📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের শ্রেণী বিন্যাস

📄 জান্নাতের শ্রেণী বিন্যাস


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ، فَضَّلَ اللهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَحِيمًا .
মু'মিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয়, অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে থাকে, তাদের উপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহা পুরষ্কারারের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এ হল তাঁর নিকট হতে মর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। আর ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।১৩৮

ইবনে জারীর রহ. স্ব-সনদে মিহারীয রহ. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মুজাহিদদেরকে যে মর্যাদা প্রদান করেছেন, তা হল সত্তরটি স্তর। এর প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে সে পরিমাণ দূরত্ব, যে পরিমাণ দূরত্ব সত্তর বছরে অত্যন্ত দ্রুতগামী ও সতেজ ঘোড়া অতিক্রম করতে পারে।

ইবনুল মুবারক রহ. যাহ্হাক রহ. থেকে আল্লাহ তা'আলার বাণী, لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عندَ رَبِّهِمْ এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, মুমিনদের মাঝে একে অপরের উপর স্তর ভেদে উঁচু-নীচু হবেন কিন্তু উঁচু স্তর অর্জনকারী নিজেই তা প্রত্যক্ষ করবেন। নিচের স্তর অর্জনকারী তা প্রত্যক্ষ করবেন না, আমার উপর কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ আয়াতে যারা ঘরে বসে থাকে, তাদের থেকে মুজাহিদের প্রথমে একগুণ বেশি মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর কয়েকগুণ বেশি মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি মনোযোগের দাবী রাখে।

কেউ কেউ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, একগুণ বেশি সে সব লোকদের উপর, যারা ওযরের কারণে ঘরে বসে থাকে, আর কয়েক গুণ বেশি হল সে ব্যক্তিদের উপর, যারা বিনা ওযরে ঘরে বসে থাকে।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, أَفَمَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَ اللَّهِ كَمَن بَاءَ بِسَخَط مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
আল্লাহ যাতে রাযী, যে তার-ই অনুসরণ করে। সেকি তার মত যে আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়েছে এবং জাহান্নাম-ই যার আবাস? এবং তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। هُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ اللهِ واللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ
তারা বিভিন্ন স্তরের, তারা যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَاناً وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ، أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ .
মু'মিন তো তারাই, যাদের হৃদয় কম্পিত হয়, যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাঁর আয়াত তাঁদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর-ই নির্ভর করে।
যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি, তা ব্যয় করে। তারাই প্রকৃত মু'মিন। তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদেরই জন্য রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।

সহীহায়নে১৩৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ان أهل الجنة ليتراءون أهل الغرف فوقهم، كما يتراؤن الكوكب الدري الغابر من آلافق من المشرق أو المغرب لتفاضل بين الناس، قالوا : يارسول الله تلك منازل الأنبياء لا يبلغها غيرهم.
জান্নাতবাসীগণ প্রাসাদবাসীদেরকে তেমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমনিভাবে পশ্চিম বা পূর্বের দূর প্রান্তের জ্বলজ্বলমান নক্ষত্ররাজিকে দেখা যায়। এটা তাদের মধ্যে একজনের উপর অন্যজনের মর্যাদার পার্থক্য থাকার কারণে হবে।

সাহাবায় কিরাম রা. প্রশ্ন করলেন, এটা কি নবীগণের স্তর? যা পর্যন্ত তাঁরা ব্যতীত অন্য কেউ পৌঁছতে পারবে না।

قَالَ: بَلَى، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ رِجَالٌ آمَنوا بِاللَّهِ، وَصَدَّقُوا الْمُرْسَلِينَ.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শপথ সে সত্তার! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন এরা হল, আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নকারী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সত্যায়নকারী ব্যক্তিগণ।

মাথার উপরের নক্ষত্রের উপমা প্রদান না করে দু'প্রান্তের নক্ষত্রের উপমা আনয়নের দু'টি কারণ রয়েছে।

প্রথম কারণ হল, তা দৃষ্টিসীমা থেকে অনেক দূরে থাকবে। দ্বিতীয় কারণ হল, এর দ্বারা এ কথা বুঝানো উদ্দেশ্য, জান্নাতের স্তর একটি অপেক্ষা অপরটি উঁচু। উপর-নিচে হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয়, বরাবর উপরে হবে। যেমনিভাবে পাহাড়ের চূড়া হতে নিয়ে তার পার্শ্ব অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে।

সহীহায়নে১৪০ হযরত সাহল ইবনে সা'দ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان أهل الجنة ليتراؤن أهل الغرفة كما ترون الكوكب في افق السماء জান্নাতবাসীগণ প্রাসাদবাসীকে তেমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমনিভাবে তোমরা আকাশের প্রান্তে নক্ষত্ররাজিকে দেখতে পাও।

ইমাম আহমদ রহ.১৪১ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে পরস্পরকে এমনিভাবে দেখতে পাবে যেমনিভাবে তোমরা দূর প্রান্তে উদিত জ্বলজ্বলে তারকাকে দেখতে পাও। এটা তাদের পরস্পরের মর্যাদায় ভিন্নতার দরুন হবে। সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ উচ্চ মর্যাদাশীলগণ কি নবীরা হবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তাঁদের সাথে সে সকল লোকও থাকবেন, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সত্যায়ন করেছেন।

এই হাদীসের সনদের রাবী তথা বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারী শরীফের রাবী।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় الكوكب এর সিফাত এসেছে الغارب দ্বারা (যার অর্থ হল, উঁচ নক্ষত্র বা অস্তমান নক্ষত্র)। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এর বর্ণনায় রয়েছে الغابر। (যার অর্থ হল শেষাংশে উদীয়মান নক্ষত্র)। আর উক্ত বর্ণনায় الكوكب এর সিফাত আনা হয়েছে الطالع। সুতরাং উদিত হওয়ার হিসাবে طالع (উদীয়মান) দ্বারা আর অস্তমিত হওয়া হিসাবে غارب (অস্তমান) শব্দ দ্বারা গুণ বর্ণনা করা হয়েছে।

ইবনে মুবারক রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ان أهل الجنة يترائون في الغرف كما يرى الكوكب الشرقى والكوكب الغربي في الافق في تفاضل الدرجات.
জান্নাতবাসীগণ প্রাসাদে একে অপরকে এমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমনিভাবে পূর্বের নক্ষত্র বা পশ্চিমের নক্ষত্র আকাশের প্রান্তে দেখা যায়। এটা তাদের মর্যাদার স্তরের ভিন্নতার কারণেই হবে। সাহাবায় কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, এ উঁচু মর্যাদা সম্পন্নগণ কি শুধু আম্বিয়ায়ে কিরাম হবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কসম সে সত্তার, যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন, নবীগণ ব্যতীত সে স্তরে এমন কিছু লোকও থাকবে, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সত্যায়ন করেছে। উক্ত বর্ণনা ইমাম বুখারী রহ. এর বর্ণনার শর্ত সমৃদ্ধ।

মুসনাদে১৪২ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان المتحابين لترى غرفهم في الجنة كالكوكب کالکوکب الشرقي أو الغربي একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে মহব্বতকারীগণ এত উঁচু মর্যাদা সম্পন্ন জান্নাত লাভ করবে, অন্যান্য জান্নাতবাসীগণ তাদেরকে এমনিভাবে দেখবে, যেমনিভাবে পূর্বে বা পশ্চিমে উদিত فيقال : من هؤلاء؟ فيقال : هؤلاء المتحابين في الله عز وجل। நட்சத்திரকে দেখা যায়। তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, এরা কারা? উত্তরে বলা হবে, এরা হল আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে মহব্বতকারী।

মুসনাদে আহমাদে১৪৩ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে এ বর্ণনাও রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ان في الجنة مأة درجة، ولو ان العالمين اجتمعوا في أحداهن وسعتهم।
জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। যদি সমগ্র পৃথিবীবাসীকে একটি মাত্র স্তরে একত্রিত করা হয়, তবে তাতে সংকুলান হবে।

