📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের প্রমাণ ও তার জবাব
প্রথম প্রমাণ ও তার উত্তর
তারা বলেন, আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এমন ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, যা তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।
বিষয়টি শ্রবণের সাথে সম্পৃক্ত। রাসূলগণ কর্তৃক অবহিত করা ব্যতীত তা জানা সম্ভব নয়। সুতরাং এটি এমন এক বিষয়; যা সম্পর্কে আমরা এবং আপনারা সকলই একমাত্র কুরআন দ্বারা অবগতি লাভ করতে পারি। বিষয়টি যুক্তি দ্বারাও বুঝা সম্ভব নয়, স্বভাবজাতভাবেও বুঝা সম্ভব নয়।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বারা যা বুঝা যাবে, একমাত্র তার উপরই আমল করতে হবে। অতএব, আমরা আপনাদেরকে বলব, কোন সাহাবী বা তাবেঈ থেকে সহীহ অথবা হাসান পর্যায়ের কোন হাদীস পেশ করুন, যা এ কথা নির্দেশ করে, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ-ই ছিল, যা আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের জন্য তৈরী করেছেন। এটা আপনাদের জন্য সম্ভব নয়। অথচ আমরা আপনাদের সামনে সালাফ তথা পূর্বসূরীদের এমন ইবারাত (মন্তব্য) উপস্থাপন করেছি, যা তার বিপরীত অর্থ নির্দেশ করে। কিন্তু যেহেতু আলোচ্য ঘটনায় জান্নাত শব্দটি শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, আর এভাবে শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হলে তা সে জান্নাতের নামের অনুরূপ বুঝা যায়, যাকে আল্লাহ তা'আলা বান্দার নেক আমলের প্রতিদান প্রদানের জন্য তৈরী করেছেন এবং কিছু কিছু গুণাগুণের ক্ষেত্রে উভয়টির মাঝে কিছুটা সামঞ্জস্যও রয়েছে, যার ফলে অনেকে এ সংশয়ে পড়ে গেছে, এটি-ই হুবহু সেই জান্নাতুল খুলদ।
সুতরাং আপনারা যদি ফিতরাত দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নেন, তবে তা আপনাদের জন্য কোনো উপকার বয়ে আনবে না। আর ফিতরাত দ্বারা যদি সে ফিতরাত উদ্দেশ্য নেন, যে ফিতরাত বা স্বভাবের উপর আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন মানুষের ফিতরাতের দাবী হল, ন্যায় বিচারকে ভাল মনে করা আর অত্যাচারকে খারাপ মনে করা। অন্য কোনো স্বভাবজাত মানসিকতা নয়। তখনও আপনাদের দাবী বাতিল বলে গন্য হবে। কারণ, যখন আমরা আমাদের ফিতরাতের প্রতি লক্ষ্য করি, তখন আমরা এ বিষয়ের অবগতি সেভাবে লাভ করতে পারি না, যেমনি ভাবে পারি অবশ্যম্ভাবীর অস্তিত্বের আবশ্যকতা ও অসম্ভবের অস্তিত্বে না আসার বিষয়টি। যা এ কথার-ই প্রমাণ বহন করে, আলোচ্য বিষয়টি কোন ফিতরী বিষয় নয়।
দ্বিতীয় প্রমাণ ও তার জবাব
আপনারা হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, যাতে রয়েছে, 'হযরত আদম আ. বলবেন, তোমাদের পিতার পদস্খলনই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করেছে, তাহলে এখন সে পিতা কিভাবে তোমাদের জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করবে'। এ কথায় এটা প্রতীয়মান হয়, তাঁর দ্বারা দুনিয়ায় ত্রুটি হয়ে যাওয়ার দরুন তিনি জান্নাতের দরযা খোলা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখবেন। আর তিনি এ কারণেই জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যেমন অন্য এক স্থানে রয়েছে, তিনি বলেন, আমাকে একটি বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু আমি তা খেয়ে ফেলেছিলাম। তাহলে এতে এমন কি প্রমাণ আছে, যার দ্বারা বুঝা যায়, সেটি জান্নাতুল মা'ওয়া তথা স্থায়ী জান্নাত ছিল?
শব্দের মূল গঠনপ্রণালী বা তার মূল অর্থের অংশ বিশেষ বা মূল অর্থের জন্য আবশ্যকীয় কোন অর্থ, কোনো বিচার-বিশ্লেষণেই উক্ত বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনিভাবে হযরত মূসা আ. কর্তৃক আদম আ.-কে এ কথা বলা, اخرجتنا ونفسك من الجنة 'আপনি আমাদেরকেও জান্নাত থেকে বের করেছেন এবং নিজেকেও বের করেছেন।' এতেও এমন কোন প্রমাণ নেই, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুল্ল্দ ছিল। কারণ তিনি তো বলেননি, আপনি আমাদেরকে জান্নাতুল খুল্ল্দ থেকে বের করেছেন।
তৃতীয় প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ. পৃথিবীর বুকে কোনো এক উদ্যানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। কাজেই জান্নাত বলে যদি সেই পার্থিব স্বর্গীয় উদ্যানকেও বুঝানো হয় তারপরও হযরত আদম আ.-কে প্রদত্ত জান্নাত ও দুনিয়ার অন্যান্য উদ্যানের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। বরং তার তুলনায় তো এ উদ্যানসমূহ বন্দীশালার ন্যায় মনে হবে। এ উদ্যানগুলো পৃথিবীতে অবস্থিত জান্নাতের সাথে নামের দিক দিয়ে শরীক থাকায় এ কথা বুঝা যায় না, উভয়টার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকতে পারে না, যা অন্যান্য বস্তুর মাঝে হয়ে থাকে। আপনারা اهبطوا দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন, তা-ও ঠিক নয়।
কারণ هبوط শব্দটি আকাশ থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করার অর্থ প্রদান করা জরুরী নয়। বেশির চেয়ে বেশি বুঝা যায়, কোন উঁচু ভূমি থেকে নিম্নভূমিতে অবতরণ করা। هبوط-এর অর্থ কেউ অস্বীকার করতে পারবেন?
