📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের পক্ষে দলীল ও প্রতিপক্ষের জবাব

📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের পক্ষে দলীল ও প্রতিপক্ষের জবাব


প্রথম দলীল ও তার উত্তর
তাদের কথা হল, আপনারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, জান্নাতুল খুলদে প্রবেশের সময় এখনো আসেনি; বরং কিয়ামতের দিন তাতে প্রবেশ করা যাবে। তা হল স্থায়ী প্রবেশের ব্যাপারে। কিন্তু জান্নাতুল খুলদে সাময়িক প্রবেশ কিয়ামতের পূর্বে হতে পারে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ রাতে তাতে প্রবেশ করেছিলেন। সাধারণ মু'মিন ও শহীদদের রূহ আলমে বরযখে থাকা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করে থাকে। এটা সে প্রবেশ নয়, কিয়ামতের দিন যে প্রবেশের কথা আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন।

সুতরাং প্রতীয়মান হল, স্থায়ীভাবে প্রবেশ কিয়ামতের দিনই হবে। কিন্তু আপনারা কোথায় পেলেন, কিয়ামতের দিনের পূর্বে কোনভাবে জান্নাতে প্রবেশ ঘটবে না? এর দ্বারা আপনাদের সে কথার জবাবও মিলে, জান্নাত হল দারুল খুল্‌দ তথা স্থায়ী নিবাস। আপনারা অন্য যে সব বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করেন, যেমন, উলঙ্গ হওয়া, ক্লান্তি, পেরেশানী, অনর্থক ও মিথ্যা কথা ইত্যাদি। এগুলো জান্নাতুল খুলদে হতে পারে না। এ সব বিষয়ই ঠিক।

আমরা এগুলো অস্বীকার করি না। এমনকি কোন মুসলমান-ই তা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এ সব বিষয় তখন, যখন মু'মিনগণ কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। সকল আয়াতের পূর্বাপর আলোচনা এটাই বুঝায়। সুতরাং প্রতীয়মান হল, উক্ত বিষয়াবলী না পাওয়ার বিষয়টি মু'মিনদের বেহেশতে প্রবেশের সাথে সম্পৃক্ত। এর দ্বারা জিন ও ইনসান দুই মুকাল্লাফ জাতির আদি পিতা হযরত আদম আ. এবং ইবলীসের জান্নাতে থাকার বিষয়টি অসম্ভব প্রমাণিত হয় না।

মু'মিনের জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের আমোদ-প্রমোদ ও আরাম-আয়েশের যে ঘটনা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন, তারা জান্নাতে প্রবেশের পরই সে আচরণ করা হবে। সুতরাং দু'টি বিষয়ে কোন বিরোধ নেই। আদম আ.-এর ঘটনা ও মু'মিনদের কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশের পরবর্তী ঘটনা সব-ই স্ব-স্ব জায়গায় ঠিক আছে।

দ্বিতীয় দলীল
আপনারা যে বলেন, জান্নাতুল খুল্ল্দ প্রতিদানস্থল ও তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান নয়। অথচ আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, সেখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে বাধ্যবাধকতা বা সীমারেখা আরোপ করেছেন। এর দ্বারা এ কথারই প্রমাণ বহন করে, আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুল্ল্দ ছিল না; বরং দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান ছিল। এর উত্তর দু'ভাবে হতে পারে।

প্রথম উত্তর
মু'মিনরা কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করার পর তা দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তার পূর্বে তা দারুত তাকলীফ হওয়া অসম্ভব নয়। আর তা অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীলও নেই। অসম্ভবই বা কিভাবে হতে পারে। অথচ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে। তিনি বলেন, دخلت البارحة الجنة، فرأيت امرأة تتوضأ إلى جانب قصر، فقلت : لمن أنت؟ আমি গত রাতে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে একজন মহিলাকে একটি প্রাসাদের নিকট ওযু করতে দেখলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার জন্য?

এটা অসম্ভব নয়, জান্নাতে কিয়ামত দিবসের পূর্বে এমন লোকগণ থাকবে, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে ও তাঁর ইবাদত করেছে; বরং এটাই বাস্তব বিষয়। সুতরাং জান্নাতে এখনও এমন লোকজন রয়েছেন, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন এবং তাঁর নির্দেশ লংঘন করেন না। চাই তাকে বাধ্যবাধকতা বলা হোক বা না হোক।

দ্বিতীয় উত্তর
সেখানে কাউকে সে সকল বিষয়ে মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়নি, যে সকল বিষয়ের অর্থাৎ নামায, রোযা, জিহাদ ইত্যাদির মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়ে থাকে দুনিয়াতে। সেখানে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি বৃক্ষ বা এক প্রকারের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এতটুকু বাধ্যবাধকতা তো দারুল খুল্দ তথা স্থায়ী নিবাসে হতেই পারে। যেমন, প্রত্যেক জান্নাতবাসীকে অন্যের পরিজনের নিকট যাওয়া থেকে বারণ করা হবে। যদি আপনাদের উদ্দেশ্য এটাই হয়, তাতে এতটুকু বাধ্যবাধকতাও থাকবে না, তবে তা প্রমাণবিহীন উত্তর বৈ কি? আর যদি আপনাদের উদ্দেশ্য হয়, দুনিয়ার ন্যায় বাধ্যবাধকতা থাকবে না, তবে তা সমর্থিত ও প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু তার দ্বারা আপনাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না।

তৃতীয় দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, হযরত আদম আ. সেখানে ঘুমিয়েছেন। অথচ জান্নাতবাসী তো নিদ্রা যাবে না। যদি এই বর্ণনা প্রমাণিত হয়, তবু এর দ্বারা এটাই বুঝা যাবে, তাদের নিদ্রার বিষয় নিষেধ করা হয়েছে স্থায়ীভাবে জান্নাতে প্রবেশের পর। কেননা, তারা সেখানে মৃত্যুবরণ করবে না। কিন্তু এর পূর্বের নিষিদ্ধতা কোনো ভাবে প্রমাণিত হয় না।

চতুর্থ দলীল ও তার উত্তর
আপনারা এ কথার দ্বারা দলীল পেশ করেন, হযরত আদম আ. কে সিজদা না করার কারণে যখন ইবলীসকে আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া হল, তার পরও সে প্রবঞ্চনা দেয়ার জন্য সেখানে কিভাবে গমন করল? আল্লাহর শপথ! এটি উক্ত মতের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় দলীল ও তাদের উক্তির বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টতর। ইবলীসকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পরও আকাশে আরোহণ ও জান্নাতে প্রবেশ করা সব-ই বাস্তবতা বিবর্জিত উক্তি। যা কোনো নীতিপরায়ণ ব্যক্তি সমর্থন করতে পারে না।

তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত পরীক্ষা ও পরীক্ষার নির্ধারিত উপকরণ ও মাধ্যম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাময়িকভাবে সে পর্যন্ত পৌছা অসম্ভব নয়। যদিও তা তার জন্য পূর্বের ন্যায় স্বতন্ত্র আবাসস্থল রূপে না হোক। জিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জিনরা আকাশে আরোহণ করত এবং এমন স্থানে বসতো, যেখান থেকে তারা ফিরিশতাদের আলোচনা শুনত। ফলে ওহীর কিয়দংশ তারা শুনে ফেলত। তাহলে এর মাধ্যমে জিনদের উপরের দিকে আকাশে উঠার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তবে তা সাময়িকভাবে হত। সেখানে তারা অবস্থান করতো না। এমনকি আল্লাহ তা'আলাও বলেন, اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ তোমরা পরস্পরে পরস্পরের শত্রুরূপে নিচে নেমে যাও।

সুতরাং নিচে নেমে যাওয়ার নির্দেশ এবং জিনদের উপরে উঠে ফিরিশতাদের কথা চুরি করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। এখানেও সে সম্ভাবনা বিদ্যমান।

আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর জীবনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এর ব্যাপারে হাদীস দ্বারা উক্ত মতকে মযবুত করেছেন। তার উত্তর হল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে তাঁর জীবনসীমা হিসাবে অবহিত করা আর জান্নাতুল খুলদে প্রবেশ করে কিছুকাল তাতে অবস্থান করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। আর আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে মৃত্যুবরণ করবে না এবং তা থেকে বের হবে না। তা হল, কিয়ামতের দিনে জান্নাতে প্রবেশের পর থেকে।

