাহ রহ. স্ব সনদে হযরত উসামা বিন যায়েদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খবরদার, তোমাদের কেউ কি জান্নাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে? নিশ্চয়ই জান্নাত এমন এক স্থান, যেখানে কোন প্রকার অস্থিরতা ও পেরেশানী থাকবে না। কা'বার প্রভুর কসম! জান্নাত হবে উজ্জ্বল-স্বচ্ছ, সুঘ্রাণযুক্ত ঘাস তাতে দোল খেতে থাকবে। সুদৃঢ় প্রাসাদ থাকবে। প্রবহমাণ নহর থাকবে। অনিন্দ রূপ লাবণ্যময় রমনীকুল থাকবে। সংখ্যাতীত জোড়া জোড়া পোশাক-পরিচ্ছদ থাকবে। তা হবে চিরস্থায়ী নিবাস ও শান্তির নিকেতন। সুশোভিত সুউচ্চ প্রাসাদে ফলফলাদি সহ সবুজাভ স্বাচ্ছন্দতা ও বিভিন্ন প্রকার নিআমত থাকবে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা জান্নাতের প্রস্তুতি নিচ্ছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ বলো, সাহাবায়ে কিরাম বললেন, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২৪৩. খ. ৪ পৃ. ১৪
২৪৪. পৃ. ৩২১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের প্রাসাদ ও বিভিন্ন স্থাপনা

📄 জান্নাতের প্রাসাদ ও বিভিন্ন স্থাপনা


لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ :আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তবে যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য আছে বহু প্রাসাদ, যার উপর নির্মিত আরো প্রাসাদ, ২৪৫

আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রাসাদের উপর আরো প্রাসাদ থাকবে, তার নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে গেছে। যেন আত্মায় এ ধারণা সৃষ্টি না হয় যে, এগুলো শুধুই উপমা আর উদাহরণমাত্র। সেখানে এর কিছুই তৈরী করা হয়নি। সে প্রাসাদগুলি একটি অপরটি অপেক্ষা উঁচু হবে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করে দিলেন, সেগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা এমন বর্ণনাধারা অবলম্বন করলেন যেন শ্রোতাবর্গ চর্মচক্ষে তার সম্মুখে প্রত্যক্ষ করছে। مُشَيَّدَةٌ শব্দটি প্রথম ও দ্বিতীয় غُرَفٌ এর সিফাত অর্থাৎ তার ভবনগুলো হবে উঁচু উঁচু, সেগুলোর উপরে অপেক্ষাকৃত আরো উঁচু ভবনও থাকবে।

وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ :আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন عِنْدَنَا زُلْفِي إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضَّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْقُرْفَاتِ أَمَنُونَ তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয়, যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দিবে। তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই তাদের কর্মের জন্য পাবে বহুগুণ পুরস্কার; আর তারা প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।২৪৬

يغفر لكم ذنوبكم ويدخلكم جنات تجري من تحتها الأنهار ومساكن طيبة في جنات عدن আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করাবেন এমন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত রয়েছে এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহ।২৪৭

আল্লাহ তাআলা ফিরআওনের স্ত্রীর (আসিয়া) ব্যাপারে বলেন, সে বলল, رب ابن لي عندك بيتا في الجنة হে আমার প্রতিপালক! তোমার নিকট জান্নাতে আমার জন্য একটি বাসগৃহ নির্মাণ করো।২৪৮

ইমাম তিরমিযী রহ. স্বীয় জা'মেতে স্ব-সনদে হযরত আলী রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন এমন প্রাসাদ রয়েছে যেগুলোর অভ্যন্তর বাইর থেকে এবং বহিরাংশ ভিতর থেকে দেখা যাবে। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারা সে সকল প্রাসাদ লাভ করবে? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সকল লোকই এসকল প্রাসাদের অধিকারী হবে যারা সুভাষী এবং উত্তম বাক্যালাপ করবে এবং দুস্থ ও দরিদ্রের আহার দান করবে এবং অধিকহারে রোযা পালন করবে এবং রাতের সে অংশে নামাযরত থাকবে যখন মানুষ নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে।

