📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের সংখ্যা ও তার প্রকার

📄 জান্নাতের সংখ্যা ও তার প্রকার


জান্নাত শব্দটি তাতে অবস্থিত সকল বস্তু অর্থাৎ উদ্যানসমূহ, নিবাসসমূহ এবং প্রাসাদসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। জান্নাত অনেক রয়েছে, যেমন ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে১৮৫ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, উম্মে হারিসা বিনতে সুরাকা রা. নাম্নী জনৈক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে বদরের যুদ্ধে হঠাৎ তীরবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করে। তার ব্যাপারে আপনি আমাকে কি কোন সংবাদ দিবেন? যদি সে জান্নাতী হয়, তবে আমি আমার এ আঘাতের উপর ধৈর্য ধারণ করব। আর যদি জান্নাত ব্যতীত অন্য স্থানে থাকে, তবে আমি খুব কাঁদব যেন আমার মনের ব্যথা কিছুটা হালকা হয়। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উম্মে হরিসা! জান্নাতে অসংখ্য উদ্যান রয়েছে। তোমার ছেলে তো জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছে। যা সর্বাপেক্ষা উচ্চ মর্যাদার জান্নাত। সহীহায়নে১৮৬ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু'টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের; তার পাত্রসমূহ, অলংকারসমূহ ও আরো যা কিছু তাতে রয়েছে সব কিছুই হবে স্বর্ণ নির্মিত। অন্য দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের। তার পাত্রসমূহ, অলংকারসমূহ, আরো যা কিছু তাতে রয়েছে সব কিছুই হবে রৌপ্য নির্মিত। আর জান্নাতে আদনের অধিবাসীগণের মাঝে এবং আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের মাঝে শুধু মাত্র আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের পর্দাই আড়াল থাকবে। এ ছাড়া আর কোন কিছু-ই থাকবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ আর যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।১৮৭

এ দুটি উল্লেখের পর আল্লাহ তা'আলা সামনে বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتَان এই উদ্যানদ্বয় ছাড়া আরো দুটি উদ্যান রয়েছে।১৮৮ সুতরাং মোট চারটি হল।

আল্লাহ তা'আলার বাণী وَمِنْ دُونهما এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণের ভিন্ন মত রয়েছে, দুটি জান্নাত উপরোক্ত সে দুটি হতে উপরের হবে? না নিচের হবে? একদল মুফাস্সির বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا দ্বারা উদ্দেশ্য হল اقرب منهما إلى العرش অর্থাৎ এ জান্নাত দুটি প্রথমোক্ত জান্নাত দুটি অপেক্ষা আরশের অধিক নিকটবর্তী হবে। এ হিসাবে এ দুটি জান্নাত প্রথমোক্ত দুটি অপেক্ষা উপরে হবে। অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, دُونهما অর্থ হল تهما অর্থাৎ এ দুটি জান্নাত প্রথমোক্ত দুটি অপেক্ষা নিচের হবে।

তারা বলেন, ভাষাবিদগণ বলেন, অমুক বস্তু অমুক বস্তু হতে دون (নিচু)। এর দ্বারা উদ্দেশ্য তা এ বস্তু অপেক্ষা নিম্নস্তরের। যেমন কোন ব্যক্তির প্রশংসায় অতিরিক্ত করে বলা হল, انا دون ما تقول، وفوق ما في نفسك তুমি যা বলছ আমার মর্যাদা তার চেয়ে কম এবং তোমার অন্তরে আমার অবস্থান যে স্তরের, আমি তার চেয়ে উর্ধ্বে। অভিধান গ্রন্থ সিহাহ-এ دون কে فوق এর বিপরীত শব্দ বলা হয়েছে। আর তাতে এ-ও বলা হয়েছে, دون শব্দ اقرب منه (অধিক নিকটবর্তী) অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কুরআন কারীমের পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বুঝা যায়, প্রথমোক্ত জান্নাত দুটি অধিক মর্যাদা সম্পন্ন। সে গুলো মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দশটি কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, ذواتَا أَفْنَان উভয়ই বহু শাখা-পল্লব বিশিষ্ট।১৮৯ افنان শব্দটির একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি হল, أفنان এটি فنن-এর বহুবচন, যার অর্থ, ঢাল। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল তা فن এর বহুবচন। فن অর্থ হল- প্রকার ও প্রজাতি। এ হিসাবে তার অর্থ হবে, জান্নাত দুটি বিভিন্ন প্রকার ও প্রজাতির ফল ও অন্যান্য বস্তুসমৃদ্ধ হবে। তার পরবর্তীতে বর্ণিত জান্নাতসমূহের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য ذَوَاتَا أَفْنَانِ দ্বারা বর্ণনা করা হয়নি।

