📄 জান্নাতের কিয়দাংশ আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে একটি প্রাসাদ নিজের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাকে আপন আরশের নিকটবর্তী করার মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। সে উদ্যানের বৃক্ষ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে লাগিয়েছেন। এ জান্নাত হবে সকল জান্নাতের সর্দার। আল্লাহ তা'আলা এটাকে জান্নাতের সকল অংশ থেকে উত্তম, মর্যাদাশীল উঁচু স্তরের করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ফিরিশতাদের মধ্যে হযরত জিবরীল আ. কে, মানবকুলের মাঝে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে, আকাশের মাঝে সর্বাপেক্ষা উপরের আকাশকে, শহরের মধ্যে মক্কা মুকাররমাকে, মাসের মধ্যে মুহাররামকে, (রমযান ব্যতীত) রজনীর মধ্যে লাইলাতুল কদরকে, দিনের মধ্যে জুমুআর দিনকে এবং এমনিভাবে অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রেও একই প্রজাতির মধ্যেও একটি অপেক্ষা অন্যটিকে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই পসন্দ করেন।
তাবারানী রহ. স্ব-সনদে স্বীয় মুজা'মে হযরত আবুদ দারদা রা. হতে বর্ণনা করেন, ২০২ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন রাতের শেষ তিন প্রহর বাকী থাকে, তখন আল্লাহ তা'আলা অবতরণ করেন। (তাঁর শান মোতাবেক) প্রথম প্রহরে লাওহে মাহফযের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সেখান থেকে যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন এবং যা ইচ্ছা রেখে দেন। দ্বিতীয় প্রহরে জান্নাতে আদনের প্রতি তাকান। এটি তাঁর অবস্থানস্থল (এখানে আরশের নীচেই এ জান্নাত)। এখানে তাঁর সাথে আম্বিয়ায়ে কিরাম, শহীদগণ ও সত্যবাদীগণ ব্যতীত অন্য কেউ থাকবে না। সেখানে এমন সব বস্তু রয়েছে যা কখনো কোন চর্মচক্ষু দেখেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কখনো তা কল্পনাও করেনি। অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা'আলা নিচে নেমে ঘোষণা করতে থাকেন, আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ কি আছে আমার কাছে কোন বস্তু প্রার্থনাকারী, আমি তাকে তা প্রদান করব। আছে কি কোন প্রার্থনাকারী, আমি তার প্রার্থনা মনযূর করব। সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ধারা বজায় থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنْ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا আর কায়েম করবে ফজরের নামায। নিশ্চয়ই ফজরের নামায উপস্থিতির সময়।২০২ অর্থাৎ এসময় আল্লাহ ও তার ফেরেশতা গণ উপস্থিত থাকেন।
হযরত হাসান বিন সুফিয়ান স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে তৈরী করেছেন। এখানে মুশরিক, মদ্যপ ও অহংকারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ।
দারিমী ও অন্যরা আবূ মাআয নুজায়হ ইবনে আব্দুর রহমানের মাধ্যমে হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল হারিছ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তিনটি বস্তু স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন, এক. হযরত আদম আ.কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। দুই. তাওরাত আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিন. ফিরদাউসের গাছগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লাগিয়েছেন। এরপর তিনি বলেছেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তাতে মদ পানকারী ও দায়্যুস প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে তো আমরা জানি, কিন্তু দায়্যুস কে? উত্তরে বললেন, যে ব্যক্তি নিজ পরিবারে কোন প্রকার নির্লজ্জ কাজের সুযোগ দেয় অর্থাৎ নিজ পরিবার- পরিজনের ভেতর অপকর্মে যার সম্মতি আছে।
দারেমী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে চারটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন। আরশ, কলম, জান্নাতে আর্দ্র ও হযরত আদম আ. কে। অতঃপর অন্য মাখলুক সৃষ্টির ক্ষেত্রে বলেছেন, كن فيكون 'হও, ফলে হয়ে যায়'। হযরত মাইসারাহ রা. হতে অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে তিনটি ব্যতীত কাউকে স্পর্শ করেননি। (বরং অন্য সব মাখলুককে এদ্বারা সৃষ্টি করেছেন) হযরত আদম আ. কে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। তাওরাত নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আদনের বৃক্ষরাজি নিজ হাতে রোপন করেছেন।