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি গরীব পর্যায়ের। কেননা, এটি একমাত্র আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাকের সনদেই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ মালিক আশআরী রা. হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন এমন প্রাসাদ রয়েছে যেগুলোর অভ্যন্তর বাইর থেকে এবং বহিরাংশ ভেতর থেকে দেখা যাবে। সে সকল প্রাসাদ আল্লাহ তাআলা এমন সব লোকদের জন্য তৈরী করেছেন যারা দুস্থ ও দরিদ্রের আহার দান করে, অধিকহারে রোযা পালন করে, রাতের সে অংশে নামাযরত থাকে যখন মানুষ নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে।

ইবনে ওয়াহাব রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন এমন প্রাসাদ রয়েছে যেগুলোর অভ্যন্তর বাইর থেকে এবং বহিরাংশ ভিতর থেকে দেখা যাবে। হযরত আবূ মালিক আশআরী রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে সকল প্রাসাদ কাদের জন্য তৈরী করা হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে লোকদের জন্য, যারা সুভাষী ও উত্তম বাক্যালাপ করবে, দুস্থ ও দরিদ্রের আহার প্রদান করবে, নামায অবস্থায় রাত পার করবে যখন সকল মানুষ নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে।

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ রহ. বলেন, উক্ত হাদীসের সনদ আমার নিকট হাসান পর্যায়ের। এ সংক্রান্ত হযরত আবূ মালিক রহ.-এর হাদীস ইতোপূর্বেও আমার নিকট পৌঁছেছে, যা এর বিশুদ্ধতার নির্দেশক। ইতোপূর্বে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর হাদীসও উল্লিখিত হয়েছে যা মুহাদ্দিসীনে কিরামের সর্বসম্মতিক্রমে সহীহ। তাতে রয়েছে, জান্নাতীরা প্রাসাদবাসীকে তেমনি দেখতে পাবে যেমনি আকাশের দিগন্তে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র তোমরা দেখতে পাও।

সহীহায়নে২৪৯ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মু'মিনের জন্য জান্নাতে জোড়াবিহীন পুরো মুক্তার একটি ষাট মাইল দীর্ঘ শিবির থাকবে। মু'মিনগণ তার অধিবাসীদের নিকট ঘুরতে থাকবে। কিন্তু কেউ কাউকে সেখানে দেখতে পাবে না। বুখারী শরীফে দুটি বর্ণনা রয়েছে। এক বর্ণনা মতে উচ্চতা ত্রিশ মাইল, অন্য বর্ণনায় ষাট মাইল।

পূর্বে সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তষ্টিকল্পে মসজিদ করল, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরী করবেন।

হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,২৫০ কোন ব্যক্তির সন্তান মৃত্যুবরণ করলে যদি সে অবস্থায় সে ব্যক্তি إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ )ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) পড়ে ও আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগাণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে বলেন, আমার বান্দার জন্য জান্নাতে প্রাসাদ তৈরী কর। বায়তুল হামদ করে তার নাম করণ কর।

সহীহায়নে২৫১ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা রা. হযরত আবূ হুরায়রা রা. ও হযরত আয়শা সিদ্দীকা রা. হতে বর্ণিত আছে। জিবরীল আ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আপনার স্ত্রী খাদিজা রা. কে আপনার প্রভুর পক্ষ হতে সালাম জানিয়ে দিন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে হীরা-মোতি-পান্নার এমন প্রাসাদের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কোন প্রকার হৈ-হুল্লোড় হবে না ও কোন প্রকার ক্লান্তি স্পর্শ করবে না।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে মুক্তার এমন প্রাসাদ থাকবে যাতে কোন প্রকার ফাটল নেই এবং কোন প্রকার দুর্বলতা নেই। আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধু হযরত ইবরাহীম আ.-এর জন্য সে প্রাসাদ তৈরী করেছেন।

সহীহায়নে২৫২ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করে স্বর্ণের নির্মিত এক প্রাসাদের নিকট পৌঁছে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কার প্রাসাদ? ফিরিশতাগণ বললেন, এটি এক কুরায়শী যুবকের। আমি ভাবলাম আমিই সেই যুবক। আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, কে সে যুবক? ফিরিশতাগণ বললেন, তিনি হলেন উমর ইবনুল খাত্তাব অর্থাৎ এটি উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রাসাদ।

