📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের ফটক কয়টি?

📄 জান্নাতের ফটক কয়টি?


আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَراً حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوابَهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ.
যারা স্বীয় প্রতিপালককে ভয় করত, তাদেরকে দলে দলে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে ও তার দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে। আর জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে পবেশ কর স্থায়ীভাবে। (অবস্থিতির জন্য।)১০৪

অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা দোযখের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوابَهَا যখন তারা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হবে, তখন তার প্রবেশ দ্বারগুলি খুলে দেওয়া হবে।১০৫

জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَفُتِحَتْ أبوابها এখানে, واز দ্বারা আর জাহান্নামের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, وفتحت أبوابها অর্থাৎ واز ব্যতীত। এর কারণ বর্ণনায় একদল উলামা বলেন, এখানে واز হল, واؤ ثمانية। যেহেতু জান্নাতের দ্বার আটটি। সুতরাং এখানে واؤ ثمانية ব্যবহার করা হয়েছে। আর যেহেতু জাহান্নামের দ্বার আটটি নয়; বরং সাতটি, তাই সেখানে واؤ ثمانية ব্যবহার করা হয়নি। এটি অত্যন্ত দুর্বলতম উক্তি। এর কোন প্রমাণিক ভিত্তি নেই। এই কায়দা আরবগণও জানেন না, আরবী ভাষার পণ্ডিতগণও জানেন না। এটি পরবর্তী যুগের কতিপয় আলিমের নিজস্ব ভাবনা মাত্র।

অন্য একদল আলিম বলেন, وفتحت এর মধ্যে واز টি অতিরিক্ত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর واز এর পরবর্তী বাক্য إذا এর জবাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনিভাবে জাহান্নামের বর্ণনায় وفتحت أبوابها বাক্যটি إذا এর জবাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ মতটিও অত্যন্ত দুর্বল। কেননা আরবী ভাষাভাষীদের নিকট অতিরিক্ত واز ব্যবহৃত হওয়ার কোন রীতি নেই। অলংকার সমৃদ্ধ ভাষার জন্য উপযোগীও নয় যে, তাতে এমন কোন অক্ষর অতিরিক্ত হিসাবে ব্যবহৃত হবে; যার কোনো অর্থ নেই বা অন্য কোনো উপকারিতাও নেই।

তৃতীয় একদল আলিম বলেন, إذا এর জবাবে আগত বাক্যটি উহ্য রয়েছে। আর وَفُتَحَتْ أبوابها এর عطف হল جاؤها এর উপর। এটি হল, আবূ উবাইদ, মুবাররাদ, যুজায ও অন্যদের মত। মুবাররাদ বলেন, আহলে ইল্ম তথা উলামায়ে কিরাম شرط এর জবাব উহ্য থাকাকেই ভাষার উচ্চাঙ্গতা বিবেচনা করেন।

প্রখ্যাত নাহুবিদ আবুল ফাতাহ ইবনে জুনী রহ. বলেন, আমাদের আসহাব واز কে অতিরিক্ত হিসাবে গণ্য করেন না। এবং তা বৈধও মনে করেন না। তিনি বলেন, যেহেতু شرط এর জবাব জানা রয়েছে, তাই তা বিলুপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি বিবেচ্য যে, জান্নাতবাসীদের বর্ণনা প্রদানকারী আয়াতে شرط এর জবাবকে বিলুপ্ত করা ও জাহান্নামবাসীদের বর্ণনা প্রদানকারী আয়াতের মধ্যে شرط এর জবাবকে উল্লেখ করার মধ্যে কি রহস্য রয়েছে?

তার জবাবে বলা যায়, উভয় স্থানের ভাষা-ই চূড়ান্ত পর্যায়ের অলংকারসমৃদ্ধ। সুতরাং জাহান্নামবাসীদেরকে যখন ফিরিশতাগণ হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে থাকবেন, তখন জাহান্নামের প্রবেশ দ্বার রুদ্ধ থাকবে, কিন্তু যখন তারা তার নিকটে পৌঁছে যাবে, তখন তাদের সামনেই তার দরযা খুলে যাবে, এবং অকস্মাৎ তারা আযাবে নিপতিত হবে।

সুতরাং তারা তার নিকট পৌঁছা মাত্র-ই অনতিবিলম্বে জাহান্নামের দরযা খুলে দেয়া হবে। উক্ত অবস্থা সে شرط এর উহ্য জবাব দ্বারাই বুঝা যায়। অর্থাৎ তা শর্ত পাওয়া যাওয়ার সাথে সাথেই ঘটবে। কেননা জাহান্নাম হলো, অপমান ও লাঞ্ছনার স্থল। ফলে কেউ-ই জাহান্নামে প্রবেশের অনুমতি চাইবে না এবং জাহান্নামের দারোয়ানের নিকটও কেউ তা দাবী করবে না। (অর্থাৎ, তার অর্থ এটা-ই নির্ণীত হল, জাহান্নামবাসীরা তার দরযায় পৌঁছা মাত্র-ই দরযা খুলে যাবে।)

আর জান্নাত হল, আল্লাহ তা'আলার দয়া, অনুগ্রহ ও সম্মানের স্থান। আল্লাহ তা'আলার বিশিষ্ট বান্দা এবং ওলীগণের স্থান। সুতরাং যখন জান্নাতবাসীগণ তার নিকটবর্তী হবে, তখন তার প্রবেশ দ্বার রুদ্ধ থাকবে। ফলে তারা জান্নাতের প্রহরীর নিকট তার দ্বার উন্মুক্ত করার আবেদন করবে। আল্লাহ তা'আলার নির্ভরযোগ্য বান্দা ও রাসূলগণের নিকট সেজন্য সুপারিশ প্রার্থনা করবে, আপনারা জান্নাতের দরযা খোলার জন্য আল্লাহ তা'আলার সমীপে সুপারিশ করুন। কিন্তু নবীগণ প্রত্যেকেই সুপারিশের বিষয়টি অন্যের দায়িত্বে সমর্পণ করবেন। আমি নয়, অমুকের নিকট সুপারিশের নিবেদন কর। এমনিভাবে শেষ নবী, নবীকুলের সর্দার ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে বলা হবে, এ কাজ একমাত্র তাঁর পক্ষে-ই সম্ভব। যখন সকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাবে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, এ কাজ একমাত্র আমার-ই। তখন তিনি আরশের নিচে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন। যতক্ষণ ইচ্ছা আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাথা উঠানোর অনুমতি দিবেন। তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাতের দরযা খোলার সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করবেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতি লক্ষ্য রেখে জান্নাতের দরযাসমূহ খুলে দিবেন। এই হল রাজাধিরাজ, অধিপতির অধিপতি মহান প্রভুর সম্মানিত স্থানের তুলনা।