সুতরাং আমরা বলব, উক্ত জান্নাত পৃথিবীর কোন উঁচু ভূমিতে অবস্থিত ছিল, সেখান থেকে হযরত আদম আ. নিচু ভূমিতে অবতরণ করেছেন। আমরা প্রথমেই এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি, اهبطوا -এর উক্ত সম্বোধনের মাঝে হযরত আদম-হাওয়া আ. ও ইবলীস সকলই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অতএব, যদি তা আকাশে অবস্থিত জান্নাত হয়, তবে হযরত আদম আ.-কে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে ইবলীসকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পরও সে সেখানে যেতে কিভাবে সক্ষম হল? কাজেই এধরনের যুক্তি অত্যন্ত অস্পষ্ট, কল্পনাপ্রসূত ও হঠধর্মী দলীল।
চতুর্থ প্রমাণ ও তার উত্তর
তাদের চতুর্থ দলীল হল এই আয়াত وَلَكُمْ فِي الارض مُسْتَقَرٌّ পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।
এই আয়াত এ কথা বুঝায় না, তিনি ইতোপূর্বে পৃথিবীতে ছিলেন না। কেননা الأرض শব্দটি ইসমে জিন্স তথা শ্রেণীবাচক বিশেষ্য। অর্থাৎ তিনি পূর্বে এর চেয়ে উত্তম স্থানে ছিলেন, যেখানে ক্ষুৎ-পিপাসা ও তাপ কিছুই লাগত না। এমতাবস্থায় হযরত আদম আ.-কে দন্ডাদেশ জানিয়ে নির্দেশ দেয়া হল, আপনি এমন স্থানে নেমে যান, যেখানে এ সব ঝামেলার আপনাকে সম্মুখীন হতে হবে এবং সেখানে আপনাকে এভাবেই জীবনযাপন করতে হবে। সে স্থানেই কবর থেকে উত্থিত হবেন। বিপরীতে ইতোপূর্বে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যে জান্নাতে রেখেছিলেন, সেখানে কোন প্রকার ক্লান্তি, কষ্টক্লেশ কিছুই ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর যে স্থানে তাঁকে নামিয়ে দেয়া হল, তা বিভিন্ন ধরনের কষ্টক্লেশ ও ক্লান্তির স্থান।
কিন্তু আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা উক্ত জান্নাতের চিত্রায়নকালে এমন সব গুণাগুণ আর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, তা পৃথিবীর কোন উদ্যানের হতে পারে না। তার উত্তর হল, এ সব গুণাগুণ সম্পন্ন উদ্যান পৃথিবীর সে স্থানের ছিল না, যে স্থানে হযরত আদম আ.-কে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং এর দ্বারা আপনারা কিভাবে প্রমাণ করবেন, তিনি পৃথিবীর বাইর হতে পৃথিবীতে নির্বাসিত হয়েছেন?
পঞ্চম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ. জানতেন এ দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং যদি উক্ত জান্নাত এ পৃথিবীতে হত, তাহলে তিনি ইবলীসের মিথ্যাচার বুঝে ফেলতেন। কেননা, সে বলেছিল, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ "আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা।' এর উত্তর দু'ভাবে হতে পারে।
প্রথম উত্তর شَجَرَة الْخُلْدِ শব্দটি অমরত্বের সাথে সাথে স্থায়িত্বের অর্থও নির্দেশ করে। আর خلد শব্দটি دوام শব্দ থেকেও ব্যাপক; যা বিরামহীন দীর্ঘ অবস্থানকে বুঝায়। অভিধানে এর অর্থ হল, দীর্ঘ অবস্থান। আর প্রত্যেক বস্তুর দীর্ঘ অবস্থান তার নিয়ম অনুযায়ী-ই হয়ে থাকে। যেমন আরবগণ অশীতিপর বৃদ্ধের ক্ষেত্রে বলে থাকে, رجل مخلد এবং সে অর্থেই চুলার পাথরকে বলা হয়, خوالد। কারণ তা অনেক দিন স্থায়ী হয়। তেমনিভাবে আরবরা قديم শব্দটি সে ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে, যা দীর্ঘকাল বিদ্যমান থাকে। যদিও তার সূচনা নির্দিষ্ট থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ পুরাতন চন্দ্র শুষ্ক পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। তদ্রুপ কুরআন পাকে রয়েছে, انك لفي ضلالك القديم আপনি তো আপনার পুরাতন ভ্রান্তিতেই রয়েছেন।৮৮ কুরআন পাকে আরো রয়েছে, إفك قديم পুরাতন অপবাদ।
আল্লাহ তা'আলা অনেক নাফরমান বান্দার ক্ষেত্রে خلود في النار শব্দের ব্যবহার করেছেন। যেমন অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা বলেন, خالدين فيها জাহান্নামে দীর্ঘকাল অবস্থান করবে। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মহত্যাকারীর ক্ষেত্রে خلود في النار শব্দের ব্যবহার করেছেন।৮৯
দ্বিতীয় উত্তর এ কথা সর্বজনবিদিত, পৃথিবী যে ধ্বংসশীল এবং পরকাল যে সমাগত; এই জ্ঞান একমাত্র ওহীর মাধ্যমেই জানা সম্ভব। কিন্তু হযরত আদম আ.-এর পূর্বে তো কোন নবী ছিলেন না, যার মাধ্যমে এগুলো জানা সম্ভব। যদিও হযরত আদম আ.-কে নবুওয়াত দ্বারা সৌভাগ্যমণ্ডিত করা হয়েছে, তাঁর নিকট ওহী ও সহীফা প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন, হযরত আবূ যার রা.-এর হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এ সবই ছিল পৃথিবীতে অবতরণের পর। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, اهبطوا منها جميعا তোমরা সকলে জান্নাত থেকে নেমে যাও।৯০ إما ياتينكم مني هدى যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে। فمن تبع هداي فلا خوف عليهم ولا هم يحزنون তখন যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। فمن اتبع هداي فلا يضل ولا يشقى যে আমার পথ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না।৯১
ষষ্ঠ প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, الْجَنَّةِ শব্দের মধ্যে (الف لام) আলিফ লাম) নির্দিষ্ট অর্থ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর তা হল, জান্নাতুল মা'ওয়া। তার উত্তর হল, কুরআন কারীমে الْجَنَّةِ আলিফলাম যুক্ত ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা জান্নাতুল মা'ওয়া উদ্দেশ্য নয়। যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ আমি তাদের পরীক্ষা করেছি, যেমনিভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান অধিপতিগণকে।’৯২
সপ্তম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, বাক্যের পূর্বাপর আলোচনা দ্বারা বুঝে আসে ঘটনাটি পৃথিবীতে ঘটেনি। তার উত্তরে বলব, আমাদের উল্লিখিত দলীলসমূহ দ্বারা বুঝায়, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত পৃথিবীতে ছিল এবং এটাই সঠিক। কেননা, দলীলের সুস্পষ্ট অর্থকে বর্জন করে উদ্দেশ্যমূলক অস্পষ্ট অর্থ গ্রহণের বৈধতা নেই।
অষ্টম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা হযরত আবূ মূসা রা.-এর ঐ হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন, যেখানে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পর পাথেয় স্বরূপ জান্নাতের ফল দান করেছেন। এর দ্বারা এর বেশি কিছু প্রতীয়মান হয় না, হযরত আদম আ. জান্নাত থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরও পাথেয় স্বরূপ জান্নাতের ফল প্রাপ্ত হয়েছেন। এ বর্ণনায় এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই, তা জান্নাতুল খুলদ ছিল। কুরআনের তথ্যের বাইরে এখানে কিছু নেই।