দ্বিতীয় কারণ : আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় বলেন, فيهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবহমান দুই প্রস্রবণ।১৯০ পক্ষান্তরে অপর জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِمَا عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ।১৯১ نَضَّاخَتَانِ )উচ্ছলিত) অপেক্ষা جارية )প্রবহমান) গুণটি অতি উত্তম। কেননা جَرَيَة ফোয়ারা ও সরলভাবে প্রবহমান উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর نَضَّاخَتَان শুধুমাত্র ফোয়ারার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তৃতীয় কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই দুই প্রকার।১৯২ অপর জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلُ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল, খর্জুর ও আনার।১৯৩

সুতরাং নিঃসন্দেহে অপর জান্নাত দুটির বর্ণিত গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের তুলনায় প্রথমোক্ত জান্নাতে বর্ণিত গুণাগুণ অধিক পরিপূর্ণ। মুফাসসিরীনে কিরাম এ ব্যাপারে একমত, زوجان দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন দুই প্রজাতি উদ্দেশ্য। কিন্তু এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে, সে ভিন্ন ভিন্ন দুই প্রজাতি কেমন হবে? একদল বলেন, সে ভিন্ন দুই প্রজাতির হবে শুকনো ও তাজার দৃষ্টিকোন থেকে। শুকনোটি তাজাটি অপেক্ষা স্বাদ ও গুণাগুণের দৃষ্টিতে কম হবে না। আর আহারকারীও এর দ্বারা তাজাটির মতই উপকৃত হতে পারবে। কিন্তু সুস্পষ্টতই এ ব্যাখ্যার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সংশয় থেকে যায়।

কেউ কেউ বলেন, ভিন্ন দুই প্রজাতি এক প্রকার হবে প্রসিদ্ধ প্রজাতির আর অন্য প্রকার অপ্রসিদ্ধ প্রজাতির। একদল বলেন, দুই প্রকারের হবে; কিন্তু তারা এর বিশদ বিবরণ প্রদান করেননি। প্রকৃত বিষয় তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। তবে বাহ্যিকভাবে যা বুঝা যায়, মিষ্টি ও টক, মিষ্টি ও নোনা, লাল ও সাদা হিসাবে দু'প্রজাতির হবে। কেননা, বৈচিত্রময় স্বাদের ও রংয়ের ফল দেখতে ভাল লাগে। স্বাদের ক্ষেত্রে ও ভাল লাগে।

চতুর্থ কারণ : আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাতের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَق সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে, পুরো রেশমের আস্তর বিশিষ্ট ফরাশে।১৯৪

পক্ষান্তরে অপর জান্নাত দুটির গুনাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِي حِسَانٍ তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার উপর।১৯৫

রَفْرَف-এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিছানার চাদর, বিছানা ইত্যাদি দ্বারা। যে ব্যাখ্যাই করা হোক এতে সে মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য নেই যা রয়েছে প্রথমোক্ত দুই জান্নাতের বর্ণিত গুণের মধ্যে।

পঞ্চম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانِ দুই উদ্যানের ফল হবে নিকটবর্তী।১৯৬ অর্থাৎ তা নেয়া অত্যন্ত সহজ হবে। যে-ই ইচছা করবে নিতে পারবে। কিন্তু অপর দুই জান্নাতের এমন কোন গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়নি।