এমনিভাবে হযরত কা'ব রা. হতেও বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তিনটি বস্তুকেই নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ. কে নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছন। তাওরাত নিজ কুদরতী হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজি নিজ কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন। অতঃপর জান্নাতে আত্মকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি কথা বল, তখন তা বলতে লাগল, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।
শামার ইবনে আতিয়াহ রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দৈনিক পাঁচবার উন্মুক্ত করে দিয়ে বলেন, আমার বন্ধুদের জন্য তুমি তোমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি কর এবং সুগন্ধি ছড়াও।
ইমাম হাকিম রহ. মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজিকে কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন, যখন তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করল, তখন তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া হল। অতঃপর তা প্রত্যেক সাহরীর সময় খোলা হত এবং আল্লাহ তা দেখতেন, তখন তা বলত قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।
ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত এ ভাবে তৈরী করেছেন, তার দেয়ালের একটি ইট হল স্বর্ণের, অন্যটি হল রৌপ্যের। সেখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে বৃক্ষ রোপণ করেছেন। তখন তাকে কথা বলতে বললেন, তখন তা বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।
তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, সুসংবাদ তোমার জন্য, তুমিই হলে রাজা বাদশাহদের ঠিকানা।
ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আত্মকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। এর একটি ইট হল শুভ্র মুক্তার আর অন্য একটি ইট হল লাল মুক্তার এবং অন্যটি হল সবুজ মুক্তার। আর এর মেঝে হল কস্তুরীর, আস্তর মুক্তার, কাষ্ঠ যাফরানের। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে কথা বলতে বললেন, তখন সে বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তোমার মধ্যে আমি কোন কৃপনকে প্রবেশ কারাবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।২০৩
আল্লাহ তা'আলার এ বিশেষ মেহেরবানীর ব্যাপারে চিন্তা করা উচিৎ, আল্লাহ তা'আলা নিজ কুদরতী হাতে যে সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন আবার তার জন্যই স্ব-হাতে গুণে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। আদম সন্তানের জন্য এর চেয়ে অধিক মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে সৃষ্টি করে তাদের মর্যাদাবান করেছেন ও অন্যান্য মাখলুক থেকে ভিন্নতা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। ( وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ )তা অর্জনের তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই দিতে পারেন) সকল প্রাণীর উপর হযরত আদম আ. এর মর্যাদা যেমন, অন্যান্য জান্নাতের উপর এ জান্নাতের মর্যাদা ঠিক তেমনি।
হযরত ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহতে২০৪ হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হযরত মূসা আ. স্বীয় প্রভুকে জিজ্ঞাসা করেছেন, জান্নাতে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের কে হবে?
উত্তরে বলা হল, যে ব্যক্তি সকল লোক বেহেশতে প্রবেশের পর আসবে এবং তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কিভাবে প্রবেশ করব। সকল লোক আপন স্থান দখল করে নিয়েছে এবং যা কিছু নেওয়ার তা নিয়ে নিয়েছে। (আমার জন্য আর তাতে কি বাকী রয়েছে?) তখন তাকে বলা হবে, তুমি কি পসন্দ কর, তোমাকে সে পরিমাণ প্রাচুর্য দেওয়া হবে, যা দুনিয়ার সকল রাজা বাদশাহরও নেই। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমি এতেই সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি পাবে এবং এরচেয়ে চারগুণ বেশি পাবে। তখন সে বলবে, আমি এতে সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং বলবেন, এ-ই সে ব্যক্তি, যার জন্য আমি নিজ কুদরতী হাতে উত্তম প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করেছি এবং সে জান্নাতে মোহর লাগিয়ে দিয়েছি। ফলে তাকে কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ তার কথা শ্রবণ করেনি, কোন হৃদয় পটে তার কল্পনাকে স্থান দেয়নি। আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ কেউ জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে।২০৫
