📄 একটি ভ্রান্তির অপনোদন
৯. একটি রাত্রির অপনোদন
আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পর শয়তান যখন বিতাড়িত হল তখন সে অস্বীকার করল যে, “হে আমার রব! আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপ কর্মকে অবশ্যই শোভনীয় করে তুলব। আর আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করেই ছাড়ব। (সূরা হিজর-৩৯)
অন্যত্র আল্লাহ শয়তানের এ উক্তিটি হুবহু নকল করেছেন, “অতঃপর আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তাদের সম্মুখ দিয়ে, পিছন দিয়ে, ডান দিক দিয়ে এবং বাম দিক দিয়ে তাদের নিকট আসব।” (সূরা আ’রাফ-১৭)
মূলত শয়তান দিন রাতভর প্রত্যেক মানুষের পিছনে লেগে আছে, যাতে মৃত্যুর পূর্বে তাকে কোন না কোন ফেতনায় ফেলে জান্নাতের রাস্তা থেকে দূরে সরিয়ে জাহান্নামের রাস্তায় নিক্ষেপ করতে পারে। মানুষকে পাপের মধ্যে লিপ্ত রাখা ও তাকে আমলহীন করার জন্য শয়তানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল এই যে, "আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং অত্যন্ত দয়ালু, তিনি সব কিছু ক্ষমা করে দিবেন।" এ কথাই অন্তরে বদ্ধমূল করে নেয়া, আমল না করা।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে আল্লাহর রহমত অত্যন্ত প্রশস্ত, আর তাঁর রহমত তাঁর রাগের ওপর বিজয়ী। কিন্তু এ রহমত প্রাপ্তির জন্যও আল্লাহর দেয়া নিয়ম-কানুন কুরআন মাজীদে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى .
এবং আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তাওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সৎ পথে অবিচল থাকে! (সূরা ত্বা-হা-৮২) আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ ক্ষমাকারীর জন্য চারটি শর্ত করেছেন-
১. তাওবা: যদি কোন ব্যক্তি প্রথমে কুফর ও শিরকের মাঝে লিপ্ত ছিল, তাহলে কুফর ও শিরক থেকে বিরত থাকা, তবে কোন ব্যক্তি যদি কাফের বা মোশরেক না হয়, কিন্তু কবীরা দ্বারা পাপ করেছে, তাহলে তার কবীরা গুনাহের পাপ থেকে বিরত থাকা বা তা পরিত্যাগ করা তার জন্য প্রথম শর্ত।
২. ঈমান: বিশ্বস্ত অন্তর নিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনে, সাথে সাথে আসমানী কিতাবসমূহ এবং ফেরেশতাগণ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা দ্বিতীয় শর্ত।
৩. নেক কাজ: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নের পর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ মোতাবেক জীবনযাপন করা ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল এর সুন্নাতের অনুসরণ করা তৃতীয় শর্ত।
৪. অবিচল থাকা: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য যদি কোন বিপদাপদ আসে, তখন ঐ পথে অবিচল থাকা চতুর্থ শর্ত।
যে ব্যক্তি উল্লেখিত চারটি শর্ত পূর্ণ করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা ও দয়ার ওয়াদা করেছেন। এ হল দয়া করা ও মানুষের পাপ মাফ করার ব্যাপারে আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়ম-নীতি। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা তাওবার নিয়ম বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, ঐ লোকদের তাওবা কবুলযোগ্য যারা না জেনে ভুলবশত পাপ করেছে, কিন্তু যারা জেনে শুনে পাপ করে চলছে, তাদের জন্য ক্ষমা নয় বরং তাদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি।
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا - وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُولَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا .
তাওবা কবুল করার দায়িত্ব যে আল্লাহর ওপর রয়েছে, তাতো শুধু তাদেরই জন্য, যারা শুধু অজ্ঞতাবশত পাপ করে থাকে, অতপর অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সুতরাং আল্লাহ তাদেরকেই ক্ষমা করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, বিজ্ঞানময়। আর তাদের জন্য ক্ষমা নেই যারা ঐ পর্যন্ত পাপ করতে থাকে। যখন তাদের কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমি এখন ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাদের জন্যও নয়, যারা অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। তাদেরই জন্য আমি বেদনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা নিসা-১৭, ১৮)
আলোচ্য আয়াতে তিনটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে-
১. পাপ থেকে ক্ষমা শুধু ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যারা অজ্ঞতা বা ভুল করে পাপ করছে।
২. জীবনভর ইচ্ছাকৃত পাপকারীদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।
৩. কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের জন্যও রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। নবী -এর যুগে সংঘটিত তাবুকের যুদ্ধে কা'ব বিন মালেক (রা), হেলাল বিন উমাইয়্যা (রা) এবং মুররা বিন রবি (রা) ভুলক্রমে অলসতা করেছিল। আর তখন তারা তিনজনেই তাওবা করল। আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন। অথচ ঐ যুদ্ধেই মুনাফেকরা ইচ্ছা করে রাসূল -এর নাফরমানী করল, তারাও তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে ক্ষমা চাইল এবং রাসূল -কে সন্তুষ্ট করতে চাইল। তখন আল্লাহ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা দিলেন যে-
إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَا وَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ .
তারা হচ্ছে অপবিত্র আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। ঐ সব কর্মের বিনিময়ে যা তারা করত। (সূরা তাওবা-৯৫)
সাহাবাগণের মধ্যে বেশির ভাগ এমন ছিল যে যাদেরকে রাসূল অত্যন্ত স্পষ্ট করে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। যেমন: আশারা মোবাশ্শারা (জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন), বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, শাজারা (বৃক্ষের নীচে বাইয়াতকারীরা) কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা ভয়ে এত ভীত সন্ত্রস্ত থাকত যে, আখেরাতের কথা স্মরণ হওয়া মাত্রই তারা কাঁদতে শুরু করত।
ওসমান (রা)-এর মতো ব্যক্তি যাকে রাসূল একবার নয়, বরং কয়েকবার জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, এর পরেও কবরের কথা স্মরণ হওয়া মাত্রই এত কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। ওমর (রা) জুম'আর খোতবায় সূরা তাকভীর তেলাওয়াত করতে ছিলেন, যখন এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন- عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ .
তখন প্রত্যেক ব্যক্তিই জানতে পারবে যে সে কি নিয়ে এসেছে। (সূরা তাকভীর-১৪)
তখন এত ভীত সন্ত্রস্ত হলেন যে, তাঁর আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল।
সাদ্দাদ বিন আওস যখন বিছানায় শুইতেন, তখন এপাশ-ওপাশ হতেন ঘুম আসত না, আর বলতেন, "হে আল্লাহ! জাহান্নামের ভয় আমার ঘুম হারাম করে দিয়েছে" এরপর উঠে গিয়ে সকাল পর্যন্ত কান্নাকাটি করতেন। আবু হুরাইরা (রা) বলেন: সূরা নাজম নাযিল হওয়ার সময় সাহাবাগণ- أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ .
তোমরা কি এ কথায় বিস্ময়বোধ করছ? এবং হাসি ঠাট্টা করছ! ক্রন্দন করছ না? (সূরা নাজম-৫৯, ৬০)
আলোচ্য আয়াত শ্রবণ করে এত কাঁদতেন যে, নয়নের অশ্রু গাল ভেসে পড়তে ছিল। রাসূল কান্নার আওয়াজ শুনে সেখানে উপস্থিত হলেন, তাঁরও নয়ন ঝরে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল।
আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) সূরা মুতাফফিফীন তিলাওয়াত করছিলেন। যখন يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ .
যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে। (সূরা মোতাফফিফীন-৬)
এ আয়াতে পৌঁছল তখন এত কাঁদলেন যে নিজে নিজেকে সংবরণ করতে পারছিলেন না এবং তিনি পড়ে গেলেন।
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) সূরা ক্বাফ তেলাওয়াত করতে করতে যখন এ আয়াতে পৌঁছল- وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ .
মৃত্যু যন্ত্রণা সত্যই আসবে, এ থেকেই তোমরা অব্যাহতি চেয়েছিলে। (সূরা ক্বাফ-১৯)
তখন কাঁদতে কাঁদতে তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল।
আবু হুরাইরা (রা) মৃত্যু শয্যায় শায়িত অবস্থায় কাঁদতে লাগল, লোকেরা তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে, তিনি বললেন: আমি পৃথিবীর (টানে) কাঁদছি না, বরং এ জন্য কাঁদছি যে, আমার দীর্ঘ সফরের পথে সম্বল খুবই কম। আমি এমন এক টিলার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছি যে, আমার দীর্ঘ সফরের পথে সম্বল খুবই কম। আমি এমন এক টিলার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছি যে, যার সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম অথচ আমার জানা নেই যে, আমার ঠিকানা কোথায়? আবু দারদা (রা) আখেরাতের ভয়ে বলছিল "হায় আমি যদি কোন বৃক্ষ হতাম যা কেটে ফেলা হত, আর প্রাণীরা তাকে ভক্ষিত তৃণ সাদৃশ করে দিত।
ইমরান বিন হুসাইন (রা) বলতেন হায়! আমি যদি কোন টিলার বালি কণা হতাম যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যেত।
আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া এবং হিসাব নিকাশ আমলনামা, অতপর জাহান্নামের আযাবের কারণে এ অবস্থা শুধু দু' একজন নয় বরং সকল সাহাবাই এরূপই ছিল।
প্রশ্ন হল সাহাবাদের কি এ কথা জানা ছিল না যে, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু? তাদের কি জানা ছিল না যে আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন? তাদের কি একথা জানা ছিল না যে, আল্লাহর রহমত তাঁর গজবের ওপর বিজয়ী। সবই তাদের জানা ছিল বরং আমাদের চেয়ে তারা এ বিষয়ে আরো অধিক জ্ঞান রাখতেন। কিন্তু আল্লাহর বড়ত্ব গৌরব ও মর্যাদার ভয় সর্বদা অন্তরে রাখা একটি ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
সুতরাং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে ওদেরকে ভয় কর না বরং আমাকেই ভয় কর। (সূরা আলে ইমরান-১৭৫)
এ কারণে আল্লাহর ফেরেশতারাও তাঁর শাস্তি ও পাকড়াওকে ভয় করে। রাসূল ও আল্লাহর শাস্তি ও গ্রেফতারের ভয়ে ভীত থাকত। তিনি বলেন-
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمُ اللَّهَ .
আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের সবার চেয়ে অধিক ভয় করি। (বোখারী)
রাসূল স্বীয় দোয়া সমূহে স্বয়ং আল্লাহর ভয় কামনা করতেন, তাঁর দোয়া সমূহের মধ্যে একট গুরুত্বপূর্ণ দোয়া এ ছিল যে-
اللَّهُمَّ أَقْسِمُ لَنَا مِنْ خَشَيَتِكَ مَا تَحُولُ بِهِ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مَعْصِيَتِكَ .
হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার এতটা ভয় দান কর যা, আমার ও তোমার নাফরমানির মাঝে বাধা হবে। (তিরমিযী)
অন্য এক দোয়ায় রাসূল আল্লাহর ভয় শূন্য অন্তর থেকে আশ্রয় কামনা করেছেন।
اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ قَلْبِ لَا يَخْشَعُ .
হে আল্লাহ! আমি এমন অন্তর থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই, যা তোমাকে ভয় করে না। তাবে-তাবেয়ী অর্থাৎ সোনালী যুগের সমস্ত মানুষ আল্লাহর শাস্তি ও গ্রেফতারকে অধিক পরিমাণে ভয় করত। আল্লাহর ভয় থেকে নির্ভয় হয়ে যাওয়া কবীরা গুনাহ। যার ফল হবে নিজেই নিজের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা।
আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন-
فَلا يَا مَنْ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ .
সর্বনাশগ্রস্ত সম্প্রদায় ব্যতীত কেউই আল্লাহর গ্রেফতার থেকে নিঃশঙ্ক হতে পারে না। (সূরা আ'রাফ-৯৯)
সুতরাং আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার আকাঙ্ক্ষা ঐ ব্যক্তির রাখা দরকার যে, আল্লাহকে ভয় করে জীবন যাপন করে, আর তার অজান্তে হয়ে যাওয়া গুনাহসমূহের জন্য সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি সর্বদা গুনাহ করে চলছে আর এ কথা মনে করছে যে, আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল তার দৃঢ় বিশ্বাস করা দরকার যে সে সরাসরি শয়তানের চক্রান্তে লিপ্ত আছে। যার শেষ ফল ধ্বংস ব্যতীত আর কিছুই নয়।