মূলকথা হল, বান্দা এ কঠিন প্রেক্ষিত অতিক্রম করার পর তাতে প্রবেশ করবে। যার সূচনা হবে বান্দার সে বিষয়ে অবগতির মাধ্যমে। এমনিভাবে বান্দা ক্রমান্বয়ে সে সকল স্তর অতিক্রম করার পর জান্নাতের নিকটবর্তী হতে পারবে। অনেক কষ্ট স্বীকার করার পর আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী ও সর্বাধিক প্রিয়তম মাখলুক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সে জান্নাতবাসীদের জন্য তার দরযা খোলার জন্য সুপারিশের অনুমতি দিবেন। এটাই হল নি'আমতকে পূর্ণাঙ্গ করার এবং চূড়ান্ত আনন্দ ও খুশি লাভের একান্ত ও সর্বোত্তম মাধ্যম। যাতে কোন অজ্ঞ, মূর্খ ব্যক্তি এ ধারণা না করে, জান্নাত একটি তো একটি হাবেলীর ন্যায় মাত্র। যার ইচ্ছা হয় প্রবেশ করবে।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জান্নাত অত্যন্ত উচ্চতর ও মূল্যবান। বান্দা ও জান্নাতের মাঝে বড় বড় ঘাঁটি ও শংকাময় স্তর রয়েছে। যা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার তাওফীকেই অতিক্রম করা সম্ভব। এটা সে ব্যক্তির জন্য নয়, যে একদিকে স্বীয় প্রবৃত্তির গোলামী করে তার-ই অনুসরণ করে। আর অন্যদিকে আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত পেতে আশাবাদী হয়ে থাকে। বরং উঁচু মর্যাদা অর্জন করার জন্য ব্যক্তির উচিত এসব বর্জন করে এ পথের জন্য সর্বোপযোগী পন্থা অবলম্বন করা। যে ব্যক্তি এ পন্থা অবলম্বন করবে, তার জন্য-ই জান্নাতের সকল কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। সে দু'দলকে (জান্নাতী ও জাহান্নামী) তাদের গন্ত ব্যস্থলের দুই দরযার দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করুন।

এই দলের অন্তর্ভুক্ত (জান্নাতী) লোকেরা আপন ভাইদের মাঝে থাকার ফলে আনন্দিত থাকবে। প্রত্যেক দল পৃথক পৃথক থাকবে। প্রত্যেক সমআমলের লোকগণ পরস্পর সাথী হবে। তারা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রসন্ন থাকবে দৃঢ়চেতা হয়ে। যেমনিভাবে তারা দুনিয়াতে নেক আমল করার সময় অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ছিল, তেমনিভাবে তারা সেখানেও পরস্পর অন্তরঙ্গ ও প্রফুল্ল থাকবে।

তেমনিভাবে অন্য দরযা অভিমুখীদেরকে (জাহান্নামী) দলে দলে সে দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে। তারা একে অপরকে অভিশাপ দিতে থাকবে ও একে অন্যের দ্বারা কষ্ট ভোগ করবে। এটা হল, অপমান ও লাঞ্ছনার চরম পর্যায়ে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা উভয় দ্বার অভিমুখীদের আলোচনা করতে গিয়ে যে زمرا শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তাকে অনর্থক মনে করো না। জান্নাতের প্রহরী জান্নাতের অধিবাসীদেরকে السَّلَامُ عَلَيْكُمْ বলে অভিভাদন করবে এবং সালাম দ্বারা-ই আলোচনা শুরু করবে। যা সকল প্রকার অনিষ্টতা ও বিপদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দানকারী। অর্থাৎ তোমরা নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস কর। আজকের পর তোমাদের কোনো প্রকার কষ্ট ও পেরেশানীর মুখোমুখি হতে হবে না। যা তোমরা পসন্দ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা পবিত্র নিষ্পাপ। তোমরা সর্বদার জন্য জান্নাতে প্রবেশ কর। অর্থাৎ তোমাদের নিরাপত্তা, শান্তি ও জান্নাতে প্রবেশ করা তোমরা নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়ার কারণেই।

আল্লাহ তা'আলা নিষ্পাপ ও পবিত্র লোকগণ ব্যতীত অন্যদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। জান্নাতের প্রহরী জান্নাতবাসীদেরকে শান্তি, নিরাপত্তা, পবিত্রতা, নিষ্পাপতার কারণে জান্নাতে প্রবেশ ও তাতে চিরস্থায়ী হওয়ার সু-সংবাদ দিবে।

আর জাহান্নামবাসীরা যখন দুঃখ-পেরেশানী ও কষ্টকর অবস্থায় জাহান্নাম পর্যন্ত পৌছবে, তখন জাহান্নামের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু তারা দরযায় দাঁড়িয়ে থাকবে, আর জাহান্নামের প্রহরী তাদের অত্যন্ত কঠোরভাবে ধমক দিতে থাকবে। এ বলে তাদেরকে লজ্জা দিতে থাকবে, أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ ‘তোমাদের মাঝে কি তোমাদের মধ্য হতেই আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত রাসূলগণের আগমন ঘটেনি? যাঁরা প্রভুর আয়াত পাঠ করে তোমাদেরকে শুনাত এবং তোমাদেরকে এ দিনের আগমন সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করত'। তখন তারা স্বীকৃতি জানাবে এবং বলবে, হ্যাঁ, আমাদের নিকট রাসূলগণের আগমন ঘটেছিল। অতঃপর প্রহরী তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করার ও তাতে চিরস্থায়ীভাবে থাকার সংবাদ শুনাবে। জাহান্নাম তাদের জন্য নিতান্তই নিকৃষ্ট স্থান হবে। ভেবে দেখুন, জান্নাতের প্রহরী জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবে, أدخلوها জান্নাতে প্রবেশ করুন। আর জাহান্নামের প্রহরী জাহান্নামীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, أدخلوا أبواب جهنم জাহান্নামের দরযা দিয়ে প্রবেশ কর। তাদের কথোপকথনের প্রতি লক্ষ্য করলে এক সূক্ষ্মতর রহস্য এবং গূঢ়তত্ত্ব পাওয়া যাবে। তা হল, জাহান্নাম শান্তির স্থান। তার দরযা অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং জাহান্নামের আগুনের সবচেয়ে বেশি তাপ হবে দরযায়। তাতে প্রবেশকারীদের যে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, তন্মধ্যে এ দরযা দিয়ে প্রবেশ করা-ই হবে সর্বাপেক্ষা বড় চিন্তা ও দুঃখের কারণ।

উক্ত দরযা দিয়ে প্রবেশের মাধ্যমে তার দুঃখ-দুর্দশা, পেরেশানী ও লাঞ্ছনা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। সুতরাং তাদেরকে বলা হবে, এর দরযা দিয়ে প্রবেশ কর। এটা তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্য-ই বলা হবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা শুধু এ দরযা দিয়ে প্রবেশের অপমান ও লাঞ্ছনাকে-ই যথেষ্ট মনে করো না; বরং তোমরা উক্ত জাহান্নামে চিরদিনের জন্য স্থায়ী হবে।

