📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 হুরে ঈন

📄 হুরে ঈন


১৪৯. ছাবিত বুনানী রহ. বর্ণনা করেন, ‘এক যুবক দীর্ঘদিন যাবৎ যুদ্ধ করছিল। সে শাহাদাতের জন্য উন্মুখ ছিল। কিন্তু কপালে তা জুটছিল না। একসময় সে নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে বিয়েশাদি করে নেয়াই ভালো হবে।’ এই ভাবতে ভাবতে সে তাঁবুতে গিয়ে কাইলুলাহ করতে লাগল। যুহরের সময় তার সাথের লোকজন তাকে সালাতের জন্য জাগিয়ে দিল। এতে সে কাঁদতে লাগল। লোকজন তার কোনো সমস্যা হয়েছে কি না ভেবে ভড়কে গেল। এই দেখে সে বলল, ‘আমার কিছু হয়নি। স্বপ্নে একজন লোক এসে আমাকে বলল, ‘চলো তোমাকে তোমার হুরে ঈন স্ত্রীদের কাছে নিয়ে যাই। আমি উঠে তার সাথে চললাম। সে আমাকে একটি শ্বেতশুভ্র ঝলমলে উদ্যানে নিয়ে গেল। এত সুন্দর উদ্যান আমি কখনো দেখিনি। সেখানে আমি দশ জন যুবতীকে দেখতে পেলাম। তাদের মতো কিংবা তাদের চেয়ে সুন্দর কোনো নারী আমি কখনো দেখিনি। আমি আশা করলাম, তাদেরই একজন যেন হুরে ঈন হয়। আমি বললাম, ‘তোমাদের মধ্যে কি হুরে ঈন রয়েছে?’ তারা বলল, ‘তিনি আরও সামনে রয়েছেন। আমরা তো তার দাসীমাত্র।’ এরপর আমি সঙ্গীর সাথে এগিয়ে চললাম। আমরা আরেকটি উদ্যানে এসে হাযির হলাম। যার সৌন্দর্যের সামনের আগের উদ্যানের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাবে। সেখানে বিশ জন যুবতীর দেখা পেলাম। যাদের সৌন্দর্যের সামনে আগের যুবতীদের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাবে। আমি আশা করলাম, তাদেরই একজন যেন হুরে ঈন হয়। আমি বললাম, ‘তোমাদের মধ্যে কি হুরে ঈন রয়েছে?’ তারা বলল, ‘তিনি আরও সামনে রয়েছেন। আমরা তো তার দাসীমাত্র।’ এভাবে আরও ত্রিশ জনের সাথে সাক্ষাৎ হলো। এরপর আমি একটি গম্বুজের কাছে এসে থামলাম। যা একটিমাত্র লাল বর্ণের ইয়াকৃত পাথর দ্বারা নির্মিত। এর ঔজ্জ্বল্যে চারপাশ ঝলমল করছিল। আমার সঙ্গী বলল, এতে প্রবেশ করো। আমি প্রবেশ করলাম। সেখানে আমি এক অনিন্দ্য রূপবতী যুবতীকে দেখতে পেলাম। যার সৌন্দর্যের সামনে গম্বুজের সৌন্দর্য কিছুই না। আমি তার পাশে বসলাম। তার সাথে কথা বললাম। সেও আমার সাথে কথা বলল। ইতিমধ্যে আমার সঙ্গী হাঁক ছেড়ে বলল, ‘বেরিয়ে আসো। যেতে হবে।’ আমার পক্ষে তার অবাধ্য হওয়া সম্ভব ছিল না। আমি ওঠে দাঁড়ালাম। মেয়েটি আমার চাদরের এক প্রান্ত ধরে বলল, ‘আজ রাতে আমাদের সাথে ইফতার করবেন।’ এমন সময় আপনারা আমাকে জাগিয়ে দেন আর আমিও বুঝতে পারি যে এটা স্বপ্ন ছিল। তাই আমি কাঁদতে শুরু করি।’ ইতিমধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। লোকজন সাওয়ারিতে চড়ে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে জড়িয়ে গেল। যুদ্ধের ডামাডোলে একসময় সূর্য অস্তমিত হলো। ইফতারের সময় হলো। সে সময় যুবকটি আহত হয়ে শহীদ হলো। সে সিয়াম পালন করছিল। বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমার ধারণা সে আনসারী ছিল। সাবিত ইবনু কায়েস রা. তার বংশ-পরিচয় জানত।”