মুসনাদে আহমাদে১৪৪ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে এ বর্ণনা রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, يقال : لصاحب القرآن إذا دخل الجنة إقرأ واصعد، فيقرأ ويصعد بكل أية درجة حتى يقرأ آخر شيئ معه। কুরআনের হাফিয অর্থাৎ কুরআনের হাফিয ও তদনুযায়ী আমলকারী যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে বলা হবে, পড়তে থাক ও জান্নাতের স্তর অতিক্রম করতে থাক। সে পাঠ করতে থাকবে ও প্রত্যেক আয়াত দ্বারা এক একটি করে স্তর অতিক্রম করতে থাকবে। এভাবে তার মুখস্থ শেষ আয়াতটি পর্যন্ত পাঠ করবে। আর উপরে উঠতে থাকবে।

উক্ত হাদীসে তো এ কথাটি অতি স্পষ্ট, জান্নাতের স্তর একশটিরও বেশি। ইমাম বুখারী রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর যে বর্ণনা তাঁর সহীহে উল্লেখ করেছেন। তাতে রয়েছে, জান্নাতের একশটি স্তর রয়েছে। সেগুলো আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথে জিহাদকারীগণের জন্য বিশেষভাবে তৈরী করেছেন। এর প্রত্যেক স্তরে সে পরিমাণ দূরত্ব, যে পরিমাণ দূরত্ব আকাশ ও যমীনের। সুতরাং যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাও। কেননা, তা জান্নাতের মাঝেও সর্বোচ্চস্তরের জান্নাত। তার উপর রয়েছে আল্লাহ তা'আলার আরশ। তা থেকেই জান্নাতের প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে।

সুতরাং এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হল, উল্লিখিত স্তরগুলো এ সকল স্তরের-ই অন্তর্ভুক্ত। অথবা উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা হল, মোট স্তর সংখ্যা একশ-ই হবে, তবে প্রত্যেক স্তরের অধীনে আরো অনেকগুলো উপস্তর থাকবে।

যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া হয়, মোট স্তর থেকে একশটি স্তর নির্ধারিত থাকবে মুজাহিদের জন্য, তবে তার সমর্থন মিলে হযরত মু'আয বিন জাবাল রা. এর বর্ণনা দ্বারা। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, مَن صَلَّى هؤلاء الصلوات الخمس যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামায পড়বে, وَصَامَ شَهْرَ رَمَضَانَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ هَاجَرَ لَهُ اَوْ قَعَدَ حَيْثُ وُلِدَتْ أُمُّهُ এবং রমাযান মাসের রোযা রাখবে, তাকে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ক্ষমা করে দিবেন, চাই সে হিজরত করুক বা তার জন্মস্থানে পড়ে থাকুক।

হযরত মু'আয রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি বাইরে গিয়ে লোকদেরকে এ বিষয় সম্পর্কে অবহিত করব? তিন বললেন, না। লোকদেরকে এভাবেই আমল করতে দাও। জান্নাতের একশটি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্তরের মাঝে আকাশ ও যমীন পরিমাণ দূরত্ব। তার মধ্যে সর্বোত্তম হল জান্নাতুল ফিরদাউস। তার উপরে আল্লাহর আরশ এবং তা জান্নাতে অবস্থিত। তা থেকেই জান্নাতের প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে। সুতরাং তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাও।

১৪৫ ইমাম তিরমিযী রহ. এ শব্দেই বর্ণনা করেছেন।

১৪৬ হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত রা. থেকেও একটি বর্ণনা রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। হযরত মু'আয রা. এর বর্ণনার মত সেখানেও এরূপ বর্ণনা রয়েছে।

এ বিষয়ে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতেও বর্ণনা রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, في الجنة مائة درجة ما بين كل درجتين مائة عام জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তর হতে অপর স্তরের মাঝে একশত বছরের দূরত্ব। ইমাম তিরমিযী বলেন, উক্ত হাদীসের সনদ গরীব পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

তিরমিযীতে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে মারফু হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। যদি সমগ্র পৃথিবীবাসী তন্মধ্যে একটি স্তরে একত্রিত হয়, তবে তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে।

ইমাম আহমদ রহ. ও উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সেখানে الجنة مائة درجة এর শুরুতে في শব্দটি নেই। কিন্তু আমি অন্যান্য গ্রন্থের সূত্রে في সহ ও في ছাড়া উভয় ভাবে সনদ সহ বর্ণনা করলাম।

যদি বাস্তবেই মূল বর্ণনায় এ শব্দটি সংরক্ষিত থাকে তাহলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের স্তরগুলোর মাঝে একশটি স্তর হল এমন।

আর যদি প্রকৃতই মূল বর্ণনায় في না থেকে থাকে তাহলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাতের বড় বড় স্তর হল একশটি। প্রত্যেকটির অধীনে ছোট ছোট স্তরও রয়েছে। والله أعلم।

যে সকল বর্ণনায় একশত বছরের দূরত্বের কথা উল্লিখিত হয়েছে, আর যে সকল বর্ণনায় পাঁচশত বছরের দূরত্বের কথা উল্লিখিত হয়েছে, তাতে কোন বিরোধ নেই। কেননা, তা নির্ভর করে দ্রুত চলন আর ধীরে চলনের উপর।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূরত্ব বা ব্যবধান বুঝানোর জন্যই এরূপ উল্লেখ করেছেন। হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এর অত্র হাদীস দ্বারা এটাই বুঝা যায়, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, مائة درجة في الجنة ما بين الدرجتين ما بين السماء والأرض، أو بعد ما بين السماء والأرض জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরের মাঝে আকাশ ও যমীনসম দূরত। অথবা বলেছেন, আকাশ ও যমীনের মধ্যে যে পরিমাণ দূরত্ব দু' স্তরের মাঝে সে পরিমাণ দূরত্ব।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ সকল স্তর কাদের জন্য ? قال للمجاهدين في سبيل الله উত্তরে বললেন, আল্লাহর পথে মুজাহিদদের জন্য।

টিকাঃ
১৩৮. সূরা নিসা, আয়াত: ৯৫-৯৬
১৩৯. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৬১, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৮
১৪০. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৯৭০, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৮
১৪১. মুসনাদে আহমদ, খ. ২, পৃ. ৩৩৫
১৪২. মুসনাদে আহমদ, খ. ৩, পৃ. ৮৭
১৪৩. খ. ৩, পৃ. ২৯, তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৭৯
১৪৪. খ. ৩, পৃ. ৪০
১৪৫. খ. ২ পৃ. ৭৯, মুসনাদে আহমদ খ. ৫, পৃ. ২৪০
১৪৬. তিরমিযী, পৃ. ৭৯

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর ও তার নাম

📄 জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর ও তার নাম


ইমাম মুসলিম রহ. তাঁর সহীহে১৪৭ হযরত আমর ইবনুল আস রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, إذا سمعتم المؤذن فقولوا مثل ما يقول যখন তোমরা মুআযযিনকে আযানের শব্দাবলী উচ্চারণ করতে শুন, তখন তোমরা তার মত বল।

(অন্যান্য সহীহ বর্ণনা রয়েছে, حي على الفلاح ও حي على الصلوة এর সময় لا حول ولا قوة إلا بالله বল। আর বাকিগুলো তেমনি বল, যেমনি বলে থাকে মুআযযিন।)

ثم صلوا عليَّ فإنه من صلى علي واحدة صلى الله عليه عشرا، ثم سلو لي الوسيلة. অতঃপর আমার প্রতি দুরূদ পড়। কেননা, যে আমার প্রতি একবার দুরূদ পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন। অতঃপর আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা কর।

فإنها منزلة في الجنة لا تنبغى إلا لعبد من عباد الله এটা জান্নাতে এমন এক স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র একজনের জন্যই নির্ধারিত। وارجو ان أكون هو আমার আশা, আমি-ই সে বান্দা হব। فمن سأل لي الوسيلة حلت عليه شفاعتي। কাজেই যে আমার জন্য ওসীলার দু'আ করবে, তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত।

ইমাম আহমদ রহ.১৪৮ স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إذا صليتم فسلوا الله لي الوسيلة، قيل : يا رسول الله وما الوسيلة؟ قال : أعلى درجة في الجنة لا ينالها إلا رجل وأحد وأرجوا أن أكون أنا هو যখন তোমরা নামায পড়বে (অর্থাৎ, নামাযের পূর্বে আযান শুনবে) তখন আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা করবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রশ্ন করা হল, ওসীলা কি? উত্তরে বললেন, ওসীলা হল, জান্নাতের সর্বোচ্চতম স্তর। যা শুধুমাত্র এক ব্যক্তি-ই লাভ করবে। আমি আশা করি, আমি-ই হব সে ব্যক্তি। হাদীসের শব্দ أن أكون هو এর মধ্যে أن হল مبتداء আর هو হল خبر এবং هو বাক্যটি أنا هو أكون এর خبر اكون এর اسم হল তার মধ্যকার উহ্য যমীর। উক্ত বর্ণনায় أنا প্রভেদ রচনাকারী হিসাবেও ব্যবহৃত হয়নি এবং তাকিদ হিসাবেও ব্যবহৃত হয়নি; বরং مبتداء রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।