নবম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, জান্নাতের ফল পচবে না, কিন্তু দুনিয়ার ফল পচে। আপনারা কোথায় পেলেন? হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের ফলমূল দুনিয়ার ফল-ফলাদির মত পচেনি।
অন্যদিকে বিশুদ্ধ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যদি বনী ইসরাঈল না হত, তবে গোশতে পরিবর্তন আসত না। অর্থাৎ তা নষ্ট হত না এবং গন্ধযুক্ত হত না। এছাড়াও আমরা দেখেছি, হযরত উযাইর আ.-এর খাদ্য পানীয় একশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আল্লাহর হুকুমে অবিকৃত ও অক্ষুন্ন ছিল।
দশম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ.-কে এ সুযোগ প্রদান করা হয়েছে, তিনি তাওবা করলে তাঁকে পুনরায় জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়া হবে। বিষয়টি এমনি, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রতিশ্রুতি কি তাঁকে হুবহু পূর্বোক্ত জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে ছিল? না জান্নাতুল খুলদের ব্যাপারে ছিল? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণও করেছেন। لعود শব্দটি পূর্বের অবস্থা বা সময় বা স্থানে ফিরিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। এমনকি পূর্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়াকেও আবশ্যক করে না। যেমন হযরত শুআইব আ. তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন, إن عدنا في ملتكم 'যদি আমি তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই, তবে তা অবশ্যই আল্লাহর প্রতি মিথ্যাচারের নামান্তর হবে। তিনি আমাকে রক্ষা করার পরও আমার জন্য কখনো সে ধর্মে ফিরে যাওয়া সমীচীন নয়। তবে আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, যিনি আমার প্রভু'। এখানে তো عود শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে عود শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে পূর্বের ধর্মে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপক অর্থে। অথচ হযরত শুয়াইব আ. পূর্বেও তাঁর স্বজাতির নাস্তিক্যবাদী ধর্মের অনুসারী ছিলেন না।
এছাড়াও ইলমে ফিকাহর পরিভাষায় যিহারকারী তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করলে বা সঙ্গমের ইচ্ছা করলে তাকে عائد প্রতিপন্ন করেছেন। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয়, عود দ্বারা ঠিক পূর্বোক্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার অর্থ নির্দেশ করা জরুরী নয়।
টিকাঃ
৮৮. সূরা ইউসূফ, আয়াত: ৯৫
৮৯. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা হল, অন্যায় ভাবে হত্যাকারী ও আত্মহত্যাকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং দীর্ঘকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে।
৯০. সূরা বাক্বারা, আয়াত: ৩৮
৯১. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২৩
৯২. সূরা কলাম, আয়াত: ১৭
📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের পক্ষে দলীল ও প্রতিপক্ষের জবাব
প্রথম দলীল ও তার উত্তর
তাদের কথা হল, আপনারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, জান্নাতুল খুলদে প্রবেশের সময় এখনো আসেনি; বরং কিয়ামতের দিন তাতে প্রবেশ করা যাবে। তা হল স্থায়ী প্রবেশের ব্যাপারে। কিন্তু জান্নাতুল খুলদে সাময়িক প্রবেশ কিয়ামতের পূর্বে হতে পারে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ রাতে তাতে প্রবেশ করেছিলেন। সাধারণ মু'মিন ও শহীদদের রূহ আলমে বরযখে থাকা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করে থাকে। এটা সে প্রবেশ নয়, কিয়ামতের দিন যে প্রবেশের কথা আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং প্রতীয়মান হল, স্থায়ীভাবে প্রবেশ কিয়ামতের দিনই হবে। কিন্তু আপনারা কোথায় পেলেন, কিয়ামতের দিনের পূর্বে কোনভাবে জান্নাতে প্রবেশ ঘটবে না? এর দ্বারা আপনাদের সে কথার জবাবও মিলে, জান্নাত হল দারুল খুল্দ তথা স্থায়ী নিবাস। আপনারা অন্য যে সব বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করেন, যেমন, উলঙ্গ হওয়া, ক্লান্তি, পেরেশানী, অনর্থক ও মিথ্যা কথা ইত্যাদি। এগুলো জান্নাতুল খুলদে হতে পারে না। এ সব বিষয়ই ঠিক।
আমরা এগুলো অস্বীকার করি না। এমনকি কোন মুসলমান-ই তা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এ সব বিষয় তখন, যখন মু'মিনগণ কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। সকল আয়াতের পূর্বাপর আলোচনা এটাই বুঝায়। সুতরাং প্রতীয়মান হল, উক্ত বিষয়াবলী না পাওয়ার বিষয়টি মু'মিনদের বেহেশতে প্রবেশের সাথে সম্পৃক্ত। এর দ্বারা জিন ও ইনসান দুই মুকাল্লাফ জাতির আদি পিতা হযরত আদম আ. এবং ইবলীসের জান্নাতে থাকার বিষয়টি অসম্ভব প্রমাণিত হয় না।
মু'মিনের জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের আমোদ-প্রমোদ ও আরাম-আয়েশের যে ঘটনা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন, তারা জান্নাতে প্রবেশের পরই সে আচরণ করা হবে। সুতরাং দু'টি বিষয়ে কোন বিরোধ নেই। আদম আ.-এর ঘটনা ও মু'মিনদের কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশের পরবর্তী ঘটনা সব-ই স্ব-স্ব জায়গায় ঠিক আছে।
দ্বিতীয় দলীল
আপনারা যে বলেন, জান্নাতুল খুল্ল্দ প্রতিদানস্থল ও তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান নয়। অথচ আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, সেখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে বাধ্যবাধকতা বা সীমারেখা আরোপ করেছেন। এর দ্বারা এ কথারই প্রমাণ বহন করে, আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুল্ল্দ ছিল না; বরং দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান ছিল। এর উত্তর দু'ভাবে হতে পারে।
প্রথম উত্তর
মু'মিনরা কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করার পর তা দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তার পূর্বে তা দারুত তাকলীফ হওয়া অসম্ভব নয়। আর তা অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীলও নেই। অসম্ভবই বা কিভাবে হতে পারে। অথচ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে। তিনি বলেন, دخلت البارحة الجنة، فرأيت امرأة تتوضأ إلى جانب قصر، فقلت : لمن أنت؟ আমি গত রাতে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে একজন মহিলাকে একটি প্রাসাদের নিকট ওযু করতে দেখলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার জন্য?