টিকাঃ
১৯৯. সনদ সহীহ। অনেকে এই বর্ণনাটিকে হাদীস বা অকাট্য দলিল মনে করে। বাস্তবে এটা এক মুজাহিদের স্বপ্ন। তবে সত্যিকারের হরে ঈন এরচেয়ে অনেক অনেক সুন্দর হবে। কারণ, জান্নাতের নিআমাত দুনিয়ার কারও পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 আমল কম বিনিময় বেশি

📄 আমল কম বিনিময় বেশি


১৫০. আবু আব্দির রহমান মাসউদী রহ. বলেন, ‘আমরা ফাযালাহ ইবনু উবাইদ রা. এর সাথে রোমানদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ফাযালাহ রহ. এই একটিমাত্র স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। ফাযালাহ দ্রুতগতিতে চলছিলেন। তিনি আমাদের আমীর ছিলেন। আর সে সময় আমীরগণ তার অধীনস্থদের কথায় কান দিতেন। কারণ, আল্লাহ তাআলাই এদের তার অধীনস্থ করেছেন। এক ব্যক্তি হাঁক ছেড়ে বলল, ‘হে আমীর, লোকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আপনি একটু থামুন। যাতে সবাই আপনার কাছে পৌঁছতে পারে।’ এই কথা শুনে তিনি একটি চারণভূমি-জাতীয় খোলা জায়গায় থামলেন। সেখানে একটি দুর্গের প্রাচীর ছিল। আর প্রাচীরের বেষ্টনীতে একটি দুর্গ ছিল। আমাদের কেউ বাহন হতে নেমে দাঁড়িয়েছিল আর কেউও নামছিল। এমন সময় ফাযালা রহ. গোঁফওয়ালা একজন লাল চামড়ার (রোমান) লোককে নিয়ে হাযির হলো। আমরা বললাম, ‘এ তো দেখছি কোনোরকম চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ছাড়াই দুর্গ থেকে বেড়িয়ে চলে এসেছে!’ ফাযালাহ রহ. তাকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। লোকটি বলল, ‘গতরাতে আমি শূকরের গোশত খেয়েছি, মদ্যপান করেছি অতঃপর স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্নে আমার কাছে দুজন লোক আসল। তারা আমার উদর ধুয়ে-মুছে সাফ করে আমাকে দুজন নারীর সাথে বিয়ে করিয়ে দিল, যারা একে অপরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয় না। অতঃপর তারা আমাকে বলল, ‘তুমি ইসলাম গ্রহণ করো।’ অতএব আমি এখন একজন মুসলমান।’ তার কথা শেষ না হতেই আমাদের উদ্দেশ্যে একটি তির উড়ে আসল আর সবার চোখের সামনে লোকটির ঘাড়ে গিয়ে বিদ্ধ হলো। এই দৃশ্য দেখে ফাযালাহ রহ. বলে উঠলেন, ‘আল্লাহু আকবার! আমল কম অথচ বিনিময় কত বেশি! তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা আদায় করো।’ আমরা তার জানাযা পড়লাম এবং সেই অবস্থানের জায়গাতেই তাকে দাফন করলাম। বর্ণনাকারী কাসিম রহ. এই ঘটনা আলোচনা করে বলতেন, ‘ঘটনাটি আমি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছি।”

টিকাঃ
২০০. সনদ হাসান। আরও রয়েছে: মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৪০০৫

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 পর পর দুই বার একজনই দাঁড়ালেন

