📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 যাদের জন্য জান্নাতপ্রাপ্তির অলংঘনীয় নিশ্চয়তা

📄 যাদের জন্য জান্নাতপ্রাপ্তির অলংঘনীয় নিশ্চয়তা


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاء وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ، وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ ، أَوْلَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَّغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأنهار خالدينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ
তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের মার্জনা ও ঐ জান্নাতের দিকে যার বিশালতা আসমান ও যমীনের সমান। যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আর যারা কোন অশ্লীল কার্য করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে জেনেশুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না এরাই তারা, যাদের পুরস্কার হচ্ছে তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম২২১।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ই জানালেন, জান্নাত শুধুমাত্র খোদাভীরুদের জন্যই; অন্যদের জন্য নয়। অতঃপর তিনি মুত্তাকীন তথা খোদাভীরুদের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন, তারা সচ্ছলতা- অসচ্ছলতা, দুঃখ-সুখ, প্রাচুর্য ও দারিদ্র্য সর্বাবস্থায় অনুগ্রহশীল। পক্ষান্তরে এমন লোক রয়েছে যারা প্রাচুর্য ও সচ্ছল অবস্থায় তো আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে; কিন্তু অসচ্ছলতা ও দরিদ্রাবস্থায় ব্যয় করে না। আল্লাহ তা'আলা এরপর বলেন, মুত্তাকীদের অন্য একটি গুণ হল, তারা ক্রোধ সংবরণ করে ক্ষমা করার মাধ্যমে প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থেকে মানুষকে কষ্ট প্রদান থেকে বিরত থাকে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করলেন, তারা কোন পাপ করে ফেললে তাদের ও তাদের প্রভুর মাঝে কি অবস্থা সৃষ্টি হয়। সুতরাং তাদের থেকে যখন কোন গুনাহের কাজ হয়ে যায়, তখন তারা আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করে তাওবা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং সে পাপকার্যের পুনরাবৃত্তি ঘটায় না।

এটি হল আল্লাহর সাথে বন্ধনের চিত্র। আর পূর্বের প্রসঙ্গ হল বান্দাদের সাথে তাদের বন্ধনের চিত্র। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন এমন উদ্যান, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটা মহা সাফল্য।২২২

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা বললেন, জান্নাত মুহাজির ও আনসার এবং নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণকারীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। সুতরাং যারা তাদের পথ হতে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে তারা যেন জান্নাতে প্রবেশের আশাও না করে।

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ মু'মিন তো তারাই, যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে। যারা নামায কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে, তারাই প্রকৃত মু'মিন। তাদের প্রতি পালকের নিকট তাদেরই জন্য রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।২২৩

উল্লিখিত আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়টিই সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, মু'মিন সে ব্যক্তি, যে বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক সকল হক পালন করে ও আল্লাহর বান্দাদের হকও আদায় করে।

সহীহ মুসলিমে২২৪ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, হুনায়নের দিনে সাহাবাদের এক জামাত এসে বলতে লাগলেন, অমুক শহীদ হয়ে গেছে ও অমুক শহীদ হয়ে গেছে। তখন তারা এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করতে গিয়ে বলল, অমুকও শহীদ হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কখনো নয়; আমি তাকে জাহান্নামে দেখতে পাচ্ছি সে চাদর বা কম্বলটির কারণে, যেটি সে গনীমতের মাল হতে চুরি করেছিল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও, জান্নাতে একমাত্র মু'মিনগণই প্রবেশ করবে। হযরত উমর রা. বলেন, আমি ঘোষণা করলাম, জান্নাতে একমাত্র মু'মিনগণই প্রবেশ করবে। অভিন্ন অর্থবিশিষ্ট বর্ণনা বুখারীতে এসেছে।

সহীহায়নে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল রা. কে নির্দেশ দিলেন, ঘোষণা করে দাও, জান্নাতে একমাত্র মুসলিম ব্যক্তিই প্রবেশ করবে। হাদীসের কোন কোন মতনে নফস মু'মিনা (মু'মিন ব্যক্তি) উল্লেখ রয়েছে।

