📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকট জান্নাত ও জান্নাতীদের প্রার্থনা

📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকট জান্নাত ও জান্নাতীদের প্রার্থনা


আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাতবাসীদের জান্নাত প্রার্থনা এবং জান্নাত তার অধিবাসীদের আগমন কামনা ও তাদের জন্য স্বীয় প্রভুর দরবারে সুপারিশ করার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্যে প্রজ্ঞাবানদের কথা উদ্ধৃত করে বলেন, رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন।' সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি।

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর, আমাদের মন্দ কর্মগুলি দূরীভূত কর এবং আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিও।

رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা আমাদেরকে দাও এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে হেয় কর না। নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম কর না।

আল্লাহর বাণী وَآتِنَا مَا وَعَدَتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আপনি আমাদেরকে আপনার রাসূলের কণ্ঠে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা আমাদের দান করুন। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مَا وَعَدَتَّنَا عَلَى الْإِيمَانِ بِرُسُلِكَ অর্থাৎ, আপনি রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যে ঈমানের উপর অটল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এর তাওফীক দিন।

উক্তবস্থায় لإيمان শব্দটির পূর্বে با অব্যয়টি উহ্য মানতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি ইসম তথা বিশেষ্য ও একটি হরফ তথা অব্যয়কে উহ্য মানা আরবী ব্যাকরণনীতিতে কঠিন। যদি على تصديق رسلك অথবা طاعة رسلك উহ্য মানা হয়, তবে উভয় অবস্থা সমপর্যায়ের হয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে প্রথম মত অগ্রগণ্য। কারণ আয়াতের প্রথমাংশ তাদের অভিমতকে যুক্তিযুক্ত মনে করে। যেখানে তারা পূর্বেই রাসূলের প্রতি ঈমান আনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসেছে।

সুতরাং তারা আপন ঈমানকে মাধ্যম বানিয়ে আল্লাহর নিকট রাসূলগণের মাধ্যমে সে বস্তু প্রার্থনা করছে যার প্রতিশ্রুতি তাদেরকে দেয়া হয়েছে। কেননা তারা রাসূলের মাধ্যমে তাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি শুনেছ। নবীগণের তাদের নিকট তাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পৌঁছানোর পর তাকে সত্য মনে করাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তারা তাঁর নিকট তাই প্রার্থনা করেছেন।

কেউ কেউ বলেন, وَآتَنَا مَا وَعَدَّتْنَ দ্বারা সাহায্য ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য। যে প্রতিশ্রুতি রাসূলগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছিলেন। তবে প্রথম ব্যাখ্যাটিই ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ।

যেহেতু তাদের ঈমানে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, তাঁর প্রতিশ্রুতি, ভীতি, তাঁর নাম ও গুণাবলীকে সত্য মনে করা এবং তাঁর ভীতি প্রদর্শনকে ভয় করা ও তাঁর সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ সব কিছুর সমষ্টির কারণেই তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারীর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া ও তাদের সাথে প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো লাভের ক্ষেত্রে তারা ঈমানকে মাধ্যম বানাতে পারে।

কেউ কেউ এ ভেবে সমস্যায় পড়ে, আল্লাহ তা'আলা তো আপন প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়ন করবেন, তবে তাদের এ প্রার্থনার মাঝে কী লাভ যে 'আপনি স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন'।

তার উত্তর হলো, এ হচ্ছে নিজেদের গোলামী ও বন্দেগীর প্রকাশ। এ বিষয়টি ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলাকে লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরয رَبِّ احْكُمْ بِالْحَقِّ 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দাও।১৬১

ফিরিশতাগণের উক্তি فَاغْفِرْ لِلَّذِيْنَ تَابُوا وَاتَّبِعُوا سَبِيْلَكَ 'অতএব, যারা তাওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর'।১৬২

প্রশ্নকারীদের নিকট এ বিষয়টিও অস্পষ্ট যে, এ প্রতিশ্রুতি বেশ কটি শর্তের উপর নির্ভরশীল। শর্তাবলীর একটি হল, আল্লাহ তা'আলার প্রতি প্রবল ইচ্ছা ও বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তাঁর দরবারে প্রার্থনা করা; যেন তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। উক্ত প্রতিশ্রুতিও ঈমানের সাথে শর্তযুক্ত। এটাও শর্ত, যেন এমন কোন বিষয় সংযুক্ত না হয়ে পড়ে, যা তা বিনষ্ট করে দেয়।

সুতরাং তারা যখন আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রতিশ্রুত বিষয় দান করার প্রার্থনা করে, তবে এ দু'আটিও তার অন্তর্ভুক্ত হয়, আমাদেরকে সে বিষয়ের তাওফীক দান করুন ও তার উপর দৃঢ়পদ রাখুন। আমাদেরকে সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পক্ষে যে সকল উপকরণ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সহযোগিতা করুন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জরুরী ও অত্যন্ত উপকারী দু'আ। তারা অন্যান্য দু'আ অপেক্ষা এ দু'আটির প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ তা'আলার বাণী, رَبِّ احْكُمْ بِالْحَقِّ এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিকট এই প্রার্থনা, যেন তাদেরকে তিনি তাদের শত্রুর বিপক্ষে সাহায্য করেন। শত্রুর মুকাবিলায় তাদের বিজয় ও সাহায্য দান করেন। এমনিভাবে তাওবাকারীদের ক্ষমা করে দেয়ার জন্য ফিরিশতাদের আরয সে কারণগুলোর অন্যতম, যেগুলোর কারণে তাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমন উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যার ফলে তারা আপন বন্ধু ও শত্রুদের সাথে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। তাদেরকেই নিজ ইচ্ছার কারণ বানিয়েছেন, যেমনিভাবে স্বীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যম বানিয়েছেন। সুতরাং কারণও তাঁর পক্ষ থেকে আর কর্তাও তিনিই। যদি এরপরও বিষয়টি বোধগম্য না হয়, তবে সে সব কারণগুলোর ব্যাপারে চিন্তা করুন, যেগুলো ব্যক্তির মাঝে পাওয়া গেলে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার প্রেম ও ভালোবাসা লাভ করতে পারে।

তিনি বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন। কারণগুলোর ব্যাপারেও চিন্তা করুন, যেগুলো ব্যক্তির মাঝে পাওয়া গেলে আল্লাহর বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট হন। অথচ এসব কিছুই তাঁর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এ হল তাওহীদ তথা একত্ববাদের এক বিশাল ভাণ্ডার; যেখানে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সত্তার মা'রিফাত লাভকারী-ই প্রবেশ করতে পারে।

ربَّنَا وَآتَنَا مَا وَعَدَتَّنَا আলোকে বিবেচনা করা যায়। এ আয়াতটি তাঁরই অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ أَذَلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءٌ وَمَصِيرًا لَهُمْ فِيهَا مَايَشَاءُونَ خَالِدِينَ كَانَ عَلَى رَبِّكَ وَعْدًا مَسْئُولًا
হে নবী! জিজ্ঞাসা কর, এটাই উত্তম, না স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? এটাই তো তাদের পুরস্কার ও প্রত্যাবর্তনস্থল। সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তা-ই থাকবে এবং তারা স্থায়ী হবে। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ তোমার প্রতিপালকেরই দায়িত্ব।১৬৩

আল্লাহর মু'মিন বান্দাগণ তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে এবং ফিরিশতাগণও মু'মিনদের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করে। সুতরাং জান্নাত আল্লাহ তা'আলার নিকট তার অধিবাসীদের আগমন প্রার্থনা করে, আর জান্নাতবাসীগণ তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করেন। এমনিভাবে ফিরিশতাগণ ও রাসূলগণও আপন অনুসারীদের জন্য জান্নাত প্রার্থন করেন। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা জান্নাত তাঁর সামনে উপস্থিত করবেন। তখন তা মু'মিন বান্দাদের জন্য সুপারিশ করবে। এতে আল্লাহ তা'আলার পূর্ণাঙ্গ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এবং রহমতের বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। এটা তাঁর দয়া-অনুগ্রহ-ইহসান ও দানশীলতা। যে সকল বস্তু বান্দাকে প্রদান করা তাঁর নাম ও মহৎ গুণাবলীর দাবী এবং যে সকল বস্তু তাঁর নিকট প্রার্থনা করা হয়, সে দিন তিনি সেগুলো প্রদান করবেন।

সুতরাং এ হতে পারে না যে, তাঁর নাম ও মহৎ গুণাবলীর দাবী থেকে তাদেরকে বেকার ভাবা হবে। (আল্লাহ তা'আলার যত নাম ও গুণাবলী আছে, সে গুলোর মাঝে প্রত্যেকটির কোনো না কোনো প্রভাব রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার সিফাত (مالك) মালিক) এর প্রভাব কিয়ামতের দিন এভাবে প্রকাশ পাবে যে, সে দিন সকল প্রকার বৈপত্তিক রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং ঘোষণা দেয়া হবে لَمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ অর্থাৎ আজকের রাজত্ব আর আধিপত্য কার? তখন উত্তর আসবে, لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ অর্থাৎ একক ও পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলার। এমনিভাবে অন্যান্য নাম ও সিফাতেরও কোন না কোন প্রভাব রয়েছে। সুতরাং এ হতে পারে না যে, নাম ও সিফাত থাকা সত্ত্বেও তার কোন প্রভাব থাকবে না।)