পঞ্চম দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন, এতে কোন প্রকার সন্দেহ ও সংশয় নেই। কিন্তু আপনারা এটা কোথায় পেলেন, হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির পূর্ণতাও পৃথিবীতেই হয়েছে। অথচ কোন কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত القاه على باب الجنة أربعين صباحا، فجعل إبليس يطوف به، ويقول لأمر خلقت؟ فلمارأه أجوف علم أنه خلق لا يتمالك আল্লাহ তা'আলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর চল্লিশ দিন যাবৎ জান্নাতের দ্বারে ফেলে রেখেছিলেন, তখন ইবলীস তাঁর আশে-পাশে ঘুরতে ঘুরতে বলল, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হল? যখন সে তাঁকে উদর বিশিষ্ট দেখতে পেল, তখন সে বুঝে ফেলল, এতো অক্ষম এক দুর্বল সৃষ্টি। তখন সে বলল, لئن سلطت عليه لأهلكنه যদি আমাকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেব,"৯৪ ولئن سلط علي لأعصينه আর যদি আমার উপর তাকে কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তার অবাধ্য হব।

وَعَلَّمَ آدم الأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَبُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلاء إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমস্ত ফিরিশতার সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও৯৫।

قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র, আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান-ই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।

قَالَ يَا آدم أَنْبِئُهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ، فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ তিনি বললেন, হে আদম! তাদেরকে এ সকল নাম বলে দাও। সে তাদেরকে সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে আমি অবহিত।৯৬

এতে এ কথা-ই বুঝা যায়, হযরত আদম আ. সে ফিরিশতাদের সঙ্গে আকাশেই ছিলেন। কেননা, তিনি-ই তো তাদেরকে সে সকল নাম সম্পর্কে অবহিত করেছেন। অন্যথায় সে ফিরিশতাদের এ পৃথিবীতে নেমে আসার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। অথচ যখন তারা হযরত আদম আ.-থেকে সকল বস্তুর নাম শুনেছিলেন, তখন তাঁরা পৃথিবীতে অবতরণ করেননি।

আর যদি হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টি আদ্যোপান্ত পৃথিবীতেই হয়ে থাকে, তবু এটা অসম্ভব নয়, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সে কাজ বাস্ত-বায়নের জন্য আকাশে তুলে নিয়েছিলেন, যা তাঁর ব্যাপারে তিনি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সংক্ষেপে একথাগুলো হযরত আদম আ.-এর জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের ব্যাপারে জোর দাবীকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের যুক্তির জবাব। والله أعلم |

টিকাঃ
৯৪. এ বিষয়ের অনেক বর্ণনা মুসলিম শরীফ ২য়. পৃ. ৩২৭ ও মুসনাদে আহমাদ, খ. ৩, পৃ. ২৫৪ তে ভিন্ন শব্দে বর্ণিত রয়েছে।
৯৫. সূরা বাক্বারা ৩১
৯৬. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩২-৩৩

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের বর্তমান অস্তিত্ব অস্বীকারকারীদের কিছু যুক্তি

📄 জান্নাতের বর্তমান অস্তিত্ব অস্বীকারকারীদের কিছু যুক্তি


তারা বলে, যদি জান্নাত এখনি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন তা অনিবার্যভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে কারীমাহ কিয়ামত দিবসে সকল কিছু হয়ে যাওয়ার দ্ব্যর্থ ঘোষণা করে। তিনি ইরশাদ করেন, كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ তিনি ছাড়া সব কিছুই ধ্বংস হবে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ প্রতিটি আত্মা-ই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।৯৭

তাহলে জান্নাতের ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হরেরাসহ সেবাদাসেরা মারা যাবে। অথচ আল্লাহর ঘোষণামতে জন্নাত হচ্ছে চিরস্থায়ী নিবাস। তার মধ্যকার সবকিছুই মৃত্যুহীন, অমর। আল্লাহর ঘোষণা অনুযাই জান্নাতের মাঝে কোনো প্রকার ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। তারা আরো বলেন, ইমাম তিরমিযী রহ. তাঁর জামে' তিরমিযীতে৯৮ হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لقيت إبراهيم ليلة أسرى بي، فقال يا محمد إقرأ أمتك مني السلام. وأخبرهم أن الجنة طيبة التربة عذبة الماء، وانها قيعان، وان غراسها سبحان الله والحمد لله ولا إله إلا الله والله أكبر আমি মি'রাজ রাতে ইবরাহীম আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম, তখন তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনার উম্মতকে আমার সালাম পৌছে দিন। তাদের জানান, জান্নাত হল পবিত্র মাটি ও সুপেয় মিষ্ট পানি বিশিষ্ট। তবে তা বৃক্ষরাজিহীন। কিন্তু سُبْحَانَ الله وَالْحَمْدُ لله وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ হল তার বৃক্ষ।

ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে غریب حسن-এর পর্যায়ে বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত জাবির রা.-এর বর্ণনায়৯৯ এশব্দাবলীও রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একবার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী পড়ে, তার জন্য জান্নাতে একটি বৃক্ষ রোপণ করা হয়। তিরমিযী উক্ত হাদীসটিকে صحیح حسن-এর স্তরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

তারা আরো বলেন, যদি জান্নাত এখনি পুরোপুরি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাহলে এখনো তার বৃক্ষশূন্য হওয়ার কোনো যুক্তি হয় না। এরপর আবার তাতে বৃক্ষ রোপণের কোন অর্থই হতে পারে না।

তাদের আরো যুক্তি হল, কুরআন কারীমের বর্ণনা মতে ফিরআওনের স্ত্রী বলল, 'হে আল্লাহ! জান্নাতে আমার জন্য ঘর তথা প্রাসাদ তৈরী করুন'। আর এটা অসম্ভব, কোন ব্যক্তি কাউকে কাপড় বানিয়ে দেয়ার পরও তাকে উক্ত ব্যক্তি বলবে, আমাকে কাপড় বানিয়ে দাও। এমনিভাবে কেউ ঘর তৈরী করে দেয়ার পরও তাকে বলবে, আমাকে ঘর তৈরী করে দাও। এর চেয়েও স্পষ্টতর হচ্ছে এ হাদীস, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من بنى الله مسجدا بنى الله له بيتا في الجنة (যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিকল্পে কোন মসজিদ তৈরী করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরী করবেন।১০০

উক্ত হাদীসের বাক্যটি (شرط وجزاء )শর্ত ও জাযা) দ্বারা গঠিত। এর চাহিদা হল, শর্ত পাওয়া যাওয়ার পর তবেই জাযা পাওয়া যাবে। এটাই আরবী ভাষাভাষীদের সর্বসম্মত নীতি।

হাদীসটি হযরত উসমান রা., হযরত আলী রা., হযরত জাবির রা., হযরত আনাস বিন মালিক রা., হযরত আমর ইবনে আমবাসা রা. প্রমুখের সূত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পরিষ্কার বিবৃত।

তারা আরো বলেন, হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, ফিরিশতাগণ জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ করেন। যতক্ষণ বান্দা নেক আমল করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরিশতাগণ এগুলোর দেখাশুনা করেন। আর যখন বান্দা নেক আমলের মধ্যে ত্রুটি করে, তখন ফিরিশতাগণও তার তত্ত্বাবধানে ত্রুটি করেন।

ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ-এর মধ্যে এবং ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إذا قبض الله ولد العبد، قال ياملك الموت قبضت ولد عبدي قبضت قرة عينه، وثمرة فؤاده، قال نعم قال فما قال؟ قال حمدك واسترجع قال إبنوا له بيتا في الجنة، وسموه بيت الحمد যখন আল্লাহ তা'আলা কোন ব্যক্তির অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু সন্তানকে মৃত্যুদান করেন, তখন মৃত্যুদূতকে ডেকে বলেন, হে মৃত্যুর ফিরিশতা! তুমি তো আমার বান্দার শিশু সন্তানটির জান কব্য করলে, তার আঁখির শীতলতা ও হৃদয়ের মণিকে তুলে নিলে। তখন ফিরিশতা বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা তখন কী বলল? ফিরিশতা বলেন, বান্দা এতেও আপনার প্রশংসা করেছে ও إنا لله وإنا إليه راجعون পড়েছে।

তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, তার জন্য জান্নাতে একটি ভবন তৈরী কর এবং তাকে বাইতুল حمد (بيت الحمد) (প্রশংসালয়) নামে নামকরণ কর।

মুসনাদে আহমাদে এক হাদীসে একথাও রয়েছে من صلى في يوم وليلة ثنتى عشرة ركعة سوى الفريضة بنى الله له بيتا في الجنة যে ব্যক্তি ফরয নামায ব্যতীত বার রাকাত নামায পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ভবন তৈরী করবেন।

তারা বলেন, এটি কোন বিদআতী বা মু'তাযিলাদের মত নয়। যেমনটা আপনারা ধারণা করে থাকেন। বরং এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্য হতেই অনেকের মত।

ইবনে মুযায়ন রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে এ ব্যাপারে হযরত ইবনে নাফে' রা.-এর মত উল্লেখ করেছেন। তিনি তো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জান্নাত কি সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে চুপ থাকা-ই শ্রেয়। والله أعلم

টিকাঃ
৯৭. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫
৯৮. খ. ২, পৃ. ১৮৪
৯৯. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ১৮৪
১০০. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৬৪, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ২০১

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 পূর্বোক্ত সংশয়সমূহের সুষ্ঠু নিরসন

📄 পূর্বোক্ত সংশয়সমূহের সুষ্ঠু নিরসন


প্রথম অধ্যায়ে জান্নাতের বিদ্যমান সৃষ্টরূপ প্রমাণিত করার জন্য যে অকাট্য দলীল পেশ করা হয়েছে তা সংশয়বাদীদের সংশয় নিরসনের জন্য যথেষ্ট। তার পরেও আমরা তাদের প্রতিটি সংশয়ভরা যুক্তির যথার্থ জবাব পেশ করছি।

প্রথম দলীল ও তার উত্তর
আমরা বলব, জান্নাত এখনো সৃষ্টি করা হয়নি; একথার দ্বারা কী উদ্দেশ্য? যদি এর দ্বারা শুধু এই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, এখনো জান্নাত অস্তিত্বে আসেনি; বরং তা শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া ও মানুষের কবর থেকে উঠার ন্যায় বিষয়। তাহলে তো এটা একটি বাতিল মত। যা উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ দ্বারা অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। সামনেও এরূপ কতিপয় হাদীস উল্লেখ করা হবে। এটি এমন একটি মত, যে মতটি পূর্ববর্তীগণ ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্য হতে কেউ-ই পোষণ করেননি। সুতরাং এটি অবশ্য-ই একটি বিভ্রান্ত মত।

আর যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, জান্নাত এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে সৃষ্টি করা হয়নি। তার মধ্যে অবস্থিত বস্তুসমূহ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। বরং আল্লাহ তা'আলা ধারাবাহিকভাবে সে সব বস্তু সৃষ্টি করবেন। আর যখন মু'মিনগণ সেখানে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য বস্তুও সৃষ্টি করবেন। এটা বাস্তবসম্মত মত। কোনভাবেই তা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। আপনাদের উত্থাপিত দলীলাদি দ্বারা শুধু এটুকু-ই বুঝা যায়।

আপনারা হযরত ইবনে মাসউদ রা. ও হযরত জাবির রা. এর যে হাদীস উল্লেখ করেছেন, তার দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্টতর হয়, সে জান্নাতের যমীন সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর যিকিরকারীদের জন্য যিকিরের প্রতিদান স্বরূপ সে যমীনে বৃক্ষ রোপণ করবেন। এমনিভাবে সে সকল আমলের বদৌলতে প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে, যে আমলের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বান্দা যখন নেক আমল করে থাকে, তখন তার প্রতিদান স্বরূপ সেখানে বৃক্ষ রোপিত হয় ও প্রাসাদ নির্মিত হয়। আমলের কারণে বিভিন্ন প্রকারের সে সকল বস্তু সৃষ্টি করা হয়, যার দ্বারা জান্নাত এখনো সজ্জিত হয়নি।

দ্বিতীয় দলীল ও তার জবাব
আপনারা আল্লাহ তা'আলার বাণী كُلُّ شَيْءٍ هَالَكَ إِلَّا وَجْهَهُ দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন, তা ঠিক নয়। কেননা, আপনারা স্বীয় অজ্ঞতার দরুন আয়াতের সঠিক অর্থ করতে সক্ষম হননি।

উক্ত আয়াত দ্বারা জান্নাত বর্তমানে বিদ্যমান না থাকার উপর দলীল পেশ করা তেমনি, যেমনি আপনারা জান্নাতবাসীদের মৃত্যুবরণ করা ও ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে দলীল পেশ করে থাকেন।

উক্ত আয়াতের অর্থ আপনারাও বুঝতে সক্ষম হননি। আপনাদের পক্ষের অন্য কেউ-ই বুঝতে সক্ষম হয়নি। উক্ত আয়াতের অর্থ মূলতঃ সালাফ ও আইম্মায়ে ইসলামের উক্তির অনুরূপ। নিম্নে তাঁদের কতিপয়ের উক্তি উপস্থাপিত হল।

ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেছেন, তাঁর সত্তা ব্যতীত সকল বস্তু ধ্বংস হয়ে যাবে। إلاّ وَجْهَهُ অর্থ হল, إلا ملكه অর্থাৎ একমাত্র তাঁর রাজত্ব ও আধিপত্য অবশিষ্ট থাকবে।

কেউ কেউ বলেন, إِلَّا وَجْهَهُ অর্থ হল ما أريد به وجهه অর্থাৎ, সব বস্তু-ই ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তাঁর সত্তা যে সব বস্তু অবশিষ্ট রাখার ইচ্ছা করবেন।

ইমাম আহমদ রহ. বলেন, 'যেহেতু আকাশ-পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, সুতরাং তাতে বসবাসকারীগণ জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কিন্তু আরশ ধ্বংসও হবে না, তার পরিসমাপ্তিও ঘটবে না। যেহেতু তা জান্নাতের ছাদ স্বরূপ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাতে সমাসীন, তাই তা ধ্বংসও হবে না এবং তার পরিসমাপ্তিও ঘটবে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার বাণী كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ এর মর্মার্থ হল, যখন আল্লাহ তা'আলা مِّنْ كُلِّ شَيْءٍ (সকল বস্তু-ই ধ্বংস হয়ে যাবে,) আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন, তখন ফিরিশতাগণ বেঁচে থাকার খায়েশ পেশ করার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বললেন, অবশ্যই আকাশ-পৃথিবী সব ধ্বংস হয়ে যাবে। إِلَّا وَجْهَهُ كُلُّ شَيْءٍ একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সত্তা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র তাঁর সত্তা-ই মৃত্যুবরণকারী নয়। তখন ফিরিশতাগণ নিজেদের মৃত্যুর বিষয়টির নিশ্চিতরুপে বুঝতে পারল।'

কিতাবুত তাকাতে হযরত আবুল হাসান রহ. ইমাম আহমাদ রহ. এর অন্য অভিমতও নকল করেছেন। যেখানে বলেন, এটি-ই আহলে ইলম, জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, হাদীসবেত্তা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা যায়। এটি-ই সাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল অনুসরণীয় ব্যক্তিবৃন্দের অভিমত। সিরিয়া, হিজাজ ও অন্যান্য স্থানের যে আলিমগণের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদেরকে আমি এ মত পোষণকারী-ই পেয়েছি। আর এ মাযহাবের যে বিরোধিতা করবে বা তাকে তিরস্কার করবে বা এ মত পোষণকারীকে দোষারোপ করবে, সে বিরোধিতাকারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রতিপক্ষ ও বিদ'আতী বলে সাব্যস্ত হবে। সে সুন্নাতের পথ তথা সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত। উলামায়ে কিরামের এ উক্তিসমূহ সামনে উল্লেখ করে বলেন, জ্ঞাতব্য তার মধ্যকার বস্তু নিয়ে স্থিত হতে হয়েছে এবং দোষও তার মধ্যকার বস্তু নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত-জাহান্নাম উভয়টাকে সৃষ্টি করেছেন আর এগুলোর জন্য মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না এবং সেগুলোর মাঝে যা আছে, তাও কখনো ধ্বংস হবে না।

