📄 জান্নাতুল খুলদে আদম আ.-এর অবস্থানের প্রমাণ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সব শ্রেণীর মানুষকে যেই স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেই বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করেছি। আর আমাদের এ বক্তব্য সকল ব্যক্তিই সমর্থন করবে। কারো মনে এর উপর দ্বিমতের বাসনা জাগবে না।
ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় গ্রন্থ 'সহীহ মুসলিমে'৬২ হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত হুযাইফা রা. হতে বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন হাশরের ময়দানে মানুষদের একত্রিত করবেন, তখন মু'মিনগণ এমন অবস্থায় উঠবে, জান্নাত তাদের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। তারা তখন হযরত আদম আ.-এর নিকট গিয়ে বলবেন, আব্বাজান! জান্নাতের দরযা খোলার ব্যবস্থা করুন। তখন হযরত আদম আ. বলবেন, তোমাদেরকে তো তোমাদের পিতার ভুলের কারণেই জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে।
জান্নাতুল খুলদ হওয়ার প্রবক্তারা এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করে পেশ করে বলে, যে জান্নাত হতে আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন এটি সে জান্নাত- ই, যে জান্নাতের প্রার্থনা কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানরা করবে। সহীহায়নে৬৩ হযরত আদম আ. ও হযরত মূসা আ.-এর পারস্পরিক তর্কের হাদীসটি রয়েছে। যাতে আছে, হযরত মূসা আ. হযরত আদম আ.-কে বললেন, 'আপনি আমাদেরকে সহ নিজেকেও জান্নাত হতে বের করেছেন'। যদি ঘটনাটি পৃথিবীতেই ঘটত, তাহলে সবাই পৃথিবীর কোনো উদ্যান হতে বিতাড়িত হতেন। জান্নাত থেকে নয়।
এমনিভাবে মু'মিনদের লক্ষ্য করে হযরত আদম আ.-এর উক্তি هل أخرجكم من الجنة إلاخطيئة أبيكم তোমাদেরকে তোমাদের পিতার ভুল-ই জান্নাত থেকে বের করেছে। (এতে প্রতীয়মান হয়, সেটি পৃথিবীতে ছিল না।) কেননা মু'মিনদেরকে তো দুনিয়ার উদ্যান থেকে বের করা হয়নি।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে সূরা বাকারায় ইরশাদ করেন, يَآدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ وَكُلاَ مِنْهَا رَغَداً حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذه الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেথা হতে ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। فَأَزَلْهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ অতঃপর শয়তান তা থেকে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে বের করল। আমি বললাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও, পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।৬৪
সুতরাং উক্ত আয়াত এ কথাই বুঝায়, হযরত আদম আ. জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। তার দু'টি কারণ। প্রথমতঃ 'إهبطوا হলো, উপর থেকে নিচে নামা। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন, পৃথিবীতে কিছু কাল তোমাদের বসবাস করতে হবে। আর এ শব্দ বলেছেন, إهبطوا-এর পরে। সুতরাং এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয়, তিনি ইতোপূর্বে পৃথিবীতে ছিলেন না। তার সমর্থনে সূরা আ'রাফে ইরশাদ হচ্ছে, فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ পৃথিবীতেই তোমাদের জীবন, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে। এবং তথা হতে তোমাদেরকে বের করে আনা হবে'।৬৫
যদি উক্ত জান্নাত পৃথিবীতেই হত, তবে জান্নাতী জীবনের পূর্বাপর জীবনও পৃথিবীতে ছিল। তাহলে এ কথা বলা কিভাবে ঠিক হল, জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর তোমাদের জীবন পৃথিবীতেই কাটাতে হবে।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের যে গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, সে গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর কোন উদ্যানের হতে পারে না। বরং তা একমাত্র জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতের-ই হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّ لَكَ أَلا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى তোমার জন্য ব্যবস্থা এমন যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না, নগ্নও হবে না এবং সেখানে পিপাসার্ত ও রৌদ্রক্লিষ্ট হবে না।৬৬
এ তো পৃথিবীতে কোন রূপেই সম্ভব নয়। চাই কোন ব্যক্তি এ পৃথিবীর উঁচু থেকে উঁচুতম স্থানে থাকুক, সে এ বিষয়গুলির কোন না কোনটির সম্মুখীন হবেই। আল্লাহ তা'আলা جوع -এর বিপরীতে ظمأ, عرى, ضحى শব্দ এনেছেন। সুতরাং جوع দ্বারা উদ্দেশ্য হল অভ্যন্তরীন অপমান, আর عرى দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বাহ্যিক অপমান। ظمأ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা, আর ضحی দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বাহ্যিক তাপ। তাহলে জান্নাতে বসবাসকারীদের থেকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবধরনের অপমান, উষ্ণতা হতে মুক্ত পরিবেশ দেয়া হচ্ছে। কাজেই তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নগ্নতা ও রৌদ্রের প্রখরতার মুখামুখি হতে হচ্ছে না। এধরনের পরিবেশ একমাত্র জান্নাতুল খুলদেই সম্ভব। অন্য কোথাও নয়।
আরো বলেন, যদি উক্ত জান্নাতটি পৃথিবীতেই হত, তাহলে আদম আ. ইবলীসের মিথ্যা প্রতারণা সম্পর্কে জানতে পারতেন। যেহেতু শয়তান বলেছে, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَة الْخُلْدِ وَمُلْكِ لَا يَبْلَى অর্থাৎ আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা?৬৭
আর আদম আ. জানতেন, এ পৃথিবী অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এবং এ পৃথিবীর রাজত্ব অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু।
এমনিভাবে তারা আরো বলেন, এ ঘটনা সূরা বাক্বারায় আরো স্পষ্টভাবে রয়েছে, হযরত আদম আ. কে যে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে, তা আকাশে ছিল। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لآدم فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ এবং যখন ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।
وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَداً حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথা হতে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দে আহার কর। কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
فَأَزَلُهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ শয়তান তা থেকে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কৃত করল। আমি বললাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও, পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা থাকবে।
فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল। ফলে আল্লাহ তাঁর প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।৬৮
জান্নাত হতে আদম আ. ও হাওয়া আ. ও মরদূদ শয়তানকে অবতরণ করতে হয়েছে। সে জন্যই اهْبِطُوا বহুবচন বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই আয়াতে হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর সাথে সে সাপের অবতরণের নির্দেশ হয়েছিল। কিন্তু এটি অত্যন্ত দুর্বল মত। কেননা, হযরত আদম আ.-এর ঘটনায় সাপের কোন উল্লেখও নেই এবং আলোচনার পূর্বাপর দ্বারাও তা বুঝা যায় না।
কেউ কেউ বলেন, أهبطوا দ্বারা হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. দুজনকেই সম্বোধন করা হয়েছে। দু'জনের ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহারের আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন, হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ.-এর ঘটনায় বলা হয়েছে, وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম, তাদের বিচার।৬৯ এখানে হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আ. তাঁরা দু'জন হওয়া সত্ত্বেও বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর সাথে সাথে তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতিও যেহেতু অবতরণের নির্দেশ ছিল একারণে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। মূলতঃ প্রথম মতটি ব্যতীত সবই দুর্বল। কারণ, এ মতগুলো সব কয়টিই দলীলবিহীন দাবী মাত্র। তা ছাড়া আয়াতের শব্দাবলীও সেগুলোর বিপরীত বুঝায়। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হল, أهْطُواً-এর সম্বোধনে (অর্থাৎ জান্নাত থেকে বের হওয়ার নির্দেশে) হযরত আদম আ. ও হযরত হাওয়া আ.-এর সাথে ইবলীসও শরীক ছিল। সেও অবতরণ করেছে। সুতরাং এ কথা যখন দৃঢ় হয়ে গেল, আল্লাহ তা'আলা পুনরায় অবতরণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন, قُلْنَا أَهْبِطُواً مِّنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ আমি বললাম, তোমরা সকলই এ স্থান হতে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎ পথের কোন নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।৭০
উক্ত আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়, জান্নাত হতে অবতরণের প্রথম নির্দেশ এবং এ নির্দেশ দু'টি স্বতন্ত্র। প্রথমোক্ত নির্দেশ হল, জান্নাত থেকে অবতরণের। আর দ্বিতীয় নির্দেশ হল, আকাশ থেকে পৃথিবীতে অবতরণের। সুতরাং যে জান্নাত থেকে তাঁদেরকে অবতরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, তা ছিল আকাশে, আর সেটিই তো জান্নাতুল খুলদ।
আল্লামা যামাখশারী রহ.-এর মত হল, أهبطوا منها جميعاً -এর দ্বারা সম্বোধন হল, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.। তবে তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের অধীনস্থ মনে করে বহুবচন আনা হয়েছে। এর দলীল হল, ষোল পারায় আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেন, أهبطوا منها جميعاً আদম ও হাওয়া! তোমরা সকলই জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও।
আর এ সম্বোধন যেহেতু তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের অধীনস্ত সাব্যস্ত করে করা হয়েছে, সেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেন, بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ তোমরা একে অপরের শত্রু। এই আয়াতও এ কথাই বুঝায়, فَمَن تَبِعَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ . وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أولئك هُدَايَ আল্লাহ তা'আলা বলেন, যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই। আর তারা দুঃখিতও হবে না। আর যারা কুফরী করবে এবং আমার নির্দেশসমূহকে অস্বীকার করবে, তারাই অগ্নিবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এটা তখনি সম্ভব, যদি এ সম্বোধন আদম আ.-এর সকল সন্তান-সন্ততিকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষ একে অপরের সাথে শত্রুতা করা, অবাধ্য হওয়া, তাদের একজনকে অন্য জনের ভ্রষ্ট করা।
