📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের অবস্থান কোথায়?

📄 জান্নাতের অবস্থান কোথায়?


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَلَقَدْ رَأَهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَىٰ عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। প্রান্তবর্তী বদরী কুল বৃক্ষের নিকট যার নিকট অবস্থিত বাসোদ্যান।১১৯

এ কথা প্রমাণিত, সিদরাতুল মুনতাহা আকাশের উর্ধ্বে। তাকে সিদরাতুল মুনতাহা এ জন্য বলা হয়, আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে অবতীর্ণ বিষয়সমূহ এবং নিচ থেকে উপরে প্রেরিত বিষয়সমূহের সেখানে যাত্রা বিরতি ঘটে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ আকাশে রয়েছে তোমাদের রিযক ও প্রতিশ্রুত সকল কিছু।

মুজাহিদ রহ. বলেন, وَمَا تُوعَدُونَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত। ইবনে মুনযির স্বীয় তাফসীরে মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণনা করেন, وَمَا تُوعَدُونَ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত ও দোযখ। কিন্তু এ মতটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কেননা দোযখ হল আসফালাস সাফিন তথা সর্ব নিম্নাংশে, আকাশে নয়।

আবূ সালেহ রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, ভাল-মন্দ সব কিছুই আকাশ থেকে অবতারিত হয়। সে হিসাবে উক্ত মতের উদ্দেশ্য হবে এই, জান্নাত ও দোযখ উভয়টির উপকরণ আল্লাহর নিকট আসমানে। সনদসহ হারিস ইবনে আবূ উসামা রহ. বাশার ইবনে শাফ্ফাফ হতে বর্ণনা করেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. কে বলতে শুনেছি, । আক্রম খলীফাতুল্লাহ আবূল কাসেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জগতের মাঝে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সম্মানিত সৃষ্টি হলেন, আবুল কাসিম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নিশ্চয়ই জান্নাত আকাশে অবস্থিত।

আবূ নাঈম রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, মা'মার ইবনে রাশেদ উক্ত হাদীস মারফু' বর্ণনা করেছেন। সনদসহ মুহাম্মদ ইবনে ফযলের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, জান্নাত সপ্তম আকাশের উর্ধ্বে অবস্থিত। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা তা যেখানে ইচ্ছা করেন, সেখানে রাখবেন। আর দোযখ হল সপ্তম যমীনের নিচে।

ইবনে মানদাহ রা. স্ব-সনদে হযরত আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জান্নাত চতুর্থ আকাশে অবস্থিত। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা তা যেখানে ইচ্ছা করেন সেখানে রাখবেন। আর দোযখ হল সপ্তম যমীনের নিচে। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলা তা যেখানে ইচ্ছা সেখানে স্থাপন করবেন।

মুজাহিদ রহ. বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, জান্নাত কোথায় অবস্থিত? তিনি বললেন, সপ্তম আকাশের উদরে। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, দোযখ কোথায় অবস্থিত? তিনি বললেন, স্তর হিসাবে সাত সমুদ্রের নিচে।

ইবনে আবূ বকর আবূ শাইবা রহ. স্ব-সনদে আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জান্নাত ভাজ করা অবস্থায় সূর্যের কিরণের সাথে আবদ্ধ। প্রত্যেক বৎসর একবার তা উন্মোচন করা হয়। মু'মিনদের আত্মা যারযূর১২০ পাখির রূপ ধারণ করে। একে অপরকে চিনে ও জান্নাতের ফল দ্বারা আহার গ্রহণ করে।

উক্ত হাদীসের প্রথম অংশ শেষাংশের সাথে বাহ্যত বিরোধপূর্ণ মনে হয়। (কেননা, প্রথমাংশে রয়েছে, জান্নাত ভাজ করা অবস্থায় সূর্যের কিরণের সাথে আবদ্ধ প্রতিবছর একবার তা উন্মোচন করা হয়। আর শেষাংশে রয়েছে, মু'মিনের আত্মা প্রতিনিয়ত জান্নাতে ঘুরাফেরা করে।) কিন্তু বাস্তবে উভয়াংশে কোন বিরোধ নেই। কেননা, জান্নাত ভাজ করা অবস্থায় সূর্যের কিরণের সাথে আবদ্ধ হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলা প্রতিবছর সূর্যের দ্বারা যে বিভিন্ন প্রকার ফলমূল ও শস্য উৎপন্ন করেন, তা জান্নাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হাদীসের ভাষ্য এটাই নির্দেশ করে। যেমনিভাবে পার্থিব জগতের আগুন জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

অন্যথায় عرضها السموات والأرض জান্নাতের দৈর্ঘ্য হল, নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলসম। তাহলে তা সূর্যের পার্শ্বে কিভাবে ঝুলন্ত থাকতে পারে?

সহীহায়নে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে, الجنة مائة درجة ما بين كل درجتين كمابين السماء والأرض, অর্থাৎ জান্নাতের একশটি স্তর রয়েছে। এর প্রত্যেক দুই স্তরের মাঝে এ পরিমাণ দূরত্ব রয়েছে, যে পরিমাণ দূরত্ব আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থলে।১২১ উক্ত বর্ণনায় এ কথা-ই বুঝায়, জান্নাত অত্যন্ত উঁচু। والله أعلم

এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসে দু'ধরণের শব্দ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। অপর বর্ণনায় রয়েছে" إن في الجنة مائة درجة، ما بين كل درجتين كما بين السماء والأرض، أعد الله للمجاهدين في سبيل الله জান্নাতে একশটি স্তর রয়েছে। তার প্রত্যেক দুই স্তরে আকাশ-যমীনসম দূরত্ব। আল্লাহ তা'আলা তা তাঁর পথে জিহাদকারীগণের জন্য তৈরী করেছেন।' আমার শায়খ (ইবনে তাইমিয়াহ) উক্ত বর্ণনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ বর্ণনা দ্বারা এ কথা নিষিদ্ধ হয় না, জান্নাতের কোনো কোনো স্তর এরও চেয়ে অধিক উঁচু।