পক্ষান্তরে জান্নাত তো সম্মান ও শান্তির নীড়। আল্লাহ তা'আলা তা একমাত্র তাঁর বন্ধুদের জন্য-ই তৈরী করেছেন। জান্নাতীগণকে প্রথমেই তাদের অবস্থানস্থল ও তাদের ভবনে প্রবেশের এবং স্থায়ী বসবাসের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার ইরশাদের প্রতি লক্ষ্য করুন, جَنَّاتِ عَدْنٍ مُّفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب তাদের জন্য স্থায়ী জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সেখানে তারা প্রবেশ করে আরাম দায়ক শয্যায় হেলান দিয়ে বসে থাকবে। তাদেরকে বৈচিত্রময় ফল ও পানীয়ের আপ্যায়নের দিকে আহবান করা হবে।

উক্ত আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করলে এখানেও তাৎপর্যপূর্ণ রহস্য উদঘাটিত হবে। তা হল, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশের পর তার দ্বার রুদ্ধ করা হবে না; বরং তার দ্বার থাকবে উন্মুক্ত। আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর তার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, عَلَيْهِم مُؤْصَدَةً অবশ্যই তাদের জন্য জাহান্নামের দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হবে।

অর্থাৎ, তা স্তর স্তর করে বন্ধ করে দেয়া হবে। এ জন্য দরযাকে وصيد বলা হয়। অর্থাৎ এমন খুঁটি তৈরী করা হবে, যা দরযার বাইরে স্থাপন করা হবে। তাকে মযবৃতভাবে বন্ধ করার জন্য। যেমনিভাবে বৃহদাকারের পাথর দরযার বাইরে রেখে তা বন্ধ করা হয়ে থাকে।

মুকাতিল রহ. বলেন, জাহান্নামীদের জন্য তার দ্বার রুদ্ধ করা হবে, তা কখনো খোলা হবে না। ফলে তা থেকে কেউ বের হতেও পারবে না। আর কেউ প্রবেশও করতে পারবে না। এমনিভাবে জান্নাতীদের জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত রাখার দ্বারা এ কথা-ই নির্দেশ করে, তারা সেখানে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে আসা-যাওয়া করবে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে-ই নিবাস বানাতে পারবে। প্রভু কর্তৃক উপহার প্রদান ও দয়া-অনুগ্রহে ফিরিশতা সর্বদা তাঁদের নিকট আসা-যাওয়া করবে। তাদের প্রতিনিয়ত প্রবেশ সে জান্নাতবাসীদের জন্য আনন্দের কারণ হবে। এমনিভাবে এটা (জান্নাতের দরযা সর্বদা উন্মুক্ত রাখা) এ কথাও নির্দেশ করে, তা নিরাপদ স্থান।

সুতরাং দরযা বন্ধ করার প্রয়োজন পড়বে না। যেমনিভাবে দুনিয়াতে নিরাপত্তার জন্য তারা ঘরের দরযা বন্ধ রাখত।১০৬

الأبواب এর ال সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি
ا صفت 27 مفتحة الأبواب موصوف 27 جنات عدن হল সে হিসাবে صفت এর মধ্যে এমন একটি ضمیر বা সর্বনাম হওয়া জরুরী, যা موصوف এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। সে ضمیر বা সর্বনাম সম্পর্কে আরবী ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনকারী উলামা কিরামের মতভেদ রয়েছে। কুফাবাসী নাহবীগণ বলেন, মূল ইবারত ছিল, الضمير | مُفَتَحَةً لَّهُمُ أبواها সর্বনামকে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে শুরুতে আলিফ লাম আনা হয়েছে। مضاف إليه ثم ها - ضمير ছিল।) আরবী ভাষাবিদগণ এরূপ করে থাকেন, مضاف إليه কে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে مضاف এর উপর আলিফ-লাম ব্যবহার করেন। যেমন আহলে আরবগণ বলেন, ا مررت برجل حسن العين এটা মূলতঃ ছিল عينه। এর আরেকটি উদাহরণ হল, আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى, মূলত: مأواه | النارى 97 الضمير কে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে ماوی শব্দের শুরুতে আলিফ-লাম যোগ করা হয়েছে।

বসরাবাসী ভাষাবিশারদ বলেন, এটা ছিল مُفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب منها ها যমীর তথা সর্বনামকে حرف جار - من সহ বিলুপ্ত করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, আরবী ভাষায় যমীর বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে আলিফ-লাম ব্যবহার করা থেকে এ জাতীয় ইবারত উহ্য নির্ধারণ করা অতি উত্তম। কারণ আলিফ- লাম যে অর্থ প্রদান করে, তার সাথে "। এর অর্থের সামঞ্জস্য নেই। কেননা হল, ইস্ম তথা বিশেষ্য (যেহেতু যমীর) আর আলিফ-লাম (এটা অব্যয়) বিশেষ্যকে নির্দিষ্ট করার জন্যে তার শুরুতে প্রবিষ্ট হয়। আর অব্যয় কখনো বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় না এবং তার স্থলাভিষিক্তও হয় না।

বসরাবাসীগণ আরো বলেন, কুফীগণ বলেন, আলিফ-লাম যমীরের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। যদি তা-ই হতো, তবে অবশ্যই جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী যমীর مفتحة এর সাথে যুক্ত থাকত। তখন অর্থ হতো, مفتحة هي । (সে উদ্যান উন্মুক্ত) এবং তার بدل আনা হতো الأبواب দ্বারা। যদি এমন হতো তবে الأبواب এর মধ্যে অবশ্যই نصب হতো।

কেননা مفتحة শব্দটি তার فعل বা কর্তাকে رفع প্রদান করেছে। আর এটা জায়েয নেই, তা অন্য কোন ইসস্ম তথা বিশেষ্য কে رفع প্রদান করবে। কারণ একই فعل বা ক্রিয়ার দু'ইসস্মকে رفع প্রদান করা নিষিদ্ধ। সুতরাং যেহেতু مفتحة শব্দটি الأبواب শব্দটিকে رفع প্রদান করেছে, তাহলে বুঝা যায় مفتحة শব্দটি ضمير হতে মুক্ত। الأبواب শব্দটি مفتحة এর কারণেই رفع যুক্ত হয়েছে। صفت এর মধ্যে যদি এক ইস্ম এর সাথে ضمیر নির্ধারিত থাকে, তবে সে ইসস্ম رفع বিশিষ্ট হবে। এবং অপর ইসস্ম نصب যুক্ত হবে। যেমন: আরবগণ বলে থাকেন, مررت برجل حسن الوجه )মূলতঃ ছিল حسن وجهه (। এখানে الوجه কে رفع যুক্ত করে আর حسن কে তানবীন দ্বারা نصب পড়া জায়েয নেই।