সহীহায়নে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শুনে এ দুআ পড়বে,
اللهم رب هذه الدعوة التامة والصلوة القائمة، أت محمد الوسيلة والفضيلة والدرجة الرفيعة، وابعثه مقاما محمودا الذي وعدته، إلا حلت له الشفاعة يوم القيامة.
'হে আল্লাহ! এ পরিপূর্ণ আহ্বান ও শাশ্বত নামাযের তুমি-ই প্রভু। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দান কর ওসীলা তথা বেহেশতের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং তাঁকে অধিষ্ঠিত কর শ্রেষ্ঠতম প্রশংসিত স্থানে। যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাঁকে দিয়েছ'। যে ব্যক্তি এ দু'আ পাঠ করবে, তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ অবধারিত।

এখানে একটি প্রশ্ন উঠে مقاما محمودا হল নকেরা তথা অনির্দিষ্ট শব্দ। الذي وعدته দ্বারা কিভাবে তার সিফাত আনা হল?

তার জবাব দেয়া হয়েছে এভাবে, কুরআন কারীমে مقاما محمودا এর মাঝে مقاما শব্দটি নকেরা তথা অনির্দিষ্ট রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং উক্ত দু'আটিকে কুরআন কারীমের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে এতে نكرة তথা অনির্দিষ্টরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। আর মাকামে মাহমূদ হল নির্দিষ্ট। نوع তথা একটি জাতিবাচক ইসম হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু মাত্র একটি একক, সেহেতু তা معرفة তথা নির্দিষ্ট শব্দের স্থলাভিষিক্ত। সুতরাং معرفة তথা নির্দিষ্ট শব্দের মত তার সিফাতও معرفة তথা নির্দিষ্ট শব্দ দ্বারা আনা হয়েছে। এবং مقاما محمودا الذي وعدته থেকে بدل বলা থেকে এ তারকীব-ই উত্তম।

মুসনাদে১৪৯ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الوسيلة درجة عند الله ليس فوقه درجة ওসীলা আল্লাহ তা'আলার নিকট এমন একটি মর্যাদাবান স্তর, যার উপর আর কোন স্তর নেই। فسلوا الله لي الوسيلة সুতরাং আল্লাহ তা'আলার নিকট আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা কর।

মুহাদ্দিস ইবনে আবিদ দুনিয়া এ শব্দে বর্ণনা করেন, درجة في الجنة ليس في الجنة درجة أعلى منها فسلوا الله أن يؤتينيها رئوس الخلائق ওসীলা জান্নাতে এমন একটি স্তর, যার থেকে উঁচু আর কোন স্তর নেই। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা কর, যেন তিনি আমাকে সমগ্র মানুষের সামনে সে স্থান দান করেন।

আবূ নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত আয়শা রা. হতে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে এল এবং বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! والله انك لأحب إلي من نفسي وانك لأحب إلي من أهلي وأحب إلي من ولدي وإني لأكون في البيت فأذكرك فما أصبر حتى أتيك فانظر إليك আল্লাহর কসম! আপনি আমার নিকট আমার জীবন, আমার পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি হতে অধিক প্রিয়। যখন আমি আমার বাড়িতে আপনার কথা স্মরণ করি, তখন আমি অস্থির হয়ে যাই এবং আপনাকে এসে না দেখা পর্যন্ত আমার অস্থিরতা কাটে না।

وإذا ذكرت موتى وموتك عرفت أنك إذا دخلت الجنة، رفعت مع النبيين، واني إذا دخلت الجنة خشيت ان لا أراك যখন আমি আমার মৃত্যু ও আপনার ইনতিকালের কথা স্মরণ করি, তখন বুঝতে পারি, আপনি নবীগণের সাথে উঁচু স্তরের জান্নাতে থাকবেন। আর আমি যদি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি, তবু আমার শংকা হয়, আমি আপনাকে দেখতে পাব না।

فلم يرد عليه النبي صلى الله عليه وسلم حتى نزل جبريل بهذه الآية রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ প্রশ্নের উত্তর না দিতেই জিবরীল আ. এ আয়াত নিয়ে নাযিল হলেন। وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا যে আল্লাহ ও রাসূলেরে আনুগত্য করবে সে আল্লাহর নি'আমত ধন্যদের সঙ্গী হবে। আল্লাহর নিয়ামতে ধন্যরা হচ্ছেন, নবী, সত্যনিষ্ঠগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মপরায়নগণ। সঙ্গী হিসাবে এরা কতইনা উত্তম।

হাফেয আবূ আবদুল্লাহ আল মাকদিসী বলেন, আমি উক্ত হাদীসের সনদে কোন প্রকার সমস্যা দেখি না।

জান্নাতের যে স্তর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাভ করবেন, তাকে ওসীলা নামে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ হল, তা রহমানের আরশের সবচেয়ে নিকটতম স্তর ও আল্লাহর নিকটবর্তী স্থান।

وسيلة শব্দটি وسل থেকে فعيلة এর ওযনে ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ হল, قرب অর্থাৎ নিকটবর্তী হল। যেহেতু তা আরশের নিকটবর্তী, সুতরাং তাকে ওসীলা বলা হয়। যেমন: কবি লবীদের কবিতায় : بلى كل ذى رأى إلى الله واسل হ্যাঁ, প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তিই আল্লাহর নৈকট্য লাভে আগ্রহী।

وسيلة শব্দটি وصلة অর্থাৎ সংযোগকারী ও সম্পর্ক স্থাপনকারী অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এ স্তরটি অন্য সকল স্তরকে আরশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনকারী, তাই এর এমন নাম রাখা হয়েছে। এ জন্যই এ স্তরটি সর্বাপেক্ষা উত্তম ও উঁচু মানের এবং নূরের হিসাবেও তা সর্বোচ্চ স্তরের হবে। সালিহ ইবনে আব্দুল কারীম রহ. বলেন, আমাকে হযরত ফুযায়ল ইবনে আয়ায রহ. বলেন, তুমি কি জান কেন জান্নাত এত সুন্দর? তিনি বললেন, কারন, তার ছাদ হল রাব্বুল আলামীনের আরশ।

হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ঐ বিশেষ জান্নাতকে আদন বলা হয় এই জন্য, তারই উপর হল আরশ এবং তা হতে জান্নাতের প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়। আদনের হুররা হল অন্য সকল স্তরের হুরদের অপেক্ষা উত্তম। আর যদি وسيلة অর্থ تقرب إلى الله অর্থাৎ, সে পর্যন্ত পৌছা হয়, তবে সে পর্যন্ত পৌঁছার বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে।

কালবী রহ. বলেন, সৎকর্ম দ্বারা তার কাছে পৌছানোর মাধ্যম সন্ধান কর। আল্লাহ তা'আলা নিজেই তার অর্থ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, أولَئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيهم أقرب
তারা যাদেরকে আহ্বান করে, তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে। তাদের মধ্য হতে কে নিকটতম?১৫০

এই আয়াতের أيهم أقرب বাক্যটি وسيلة শব্দের ব্যাখ্যারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ মুশরিকরা যেই গাইরুল্লাহর দিকে আহবান করে তার কাছে তারা وسيلة চায়। অর্থাৎ তার নিকটবর্তী হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা করে।

যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মাখলুক অপেক্ষা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত বেশি করে থাকেন এবং অন্যদের চেয়ে তিনি আল্লাহকে সর্বাধিক চিনেন ও জানেন। খোদাভীতি তার মাঝে সর্বাপেক্ষা বেশি ও আল্লাহকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। সুতরাং তিনিই আল্লাহর সবচেয়ে নিকটতম মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন। সবচেয়ে উঁচু স্তরের জান্নাত লাভ করবেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতকে এ কথার নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর জন্য এ মর্যাদাধন্য স্তরের জান্নাতের জন্য দু'আ করে, যাতে করে এ দু'আর ফলে তারাও আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা'আলা তার জন্য কিছু উপকরণ এবং মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হল, তাঁর উম্মত তাঁর জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট এ মর্যাদাধন্য স্তর লাভের জন্য দু'আ করবে। কেননা, তারা ঈমান ও হিদায়েত লাভ করেছে তাঁরই কারণে।