বিদ'আতী মতবাদ পোষণকারী কুরআন কারীমের আয়াত إِلَّا وَجْهَهُ كُلُّ شَيْءٍ বা এ জাতীয় অন্যান্য আয়াত, যা মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত তা দ্বারা দলীল পেশ করে। তাদের সংশয়ের উত্তরে বলা হবে, যে সকল বস্তুর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা চূড়ান্ত ফায়সালা করেছেন, সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে আয়াত দ্বারা সেগুলো-ই উদ্দেশ্য। আর বেহেশত ও দোযখ আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করার জন্য নয়; বরং স্থায়ীভাবে রাখার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তা ছাড়া দুনিয়ার বস্তুসমূহ হল ধ্বংসশীল আর জান্নাত ও দোযখ হল আখিরাতের বস্তু। দুনিয়ার বস্তু নয়। ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। কিয়ামতের দিনও নয়। শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়ার দিনও নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে ধ্বংসের জন্য নয়; বরং স্থায়িত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সেগুলোর জন্য মৃত্যু নির্ধারণ করেননি।

সুতরাং যে এর বিপরীত মত পোষণ করে, সে বিদ'আতী ও সঠিক পথ হতে বিচ্যুত। আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্ব ও নিম্ন স্তর হিসাবে সাত আকাশ ও সাত যমীন সৃষ্টি করেছেন। সর্বাপেক্ষা নিম্নের আকাশ ও সর্বাপেক্ষা উপরের যমীনের মধ্যে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। প্রত্যেক আকাশ থেকে অন্য আকাশের মধ্যেও পাঁচশত বছরের দূরত্ব। সর্বাপেক্ষা উপরের আকাশ অর্থাৎ সপ্তম আকাশের উপর পানি রয়েছে। পানির উপর হল আল্লাহ তা'আলার আরশ। তিনি আরশের উপর সমাসীন। কুরসী হচ্ছে তাঁর কুদরতী পদযুগল রাখার জায়গা। ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলে যা কিছু আছে ও তার মধ্যবর্তী স্থলে যা কিছু আছে এবং সর্বনিম্ন যমীনের নিচে যা কিছু আছে, সবকিছুই তিনি জানেন। সমুদ্র বক্ষে, প্রতিটি রোম কূপে, প্রতি বৃক্ষে, শস্যক্ষেত্রে, উদ্ভিদের ডগায় ডগায়, পাতা ঝরার স্থানে, প্রতিটি কংকর, ধুলো ও বালিতে, সুবিশাল পাহাড়-পর্বতের খাঁজে খাঁজে এমনকি বান্দাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, স্পন্দন, পদক্ষেপের সমুদয় তাঁর নখদর্পণে।

তাঁর নিকট কিছুই গোপন নয়। তিনি সপ্তম আকাশের উপর আরশের উপর সমাসীন (তাঁর শান মুতাবিক)। তার নিচে আগুন, নূর ও অন্ধকারের পর্দা রয়েছে। এমন এমন বস্তু রয়েছে, যা একমাত্র তিনি-ই জানেন।

সুতরাং যদি কোন বিদ'আতী মতবাদ পোষণকারী এ মতবাদের বিপরীতে আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা দলীল পেশ করে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর ১০১ আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ তোমরা যেখানেই থাক, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। ১০২

আল্লাহ তা'আলা অন্য ইরশাদ করেন, مَا يَكُوْنُ مِنْ نَّجْوَى ثَلٰثَةٍ اِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ তিনি তাঁদের সঙ্গেই আছেন তাঁরা যেখানেই থাকুক না কেন। ১০৩ তেমনিভাবে তাঁর বাণী, যদি তিনজন পরামর্শকারী থাকে, তবে চতুর্থজন হলেন তিনি (আল্লাহ তা'আলা)। যদি পাঁচজন থাকে, তবে ষষ্ঠ জন হলেন তিনি।

এ জাতীয় অন্যান্য মুতাশাবিহাত আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করেন, তবে আমরা তার উত্তরে বলব, আল্লাহ তা'আলা সব কিছুই জানেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর আরশের উপর। তাই তিনি সব কিছু জানেন। তিনি মাখলুক থেকে ভিন্নতর। কোন কিছুই তাঁর অবগতির বাইরে নয়।

আবু জা'ফর তাহির বর্ণনায় রয়েছে, খিলাল রহ. ছিলেন, সমকালীন ইল্‌ম ও মারিফাতের অত্যন্ত খ্যাত ও নেতৃত্বনীয় ব্যক্তিত্ব। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন ও তাঁর মতামত গ্রহণ করতেন। তাঁর নিকট তাঁর শহরের বিভিন্ন লোকের হাল-হাকীকতের তথ্য নিতেন। তিনি বলেন, আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. থেকে অনেক কিছু লিখেছি। তদুপরি সুন্নাত সম্পর্কে একটি পুস্তিকার কথা উল্লেখ করলেন। তার মাঝে তিনি বলেন, জান্নাত ও দোযখ উভয়টি সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে (সহীহায়নে উল্লিখিত বিভিন্ন হাদীসের অংশ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, دَخَلْتُ الْجَنَّةَ فِي আমি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি প্রাসাদ দেখেছি, তাতে হাউযে কাওসার দেখেছি এবং উঁকি মেরে দোযখ দেখেছি। তার মধ্যে অধিকাংশ অধিবাসীকে এমন এমন দোষে অভিযুক্ত অবস্থায় পেয়েছি। رَأَيْتُ فِيْهَا قُصَرًا، وَاطَّلَعْتُ فِي النَّارِ، فَرَأَيْتُ أَكْثَرَهَا كَذَا وَكَذَا.

সুতরাং যে এ আকীদা পোষণ করে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃষ্টি হয়নি, সে প্রকারান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরআনকে-ই মিথ্যা প্রতিপন্ন করল ও জান্নাত-জাহান্নামকে অস্বীকার করল। সে ব্যক্তিকে এ ভুল আকীদা থেকে তওবা করতে বলা হবে। যদি তওবা করে, তবে তো ভাল। অন্যথায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। (কেননা সে ধর্মদ্রোহী)।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে আব্দুস ইবনে মালিক আত্তারও এমন বর্ণনা করেছেন। সে বর্ণনার শেষাংশে এ-ও রয়েছে, যে ব্যক্তি এ আকীদা পোষণ করে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃজিত হয়নি, সে কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। আমি মনে করি না, সে ব্যক্তি জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য হওয়ার ব্যাপারে ঈমান আনয়নকারী।

সুতরাং উল্লিখিত অধ্যায়সমূহের মাসাইল ও তার মধ্যে উল্লিখিত কুরআন-সুন্নাহ ও সলাফদের থেকে বর্ণিত মতসমূহ, গবেষণালব্ধ জ্ঞান, অন্তর্নিহিত গূঢ়তথ্য ও তত্ত্ব গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করুন। এগুলো এমন কতগুলো বিষয়, যেগুলো এ গ্রন্থ ব্যতীত অন্য কোন গ্রন্থে একত্রে এ ভাবে পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে আমি সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করেছি। যদি বিস্তারিত করতাম, তবে এতেই দীর্ঘ কলেবর বিশিষ্ট একটি গ্রন্থ রচিত হয়ে যেত। সাহায্য একমাত্র আল্লাহর নিকট-ই চাওয়া যায়। ভরসা একমাত্র তাঁরই উপর করা যায়। সঠিক কথা ও কাজের তাওফীক দানকারী একমাত্র তিনি-ই।

টিকাঃ
১০১. সূরা ক্বাফ, আয়াতঃ ১৬
১০২. সূরা হাদীদ, আয়াতঃ ৪
১০৩. সূরা মুজাদালা, আয়াতঃ ৭

📘 জান্নাতের স্বপ্নীল ভুবন > 📄 জান্নাতের ফটক কয়টি?

📄 জান্নাতের ফটক কয়টি?


আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَراً حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوابَهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ.
যারা স্বীয় প্রতিপালককে ভয় করত, তাদেরকে দলে দলে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে ও তার দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হবে। আর জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে পবেশ কর স্থায়ীভাবে। (অবস্থিতির জন্য।)১০৪

অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা দোযখের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوابَهَا যখন তারা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হবে, তখন তার প্রবেশ দ্বারগুলি খুলে দেওয়া হবে।১০৫

জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَفُتِحَتْ أبوابها এখানে, واز দ্বারা আর জাহান্নামের বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, وفتحت أبوابها অর্থাৎ واز ব্যতীত। এর কারণ বর্ণনায় একদল উলামা বলেন, এখানে واز হল, واؤ ثمانية। যেহেতু জান্নাতের দ্বার আটটি। সুতরাং এখানে واؤ ثمانية ব্যবহার করা হয়েছে। আর যেহেতু জাহান্নামের দ্বার আটটি নয়; বরং সাতটি, তাই সেখানে واؤ ثمانية ব্যবহার করা হয়নি। এটি অত্যন্ত দুর্বলতম উক্তি। এর কোন প্রমাণিক ভিত্তি নেই। এই কায়দা আরবগণও জানেন না, আরবী ভাষার পণ্ডিতগণও জানেন না। এটি পরবর্তী যুগের কতিপয় আলিমের নিজস্ব ভাবনা মাত্র।

অন্য একদল আলিম বলেন, وفتحت এর মধ্যে واز টি অতিরিক্ত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর واز এর পরবর্তী বাক্য إذا এর জবাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনিভাবে জাহান্নামের বর্ণনায় وفتحت أبوابها বাক্যটি إذا এর জবাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ মতটিও অত্যন্ত দুর্বল। কেননা আরবী ভাষাভাষীদের নিকট অতিরিক্ত واز ব্যবহৃত হওয়ার কোন রীতি নেই। অলংকার সমৃদ্ধ ভাষার জন্য উপযোগীও নয় যে, তাতে এমন কোন অক্ষর অতিরিক্ত হিসাবে ব্যবহৃত হবে; যার কোনো অর্থ নেই বা অন্য কোনো উপকারিতাও নেই।

তৃতীয় একদল আলিম বলেন, إذا এর জবাবে আগত বাক্যটি উহ্য রয়েছে। আর وَفُتَحَتْ أبوابها এর عطف হল جاؤها এর উপর। এটি হল, আবূ উবাইদ, মুবাররাদ, যুজায ও অন্যদের মত। মুবাররাদ বলেন, আহলে ইল্ম তথা উলামায়ে কিরাম شرط এর জবাব উহ্য থাকাকেই ভাষার উচ্চাঙ্গতা বিবেচনা করেন।

প্রখ্যাত নাহুবিদ আবুল ফাতাহ ইবনে জুনী রহ. বলেন, আমাদের আসহাব واز কে অতিরিক্ত হিসাবে গণ্য করেন না। এবং তা বৈধও মনে করেন না। তিনি বলেন, যেহেতু شرط এর জবাব জানা রয়েছে, তাই তা বিলুপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়টি বিবেচ্য যে, জান্নাতবাসীদের বর্ণনা প্রদানকারী আয়াতে شرط এর জবাবকে বিলুপ্ত করা ও জাহান্নামবাসীদের বর্ণনা প্রদানকারী আয়াতের মধ্যে شرط এর জবাবকে উল্লেখ করার মধ্যে কি রহস্য রয়েছে?

তার জবাবে বলা যায়, উভয় স্থানের ভাষা-ই চূড়ান্ত পর্যায়ের অলংকারসমৃদ্ধ। সুতরাং জাহান্নামবাসীদেরকে যখন ফিরিশতাগণ হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে থাকবেন, তখন জাহান্নামের প্রবেশ দ্বার রুদ্ধ থাকবে, কিন্তু যখন তারা তার নিকটে পৌঁছে যাবে, তখন তাদের সামনেই তার দরযা খুলে যাবে, এবং অকস্মাৎ তারা আযাবে নিপতিত হবে।

সুতরাং তারা তার নিকট পৌঁছা মাত্র-ই অনতিবিলম্বে জাহান্নামের দরযা খুলে দেয়া হবে। উক্ত অবস্থা সে شرط এর উহ্য জবাব দ্বারাই বুঝা যায়। অর্থাৎ তা শর্ত পাওয়া যাওয়ার সাথে সাথেই ঘটবে। কেননা জাহান্নাম হলো, অপমান ও লাঞ্ছনার স্থল। ফলে কেউ-ই জাহান্নামে প্রবেশের অনুমতি চাইবে না এবং জাহান্নামের দারোয়ানের নিকটও কেউ তা দাবী করবে না। (অর্থাৎ, তার অর্থ এটা-ই নির্ণীত হল, জাহান্নামবাসীরা তার দরযায় পৌঁছা মাত্র-ই দরযা খুলে যাবে।)

আর জান্নাত হল, আল্লাহ তা'আলার দয়া, অনুগ্রহ ও সম্মানের স্থান। আল্লাহ তা'আলার বিশিষ্ট বান্দা এবং ওলীগণের স্থান। সুতরাং যখন জান্নাতবাসীগণ তার নিকটবর্তী হবে, তখন তার প্রবেশ দ্বার রুদ্ধ থাকবে। ফলে তারা জান্নাতের প্রহরীর নিকট তার দ্বার উন্মুক্ত করার আবেদন করবে। আল্লাহ তা'আলার নির্ভরযোগ্য বান্দা ও রাসূলগণের নিকট সেজন্য সুপারিশ প্রার্থনা করবে, আপনারা জান্নাতের দরযা খোলার জন্য আল্লাহ তা'আলার সমীপে সুপারিশ করুন। কিন্তু নবীগণ প্রত্যেকেই সুপারিশের বিষয়টি অন্যের দায়িত্বে সমর্পণ করবেন। আমি নয়, অমুকের নিকট সুপারিশের নিবেদন কর। এমনিভাবে শেষ নবী, নবীকুলের সর্দার ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে বলা হবে, এ কাজ একমাত্র তাঁর পক্ষে-ই সম্ভব। যখন সকলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাবে, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, এ কাজ একমাত্র আমার-ই। তখন তিনি আরশের নিচে গিয়ে আল্লাহ তা'আলার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন। যতক্ষণ ইচ্ছা আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাথা উঠানোর অনুমতি দিবেন। তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাতের দরযা খোলার সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করবেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতি লক্ষ্য রেখে জান্নাতের দরযাসমূহ খুলে দিবেন। এই হল রাজাধিরাজ, অধিপতির অধিপতি মহান প্রভুর সম্মানিত স্থানের তুলনা।

মূলকথা হল, বান্দা এ কঠিন প্রেক্ষিত অতিক্রম করার পর তাতে প্রবেশ করবে। যার সূচনা হবে বান্দার সে বিষয়ে অবগতির মাধ্যমে। এমনিভাবে বান্দা ক্রমান্বয়ে সে সকল স্তর অতিক্রম করার পর জান্নাতের নিকটবর্তী হতে পারবে। অনেক কষ্ট স্বীকার করার পর আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী ও সর্বাধিক প্রিয়তম মাখলুক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সে জান্নাতবাসীদের জন্য তার দরযা খোলার জন্য সুপারিশের অনুমতি দিবেন। এটাই হল নি'আমতকে পূর্ণাঙ্গ করার এবং চূড়ান্ত আনন্দ ও খুশি লাভের একান্ত ও সর্বোত্তম মাধ্যম। যাতে কোন অজ্ঞ, মূর্খ ব্যক্তি এ ধারণা না করে, জান্নাত একটি তো একটি হাবেলীর ন্যায় মাত্র। যার ইচ্ছা হয় প্রবেশ করবে।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জান্নাত অত্যন্ত উচ্চতর ও মূল্যবান। বান্দা ও জান্নাতের মাঝে বড় বড় ঘাঁটি ও শংকাময় স্তর রয়েছে। যা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার তাওফীকেই অতিক্রম করা সম্ভব। এটা সে ব্যক্তির জন্য নয়, যে একদিকে স্বীয় প্রবৃত্তির গোলামী করে তার-ই অনুসরণ করে। আর অন্যদিকে আল্লাহ তা'আলার নিকট জান্নাত পেতে আশাবাদী হয়ে থাকে। বরং উঁচু মর্যাদা অর্জন করার জন্য ব্যক্তির উচিত এসব বর্জন করে এ পথের জন্য সর্বোপযোগী পন্থা অবলম্বন করা। যে ব্যক্তি এ পন্থা অবলম্বন করবে, তার জন্য-ই জান্নাতের সকল কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁর জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। সে দু'দলকে (জান্নাতী ও জাহান্নামী) তাদের গন্ত ব্যস্থলের দুই দরযার দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করুন।