সুতরাং আল্লাহ তা'আলার একটি সিফাত হল, جواد অর্থাৎ, সকল প্রকার ও সব কিছু দানকারী। এর চাহিদা হল, তাঁর নিকট প্রার্থনা করা হোক, যেন তাঁর সিফাতের প্রভাব প্রকাশ পেতে থাকে।

সুতরাং প্রার্থনাকারী ও প্রার্থনাকারীর অন্তরে প্রার্থনার আগ্রহ এবং প্রার্থিত বস্তুসমূহ সবই তাঁর সৃষ্টি। কেননা, বান্দা তাঁর নিকট কোন বস্তু প্রার্থনা করলে, তিনি সন্তুষ্ট হন। আর বান্দা তাঁর নিকট কোন বস্তু প্রার্থনা না করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। কবি বলেন, الله يغضب ان تركت سؤاله وبني آدم حين يستل يغضب প্রার্থনা যদি না কর তুমি প্রভু মহানের দরবারে, হবেন তিনি অসন্তুষ্ট। মানুষের কাছে যদি চাও, সে হবে তিক্ত ও অসন্তুষ্ট।

আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর মাখলুকের মধ্য হতে সর্বাধিক প্রিয়, পসন্দনীয় ও মর্যাদাবান সে-ই, যে তাঁর নিকট প্রার্থনা করে। এমনিভাবে প্রার্থনার মাঝে অতিশয় অনুনয়কারীদেরকেও তিনি অত্যধিক ভালবাসেন। তাকে স্বীয় নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করেন ও স্বীয় নি'আমতরাজি প্রদান করেন। সুতরাং তিনি ব্যতীত কোনো মা'বুদ ও উপাস্য নেই। সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। যিনি আমাদেরকে হিদায়েত দিয়েছেন। আমরা তো পথভ্রান্ত ছিলাম না, যদি তিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন।

হযরত আবু নাঈম রহ. হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন,১৬৪ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে পরওয়ারদেগার! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আর যে ব্যক্তি তিন বার জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, জাহান্নام তার ব্যাপারে বলে, হে পরওয়ারদেগার! তাকে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় দিন। উক্ত বর্ণনাটি জামে' তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাতবার আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, সে ব্যক্তির ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে পরওয়ারদেগার! অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট আমাকে প্রার্থনা করে। সুতরাং তাকে আমার মাঝে স্থান করে দিন।

আবূ ইয়ালা রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাত বার আল্লাহর নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জাহান্নাম বলে, হে প্রভু! আপনার নিকট অমুক ব্যক্তি আমার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। সুতরাং তাকে আশ্রয় দিয়ে দিন। আর যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাতবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে প্রভু! আপনার নিকট অমুক বান্দা আমাকে প্রার্থনা করেছে। সুতরাং তাকে আমার মাঝে স্থান করে দিন'। উক্ত হাদীসের সনদ সহীহায়নের বর্ণনা শর্ত মুতাবিক রয়েছে।

আবূ দাউদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট সাতবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন'।

হযরত হাসান ইবনে সুফয়ান রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা অধিক হারে আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত প্রার্থনা কর ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা উভয়ে সুপারিশ করে থাকে ও তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। বান্দা যখন অধিক হারে আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, তখন জান্নাত বলে থাকে, হে প্রভু! আপনার এ বান্দা আপনার নিকট আমাকে প্রার্থনা করে। সুতরাং আমাকে তার ঠিকানা তথা নীড় বানিয়ে দিন। আর দোযখ বলতে থাকে, হে প্রভু! আপনার এ বান্দা আপনার নিকট আমার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। সুতরাং তাকে আশ্রয় প্রদান করুন'।

সালফে সালেহীনের মাঝে কতিপয় তো এমন ছিলেন যে, তাঁরা জান্নাত প্রার্থনা করতো না; বরং তাঁরা বলতেন, যদি আমরা দোযখ থেকে রক্ষা পাই, তবে তা-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তাঁদের মধ্যে আবুস সাহবা সিলাহ ইবনে আশীমও ছিলেন। যিনি সাহরী পর্যন্ত সারা রাত্রই নামাযে মাশগুল থাকতেন। অতঃপর আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে এই দু'আ করতেন, হে আল্লাহ! আমাকে দোযখ থেকে রক্ষা করুন। আমার মত ব্যক্তিও কি আপনার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করতে পারে?

হযরত আতা সুলামী রহ.ও জান্নাত চাইতেন না। সালেহ আসমায়ী রহ. তাঁকে বললেন, হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার বান্দার আমল নামা দেখ। যদি সে আমার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, তবে আমি তাকে জান্নাত দেব। আর যে আমার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে জাহান্নام থেকে রক্ষা করব। তখন হযরত আতা রহ. বলেন, যদি আমি জাহান্নাম হতে রক্ষা পাই, তবে তা-ই আমার জন্য যথেষ্ট। হযরত আবূ নাঈমও উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আবূ দাউদ রহ. তাঁর সুনানে হযরত জাবির রা. এর হাদীসে সে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা হযরত মু'আয রা. দীর্ঘ কিরআত দ্বারা নামায পড়ানোর দরুন সৃষ্টি হয়েছিল। এক সময় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনুযোগ করল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, ভাতিজা! যখন তুমি নামায পড়, তখন তুমি কি কর? উত্তরে সে বলল, সূরা ফাতিহা পড়ি এবং আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করি ও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভের প্রার্থনা করি। আমি আপনার ও মু'আয রা. এর ক্ষীণ আওয়াযের স্বরগুলো বুঝি না। (অর্থাৎ, আপনি ও মু'আয রা. নিভৃতে যা বলতেন) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ও মু'আয তার আশেপাশের কোন বিষয় নিয়ে-ই গুণগুণ করি।

সুনানে আবূ দাউদ১৬৫ হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলার সত্তার ওসীলা দিয়ে শুধু জান্নাতের প্রার্থনা করা যেতে পারে।

এ গ্রন্থের শুরুতে আব্দুল মালিক ইবনে বাশীর রা. এর মারফু বর্ণনা রয়েছে, যে প্রত্যহ জান্নাত ও জাহান্নাম (মুক্তির) প্রার্থনা করে থাকে। জান্নাত বলে,
يارب قد طابت ثماري واطردت أنهاري واشتقت إلي أولياني، فعجل إلى بأهلي
হে প্রভু! নিশ্চয়ই আমার ফলগুলো পেকে গেছে। আমার নহরগুলো পূর্ণভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। আমার অধিবাসীদের ব্যাপারে আমার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। সুতরাং আমার অধিবাসীদেরকে আমার মাঝে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিন। অতএব, জান্নাত তার অধিবাসীদের প্রার্থনা করে ও তাদেরকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করে। এমনিভাবে জাহান্নامও করে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন, তোমরা সর্বদা জান্নাত ও জাহান্নাম স্মরণ রাখ। কখনো তাকে ভুলে যেও না।

যেমনিভাবে আবূ ইয়ালা মুসেলী রহ. তার মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা মহান দু'টি বিষয়কে ভুলে যেও না। আমারা জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কি সে মহান দু'টি বস্তু? উত্তর দিলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম।

আবূ বকর শাফেঈ রহ. হযরত কুলাইব ইবনে হারব রা. হতে বর্ণনা করে। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
أطلبوا الجنة جهدكم واهربوا من النار جهدكم.
তোমরা তোমাদের পূর্ণ সামর্থ দ্বারা জান্নাত প্রার্থনা কর। আর পূর্ণ সামর্থ দ্বারা জাহান্নام থেকে আত্মরক্ষা কর। وان النار لا ينام هاربها । কেননা পলায়নকারী তথা আত্মরক্ষাকারী কখনো নিদ্রা যায় না। وإن الآخرة محفوفة بالمكاره، وإن الدنيا محفوفة باللذات والشهوات، فلا تلهينكم عن الآخرة.
আর আখিরাত কষ্টকর বিষয়াবলী দ্বারা বেষ্টিত আর দুনিয়া হল, আসক্তিকর ও লোভনীয় বস্তসমূহ দ্বারা বেষ্টিত। সুতরাং দুনিয়ার এ লোভনীয় ও আসক্তিকর বস্তসমূহ যেন তোমাদেরকে আখিরাত থেকে উদাসীন না করে ফেলে।

টিকাঃ
১৬১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১১২
১৬২. সূরা মু'মিন, আয়াত: ৭
১৬৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ১৫-১৬
১৬৪. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৮৪, ইবনে মাজাহ, পৃ. ৩২৩
১৬৫. খ. ১, পৃ. ১২২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের বৃক্ষবিধি নাম, অর্থ ও উৎপত্তি

📄 জান্নাতের বৃক্ষবিধি নাম, অর্থ ও উৎপত্তি


সিফাত বা বৈশিষ্ট্যের বিচারে জান্নাতের অনেকগুলো নাম রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার সত্তার দিকে লক্ষ্য করলে তা একটি নামেই অবহিত।