আল্লামা যামাখশারীর গ্রহণ করা এই মতটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, উক্ত আয়াতে শত্রুতা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শয়তান ও মানুষের মধ্যকার শত্রুতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوا শয়তান তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা শয়তান ও মানুষের মধ্যকার বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। কারণ, এই শত্রু থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরী। তা ছাড়া হযরত আদম ও হাওয়ার মাঝে তো কোন শত্রুতা ছিল না। বরং তাদের ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্য হল, لِتَسْكُنَ إِلَيْهَا হযরত আদম আ.-এর স্ত্রী হাওয়াকে এ জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়।৭১
এবং আল্লাহ তা'আলা وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً তিনি তোমাদের স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও মমতা সৃষ্টি করেছেন।
সুতরাং ভালবাসা ও মমতা হয় ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর মাঝে। আর শয়তান ও মানুষের মাঝে হয় শত্রুতা। আর পূর্বে এ কথা উল্লেখ হয়েছে, এখানে তিন জনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আদম আ., তাঁর স্ত্রী ও ইবলীস। তাহলে أخبطوا -এর মধ্যে বহুবচনের ضمير বহুবচনের কিছু অংশের দিকে ফিরানো আর কিছুকে বাদ দেয়া ভাষার ব্যবহারিক ব্যাকরণ পরিপন্থী। শব্দ ও অর্থের চাহিদা তাই। সুতরাং (এর বিপরীত কথা বলে) আল্লামা যামাখশারী কোন অভিনব কথা বলেননি।
আর ষোল পারায় সূরা ত্বা-হাতে আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ, قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى -এর মধ্যে আদম ও হাওয়া উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। সুতরাং اهْبِطَا -এর মধ্যে দ্বিবচনের ضمير হয়ত হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর প্রতি ফিরেছে। অথবা হযরত আদম আ. এবং ইবলীসের দিকে ফিরেছে। হযরত হাওয়া হযরত আদম আ.-এর অধীনস্থ হওয়ায় তাঁর আলোচনা করা হয়নি। এ হিসাবে অবতরণের সাথে যে শত্রুতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা এই দুই সম্বোধিত সত্তার মধ্যেই হবে। আর দুই সম্বোধিত সত্তা হল, হযরত আদম আ. ও ইবলীস।
সুতরাং এতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে প্রথম অবস্থা যাতে ضمير হযরত আদম ও হাওয়া' আ.-এর দিকে ফিরে। তখন আয়াতে দু'টি বিষয় সন্নিবেশিত হয়। এক. আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ.-কে অবতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। দুই. হযরত আদম আ. ও তাঁর স্ত্রীর সাথে ইবলীসের সংবাদ দেয়া হয়েছে। এজন্য بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর মধ্যে বহুবচনের ضمير ব্যবহার করা হয়েছে। আর الفاظ -এর মধ্যে যেহেতু ইবলীস অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই দ্বিবচন আনা হয়েছে। তবে শত্রুতার বিষয়টির মধ্যে ইবলীস অবশ্যই অকাট্যভাবে অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ হে আদম! নিশ্চয়ই এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু।৭২
আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদেরকে বলেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا শয়তান তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ কর।৭৩
ভেবে দেখার বিষয়, যেখানে শত্রুতা ও বৈরিতার উল্লেখ এসেছে, সেখানে দ্বিবচনের ضمير বর্জন করে বহুবচন আনা হয়েছে। আর পৃথিবীতে অবতরণের নির্দেশ করার সময় কখনো একবচন, কখনো দ্বিবচন ও কখনো বহুবচনের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন সূরা আ'রাফে রয়েছে, قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا আল্লাহ বলেন, হে ইবলীস! তুমি জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও। এমনিভাবে সূরা সাদে রয়েছে, فَاخْرُجْ مِنْهَا হে ইবলীস! তুমি জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও।
সুতরাং এর দ্বারা সম্বোধন শুধু ইবলীসকে করা হয়েছে। আর যেখানে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে হযরত আদম, হাওয়া ও ইবলীস সকলকেই করা হয়েছে। কারণ, ঘটনা সকলকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে। আর যেখানে দ্বি-বচন ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে হযরত আদম ও হাওয়া আ. উদ্দেশ্য। কেননা, তাঁরা উভয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়েছেন। স্খলন তাদের দ্বারাই হয়েছে। অথবা এর সম্বোধন আদম আ. ও ইবলীস। কেননা উভয়েই মুকাল্লাফ তথা শরীআতের হুকুম-আহকাম পালনে নির্দেশিত দুই জাতির (মানুষ ও জিন) পিতা এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদের মূল। তাই তাদের অবস্থা ও তার পরিণাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেন তাদের বংশধররা এ থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে আমি উভয় মত-ই উল্লেখ করলাম। তবে এ ব্যাপারে স্পষ্টতর কথা হল, هبط। এর মধ্যে সম্বোধন হযরত আদম আ. ও ইবলীসকেই করা হয়েছে।
কেননা আল্লাহ তা'আলা যেখানে তাঁর নির্দেশের বিপরীত আচরণ করার কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে শুধু হযরত আদম আ.-এর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ. এর কথা উল্লেখ করেননি। যেমন সূরা ত্বা-হা-এর মাঝে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَعَصَىٰ ءَ آدَمٍ رَبَّهُ فَقَوَىٰ ثُمَّ أجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হল। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন। তার তাওবা কবুল করলেন ও তাকে পথ নির্দেশ করলেন। قال اهْبطًا مِنْهَا جَمِيعًا অতঃপর বললেন, তোমরা উভয় একই সঙ্গে জান্নাত হতে নেমে যাও।৭৪
উক্ত আয়াতগুলি হতে সুস্পষ্টতই বুঝে আসে, জান্নাত হতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ হযরত আদম আ. কে করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী তো তাঁর অধীনস্থ হয়ে এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য হল, মুকাল্লাফ দুই জাতি জিন ও ইনসানকে সে বিষয়ে অবহিত করা, যা তাদের আদি পিতা দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অমান্য করা ও তার বিপরীত করার কারণে যে অমঙ্গলজনক দুর্বিপাকের সম্মুখীন হতে হল।
সুতরাং শুধুমাত্র মানব জাতির আদি পিতার কথা উল্লেখ করার চেয়ে উভয় মুকাল্লাফ জাতির আদি পিতার কথা উল্লেখ করাই পরিপূর্ণতর। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ে জানান, আদম আ.-এর স্ত্রীও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেছেন এবং সে জন্যই হযরত আদম আ. কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করে নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা এ কথাও বুঝা যায়, যেহেতু আদম আ. এর স্ত্রী নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণে শরীক ছিল। সুতরাং জান্নাত থেকে বহিষ্কারকরণ ও নিচে অবতরণের নির্দেশের মাঝে সেও অন্তর্ভুক্ত। অবশ্যই তারও সে অবস্থা-ই হয়েছে, যে অবস্থা হয়েছিল হযরত আদম আ.-এর।
মুদ্দাকথা হল, আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ أَهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর মধ্যে বহুবচনের সম্বোধন সম্পূর্ণ স্পষ্ট। সুতরাং তাকে إذاً দ্বিবচনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের নিমিত্তে দ্বি-বচনের ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তা নিষ্প্রয়োজন। তারা (যারা বলেন, উক্ত জান্নাত দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাতুল খুলদ) বলেন, প্রত্যেক স্থানে الْجَنَّةُ নির্দিষ্টকরণের 'আলিফ লাম' যুক্ত ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী أَسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ ও এ জাতীয় অন্যান্য আয়াত। জান্নাতুল খুলদ ব্যতীত অন্য কোন জান্নাতই তার معھود তথা প্রতিপাদ্য বিষয় হতে পারে না। সম্বোধিত ব্যক্তিগণ الْجَنَّةُ দ্বারা তার আল্লাহর প্রতিশ্রুত সেই جنة الخلد বা চিরস্থায়ী জান্নাতকেই বুঝেন। যেমন মদীনা (শহর) নাজম (তারকা) আল-বাইত (ঘর) আল-কিতাব (বই) এর উদ্দেশ্য ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও তা নির্দিষ্ট স্থানের নামে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং যে স্থানে জান্নাত শব্দটি নির্দিষ্টকরণের 'আলিফ লাম' দ্বারা ব্যবহৃত হয়, সেখানে জান্নাত দ্বারা নির্দিষ্ট জান্নাতই উদ্দেশ্য হবে, যা মু'মিনদের মনে গ্রথিত। আর যদি জান্নাতুল খুলদ ব্যতীত অন্য কোনো জান্নাত উদ্দেশ্য নিতে হয়, তবে হয়ত অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হবে অথবা অন্য শব্দের সাথে ইযাফতের (দুই বিশেষ্য পদের পরস্পর সংযোগ) মাধ্যমে ব্যবহৃত হবে। অথবা পূর্বাপর এমন কোন শর্তযুক্ত হবে, যদ্বারা বুঝা যাবে, তা পৃথিবীর কোন উদ্যান। তার অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, جَنَّتَيْنِ مِنْ أَعْنَابِ ইযাফতের মাধ্যমে তার ব্যবহার যেমন, وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ । পূর্বাপর এমন কোন শর্তযুক্ত হয়, যার দ্বারা বুঝা যায়, তা পৃথিবীর কোন উদ্যান ছিল, তার ব্যবহারের উদাহরণ হল আল্লাহ তা'আলার এই বাণী, إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ নিশ্চয়-ই আমি তাদেরকে পরীক্ষায় নিপতিত করেছি, যেমনিভাবে করেছিলাম উদ্যান মালিকদেরকে।
তারা বলেন, উক্ত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ হওয়ার উপর নির্দেশক প্রমাণগুলির অন্যতম হল নিম্নের এই বর্ণনা। হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. বলেন, ان الله لما أخرج آدم من الجنة زوده من ثمار الجنة، وعلمه صنعة كل شيئ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করলেন, তখন তাকে খাদ্যসম্ভার হিসাবে কিছু জান্নাতের ফল দান করলেন এবং তাঁকে প্রত্যেক বস্তু তৈরীর পদ্ধতি শিখালেন। সুতরাং পৃথিবীতে তোমরা যে ফল-ফলাদি দেখছ, তা জান্নাতেরই ফল। তবে হ্যাঁ, ব্যবধান এটুকু, দুনিয়ার ফলগুলোতে বিভিন্ন প্রকার পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু জান্নাতের ফলগুলোয় কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটে না।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জামানত দিয়ে বলেছেন, তিনি যদি তাওবা করে ফিরে আসেন, তবে তাকে জান্নাতে ফিরিয়ে আনা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَتَلَقَّى آدم من ربه كلمات فَتابَ عَلَيْهِ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মিনহাল রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে একটি হাদীস নকল করেছেন, হযরত আদম আ. আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলেন, يارب خلقتنى بيدك হে প্রভু! আপনি কি আমাকে স্ব-হস্তে তৈরী করেননি? আল্লাহ তা'আলা বলেন, কেন নয়?
