📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 স্বপ্নযোগে আবু রিফাআহ রা.-এর দর্শন

📄 স্বপ্নযোগে আবু রিফাআহ রা.-এর দর্শন


১৫৮. সিলাহ ইবনু আশইয়াম রহ. বলেন,
"আমি স্বপ্নে দেখলাম আবু রিফাআহ রা. একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন আর আমি একটি ধীরগামী উটের পিঠে রয়েছি। তিনি কিছুদূর গিয়ে আমার জন্য থামেন, যেন আমি তার এতটুকু কাছে পৌঁছতে পারি যে তিনি আমার আওয়াজ শুনতে পান। এরপর তিনি আবার এগিয়ে যান আর আমি তার অনুসরণ করি। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম যে, আমি তার পথ ধরে (শাহাদাতের পথে) চলব। আর তিনি চলে যাওয়ার পরও আমি আমলের বোঝা বয়ে বেড়াব (আরও কিছুদিন জীবিত থাকব)।"

টিকাঃ
২০৯. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: ইবনু আবিদ দুনিয়া, আল মানামাত, ২৫৬।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 সফরে সাথিদের জন্য আবু রিফাআহ রা.-এর বিশেষ খিদমাত

📄 সফরে সাথিদের জন্য আবু রিফাআহ রা.-এর বিশেষ খিদমাত


১৫৯. আবু রিফাআহ রা. বলেন,
"আমি রাসূল ﷺ-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি তখন খুতবা (ভাষণ) দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন মুসাফির এসেছে এবং সে তার দ্বীন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছে। সে জানে না তার দ্বীন কী?' তখন রাসূল ﷺ খুতবা বন্ধ করে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন। একটি চেয়ার আনা হলো, আমার যতটুকু মনে পড়ে, তার পায়াসমূহ ছিল লোহার। রাসূল ﷺ তার ওপর উপবেশন করলেন। তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে যা হতে শিক্ষা দেন তা হতে তিনি আমাকে শিক্ষা দিতে লাগলেন। এরপর তিনি খুতবায় ফিরে গেলেন এবং তা শেষ করলেন।"

বর্ণনাকারী বলেন, 'আবু রিফাআহ রা. বলতেন, আল্লাহ তাআলা যেদিন আমাকে সূরা বাকারা শিক্ষা দিয়েছেন, সেদিন হতে তা আমার হাতছাড়া হয়নি (তিলাওয়াত ছোটেনি)। আমি কুরআনের যা কিছু শিখেছি, সূরা বাকারার সাথেই শিখেছি। তিনি সফরে সাথিদের জন্য পানি গরম করতেন আর বলতেন, 'তোমরা এই পানি দিয়ে ভালোভাবে অযু করে নাও। আর আমি ওই পানি দিয়ে অযু করব।' অতঃপর তিনি ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করতেন।

টিকাঃ
২১০. সহীহ মুসলিম, ৮৭৬; সুনানু নাসাঈ, ৫৩৭৭।
২১১. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৫৫১৭।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 একজন পুরোনো চাদরওয়ালার ঘটনা

📄 একজন পুরোনো চাদরওয়ালার ঘটনা


১৬০. উসাইর ইবনু জাবির রহ. বলেন,
"কুফায় অবস্থানকালে একদিন আমার সঙ্গী আমাকে বললেন, 'আপনি একজন (বিশেষ) মানুষের দেখা পেতে চান?' বললাম, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'এটাই তার চলাচলের রাস্তা। আমার মনে হয় এখনই তিনি এদিক দিয়ে যাবেন।' আমরা তার জন্য বসে রইলাম। ইতিমধ্যে পুরোনো চাদর গায়ে একজন লোক এসে উপস্থিত হলো। বেশ কিছু মানুষ তার পিছু নিল। তিনি তাদের সামনে চলছিলেন আর তাদের দিকে ফিরে কর্কশ ভাষায় কিছু বলছিলেন। কিন্তু লোকজন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছিল না। আমরাও লোকজনের সাথে চলতে শুরু করলাম। তিনি কুফার মসজিদে প্রবেশ করলেন। তার সাথে আমরাও প্রবেশ করলাম। তিনি একটি খুঁটির পাশে গিয়ে দুই রাকাআত সালাত করলেন। সালাত শেষে লোকজনের দিকে ফিরে বললেন, 'হে লোকসকল, তোমাদের সাথে আমার এমন কী সম্পর্ক যে, তোমরা প্রতিটি অলিগলিতে আমার পিছু নিচ্ছ? আমি একজন দুর্বল মানুষ। আমার বিভিন্ন প্রয়োজন রয়েছে। তোমরা সাথে থাকায় আমি সেসব পালন করতে পারছি না। আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রহম করুন। এমন কোরো না। আমার কাছে তোমাদের কারও কোনো প্রয়োজন থাকলে এখানেই বলতে পার।' এরপর তিনি বললেন, 'এ ধরনের মজলিসে তিন প্রকারের মানুষ থাকে। (১) (দ্বীনী বিষয়ে) বিচক্ষণ মুমিন ব্যক্তি। (২) সাধারণ মুমিন, যে বিচক্ষণ নয়। আর (৩) মুনাফিক। দুনিয়াতে এদের উপমা হলো আসমান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মতো। এই বৃষ্টি যখন পত্রবহুল, মজবুত শেকড়-বিশিষ্ট এবং ফলবান গাছের শেকড়ে পৌঁছায় তখন তা আরও সজীব হয়, শেকড় শক্তিশালী হয় আর ফল উত্তম হয় এবং বৃদ্ধি পায়। আবার এই পানি এমন গাছের শেকড়েও পৌঁছায়, যার সবুজপত্র পল্লব রয়েছে। মজবুত শেকড় রয়েছে। কিন্তু ফল নেই। এই পানির ছোঁয়ায় তার পূর্ণতা বৃদ্ধি পায়, পাতা-পল্লব আরও সুন্দর হয়ে ওঠে আর তাতে ফল আসে এবং গাছটি প্রথম শ্রেণির গাছের মতো হয়ে ওঠে। অতঃপর এই পানি শুকনো (মৃত) গাছের গোড়াতেও এসে পৌঁছায় আর তাকে ছিন্নভিন্ন করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।' অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন,
'আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি, যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত। গোনাহগারদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।' (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৮২)
এরপর তিনি এই দুআ পাঠ করেন,
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً يَسْبِقُ بُشْرَاهَا آذَاهَا، وَأَمْنُهَا فَزَعَهَا، تُوجِبُ لِي بِهَا الحَيَاةَ وَالرِّزْقَ.
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে এমন শাহাদাত দান করুন, যার সুসংবাদ এর কষ্টের চেয়ে এবং নিরাপত্তা এর ভীতির চেয়ে অগ্রগামী হবে। যার মধ্যে আপনি আমার জন্য জীবন ও রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।' এই বলে তিনি চুপ করলেন।
উসাইর ইবনু জাবির রহ. বলেন, 'আমার সঙ্গী জানতে চাইল, 'লোকটিকে কেমন দেখলেন?' বললাম, 'তার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে চলেছে। তা ছাড়া তিনি এমন লোক নন, যাকে ছেড়ে চলে যাওয়া যায়।' এরপর আমরা তার সাথেই রয়ে গেলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই লোকজনকে নিয়ে অভিযানের উদ্দেশ্যে একটি বাহিনী তৈরি হলো। চাদরওয়ালা লোকটি তাদের সাথে বেরিয়ে পড়লেন। আমরাও তার সাথে বের হলাম। সফর এবং বিরতি চলতে লাগল। এভাবে চলতে চলতে একসময় আমরা শত্রুর মুখোমুখি হলাম।"