টিকাঃ
২০২. এ বর্ণনাটি তিরমিযীতে খ. ১, পৃ. ১০১ উদ্ধৃত হয়েছে।
২০৩. সূরা হাশর, আয়াত: ৯
২০৪. খ. ১ পৃ. ১০৬
২০৫. সূরা সাজদা, আয়াত: ১৭
📄 জান্নাতের প্রহরী, দারোগা ও তাদের সর্দারের নাম
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ যারা স্বীয় প্রতিপালককে ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে ও এর দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি ‘সালাম’২০৬।'
خزانة শব্দটি خازن এর বহুবচন যেমন حفظة হল حافظ এর বহুবচন। যে বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ উদ্দেশ্য সে বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যাকে বিশ্বস্ত রূপে নিয়োগ করা হয় তাকে خازن বলা হয়।
ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ মুসলিমে২০৭ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি যখন জান্নাতের দ্বারে উপস্থিত হয়ে তা খোলার জন্য প্রহরীকে বলব, তখন সে বলবে, আপনি কে? উত্তরে আমি বলব, আমি মুহাম্মদ। সে বলবে, হ্যাঁ আপনার পূর্বে কারো জন্যে দরযা না খোলার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইতোপূর্বে এ ব্যাপারে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে মুত্তাফাক আলাইহি হাদীস বর্ণনা হয়েছে। তাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্ত ায় এক জাতীয় দুটি বস্তু খরচ করবে জান্নাতের প্রহরী তাকে ডাকতে থাকবে। অর্থাৎ প্রত্যেক দ্বারের প্রহরীই এসে ডাকতে থাকবে, এদিক দিয়ে আস।
হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা তো এমন কথা যাতে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই, জান্নাতের প্রহরী তাকে ডাকবে, অর্থাৎ প্রত্যেক দ্বারের প্রহরীই এ বলে ডাকবে, এদিক দিয়ে আস। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই সম্মানতো সেই ব্যক্তির প্রাপ্য যার কোনো ত্রুটি নেই। নবীজী বলেন, হ্যা, আমি আশাবাদী, তুমি তাদের একজন হবে। অপর বর্ণনা মতে হযরত আবু বকর রা. জিজ্ঞাসা করলেন, এমন কেউ কি আছে; যাকে সকল দুয়ার হতে ডাকা হবে? নবীজী বললেন, হ্যাঁ, আমিও আশাবাদী, তুমি তেমন একজন হবে। যখন সিদ্দীকে আকবর রা. ঈমানী বলের পূর্ণতায় তার শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন তার অন্তরের এ কামনা ছিল, তাকে জান্নাতের সকল দরযা হতে আহবান করা হোক। তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করছিলেন, এমন কোন ব্যক্তি কি আছে যাকে জান্নাতের প্রত্যেক দরযা হতে আহবান করা হবে? যাতে ব্যক্তি আমলের দ্বারা তা লাভ করতে পারে। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, এ স্তরের জান্নাতও লাভ করা সম্ভব। তিনি তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছেন, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তিনি যেন এ প্রশ্ন করছিলেন, কেউ কি সে সকল স্তরে পূর্ণতা লাভ করতে পারবে, যার কারণে বেহেশতের প্রত্যেকটি দ্বার তাকে আহবান করবে?
সকল সৌন্দর্য ও শোভা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই জন্য। কত মর্যাদাবান ও সম্মানিত তিনি।
জান্নাতের সর্বাপেক্ষা ও বড় প্রহরীর নাম হল 'রিযওয়ান'। রিযওয়ান শব্দটি رض হতে উৎকলিত। জাহান্নামের প্রহরীর নাম হল মালিক, এটা ملك হতে উৎকলিত। এই শব্দের বর্ণে যে ধরনেরই হরকত দেয়া হোক না কেনো, তার অর্থের মাঝে অবশ্যই শক্তিমত্তা ও কঠোরতার ভাব পাওয়া যায়।
টিকাঃ
২০৬. সূরা যুমার, আয়াত: ৭৩
২০৭. খ. ১, পৃ. ১১২
📄 জান্নাতের দুয়ারে প্রথম কড়াঘাত
ইতোপূর্বে হযরত আনাস রা. এর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাবারানী রহ. কিছু সংযোজিত অবস্থায় বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের দ্বারে কড়াঘাত করবেন তখন জান্নাতের প্রহরী উঠে বলবে, 'আমি আপনার আগে কারো জন্য দরযা খুলব না এবং আপনার পরে কারো জন্য উঠে দাঁড়াবো না'। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের বহি:প্রকাশের জন্যই জান্নাতের প্রহরী তাঁর আগমন কালে উঠে দাঁড়াবে। জান্নাতের প্রহরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কারো জন্য উঠে দাঁড়াবে না; বরং অন্য প্রহরীগণ তার সেবায় নিয়োজিত থাকবে। তাদের উপর সেই প্রহরীর অধিপতির মর্যাদা লাভ হবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে শুধু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতের জন্য দাঁড় করেছেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে হেঁটে আসবে এবং তাঁর জন্য দরযা খুলে দেবে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যার জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে। কিন্তু আমার পূর্বেও একজন মহিলা জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইবে। আমি বলব, তুমি কে? সে বলবে, আমি সেই মহিলা, যে শুধুমাত্র অনাথ শিশুর জন্য পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি; বরং এ ভাবেই জীবন অতিবাহিত করেছে।২০৮