সহীহ মুসলিমে২২৫ হযরত ইয়ায ইবনে হিমার আল মুজাশিয়ী রা. হতে বর্ণিত আছ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার খুতবায় বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সে সব বিষয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য যা তোমরা জান না। আল্লাহ তা'আলা অদ্যাবধি আমাকে যে সকল বস্তু শিখিয়েছেন তন্মধ্যে কিছু হল এই, (আল্লাহ তা'আলা বলেন,) আমি নিজ বান্দাকে যে সম্পদ দান করি তা হালাল এবং আমি আমার সকল বান্দাকে একই আদর্শের উপর সৃষ্টি করেছি (অর্থাৎ ফিতরাতে ইসলামী) কিন্তু শয়তান তাদের নিকট এসে তাদেরকে আপন ধর্মত্যাগী করে। সুতরাং শয়তান তার জন্য সে সকল বস্তু হারাম করে দেয় যা আমি তার জন্য হালাল করেছি এবং শয়তান তাদেরকে সে সকল বস্তুকে আমার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করার নির্দেশ দেয় যে ব্যাপারে কোন দলীল-প্রমাণ নেই। আল্লাহ তা'আলা নির্বাচিত কিছু আহলে কিতাব ব্যতীত আরব-অনারব সমগ্র পৃথিবীবাসীর প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি আরো বললেন, আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি আপনাকে ও আপনার মাধ্যমে অন্যদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আর আমি আপনার প্রতি এমন গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যাকে পানিও ধুয়ে মুছে ফেলতে পারবে না, তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত সর্বাবস্থায় পাঠ করুন। আল্লাহ তা'আলা কুরাইশকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, হে প্রভু! তারা তো আমার শির পিষে ফেলবে ও তা রুটির মত ছড়িয়ে দিবে। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, তারা আপনাকে যেমনিভাবে বহিষ্কার করেছে, আমিও তাদের তেমনিভাবে বহিষ্কার করব। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন, আমি আপনাকে সহায়তা করব। আপনি ব্যয় করুন, আমি আপনার উপর শীঘ্রই ব্যয় করব। তাদের বিরুদ্ধে সৈন্যদল প্রেরণ করুন, আমি তাদের সাথে আরো পাঁচগুণ সৈন্য প্রেরণ করব। আপনি আপনার অনুসারীদের সাথে নিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যান। আল্লাহ আরো বলেছেন, তিন ব্যক্তি জান্নাতী হবে। ঐ ক্ষমতাধর ব্যক্তি, যে ন্যায়পরায়ণ, দানবীর ও তাওফীকপ্রাপ্ত। দ্বিতীয়ত ঐ ব্যক্তি, যে দয়াশীল এবং প্রত্যেক মুসলমানসহ নিজ আত্মীয়দের সাথে নরমদিল। তৃতীয়ত ঐ নিস্কলুষ ব্যক্তি, যে নিজেকে অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। পক্ষান্তরে পাঁচ শ্রেণীর ব্যক্তি জাহান্নামী হবে। প্রথমত ঐ দুর্বল ব্যক্তি, যে অতিশয় নির্বোধ। যারা তোমাদের মাঝে নিম্ন শ্রেণীর হয়ে থাকবে। তোমাদের ভেতর সে পরিবার, সম্পদ কিছুই অন্বেষণ করে না। দ্বিতীয়ত ঐ খেয়ানতকারী, যে সারাক্ষণ লোভ-লালসার পেছনে পড়ে থাকে। সামান্যতম জিনিসও খেয়ানত করতে ছাড়ে না। তৃতীয়ত ঐ প্রতারক, যে সকাল-সন্ধ্যা তোমাকে তোমার পরিবার ও সম্পদের ক্ষেত্রে অনবরত প্রতারণা করে যায়। চতুর্থত: কৃপণ বা মিথ্যুক। পঞ্চমত: অশ্লীলতায় অভ্যস্ত পাপাচারী। আল্লাহ আমাকে ওহীর মাধ্যমে এই নির্দেশ দিতে বলেছেন, হে লোক সকল! তোমরা এতটা বিনয়ী হও, একজন যেন অন্যজনের উপর গর্ব না করে এবং কেউ যেন অপরকে ছাড়িয়ে যেতে উগ্র না হয়।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের সম্পর্কে বলব না? নবীগণ জান্নাতী, সত্যবাদীগণ জান্নাতী, শহীদগণ জান্নাতী এবং যে ব্যক্তি শহরের প্রান্ত হতে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য আগমন করে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে। তোমাদের স্ত্রীগণের মধ্যে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যারা স্বামী ও সন্তানকে অধিক ভালবাসে এবং অধিক সন্তান জন্ম দেয়। সাথে সাথে তার মানসিকতা এমন, যদি তার প্রতি স্বামী অসন্তুষ্ট অথবা সে স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকে, তখন সে এগিয়ে এলে স্বীয় হাত স্বামীর হাতে রেখে বলে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সন্তুষ্ট না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সামান্যতম কোন কিছুই মুখে নেব না। (অর্থাৎ স্বামীর সাথে অভিমান এবং আত্মম্ভরিতা করে না এবং সে চায় না যে স্বামী তাকে খোশামোদ করুক; বরং সে-ই স্বামীকে খোশামোদ করে ও তুষ্ট করে।)

ইমাম নাসাঈ রহ. এ হাদীসের শুধু সে অংশ উল্লেখ করেছেন, যেখানে মহিলাদের ফযীলত বর্ণিত রয়েছে। হাদীসের অবশিষ্ট অংশও তার বর্ণনাশর্ত মোতাবেক।