সুতরাং এ হিসাবে সেগুলো সমার্থবোধক শব্দ। কিন্তু বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য করলে সেগুলোর মাঝে ভিন্নতা দেখা যায়। সুতরাং এ হিসাবে সেগুলোর মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। একই অবস্থা আল্লাহ তা'আলার পবিত্র নামসমূহ, তাঁর প্রেরিত কিতাবের নাম, তাঁর রাসূলের নাম, কিয়ামত দিবসের নাম এবং জাহান্নামের নামের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়।

প্রথম নাম
প্রথম নাম হল الجنة (আল জান্নাতু)। এটি একটি ব্যাপক নাম। যা সকল জান্নাত ও সেখানকার নি'আমতরাজি, সৌন্দর্য ও সৌভাগ্য, চক্ষুর শীতলতা ও কোমলতা সব কিছুকেই তা অন্তর্ভূক্ত করে। এটি যে শব্দ থেকে উৎকলিত তার অর্থ হল, আবৃত করা, ঢেকে রাখা, আবরণ। তা হতেই গঠিত হল - جنين | جنين বলা হয়, মাতৃগর্ভস্থ সন্তানকে, তাকে جنين জন্যই বলা হয়, যেহেতু সে ভ্রূণ মাতৃগর্ভে লুকিয়ে আছে, এমনিভাবে জিনদেরকেও জিন এ জন্যই বলা হয়ে থাকে, যেহেতু তারা মানব সৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এমনিভাবে من অর্থ ঢাল, যেহেতু তা আত্মরক্ষার মাধ্যম হয়। এমনিভাবে مجنون কে (পাগল) মাজনূন এজন্যই বলা হয়, যেহেতু তার আবরণ তার জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। ক্ষুদ্র সাপকেও جان বলা হয়। উদ্যানকে জান্নাত এ জন্য বলা হয়, যেহেতু তাতে প্রবেশকারী বৃক্ষরাজিতে অদৃশ্য হয়ে যায়। আর بستان শুধুমাত্র ঐ স্থানকে বলা যায়, যে স্থানে বিভিন্ন প্রজাতির অনেক গাছ রয়েছে।

جنة। শব্দটির 'জীম' অক্ষরে পেশ দিয়ে পড়লে তার অর্থ দাঁড়ায়- ঢাল ইত্যাদি। যার আড়ালে মানুষ আত্মরক্ষার জন্য লুকায়। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جنة তারা তাদের শপথগুলোকে ঢালরূপে ব্যবহার করে'। অর্থাৎ তারা তাদের বিরুদ্ধে মু'মিনদের অস্বীকারকে গোপন করে এভাবে যে, তারা (মু'মিনগণ) তাদের ব্যপারে অস্বীকার করেননি।

এমনিভাবে جنة 'জীম' অক্ষরটিকে যের যোগে তা হতে উদ্ভাবিত, যা জিনদের জন্য ব্যবহার হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী من الجنة والناس 'কু-মন্ত্রণাদাতা জিনদের মধ্যেও রয়েছে এবং মানুষদের মধ্যেও রয়েছে'।

কোন কোন মুফাস্সির বলেন, ফিরিশতাদেরকেও জিন বলা হয়। তারা উক্ত আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করে وَجَعَلُوا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجَنَّةِ نَسَبًا (এবং মুশরিকগণ আল্লাহ তা'আলা এবং জিনদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে'।

মুফাস্সিরীন কিরাম বলেন, তারা মূলত: আল্লাহ তা'আলা ও ফিরিশতাদের মাঝে এ আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে। উল্লিখিত মুফাস্সিরীন দু'কারণে নিজেদের মতকে প্রাধান্য দেন। প্রথম কারণ হল, মুশরিকরা ফিরিশতাগণকে আল্লাহ তা'আলার কন্যা বলে থাকে। সুতরাং তারা জিন ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে না। দ্বিতীয় কারণ হল, আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَقَدْ عَلَمَتِ الْجِنَّةُ إِنَّهُمْ لَمُحْضَرُونَ অথচ জ্বিনেরা জানে, তাদেরকেও উপস্থিত করা হবে শাস্তির জন্য।

উক্ত মুফাস্সিরীনগণ বলেন, ফিরিশতাগণও জানেন, যারা বলে ফিরিশতাগণ আল্লাহর কন্যা, অবশ্যই তাদেরকে শাস্তির জন্য উপস্থিত করা হবে। প্রকৃতার্থে উক্ত মুফসসিরীনের এই মত সঠিক নয়; বরং বিশুদ্ধ বিষয় হল- এর বিপরীত। কেননা وَجَعَلُوا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجَنَّةِ نَسَبًا এ الجنة দ্বারা জিনরাই উদ্দেশ্য। যেমনিভাবে আল্লাহর বাণী من الجنة والناس এ الجنة দ্বারা জিন উদ্দেশ্য। সে হিসাবে উক্ত আয়াতের তাফসীরে মুফাস্সিরীনে কিরামের দু'টি অভিমত রয়েছে। প্রথমটি হল, মুজাহিদ রহ. বলেন, কুরাইশ বংশীয় কাফিররা বলত- ফিরিশতাগণ আল্লাহ তা'আলার কন্যা, তখন আবূ বকর রা. তাদেরকে প্রশ্ন করলেন, তবে তাদের মাতা কে? উত্তরে তারা বলল, সম্ভ্রান্ত নারী জিনরা হল তাদের মা।

কালবী রহ. বলেন, তারা (কাফিররা) বলে থাকে আল্লাহ তা'আলা পরীকে বিবাহ করেছেন, আর তাদের থেকেই ফিরিশতাদের জন্ম।

কাতাদাহ রহ. বলেন, তারা বলত, আল্লাহ তা'আলার ও জিনদের মাঝে জামাই-শ্বশুরের সম্পর্ক।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় দ্বিতীয় মতটি হল, হযরত হাসান বসরী রহ.-এর। তিনি বলেন, মুশরিকরা শয়তানকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে শরীক করে নিয়েছে। একেই তারা নসব তথা বংশীয় সম্পর্ক বলে ব্যক্ত করে। তবে মুজাহিদ ও অন্যদের মতই হল বিশুদ্ধ।

আর আল্লাহ তা'আলার বাণী وَلَقَدْ عَلِمَتِ الْجِنَّةُ إِنَّهُمْ لَمُحْضَرُونَ এর যমীর তথা সর্বনামসমূহ الْجِنَّةِ এর প্রতি-ই প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ জিনরা জানে, হিসাব-নিকাশের জন্য তাদেরকে উপস্থিত করা হবে।

মুজাহিদ রহ. বলেন, মুশরিকরা জিনদের ও আল্লাহর মাঝে যে সম্পর্ক স্থির করে, তা যদি বাস্তবেই থাকত, তবে তাদেরকে হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিত করা হত না। তাদেরকে হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিত করা এ কথারই প্রমাণ বহন করে, তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। উক্ত আয়াতের ভাব ও উদ্দেশ্য তা-ই, যা এ আয়াতের ভাব ও উদ্দেশ্য।

وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُمْ بِذُنُوبِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ بَشَرٌ مِمَّنْ خَلَقَ ইহুদী ও খৃস্টানরা বলে, 'আমরা আল্লাহর পুত্র ও প্রিয়।' বল, তবে কেন তিনি তোমাদের পাপের জন্য তোমাদেরকে শাস্তি দেন? না, তোমরা মানুষ তাদের-ই মতো, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন।'১৬৬

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে স্বীয় পাপের জন্য শাস্তি প্রদান ও শান্তির জন্য উপস্থিত করাকে তাদের মিথ্যা দাবী বাতিল হওয়ার প্রমাণ রূপে করেছেন।

দ্বিতীয় নাম
জান্নাতের দ্বিতীয় নাম হল 'দারুস সালাম'। কুরআনেই আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে এ নামে অভিহিত করেছেন। لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِنْدَ رَبِّهِمْ তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে শান্তির নিবাস।১৬৭

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَاللَّهُ يَدْعُوا لَى دَارِ السَّلَامِ আল্লাহ তা'আলা শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন।১৬৮

এটি জান্নাতের অত্যন্ত উপযোগী নাম। কেননা, তা সকল প্রকার বিপদ-আপদ, অস্থিরতা-পেরেশানী ও দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত ও নিরাপদ এবং তা হল, আল্লাহ তা'আলার ঘর। আর আল্লাহ তা'আলার এক নাম হল السلام (আসসালাম)। যিনি সে জান্নাত ও জান্নাতবাসীকে নিরাপত্তা দিবেন। এর অন্য কারণটি হল, যেহেতু জান্নাতবাসীগণ পারস্পরিক সাক্ষাতে দু'আ ও সালাম করবে, তাই তাকে 'দারুস সালাম' নামে অভিহিত করা হয়। আর ফিরিশতাগণও প্রত্যেক দরযা দিয়ে প্রবেশ করে জান্নাতবাসীদের বলবে, سَلَامٌ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি।

আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেও তাদের প্রতি শান্তি সালাম বলা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَا يَدَّعُونَ سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبِّ رَحِيمٍ সেখানে থাকবে তাদের জন্য ফলমূল এবং বঞ্চিত সমস্ত কিছু ও সালাম, পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে সম্ভাষণ।১৬৯