এমনিভাবে সহীহ হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, ان الله تسعة وتسعين إسما، من أحصاها دخل الجنة. অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এ নামগুলো মুখস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ তাঁর নামগুলোর প্রভাব এই যে, সে সব মুখস্থকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। এর দ্বারা বুঝা যায় না, আল্লাহ তা'আলার নাম এরও অধিক হতে পারে না। এই বর্ণনার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে এ তথ্যও নির্দেশ করে, জান্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা এ সকল স্তর থেকে উর্ধ্বে হবে। তার উর্ধ্বে কোন জান্নাত থাকবে না।

জান্নাতের এ শত স্তর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের সদস্যগণ জিহাদের কল্যাণে অর্জন করবে। জান্নাত হল, গোলাকৃতির। তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উঁচুস্তরের ও প্রশস্ততম হল, জান্নাতুল ফিরদাউস। তার ছাদ হল, আরশ। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসের মধ্যে ইরশাদ করেন,
إذا سألتم الله فاسئلوه الفردوس، فانه أوسط الجنة و أعلى الجنة তোমরা যখন আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা করবে। কেননা, তা অন্যান্য জান্নাতের ঠিক মাঝ বরাবর সর্বোচ্চ উচ্চতায় স্থাপিত। তার উপরে আল্লাহ তা'আলার আরশ অবস্থিত এবং তা হতেই প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয়, সমগ্র জান্নাত-ই তো আরশের নিচে। আরশ হল, তার ছাদ। আর কুরসী আকাশ-পৃথিবী অপেক্ষাও প্রশস্ত। আরশ তা অপেক্ষাও বৃহৎ আকারের। (তাহলে আরশ জান্নাতের ছাদ হয় কিভাবে?)

তার উত্তরে বলা হবে, জান্নাতের যে স্তরকে ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে, তা আরশের নিকটে অবস্থিত। সে হিসাবে তা অপেক্ষা উপরে আর কোন জান্নাত নেই। সুতরাং আরশ মূলতঃ এটারই ছাদ। এটি অপেক্ষা নিম্নস্থ জান্নাতের উপরে আরশ নয়।

জান্নাত অত্যন্ত উঁচু ও প্রশস্ত হওয়ার কারণে তার নিচের অংশ থেকে উপরের অংশে উঠবে স্তরানুসারে পর্যায়ক্রমে। যেমন কুরআন তিলাওয়াতকারীকে বলা হবে, إقرأ وارتق، فإن منزلتك عند أخر آية تقرأها তিলাওয়াত করতে থাক ও বেহেশতে আরোহণ করতে থাক। যেখানে গিয়ে তুমি শেষ আয়াত তিলাওয়াত করবে, তা-ই হবে তোমার ঠিকানা তথা নিবাস।

উক্ত হাদীসে দু'টি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত তার অবস্থান তার ধীশক্তির উপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ ধীশক্তি যেই স্থানে শেষ হবে সেখানে তার অবস্থান হবে। দ্বিতীয়টি হল, তার অবস্থান তার তিলাওয়াতের উপর। والله

টিকাঃ
১১৯. সূরা নাজম, আয়াত: ১৩-১৫
১২০. যারযূর, চড়ুই পাখি অপেক্ষা ঈষৎ বড় এক প্রকার পাখি- মিসবাহুল লুগাত
১২১. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৩৯১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের চাবির বর্ণনা

📄 জান্নাতের চাবির বর্ণনা


হাসান ইবনে আরাফা রা. স্ব-সনদে হযরত মু'আয বিন জাবাল রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের চাবি হল, شهادة أن لا إله إلا الله অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদের সাক্ষ্য প্রদান করা। এ হাদীসটি ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদেও১২২ উল্লেখ করেছেন।

ইমাম বুখারী রহ. ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রা. হতে বর্ণনা করেন,১২৩ তাকে বলা হল, لا إله إلا الله কি জান্নাতের চাবি নয়? তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে চাবির তো দাঁতও থাকে। সুতরাং তুমি যদি এমন চাবি আন, যার দাঁতও ঠিক আছে, তাহলে তালা খুলবে। অন্যথায় খুলবে না।

আবূ নাঈম রহ. হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, এক গ্রাম্য ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহ রাসূল! জান্নাতের চাবি কি? তিনি উত্তরে বললেন, لا إله إلا الله |

আবূ শায়খ স্ব-সনদে ইয়াযিদ ইবনে সুখায়রা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, إن السيوف مفاتيح الجنة অর্থাৎ তরবারি হল জান্নাতের চাবি। মুসনাদে১২৪ হযরত মু'আয বিন জাবাল রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কি তোমাকে জান্নাতের দ্বারসমূহ হতে একটি দ্বারের কথা বলব না? আমি বললাম, অবশ্যই বলুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, لاحول ولاقوة إلا بالله এটি হল জান্নাতের দ্বারসমূহের একটি দ্বার। আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি প্রার্থিত ইবাদতের জন্য একটি করে চাবি বানিয়ে রেখেছেন, যে চাবি দিয়ে সেই প্রার্থীত বিষয় খোলা যাবে। সে মতে নামাযের চাবি হল, পবিত্রতা। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مفتاح الصلوة الطهور অর্থ্যাৎ, পবিত্রতা হল নামাযের চাবি। হজের চাবি হল, ইহরাম। নেক কাজের চাবি হল, সত্য ভাষণ। আর ইলমের চাবি হল, উত্তমরূপে জানতে চাওয়া ও গভীর ভাবে মনোনিবেশ করা। সাহায্য ও সফলতার চাবি হল, ধৈর্য্য ধারণ করা। নি'আমত বৃদ্ধির চাবি হল, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। বন্ধুত্বের চাবি হল, ভালোবাসা ও যিক্র তথা স্মরণ। সফলতার চাবি হল, তাকওয়া তথা খোদাভীতি। তাওফীকের চাবি হল, আশা ও ভয়। ডাকে সাড়া দেওয়ার চাবি হল, দু'আ। আখিরাতের প্রতি প্রেরণা ও মোহ সৃষ্টির চাবি হল, পার্থিব বস্তু হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। ঈমানের চাবি হল, সে সকল বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করা, যে সকল বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করার জন্য আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে আহ্বান করেছেন। আল্লাহ তা'আলার নিকটে প্রবেশের চাবি হল, নিঃশর্ত আনুগত্য এবং প্রেম ও ত্যাগ, গ্রহণ ও বর্জন একমাত্র আল্লাহর সন্ত ষ্টির জন্য করা। অন্তরের সজীবতার চাবি হল, কুরআন কারীমে গবেষণা করা ও সাহরীর সময় মিনতি করা ও পাপকার্য বর্জন করা।