কোন বর্ণনায় রয়েছে, حلت عليه شفاعتي । আর কোন বর্ণনায় আছে, حلت له شفاعتي। অর্থ দাঁড়ায়, আমার জন্য ওসীলার দু'আকারী আমার শাফায়াত লাভ করবে। আর حلت عليه এর অবস্থায় অর্থ দাঁড়ায়, সে আমার শাফায়াতের যোগ্য হবে।

টিকাঃ
১৪৭. খ. ১, পৃ. ১৬৬
১৪৮. মুসনাদে আহমদ খ. ২, পৃ. ২৬৫
১৪৯. মুসনাদে আহমদ, খ. ৩, পৃ. ৮৩
১৫০. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৫৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 মু’মিনদের জান-মালের বিনিময়ে জান্নাতের সওদা

📄 মু’মিনদের জান-মালের বিনিময়ে জান্নাতের সওদা


আল্লাহ তা'আলা বান্দার নিকট জান্নাতকে সওদারূপে পেশ করে তার মূল্য চাইলেন। আল্লাহ তা'আলা ও মু'মিনদের মাঝে এটা হল ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপার। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنْ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفِي بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ 0
নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের নিকট হতে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, নিধন করে ও নিহত হয়। তাওরাত, ইনজীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে তার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কে আছেন? তোমরা যে সওদা করেছ সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই তো মহা সাফল্য।১৫১

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের জান ও মালকে জান্নাতের মূল্য নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যখন আল্লাহর পথে বান্দা স্বীয় জীবন ও সম্পদ ব্যয় করবে, তখন সে মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব সম্পন্ন করল। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সাথে এ চুক্তি করলেন এবং তাকে বিভিন্ন প্রকার তাকীদ দ্বারা দৃঢ় করলেন। যথা:

প্রথম : এ ঘোষণা বিবৃত করার ক্ষেত্রে إِنَّ ব্যবহার করেছেন, যা বাক্যকে দৃঢ় করণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

দ্বিতীয় : ماضی তথা অতীতকালের শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার দ্বারা বুঝা যায়, ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদিত হয়ে গেছে।

তৃতীয়: উক্ত লেনদেন স্বয়ং নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বিক্রেতা।

চতুর্থ : তিনি এ প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন, সে মূল্যের বিনিময়ে তাদেরকে জান্নাত প্রদান করা হবে। আর এমন এক প্রতিশ্রুতি যা ভঙ্গ করা হবে না এবং তার বিপরীতও করা হবে না।

পঞ্চম : এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা দ্বারা ব্যক্তির উপর সাধারণত: আবশ্যকতা সাব্যস্ত করা হয়। তিনি বলেন, وَعْدًا عَلَيْهِ حَقَّ অর্থাৎ, তিনি নিজের জন্যে তা আবশ্যকীয় করে নিলেন।

ষষ্ঠ: শুধু وَعْدًا বলে ক্ষান্ত করেননি; বরং عَلَيْهِ حَقَّ এ ও ব্যবহার করেছেন। প্রতিশ্রুতিকে আরো দৃঢ় করে।

সপ্তম: তিনি বলেন, তাঁর প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তাঁর অবতারিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহ তাওরাত, ইনজীল ও কুরআনে উদ্ধৃত রয়েছে।

অষ্টম : তিনি اَوْفِي بِعَهْدِى وَمَنْ أَوْفَىٰ বলে إنكارى استفهام তথা অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্ন ব্যবহার করে বান্দাকে এ কথা জানিয়ে দিলেন, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকারী অন্য কেউ নেই।

নবম : তিনি বান্দাদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা এ চুক্তিতে আনন্দিত হও। যারা এ চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে ও যাদের জন্য চুক্তি অবাধারিত হয়ে গেছে, তাদেরকে তোমরা সুসংবাদ দাও। কেননা, এটা এমন একটি চুক্তি যা লংঘন করার বা রহিত করার কোন পদ্ধতি নেই।

দশম : তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে সওদা করেছ, তা হল মহা সাফল্য। এখানে بَيْع দ্বারা উদ্দেশ্য হল مبیع তথা বিক্রয়-যোগ্য মাল অর্থাৎ জান্নাত, যা তোমরা জান-মালের বিনিময়ে লাভ করেছ। আর بایعتم به এর অর্থ হল ثامنتم به - তোমরা যার মূল্য পরিশোধ করেছ।

সামনে আল্লাহ তা'আলা সে সকল লোকের কথা উল্লেখ করলেন, যারা এ চুক্তি সম্পাদন করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তারা হল التائبون আল্লাহ তা'আলার অপসন্দনীয় বিষয়াবলী হতে তাওবাকারী, العابدون আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় পদ্ধতিতে ইবাদতকারী, الحمدون প্রিয় ও অপ্রিয় সব বিষয়েই আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায়কারী। السائحون - سياحة এর এক অর্থ হল, রোযা অর্থ রোযা পালনকারী, سياحة এর অপর অর্থ হল, ভ্রমনকারী অর্থাৎ, ইলম তথা জ্ঞানার্জনের জন্য ভ্রমণকারী। এর ব্যাখ্যা জিহাদ দ্বারাও করা হয়েছে, সে জিহাদকারী। তার অন্য ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সে সর্বদা আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যকারী। এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা হল, অন্তরকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ, তাঁর মহব্বত তথা ভালোবাসা ও তাঁর প্রতি ধাবিতকরণ ও তাঁর সাক্ষাতের আসক্তির প্রতি ধাবিত করা। سياحة এর ব্যাখ্যায় উল্লিখিত পূর্বোক্ত মতগুলোতেও سياحة القلب তথা অন্তরের উল্লিখিত অবস্থার প্রয়োজন। সে জন্য আল্লাহ তা'আলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত ও পবিত্র পত্নীগণের ব্যাপারে সূরায়ে তাহরীমে উল্লিখিত ঘটনায় বলেন,
عَسَى رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْد لَهُ أَزْوَاجاً خَيْراً مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتِ مُؤْمِنَاتِ قَانتات تائبات عابدات سَائِحَاتِ ثَيِّبَاتِ وَأَبْكاراً
যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করে, তবে তার প্রতিপালক সম্ভবত: তোমাদের স্থলে তাকে দিবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্ত্রী। যারা হবে আত্মসমপণকারিনী, বিশ্বাসী, অনুগত, তাওবাকারী, ইবাদতকারী, সিয়াম পালনকারী, অকুমারী এবং কুমারী।১৫২

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সে সকল নারীর গুণাগুণ বর্ণনায় سائحات শব্দটিও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের এ سیاحت এর গুণ জিহাদের মাধ্যমেও ছিল না, সর্বদা সিয়াম সাধনার মাধ্যমেও ছিল না। ইলম তথা জ্ঞানার্জনে ভ্রমণের মাধ্যমেও ছিল না; বরং তাঁদের মধ্যে এ গুণ ছিল অন্তরে আল্লাহর প্রেম-ভালোবাসা, ভয়-ভীতি ও অন্তরকে তাঁর প্রতি ধাবিত করার মাধ্যমে।

আল্লাহর বাণী التائبون العابدون এর মধ্যে চিন্তা-গবেষণা করুন, আল্লাহ তা'আলা তওবাকারী ও ইবাদতকারীকে কিভাবে এক সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাওবার অর্থ হল, আল্লাহ তা'আলার অপসন্দনীয় বিষয়গুলো বর্জন করা। আর ইবাদত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার পসন্দনীয় বিষয়াবলী বাস্তবায়ন করা।

এরপর এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ও سیاحت কে একত্রে উল্লেখ করেছেন। ১৯ হচ্ছে তার সিফাতে কামালিয়া তথা পরিপূর্ণ গুণাবলীর প্রশংসা তার পূর্বে سياحة শব্দের ব্যবহার একথার ইঙ্গিত বহন করে, যবানের سیاحة তথা পূর্নতা হচ্ছে, রবের উত্তম স্মরণ। আর কলবের سیاحة হচ্ছে সেই সত্তার প্রেম ভালবাসা, বড়ত্ব ও সদা স্মরণ হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। একারণেই আল্লাহ তা'আলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুণ্যবতী পত্নীগণের গুণাবলী বর্ণনায় বলেন, প্রথমত তারা হল, سائحات ও عابدات। এখানে ইবাদত ও সিয়াহাত উভয়টাকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। কেননা, ইবাদাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শারীরিক ইবাদত আর সিয়াহাত দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অন্তরের ইবাদত।