সামনে হযরত জাবির রা.-এর বর্ণিত হাদীসে উল্লিখিত হবে, জান্নাতবাসীদের জান্নাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্ভাষণ হবে 'সালাম'। এবং জান্নাতবাসীদের পারস্পরিক কথাবার্তা, শান্ত ও শিষ্টতাপূর্ণ অর্থাৎ সেখানে কোন অসার, মন্দ, অশ্লীল ও খারাপ কথা হবে না। لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا إِلَّا سَلَامًا সেখানে তারা শান্তি ব্যতীত কোন অসার বাক্য শুনবে না।১৭০

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَأَمَّا إِنْ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ فَسَلَامٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَابِ الْيَمِينِ আর যদি সে ডানদিকের একজন হয়, তাকে বলা হবে, হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী! তোমার প্রতি শান্তি।১৭১

মুমিনদেরকে সালাম জানানোর ব্যাপারে মুফাসসিরীনদের থেকে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। কিন্তু সব অভিমতের সারাংশ হল, একজন জান্নাতী ব্যক্তি দুনিয়ায় থাকাকালে যেমনিভাবে জান্নাত ও জাহান্নام সম্পর্কিত আক্বীদার ক্ষেত্রে ভুল-বিচ্যুতি হতে সালেম অর্থাৎ নিরাপদ ছিল, ঠিক তেমনি দুনিয়া ত্যাগ করে আল্লাহর সকাশে উপস্থিত হওয়ার প্রাক্কালে তাকে সালামত তথা নিরাপত্তা বিজড়িত শব্দে অভিবাদন জানানো হবে। আর এটিই হবে জান্নাতী ব্যক্তির জন্য পরকালে সর্বপ্রথম সুসংবাদ।

তৃতীয় নাম
জান্নাতের তৃতীয় নাম হল দারুল খুলদ। জান্নাতকে এ নামে নামকরণের কারণ হল, জান্নাতীদেরকে কখনোই জান্নাত হতে বের করা হবে না। যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী عَطَاء غَيْرُ مَجْذُوذ এটা এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।১৭২ আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّ هَذَا لَرِزْقْنَا مَا لَهُ مِن نَّفَادٍ এটাতো আমার দেয়া রিযক যা নিঃশেষ হবে না।১৭৩

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, أُكُلُهَا دَائِمٌ وظِلُّهَا এর ফলসমূহ ও ছায়া চিরস্থায়ী।১৭৪

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না।১৭৫

মু'তাযিলা ও জাহামিয়ারা যে বলে, জান্নাত ধ্বংস হয়ে যাবে বা তার অধিবাসীদের গতি স্তিমিত হয়ে যাবে, সামনে তাদের এ মত খণ্ডন করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

চতুর্থ নাম
জান্নাতের চতুর্থ নাম হল 'দারুল মাকামাহ'। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের পারস্পরিক বাক্যালাপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورٌ الَّذِي أَحَلْنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِنْ فَضْله الَّذِي لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٌ সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের থেকে সকল প্রকার চিন্তা, দুঃখ ও কষ্টক্লেশকে বিদূরিত করেছেন, নিশ্চয়ই আমাদের প্রভু অধিক ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী। যিনি আমাদেরকে আপন ফযলগুণে স্থায়ী আবাস দিয়েছেন। কোনো ক্লেশ আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং ক্লান্তিও স্পর্শ করে না ১৭৬

মুকাতিল রহ. 'দারুল মাকামা'-এর ব্যাখ্যা করেছেন 'দারুল খুলুদ' দ্বারা। যেহেতু তারা সেখানে সর্বদাই অবস্থান করবে, সেখানে তাদের মৃত্যু ঘটবে না এবং সেখান হতে অন্যস্থানে স্থানান্তরিতও হবে না। ফাররা ও যুজাজ বলেন, আল মাকামাহ শব্দটি ইকামাতুন শব্দেরই ন্যায়। যেমন বলা হয়, قمت بالمكان اقامة ومقامة ومقاما। আমি অমুক স্থানে অবস্থান করেছি। এ হিসাবে দারুল মাকামাহ ও দারুল ইকামাহ সমার্থবোধক।

পঞ্চম নাম
জান্নাতের পঞ্চম নাম হল 'জান্নাতুল মা'ওয়া'। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى সিদরাতুল মুনতাহার নিকট অবস্থিত বসোদ্যান। ماوى শব্দটি يأوى থেকে مفعل এর ওযনে ظرف اسم এর صيغة । يأوى -اوى তখন বলা হয়, যখন ব্যক্তি কোথায়ও অবস্থান করে ও সেটিকে আবাসস্থল বানিয়ে নেয়।

হযরত আ'তা রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তাকে মা'ওয়া বলা হয় এ জন্য, যেহেতু জিবরীল আ. ও অন্যান্য ফিরিশতা তাকে ঠিকানা তথা আবাসস্থল বানিয়েছেন। হযরত কালবী ও মুকাতিল রহ. বলেন, তাকে ‘মাওয়া’ বলা হয় এই জন্য, যেহেতু শহীদগণের আত্মা তাকে নিবাস স্থির করেছে। হযরত কা'ব রহ. বলেন, জান্নাতুল মা'ওয়া সে জান্নাত, যাতে শহীদগণের আত্মা সবুজ পাখির ন্যায় ঘুরে বেড়ায়।

উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা রা. ও যির ইবনে হুবাইশ বলেন, জান্নাতসমূহের একটির নাম হল 'জান্নাতুল মা'ওয়া'। তবে বিশুদ্ধতম মত হল, এটা জান্নাত-এর নামসমূহের একটি নাম। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَأَمَّا مَنْ طَغَى وَأَثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস। অনন্তর যে সীমা লংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়, জাহান্নামই হবে তার আবাস।১৭৭ আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, কাফিরদেরকে বলা হবে, وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ তোমাদের আবাসস্থল হল জাহান্নাম।

এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, জান্নাতুল মা'ওয়া জান্নাতেরই একটি নাম।

ষষ্ঠ নাম
জান্নাতের ৬ষ্ঠ নাম হল, ‘জান্নাতে আদ্ন’। কেউ কেউ বলেন, এটি একটি বিশেষ জান্নাতের নাম। তবে সঠিক মত হল, এটিও পুরো জান্নাতেরই একটি নাম। জান্নাতে যতগুলো স্তর রয়েছে, সবগুলোই হল আদ্ন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, جَنَّاتٍ عَدْنِ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْب এটা স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি দয়াময় অদৃশ্যভাবে তাঁর বান্দাদেরকে দিয়েছেন।১৭৮

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ, অর্থাৎ স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ নির্মিত কংকন ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং সেখানে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ হবে রেশমের।১৭৯

عدن শব্দটি عدن - يعدن - عدنا হতে উৎকলিত। যার অর্থ হল, অবস্থান করা ও স্থায়ী নিবাস গড়া। এ হিসাবে জান্নাতের সকল স্তরই হল আন্ন। যেমন আরবগণ বলে থাকেন, عدنت البلد আমি অমুক শহরকে আবাসস্থল বানিয়েছি। জাওহারী রহ. বলেন, জান্নাতে আদ্দন হল, চিরস্থায়ী জান্নাত। এর থেকেই গঠিত معدن এর দাল এ যের যুক্ত। معدن এর অর্থ হল, নাতিশীতোষ্ণ স্থান। তাকে معدن এ জন্যই বলা হয়, যেহেতু মানুষ সেখানে শীত ও গ্রীষ্মে আবাস স্থির করে। আর প্রত্যেক বস্তুর কেন্দ্রই তার খনি সমতুল্য।

সপ্তম নাম
জান্নাতের সপ্তম নাম হল 'দারুল হাইওয়ান'। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِنَّ الدَّارَ الآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ * পারলৌকিক জীবনেই তো প্রকৃত জীবন১৮০।

তাফসীরবিদগণ বলেন, এ দ্বারা উদ্দেশ্য হল 'জান্নাত'। তারা বলেন, আখিরাতের ঘর অর্থাৎ জান্নাত হল لَهِيَ الْحَيَوَانُ অর্থাৎ এমন জীবন যাতে কখনো মৃত্যু ঘটবে না।

কালবী রহ. বলেন, জান্নাত হল এমন জীবন, যাতে মৃত্যু ঘটবে না। যুজাজ বলেন, তা হল চিরস্থায়ী নিবাস। অভিধান বেত্তাগণ বলেন, حيوان শব্দের অর্থ হল হায়াত তথা জীবন। আবূ উবাইদা এবং শাইবাহ রহ. বলেন, الحيواة و الحيوان উভয়টা এক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। আবূ উবাইদ রহ. বলেন, حاء الحي و الحيوان-الحياة -এর যের যুক্ত অবস্থায় তিনটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবূ আলী রহ. বলেন, এ তিনটিই মাসদার তথা ক্রিয়া বিশেষ। الحياة হল فعلة এর ওযনে। যেমন جبلة । আর الحيوان হল نزوان এর ওযনে। আর حي হল عی এর মত।