হযরত জাবির রা.-এর বর্ণিত হাদীসের ভাষ্য হল, আমি স্বর্ণ নির্মিত চতুর্ভুজ বিশিষ্ট উঁচু প্রাসাদের নিকট পৌছলাম। ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে একটি হাদীস বর্ণানা করেছেন। যেখানে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি শ্বেতশুভ্র প্রাসাদের নিকটে পৌছলে হযরত জিবরীল আ. কে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কার প্রাসাদ? জবাবে বললেন, এক কুরায়শী ব্যক্তির। আমার আশা ছিল, আমিই সে ব্যক্তি। কেননা, আমি তো কুরায়শী। তখন জিবরীল আ. বললেন, এটি উমর ইবনুল খাত্তাবের প্রাসাদ। উক্ত হাদীসে শ্বেত ও শুভ্রতা দ্বারা উদ্দেশ্য হল তার ঔজ্জ্বল্যতা। আল্লাহ ভালো জানেন।

হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, স্বর্ণ নির্মিত প্রাসাদ কেবলমাত্র নবী, পরম সত্যবাদী, শহীদগণ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাগণই অর্জন করবেন। আ'মাশ স্ব-সনদে হযরত মাগীছ ইবনে সামী হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জান্নাতে স্বর্ণ, রৌপ্য, মুক্তা, ইয়াকুত ও পান্নার প্রাসাদ থাকবে।

আ'মাশ রহ. হযরত উবাইদ ইবনে উমাইর রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের জান্নাতীর জন্য মুক্তা নির্মিত এমন ভবন থাকবে যাতে কক্ষ ও দরযা থাকবে।

ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন প্রাসাদ রয়েছে, যাতে কেউ বসবাস করলে তার কাছে যেমন পেছনের বস্তু অজ্ঞাত থাকবে না। তেমনি পেছন দিকে বাস করলেও মাঝখানের বস্তু গোপন থাকবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারা এ প্রাসাদ লাভ করবে? উত্তর দিলেন, সে সকল লোক এসব প্রাসাদ লাভ করবে, যারা সুভাষী ও উত্তম বাক্যালাপ করে। অধিক হারে রোযা পালন করে ও দুস্থ-দরিদ্রকে আহার দান করে। সালামের বিস্তার ঘটায় এবং যখন মানুষ নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে তখন তারা নামাযে রত থাকে। সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, তাইয়্যেবুল কালাম তথা সুভাষণ দ্বারা উদ্দেশ্য কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হল সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার এ কালিমাগুলো কিয়ামত দিবসে সামনে ও পেছনে ফিরিশতাদের জামাত সহকারে উপস্থিত হবে। এরপর প্রশ্ন করা হল, وصال الصيام (বিসালুস সিয়াম) দ্বারা উদ্দেশ্য কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি রমযানে পূর্ণ রোযা রাখে ও পরবর্তীতে সুযোগ পেয়ে রোযা রাখে, এটাই وصال الصيام এর উদ্দেশ্য।

আবার জিজ্ঞাসা করা হল إطعام الطعام দ্বারা উদ্দেশ্য কি? তিনি বললেন اطعام الطعام দ্বারা উদ্দেশ্য হল, স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য জীবিকা উপার্জন করা। অতঃপর প্রশ্ন করা হল, إفشاء السلام (সালামের বিস্তার ঘটানো) দ্বারা উদ্দেশ্য কি? বললেন, তোমার মুসলিম ভাইদের সাথে মোসাফাহা করা ও সালাম বিনিময় হল إفشاء السلام দ্বারা উদ্দেশ্য। এরপর জিজ্ঞাসা করা হল, الصلوة والناس نيام দ্বারা কোন নামায উদ্দেশ্য? উত্তর দিলেন, এর দ্বারা এশার নামায উদ্দেশ্য।

ইমাম বায়হাকী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসে হাফস ইবনে উমর অজ্ঞাত পরিচয়। কেননা, আমার জানা মতে তার থেকে শুধু মাত্র আলী ইবনে হারই বর্ণনা করেছেন, অন্য কেউ বর্ণনা করেননি।