ইমাম আহমাদ রহ. স্বীয় মুসনাদে বিশুদ্ধ সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. হতে বর্ণনা করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কর্কশভাষী, উগ্র-প্রকৃতির, দুশ্চরিত্রবান, অহংকারী, সম্পদ সঞ্চয়কারী ও সৎকাজে বাধা প্রদানকারী ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। আর যে সকল ব্যক্তিকে দুর্বল ও অধীনস্থ মনে করা হয় তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. তাঁর সুনানে২২৬ স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জান্নাতী হল সে ব্যক্তি, মানুষ যার উত্তম প্রশংসা করে। মানুষ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। লোকদের প্রশংসা তার শ্রুতিগোচর হয়ে কর্ণরন্ধ ভরে উঠে। আর জাহান্নামী সে ব্যক্তি, যার কু-কীর্তি ও মন্দ কর্মের বিবরণ মানুষ দিতেই থাকে। আর সে তা শুনতে শুনতে কান ভরে যায়। তবু তা পরিহার না করে তা শুনেই যায়। (অর্থাৎ নিজের সংশোধনের কোন চেষ্টা করে না)

সহীহায়নে২২৭ হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একটি জানাযা নিয়ে লোকজন অতিক্রম করলে তার উত্তম প্রশংসা করা হল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, وَجَبَتْ وَجَبَتْ وَجَبَتْ অর্থাৎ তার জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছে, আবশ্যক হয়ে পড়েছে, আবশ্যক হয়ে পড়েছে। অতঃপর অন্য একটি জানাযা নিয়ে লোকজন অতিবাহিত হলে তার দুর্নাম করা হল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, وَجَبَتْ وَجَبَتْ وَجَبَتْ অর্থাৎ তার জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছে, আবশ্যক হয়ে পড়েছে, আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

হযরত ওমর রা. বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক। যে জানাযার প্রশংসা করা হয়েছে, আপনি তার ব্যাপারে তিনবার বলেছেন, وَجَبَتْ। এমনিভাবে যে জানাযার দুর্নাম করা হল, তার ব্যাপারেও আপনি তিনবার বলেছেন, وَجَبَت। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তির তোমরা উত্তম প্রশংসা করলে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর যার তোমরা দুর্নাম করলে, তার জন্য জাহান্নام ওয়াজিব হয়ে গেছে। এ পৃথিবীতে তোমরাই হলে আল্লাহ তা'আলার সাক্ষী।

এরই সর্মার্থবোধক অন্য এক হাদীসে রয়েছে, তোমরা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের ব্যাপারে জেনে নাও। সাহাবাগণ রা. আরয করলেন, কিভাবে ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উত্তম প্রশংসা ও বদনামের মাধ্যমে। (অর্থাৎ যে ব্যক্তির উত্তম প্রশংসা করা হয়েছে সে জান্নাতী, আর যে ব্যক্তির অনিষ্টতা ও পাপ ও দুরাচারের আলোচনা করা হয় সে জাহন্নামী।) মোদ্দা কথা হল, জান্নাতবাসীগণ চার শ্রেণীতে বিভক্ত। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের কথা উল্লেখ করেছেন। وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন তাদের সংগী হবে।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলার মহান দরবারে আমাদের এ-ই প্রার্থনা যে, আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার অনুগ্রহ ও ফযলগুণে তাঁদের দলভুক্ত করুন।

টিকাঃ
২২১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩-৩৬
২২২. সূরা তাওবা, আয়াত: ১০০
২২৩. সূরা আনফাল, আয়াত: ২-৪
২২৪. খ. ১, পৃ. ৭৪
২২৫. খ. ২, পৃ. ৩৮৫
২২৬. পৃ. ৩১১
২২৭. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৮৩, মুসলিম. খ. ১ পৃ. ৩০৮

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 উম্মতে মুহাম্মদী-ই জান্নাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে

📄 উম্মতে মুহাম্মদী-ই জান্নাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে


সহীহায়নে২২৮ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি চাও না, জান্নাতে তোমাদের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ হোক, একথা শুনে আমরা সমস্বরে আল্লাহু আকবার বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি চাও না, জান্নাতে তোমাদের সংখ্যা এক-তৃতীয় অংশ হোক। আমরা সমস্বরে আল্লাহু আকবার বললাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি আশাবাদী, তোমরা জান্নাতে অর্ধেক হবে। তোমাদেরকে আমি বিষয়টি স্পষ্ট করে বলছি, কাফিরদের বিপরীতে মুসলমানদের সংখ্যা সে পরিমাণ, যে পরিমাণ সাদা লোম থাকে কালো গরুর গায়ে। মুসলিম শরীফে বর্ণিত শব্দ মতে, তাতে রয়েছে بيضاء আর বুখারীর বর্ণনায় রয়েছে في ثور أبيض

হযরত বুরাইদা ইবনুল হুসাইব রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জান্নাতীদের ১২০টি কাতার থাকবে, তন্মধ্যে ৮০টি হবে এই উম্মতের অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদীর। ইমাম আহমাদ রহ. এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এর সনদ সহীহের বর্ণনার শর্ত মোতাবেক রয়েছে।