আল্লাহ তা'আলার রহমত লাভের চাবি হল, পূর্ণ ধ্যানে তাঁর ইবাদত করা ও তাঁর বান্দাদের উপকার করার চেষ্টা করা। রিযিকের চাবি হল, ইসতিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জনের চেষ্টা করা। ইয্যত ও সম্মান লাভের চাবি হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আনুগত্য। আখিরাতের প্রস্তুতির চাবি হল পার্থিব আশা-আকাংখা ও লোভ-লালসা সংক্ষিপ্ত করা। যাবতীয় কল্যাণের চাবিকাঠি হল, আল্লাহ তা'আলা ও আখিরাতের প্রতি আগ্রহী হওয়া। যাবতীয় অকল্যাণ ও অমঙ্গলের চাবিকাঠি হল, দুনিয়াপ্রীতি ও বড় বড় আশা-আকাংখা করা।

ইলমের অধ্যায়সমূহের মাঝে এটা হল সর্বাপেক্ষা উপকারী অধ্যায়। যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের চাবিকাঠি সম্পর্কে অবগতি লাভের অধ্যায়। এর পরিচিতি লাভ ও তার প্রতি সম্পূর্ণ লক্ষ্য রাখার তাওফীক একমাত্র সে ব্যক্তির হয়ে থাকে যে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ও আল্লাহ তা'আলা যাকে এ মহান তাওফীক দান করেন।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের জন্য চাবিকাঠি ও দরযা নির্ধারণ করেছেন, যার দ্বারা ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করতে পারে। যেমনিভাবে তিনি শিরক-অহংকার ও তাঁর রাসূলের প্রেরিত বিষয়সমূহ থেকে বিমুখতা এবং যিকর থেকে উদাসীনতাকে জাহান্নামের চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। মদকে তিনি সকল পাপকার্যের চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। ধনাঢ্যতা ব্যভিচারের চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। চেহারার উপর গভীর দৃষ্টিপাত করাকে অনুরাগ ও প্রেমের চাবিকাঠি বানিয়েছেন। অলসতা ও আরামপ্রিয়তাকে ব্যর্থতা ও বঞ্চিত হওয়ার চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। পাপাচারকে কুফরীর ও মিথ্যাকে কপটতার চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। সংকীর্ণ মন ও লোভ-লালসাকে কৃপণতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নতা ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জনের চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত বিষয়াবলী হতে বিমুখতাকে প্রত্যেক বিদআত ও ভ্রান্ততার চাবিকাঠি নির্ধারণ করেছেন।

এগুলো এমন বিষয়, যার সত্যায়ন একমাত্র সঠিক দৃষ্টিসম্পন্ন ও এমন জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি-ই করতে পারেন, যে তার মনে উঁকি মারা বিষয়গুলোকে এবং ভাল-মন্দ ও কল্যাণ-অকল্যাণকে স্ব-স্ব স্থানে বুঝতে সক্ষম হন।

সুতরাং আমাদের সকলেরই কর্তব্য হল, এই চাবিগুলো এবং চাবি সম্পর্কিত বিষয়গুলোর উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা। আর প্রতিটি তাওফীকের নেপথ্যে একমাত্র আল্লাহই রয়েছেন। যার ন্যায়পরায়ণতাই তার জন্য রাজত্ব। সকল প্রশংসা তার জন্য। তার পক্ষ থেকেই নি'আমত ও অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। যাকে তার কর্মকান্ডের জন্য জবাবদিহী করতে হয় না। অথচ তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে জবাবদিহী নিবেন।

টিকাঃ
১২২. খ. ৫, পৃ. ২৪২
১২৩. খ. ১, পৃ. ১৬৫
১২৪. খ. ৫, ২৪২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের আরজি ও আমন্ত্রণপত্র

📄 জান্নাতের আরজি ও আমন্ত্রণপত্র


আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ وَمَا أَدْرَاكَ مَا عِلِّيُّونَ ، كِتَابٌ مَّرْقُومٌ ، يَشْهَدُهُ الْمُقَرَّبُونَ .
'অবশ্যই পুণ্যবানদের আমলনামা ইল্লিয়‍্যীনে। (ইল্লিয়‍্যীন হল, সিজ্জীনের বিপরীত। মু'মিনদের রূহ ও আমলনামা যেখানে রক্ষিত হয় সেই স্থান।) ইল্লিয়্যীন সম্পর্কে তুমি কি জান? তা চিহ্নিত আমলনামা। যারা আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত তারা তা দেখে'।১২৫

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা বলে দিয়েছেন, তাদের আমলনামা রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায়, তা বাস্তবেই লিপিবদ্ধ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা নেক লোকদের আমলকে লিখে রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। সেগুলো তার নৈকট্যশীল অর্থাৎ ফিরিশতা, আম্বিয়ায়ে কিরাম ও কামিল মু'মিনদের উপস্থিতিতে তার উপর সীলমহর অংকন করে দিবেন। পক্ষান্তরে যখন তিনি পাপাচারীদের আমলনামার কথা উল্লেখ করেছেন, তখন এ সকল পুণ্যবান লোকের সাক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেননি, যেমনটি নেক লোকদের আমলনামার মর্যাদা প্রকাশের সময় করেছেন। তার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুকের মধ্য হতে বিশিষ্ট বান্দাদেরকে সাক্ষ্য রূপে গ্রহণ করেছেন। এই নৈকট্যশীলদের সামনে আমলনামা প্রকাশ করা সেরূপ, যেরূপ বাদশাহ তার প্রজাদের মধ্য হতে বিশিষ্টদের নামে পত্র লিখেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করা। এভাবে সৎ লোকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহ ও তার ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে বান্দার উপর সালাত প্রদর্শনের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।

ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদে এবং ইবনে হিব্বান ও আবূ আওয়ানা আল ইসফারায়ী স্ব-স্ব সহীতে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য হাযির হলাম। فجلس رسول الله صلى الله عليه وسلم على القبر، وجلسنا حوله، كأن على رؤسنا الطير، وهو يلحد له.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে বসলেন, আর আমরা তাঁর আশে-পাশে বসলাম। তখন এমন অবস্থা বিরাজ করছিল, যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামাচ্ছিলেন। অতঃপর তিনি তিনবার বললেন, أعوذ بالله من عذاب القبر 'আমি আল্লাহর নিকট কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি'। অতঃপর বললেন,
إن المؤمن إذا كان في إقبال من الآخرة، وانقطاع من الدنيا نزلت إليه الملائكة كان على وجوههم الشمس مع كل واحد منهم حنوط وكفن فجلسوا منه مد بصره، ثم يجى ملك الموت حتى يجلس عند رأسه ، فيقول أيتها النفس الطيبة أخرجي إلى مغفرة من الله ورضوان، قال : فتخرج تسيل كما تسيل القطرة من في السقاء، فيأخذها، فإذا أخذها لم يدعوها في يده طرفة عين حتى يأخذوها، فيجعلوها في ذلك الكفن وذلك الحنوط ويخرج منها كأطيب نفحة مسك وجدت على وجه الأرض، قال فيصعدون بها، فلا يمرون بها يعني على ملأ من الملائكة إلا قالوا : ما هذا الروح الطيب؟ فيقولون : فلان بن فلان بأحسن أسمائه التي كانوا يسمونه بها في الدنيا، حتى ينتهوا بها إلى السماء الدنيا فيستفتحون له فيفتح لهم، ويشيعه من كل سماء مقربوها إلى السماء التي تليها حتى ينتهي بها إلى السماء التي فيها الله عز وجل، فيقول الله عز و جل : اكتبوا كتاب عبدي في عليين، وأعيدوه إلى الأرض، فأنى منها خلقتهم وفيها أعيدهم ومنها أخرجهم تارة أخرى. قال : فتعاد روحه في جسده، فيأتيه ملكان فيجلسانه، فيقولان له : من ربك؟ فيقول : ربي الله، فيقولان له : ما دينك؟ فيقول : ديني الإسلام، فيقولان له : ما هذا الرجل الذي بعث فيكم؟ فيقول : هو رسول الله، فيقولان له : وما علمك؟ فيقول : قرات كتاب الله فآمنت به وصدقت، قال : فينادي مناد من السماء : أن صدق عبدي، فافرشوه من الجنة ، والبسوه من الجنة، وافتحوا له بابا إلى الجنة. قال : فيأتيه من روحها وطيبها، ويفسخ له في قبره مد بصره. قال : ويأتيه رجل حسن الوجه حسن الثياب طيب الريح، فيقول : أبشر بالذي يسرك هذا يومك الذي كنت توعد، فيقول له : من أنت؟ فوجهك الوجه الذي يجيء بالخير فيقول أنا عملك الصالح

মু'মিন যখন আখিরাতের প্রথম মনযিলে অবতীর্ণ হয় ও দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার নিকট রহমতের ফিরিশতার আগমন ঘটে। যাদের চেহারায় যেন সূর্যের কিরণ জ্বলজ্বল করতে থাকে। তাঁদের (ফিরিশতাদের) প্রত্যেকের নিকট সুগন্ধি ও কাফন থাকে। তারা দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে পড়ে।

অতঃপর মৃত্যুদূত উপস্থিত হয়ে তার মাথার নিকটে বসে পড়ে ও বলতে থাকে, হে পবিত্র আত্মা! আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সাথে বেরিয়ে পড়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর মু'মিনের আত্মা তেমনিভাবে বের হয়, যেমনিভাবে মশক থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। অতঃপর মৃত্যুদূত তা ধরে, আর যখন তিনি তা ধরেন, তখন তাকে আর সামান্যতম সময়ও রাখেন না। ফেরেশতারা সেই আত্মা গ্রহণ করে ঐ সুগন্ধিময় কফিনে সংরক্ষন করেন। তখন সেই কফিন থেকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সহজ লভ্য সুগন্ধি বের হয়ে চার পাশে ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর ফিরিশতারা সে রূহকে নিয়ে উর্ধ্বে গমন করেন। তখন তাঁরা ফিরিশতাদের যে দলের নিকট দিয়েই অতিক্রম করে, তারা বলতে থাকে এ পবিত্র আত্মা কার?

তারা উত্তরে বলেন, অমুকের ছেলে অমুকের আত্মা এটা। দুনিয়ায় তার যে নামে ডাকা হত তন্মধ্যে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর নামে তারা তাকে সম্বোধিত করে। এরপর তাকে নিয়ে দুনিয়ার আকাশে অর্থাৎ প্রথম আকাশে আরোহণ করে। অতঃপর তার জন্য সে আকাশের দরযা খোলার আবেদন করা হবে। তখন দরযা খুলে দেয়া হবে ও প্রতিটি আসমানের ফিরেশতা গণ তাকে পরবর্তী আসমান পর্যন্ত বিদায় জ্ঞাপনে যাবে। এমনিভাবে তাদেরকে সে আকাশে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে আল্লাহ তা'আলার আরশ রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার বান্দার আমলনামা ইল্লিয়‍্যীনে লিখ এবং তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দাও। কেননা, আমি তাকে সে মাটি থেকেই সৃষ্টি করেছি এবং তাতেই তাকে ফিরিয়ে দেব ও পুনরায় তা থেকেই তার উত্থান ঘটাব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তার শরীরে রূহ ফিরিয়ে দেয়া হবে ও তার নিকট দু'জন ফিরিশতা আসবেন। তাঁরা তাকে প্রশ্ন করবেন, তোমার রব তথা প্রভু কে? মু'মিন ব্যক্তি বলবে, আমার প্রভু হলেন, আল্লাহ তা'আলা। তাঁরা পুনরায় প্রশ্ন করবেন, তোমার ধর্ম কি? মু'মিন ব্যক্তি উত্তরে বলবেন, আমার ধর্ম হল ইসলাম। তাঁরা পুনরায় প্রশ্ন করবেন, যে ব্যক্তিকে তেমাদের মাঝে প্রেরণ করা হয়েছে, তাঁর সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? মু'মিন ব্যক্তি উত্তরে বলবেন, তিনি হলেন, আল্লাহ তা'আলার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ফিরিশতাগণ পুনরায় প্রশ্ন করবেন, তুমি কিভাবে জানলে? মু'মিন ব্যক্তি উত্তরে বলবেন, আমি আল্লাহ তা'আলার কিতাব পড়েছি ও তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্যায়ন করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আকাশ হতে একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, অবশ্যই আমার বান্দা সঠিক বলেছে।

