📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাত ও জাহান্নামে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে

📄 জান্নাত ও জাহান্নামে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে


সহীহায়নে হযরত মুহাম্মদ ইবনে সীরীনের বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেছেন, তোমরা কি পরস্পরে গর্ব অথবা আলোচনা কর না যে, জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা অধিক হবে নাকি পুরুষের সংখ্যা অধিক হবে? হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি একথা বলেননি, প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাদের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। আর যারা তাদের পরে প্রবশ করবে তারা হবে আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের ন্যায়। সেখানে প্রত্যেকের জন্য এমন দু'জন স্ত্রী থাকবে যাদের সৌন্দর্য ও রূপলাবণ্যের দরুন তাদের গোস্ত ভেদ করে পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।'

উল্লেখ্য, জান্নাতে স্ত্রী ব্যতীত অন্য কেউই থাকবে না। যদি তারা সকলেই দুনিয়ার স্ত্রীলোক হয়ে থাকে, তবে তো কোন সমস্যা নেই। কেননা, দুনিয়াতে পুরুষের তুলনায় মহিলা অধিক। আর যদি তারা দুনিয়ার স্ত্রীলোক না হয়ে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূর হয়, তবে এদ্বারা জান্নাতে পুরুষের তুলনায় মহিলা অধিক হওয়ার বিষয়টি বুঝায় না।

অথচ এ কথা সুস্পষ্ট যে, তারা হুরই হবে। দলীল হল, ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে২২৯ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
للرجل من أهل الجنة زوجتان من حور العين على كل واحدة سبعون حلة يرى من ساقها من وراء الثياب
জান্নাতী পুরুষের জন্য সেখানে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট দু'জন স্ত্রী থাকবে। তাদের প্রত্যেকের পরনে ৭০ জোড়া কাপড় থাকবে। তারপরও পোশাক ভেদ করে তাদের পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।

প্রশ্ন: যদি এ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, জান্নাতে মহিলাদের আধিক্য হবে, এ দাবীর সাথে এই হাদীসের কোন সামঞ্জস্য রয়েছে, যে হাদীসে রয়েছে, জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা কম হবে। যেমন হযরত জাবির রা. হতে মুত্তাফাক আলাইহি২০০ হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ঈদে উপস্থিত ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার পূর্বে আযান ও ইকামত ব্যতীত নামায আদায় করলেন। নামায শেষে খুতবা দিলেন, তাতে লোকদের উপদেশ দিলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের নিকট তাশরীফ নিলেন ও তাদেরকে উপদেশ দিলেন। হযরত বিলাল রা. তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি মহিলাদেরকে উপদেশ দিলেন এবং সদকা করার নির্দেশ দিলেন। তখন মহিলারা তাদের আংটি, কানের দুল ও অন্যান্য বস্তু দান করতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বিলাল রা. কে সে সব বস্তু একত্রিত করার নির্দেশ দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে মহিলারা! জান্নাতে তোমাদের সংখ্যা কম হবে। একজন মহিলা প্রশ্ন করল, এর কারণ কি? ইয়া রাসূলাল্লাহ! উত্তরে বললেন, তোমরা অধিক হারে লা'নত করে থাকো। এছাড়া তোমরা স্বামীর অকৃতজ্ঞতাও করে থাকো।' উক্ত হাদীস ছাড়াও অন্য এক হাদীসে এসেছে, 'জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা কম হবে।'

জবাব : যদি জান্নাতে সৃষ্ট হুরদেরকেও মহিলাদের মধ্যে গণনা করা হয়, তাহলে জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা অধিক হবে। আর যদি হুরদেরকে সেই জান্নাতী মহিলাদের সাথে গণনা করা না হয় তাহলে জান্নাতে দুনিয়ার মহিলাদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম হবে। সুতরাং দুনিয়ার মহিলার সংখ্যা জান্নাতে কম হবে ও জাহান্নামে অধিক হবে।

এই মহিলাদের সংখ্যা জাহান্নামে অধিক হওয়ার প্রমাণ হল ঐ হাদীস, যা ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখরীতে২৩১ হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি এ বিষয়ে জেনেছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেলেন, আমি উঁকি মেরে জাহান্নাম দেখেছি। সেখানে মহিলাদেরই আধিক্য ছিল। এরপর আমি উঁকি মেরে জান্নাতও দেখেছি। সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেয়েছি।

সহীহ মুসলিমে২৩২ হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি উঁকি মেরে জান্নাত দেখেছি সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম। এরপর আমি জাহান্নামেও উঁকি মেরে দেখলাম। সেখানে মহিলাদের আধিক্য দেখতে পেলাম'।

ইমাম আহমদ রহ. সহীহ সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আমি উকি মেরে জাহান্নাম দেখেছি। সেখানে মহিলাদের আধিক্য ছিল। তারপর জান্নাতেও দেখেছি। সেখানেও দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম।'

মুসনাদে আহমাদে২৩৩ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি উঁকি মেরে জান্নাত দেখেছি সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম, জাহান্নামেও উঁকি মেরে দেখলাম। সেখানেও মহিলাদের আধিক্য দেখতে পেলাম।'