এটা অসম্ভব নয়, জান্নাতে কিয়ামত দিবসের পূর্বে এমন লোকগণ থাকবে, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে ও তাঁর ইবাদত করেছে; বরং এটাই বাস্তব বিষয়। সুতরাং জান্নাতে এখনও এমন লোকজন রয়েছেন, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন এবং তাঁর নির্দেশ লংঘন করেন না। চাই তাকে বাধ্যবাধকতা বলা হোক বা না হোক।
দ্বিতীয় উত্তর
সেখানে কাউকে সে সকল বিষয়ে মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়নি, যে সকল বিষয়ের অর্থাৎ নামায, রোযা, জিহাদ ইত্যাদির মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়ে থাকে দুনিয়াতে। সেখানে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি বৃক্ষ বা এক প্রকারের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এতটুকু বাধ্যবাধকতা তো দারুল খুল্দ তথা স্থায়ী নিবাসে হতেই পারে। যেমন, প্রত্যেক জান্নাতবাসীকে অন্যের পরিজনের নিকট যাওয়া থেকে বারণ করা হবে। যদি আপনাদের উদ্দেশ্য এটাই হয়, তাতে এতটুকু বাধ্যবাধকতাও থাকবে না, তবে তা প্রমাণবিহীন উত্তর বৈ কি? আর যদি আপনাদের উদ্দেশ্য হয়, দুনিয়ার ন্যায় বাধ্যবাধকতা থাকবে না, তবে তা সমর্থিত ও প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু তার দ্বারা আপনাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না।
তৃতীয় দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, হযরত আদম আ. সেখানে ঘুমিয়েছেন। অথচ জান্নাতবাসী তো নিদ্রা যাবে না। যদি এই বর্ণনা প্রমাণিত হয়, তবু এর দ্বারা এটাই বুঝা যাবে, তাদের নিদ্রার বিষয় নিষেধ করা হয়েছে স্থায়ীভাবে জান্নাতে প্রবেশের পর। কেননা, তারা সেখানে মৃত্যুবরণ করবে না। কিন্তু এর পূর্বের নিষিদ্ধতা কোনো ভাবে প্রমাণিত হয় না।
চতুর্থ দলীল ও তার উত্তর
আপনারা এ কথার দ্বারা দলীল পেশ করেন, হযরত আদম আ. কে সিজদা না করার কারণে যখন ইবলীসকে আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া হল, তার পরও সে প্রবঞ্চনা দেয়ার জন্য সেখানে কিভাবে গমন করল? আল্লাহর শপথ! এটি উক্ত মতের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় দলীল ও তাদের উক্তির বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টতর। ইবলীসকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পরও আকাশে আরোহণ ও জান্নাতে প্রবেশ করা সব-ই বাস্তবতা বিবর্জিত উক্তি। যা কোনো নীতিপরায়ণ ব্যক্তি সমর্থন করতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত পরীক্ষা ও পরীক্ষার নির্ধারিত উপকরণ ও মাধ্যম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাময়িকভাবে সে পর্যন্ত পৌছা অসম্ভব নয়। যদিও তা তার জন্য পূর্বের ন্যায় স্বতন্ত্র আবাসস্থল রূপে না হোক। জিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জিনরা আকাশে আরোহণ করত এবং এমন স্থানে বসতো, যেখান থেকে তারা ফিরিশতাদের আলোচনা শুনত। ফলে ওহীর কিয়দংশ তারা শুনে ফেলত। তাহলে এর মাধ্যমে জিনদের উপরের দিকে আকাশে উঠার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তবে তা সাময়িকভাবে হত। সেখানে তারা অবস্থান করতো না। এমনকি আল্লাহ তা'আলাও বলেন, اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ তোমরা পরস্পরে পরস্পরের শত্রুরূপে নিচে নেমে যাও।
সুতরাং নিচে নেমে যাওয়ার নির্দেশ এবং জিনদের উপরে উঠে ফিরিশতাদের কথা চুরি করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। এখানেও সে সম্ভাবনা বিদ্যমান।
আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর জীবনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এর ব্যাপারে হাদীস দ্বারা উক্ত মতকে মযবুত করেছেন। তার উত্তর হল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে তাঁর জীবনসীমা হিসাবে অবহিত করা আর জান্নাতুল খুলদে প্রবেশ করে কিছুকাল তাতে অবস্থান করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। আর আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে মৃত্যুবরণ করবে না এবং তা থেকে বের হবে না। তা হল, কিয়ামতের দিনে জান্নাতে প্রবেশের পর থেকে।
পঞ্চম দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন, এতে কোন প্রকার সন্দেহ ও সংশয় নেই। কিন্তু আপনারা এটা কোথায় পেলেন, হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির পূর্ণতাও পৃথিবীতেই হয়েছে। অথচ কোন কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত القاه على باب الجنة أربعين صباحا، فجعل إبليس يطوف به، ويقول لأمر خلقت؟ فلمارأه أجوف علم أنه خلق لا يتمالك আল্লাহ তা'আলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর চল্লিশ দিন যাবৎ জান্নাতের দ্বারে ফেলে রেখেছিলেন, তখন ইবলীস তাঁর আশে-পাশে ঘুরতে ঘুরতে বলল, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হল? যখন সে তাঁকে উদর বিশিষ্ট দেখতে পেল, তখন সে বুঝে ফেলল, এতো অক্ষম এক দুর্বল সৃষ্টি। তখন সে বলল, لئن سلطت عليه لأهلكنه যদি আমাকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেব,"৯৪ ولئن سلط علي لأعصينه আর যদি আমার উপর তাকে কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তার অবাধ্য হব।