তিরমিযীতে২০৯ হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, কয়েকজন সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনলেন। তিনি যখন তাদের নিকট পৌঁছলেন, তখন তাদেরকে কোন একটি বিষয়ে আলোচনা করতে শুনলেন, তিনি তাদের আলোচনা শুনে ফেললেন। তাদের একজন বলছিলেন, কি আশ্চর্য বিষয়, স্বীয় মাখলুকের মধ্যেই আল্লাহর বন্ধু রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আ. কে বন্ধু নির্বাচন করেছেন। অন্য একজন বলল, আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথনকারী অপেক্ষা অধিক আশ্চর্যকর কি হতে পারে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ. এর সাথে কথা বলেছেন। অন্য একজন বলল, হযরত ঈসা আ. তো আল্লাহর কালিমা ও রূহ (বাণী ও আত্মা) ছিলেন। অন্য একজন বলল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে নিজের জন্য চয়ন করেছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং সালাম দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের সব কথাই শুনেছি। তোমরা হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর বন্ধু হওয়ার ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করেছ। তা ঠিক। তিনি তা-ই ছিলেন এবং মূসা আ. আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথনকারী ছিলেন তাও ঠিক। হযরত ঈসা আ. আল্লাহর কালিমা ও তাঁর পক্ষ হতে রূহ বা আত্মা ছিলেন, তাও ঠিক। হযরত আদম আ. আল্লাহর মনোনীত হওয়াও ঠিক। তবে আমি হলাম, আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু। গর্ব বা অহংকারের বিষয় নয়, আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই গ্রহণ করা হবে। এটা কোন গর্ব বা অহংকারের বিষয় নয়। আমিই কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার প্রশংসার ঝান্ডা উড্ডীন করব। এটাও কোন অহংকারের বিষয় নয়। আমিই কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম জান্নাতের কড়া নাড়া দিব। তখন আমার জন্য তার দ্বার উন্মুক্ত করা হবে এবং আমি তাতে প্রবেশ করব। আমার সাথে দরিদ্র মু'মিনগণও থাকবে। এটা কোন অহংকারের বিষয় নয় যে, পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা মর্যাদাশীল হব।
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন পুনরুত্থান হবে, তখন আমাকে সর্বাগ্রে উঠানো হবে। যখন তারা সকলে নিশ্চুপ থাকবে, তখন আমিই তাদের পক্ষে ভাষ্যকার হব। আর যখন তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়বে, তখন আমিই তাদের নেতা হব। যখন তারা প্রতিনিধি হয়ে আসবে তখন আমিই তাদের জন্য সুপারিশ করব। যখন তারা হতাশ হয়ে যাবে তখন আমিই তাদেরকে সুসংবাদ দেব। আমার হাতেই প্রশংসার ঝাণ্ডা শোভা পাবে। সেদিন জান্নাতের চাবি আমার নিকটই থাকবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আদম সন্তানের মাঝে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান হব। এটা কোন অহংকারের বিষয় নয়। আমার চতুর্পার্শ্বে এমন হাজারো সেবক ঘুরতে থাকবে যেন তারা অন্তর্নিহিত মুক্তামালা। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী ও বায়হাকী রহ. বর্ণনা করেছেন।
সহীহ মুসলিমে২১০ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত দিবসে আমার অনুসারীই সর্বাপেক্ষা বেশি হবে। আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দ্বারে করাঘাত করব।
টিকাঃ
২০৮. মুসনাদে আহমাদ, খ. ৬, পৃ. ২৯ এবং আবূ দাউদ ২য় খ: ৩৫৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে যে, রাসূল সা. বলেন, যে মহিলা অনাথ সন্তানের উত্তম শিক্ষা-দীক্ষার জন্য অপর বিবাহ হতে বিরত থাকে, সে এবং আমি জান্নাতে এভাবে থাকব, অতঃপর রাসূল সা. শাহাদাত এবং মধ্যমা আঙ্গুলকে একত্রিত করে দেখালেন
২০৯. খ. ২ পৃ. ২০২
২১০. খ. ১ পৃ. ১১২
📄 সর্বপ্রথম কারা জান্নাতে প্রবেশ করবে?