আমি (ইবনুল কাইয়্যিম) বলব, তার উপাধি ছিল কাফ্র। তার থেকে মুহাম্মদ ইবনে গালিব ও আলী ইবনে হারব উভয়েই বর্ণনা করেছেন। উভয় ছিকা তথা নির্ভরযোগ্য। পক্ষান্তরে ইবনে আদিও ইবনে হাব্বান তাকে দুর্বল স্তরের বর্ণনাকারী রূপে প্রতিপন্ন করেছেন। অন্যান্য বর্ণনায় এই হাদীসের অনুরূপ ভাষ্য পাওয়া যায়। والله اعلم

ফাওয়ায়েদে ইবনুস সামাকে সনদসহ হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতের প্রাসাদ সম্পর্কে জানাব? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমাদের মাতা-পিতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। অবশ্যই বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, জান্নাতে প্রত্যেক প্রকারের মণি-মাণিক্যে খচিত প্রাসাদ থাকবে। তার অভ্যন্তর বাইর থেকে এবং বহিরাংশ ভিতর থেকে দেখা যাবে। তাতে রয়েছে এমন স্বাদ ও নিআমত, যা কোন চক্ষু অবলোকন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি, এমনকি কোন মানব হৃদয়ে যার কল্পনা পর্যন্ত অঙ্কিত হয়নি।

হযরত জাবির রা. বলেন, আমরা নিবেদন করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কারা এ সকল প্রাসাদ লাভ করবে? জবাব দিলেন, সে সকল লোক, যারা সালামের বিস্তার ঘটায়, দুস্থ ও দরিদ্রদের আহার দান করে, অধিক হারে রোযা রাখে, মানুষ যখন নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন তারা নামাযরত থাকে।

জাবির রা. বলেন, আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কার দ্বারা তা সম্ভব? জবাব দিলেন, আমার উম্মতের জন্য তা সম্ভব। আমি তোমাদেরকে তাদের পরিচয় অবহিত করছি। যে ব্যক্তি অপর মুসলিম ভাই-এর সাথে সাক্ষাত হলে সালাম পেশ করল, সালামের জবাব দিল, সে সালামের বিস্তারের আমল করল। যে ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের জন্য তৃপ্তি সহকারে খাবারের ব্যবস্থা করল, সে اطعام الطعام এর আমল করল। যে ব্যক্তি রমাযানের রোযাসহ প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখবে, সে অধিক হারে রোযা আদায়ের আমল সম্পন্ন করল। আর যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ইশার নামায আদায় করল সে صلى اليل والناس نيام এর আমল করল।

উক্ত হাদীসের সনদে যদিও দুর্বলতা রয়েছে। সাথে সাথে অন্যান্য বর্ণনার ভাষ্য তা সমর্থন করে।

টিকাঃ
২৪৫. সূরা যুমার, আয়াত: ২০
২৪৬. সূরা সাবা, আয়াত: ৩৭
২৪৭. সূরা সাফ, আয়াত: ১২
২৪৮. সূরা তাহরীম, আয়াত: ১১
২৪৯. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৪৬০, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৮৬
২৫০. তিরমিযী, খ. ১ পৃ. ১৯৮
২৫১. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৫৩৯ মুসলিম, খ. ২. পৃ. ২৮৪
২৫২. বুখারী, খ. ২ পৃ. ১০৪০ মুসলিম, খ. ২ পৃ. ২৭৫

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতীরা আপন নিবাস দেখেই চিনে ফেলবেন

📄 জান্নাতীরা আপন নিবাস দেখেই চিনে ফেলবেন


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَنْ يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনও তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না। তিনি তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দেন। তিনি তাদেরকে দাখিল করেন জান্নাতে, যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়ে ছিলেন।২৫৩

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ রহ. বলেন, জান্নাতীগণ স্ব-স্ব ভবন ও নিবাস এমনভাবে চিনে নিবে, তাতে কোন প্রকার ভুল-ত্রুটি হবে না। যেন সে আজন্ম সেখানেই বসবাস করেছে, এমনকি তারা কারো নিকট পথ-নির্দেশনাও চাবে না।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জুম'আর নামায আদায় করে ফিরে গিয়ে মানুষ যেমনিভাবে স্ব-গৃহ চিনে নেয়, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করে স্ব-স্ব নিবাস তদপেক্ষা ভালভাবে চিনে নিবে।