সহীহ মুসলিমে২৩৪ হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে মহিলারা! তোমরা সদকা কর ও অধিক হারে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আমি জাহান্নামে তোমাদের অধিক সংখ্যা দেখেছি। তাদের মধ্যে স্থূল গোছা বিশিষ্ট একজন মহিলা জিজ্ঞাসা করল, আমরা কেন অধিক হারে জাহান্নামী হব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কারণ তোমরা অধিক হারে লা'নত করে থাক এবং স্বীয় স্বামীর অকৃজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। আমি তোমাদের মত দীন ও জ্ঞানস্বল্পতা সম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি, যা সহজেই তোমাদের কাবু করে ফেলে। সে মহিলা পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের মাঝে দীন ও জ্ঞানস্বল্পতা কিরূপ? জ্ঞানেরস্বল্পতা তো এর দ্বারাই প্রতীয়মান হয় যে, সাক্ষীর ক্ষেত্রে তোমাদের দু'জনের সাক্ষকে একজন পুরুষের সাক্ষীর সমপরিমাণ গন্য করা হয়েছে। আর তোমরা ঋতুস্রাব ও নিফাসাবস্থায় কিছু দিন নামায পড়তে পার না, রোযাও রাখতে পার না। এটাই হল তোমাদের দীনের মাঝে দীনতা ও হীনতা।

জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যার স্বল্পতা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. একাই বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেননি। ইমাম মুসলিম রহ. মুতরিফ বিন আবদুল্লাহ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেন, তাঁর দু'জন স্ত্রী ছিল। তিনি একজনের সাথে সাক্ষাত করে অন্য জনের নিকট গেলে সে বলল, আপনি অমুক মহিলার সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। তিনি বললেন, আমি হযরত ইমরান বিন হুসাইন রা.-এর নিকট হতে এলাম। তিনি আমার নিকট এই হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা স্বল্প হবে।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আবূ ইয়ালা মুসেলী-এর স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীসের সমাধান কী হবে? যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন, আমি সাহাবাদের এক জামাতে উপস্থিত ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (দীর্ঘ হাদীস উল্লেখ করেছেন। তাতে এ শব্দাবলীও ছিল) জান্নাতী ব্যক্তি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য এমন ৭২ জন স্ত্রী থাকবে; যাদেরকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ হূর। এছাড়াও মানব সম্প্রদায় হতে দু'জন করে স্ত্রী থাকবে। এই দুই স্ত্রীর মর্যাদা সকল হুরদের চেয়ে বেশি হবে। কারণ, তারা দুনিয়ায় থাকাকালে ইবাদাত করেছিল।

জবাব : দীর্ঘ এ হাদীসটির এ অংশটুকু শুধুমাত্র ইসমাঈল বিন রাফে নামক একজন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনাকারীকে ইমাম আহমদ রহ. ইয়াহইয়া রহ. ও মুহাদ্দিসীনে কিরামের এক জামাত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুতনী বলেন, উক্ত বর্ণনাকারীর হাদীস প্রত্যাখ্যাত। ইবনে আদী বলেন, এ সকল হাদীসে আপত্তি রয়েছে।

এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. এর মন্তব্য ইমাম তিরমিযী রহ. বর্ণনা করে বলেন, আমি উক্ত বর্ণনাকারীর ব্যাপারে হযরত ইমাম বুখারী রহ. কে বলতে শুনেছি, সে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী এবং তার হাদীস গ্রহণযোগ্য।

আমি (ইবনুল কায়্যিম জাওযী) বলব, এ জাতীয় বর্ণনাকারীর বর্ণনা যদি অন্যান্য সহীহ হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ হয় তবে তা গ্রহণ না করাই উত্তম। তাছাড়া উক্ত হাদীসটির অগ্রহণযোগ্যতার আরেকটি দিক হল, ইসমাঈল হতে বর্ণনাকারী কুরদী হল অজ্ঞাত পরিচয়। তার ব্যপারে কিছু জানা যায়নি।

ইমাম আহমদ রহ. মুসনাদে২৩৫ উমারা ইবনে খুযাইমা ইবনে সাবিত রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর সাথে হজ্জ বা উমরার সফরে ছিলাম। আমরা যখন 'মাররুয যাহরানে' পৌঁছলাম, তখন একজন মহিলা দেখতে পেলাম, তার উটের হাওদায় করে সফর করছিল। হযরত উমারা রা. বললেন, হযরত আমর ইবনুল আস রা. রাস্তা হতে সরে গিরিপথে ঢুকে গেলেন, আমরাও তার সাথে ঢুকে গেলাম। তখন তিনি বললেন, আমরা একবার এ স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ অনেক কাক এসে এখানে একত্রিত হল। তন্মধ্যে একটি কাক এমন ছিল যার পালকগুলোর মাঝে কিছুটা শুভ্রতা ছিল এবং ঠোট ও পা ছিল লাল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অন্যান্য কাকের তুলনায় যেমন এ ধরনের কাকের সংখ্যা কম, তেমনি জান্নাতেও মহিলাদের সংখ্যা হবে কম।