সহীহায়নে২১১ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামত দিবসে আমরা সকল উম্মত অপেক্ষা সর্বাগ্রে থাকব। অথচ তারা আমাদের পূর্বে কিতাব পেয়েছে আর আমরা তাদের পরে কিতাব পেয়েছি। শুধু এতটুকুই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব।
সহীহ মুসলিমে২১২ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি দুনিয়ায় সর্বশেষে আগমন করেছি; কিন্তু কিয়ামত দিবসে সর্বাগ্রে থাকব। আর আমি জান্নাতে সর্বাগ্রে প্রবেশ করব। অথচ তারা আমাদের পূর্বে কিতাব পেয়েছে আর আমরা তাদের পরে কিতাব পেয়েছি। শুধু এতটুকুই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব। তারা পরস্পরে মতবিরোধ করেছে। আর তাদের সত্য সম্পর্কে মতপার্থক্য করা বিষয়গুলোতে আল্লাহ তা'আলা আমাদের হিদায়েত দিয়েছেন। এটা তাঁর ইহসান।
সহীহায়নে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি সবার পরে আগমন করেছি কিন্তু কিয়ামত দিবসে সর্বাগ্রে থাকব। আর জান্নাতে সর্বাগ্রে প্রবেশ করব। অথচ তারা আমাদের পূর্বে কিতাব পেয়েছে আর আমরা তাদের পরে কিতাব পেয়েছি। শুধু এতটুকুই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব।
দারাকুতনী রহ. হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত অন্য নবীগণের জন্য জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে অন্যান্য উম্মতের জন্য জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়েছে। দারেকুতনী রহ. বলেন, এ হাদীসটি গরীব পর্যায়ের। অন্য এক বর্ণনার শব্দ হল এরূপ, এ উম্মত সর্বাগ্রে কবর থেকে উত্থিত হবে এবং সর্বোচ্চতম অবস্থানের দিকে সর্বাগ্রে অগ্রগামী হবে ও আরশের ছায়ার দিকেও সর্বাগ্রে ধাবিত হবে। ফায়সালা ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের সমাধানের ক্ষেত্রেও অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা অগ্রগামী হবে। আর পুলসিরাত পার হওয়া ও জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অন্য উম্মত অপেক্ষা অগ্রগামী হবে। সুতরাং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত অন্য নবীদের জন্য জান্নাত হারাম করা হয়েছে। এ উম্মত জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে অন্য উম্মতের জন্য জান্নাতে প্রবেশ হারাম করে দেয়া হয়েছে।
এ উম্মত সকল উম্মত অপেক্ষা আগে জান্নাতে প্রবেশ করার ব্যাপারে ইমাম আবূ দাউদ রহ. স্ব-সনদে তাঁর সুনানে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিবরীল আ. আমার নিকট এসে আমার হাত ধরে আমাকে জান্নাতে সে দরযা দেখালেন, যে দরযা দ্বারা আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হায়! যদি আপনার সঙ্গে থাকতাম, তবে আমিও তা দেখতে পেতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। আবূ বকর! তুমি আমার উম্মতের মধ্যে সর্বাগ্রে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
হযরত আবূ বকর রা. এর উক্তি "হায় যদি আমি আপনার সঙ্গে থাকতাম, তবে তা দেখতে পেতাম' তার অত্যধিক বিশ্বাস ও জান্নাত কামনারই বহিঃপ্রকাশ।
এখানে সংবাদটি প্রায় চোখে দেখার মত করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি তেমনি, যেমনিভাবে হযরত ইবরাহীম আ. স্বীয় প্রভুর নিকট আরয করছিলেন, رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর, আমাকে দেখাও। আল্লাহ বললেন, তবে কি তুমি বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম আ. বললেন, بَلَى وَلَكن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي কেন করব না, তবে কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য২১৩।
ইবনে মাজাহ-এ হযরত উবাই ইবনে কা'ব রা. হতে বর্ণনা রয়েছে, আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সর্বপ্রথম মুসাফাহা করবেন হযরত ওমর রা. এবং সর্বপ্রথম তাঁকে সালাম করা হবে ও তার হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।
এটা অত্যন্ত منکر (প্রত্যাখ্যাত) পর্যায়ের হাদীস। ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী দাউদ ইবনে আতা অগ্রহণযোগ্য। এ বর্ণনাকারী প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী রহ. বলেন, সে প্রত্যাখ্যাত বর্ণনাকারী।
টিকাঃ
২১১. বুখারী, খ. ১ পৃ. ১২০, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ২৮২
২১২. খ. ১, পৃ. ২৮২
২১৩. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬০