📄 সর্বোত্তম মানুষ
১৬৪. হাসান বসরী রহ. বলেন,
"আরবের যাযাবর গোত্রগুলোর এক ব্যক্তি উমর রা.-কে উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে সর্বোত্তম মানুষ, হে সর্বোত্তম মানুষ!' উমর রা. বললেন, সে কী বলছে? বলা হলো, 'সে আপনাকে 'হে সর্বোত্তম মানুষ' বলে সম্বোধন করছে।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'তোমার অমঙ্গল হোক। আমি মোটেও সর্বোত্তম মানুষ নই।' লোকটি বলল, 'আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ! আমি তো আপনাকে সর্বোত্তম মানুষ মনে করতাম।' তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাকে বলব, সর্বোত্তম মানুষ কে?' লোকটি বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।' তিনি বললেন, 'সর্বোত্তম মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবার-পরিজনের সাথে অবস্থান করছিল। এমন সময় তার কাছে ইসলাম পৌঁছে; তখন সে কিছু উট নিয়ে কোনো হিজরতের স্থানে পৌঁছে আর সেগুলো বিক্রি করে যুদ্ধ সরঞ্জাম জোগাড় করে। এরপর থেকে মুসলমান এবং শত্রুদলের মাঝে তার দিন-রাত কাটতে থাকে। সে হলো সর্বোত্তম মানুষ।
লোকটি বলল, 'আমিরুল মুমিনীন, আমি একজন যাযাবর মানুষ। আমার নানাবিধ ব্যস্ততা রয়েছে। এই এই কাজ আছে। আপনি আমাকে এমন কিছু কাজের আদেশ করুন, যা আমার জন্য (জান্নাতে যেতে) সঠিক হবে আর আমি তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে পারব।' উমর রা. বললেন, 'আমাকে তোমার হাত দেখাও!' সে তার হাত বাড়িয়ে দিল। উমর রা. বললেন, 'আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে। তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। সালাত কায়িম করবে। যাকাত আদায় করবে। রমজানের সিয়াম পালন করবে। (সামর্থ্য থাকলে) হজ্জ পালন করবে। ওমরা আদায় করবে। আমীরের কথা শুনবে এবং আনুগত্য করবে। স্পষ্ট বিষয় অবলম্বন করবে এবং গোপন বিষয় হতে দূরে থাকবে। এমন বিষয়ে জড়িত থাকবে, যা লোকজন জানলে ও প্রচার হলে তোমাকে লজ্জিত বা অপদস্থ হতে হয় না। পক্ষান্তরে এমন বিষয় হতে দূরে থাকবে, যা জানাজানি হলে বা প্রচার হলে তুমি লজ্জিত ও অপদস্থ হবে।'
লোকটি বলল, 'আমিরুল মুমিনীন, আমি এসবের ওপর আমল করব আর আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ হলে এ কথা বলব যে, উমর রা. আমাকে এসব করতে আদেশ করেছেন?' উমর রা. বললেন, 'তুমি এগুলো মেনে চলো আর আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ হলে যা ইচ্ছা তা বোলো।"
টিকাঃ
২১৯. সনদ হাসান। গ্রন্থকার ব্যতীত আর কেউ পূর্ণ বর্ণনা উল্লেখ করেননি।
📄 উত্তম ও অধম
১৬৫. উমার ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন,
"একদিন আমি রাসূল ﷺ-এর নিকট বসা ছিলাম। সেখানে আরও কিছু লোক ছিল। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর নবী-রাসূল এবং বিশেষ বান্দাগণের পর সবচেয়ে উত্তম কে?' রাসূল ﷺ বললেন, 'যে মুজাহিদ নিজের জান মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আর ঘোড়ার পিঠে বসা অবস্থায় কিংবা লাগাম ধরা অবস্থায় তার কাছে আল্লাহ তাআলার আহ্বান (মৃত্যুর ডাক) চলে আসে।' লোকটি বলল, 'তারপর কে ইয়া রাসূলাল্লাহ?' রাসূল ﷺ নিজ হাত দ্বারা তাকে জোরে চাপড় মেরে বললেন, 'যে ব্যক্তি একটি পার্শ্ব (স্থান) অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে এবং মানুষকে নিজের অনিষ্ট হতে নিরাপদ রাখে।' এবার লোকটি বলল, 'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি কে?' রাসূল ﷺ বললেন, 'আল্লাহ তাআলার সাথে অংশী স্থাপনকারী (মুশরিক)।' লোকটি বলল, 'তারপর?' তিনি বললেন, 'অত্যাচারী শাসক। যে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হতে বিরত থাকে।'
১৬৬. মুজাহিদ রহ. বলেন,
"উম্মু মুবাশশির হুমাইমাহ বিনতু সইফী রা. রাসূল ﷺ-কে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বোত্তম মানুষ কে?' তিনি বললেন, 'ওই ব্যক্তি, যে ঘোড়ার ওপর বসা আছে, সে শত্রুদের ভয় দেখায় আর শত্রুরাও তাকে ভয় দেখায়।' এই বলে তিনি হাত দ্বারা হিজাজের দিকে ইশারা করেন। তারপর বলেন, 'আর ওই ব্যক্তি, যে সালাত কায়িম করে এবং নিজের সম্পদ হতে আল্লাহ তাআলার পাওনা (যাকাত, সদকা ও আল্লাহর রাস্তার জন্য প্রদেয়) আদায় করে।'
১৬৭. আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন,
"তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তিনি খেজুর গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের উত্তম ও অধম ব্যক্তির সংবাদ দেব না? মানুষের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম, যে আমৃত্যু আল্লাহর রাস্তায় কাজ করে, ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে অথবা তার উটের পৃষ্ঠে থেকে অথবা পদব্রজে। আর নিকৃষ্ট পাপাচারী ব্যক্তি, যে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, কিন্তু পাপের কাজে কোনো পরোয়া করে না।"
১৬৮. আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন,
"রাসুলুল্লাহ ﷺ একবার আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বললেন, মানুষের মধ্যে উত্তম হলো সেই মুজাহিদ, (যে আমৃত্যু আল্লাহর রাস্তায় কাজ করে, ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে অথবা তার উটের পৃষ্ঠে থেকে অথবা পদব্রজে।)"
১৬৯. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেন,
“একবার রাসূল ﷺ তাদের নিকট আসলেন। তারা তখন একটি মজলিসে বসা ছিলেন। রাসূল ﷺ বললেন, আমি কি তোমাদের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করব না? আমরা বললাম, কেন নয়? (নিশ্চয়ই) ইয়া রাসূলাল্লাহ, তিনি বললেন, সে ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় তার ঘোড়ার লাগাম ধরে বের হয়ে যায় এবং মৃত্যুবরণ করে বা শহীদ হয়ে যায়। তারপর বললেন, তার পরবর্তী পর্যায়ের লোকের সংবাদও তোমাদের দেব কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ; ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, সে হলো ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে কোনো গুহায় থাকে, সেখানে সে সালাত আদায় করে, যাকাত আদায় করে এবং লোকদের অনিষ্ঠ থেকে দূরে সরে থাকে। অতঃপর বললেন, তোমাদের কি সর্বনিকৃষ্ট লোক সম্পর্কে অবহিত করব? আমরা বললাম, হ্যাঁ; ইয়া রাসূলাল্লাহ, (অবহিত করুন)। তিনি বললেন, সে হলো ওই ব্যক্তি, যার কাছে কেউ আল্লাহ তাআলার নামে (সাহায্য) চায় কিন্তু সে তাকে দান করে না।”
টিকাঃ
২১৮. সনদ দুর্বল। আরও রয়েছে: আবু দাউদ তয়ালিসী, মুসনাদু আবি দাউদ, ৩৬।
২১৯. সনদ মুরসাল। আরও রয়েছে: মুসনাদু ইসহাক ইবনি রাহওয়াই, ২২০১।
২২০. সনদ দুর্বল। আরও রয়েছে: মুসনাদু আহমাদ, ১১৩৭৪; সুনানু নাসাঈ, ৩১০৬।
২২১. সনদ হাসান গরীব।
২২২. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: সুনানু নাসাঈ, ২৫৬৯।
📄 দ্বীনের পথে ধৈর্যধারণ ও দৃঢ়পদ থাকার নির্দেশ
১৭০. মুবারক ইবনু ফাযালাহ রহ. হাসান বসরী রহ. হতে বর্ণনা করেন,
আল্লাহ তাআলা বলেন,
'হে ঈমানদারগণ, ধৈর্যধারণ করো এবং (শত্রুর) মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।' (সূরা আ-লু ইমরান, ৩:২০০)
এর ব্যাখ্যায় হাসান বসরী রহ. বলেন, 'এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে তাদের দ্বীনের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করতে বলেছেন। তারা দুখে কিংবা সুখে, সচ্ছলতায় কিংবা অনটনে কোনো অবস্থাতেই যেন ধৈর্যহারা না হয়। আর কাফিরদের মোকাবিলায় দৃঢ়পদ থাকতে এবং মুশরিকদের বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
১৭১. একই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহ. বলেন,
'মুশরিকদের মোকাবিলায় দৃঢ়পদ থাকো এবং আল্লাহর রাস্তায় (বের হতে) সদা প্রস্তুত থাকো।'
টিকাঃ
২২৩. সূরা আ-লু ইমরান, ৩:২০০
২২৪. সনদ হাসান। আরও রয়েছে: তাফসিরুত তাবারী, ৬/৩৩২।
২২৫. সনদ হাসান। আরও রয়েছে: তাফসিরুত তাবারী, ৬/৩৩৩।
📄 ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারার ফযীলত
১৭২. শুরাহবীল ইবনু সিমাত কিন্ন্দী রহ. বলেন,
"আমরা দীর্ঘদিন সীমান্ত এবং দুর্গের পাহারায় নিযুক্ত ছিলাম। আমার পরনের কাপড়টির কারণে আমার কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। এর বিহিত করার জন্য একদিন সৈন্যদল থেকে একটু দূরে গেলাম। পথিমধ্যে সালমান ফারসী রা. এর সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, 'আবুস সিমত, কী করছ?' আমি তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, 'আমার মনে হয় তুমি উম্মুস সিমতের (স্ত্রীর) কাছে যেতে চাচ্ছ। যাতে সে তোমার এই (পোশাক ঠিক করার) কাজটি করে দেয়।' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আমি এটাই চাই।' তিনি বললেন, 'এই কাজ কোরো না। কারণ, আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, '(আল্লাহর রাস্তায়) একদিন ও একরাতের সীমান্ত পাহারা বা এক দিনের পাহারা বা এক রাতের পাহারা এক মাস সিয়াম পালন ও রাতভর কিয়াম (সালাত আদায়ের) সমতুল্য। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় পাহারারত অবস্থায় মারা গেল তার সে আমল জারি থাকবে, যা সে করত আর সে সকল ফিতনা হতে রক্ষিত থাকবে, আর তার জন্য রিযিক বরাদ্দ করা হবে। তোমরা চাইলে এই আয়াত দুটি তিলাওয়াত করতে পার,
'যারা আল্লাহর পথে গৃহ ত্যাগ করেছে, এরপর নিহত হয়েছে অথবা মরে গেছে; আল্লাহ তাদের অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করবেন এবং আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট রিযিকদাতা। তাদের অবশ্যই এমন এক স্থানে প্রবেশ করাবেন, যা তারা পছন্দ করবে এবং আল্লাহ জ্ঞানময়, সহনশীল।"
১৭৩. ফাযালাহ ইবনু উবাইদ রা. বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন,
"যে ব্যক্তি এ সকল অবস্থায় মারা যাবে সে কিয়ামাতের আল্লাহ তাআলার নিকট সে অবস্থাতেই পুনরুত্থিত হবে। বর্ণনাকারী হাইওয়াহ ইবনু শুরাইহ বলেন, 'মর্তবা বা অবস্থা বলতে সীমান্ত পাহারা ও হজ্জ ইত্যাদি আমলের কথা বোঝানো হয়েছে।"
১৭৪. ফাযালাহ ইবনু উবাইদ রা. বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন,
"প্রতিটি মৃত ব্যক্তিকেই তার আমলের ওপর মোহরাঙ্কিত করে দেয়া হয় (ব্যক্তিগত কোনো আমলের সুযোগ থাকে না)। তবে আল্লাহর রাস্তায় পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির বিষয়টি ভিন্ন। কিয়ামাত পর্যন্ত তার আমলনামা বৃদ্ধি পেতে থাকে আর সে কবরের ফিতনা (পরীক্ষা ও শান্তি) হতে নিরাপদ থাকে।"
টিকাঃ
২২৬. সুনানু নাসাঈ, ৩১৬৭। সনদ সহীহ।
২২৭. সূরা হজ, ২২:৫৮,৫৯
২২৮. সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী রয়েছেন।
২২৯. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসনাদু আহমাদ, ২৩৯৫০।
২৩০. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসনাদু আহমাদ, ২৩৯৫১।