উক্ত হাদীসে لأعصم শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। أعصم বলা হয় এমন কাককে যার কিছু পালক থাকবে শুভ্র। নিহায়া গ্রন্থে الغراب الأعصمসে কাককে বলা হয়েছে যার কিছু পালক শুভ্র। উক্ত উপমা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য হল, মহিলারা জান্নাতে স্বল্পসংখ্যক হবে। কেননা অন্যান্য কাকের তুলনায় শুভ্র পালক বিশিষ্ট কাক খুবই কম পাওয়া যায়।

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, নেক মহিলারা হলেন আ'সাম তথা শুভ্র পালক বিশিষ্ট কাকের ন্যায়। সাহাবাগণ রা. প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গুরাব আ'সাম কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হল, ঐ কাক যার এক পা সাদা।

অন্য হাদীসে এসেছে, অন্য মহিলাদের তুলনায় হযরত আইশা রা. ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে অন্য কাকের তুলনায় শুভ্র পালক ও পা বিশিষ্ট কাক। অর্থাৎ তিনি অনন্য বৈশিষ্ট মর্যাদা ও স্বতন্ত্রতার অধিকারী।

টিকাঃ
২২৯. মুসনাদে আহমদ, খ. ২, পৃ. ৩৪৫
২০০ বুখারী, খ. ১ প. ১৩১, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১৮৯
২৩১. খ. ১, প. ৪৬০
২৩২, খ: ১ পৃ: ৬০
২৩৩. খ: ২ পৃঃ ১৭৩
২৩৪. খ: ১ পৃ: ৬০
২৩৫. খ. ৪ পৃ. ১৯৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন যারা

📄 বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন যারা


সহীহায়নে২৩৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করবে। যাদের সংখ্যা হবে ৭০ হাজার। তাদের চেহারা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। হযরত উকাশা বিন মিহসন আসাদী রা. দাঁড়িয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন তাঁর শরীরে একটি নকশী চাদর ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করলেন, আল্লাহ! উকাশাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আনসারদের এক ব্যক্তি উঠে তদ্রূপ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্যও দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।

সহীহায়নে২৩৭ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই আমার উম্মতের ৭০ হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথবা তিনি বলেছেন, সাত লক্ষ লোক পরস্পরে হাত ধরাধরি করা অবস্থায় বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের মুখাবয়ব পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হবে। বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে এরাই প্রথম দল। সহীহায়নে বর্ণিত হাদীসই তার দলীল। এখানে মুসলিমে বর্ণিত শব্দ উল্লেখ করা হচ্ছে।

হযরত খুসাইফ ইবনে আবদুর রহমান বলেন,২৩৮ আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রা.-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে গত রাতে ভাঙ্গা তারা দেখেছ? জবাবে আমি বললাম, আমি দেখেছি এবং আমি আরো বললাম, আমি নামাযরত ছিলাম না; বরং আমাকে একটি বিষাক্ত কীট দংশন করেছে। (সে ব্যাথার কারনে আমি জাগ্রত ছিলাম) তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, দংশনের প্রতিকার স্বরুপ তুমি কি করেছিলে? আমি বললাম, ঝাড়-ফুঁক করেছি। তিনি বললেন, কিসে তোমাকে তা করতে উদ্বুদ্ধ করল। আমি বললাম, শা'বী রহ. কর্তৃক আমার নিকট বর্ণিত একটি হাদীস আমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বললেন, কি সেই হাদীস? আমি হযরত বুরাইদা ইবনুল হাসাব আসলামীর বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করলাম। তিনি বলেন, শুধু নযর লাগলে অথবা কোন বিষধর কীট দংশন করলে ঝাড়-ফুঁক করা ও করানো জায়েয আছে। হযরত সাঈদ রা. বললেন, তার শ্রুত বিষয়টিও ভাল। তবে হযরত ইবনে আব্বাস রা. আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে পৃথিবীর শুরু থেকে অদ্য পর্যন্ত সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছে। তখন আমি এক নবীকে দেখতে পেলাম, যার সাথে এক কাফেলা সমান উম্মত আছে। কোন নবীর সাথে উম্মত হচ্ছে এক বা দুই ব্যক্তি মাত্র। কোন কোন নবীর উম্মতই নেই। এরপর একটি বড় দলকে আমার সামনে আনা হল। আমি ধারণা করলাম, এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হল, এরা মূসা আ.-এর উম্মত। আমাকে বলা হল, আপনি এক দিগন্ত লক্ষ্য করুন। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, সেখানে বিশাল সংখ্যক লোক রয়েছে। তখন আমাকে বলা হল, এরা হল আপনার উম্মত, এদের মাঝে এমন ৭০ হাজার লোক রয়েছে, যারা কোন হিসাব-নিকাশ ও কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এতটুকু বলার পর রাসূল সেখান থেকে উঠে স্বীয় কক্ষে তাশরীফ নিলেন। তখন লোকেরা সে সকল লোক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে লাগল যারা কোন হিসাব নিকাশ এবং কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে লাগলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ-ই হলেন সে সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা। কেউ কেউ বললেন, সে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হল তারা, যারা মুসলমান হিসাবেই জন্মলাভ করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে কখনো কাউকে শরীক করেনি। এছাড়াও বিভিন্ন জন বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকলেন।

ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট তাশরীফ এনে বললেন, তোমরা পরস্পরে কোন্ ব্যাপারে আলোচনায় লিপ্ত? সাহাবা রা. আলোচনার বিষয় খুলে বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেলেন, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হল তারা, যারা ঝাড়-ফুঁক ও তাবীয, মন্ত্র করেনি ও করায়নি এবং কোন কু-লক্ষণ গণনা করেনি; বরং একমাত্র স্বীয় প্রভুর উপরই ভরসা করত।

হযরত উকাশা রা. দাঁড়িয়ে আরয করলেন, আমার জন্য দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তখন অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আরয করল, আমার জন্য দু'আ করুন যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার থেকে অগ্রগামী হয়ে গেছে। বুখারীতে لا يرقون শব্দটি নেই।

শায়খ ইবনে তায়মিয়া বলেন, এটা বিশুদ্ধ। কেননা, কোন বর্ণনাকারী ভুলক্রমে তা হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। সুতরাং প্রতীয়মান হল, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র খালেছ তাওহীদ মেনে চলা ও তাওহীদ পরিপন্থী কার্যাবলী হতে বিরত থাকাকেই বিনা হিসাবে জান্নাত লাভের মাধ্যম নির্ণয় করেছেন। অন্যের নিকট হতে ঝাড়-ফুঁক, তাবীয-মন্ত্র গ্রহণ না করা, কু-লক্ষণ গন্য না করা ও একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করাই হল বিনা হিসাবে জান্নাত লাভকারীর গুনাগুন ও বৈশিষ্ট্য। কুলক্ষণ গন্য করাও এক প্রকার শিরক। সুতরাং সে কু-লক্ষণ গন্য করবে না ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপর ভরসা করবে না। কেননা, এটাই তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পর্যায়। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে الطيرة شرক২৩৯ অর্থাৎ কুলক্ষণ গণ্য করা হল শিরক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই তো কুলক্ষণ গণ্য করে। তবে তাওয়াক্কুলের কারনে আল্লাহ তাআলা তা আমাদের থেকে দূরীভূত করেন। তাওয়াক্কুল হল, কুলক্ষণের বিপরীত। তবে হ্যাঁ, নযরের জন্য ঝাঁড়-ফুঁক করতো ঝাঁড়-ফুঁককারীর পক্ষ হতে একটা অনুগ্রহ।

হযরত জিবরীল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দম করেছিলেন এবং দম করার অনুমতি প্রদান করে বলেছেন, এতে আমি ক্ষতিকর কোন কিছু দেখি না, যদি তাতে শিরক না করা হয়। সাহাবাগণ রা. এব্যপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমাদের কেউ অন্য ভাইয়ের কোন প্রকার উপকার করতে পারে, তবে সে যেন তা করে।

এর দ্বারা বুঝা যায়, এটা শুধুমাত্র উপকার সাধন ও অনুগ্রহের কাজ। যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অত্যন্ত পসন্দনীয় বিষয়। আর দম প্রার্থনাকারী হল, অন্যের নিকট উপকার প্রার্থনাকারী যা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আইশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দম করেছিলেন। জিবরীল আ. ও দম করেছিলেন। (তাহলে কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কাজটি তাওয়াক্কুল পরিপন্থী হয়নি, নাউযুবিল্লাহ)

জবাব : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দম করার জন্য বলেননি, এ কথাতো বলেননি যে, কোন ঝাড়-ফুঁক কারী যেন কাউকে দম না করে; বরং তিনি বলেছেন, যেন কেউ কাউকে ঝাড়-ফুঁক করতে না বলে।

সহীহ মুসলিমে২৪০ হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের ৭০ হাজার লোক হিসাব-নিকাশ ও কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হল, সে সকল লোক কারা? বললেন, সে সকল লোক তারা, যারা কোন অঙ্গে দাগ তথা সেঁক দেয়নি, ঝাড়-ফুঁক করেনি, কোন প্রকার কুলক্ষণ গন্য করেনি বরং স্বীয় প্রভুর উপর তাওয়াক্কুল করত।

সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি, তার মধ্যে এশব্দগুলোও ছিল, প্রথম দল সফলকাম হবে, তাদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমা চাদের ন্যায় জ্বলজ্বলে ও দীপ্তিমান হবে। তাদের সংখ্যা হবে ৭০ হাজার। তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের নিকটতমদের অবস্থা আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের ন্যায়। এভাবে স্তর বিন্যাস হবে।

আহমদ ইবনে মানী স্বীয় মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে আমার উম্মতের হাশরের অবস্থা দেখানো হয়েছে। আমি তাদের অবস্থা ও আধিক্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কেননা, পাহাড় ও সমতল সকল স্থানেই তাদের অবস্থান বিস্তৃত ছিল। আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, হে মুহাম্মদ! তুমি কি সন্তুষ্ট? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তাদের মাঝে ৭০ হাজার লোক এমন, যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হল সে সকল লোক, যারা ঝাড়-ফুঁক করবে না, দাগ তথা সেঁক দিবে না, একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করবে।