وَعَلَّمَ آدم الأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَبُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلاء إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমস্ত ফিরিশতার সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও৯৫।
قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র, আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান-ই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।
قَالَ يَا آدم أَنْبِئُهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ، فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ তিনি বললেন, হে আদম! তাদেরকে এ সকল নাম বলে দাও। সে তাদেরকে সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে আমি অবহিত।৯৬
এতে এ কথা-ই বুঝা যায়, হযরত আদম আ. সে ফিরিশতাদের সঙ্গে আকাশেই ছিলেন। কেননা, তিনি-ই তো তাদেরকে সে সকল নাম সম্পর্কে অবহিত করেছেন। অন্যথায় সে ফিরিশতাদের এ পৃথিবীতে নেমে আসার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। অথচ যখন তারা হযরত আদম আ.-থেকে সকল বস্তুর নাম শুনেছিলেন, তখন তাঁরা পৃথিবীতে অবতরণ করেননি।
আর যদি হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টি আদ্যোপান্ত পৃথিবীতেই হয়ে থাকে, তবু এটা অসম্ভব নয়, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সে কাজ বাস্ত-বায়নের জন্য আকাশে তুলে নিয়েছিলেন, যা তাঁর ব্যাপারে তিনি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সংক্ষেপে একথাগুলো হযরত আদম আ.-এর জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের ব্যাপারে জোর দাবীকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের যুক্তির জবাব। والله أعلم |
টিকাঃ
৯৪. এ বিষয়ের অনেক বর্ণনা মুসলিম শরীফ ২য়. পৃ. ৩২৭ ও মুসনাদে আহমাদ, খ. ৩, পৃ. ২৫৪ তে ভিন্ন শব্দে বর্ণিত রয়েছে।
৯৫. সূরা বাক্বারা ৩১
৯৬. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩২-৩৩
📄 জান্নাতের বর্তমান অস্তিত্ব অস্বীকারকারীদের কিছু যুক্তি
তারা বলে, যদি জান্নাত এখনি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাহলে কিয়ামতের দিন তা অনিবার্যভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলার এই আয়াতে কারীমাহ কিয়ামত দিবসে সকল কিছু হয়ে যাওয়ার দ্ব্যর্থ ঘোষণা করে। তিনি ইরশাদ করেন, كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ তিনি ছাড়া সব কিছুই ধ্বংস হবে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ প্রতিটি আত্মা-ই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।৯৭
তাহলে জান্নাতের ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হরেরাসহ সেবাদাসেরা মারা যাবে। অথচ আল্লাহর ঘোষণামতে জন্নাত হচ্ছে চিরস্থায়ী নিবাস। তার মধ্যকার সবকিছুই মৃত্যুহীন, অমর। আল্লাহর ঘোষণা অনুযাই জান্নাতের মাঝে কোনো প্রকার ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। তারা আরো বলেন, ইমাম তিরমিযী রহ. তাঁর জামে' তিরমিযীতে৯৮ হযরত ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لقيت إبراهيم ليلة أسرى بي، فقال يا محمد إقرأ أمتك مني السلام. وأخبرهم أن الجنة طيبة التربة عذبة الماء، وانها قيعان، وان غراسها سبحان الله والحمد لله ولا إله إلا الله والله أكبر আমি মি'রাজ রাতে ইবরাহীম আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম, তখন তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনার উম্মতকে আমার সালাম পৌছে দিন। তাদের জানান, জান্নাত হল পবিত্র মাটি ও সুপেয় মিষ্ট পানি বিশিষ্ট। তবে তা বৃক্ষরাজিহীন। কিন্তু سُبْحَانَ الله وَالْحَمْدُ لله وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ হল তার বৃক্ষ।
ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে غریب حسن-এর পর্যায়ে বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত জাবির রা.-এর বর্ণনায়৯৯ এশব্দাবলীও রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একবার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী পড়ে, তার জন্য জান্নাতে একটি বৃক্ষ রোপণ করা হয়। তিরমিযী উক্ত হাদীসটিকে صحیح حسن-এর স্তরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তারা আরো বলেন, যদি জান্নাত এখনি পুরোপুরি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে, তাহলে এখনো তার বৃক্ষশূন্য হওয়ার কোনো যুক্তি হয় না। এরপর আবার তাতে বৃক্ষ রোপণের কোন অর্থই হতে পারে না।
তাদের আরো যুক্তি হল, কুরআন কারীমের বর্ণনা মতে ফিরআওনের স্ত্রী বলল, 'হে আল্লাহ! জান্নাতে আমার জন্য ঘর তথা প্রাসাদ তৈরী করুন'। আর এটা অসম্ভব, কোন ব্যক্তি কাউকে কাপড় বানিয়ে দেয়ার পরও তাকে উক্ত ব্যক্তি বলবে, আমাকে কাপড় বানিয়ে দাও। এমনিভাবে কেউ ঘর তৈরী করে দেয়ার পরও তাকে বলবে, আমাকে ঘর তৈরী করে দাও। এর চেয়েও স্পষ্টতর হচ্ছে এ হাদীস, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من بنى الله مسجدا بنى الله له بيتا في الجنة (যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিকল্পে কোন মসজিদ তৈরী করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরী করবেন।১০০