ইমাম তাবারানী রহ. তাঁর মুজামে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার সনদে খালিদ ইবনে ইয়াযিদ নামক একজন বর্ণনাকারী বিতর্কিত। ইমাম তাবারানী রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত হাদীসও উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা এক-চতুর্থাংশ জান্নাতী হবে, আর বাকী তিন অংশ অন্যান্য উম্মতের হবে তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে? সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন তোমাদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ হবে, তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে? সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, অত্যন্ত সন্তোষজনক অবস্থা। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন তোমাদের সংখ্যা জান্নাতে জান্নাতীদের অর্ধেক হবে, তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে? সাহাবায়ে কিরাম রা. বললেন, অত্যন্ত সন্তোষজনক অবস্থা। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতীদের ১২০ কাতার থাকবে তন্মধ্যে ৮০ কাতার থাকবে তোমাদের।

ইমাম তাবারানী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি হারিস ইবনে হুসাইরাহ কাসিম হতে একাই বর্ণনা করেছে। এমনিভাবে আবদুল ওয়াহেদ বিন যিয়াদ হারিস বিন খুযাইমা হতে একাই বর্ণনা করেছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ রহ. স্ব সনদে হযরত আবু হুরায়রাহ রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন * ثُلَّةٌ مِّنَ الْأَوَّلِينَ * وَثُلُةٌ مِّنَ الْآخِرِينَ আয়াতটি অবতীর্ণ হল (তাদের মধ্য অনেকে হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অনেকে হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা জান্নাতীদের এক-চতুর্থাংশ হবে, তোমরা জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ হবে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে, তোমরা জান্নাতীদের দুই-তৃতীয়াংশ হবে।

ইমাম তাবারানী বলেন, এ হাদীসটি ইবনুল মুবারক একাই সাওরী হতে মারফু হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

খাইসামাহ ইবনে সুলাইমান কুরাশী রহ. স্ব-সনদে হযরত হাকিম হতে এবং হাকিম স্বীয় পিতা মুআবিয়া ইবনে হায়দা কুশাইরী রহ. হতে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতীগনের ১২০ কাতার থাকবে, তন্মধ্যে ৮০ কাতার থাকবে তোমাদের।

এ হাদীসের অনেকগুলো সনদ রয়েছে, তন্মধ্যে কিছু কিছু সহীহ। এ সকল হাদীসের সাথে সে হাদীসের কোন বিরোধ নেই যাতে রয়েছে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম আশা পোষণ করেছিলেন, এ উম্মত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর আশা পূরণ করেছেন ও তাঁর চেয়ে এক-ষষ্ঠাংশ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন।

ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলতে শুনেছি, আমি আশা করি আমার উম্মতের যে সকল লোক আমার অনুস্বরণ করবে তারা জান্নাতের এক-চতুর্থাংশ হবে। হযরত জাবির রা. বলেন, তখন আমরা খুশীতে আল্লাহু আকবার বলে উঠলাম। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে।

এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. এর বর্ণনা শর্ত মোতাবেক।

টিকাঃ
২২৮. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৯৬৬, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ১১৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাত ও জাহান্নামে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে

📄 জান্নাত ও জাহান্নামে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে


সহীহায়নে হযরত মুহাম্মদ ইবনে সীরীনের বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেছেন, তোমরা কি পরস্পরে গর্ব অথবা আলোচনা কর না যে, জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা অধিক হবে নাকি পুরুষের সংখ্যা অধিক হবে? হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি একথা বলেননি, প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমার চাদের ন্যায় উজ্জ্বল হবে। আর যারা তাদের পরে প্রবশ করবে তারা হবে আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের ন্যায়। সেখানে প্রত্যেকের জন্য এমন দু'জন স্ত্রী থাকবে যাদের সৌন্দর্য ও রূপলাবণ্যের দরুন তাদের গোস্ত ভেদ করে পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।'

উল্লেখ্য, জান্নাতে স্ত্রী ব্যতীত অন্য কেউই থাকবে না। যদি তারা সকলেই দুনিয়ার স্ত্রীলোক হয়ে থাকে, তবে তো কোন সমস্যা নেই। কেননা, দুনিয়াতে পুরুষের তুলনায় মহিলা অধিক। আর যদি তারা দুনিয়ার স্ত্রীলোক না হয়ে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূর হয়, তবে এদ্বারা জান্নাতে পুরুষের তুলনায় মহিলা অধিক হওয়ার বিষয়টি বুঝায় না।

অথচ এ কথা সুস্পষ্ট যে, তারা হুরই হবে। দলীল হল, ইমাম আহমদ রহ. স্ব-সনদে২২৯ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
للرجل من أهل الجنة زوجتان من حور العين على كل واحدة سبعون حلة يرى من ساقها من وراء الثياب
জান্নাতী পুরুষের জন্য সেখানে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট দু'জন স্ত্রী থাকবে। তাদের প্রত্যেকের পরনে ৭০ জোড়া কাপড় থাকবে। তারপরও পোশাক ভেদ করে তাদের পায়ের গোছার মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে।