📄 পর পর দুই বার একজনই দাঁড়ালেন


১৫১. সুহাইল ইবনু আবি সালিহ রহ. বলেন, ‘রাসূল ﷺ যখন অহুদের উদ্দেশে বের হলেন তখন বললেন, ‘কে আছো যে আজ রাতে এই গিরিপথটি পাহারা দেওয়ার জন্য রাজি আছে?’ অথবা তিনি এ-জাতীয় কিছু বলেন। তখন বনু যুরাইক হতে আবুস সাবই যাকওয়ান ইবনু আব্দি কায়স নামক একজন আনসারী সাহাবী উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘আমি রাজি আছি।’ রাসূল ﷺ বললেন, ‘তুমি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি ইবনু আব্দি কায়স।’ রাসূল ﷺ বললেন, ‘বসো।’ এরপর তিনি আবার আহ্বান জানালেন। তখন যাকওয়ান রা. আবার দাঁড়ালেন। রাসূল ﷺ বললেন, ‘তুমি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি আবুস সাবই।’ তখন রাসূল ﷺ (দুই বারে দুই জন দাঁড়িয়েছে ভেবে) বললেন, ‘তোমরা অমুক অমুক জায়গায় অবস্থান নেবে।’ তখন যাকওয়ান রা. বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, লোক তো আমি এক জনই।’ আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে, সে কি মুশরিকদের গুপ্তচর কি না? ইতিমধ্যে রাসূল ﷺ বললেন, ‘কেউ যদি আগামীকাল জান্নাতের সবুজ উদ্যানে ঘুড়ে বেড়ানো মানুষ দেখতে চায়, সে যেন তাকে দেখে নেয়।’ তখন যাকওয়ান রা. বিদায় নিতে পরিবারের লোকজনের কাছে গেলেন। তার স্ত্রীগণ তার পোশাক টেনে ধরে বলতে লাগল ‘আবুস সাবই! তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছ!’ তিনি টেনে তাদের হাত থেকে পোশাক ছাড়িয়ে নিয়ে তাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘কিয়ামাতের দিন তোমাদের সাথে দেখা হবে।’ এরপর তিনি শাহাদাতবরণ করেন।”

টিকাঃ
২০১. সনদ দুর্বল। একাধিক দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। তবে ঘটনাটি ইমাম আবু নুআইম, ওয়াকিদী, ইবনু হাজার আসকালানীসহ অনেকেই বর্ণনা করেছেন। আবু নুআইম, মা'রিফাতুস সাহাবাহ, ২/২৭; আল ইসাবাহ, ২/৩৩৮।

📘 জান্নাতের ছায়াপথ 📄 সিলাহ ইবনু আশইয়াম রহ. -এর অদ্ভুত স্বপ্ন

📄 সিলাহ ইবনু আশইয়াম রহ. -এর অদ্ভুত স্বপ্ন


১৫২. সিলাহ ইবনু আশইয়ান রহ. বলেন, ‘একবার আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একদল লোকের মাঝে আছি আর আমাদের পেছনে খোলা তরবারি হাতে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। সে যার কাছে যাচ্ছে তার মাথায় আঘাত করছে। তবে কিছুক্ষণ পরই আঘাতপ্রাপ্ত লোকটির মাথা আবার আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। আমি অপেক্ষা করছিলাম যে, লোকটি কখন আমার কাছে আসবে আর আমার সাথেও অন্যদের মতো আচরণ করবে। অবশেষে লোকটি আমার কাছে আসল এবং মাথায় আঘাত করল। মাথা কেটে পড়ে গেল। আমার চোখে এখনো সেই দৃশ্য ভাসছে যে, আমি আমার মাথা উঠিয়ে নিয়ে ঠোঁট হতে ধুলোবালি ঝেড়ে তা আগের জায়গায় স্থাপন করে নিলাম। আর মাথাও আগের মতো হয়ে গেল।”

টিকাঃ
২০২. সনদ হাসান। আরও রয়েছে: মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩০৫৩১। এই বর্ণনা দ্বারা সম্ভবত শহীদের কর্তিত অঙ্গ মৃত্যুর পর কবরজগতে বা অল্প সময় পরেই পুনঃস্থাপনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ ভালো জানেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px