হযরত উকাশা ইবনে মিহসান রা. দাঁড়িয়ে আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তখন অন্য লোক দাঁড়িয়ে তেমনি আরয করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার থেকে অগ্রগামী হয়ে গেছে। উক্ত হাদীসের সনদ ইমাম মুসলিম রহ.-এর সনদের শর্ত মোতাবেক।

টিকাঃ
২৩৬. বুখারী, খ. ২, পৃ. ১১৬
২৩৭. বুখারী, ২. পৃ. ৯৬৯, মুসলিম. খ. ১ পৃ. ১১৬
২৩৮. উক্ত কিতাবের উভয় নুসখাতেই খুসাইফ ইবনে আ. রহমান উল্লেখ করা হয়েছে, তবে মুসলিম শরীফে হুসাইন ইবনে আ. রহমান উল্লেখ রয়েছে।
২৩৯. তিরমিযী, খ. ১. পৃ. ২৯০
২৪০. খ: ২ পৃ: ১১৬

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 যাদেরকে আল্লাহ নিজ মুঠোতে জাহান্নাম থেকে তুলে আনবেন

📄 যাদেরকে আল্লাহ নিজ মুঠোতে জাহান্নাম থেকে তুলে আনবেন


আবূ বকর ইবনে আবূ শায়বা স্ব-সনদে হযরত উসামা বাহেলী রা. হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার প্রভু আমাকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে হতে সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। প্রত্যেক হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার থাকবে, যারা বিনা হিসাবে কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এছাড়াও আল্লাহ তাআলার আরো তিনটি মুষ্টি থাকবে। (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তিন মুষ্টি ভরে আমার উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন)

উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ইসমাঈল বিন আয়্যাশ সম্পর্কে দুর্বলতা ও তাদলীসের আশংকা যদিও রয়েছে কিন্তু তাদলীস বিদূরিত হয়ে যায় তাবারানীর রিওয়ায়েত দ্বারা। তিনি হাদীসটি عن দ্বারা বর্ণনা করেননি; বরং اخبرني দ্বারা বর্ণনা করেছেন। ضعیف হওয়ার ত্রুটিটিও তার থেকে বিদূরিত হয়ে যায়, যেহেতু তিনি সিরীয় বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেন, তিনি যদি সিরীয় বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করে থাকেন, তবে তিনি ضعیف নন।

হযরত আবূ উসামা বাহেলী রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রতিশ্রুতি দান করেছেন, আমার উম্মতের সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তখন ইয়াযীদ ইবনে আখনাছ রা. বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার বিশাল উম্মতের মধ্য হতে এই সংখ্যাতো ততটাই নগণ্য, সাধারণ মাছির মাঝে হলুদ মাছির সংখ্যা যতটা নগণ্য। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার প্রভু অবশ্যই আমার সাথে ওয়াদা করেছেন, সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, প্রত্যেক হাজারে আরো সত্তর হাজার থাকবে। এর সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা তিন মুষ্টি দ্বারা আরো বিশাল সংখ্যাকে জাহান্নام থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত উতবা ইবনে আব্দুস সালামী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার প্রভু আমাকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন, আমার উম্মত হতে সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাদের সুপারিশক্রমে প্রত্যেক হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজারকে প্রবেশ করাবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় তিন মুষ্টি ভরে আরো অনেককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। একথা শুনে হযরত উমর রা. উঁচু স্বরে তাকবীর ধ্বনি দিয়ে বললেন, প্রথম সত্তর হাজার তো আপন বাপ-দাদা, সন্তান-সন্তুতি ও নিজ বংশের লোকদের জন্য সুপারিশ করবে। আমি আশা রাখি, আল্লাহ তাআলা আমাকে শেষ তিন মুষ্টির কোন একটিতে অন্তর্ভুক্ত করে নিবেন।

হাফেয আবূ আবদুল্লাহ বলেন, এ হাদীসের সনদে কোন দুর্বলতা নেই। তাবারানী স্ব-সনদে হযরত আবূ সা'ঈদ আনমারী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার প্রভু আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমার উম্মতের সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এদের প্রত্যেক হাজার আরো ৭০ হাজারের জন্য সুপারিশ করবে। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর অঞ্জলি দিয়ে আরো তিন মুষ্টিকে জাহান্নাম হতে নাজাত দিবেন। ইবনে কায়স হযরত সা'ঈদ রা. কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিজ কানে শুনেছি। আমার অন্তরে তা গেথে রয়েছে। হযরত আবূ সা'ঈদ রা. বললেন, অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ এ সংখ্যা আমার উম্মতের মুহাজিরগণকে বেষ্টন করে নিবে। আর বাকী সংখ্যা আল্লাহ তাআলা গ্রাম্য আরবদের মধ্য হতে পূর্ণ-করে নিবেন। ইমাম তাবারানী বলেন, উক্ত হাদীসটি মুআবিয়া বিন সালামের একক সূত্রে বর্ণিত।