এর বিরোধীতা করে যায়েদ রহ. বলেন, حيوان বলা হয়, যার মাঝে প্রাণ আছে। তার বিপরীত موات ও موتان তার অর্থ হল প্রাণহীন। বিশুদ্ধ মত হল, حيواة শব্দটি দু'ভাবে ব্যবহার হয়। প্রথমত: মাসদার তথা ক্রিয়া বিশেষ্য রূপে, যেমন আবূ উবাইদা রহ. বলে থাকেন। দ্বিতীয়ত: ওস্ফ তথা গুণ হিসাবে যেমন আবূ যায়দ রহ. এর মতানুসারে حيوان শব্দটি এর ন্যায় میت তথা মৃত্যু এর বিপরীতে ব্যবহৃত হবে। তবে প্রথম মত অর্থাৎ মাসদার হওয়ার মতটিই প্রধান্যতম। কেননা, فعلان এটি মাসদারেরই ওযন। যেমন غيلان ও تروان । এর বিপরীতে সিফাতের সীগা আছে غضبان ও سكران এর ওযনে। যারা দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন তারা বলেন, فعلان এর ওযন কখনো সিফাতের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন আরবগণ বলেন, رجل ضميان অর্থাৎ ছিপছিপে দ্রুতগামী ব্যক্তি। সিহাহে রয়েছে ناقة رفيان অর্থাৎ দ্রুতগামী উষ্ট্রী। সুতরাং رفین শব্দটি সিফাতের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলার বাণী- وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَان এর দু'টি অর্থ হতে পারে। তার প্রথম অর্থ হল, অবশ্যই পরকালের জীবনই হল মূল এবং আসল জীবন। কেননা, তাতে নেই জীবনের কোন তিক্ততা এবং সে জীবনের কখনো সমাপ্তি ঘটবে না। অর্থাৎ সে জীবনে এমন কোন অবাঞ্চিত বিষয়ের সম্মুখীন হবে না, যার সম্মুখীন হত পার্থিব জীবনে। এ দৃষ্টিকোন থেকে حیوان শব্দটি মাসদার তথা ক্রিয়া বিশেষ্য। তার দ্বিতীয় অর্থ, এটা এমন নিবাস যার অবসান ঘটবে না, সমাপ্তি ঘটবে না ও যা ধ্বংস হবে না। যেমনিভাবে পৃথিবীতে জীবিতদের জীবনাবসান ঘটে থাকে। সুতরাং ধ্বংসশীল ও মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদনকারী প্রাণী হতে পরকালীন নিবাসীগণ حیوان নামে অভিহিত হওয়ার অধিক যোগ্য। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَان الدار الآخرة لهي الحيوان -পারলৌকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন। অর্থাৎ যে জীবনের সমাপ্তি নেই।

অষ্টম নাম
জান্নাতের অষ্টম নাম হল ‘ফিরদাউস’। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, أولئك هم الوارثون الذين يرثون الفردوس هم فيها خالدون তারাই হবে অধিকারী, অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা স্থায়ী হবে।১৮১

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফিরদাউস উদ্যান।১৮২

সকল জান্নাতকেই ফিরদাউস বলা হয়। তবে জান্নাতের সর্বাপেক্ষা উত্তম ও উচ্চ স্তরকেও ফিরদাউস বলা হয়। কেমন যেন এ স্তরটিই অন্যান্য স্তর হতে এ নামের অধিক যোগ্য। মূলত ফিরদাউস বলা হয় পুষ্পোদ্যানকে। এর বহুবচন হল, فرادیس।

কা'ব রহ. বলেন, আঙ্গুরগাছ সমৃদ্ধ উদ্যানকে ফিরদাউস বলা হয়।

যাহ্হাক রহ. বলেন, পরস্পর লাগোয়া বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ উদ্যানকে ফিরদাউস বলা হয়। মুবাররাদও এ মত গ্রহণ করে বলেন, আমি আরবদের থেকে যা শুনেছি সে হিসাবে ফিরদাউস সে উদ্যানকে বলা হয়, যার বৃক্ষগুলো পরস্পর লাগোয়া অর্থাৎ ঘন এবং এর অধিকাংশ আঙ্গুর গাছ সমৃদ্ধ হয়। এর বহুবচন হল فرادیس। মুবাররাদ বলেন, এ জন্যই সিরিয়াকে ‘বাবুল ফারাদিস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

মুজাহিদ রহ. বলেন, بستان এর অর্থে একটি রোমান শব্দ। যুজাজ রহ.ও এ মতটি গ্রহণ করে বলেন, এটি একটি রোমান শব্দ। এরপর তাকে আরবী ভাষায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। উদ্যানে সাধারণত যে সব বস্তু থাকে সে গুলো দ্বারা উদ্যান সমৃদ্ধ হলে তাকে ফেরদাউস বলা হয়। হাসান রা. বলেন, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে স্থায়ী নিবাসীদের যে প্রতিদান প্রদান করা হবে, তা হবে ফিরদাউসের উদ্যানের আকৃতিতে, যা হবে চিরস্থায়ী।

নবম নাম
জান্নাতের নবম নাম হল 'জান্নাতুন নাঈম'। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, o إِنَّ الَّذِيْنَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে সুখদায়ক কানন।

এটিও একটি ব্যাপক নাম- যা সকল জান্নাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। কেননা, জান্নাতে তাবৎ নিআমতের ব্যাপক সমাহার। খাবারের নি'আমত, পানীয়র নি'আমত, পোশাক-পরিচ্ছেদের নি'আমত, সুগন্ধিময় মেশকের নি'আমত, প্রফুল্লকর দৃশ্যের নি'আমত, বিশাল বাসস্থানের নি'আমত, ইত্যাদি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নি'আমতরাজী দিয়ে জান্নাতঋদ্ধ বলেই তাকে 'জান্নাতুন নাঈম' বলা হয়।

দশম নাম
জান্নাতের দশম নাম হল 'মাকামুন আমীন'। আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাকে ইরশাদ করেন, o إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامِ أَمِين নিশ্চয়ই খোদাভীরুগণ নিরাপদ স্থানে অবস্থান করবে।

মাকাম বলা হয়, অবস্থান স্থলকে। আর আমীন বলা হয়, সকল প্রকার বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানী হতে নিরাপদ স্থানে অবস্থানকারীকে। জান্নাত হবে নিরাপত্তার সকল প্রকার গুণসমৃদ্ধ। তা ধ্বংস হওয়া, অবসান ঘটা ও সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত। আর তার অধিবাসীগণ তা থেকে বহিষ্কার, জীবনের তিক্ততা ও সকল প্রকার পেরেশানী মুক্ত থাকবে। মক্কা নগরীকে বলা হয় 'আল বালাদুল আমীন'। কেননা, তা সার্বিকভাবে নিরাপদ এবং অন্যান্য শহরে সাধারণত: যে সকল নিরাপত্তাহীনতা থাকে তা হতে মক্কা নগরী মুক্ত। চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ তা'আলা কিভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, o إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامِ أَمِينِ অবশ্যই মু'মিনগণ নিরাপদ স্থানে অবস্থান করবে। অন্যত্র বলেন, يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةِ آمِنِينَ সেখানে তারা প্রশান্তচিত্তে বিভিন্ন ফলমূল আনতে বলবে।১৮৩

আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য কিভাবে বাসস্থানের নিরাপত্তা ও খাদ্যের নিরাপত্তাকে যুগপৎভাবে একত্র করেছেন। সুতরাং ফল নিঃশেষ হওয়ার বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার বা পচে যাওয়ার বা কোন প্রকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার আশংকা থাকবে না। জান্নাত থেকে তাদের বহিষ্কার হওয়ারও কোন প্রকার ভীতি বা শংকা থাকবে না। আর মৃত্যুবরণের কোন প্রকার শংকাও থাকবে না।

এগার ও বারতম নাম
জান্নাতের এগারতম নাম হল, 'মাক'আদুস সিদক' এবং বারতম নাম হল 'কাদামুস সিদ্‌ক'। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ في مَقْعَدِ صَدْقٍ عِنْدَ مَلِيكَ مُقْتَدِرٍ মুত্তাকীরা থাকবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে, যোগ্য আসনে, সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহর সান্নিধ্যে।১৮৪

এখানে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে 'মাকআদুস্ সিদক' নামে অভিহিত করেছেন। কেননা, ঈপ্সিত যে কোনো বস্তুই সেই সত্য স্থানে অর্জিত হবে। যেমন مودة صادقة তখন বলা হয়ে থাকে, যখন দু'ব্যক্তির মাঝে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। এমনিভাবে বলা হয় حلاوة صادقة, অর্থাৎ স্বভাবসুলভ মিষ্টি। এমনিভাবে উদ্দেশ্য সফল আক্রমণকে বলা হয় حملة صادقة এমনিভাবে উদ্দেশ্য অর্জিত বাক্যকে বলা হয় ا الكلام الصدق

আরবী ভাষাবিদগণের মতে صدق শব্দটি পূর্ণতা ও বিশুদ্ধতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। সে মতেই বলা হয় الصدق في الحديث، والصدق في العمل অর্থাৎ কথা ও কাজে সত্যবাদিতা। সাদিক সে ব্যক্তিকে বলা হয়, যার কাজ ও কথায় মিল থাকে। 'সাদ' এ যবরযুক্ত অবস্থায় صدق বলা হয়- বর্শার শক্ত ভাগকে ও বীর ব্যক্তিকে। যেমন বলা হয়ে থাকে- انه لذو مصدق নিশ্চয় সে প্রকৃত হামলাকারী। আর সে মতেই অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে বলা হয় * 5 ও সঠিক পদক্ষেপকে বলা হয় قدم صدق এবং সঠিক প্রবেশকে বলা হয় مدخل صدق ও সঠিক নিষ্কৃতিকে বলা হয় ا مخرج صدق