উক্ত হাদীসের বাক্যটি (شرط وجزاء )শর্ত ও জাযা) দ্বারা গঠিত। এর চাহিদা হল, শর্ত পাওয়া যাওয়ার পর তবেই জাযা পাওয়া যাবে। এটাই আরবী ভাষাভাষীদের সর্বসম্মত নীতি।
হাদীসটি হযরত উসমান রা., হযরত আলী রা., হযরত জাবির রা., হযরত আনাস বিন মালিক রা., হযরত আমর ইবনে আমবাসা রা. প্রমুখের সূত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পরিষ্কার বিবৃত।
তারা আরো বলেন, হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত, ফিরিশতাগণ জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ করেন। যতক্ষণ বান্দা নেক আমল করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরিশতাগণ এগুলোর দেখাশুনা করেন। আর যখন বান্দা নেক আমলের মধ্যে ত্রুটি করে, তখন ফিরিশতাগণও তার তত্ত্বাবধানে ত্রুটি করেন।
ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ-এর মধ্যে এবং ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর মুসনাদে হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إذا قبض الله ولد العبد، قال ياملك الموت قبضت ولد عبدي قبضت قرة عينه، وثمرة فؤاده، قال نعم قال فما قال؟ قال حمدك واسترجع قال إبنوا له بيتا في الجنة، وسموه بيت الحمد যখন আল্লাহ তা'আলা কোন ব্যক্তির অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু সন্তানকে মৃত্যুদান করেন, তখন মৃত্যুদূতকে ডেকে বলেন, হে মৃত্যুর ফিরিশতা! তুমি তো আমার বান্দার শিশু সন্তানটির জান কব্য করলে, তার আঁখির শীতলতা ও হৃদয়ের মণিকে তুলে নিলে। তখন ফিরিশতা বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা তখন কী বলল? ফিরিশতা বলেন, বান্দা এতেও আপনার প্রশংসা করেছে ও إنا لله وإنا إليه راجعون পড়েছে।
তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, তার জন্য জান্নাতে একটি ভবন তৈরী কর এবং তাকে বাইতুল حمد (بيت الحمد) (প্রশংসালয়) নামে নামকরণ কর।
মুসনাদে আহমাদে এক হাদীসে একথাও রয়েছে من صلى في يوم وليلة ثنتى عشرة ركعة سوى الفريضة بنى الله له بيتا في الجنة যে ব্যক্তি ফরয নামায ব্যতীত বার রাকাত নামায পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ভবন তৈরী করবেন।
তারা বলেন, এটি কোন বিদআতী বা মু'তাযিলাদের মত নয়। যেমনটা আপনারা ধারণা করে থাকেন। বরং এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্য হতেই অনেকের মত।
ইবনে মুযায়ন রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে এ ব্যাপারে হযরত ইবনে নাফে' রা.-এর মত উল্লেখ করেছেন। তিনি তো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জান্নাত কি সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে চুপ থাকা-ই শ্রেয়। والله أعلم
টিকাঃ
৯৭. সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫
৯৮. খ. ২, পৃ. ১৮৪
৯৯. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ১৮৪
১০০. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৬৪, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ২০১
📄 পূর্বোক্ত সংশয়সমূহের সুষ্ঠু নিরসন
প্রথম অধ্যায়ে জান্নাতের বিদ্যমান সৃষ্টরূপ প্রমাণিত করার জন্য যে অকাট্য দলীল পেশ করা হয়েছে তা সংশয়বাদীদের সংশয় নিরসনের জন্য যথেষ্ট। তার পরেও আমরা তাদের প্রতিটি সংশয়ভরা যুক্তির যথার্থ জবাব পেশ করছি।
প্রথম দলীল ও তার উত্তর
আমরা বলব, জান্নাত এখনো সৃষ্টি করা হয়নি; একথার দ্বারা কী উদ্দেশ্য? যদি এর দ্বারা শুধু এই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, এখনো জান্নাত অস্তিত্বে আসেনি; বরং তা শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া ও মানুষের কবর থেকে উঠার ন্যায় বিষয়। তাহলে তো এটা একটি বাতিল মত। যা উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ দ্বারা অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। সামনেও এরূপ কতিপয় হাদীস উল্লেখ করা হবে। এটি এমন একটি মত, যে মতটি পূর্ববর্তীগণ ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মধ্য হতে কেউ-ই পোষণ করেননি। সুতরাং এটি অবশ্য-ই একটি বিভ্রান্ত মত।
আর যদি এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, জান্নাত এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে সৃষ্টি করা হয়নি। তার মধ্যে অবস্থিত বস্তুসমূহ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। বরং আল্লাহ তা'আলা ধারাবাহিকভাবে সে সব বস্তু সৃষ্টি করবেন। আর যখন মু'মিনগণ সেখানে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য বস্তুও সৃষ্টি করবেন। এটা বাস্তবসম্মত মত। কোনভাবেই তা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। আপনাদের উত্থাপিত দলীলাদি দ্বারা শুধু এটুকু-ই বুঝা যায়।
আপনারা হযরত ইবনে মাসউদ রা. ও হযরত জাবির রা. এর যে হাদীস উল্লেখ করেছেন, তার দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্টতর হয়, সে জান্নাতের যমীন সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর যিকিরকারীদের জন্য যিকিরের প্রতিদান স্বরূপ সে যমীনে বৃক্ষ রোপণ করবেন। এমনিভাবে সে সকল আমলের বদৌলতে প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়ে থাকে, যে আমলের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বান্দা যখন নেক আমল করে থাকে, তখন তার প্রতিদান স্বরূপ সেখানে বৃক্ষ রোপিত হয় ও প্রাসাদ নির্মিত হয়। আমলের কারণে বিভিন্ন প্রকারের সে সকল বস্তু সৃষ্টি করা হয়, যার দ্বারা জান্নাত এখনো সজ্জিত হয়নি।