সুতরাং তোমরা তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও ও তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরযা খুলে দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তার কবরে জান্নাতের সুবাতাস ও সুগন্ধি আসতে থাকবে। তার কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেয়া হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর তার নিকট সুদর্শন আকৃতির ও উত্তম পোশাক পরিহিত এবং অত্যন্ত সুগন্ধিময় একজন ব্যক্তি এসে তাকে বলবে, তুমি যে বিষয়ে খুশি হও, সে বিষয়ের সু-সংবাদ গ্রহণ কর। এটা সেই দিবস, যে দিবসের তোমাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

তখন সে ব্যক্তি বলবে, আপনি কে? আপনার চেহারা থেকে তো শুধু কল্যাণ-ই বেয়ে পড়ছে। তখন সে বলবে, আমি হলাম তোমার নেক আমল। এরপর সে ব্যক্তি বলতে থাকবে, হে প্রভু! কিয়ামত ঘটান। হে প্রভু! কিয়ামত ঘটান। যেন আমি জান্নাতে আমার পরিজন ও সম্পদের নিকট পৌঁছতে পারি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কাফির পৃথিবী ত্যাগ করে পরপারে যাত্রার নিকটবর্তী হয়, তখন আকাশ থেকে কালো কৃষ্ণ বর্ণের ফিরিশতাগণ অবতরণ করেন। তাদের নিকট চট থাকে। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুদূত উপস্থিত হয়ে তার মাথার পাশে বসে বলবে, ايتها النفس الخبيثة হে পাপাত্মা! আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টিতে বের হয়ে যাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এবং মৃত্যুদূত তা টানতে থাকবে, যেমনিভাবে কাবাব প্রস্তুতকারী ব্যক্তি ভিজা তুলা দ্বারা কাবাবের শিক টানতে থাকে। অতঃপর ফিরিশতা তা নিয়ে নেন। ফিরিশতা যখন তা নেন, তখন চোখের পলক ফিরানোর পরিমাণ সময়ও তাকে সুযোগ দেন না; বরং তাকে চটে মুড়িয়ে ফেলেন।

ويخرج منها كانتن ريح الجيفة وجدت على وجه الأرض এবং তা থেকে মৃত প্রাণীর লাশের ন্যায় দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকবে, যা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম দুর্গন্ধ। অতঃপর ফিরিশতা তাকে নিয়ে উপরে উঠেন। তখন তা নিয়ে ফিরিশতাদের যে দলের নিকট দিয়ে-ই অতিক্রম করা হয়, তারা বলতে থাকবে, এ খারাপ আত্মা কার? তখন সে ফিরিশতা উত্তরে বলবে, অমুকের ছেলে অমুকের। পৃথিবীতে তাকে যে নামে ডাকা হত, তা হতে নিকৃষ্টতম নামে তারা তাকে সম্বোধন করবে। তাকে পৃথিবীর আকাশে তথা প্রথম আকাশে নিয়ে যাওয়া হবে ও তার জন্য আকাশের দ্বার খুলতে বলা হবে। কিন্তু তা খোলা হবে না।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করলেন, لا تفتّح لهم أبواب السّماء তাদের জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে না।১২৬ তারা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্র পথে উষ্ট্র প্রবেশ করে। (এটি যেমন অসম্ভব। তেমনিভাবে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাও অসম্ভব।) অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তার আমলনামা সিজ্জীনে লিখে দাও। যা সর্বাপেক্ষা নিম্নের যমীনেরও নিচে। তার আত্মাকে অত্যন্ত কঠোরতার সাথে নিক্ষেপ করা হবে।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ومن يشرك بالله فكأنما خرّ من السماء 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাথে শরীক করল, তথা অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে যেন আকাশ থেকে নিচে পড়ে গেল। অতঃপর তা মৃত ভক্ষণকারী প্রাণী লুফে নেয় বা বাতাস তাকে দূর প্রান্তে নিক্ষেপ করে'।

অতঃপর আত্মা তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তার নিকট দু'জন ফিরিশতা এসে তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করবে, "তোমার প্রভু কে? উত্তরে সে বলবে, هاه هاه لا أدري অর্থাৎ হায় আফসোস! আমি জানি না। অতঃপর ফিরিশতাগণ তাকে প্রশ্ন করেন, তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তিকে প্রেরণ করা হয়েছে, তার সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? উত্তরে সে বলবে, হায় আফসোস! আমি জানি না। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, নিশ্চয়-ই আমার এ বান্দা মিথ্যা বলেছে। সুতরাং তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার জন্য জাহান্নামের দরযা খুলে দাও। ফলে জাহান্নামের আগুনের তাপ তার শরীরে লাগতে থাকবে। ويضيق قبره حتى تختلف اضلاعه এবং তার কবর এ পরিমাণ সংকীর্ণ করে দেয়া হবে, তার পাঁজরের হাড় একটি অপরটির মাঝে ঢুকে পড়বে। এরপর তার নিকট কুৎসিত আকৃতির খারাপ পোশাক পরিহিত দুর্গন্ধযুক্ত এক ব্যক্তি আসবে ও তাকে বলবে, তোমার জন্য যে সকল অমঙ্গল ও অকল্যাণকর তার সুসংবাদ নাও। এ হল সে দিবস, যে দিবসের প্রতিশ্রুতি তোমাকে দেয়া হয়েছিল। তখন সে কবরস্থ ব্যক্তি তাকে বলবে, من أنت فوجهك الذي يجيئ بالشر তুমি কে? তোমার চেহারা থেকে তো শুধু খারাপ-ই বেয়ে পড়ছে। فيقول انا عملك الخبيث তখন সে বলবে, আমি হলাম তোমার সে খারাপ আমল। তখন সে বলবে, رب لا تقم الساعة হে প্রভু! কিয়ামত অনুষ্ঠিত করবেন না।