এ সবগুলোই সত্য ও প্রমাণিত। এর দ্বারা তার প্রতি আকৃষ্ট করাই উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে মিথ্যা হল বাতিল, যার থেকে নীচু আর কোন বিষয় নেই। কেউ কেউ قدم صدق -এর ব্যাখ্যা করেছেন জান্নাত দ্বারা। কেউ কেউ বলেন, قدم صدق দ্বারা সে সকল আমল উদ্দেশ্য- যার দ্বারা জান্নাত লাভ করা যায়। কেউ কেউ তার ব্যাখ্যা করেছেন- তাকদীর তথা ভাগ্যলিপি দ্বারা। কেউ কেউ তার ব্যাখ্যায় বলেন, قدم صدق দ্বারা উদ্দেশ্য হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাঁর পথ-নির্দেশনায় মানুষ জান্নাত লাভ করবে। এ সকল তাফসীরই সঠিক। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জান্নাত লাভের মাধ্যম সকল আমলকে স্বীয় রাসূলের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন এবং সেগুলোকে প্রতিদান দিবসের জন্য সঞ্চয় করেছেন। আর সেগুলো লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

لسان الصدق বলা হয়- উত্তম কাজের সঠিক প্রশংসাকারী মুখকে। لان الصدق দ্বারা এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত, যে সকল বিষয় প্রকৃতপক্ষেই বাস্তব সম্মত এবং তার প্রশংসাও বাস্তবোচিত, কৃত্রিম নয়।

مخرج صدق 3 مدخل صدق এমন প্রবেশ ও বহির্গমনকে বলে, যাতে প্রবেশকারী ও বহির্গামী আল্লাহ তা'আলার যিম্মাদারীতে থাকবে। তার প্রবেশ ও বহির্গমন একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই হবে। এ দু'আ তো বান্দার জন্য অত্যন্ত উপকারী। কেননা, সে তো অবশ্যই কোথাও না কোথাও প্রবেশ করবে অথবা বের হবে। তার এ প্রবেশ ও বহির্গমন যদি আল্লাহর জন্য হয়, তবে তাও مخرج صدق 3 مدخل صدق -এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

টিকাঃ
১৬৬. সূরা মায়িদা, আয়াত: ১৮
১৬৭. সূরা আনআম, আয়াত: ১২৭
১৬৮. সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৫
১৬৯. সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ৫৭-৫৮
১৭০. সূরা মারয়াম ৬২
১৭১. সূরা ওয়াকি 'আ ৯০-৯১
১৭২. সূরা হুদ, আয়াত: ১০৮
১৭৩. সূরা সাদ, আয়াত: ৫৪
১৭৪. সূরা রা'দ, আয়াত ৩৫
১৭৫. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
১৭৬. সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৪-৩৫
১৭৭. সূরা নাযি'আত, আয়াত: ৪০-৪১
১৭৮. সূরা, মারইয়াম, আয়াত: ৬১
১৭৯. সূরা ফাতির, আয়াত: ৩৩
১৮০. সূরা আনকাবূত, আয়াত: ৬৪
১৮১. সূরা মু'মিনুন, আয়াত: ১০-১১
১৮২. সূরা কাহফ, আয়াত: ১০৭
১৮৩. সূরা দুখান, আয়াত: ৫৫
১৮৪. সূরা কামার, আয়াত: ৫৪-৫৫

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের সংখ্যা ও তার প্রকার

📄 জান্নাতের সংখ্যা ও তার প্রকার


জান্নাত শব্দটি তাতে অবস্থিত সকল বস্তু অর্থাৎ উদ্যানসমূহ, নিবাসসমূহ এবং প্রাসাদসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। জান্নাত অনেক রয়েছে, যেমন ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে১৮৫ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, উম্মে হারিসা বিনতে সুরাকা রা. নাম্নী জনৈক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে বদরের যুদ্ধে হঠাৎ তীরবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করে। তার ব্যাপারে আপনি আমাকে কি কোন সংবাদ দিবেন? যদি সে জান্নাতী হয়, তবে আমি আমার এ আঘাতের উপর ধৈর্য ধারণ করব। আর যদি জান্নাত ব্যতীত অন্য স্থানে থাকে, তবে আমি খুব কাঁদব যেন আমার মনের ব্যথা কিছুটা হালকা হয়। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উম্মে হরিসা! জান্নাতে অসংখ্য উদ্যান রয়েছে। তোমার ছেলে তো জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছে। যা সর্বাপেক্ষা উচ্চ মর্যাদার জান্নাত। সহীহায়নে১৮৬ হযরত আবূ মূসা আশআরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু'টি জান্নাত রয়েছে স্বর্ণের; তার পাত্রসমূহ, অলংকারসমূহ ও আরো যা কিছু তাতে রয়েছে সব কিছুই হবে স্বর্ণ নির্মিত। অন্য দু'টি জান্নাত রয়েছে রৌপ্যের। তার পাত্রসমূহ, অলংকারসমূহ, আরো যা কিছু তাতে রয়েছে সব কিছুই হবে রৌপ্য নির্মিত। আর জান্নাতে আদনের অধিবাসীগণের মাঝে এবং আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভের মাঝে শুধু মাত্র আল্লাহ তা'আলার বড়ত্বের পর্দাই আড়াল থাকবে। এ ছাড়া আর কোন কিছু-ই থাকবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ আর যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।১৮৭

এ দুটি উল্লেখের পর আল্লাহ তা'আলা সামনে বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتَان এই উদ্যানদ্বয় ছাড়া আরো দুটি উদ্যান রয়েছে।১৮৮ সুতরাং মোট চারটি হল।

আল্লাহ তা'আলার বাণী وَمِنْ دُونهما এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণের ভিন্ন মত রয়েছে, দুটি জান্নাত উপরোক্ত সে দুটি হতে উপরের হবে? না নিচের হবে? একদল মুফাস্সির বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا দ্বারা উদ্দেশ্য হল اقرب منهما إلى العرش অর্থাৎ এ জান্নাত দুটি প্রথমোক্ত জান্নাত দুটি অপেক্ষা আরশের অধিক নিকটবর্তী হবে। এ হিসাবে এ দুটি জান্নাত প্রথমোক্ত দুটি অপেক্ষা উপরে হবে। অন্য একদল মুফাস্সির বলেন, دُونهما অর্থ হল تهما অর্থাৎ এ দুটি জান্নাত প্রথমোক্ত দুটি অপেক্ষা নিচের হবে।

তারা বলেন, ভাষাবিদগণ বলেন, অমুক বস্তু অমুক বস্তু হতে دون (নিচু)। এর দ্বারা উদ্দেশ্য তা এ বস্তু অপেক্ষা নিম্নস্তরের। যেমন কোন ব্যক্তির প্রশংসায় অতিরিক্ত করে বলা হল, انا دون ما تقول، وفوق ما في نفسك তুমি যা বলছ আমার মর্যাদা তার চেয়ে কম এবং তোমার অন্তরে আমার অবস্থান যে স্তরের, আমি তার চেয়ে উর্ধ্বে। অভিধান গ্রন্থ সিহাহ-এ دون কে فوق এর বিপরীত শব্দ বলা হয়েছে। আর তাতে এ-ও বলা হয়েছে, دون শব্দ اقرب منه (অধিক নিকটবর্তী) অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কুরআন কারীমের পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বুঝা যায়, প্রথমোক্ত জান্নাত দুটি অধিক মর্যাদা সম্পন্ন। সে গুলো মর্যাদা সম্পন্ন হওয়ার দশটি কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, ذواتَا أَفْنَان উভয়ই বহু শাখা-পল্লব বিশিষ্ট।১৮৯ افنان শব্দটির একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি হল, أفنان এটি فنن-এর বহুবচন, যার অর্থ, ঢাল। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল তা فن এর বহুবচন। فن অর্থ হল- প্রকার ও প্রজাতি। এ হিসাবে তার অর্থ হবে, জান্নাত দুটি বিভিন্ন প্রকার ও প্রজাতির ফল ও অন্যান্য বস্তুসমৃদ্ধ হবে। তার পরবর্তীতে বর্ণিত জান্নাতসমূহের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য ذَوَاتَا أَفْنَانِ দ্বারা বর্ণনা করা হয়নি।

দ্বিতীয় কারণ : আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় বলেন, فيهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রবহমান দুই প্রস্রবণ।১৯০ পক্ষান্তরে অপর জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِمَا عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে উচ্ছলিত দুই প্রস্রবণ।১৯১ نَضَّاخَتَانِ )উচ্ছলিত) অপেক্ষা جارية )প্রবহমান) গুণটি অতি উত্তম। কেননা جَرَيَة ফোয়ারা ও সরলভাবে প্রবহমান উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর نَضَّاخَتَان শুধুমাত্র ফোয়ারার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তৃতীয় কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই দুই প্রকার।১৯২ অপর জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلُ وَرُمَّانٌ সেখানে রয়েছে ফলমূল, খর্জুর ও আনার।১৯৩