এরপর مؤمنات و مسلمات বলে ঈমান ও ইসলামকে একত্রিত করেছেন। এ জন্য, ইসলামের সম্পর্ক হল বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে আর ঈমানের সম্পর্ক হল, অন্তরের সাথে।

মুসনাদে১৫৩ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, الإسلام علانية، والإيمان في القلب ইসলামের সম্পর্কস্থল বাহ্যিক আমলের সাথে আর ঈমানের সম্পর্ক হল অন্তরের সাথে।

তৃতীয়ত: আল্লাহ তা'আলা قانتات و تائبات কে একত্রে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং قوت দ্বারা উদ্দেশ্য হল, প্রীতিকর বিষয়াবলী বাস্তবায়ন করা আর তাওবা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার অপ্রীতিকর বিষয়াবলী বর্জন করা।

চতুর্থত : ثيبات وأبكارا কে একত্রে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এ হল সে সকল স্ত্রী লোক, যারা সন্তষ্ট চিত্তে পূর্বের স্বামীর ঘর করে এসেছে। সাংসারিক ঝক্কি ঝামেলা সহ্য করতে তারা পূর্ব থেকেই অভ্যস্ত। আর باكرة অর্থ হল, প্রথম উদ্যান, যার ফলের স্বাদ এখনো কেউ আস্বাদন করেনি। এখানে আল্লাহ তা'আলা الراكعون الساجدون এর মধ্যে রুকু ও সিজদাকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। আমর বিল মা'রূফ তথা সৎ কাজের আদেশ দান ও নাহী আনিল মুনকার তথা অসৎ কাজ থেকে নিষেধ-করণকে একত্রে উল্লেখ করেছেন। এ দুটির মাঝে واو উল্লেখ করেছেন। কিন্তু পূর্বোল্লিখিত الثانبون ইত্যাদি । তথা বিশেষত্বের মাঝে واز উল্লেখ করেননি। কারণ এর দ্বারা এ কথা বুঝানো উদ্দেশ্য, সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা; এ দু'টি কাজের মধ্যেই যে কোন একটি যথেষ্ট নয়; বরং উভয়টাই প্রয়োজন। অর্থাৎ নেক কাজের আদেশও দিতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধও করতে হবে। এর সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, والحافظون الحدود الله এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী'। কেননা আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী নিজেকে সীমালংঘন থেকে বিরত রাখবে। আর সৎকাজের আদেশদানকারী ও অসৎ কাজ হতে বাধা প্রদানকারী অন্যদেরকে সীমা লংঘন থেকে বিরত রাখে। এ আয়াতে কারীমায় মানবাত্মার বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও সম্মান বুঝানো হয়েছে। কেননা, পন্য (জান্নাত) যখন অদৃশ। তখন তার যথাযথ মূল্যায়ন আপাতত সম্ভব নয়। কাজেই এখন বিনিময় অর্থের অন্ধত্য ভালভাবে দেখে নাও। সাথে সাথে দেখে নাও ক্রয়করীর বড়ত্ব ও শক্তিমত্তা এবং এটিও লক্ষ্য কর, এ আব্দ তথা ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি কার দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে।

সুতরাং সওদা হল মানবাত্মা। খরীদকারী হলেন, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। আর মূল্য হল, জান্নাতুন নাঈম। আর এ চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হচ্ছে, ফেরেশতা ও মানব জতির সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুকাত। কবি বলেন, قد هيؤك لأمرلو فطنت له قارباً بنفسك أن ترعى مع الهمل
তিনি তোমাকে যেই মহান কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যদি সেই কাজের গুরুত্ব বুঝতে, তাহলে এ সকল খড়কুটায় নিজেকে জড়ানো থেকে সর্বদা বেঁচে থাকতে।

জামে তিরমিযীতে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من خاف أدلج، ومن أدلج بلغ المنزل، ألا إن سلعة الله عالية، ألا إن سلعة الله الجنة যে ভয় পায় সে রাতের শেষভাগেও পথ চলে। আর যে রাতভর পথ চলে, সে তার গন্তব্যে পৌছতে পারে। জেনে রাখ, আল্লাহ তা'আলার সওদা অত্যন্ত মূল্যবান। জেনে রাখ! আল্লাহ তা'আলার সওদা হল, জান্নাত। ইমাম তিরমিযী উক্ত হাদীসকে হাসান গরীব স্তরের বলে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আবু নাঈম রহ. এর صفة الجنة (সিফাতুল জান্নাত) নামক গ্রন্থে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, এক গ্রাম্য ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করল, জান্নাতের মূল্য কি? উত্তরে তিনি বললেন, لا إله إلا الله। এ হাদীসের সমর্থনে অনেক হাদীস রয়েছে।

সহীহায়নে হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণিত হাদীসে রয়েছে,১৫৪ এক গ্রাম্য ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বলল, يا رسول الله! دلني على عمل إذا عملته دخلت الجنة হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমলের কথা বলে দিন, যার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব।

فقال : تعبد الله ولا تشرك به شيئا، وتقيم الصلوة وتؤتي الزكوة المفروضة، وتصوموا رمضان রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। নামায আদায় করবে, ফরয যাকাত প্রদান করবে ও রমাযান মাসের রোযা রাখবে।

والذي نفسي بيده لا أزيد على هذا شيئا ولا أنقص প্রত্যুত্তরে সে ব্যক্তি বলল, যে সত্তার কুদরতী হাতে আমার জীবন, আমি এর উপর কোন কিছু বৃদ্ধিও করবো না এবং এর থেকে কিছু হ্রাসও করব না।

ফَلَمَّا وَلَّى قَالَ: مَنْ سَرَّه أنْ يَنْظُرَ إِلَى رَجُلٍ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى هَذَا
সে ব্যক্তি ফিরে যেতে লাগলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে আনন্দবোধ করে, সে যেন এ ব্যক্তিকে দেখে।

সহীহ মুসলিমে১৫৫ হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত আছে, নো'মান ইবনে হাওকাল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি মনে করেন যে, أَرَأَيْتَ إِذَا صَلَّيْتُ الْمَكْتُوبَةَ وَحَرَّمْتُ الْحَرَامَ وَأَحْلَلْتُ الْحَلالَ أَدْخُلُ الْجَنَّةَ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : نَعَمْ আমি যদি ফরজ নামায পূর্ণভাবে আদায় করি এবং হারামকে হারাম ও হালালকে হালাল মানি, তবে কি আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ।

সহীহ মুসলিমে১৫৬ হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ! যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে মনে করে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোন মা'বুদ নেই, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সুনানে আবি দাউদে১৫৭ হযরত মু'আয ইবনে জাবাল রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তির শেষ কথা হবে, لا إله إلا الله সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সহীহায়নে১৫৮ হযরত আবূ যারর গিফারী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার নিকট আমার প্রভুর পক্ষ হতে আগমনকারী (জিবরীল আ.) এলেন, অতঃপর তিনি আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে নাই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। قلت : وان زنى وإن سرق؟ হযরত আবূ যারর রা. বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, যদি সে ব্যভিচার করে থাকে? অথবা চুরি করে থাকে? قال : وان زنى وإن سرق রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে, যদিও সে চুরি করে। মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেন, ঈমান থাকার কারণে সে অবশ্যই কোনো এক সময় জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদিও তার পাপের শাস্তি ভোগ করার পরে হোক।

সহীহায়নে১৫৯ উবাদা ইবনুস সামিত রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ কালিমা পড়বে, أشهد ان لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأن محمدا عبده ورسوله، وأن عيسى عبد الله ورسوله وكلمته، القاها إلى مريم وروح منه وإن الجنة حق والنارحق.
আমি এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোন মা'বৃদ নেই। তিনি একক, কেউ তাঁর শরীক নেই। নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। হযরত ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল ও তাঁর কালেমা, যাকে মারয়াম আ. এর নিকট আল্লাহ তা'আলা অবতারিত করলেন এবং হযরত ঈসা আ. হলেন, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে একটি আত্মা। জান্নাত অবশ্যই সত্য এবং দোযখও সত্য। সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাকে জান্নাতে আট দরযার প্রত্যেকটি দ্বারা প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হবে।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, চাই যে আমল করেই সে মৃত্যুবরণ করুক না কেন।