এই দলের অন্তর্ভুক্ত (জান্নাতী) লোকেরা আপন ভাইদের মাঝে থাকার ফলে আনন্দিত থাকবে। প্রত্যেক দল পৃথক পৃথক থাকবে। প্রত্যেক সমআমলের লোকগণ পরস্পর সাথী হবে। তারা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রসন্ন থাকবে দৃঢ়চেতা হয়ে। যেমনিভাবে তারা দুনিয়াতে নেক আমল করার সময় অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ছিল, তেমনিভাবে তারা সেখানেও পরস্পর অন্তরঙ্গ ও প্রফুল্ল থাকবে।

তেমনিভাবে অন্য দরযা অভিমুখীদেরকে (জাহান্নামী) দলে দলে সে দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে। তারা একে অপরকে অভিশাপ দিতে থাকবে ও একে অন্যের দ্বারা কষ্ট ভোগ করবে। এটা হল, অপমান ও লাঞ্ছনার চরম পর্যায়ে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা উভয় দ্বার অভিমুখীদের আলোচনা করতে গিয়ে যে زمرا শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তাকে অনর্থক মনে করো না। জান্নাতের প্রহরী জান্নাতের অধিবাসীদেরকে السَّلَامُ عَلَيْكُمْ বলে অভিভাদন করবে এবং সালাম দ্বারা-ই আলোচনা শুরু করবে। যা সকল প্রকার অনিষ্টতা ও বিপদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দানকারী। অর্থাৎ তোমরা নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস কর। আজকের পর তোমাদের কোনো প্রকার কষ্ট ও পেরেশানীর মুখোমুখি হতে হবে না। যা তোমরা পসন্দ করো না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, তোমরা পবিত্র নিষ্পাপ। তোমরা সর্বদার জন্য জান্নাতে প্রবেশ কর। অর্থাৎ তোমাদের নিরাপত্তা, শান্তি ও জান্নাতে প্রবেশ করা তোমরা নিষ্পাপ ও পবিত্র হওয়ার কারণেই।

আল্লাহ তা'আলা নিষ্পাপ ও পবিত্র লোকগণ ব্যতীত অন্যদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। জান্নাতের প্রহরী জান্নাতবাসীদেরকে শান্তি, নিরাপত্তা, পবিত্রতা, নিষ্পাপতার কারণে জান্নাতে প্রবেশ ও তাতে চিরস্থায়ী হওয়ার সু-সংবাদ দিবে।

আর জাহান্নামবাসীরা যখন দুঃখ-পেরেশানী ও কষ্টকর অবস্থায় জাহান্নাম পর্যন্ত পৌছবে, তখন জাহান্নামের প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু তারা দরযায় দাঁড়িয়ে থাকবে, আর জাহান্নামের প্রহরী তাদের অত্যন্ত কঠোরভাবে ধমক দিতে থাকবে। এ বলে তাদেরকে লজ্জা দিতে থাকবে, أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ ‘তোমাদের মাঝে কি তোমাদের মধ্য হতেই আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত রাসূলগণের আগমন ঘটেনি? যাঁরা প্রভুর আয়াত পাঠ করে তোমাদেরকে শুনাত এবং তোমাদেরকে এ দিনের আগমন সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করত'। তখন তারা স্বীকৃতি জানাবে এবং বলবে, হ্যাঁ, আমাদের নিকট রাসূলগণের আগমন ঘটেছিল। অতঃপর প্রহরী তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করার ও তাতে চিরস্থায়ীভাবে থাকার সংবাদ শুনাবে। জাহান্নাম তাদের জন্য নিতান্তই নিকৃষ্ট স্থান হবে। ভেবে দেখুন, জান্নাতের প্রহরী জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবে, أدخلوها জান্নাতে প্রবেশ করুন। আর জাহান্নামের প্রহরী জাহান্নামীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, أدخلوا أبواب جهنم জাহান্নামের দরযা দিয়ে প্রবেশ কর। তাদের কথোপকথনের প্রতি লক্ষ্য করলে এক সূক্ষ্মতর রহস্য এবং গূঢ়তত্ত্ব পাওয়া যাবে। তা হল, জাহান্নাম শান্তির স্থান। তার দরযা অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং জাহান্নামের আগুনের সবচেয়ে বেশি তাপ হবে দরযায়। তাতে প্রবেশকারীদের যে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, তন্মধ্যে এ দরযা দিয়ে প্রবেশ করা-ই হবে সর্বাপেক্ষা বড় চিন্তা ও দুঃখের কারণ।

উক্ত দরযা দিয়ে প্রবেশের মাধ্যমে তার দুঃখ-দুর্দশা, পেরেশানী ও লাঞ্ছনা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। সুতরাং তাদেরকে বলা হবে, এর দরযা দিয়ে প্রবেশ কর। এটা তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করার জন্য-ই বলা হবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা শুধু এ দরযা দিয়ে প্রবেশের অপমান ও লাঞ্ছনাকে-ই যথেষ্ট মনে করো না; বরং তোমরা উক্ত জাহান্নামে চিরদিনের জন্য স্থায়ী হবে।

পক্ষান্তরে জান্নাত তো সম্মান ও শান্তির নীড়। আল্লাহ তা'আলা তা একমাত্র তাঁর বন্ধুদের জন্য-ই তৈরী করেছেন। জান্নাতীগণকে প্রথমেই তাদের অবস্থানস্থল ও তাদের ভবনে প্রবেশের এবং স্থায়ী বসবাসের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার ইরশাদের প্রতি লক্ষ্য করুন, جَنَّاتِ عَدْنٍ مُّفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب তাদের জন্য স্থায়ী জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সেখানে তারা প্রবেশ করে আরাম দায়ক শয্যায় হেলান দিয়ে বসে থাকবে। তাদেরকে বৈচিত্রময় ফল ও পানীয়ের আপ্যায়নের দিকে আহবান করা হবে।

উক্ত আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করলে এখানেও তাৎপর্যপূর্ণ রহস্য উদঘাটিত হবে। তা হল, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশের পর তার দ্বার রুদ্ধ করা হবে না; বরং তার দ্বার থাকবে উন্মুক্ত। আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশের পর তার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, عَلَيْهِم مُؤْصَدَةً অবশ্যই তাদের জন্য জাহান্নামের দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হবে।

অর্থাৎ, তা স্তর স্তর করে বন্ধ করে দেয়া হবে। এ জন্য দরযাকে وصيد বলা হয়। অর্থাৎ এমন খুঁটি তৈরী করা হবে, যা দরযার বাইরে স্থাপন করা হবে। তাকে মযবৃতভাবে বন্ধ করার জন্য। যেমনিভাবে বৃহদাকারের পাথর দরযার বাইরে রেখে তা বন্ধ করা হয়ে থাকে।

মুকাতিল রহ. বলেন, জাহান্নামীদের জন্য তার দ্বার রুদ্ধ করা হবে, তা কখনো খোলা হবে না। ফলে তা থেকে কেউ বের হতেও পারবে না। আর কেউ প্রবেশও করতে পারবে না। এমনিভাবে জান্নাতীদের জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত রাখার দ্বারা এ কথা-ই নির্দেশ করে, তারা সেখানে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে আসা-যাওয়া করবে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে-ই নিবাস বানাতে পারবে। প্রভু কর্তৃক উপহার প্রদান ও দয়া-অনুগ্রহে ফিরিশতা সর্বদা তাঁদের নিকট আসা-যাওয়া করবে। তাদের প্রতিনিয়ত প্রবেশ সে জান্নাতবাসীদের জন্য আনন্দের কারণ হবে। এমনিভাবে এটা (জান্নাতের দরযা সর্বদা উন্মুক্ত রাখা) এ কথাও নির্দেশ করে, তা নিরাপদ স্থান।

সুতরাং দরযা বন্ধ করার প্রয়োজন পড়বে না। যেমনিভাবে দুনিয়াতে নিরাপত্তার জন্য তারা ঘরের দরযা বন্ধ রাখত।১০৬

الأبواب এর ال সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি
ا صفت 27 مفتحة الأبواب موصوف 27 جنات عدن হল সে হিসাবে صفت এর মধ্যে এমন একটি ضمیر বা সর্বনাম হওয়া জরুরী, যা موصوف এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। সে ضمیر বা সর্বনাম সম্পর্কে আরবী ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনকারী উলামা কিরামের মতভেদ রয়েছে। কুফাবাসী নাহবীগণ বলেন, মূল ইবারত ছিল, الضمير | مُفَتَحَةً لَّهُمُ أبواها সর্বনামকে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে শুরুতে আলিফ লাম আনা হয়েছে। مضاف إليه ثم ها - ضمير ছিল।) আরবী ভাষাবিদগণ এরূপ করে থাকেন, مضاف إليه কে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে مضاف এর উপর আলিফ-লাম ব্যবহার করেন। যেমন আহলে আরবগণ বলেন, ا مررت برجل حسن العين এটা মূলতঃ ছিল عينه। এর আরেকটি উদাহরণ হল, আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى, মূলত: مأواه | النارى 97 الضمير কে বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে ماوی শব্দের শুরুতে আলিফ-লাম যোগ করা হয়েছে।