সুতরাং নিঃসন্দেহে অপর জান্নাত দুটির বর্ণিত গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের তুলনায় প্রথমোক্ত জান্নাতে বর্ণিত গুণাগুণ অধিক পরিপূর্ণ। মুফাসসিরীনে কিরাম এ ব্যাপারে একমত, زوجان দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন দুই প্রজাতি উদ্দেশ্য। কিন্তু এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে, সে ভিন্ন ভিন্ন দুই প্রজাতি কেমন হবে? একদল বলেন, সে ভিন্ন দুই প্রজাতির হবে শুকনো ও তাজার দৃষ্টিকোন থেকে। শুকনোটি তাজাটি অপেক্ষা স্বাদ ও গুণাগুণের দৃষ্টিতে কম হবে না। আর আহারকারীও এর দ্বারা তাজাটির মতই উপকৃত হতে পারবে। কিন্তু সুস্পষ্টতই এ ব্যাখ্যার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সংশয় থেকে যায়।

কেউ কেউ বলেন, ভিন্ন দুই প্রজাতি এক প্রকার হবে প্রসিদ্ধ প্রজাতির আর অন্য প্রকার অপ্রসিদ্ধ প্রজাতির। একদল বলেন, দুই প্রকারের হবে; কিন্তু তারা এর বিশদ বিবরণ প্রদান করেননি। প্রকৃত বিষয় তো একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। তবে বাহ্যিকভাবে যা বুঝা যায়, মিষ্টি ও টক, মিষ্টি ও নোনা, লাল ও সাদা হিসাবে দু'প্রজাতির হবে। কেননা, বৈচিত্রময় স্বাদের ও রংয়ের ফল দেখতে ভাল লাগে। স্বাদের ক্ষেত্রে ও ভাল লাগে।

চতুর্থ কারণ : আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাতের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَق সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে, পুরো রেশমের আস্তর বিশিষ্ট ফরাশে।১৯৪

পক্ষান্তরে অপর জান্নাত দুটির গুনাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, مُتَّكِئِينَ عَلَى رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِي حِسَانٍ তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ তাকিয়ায় ও সুন্দর গালিচার উপর।১৯৫

রَفْرَف-এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিছানার চাদর, বিছানা ইত্যাদি দ্বারা। যে ব্যাখ্যাই করা হোক এতে সে মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য নেই যা রয়েছে প্রথমোক্ত দুই জান্নাতের বর্ণিত গুণের মধ্যে।

পঞ্চম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانِ দুই উদ্যানের ফল হবে নিকটবর্তী।১৯৬ অর্থাৎ তা নেয়া অত্যন্ত সহজ হবে। যে-ই ইচছা করবে নিতে পারবে। কিন্তু অপর দুই জান্নাতের এমন কোন গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়নি।

ষষ্ঠ কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, فيهِنَّ قاصرات الطرف সেখানে রয়েছে বহু আনত নয়না স্ত্রীলোক।১৯৭ অর্থাৎ সে সকল স্ত্রীলোক স্বীয় স্বামীতেই আপন দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করবে, অন্য কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে না। এটা তাদের সন্তুষ্টি ও ভালবাসার কারণেই হবে। এর দ্বারা এ বিষয়টিও প্রতীয়মান হয়, স্বামীদের দৃষ্টিও একমাত্র তাদের প্রতিই কেন্দ্রীভূত থাকবে। সে সকল স্ত্রীর রূপ-লাবণ্য ও সৌন্দর্য স্বামীদের দৃষ্টিকে অন্যদিকে যেতেই দিবে না। অপর জান্নাত দুটির বর্ণনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, তাতে রয়েছে حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ তাঁবুতে রক্ষিতা হুরগণ।১৯৮

সুতরাং আপন দৃষ্টিকে স্বেচ্ছায় স্বীয় স্বামীর দৃষ্টি নিজের প্রতি কেন্দ্রীভূতকারিনী স্ত্রীলোক অন্যান্য স্ত্রীলোকের তুলনায় মর্যাদাবান।

সপ্তম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাতের আলোচনাকালে হুরদের বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।১৯৯ অর্থাৎ তারা আপন রূপ মহিমায় ও রূপ লাবণ্য পদ্মরাগ ও প্রবালের ন্যায় হবে। কিন্তু পরবর্তীতে বর্ণিত জান্নাতের হুরদের গুণ বর্ণনায় এতটা বলা হয়নি।

অষ্টম কারণ : প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, هل جزاء الاحسان إلا الإحسان উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার ব্যতীত আর কী হতে পারে?২০০ এর দ্বারা বুঝা যায়, উক্ত জান্নাতের অধিবাসীগণ দুনিয়ায় সম্পূর্ণ সৎ কাজ সম্পাদনকারী ছিলেন। সুতরাং তাদের পুরস্কার ও হবে উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ।

নবম কারণ: প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা لِمَنْ خَافَ দ্বারা সূচনা করে বলেন, এটা সে লোকদের প্রতিদান, যারা স্বীয় প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে। এর দ্বারা বুঝা যায়, উক্ত জান্নাত দুটি খোদাভীরু লোকদের প্রতিদান স্বরুপ প্রদান করা হবে। যেভাবে প্রথমে কারণ বলে পরে সেই কারনের ফলাফল বলা হয়েছে। ঠিক সেভাবেই প্রথমে আল্লাহ ভীতিকে উল্লেখ করে পরে তার প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। কাজেই খোদাভীরুদের মাঝে দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরে নৈকট্যশীলগণ, তাদের জন্য প্রথোমাক্ত দুই জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে দরবারে খোদাওয়ান্দির ডান পাশের আসনে সমাসীন খোদাভীরুগণ, তাদের জন্য পরের দুই জান্নাত বরাদ্দ থাকবে।

দশম কারণ: আল্লাহ তা'আলা প্রথমোক্ত জান্নাত দুটির বর্ণনায় বলেন, وَمِنْ دُونِهِمَا جَنَّتَانِ বাক্যের উপস্থাপন পদ্ধতি দাবী করে, এখানে دُون শব্দ টি فَوق এর বিপরীত ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন জাওহারীর মত।

যদি প্রশ্ন করা হয়, খোদাভীরুদের মাঝে চারটি জান্নাত কিভাবে বণ্টন করা হবে? তবে তার উত্তরে বলা হবে খোদাভীরু দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। যেমন আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি। সুতরাং উঁচু স্তরের জান্নাত নৈকট্যপ্রাপ্তদের প্রদান করা হবে, আর ডানপার্শ্বস্থ অন্য লোকদেরকে অপর জান্নাত দেওয়া হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয়, সকল খোদাভীরু লোকই কি যৌথ ভাবে দুটি জান্নাত লাভ করবে? নাকি তারা প্রত্যেকেই দুটি করে জান্নাত লাভ করবে? তার উত্তর হল, এ ব্যাপারে মুফাস্সিরীনে কিরামের দুটি অভিমত রয়েছে। একটি হল, সকলে যৌথভাবে সে উদ্যান লাভ করবে। দ্বিতীয়টি হল, প্রত্যেকেই দুটি করে উদ্যান লাভ করবে। দ্বিতীয় মতটিকে দু'কারণে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রথম কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। তিনি বলেন, এগুলো জান্নাতের উদ্যানসমূহের অন্ত র্গত দুটি উদ্যান। দ্বিতীয়টি হল অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলী বাস্তবায়নের প্রতিদান স্বরূপ একটি উদ্যান প্রদান করা হবে। আর আল্লাহ তা'আলার নিষেধকৃত বিষয়াবলী থেকে বিরত থাকার প্রতিদান স্বরূপ তাদেরকে অন্য একটি উদ্যান প্রদান করা হবে।

যদি এরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যে সকল উদ্যানে স্ত্রীলোকের আলোচনা রয়েছে সেগুলোতে فيهن বলা হয়েছে, অর্থাৎ هن বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর যে সকল উদ্যানে স্ত্রীলোক ব্যতীত অন্যান্য বস্তুর আলোচনা করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে فيهما বলা হয়েছে অর্থাৎ দ্বিবচনের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তার উত্তরে বলা হবে, مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشٍ বলার পর বলা হয়েছে, فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطرف এখানে هن সর্বনাম فرش এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। আর অন্যস্থানে যেখানে স্ত্রীলোকের কথা আলোচিত হয়েছে, সেখানেও তার পূর্বোক্ত আয়াতের সাথে শাব্দিক ও অর্থগত উভয় দিকে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য فِيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ বলা হয়েছে। যেন এটিও তার পূর্বোক্ত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়।

টিকাঃ
১৮৫. খ. ২, পৃ. ৫৬৭
১৮৬. বুখারী, খ. ২ পৃ: ৭২৪, মুসলিম, খ. ১ পৃ. ১০০
১৮৭. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৪২
১৮৮. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬২
১৮৯. সূরা আর রহমান, আয়াত: ৪৮
১৯০. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫০
১৯১. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬৬
১৯২. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫২
১৯৩. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬৮
১৯৪. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৪
১৯৫. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৭৬
১৯৬. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৪
১৯৭. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৬
১৯৮. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৭২
১৯৯. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৫৮
২০০. সূরা আর রাহমান, আয়াত: ৬০

