📄 জান্নাত এখনো আছে
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক সহচর সাহাবায় কিরাম, তাদের অনুসারী তাবেঈন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাবয়ে তাবেঈন সহ সর্বযুগের সকল বিদগ্ধ মুহাদ্দিস, ফুকাহা, সুফিয়ায়ে কিরাম সহ হকপন্থী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল জান্নাতের অস্তিত্ব পূর্বেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তারা তাদের এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে কুরআনুল কারীমের অসংখ্য আয়াত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অগণিত হাদীসের সাথে সাথে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগত নবী-রাসূলগণের অমূল্য বাণী পেশ করেন। কেননা, যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ তাঁদের উম্মতদেরকে বিদ্যমান ও অস্তিত্বশীল জান্নাতের দিকে আহ্বান করে এসেছেন। (অস্তিত্বহীন বিষয়ের দিকে আহ্বান তাঁদের মিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।)
জান্নাতের বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়
মু'তাযিলা ও কাদরিয়্যা সম্প্রদায়ের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জান্নাতের বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে থাকে। তারা বলে, জান্নাত এখনো সৃষ্টি করা হয়নি; বরং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করবেন। তাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণ তাদের এমন কিছু বিভ্রান্ত নীতিমালা; যার আলোকে তারা আল্লাহর কর্মপন্থা সম্পর্কে নিজেদের মনগড়া মূলনীতি উদ্ভাবন করেছে। তারা বলছে, অমুক কাজ আল্লাহ তা'আলার উপযোগী, তাই তিনি তা করেন। অমুক কাজ তাঁর শানের খিলাফ, তাই তিনি তা হতে বিরত থাকেন। তারা আল্লাহ তা'আলার কাজকে বান্দার কাজের সাথে তুলনা করে। তারা কি এ কারণেই আল্লাহ তা'আলার কাজকে বান্দার কাজের সাথে তুলনা করে, বান্দার কর্ম আর আল্লাহ তা'আলার কর্ম সামঞ্জস্যশীল?
এ বিশ্বাসের উপর এই দুই বিভ্রান্ত গোষ্ঠী এতটাই দৃঢ়, তারা আল্লাহ তা'আলার সকল সিফাত তথা গুণবাচক নামকে অনর্থক মনে করে। এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে তারা বলে, প্রতিদানের পূর্বে জান্নাত সৃষ্টি করে রাখার কোনো অর্থ হয় না। কারণ, এমতাবস্থায় জান্নাত দীর্ঘকাল বেকার পড়ে থাকবে। এতে কোন বসতি থাকবে না।
তারা আরো যুক্তি পেশ করে, সুস্পষ্টই কোন বাদশাহ যদি সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করে সেখানে নানাবিধ পানাহার দ্রব্যের ও আরাম-আয়েশের সকল প্রকার উপকরণের ব্যবস্থা করে দীর্ঘকাল তাকে অনাবাদ রাখে এবং মানুষকে তাতে প্রবেশ করতে বারণ করে, তবে তার এ কাজ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তির পরিপন্থী। এর ফলে ইসলামবিরোধী বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিকরা অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ পেয়ে যাবে।
সংশয়ের জবাব
মু'তাযিলারা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ ও বিফল জ্ঞানের দৃষ্টিতে আল্লাহ তা'আলার প্রতি প্রজ্ঞাবিরুদ্ধ কর্ম সম্পাদনের আপত্তি হতে আত্মরক্ষার্থে বর্তমান সময়েও জান্নাত বিদ্যমান থাকার বিষয়টিকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ তা'আলার কর্মকে নিজেদের কর্মের সাদৃশ্যময় সাব্যস্ত করে।
সুতরাং তারা আল্লাহ তা'আলার কর্মের ব্যাপারে নিজেদের মনগড়া বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক সকল 'নস' (কুরআন-হাদীসের অকাট্য নির্দেশনা)-কে অস্বীকার করেছে। কোথাও কোথাও কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট অর্থ থেকে সরে গিয়ে নিজেদের মনগড়া অর্থ ও বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। তাই যারা তাদের এ ভ্রান্ত মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে, তাদেরকে তারা উল্টো ভ্রান্ত ও বিদ'আতী বলে বেড়ায়। তারা তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের মাঝে এমন সব বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞজনদের হাসির খোরাক হয়। এ কারণেই (তাদের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনের জন্য) সালফে সালেহীন তাদের আকায়েদগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম অবশ্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁরা তাঁদের বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ করেছেন, এটি (জান্নাত-জাহান্নাম বর্তমানে বিদ্যমান থাকা) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সর্বসম্মত আকীদা। এতে কারো দ্বিরুক্তি নেই।
ঈমানের মৌলিক বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা
ইমাম আবুল হাসান আশ'আরী রহ. তাঁর "মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ওয়া ইখতিলাফুল মুদিল্লীন" নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, 'সকল মুহাদ্দিসসহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সর্বসম্মত আকীদা হল, আল্লাহ তা'আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর রাসূলগণ ও তাঁর কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক অবতীর্ণ বিষয়াবলীর প্রতি ঈমান আনয়ন করা এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য হতে কোনটিকে প্রত্যাখ্যান না করা এবং এ আকীদা পোষণ করা যে, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই মা'বূদ তথা উপাস্য। তিনি একক, অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন সন্তান ও স্ত্রী নেই। আর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও তদীয় রাসূল।
নিঃসন্দেহে জান্নাত ও দোযখ সত্য। কিয়ামত তথা প্রতিদান দিবস অবশ্যই আসন্ন। এতে কোন সন্দেহ ও সংশয় নেই এবং সমাধিস্থদের আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই পুনর্জীবন দান করবেন। (মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির শরীর যেখানেই থাকুক, যে অবস্থাতেই থাকুক, তা-ই তার জন্য কবর। সুতরাং কিয়ামতের দিন সবাইকে উঠানো হবে, কেউ বাকি থাকবে না।) এবং আল্লাহ তা'আলা আরশে অধিষ্ঠিত। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, الرَّحْمن عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوى তিনি পরম দয়াময় আরশে সমাসীন হয়েছেন।৬ এবং তাঁর দু'হাত আছে, কিন্তু তা কেমন জানা নেই।৭ যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, يَا إِبْلِيْسَ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ হে ইবলীস! আমি স্বহস্তে যাকে সৃষ্টি করেছি, তাঁর সামনে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল?৮
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, بَل يَدَاهُ مَبْسُوْطَانِ (ইহুদীরা বলে, আল্লাহর হাত বন্ধ।) তাদের এ কথা ভুল। বরং তাঁর উভয় হস্ত উন্মুক্ত।৯
তাঁর দুটি চক্ষু রয়েছে; কিন্তু তার প্রকৃতি অজানা। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا যা (হযরত নূহ আ.-এর তরী) চলত আমার দৃষ্টির সামনে।১০
এমনিভাবে তাঁর চেহারাও আছে। কিন্তু তার প্রকৃতি জানা নেই। যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ একমাত্র তোমার প্রতিপালকের চেহারাই (সত্তা) অবিনশ্বর।১১
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত ও মুহাদ্দিসীনে কিরামের মত হল, আল্লাহ তা'আলার সুন্দর গুণবাচক নামগুলো তাঁর সত্তা হতে বিচ্ছিন্ন নয়। পক্ষান্তরে মু'তাযিলা ও খারেজীদের আকীদা হল, আল্লাহর সত্তা ও নাম ভিন্ন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত আল্লাহর জন্য ইলমের গুণ সাব্যস্ত হওয়ার আকীদা পোষণ করে। যেমন আল্লাহ নিজেই ইরশাদ করেন, أَنزَلَهُ بِعِلْمِهِ তিনি তা অবর্তীর্ণ করেছেন নিজ জ্ঞানে।১২
তিনি আরো ইরশাদ করেন, وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَى وَلَا تَضَعُ إِلا بِعِلْمِهِ অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং প্রসবও করে না।১৩
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত আল্লাহ তা'আলার জন্য শ্রবণ ও দর্শন গুণদ্বয় সাব্যস্ত করেন। এর কোনোটি অস্বীকার করে না। যেমনটি মু'তাযিলারা করে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত আল্লাহ তা'আলার সত্তার মাঝে শক্তির গুণ রয়েছে বলে বিশ্বাস রাখেন। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً তারা কি তবে লক্ষ্য করেনি, আল্লাহ; যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অপেক্ষা শক্তিশালী?১৪
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ আকীদাও পোষণ করে, এ পৃথিবীতে ভাল-মন্দ যা-ই ঘটে, তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই ঘটে। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই প্রত্যেক বস্তু অস্তিত্ব লাভ করে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ তোমরা ইচ্ছা করবে না, যদি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করেন।১৫ যেমন, মুসলমানরা বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হবে। আর যা ইচ্ছা করবেন না, তা হবে না।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলে, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা কোনো কাজ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কেউ সে কাজ করতে সক্ষম নয়। অথবা আল্লাহকে না জানিয়ে কেউ কোনো কাজ সম্পাদন করতে পারবে না এবং যে কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ জানেন যে হবে না, কোন ব্যক্তি সে কাজ গঠন করতে পারবে না।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদা হল, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। বান্দার সকল কাজ-কর্ম একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই সৃষ্টি। বান্দার কোন কিছু সৃজনের ক্ষমতা নেই।১৬ এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর মু'মিন বান্দাদেরকে তাঁর আনুগত্যের তাওফীক প্রদান করেন। আর কাফির তথা অবিশ্বাসীদেরকে অপদস্থ করেন এবং মু'মিনদের প্রতি দয়া করেন, তাদের সাহায্য করেন ও সংশোধন করেন। হিদায়াত তথা সরল পথ লাভের সৌভাগ্য দান করেন। কিন্তু কাফিরদের প্রতি তিনি (তাঁর বিশেষ) অনুগ্রহ করেন না ও তাদেরকে সংশোধন করেন না।
যদি তিনি তাদেরকে সংশোধন করতেন, তবে তারা মু'মিন হতো। যদি তিনি তাদেরকে হিদায়াত প্রদান করতেন, তবে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হতো। আর আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই কাফিরদেরকে হিদায়াত প্রদানে সক্ষম। তিনি তাদের প্রতি এতটুকু দয়া করতে পারেন, তারা ঈমানের দৌলত লাভে ধন্য হবে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইলম মুতাবিক১৭ চান, তারা কাফির-ই থাকুক। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অপমানিত করেছেন, পথভ্রষ্ট করেছেন ও তাদের অন্তরে মোহরাঙ্কন করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে ভাল-মন্দ আল্লাহর ফায়সালার উপর নির্ভরশীল। মু'মিন আল্লাহর ফায়সালা তথা তাকদীর ও তার ভাল-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। এ কথাও বিশ্বাস করে, তারা নিজের কোন প্রকার মঙ্গল ও অমঙ্গলের মালিক নয়; বরং তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই ইচ্ছাধীন।১৮ মু'মিন তার সকল বিষয়কেই আল্লাহ তা'আলার উপর সোপর্দ করে থাকে এবং সর্বাবস্থায়ই তাঁর নিকট নিজ প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করে থাকে।
এ আকীদাও পোষণ করে, কুরআনুল কারীম আল্লাহ তা'আলার কালাম তথা বাণী। এটা মাখলুক নয়। কাজেই কুরআনুল কারীমকে মাখলুক (সৃষ্ট) বলা যেমন ভ্রান্ত মত। তেমনি সৃষ্ট বা অসৃষ্ট নিরূপণ না করে মৌনতা ও নিরপেক্ষতা অবলম্বন করাও বিদআতী মতবাদ।১৯
মু'মিনগণ এ কথার প্রতিও বিশ্বাস রাখে, কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলাকে চর্মচক্ষে তেমনিভাবে দেখা যাবে, যেমনিভাবে পূর্ণিমার রজনীতে চাঁদকে দেখা যায়। তবে শুধু মু'মিনগণই আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে, কাফিররা নয়। কারণ, তাদের মাঝে ও আল্লাহ তা'আলার মাঝে আড়াল থাকবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, كُلًّا إِنَّهُمْ عَنْ ربِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ না, অবশ্যই সেই দিন তারা তাদের প্রতিপালক হতে অন্তরিত থাকবে।২০
কিয়ামতের দিনে কাফিরদেরকে আল্লাহ তা'আলার নিকট যেতে দেয়া হবে না। হযরত মূসা আ. দুনিয়াতেই আল্লাহ তা'আলাকে দেখার জন্য তাঁর নিকট আবেদন করলেন। আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ের উপর স্বীয় নূরের তাজাল্লী ফেললেন, এতে পাহাড় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তখন হযরত মূসা আ. বুঝতে পারলেন, এ জগতে আল্লাহ তা'আলাকে দেখা সম্ভব নয়। কেউ তাঁকে এ জগতে দেখতে পারবে না; বরং একমাত্র পরকালেই তাঁকে দেখা সম্ভব হবে।
মু'মিনগণ আহলে কিবলাদেরকে ব্যভিচার, চুরি বা এ জাতীয় কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ফলে কাফির সাব্যস্ত করে না।২১ বরং তারা এ জাতীয় কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও মু'মিনের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, তারা ঈমানের সংজ্ঞা এভাবে করে থাকেন, “ঈমান হল, আল্লাহ তা'আলার প্রতি, তাঁর ফিরিশতাগণের প্রতি, তাঁর অবতীর্ণকৃত সকল কিতাবের প্রতি, তাঁর সকল নবী-রাসূলের প্রতি ও তাকদীরের ভাল-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গল; সকল বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। এ কথার প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করা, যে বস্তু অর্জিত হয়নি, তা কোনভাবেই অর্জিত হবার নয়। আর যা অর্জিত হয়েছে, তা কোনভাবেই লক্ষভ্রষ্ট হয়ে যাবার মত নয়।"
আর ইসলাম হল, "ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা'বুদ তথা উপাস্য নেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার রাসূল।" যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে।২২
সাথে সাথে তাঁরা ঈমান ও ইসলাম দুটিকে পৃথক দুটি বিষয় মনে করেন। তাঁরা এ-ও বিশ্বাস করেন, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই অন্তরকে পরিবর্তনকারী এবং কিয়ামতের দিবসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের জন্যও সুপারিশ করবেন। আর এ সুপারিশ হবে উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্য হতে কবীরা গুনাহকারীদের জন্য। তারা এ আকীদাও পোষণ করেন, কবরের আযাব সত্য। হাউযে কাউসারও সত্য। পুলসিরাতও সত্য। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানও সত্য। আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বান্দার হিসাব নেয়ার বিষয়টিও সত্য এবং আল্লাহর সামনে একদিন উপস্থিত হতে হবে; এটিও সত্য। তাঁরা বলেন, মৌখিক স্বীকারোক্তি ও কর্মে পরিণতকরণ উভয়ের সমষ্টি-ই হল, ঈমান। তাতে হ্রাস-বৃদ্ধিও ঘটে।২৩ তারা আরো বলেন, আল্লাহ তা'আলার সিফাত (গুণাবলী) তাঁর সত্তা থেকে পৃথক কিছু নয় এবং তারা কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে জাহান্নামী হওয়ার ফায়সালা দেন না। তেমনিভাবে কোনো (নির্দিষ্ট) মু'মিন-এর ব্যাপারে জান্নাতী হওয়ারও ফায়সালা প্রদান করেন না।২৪
আর তারা এ বিশ্বাসও রাখেন, তাদের বিষয় একমাত্র আল্লাহর-ই নিকট। তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করবেন, আর যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন। এবং তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) এ-ও বিশ্বাস করে, আল্লাহ তা'আলা তাওহীদে বিশ্বাসী একদল উম্মতকে (যাদেরকে তাদের পাপের শাস্তি ভোগের লক্ষ্যে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং তাদের শাস্তির মেয়াদ সম্পন্ন হয়ে গেছে) জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। যেমনটি হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে।২৫ তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) বিশুদ্ধতম বর্ণনাগুলোকে মান্য করায় দীনের ব্যাপারে ঝগড়া-বিবাদ, তাকদীরের (ভাগ্যলিপি) ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক এবং যে বিষয়গুলোতে বিবাদকারীরা (প্রশাখামূলক মাসআলাগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করে) বিতর্ক করে থাকে, তা পসন্দ করেন না। যদি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর সূত্রে তাদের নিকট কোনো হাদীস পৌঁছে, তবে তারা কোনো প্রকার প্রশ্ন উত্থাপন করেন না।২৬ এটাও বলেন না, এটা কেন হল? কেননা, কোনো হাদীস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এরূপ (টাল-বাহানা) করা নির্ঘাত বিদ'আত।
তাঁরা এ বিশ্বাসও রাখেন, আল্লাহ তা'আলা কোনো মন্দ কাজের নির্দেশ দেন না, (বরং আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে ভাল-মন্দ উভয়ের শক্তি প্রদান করেন। বান্দা তার মধ্যে যেটি করার ইচ্ছা পোষণ করে, আল্লাহ তা'আলা সে ইচ্ছা পূর্ণ করার সুযোগ করে দেন।) বরং আল্লাহ তা'আলা মন্দ কাজ হতে নিষেধ করেছেন ও উত্তম কার্যাবলীর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা শিরককে পসন্দ করেন না। যদিও তা তাঁর ইচ্ছাধীন।২৭ এবং তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) তাদের সেই পূর্বসূরীদের প্রতি মর্যাদা পোষণ করেন ও মূল্যায়ন করেন, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যের জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাদের পারস্পরিক ছোটখাটো মতবিরোধকে সমালোচনার বস্তুতে পরিণত করেন না।
তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) মনে করে, সাহাবায় কিরামের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা. সর্বশ্রেষ্ঠ, অতঃপর হযরত উমর রা., অতঃপর হযরত উসমান রা., অতঃপর হযরত আলী রা.। তারা আরো বিশ্বাস করেন, এই চারজনই সেই খলীফা; যাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ জীবদ্দশায় হিদায়াতপ্রাপ্ত ও হিদায়েতপ্রদর্শক; এই দুই মহান উপাধিতে ভূষিত করে গেছেন। আর অবশ্যই তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ও অন্যান্য নবীগণ)-এর পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব।
তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সে সকল হাদীসকেও সত্যায়ন করেন, যাতে রয়েছে? ان الله ينزل إلى السماء الدنيا فيقول هل من مستغفر দুনিয়ার আকাশে (প্রথম আকাশে) অবতরণ করেন, (তাঁর শান মুতাবিক) এবং বলতে থাকেন, আছে কি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।২৮
তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আমল করেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إلى اللهِ وَالرَّسُولِ (কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট উপস্থিত কর।২৯) এবং তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) আইম্মা কিরামের অনুসরণ করেন। তারা নিজ ধর্মের ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুমতির বাইরে অন্য কারো আনুগত্য করেন না। তারা আরো মনে করেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দার সম্মুখে আগমন করবেন। যেমন তাঁর বাণী, وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفَا صَفَا )এবং যখন তোমার প্রতিপালক উপস্থিত হবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও।)৩০ এবং তারা এ বিশ্বাসও রাখেন, আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তাঁর শান মুতাবিক মাখলুকের অতি নিকটে অবস্থান করেন। যেমন, তাঁর বাণী, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ )আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।)৩১
এবং তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) দুই ঈদের নামায, জুমু'আর নামায ও অন্যান্য নামায নেককার ও ফাসিক প্রত্যেক ইমামের পেছনে পড়াকে জায়েয মনে করেন।
তারা (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) মোজার উপর মাসেহ করাকে হাদীসের আলোকে বৈধ মনে করেন। সফর ও ইক্বামত উভয় অবস্থাতেই তা জায়েয মনে করেন। মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে ফরয মনে করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত হওয়ার সময় থেকে এ উম্মতের শেষ দল যখন দাজ্জালের সাথে জিহাদ করবে এবং তারপর কিয়ামত পর্যন্ত তারা জিহাদকে ফরয মনে করেন। এবং মুসলিম শাসকদের সংশোধনের জন্য দু'আ করাকে জায়েয মনে করেন। আর তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ভাল মনে করেন না। দাজ্জালের আবির্ভাবের উপর বিশ্বাস করে। আর এ-ও বিশ্বাস করে, হযরত ঈসা আ. আকাশ থেকে অবতরণ করে দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মৃত্যু পরবর্তী আলমে বরযখ তথা কবর জগতে প্রশ্নকারী মুনকার-নাকীরের বিষয়টি সহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সশরীরে মি'রাজ গমন ও স্বপ্নযোগে আল্লাহর প্রত্যাদেশ লাভের সত্যতার উপর ঈমান রাখেন এবং এও বিশ্বাস করেন, মৃত মুসলমানদের জন্য দু'আ করা হলে, অথবা তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা হলে এর সাওয়াব তাদের আমলনামায় সংযুক্ত হয়। এ কথারও সত্যায়ন করেন, পৃথিবীতে যাদুকর রয়েছে। আর যাদুকররা (অর্থাৎ যাদু-টোনাকে হালাল বিশ্বাসকারী) কাফির। যেমন, আল্লাহর বাণী, وَمَا كَفَرَ سلیمان (আর) সুলাইমান কুফরী করেননি অর্থাৎ যাদু ক্রিয়া করেননি।৩২
আহলে কিবলাদের মধ্য হতে নেককার মু'মিন বা ফাসিক যে-ই মৃত্যুবরণ করবে, তাকে জানাযা দিতে হবে। আর এ কথাও বিশ্বাস করেন, জান্নাত ও দোযখ তৈরী করা হয়েছে। যে মৃত্যুবরণ করে, সে তার মৃত্যুর নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুবরণ করে। আর যে কাউকে হত্যা করে, সে তার মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ে-ই হত্যা করে। (হত্যাকে শরী'আত নিষেধ করেছে। তাই যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে, তাকে শরী'আতের হুকুমের বিরোধিতার দরুন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এর অর্থ এই নয়, হত্যাকারী নিহত ব্যক্তিকে তার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই হত্যা করেছে।)
হালাল-হারাম সব প্রকার রিযিক-ই খোদা প্রদত্ত। অবশ্য শয়তান মানুষকে ধোকা দিয়ে সন্দেহে ফেলে ও পথভ্রষ্ট করে। এটিও সম্ভব, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নেক বান্দাদের মধ্য হতে কারো থেকে কারামাত প্রকাশ করার মাধ্যমে তাকে বিশেষিত করতে পারেন এবং তারা এ বিশ্বাসও রাখেন, হাদীস দ্বারা কুরআনকে রহিত করা বৈধ নয়।৩৩
শৈশবে যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের বিষয় আল্লাহ তা'আলার নিকট-ই সমর্পিত। তিনি ইচ্ছা করলে শাস্তি দিতে পারেন বা তাঁর ইচ্ছানুযায়ী যে কোন আচরণ করতে পারেন। (অধিকাংশ উলামা কিরামের নিকট অপ্রাপ্ত বয়সে কোন শিশু মারা গেলে, সে শিশু কোন নেক আমল না করেও জান্নাতী হবে। কেননা, তারা মৃত্যুকালেও মুকাল্লাফ তথা শরী'আতের বিধানাবলী পালনে আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত হয়নি। মুকাল্লাফ তো শুধু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগণ।) বান্দা কোন আমল করার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা সে সম্পর্কে জানেন। তিনি লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন, বান্দা তার ইচ্ছা মুতাবিক এই এই কাজ করবে। মূলতঃ সকল বিষয়ই আল্লাহ তা'আলার নিয়ন্ত্রণাধীন।
তারা বিশ্বাস করেন, সকল বিষয়ের ক্ষমতা আল্লাহর হাতে। কাজেই তাঁর নির্দেশ পালনের উপর অবিচল থাকতে হবে এবং তিনি যা করতে বলেছেন তা প্রতিপালন করতে হবে এবং যা থেকে বারণ করেছেন, তা হতে বেঁচে থাকতে হবে। সকল কাজকর্ম তাঁরই সন্তষ্টি অর্জনের নিমিত্ত হতে হবে। ব্যভিচার, মিথ্যাচার, অবাধ্যতা, গর্ব, অহংকার, অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান, আত্মম্ভরিতা ইত্যকার কবীরা গুনাহ পরিহার করতে হবে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকামনা করতে হবে ও ইবাদতকারীদের সাথে মিলে আল্লাহর ইবাদত করাকে দ্বীন মনে করতঃ বিদ'আতের প্রতি আহ্বানকারীদের থেকে দূরে থাকতে হবে। এবং নম্রতা ও বিনয়ের সাথে কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত, হাদীস লিখা ও ফিকহী মাসআলা-মাসাইলে চিন্তা-গবেষণাকে নিজেদের ব্রত বানিয়ে নিতে হবে। সাথে সাথে উত্তম চরিত্র গ্রহণ করে অশ্লীল কথাবার্তা বর্জনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পানাহারের ব্যাপারে যাচাই করবে। (এ খাদ্য হালাল কিনা?) আর যে সকল বিষয়ে তারা আদিষ্ট তার উপর আমল করেন এবং সেগুলো সত্য হওয়ার বিশ্বাস রাখেন।"
হযরত আশআরী রহ.-এর প্রাগুক্ত গ্রন্থ হতে এ কথাগুলো উদ্ধৃত করার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য হল, 'জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ব হতেই সৃষ্ট' এ বিষয়ের উপর সকল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ঐকমত্য পাঠকবর্গের কাছে স্পষ্ট করা। উপরন্তু কারা সেই জান্নাত লাভের মহা সুসংবাদের প্রাপক তাও উক্ত কথামালার আলোকে পাঠকবর্গের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর তারা হলেন তারাই, যারা জান্নাত-জাহান্নাম আদি যুগেই সৃষ্টি হওয়ার প্রবক্তা। সকল প্রশংসা আল্লাহর।
পূর্ণ ইবারাত তথা রচনা পূর্বাপরসহ এ জন্য উল্লেখ করেছি, যাতে এ কিতাব সে সকল লোকের পরিচিতির ব্যাপারে প্রধান সঞ্চালকের ভূমিকা রাখতে পারে, যারা উল্লিখিত সুসংবাদের যোগ্য। নিশ্চয়ই এ আকীদা পোষণকারীরা-ই তার যোগ্য। আর তাওফীক একমাত্র আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে-ই হয়ে থাকে।
জান্নাত এখনো আছে, তার প্রমাণ
নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমাহ দ্বারা বুঝা যায়, জান্নাত এখনো আছে। আয়াতটি হল, وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِنْدَ سِدْرَة الْمُنْتَهَى عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى, নিশ্চয়ই তিনি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে (জিবরীল আ. কে) আরেকবার দেখেছিলেন প্রান্তবর্তী কুল বৃক্ষের নিকট। যার নিকট অবস্থিত বাসোদ্যান।৩৪
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস রা. হতে মি'রাজের ঘটনা সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসের শেষাংশে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর হযরত জিবরীল আ. আমাকে "সিদরাতুল মুনতাহা" পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তা বিচিত্র বর্ণচ্ছটায় সুশোভিত। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, তা কেমন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ثم دخلت الجنة অতঃপর আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। সেখানে রয়েছে মুক্তার মুকুলকলি। আর তার মাটিগুলি মৃগনাভির ন্যায় সুগন্ধিময়।৩৫
বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন إن أحدكم إذا مات عرض عليه مقعده بالغداة والعشى যখন তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করে তখন তার নিকট তার প্রাত্যহিক চির ঠিকানা পেশ করা হয়। ان كان من أهل الجنة فمن أهل الجنة ,2010 1217 1971 1019 1211 ان كان من أصحاب النار فمن أهل النارا যদি সে জান্নাতী হয়ে থাকে, তাহলে তার ঠিকানাও জান্নাতীদের ঠিকানায় থাকে, তাহলে তাকে জাহান্নামীদের ঠিকানায় অন্তর্ভূক্ত দেখানো হয়। فيقال هذا مقعدك حتى يبعثك الله يوم القيامة অতঃপর তাকে বলা হবে, এটা তোমার ঠিকানা। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে পুনরুজ্জীবিত করা পর্যন্ত তোমাকে এখানে বাস করতে হবে।।৩৬
মুসনাদে আহমদ, মুসতাদরাকে হাকিম, সহীহ ইবনে হাব্বান; হাদীসের এসকল নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক আনসারী সাহাবীর জানাযায় গেলাম। এরপর হাদীসটি দীর্ঘ। যার শেষাংশে আছে, কবরদেশে শায়িত হওয়ার পর মৃত ব্যক্তি যদি মুনকার-নাকীর ফিরিশতদ্বয়ের প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারে, তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে, আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তার জন্য জান্নাতী গালিচা এনে বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাত হতে পোশাক এনে পরিয়ে দাও। এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দ্বার খুলে দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন তার কবর থেকে জান্নাতের দিকে একটি দ্বার খুলে দেয়া হবে। এবং তার কবরে জান্নাতের সুবাতাস ও সুগন্ধি ভেসে বেড়াবে।
সহীহায়নে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন ব্যক্তিকে কবরে রাখা হয়। এবং তার নিকট থেকে তার স্বজনরা চলে আসে। তখন সে তাদের জুতার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পায়। অতঃপর তার নিকট দু'জন ফিরিশতা উপস্থিত হয়। অতঃপর ফিরিশতাদ্বয় তাকে বসায়। ফিরিশতাদ্বয় জিজ্ঞাসা করে, এই মহান ব্যক্তিত্ব (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে তুমি কী বলতে?৩৯ যদি সে সমাধিস্থ ব্যক্তি মু'মিন হয়, তবে বলবে, اشهد انه عبد الله ورسوله আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও তাঁর রাসূল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে ফিরিশতা তাকে বলবে, انظر إلى مقعدك من النار জাহান্নামে তোমার ঠিকানা দেখ। যদি তুমি মু'মিন না হতে, তবে এটাই হত তোমার ঠিকানা। যেহেতু তুমি মু'মিন قد أبدلك الله به مقعدا في الجنة قال نبي الله فيراهما جميعا জান্নাতকে তোমার ঠিকানা বানিয়েছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে উভয় ঠিকানাই দেখবে।
সহীহে আবূ আওয়ানা ইমাম ইসফারাইনী রহ. ও সুনানে আবী দাউদে হযরত বারা ইবনে আযিব রা. হতে রূহ কবয করার ব্যাপারে দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত রয়েছে। যাতে রয়েছে, ثم يفتح له باب من الجنة وباب من النار فيقال هذا كان منزلك لوعصيت الله تعالى একটি দ্বার ও জাহান্নামের দিকে একটি দ্বার উন্মুক্ত করা হবে। (জাহান্নামের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হবে) যদি তুমি আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী করতে, তবে এই জাহান্নামই হত তোমার ঠিকানা। কিন্তু أبدلك الله به هذا আল্লাহ তা'আলা তার পরিবর্তে জান্নাতকে তোমার আবাসস্থল নির্ধারণ করেছেন। فإذا رأى ما في الجنة সুতরাং সে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি জান্নাতের বস্তসমূহ দেখে বলবে, يارب عجل قيام الساعة أرجع إلى أهلي ومالي হে প্রভু! শীঘ্র কিয়ামত সংগঠিত করুন, যেন আমি আমার পরিজন ও সম্পদ ফিরে পাই। তখন বলা হবে, اسکن এখন তুমি বিশ্রাম কর।
মুসনাদে বায্যায ও অন্যান্য গ্রন্থে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, أيها الناس ان هذه الأمة تبتلى في قبورها হে লোকসকল! নিঃসন্দেহে এ সকল মানুষ (মৃত) স্বীয় কবরে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। فإذا دفن الإنسان وتفرق عنه أصحابه جاء ملك في يده مطراق যখন কোন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে তার স্বজনরা তার নিকট হতে চলে আসে, তখন একজন ফিরিশতা আসেন, যার হাতে একটি লোহার হাতুড়ি থাকবে। (তার সাথে অন্যান্য ফিরিশতাও থাকবেন; কিন্তু শুধু এই ফিরিশতার অবস্থা-ই দৃশ্যমান হবে। এ জন্যই শুধু তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে) অতঃপর সে ফিরিশতা ঐ ব্যক্তিকে বসাবে ও তাকে প্রশ্ন করবে, ما تقول في هذا الرجل؟ তুমি এ মহান ব্যক্তি (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে) কী বলতে? فإن كان مؤمنا قال أشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا عبده ورسوله যদি সে ব্যক্তি মু'মিন হয়, তবে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।
অতঃপর সে ফিরিশতা বলবেন, তুমি সত্যই বলেছ। ثم يفتح له باب إلى النار অতঃপর তার জন্য জাহান্নামমুখী একটি দ্বার উন্মুক্ত করে বলবে, যদি তুমি কাফির হতে, তবে এটা হতো তোমার আবাসস্থল। যেহেতু তুমি ঈমান এনেছ, তাই এটি হল তোমার আবাসস্থল। فيفتح له باب إلى الجنة অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। তখন সে জান্নাতে যেতে চাইলে ফিরিশতা তাকে বলবে, اُسکن এখন বিশ্রাম নাও।
সহীহ মুসলিমে৪২ হযরত আইশা সিদ্দীকা রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় একবার সূর্যগ্রহণ হলে তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করলেন। তাতে তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে বললেন, ان الشمس والقمر آيتان من أيات الله تعالى অবশ্যই চন্দ্র-সূর্য আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী হতে দু'টি নিদর্শন। لا يخسفان لموت أحد ولا لحياته সেগুলোতে কারো মৃত্যুর কারণে বা জন্মলাভের কারণে গ্রহণ লাগে না। সুতরাং তোমরা সেগুলোকে এমন হতে দেখলে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যাও।৪৩
উক্ত খুতবায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, رأيت في مقامي هذا كل شئ وعدتم আমি যে স্থানে দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকে সে বস্তুগুলো দেখতে পেলাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে। এমনকি আমি নিজেকে জান্নাতে একটি আঙ্গুরের গুচ্ছ ধরতে দেখতে পেলাম। এটা তখন, যখন তোমরা আমাকে একটু সামনে অগ্রসর হতে দেখলে। আমি জাহান্নামও দেখেছি, তার একাংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছিল। এটা তখন, যখন তোমরা আমাকে একটু পেছনে সরে যেতে দেখলে।৪৪ সহীহায়নে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় একবার সূর্য গ্রহণ হয়। হাদীসটি বেশ দীর্ঘ। যার শেষাংশে রয়েছে, চন্দ্র-সূর্য; এগুলো আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলীর মধ্য হতে দু'টি অন্যতম নিদর্শন। কারো জন্ম বা মৃত্যুতে তাতে গ্রহণ লাগে না। সুতরাং তোমরা চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ হতে দেখলে আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করতে থাক।৪৫ অতঃপর সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনাকে দেখতে পেলাম, আপনি আপনার স্থান থেকে কোনো কিছু ধরতে চাইছেন। একটু পর দেখলাম, আপনি একটু পেছনে সরে এলেন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি জান্নাত দেখতে পেলাম এবং আঙ্গুর গুচ্ছ ধরতে চাইলাম। যদি আমি তা নিয়ে নিতাম, তবে তোমরা আজীবন খেতে পারতে (কখনো শেষ হতো না)।
আমি দোযখও দেখেছি। এতো ভয়ানক চিত্র অদ্যাবধি আর কখনো দেখিনি। জাহান্নামে মহিলাদের সংখ্যা অধিক দেখলাম। সাহাবায় কিরাম রা. জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর কারণ কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরা অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হল, এরা কি আল্লাহ তা'আলার অকৃতজ্ঞতা করে? বললেন, يكفرن العشير না, এরা স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয়। ويكفرن الإحسان এবং অনুগ্রহ ভুলে যায়। যদি তোমরা আজীবন তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর, অতঃপর তোমার থেকে সে সামান্যতম কষ্ট পায়, তবে বলবে, مارأيت منك خيرا قط আমি তোমার থেকে কখনো কোন উত্তম ব্যবহার পাইনি।
সহীহ বুখারীতে৪৬ হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যগ্রহণ চলাকালে নামায আদায় করেছেন। এরপর ইরশাদ করেন, জান্নাত আমার এত নিকটবর্তী করা হয়েছে যে, যদি আমি সাহস করে আঙ্গুরের থোকা তোমাদের জন্য নিতে চাইতাম, তবে নিতে পারতাম। এমনিভাবে জাহান্নامও আমার এত নিকটবর্তী করা হল যে, আমি বললাম, হে প্রভু! أنا معهم আমি তো তাদের মাঝে রয়েছি।৪৭
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে জাহান্নামে এমন এক মহিলা ছিল, যাকে একটি বিড়াল তার পাঞ্জা দ্বারা আঁচড় দিচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ মহিলার এ অবস্থা কেন? ফিরিশতাগণ বললেন, এ মহিলা এ বিড়ালটিকে আবদ্ধ করে রেখেছিল, যার ফলে সেটি ক্ষুৎ-পিপাসায় মারা গেল। সে তাকে নিজেও কোন খাদ্য দেয়নি, আর তাকে মুক্তও করে দেয়নি, যাতে সে নিজে খাবার সংগ্রহ করে খেতে পারে।
সহীহ মুসলিমে সূর্যগ্রহণের নামায সংক্রান্ত ঘটনায় হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার সামনে সে সব বস্তু উপস্থিত করা হল, যাতে মানুষ প্রবেশ করবে। সুতরাং আমার সামনে জান্নাত উপস্থিত করা হল।৪৮ এমনকি আমি আঙ্গুরের থোকা নিতে চাইলাম। কিন্তু আমার হাত সে পর্যন্ত যায়নি এবং আমার সামনে فرأيت فيها إمرأة من بني إسرائيل تعذب في هرة لها তাতে আমি বনী ইসরাঈলের এক মহিলাকে দেখলাম, যাকে তার বিড়ালের কারণে শাস্তি দেয়া হচ্ছে।
সহীহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত আছে।৪৯ যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুত ঘটনাবলীর দৃশ্য আমি আমার এ নামাযে দেখেছি। তখন আমার সামনে জাহান্নাম উপস্থিত করা হল, এটা তখন যখন তোমরা আমাকে পেছনে সরে যেতে দেখলে। আমি এ ভয়ে পেছনে সরে এলাম, যেন তার তাপ আমার গায়ে না লাগে। তখন আমি একজন যষ্টিধারী ব্যক্তিকে সেখানে শাস্তিভোগ করতে দেখলাম, যে দুনিয়ায় থাকাকালে হাতে লাঠি নিয়ে হাজীদের মালামাল চুরি করছিল। যদি কেউ তার এ কাজ দেখে ফেলত তখন সে বলত, আমার লাঠি আটকে গেছে। যদি ঐ মালের মালিক না জানতো, তবে সে এ মাল চুরি করে নিত। আর সেখানে আমি এক বিড়ালের মালিক মহিলাকে দেখলাম, যে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল। সে নিজেও তাকে কোনো খাবার দেয়নি আর তাকে মুক্তও করে দেয়নি, সে নিজ খাবার নিজেই সংগ্রহ করে তা খেয়ে জীবন ধারণ করবে। শেষ পর্যন্ত বিড়ালটি ক্ষুৎ-পিপাসায় মারা গেল।
অতঃপর আমার সামনে জান্নাত উপস্থিত করা হল। এটা তখন যখন তোমরা আমাকে একটু সামনে অগ্রসর হতে দেখলে। তখন আমি নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে জান্নাতের ফল-ফলাদি হতে কিছু নিতে চাইলাম। যাতে তোমরা তা দেখতে পাও। কিন্তু পরে ভাবলাম এরকম না করাই সংগত। তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুত ঘটনাবলীর দৃশ্য আমি আমার এ নামাযে দেখেছি।
মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবী দাউদ ও নাসায়ীতে সূর্যগ্রহণ সংক্রান্ত ঘটনা সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণনা আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার জীবন, নিশ্চয়ই জান্নাত আমার এত নিকটবর্তী করা হয়েছে, আমি তার ফলের থোকা থেকে কিছু নেয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। জাহান্নামও আমার এত নিকটবর্তী করা হয়েছে, আমি তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম, এ ভয়ে যে; তা যেন তোমাদেরকে গ্রাস করে নিতে না পারে।
সহীহ মুসলিম শরীফে৫০ হযরত আনাস বিন মালিক রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে। একবার নামাযের ইকামত বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, يأيها الناس إلى إمامكم فلا تسبقوني بالركوع ولا بالسجود ولا ترفعوا روؤسكم، فإنى أراكم كثيرا من أمامي و من خلفي، لو رأيتم ما رأيت لضحكتم قليلا و لبكيتم كثيرا হে লোকসকল! আমি তোমাদের ইমাম। সুতরাং তোমরা রুকু-সিজদাতে আমার থেকে অগ্রসর হয়ো না। আমার পূর্বে তোমরা তোমাদের মাথা উঠিও না। কেননা, আমি তোমাদেরকে আমার সামনে ও পেছনে উভয় দিকেই দেখি। আমি যা দেখেছি, তোমরা যদি তা দেখতে, তবে তোমরা কম হাসতে ও অধিক কাঁদতে।
সাহাবায় কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! مارأيت আপনি কী দেখেছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, رأيت الجنة والنار আমি জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছি।
মুয়াত্তা৫২ ও সুনানে আবী দাউদে৫৩ হযরত কা'ব ইবনে মালিক রা.-এর বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إنما نسمة المؤمن طير يعلق في شجر الجنة حتى يرجعها الله إلى جسده يوم القيامة পাখির আকৃতিতে জান্নাতে ঘুরে বেড়ায়; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় শরীরে ফিরিয়ে দেয়া পর্যন্ত।
এই হাদীসে এ বিষয়টি স্পষ্টাকারে রয়েছে, কিয়ামতের পূর্বেই রূহ জান্নাতে প্রবেশ করবে।
হযরত কা'ব ইবনে মালিক রা. হতে এ রকম অন্য একটি বর্ণনা আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, إن ارواح الشهداء في حواصل طير خضر تعلق في ثمر الجنة أو شجر الجنة পাখির পেটে থাকে। জান্নাতের ফল খেয়ে বেড়ায়। অথবা বললেন, জান্নাতের গাছ থেকে খেয়ে বেড়ায়।
আসহাবে সুনানও এ হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী রহ.৫৪ এটিকে সহীহ সাব্যস্ত করেছেন। এ গ্রন্থের শেষাংশে ইনশাআল্লাহ সে সকল হাদীস উল্লেখ করা হবে, যাতে কিয়ামতের পূর্বেই মু'মিনদের রূহ জান্নাতে প্রবেশ করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এ ব্যাপারে হাদীস দ্বারা যা প্রমাণিত, কুরআন কারীমের আয়াত দ্বারাও তা-ই বুঝা যায়।
সহীহ মুসলিম, সুনানে আবী দাউদ ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, لما خلق الله تعالى الجنة والنار أرسل جبریل إلى الجنة فقال إذهب فانظر إليها وإلى ما أعددت لأهلها فيها، فذهب فنظر إليها وعزتك لا يسمع بها أحد إلا أدخلها হযরত জিবরীল আ.-কে জান্নাত পরিদর্শনে পাঠালেন। বললেন, যাও সে উদ্যানসমূহ দেখে আসো। সেখানে বসবাসকারীদের জন্য যে সকল বস্তু তৈরী করে রেখেছি, সেগুলোও দেখ। জিবরীল আ. গিয়ে তা দেখে বললেন, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ, যে ব্যক্তিই এর সম্পর্কে অবগত হবে, সে-ই এতে প্রবেশ করার প্রাণান্ত প্রয়াস চালাবে। فأمر بالجنة فحفت بالمكاره অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতের চতুর্পার্শ্বে কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা বেষ্টনের নির্দেশ দিলেন। তাই চতুর্পার্শ্বে কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা বেষ্টনি গড়ে তোলা হল। তখন হযরত জিবরীল আ. কে বলা হল, পুনরায় জান্নাতে ফিরে গিয়ে আরেকবার দেখে এসো। জিবরীল আ. তা দেখে বললেন, হে প্রভু! আপনার ইয্যতের শপথ, আমার ভয় হয়, (সে সকল কষ্টদায়ক বস্তুর কারণে) তাতে কেউ প্রবেশ করবে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরীল আ. কে জাহান্নামে ও তাতে অবস্থানকারীদেরকে পরিদর্শনের জন্য পাঠালেন। হযরত জিবরীল আ. তা দেখলেন। فإذا هي يركب بعضها بعضا (জাহান্নামের অবস্থা এমন যে,) তার অগ্নিশিখা একটি অপরটির উপর আরোহণ করছে। অর্থাৎ একটি থেকে অন্যটি অধিক লেলিহানময়। হযরত জিবরীল আ. ফিরে এসে বললেন, وعزتك وجلالك হে প্রভু, আপনার ইয্যত ও বুযুর্গীর শপথ, যে ব্যক্তি দোযখ সম্পর্কে জানবে, সে কোনো ভাবেই তাতে প্রবেশ করতে চাবে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে জাহান্নামের চারপাশ কামনা ও অভিলাষের বস্তু দ্বারা বেষ্টন করা হল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত জিবরীল আ. কে বললেন, এবার তা দেখে এসো। তিনি গিয়ে দেখে ফিরে এসে বললেন, وعزتك لقد خشيت أن لأينجو منها أحد আপনার ইয্যতের শপথ, আমার ভয় হয়, এতে প্রবেশ করা থেকে কেউ-ই বাঁচতে পারবে না। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এই হাদীসটি হাসান ও সহীহ-এর পর্যায়ে।
সহীহায়নে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, জান্নাতকে কষ্টদায়ক বস্তুসমূহ দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে।৫৫ আর জাহান্নামকে কামনা ও অভিলাষের বস্তু দ্বারা বেষ্টন করা হয়েছে। সহীহায়নে حتجت শব্দে বর্ণিত হয়েছে।৫৬
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, اختصمت الجنة والنار، فقالت الجنة : يا رب ما لها إنما يدخلها ضعفاء الناس وسقطهم، وقالت النار : يا رب ما لها يدخلها الجبارون والمتكبرون، فقال : أنت رحمتي أصيب بك من أشاء، وأنت عذابي أصيب بك من أشاء، ولكل واحدة منكما ملؤها
বেহেশত দোযখ পরস্পর তর্কে লিপ্ত হবে। তখন জান্নাত বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার, আমার মর্যাদা কত উচ্চ, আমার মধ্যে দুনিয়ার দুর্বল ও নিম্ন মর্যাদাবান লোক প্রবেশ করবে। আর দোযখ বলবে, হে আমার প্রভু, আমার মর্যাদা কত উচ্চ, আমার মধ্যে দুনিয়ার বড় বড় প্রতাপশালী ও অহংকারীরা প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে লক্ষ্য করে বলবেন, তুমি আমার রহমত; যাকে ইচ্ছা তাকে আমি তা প্রদান করব। হে জাহান্নাম! তুমি হলে আমার শান্তি। যাকে ইচ্ছা তাকে আমি তোমার মাধ্যমে শান্তি দিব। তোমাদের প্রত্যেককে (প্রবেশকারীদের দ্বারা) পূর্ণ করে দেয়া হবে।
সহীহায়নে৫৭ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত রয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দোযখ আল্লাহ তা'আলার নিকট অভিযোগ করে বলল, بعضى بعضا أكل হে আমার প্রভু, তাপদাহের প্রচণ্ডতার দরুন আমার একাংশ অপরাংশকে গ্রাস করে ফেলছে। فأذن له بفسين তখন তাকে দু'বার নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি প্রদান করা হল, نفس في الشتاء ونفس في الصيف শীতকালে একবার শ্বাস নিবে, আর গরম কালে একবার শ্বাস নিবে।
হযরত আবদুল মালিক বিন বশীরের সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রতিদিন জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট নিবেদন পেশ করে।
জান্নাত বলতে থাকে, হে প্রভু, আমার ফল পেকে আছে। আমার প্রস্রবণগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে বয়ে চলছে। আর আমার মাঝে যারা বসবাস করবে, তারা এগুলোতে আগ্রহীও। সুতরাং আমার অধিবাসীদের তাড়াতাড়ি আমার মাঝে পাঠিয়ে দিন।
জাহান্নাম বলে, হে আমার প্রভু, আমার তাপদাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার গভীরতা অধিক থেকে অধিকতর হচ্ছে এবং আমার অঙ্গারও প্রচুর হয়ে গেছে। সুতরাং আমার অধিবাসীদের পাঠিয়ে দিন।
সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, بينما أسير في الجنة، وإذا بنهر في الجنة حافتاه قباب الدر المجوف قال : قلت : ما هذا؟ قال : هذا الكوثر الذي أعطاك ربك، فضرب الملك بيده فإذا طينه المسك الإذخر করছিলাম, তখন জান্নাতের একটি প্রস্রবনের কাছে গেলাম। যার উভয় পার্শ্বে ফাঁপা মুক্তার গম্বুজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, হে জিবরীল! এটি কী? জিবরীল আ. বললেন, এটি সেই হাউযে কাউসার, যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তখন ফিরিশতা তাতে নিজ হাত দ্বারা পানিতে আলোড়ন তুললেন। তার কাদাগুলো সুরভিত কস্তুরীসম।
সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আমি যখন জান্নাতে প্রবেশ করলাম, তখন একটি প্রাসাদ দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, এটি কার? উত্তর এল, لرجل من قريش এটি কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তির। فرجوت أن أكون أنا، فقيل : لعمر بن الخطاب (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,) আমি মনে মনে আশা করলাম, আমি-ই সেই ব্যক্তি হব। তখন আমাকে জানানো হল, এটি উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর প্রাসাদ। (রাসূল فلولا غيرتك يا أبا حفص لدخلته সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমর রা.কে লক্ষ্য করে বললেন,) হে আবূ হাফস! আমি যদি তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা চিন্তা না করতাম, তবে অবশ্যই তাতে প্রবেশ করতাম !
قال : فبكى عمر ، وقال : أ يغار عليك يارسول الله বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শুনে হযরত উমর রা. কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আপনার উপর কি কেউ আত্মমর্যাদাবোধ দেখাতে পারে?
হযরত বিলাল রা. সম্পর্কেও এমন বর্ণনা রয়েছে। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বিলাল রা.-কে বলেছেন, আমি আমার পূর্বে জান্নাতে তোমার জুতার শব্দ শুনতে পেয়েছি। এ জাতীয় অন্যান্য হাদীস সামনে বর্ণনা করবো, ইনশাআল্লাহ!
হযরত আবদুল্লাহ বিন ওহাব রহ. নিজ সনদে হযরত আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। ثم مديده ثم فلما سلم آخرها নামাযের ভেতর একবার হাত সামনে বাড়িয়ে দেন। পরের বার পেছনে টেনে আনেন। নামায সমাপনান্তে সালাম ফিরালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হল, يارسول الله لقد صنعت في صلواتك شيئا لم تصنعه في غيرها হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ নামাযে এমন কাজ করলেন, যা ইতোপূর্বে আর কোনো নামাযে করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, اني رأيت الجنة، فرأيت فيها دالية تطوفها دانية حبها كالدباء فأردت أن أتناول منها فأوحى إليها أن إستأخرى، فاستأخرت، ثم رأيت النار فيما بيني وبينكم حتى لقد رأيت ظلي وظلكم আমি জান্নাত দেখেছি। তাতে আমি আঙ্গুরের থোকা দেখেছি, যাতে ফল ঝুলে আছে এবং ফলগুলো কদুর সমান। আমি তা থেকে কিছু নেয়ার ইচ্ছে করলাম, তখন জান্নাতকে পিছে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হল এবং জান্নাত পিছে সরে গেল। অতঃপর আমি আমার ও তোমাদের মাঝে জাহান্নামের আগুন দেখতে পেলাম। এমনকি আমি আমার ও তোমাদের ছায়া দেখতে পেলাম। (বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছায়ার কথা উল্লেখ আছে) তাই আমি তোমাদেরকে পেছনে সরে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করলাম। কিন্তু আমার নিকট প্রত্যাদেশ এল, তাদেরকে স্ব-স্ব স্থানে থাকতে দাও। (তাদেরকে আগুন স্পর্শ করবে না।) যেহেতু আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন আর তারাও ইসলাম গ্রহণ করেছে। আপনি হিজরত করেছেন। তারাও হিজরত করেছে। আপনি জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছেন, তারাও জিহাদে অংশগ্রহণ করেছে। (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায় কিরাম রা. কে লক্ষ্য করে বললেন, فلم أر لي عليكم فضلا إلا بالنبوة তখন নবুওয়াত ছাড়া তোমাদের উপর আমার আর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব চোখে পড়ল না। (এহাদীস শব্দের কিছু পরিবর্তনসহ হযরত আনাস রা. থেকে মুসতাদরাকে হাকিমেও বর্ণিত রয়েছে। ইমাম হাকিম ও ইমাম যাহাবী উভয়ে এটিকে বিশুদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন।)
প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, জান্নাত বর্তমানেও বিদ্যমান থাকার ব্যাপারে হযরত আদম আ.-এর ঘটনা দ্বারা কেন দলীল দেয়া হয়নি? তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করা ও বের হওয়া এবং জান্নাতের নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া দ্বারা কেন দলীল দেয়া হয়নি। অথচ দলীলটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট!
উত্তর: উত্থিত প্রশ্নের উত্তর হল, অনেকের নিকট তো এর দ্বারা দলীল দেয়া অত্যন্ত স্পষ্ট ব্যাপার। কিন্তু এর দ্বারা দলীল দেয়া এ জন্য কষ্টসাধ্য যে, হযরত আদম আ.-কে যে জান্নাত দেয়া হয়েছিল, তা কি সেই চিরস্থায়ী জান্নাত; যাতে মু'মিনদেরকে কিয়ামতের দিন প্রবেশ করানো হবে? নাকি আল্লাহ তা'আলার মহিমাগুণে পৃথিবীতে সৃষ্ট কোনো জান্নাত? তাতে কারো কারো মতভেদ রয়েছে। আমি এ ব্যাপারে পক্ষ- বিপক্ষের মতামত পেশ করে উভয় পক্ষের বিশদ প্রমাণাদি তুলে ধরব। চেষ্টা করব, সঠিক মত অবলম্বনকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের প্রমাণ খণ্ডাতে। এব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কাছে শক্তি ও সামর্থ কামনা করি।
টিকাঃ
৬. সূরা ত্বহা, আয়াত: ৫
৭. আল্লাহ তা'আলা নিরাকার। তাই এখানে হাত, চেহারা ইত্যাদি দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।
৮. সূরা সাদ, আয়াত: ৭৫
৯. সূরা মায়িদা, আয়াত: ৬৪
১০. সূরা ক্বামার, আয়াত: ১৪
১১. সূর. আর রাহমান, আয়াত: ২৭
১২. সূরা নিসা, আয়াত: ১৬৬
১৩. সূরা ফাতির, আয়াত: ১১
১৪. সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১৫
১৫. সূরা দাহর, আয়াত: ৩০
১৬. খোদাপ্রদত্ত মেধার সাহায্যে মানুষ নব নব বস্তু আবিষ্কার করে। সৃষ্টি করে না। সৃষ্টি আর আবিষ্কার দু'টি এক বিষয় নয়; বরং ভিন্ন বিষয়।
১৭. যেহেতু তারা ফিতরাত তথা স্বভাবগত তাওফীককে বিনষ্ট করে ফেলেছে এবং এরা ঈমানের পথে অগ্রসর-ই হয় না। তাই আল্লাহ তা'আলাও জোরপূর্বক তাদেরকে হিদায়াত প্রদান করেন না।
১৮. যেমন, আল্লাহ তা'আলার বাণী: فل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ الله )বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা ব্যতীত আমার ভাল-মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই।)
১৯. সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনে কারীমকে শব্দ (অর্থাৎ মাখলুক) সাব্যস্ত করেছে বা এ ব্যাপারে কোন মত পোষণ থেকে বিরত থেকেছে, সে ব্যক্তি তাদের (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত) নিকট বিদআতী বলে গণ্য হবে। এটা বলা ঠিক নয় যে, এটা মাখলুক নয় (অর্থাৎ কুরআনে কারীমের দুটি অবস্থা। (এক) এটা আল্লাহ তা'আলার কালাম বা বাণী। (দুই) এটা মানুষ তিলাওয়াত করে, পড়ে ও পড়ায়। মূল বিষয় হল, এটি আল্লাহ তা'আলার বাণী। আর মানুষ এটি তিলাওয়াত করে। সুতরাং মানুষ যে শব্দগুলো তিলাওয়াত করে, সেগুলো তার মূলকে (আল্লাহ তা'আলার বাণী) বুঝায়। যেমনিভাবে 'আগুন' শব্দটির উচ্চারণ তার মূল সত্তাকে বুঝায়। তার মূল উচ্চারণ করা যায় না; বরং মূলের উপর নির্দেশক শব্দটি মাত্র উচ্চারণ করা যায়। তেমনিভাবে কুরআনুল কারীমের হাকীকত তথা মূল সে অর্থসমূহ যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার সত্তার সাথেই সংশ্লিষ্ট। এ শব্দগুলো সে হাকীকত তথা মূলের উপর নির্দেশক মাত্র। যেহেতু এই শব্দাবলী মূল নির্দেশক, সুতরাং এগুলো কুরআন। সেজন্য উসূলে ফিকাহবিদগণ বলেন, هو إسم للنظم والمعنى جميعا শব্দ ও অর্থ উভয়ের সমষ্টি-ই হল, কুরআন।
২০. সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৫।
২১. আহলে কেবলা তারা, যারা কেবলাভিমুখী হয়ে নামায আদায়কারীদের সাথে সকল প্রকার মৌলিক ও প্রশাখামূলক মাসআলাতে সমমত পোষণ করে। কিবলাভিমুখী হয়ে নামায আদায়কারী দ্বারা সর্বপ্রথম উদ্দেশ্য হলেন, সাহাবায় কিরাম রা.। সে জন্য মির্জায়ী তথা কাদিয়ানী, চকড়ালভী এবং কুরআন অস্বীকারকারী রাফেযীদেরকে আহলে কিবলা বলা হয় না।
২২. ঐ হাদীস যাতে রয়েছে যে, হযরত জিবরীল আ. এসে রাসূল সা. কে ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।
২৩. কতিপয় ফুকাহা ও মুহাদ্দিসীনের অভিমত হল, মৌখিক স্বীকারোক্তি ও কর্মে পরিণত করণ উভয়ের সমষ্টি-ই হল, ঈমান। অন্যরা বলেন, শুধু অন্তরের বিশ্বাস-ই হল ঈমান। যারা বলেন ঈমান উভয়ের সমষ্টি, তাদের মতে, ঈমানের মাঝে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে। আর যারা বলেন, শুধু অন্তরে বিশ্বাস-ই হল ঈমান, তাদের মতে, ঈমানের মাঝে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে না। তাদের মতে ঈমানের মাঝে বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটা সমৃদ্ধ বর্ণনাগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হল ঈমানের ফলাফলের মাঝে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে
২৪. এ মতামত সাহাবায়ে কিরাম রা. ব্যতীত অন্য মু'মিনদের ব্যাপারে, কেননা, তাঁদের ব্যাপারে জান্নাতী হওয়ার বিষয়টি স্বয়ং রাসূল সা. এর যবান দ্বারাই সাব্যস্ত; বরং আল্লাহ তা'আলা যাকে যেথায় ইচ্ছা সেথায় স্থান দিবেন।
২৫. তিরমিযী, খ. ২, পৃ. ৮৬, বুখারী, খ. ১, পৃ. ১১
২৬. বরং তা মেনে নেয়। আর যদি কোনো ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে তা হতে কোনো একটিকে প্রাধান্য দেয়া তো হাদীস বিশারদদের কাজ। সুতরাং কোন একটি হাদীসকে প্রাধান্য দিয়ে সে মুতাবিক আমল করা ও অপরটিকে বর্জন করা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
২৭. বান্দাকে সকল কাজের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বান্দার সকল কাজ-ই আল্লাহ তা'আলার কর্তৃত্বাধীন। সুতরাং বান্দার শিরক করার বিষয়টিও আল্লাহ তা'আলার কর্তৃত্বাধীন। কিন্তু তিনি তা পসন্দ করেন না। কোন কিছু সৃষ্টি করা বা তার ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন হওয়া ভিন্ন বিষয় আর তা পসন্দ করা ভিন্ন বিষয়। বান্দার ভাল-মন্দ সকল কর্মের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলা। বান্দার সকল কর্ম-ই তাঁর ইচ্ছা ও কর্তৃত্বাধীন। কিন্তু তিনি কোনো মন্দ কাজ পসন্দ করেন না। কেবল বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য তা সৃষ্টি করা হয়েছে।
২৮. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৫৩, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ২৫৮
২৯. সূরা নিসা, আয়াত: ৫৯
৩০. সূরা ফাজর, আয়াত: ২২
৩১. সূরা কাফ, আয়াত: ১৬
৩২. সুরা বাকারা, আয়াত: ১০২
৩৩. হাদীস দ্বারা এখানে خبر واحد উদ্দেশ্য। কেননা, متواتر হাদীস দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে আর مشهور হাদীস দ্বারা কারো কারো নিকট কুরআনের বিশেষ কিছু বিধান রহিত করা যায়।
৩৪. সূরা নাজম, আয়াত: ১৩-১৫
৩৫. বুখারী, খ. ১, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৯১
৩৬. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৮৪, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৮৫
৩৭. খ. ৪, পৃ. ২৮৭
৩৮. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৮৩, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৮৬
৩৯. এই ব্যক্তি দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে, প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির সামনেই রাসূল সা. উপস্থিত হন; বরং আরবদের ভাষারীতি হল, প্রসিদ্ধ হওয়ার দরুণ তারা কারো কারো ক্ষেত্রে (ইঙ্গিতসূচক শব্দ) ব্যবহার করে। রাসূল সা. এর সুপ্রসিদ্ধর কারণেই এরূপ প্রশ্ন করা হয়। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থে কাস্তালানী রহ. বলেন, আমি এমন কোনো সহীহ হাদীস পাইনি, যাতে বুঝা যায় যে, রাসূল সা. কে প্রত্যেক কবরে উপস্থিত করানো হয়।
৪২. খ. ১, পৃ. ২৯৬
৪৩. সে সময় মানুষের বিশ্বাস ছিল, কোন বড় ব্যক্তিত্বের মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্য-চন্দ্র গ্রহণ লাগে। আর ঘটনাক্রমে সে দিন রাসূল সা.-এর পুত্র হযরত ইবরাহীম রা. মৃত্যুবরণ করেন। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, হযরত ইবরাহীমের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ লেগেছে। কিন্তু রাসূল সা. জোরালোভাবে এটিকে নাকচ করে দিলেন। -অনুবাদক
৪৪. বুখারী, খ. ১, পৃ. ১৪৪, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ২৯৮
৪৫. গ্রহণের ফলে চন্দ্র-সূর্যের চিরায়িত নীতির মাঝে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। তার ফলে বিভিন্ন প্রকার রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ঋতু ও ফলের উপর তার প্রভাব পড়ে। এটি আযাবেরই একটা প্রকৃতি। এ সময় আল্লাহ তা'আলার যিকির-ইস্তিগফার ও নামায পড়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। যেন আল্লাহর রহমতে এ অবস্থা কেটে যায়। -অনুবাদক
৪৬. খ. ১, পৃ. ১০৩
৪৭. এর দ্বারা সেদিকে ইঙ্গিত যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, হে মুহাম্মদ! যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তাদের মাঝে থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাদেরকে কোন আযাব দেব না। তাই জাহান্নাম নিকটে দেখে রাসূল সা. বললেন, হে প্রভু! আমি তো তাদের মাঝে এখনো আছি, তবু কেনো জাহান্নাম নিকটে আসছে। -অনুবাদক
৪৮. খ. ১, পৃ. ২৯৭
৪৯. খ. ১, পৃ. ২৯৮
৫০. খ. ২, পৃ. ১৮৮
৫১. খ. ১, পৃ. ২১৮
৫২. খ. ১, পৃ. ১৮০
৫৩. পৃ. ২২১
৫৪. তিরমিযী, খ. ১, পৃ. ২৯৩
৫৫. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৯৬০, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৭৮
৫৬. বুখারী, খ. ২, পৃ. ১১১, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৮১,
৫৭. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৭৭, মুসলিম, খ. ১, পৃ. ২২৪
📄 হযরত আদম আ. কোন জান্নাতে ছিলেন?
এ অধ্যায়ে আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য হচ্ছে "হযরত আদম আ. যে জান্নাতে অবস্থান করেছেন এবং যে জান্নাত থেকে তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে সেটি কি ঐ জান্নাতই, যাকে জান্নাতুল খুল্দ বা চিরস্থায়ী জান্নাত বলা হয়, নাকি তা পৃথিবীর কোনো উঁচু স্থানে নির্মিত কোনো উদ্যান ছিল?"৫৯
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন, اسكن أَنْتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ 'তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর'।৬০ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুনযির ইবনে সাঈদ বলেন, একদল মুফাসসির বলেন, হযরত আদম আ.-কে সেই জান্নাতুল খুলদ বা চিরস্থায়ী জান্নাতে রাখা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিন মু'মিনগণ প্রবেশ করবেন। অন্য একদল বলেন, হযরত আদম আ.-কে যে জান্নাতে রাখা হয়েছে, তা জান্নাতুল খুলদ বা চিরস্থায়ী জান্নাত ছিল না। বরং আল্লাহ তা'আলা অন্য একটি জান্নাত তৈরী করেছিলেন। মুনযির ইবনে সাঈদ বলেন, এ মতের সমর্থনে এমন অনেক দলীল রয়েছে, যা এ মতকে শক্তিশালী করে।
আবুল হাসান মাওয়ারদী রহ. উক্ত আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন, যে জান্নাতে হযরত আদম আ. কে রাখা হয়েছিল, সে ব্যাপারে দু'টি উক্তি রয়েছে। এক. সেটি জান্নাতুল খুলদ-ই ছিল। দুই. সেটি জান্নাতুল খুলদ ছিল না; বরং অন্য কোন জান্নাত ছিল, যেটি আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর পরীক্ষার জন্য তৈরি করেছিলেন এবং সেটি নেক আমলের প্রতিদান প্রদানের জন্য তৈরিকৃত জান্নাতুল খুলদ ছিল না। যারা এ মত পোষণ করেন, তাদের পরস্পরের মাঝেও মতবিরোধ রয়েছে।
এতে দুটি মত রয়েছে।
প্রথম মতটি হল, আদম ও হাওয়া আ.-এর জন্য তৈরিকৃত জান্নাতটি আকাশে ছিল। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁদের উভয়জনকে নিচে (পৃথিবীতে) পাঠিয়ে দিয়েছেন। এটি ইমাম হাসান রহ.-এর মত।
দ্বিতীয় মতটি হল, সে জান্নাতটি পৃথিবীতেই ছিল। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে (আদম ও হাওয়া আ.) একটি গাছের ফল খাওয়া থেকে নিষেধ করে তাঁদের পরীক্ষা করেছিলেন। অন্যান্য ফল খাওয়া থেকে নিষেধ করেননি। এটা ইবনে বাহর-এর মত। এটি ঐ ঘটনার পরে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সিজদা করার জন্য ইবলিসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। والله أعلم بالصواب
ইবনে খতীব তাঁর প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এ আয়াতে যে জান্নাতের উল্লেখ রয়েছে, সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। সেটি কি আকাশে ছিল, না পৃথিবীতে ছিল? যদি ধরে নেয়া হয়, তা আকাশে ছিল, তবে সেটি কি আমলের প্রতিদানক্ষেত্র জান্নাতুল খুলদ ছিল, নাকি অন্য কোন জান্নাত ছিল? এ ব্যাপারে আবুল কাসিম বলখী ও মুসলিম ইস্পাহানী বলেন, এটি পৃথিবীতে ছিল। এ ক্ষেত্রে তারা اهبطوا (অর্থাৎ নিচে নেমে আস।) নির্দেশকে “এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া"-এর অর্থে ব্যাখ্যা করেন। যেমন اهبطوا مضراً-এই আয়াতে বনী ইসরাঈলকে এ স্থান ত্যাগ করে অন্য কোন শহরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারা তাদের মতের সমর্থনে আরো কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
দ্বিতীয় মতটি হল, জুব্বাই মু'তাযেলীর। তার মত হল, এটি সপ্তম আকাশের উপর ছিল।
তৃতীয় উক্তি হল, সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামায়ে কেরামের। তারা বলেন, সেটি আমলের প্রতিদানক্ষেত্র জান্নাতই ছিল।
আবুল কাসিম আর-রাগেব তাঁর তাফসীরগ্রন্থে উল্লেখ করেন, যে জান্নাতে হযরত আদম আ.-কে রাখা হয়েছিল, সে জান্নাতের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুতাকাল্লিমীন বলেন, সেটি একটি বিশেষ উদ্যান ছিল, যা আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে পরীক্ষা করার জন্য তৈরী করেছেন। সেটি জান্নাতুল মা'ওয়া বা মু'মিনের চিরস্থায়ী আবাসস্থল ছিল না। তিনি (আবুল কাসিম আর-রাগেব) উভয় মতের পক্ষে বেশ কিছু দলীলও উল্লেখ করেছেন।
আবূ ঈসা আর-রামালী রহ. স্বীয় তাফসীরগ্রন্থে এব্যাপারে উলামায়ে কিরামের মতভেদ উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাত হওয়ার মতটিকেই সমর্থন করে বলেছেন, নিঃসন্দেহে সেটি জান্নাতুল খুলদই ছিল। তিনি আরো বলেন, আমি যে মতটি গ্রহণ করেছি, সেটিই হযরত হাসান রহ., হযরত আমর রহ., হযরত ওয়াসিল রহ. ও আমাদের অধিকাংশ সাথীর মত এবং হযরত আবূ আলী ও আমার শায়খ হযরত আবূ বকর রহ.ও এ মত গ্রহণ করেছেন। মুফাস্সিরীনও এ মত গ্রহণ করেছেন।
ইবনুল খাতীব এ ব্যাপারে কোনো মত প্রদান করা থেকে বিরত থাকাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এ প্রশ্নে এটিকে চতুর্থ মত বলা চলে। মূলতঃ চতুর্থ উক্তিটি হল এই, প্রত্যেকটির-ই সম্ভাবনা রয়েছে, আর দলীলও এ ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। সুতরাং বিতর্ক না করে এ ব্যাপারে চুপ থাকাই ভাল।
মুনযির ইবনে সাঈদ রহ. বলেন, যারা বলেন এটি জান্নাতুল খুলদ ছিল না; বরং পৃথিবীতেই ছিল। তাদের মধ্যে হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহ. ও তাঁর সাথীগণ রয়েছেন।
ইবনে মুনযির রহ. বলেন, আমি লক্ষ্য করলাম কিছু লোক আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের ব্যাপারে আমাদের বিরোধিতার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা কোন প্রকার দলীল ব্যতীত-ই শুধু দাবী ও আবেগের জোরে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। তারা কুরআন-সুন্নাহর কোন দলীল উপস্থাপন করতে পারেনি। কোন সাহাবী, তাবেঈ, তাবয়ে তাবেঈর উক্তি বা মুত্তাসিল সনদ (অবিচ্ছিন্ন বর্ণনাধারা) বা শায বা মশহূর সনদে বর্ণিত হাদীস কোনটি দ্বারা-ই দলীল উপস্থাপন করতে পারেনি। আমি স্পষ্ট করে দিচ্ছি, ইরাকের অন্যান্য ফকীহগণও বলেন, সেটি জান্নাতুল খুলদ ছিল না। এই সুবিশাল গ্রন্থগুলো তাদের বিদ্যা-প্রজ্ঞা দিয়ে পরিপূর্ণ। তারা কোনো জনবিচ্ছিন্ন ইমাম নন। তারা আমাদের প্রতিপক্ষদের নেতৃস্থানীয়। আমি এ জন্য উপস্থাপন করলাম, যেন কেউ আমার উপর দোষ আরোপ না করতে পারে, আমি ইমাম আবূ হানীফার মাযহাবকে শক্তিশালী করছি। বরং আমি সে মতকেই সমর্থন করছি, যা আমার নিকট কুরআন-হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত মনে হয়েছে।৬১
ইবনে যায়েদ মালিকীর মত ব্যক্তিত্ব তাঁর তাফসীরের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, আমি হযরত নাফে' রহ. কে জান্নাতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তা কি সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, এ জাতীয় বিষয়ে চুপ থাকা-ই শ্রেয়। অপরদিকে ইবনে উআয়নাহ রহ. কুরআনে কারীমের আয়াত إِنْ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى - এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে জান্নাতটি পৃথিবীতেই ছিল। ইবনে 'উয়ায়নাহ ও ইবনে নাফে' উভয়ে ইমাম। তাদের ব্যক্তিত্ব এতটাই উঁচু, কেউ তাদের সমতুল্য ব্যক্তিত্ব দেখাতে পারবে না। এমনকি বিরোধী পক্ষও না।
ইবনে কুতাইবা তাঁর "আল-মাআরিফ” গ্রন্থে হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর সৃষ্টির কথা উল্লেখ করার পর বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জান্নাতে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ফল-ফলাদি খাও। আর পৃথিবীকে সন্তান-সন্ততি দ্বারা পরিপূর্ণ করে দাও। সমুদ্রের মাছ, শূন্যের পাখী, চতুষ্পদ জন্তু, যমীনের সবুজ-শ্যামল তৃণ, বৃক্ষরাজি ও তার ফলের উপর কর্তৃত্ব কর। এ ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ জানাচ্ছেন, তাদের সৃষ্টি পৃথিবীতেই হয়েছে এবং এ নির্দেশনাবলী সেখানেই ঘটেছে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তা'আলা ফিরদাউস সৃষ্টি করেছেন। তাকে চারটি নদীতে বিভক্ত করেছেন। আর তা হল সাইহূন, জাইহূন, দজলা (টাইগ্রীস) ও ফুরাত (ইউফ্রেটিস)।
অতঃপর তিনি সাপের কথা উল্লেখ করেন, যে সাপ স্থলভাগের সর্বাপেক্ষা বড় প্রাণী ছিল। সাপ হযরত হাওয়া আ.-কে বলল, যদি তোমরা ঐ বৃক্ষের ফল খাও তবে তোমরা চিরস্থায়ী হবে। কখনো তোমাদের মৃত্যু আসবে না। কিছু আলোচনার পর তিনি উল্লেখ করেন, অতঃপর তাকে আদন (একটি আরব উপদ্বীপ) থেকে উদ্যানের পূর্ব দিক দিয়ে সে যমীনে পাঠিয়ে দেয়া হল, যা থেকে তাঁর সৃষ্টির সময় মাটি সংগ্রহ করা হয়েছিল।
হযরত ইবনে ওহাব রহ. বলেন, হযরত আদম আ.-এর আদন হতে অবতরণের স্থানটি হল ভারতবর্ষের পূর্ব দিক। সম্ভবতঃ কাবিল তার ভাইকে হত্যা করার পর আদন-এর পূর্ব দিকে ইয়ামেন-এর কোনো এক উপত্যকায় নিয়ে গিয়েছিল। যেখানে সে তার লাশ সমাধিস্থ করে। অন্য মুফাসসিরীনের মধ্য হতে কেউ কেউ বলেন, আবূ সালেহ রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে هْطُواْ -এর যেই তাফসীর বর্ণনা করেছেন, সেই তাফসীরও পূর্বোল্লিখিত তাফসীরগুলোর ন্যায়। মুনযির ইবনে সাঈদও এ রূপ বলেছেন।
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বর্ণনা করেন, হযরত আদম আ. কে পৃথিবীতেই সৃষ্টি করা হয়েছে, পৃথিবীতেই রাখা হয়েছে। পৃথিবীতে ফিরদাউস তৈরি করা হয়েছে। আর তা ছিল 'আদন' নামক আরব উপদ্বীপে। যাকে ফিরদাউসে আদম বলা হয়। তাকে চারটি নদী দ্বারা বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো আজও পৃথিবীর বুকে রয়েছে। এতে মুসলমানগণ একমত। সুতরাং হে বিবেকবান ব্যক্তিবর্গ! এ থেকে উপদেশ গ্রহণ কর।
তিনি এ-ও উল্লেখ করেছেন, যে সাপটি হযরত আদম আ.-এর সাথে কথা বলেছিল, সেটি সর্ববৃহৎ স্থলচর প্রাণী ছিল। তিনি বলেন, সেটি সর্ববৃহৎ নভচর প্রাণী ছিল না। তাহলে তারা কিভাবে বলে, সেই জান্নাত পৃথিবীতে ছিল না; বরং সপ্তম আকাশে ছিল।
তিনি আরো বলেন, হযরত আদম আ.-কে আদন উদ্যানের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বের করা হয়। অথচ জান্নাতুল মা'ওয়া (চিরস্থায়ী আবাসস্থল)-এর কোনো পূর্ব-পশ্চিম নেই। কারণ সেখানে তো সূর্যই নেই।
তিনি এ-ও বলেন, অতঃপর হযরত আদম আ.-কে সে স্থানে অবতরণ করা হয়েছে, যে স্থান থেকে তাঁকে সৃষ্টির জন্য মাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থাৎ তাকে ভারতবর্ষের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত 'আদন' উপদ্বীপে অবস্থিত জান্নাতুল ফিরদাউস হতে নামিয়ে আনা হয়েছে। হযরত ইবনে কুতায়বাহ কর্তৃক বর্ণিত এ সকল তথ্য দ্বারা বুঝা যায়, সেটি ইয়ামেনের অন্তর্গত ছিল। আর 'আদন'ও ইয়ামেনে অবস্থিত। তিনি আরো উল্লেখ করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর জন্য 'আদনে' উদ্যান তৈরী করেছেন এবং তার সমর্থনে বলেন, এর চারটি নদী (সাইহুন, জাইহুন, দজলা ও ফোরাত) ফেরদাউসে আদম নামক নদ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে।
মুনযির রহ. বলেন, ইবনে কুতায়বা ইবনে মুনাব্বিহ-এর সনদে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন, হযরত আদম আ. মৃত্যুকালে সেই উদ্যানের ফলের আকাংখা করেছিলেন, যেখানে তিনি পূর্বে ছিলেন। যারা বলে তা সপ্তম আকাশে ছিল, তাদের মত অনুযায়ী তা কি করে সম্ভব? কেননা, হযরত আদম আ. তো পৃথিবীতেই ছিলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তখন সে ফলের সন্ধানে বের হন। কিন্তু ফেরেশতারা হযরত আদম আ.-এর মৃত্যুর সংবাদ তাদের নিকট পৌঁছে দিলেন।
তাহলে তাদের মতানুসারে কি আদম আ.-এর সেই সন্তানেরা পাগল ছিল, যারা ফলের সন্ধানে বের হলেন। (যে, উক্ত চিরস্থায়ী জান্নাত আকাশে আর তারা যমীনে সে জান্নাতের ফল অনুসন্ধানে বের হলেন?)
ইবনে কুতায়বা যা বর্ণনা করলেন, 'তারা' (আদম আ.এর সন্তান) তাদের পিতার জন্য জান্নাতুল খুলদ- এর ফলের অনুসন্ধানে বের হলেন, তা যদি সত্যি হয়, তবে এটা বাস্তবেই একটি পাগলামি। তিনি (ইবনুল মুনযির) বলেন, তাঁরা যা বলেন, আমি এর বিপরীত অন্য কিছুই বলি না। যদি সে জান্নাত জান্নাতুল খুলদ হত, তবে তাতে আজীবন থাকত। আমরা কুরআন দ্বারা দলীল পেশ করি। আর আমাদের প্রতিপক্ষ তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এমন দাবী করে, যার কোন দালীলিক ভিত্তি নেই।
উক্ত মাসআলাতে যারা মতভেদ করেছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের মত উল্লেখ করা হল। এখন আমরা উভয় মতাবলম্বন কারীদের দলীল-প্রমাণ পেশ করে প্রত্যেকের পক্ষের ও বিপক্ষের জবাবগুলো তুলে ধরার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৫৯. তাফসীরে কাবীর ও তাফসীরে রূহুল মা'আনী ইত্যাদি তাফসীর গ্রন্থে বিশদ আলোচনা রয়েছে।
৬০. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৫
৬১. আল্লামা যাহেদ কাওসারী রহ. বলেন, এ জান্নাতের ব্যাপারে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওযী যা বর্ণনা করেছেন, তা হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মত নয়।
📄 জান্নাতুল খুলদে আদম আ.-এর অবস্থানের প্রমাণ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সব শ্রেণীর মানুষকে যেই স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেই বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করেছি। আর আমাদের এ বক্তব্য সকল ব্যক্তিই সমর্থন করবে। কারো মনে এর উপর দ্বিমতের বাসনা জাগবে না।
ইমাম মুসলিম রহ. স্বীয় গ্রন্থ 'সহীহ মুসলিমে'৬২ হযরত আবূ হুরায়রা ও হযরত হুযাইফা রা. হতে বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন হাশরের ময়দানে মানুষদের একত্রিত করবেন, তখন মু'মিনগণ এমন অবস্থায় উঠবে, জান্নাত তাদের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। তারা তখন হযরত আদম আ.-এর নিকট গিয়ে বলবেন, আব্বাজান! জান্নাতের দরযা খোলার ব্যবস্থা করুন। তখন হযরত আদম আ. বলবেন, তোমাদেরকে তো তোমাদের পিতার ভুলের কারণেই জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে।
জান্নাতুল খুলদ হওয়ার প্রবক্তারা এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করে পেশ করে বলে, যে জান্নাত হতে আদম আ. পৃথিবীতে এসেছিলেন এটি সে জান্নাত- ই, যে জান্নাতের প্রার্থনা কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানরা করবে। সহীহায়নে৬৩ হযরত আদম আ. ও হযরত মূসা আ.-এর পারস্পরিক তর্কের হাদীসটি রয়েছে। যাতে আছে, হযরত মূসা আ. হযরত আদম আ.-কে বললেন, 'আপনি আমাদেরকে সহ নিজেকেও জান্নাত হতে বের করেছেন'। যদি ঘটনাটি পৃথিবীতেই ঘটত, তাহলে সবাই পৃথিবীর কোনো উদ্যান হতে বিতাড়িত হতেন। জান্নাত থেকে নয়।
এমনিভাবে মু'মিনদের লক্ষ্য করে হযরত আদম আ.-এর উক্তি هل أخرجكم من الجنة إلاخطيئة أبيكم তোমাদেরকে তোমাদের পিতার ভুল-ই জান্নাত থেকে বের করেছে। (এতে প্রতীয়মান হয়, সেটি পৃথিবীতে ছিল না।) কেননা মু'মিনদেরকে তো দুনিয়ার উদ্যান থেকে বের করা হয়নি।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে সূরা বাকারায় ইরশাদ করেন, يَآدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ وَكُلاَ مِنْهَا رَغَداً حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذه الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেথা হতে ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার কর, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। فَأَزَلْهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ অতঃপর শয়তান তা থেকে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে বের করল। আমি বললাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও, পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।৬৪
সুতরাং উক্ত আয়াত এ কথাই বুঝায়, হযরত আদম আ. জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। তার দু'টি কারণ। প্রথমতঃ 'إهبطوا হলো, উপর থেকে নিচে নামা। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ তা'আলা বলেন, পৃথিবীতে কিছু কাল তোমাদের বসবাস করতে হবে। আর এ শব্দ বলেছেন, إهبطوا-এর পরে। সুতরাং এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয়, তিনি ইতোপূর্বে পৃথিবীতে ছিলেন না। তার সমর্থনে সূরা আ'রাফে ইরশাদ হচ্ছে, فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ পৃথিবীতেই তোমাদের জীবন, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে। এবং তথা হতে তোমাদেরকে বের করে আনা হবে'।৬৫
যদি উক্ত জান্নাত পৃথিবীতেই হত, তবে জান্নাতী জীবনের পূর্বাপর জীবনও পৃথিবীতে ছিল। তাহলে এ কথা বলা কিভাবে ঠিক হল, জান্নাত থেকে বের হওয়ার পর তোমাদের জীবন পৃথিবীতেই কাটাতে হবে।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের যে গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, সে গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর কোন উদ্যানের হতে পারে না। বরং তা একমাত্র জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতের-ই হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّ لَكَ أَلا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَى وَأَنَّكَ لَا تَظْمَأُ فِيهَا وَلَا تَضْحَى তোমার জন্য ব্যবস্থা এমন যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না, নগ্নও হবে না এবং সেখানে পিপাসার্ত ও রৌদ্রক্লিষ্ট হবে না।৬৬
এ তো পৃথিবীতে কোন রূপেই সম্ভব নয়। চাই কোন ব্যক্তি এ পৃথিবীর উঁচু থেকে উঁচুতম স্থানে থাকুক, সে এ বিষয়গুলির কোন না কোনটির সম্মুখীন হবেই। আল্লাহ তা'আলা جوع -এর বিপরীতে ظمأ, عرى, ضحى শব্দ এনেছেন। সুতরাং جوع দ্বারা উদ্দেশ্য হল অভ্যন্তরীন অপমান, আর عرى দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বাহ্যিক অপমান। ظمأ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা, আর ضحی দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বাহ্যিক তাপ। তাহলে জান্নাতে বসবাসকারীদের থেকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবধরনের অপমান, উষ্ণতা হতে মুক্ত পরিবেশ দেয়া হচ্ছে। কাজেই তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নগ্নতা ও রৌদ্রের প্রখরতার মুখামুখি হতে হচ্ছে না। এধরনের পরিবেশ একমাত্র জান্নাতুল খুলদেই সম্ভব। অন্য কোথাও নয়।
আরো বলেন, যদি উক্ত জান্নাতটি পৃথিবীতেই হত, তাহলে আদম আ. ইবলীসের মিথ্যা প্রতারণা সম্পর্কে জানতে পারতেন। যেহেতু শয়তান বলেছে, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَة الْخُلْدِ وَمُلْكِ لَا يَبْلَى অর্থাৎ আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা?৬৭
আর আদম আ. জানতেন, এ পৃথিবী অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এবং এ পৃথিবীর রাজত্ব অবশ্যই ক্ষয়িষ্ণু।
এমনিভাবে তারা আরো বলেন, এ ঘটনা সূরা বাক্বারায় আরো স্পষ্টভাবে রয়েছে, হযরত আদম আ. কে যে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে, তা আকাশে ছিল। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لآدم فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ এবং যখন ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।
وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَداً حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথা হতে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দে আহার কর। কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
فَأَزَلُهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ শয়তান তা থেকে তাদের পদস্খলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল, সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কৃত করল। আমি বললাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নেমে যাও, পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা থাকবে।
فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের নিকট হতে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল। ফলে আল্লাহ তাঁর প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।৬৮
জান্নাত হতে আদম আ. ও হাওয়া আ. ও মরদূদ শয়তানকে অবতরণ করতে হয়েছে। সে জন্যই اهْبِطُوا বহুবচন বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই আয়াতে হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর সাথে সে সাপের অবতরণের নির্দেশ হয়েছিল। কিন্তু এটি অত্যন্ত দুর্বল মত। কেননা, হযরত আদম আ.-এর ঘটনায় সাপের কোন উল্লেখও নেই এবং আলোচনার পূর্বাপর দ্বারাও তা বুঝা যায় না।
কেউ কেউ বলেন, أهبطوا দ্বারা হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. দুজনকেই সম্বোধন করা হয়েছে। দু'জনের ক্ষেত্রে বহুবচন ব্যবহারের আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন, হযরত দাউদ আ. ও সুলাইমান আ.-এর ঘটনায় বলা হয়েছে, وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ আমি প্রত্যক্ষ করছিলাম, তাদের বিচার।৬৯ এখানে হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আ. তাঁরা দু'জন হওয়া সত্ত্বেও বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর সাথে সাথে তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতিও যেহেতু অবতরণের নির্দেশ ছিল একারণে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। মূলতঃ প্রথম মতটি ব্যতীত সবই দুর্বল। কারণ, এ মতগুলো সব কয়টিই দলীলবিহীন দাবী মাত্র। তা ছাড়া আয়াতের শব্দাবলীও সেগুলোর বিপরীত বুঝায়। এর দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হল, أهْطُواً-এর সম্বোধনে (অর্থাৎ জান্নাত থেকে বের হওয়ার নির্দেশে) হযরত আদম আ. ও হযরত হাওয়া আ.-এর সাথে ইবলীসও শরীক ছিল। সেও অবতরণ করেছে। সুতরাং এ কথা যখন দৃঢ় হয়ে গেল, আল্লাহ তা'আলা পুনরায় অবতরণের নির্দেশ প্রদান করে বলেন, قُلْنَا أَهْبِطُواً مِّنْهَا جَمِيعاً فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ আমি বললাম, তোমরা সকলই এ স্থান হতে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকট সৎ পথের কোন নির্দেশ আসবে, তখন যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।৭০
উক্ত আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়, জান্নাত হতে অবতরণের প্রথম নির্দেশ এবং এ নির্দেশ দু'টি স্বতন্ত্র। প্রথমোক্ত নির্দেশ হল, জান্নাত থেকে অবতরণের। আর দ্বিতীয় নির্দেশ হল, আকাশ থেকে পৃথিবীতে অবতরণের। সুতরাং যে জান্নাত থেকে তাঁদেরকে অবতরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, তা ছিল আকাশে, আর সেটিই তো জান্নাতুল খুলদ।
আল্লামা যামাখশারী রহ.-এর মত হল, أهبطوا منها جميعاً -এর দ্বারা সম্বোধন হল, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.। তবে তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের অধীনস্থ মনে করে বহুবচন আনা হয়েছে। এর দলীল হল, ষোল পারায় আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেন, أهبطوا منها جميعاً আদম ও হাওয়া! তোমরা সকলই জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও।
আর এ সম্বোধন যেহেতু তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের অধীনস্ত সাব্যস্ত করে করা হয়েছে, সেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেন, بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ তোমরা একে অপরের শত্রু। এই আয়াতও এ কথাই বুঝায়, فَمَن تَبِعَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ . وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أولئك هُدَايَ আল্লাহ তা'আলা বলেন, যারা আমার সৎ পথের নির্দেশ অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই। আর তারা দুঃখিতও হবে না। আর যারা কুফরী করবে এবং আমার নির্দেশসমূহকে অস্বীকার করবে, তারাই অগ্নিবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এটা তখনি সম্ভব, যদি এ সম্বোধন আদম আ.-এর সকল সন্তান-সন্ততিকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মানুষ একে অপরের সাথে শত্রুতা করা, অবাধ্য হওয়া, তাদের একজনকে অন্য জনের ভ্রষ্ট করা।
আল্লামা যামাখশারীর গ্রহণ করা এই মতটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, উক্ত আয়াতে শত্রুতা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শয়তান ও মানুষের মধ্যকার শত্রুতা। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوا শয়তান তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা শয়তান ও মানুষের মধ্যকার বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। কারণ, এই শত্রু থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরী। তা ছাড়া হযরত আদম ও হাওয়ার মাঝে তো কোন শত্রুতা ছিল না। বরং তাদের ব্যাপারে কুরআনের ভাষ্য হল, لِتَسْكُنَ إِلَيْهَا হযরত আদম আ.-এর স্ত্রী হাওয়াকে এ জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়।৭১
এবং আল্লাহ তা'আলা وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً তিনি তোমাদের স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও মমতা সৃষ্টি করেছেন।
সুতরাং ভালবাসা ও মমতা হয় ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর মাঝে। আর শয়তান ও মানুষের মাঝে হয় শত্রুতা। আর পূর্বে এ কথা উল্লেখ হয়েছে, এখানে তিন জনকে বুঝানো হয়েছে। হযরত আদম আ., তাঁর স্ত্রী ও ইবলীস। তাহলে أخبطوا -এর মধ্যে বহুবচনের ضمير বহুবচনের কিছু অংশের দিকে ফিরানো আর কিছুকে বাদ দেয়া ভাষার ব্যবহারিক ব্যাকরণ পরিপন্থী। শব্দ ও অর্থের চাহিদা তাই। সুতরাং (এর বিপরীত কথা বলে) আল্লামা যামাখশারী কোন অভিনব কথা বলেননি।
আর ষোল পারায় সূরা ত্বা-হাতে আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ, قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى -এর মধ্যে আদম ও হাওয়া উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। সুতরাং اهْبِطَا -এর মধ্যে দ্বিবচনের ضمير হয়ত হযরত আদম ও হাওয়া আ.-এর প্রতি ফিরেছে। অথবা হযরত আদম আ. এবং ইবলীসের দিকে ফিরেছে। হযরত হাওয়া হযরত আদম আ.-এর অধীনস্থ হওয়ায় তাঁর আলোচনা করা হয়নি। এ হিসাবে অবতরণের সাথে যে শত্রুতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা এই দুই সম্বোধিত সত্তার মধ্যেই হবে। আর দুই সম্বোধিত সত্তা হল, হযরত আদম আ. ও ইবলীস।
সুতরাং এতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে প্রথম অবস্থা যাতে ضمير হযরত আদম ও হাওয়া' আ.-এর দিকে ফিরে। তখন আয়াতে দু'টি বিষয় সন্নিবেশিত হয়। এক. আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ.-কে অবতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। দুই. হযরত আদম আ. ও তাঁর স্ত্রীর সাথে ইবলীসের সংবাদ দেয়া হয়েছে। এজন্য بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর মধ্যে বহুবচনের ضمير ব্যবহার করা হয়েছে। আর الفاظ -এর মধ্যে যেহেতু ইবলীস অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই দ্বিবচন আনা হয়েছে। তবে শত্রুতার বিষয়টির মধ্যে ইবলীস অবশ্যই অকাট্যভাবে অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ হে আদম! নিশ্চয়ই এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু।৭২
আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদেরকে বলেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا শয়তান তো তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ কর।৭৩
ভেবে দেখার বিষয়, যেখানে শত্রুতা ও বৈরিতার উল্লেখ এসেছে, সেখানে দ্বিবচনের ضمير বর্জন করে বহুবচন আনা হয়েছে। আর পৃথিবীতে অবতরণের নির্দেশ করার সময় কখনো একবচন, কখনো দ্বিবচন ও কখনো বহুবচনের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন সূরা আ'রাফে রয়েছে, قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا আল্লাহ বলেন, হে ইবলীস! তুমি জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও। এমনিভাবে সূরা সাদে রয়েছে, فَاخْرُجْ مِنْهَا হে ইবলীস! তুমি জান্নাত থেকে বের হয়ে যাও।
সুতরাং এর দ্বারা সম্বোধন শুধু ইবলীসকে করা হয়েছে। আর যেখানে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে হযরত আদম, হাওয়া ও ইবলীস সকলকেই করা হয়েছে। কারণ, ঘটনা সকলকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে। আর যেখানে দ্বি-বচন ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে হযরত আদম ও হাওয়া আ. উদ্দেশ্য। কেননা, তাঁরা উভয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়েছেন। স্খলন তাদের দ্বারাই হয়েছে। অথবা এর সম্বোধন আদম আ. ও ইবলীস। কেননা উভয়েই মুকাল্লাফ তথা শরীআতের হুকুম-আহকাম পালনে নির্দেশিত দুই জাতির (মানুষ ও জিন) পিতা এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদের মূল। তাই তাদের অবস্থা ও তার পরিণাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেন তাদের বংশধররা এ থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে আমি উভয় মত-ই উল্লেখ করলাম। তবে এ ব্যাপারে স্পষ্টতর কথা হল, هبط। এর মধ্যে সম্বোধন হযরত আদম আ. ও ইবলীসকেই করা হয়েছে।
কেননা আল্লাহ তা'আলা যেখানে তাঁর নির্দেশের বিপরীত আচরণ করার কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে শুধু হযরত আদম আ.-এর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ. এর কথা উল্লেখ করেননি। যেমন সূরা ত্বা-হা-এর মাঝে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَعَصَىٰ ءَ آدَمٍ رَبَّهُ فَقَوَىٰ ثُمَّ أجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى আদম তার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করল, ফলে সে ভ্রমে পতিত হল। এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করলেন। তার তাওবা কবুল করলেন ও তাকে পথ নির্দেশ করলেন। قال اهْبطًا مِنْهَا جَمِيعًا অতঃপর বললেন, তোমরা উভয় একই সঙ্গে জান্নাত হতে নেমে যাও।৭৪
উক্ত আয়াতগুলি হতে সুস্পষ্টতই বুঝে আসে, জান্নাত হতে নেমে যাওয়ার নির্দেশ হযরত আদম আ. কে করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী তো তাঁর অধীনস্থ হয়ে এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য হল, মুকাল্লাফ দুই জাতি জিন ও ইনসানকে সে বিষয়ে অবহিত করা, যা তাদের আদি পিতা দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অমান্য করা ও তার বিপরীত করার কারণে যে অমঙ্গলজনক দুর্বিপাকের সম্মুখীন হতে হল।
সুতরাং শুধুমাত্র মানব জাতির আদি পিতার কথা উল্লেখ করার চেয়ে উভয় মুকাল্লাফ জাতির আদি পিতার কথা উল্লেখ করাই পরিপূর্ণতর। আল্লাহ তা'আলা এ বিষয়ে জানান, আদম আ.-এর স্ত্রীও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেছেন এবং সে জন্যই হযরত আদম আ. কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করে নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এর দ্বারা এ কথাও বুঝা যায়, যেহেতু আদম আ. এর স্ত্রী নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণে শরীক ছিল। সুতরাং জান্নাত থেকে বহিষ্কারকরণ ও নিচে অবতরণের নির্দেশের মাঝে সেও অন্তর্ভুক্ত। অবশ্যই তারও সে অবস্থা-ই হয়েছে, যে অবস্থা হয়েছিল হযরত আদম আ.-এর।
মুদ্দাকথা হল, আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ أَهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ -এর মধ্যে বহুবচনের সম্বোধন সম্পূর্ণ স্পষ্ট। সুতরাং তাকে إذاً দ্বিবচনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের নিমিত্তে দ্বি-বচনের ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তা নিষ্প্রয়োজন। তারা (যারা বলেন, উক্ত জান্নাত দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাতুল খুলদ) বলেন, প্রত্যেক স্থানে الْجَنَّةُ নির্দিষ্টকরণের 'আলিফ লাম' যুক্ত ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী أَسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجَكَ الْجَنَّةَ ও এ জাতীয় অন্যান্য আয়াত। জান্নাতুল খুলদ ব্যতীত অন্য কোন জান্নাতই তার معھود তথা প্রতিপাদ্য বিষয় হতে পারে না। সম্বোধিত ব্যক্তিগণ الْجَنَّةُ দ্বারা তার আল্লাহর প্রতিশ্রুত সেই جنة الخلد বা চিরস্থায়ী জান্নাতকেই বুঝেন। যেমন মদীনা (শহর) নাজম (তারকা) আল-বাইত (ঘর) আল-কিতাব (বই) এর উদ্দেশ্য ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও তা নির্দিষ্ট স্থানের নামে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং যে স্থানে জান্নাত শব্দটি নির্দিষ্টকরণের 'আলিফ লাম' দ্বারা ব্যবহৃত হয়, সেখানে জান্নাত দ্বারা নির্দিষ্ট জান্নাতই উদ্দেশ্য হবে, যা মু'মিনদের মনে গ্রথিত। আর যদি জান্নাতুল খুলদ ব্যতীত অন্য কোনো জান্নাত উদ্দেশ্য নিতে হয়, তবে হয়ত অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হবে অথবা অন্য শব্দের সাথে ইযাফতের (দুই বিশেষ্য পদের পরস্পর সংযোগ) মাধ্যমে ব্যবহৃত হবে। অথবা পূর্বাপর এমন কোন শর্তযুক্ত হবে, যদ্বারা বুঝা যাবে, তা পৃথিবীর কোন উদ্যান। তার অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, جَنَّتَيْنِ مِنْ أَعْنَابِ ইযাফতের মাধ্যমে তার ব্যবহার যেমন, وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ । পূর্বাপর এমন কোন শর্তযুক্ত হয়, যার দ্বারা বুঝা যায়, তা পৃথিবীর কোন উদ্যান ছিল, তার ব্যবহারের উদাহরণ হল আল্লাহ তা'আলার এই বাণী, إِنَّا بَلَوْنَاهُمْ كَمَا بَلَوْنَا أَصْحَابَ الْجَنَّةِ নিশ্চয়-ই আমি তাদেরকে পরীক্ষায় নিপতিত করেছি, যেমনিভাবে করেছিলাম উদ্যান মালিকদেরকে।
তারা বলেন, উক্ত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ হওয়ার উপর নির্দেশক প্রমাণগুলির অন্যতম হল নিম্নের এই বর্ণনা। হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. বলেন, ان الله لما أخرج آدم من الجنة زوده من ثمار الجنة، وعلمه صنعة كل شيئ যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করলেন, তখন তাকে খাদ্যসম্ভার হিসাবে কিছু জান্নাতের ফল দান করলেন এবং তাঁকে প্রত্যেক বস্তু তৈরীর পদ্ধতি শিখালেন। সুতরাং পৃথিবীতে তোমরা যে ফল-ফলাদি দেখছ, তা জান্নাতেরই ফল। তবে হ্যাঁ, ব্যবধান এটুকু, দুনিয়ার ফলগুলোতে বিভিন্ন প্রকার পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু জান্নাতের ফলগুলোয় কোন প্রকার পরিবর্তন ঘটে না।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জামানত দিয়ে বলেছেন, তিনি যদি তাওবা করে ফিরে আসেন, তবে তাকে জান্নাতে ফিরিয়ে আনা হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَتَلَقَّى آدم من ربه كلمات فَتابَ عَلَيْهِ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মিনহাল রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে একটি হাদীস নকল করেছেন, হযরত আদম আ. আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করলেন, يارب خلقتنى بيدك হে প্রভু! আপনি কি আমাকে স্ব-হস্তে তৈরী করেননি? আল্লাহ তা'আলা বলেন, কেন নয়?
অতঃপর আদম আ. বলেছেন, أي رب ألم تنفخ في من روحك হে প্রভু! আপনি কি আপনার থেকে আমার মাঝে আত্মা দান করেননি? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
অতঃপর আদম আ. বললেন, الم تسكننى جنتك হে প্রভু! আপনি কি আমাকে জান্নাতে স্থান দেননি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
অতঃপর হযরত আদম আ. বললেন, رب ألم تسبق رحمتك غضبك হে প্রভু! আপনার রহমত কি আপনার ক্রোধের উপর বিজয়ী নয়? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়? তখন হযরত আদম আ. বললেন, أرأيت أن أثبت وأصلحت أرجع أنت إلى الجنة। যদি আমি তাওবা করে নিজেকে শুধরে নেই, তবে কি আমাকে পুনরায় জান্নাতে ফিরিয়ে নেবেন না? আল্লাহ তা'আলা বললেন, কেন নয়?
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী, فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে এ হাদীসের কয়েকটি সনদ রয়েছে। সে সনদগুলোর কোনো কোনোটিতে একথাও রয়েছে, হযরত আদম আ. স্বীয় প্রভুর হুকুম লঙ্ঘন করলেন। অতঃপর স্বীয় প্রভুকে বললেন, যদি আমি তাওবা করে নেই? তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, পুনরায় আমি তোমাকে জান্নাতে ফিরিয়ে নেব।
একথাগুলো হল সেই মত পোষণকারীদের দলীল, যারা বলেন, আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত দ্বারা জান্নাতুল খুলদ উদ্দেশ্য। এখন আমি উক্ত মতের সাথে দ্বিমত পোষণকারীদের দলীলসমূহ উপস্থাপন করব।
টিকাঃ
৬২. খ. ১, পৃ. ১১২
৬৩. বুখারী, খ. ১, পৃ. ৪৮৪, মুসলিম, খ. ২, পৃ. ৩৩৫
৬৪. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৫
৬৫. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২৫
৬৬. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৮-১৯
৬৭. প্রাগুক্ত, আয়াত: ১২০
৬৮. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩৪-৩৭
৬৯. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭৮
৭০. সরা বাকারা, আয়াত: ৩৮
৭১. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৮৯
৭২. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৭
৭৩. প্রাগুক্ত, আয়াত: ৬
৭৪. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২১-২৩
📄 আদম আ. চিরস্থায়ী জান্নাতে নয়; পৃথিবীতেই ছিলেন
এ মতালম্বীদের ভাষ্যমতে তাদের মতের পেছনে প্রচুর যুক্তি রয়েছে। সেগুলোর মধ্য হতে নির্বাচিত কয়েকটি যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীগণের মাধ্যমে এ সংবাদ-ই জানিয়েছেন, জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতে শুধু কিয়ামতের দিনই প্রবেশ করানো হবে। সুতরাং তাতে প্রবেশ করার সময় এখনো আসেনি।
আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে উক্ত জান্নাতের বর্ণনা করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা কোন বস্তুর যেই গুণাগুণ বর্ণনা করবেন, তাতে সেই গুণাগুণ বিদ্যমান থাকবে না; এটি অসম্ভব। উক্ত মত পোষণকারীগণ বলেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তা খোদাভীরু তথা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তা হবে স্থায়ী আবাসস্থল। যে তাতে প্রবেশ করবে, সে তাতেই অবস্থান করবে। কিন্তু আদম আ. কে যে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, তাতে তো তিনি স্থায়ীভাবে অবস্থান করেননি। এখন আল্লাহ তা'আলা যেই জান্নাতকে জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাত বলেই অবহিত করেছেন। হযরত আদম আ. যে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন, অথচ তাতে স্থায়ী ভাবে থাকেননি।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল খুলদের বর্ণনায় আরো বলেন, সেটি হল কর্মের প্রতিদানস্থল। সেটি আদেশ-নিষেধ ও কোনো প্রকার বাধ্য-বাধকতার স্থল নয়। আল্লাহ তা'আলা তার গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, তা সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ স্থান। তা কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্থান নয়। অথচ হযরত আদম আ. কে যে জান্নাতে স্থান দেয়া হয়েছে, তাঁকে সেখানে পরীক্ষা করা হয়েছে। আর তা ছিল অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, সেখানে কেউ তাঁর হুকুম অমান্য করবে না। কিন্তু আদম আ. দ্বারা তো তা সংঘটিত হয়েছে সে জান্নাতেই, যাতে তিনি প্রবেশ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের গুণাগুণ বর্ণনায় আরো বলেন, তা কোন প্রকার চিন্তা ও পেরেশানীর স্থান নয়। অথচ তাতে হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. চিন্তা ও পেরেশানীতে নিপতিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে দারুস সালাম তথা শান্তি নিবাস বলে অভিহিত করেছেন। অথচ আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে নিরাপদ ছিল না। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে দারুল কারার তথা স্থায়ী নিবাস ঘোষণা করেছেন। অথচ হযরত আদম ও হাওয়া আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তাতে স্থায়ী হননি।
জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন وَمَاهُمْ مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃত হবে না।৭৫ অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তা হতে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ জান্নাতবাসীদের সেখানে কোন প্রকার কষ্ট হবে না। অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, তাতে তাঁর শরীর থেকে বস্ত্র খুলে ফেলার পর তিনি লজ্জায় তাড়িত হয়ে ফিরতে লাগলেন। বৃক্ষপাতা দ্বারা স্বীয় শরীরকে আচ্ছাদিত করতে লাগলেন। এটিতো পূর্ণ মাত্রায় কষ্টকর। জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, সেখানে তারা শুনবে না কোন অসার অথবা পাপবাক্য।৭৬ অথচ হযরত আদম আ. যে জান্নাতে ছিলেন, সেখানে তিনি ইবলীসের অসার ও পাপবাক্য শুনেছিলেন।
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে مَقْعَد صدق সত্যের ভূমি বলে ঘোষণা করেন। অথচ আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতের ভূমিতে দাঁড়িয়ে তো ইবলীস মিথ্যাচার করেছিল; এমনকি মিথ্যার উপর শপথও করেছিল।
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ. কে সৃষ্টির পূর্বে ফিরিশতাদের সম্মুখে ঘোষণা করেন, "ইন্নি জাইলুন ফিল আরদি খলিফা- আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।"৭৭ ফিরিশতাগণ প্রত্যুত্তরে বললেন, আপনি কি পৃথিবীতে এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে চান, যারা অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে। এটি জান্নাতুল মা'ওয়াতে কোন ভাবেই হতে পারে না। ইবলীস জান্নাতে হযরত আদম আ. কে যা বলেছিল আল্লাহ তা'আলা সেটি বর্ণনা করেন, হে আদম! আমি কি তোমাকে বলে দিব জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা। সুতরাং যদি হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাত জান্নাতুল খুলদ বা স্থায়ী জান্নাত হত, তাহলে তিনি কেন ইবলীসের এ কথার উত্তর দেননি, তুমি আমাকে সে স্থানের-ই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ, যে স্থানে আমি বর্তমানে আছি। তা তো আমি প্রাপ্ত হয়েছি।
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে জান্নাতে স্থান দিয়ে বলেননি যে, এখানে চিরস্থায়ী হবে। তিনি যদি তা জানতেন, তবে ইবলীসের কথায় কান দিতেন না। তার উপদেশের প্রতিও ভ্রূক্ষেপ করতেন না। কিন্তু যেহেতু তিনি এমন জান্নাতে ছিলেন, যা চিরস্থায়ী ছিল না, ফলে তিনি সে বস্তু ভক্ষণের মাধ্যমে ধোকায় পড়ে গেলেন অমরত্ব অর্জনের মিথ্যা প্রবঞ্চনায়। তারা আরো বলেন, জান্নাত হল পূতঃপবিত্র ব্যক্তিদের স্থান। সুতরাং যদি হযরত আদম আ. জান্নাতুল খুলদে অবস্থান করতেন, তবে ধোকাবাজ ও বিতাড়িত শয়তান সেখানে কিভাবে পৌঁছল? এবং কিভাবে তাঁকে পরীক্ষায় ফেলল ও কু-মন্ত্রণা দিল?
এ কু-মন্ত্রণা চাই তাঁকে শুনানো হোক বা তাঁর অন্তরে সৃষ্টি করা হোক, সে অভিশপ্ত শয়তান সেখানে কিভাবে প্রবেশ করল? এমনিভাবে যখন তাকে বলা হল, তুমি এ থেকে নেমে যাও فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا এখানে থেকে অহংকার করবে, তা হতে পারে না।৭৮
এরপরও তার জন্য জান্নাতুল মা'ওয়াতে উঠা কিভাবে সম্ভব হল, যা সম্ভবত আকাশেরও ঊর্ধ্বে? অথচ এ সব কিছুই তার অবাধ্যতা ও অহংকারীর কারণে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি বশতঃ তাকে বের করে দেয়া ও ধমকানির পর হয়েছে। এসব কল্পনা কি এ আয়াতের (مَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا) (এখানে থেকে অহংকার করবে, তা হতে পারে না) সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে পারে?
সুতরাং যে ভাষায় শয়তান হযরত আদম আ.-কে সম্বোধন করেছে ও তার উপর শপথ করেছে, এটিই যদি অহংকার না হয়, তবে অহংকার আবার কি?
যদি কেউ বলে, হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ. ছিলেন আকাশে আর শয়তান ছিল পৃথিবীতে এবং এ অবস্থাতেই শয়তান তাঁদের কু-মন্ত্রণা দিয়েছে। তার এ কথা অভিধান, অনুভূতি ও পরিভাষা; কোন দিক থেকেই যুক্তিসম্মত নয়। যদি মনে করা হয়, ইবলীস সাপের মুখে প্রবেশ করে সাপের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করেছে, এটিও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও ভুল। কেননা সে জান্নাত থেকে একবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর পুনরায় জান্নাতে কিভাবে প্রবেশ সম্ভব? যদিও সাপের মুখে করে হোক।
যদি বলা হয়, সেই ইবলীস হযরত আদম আ. ও হাওয়া আ.-এর অন্তরে প্রবেশ করে তাঁদেরকে কু-মন্ত্রণা দিয়েছে, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়। তা ছাড়া আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে শয়তানের সাথে তাঁদের কথোপকথনকালে তাঁদের সাথে তার সম্বোধনকেও বর্ণনা করেছেন। তাতে বুঝায় যায়, তাঁরা তার কথা সামনাসামনি শুনেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَنْ تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ 'শয়তান বলল, পাছে তোমরা উভয়ে ফিরিশতা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও, এই জন্য-ই তোমাদের প্রতিপালক এই বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরক নিষেধ করেছেন'।৭৯
আল্লাহর বক্তব্যের ধরণ এ কথারই নির্দেশ বহন করে, সে তাঁদের উভয়ের সামনে সে নিষিদ্ধ বৃক্ষের পাশেই উপস্থিত ছিল। যখন হযরত আদম আ. জান্নাতের বাইরে ছিলেন; জান্নাতে ছিলেন না, তখন আল্লাহ তা'আলা أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِবলেননি। যখন তাঁরা জান্নাতে ছিলেন, তখন নিকটেবর্তী বস্তুর প্রতি ইঙ্গিতকারী সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। আর যখন জান্নাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তখন দূরবর্তী বস্তুর প্রতি ইঙ্গিতকারী সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, তারা এখন আর জান্নাতে নেই। সে নিষিদ্ধ বৃক্ষ আর তাঁদের সামনে নেই। এটি এ কথারই প্রমাণবহ, তাঁরা সেই জান্নাতে চিরস্থায়ী ছিলেন না। অথচ জান্নাতুল খুলদ তথা চিরস্থায়ী জান্নাতের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার নিবাস হবে চিরস্থায়ী।
সুতরাং এর দ্বারা প্রতীয়মান হল, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতটি জান্নাতুল খুলদ ছিল না। ইবলীস পৃথিবীতে থাকা সত্ত্বেও তার কু-মন্ত্রণা হযরত আদম ও হাওয়া আ. পর্যন্ত আকাশে পৌঁছিয়ে ছিল; এ কথা বলাও ঠিক হবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ উত্থিত হয়।৮১ অথচ অভিশপ্ত ইবলীসের কথা তো সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট ও অপবিত্র। সুতরাং তা পবিত্র স্থানে উত্থিত হতে পারে না।
মুনযির রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আদম আ. نَامَ فِي جَنَّتِهِ তিনি তাঁর জান্নাতে ঘুমিয়েছেন। অথচ নস ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত, জান্নাতুল খুলদে নিদ্রা আসবে না। যেমন, এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জান্নাতবাসী কি জান্নাতে নিদ্রা যাবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুত্তরে বললেন, النوم أخو الموت والنوم وفاة ‘নিদ্রা মৃত্যুসদৃশ, নিদ্রা তো মৃত্যুই’। কিন্তু জান্নাতে মৃত্যু হবে না। কুরআন কারীমেও তার সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। তা ছাড়া নিদ্রা তো অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। অথচ জান্নাতী ব্যক্তি দারুস সালাম অর্থাৎ জান্নাতে যে কোনো প্রকার অবস্থার পরিবর্তন থেকে নিরাপদ থাকবে। আর ঘুমন্ত ব্যক্তি মৃতুতুল্য।
আমি বলব, মুনযির রহ. যে বর্ণনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তা মুজাহিদের উপর মাওকূফ। তিনি বলেন, হযরত আদম আ.-এর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর পাঁজরর হাড় থেকে হযরত হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছেন।
আসবাত রহ. সুদ্দী রহ. হতে বর্ণনা করেন, হযরত আদম আ. যে জান্নাতে অবস্থান করছিলেন, তাতে একাকী বসবাস করছিলেন। তাঁর কোনো এমন সঙ্গী ছিল না; যার দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। তখন তিনি একবার ঘুম থেকে জেগে তাঁর শিয়রের কাছে একজন রমণীকে বসা অবস্থায় পেলেন, যাঁকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বাম পাঁজর থেকে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ. তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, আমি একজন নারী। আদম আ. প্রশ্ন করলেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হল? তিনি উত্তরে বললেন, যেন তুমি প্রশান্তি লাভ করতে পার।
ইবনে ইসহাক রহ. হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করে দিলেন। এরপর তাঁর বাম পাঁজর হতে একটি হাড় বের করে তাতে পুনরায় গোস্ত ভরিয়ে দিলেন। আদম আ. ঘুমন্ত ছিলেন। তিনি নিদ্রা হতে জেগে উঠার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃজিত স্ত্রী হাওয়া আ.-কে পুরোদস্তুর একজন নারী হিসাবে সৃষ্টি করলেন, যেন তিনি তাঁর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। হযরত আদম আ. নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়ে সে রমণীকে নিজের পার্শ্বে দেখতে পেয়ে বলে উঠলেন, لحمي ودمي وروحي হে আমার গোস্ত, হে আমার রক্ত ও আমার আত্মা! فسكن إليها অতঃপর তার দ্বারা প্রশান্তি লাভ করলেন।
তাদের আরো যুক্তি হল, এতে কোন মতভেদ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। কোথাও এ বিষয়ে উল্লেখ নেই, তাঁকে পরবর্তীতে আকাশে তুলে নেয়া হয়েছে। যদি তাঁকে পরবর্তীতে আকাশে তুলে নেয়া হয়, তবে অবশ্যই তা উল্লেখ না করলে নয়। কারণ এটি তখন আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলীর মধ্যে হতে একটি নিদর্শন হত এবং হযরত আদম আ.-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলার এক মহান নি'আমত হত। কারণ, তা হত হযরত আদম আ.-এর সশরীরে ঊর্ধ্বগমন।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে কিভাবে আকাশে স্থানান্তরিত করবেন, অথচ তিনি ফিরিশতাদের লক্ষ্য করে বলেন, إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً "আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করব"।৮২ সুতরাং যেথাকার নিবাস স্থায়ী, কখনো বহিষ্কার হতে হয় না, সেখানে তাঁকে কিভাবে অস্থায়ীভাবে রাখা হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলার ইরশাদ, وَمَا هُمْ مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ "তারা সেথা হতে বহিষ্কৃত হবে না"।৮৩
তারা আরো বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁকে সিজদা করার জন্য ইবলীসকে নির্দেশ দিলে সে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানানোর প্রেক্ষিতে তাকে নির্দেশ দেয়া হল, فَاهْبط منْهَا "তুমি জান্নাত থেকে নিচে নেমে যাও"। এরপরই হযরত আদম আ.-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে।
সুতরাং উক্ত জান্নাত দ্বারা যদি নভোমণ্ডলের উপরস্থ জান্নাত উদ্দেশ্য হয়, তবে ইবলীসকে জান্নাত থেকে নামিয়ে দেয়ার পরও সে কিভাবে আকাশে আরোহণ করতে পারে? এটাও এ কথার প্রমাণবহ, উক্ত জান্নাত পৃথিবীতে ছিল। জান্নাতুল মা'ওয়া ছিল না।
পক্ষান্তরে বিরোধীপক্ষ যে ব্যাখ্যা পেশ করছেন তা নিতান্তই কাল্পনিক, কৃত্রিম ও বানোয়াট। যেমন তাদের কেউ বলে, ইবলীস সর্বদার জন্য নয়; বরং সাময়িকভাবে আকাশে আরোহণ করেছিল। আবার কেউ বলেছেন, ইবলীস সাপের পেটে অথবা মুখে অবস্থান করে জান্নাতে প্রবেশ করেছিল। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইবলীস পৃথিবীতে ছিল, আর হযরত আদম ও হাওয়া আ. আকাশে ছিলেন। এ অবস্থায়-ই সে তাঁদেরকে ধোকা দিয়েছে। কিন্তু এসবগুলোর ভ্রষ্টতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত হওয়ার বিষয়টি মোটেই অস্পষ্ট নয়।
এর বিপরীতে আমাদের মত সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক। কেননা, আমরা বলি, ইবলীস যখন হযরত আদম আ.-কে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে ফিরিশতা জগৎ থেকে বহিষ্কার করে দেন। আর তখন থেকেই ইবলীসের চোখে আদম আ. শত্রু হয়ে যায়।
আর যখন তার শত্রু হযরত আদম আ.-কে মনোরম উদ্যানে প্রতিষ্ঠিত করা হল, তখন থেকে তার শত্রুতা চরম বিদ্বেষে রূপ নিল এবং ধোকা ও কু-মন্ত্রণার মাধ্যমে তাঁকে সেখান থেকে বের করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করল।
তারা বলেন, সকল দলীল দ্বারা বুঝা যায়, হযরত আদম আ.-এর অবস্থানকৃত জান্নাতটি সেই জান্নাতুল খুলদ তথা স্থায়ী জান্নাত ছিল না; যার ব্যাপারে খোদাভীরুদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। এর উপর ভাল একটি দলীল হল, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর জীবন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর তাঁর জীবনের ইতি ঘটবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে স্থায়ীরূপে সৃষ্টি করেননি। যেমন ইমাম তিরমিযী তাঁর জামে' তিরমিযীতে হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন,
قال رسول الله ﷺ لما خلق الله آدم ﷺ ونفخ فيه الروح عطس فقال الحمد لله فحمد الله بأذنه. فقال ربه يرحمك الله يا آدم اذهب إلى أولئك الملائكة إلى ملأمنهم جلوس فقال السلام عليكم وقالوا وعليك السلام. ثم رجع إلى ربه فقال هذه تحيتك وتحية بنبيك بينهم فقال الله له ويداه مقبوضتان اخترايهما شئت فقال اخترت يمين ربي وكلتا يديه يمين مباركة. ثم بسطها فاذا فيها آدم وذريته فقال يا رب ما هؤلاء؟ قال هؤلاء ذريتك فاذا كل انسان مكتوب بين عينيه عمره. فاذا فيهم رجل أضوؤهم قال يا رب من هذا؟ قال هذا إبنك داؤد وقد كتبت له عمره أربعين سنة. قال ذالك الذي كتبت له قال أى ربي فإني قد جعلت له من عمرى ستين سنة قال أنت وذالك . قال ثم اسكن الجنة ما شاء الله ثم اهبط منها يعد لنفسه . قال فأتاه ملك الموت فكان آدم فقال آدم قد عجلت قد كتبت لي ألف سنة قال بلى ولكنك جعلت لإبنك داؤد ستين سنة. فجحد فجحدت ذريته ونسى فنسيت ذريته فمن يومئذ أمر بالكتاب والشهود.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করে তাঁর মাঝে আত্মা দান করেছেন, তখন হযরত আদম আ.-এর হাঁচি এলো এবং তিনি বলে উঠলেন, আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশেই তিনি তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, তোমার প্রতি রহমত বর্ষিত হোক হে আদম! এখানে ফিরিশতারা আছে, তাদের নিকট যাও। যখন হযরত আদম আ. তাদের নিকট গিয়ে বললেন, আস্-সালামু আলাইকুম। তাঁরা (ফিরিশতাগণ) বললেন, ওয়া আলাইকাস সালাম। অতঃপর তিনি তাঁর প্রভুর নিকট ফিরে এলে তিনি তাঁকে বললেন, এটিই হল তোমার ও তোমার সন্তান-সন্ততিদের পারস্পরিক সালাম বা অভিবাদনের পদ্ধতি।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বললেন, এ দুই মুষ্টি হতে যেটিকে ইচ্ছা পসন্দ কর। হযরত আদম আ. বললেন, আমি আমার প্রতিপালকের ডান হাতকে গ্রহণ করলাম। আল্লাহ তা'আলার উভয় হাতই ডান হাত ও বরকতময়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মুষ্টি খুললেন, তাতে ছিল হযরত আদম আ. ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর সকল বংশধর। তখন হযরত আদম আ. জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রভু! এরা কারা? আল্লাহ তা'আলা বললেন, এরা তোমার সন্তান-সন্ততি। প্রত্যেকের দু'চোখের মধ্যবর্তী স্থলে তাদের আয়ু লিপিবদ্ধ ছিল। তাদের মাঝে অত্যধিক উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট একজন ছিলেন। হযরত আদম আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রভু! এ কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, এ হল, তোমার পুত্র দাউদ। আমি তার বয়স চল্লিশ বছর নির্ধারণ করেছি। হযরত আদম আ. বললেন, হে প্রভু! তার বয়স কিছু বৃদ্ধি করে দিন। আল্লাহ তা'আলা বললেন, তার জন্য আমি এ পরিমাণ-ই লিপিবদ্ধ করে ফেলেছি। তখন হযরত আদম আ. বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! আমার বয়স থেকে তাকে আমি ষাট বছর দিয়ে দিচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, এটা তার ও তোমার ব্যাপার।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর হযরত আদম আ. যত দিন অনুমতি ছিল, জান্নাতে অবস্থান করেছেন। তারপর জান্নাত থেকে অবতারিত হলেন।
হযরত আদম আ. তাঁর আয়ুকাল গণনা করছিলেন। হযরত আদম আ.-এর আয়ূকাল পূর্ণ হওয়ার ষাট বছর পূর্বেই মৃত্যুর ফিরিশতা এসে উপস্থিত হলেন। তখন হযরত আদম আ. বললেন, আপনি তো একটু পূর্বেই এসে পড়লেন। কারণ, আমার আয়ুকাল এক হাজার বছর লিপিবদ্ধ হয়েছে। ফিরিশতা বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই হয়েছে। কিন্তু আপনি আপনার পুত্র দাউদকে তা থেকে ষাট বছর প্রদান করেছেন। তখন হযরত আদম আ. অস্বীকার করলেন। যার ফলে তার সন্তানদেরও অস্বীকৃতি ও বিবাদ করার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তিনি ভুলে গেছেন, ফলে তাঁর সন্তানরাও ভুলে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সেদিন থেকেই মানুষকে পারস্পরিক লেনদেন লিখে রাখার ও সাক্ষী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এ হাদীস উক্ত সনদে حسن غریب এর পর্যায়ে। এ হাদীসটি হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে অন্য সনদেও বর্ণিত আছে।
তারা বলেন, উল্লিখিত হাদীসটি এ ব্যাপারে অত্যন্ত স্পষ্ট, হযরত আদম আ. কে দারুল ক্বারার তথা স্থায়ী নিবাসে সৃষ্টি করা হয়নি। যাতে প্রবেশকারীর কখনো মৃত্যু ঘটবে না। চূড়ান্ত কথা হল, তাঁকে দারুল ফানা তথা পৃথিবীতেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যাতে অবস্থানের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেন। সে সময়েই আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সেখানে অবস্থান করতে দেন।
প্রশ্ন: যদি প্রশ্ন করা হয়, হযরত আদম আ. এর যদি জানা-ই থাকে, তাঁর জীবন চিরস্থায়ী নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপর তাঁর জীবনের ইতি ঘটবে, তবে তিনি ইবলীসের মিথ্যাচার বুঝতে পারলেন না কেন? যখন ইবলীস তাঁকে বলল, هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْد (আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা।৮৪ অথবা যখন ইবলীস তাঁকে বলেছিল, তোমরা স্থায়ী হয়ে যাবে।৮৫ তাহলে তার উত্তর দু'ভাবে দেয়া যায়।
১ম উত্তর: خلد শব্দ ব্যবহারের দ্বারা চিরস্থায়ীর অর্থ বুঝানো আবশ্যক নয়; বরং خلد শব্দটি দীর্ঘকাল অবস্থান করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
২য় উত্তর: যখন ইবলীস তার কু-মন্ত্রণা প্রতিষ্ঠার জন্য শপথ করে বলল এবং তাকে ধোকা দিয়ে চিরস্থায়ী হওয়ার লোভ দেখাল, তখন হযরত আদম আ. তাঁর নির্ধারিত বয়সের কথা ভুলে গেলেন।
তারা বলেন, এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট কথা এবং এতে কোন মুসলমানের দ্বিমত নেই, হযরত আদম আ.-কে এ পৃথিবীর মাটি দ্বারা-ই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, مِن طِينٍ سُلالة নির্বাচিত মৃত্তিকার উপাদান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে (আদম আ.কে)।
এবং তিনি আমাদেরকে আরো জানিয়েছেন, আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে, مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ গন্ধযুক্ত কর্দমের শুষ্ক ঠনঠনে মৃত্তিকা হতে।৮৬
কেউ কেউ বলেন, صَلْصَال বলা হয় ঐ মাটিকে; যা শুকানোর পর বাজালে শব্দ হয়। অন্যরা বলেন, যে মাটির গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে, তাকে صَلْصَال বলা হয়। যা صل اللحم শব্দ হতে নির্গত। صل اللحم-এর অর্থ হল, দুর্গন্ধময় গোশত। حمإ হল, নিকষ কালো পরিবর্তিত মাটি, مسنون বলা হয়, ঐ মাটিকে যার উপর পানি প্রবাহিত করা হয়েছে।
এ সবই হল মৃত্তিকার বিভিন্ন অবস্থা, যা হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির প্রথম পর্ব। যেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা আদমসন্তানের সৃষ্টির বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, প্রথমে বীর্য, অতঃপর জমাট রক্ত, অতঃপর মাংসপিণ্ড সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা এমন অকাট্য কোন সংবাদ দেননি, হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টির পূর্বে বা পরে আকাশে তুলে নেয়া হয়েছে। বলুন, এমন কোন দলীল আছে, যা হযরত আদম আ.-এর উপাদান বা সৃষ্টির পর তাঁকে আকাশে তুলে নেয়ার নির্দেশক? এটি এমনি একটি বিষয় যে ব্যাপারে প্রতিপক্ষের নিকট কোন প্রমাণ নেই। আল্লাহ তা'আলার দেয়া সংবাদসমূহ দ্বারাও তা প্রতীয়মান হয় না।
তারা আরো বলেন, নিশ্চয় নভোমণ্ডলের উপর এমন কোন স্থান নেই, যেখানে ভূ-মণ্ডলের মৃত্তিকা বিকৃত গন্ধযুক্ত হয়ে যেতে পারে। এটিই নিশ্চিত কথা, বিকৃতির স্থল একমাত্র পৃথিবী-ই। নভোমণ্ডলের উপর কোন বস্তু পরিবর্তিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও বিকৃত হতে পারে না। এতে কোন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিই সংশয় পোষণ করতে পারে না।
তারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, وَأَمَّا الَّذِينَ سُعْدُوا فَفِي الْجَنَّةِ خالدين فيهَا مَا دَامَت السَّمَاوَاتُ وَالأرض إلا مَا شَاءَ رَبُّكَ عَطَاء غَيْرَ مَجْذُودَ . পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান তারা থাকবে জান্নাতে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে, যত দিন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে। যদি না তোমার প্রতিপালক অন্যরূপ ইচ্ছা করেন; এটা এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।৮৭ সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জান্নাতুল খুলদের নি'আমত নিরবচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টিই অবহিত করলেন।
তারা আরো বলেন, যদি এ বিষয়গুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করা হয়, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে যমীন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। ইবলীস তাঁকে ধোকায় ফেলল সে স্থানে, যেখানে সে ছিল। ইবলীস তাঁর সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার দরুন তাকে আকাশ থেকে বহিষ্কৃত করার পর। এবং আল্লাহ তা'আলা এটাও বললেন, আমি আদমকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি মনোনীত করব। এগুলো হচ্ছে অস্থায়ী নিবাস। স্থায়ী নিবাস হবে সেই চিরস্থায়ী জান্নাতে, যেটি পৃথিবীতে সহ্য করা কষ্টক্লেশের বিনিময় স্বরূপ পাওয়া যাবে। সেখানে কোন দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা, পেরেশানী নেই। কোন ভয়ও নেই। সেখানে নিদ্রাও নেই। আল্লাহ তা'আলা কাফিরদের জন্য জান্নাতুল খুলদ হারাম করে দিয়েছেন। আর ইবলীস তো কুফরীর মূল।
উক্ত দলীলগুলোর মাঝে যখন সমন্বয় সাধন করা হবে এবং নিরপেক্ষ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে, তখন সে অবশ্যই এ দিকেই (হযরত আদম আ.-এর জান্নাত জান্নাতুল খুলদ ছিল না) ঝুঁকে পড়বে। যে নিজেকে অন্যায় অনুসরণ থেকে মুক্ত রেখেছে, তার কাছে সঠিক বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক প্রদানকারী।
তারা বলেন, যদি এতে অন্য কোন দলীল না থাকে। আর শুধু এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করা হয়, জান্নাতে তো কোন বিধি-নিষেধ নেই। অথচ আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-কে তাঁর জান্নাতে নির্দিষ্ট বৃক্ষে ফল খেতে নিষেধ করেছেন। এটি এ কথারই স্পষ্ট প্রমাণবহ করে, হযরত আদম আ.-এর জান্নাত দারুত তাকলীফ তথা বিধি-নিষেধের স্থান ছিল; প্রতিদান স্থান বা জান্নাতুল খুলদ ছিল না। সংক্ষেপে একথাগুলোই নির্বাচিত যুক্তি।
তরে আল্লাহ-ই একমাত্র সত্তা, যিনি সর্বাধিক ও সম্যক জ্ঞাত।
টিকাঃ
৭৫. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৭৬. সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ২৫
৭৭. সূরা বাক্বারা, আয়াত: ৩০
৭৮. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ১৩
৭৯. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২১
৮০. প্রাগুক্ত, আয়াত: ২২
৮১. সূরা ফাতির, আয়াত: ১০
৮২. সূরা বাকারা, আয়াত: ৩০
৮৩. সূরা হিজর, আয়াত: ৪৮
৮৪. সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২০
৮৫. সূরা আ'রাফ, আয়াত: ২০
৮৬. সূরা হিজর, আয়াত: ২৬
৮৭. সূরা হূদ, আয়াত: ১০৮