বসরাবাসী ভাষাবিশারদ বলেন, এটা ছিল مُفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب منها ها যমীর তথা সর্বনামকে حرف جار - من সহ বিলুপ্ত করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, আরবী ভাষায় যমীর বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে আলিফ-লাম ব্যবহার করা থেকে এ জাতীয় ইবারত উহ্য নির্ধারণ করা অতি উত্তম। কারণ আলিফ- লাম যে অর্থ প্রদান করে, তার সাথে "। এর অর্থের সামঞ্জস্য নেই। কেননা হল, ইস্ম তথা বিশেষ্য (যেহেতু যমীর) আর আলিফ-লাম (এটা অব্যয়) বিশেষ্যকে নির্দিষ্ট করার জন্যে তার শুরুতে প্রবিষ্ট হয়। আর অব্যয় কখনো বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় না এবং তার স্থলাভিষিক্তও হয় না।

বসরাবাসীগণ আরো বলেন, কুফীগণ বলেন, আলিফ-লাম যমীরের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। যদি তা-ই হতো, তবে অবশ্যই جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী যমীর مفتحة এর সাথে যুক্ত থাকত। তখন অর্থ হতো, مفتحة هي । (সে উদ্যান উন্মুক্ত) এবং তার بدل আনা হতো الأبواب দ্বারা। যদি এমন হতো তবে الأبواب এর মধ্যে অবশ্যই نصب হতো।

কেননা مفتحة শব্দটি তার فعل বা কর্তাকে رفع প্রদান করেছে। আর এটা জায়েয নেই, তা অন্য কোন ইসস্ম তথা বিশেষ্য কে رفع প্রদান করবে। কারণ একই فعل বা ক্রিয়ার দু'ইসস্মকে رفع প্রদান করা নিষিদ্ধ। সুতরাং যেহেতু مفتحة শব্দটি الأبواب শব্দটিকে رفع প্রদান করেছে, তাহলে বুঝা যায় مفتحة শব্দটি ضمير হতে মুক্ত। الأبواب শব্দটি مفتحة এর কারণেই رفع যুক্ত হয়েছে। صفت এর মধ্যে যদি এক ইস্ম এর সাথে ضمیر নির্ধারিত থাকে, তবে সে ইসস্ম رفع বিশিষ্ট হবে। এবং অপর ইসস্ম نصب যুক্ত হবে। যেমন: আরবগণ বলে থাকেন, مررت برجل حسن الوجه )মূলতঃ ছিল حسن وجهه (। এখানে الوجه কে رفع যুক্ত করে আর حسن কে তানবীন দ্বারা نصب পড়া জায়েয নেই।

(তেমনিভাবে এখানেও مفتحة শব্দটি তানবীন দ্বারা যবরযুক্ত আর الأبواب শব্দটি হল পেশযুক্ত। সুতরাং তা উল্লিখিত নিয়ম মুতাবিক নয়। কিন্তু যদি তার মূল مُفَتَّحَةً لَّهُمُ الأبواب منها ধার্য করা হয়, তবে কোন প্রশ্ন-ই থাকে না।)

আলিফ-লাম যেহেতু নির্দিষ্টকরণের জন্য এবং তা صفت এর উপর প্রবিষ্ট হয়েছে। সুতরাং এখানে অবশ্যই একটি ضمیر হওয়া জরুরী যা موصوف এর দিকে ফিরবে। جنات عدن موصوف। আর যমীর শব্দের মাঝে বিদ্যমান নেই। তাহলে অবশ্যই তা উহ্য থাকবে এবং মূল বাক্য হবে الأبواب منها।

আমার (আল্লামা ইবনুল কায়্যিম) মতে, এর দ্বারা কুফাবাসীদের মত বাতিল হবে বলে গণ্য হয় না। কেননা, তারা তো শুধু বলেন, ضمير এর পরিবর্তে আলিফ-লাম ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং তাদের উদ্দেশ্য শুধু এতটুকু, আলিফ-লাম ব্যবহারের কারণে ضمير ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। সকল আরব-ই حسن وجهه ও حسن الوجه এরূপ ব্যবহারকে সঠিক বলে গণ্য করেন, যা কুফাবাসীদের মতকে সমর্থন করে। আরবগণ বলে থাকেন, তানবীন আলিফ-লাম এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হল, উভয়টা একত্রিত হয় না। এমনিভাবে مضاف إليه তানবীনের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় এবং তানবীন إضافت এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এ দু'টি একত্রে ব্যবহৃত হয় না। বরং ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহৃত হয়। তাদের উদ্দেশ্য এই নয়, بدل যে অর্থ مبدل منه এরও হুবহু সে অর্থ হবে। বরং কখনো কখনো উভয়টা এমন অর্থ প্রদান করে, একটির অর্থ অন্যটির মধ্যে আদৌ পাওয়া যায় না। কুফাবাসীদেরও তো এ-ই উদ্দেশ্য, الأبواب এর মধ্যে আলিফ-লাম আসার কারণে যমীরের প্রয়োজন নেই।১০৭

যদি أبواب বলা হয়, তবু তা সঠিক হবে। কারণ উদ্দেশ্য হল, صفت ও موصوف এর মাঝে এমন কোন বিষয় দ্বারা সম্পর্ক স্থাপন করা যা স্বতন্ত্র কোন বিষয় নয়। সুতরাং যমীর যখন موصوف এর দিকে ফিরবে, তখন তা স্বতন্ত্র হওয়ারও আর অবকাশ থাকে না। তেমনিভাবে নির্দিষ্টকরণের লাম। কেননা যমীর ও লাম উভয়টা স্ব-স্ব متعلق তথা সম্পর্কিত বস্তুকে নির্দিষ্ট করে। যমীর مُفسر কে নির্দিষ্ট করে আর আলিফ-লাম যে ইস্স তথা বিশেষের উপর প্রবেশ করে, তাকে নির্দিষ্ট করে। ভাষাবিদগণও বলেন, زيد نِعْمَ الرَّجُل জাতীয় বাক্যের মধ্যে আলিফ-লামটি যমীরের ব্যবহার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে। সুতরাং যমীর ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।

আল্লামা যামাখশরী রহ. উক্ত আয়াতের এমন তারকীব করেছেন, যা প্রশ্ন সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, جنات عدن নাকিরা বা অনির্দিষ্ট শব্দ নয়; বরং মা'রিফা বা নির্দিষ্ট শব্দ। যেমনিভাবে আল্লাহ তা'লার বাণী, جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ عباده بالغيب এর মধ্যে মা'রিফা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর جنات শব্দটি যবরযুক্ত। কেননা এটা لحسن مأب এর উপর عطف হয়েছে।

আর مفتحة হল, ১। তার আমেল তা-ই যা للمتقين। এর মধ্যে আমল করেছে। অর্থাৎ معنی فعل বা ক্রিয়ার অর্থ। مفتحة এর মধ্যে একটি যমীর আছে, যা جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। আর الأبواب হল, উক্ত যমীর থেকে بدل।

সুতরাং মূল ইবারত হল مفتحة هي الأبواب এবং তেমনি যেমনিভাবে 2) الرجلاليد زيدضرب زيد اليد والرجل بدلالة آبرদের উক্তি 4 बदल الإشتمال হয়েছে। তেমনিভাবে الأبواب শব্দটিও هي যমীর থেকে بدل | الاشتمال হয়েছে।

আল্লামা যমখশরীর তারকীবের কয়েকটি অংশের উপর প্রশ্ন আরোপিত হয়। তা হল, جنات শব্দটিকে কিভাবে মা'রেফা তথা নির্দিষ্ট বানানো হল। অথচ তাতে মা'রেফা বা নির্দিষ্ট করণের কোন কারণ পাওয়া যায় না। যদি বলা হয় যে, جَنَّاتِ عَدْنِ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ এর মধ্যে الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَنُ মা'রিফা, এবং তা جنات عدن -এর صفت। সুতরাং বুঝা গেল جنات عدن মা'রিফা বা নির্দিষ্ট।