উক্ত হাদীস ইমাম আবূ দাউদ সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন,১২৭ এটাই হল স্বাক্ষরদান ও প্রাথমিক পরিচয় পত্র।

উক্ত হাদীসের শেষাংশের দ্বারা বুঝা যায়, কাফির কবরের শাস্তিতে নিপতিত হওয়া সত্ত্বেও বলবে, হে প্রভু! কিয়ামত অনুষ্ঠিত করবেন না। কেননা, এখন তো জাহান্নামের দিকের দরযা খোলা। যা দ্বারা জাহান্নাম দেখা যায়। ফলে সে ভয়াবহ শাস্তির বিপরীতে কবরের আযাবকে সাধারণ ও শান্তি মনে করবে। এর দ্বারা সে সকল লোকের ঐ প্রশ্ন বিদূরিত হয়ে যায়, যে প্রশ্ন তারা সূরা ইয়াসীনের উক্ত আয়াত দ্বারা করে থাকে, قَالُوا يُوَيْلَنَا مَن بَعَثَنَا مِن مَّرْقَد نَا তারা বলবে, হায়! দুর্ভোগ আমাদের। কে আমাদিগকে আমাদের নিদ্রাস্থল হতে উঠাল।১২৮

জান্নাতের পরিচয় পর্বের সূচনা বিসমিল্লাহ দ্বারা আর দ্বিতীয় পরিচয়পর্বে থাকবে শাহী ফরমান
তাবারানী তাঁর মু'জামে স্ব-সনদে হযরত সালমান ফারসী রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ إِلَّا بِجَوَازٍ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، هَذَا كِتَابُ مِنْ اللهِ، لِفُلَانِ بْنِ فُلَانٍ ادْخُلُوهُ جَنَّةً عَالِيَةً قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ :
কেউ ঐ পরিচয়পত্র ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। যাতে বিসমিল্লাহ লিপিবদ্ধ থাকবে। আরো লিখিত থাকবে, এ হল অমুকের ছেলে অমুকের জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র। তাকে উঁচু স্তরের বেহেশতে প্রবেশ করাও, যার ফল-ফলাদিগুলো ঝুঁকে আছে।

অন্য এক সনদে হযরত সালমান ফারসী রা. হতে এ হাদীসও বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মু'মিনদেরকে পুলসিরাতে এ পরিচয়পত্র দেয়া হবে, যাতে লিপিবদ্ধ থাকবে, بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، هَذَا كِتَابُ مِنْ اللهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ لِفُلَانِ بْنِ فُلَانٍ.
এ হল পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অমুকের পুত্র অমুকের পরিচয়পত্র। তাকে উঁচু স্তরের বেহেশতে প্রবেশ করিয়ে দাও। যার ফল-ফলাদিগুলো ঝুঁকে আছে।

(লেখক বলেন) আমি বলব, যে দিন দুই মুষ্টি উত্তোলন করা হয়েছিল, সেদিন-ই মু'মিনগণ আসহাবুল ইয়ামিন তথা ডানদিকের দলের অন্তর্ভুক্ত। সে দিন-ই তাকে জান্নাতবাসী হিসাবে লিখে দেয়া হয়েছে, যে দিন তার মাঝে আত্মা প্রবিষ্ট করানো হয়েছে। অতঃপর মৃত্যুর দিন জান্নাতবাসীদের রেজিষ্ট্রি খাতায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাকে এ পরিচয়পত্র কিয়ামতের দিন প্রদান করা হবে। الله المستعان একমাত্র আল্লাহ তা'আলা-ই সাহায্যকারী।

টিকাঃ
১২৫. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৮-১৯
১২৬. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ৪০
১২৭. খ. ২, পৃ. ৩০৬
১২৮. সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ৫২

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 তাওহীদ-ই জান্নাতের একমাত্র পথ

📄 তাওহীদ-ই জান্নাতের একমাত্র পথ


এটি এমন একটি বিষয় যে সম্পর্কে শুরু থেকে নিয়ে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী একমত। আর জাহান্নামের পথ তো অগণিত। সে জন্যই আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের পথের বর্ণনায় একবচন ও জাহান্নামের পথের বর্ণনায় বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, وَأَنْ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ এবং এই পথ-ই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।১২৯

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ সরলপথ আল্লাহর কাছে পৌঁছায়; কিন্তু পথগুলির মধ্যে বক্র পথও আছে।১৩০

অর্থাৎ সরল পথ থেকে বিচ্যুত পথও রয়েছে। আর তা হল, ভ্রষ্টতার পথ। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, هَذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ এটাই আমার নিকট পৌঁছার সরল পথ।১৩১

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, ১৩২ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে একটি সোজা রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা হল আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার পথ। অতঃপর সে রেখার ডানে-বাঁয়ে আরো অনেকগুলো রেখা টানলেন এবং বললেন, এ পথগুলোর প্রত্যেকটিতে শয়তান রয়েছে। যারা প্রত্যেকেই নিজেদের দিকে আহ্বান করতে থাকে।

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ এবং এ পথই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ পথের অনুসরণ কর।১৩৩ অন্য পথে চলো না। যদি এ আয়াত দ্বারা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, قَدْ جَاءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ، يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ الإِسْلَامِ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে। যারা আল্লাহ নিকট সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন।১৩৪