(তেমনিভাবে এখানেও مفتحة শব্দটি তানবীন দ্বারা যবরযুক্ত আর الأبواب শব্দটি হল পেশযুক্ত। সুতরাং তা উল্লিখিত নিয়ম মুতাবিক নয়। কিন্তু যদি তার মূল مُفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب منها ধার্য করা হয়, তবে কোন প্রশ্ন-ই থাকে না।)

আলিফ-লাম যেহেতু নির্দিষ্টকরণের জন্য এবং তা صفت এর উপর প্রবিষ্ট হয়েছে। সুতরাং এখানে অবশ্যই একটি ضمیر হওয়া জরুরী যা موصوف এর দিকে ফিরবে। جنات عدن موصوف। আর যমীর শব্দের মাঝে বিদ্যমান নেই। তাহলে অবশ্যই তা উহ্য থাকবে এবং মূল বাক্য হবে الأبواب منها।

আমার (আল্লামা ইবনুল কায়্যিম) মতে, এর দ্বারা কুফাবাসীদের মত বাতিল হবে বলে গণ্য হয় না। কেননা, তারা তো শুধু বলেন, ضمير এর পরিবর্তে আলিফ-লাম ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং তাদের উদ্দেশ্য শুধু এতটুকু, আলিফ-লাম ব্যবহারের কারণে ضمير ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। সকল আরব-ই حسن وجهه ও حسن الوجه এরূপ ব্যবহারকে সঠিক বলে গণ্য করেন, যা কুফাবাসীদের মতকে সমর্থন করে। আরবগণ বলে থাকেন, তানবীন আলিফ-লাম এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হল, উভয়টা একত্রিত হয় না। এমনিভাবে مضاف إليه তানবীনের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় এবং তানবীন إضافت এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এ দু'টি একত্রে ব্যবহৃত হয় না। বরং ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহৃত হয়। তাদের উদ্দেশ্য এই নয়, بدل যে অর্থ مبدل منه এরও হুবহু সে অর্থ হবে। বরং কখনো কখনো উভয়টা এমন অর্থ প্রদান করে, একটির অর্থ অন্যটির মধ্যে আদৌ পাওয়া যায় না। কুফাবাসীদেরও তো এ-ই উদ্দেশ্য, الأبواب এর মধ্যে আলিফ-লাম আসার কারণে যমীরের প্রয়োজন নেই।১০৭

যদি أبواب বলা হয়, তবু তা সঠিক হবে। কারণ উদ্দেশ্য হল, صفت ও موصوف এর মাঝে এমন কোন বিষয় দ্বারা সম্পর্ক স্থাপন করা যা স্বতন্ত্র কোন বিষয় নয়। সুতরাং যমীর যখন موصوف এর দিকে ফিরবে, তখন তা স্বতন্ত্র হওয়ারও আর অবকাশ থাকে না। তেমনিভাবে নির্দিষ্টকরণের লাম। কেননা যমীর ও লাম উভয়টা স্ব-স্ব متعلق তথা সম্পর্কিত বস্তুকে নির্দিষ্ট করে। যমীর مُفسر কে নির্দিষ্ট করে আর আলিফ-লাম যে ইস্স তথা বিশেষের উপর প্রবেশ করে, তাকে নির্দিষ্ট করে। ভাষাবিদগণও বলেন, زيد نِعْمَ الرَّجُل জাতীয় বাক্যের মধ্যে আলিফ-লামটি যমীরের ব্যবহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে। সুতরাং যমীর ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।

আল্লামা যামাখশরী রহ. উক্ত আয়াতের এমন তারকীব করেছেন, যা প্রশ্ন সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, جنات عدن নাকিরা বা অনির্দিষ্ট শব্দ নয়; বরং মা'রিফা বা নির্দিষ্ট শব্দ। যেমনিভাবে আল্লাহ তা'লার বাণী, جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ عباده بالغيب এর মধ্যে মা'রিফা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর جنات শব্দটি যবরযুক্ত। কেননা এটা لحسن مأب এর উপর عطف হয়েছে।

আর مفتحة হল, ১। তার আমেল তা-ই যা للمتقين। এর মধ্যে আমল করেছে। অর্থাৎ معنی فعل বা ক্রিয়ার অর্থ। مفتحة এর মধ্যে একটি যমীর আছে, যা جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। আর الأبواب হল, উক্ত যমীর থেকে بدل।

সুতরাং মূল ইবারত হল مفتحة هي الأبواب এবং তেমনি যেমনিভাবে 2) الرجلاليد زيدضرب زيد اليد والرجل بدلالة آبرদের উক্তি 4 बदल الإشتمال হয়েছে। তেমনিভাবে الأبواب শব্দটিও هي যমীর থেকে بدل | الاشتمال হয়েছে।

আল্লামা যমখশরীর তারকীবের কয়েকটি অংশের উপর প্রশ্ন আরোপিত হয়। তা হল, جنات শব্দটিকে কিভাবে মা'রেফা তথা নির্দিষ্ট বানানো হল। অথচ তাতে মা'রেফা বা নির্দিষ্ট করণের কোন কারণ পাওয়া যায় না। যদি বলা হয় যে, جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ এর মধ্যে الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ মা'রিফা, এবং তা جنات عدن -এর صفت। সুতরাং বুঝা গেল جنات عدن মা'রিফা বা নির্দিষ্ট।

এর জবাব আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযী রহ. এভাবে প্রদান করেছেন, صفت بدل, جنات عدن التي وعد الرحمن হতে নয়। এটাও লক্ষ্য রাখা চাই, الحسن ماب جنات عدن থেকে عطف بيان বলাও সহজ ব্যাপার নয়।

যেমনটি আল্লামা যামাখশরীর মত। কেননা মা'রিফা ও নাকিরা দু'টি ইস্ম তথা বিশেষ্যের মধ্যে একটিকে অপরটির থেকে عطف بيان বলার পক্ষে কেউ-ই মত পোষণ করেননি। কারণ এ ব্যাপারে দু'টি মত পাওয়া যায়। একটি হল, একমাত্র মা'রিফার عطف بان মা'রিফা-ই হয়। যা বসরাবাসী নাহুবিদদের মত। অপর মতটি হল, মা'রেফার عطف بيان মা'রিফা হয়। আর নাকিরার عطف بيان নাকিরা হয়। যা কুফাবাসী নাহুবিদগণ সহ আবূ আলী আল-ফারেসীর মত।

আর আল্লামা যামাখশরী যে বলেন, مفتحة এর মধ্যে এমন একটি যমীর আছে, যা جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটাও সঠিক নয়। কেননা, বাক্যের বাহ্যরূপ তার পরিপন্থী। কেননা, তার-ই কারণে الأبواب শব্দটি পেশযুক্ত হয়েছে। আর তার মধ্যে যমীরও নেই।

এছাড়া তিনি যে বলেছেন, الأبواب শব্দটি بدل الإشتمال হয়েছে। অথচ, بدل الإشتمال এর ব্যাপারে স্বয়ং যামাখশরীও অন্যদের মত এ মত পোষন করেন, তাতে একটি যমীর থাকা আবশ্যক। যদিও কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষন করেছেন।

যমীর হওয়া যেহেতু জরুরী, সুতরাং যমীর শব্দে উল্লেখও থাকতে পারে, উল্লেখ না থেকে উহ্যও থাকতে পারে। এখানে শব্দে উল্লেখ নেই। তাহলে অবশ্যই তাকে উহ্য মানতে হবে। সে অবস্থায় মূল ইবারত হবে, الأبواب منها। সুতরাং মূল ইবারত হয়, مفتحة لهم هي الأبواب منها. এ অবস্থায় যমীর অধিক হয়ে যায়। অথচ যমীর কম ব্যবহার করা-ই হল উত্তম। (অতএব, তার মূল مفتحة لهم الأبواب منها মানা-ই উত্তম।(

সহীহায়নে১০৮ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فى الجنة ثمانية أبواب، باب منها يسمى الريان لا يدخله إلا الصائمون জান্নাতে আটটি দরযা আছে। তন্মধ্যে একটির নাম রাইয়‍্যান। যা দ্বারা একমাত্র রোযাদাররা-ই প্রবেশ করবে।

সহীহায়নে১০৯ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من انفق زوجين في شيئ من الأشياء في سبيل الله ، دعي من أبواب الجنة، يا عبد الله هذا خير، فمن كان من أهل الصلوة دعي من باب الصلوة। যে ব্যক্তি যে কোন বস্তুর এক জোড়া আল্লাহ তা'আলার রাহে খরচ করবে, তাকে জান্নাতের দরযা হতে ডেকে বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। যে ব্যক্তি নামাযওয়ালা হবে (অধিক নামায আদায়কারী) ومن كان من أهل الجهاد دعي من باب الجهاد، ومن كان من أهل الصدقة دعي من باب الصدقة، ومن كان من أهل الصيام دعي من باب الريان তাকে বাবুস সালাত হতে আহ্বান করা হবে। আর যে জিহাদকারী হবে, তাকে বাবুল জিহাদ হতে আহ্বান করা হবে। আর যে অধিক সদকাকারী হবে, তকে বাবুস সাদাকাত থেকে আহ্বান করা হবে। আর যে অধিক রোযা পালনকারী হবে, তাকে বাবুর রাইয়্যান হতে আহ্বান করা হবে।

হযরত আবূ বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! ما على من دعى من تلك الأبواب من ضرورة فهل يدعى ! যে ব্যক্তিকে অবশ্যকীয়ভাবে সকল দরজা হতে আহবান করা হয়, তার কী হবে? এমন কেউ কি আছে যাকে সকল দুয়ার হতে একযোগে আহবান করা হবে? فقال نعم! وأرجوا أن تكون منهم রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আমি আশাবাদী যে, তুমি তাদের মধ্য হতে একজন হবে।

সহীহ মুসলিমে১১০ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ما منكم من أحد يتوضأ، فيبالغ في الوضوء، ثم يقول : أشهد أن لا إليه إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمد عبده ورسوله، إلا فتحت له أبواب الجنة الثمانية، يدخل من أيها شاء. তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অতি উত্তম রূপে ওযু করে ও ওযুর পর এ দু'আ পড়ে,

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لاشريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোনো মা'বুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। তার জন্য জান্নাতের আট দরযার সব কয়টি খুলে দেয়া হবে। সে যে দরযা' দিয়ে ইচ্ছা তা দিয়ে-ই প্রবেশ করতে পারবে।

ইমাম তিরমিযী এ শব্দাবলীও বৃদ্ধি করেছেন, اللهم اجعلني من التوابين، واجعلني من المتطهرين হে আল্লাহ আমাকে তাওবাকারীদের মধ্যে ও অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।

ইমাম আবূ দাউদ১১ ও ইমাম আহমদ১১২ বলেন, উক্ত দু'আ পড়ার পর আকাশের দিকে তাকাবে।

ইমাম আহমাদ রহ. হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গরূপে ওযু করে তিন বার এ দু'আ পড়বে,

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمد عبده ورسوله তার জন্য জান্নাতের আট দরযার সব কয়টি খুলে দেয়া হবে। যে দরযা দিয়ে ইচ্ছা সে দরযা দিয়েই সে প্রবেশ করতে পারবে।

হযরত উতবাহ ইবনে আবদুল্লাহ আস সালামী রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ما من مسلم يموت له ثلاثة من الولد لم يبلغوا الحنث، إلا تلقوه من أبواب الجنة الثمانية، من أيها شاء دخل.
কোন মুসলমানের তিনটি শিশু সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে (এবং সে এতে ধৈর্য ধারণ করেছে, কোন প্রকার অভিযোগ করেনি) সে সন্তান তার সাথে জান্নাতের আট দরযার যে কোন এক দরযায় সাক্ষাৎ করতে পারবে। সে এ আট ফটক বা দরযার যে কোনটি দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। উক্ত বর্ণনাটি ইবনে মাজার ১১৫ পৃ. সনদসহ বর্ণিত আছে।

টিকাঃ
১০৪. সূরা যুমার, আয়াত: ৭৩
১০৫. প্রাগুক্ত, আয়াত: ৭১
১০৬. প্রাজ্ঞ লেখক এখান থেকে الابواب শব্দের আলিফ লাম সম্পর্কে আরবী ভাষাবিদদের উক্তি উদ্ধৃত করছেন। সম্পূর্ণ ইলমী আলোচনা করেছেন। আহলে ইল্ম তথা আলিম সমাজের জন্য তা নিতান্তই জ্ঞানগর্ভ ইল্মী আলোচনা।
১০৭. সুতরাং তাদের প্রতি এ প্রশ্ন ছোঁড়া যায় না যে, আলিফ-লামের অর্থ এবং যমীরের অর্থ ভিন্ন। ফলে তা এর بدل বা স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আর এ প্রশ্নের কোন ভিত্তি নেই। কাজেই এর দ্বারা কুফাবাসীদের মতবাদও বাতিল হয় না।
১০৮. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৬১, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৩৬৪
১০৯. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৫১৭, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৩৩০
১১০. খ. ১, পৃ. ১২২
১১১. সুনানে আবী দাউদ, খ. ১, পৃ. ২৬
১১২. মুসনাদে আহমাদ, খ. ১, পৃ. ১৮৫
১১৫. ইবনে মাজার পৃ. ১১৫

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের ফটকের বিশালতা

📄 জান্নাতের ফটকের বিশালতা


হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে।১১৩ তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এক পেয়ালা সরীদ (ঝোলে ভিজানো রুটির টুকরা) রাখলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরীর একটি বাহু নিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরীর এ অংশটা বেশি পসন্দ করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দাঁত দ্বারা চিবিয়ে খেলেন। আর বললেন, اناسید الناس يوم القيامة আমি কিয়ামতের দিন সকল লোকের সরদার। অতঃপর অন্য বাহুটি চিবিয়ে খেলেন এবং আবারও বললেন, আমি কিয়ামতের দিন সকল লোকের সরদার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, সাহাবায় কিরাম রা. তাঁর কাছে এ বিষয়ে বিশদবিবরণ জিজ্ঞাসা করছোনা, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কেন জিজ্ঞাসা করলে না এটা কিভাবে হবে? তখন সাহাবাগণ রা. বললেন, কিভাবে হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, يقوم الناس لرب العالمين .فيسمعهم الداعي، وينفذ هم البصر লোক সকল আল্লাহ তা'আলার দরবারে দাঁড়িয়ে থাকবে। তখন একজন আহ্বানকারী উঁচু আওয়াযে তাদেরকে আহ্বান করতে থাকবে, যা সকলে শুনবে ও দেখবে। অতঃপর শাফা'আত সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদীসটি ইরশাদ করেন। তার শেষাংশে রয়েছে, فانطلق، فأتى تحت العرش অতঃপর আমি হেঁটে আরশের নিচে আসব। ،فاقع ساجدا لربي এবং আমি আমার প্রতিপালকের সামনে লুটে পড়ব। فيقيمني رب العالمين مقاما لم يقمه أحد قبلي، ولن يقيمه أحد بعدي অতঃপর রাব্বুল আলামীন এ অবস্থা থেকে উঠাবেন এবং এমন স্থানে আমাকে অবস্থান করাবেন, যেখানে আমার পূর্বে কেউ অবস্থান করেনি আর আমার পরেও কেউ অবস্থান করবে না।

فأقول : يارب أمتي أمتي তখন আমি বলব, হে প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন: يا محمد ادخل من أمتك من لا حساب عليهم من الباب الأيمن، وهم شركاء الناس فيما سوى ذالك من الأواب، والذي نفس محمد بيده إن ما بين المصراعين من مصاريع الجنة لكما بين مكة وهجر، أو هجر ومكة .

হে মুহাম্মদ! আপনার উম্মতের মধ্য হতে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ নেই, তাদেরকে বাবুল আয়মান দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করান এবং এরা অন্যান্য লোকদের সাথে অন্যান্য দরযা দিয়েও প্রবেশ করতে পারে।

শপথ সে সত্তার! যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন। জান্নাতের দু' দরযার মাঝে দূরত্ব এ পরিমাণ, যে পরিমাণ দূরত্ব মক্কা ও হাজারের মধ্যে। অথবা বলেছেন, হাজার ও মক্কার মধ্যে যে পরিমাণ দূরত্ব।

অন্য এক বর্ণনায় আছে كما بين مكة وبصرى বসরা ও মক্কার মধ্যবর্তী দূরত্ব।১১৪ এ বর্ণনা সহীহ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীন একমত। সনদের ভিত্তিতে সহীহ বহির্ভূত বর্ণনায় হাদীসের শব্দ এমন ان ما بين عضادتي الباب لكما بين مكة وهجر মক্কা ও হাজারের মাঝে যে পরিমাণ দূরত্ব, জান্নাতের দরযার কপাটের মাঝে সে পরিমাণ দূরত্ব।

খালিদ ইবনে উমায়র রা. হতে বর্ণিত আছে যে,১১৫ হযরত উতবা ইবনে গাযওয়ান রা. আমাদের সামনে খুতবা দিলেন। প্রথমে আল্লাহ তা'আলার হামদ ও সানা তথা গুণগান ও প্রশংসা করার পর বললেন,
فإن الدنيا قد أذنت بصرم، وولت حذاء ولم يبق منها إلا صبابة كصبابة الاناء، يصبها صاحبها، وانكم منقلبون منها إلى دار لازوال لها، فانقلبوا بخير ما بحضرتكم.

অবশ্যই এ ধরা বিরহের বাণী গেয়ে যাচ্ছে। দ্রুত তার সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে। পৃথিবীর শুধু মাত্র এ পরিমাণ সময় রয়েছে, যে পরিমাণ পানি অবশিষ্ট থাকে কোনো পাত্রের পানি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর। দুনিয়াবাসী তা থেকে পান করে যাচ্ছে। অতঃপর তোমরা এমন আবাসস্থলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে, যা কখনো ধ্বংস হবে না। সুতরাং তোমাদের নিকট যা রয়েছে, তা ছেড়ে তারও চেয়ে উত্তম অবস্থার সে দিকে প্রত্যাবর্তন কর। তিনি আমাদের সামনে জান্নাতের দরযার বিশালতার বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ان مصرعين من مصاريع الجنة بينهما مسيرة أربعين سنة জান্নাতের দরযার এক কপাট থেকে অন্য কপাটের দূরত্ব চল্লিশ বছরের দূরত্ব পরিমাণ। দ্রুতগতিসম্পন্ন কোন অশ্ব চল্লিশ বৎসর দৌড়ালে যতটুকু পৌঁছতে পারে, জান্নাতের এক দরযা থেকে অন্য দরযার দূরত্ব ততটুকু। وليأتين عليه يوم وهو كظيظ من الزحام একদিন এমনও আসবে, যে দিন তা ভীড়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে।

এ রিওয়ায়েত মাওকূফ আর পূর্বোল্লিখিত রেওয়ায়েত হল, মারফু'। সুতরাং যদি এর বর্ণনাকারীও স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ে থাকেন, তবে হতে পারে, জান্নাতের এমন কোনো দরযা রয়েছে, যা সকল দরযা অপেক্ষা বিশাল (এ অবস্থায় উভয় বর্ণনার মাঝে কোন বিরোধ থাকে না) আর যদি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উল্লেখ না করেন, বরং অন্য কেউ বর্ণনা করেন, তবে তা হযরত আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণিত পূর্বোক্ত হাদীস থেকে অগ্রগণ্য হবে না। কিন্তু ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদে সনদসহ উল্লেখ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের দ্বারা-ই উম্মতের সত্তরতম দলের পূর্ণতা লাভ করবে। আর তোমরা তাদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান ও সম্মানী হবে। জান্নাতের দরযার কপাটের মধ্যে দূরত্ব হবে চল্লিশ বছরের দূরত্ব। অবশ্যই এমন একটা সময় আসবে, যখন তা ভীড়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে।

হাকীম ইবনে মু'আবিয়া রা. তাঁর পিতা মু'আবিয়া রা. হতে মারফু' রূপে বর্ণনা করেছেন, যাতে এ শব্দাবলীও রয়েছে, ما بين مصر أعين من مصاريع الجنة مسيرة سبع سنين জান্নাতের দরযার দু'কপাটের মাঝে সাত বছরের দূরত্ব।

মুসনাদে আবদ ইবনে হুমায়দের মধ্যে সনদসহ বর্ণিত আছে, হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ان ما بين مصراعين في الجنة لمسيرة أربعين سنة ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
জান্নাতের দরযার দু'কপাটের মধ্যে চল্লিশ বছরের দূরত্ব রয়েছে। এ ব্যাপারে আবূ হুরায়রা রা. এর বর্ণনা-ই অধিকতর বিশুদ্ধ। কিন্তু গ্রন্থের এই অনুলিপিটি দুর্বল। والله أعلم

সালিম তাঁর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন যে,১১৬ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে দরযা দিয়ে জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে, তার দু' কপাটের মাঝে দূরত্ব এ পরিমাণ, যে পরিমাণ দূরত্ব কোন দ্রুত অশ্বারোহী তিন দিনে অতিক্রম করতে পারে। ভীড়ের কারণে সংকীর্ণতা অনুভব করবে। ভীড়ের প্রচণ্ডতার কারণে মনে হবে, যেন তাদের স্কন্ধের হাড় আপন স্থান থেকে নড়ে যাচ্ছে।

এ অধ্যায়ে হাকীম ইবনে মু'আবিয়ার বর্ণনায় বর্ণনাকারীগণ ইযতিরাব করেছে। যেখানে হাম্মাদ ইবনে সালামা জারীরী রহ. হতে বর্ণনা করেন, জান্নাতের দরযার উভয় কপাটের মাঝে দূরত্ব হল, চল্লিশ বছরের। সেখানে তাঁর থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে খালিদ রা. সাত বছরের কথা উল্লেখ করেছেন।

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এর মারফু রেওয়ায়েতেও চল্লিশ বছরের দূরত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু উক্ত বর্ণনার সনদের একজন বর্ণনাকারী অনুল্লেখ রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে ইমাম আহমদ রহ. বলেন, এ জাতীয় হাদীস প্রত্যাখ্যাত। ইমাম হাতিম রাযী তাকে দুর্বল গণ্য করেছেন। ইমাম নাসাঈ রহ. ليس بالقوي শক্তিশালী নয় বলে এ ব্যাপারে মত পোষণ করেছেন।

কাজেই হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্নিত হাদীসটি সনদের বিচারে সহীহ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে সূত্র পরম্পরার বিচারে ধারাবাহিক এবং ইযতিরাব ও শায হওয়া ইত্যাদি ত্রুটি হতে মুক্ত। যার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ ঐক্যমত পোষণকরেছেন। তা ছাড়া হযরত হাকীম ইবনে মু'আবিয়া রা. এর বর্ণনার দূরত্বের কথা মারফু' হিসাবে উল্লেখ নেই। বরং তাতে এ সম্ভাবনা রয়েছে, দূরত্বের কথা অন্য কোন বর্ণনাকারীর অন্তর্ভুক্তকৃত। এ অংশ মারফু' বর্ণনার নয়; বরং তা মুদরাজ। সুতরাং এ হাদীসও হযরত উতবাহ ইবনে গাযওয়ানের রা. হাদীসের অনুরূপ।

টিকাঃ
১১৩. বুখারী, খ. ২, পৃ. ৬৮৫
১১৪. মুসনাদে আহমদ, খ. ২, পৃ. ৪৩২, বুখারী, খ. ২, পৃ. ৬৮৫
১১৫. মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৪০৯, মুসনাদে আহমদ, খ. ৪, পৃ. ১৭৪
১১৬. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৮১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 কেমন হবে জান্নাতের ফটক

📄 কেমন হবে জান্নাতের ফটক


ওলীদ ইবনে মুসলিম খালীদের সূত্রে হযরত হাসান বসরী রহ. হতে مُفَتَحَةُ لَهُمُ الأبواب -এর তাফসীরে উল্লেখ করেন, ১১৭ দরযাগুলো এমন হবে যে, ভেতরের দৃশ্য দেখা যাবে।

খলীদ এর সূত্রে হযরত কাতাদাহ রহ. হতে একথাও বর্ণিত রয়েছে, তার দরযা এমন হবে, বাইর থেকে ভিতরে এবং ভিতর থেকে বাইরে পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। তার দরযা কথা বুঝবে এবং কথাও বলবে। সুতরাং যখন তাকে বলা হবে খুলে যাও, তখন খুলে যাবে। আর যখন বলা হবে বন্ধ হয়ে যাও, তখন তা বন্ধ হয়ে যাবে।

আবুশ শায়খ ফাযারী রহ. হতে সনদসহ বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, জান্নাতে প্রত্যেক মু'মিনের জন্য চারটি দরযা বরাদ্ধ থাকবে। এক দরযা দিয়ে ফিরিশতাগণ তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য আসবেন। অন্য এক দরযা দিয়ে তাদের স্ত্রী ও ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূরগণ প্রবেশ করবেন। অন্য একটি রুদ্ধ দ্বার থাকবে, তার ও জাহান্নামের মাঝে। সে যখন ইচ্ছা করবে, তখনি তা খুলে জাহান্নামীদেরকে দেখতে পারবে এবং তখন তার নিজের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নি'আমতরাজির কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে। অন্য একটি দরযা থাকবে, তার ও দারুস সালামের মাঝে। তা দ্বারা সে স্বীয় প্রভুর নিকট যখন ইচ্ছা তখনি যেতে পারবে।

হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أنا أول من يأخذ بحلقة باب الجنة، ولا فخر আমি-ই প্রথম ব্যক্তি, যে সর্বপ্রথম জান্নাতের দরযার শিকল স্পর্শ করবে, এ কোন গর্ব ও অহংকারের বিষয় নয়; বরং একমাত্র আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহ।

ইবনে উয়ায়নাহ শাফা'আতের ব্যাপারে হযরত আনাস রা. হতে দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেন। তাতে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فأخذ بحلقة باب الجنة فاقعقها অতঃপর আমি জান্নাতের দরযার শিকল ধরে নাড়া দেব।

এ সকল বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, জান্নাতের দরযায় সত্যিকার শিকল লাগানো থাকবে, যাকে নাড়া দেয়া যাবে এবং করাঘাত করা যাবে।

সুহাইল রহ. হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أخذ بحلقة باب الجنة فيؤذن لي আমি জান্নাতের দরযার শিকল ধরলে আমাকে তাতে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হবে।

হযরত আলী রা. হতে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি প্রত্যহ একশত বার لا إله إلا الله الملك الحق المبين পড়বে, সে দারিদ্র্য ও কবর জগতের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাবে। প্রাচুর্য তার দিকে দৌড়ে আসবে। আর এর মাধ্যমে জান্নাতের দরযায় করাঘাত করল।