ষষ্ঠ কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِنَّ قاصرات الطرف সেখানে রয়েছে বহু আনত নয়না স্ত্রীলোক।১৯৭ অর্থাৎ সে সকল স্ত্রীলোক স্বীয় স্বামীতেই আপন দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করবে, অন্য কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না। এটা তাদের সন্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণেই হবে। এর দ্বারা এ বিষয়টিও প্রতীয়মান হয়, স্বামীদের দৃষ্টিও একমাত্র তাদের প্রতিই কেন্দ্রীভূত থাকবে। সে সকল স্ত্রীর রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্য স্বামীদের দৃষ্টিকে অন্যদিকে যেতেই দিবে না। অপর জান্নাত দুটির বর্ণনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, তাতে রয়েছে حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ তাঁবুতে রক্ষিতা হুরগণ।১৯৮

সুতরাং আপন দৃষ্টিকে স্বেচ্ছায় স্বীয় স্বামীর দৃষ্টি নিজের প্রতি কেন্দ্রীভূতকারিনী স্ত্রীলোক অন্যান্য স্ত্রীলোকের তুলনায় মর্যাদাবান।

সপ্তম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাতের আলোচনাকালে হুরদের বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।১৯৯ অর্থাৎ তারা আপন রূপ মহিমায় ও রূপ লাবণ্য পদ্মরাগ ও প্রবালের ন্যায় হবে। কিন্তু পরবর্তীতে বর্ণিত জান্নাতের হুরদের গুণ বর্ণনায় এতটা বলা হয়নি।

অষ্টম কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, هل جزاء الاحسان إلا الإحسان উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে?২০০ এর দ্বারা বুঝা যায়, উক্ত জান্নাতের অধিবাসীগণ দুনিয়ায় সম্পূর্ণ সৎ কাজ সম্পাদনকারী ছিলেন। সুতরাং তাদের পুরস্কার ও হবে উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ।

নবম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা لِمَنْ خَافَ দ্বারা সূচনা করে বলেন, এটা সে লোকদের প্রতিদান, যারা স্বীয় প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে। এর দ্বারা বুঝা যায়, উক্ত জান্নাত দুটি খোদাভীরু লোকদের প্রতিদান স্বরুপ প্রদান করা হবে। যেভাবে প্রথমে কারণ বলে পরে সেই কারনের ফলাফল বলা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই প্রথমে আল্লাহ ভীতিকে উল্লেখ করে পরে তার প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। কাজেই খোদাভীরুদের মাঝে দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরে নৈকট্যশীলগণ, তাদের জন্য প্রথোমাক্ত দুই জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে দরবারে খোদাওয়ান্দির ডান পাশের আসনে সমাসীন খোদাভীরুগণ, তাদের জন্য পরের দুই জান্নাত বরাদ্দ থাকবে।

দশম কারণ: আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির বর্ণনায় বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتَانِ বাক্যের উপস্থাপন পদ্ধতি দাবী করে, এখানে دُون শব্দ টি فَوق এর বিপরীত ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন জাওহারীর মত।

যদি প্রশ্ন করা হয়, খোদাভীরুদের মাঝে চারটি জান্নাত কিভাবে বণ্টন করা হবে? তবে তার উত্তরে বলা হবে খোদাভীরু দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। সুতরাং উঁচু স্তরের জান্নাত নৈকট্যপ্রাপ্তদের প্রদান করা হবে, আর ডানপার্শ্বস্থ অন্য লোকদেরকে অপর জান্নাত দেওয়া হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয়, সকল খোদাভীরু লোকই কি যৌথ ভাবে দুটি জান্নাত লাভ করবে? নাকি তারা প্রত্যেকেই দুটি করে জান্নাত লাভ করবে? তার উত্তর হল, এ ব্যাপারে মুফাস্সিরীনে কিরামের দুটি অভিমত রয়েছে। একটি হল, সকলে যৌথভাবে সে উদ্যান লাভ করবে। দ্বিতীয়টি হল, প্রত্যেকেই দুটি করে উদ্যান লাভ করবে। দ্বিতীয় মতটিকে দু'কারণে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রথম কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। তিনি বলেন, এগুলো জান্নাতের উদ্যানসমূহের অন্ত র্গত দুটি উদ্যান। দ্বিতীয়টি হল অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের প্রতিদান স্বরূপ একটি উদ্যান প্রদান করা হবে। আর আল্লাহ তা'আলার নিষেধকৃত বিষয়াবলী থেকে বিরত থাকার প্রতিদান স্বরূপ তাদেরকে অন্য একটি উদ্যান প্রদান করা হবে।