সহীহ মুসলিমে১৬০ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (চিহ্নস্বরূপ) তাঁকে তাঁর উভয় পাদুকা মুবারক দিয়ে বললেন, আমার জুতা নিয়ে যাও এবং এ দেয়ালের পিছনে এমন যাকেই পাও, যে তাওহীদের সাক্ষ্য প্রদান করে ও অন্তর দিয়ে তা বিশ্বাস করে, তাকেই জান্নাতের সুসংবাদ দাও।

হযরত হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, জান্নাতের মূল্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

আবূ নাঈম রহ. স্ব-সনদে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি এবং তোমাদের মধ্যে কেউ-ই নিজ আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জাহান্নামের আগুন হতেও রক্ষা পাবে না। তবে হ্যাঁ, তাওহীদ তথা একত্ববাদের স্বীকৃতি দ্বারা, জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা পাব ও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব।

উক্ত বর্ণনাটির সনদ ইমাম মুসলিমের রহ. শর্ত মুতাবিক সহীহ।

আল্লাহ তা'আলার রহমতেই কেবল জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানা জরুরী। তা হল, জান্নাতে প্রবেশ করা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রহমত দ্বারাই সম্ভব। বান্দার আমল যদিও জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম; কিন্তু আমল সে জন্য কোন চূড়ান্ত ও আবশ্যকীয় বিষয় নয় (যে আমলের মাধ্যমে জান্নাত অবধারিত)। এই জন্যই আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে প্রবেশ করাকে আমলের বিনিময় নির্ধারণ করে বলেন, أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ ‘তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এই জান্নাতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে’। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমলের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করার বিষয়টি রদ করলেন এভাবে যে, তোমাদের কেউ আমলের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলার বাণী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। দু'টি কারণে বিরোধ নেই। যথা:

১. হযরত সুফয়ান রহ. ও অন্যরা উল্লেখ করেছেন, তারা বলাবলি করত, আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা করে দেয়ার দ্বারা। আর জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে, তাঁর রহমতের দ্বারা এবং মর্যাদা ও স্তরের বণ্টন হবে আমলের দ্বারা। )اورثتموهم بما کنتم تعملون এর মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেন, জান্নাতে তোমরা যে বিভিন্ন মর্যাদা লাভ করবে, তা তোমাদের কৃত আমলের কারণে। আর তোমাদের সকলের আমল সমপর্যায়ের ছিল না।)

হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণিত হাদীসও তাই বুঝায়, যা সামনে উল্লেখ করা হবে। যাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদেরক স্বীয় আমল মুতাবিক বিভিন্ন মর্যাদা ও স্তরে বিন্যস্ত করা হবে। ইমাম তিরমিযী রহ. উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

২. বিরোধ না থাকার দ্বিতীয় কারণ হল, যে হাদীসে আমল দ্বারা জান্নাত লাভ না করার বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে, তাতে بالأعمال এ ব্যবহৃত باء অব্যয়টি مقابلة তথা বিনিময় অর্থ বুঝানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে। সে হিসাবে অর্থ দাঁড়ায়, কোন ব্যক্তি কেবল নিজ আমল দ্বারাই জান্নাতের হকদার হবে না। (যদি এ মত গ্রহণ করা হয়, যেমন: মু'তাযিলাগণ এ মত পোষণ করে যে, বান্দা কেবল মাত্র নিজ আমল দ্বারাই জান্নাতের হকদার হয়। তবে এমন বান্দাকে জান্নাত প্রদান করা আল্লাহ তা'আলার জন্য আবশ্যকীয় হয়ে পড়বে এবং আল্লাহ তা'আলা জান্নাত প্রদানে বাধ্য হবেন। অথচ আল্লাহ তা'আলার জন্য কোন কাজের বাধ্যবাধকতা নেই।)

আর কুরআনের بما كنتم এ ব্যবহৃত অব্যয়টি مقابلة তথা বিনিময় বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়নি; বরং তথা কারণ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যা এ কথা নির্দেশ করে যে, তা যে ইসম তথা বিশেষ্যের উপর প্রবিষ্ট হয়েছে তা سبب তথা কারণের পর্যায়ে হবে।

সুতরাং আমল হল, কারণের পর্যায়ে। যদিও জান্নাত লাভের আমলটা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ বাণীতে বিষয়কে একত্রিত করেছেন سدّدوا وقاربوا وابشروا সঠিক পথে চল এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর ও সুসংবাদ দাও। ভাল ভাবে জেনে রাখ! কখনো কোন ব্যক্তি নিজ আমল গুণে নাজাত পাবে না। সাহাবায় কিরাম প্রশ্ন করলেন, আপনিও নন কি ইয়া রাসূলাল্লাহ? উত্তরে তিনি বললেন, আমিও নই। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমত দ্বারা বেষ্টন করে নেন, তবেই কেবল জান্নাতে প্রবেশ সম্ভব।

যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তার মা'রিফাত লাভ করল এবং যে সকল বিষয়াবলীর সাক্ষ্য প্রদান তার জন্য আবশ্যকীয়, সে সকল বিষয়ের সাক্ষ্য প্রদান করল এবং আপন পাপ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি স্বীকার করে। যদি উভয় বিষয়কে অন্তরের অন্তস্থল থেকে প্রত্যক্ষ করতে চেষ্টা করে, তবে বুঝতে পারবে, সত্য ও সঠিক বিষয় এটিই যে, কোন ব্যক্তি আপন আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করতে না পারে। والله سبحانه وتعالى المستعان।

টিকাঃ
১৫১. সূরা তাওবা, আয়াত: ১১১
১৫২. সূরা তাহরীম ৫
১৫৩. খ. ২, পৃ. ১৩৪
১৫৪. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৮৭, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৩১
১৫৫. খ. ১, পৃ. ৩২
১৫৬. খ. ১, পৃ. ৪১
১৫৭. খ. ২, পৃ. ৮৮
১৫৮. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৩২১, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৬৬
১৫৯. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৮৮
১৬০. খ. ১, পৃ. ৪৫

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকট জান্নাত ও জান্নাতীদের প্রার্থনা

📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকট জান্নাত ও জান্নাতীদের প্রার্থনা


আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাতবাসীদের জান্নাত প্রার্থনা এবং জান্নাত তার অধিবাসীদের আগমন কামনা ও তাদের জন্য স্বীয় প্রভুর দরবারে সুপারিশ করার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্যে প্রজ্ঞাবানদের কথা উদ্ধৃত করে বলেন, رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন।' সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি।

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর, আমাদের মন্দ কর্মগুলি দূরীভূত কর এবং আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিও।

رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা আমাদেরকে দাও এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে হেয় কর না। নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম কর না।

আল্লাহর বাণী وَآتِنَا مَا وَعَدَتَّنَا عَلَى رُسُلِكَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আপনি আমাদেরকে আপনার রাসূলের কণ্ঠে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা আমাদের দান করুন। কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, مَا وَعَدَتَّنَا عَلَى الْإِيمَانِ بِرُسُلِكَ অর্থাৎ, আপনি রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যে ঈমানের উপর অটল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এর তাওফীক দিন।

উক্তবস্থায় لإيمان শব্দটির পূর্বে با অব্যয়টি উহ্য মানতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে একটি ইসম তথা বিশেষ্য ও একটি হরফ তথা অব্যয়কে উহ্য মানা আরবী ব্যাকরণনীতিতে কঠিন। যদি على تصديق رسلك অথবা طاعة رسلك উহ্য মানা হয়, তবে উভয় অবস্থা সমপর্যায়ের হয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে প্রথম মত অগ্রগণ্য। কারণ আয়াতের প্রথমাংশ তাদের অভিমতকে যুক্তিযুক্ত মনে করে। যেখানে তারা পূর্বেই রাসূলের প্রতি ঈমান আনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসেছে।

সুতরাং তারা আপন ঈমানকে মাধ্যম বানিয়ে আল্লাহর নিকট রাসূলগণের মাধ্যমে সে বস্তু প্রার্থনা করছে যার প্রতিশ্রুতি তাদেরকে দেয়া হয়েছে। কেননা তারা রাসূলের মাধ্যমে তাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি শুনেছ। নবীগণের তাদের নিকট তাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি পৌঁছানোর পর তাকে সত্য মনে করাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তারা তাঁর নিকট তাই প্রার্থনা করেছেন।

