📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান

📄 যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান


১৫৪. আলা ইবনু হিলাল বাহিলী রহ. বলেন, ‘সিলাহ রহ.-এর গোত্রের একলোক তাকে বলল, ‘আবুস সাহবাহ! আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি শাহাদাতের পরওয়ানা লাভ করেছি আর তুমি দুইটি লাভ করেছ। তিনি বললেন, ‘তুমি ভালো স্বপ্নে দেখেছ। তুমি নিজে শহীদ হবে আর আমি এবং ছেলে শহীদ হব।’ ইয়াযিদ ইবনু যিয়াদের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে তুর্কী সৈন্যদল যেদিন সিজিস্তানে (সিসতানে) মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায় তখন প্রথম দিকে মুসলমানদের যে বাহিনীটি পরাস্ত হয় এটা ছিল সেই দল। সেই লড়াইয়ে সিলাহ রহ. তার ছেলেকে ডেকে বলেন, ‘বেটা, তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাও।’ ছেলে বলল, ‘আব্বাজান, আপনি নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করছেন আর আমাকে ফিরে যেতে বলছেন? আল্লাহর শপথ! আমার মায়ের দেখাশোনা করার জন্য তো আমার চেয়ে আপনিই উত্তম ছিলেন।’ সিলাহ রহ. বললেন, ‘তাহলে এগিয়ে যাও।’ ছেলে এগিয়ে গিয়ে লড়াই করল এবং আহত হলো। তিনি তির ছুঁড়ে ছেলের আশপাশ থেকে শত্রুসেনা হটিয়ে দিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ। অতঃপর তিনি এগিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য দুআ করলেন। এরপর নিজেও লড়াই করে শহীদ হলেন।”

টিকাঃ
২০৪. সনদ দুর্বল। আরও রয়েছে: বাইহাকী, শুআবুল ঈমান, ৪০১১।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 সিলাহ ইবনু আশইয়াম রহ. এর স্ত্রীর দৃঢ়তা

📄 সিলাহ ইবনু আশইয়াম রহ. এর স্ত্রীর দৃঢ়তা


১৫৫. ছাবিত বুনানী রহ. সিলাহ রহ. এর স্ত্রী মুআজাহ রহ. সম্পর্কে বলেন, ‘যখন তাঁর স্বামী ও পুত্রের শাহাদাতের সংবাদ পৌঁছল তখন মহিলারা তার সাথে দেখা করতে আসল। তিনি তাদের বললেন, ‘তোমরা যদি এই উদ্দেশ্যে এসে থাকো যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে যে সম্মান দান করেছেন তার জন্য শুভেচ্ছা জানাবে, তবে আসতে পার। তা না হলে ফিরে যাও।’

বর্ণনাকারী ছাবিত বুনানী রহ. বলেন, ‘একবার সিলাহ রহ. খানা খাচ্ছিলেন। একলোক এসে বলল, ‘আপনার ভাই মারা গিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আরে, এ খবর তো আমি আগেই পেয়েছি। তুমি বসো। লোকটি বলল, ‘আমার আগে তো এই খবর নিয়ে আর কেউ আপনার কাছে আসেনি!’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ইন্নাকা মাইয়্যিতুন ওয়া ইন্নাহুম মাইয়্যিতুন’ ‘নিশ্চয় আপনারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে।”

টিকাঃ
২০৫. সূরা যুমার, ৩৯:৩০
২০৬. সনদ হাসান। আরও রয়েছে: ইবনু হিব্বান, রওযাতুল ওকালা, ১৬৩।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 আসওয়াদ ইবনু কুলছুম রহ.-এর দুআ

📄 আসওয়াদ ইবনু কুলছুম রহ.-এর দুআ


১৫৬. হুমাইদ ইবনু হিলাল রহ. বলেন,
আসওয়াদ ইবনু কুলছুম রহ. যখন পথ চলতেন তখন তিনি নিজের পায়ের দিকে অথবা পায়ের আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এদিক-সেদিক তাকাতেন না। সে সময় মানুষের বাড়ির প্রাচীর দেয়ালগুলো কিছুটা নিচু করে বানানো হতো। কখনো কখনো তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে গমন করলে মহিলাদের কারও গায়ে উড়না না থাকলে পরপুরুষ দেখে তারা চমকে উঠত এবং একে অন্যের দিকে তাকাত। এরপর তারা বলত, 'সমস্যা নেই, এ তো আসওয়াদ ইবনু কুলছুম। সবাই জানে সে পরনারীর প্রতি চোখ তুলে তাকায় না।'
একবার তিনি যুদ্ধে গিয়ে এই দুআ করলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّ هَذِهِ نَفْسِي تَزْعُمُ فِي الرِّخَاءِ أَنَّهَا تُحِبُّ لِقَاءَكَ، فَإِنْ كَانَتْ صَادِقَةً، فَارْزُقُهَا ذَاكَ، وَإِنْ كَانَتْ كَاذِبَةً، فَاحْمِلْهَا عَلَيْهِ وَإِنْ كَرِهَتْ، فَاجْعَلْهُ قَتْلًا فِي سَبِيلِكَ، وَأَطْعِمْ لَحْمِي سِبَاعًا وَطَيْرًا.
'হে আল্লাহ, আমার ধারণা, এই সুখের সময়ে আমার মন আপনার সাক্ষাৎ পেতে চায়। যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে আপনি তাকে সাক্ষাতের রিজিকে ধন্য করুন। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার অপছন্দ সত্ত্বেও বিষয়টি তার ওপর চাপিয়ে দিন। এই অন্তরকে আপনার রাস্তায় শহীদ করুন আর আমার গোশত হিংস্র পশু আর কাক-পক্ষীকে খাইয়ে দিন।'

বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর তিনি এক বাহিনীর সাথে বেরিয়ে গেলেন। তারা একটি ভগ্ন দেয়াল-ঘেরা স্থানে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে শত্রুপক্ষ এসে সেই প্রাচীরের পাশে অবস্থান নিল। তখন তার সঙ্গীগণ সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেও তিনি বের হতে পারলেন না। শত্রুসংখ্যাও ততক্ষণে আরও বেড়ে গেল। অবশেষে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে চেহারায় চাপড় মারলেন এবং খালি পায়ে চললেন। শত্রুসেনারা তার পথ ছেড়ে দিল। তিনি সেই স্থান হতে কিছুদূর গিয়ে অযু করে সালাত আদায় করলেন। শত্রুসেনারা বলল, 'সম্ভবত আরবরা যখন আত্মসমর্পণ করে তখন এমন করে থাকে।' সালাত শেষ করেই তিনি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং নিহত হলেন। এর কিছুকাল পর মুসলমানদের বড় এক বাহিনী সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে আসওয়াদ রহ.-এর ভাইও ছিলেন। তার ভাইকে বলা হলো, 'আপনি ওদিকে গিয়ে আপনার ভাইয়ের হাড়গোড় যা পাওয়া যায় এনে দাফন করছেন না কেন?' তিনি বললেন, 'আমি এসবের কিছুই করব না। আমার ভাই দুআ করেছিলেন আর তার দুআ কবুল হয়েছে।' বাস্তবেই তিনি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিলেন না।

টিকাঃ
২০৭. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: ইবনু আবিদ দুনিয়া, মুহাসাবাতুন নাফস, ২০; ইমাম আহমাদ, কিতাবুয যুহদ, ১১৫৩।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 ঘুমের মধ্যেই শহীদ

📄 ঘুমের মধ্যেই শহীদ


১৫৭. হুমাইদ ইবনু হিলাল রহ. বলেন,
আবু রিফাআহ আদাওয়ী রা. যখন সালাত আদায় করতেন তখন সালাত শেষে দুআ করতেন। তার দুআর শেষে এসে তিনি বলতেন,
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَإِذَا كَانَتْ خَيْرًا لِي فَتَوَفَّنِي وَفَاةً طَاهِرَةً طَيِّبَةً يَغْبِطُنِي بِهَا مَنْ سَمِعَ بِهَا مِنْ إِخْوَانِي الْمُسْلِمِينَ مِنْ عِفْتِهَا وَطَهَارَتِهَا وَطِيبِهَا، وَاجْعَلْهُ قَتْلًا فِي سَبِيلِكَ، وَاجْدَعْنِي عَنْ نَفْسِي
'হে আল্লাহ, যতদিন এ জীবন আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমায় জীবিত রাখুন। আর যখন মৃত্যু কল্যাণকর হয় তখন আমাকে এমন পবিত্র মৃত্যু দান করুন, যা শুনে আমার মুসলমান ভাইয়েরা এই পূতপবিত্রতা ও উত্তম মৃত্যুর প্রতি ঈর্যান্বিত হয়ে উঠবে। আপনি আমাকে আপনার রাস্তায় মৃত্যু দান করুন আর আমাকে আমা হতে বিচ্ছিন্ন রাখুন (আমার অজান্তেই যেন মৃত্যু চলে আসে)।'

বর্ণনাকারী বলেন, 'এর কিছুদিন পর তিনি আব্দুর রহমান ইবনু সামুরাহ রা.-এর সাথে অভিযানে বের হলেন। এই বাহিনী থেকে একটি ক্ষুদ্র দল বিশেষ অভিযানে বের হলো। এই দলটির অধিকাংশই বনু হানীফার লোকজন ছিলেন। আবু রিফাআহ রা. বললেন, 'আমি বাহিনীর সাথে যাব।' তখন আবু কাতাদাহ রা. বললেন, এই বাহিনীতে তো (আপনার গোত্র) বনু সা'আদের কেউ নেই। তা ছাড়া আপনার পরিবারেও আপনি ছাড়া (কর্মক্ষম) কেউ নেই।' তিনি বললেন, 'এ ব্যাপারে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।' তিনি তাদের সাথে বেরিয়ে গেলেন।

দলটি শত্রুপক্ষের একটি দুর্গের চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দিলেন। রাতের শেষ প্রহরে ঢালের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। ভোর হলে তার সঙ্গীগণ আক্রমণের উপায় ও পথ নিয়ে ভাবতে লাগল। তারা ঘুমন্ত আবু রিফাআহ রা.-কে ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে তার ওপর শত্রুপক্ষের নজর পড়ল। তারা তিন জন শক্তিশালী সৈন্যকে তার পাশে নামিয়ে দিল। তারা তার তরবারি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করল। ইতিমধ্যে দলের লোকদের আবু রিফাআহ রা.-এর কথা মনে পড়ল। তারা বলল, 'আমরা তো তার কথা ভুলেই গেছি।' এই বলে তারা তার নিকট ফিরে এসে দেখে শত্রুপক্ষের শক্তিশালী লোক তিনটি তাকে হত্যা করে সব ছিনিয়ে নিতে উদ্যত হয়েছে। তারা তাদের হটিয়ে দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে আসল। সব শুনে আব্দুর রহমান ইবনু সামুরাহ রা. বললেন, 'আমাদের বনু আদী ভাই শাহাদাতের দুয়ারে পৌঁছে গেলেন অথচ তিনি নিজে তা টেরও পেলেন না!'

টিকাঃ
২০৮. সনদ সহীহ। আরও রয়েছে: ইবনু সা'আদ, তবাকাতুল কুবরা, ৭/৪৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px