অতঃপর আদম আ. বলেছেন, أي رب ألم تنفخ في من روحك হে প্রভু! আপনি কি আপনার থেকে আমার মাঝে আত্মা দান করেননি? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
অতঃপর আদম আ. বললেন, الم تسكننى جنتك হে প্রভু! আপনি কি আমাকে জান্নাতে স্থান দেননি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
অতঃপর হযরত আদম আ. বললেন, رب ألم تسبق رحمتك غضبك হে প্রভু! আপনার রহমত কি আপনার ক্রোধের উপর বিজয়ী নয়? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়? তখন হযরত আদম আ. বললেন, أرأيت أن أثبت وأصلحت أرجع أنت إلى الجنة। যদি আমি তাওবা করে নিজেকে শুধরে নেই, তবে কি আমাকে পুনরায় জান্নাতে ফিরিয়ে নেবেন না? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে এ হাদীসের কয়েকটি সনদ রয়েছে। সে সনদগুলোর কোনো কোনোটিতে একথাও রয়েছে, হযরত আদম আ. স্বীয় প্রভুর হুকুম লঙ্ঘন করলেন। অতঃপর স্বীয় প্রভুকে বললেন, যদি আমি তাওবা করে নেই? তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, পুনরায় আমি তোমাকে জান্নাতে ফিরিয়ে নেব।
একথাগুলো হল সেই মত পোষণকারীদের দলীল, যারা বলেন, আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত দ্বারা জান্নাতুল খুলদ উদ্দেশ্য। এখন আমি উক্ত মতের সাথে দ্বিমত পোষণকারীদের দলীলসমূহ উপস্থাপন করব।
টিকাঃ
৬২. খ. ১, পৃ. ১১২
৬৩. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৮৪, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৩৫
৬৪. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৫
৬৫. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২৫
৬৬. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৮-১৯
৬৭. প্রাগুক্ত, আয়াত: ১২০
৬৮. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৪-৩৭
৬৯. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭৮
৭০. সরা বাকারা, আয়াত: ৩৮
৭১. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৮৯
৭২. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৭
৭৩. প্রাগুক্ত, আয়াত: ৬
৭৪. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২১-২৩
📄 আদম আ. চিরস্থায়ী জান্নাতে নয়; পৃথিবীতেই ছিলেন
এ মতালম্বীদের ভাষ্যমতে তাদের মতের পেছনে প্রচুর যুক্তি রয়েছে। সেগুলোর মধ্য হতে নির্বাচিত কয়েকটি যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীগণের মাধ্যমে এ সংবাদ-ই জানিয়েছেন, জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতে শুধু কিয়ামতের দিনই প্রবেশ করানো হবে। সুতরাং তাতে প্রবেশ করার সময় এখনো আসেনি।
আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে উক্ত জান্নাতের বর্ণনা করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা কোন বস্তুর যেই গুণাগুণ বর্ণনা করবেন, তাতে সেই গুণাগুণ বিদ্যমান থাকবে না; এটি অসম্ভব। উক্ত মত পোষণকারীগণ বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তা খোদাভীরু তথা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তা হবে স্থায়ী আবাসস্থল। যে তাতে প্রবেশ করবে, সে তাতেই অবস্থান করবে। কিন্তু আদম আ. কে যে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, তাতে তো তিনি স্থায়ীভাবে অবস্থান করেননি। এখন আল্লাহ তা'আলা যেই জান্নাতকে জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাত বলেই অবহিত করেছেন। হযরত আদম আ. যে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন, অথচ তাতে স্থায়ী ভাবে থাকেননি।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল খুলদের বর্ণনায় আরো বলেন, সেটি হল কর্মের প্রতিদানস্থল। সেটি আদেশ-নিষেধ ও কোনো প্রকার বাধ্য-বাধকতার স্থল নয়। আল্লাহ তা'আলা তার গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, তা সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ স্থান। তা কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্থান নয়। অথচ হযরত আদম আ. কে যে জান্নাতে স্থান দেয়া হয়েছে, তাঁকে সেখানে পরীক্ষা করা হয়েছে। আর তা ছিল অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, সেখানে কেউ তাঁর হুকুম অমান্য করবে না। কিন্তু আদম আ. দ্বারা তো তা সংঘটিত হয়েছে সে জান্নাতেই, যাতে তিনি প্রবেশ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, তা কোন প্রকার চিন্তা ও পেরেশানীর স্থান নয়। অথচ তাতে হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. চিন্তা ও পেরেশানীতে নিপতিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে দারুস সালাম তথা শান্তি নিবাস বলে অভিহিত করেছেন। অথচ আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে নিরাপদ ছিল না। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে দারুল কারার তথা স্থায়ী নিবাস ঘোষণা করেছেন। অথচ হযরত আদম ও হাওয়া আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তাতে স্থায়ী হননি।
জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন وَمَاهُمْ مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃত হবে না।৭৫ অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তা হতে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ জান্নাতবাসীদের সেখানে কোন প্রকার কষ্ট হবে না। অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তাতে তাঁর শরীর থেকে বস্ত্র খুলে ফেলার পর তিনি লজ্জায় তাড়িত হয়ে ফিরতে লাগলেন। বৃক্ষপাতা দ্বারা স্বীয় শরীরকে আচ্ছাদিত করতে লাগলেন। এটিতো পূর্ণ মাত্রায় কষ্টকর। জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, সেখানে তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপবাক্য।৭৬ অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, সেখানে তিনি ইবলীসের অসার ও পাপবাক্য শুনেছিলেন।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে مَقْعَد صدق সত্যের ভূমি বলে ঘোষণা করেন। অথচ আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের ভূমিতে দাঁড়িয়ে তো ইবলীস মিথ্যাচার করেছিল; এমনকি মিথ্যার উপর শপথও করেছিল।
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে সৃষ্টির পূর্বে ফিরিশতাদের সম্মুখে ঘোষণা করেন, "ইন্নি জাইলুন ফিল আরদি খলিফা- আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।"৭৭ ফিরিশতাগণ প্রত্যুত্তরে বললেন, আপনি কি পৃথিবীতে এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে চান, যারা অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে। এটি জান্নাতুল মা'ওয়াতে কোন ভাবেই হতে পারে না। ইবলীস জান্নাতে হযরত আদম আ. কে যা বলেছিল আল্লাহ তা'আলা সেটি বর্ণনা করেন, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা। সুতরাং যদি হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ বা স্থায়ী জান্নাত হত, তাহলে তিনি কেন ইবলীসের এ কথার উত্তর দেননি, তুমি আমাকে সে স্থানের-ই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ, যে স্থানে আমি বর্তমানে আছি। তা তো আমি প্রাপ্ত হয়েছি।
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জান্নাতে স্থান দিয়ে বলেননি যে, এখানে চিরস্থায়ী হবে। তিনি যদি তা জানতেন, তবে ইবলীসের কথায় কান দিতেন না। তার উপদেশের প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করতেন না। কিন্তু যেহেতু তিনি এমন জান্নাতে ছিলেন, যা চিরস্থায়ী ছিল না, ফলে তিনি সে বস্তু ভক্ষণের মাধ্যমে ধোকায় পড়ে গেলেন অমরত্ব অর্জনের মিথ্যা প্রবঞ্চনায়। তারা আরো বলেন, জান্নাত হল পূতঃপবিত্র ব্যক্তিদের স্থান। সুতরাং যদি হযরত আদম আ. জান্নাতুল খুলদে অবস্থান করতেন, তবে ধোকাবাজ ও বিতাড়িত শয়তান সেখানে কিভাবে পৌঁছল? এবং কিভাবে তাঁকে পরীক্ষায় ফেলল ও কু-মন্ত্রণা দিল?
এ কু-মন্ত্রণা চাই তাঁকে শুনানো হোক বা তাঁর অন্তরে সৃষ্টি করা হোক, সে অভিশপ্ত শয়তান সেখানে কিভাবে প্রবেশ করল? এমনিভাবে যখন তাকে বলা হল, তুমি এ থেকে নেমে যাও فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا এখানে থেকে অহংকার করবে, তা হতে পারে না।৭৮
এরপরও তার জন্য জান্নাতুল মা'ওয়াতে উঠা কিভাবে সম্ভব হল, যা সম্ভবত আকাশেরও ঊর্ধ্বে? অথচ এ সব কিছুই তার অবাধ্যতা ও অহংকারীর কারণে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি বশতঃ তাকে বের করে দেয়া ও ধমকানির পর হয়েছে। এসব কল্পনা কি এ আয়াতের (مَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا) (এখানে থেকে অহংকার করবে, তা হতে পারে না) সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে পারে?
সুতরাং যে ভাষায় শয়তান হযরত আদম আ.-কে সম্বোধন করেছে ও তার উপর শপথ করেছে, এটিই যদি অহংকার না হয়, তবে অহংকার আবার কি?
যদি কেউ বলে, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. ছিলেন আকাশে আর শয়তান ছিল পৃথিবীতে এবং এ অবস্থাতেই শয়তান তাঁদের কু-মন্ত্রণা দিয়েছে। তার এ কথা অভিধান, অনুভূতি ও পরিভাষা; কোন দিক থেকেই যুক্তিসম্মত নয়। যদি মনে করা হয়, ইবলীস সাপের মুখে প্রবেশ করে সাপের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করেছে, এটিও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভুল। কেননা সে জান্নাত থেকে একবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর পুনরায় জান্নাতে কিভাবে প্রবেশ সম্ভব? যদিও সাপের মুখে করে হোক।
যদি বলা হয়, সেই ইবলীস হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর অন্তরে প্রবেশ করে তাঁদেরকে কু-মন্ত্রণা দিয়েছে, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। তা ছাড়া আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে শয়তানের সাথে তাঁদের কথোপকথনকালে তাঁদের সাথে তার সম্বোধনকেও বর্ণনা করেছেন। তাতে বুঝায় যায়, তাঁরা তার কথা সামনাসামনি শুনেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ 'শয়তান বলল, পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও, এই জন্য-ই তোমাদের প্রতিপালক এই বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরক নিষেধ করেছেন'।৭৯
আল্লাহর বক্তব্যের ধরণ এ কথারই নির্দেশ বহন করে, সে তাঁদের উভয়ের সামনে সে নিষিদ্ধ বৃক্ষের পাশেই উপস্থিত ছিল। যখন হযরত আদম আ. জান্নাতের বাইরে ছিলেন; জান্নাতে ছিলেন না, তখন আল্লাহ তা'আলা أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِবলেননি। যখন তাঁরা জান্নাতে ছিলেন, তখন নিকটেবর্তী বস্তুর প্রতি ইঙ্গিতকারী সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর যখন জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তখন দূরবর্তী বস্তুর প্রতি ইঙ্গিতকারী সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, তারা এখন আর জান্নাতে নেই। সে নিষিদ্ধ বৃক্ষ আর তাঁদের সামনে নেই। এটি এ কথারই প্রমাণবহ, তাঁরা সেই জান্নাতে চিরস্থায়ী ছিলেন না। অথচ জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার নিবাস হবে চিরস্থায়ী।
সুতরাং এর দ্বারা প্রতীয়মান হল, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতটি জান্নাতুল খুলদ ছিল না। ইবলীস পৃথিবীতে থাকা সত্ত্বেও তার কু-মন্ত্রণা হযরত আদম ও হাওয়া আ. পর্যন্ত আকাশে পৌঁছিয়ে ছিল; এ কথা বলাও ঠিক হবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উত্থিত হয়।৮১ অথচ অভিশপ্ত ইবলীসের কথা তো সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও অপবিত্র। সুতরাং তা পবিত্র স্থানে উত্থিত হতে পারে না।
মুনযির রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আদম আ. نَامَ فِي جَنَّتِهِ তিনি তাঁর জান্নাতে ঘুমিয়েছেন। অথচ নস ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত, জান্নাতুল খুলদে নিদ্রা আসবে না। যেমন, এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জান্নাতবাসী কি জান্নাতে নিদ্রা যাবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুত্তরে বললেন, النوم أخو الموت والنوم وفاة ‘নিদ্রা মৃত্যুসদৃশ, নিদ্রা তো মৃত্যুই’। কিন্তু জান্নাতে মৃত্যু হবে না। কুরআন কারীমেও তার সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। তা ছাড়া নিদ্রা তো অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। অথচ জান্নাতী ব্যক্তি দারুস সালাম অর্থাৎ জান্নাতে যে কোনো প্রকার অবস্থার পরিবর্তন থেকে নিরাপদ থাকবে। আর ঘুমন্ত ব্যক্তি মৃতুতুল্য।
আমি বলব, মুনযির রহ. যে বর্ণনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তা মুজাহিদের উপর মাওকূফ। তিনি বলেন, হযরত আদম আ.-এর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর পাঁজরর হাড় থেকে হযরত হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছেন।
আসবাত রহ. সুদ্দী রহ. হতে বর্ণনা করেন, হযরত আদম আ. যে জান্নাতে অবস্থান করছিলেন, তাতে একাকী বসবাস করছিলেন। তাঁর কোনো এমন সঙ্গী ছিল না; যার দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। তখন তিনি একবার ঘুম থেকে জেগে তাঁর শিয়রের কাছে একজন রমণীকে বসা অবস্থায় পেলেন, যাঁকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বাম পাঁজর থেকে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ. তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, আমি একজন নারী। আদম আ. প্রশ্ন করলেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হল? তিনি উত্তরে বললেন, যেন তুমি প্রশান্তি লাভ করতে পার।
ইবনে ইসহাক রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করে দিলেন। এরপর তাঁর বাম পাঁজর হতে একটি হাড় বের করে তাতে পুনরায় গোস্ত ভরিয়ে দিলেন। আদম আ. ঘুমন্ত ছিলেন। তিনি নিদ্রা হতে জেগে উঠার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃজিত স্ত্রী হাওয়া আ.-কে পুরোদস্তুর একজন নারী হিসাবে সৃষ্টি করলেন, যেন তিনি তাঁর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। হযরত আদম আ. নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়ে সে রমণীকে নিজের পার্শ্বে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, لحمي ودمي وروحي হে আমার গোস্ত, হে আমার রক্ত ও আমার আত্মা! فسكن إليها অতঃপর তার দ্বারা প্রশান্তি লাভ করলেন।
তাদের আরো যুক্তি হল, এতে কোন মতভেদ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। কোথাও এ বিষয়ে উল্লেখ নেই, তাঁকে পরবর্তীতে আকাশে তুলে নেয়া হয়েছে। যদি তাঁকে পরবর্তীতে আকাশে তুলে নেয়া হয়, তবে অবশ্যই তা উল্লেখ না করলে নয়। কারণ এটি তখন আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলীর মধ্যে হতে একটি নিদর্শন হত এবং হযরত আদম আ.-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'আমত হত। কারণ, তা হত হযরত আদম আ.-এর সশরীরে ঊর্ধ্বগমন।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে কিভাবে আকাশে স্থানান্তরিত করবেন, অথচ তিনি ফিরিশতাদের লক্ষ্য করে বলেন, إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً "আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব"।৮২ সুতরাং যেথাকার নিবাস স্থায়ী, কখনো বহিষ্কার হতে হয় না, সেখানে তাঁকে কিভাবে অস্থায়ীভাবে রাখা হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ, وَمَا هُمْ مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ "তারা সেথা হতে বহিষ্কৃত হবে না"।৮৩
তারা আরো বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁকে সিজদা করার জন্য ইবলীসকে নির্দেশ দিলে সে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানানোর প্রেক্ষিতে তাকে নির্দেশ দেয়া হল, فَاهْبط منْهَا "তুমি জান্নাত থেকে নিচে নেমে যাও"। এরপরই হযরত আদম আ.-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে।
সুতরাং উক্ত জান্নাত দ্বারা যদি নভোমণ্ডলের উপরস্থ জান্নাত উদ্দেশ্য হয়, তবে ইবলীসকে জান্নাত থেকে নামিয়ে দেয়ার পরও সে কিভাবে আকাশে আরোহণ করতে পারে? এটাও এ কথার প্রমাণবহ, উক্ত জান্নাত পৃথিবীতে ছিল। জান্নাতুল মা'ওয়া ছিল না।
পক্ষান্তরে বিরোধীপক্ষ যে ব্যাখ্যা পেশ করছেন তা নিতান্তই কাল্পনিক, কৃত্রিম ও বানোয়াট। যেমন তাদের কেউ বলে, ইবলীস সর্বদার জন্য নয়; বরং সাময়িকভাবে আকাশে আরোহণ করেছিল। আবার কেউ বলেছেন, ইবলীস সাপের পেটে অথবা মুখে অবস্থান করে জান্নাতে প্রবেশ করেছিল। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইবলীস পৃথিবীতে ছিল, আর হযরত আদম ও হাওয়া আ. আকাশে ছিলেন। এ অবস্থায়-ই সে তাঁদেরকে ধোকা দিয়েছে। কিন্তু এসবগুলোর ভ্রষ্টতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত হওয়ার বিষয়টি মোটেই অস্পষ্ট নয়।
এর বিপরীতে আমাদের মত সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক। কেননা, আমরা বলি, ইবলীস যখন হযরত আদম আ.-কে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে ফিরিশতা জগৎ থেকে বহিষ্কার করে দেন। আর তখন থেকেই ইবলীসের চোখে আদম আ. শত্রু হয়ে যায়।
আর যখন তার শত্রু হযরত আদম আ.-কে মনোরম উদ্যানে প্রতিষ্ঠিত করা হল, তখন থেকে তার শত্রুতা চরম বিদ্বেষে রূপ নিল এবং ধোকা ও কু-মন্ত্রণার মাধ্যমে তাঁকে সেখান থেকে বের করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করল।
তারা বলেন, সকল দলীল দ্বারা বুঝা যায়, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতটি সেই জান্নাতুল খুলদ তথা স্থায়ী জান্নাত ছিল না; যার ব্যাপারে খোদাভীরুদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। এর উপর ভাল একটি দলীল হল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর জীবন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর তাঁর জীবনের ইতি ঘটবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্থায়ীরূপে সৃষ্টি করেননি। যেমন ইমাম তিরমিযী তাঁর জামে' তিরমিযীতে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন,
قال رسول الله ﷺ لما خلق الله آدم ﷺ ونفخ فيه الروح عطس فقال الحمد لله فحمد الله بأذنه. فقال ربه يرحمك الله يا آدم اذهب إلى أولئك الملائكة إلى ملأمنهم جلوس فقال السلام عليكم وقالوا وعليك السلام. ثم رجع إلى ربه فقال هذه تحيتك وتحية بنبيك بينهم فقال الله له ويداه مقبوضتان اخترايهما شئت فقال اخترت يمين ربي وكلتا يديه يمين مباركة. ثم بسطها فاذا فيها آدم وذريته فقال يا رب ما هؤلاء؟ قال هؤلاء ذريتك فاذا كل انسان مكتوب بين عينيه عمره. فاذا فيهم رجل أضوؤهم قال يا رب من هذا؟ قال هذا إبنك داؤد وقد كتبت له عمره أربعين سنة. قال ذالك الذي كتبت له قال أى ربي فإني قد جعلت له من عمرى ستين سنة قال أنت وذالك . قال ثم اسكن الجنة ما شاء الله ثم اهبط منها يعد لنفسه . قال فأتاه ملك الموت فكان آدم فقال آدم قد عجلت قد كتبت لي ألف سنة قال بلى ولكنك جعلت لإبنك داؤد ستين سنة. فجحد فجحدت ذريته ونسى فنسيت ذريته فمن يومئذ أمر بالكتاب والشهود.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁর মাঝে আত্মা দান করেছেন, তখন হযরত আদম আ.-এর হাঁচি এলো এবং তিনি বলে উঠলেন, আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশেই তিনি তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, তোমার প্রতি রহমত বর্ষিত হোক হে আদম! এখানে ফিরিশতারা আছে, তাদের নিকট যাও। যখন হযরত আদম আ. তাদের নিকট গিয়ে বললেন, আস্-সালামু আলাইকুম। তাঁরা (ফিরিশতাগণ) বললেন, ওয়া আলাইকাস সালাম। অতঃপর তিনি তাঁর প্রভুর নিকট ফিরে এলে তিনি তাঁকে বললেন, এটিই হল তোমার ও তোমার সন্তান-সন্ততিদের পারস্পরিক সালাম বা অভিবাদনের পদ্ধতি।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বললেন, এ দুই মুষ্টি হতে যেটিকে ইচ্ছা পসন্দ কর। হযরত আদম আ. বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের ডান হাতকে গ্রহণ করলাম। আল্লাহ তা'আলার উভয় হাতই ডান হাত ও বরকতময়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুষ্টি খুললেন, তাতে ছিল হযরত আদম আ. ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর সকল বংশধর। তখন হযরত আদম আ. জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রভু! এরা কারা? আল্লাহ তা'আলা বললেন, এরা তোমার সন্তান-সন্ততি। প্রত্যেকের দু'চোখের মধ্যবর্তী স্থলে তাদের আয়ু লিপিবদ্ধ ছিল। তাদের মাঝে অত্যধিক উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট একজন ছিলেন। হযরত আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রভু! এ কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, এ হল, তোমার পুত্র দাউদ। আমি তার বয়স চল্লিশ বছর নির্ধারণ করেছি। হযরত আদম আ. বললেন, হে প্রভু! তার বয়স কিছু বৃদ্ধি করে দিন। আল্লাহ তা'আলা বললেন, তার জন্য আমি এ পরিমাণ-ই লিপিবদ্ধ করে ফেলেছি। তখন হযরত আদম আ. বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! আমার বয়স থেকে তাকে আমি ষাট বছর দিয়ে দিচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, এটা তার ও তোমার ব্যাপার।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর হযরত আদম আ. যত দিন অনুমতি ছিল, জান্নাতে অবস্থান করেছেন। তারপর জান্নাত থেকে অবতারিত হলেন।
হযরত আদম আ. তাঁর আয়ুকাল গণনা করছিলেন। হযরত আদম আ.-এর আয়ূকাল পূর্ণ হওয়ার ষাট বছর পূর্বেই মৃত্যুর ফিরিশতা এসে উপস্থিত হলেন। তখন হযরত আদম আ. বললেন, আপনি তো একটু পূর্বেই এসে পড়লেন। কারণ, আমার আয়ুকাল এক হাজার বছর লিপিবদ্ধ হয়েছে। ফিরিশতা বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই হয়েছে। কিন্তু আপনি আপনার পুত্র দাউদকে তা থেকে ষাট বছর প্রদান করেছেন। তখন হযরত আদম আ. অস্বীকার করলেন। যার ফলে তার সন্তানদেরও অস্বীকৃতি ও বিবাদ করার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তিনি ভুলে গেছেন, ফলে তাঁর সন্তানরাও ভুলে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সেদিন থেকেই মানুষকে পারস্পরিক লেনদেন লিখে রাখার ও সাক্ষী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এ হাদীস উক্ত সনদে حسن غریب এর পর্যায়ে। এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে অন্য সনদেও বর্ণিত আছে।
তারা বলেন, উল্লিখিত হাদীসটি এ ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট, হযরত আদম আ. কে দারুল ক্বারার তথা স্থায়ী নিবাসে সৃষ্টি করা হয়নি। যাতে প্রবেশকারীর কখনো মৃত্যু ঘটবে না। চূড়ান্ত কথা হল, তাঁকে দারুল ফানা তথা পৃথিবীতেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যাতে অবস্থানের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন। সে সময়েই আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সেখানে অবস্থান করতে দেন।
প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আদম আ. এর যদি জানা-ই থাকে, তাঁর জীবন চিরস্থায়ী নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর তাঁর জীবনের ইতি ঘটবে, তবে তিনি ইবলীসের মিথ্যাচার বুঝতে পারলেন না কেন? যখন ইবলীস তাঁকে বলল, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْد (আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা।৮৪ অথবা যখন ইবলীস তাঁকে বলেছিল, তোমরা স্থায়ী হয়ে যাবে।৮৫ তাহলে তার উত্তর দু'ভাবে দেয়া যায়।
১ম উত্তর: خلد শব্দ ব্যবহারের দ্বারা চিরস্থায়ীর অর্থ বুঝানো আবশ্যক নয়; বরং خلد শব্দটি দীর্ঘকাল অবস্থান করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
২য় উত্তর: যখন ইবলীস তার কু-মন্ত্রণা প্রতিষ্ঠার জন্য শপথ করে বলল এবং তাকে ধোকা দিয়ে চিরস্থায়ী হওয়ার লোভ দেখাল, তখন হযরত আদম আ. তাঁর নির্ধারিত বয়সের কথা ভুলে গেলেন।
তারা বলেন, এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট কথা এবং এতে কোন মুসলমানের দ্বিমত নেই, হযরত আদম আ.-কে এ পৃথিবীর মাটি দ্বারা-ই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, مِن طِينٍ سُلالة নির্বাচিত মৃত্তিকার উপাদান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে (আদম আ.কে)।
এবং তিনি আমাদেরকে আরো জানিয়েছেন, আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে, مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ গন্ধযুক্ত কর্দমের শুষ্ক ঠনঠনে মৃত্তিকা হতে।৮৬
কেউ কেউ বলেন, صَلْصَال বলা হয় ঐ মাটিকে; যা শুকানোর পর বাজালে শব্দ হয়। অন্যরা বলেন, যে মাটির গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে, তাকে صَلْصَال বলা হয়। যা صل اللحم শব্দ হতে নির্গত। صل اللحم-এর অর্থ হল, দুর্গন্ধময় গোশত। حمإ হল, নিকষ কালো পরিবর্তিত মাটি, مسنون বলা হয়, ঐ মাটিকে যার উপর পানি প্রবাহিত করা হয়েছে।
এ সবই হল মৃত্তিকার বিভিন্ন অবস্থা, যা হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির প্রথম পর্ব। যেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা আদমসন্তানের সৃষ্টির বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, প্রথমে বীর্য, অতঃপর জমাট রক্ত, অতঃপর মাংসপিণ্ড সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা এমন অকাট্য কোন সংবাদ দেননি, হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টির পূর্বে বা পরে আকাশে তুলে নেয়া হয়েছে। বলুন, এমন কোন দলীল আছে, যা হযরত আদম আ.-এর উপাদান বা সৃষ্টির পর তাঁকে আকাশে তুলে নেয়ার নির্দেশক? এটি এমনি একটি বিষয় যে ব্যাপারে প্রতিপক্ষের নিকট কোন প্রমাণ নেই। আল্লাহ তা'আলার দেয়া সংবাদসমূহ দ্বারাও তা প্রতীয়মান হয় না।
তারা আরো বলেন, নিশ্চয় নভোমণ্ডলের উপর এমন কোন স্থান নেই, যেখানে ভূ-মণ্ডলের মৃত্তিকা বিকৃত গন্ধযুক্ত হয়ে যেতে পারে। এটিই নিশ্চিত কথা, বিকৃতির স্থল একমাত্র পৃথিবী-ই। নভোমণ্ডলের উপর কোন বস্তু পরিবর্তিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও বিকৃত হতে পারে না। এতে কোন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিই সংশয় পোষণ করতে পারে না।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خالدين فيهَا مَا دَامَت السَّمَاوَاتُ وَالأرض إلا مَا شَاءَ رَبُّكَ عَطَاء غَيْرَ مَجْذُودَ . পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান তারা থাকবে জান্নাতে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে, যত দিন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে। যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরূপ ইচ্ছা করেন; এটা এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।৮৭ সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল খুলদের নি'আমত নিরবচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টিই অবহিত করলেন।
তারা আরো বলেন, যদি এ বিষয়গুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করা হয়, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। ইবলীস তাঁকে ধোকায় ফেলল সে স্থানে, যেখানে সে ছিল। ইবলীস তাঁর সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার দরুন তাকে আকাশ থেকে বহিষ্কৃত করার পর। এবং আল্লাহ তা'আলা এটাও বললেন, আমি আদমকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি মনোনীত করব। এগুলো হচ্ছে অস্থায়ী নিবাস। স্থায়ী নিবাস হবে সেই চিরস্থায়ী জান্নাতে, যেটি পৃথিবীতে সহ্য করা কষ্টক্লেশের বিনিময় স্বরূপ পাওয়া যাবে। সেখানে কোন দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা, পেরেশানী নেই। কোন ভয়ও নেই। সেখানে নিদ্রাও নেই। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের জন্য জান্নাতুল খুলদ হারাম করে দিয়েছেন। আর ইবলীস তো কুফরীর মূল।
উক্ত দলীলগুলোর মাঝে যখন সমন্বয় সাধন করা হবে এবং নিরপেক্ষ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে, তখন সে অবশ্যই এ দিকেই (হযরত আদম আ.-এর জান্নাত জান্নাতুল খুলদ ছিল না) ঝুঁকে পড়বে। যে নিজেকে অন্যায় অনুসরণ থেকে মুক্ত রেখেছে, তার কাছে সঠিক বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক প্রদানকারী।
তারা বলেন, যদি এতে অন্য কোন দলীল না থাকে। আর শুধু এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করা হয়, জান্নাতে তো কোন বিধি-নিষেধ নেই। অথচ আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে তাঁর জান্নাতে নির্দিষ্ট বৃক্ষে ফল খেতে নিষেধ করেছেন। এটি এ কথারই স্পষ্ট প্রমাণবহ করে, হযরত আদম আ.-এর জান্নাত দারুত তাকলীফ তথা বিধি-নিষেধের স্থান ছিল; প্রতিদান স্থান বা জান্নাতুল খুলদ ছিল না। সংক্ষেপে একথাগুলোই নির্বাচিত যুক্তি।
তরে আল্লাহ-ই একমাত্র সত্তা, যিনি সর্বাধিক ও সম্যক জ্ঞাত।
টিকাঃ
৭৫. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৭৬. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ২৫
৭৭. সূরা বাক্বারা, আয়াত: ৩০
৭৮. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৩
৭৯. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২১
৮০. প্রাগুক্ত, আয়াত: ২২
৮১. সূরা ফাতির, আয়াত: ১০
৮২. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩০
৮৩. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৮৪. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২০
৮৫. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২০
৮৬. সূরা হিজর, আয়াত: ২৬
৮৭. সূরা হূদ, আয়াত: ১০৮
📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের প্রমাণ ও তার জবাব
প্রথম প্রমাণ ও তার উত্তর
তারা বলেন, আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এমন ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছেন, যা তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।
বিষয়টি শ্রবণের সাথে সম্পৃক্ত। রাসূলগণ কর্তৃক অবহিত করা ব্যতীত তা জানা সম্ভব নয়। সুতরাং এটি এমন এক বিষয়; যা সম্পর্কে আমরা এবং আপনারা সকলই একমাত্র কুরআন দ্বারা অবগতি লাভ করতে পারি। বিষয়টি যুক্তি দ্বারাও বুঝা সম্ভব নয়, স্বভাবজাতভাবেও বুঝা সম্ভব নয়।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বারা যা বুঝা যাবে, একমাত্র তার উপরই আমল করতে হবে। অতএব, আমরা আপনাদেরকে বলব, কোন সাহাবী বা তাবেঈ থেকে সহীহ অথবা হাসান পর্যায়ের কোন হাদীস পেশ করুন, যা এ কথা নির্দেশ করে, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ-ই ছিল, যা আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের জন্য তৈরী করেছেন। এটা আপনাদের জন্য সম্ভব নয়। অথচ আমরা আপনাদের সামনে সালাফ তথা পূর্বসূরীদের এমন ইবারাত (মন্তব্য) উপস্থাপন করেছি, যা তার বিপরীত অর্থ নির্দেশ করে। কিন্তু যেহেতু আলোচ্য ঘটনায় জান্নাত শব্দটি শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, আর এভাবে শর্তহীনভাবে ব্যবহৃত হলে তা সে জান্নাতের নামের অনুরূপ বুঝা যায়, যাকে আল্লাহ তা'আলা বান্দার নেক আমলের প্রতিদান প্রদানের জন্য তৈরী করেছেন এবং কিছু কিছু গুণাগুণের ক্ষেত্রে উভয়টির মাঝে কিছুটা সামঞ্জস্যও রয়েছে, যার ফলে অনেকে এ সংশয়ে পড়ে গেছে, এটি-ই হুবহু সেই জান্নাতুল খুলদ।
সুতরাং আপনারা যদি ফিতরাত দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নেন, তবে তা আপনাদের জন্য কোনো উপকার বয়ে আনবে না। আর ফিতরাত দ্বারা যদি সে ফিতরাত উদ্দেশ্য নেন, যে ফিতরাত বা স্বভাবের উপর আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন মানুষের ফিতরাতের দাবী হল, ন্যায় বিচারকে ভাল মনে করা আর অত্যাচারকে খারাপ মনে করা। অন্য কোনো স্বভাবজাত মানসিকতা নয়। তখনও আপনাদের দাবী বাতিল বলে গন্য হবে। কারণ, যখন আমরা আমাদের ফিতরাতের প্রতি লক্ষ্য করি, তখন আমরা এ বিষয়ের অবগতি সেভাবে লাভ করতে পারি না, যেমনি ভাবে পারি অবশ্যম্ভাবীর অস্তিত্বের আবশ্যকতা ও অসম্ভবের অস্তিত্বে না আসার বিষয়টি। যা এ কথার-ই প্রমাণ বহন করে, আলোচ্য বিষয়টি কোন ফিতরী বিষয় নয়।
দ্বিতীয় প্রমাণ ও তার জবাব
আপনারা হযরত আবূ হুরায়রা রা.-এর হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, যাতে রয়েছে, 'হযরত আদম আ. বলবেন, তোমাদের পিতার পদস্খলনই তো তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করেছে, তাহলে এখন সে পিতা কিভাবে তোমাদের জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করবে'। এ কথায় এটা প্রতীয়মান হয়, তাঁর দ্বারা দুনিয়ায় ত্রুটি হয়ে যাওয়ার দরুন তিনি জান্নাতের দরযা খোলা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখবেন। আর তিনি এ কারণেই জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যেমন অন্য এক স্থানে রয়েছে, তিনি বলেন, আমাকে একটি বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু আমি তা খেয়ে ফেলেছিলাম। তাহলে এতে এমন কি প্রমাণ আছে, যার দ্বারা বুঝা যায়, সেটি জান্নাতুল মা'ওয়া তথা স্থায়ী জান্নাত ছিল?
শব্দের মূল গঠনপ্রণালী বা তার মূল অর্থের অংশ বিশেষ বা মূল অর্থের জন্য আবশ্যকীয় কোন অর্থ, কোনো বিচার-বিশ্লেষণেই উক্ত বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনিভাবে হযরত মূসা আ. কর্তৃক আদম আ.-কে এ কথা বলা, اخرجتنا ونفسك من الجنة 'আপনি আমাদেরকেও জান্নাত থেকে বের করেছেন এবং নিজেকেও বের করেছেন।' এতেও এমন কোন প্রমাণ নেই, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুল্ল্দ ছিল। কারণ তিনি তো বলেননি, আপনি আমাদেরকে জান্নাতুল খুল্ল্দ থেকে বের করেছেন।
তৃতীয় প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ. পৃথিবীর বুকে কোনো এক উদ্যানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। কাজেই জান্নাত বলে যদি সেই পার্থিব স্বর্গীয় উদ্যানকেও বুঝানো হয় তারপরও হযরত আদম আ.-কে প্রদত্ত জান্নাত ও দুনিয়ার অন্যান্য উদ্যানের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। বরং তার তুলনায় তো এ উদ্যানসমূহ বন্দীশালার ন্যায় মনে হবে। এ উদ্যানগুলো পৃথিবীতে অবস্থিত জান্নাতের সাথে নামের দিক দিয়ে শরীক থাকায় এ কথা বুঝা যায় না, উভয়টার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকতে পারে না, যা অন্যান্য বস্তুর মাঝে হয়ে থাকে। আপনারা اهبطوا দ্বারা যে দলীল পেশ করেছেন, তা-ও ঠিক নয়।
কারণ هبوط শব্দটি আকাশ থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করার অর্থ প্রদান করা জরুরী নয়। বেশির চেয়ে বেশি বুঝা যায়, কোন উঁচু ভূমি থেকে নিম্নভূমিতে অবতরণ করা। هبوط-এর অর্থ কেউ অস্বীকার করতে পারবেন?
সুতরাং আমরা বলব, উক্ত জান্নাত পৃথিবীর কোন উঁচু ভূমিতে অবস্থিত ছিল, সেখান থেকে হযরত আদম আ. নিচু ভূমিতে অবতরণ করেছেন। আমরা প্রথমেই এ কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি, اهبطوا -এর উক্ত সম্বোধনের মাঝে হযরত আদম-হাওয়া আ. ও ইবলীস সকলই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অতএব, যদি তা আকাশে অবস্থিত জান্নাত হয়, তবে হযরত আদম আ.-কে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে ইবলীসকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পরও সে সেখানে যেতে কিভাবে সক্ষম হল? কাজেই এধরনের যুক্তি অত্যন্ত অস্পষ্ট, কল্পনাপ্রসূত ও হঠধর্মী দলীল।
চতুর্থ প্রমাণ ও তার উত্তর
তাদের চতুর্থ দলীল হল এই আয়াত وَلَكُمْ فِي الارض مُسْتَقَرٌّ পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।
এই আয়াত এ কথা বুঝায় না, তিনি ইতোপূর্বে পৃথিবীতে ছিলেন না। কেননা الأرض শব্দটি ইসমে জিন্স তথা শ্রেণীবাচক বিশেষ্য। অর্থাৎ তিনি পূর্বে এর চেয়ে উত্তম স্থানে ছিলেন, যেখানে ক্ষুৎ-পিপাসা ও তাপ কিছুই লাগত না। এমতাবস্থায় হযরত আদম আ.-কে দন্ডাদেশ জানিয়ে নির্দেশ দেয়া হল, আপনি এমন স্থানে নেমে যান, যেখানে এ সব ঝামেলার আপনাকে সম্মুখীন হতে হবে এবং সেখানে আপনাকে এভাবেই জীবনযাপন করতে হবে। সে স্থানেই কবর থেকে উত্থিত হবেন। বিপরীতে ইতোপূর্বে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যে জান্নাতে রেখেছিলেন, সেখানে কোন প্রকার ক্লান্তি, কষ্টক্লেশ কিছুই ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর যে স্থানে তাঁকে নামিয়ে দেয়া হল, তা বিভিন্ন ধরনের কষ্টক্লেশ ও ক্লান্তির স্থান।
কিন্তু আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা উক্ত জান্নাতের চিত্রায়নকালে এমন সব গুণাগুণ আর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, তা পৃথিবীর কোন উদ্যানের হতে পারে না। তার উত্তর হল, এ সব গুণাগুণ সম্পন্ন উদ্যান পৃথিবীর সে স্থানের ছিল না, যে স্থানে হযরত আদম আ.-কে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং এর দ্বারা আপনারা কিভাবে প্রমাণ করবেন, তিনি পৃথিবীর বাইর হতে পৃথিবীতে নির্বাসিত হয়েছেন?
পঞ্চম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ. জানতেন এ দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং যদি উক্ত জান্নাত এ পৃথিবীতে হত, তাহলে তিনি ইবলীসের মিথ্যাচার বুঝে ফেলতেন। কেননা, সে বলেছিল, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ "আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা।' এর উত্তর দু'ভাবে হতে পারে।
প্রথম উত্তর شَجَرَة الْخُلْدِ শব্দটি অমরত্বের সাথে সাথে স্থায়িত্বের অর্থও নির্দেশ করে। আর خلد শব্দটি دوام শব্দ থেকেও ব্যাপক; যা বিরামহীন দীর্ঘ অবস্থানকে বুঝায়। অভিধানে এর অর্থ হল, দীর্ঘ অবস্থান। আর প্রত্যেক বস্তুর দীর্ঘ অবস্থান তার নিয়ম অনুযায়ী-ই হয়ে থাকে। যেমন আরবগণ অশীতিপর বৃদ্ধের ক্ষেত্রে বলে থাকে, رجل مخلد এবং সে অর্থেই চুলার পাথরকে বলা হয়, خوالد। কারণ তা অনেক দিন স্থায়ী হয়। তেমনিভাবে আরবরা قديم শব্দটি সে ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে, যা দীর্ঘকাল বিদ্যমান থাকে। যদিও তার সূচনা নির্দিষ্ট থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ পুরাতন চন্দ্র শুষ্ক পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। তদ্রুপ কুরআন পাকে রয়েছে, انك لفي ضلالك القديم আপনি তো আপনার পুরাতন ভ্রান্তিতেই রয়েছেন।৮৮ কুরআন পাকে আরো রয়েছে, إفك قديم পুরাতন অপবাদ।
আল্লাহ তা'আলা অনেক নাফরমান বান্দার ক্ষেত্রে خلود في النار শব্দের ব্যবহার করেছেন। যেমন অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা বলেন, خالدين فيها জাহান্নামে দীর্ঘকাল অবস্থান করবে। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মহত্যাকারীর ক্ষেত্রে خلود في النار শব্দের ব্যবহার করেছেন।৮৯
দ্বিতীয় উত্তর এ কথা সর্বজনবিদিত, পৃথিবী যে ধ্বংসশীল এবং পরকাল যে সমাগত; এই জ্ঞান একমাত্র ওহীর মাধ্যমেই জানা সম্ভব। কিন্তু হযরত আদম আ.-এর পূর্বে তো কোন নবী ছিলেন না, যার মাধ্যমে এগুলো জানা সম্ভব। যদিও হযরত আদম আ.-কে নবুওয়াত দ্বারা সৌভাগ্যমণ্ডিত করা হয়েছে, তাঁর নিকট ওহী ও সহীফা প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন, হযরত আবূ যার রা.-এর হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এ সবই ছিল পৃথিবীতে অবতরণের পর। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, اهبطوا منها جميعا তোমরা সকলে জান্নাত থেকে নেমে যাও।৯০ إما ياتينكم مني هدى যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে। فمن تبع هداي فلا خوف عليهم ولا هم يحزنون তখন যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। فمن اتبع هداي فلا يضل ولا يشقى যে আমার পথ অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না।৯১
ষষ্ঠ প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, الْجَنَّةِ শব্দের মধ্যে (الف لام) আলিফ লাম) নির্দিষ্ট অর্থ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আর তা হল, জান্নাতুল মা'ওয়া। তার উত্তর হল, কুরআন কারীমে الْجَنَّةِ আলিফলাম যুক্ত ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা জান্নাতুল মা'ওয়া উদ্দেশ্য নয়। যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ আমি তাদের পরীক্ষা করেছি, যেমনিভাবে পরীক্ষা করেছিলাম উদ্যান অধিপতিগণকে।’৯২
সপ্তম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, বাক্যের পূর্বাপর আলোচনা দ্বারা বুঝে আসে ঘটনাটি পৃথিবীতে ঘটেনি। তার উত্তরে বলব, আমাদের উল্লিখিত দলীলসমূহ দ্বারা বুঝায়, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত পৃথিবীতে ছিল এবং এটাই সঠিক। কেননা, দলীলের সুস্পষ্ট অর্থকে বর্জন করে উদ্দেশ্যমূলক অস্পষ্ট অর্থ গ্রহণের বৈধতা নেই।
অষ্টম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা হযরত আবূ মূসা রা.-এর ঐ হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন, যেখানে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পর পাথেয় স্বরূপ জান্নাতের ফল দান করেছেন। এর দ্বারা এর বেশি কিছু প্রতীয়মান হয় না, হযরত আদম আ. জান্নাত থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরও পাথেয় স্বরূপ জান্নাতের ফল প্রাপ্ত হয়েছেন। এ বর্ণনায় এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই, তা জান্নাতুল খুলদ ছিল। কুরআনের তথ্যের বাইরে এখানে কিছু নেই।
নবম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, জান্নাতের ফল পচবে না, কিন্তু দুনিয়ার ফল পচে। আপনারা কোথায় পেলেন? হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের ফলমূল দুনিয়ার ফল-ফলাদির মত পচেনি।
অন্যদিকে বিশুদ্ধ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যদি বনী ইসরাঈল না হত, তবে গোশতে পরিবর্তন আসত না। অর্থাৎ তা নষ্ট হত না এবং গন্ধযুক্ত হত না। এছাড়াও আমরা দেখেছি, হযরত উযাইর আ.-এর খাদ্য পানীয় একশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আল্লাহর হুকুমে অবিকৃত ও অক্ষুন্ন ছিল।
দশম প্রমাণ ও তার উত্তর
আপনারা বলেন, হযরত আদম আ.-কে এ সুযোগ প্রদান করা হয়েছে, তিনি তাওবা করলে তাঁকে পুনরায় জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়া হবে। বিষয়টি এমনি, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রতিশ্রুতি কি তাঁকে হুবহু পূর্বোক্ত জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে ছিল? না জান্নাতুল খুলদের ব্যাপারে ছিল? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণও করেছেন। لعود শব্দটি পূর্বের অবস্থা বা সময় বা স্থানে ফিরিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। এমনকি পূর্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়াকেও আবশ্যক করে না। যেমন হযরত শুআইব আ. তাঁর সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেন, إن عدنا في ملتكم 'যদি আমি তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই, তবে তা অবশ্যই আল্লাহর প্রতি মিথ্যাচারের নামান্তর হবে। তিনি আমাকে রক্ষা করার পরও আমার জন্য কখনো সে ধর্মে ফিরে যাওয়া সমীচীন নয়। তবে আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, যিনি আমার প্রভু'। এখানে তো عود শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে عود শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে পূর্বের ধর্মে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপক অর্থে। অথচ হযরত শুয়াইব আ. পূর্বেও তাঁর স্বজাতির নাস্তিক্যবাদী ধর্মের অনুসারী ছিলেন না।
এছাড়াও ইলমে ফিকাহর পরিভাষায় যিহারকারী তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করলে বা সঙ্গমের ইচ্ছা করলে তাকে عائد প্রতিপন্ন করেছেন। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয়, عود দ্বারা ঠিক পূর্বোক্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার অর্থ নির্দেশ করা জরুরী নয়।
টিকাঃ
৮৮. সূরা ইউসূফ, আয়াত: ৯৫
৮৯. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা হল, অন্যায় ভাবে হত্যাকারী ও আত্মহত্যাকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং দীর্ঘকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে।
৯০. সূরা বাক্বারা, আয়াত: ৩৮
৯১. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২৩
৯২. সূরা কলাম, আয়াত: ১৭
📄 জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের পক্ষে দলীল ও প্রতিপক্ষের জবাব
প্রথম দলীল ও তার উত্তর
তাদের কথা হল, আপনারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, জান্নাতুল খুলদে প্রবেশের সময় এখনো আসেনি; বরং কিয়ামতের দিন তাতে প্রবেশ করা যাবে। তা হল স্থায়ী প্রবেশের ব্যাপারে। কিন্তু জান্নাতুল খুলদে সাময়িক প্রবেশ কিয়ামতের পূর্বে হতে পারে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ রাতে তাতে প্রবেশ করেছিলেন। সাধারণ মু'মিন ও শহীদদের রূহ আলমে বরযখে থাকা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করে থাকে। এটা সে প্রবেশ নয়, কিয়ামতের দিন যে প্রবেশের কথা আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং প্রতীয়মান হল, স্থায়ীভাবে প্রবেশ কিয়ামতের দিনই হবে। কিন্তু আপনারা কোথায় পেলেন, কিয়ামতের দিনের পূর্বে কোনভাবে জান্নাতে প্রবেশ ঘটবে না? এর দ্বারা আপনাদের সে কথার জবাবও মিলে, জান্নাত হল দারুল খুল্দ তথা স্থায়ী নিবাস। আপনারা অন্য যে সব বিষয় দ্বারা দলীল পেশ করেন, যেমন, উলঙ্গ হওয়া, ক্লান্তি, পেরেশানী, অনর্থক ও মিথ্যা কথা ইত্যাদি। এগুলো জান্নাতুল খুলদে হতে পারে না। এ সব বিষয়ই ঠিক।
আমরা এগুলো অস্বীকার করি না। এমনকি কোন মুসলমান-ই তা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এ সব বিষয় তখন, যখন মু'মিনগণ কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। সকল আয়াতের পূর্বাপর আলোচনা এটাই বুঝায়। সুতরাং প্রতীয়মান হল, উক্ত বিষয়াবলী না পাওয়ার বিষয়টি মু'মিনদের বেহেশতে প্রবেশের সাথে সম্পৃক্ত। এর দ্বারা জিন ও ইনসান দুই মুকাল্লাফ জাতির আদি পিতা হযরত আদম আ. এবং ইবলীসের জান্নাতে থাকার বিষয়টি অসম্ভব প্রমাণিত হয় না।
মু'মিনের জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদের আমোদ-প্রমোদ ও আরাম-আয়েশের যে ঘটনা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন, তারা জান্নাতে প্রবেশের পরই সে আচরণ করা হবে। সুতরাং দু'টি বিষয়ে কোন বিরোধ নেই। আদম আ.-এর ঘটনা ও মু'মিনদের কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশের পরবর্তী ঘটনা সব-ই স্ব-স্ব জায়গায় ঠিক আছে।
দ্বিতীয় দলীল
আপনারা যে বলেন, জান্নাতুল খুল্ল্দ প্রতিদানস্থল ও তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান নয়। অথচ আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, সেখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমে বাধ্যবাধকতা বা সীমারেখা আরোপ করেছেন। এর দ্বারা এ কথারই প্রমাণ বহন করে, আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুল্ল্দ ছিল না; বরং দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান ছিল। এর উত্তর দু'ভাবে হতে পারে।
প্রথম উত্তর
মু'মিনরা কিয়ামতের দিন জান্নাতে প্রবেশ করার পর তা দারুত তাকলীফ তথা বাধ্যবাধকতার স্থান হওয়া অসম্ভব। কিন্তু তার পূর্বে তা দারুত তাকলীফ হওয়া অসম্ভব নয়। আর তা অসম্ভব হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীলও নেই। অসম্ভবই বা কিভাবে হতে পারে। অথচ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে। তিনি বলেন, دخلت البارحة الجنة، فرأيت امرأة تتوضأ إلى جانب قصر، فقلت : لمن أنت؟ আমি গত রাতে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে একজন মহিলাকে একটি প্রাসাদের নিকট ওযু করতে দেখলাম। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার জন্য?