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের কিয়দাংশ আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন

📄 জান্নাতের কিয়দাংশ আল্লাহ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন


আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে একটি প্রাসাদ নিজের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাকে আপন আরশের নিকটবর্তী করার মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। সে উদ্যানের বৃক্ষ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে লাগিয়েছেন। এ জান্নাত হবে সকল জান্নাতের সর্দার। আল্লাহ তা'আলা এটাকে জান্নাতের সকল অংশ থেকে উত্তম, মর্যাদাশীল উঁচু স্তরের করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন ফিরিশতাদের মধ্যে হযরত জিবরীল আ. কে, মানবকুলের মাঝে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে, আকাশের মাঝে সর্বাপেক্ষা উপরের আকাশকে, শহরের মধ্যে মক্কা মুকাররমাকে, মাসের মধ্যে মুহাররামকে, (রমযান ব্যতীত) রজনীর মধ্যে লাইলাতুল কদরকে, দিনের মধ্যে জুমুআর দিনকে এবং এমনিভাবে অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রেও একই প্রজাতির মধ্যেও একটি অপেক্ষা অন্যটিকে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন তা-ই সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই পসন্দ করেন।

তাবারানী রহ. স্ব-সনদে স্বীয় মুজা'মে হযরত আবুদ দারদা রা. হতে বর্ণনা করেন, ২০২ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন রাতের শেষ তিন প্রহর বাকী থাকে, তখন আল্লাহ তা'আলা অবতরণ করেন। (তাঁর শান মোতাবেক) প্রথম প্রহরে লাওহে মাহফযের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সেখান থেকে যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন এবং যা ইচ্ছা রেখে দেন। দ্বিতীয় প্রহরে জান্নাতে আদনের প্রতি তাকান। এটি তাঁর অবস্থানস্থল (এখানে আরশের নীচেই এ জান্নাত)। এখানে তাঁর সাথে আম্বিয়ায়ে কিরাম, শহীদগণ ও সত্যবাদীগণ ব্যতীত অন্য কেউ থাকবে না। সেখানে এমন সব বস্তু রয়েছে যা কখনো কোন চর্মচক্ষু দেখেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কখনো তা কল্পনাও করেনি। অতঃপর রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা'আলা নিচে নেমে ঘোষণা করতে থাকেন, আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ কি আছে আমার কাছে কোন বস্তু প্রার্থনাকারী, আমি তাকে তা প্রদান করব। আছে কি কোন প্রার্থনাকারী, আমি তার প্রার্থনা মনযূর করব। সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ধারা বজায় থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنْ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا আর কায়েম করবে ফজরের নামায। নিশ্চয়ই ফজরের নামায উপস্থিতির সময়।২০২ অর্থাৎ এসময় আল্লাহ ও তার ফেরেশতা গণ উপস্থিত থাকেন।

হযরত হাসান বিন সুফিয়ান স্ব-সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে তৈরী করেছেন। এখানে মুশরিক, মদ্যপ ও অহংকারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ।

দারিমী ও অন্যরা আবূ মাআয নুজায়হ ইবনে আব্দুর রহমানের মাধ্যমে হযরত আব্দুর রহমান ইবনুল হারিছ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তিনটি বস্তু স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন, এক. হযরত আদম আ.কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। দুই. তাওরাত আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিন. ফিরদাউসের গাছগুলো আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে লাগিয়েছেন। এরপর তিনি বলেছেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তাতে মদ পানকারী ও দায়্যুস প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে তো আমরা জানি, কিন্তু দায়্যুস কে? উত্তরে বললেন, যে ব্যক্তি নিজ পরিবারে কোন প্রকার নির্লজ্জ কাজের সুযোগ দেয় অর্থাৎ নিজ পরিবার- পরিজনের ভেতর অপকর্মে যার সম্মতি আছে।

দারেমী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে চারটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন। আরশ, কলম, জান্নাতে আর্দ্র ও হযরত আদম আ. কে। অতঃপর অন্য মাখলুক সৃষ্টির ক্ষেত্রে বলেছেন, كن فيكون 'হও, ফলে হয়ে যায়'। হযরত মাইসারাহ রা. হতে অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মাখলুকের মধ্য হতে তিনটি ব্যতীত কাউকে স্পর্শ করেননি। (বরং অন্য সব মাখলুককে এদ্বারা সৃষ্টি করেছেন) হযরত আদম আ. কে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। তাওরাত নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আদনের বৃক্ষরাজি নিজ হাতে রোপন করেছেন।

এমনিভাবে হযরত কা'ব রা. হতেও বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তিনটি বস্তুকেই নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ. কে নিজ কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছন। তাওরাত নিজ কুদরতী হাতে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজি নিজ কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন। অতঃপর জান্নাতে আত্মকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি কথা বল, তখন তা বলতে লাগল, قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

শামার ইবনে আতিয়াহ রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল ফিরদাউসকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দৈনিক পাঁচবার উন্মুক্ত করে দিয়ে বলেন, আমার বন্ধুদের জন্য তুমি তোমার সৌন্দর্য বৃদ্ধি কর এবং সুগন্ধি ছড়াও।

ইমাম হাকিম রহ. মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আন-এর বৃক্ষরাজিকে কুদরতী হাতে রোপণ করেছেন, যখন তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করল, তখন তার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া হল। অতঃপর তা প্রত্যেক সাহরীর সময় খোলা হত এবং আল্লাহ তা দেখতেন, তখন তা বলত قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

ইমাম বায়হাকী রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত এ ভাবে তৈরী করেছেন, তার দেয়ালের একটি ইট হল স্বর্ণের, অন্যটি হল রৌপ্যের। সেখানে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতী হাতে বৃক্ষ রোপণ করেছেন। তখন তাকে কথা বলতে বললেন, তখন তা বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ।

তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, সুসংবাদ তোমার জন্য, তুমিই হলে রাজা বাদশাহদের ঠিকানা।

ইবনে আবিদ দুনিয়া স্ব-সনদে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আত্মকে স্বীয় কুদরতী হাতে সৃষ্টি করেছেন। এর একটি ইট হল শুভ্র মুক্তার আর অন্য একটি ইট হল লাল মুক্তার এবং অন্যটি হল সবুজ মুক্তার। আর এর মেঝে হল কস্তুরীর, আস্তর মুক্তার, কাষ্ঠ যাফরানের। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে কথা বলতে বললেন, তখন সে বলে উঠল قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু'মিনগণ। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার সম্মান ও বড়ত্বের কসম, তোমার মধ্যে আমি কোন কৃপনকে প্রবেশ কারাবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।২০৩

আল্লাহ তা'আলার এ বিশেষ মেহেরবানীর ব্যাপারে চিন্তা করা উচিৎ, আল্লাহ তা'আলা নিজ কুদরতী হাতে যে সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন আবার তার জন্যই স্ব-হাতে গুণে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। আদম সন্তানের জন্য এর চেয়ে অধিক মর্যাদা আর কি হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা নিজ হাতে সৃষ্টি করে তাদের মর্যাদাবান করেছেন ও অন্যান্য মাখলুক থেকে ভিন্নতা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। ( وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ )তা অর্জনের তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই দিতে পারেন) সকল প্রাণীর উপর হযরত আদম আ. এর মর্যাদা যেমন, অন্যান্য জান্নাতের উপর এ জান্নাতের মর্যাদা ঠিক তেমনি।

হযরত ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহতে২০৪ হযরত সাঈদ রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হযরত মূসা আ. স্বীয় প্রভুকে জিজ্ঞাসা করেছেন, জান্নাতে সর্বাপেক্ষা নিম্নস্তরের কে হবে?

উত্তরে বলা হল, যে ব্যক্তি সকল লোক বেহেশতে প্রবেশের পর আসবে এবং তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কিভাবে প্রবেশ করব। সকল লোক আপন স্থান দখল করে নিয়েছে এবং যা কিছু নেওয়ার তা নিয়ে নিয়েছে। (আমার জন্য আর তাতে কি বাকী রয়েছে?) তখন তাকে বলা হবে, তুমি কি পসন্দ কর, তোমাকে সে পরিমাণ প্রাচুর্য দেওয়া হবে, যা দুনিয়ার সকল রাজা বাদশাহরও নেই। তখন সে বলবে, হে প্রভু! আমি এতেই সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বলবেন, তুমি পাবে এবং এরচেয়ে চারগুণ বেশি পাবে। তখন সে বলবে, আমি এতে সন্তুষ্ট। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং বলবেন, এ-ই সে ব্যক্তি, যার জন্য আমি নিজ কুদরতী হাতে উত্তম প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করেছি এবং সে জান্নাতে মোহর লাগিয়ে দিয়েছি। ফলে তাকে কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ তার কথা শ্রবণ করেনি, কোন হৃদয় পটে তার কল্পনাকে স্থান দেয়নি। আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ কেউ জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে।২০৫

টিকাঃ
২০২. এ বর্ণনাটি তিরমিযীতে খ. ১, পৃ. ১০১ উদ্ধৃত হয়েছে।
২০৩. সূরা হাশর, আয়াত: ৯
২০৪. খ. ১ পৃ. ১০৬
২০৫. সূরা সাজদা, আয়াত: ১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00