এর জবাব আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযী রহ. এভাবে প্রদান করেছেন, صفت بدل, جنات عدن التي وعد الرحمن হতে নয়। এটাও লক্ষ্য রাখা চাই, الحسن ماب جنات عدن থেকে عطف بيان বলাও সহজ ব্যাপার নয়।

যেমনটি আল্লামা যামাখশরীর মত। কেননা মা'রিফা ও নাকিরা দু'টি ইস্ম তথা বিশেষ্যের মধ্যে একটিকে অপরটির থেকে عطف بيان বলার পক্ষে কেউ-ই মত পোষণ করেননি। কারণ এ ব্যাপারে দু'টি মত পাওয়া যায়। একটি হল, একমাত্র মা'রিফার عطف بان মা'রিফা-ই হয়। যা বসরাবাসী নাহুবিদদের মত। অপর মতটি হল, মা'রেফার عطف بيان মা'রিফা হয়। আর নাকিরার عطف بيان নাকিরা হয়। যা কুফাবাসী নাহুবিদগণ সহ আবূ আলী আল-ফারেসীর মত।

আর আল্লামা যামাখশরী যে বলেন, مفتحة এর মধ্যে এমন একটি যমীর আছে, যা جنات এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। এটাও সঠিক নয়। কেননা, বাক্যের বাহ্যরূপ তার পরিপন্থী। কেননা, তার-ই কারণে الأبواب শব্দটি পেশযুক্ত হয়েছে। আর তার মধ্যে যমীরও নেই।

এছাড়া তিনি যে বলেছেন, الأبواب শব্দটি بدل الإشتمال হয়েছে। অথচ, بدل الإشتمال এর ব্যাপারে স্বয়ং যামাখশরীও অন্যদের মত এ মত পোষন করেন, তাতে একটি যমীর থাকা আবশ্যক। যদিও কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষন করেছেন।

যমীর হওয়া যেহেতু জরুরী, সুতরাং যমীর শব্দে উল্লেখও থাকতে পারে, উল্লেখ না থেকে উহ্যও থাকতে পারে। এখানে শব্দে উল্লেখ নেই। তাহলে অবশ্যই তাকে উহ্য মানতে হবে। সে অবস্থায় মূল ইবারত হবে, الأبواب منها। সুতরাং মূল ইবারত হয়, مفتحة لهم هي الأبواب منها. এ অবস্থায় যমীর অধিক হয়ে যায়। অথচ যমীর কম ব্যবহার করা-ই হল উত্তম। (অতএব, তার মূল مفتحة لهم الأبواب منها মানা-ই উত্তম।(

সহীহায়নে১০৮ হযরত সাহল বিন সা'দ রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فى الجنة ثمانية أبواب، باب منها يسمى الريان لا يدخله إلا الصائمون জান্নাতে আটটি দরযা আছে। তন্মধ্যে একটির নাম রাইয়‍্যান। যা দ্বারা একমাত্র রোযাদাররা-ই প্রবেশ করবে।

সহীহায়নে১০৯ হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, من انفق زوجين في شيئ من الأشياء في سبيل الله ، دعي من أبواب الجنة، يا عبد الله هذا خير، فمن كان من أهل الصلوة دعي من باب الصلوة। যে ব্যক্তি যে কোন বস্তুর এক জোড়া আল্লাহ তা'আলার রাহে খরচ করবে, তাকে জান্নাতের দরযা হতে ডেকে বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। যে ব্যক্তি নামাযওয়ালা হবে (অধিক নামায আদায়কারী) ومن كان من أهل الجهاد دعي من باب الجهاد، ومن كان من أهل الصدقة دعي من باب الصدقة، ومن كان من أهل الصيام دعي من باب الريان তাকে বাবুস সালাত হতে আহ্বান করা হবে। আর যে জিহাদকারী হবে, তাকে বাবুল জিহাদ হতে আহ্বান করা হবে। আর যে অধিক সদকাকারী হবে, তকে বাবুস সাদাকাত থেকে আহ্বান করা হবে। আর যে অধিক রোযা পালনকারী হবে, তাকে বাবুর রাইয়্যান হতে আহ্বান করা হবে।

হযরত আবূ বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! ما على من دعى من تلك الأبواب من ضرورة فهل يدعى ! যে ব্যক্তিকে অবশ্যকীয়ভাবে সকল দরজা হতে আহবান করা হয়, তার কী হবে? এমন কেউ কি আছে যাকে সকল দুয়ার হতে একযোগে আহবান করা হবে? فقال نعم! وأرجوا أن تكون منهم রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আমি আশাবাদী যে, তুমি তাদের মধ্য হতে একজন হবে।

সহীহ মুসলিমে১১০ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ما منكم من أحد يتوضأ، فيبالغ في الوضوء، ثم يقول : أشهد أن لا إليه إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمد عبده ورسوله، إلا فتحت له أبواب الجنة الثمانية، يدخل من أيها شاء. তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অতি উত্তম রূপে ওযু করে ও ওযুর পর এ দু'আ পড়ে,

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لاشريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোনো মা'বুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। তার জন্য জান্নাতের আট দরযার সব কয়টি খুলে দেয়া হবে। সে যে দরযা' দিয়ে ইচ্ছা তা দিয়ে-ই প্রবেশ করতে পারবে।

ইমাম তিরমিযী এ শব্দাবলীও বৃদ্ধি করেছেন, اللهم اجعلني من التوابين، واجعلني من المتطهرين হে আল্লাহ আমাকে তাওবাকারীদের মধ্যে ও অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।

ইমাম আবূ দাউদ১১ ও ইমাম আহমদ১১২ বলেন, উক্ত দু'আ পড়ার পর আকাশের দিকে তাকাবে।

ইমাম আহমাদ রহ. হযরত আনাস রা. হতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গরূপে ওযু করে তিন বার এ দু'আ পড়বে,

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمد عبده ورسوله তার জন্য জান্নাতের আট দরযার সব কয়টি খুলে দেয়া হবে। যে দরযা দিয়ে ইচ্ছা সে দরযা দিয়েই সে প্রবেশ করতে পারবে।

হযরত উতবাহ ইবনে আবদুল্লাহ আস সালামী রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ما من مسلم يموت له ثلاثة من الولد لم يبلغوا الحنث، إلا تلقوه من أبواب الجنة الثمانية، من أيها شاء دخل.
কোন মুসলমানের তিনটি শিশু সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে (এবং সে এতে ধৈর্য ধারণ করেছে, কোন প্রকার অভিযোগ করেনি) সে সন্তান তার সাথে জান্নাতের আট দরযার যে কোন এক দরযায় সাক্ষাৎ করতে পারবে। সে এ আট ফটক বা দরযার যে কোনটি দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। উক্ত বর্ণনাটি ইবনে মাজার ১১৫ পৃ. সনদসহ বর্ণিত আছে।

টিকাঃ
১০৪. সূরা যুমার, আয়াত: ৭৩
১০৫. প্রাগুক্ত, আয়াত: ৭১
১০৬. প্রাজ্ঞ লেখক এখান থেকে الابواب শব্দের আলিফ লাম সম্পর্কে আরবী ভাষাবিদদের উক্তি উদ্ধৃত করছেন। সম্পূর্ণ ইলমী আলোচনা করেছেন। আহলে ইল্ম তথা আলিম সমাজের জন্য তা নিতান্তই জ্ঞানগর্ভ ইল্মী আলোচনা।
১০৭. সুতরাং তাদের প্রতি এ প্রশ্ন ছোঁড়া যায় না যে, আলিফ-লামের অর্থ এবং যমীরের অর্থ ভিন্ন। ফলে তা এর بدل বা স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। আর এ প্রশ্নের কোন ভিত্তি নেই। কাজেই এর দ্বারা কুফাবাসীদের মতবাদও বাতিল হয় না।
১০৮. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৬১, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৩৬৪
১০৯. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৫১৭, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ৩৩০
১১০. খ. ১, পৃ. ১২২
১১১. সুনানে আবী দাউদ, খ. ১, পৃ. ২৬
১১২. মুসনাদে আহমাদ, খ. ১, পৃ. ১৮৫
১১৫. ইবনে মাজার পৃ. ১১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00