তবে এই হাদীসটি মুহাম্মদ ইবনে সাহল আবূ তাওবাহ হতে এ অংশটি বৃদ্ধি করে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবূ সা'ঈদ রা. বর্ণনা করে বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় উক্ত সংখ্যাটি হিসাব করা হলে (প্রথম সত্তর হাজার ব্যতীত) তা চার লক্ষ নব্বই হাজারে উন্নীত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ এ সংখ্যা আমার উম্মতের মুহাজিরগণকে বেষ্টন করে নিবে।

ইমাম তাবারানী রহ. স্ব-সনদে হযরত উমাইর রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমার উম্মতের তিন লক্ষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। হযরত উমায়র রা. বললেন, এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করুন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, এর সাথে এ সংখ্যাও রয়েছে। হযরত উমায়র রা. পুনরায় বললেন, আরো বৃদ্ধি করুন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন হযরত উমর রা. বললেন, হে উমায়র! এতটুকুই যথেষ্ট। তিনি বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! যদি আমাদের সকলকে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন, এতে তোমার আমার ক্ষতি কি? হযরত উমর রা. বললেন, আল্লাহ তাআলা যদি ইচ্ছা করেন, তবে উম্মতের সকল সদস্যকে এক মুষ্টিতে অথবা এক অঞ্জলিতে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উমর সঠিক কথাই বলেছে।

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল আহাদ রহ. বলেন, আমি হযরত উমায়র রা. থেকে শুধু এ হাদীসই শুনেছি।

হুলিয়াতে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার প্রভু আমার সাথে ওয়াদা করেছেন, আমার উম্মতের এক লাখকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেন, এর সাথে এ সংখ্যাও রয়েছে। হযরত আবূ বকর বললেন, এ সংখ্যার সাথে আরো বৃদ্ধি করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন হযরত উমর রা. বললেন, অবশ্যই আল্লাহ তাআলা এক মুষ্টিতে সকলকে প্রবেশ করাতে সক্ষম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উমর সঠিক বলেছে।

উক্ত হাদীসের সনদে আবূ ইবরাহীম বালাদী নামে একজন দুর্বল রাবী রয়েছে।

আব্দুর রাযযাক রহ. স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমার সাথে ওয়াদা করেছেন এমর্মে, আমার উম্মতের চার লক্ষ লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, এ সংখ্যাটা আরো কিছু বৃদ্ধি করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উভয় হাত একত্রিত করে ইঙ্গিত করে বললেন, এর সাথে এ সংখ্যাও রয়েছে। হযরত আবূ বকর রা. আবার বললেন, এ সংখ্যার সাথে আরো কিছু বৃদ্ধি করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দ্বিতীয়বার একই মন্তব্য করার পর হযরত উমর রা. বললেন, হে আবূ বকর! আপনার জন্য তো এতটুকুই যথেষ্ট। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, অতিরিক্ত বৃদ্ধির আবেদনের সুযোগ দাও। আমরা সকলে জান্নাতে প্রবেশ করলে তোমার তো কোন ক্ষতি নেই। হযরত উমর রা. বললেন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সকল মাখলুককে এক মুষ্টিতে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উমর সঠিক কথাই বলেছে। আব্দুর রাযযাক রহ. এই সনদে একাই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

আবূ ইয়ালা মুসিলী রহ. স্বীয় মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সাহাবীগণ আরয করলেন, এ সংখ্যায় আরো বৃদ্ধি করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বলেছেন, এমন মুষ্টিও তার মধ্যে থাকবে। সাহাবাগণ বললেন, এর পরেও যদি কেউ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়, তবে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমত থেকে দূর করুন।

মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, উক্ত হাদীসটি এ সনদে হযরত আনাস রা. হতে অন্য কেউ বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই।

উক্ত হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আব্দুয-যাহের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, সে সত্যবাদী। আর যে লোকদেরকে আল্লাহ তাআলা মুষ্টিভরে জাহান্নام থেকে বের করবেন, তারা আল্লাহ তাআলার মুষ্টিদ্বয়ের প্রথমটিতে থাকবেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাদেরকে আল্লাহ প্রথমে এক মুষ্টিতে নিয়ে যাওয়ার পর কিভাবে তাদেরকেই আবার তিন মুষ্টিতে ভরে জাহান্নাম হতে বের করে আনবেন? এর উত্তর হল, আল্লাহ যখন মুষ্টিতে নিবেন তখন তাদের শুধু আকৃতিকেই নিবেন। এজন্য জায়গা কম লাগবে। কিন্তু যেদিন তিন মুষ্টিতে নেবেন সেদিন তাদেরকে পরিপূর্ণ দেহাবয়বে মুষ্টিতে নিবেন। এজন্য উভয় হাত একাধিক বার মুষ্টিবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন পড়বে। والله اعلم

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের ধুলি মাটি কস্তুর ও উদ্ভিদ কেমন হবে?

📄 জান্নাতের ধুলি মাটি কস্তুর ও উদ্ভিদ কেমন হবে?


ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার দর্শনে আমার হৃদয় বিগলিত হয়, পার্থিবতা বিমুখী হয়ে পরকালের চিন্তায় বিভোর হয়ে পড়ি। কিন্তু যখন আপনার দর্শন হতে দূরে থাকি তখন পার্থিব জগত প্রিয় হয়ে পড়ে। স্ত্রী-পরিজন ও সন্তান-সন্ততিতে ডুবে যাই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমরা সর্বাবস্থায় আমার সম্মুখের আবস্থায় থাকতে, তাহলে ফিরিশতাগণ তোমাদের সাথে মোসাফাহ করত, সাক্ষাতের জন্য তোমাদের ঘর পর্যন্ত যেত। যদি তোমরা পাপ না কর তবে আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্থলে এমন জাতি সৃষ্টি করবেন, যারা পাপ করবে, আবার আল্লাহর নিকট মাফ চাবে। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, আমি বললাম, আমাকে জান্নাতের অট্টালিকা ও প্রাসাদ সম্পর্কে বলুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতের অট্টালিকার একটি ইট স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার কাদা হবে কস্তুরির ও পাথরকণা হবে মুক্তার এবং মৃত্তিকা হবে যাফ্রানের। যে ব্যক্তিই তাতে প্রবেশ করবে সে বিভিন্ন প্রকার নিআমত লাভ করবে। কেউ কোন প্রয়োজন অনুভব করবে না। তাতে চিরস্থায়ী থাকবে। কেউ মৃত্যুবরন করবে না। তাতে পোশাকাদী পুরাতন হবে না। যৌবনের অবসান ঘটবে না। তিনি আরো বলেন, তিন ব্যক্তির দু'আ প্রত্যাখ্যাত হয় না। ন্যায়-পরায়ণ বাদশাহ, রোযাদার ব্যক্তি ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত এবং মাযলুম তথা নির্যাতিত ব্যক্তি। তিনি বলেন, মাযলুমের দু'আ মেঘমালার উপরে উঠানো হয় এবং তার জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব যদিও বিলম্বে হয়।

আবূ বকর ইবনে মারদুইয়া স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জান্নাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সারা জীবন জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। নিআমত লাভ করতে থাকবে, কোন প্রয়োজন অনুভব করবে না। পোশাকাদী পুরাতন হবে না, যৌবনের অবসান ঘটবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পুনরায় তার অট্টালিকা এবং প্রাসাদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তার একটি ইট হবে স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার কাদা হবে সুগন্ধি বিচ্ছুরণকারী কস্তুরির ন্যায়, পাথরকণা হবে মুক্তার এবং মৃত্তিকা হবে যাফরানের।

ইয়যিদ ইবনে যুরাই রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের একটি ইট হবে স্বর্ণের আর অন্যটি হবে রৌপ্যের। তার মৃত্তিকা হবে যাফরানের আর কাদা হবে কস্তুরির।

সহীহায়নে২৪১ হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ যারর রা. হাদীস বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করে মুক্তার গম্বুজ দেখতে পেলাম, তার মৃত্তিকা কস্তরির। এটি মি'রাজ সংক্রান্ত হাদীসটির অংশ বিশেষ।

ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় গ্রন্থ মুসলিমে২৪২ স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে সায়্যাদকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন, তা শুভ্র ময়দার ন্যায় অকৃত্রিম মুক্তা হবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে এ কথাটি সঠিক বলেছে। আবূ বকর ইবনে আবূ শাইবাহ রহ. স্ব-সনদে আবূ নুসরা হতে বর্ণনা করেন, ইবনে সায়্যাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তা হবে শুভ্র ময়দার ন্যায় কস্তুরি।

হযরত সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ রহ. হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলে, হে মুহাম্মদ! আজ আপনার সাথী পরাজিত হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিসে পরাজিত হয়েছে? উত্তরে সে বলল, এক ইয়াহুদী তাকে প্রশ্ন করল, জাহান্নামের প্রহরী সংখ্যা কত? আপনার সাথী উত্তরে বলল, আমি আমাদের নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত বলতে পারব না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, সে জাতি কি পরাজিত হতে পারে? যারা অজানা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বলে, আমাদের নবীর নিকট জেনে বলব। কিন্তু ইহুদীরাতো আল্লাহর দুশমন, তারা স্বীয় নবীর নিকট আল্লাহর দর্শনের দাবী জানিয়েছে। আল্লাহর দুশমনদেরকে আমার নিকট নিয়ে আস! আমি তাদেরকে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করব, তা হল ময়দার ন্যায় শুভ্র। অতঃপর ইহুদীরা এসে জিজ্ঞাসা করল, হে মুহাম্মদ! জাহান্নামের প্রহরীর সংখ্যা কত? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'বার উভয় হাতের অঙ্গুলি প্রসারিত করে ইঙ্গিত করলেন। তবে দ্বিতীয় বার একটি অঙ্গুলী বন্ধ রাখলেন অর্থাৎ বুঝালেন, জাহান্নামের প্রহরী সংখ্যা উনিশজন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, জান্নাতের মাটি কেমন হবে? তারা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল। এরপর বলল, তা হবে রুটির ন্যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রুটি হল শুভ্র ময়দা দ্বারা তৈরী।

জান্নাতের এ তিনটি গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য এমন যে, এগুলোতে পারস্পরিক কোন দ্বন্দ্ব নেই। সালাফীদের একদল বলেন, তার মাটি হবে কস্তুরি ও যাফরানের সমন্বিত।