যদি এরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যে সকল উদ্যানে স্ত্রীলোকের আলোচনা রয়েছে সেগুলোতে فيهن বলা হয়েছে, অর্থাৎ هن বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর যে সকল উদ্যানে স্ত্রীলোক ব্যতীত অন্যান্য বস্তুর আলোচনা করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে فيهما বলা হয়েছে অর্থাৎ দ্বিবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তার উত্তরে বলা হবে, مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشٍ বলার পর বলা হয়েছে, فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطرف এখানে هن সর্বনাম فرش এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। আর অন্যস্থানে যেখানে স্ত্রীলোকের কথা আলোচিত হয়েছে, সেখানেও তার পূর্বোক্ত আয়াতের সাথে শাব্দিক ও অর্থগত উভয় দিকে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য فِيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ বলা হয়েছে। যেন এটিও তার পূর্বোক্ত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়।

টিকাঃ
১৮৫. খ. ২, পৃ. ৫৬৭
১৮৬. বুখারী, খ. ২ পৃ: ৭২৪, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০০
১৮৭. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৪২
১৮৮. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬২
১৮৯. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৪৮
১৯০. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫০
১৯১. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬৬
১৯২. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫২
১৯৩. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬৮
১৯৪. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৪
১৯৫. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৭৬
১৯৬. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৪
১৯৭. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৬
১৯৮. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৭২
১৯৯. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৮
২০০. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬০

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের কিয়দাংশ আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন

📄 জান্নাতের কিয়দাংশ আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন


আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে একটি প্রাসাদ নিজের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাকে আপন আরশের নিকটবর্তী করার মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। সে উদ্যানের বৃক্ষ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে লাগিয়েছেন। এ জান্নাত হবে সকল জান্নাতের সর্দার। আল্লাহ তা'আলা এটাকে জান্নাতের সকল অংশ থেকে উত্তম, মর্যাদাশীল উঁচু স্তরের করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ফিরিশতাদের মধ্যে হযরত জিবরীল আ. কে, মানবকুলের মাঝে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে, আকাশের মাঝে সর্বাপেক্ষা উপরের আকাশকে, শহরের মধ্যে মক্কা মুকাররমাকে, মাসের মধ্যে মুহাররামকে, (রমযান ব্যতীত) রজনীর মধ্যে লাইলাতুল কদরকে, দিনের মধ্যে জুমুআর দিনকে এবং এমনিভাবে অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রেও একই প্রজাতির মধ্যেও একটি অপেক্ষা অন্যটিকে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই পসন্দ করেন।

তাবারানী রহ. স্ব-সনদে স্বীয় মুজা'মে হযরত আবুদ দারদা রা. হতে বর্ণনা করেন, ২০২ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন রাতের শেষ তিন প্রহর বাকী থাকে, তখন আল্লাহ তা'আলা অবতরণ করেন। (তাঁর শান মোতাবেক) প্রথম প্রহরে লাওহে মাহফযের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সেখান থেকে যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন এবং যা ইচ্ছা রেখে দেন। দ্বিতীয় প্রহরে জান্নাতে আদনের প্রতি তাকান। এটি তাঁর অবস্থানস্থল (এখানে আরশের নীচেই এ জান্নাত)। এখানে তাঁর সাথে আম্বিয়ায়ে কিরাম, শহীদগণ ও সত্যবাদীগণ ব্যতীত অন্য কেউ থাকবে না। সেখানে এমন সব বস্তু রয়েছে যা কখনো কোন চর্মচক্ষু দেখেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কখনো তা কল্পনাও করেনি। অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা'আলা নিচে নেমে ঘোষণা করতে থাকেন, আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ কি আছে আমার কাছে কোন বস্তু প্রার্থনাকারী, আমি তাকে তা প্রদান করব। আছে কি কোন প্রার্থনাকারী, আমি তার প্রার্থনা মনযূর করব। সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ধারা বজায় থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنْ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا আর কায়েম করবে ফজরের নামায। নিশ্চয়ই ফজরের নামায উপস্থিতির সময়।২০২ অর্থাৎ এসময় আল্লাহ ও তার ফেরেশতা গণ উপস্থিত থাকেন।