প্রশ্ন: যদি এ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, জান্নাতে মহিলাদের আধিক্য হবে, এ দাবীর সাথে এই হাদীসের কোন সামঞ্জস্য রয়েছে, যে হাদীসে রয়েছে, জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা কম হবে। যেমন হযরত জাবির রা. হতে মুত্তাফাক আলাইহি২০০ হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ঈদে উপস্থিত ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার পূর্বে আযান ও ইকামত ব্যতীত নামায আদায় করলেন। নামায শেষে খুতবা দিলেন, তাতে লোকদের উপদেশ দিলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের নিকট তাশরীফ নিলেন ও তাদেরকে উপদেশ দিলেন। হযরত বিলাল রা. তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি মহিলাদেরকে উপদেশ দিলেন এবং সদকা করার নির্দেশ দিলেন। তখন মহিলারা তাদের আংটি, কানের দুল ও অন্যান্য বস্তু দান করতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বিলাল রা. কে সে সব বস্তু একত্রিত করার নির্দেশ দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে মহিলারা! জান্নাতে তোমাদের সংখ্যা কম হবে। একজন মহিলা প্রশ্ন করল, এর কারণ কি? ইয়া রাসূলাল্লাহ! উত্তরে বললেন, তোমরা অধিক হারে লা'নত করে থাকো। এছাড়া তোমরা স্বামীর অকৃতজ্ঞতাও করে থাকো।' উক্ত হাদীস ছাড়াও অন্য এক হাদীসে এসেছে, 'জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা কম হবে।'

জবাব : যদি জান্নাতে সৃষ্ট হুরদেরকেও মহিলাদের মধ্যে গণনা করা হয়, তাহলে জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যা অধিক হবে। আর যদি হুরদেরকে সেই জান্নাতী মহিলাদের সাথে গণনা করা না হয় তাহলে জান্নাতে দুনিয়ার মহিলাদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম হবে। সুতরাং দুনিয়ার মহিলার সংখ্যা জান্নাতে কম হবে ও জাহান্নামে অধিক হবে।

এই মহিলাদের সংখ্যা জাহান্নামে অধিক হওয়ার প্রমাণ হল ঐ হাদীস, যা ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখরীতে২৩১ হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি এ বিষয়ে জেনেছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেলেন, আমি উঁকি মেরে জাহান্নাম দেখেছি। সেখানে মহিলাদেরই আধিক্য ছিল। এরপর আমি উঁকি মেরে জান্নাতও দেখেছি। সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেয়েছি।

সহীহ মুসলিমে২৩২ হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি উঁকি মেরে জান্নাত দেখেছি সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম। এরপর আমি জাহান্নামেও উঁকি মেরে দেখলাম। সেখানে মহিলাদের আধিক্য দেখতে পেলাম'।

ইমাম আহমদ রহ. সহীহ সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আমি উকি মেরে জাহান্নাম দেখেছি। সেখানে মহিলাদের আধিক্য ছিল। তারপর জান্নাতেও দেখেছি। সেখানেও দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম।'

মুসনাদে আহমাদে২৩৩ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি উঁকি মেরে জান্নাত দেখেছি সেখানে দরিদ্রদের আধিক্য দেখতে পেলাম, জাহান্নামেও উঁকি মেরে দেখলাম। সেখানেও মহিলাদের আধিক্য দেখতে পেলাম।'

সহীহ মুসলিমে২৩৪ হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে মহিলারা! তোমরা সদকা কর ও অধিক হারে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আমি জাহান্নামে তোমাদের অধিক সংখ্যা দেখেছি। তাদের মধ্যে স্থূল গোছা বিশিষ্ট একজন মহিলা জিজ্ঞাসা করল, আমরা কেন অধিক হারে জাহান্নামী হব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কারণ তোমরা অধিক হারে লা'নত করে থাক এবং স্বীয় স্বামীর অকৃজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক। আমি তোমাদের মত দীন ও জ্ঞানস্বল্পতা সম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি, যা সহজেই তোমাদের কাবু করে ফেলে। সে মহিলা পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের মাঝে দীন ও জ্ঞানস্বল্পতা কিরূপ? জ্ঞানেরস্বল্পতা তো এর দ্বারাই প্রতীয়মান হয় যে, সাক্ষীর ক্ষেত্রে তোমাদের দু'জনের সাক্ষকে একজন পুরুষের সাক্ষীর সমপরিমাণ গন্য করা হয়েছে। আর তোমরা ঋতুস্রাব ও নিফাসাবস্থায় কিছু দিন নামায পড়তে পার না, রোযাও রাখতে পার না। এটাই হল তোমাদের দীনের মাঝে দীনতা ও হীনতা।