১৬১. হাম্মাদ ইবনু সালামাহ রহ.-এর সনদে পরবর্তী ঘটনা উল্লেখ করে উসাইর ইবনু জাবির রহ. বলেন,
"শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পরপর একজন ঘোষক এই বলে ঘোষণা দিল যে, 'হে আল্লাহ তাআলার সৈন্যদল, সাওয়ারিতে আরোহণ করো আর সুসংবাদ গ্রহণ করো।' এই কথা শুনে লোকটি তার চাদর হেঁচড়িয়ে আসল এবং লোকজন শত্রুর মোকাবিলায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল।
বর্ণনাকারী বলেন, 'চাদরওয়ালা লোকটি তার তরবারি কোষমুক্ত করল এবং তরবারির খাপ ভেঙে ছুড়ে ফেলল আর বলতে লাগল, 'আশায় বুক বাঁধো! আশায় বুক বাঁধো!! যেন সকলেই মৃত্যুবরণ করে আর জান্নাতের দর্শন বিনা ফিরে না আসে।' এ কথা বলতে বলতে তিনি চলতে লাগলেন আর লোকজনও তার সাথে এগিয়ে গেল। তিনি এই বাক্য বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সময় আচমকা একটি তির উড়ে এসে হৃৎপিণ্ডে বিদ্ধ হলো। সাথে সাথে তিনি একেবারে নিথর হয়ে পড়ে গেলেন, যেন কতদিন যাবৎ নিহত হয়ে পড়ে আছেন!
হাম্মাদ রহ. বলেন, 'অতঃপর আমরা তাকে মাটি দিয়ে ঢেকে (কবর) দিলাম।"

টিকাঃ
২১২. সূরা বনী ইসরাঈল (ইসরা), ১৭:৮২
২১৩. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসতাদরাকু হাকিম, ৩৩৮৬।
২১৪. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসতাদরাকু হাকিম, ৩৩৮৬।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 জান্নাতের প্রতি বারা ইবনু মালিক রা.-এর আহ্বান

📄 জান্নাতের প্রতি বারা ইবনু মালিক রা.-এর আহ্বান


১৬২. আনাস ইবনু মালিক রা. বলেন,
"ইয়ামামার যুদ্ধের দিন খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা. মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে অগ্রসর হলেন। তারা একটি নদীর তীরে এসে থামল। সাথে থাকা ছোটখাটো বস্তুসামগ্রী কোমরে গুঁজে তারা নদী পার হলো। সেখানে কিছুক্ষণ লড়াই হলো এবং মুসলিম বাহিনী পিছু হটে আসল। তখন খালিদ রা. মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তখন খালিদ এবং বারা ইবনু মালিক রা.-এর মাঝে ছিলাম। একটু পর খালিদ রা. আসমানের দিকে মাথা তুলে তাকালেন। রণাঙ্গনে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা. কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে পড়ে আসমানের দিকে মাথা তুলে তাকাতেন। এতে তার কর্মপন্থা স্থির হয়ে যেত। খালিদ রা.-এর এই অবস্থা চলাকালে একজন বলল, 'বারা তো ভরসা করে বসে আছে।' উত্তরে খালিদ রা. জমিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আমার ভাই, আল্লাহর শপথ আমি দেখছি।' এরপর তিনি মাথা তুলে আসমানের দিকে তাকালেন। তার কর্মপন্থা স্থির হলো। তিনি বললেন, 'বেটা, এবার উঠো।' বারা রা. বললেন, 'এখন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' এরপর বারা রা. নিজের মাদী ঘোড়ার পিঠে চড়ে আল্লাহ তাআলার হামদ ও ছানা পাঠ করলেন এবং লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'হে লোকসকল, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এটাই জান্নাত। আমার পক্ষে মদীনায় ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।' এরপর আরও কিছুক্ষণ তিনি লোকজনকে উৎসাহ দিলেন তারপর ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে গেলেন। আমি যেন এখনো সেই ঘোড়াটিকে লেজ বাঁকিয়ে দৌড়াতে দেখতে পাচ্ছি। এরপর একদল আরেকদলের ওপর হামলে পড়ল। আর আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের পরাজিত করে দিলেন।"

টিকাঃ
২১৫. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৩৭২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px