এটা অসম্ভব নয়, জান্নাতে কিয়ামত দিবসের পূর্বে এমন লোকগণ থাকবে, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে ও তাঁর ইবাদত করেছে; বরং এটাই বাস্তব বিষয়। সুতরাং জান্নাতে এখনও এমন লোকজন রয়েছেন, যারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন এবং তাঁর নির্দেশ লংঘন করেন না। চাই তাকে বাধ্যবাধকতা বলা হোক বা না হোক।
দ্বিতীয় উত্তর
সেখানে কাউকে সে সকল বিষয়ে মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়নি, যে সকল বিষয়ের অর্থাৎ নামায, রোযা, জিহাদ ইত্যাদির মুকাল্লাফ তথা বাধ্য করা হয়ে থাকে দুনিয়াতে। সেখানে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি বৃক্ষ বা এক প্রকারের বৃক্ষের ফল ভক্ষণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এতটুকু বাধ্যবাধকতা তো দারুল খুল্দ তথা স্থায়ী নিবাসে হতেই পারে। যেমন, প্রত্যেক জান্নাতবাসীকে অন্যের পরিজনের নিকট যাওয়া থেকে বারণ করা হবে। যদি আপনাদের উদ্দেশ্য এটাই হয়, তাতে এতটুকু বাধ্যবাধকতাও থাকবে না, তবে তা প্রমাণবিহীন উত্তর বৈ কি? আর যদি আপনাদের উদ্দেশ্য হয়, দুনিয়ার ন্যায় বাধ্যবাধকতা থাকবে না, তবে তা সমর্থিত ও প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু তার দ্বারা আপনাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না।
তৃতীয় দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, হযরত আদম আ. সেখানে ঘুমিয়েছেন। অথচ জান্নাতবাসী তো নিদ্রা যাবে না। যদি এই বর্ণনা প্রমাণিত হয়, তবু এর দ্বারা এটাই বুঝা যাবে, তাদের নিদ্রার বিষয় নিষেধ করা হয়েছে স্থায়ীভাবে জান্নাতে প্রবেশের পর। কেননা, তারা সেখানে মৃত্যুবরণ করবে না। কিন্তু এর পূর্বের নিষিদ্ধতা কোনো ভাবে প্রমাণিত হয় না।
চতুর্থ দলীল ও তার উত্তর
আপনারা এ কথার দ্বারা দলীল পেশ করেন, হযরত আদম আ. কে সিজদা না করার কারণে যখন ইবলীসকে আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া হল, তার পরও সে প্রবঞ্চনা দেয়ার জন্য সেখানে কিভাবে গমন করল? আল্লাহর শপথ! এটি উক্ত মতের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড় দলীল ও তাদের উক্তির বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টতর। ইবলীসকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করার পরও আকাশে আরোহণ ও জান্নাতে প্রবেশ করা সব-ই বাস্তবতা বিবর্জিত উক্তি। যা কোনো নীতিপরায়ণ ব্যক্তি সমর্থন করতে পারে না।
তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত পরীক্ষা ও পরীক্ষার নির্ধারিত উপকরণ ও মাধ্যম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাময়িকভাবে সে পর্যন্ত পৌছা অসম্ভব নয়। যদিও তা তার জন্য পূর্বের ন্যায় স্বতন্ত্র আবাসস্থল রূপে না হোক। জিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জিনরা আকাশে আরোহণ করত এবং এমন স্থানে বসতো, যেখান থেকে তারা ফিরিশতাদের আলোচনা শুনত। ফলে ওহীর কিয়দংশ তারা শুনে ফেলত। তাহলে এর মাধ্যমে জিনদের উপরের দিকে আকাশে উঠার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তবে তা সাময়িকভাবে হত। সেখানে তারা অবস্থান করতো না। এমনকি আল্লাহ তা'আলাও বলেন, اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ তোমরা পরস্পরে পরস্পরের শত্রুরূপে নিচে নেমে যাও।
সুতরাং নিচে নেমে যাওয়ার নির্দেশ এবং জিনদের উপরে উঠে ফিরিশতাদের কথা চুরি করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। এখানেও সে সম্ভাবনা বিদ্যমান।
আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর জীবনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এর ব্যাপারে হাদীস দ্বারা উক্ত মতকে মযবুত করেছেন। তার উত্তর হল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে তাঁর জীবনসীমা হিসাবে অবহিত করা আর জান্নাতুল খুলদে প্রবেশ করে কিছুকাল তাতে অবস্থান করার মাঝে কোন বিরোধ নেই। আর আল্লাহ তা'আলা যে বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে মৃত্যুবরণ করবে না এবং তা থেকে বের হবে না। তা হল, কিয়ামতের দিনে জান্নাতে প্রবেশের পর থেকে।
পঞ্চম দলীল ও তার উত্তর
আপনারা যে বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন, এতে কোন প্রকার সন্দেহ ও সংশয় নেই। কিন্তু আপনারা এটা কোথায় পেলেন, হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির পূর্ণতাও পৃথিবীতেই হয়েছে। অথচ কোন কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত القاه على باب الجنة أربعين صباحا، فجعل إبليس يطوف به، ويقول لأمر خلقت؟ فلمارأه أجوف علم أنه خلق لا يتمالك আল্লাহ তা'আলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর চল্লিশ দিন যাবৎ জান্নাতের দ্বারে ফেলে রেখেছিলেন, তখন ইবলীস তাঁর আশে-পাশে ঘুরতে ঘুরতে বলল, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হল? যখন সে তাঁকে উদর বিশিষ্ট দেখতে পেল, তখন সে বুঝে ফেলল, এতো অক্ষম এক দুর্বল সৃষ্টি। তখন সে বলল, لئن سلطت عليه لأهلكنه যদি আমাকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেব,"৯৪ ولئن سلط علي لأعصينه আর যদি আমার উপর তাকে কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়, তবে আমি তার অবাধ্য হব।
وَعَلَّمَ آدم الأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَبُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلاء إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমস্ত ফিরিশতার সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও৯৫।
قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র, আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান-ই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।
قَالَ يَا آدم أَنْبِئُهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ، فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ তিনি বললেন, হে আদম! তাদেরকে এ সকল নাম বলে দাও। সে তাদেরকে সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে আমি অবহিত।৯৬
এতে এ কথা-ই বুঝা যায়, হযরত আদম আ. সে ফিরিশতাদের সঙ্গে আকাশেই ছিলেন। কেননা, তিনি-ই তো তাদেরকে সে সকল নাম সম্পর্কে অবহিত করেছেন। অন্যথায় সে ফিরিশতাদের এ পৃথিবীতে নেমে আসার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। অথচ যখন তারা হযরত আদম আ.-থেকে সকল বস্তুর নাম শুনেছিলেন, তখন তাঁরা পৃথিবীতে অবতরণ করেননি।
আর যদি হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টি আদ্যোপান্ত পৃথিবীতেই হয়ে থাকে, তবু এটা অসম্ভব নয়, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সে কাজ বাস্ত-বায়নের জন্য আকাশে তুলে নিয়েছিলেন, যা তাঁর ব্যাপারে তিনি নির্ধারণ করে রেখেছেন। সংক্ষেপে একথাগুলো হযরত আদম আ.-এর জান্নাতুল খুলদে অবস্থানের ব্যাপারে জোর দাবীকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের যুক্তির জবাব। والله أعلم |
টিকাঃ
৯৪. এ বিষয়ের অনেক বর্ণনা মুসলিম শরীফ ২য়. পৃ. ৩২৭ ও মুসনাদে আহমাদ, খ. ৩, পৃ. ২৫৪ তে ভিন্ন শব্দে বর্ণিত রয়েছে।
৯৫. সূরা বাক্বারা ৩১
৯৬. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩২-৩৩