জান্নাতে মহিলাদের সংখ্যার স্বল্পতা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. একাই বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করেননি। ইমাম মুসলিম রহ. মুতরিফ বিন আবদুল্লাহ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেন, তাঁর দু'জন স্ত্রী ছিল। তিনি একজনের সাথে সাক্ষাত করে অন্য জনের নিকট গেলে সে বলল, আপনি অমুক মহিলার সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন। তিনি বললেন, আমি হযরত ইমরান বিন হুসাইন রা.-এর নিকট হতে এলাম। তিনি আমার নিকট এই হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা স্বল্প হবে।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আবূ ইয়ালা মুসেলী-এর স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীসের সমাধান কী হবে? যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন, আমি সাহাবাদের এক জামাতে উপস্থিত ছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (দীর্ঘ হাদীস উল্লেখ করেছেন। তাতে এ শব্দাবলীও ছিল) জান্নাতী ব্যক্তি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য এমন ৭২ জন স্ত্রী থাকবে; যাদেরকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ হূর। এছাড়াও মানব সম্প্রদায় হতে দু'জন করে স্ত্রী থাকবে। এই দুই স্ত্রীর মর্যাদা সকল হুরদের চেয়ে বেশি হবে। কারণ, তারা দুনিয়ায় থাকাকালে ইবাদাত করেছিল।

জবাব : দীর্ঘ এ হাদীসটির এ অংশটুকু শুধুমাত্র ইসমাঈল বিন রাফে নামক একজন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন। উক্ত বর্ণনাকারীকে ইমাম আহমদ রহ. ইয়াহইয়া রহ. ও মুহাদ্দিসীনে কিরামের এক জামাত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুতনী বলেন, উক্ত বর্ণনাকারীর হাদীস প্রত্যাখ্যাত। ইবনে আদী বলেন, এ সকল হাদীসে আপত্তি রয়েছে।

এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. এর মন্তব্য ইমাম তিরমিযী রহ. বর্ণনা করে বলেন, আমি উক্ত বর্ণনাকারীর ব্যাপারে হযরত ইমাম বুখারী রহ. কে বলতে শুনেছি, সে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী এবং তার হাদীস গ্রহণযোগ্য।

আমি (ইবনুল কায়্যিম জাওযী) বলব, এ জাতীয় বর্ণনাকারীর বর্ণনা যদি অন্যান্য সহীহ হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ হয় তবে তা গ্রহণ না করাই উত্তম। তাছাড়া উক্ত হাদীসটির অগ্রহণযোগ্যতার আরেকটি দিক হল, ইসমাঈল হতে বর্ণনাকারী কুরদী হল অজ্ঞাত পরিচয়। তার ব্যপারে কিছু জানা যায়নি।

ইমাম আহমদ রহ. মুসনাদে২৩৫ উমারা ইবনে খুযাইমা ইবনে সাবিত রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর সাথে হজ্জ বা উমরার সফরে ছিলাম। আমরা যখন 'মাররুয যাহরানে' পৌঁছলাম, তখন একজন মহিলা দেখতে পেলাম, তার উটের হাওদায় করে সফর করছিল। হযরত উমারা রা. বললেন, হযরত আমর ইবনুল আস রা. রাস্তা হতে সরে গিরিপথে ঢুকে গেলেন, আমরাও তার সাথে ঢুকে গেলাম। তখন তিনি বললেন, আমরা একবার এ স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ অনেক কাক এসে এখানে একত্রিত হল। তন্মধ্যে একটি কাক এমন ছিল যার পালকগুলোর মাঝে কিছুটা শুভ্রতা ছিল এবং ঠোট ও পা ছিল লাল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অন্যান্য কাকের তুলনায় যেমন এ ধরনের কাকের সংখ্যা কম, তেমনি জান্নাতেও মহিলাদের সংখ্যা হবে কম।

উক্ত হাদীসে لأعصم শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। أعصم বলা হয় এমন কাককে যার কিছু পালক থাকবে শুভ্র। নিহায়া গ্রন্থে الغراب الأعصمসে কাককে বলা হয়েছে যার কিছু পালক শুভ্র। উক্ত উপমা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য হল, মহিলারা জান্নাতে স্বল্পসংখ্যক হবে। কেননা অন্যান্য কাকের তুলনায় শুভ্র পালক বিশিষ্ট কাক খুবই কম পাওয়া যায়।

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, নেক মহিলারা হলেন আ'সাম তথা শুভ্র পালক বিশিষ্ট কাকের ন্যায়। সাহাবাগণ রা. প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গুরাব আ'সাম কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হল, ঐ কাক যার এক পা সাদা।

অন্য হাদীসে এসেছে, অন্য মহিলাদের তুলনায় হযরত আইশা রা. ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে অন্য কাকের তুলনায় শুভ্র পালক ও পা বিশিষ্ট কাক। অর্থাৎ তিনি অনন্য বৈশিষ্ট মর্যাদা ও স্বতন্ত্রতার অধিকারী।

টিকাঃ
২২৯. মুসনাদে আহমদ, খ. ২, পৃ. ৩৪৫
২০০ বুখারী, খ. ১ প. ১৩১, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১৮৯
২৩১. খ. ১, প. ৪৬০
২৩২, খ: ১ পৃ: ৬০
২৩৩. খ: ২ পৃঃ ১৭৩
২৩৪. খ: ১ পৃ: ৬০
২৩৫. খ. ৪ পৃ. ১৯৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন যারা