মুহাম্মদ ইবনে কা'ব বলেন, তোমরা জুম'আর নামায পড়ে ফিরে এসে যেমনিভাবে আপন গৃহ চিনে নাও জান্নাতীগণও ঠিক তেমনিভাবে স্ব-স্ব নিবাস চিনে নিবে। অধিকাংশ মুফাস্সিরের উক্তিও তাই। এসকল মতের সমষ্টি তা-ই, যা আবূ উবায়দা রহ. বলেছেন, عَرَّفَهَا لَهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতীগণ তাদের নিবাসকে কারো নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীতই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিনে নিবে।

হযরত মুকাতিল ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতা জান্নাতে আগে আগে হাঁটতে থাকবে আর লোকেরা তার পেছনে পেছনে চলতে থাকবেন। ফিরিশতা তার ভবনে প্রবেশ করে তাকে সকল বস্তুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। মু'মিন ব্যক্তি নিজ নিবাসে প্রবেশ করে স্ত্রীর নিকট পৌঁছলে ফিরিশতা ফিরে আসবেন।

সালামাহ ইবনে কুহায়ল রহ. বলেন, عرفها لهم এর অর্থ طرفها هم অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন পথ তৈরী করে রেখেছেন যে পথ ধরে তারা স্ব- স্ব- নিবাসে পৌছতে পারবে।

হাসান বসরী রহ. বলেন, পৃথিবীতে তো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতের বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ বর্ণনা করে শুনিয়েছেন। যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তারা সেই বর্ণনার আলোকে জান্নাত চিনে ফেলবে। এ মতানুযায়ী عَرَّفَهَا لَهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে তাদের নিকট জান্নাতের যে গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, তাদেরকে সে জান্নাতেই দাখিল করাবেন। عَرَّفَهَا لَهُمْ এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে উল্লিখিত মতামতগুলো সেক্ষেত্রে, যখন عرف শব্দটির শব্দমূল تعریف অর্থাৎ পরিচয় জ্ঞাপন হবে। কতক ভাষাবিদের মতে তার শব্দমূল হল عرف। উত্তম ও উন্নত সুগন্ধি, তখন বাক্যটির অর্থ হল طيها همঅর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য জান্নাতকে সুগন্ধিময় করে সৃষ্টি করেছেন। এর থেকেই উৎকলিত طعام معرف অর্থাৎ সুগন্ধিময় খাবার। এটি যুজাজ রহ.-এর উক্তি।

কেউ বলেন, عرف শব্দটির অর্থ হল অনুগামী অর্থাৎ জান্নাতের সুগন্ধি ও স্বাদসমূহ জান্নাতীদের অনুগামী-অধীনস্থ হবে। তবে প্রথম উক্তিটি অধিক গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআলা সকলকেই স্ব-স্ব মনযিল ও গৃহ চিনিয়ে দিবেন, যেন অন্যদিকে অতিক্রম না করে।

সহীহ বুখারীতে২৫৪ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একদল মু'মিন যখন জাহান্নام থেকে মুক্তি পাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও দোযখের মধ্যবর্তী একটি সেতুতে বাধা দেয়া হবে। সেখানে তারা পরস্পরে দুনিয়াতে যে বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন করেছে তার প্রতিশোধ নিবে। এরপর যখন সকল প্রকার বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন থেকে মুক্ত হবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। সেই সত্তার শপথ! যার কুদরতী হাতে আমার জীবন, তারা তখন জান্নাতে আপন নিবাসকে এত দ্রুত ও সহজে তেমনি করে চিনবে যতটা সহজে পৃথিবীতে আপন গৃহকেও চেনা সম্ভব হয় না।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যিনি আমাকে সত্য নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই সত্তার শপথ! তোমরা পৃথিবীতে তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিকেও ততটা চিন না যতটা জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশের পর স্বীয় স্ত্রী ও নিবাসকে চিনবে।

টিকাঃ
২৫৩. সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৪-৬
২৫৪. খ. ২, পৃ. ৯৭০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00