দ্বিতীয় দলীল ও তার জবাব
আপনারা আল্লাহ তা'আলার বাণী كُلُّ شَيْءٍ هَالَكَ إِلَّا وَجْهَهُ দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন, তা ঠিক নয়। কেননা, আপনারা স্বীয় অজ্ঞতার দরুন আয়াতের সঠিক অর্থ করতে সক্ষম হননি।
উক্ত আয়াত দ্বারা জান্নাত বর্তমানে বিদ্যমান না থাকার উপর দলীল পেশ করা তেমনি, যেমনি আপনারা জান্নাতবাসীদের মৃত্যুবরণ করা ও ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে দলীল পেশ করে থাকেন।
উক্ত আয়াতের অর্থ আপনারাও বুঝতে সক্ষম হননি। আপনাদের পক্ষের অন্য কেউ-ই বুঝতে সক্ষম হয়নি। উক্ত আয়াতের অর্থ মূলতঃ সালাফ ও আইম্মায়ে ইসলামের উক্তির অনুরূপ। নিম্নে তাঁদের কতিপয়ের উক্তি উপস্থাপিত হল।
ইমাম বুখারী রহ. স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেছেন, তাঁর সত্তা ব্যতীত সকল বস্তু ধ্বংস হয়ে যাবে। إلاّ وَجْهَهُ অর্থ হল, إلا ملكه অর্থাৎ একমাত্র তাঁর রাজত্ব ও আধিপত্য অবশিষ্ট থাকবে।
কেউ কেউ বলেন, إِلَّا وَجْهَهُ অর্থ হল ما أريد به وجهه অর্থাৎ, সব বস্তু-ই ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তাঁর সত্তা যে সব বস্তু অবশিষ্ট রাখার ইচ্ছা করবেন।
ইমাম আহমদ রহ. বলেন, 'যেহেতু আকাশ-পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, সুতরাং তাতে বসবাসকারীগণ জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কিন্তু আরশ ধ্বংসও হবে না, তার পরিসমাপ্তিও ঘটবে না। যেহেতু তা জান্নাতের ছাদ স্বরূপ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাতে সমাসীন, তাই তা ধ্বংসও হবে না এবং তার পরিসমাপ্তিও ঘটবে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার বাণী كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ এর মর্মার্থ হল, যখন আল্লাহ তা'আলা مِّنْ كُلِّ شَيْءٍ (সকল বস্তু-ই ধ্বংস হয়ে যাবে,) আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন, তখন ফিরিশতাগণ বেঁচে থাকার খায়েশ পেশ করার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বললেন, অবশ্যই আকাশ-পৃথিবী সব ধ্বংস হয়ে যাবে। إِلَّا وَجْهَهُ كُلُّ شَيْءٍ একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সত্তা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। একমাত্র তাঁর সত্তা-ই মৃত্যুবরণকারী নয়। তখন ফিরিশতাগণ নিজেদের মৃত্যুর বিষয়টির নিশ্চিতরুপে বুঝতে পারল।'
কিতাবুত তাকাতে হযরত আবুল হাসান রহ. ইমাম আহমাদ রহ. এর অন্য অভিমতও নকল করেছেন। যেখানে বলেন, এটি-ই আহলে ইলম, জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, হাদীসবেত্তা ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা যায়। এটি-ই সাহাবায়ে কিরাম রা. থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল অনুসরণীয় ব্যক্তিবৃন্দের অভিমত। সিরিয়া, হিজাজ ও অন্যান্য স্থানের যে আলিমগণের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদেরকে আমি এ মত পোষণকারী-ই পেয়েছি। আর এ মাযহাবের যে বিরোধিতা করবে বা তাকে তিরস্কার করবে বা এ মত পোষণকারীকে দোষারোপ করবে, সে বিরোধিতাকারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রতিপক্ষ ও বিদ'আতী বলে সাব্যস্ত হবে। সে সুন্নাতের পথ তথা সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত। উলামায়ে কিরামের এ উক্তিসমূহ সামনে উল্লেখ করে বলেন, জ্ঞাতব্য তার মধ্যকার বস্তু নিয়ে স্থিত হতে হয়েছে এবং দোষও তার মধ্যকার বস্তু নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা জান্নাত-জাহান্নাম উভয়টাকে সৃষ্টি করেছেন আর এগুলোর জন্য মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। সেগুলো কখনো ধ্বংস হবে না এবং সেগুলোর মাঝে যা আছে, তাও কখনো ধ্বংস হবে না।
বিদ'আতী মতবাদ পোষণকারী কুরআন কারীমের আয়াত إِلَّا وَجْهَهُ كُلُّ شَيْءٍ বা এ জাতীয় অন্যান্য আয়াত, যা মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত তা দ্বারা দলীল পেশ করে। তাদের সংশয়ের উত্তরে বলা হবে, যে সকল বস্তুর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা চূড়ান্ত ফায়সালা করেছেন, সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে আয়াত দ্বারা সেগুলো-ই উদ্দেশ্য। আর বেহেশত ও দোযখ আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করার জন্য নয়; বরং স্থায়ীভাবে রাখার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তা ছাড়া দুনিয়ার বস্তুসমূহ হল ধ্বংসশীল আর জান্নাত ও দোযখ হল আখিরাতের বস্তু। দুনিয়ার বস্তু নয়। ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হূর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। কিয়ামতের দিনও নয়। শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়ার দিনও নয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে ধ্বংসের জন্য নয়; বরং স্থায়িত্বের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সেগুলোর জন্য মৃত্যু নির্ধারণ করেননি।