📄 বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন যারা


সহীহায়নে২৩৬ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের একটি দল জান্নাতে প্রবেশ করবে। যাদের সংখ্যা হবে ৭০ হাজার। তাদের চেহারা পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় হবে। হযরত উকাশা বিন মিহসন আসাদী রা. দাঁড়িয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন তাঁর শরীরে একটি নকশী চাদর ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করলেন, আল্লাহ! উকাশাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আনসারদের এক ব্যক্তি উঠে তদ্রূপ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্যও দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার অগ্রগামী হয়ে গেছে।

সহীহায়নে২৩৭ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই আমার উম্মতের ৭০ হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথবা তিনি বলেছেন, সাত লক্ষ লোক পরস্পরে হাত ধরাধরি করা অবস্থায় বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের মুখাবয়ব পূর্ণিমা রাতের চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হবে। বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে এরাই প্রথম দল। সহীহায়নে বর্ণিত হাদীসই তার দলীল। এখানে মুসলিমে বর্ণিত শব্দ উল্লেখ করা হচ্ছে।

হযরত খুসাইফ ইবনে আবদুর রহমান বলেন,২৩৮ আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর রা.-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে গত রাতে ভাঙ্গা তারা দেখেছ? জবাবে আমি বললাম, আমি দেখেছি এবং আমি আরো বললাম, আমি নামাযরত ছিলাম না; বরং আমাকে একটি বিষাক্ত কীট দংশন করেছে। (সে ব্যাথার কারনে আমি জাগ্রত ছিলাম) তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, দংশনের প্রতিকার স্বরুপ তুমি কি করেছিলে? আমি বললাম, ঝাড়-ফুঁক করেছি। তিনি বললেন, কিসে তোমাকে তা করতে উদ্বুদ্ধ করল। আমি বললাম, শা'বী রহ. কর্তৃক আমার নিকট বর্ণিত একটি হাদীস আমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বললেন, কি সেই হাদীস? আমি হযরত বুরাইদা ইবনুল হাসাব আসলামীর বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করলাম। তিনি বলেন, শুধু নযর লাগলে অথবা কোন বিষধর কীট দংশন করলে ঝাড়-ফুঁক করা ও করানো জায়েয আছে। হযরত সাঈদ রা. বললেন, তার শ্রুত বিষয়টিও ভাল। তবে হযরত ইবনে আব্বাস রা. আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে পৃথিবীর শুরু থেকে অদ্য পর্যন্ত সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছে। তখন আমি এক নবীকে দেখতে পেলাম, যার সাথে এক কাফেলা সমান উম্মত আছে। কোন নবীর সাথে উম্মত হচ্ছে এক বা দুই ব্যক্তি মাত্র। কোন কোন নবীর উম্মতই নেই। এরপর একটি বড় দলকে আমার সামনে আনা হল। আমি ধারণা করলাম, এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হল, এরা মূসা আ.-এর উম্মত। আমাকে বলা হল, আপনি এক দিগন্ত লক্ষ্য করুন। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, সেখানে বিশাল সংখ্যক লোক রয়েছে। তখন আমাকে বলা হল, এরা হল আপনার উম্মত, এদের মাঝে এমন ৭০ হাজার লোক রয়েছে, যারা কোন হিসাব-নিকাশ ও কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। এতটুকু বলার পর রাসূল সেখান থেকে উঠে স্বীয় কক্ষে তাশরীফ নিলেন। তখন লোকেরা সে সকল লোক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে লাগল যারা কোন হিসাব নিকাশ এবং কোন প্রকার কষ্ট ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে লাগলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাহাবীগণ-ই হলেন সে সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা। কেউ কেউ বললেন, সে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হল তারা, যারা মুসলমান হিসাবেই জন্মলাভ করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে কখনো কাউকে শরীক করেনি। এছাড়াও বিভিন্ন জন বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকলেন।

ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট তাশরীফ এনে বললেন, তোমরা পরস্পরে কোন্ ব্যাপারে আলোচনায় লিপ্ত? সাহাবা রা. আলোচনার বিষয় খুলে বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেলেন, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হল তারা, যারা ঝাড়-ফুঁক ও তাবীয, মন্ত্র করেনি ও করায়নি এবং কোন কু-লক্ষণ গণনা করেনি; বরং একমাত্র স্বীয় প্রভুর উপরই ভরসা করত।

হযরত উকাশা রা. দাঁড়িয়ে আরয করলেন, আমার জন্য দু'আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তখন অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আরয করল, আমার জন্য দু'আ করুন যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার থেকে অগ্রগামী হয়ে গেছে। বুখারীতে لا يرقون শব্দটি নেই।