হযরত হাসান বিন সুফিয়ান স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে তৈরী করেছেন। এখানে মুশরিক, মদ্যপ ও অহংকারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ।

দারিমী ও অন্যরা আবূ মাআয নুজায়হ ইবনে আব্দুর রহমানের মাধ্যমে হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল হারিছ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তিনটি বস্তু স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন, এক. হযরত আদম আ.কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। দুই. তাওরাত আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিন. ফিরদাউসের গাছগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লাগিয়েছেন। এরপর তিনি বলেছেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তাতে মদ পানকারী ও দায়্যুস প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে তো আমরা জানি, কিন্তু দায়্যুস কে? উত্তরে বললেন, যে ব্যক্তি নিজ পরিবারে কোন প্রকার নির্লজ্জ কাজের সুযোগ দেয় অর্থাৎ নিজ পরিবার- পরিজনের ভেতর অপকর্মে যার সম্মতি আছে।

দারেমী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে চারটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন। আরশ, কলম, জান্নাতে আর্দ্র ও হযরত আদম আ. কে। অতঃপর অন্য মাখলুক সৃষ্টির ক্ষেত্রে বলেছেন, كن فيكون 'হও, ফলে হয়ে যায়'। হযরত মাইসারাহ রা. হতে অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে তিনটি ব্যতীত কাউকে স্পর্শ করেননি। (বরং অন্য সব মাখলুককে এদ্বারা সৃষ্টি করেছেন) হযরত আদম আ. কে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। তাওরাত নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আদনের বৃক্ষরাজি নিজ হাতে রোপন করেছেন।

এমনিভাবে হযরত কা'ব রা. হতেও বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তিনটি বস্তুকেই নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ. কে নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছন। তাওরাত নিজ কুদরতী হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজি নিজ কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন। অতঃপর জান্নাতে আত্মকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি কথা বল, তখন তা বলতে লাগল, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

শামার ইবনে আতিয়াহ রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দৈনিক পাঁচবার উন্মুক্ত করে দিয়ে বলেন, আমার বন্ধুদের জন্য তুমি তোমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি কর এবং সুগন্ধি ছড়াও।

ইমাম হাকিম রহ. মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজিকে কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন, যখন তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করল, তখন তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া হল। অতঃপর তা প্রত্যেক সাহরীর সময় খোলা হত এবং আল্লাহ তা দেখতেন, তখন তা বলত قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত এ ভাবে তৈরী করেছেন, তার দেয়ালের একটি ইট হল স্বর্ণের, অন্যটি হল রৌপ্যের। সেখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে বৃক্ষ রোপণ করেছেন। তখন তাকে কথা বলতে বললেন, তখন তা বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, সুসংবাদ তোমার জন্য, তুমিই হলে রাজা বাদশাহদের ঠিকানা।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আত্মকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। এর একটি ইট হল শুভ্র মুক্তার আর অন্য একটি ইট হল লাল মুক্তার এবং অন্যটি হল সবুজ মুক্তার। আর এর মেঝে হল কস্তুরীর, আস্তর মুক্তার, কাষ্ঠ যাফরানের। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে কথা বলতে বললেন, তখন সে বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তোমার মধ্যে আমি কোন কৃপনকে প্রবেশ কারাবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।২০৩