কেউ কেউ বলেন, وَآتَنَا مَا وَعَدَّتْنَ দ্বারা সাহায্য ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি উদ্দেশ্য। যে প্রতিশ্রুতি রাসূলগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছিলেন। তবে প্রথম ব্যাখ্যাটিই ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ।

যেহেতু তাদের ঈমানে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, তাঁর প্রতিশ্রুতি, ভীতি, তাঁর নাম ও গুণাবলীকে সত্য মনে করা এবং তাঁর ভীতি প্রদর্শনকে ভয় করা ও তাঁর সকল নির্দেশ বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ সব কিছুর সমষ্টির কারণেই তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নকারীর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া ও তাদের সাথে প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো লাভের ক্ষেত্রে তারা ঈমানকে মাধ্যম বানাতে পারে।

কেউ কেউ এ ভেবে সমস্যায় পড়ে, আল্লাহ তা'আলা তো আপন প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়ন করবেন, তবে তাদের এ প্রার্থনার মাঝে কী লাভ যে 'আপনি স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন'।

তার উত্তর হলো, এ হচ্ছে নিজেদের গোলামী ও বন্দেগীর প্রকাশ। এ বিষয়টি ঠিক তেমনি, যেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলাকে লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরয رَبِّ احْكُمْ بِالْحَقِّ 'হে আমার প্রতিপালক! তুমি ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে দাও।১৬১

ফিরিশতাগণের উক্তি فَاغْفِرْ لِلَّذِيْنَ تَابُوا وَاتَّبِعُوا سَبِيْلَكَ 'অতএব, যারা তাওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বন করে, তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর'।১৬২

প্রশ্নকারীদের নিকট এ বিষয়টিও অস্পষ্ট যে, এ প্রতিশ্রুতি বেশ কটি শর্তের উপর নির্ভরশীল। শর্তাবলীর একটি হল, আল্লাহ তা'আলার প্রতি প্রবল ইচ্ছা ও বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তাঁর দরবারে প্রার্থনা করা; যেন তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। উক্ত প্রতিশ্রুতিও ঈমানের সাথে শর্তযুক্ত। এটাও শর্ত, যেন এমন কোন বিষয় সংযুক্ত না হয়ে পড়ে, যা তা বিনষ্ট করে দেয়।

সুতরাং তারা যখন আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রতিশ্রুত বিষয় দান করার প্রার্থনা করে, তবে এ দু'আটিও তার অন্তর্ভুক্ত হয়, আমাদেরকে সে বিষয়ের তাওফীক দান করুন ও তার উপর দৃঢ়পদ রাখুন। আমাদেরকে সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পক্ষে যে সকল উপকরণ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সহযোগিতা করুন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জরুরী ও অত্যন্ত উপকারী দু'আ। তারা অন্যান্য দু'আ অপেক্ষা এ দু'আটির প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ তা'আলার বাণী, رَبِّ احْكُمْ بِالْحَقِّ এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিকট এই প্রার্থনা, যেন তাদেরকে তিনি তাদের শত্রুর বিপক্ষে সাহায্য করেন। শত্রুর মুকাবিলায় তাদের বিজয় ও সাহায্য দান করেন। এমনিভাবে তাওবাকারীদের ক্ষমা করে দেয়ার জন্য ফিরিশতাদের আরয সে কারণগুলোর অন্যতম, যেগুলোর কারণে তাদের প্রার্থনা গ্রহণ করা আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমন উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যার ফলে তারা আপন বন্ধু ও শত্রুদের সাথে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। তাদেরকেই নিজ ইচ্ছার কারণ বানিয়েছেন, যেমনিভাবে স্বীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যম বানিয়েছেন। সুতরাং কারণও তাঁর পক্ষ থেকে আর কর্তাও তিনিই। যদি এরপরও বিষয়টি বোধগম্য না হয়, তবে সে সব কারণগুলোর ব্যাপারে চিন্তা করুন, যেগুলো ব্যক্তির মাঝে পাওয়া গেলে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার প্রেম ও ভালোবাসা লাভ করতে পারে।

তিনি বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন। কারণগুলোর ব্যাপারেও চিন্তা করুন, যেগুলো ব্যক্তির মাঝে পাওয়া গেলে আল্লাহর বান্দার প্রতি অসন্তুষ্ট হন। অথচ এসব কিছুই তাঁর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এ হল তাওহীদ তথা একত্ববাদের এক বিশাল ভাণ্ডার; যেখানে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সত্তার মা'রিফাত লাভকারী-ই প্রবেশ করতে পারে।

ربَّنَا وَآتَنَا مَا وَعَدَتَّنَا আলোকে বিবেচনা করা যায়। এ আয়াতটি তাঁরই অনুরূপ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ أَذَلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءٌ وَمَصِيرًا لَهُمْ فِيهَا مَايَشَاءُونَ خَالِدِينَ كَانَ عَلَى رَبِّكَ وَعْدًا مَسْئُولًا
হে নবী! জিজ্ঞাসা কর, এটাই উত্তম, না স্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকীদেরকে? এটাই তো তাদের পুরস্কার ও প্রত্যাবর্তনস্থল। সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তা-ই থাকবে এবং তারা স্থায়ী হবে। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ তোমার প্রতিপালকেরই দায়িত্ব।১৬৩

আল্লাহর মু'মিন বান্দাগণ তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে এবং ফিরিশতাগণও মু'মিনদের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করে। সুতরাং জান্নাত আল্লাহ তা'আলার নিকট তার অধিবাসীদের আগমন প্রার্থনা করে, আর জান্নাতবাসীগণ তাঁর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করেন। এমনিভাবে ফিরিশতাগণ ও রাসূলগণও আপন অনুসারীদের জন্য জান্নাত প্রার্থন করেন। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা জান্নাত তাঁর সামনে উপস্থিত করবেন। তখন তা মু'মিন বান্দাদের জন্য সুপারিশ করবে। এতে আল্লাহ তা'আলার পূর্ণাঙ্গ রাজত্ব ও কর্তৃত্ব এবং রহমতের বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। এটা তাঁর দয়া-অনুগ্রহ-ইহসান ও দানশীলতা। যে সকল বস্তু বান্দাকে প্রদান করা তাঁর নাম ও মহৎ গুণাবলীর দাবী এবং যে সকল বস্তু তাঁর নিকট প্রার্থনা করা হয়, সে দিন তিনি সেগুলো প্রদান করবেন।

সুতরাং এ হতে পারে না যে, তাঁর নাম ও মহৎ গুণাবলীর দাবী থেকে তাদেরকে বেকার ভাবা হবে। (আল্লাহ তা'আলার যত নাম ও গুণাবলী আছে, সে গুলোর মাঝে প্রত্যেকটির কোনো না কোনো প্রভাব রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার সিফাত (مالك) মালিক) এর প্রভাব কিয়ামতের দিন এভাবে প্রকাশ পাবে যে, সে দিন সকল প্রকার বৈপত্তিক রাজত্বের অবসান ঘটবে এবং ঘোষণা দেয়া হবে لَمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ অর্থাৎ আজকের রাজত্ব আর আধিপত্য কার? তখন উত্তর আসবে, لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ অর্থাৎ একক ও পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলার। এমনিভাবে অন্যান্য নাম ও সিফাতেরও কোন না কোন প্রভাব রয়েছে। সুতরাং এ হতে পারে না যে, নাম ও সিফাত থাকা সত্ত্বেও তার কোন প্রভাব থাকবে না।)

সুতরাং আল্লাহ তা'আলার একটি সিফাত হল, جواد অর্থাৎ, সকল প্রকার ও সব কিছু দানকারী। এর চাহিদা হল, তাঁর নিকট প্রার্থনা করা হোক, যেন তাঁর সিফাতের প্রভাব প্রকাশ পেতে থাকে।