আবূ বকর ইবনে আবূ শাইবা রহ. স্ব-সনদে মুগীছ বিন সামী রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জান্নাতের মাটি হবে কস্তুরি ও যাফরানের সমন্বিত।

এর আরো দুটি অর্থের অবকাশ রয়েছে। একটি হল, মাটি হবে যাফরানের। তবে যখন তাকে পানি মিশ্রিত করে গদ তৈরী করা হবে, তখন তা কস্তুরিতে রূপান্তরিত হবে আর তুরাব (تراب) শব্দটি দ্বারা ভেজা মাটিকেই বুঝানো হয়েছে। হাদীসে ব্যবহৃত শব্দাবলীও এ অর্থই নির্দেশ করে। যেমন المسك ملاطها অর্থাৎ তার কাদা হবে কস্তুরির। হযরত আলা ইবনে যিয়াদ হতে বর্ণিত হাদীসও একথা নির্দেশ করে। যাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, ترابها الزعفران وطينها المسك 1 অর্থাৎ তার শুষ্ক মাটি হবে যাফরানের এবং ভেজা মাটি হবে কস্তুরির; সুতরাং জান্নাতের শুষ্ক মাটি এবং পানি সবই যেহেতু সুগন্ধিময়, তাই উভয়টার সম্মিলনে ভিন্ন এক প্রকার সুগন্ধিতে রূপান্তরিত হয়ে মিশকে পরিণত হবে। দ্বিতীয় অর্থ হল, রং-এর দৃষ্টিকোণ থেকে তো তা যাফরানের মত হবে তবে সুগন্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে তা কস্তুরির ন্যায় হবে। সৌন্দর্য ও শোভায় যাফরানের মত হওয়া আর সুগন্ধিতে কস্তুরির ন্যায় হওয়া অত্যন্ত চমৎকার বিষয়।

হযরত মুজাহিদ রহ. সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহ. ও আবূ নুযাইহ রহ.-এর মাধ্যমে এ অর্থ বর্ণনা করেছেন। জান্নাতের যমীন হবে রৌপ্যের আর তার মাটি হবে করর অর্থাৎ তার রং হবে রৌপ্যের আর সুগন্ধি হবে কস্তুরির।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের জমীন হবে শুভ্র, তার মাটি হবে কপূর প্রস্তরের, তাকে কস্তুরি বালুর ঢিবির ন্যায় বেষ্টন করে আছে। তাতে প্রবহমান নহর রয়েছে। সেখানে উঁচু-নিচু সর্বস্তরের জান্নাতীগণ একত্রিত হয়ে পরস্পরে পরিচিত হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তাতে রহমতের সমীরণ বইয়ে দিলে কস্তুরির ন্যায় তার সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকবে। তখন জান্নাতীগণ স্বীয় স্ত্রীদের নিকট গিয়ে তাদের সৌন্দর্য ও রূপলাবণ্য বৃদ্ধি পেতে দেখে বলবে, আমি যখন তোমার নিকট থেকে গিয়েছিলাম, তখনো তোমাকে পসন্দ করতাম কিন্তু এখন তোমাকে আরো অধিক পসন্দ করি।

ইবনে আবী শাইবা স্ব-সনদে হযরত ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জান্নাতের প্রাসাদ ও অট্টালিকাসমূহ কেমন হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, এক ইট স্বর্ণের ও অপর ইট রৌপ্যের হবে, তার কাদা হবে বিচ্ছুরিত কস্তুরির ন্যায় আর পাথরকনা হবে মুক্তা ও ইয়াকুত পাথরের এবং মাটি হবে যাফরানের।

আবূ শাইখ স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আদনকে স্বীয় কুদরতী হাতে তৈরী করেছেন। তার একটি ইট হবে স্বর্ণের অপর ইট রৌপ্যের। তার অট্টালিকা তৈরীর মসলা বিচ্ছুরিত কস্তরি দ্বারা তৈরী করা হবে এবং তার মাটি হবে যাফরানের আর পাথরকণা হবে মুক্তার। আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে কথা বলতে বললে, তা বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ নিশ্চয় সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ। তখন ফিরিশতাগণ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বলবেন, তুমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, তুমিই হবে অধিপতিদের নিবাস।

আবূশ-শাইখ স্ব সনদে হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে রাতে আমাকে ঊর্ধ্বলোকে আরোহন করানো হল সে রাতে আমি জিবরীলকে বললাম, তারাতো অবশ্যই আমার নিকট জান্নাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। তখন জিবরীল বললেন, আপনি তাদেরকে বলবেন, জান্নাত হল, শ্বেতশুভ্র মুক্তরাজি দ্বারা তৈরী। আর তার যমীন হবে স্বর্ণের।

যদি এ হাদীসটি মারফু হয়, তবে সোনালী যমীন বিশিষ্ট জান্নাত বলতে জিবরীল আ. সর্বোত্তম জান্নাত দু'টির কথাই বুঝিয়েছেন ।

টিকাঃ
২৪১. বুখারী, খ. ১ পৃ. ৫১, মুসলিম, খ. ১, পৃ, ৯৩
২৪২. খ. ২ প. ১৯৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00