আল্লাহ তা'আলার এ বিশেষ মেহেরবানীর ব্যাপারে চিন্তা করা উচিৎ, আল্লাহ তা'আলা নিজ কুদরতী হাতে যে সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন আবার তার জন্যই স্ব-হাতে গুণে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। আদম সন্তানের জন্য এর চেয়ে অধিক মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে সৃষ্টি করে তাদের মর্যাদাবান করেছেন ও অন্যান্য মাখলুক থেকে ভিন্নতা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। ( وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ )তা অর্জনের তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই দিতে পারেন) সকল প্রাণীর উপর হযরত আদম আ. এর মর্যাদা যেমন, অন্যান্য জান্নাতের উপর এ জান্নাতের মর্যাদা ঠিক তেমনি।

হযরত ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহতে২০৪ হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হযরত মূসা আ. স্বীয় প্রভুকে জিজ্ঞাসা করেছেন, জান্নাতে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের কে হবে?

উত্তরে বলা হল, যে ব্যক্তি সকল লোক বেহেশতে প্রবেশের পর আসবে এবং তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কিভাবে প্রবেশ করব। সকল লোক আপন স্থান দখল করে নিয়েছে এবং যা কিছু নেওয়ার তা নিয়ে নিয়েছে। (আমার জন্য আর তাতে কি বাকী রয়েছে?) তখন তাকে বলা হবে, তুমি কি পসন্দ কর, তোমাকে সে পরিমাণ প্রাচুর্য দেওয়া হবে, যা দুনিয়ার সকল রাজা বাদশাহরও নেই। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমি এতেই সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি পাবে এবং এরচেয়ে চারগুণ বেশি পাবে। তখন সে বলবে, আমি এতে সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং বলবেন, এ-ই সে ব্যক্তি, যার জন্য আমি নিজ কুদরতী হাতে উত্তম প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করেছি এবং সে জান্নাতে মোহর লাগিয়ে দিয়েছি। ফলে তাকে কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ তার কথা শ্রবণ করেনি, কোন হৃদয় পটে তার কল্পনাকে স্থান দেয়নি। আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ কেউ জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে।২০৫

টিকাঃ
২০২. এ বর্ণনাটি তিরমিযীতে খ. ১, পৃ. ১০১ উদ্ধৃত হয়েছে।
২০৩. সূরা হাশর, আয়াত: ৯
২০৪. খ. ১ পৃ. ১০৬
২০৫. সূরা সাজদা, আয়াত: ১৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের প্রহরী, দারোগা ও তাদের সর্দারের নাম

📄 জান্নাতের প্রহরী, দারোগা ও তাদের সর্দারের নাম


وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ যারা স্বীয় প্রতিপালককে ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে ও এর দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি ‘সালাম’২০৬।'

خزانة শব্দটি خازن এর বহুবচন যেমন حفظة হল حافظ এর বহুবচন। যে বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ উদ্দেশ্য সে বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যাকে বিশ্বস্ত রূপে নিয়োগ করা হয় তাকে خازن বলা হয়।

ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ মুসলিমে২০৭ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি যখন জান্নাতের দ্বারে উপস্থিত হয়ে তা খোলার জন্য প্রহরীকে বলব, তখন সে বলবে, আপনি কে? উত্তরে আমি বলব, আমি মুহাম্মদ। সে বলবে, হ্যাঁ আপনার পূর্বে কারো জন্যে দরযা না খোলার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইতোপূর্বে এ ব্যাপারে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে মুত্তাফাক আলাইহি হাদীস বর্ণনা হয়েছে। তাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্ত ায় এক জাতীয় দুটি বস্তু খরচ করবে জান্নাতের প্রহরী তাকে ডাকতে থাকবে। অর্থাৎ প্রত্যেক দ্বারের প্রহরীই এসে ডাকতে থাকবে, এদিক দিয়ে আস।