সুতরাং প্রার্থনাকারী ও প্রার্থনাকারীর অন্তরে প্রার্থনার আগ্রহ এবং প্রার্থিত বস্তুসমূহ সবই তাঁর সৃষ্টি। কেননা, বান্দা তাঁর নিকট কোন বস্তু প্রার্থনা করলে, তিনি সন্তুষ্ট হন। আর বান্দা তাঁর নিকট কোন বস্তু প্রার্থনা না করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। কবি বলেন, الله يغضب ان تركت سؤاله وبني آدم حين يستل يغضب প্রার্থনা যদি না কর তুমি প্রভু মহানের দরবারে, হবেন তিনি অসন্তুষ্ট। মানুষের কাছে যদি চাও, সে হবে তিক্ত ও অসন্তুষ্ট।

আল্লাহ তা'আলার নিকট তাঁর মাখলুকের মধ্য হতে সর্বাধিক প্রিয়, পসন্দনীয় ও মর্যাদাবান সে-ই, যে তাঁর নিকট প্রার্থনা করে। এমনিভাবে প্রার্থনার মাঝে অতিশয় অনুনয়কারীদেরকেও তিনি অত্যধিক ভালবাসেন। তাকে স্বীয় নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করেন ও স্বীয় নি'আমতরাজি প্রদান করেন। সুতরাং তিনি ব্যতীত কোনো মা'বুদ ও উপাস্য নেই। সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। যিনি আমাদেরকে হিদায়েত দিয়েছেন। আমরা তো পথভ্রান্ত ছিলাম না, যদি তিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন।

হযরত আবু নাঈম রহ. হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন,১৬৪ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে পরওয়ারদেগার! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আর যে ব্যক্তি তিন বার জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, জাহান্নام তার ব্যাপারে বলে, হে পরওয়ারদেগার! তাকে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় দিন। উক্ত বর্ণনাটি জামে' তিরমিযী ও সুনানে নাসাঈতেও রয়েছে।

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাতবার আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, সে ব্যক্তির ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে পরওয়ারদেগার! অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট আমাকে প্রার্থনা করে। সুতরাং তাকে আমার মাঝে স্থান করে দিন।

আবূ ইয়ালা রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাত বার আল্লাহর নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জাহান্নাম বলে, হে প্রভু! আপনার নিকট অমুক ব্যক্তি আমার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। সুতরাং তাকে আশ্রয় দিয়ে দিন। আর যে ব্যক্তি প্রতিদিন সাতবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে প্রভু! আপনার নিকট অমুক বান্দা আমাকে প্রার্থনা করেছে। সুতরাং তাকে আমার মাঝে স্থান করে দিন'। উক্ত হাদীসের সনদ সহীহায়নের বর্ণনা শর্ত মুতাবিক রয়েছে।

আবূ দাউদ রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট সাতবার জান্নাত প্রার্থনা করে, তার ব্যাপারে জান্নাত বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন'।

হযরত হাসান ইবনে সুফয়ান রহ. স্ব-সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা অধিক হারে আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত প্রার্থনা কর ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা উভয়ে সুপারিশ করে থাকে ও তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। বান্দা যখন অধিক হারে আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, তখন জান্নাত বলে থাকে, হে প্রভু! আপনার এ বান্দা আপনার নিকট আমাকে প্রার্থনা করে। সুতরাং আমাকে তার ঠিকানা তথা নীড় বানিয়ে দিন। আর দোযখ বলতে থাকে, হে প্রভু! আপনার এ বান্দা আপনার নিকট আমার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। সুতরাং তাকে আশ্রয় প্রদান করুন'।

সালফে সালেহীনের মাঝে কতিপয় তো এমন ছিলেন যে, তাঁরা জান্নাত প্রার্থনা করতো না; বরং তাঁরা বলতেন, যদি আমরা দোযখ থেকে রক্ষা পাই, তবে তা-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তাঁদের মধ্যে আবুস সাহবা সিলাহ ইবনে আশীমও ছিলেন। যিনি সাহরী পর্যন্ত সারা রাত্রই নামাযে মাশগুল থাকতেন। অতঃপর আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে এই দু'আ করতেন, হে আল্লাহ! আমাকে দোযখ থেকে রক্ষা করুন। আমার মত ব্যক্তিও কি আপনার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করতে পারে?

হযরত আতা সুলামী রহ.ও জান্নাত চাইতেন না। সালেহ আসমায়ী রহ. তাঁকে বললেন, হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার বান্দার আমল নামা দেখ। যদি সে আমার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করে, তবে আমি তাকে জান্নাত দেব। আর যে আমার নিকট জাহান্নাম হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে জাহান্নام থেকে রক্ষা করব। তখন হযরত আতা রহ. বলেন, যদি আমি জাহান্নাম হতে রক্ষা পাই, তবে তা-ই আমার জন্য যথেষ্ট। হযরত আবূ নাঈমও উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আবূ দাউদ রহ. তাঁর সুনানে হযরত জাবির রা. এর হাদীসে সে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা হযরত মু'আয রা. দীর্ঘ কিরআত দ্বারা নামায পড়ানোর দরুন সৃষ্টি হয়েছিল। এক সময় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনুযোগ করল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, ভাতিজা! যখন তুমি নামায পড়, তখন তুমি কি কর? উত্তরে সে বলল, সূরা ফাতিহা পড়ি এবং আল্লাহর নিকট জান্নাত প্রার্থনা করি ও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভের প্রার্থনা করি। আমি আপনার ও মু'আয রা. এর ক্ষীণ আওয়াযের স্বরগুলো বুঝি না। (অর্থাৎ, আপনি ও মু'আয রা. নিভৃতে যা বলতেন) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ও মু'আয তার আশেপাশের কোন বিষয় নিয়ে-ই গুণগুণ করি।

সুনানে আবূ দাউদ১৬৫ হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলার সত্তার ওসীলা দিয়ে শুধু জান্নাতের প্রার্থনা করা যেতে পারে।

এ গ্রন্থের শুরুতে আব্দুল মালিক ইবনে বাশীর রা. এর মারফু বর্ণনা রয়েছে, যে প্রত্যহ জান্নাত ও জাহান্নাম (মুক্তির) প্রার্থনা করে থাকে। জান্নাত বলে,
يارب قد طابت ثماري واطردت أنهاري واشتقت إلي أولياني، فعجل إلى بأهلي
হে প্রভু! নিশ্চয়ই আমার ফলগুলো পেকে গেছে। আমার নহরগুলো পূর্ণভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। আমার অধিবাসীদের ব্যাপারে আমার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। সুতরাং আমার অধিবাসীদেরকে আমার মাঝে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিন। অতএব, জান্নাত তার অধিবাসীদের প্রার্থনা করে ও তাদেরকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করে। এমনিভাবে জাহান্নامও করে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন, তোমরা সর্বদা জান্নাত ও জাহান্নাম স্মরণ রাখ। কখনো তাকে ভুলে যেও না।

যেমনিভাবে আবূ ইয়ালা মুসেলী রহ. তার মুসনাদে স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা মহান দু'টি বিষয়কে ভুলে যেও না। আমারা জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কি সে মহান দু'টি বস্তু? উত্তর দিলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম।

আবূ বকর শাফেঈ রহ. হযরত কুলাইব ইবনে হারব রা. হতে বর্ণনা করে। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
أطلبوا الجنة جهدكم واهربوا من النار جهدكم.
তোমরা তোমাদের পূর্ণ সামর্থ দ্বারা জান্নাত প্রার্থনা কর। আর পূর্ণ সামর্থ দ্বারা জাহান্নام থেকে আত্মরক্ষা কর। وان النار لا ينام هاربها । কেননা পলায়নকারী তথা আত্মরক্ষাকারী কখনো নিদ্রা যায় না। وإن الآخرة محفوفة بالمكاره، وإن الدنيا محفوفة باللذات والشهوات، فلا تلهينكم عن الآخرة.
আর আখিরাত কষ্টকর বিষয়াবলী দ্বারা বেষ্টিত আর দুনিয়া হল, আসক্তিকর ও লোভনীয় বস্তসমূহ দ্বারা বেষ্টিত। সুতরাং দুনিয়ার এ লোভনীয় ও আসক্তিকর বস্তসমূহ যেন তোমাদেরকে আখিরাত থেকে উদাসীন না করে ফেলে।

টিকাঃ
১৬১. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১১২
১৬২. সূরা মু'মিন, আয়াত: ৭
১৬৩. সূরা ফুরকান, আয়াত: ১৫-১৬
১৬৪. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৮৪, ইবনে মাজাহ, পৃ. ৩২৩
১৬৫. খ. ১, পৃ. ১২২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00