এ আয়াতে سبل السلام বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। তাহলে কিভাবে বলা যায়, আল্লাহ তা'আলা তাঁর পথের বর্ণনায় একবচন ব্যবহার করেছেন? উক্ত প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, এ আয়াতে এক পথকে বুঝাতে গিয়েই বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। যেমনিভাবে جواد বহুবচন হওয়া সত্ত্বেও এক সত্তাকেই বুঝানোর জন্য তা ব্যবহৃত হয়। বড় পথের ক্ষেত্রে طرق বহুবচন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সুতরাং এগুলো হল ঈমানের শাখা-প্রশাখা। ঈমান এ সবগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। যেমনিভাবে বৃক্ষের কাণ্ড তার ডাল ও শাখাকে অন্তর্ভুক্ত করে। তেমনিভাবে পথ তো একটি-ই; কিন্তু তার শাখা অনেক। আর এ سبل দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার প্রতি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেয়া ও তাঁর সংবাদকে সত্যায়ন করা ও তাঁর নির্দেশের আনুগত্য করা। প্রকৃত পক্ষে জান্নাতের পথ তো হল আল্লাহ তা'আলার প্রতি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেয়া।

১৩৫ ইমাম বুখারী রহ. তার সহীহেতে হযরত জাবির রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ফিরিশতাগণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এলেন, তখন তাঁদের মধ্য হতে একজন বললেন, انه نائم তিনি তো ঘুমন্ত। অন্যজন বললেন, العين نائمة والقلب يقظان চক্ষু তো ঘুমন্ত; কিন্তু অন্তর জাগ্রত।

فقالوا ان لصاحبكم هذا مثلا فاضربوه তখন তাঁরা বললেন, তোমাদের সাথীর (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি উপমা আছে। সুতরাং তোমরা উপমা বর্ণনা কর।

فقالوا مثله رجل بنى دارا، وجعل فيها مأدبة، وبعث داعيا, فمن أجاب الداعي دخل الدار، وأكل من المأدبة. তাঁরা বললেন, তাঁর উপমা হল এমন, এক ব্যক্তি একটি ঘর তৈরী করল ও তাতে খাবারের আয়োজন করে একজন ঘোষককে পাঠিয়ে দিল, গিয়ে লোকদের ডেকে নিয়ে আস। সুতরাং যে ব্যক্তি সে ঘোষকের আহ্বানে সাড়া দিবে সে ঘরে প্রবেশ করতে পারবে ও আয়োজিত খাবার থেকে খেতে পারবে।

ومن لم يجب الداعي لم يدخل الدار، ولم يأكل من المأدبة আর যে ব্যক্তি সে ঘোষকের আহ্বানে সাড়া দিবে না, সে ঘরে প্রবেশও করতে পারবে না, খাবারও খেতে পারবে না। فقالوا : তখন তাঁরা বললেন, উক্ত উপমাটিকে এমন স্পষ্ট ভাবে أولوها له يفقهها ব্যাখ্যা কর, যাতে তিনি বুঝতে পারেন।

فقال بعضهم : ان العين نائمة، والقلب يقظان তাঁদের মধ্য হতে একজন বললেন, চক্ষু ঘুমন্ত; কিন্তু অন্তর জাগ্রত।

الدار الجنة، والداعي محمد ঘর দ্বারা উদ্দেশ্য হল জান্নাত, যা আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন। আর দস্তরখান দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার নি'আমতরাজি। ঘোষক দ্বারা উদ্দেশ্য হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

فمن أطاع محمدا فقد أطاع الله، ومن عصى محمدا فقد عصى الله সুতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আনুগত্য করল, সে আল্লাহরও আনুগত্য করল। আর যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর অবাধ্য হল, সে আল্লাহরও অবাধ্য হল। ومحمد فرق بين الناس মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই হলেন, মানুষের মাঝে পার্থক্য রচনাকারী। (আনুগত্যকারীগণ ভিন্ন, অবাধ্যরা ভিন্ন)।

উক্ত হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও বর্ণনা করেছেন,১৩৬ তাঁর শব্দ হল এরূপ, সাহাবী বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট তাশরীফ আনলেন ও বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, জিবরীল আ. আমার মাথার পাশে ও মীকাঈল আ. আমার পায়ের দিকে বসে আছেন। তাদের মধ্যে একজন তার সাথীকে বলল, তাঁর উপমা বর্ণনা কর। তখন ফিরিশতা বললেন, আপনি শুনুন, কেননা আপনার কর্ণ শ্রবণ করে, আপনি বুঝুন, কেননা আপনার অন্তর বুঝে। নিশ্চয়-ই আপনার ও আপনার كمثل ملك اتخذ دارا ثم بنى فيها بيتا، ثم جعل مائدة ثم بعث رسولا يدعوا الناس إلى طعامه উচ্চতের উদাহরণ হল এরূপ, এক বাদশাহ প্রাসাদ নির্মাণ করল এবং তাতে কক্ষ তৈরী করল, সেখানে খাবারের আয়োজন করে দস্ত রখান বিছাল ও লোকদের খাবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে আহ্বান করার জন্য নিজ দূত পাঠাল। فمنهم من أجاب الرسول তাদের মধ্যে সুতরাং কতেক দূতের ডাকে সাড়া দিল। ومنهم من ترکه তাদের মাঝে কতেক দিল না। فالله هو الملك، والدار الإسلام، والبيت الجنة সুতরাং বাদশাহ হলেন, আল্লাহ তা'আলা। আর প্রাসাদ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ইসলাম। কক্ষ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, জান্নাত। আল্লাহ তা'আলার পক্ষে আহ্বানকারী হলেন, আপনি হে মুহাম্মদ। فمن أجابك دخل الإسلام، ومن دخل الإسلام دخل الجنة، ومن دخل الجنة أكل ما فيها যে ব্যক্তি আপনার আহ্বানে সাড়া দিবে সে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করবে, আর যে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে জান্নাতের নি'আমতরাজি হতে আহার করবে।