হযরত আবূ বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা তো এমন কথা যাতে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই, জান্নাতের প্রহরী তাকে ডাকবে, অর্থাৎ প্রত্যেক দ্বারের প্রহরীই এ বলে ডাকবে, এদিক দিয়ে আস। হযরত আবূ বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই সম্মানতো সেই ব্যক্তির প্রাপ্য যার কোনো ত্রুটি নেই। নবীজী বলেন, হ্যা, আমি আশাবাদী, তুমি তাদের একজন হবে। অপর বর্ণনা মতে হযরত আবু বকর রা. জিজ্ঞাসা করলেন, এমন কেউ কি আছে; যাকে সকল দুয়ার হতে ডাকা হবে? নবীজী বললেন, হ্যাঁ, আমিও আশাবাদী, তুমি তেমন একজন হবে। যখন সিদ্দীকে আকবর রা. ঈমানী বলের পূর্ণতায় তার শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন তার অন্তরের এ কামনা ছিল, তাকে জান্নাতের সকল দরযা হতে আহবান করা হোক। তখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করছিলেন, এমন কোন ব্যক্তি কি আছে যাকে জান্নাতের প্রত্যেক দরযা হতে আহবান করা হবে? যাতে ব্যক্তি আমলের দ্বারা তা লাভ করতে পারে। উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, এ স্তরের জান্নাতও লাভ করা সম্ভব। তিনি তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছেন, তুমিও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তিনি যেন এ প্রশ্ন করছিলেন, কেউ কি সে সকল স্তরে পূর্ণতা লাভ করতে পারবে, যার কারণে বেহেশতের প্রত্যেকটি দ্বার তাকে আহবান করবে?

সকল সৌন্দর্য ও শোভা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই জন্য। কত মর্যাদাবান ও সম্মানিত তিনি।

জান্নাতের সর্বাপেক্ষা ও বড় প্রহরীর নাম হল 'রিযওয়ান'। রিযওয়ান শব্দটি رض হতে উৎকলিত। জাহান্নামের প্রহরীর নাম হল মালিক, এটা ملك হতে উৎকলিত। এই শব্দের বর্ণে যে ধরনেরই হরকত দেয়া হোক না কেনো, তার অর্থের মাঝে অবশ্যই শক্তিমত্তা ও কঠোরতার ভাব পাওয়া যায়।

টিকাঃ
২০৬. সূরা যুমার, আয়াত: ৭৩
২০৭. খ. ১, পৃ. ১১২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের দুয়ারে প্রথম কড়াঘাত

📄 জান্নাতের দুয়ারে প্রথম কড়াঘাত


ইতোপূর্বে হযরত আনাস রা. এর হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাবারানী রহ. কিছু সংযোজিত অবস্থায় বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের দ্বারে কড়াঘাত করবেন তখন জান্নাতের প্রহরী উঠে বলবে, 'আমি আপনার আগে কারো জন্য দরযা খুলব না এবং আপনার পরে কারো জন্য উঠে দাঁড়াবো না'। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের বহি:প্রকাশের জন্যই জান্নাতের প্রহরী তাঁর আগমন কালে উঠে দাঁড়াবে। জান্নাতের প্রহরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কারো জন্য উঠে দাঁড়াবে না; বরং অন্য প্রহরীগণ তার সেবায় নিয়োজিত থাকবে। তাদের উপর সেই প্রহরীর অধিপতির মর্যাদা লাভ হবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে শুধু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতের জন্য দাঁড় করেছেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে হেঁটে আসবে এবং তাঁর জন্য দরযা খুলে দেবে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যার জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে। কিন্তু আমার পূর্বেও একজন মহিলা জান্নাতে প্রবেশ করতে চাইবে। আমি বলব, তুমি কে? সে বলবে, আমি সেই মহিলা, যে শুধুমাত্র অনাথ শিশুর জন্য পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়নি; বরং এ ভাবেই জীবন অতিবাহিত করেছে।২০৮

তিরমিযীতে২০৯ হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে, কয়েকজন সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনলেন। তিনি যখন তাদের নিকট পৌঁছলেন, তখন তাদেরকে কোন একটি বিষয়ে আলোচনা করতে শুনলেন, তিনি তাদের আলোচনা শুনে ফেললেন। তাদের একজন বলছিলেন, কি আশ্চর্য বিষয়, স্বীয় মাখলুকের মধ্যেই আল্লাহর বন্ধু রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আ. কে বন্ধু নির্বাচন করেছেন। অন্য একজন বলল, আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথনকারী অপেক্ষা অধিক আশ্চর্যকর কি হতে পারে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আ. এর সাথে কথা বলেছেন। অন্য একজন বলল, হযরত ঈসা আ. তো আল্লাহর কালিমা ও রূহ (বাণী ও আত্মা) ছিলেন। অন্য একজন বলল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে নিজের জন্য চয়ন করেছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং সালাম দিয়ে বললেন, আমি তোমাদের সব কথাই শুনেছি। তোমরা হযরত ইবরাহীম আ. আল্লাহর বন্ধু হওয়ার ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ করেছ। তা ঠিক। তিনি তা-ই ছিলেন এবং মূসা আ. আল্লাহ তা'আলার সাথে কথোপকথনকারী ছিলেন তাও ঠিক। হযরত ঈসা আ. আল্লাহর কালিমা ও তাঁর পক্ষ হতে রূহ বা আত্মা ছিলেন, তাও ঠিক। হযরত আদম আ. আল্লাহর মনোনীত হওয়াও ঠিক। তবে আমি হলাম, আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু। গর্ব বা অহংকারের বিষয় নয়, আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই গ্রহণ করা হবে। এটা কোন গর্ব বা অহংকারের বিষয় নয়। আমিই কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার প্রশংসার ঝান্ডা উড্ডীন করব। এটাও কোন অহংকারের বিষয় নয়। আমিই কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম জান্নাতের কড়া নাড়া দিব। তখন আমার জন্য তার দ্বার উন্মুক্ত করা হবে এবং আমি তাতে প্রবেশ করব। আমার সাথে দরিদ্র মু'মিনগণও থাকবে। এটা কোন অহংকারের বিষয় নয় যে, পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা মর্যাদাশীল হব।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন পুনরুত্থান হবে, তখন আমাকে সর্বাগ্রে উঠানো হবে। যখন তারা সকলে নিশ্চুপ থাকবে, তখন আমিই তাদের পক্ষে ভাষ্যকার হব। আর যখন তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়বে, তখন আমিই তাদের নেতা হব। যখন তারা প্রতিনিধি হয়ে আসবে তখন আমিই তাদের জন্য সুপারিশ করব। যখন তারা হতাশ হয়ে যাবে তখন আমিই তাদেরকে সুসংবাদ দেব। আমার হাতেই প্রশংসার ঝাণ্ডা শোভা পাবে। সেদিন জান্নাতের চাবি আমার নিকটই থাকবে। আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আদম সন্তানের মাঝে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান হব। এটা কোন অহংকারের বিষয় নয়। আমার চতুর্পার্শ্বে এমন হাজারো সেবক ঘুরতে থাকবে যেন তারা অন্তর্নিহিত মুক্তামালা। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী ও বায়হাকী রহ. বর্ণনা করেছেন।

সহীহ মুসলিমে২১০ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত দিবসে আমার অনুসারীই সর্বাপেক্ষা বেশি হবে। আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দ্বারে করাঘাত করব।

টিকাঃ
২০৮. মুসনাদে আহমাদ, খ. ৬, পৃ. ২৯ এবং আবূ দাউদ ২য় খ: ৩৫৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে যে, রাসূল সা. বলেন, যে মহিলা অনাথ সন্তানের উত্তম শিক্ষা-দীক্ষার জন্য অপর বিবাহ হতে বিরত থাকে, সে এবং আমি জান্নাতে এভাবে থাকব, অতঃপর রাসূল সা. শাহাদাত এবং মধ্যমা আঙ্গুলকে একত্রিত করে দেখালেন
২০৯. খ. ২ পৃ. ২০২
২১০. খ. ১ পৃ. ১১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00