শায়খ ইবনে তায়মিয়া বলেন, এটা বিশুদ্ধ। কেননা, কোন বর্ণনাকারী ভুলক্রমে তা হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। সুতরাং প্রতীয়মান হল, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র খালেছ তাওহীদ মেনে চলা ও তাওহীদ পরিপন্থী কার্যাবলী হতে বিরত থাকাকেই বিনা হিসাবে জান্নাত লাভের মাধ্যম নির্ণয় করেছেন। অন্যের নিকট হতে ঝাড়-ফুঁক, তাবীয-মন্ত্র গ্রহণ না করা, কু-লক্ষণ গন্য না করা ও একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করাই হল বিনা হিসাবে জান্নাত লাভকারীর গুনাগুন ও বৈশিষ্ট্য। কুলক্ষণ গন্য করাও এক প্রকার শিরক। সুতরাং সে কু-লক্ষণ গন্য করবে না ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপর ভরসা করবে না। কেননা, এটাই তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পর্যায়। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে الطيرة شرক২৩৯ অর্থাৎ কুলক্ষণ গণ্য করা হল শিরক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই তো কুলক্ষণ গণ্য করে। তবে তাওয়াক্কুলের কারনে আল্লাহ তাআলা তা আমাদের থেকে দূরীভূত করেন। তাওয়াক্কুল হল, কুলক্ষণের বিপরীত। তবে হ্যাঁ, নযরের জন্য ঝাঁড়-ফুঁক করতো ঝাঁড়-ফুঁককারীর পক্ষ হতে একটা অনুগ্রহ।

হযরত জিবরীল আ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দম করেছিলেন এবং দম করার অনুমতি প্রদান করে বলেছেন, এতে আমি ক্ষতিকর কোন কিছু দেখি না, যদি তাতে শিরক না করা হয়। সাহাবাগণ রা. এব্যপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমাদের কেউ অন্য ভাইয়ের কোন প্রকার উপকার করতে পারে, তবে সে যেন তা করে।

এর দ্বারা বুঝা যায়, এটা শুধুমাত্র উপকার সাধন ও অনুগ্রহের কাজ। যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অত্যন্ত পসন্দনীয় বিষয়। আর দম প্রার্থনাকারী হল, অন্যের নিকট উপকার প্রার্থনাকারী যা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী।

প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আইশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দম করেছিলেন। জিবরীল আ. ও দম করেছিলেন। (তাহলে কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কাজটি তাওয়াক্কুল পরিপন্থী হয়নি, নাউযুবিল্লাহ)

জবাব : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দম করার জন্য বলেননি, এ কথাতো বলেননি যে, কোন ঝাড়-ফুঁক কারী যেন কাউকে দম না করে; বরং তিনি বলেছেন, যেন কেউ কাউকে ঝাড়-ফুঁক করতে না বলে।

সহীহ মুসলিমে২৪০ হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের ৭০ হাজার লোক হিসাব-নিকাশ ও কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হল, সে সকল লোক কারা? বললেন, সে সকল লোক তারা, যারা কোন অঙ্গে দাগ তথা সেঁক দেয়নি, ঝাড়-ফুঁক করেনি, কোন প্রকার কুলক্ষণ গন্য করেনি বরং স্বীয় প্রভুর উপর তাওয়াক্কুল করত।

সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি, তার মধ্যে এশব্দগুলোও ছিল, প্রথম দল সফলকাম হবে, তাদের মুখমণ্ডল পূর্ণিমা চাদের ন্যায় জ্বলজ্বলে ও দীপ্তিমান হবে। তাদের সংখ্যা হবে ৭০ হাজার। তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের নিকটতমদের অবস্থা আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের ন্যায়। এভাবে স্তর বিন্যাস হবে।

আহমদ ইবনে মানী স্বীয় মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে আমার উম্মতের হাশরের অবস্থা দেখানো হয়েছে। আমি তাদের অবস্থা ও আধিক্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কেননা, পাহাড় ও সমতল সকল স্থানেই তাদের অবস্থান বিস্তৃত ছিল। আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, হে মুহাম্মদ! তুমি কি সন্তুষ্ট? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তাদের মাঝে ৭০ হাজার লোক এমন, যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হল সে সকল লোক, যারা ঝাড়-ফুঁক করবে না, দাগ তথা সেঁক দিবে না, একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করবে।

হযরত উকাশা ইবনে মিহসান রা. দাঁড়িয়ে আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তখন অন্য লোক দাঁড়িয়ে তেমনি আরয করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার থেকে অগ্রগামী হয়ে গেছে। উক্ত হাদীসের সনদ ইমাম মুসলিম রহ.-এর সনদের শর্ত মোতাবেক।

টিকাঃ
২৩৬. বুখারী, খ. ২, পৃ. ১১৬
২৩৭. বুখারী, ২. পৃ. ৯৬৯, মুসলিম. খ. ১ পৃ. ১১৬
২৩৮. উক্ত কিতাবের উভয় নুসখাতেই খুসাইফ ইবনে আ. রহমান উল্লেখ করা হয়েছে, তবে মুসলিম শরীফে হুসাইন ইবনে আ. রহমান উল্লেখ রয়েছে।
২৩৯. তিরমিযী, খ. ১. পৃ. ২৯০
২৪০. খ: ২ পৃ: ১১৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00