ইমাম তিরমিযী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে একটি সহীহ হাদীস বর্ণনা করেছেন।১৩৭ হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামায শেষে ফাخذ بيدي حتى خرج إلى بطحاء مكة، فاجلسني ثم خط علي خطا আমার হাত ধরে মক্কার দিকে গেলেন ও আমাকে বসালেন এবং আমার চতুর্পার্শ্বে রেখা টানলেন।

ثم قال : لا تبرحن خطك فانه سينتهى إليك رجال فلا تكلمهم، فإنهم لا يكلمونك অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, এরেখা থেকে কোন ক্রমেই বের হবে না। তোমার নিকট কিছু লোক আসবে, তুমি তাদের সাথে কথা বলবে না। তাহলে তারাও তোমার সাথে কথা বলবে না।

ثم مضى رسول الله صلى الله عليه وسلم حيث أراد অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে গমন করার ইচ্ছা করেছিলেন, সেখানে গমন করলেন।

فبينا انا جالس في خطي، إذ أتاني رجال كأنهم الزط اشعارهم اجسامهم لاأرى عورة ولا أرى بشرا আমি সে রেখায় থাকাবস্থায়-ই আমার নিকট কিছু লোক এল, যেন তারা কৃষক। তাদের শরীর ও চুল এমন যে, তাদের নারীও মনে হয় না, পুরুষও মনে হয় না। وينتهون إلى لا يجاوزن الخط তারা আমার নিকট আসে; কিন্তু সে রেখার ভিতরে ঢুকতে পারে না।

ثم يصدرون إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم অতঃপর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে গেল। حتى اذا كان آخر الليل، لكن رسول الله صلى الله عليه وسلم قد جاءني وانا جالس রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের শেষভাগে তাশরীফ আনলেন, আর আমি তখন বসা-ই ছিলাম। فقال : لقد رأني منذ الليلة، ثم دخل علي في خطي، فتوسد فخذی فرقد অতঃপর তিনি বললেন, 'আজ রাতে সে আমাকে দেখেছে'। তারপর তিনি আমার নিকট রেখায় ঢুকে পড়লেন এবং আমার উরুকে বালিশ বানিয়ে ঘুমালেন। وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا ارقد نفخ | রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমালে নাক ডাকতেন। فبينما انا قاعد ورسول الله صلى الله عليه وسلم متوسد فخذي আমি সে অবস্থাতেই বসে ছিলাম আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উরুতে মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। إذا برجال عليهم ثياب بيض، والله أعلم ما بهم من الجمال فانتهوا إلى হঠাৎ সাদা শুভ্র বস্ত্র পরিহিত কিছু লোক দেখতে পেলাম। তাদের রূপ সৌন্দর্য সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। তারা আমার নিকটে এল।

جلس طائفة منهم عند رأس رسول الله صلى الله عليه وسلم، وطائفة منهم عند رجليه. এবং তাদের মধ্যে একটি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথার নিকট বসল ও অন্য দল পায়ের নিকট বসল।

ثم قالوا : ما رأينا عبدا قد مارأينا عبدا قط। فقال : মারায়না আবদান ক্বাদ। إن عينيـه تنامـان، وقلبـه يقظـان أوتى مثل ما أوتى هذا النبي। إن عينيه تنامان, وقلبه يقظان এ নবীকে সে সকল বিষয় প্রদান করা হয়েছে আমরা অন্য কোনো মানুষকে তা পেতে দেখিনি। তাঁর চক্ষু তো ঘুমায়; কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকে। اضربواله مثلا তোমরা তাঁর উপমা বর্ণনা কর।

مثل سيد بنى قصرا، ثم جعل مأدبة، فدعا الناس أكل من طعامه، وشرب من شرابه. তাঁর উদাহরণ হল, সে সরদারের মত, যে একটি প্রাসাদ তৈরী করে খাবার আয়োজন করেছে এবং লোকদেরকে সেখান থেকে পানাহারের প্রতি আহ্বান করছে। فمن أجابه أكل من طعامه، وشرب من شرابه যে তার ডাকে সাড়া দিল সে সেখান থেকে পানাহার গ্রহণ করতে পারবে। ومن لم يجبه عاقبه أو قل عذبه আর যে তাঁর ডাকে সাড়া দিল না, সে তাকে শাস্তি দিবে। ثم ارتفعوا واستيقظ رسول الله صلى الله عليه وسلم عند ذالك তারা উঠতে লাগলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে গেলেন।

فقال : سمعت ماقال هؤلاء؟ অতঃপর তিনি বললেন, এরা যা বলল, তুমি কি তা শুনেছ? وهل تدري من هم؟ তুমি কি জান এরা কারা? قلت : الله ورسوله أعلم আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। قال : هم الملائكة রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাঁরা হলেন, ফিরিশতা। فتدري ما المثل الذي ضربوه؟ তুমি কি জান, তাঁরা কী উপমা পেশ করেছেন?

قلت : الله ورسوله أعلم আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-ই ভাল জানেন।

قال : الرحمن بنى الجنة، ودعا إليها عباده، فمن أجابه دخل الجنة. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করে তার প্রতি স্বীয় বান্দাকে আহ্বান করলেন। সুতরাং যে সে আহ্বানে সাড়া দিবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ومن لم يجبه عذبه আর যে সে আহ্বানে সাড়া দিবে না, তাকে তিনি শাস্তি প্রদান করবেন।

টিকাঃ
১২৯. সূরা আন'আম, আয়াত: ১৫৩
১৩০. সূরা নাহল, আয়াত: ৯
১৩১. সূরা হিজর, আয়াত: ৪১
১৩২. মুসনাদে আহমদ, খ. ১, পৃ. ৪৩৫
১৩৩. সূরা আন'আম, আয়াত: ১৫৩
১৩৪. সূরা মায়িদা, আয়াত: ১৫-১৬
১৩৫. বুখারী, খ. ২, পৃ. ১০৭৫
১৩৬. খ. ২, পৃ. ১১৩
১৩৭. খ. ২, পৃ. ১১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00