সুতরাং যে এর বিপরীত মত পোষণ করে, সে বিদ'আতী ও সঠিক পথ হতে বিচ্যুত। আল্লাহ তা'আলা উর্ধ্ব ও নিম্ন স্তর হিসাবে সাত আকাশ ও সাত যমীন সৃষ্টি করেছেন। সর্বাপেক্ষা নিম্নের আকাশ ও সর্বাপেক্ষা উপরের যমীনের মধ্যে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। প্রত্যেক আকাশ থেকে অন্য আকাশের মধ্যেও পাঁচশত বছরের দূরত্ব। সর্বাপেক্ষা উপরের আকাশ অর্থাৎ সপ্তম আকাশের উপর পানি রয়েছে। পানির উপর হল আল্লাহ তা'আলার আরশ। তিনি আরশের উপর সমাসীন। কুরসী হচ্ছে তাঁর কুদরতী পদযুগল রাখার জায়গা। ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডলে যা কিছু আছে ও তার মধ্যবর্তী স্থলে যা কিছু আছে এবং সর্বনিম্ন যমীনের নিচে যা কিছু আছে, সবকিছুই তিনি জানেন। সমুদ্র বক্ষে, প্রতিটি রোম কূপে, প্রতি বৃক্ষে, শস্যক্ষেত্রে, উদ্ভিদের ডগায় ডগায়, পাতা ঝরার স্থানে, প্রতিটি কংকর, ধুলো ও বালিতে, সুবিশাল পাহাড়-পর্বতের খাঁজে খাঁজে এমনকি বান্দাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, স্পন্দন, পদক্ষেপের সমুদয় তাঁর নখদর্পণে।
তাঁর নিকট কিছুই গোপন নয়। তিনি সপ্তম আকাশের উপর আরশের উপর সমাসীন (তাঁর শান মুতাবিক)। তার নিচে আগুন, নূর ও অন্ধকারের পর্দা রয়েছে। এমন এমন বস্তু রয়েছে, যা একমাত্র তিনি-ই জানেন।
সুতরাং যদি কোন বিদ'আতী মতবাদ পোষণকারী এ মতবাদের বিপরীতে আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা দলীল পেশ করে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর ১০১ আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ তোমরা যেখানেই থাক, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। ১০২
আল্লাহ তা'আলা অন্য ইরশাদ করেন, مَا يَكُوْنُ مِنْ نَّجْوَى ثَلٰثَةٍ اِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ তিনি তাঁদের সঙ্গেই আছেন তাঁরা যেখানেই থাকুক না কেন। ১০৩ তেমনিভাবে তাঁর বাণী, যদি তিনজন পরামর্শকারী থাকে, তবে চতুর্থজন হলেন তিনি (আল্লাহ তা'আলা)। যদি পাঁচজন থাকে, তবে ষষ্ঠ জন হলেন তিনি।
এ জাতীয় অন্যান্য মুতাশাবিহাত আয়াত দ্বারা দলীল পেশ করেন, তবে আমরা তার উত্তরে বলব, আল্লাহ তা'আলা সব কিছুই জানেন। কেননা, আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর আরশের উপর। তাই তিনি সব কিছু জানেন। তিনি মাখলুক থেকে ভিন্নতর। কোন কিছুই তাঁর অবগতির বাইরে নয়।
আবু জা'ফর তাহির বর্ণনায় রয়েছে, খিলাল রহ. ছিলেন, সমকালীন ইল্ম ও মারিফাতের অত্যন্ত খ্যাত ও নেতৃত্বনীয় ব্যক্তিত্ব। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন ও তাঁর মতামত গ্রহণ করতেন। তাঁর নিকট তাঁর শহরের বিভিন্ন লোকের হাল-হাকীকতের তথ্য নিতেন। তিনি বলেন, আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. থেকে অনেক কিছু লিখেছি। তদুপরি সুন্নাত সম্পর্কে একটি পুস্তিকার কথা উল্লেখ করলেন। তার মাঝে তিনি বলেন, জান্নাত ও দোযখ উভয়টি সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে (সহীহায়নে উল্লিখিত বিভিন্ন হাদীসের অংশ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, دَخَلْتُ الْجَنَّةَ فِي আমি জান্নাতে প্রবেশ করে একটি প্রাসাদ দেখেছি, তাতে হাউযে কাওসার দেখেছি এবং উঁকি মেরে দোযখ দেখেছি। তার মধ্যে অধিকাংশ অধিবাসীকে এমন এমন দোষে অভিযুক্ত অবস্থায় পেয়েছি। رَأَيْتُ فِيْهَا قُصَرًا، وَاطَّلَعْتُ فِي النَّارِ، فَرَأَيْتُ أَكْثَرَهَا كَذَا وَكَذَا.
সুতরাং যে এ আকীদা পোষণ করে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃষ্টি হয়নি, সে প্রকারান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরআনকে-ই মিথ্যা প্রতিপন্ন করল ও জান্নাত-জাহান্নামকে অস্বীকার করল। সে ব্যক্তিকে এ ভুল আকীদা থেকে তওবা করতে বলা হবে। যদি তওবা করে, তবে তো ভাল। অন্যথায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। (কেননা সে ধর্মদ্রোহী)।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে আব্দুস ইবনে মালিক আত্তারও এমন বর্ণনা করেছেন। সে বর্ণনার শেষাংশে এ-ও রয়েছে, যে ব্যক্তি এ আকীদা পোষণ করে, জান্নাত ও জাহান্নাম এখনো সৃজিত হয়নি, সে কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। আমি মনে করি না, সে ব্যক্তি জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য হওয়ার ব্যাপারে ঈমান আনয়নকারী।
সুতরাং উল্লিখিত অধ্যায়সমূহের মাসাইল ও তার মধ্যে উল্লিখিত কুরআন-সুন্নাহ ও সলাফদের থেকে বর্ণিত মতসমূহ, গবেষণালব্ধ জ্ঞান, অন্তর্নিহিত গূঢ়তথ্য ও তত্ত্ব গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করুন। এগুলো এমন কতগুলো বিষয়, যেগুলো এ গ্রন্থ ব্যতীত অন্য কোন গ্রন্থে একত্রে এ ভাবে পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে আমি সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করেছি। যদি বিস্তারিত করতাম, তবে এতেই দীর্ঘ কলেবর বিশিষ্ট একটি গ্রন্থ রচিত হয়ে যেত। সাহায্য একমাত্র আল্লাহর নিকট-ই চাওয়া যায়। ভরসা একমাত্র তাঁরই উপর করা যায়। সঠিক কথা ও কাজের তাওফীক দানকারী একমাত্র তিনি-ই।
টিকাঃ
১০১. সূরা ক্বাফ, আয়াতঃ ১৬
১০২. সূরা হাদীদ, আয়াতঃ ৪
১০৩. সূরা মুজাদালা, আয়াতঃ ৭