জান্নাতের ফটক একটি অপরটি থেকে উঁচু হবে
যেহেতু জান্নাতের স্তর উঁচু-নিচু রয়েছে। সুতরাং জান্নাতের দরযাও একটি অপেক্ষা অন্যটি উঁচু। উপরের স্তরের জান্নাতের দরযা নিচু স্তরের জান্নাতের দরযা অপেক্ষা উঁচু। জান্নাতের স্তর যত-ই উঁচু হবে, ততই তার দরযা নিচু জান্নাত থেকে প্রশস্ত হতে থাকবে। প্রশস্ততা জান্নাতের প্রশস্ততা অনুপাতেই হবে। ইতোপূর্বে জান্নাতের দরযার উভয় কপাটের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে যে বিভিন্ন উক্তি পরিলক্ষিত হয়েছে, যে কোনো বর্ণনা মতে উভয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব হল তিন দিনের, কোন বর্ণনায় চল্লিশ দিনের হতে পারে। এ মতভেদের কারণ জান্নাতের স্তরের বিভিন্নতাই। সুতরাং উঁচু স্তরের জান্নাতের দরযা নিচু স্তরের জান্নাতের দরযা অপেক্ষা প্রশস্ত হবে।

এ উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ একটি দরযা থাকবে, যা দ্বারা শুধু মাত্র তারা-ই প্রবেশ করবে। যেমন মুসনাদে হযরত উমর রা. এর বর্ণনা যে এ হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, باب أمتي يبخلون পর্যন্ত আমার উম্মতের জন্য যে বিশেষ দরযা من الجنة عرض مسيرة الراكب ثلاثا থাকবে, তার দু' কপাটের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে তিন দিনের দূরত্বের সমান। তারা শিকলের কারণে তাকে সংকীর্ণ মনে করবে। এমনকি ভীড়ের কারণে যেন তাদের স্কন্ধ বের হয়ে যাবে।

মুসনাদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أتاني جبرئيل فأخذ بيدي فأراني باب الجنة الذي تدخل منه أمتي আমার নিকট জিবরীল আ. এলেন এবং আমার হাত ধরে আমাকে জান্নাতের সেই দরযাটি দেখালেন, যা দ্বারা আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইনশা আল্লাহ উক্ত হাদীসের বিস্তারিত আলোচনা সামনে করা হবে।

হযরত আলী রা. হতে বর্ণিত আছে, জান্নাতের দরযা এভাবে একটি অপরটি অপেক্ষা উঁচু-নিচু হবে। অতঃপর এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, حَتَّى إِذَا جَاؤُوهَا وَفُتِحَتْ أبوابها যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে ও তার দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হবে, সে দ্বারসমূহের নিকট এমন একটি গাছ থাকবে, যার শিকড় থেকে দু'টি প্রস্রবণ প্রবাহিত হবে। তখন তারা সে প্রস্রবণদ্বয়ের একটি হতে পানি পান করবে। সে পানি তাদের পেটের মালিন্যকে বিদূরিত করে দিবে এবং অপর প্রস্রবণ থেকে তারা গোসল করবে। তখন তাদেরকে স্বাচ্ছন্দ্যের ও তৃপ্তির সজীবতা আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এরপর আর তাদের মাথার কেশ এলোমেলো হবে না এবং তাদের ত্বক আর বিকৃত হবে না। (যেমনিভাবে পৃথিবীতে ঋতুর পরিবর্তনের ফলে ত্বকের মধ্যে পরিবর্তন সৃষ্টি হয়।)

অতঃপর তিনি (হযরত আলী রা.) আয়াতের এ অংশ পাঠ করলেন, فَادْخُلُوهَا خَالدين ‘তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীতাবে অবস্থিতির জন্য’। অতঃপর জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা আপন অবস্থানস্থলকে চিনবে। ছোট ছোট ছেলেরা তাদের সাথে সাক্ষাত করবে। তারা সে জান্নাতীকে দেখে এমন আনন্দিত ও প্রফুল্ল হবে, যেমনিভাবে কোনো স্বজনের দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতির পর আপন জনের মাঝে ফিরে আসার দ্বারা পরিবারস্থ লোকজন আনন্দিত হয়ে থাকে। অতঃপর সে ছোট ছেলে জান্নাতীদের স্ত্রী অর্থাৎ ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হুরদের নিকট যাবে এবং তাদেরকে সংবাদ দিবে, তাদের স্বামী সেই জান্নাতীর আগমন ঘটেছে। তখন তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবে, বাস্তবেই কি তুমি তাকে দেখেছ? অতঃপর সে জান্নাতী দরযায় দণ্ডায়মান হবে ও আপন নিবাসে প্রবেশ করবে এবং তার আসনের সাথে হেলান দিয়ে বসবে ও আপন নিবাসে খুঁটিগুলোর প্রতি তাকালে দেখতে পাবে, সেগুলো উন্নততর মুক্তামালা দ্বারা নির্মিত এবং সে লাল-সবুজ, হলুদ রং-বেরংয়ের মুক্তা দেখতে পাবে। অতঃপর সে তার ঘরের ছাদের প্রতি তাকাবে। যদি এ ঘর তার জন্য তৈরী করা না হত, তবে তার ঝলক ও উজ্জ্বলতা তার দৃষ্টিশক্তি বিনষ্ট করে দিত। তখন সে বলবে, الحمد لله الذي هدانا সকল প্রশংসা সেই মহান সত্তার জন্য, যিনি আমাকে এ অফুরন্ত নি'আমতরাজি লাভের তাওফীক প্রদান করেছেন। যদি তিনি তাওফীক প্রদান না করতেন, তবে এ পর্যন্ত পৌঁছা ও নি'আমতরাজি লাভ করা সম্ভব হত না।

টিকাঃ
১১৭. তাফসীরুল হাসান বসরী, খ. ৪, পৃ. ৩৯০

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 ফটকে ফটকে ব্যবধান

📄 ফটকে ফটকে ব্যবধান


মু'জামে ত্বাবারানীতে সনদসহ হযরত লাকীত ইবনে আমির রা. হতে বর্ণিত আছে।১১৮ তিনি আপন গোত্রের প্রতিনিধিরূপে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জান্নাত ও দোযখ কি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাকেব
لعمر إلهك إن للنار سبعة أبواب، ما منهن بابان الا يسير الراكب بينهما سبعين عاما، وان للجنة ثمانية أبواب ما منهن بابان الا يسير الراكب بينهما سبعين عاما তোমার প্রভুর শপথ, জাহান্নামের সাতটি দরযা রয়েছে, তার প্রত্যেকটি দরযার মাঝে সত্তর বছরের দূরত্ব। জান্নাতের আটটি দরযা রয়েছে। তার প্রত্যেকটি দরযার মাঝে সত্তর বছরের দূরত্ব। এরপর হাদীসটি বিস্তারিত উল্লেখ করেন।

উক্ত হাদীস দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হয়, উল্লিখিত দূরত্ব হল, এক দরযা হতে অপর দরযার মাঝে। কেননা মক্কা ও বসরার মাঝেও তো সত্তর বছরের দূরত্ব নয়। এবং তা কোন নির্দিষ্ট দরযার ব্যাপারেও প্রযোজ্য নয়। বরং প্রত্যেক দরযার মাঝে এ পরিমাণ দূরত্ব বিরাজমান।

টিকাঃ
১১৮. উক্ত হাদীসটি মুসনাদে আহমদের খ. ৪, পৃ. ১৪ এর মধ্যেও বর্ণিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00